কালো দরজা – অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী

কালো দরজা

১. সুবীরবাবুর গল্প

–শুনুন। সব দরজা খোলা উচিত নয়। বিশেষ করে কালো রঙের কোনো দরজা। মানে ধরুন, আপনি রোজকার মতো আজও নিজের অতি পরিচিত রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ খেয়াল করলেন একটা বাড়ির গায়ে, বা, অন্ধকার গলির মুখে একটা কালো রঙের দরজা। অথচ, আপনার মনে পড়ে না আগে কখনো এটা দেখেছেন বলে। আপনি এই ভেবে আশ্চর্য হলেন যে, এতদিন কেন খেয়াল করেননি এটা। কি? এরকম ঘটেছে আপনার সঙ্গে? শুনুন… মন দিয়ে শুনুন। সেই দরজা কখনোই খোলার চেষ্টা করবেন না। কারণ, এগুলো সাধারণ দরজা নয়।

আপনি কি জানেন, এই পৃথিবীর বুক থেকে প্রতি বছর কয়েক লক্ষ মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায়! এদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না কোনোদিন। এদের বেশিরভাগই কোথায় যায়, জানেন? আমার ধারণা ওই কালো দরজার ওপারে!

ওপরের এই খাপছাড়া, প্রলাপগুলো আমার সামনে যে ব্যক্তি বকছেন তিনি সুবীরবাবু। কোনো একটা সরকারি দপ্তরের কেরানি ছিলেন। ছিলেন, কারণ এখন ভদ্রলোকের যা অবস্থা, তাতে তিনি চাকরি করার অবস্থায় নেই। বরং, একটা অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে তিনি আসার পর থেকেই। তাঁর ডান হাতের কড়ে আঙুলটা দেখলাম নেই। ওটার চারপাশে ব্যান্ডেজের দাগ এখনও দেখা যাচ্ছে দেখে আন্দাজ করলাম যে, সম্ভবত কোনো সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় তিনি আঙুলটা খুইয়েছেন। ভদ্রলোকের কথায় গ্রাম্য টান স্পষ্ট। আমার লেখা বই পড়ে এই ভদ্রলোকের ধারণা হয়েছে, আমি তাঁর কথাগুলো শুনতে ইন্টারেস্টেড হব। যদিও আমি মোটেই তা হচ্ছি না।

আর, আমি অতীন্দ্র ব্যানার্জি। শখে মেটাফিজিক্স চর্চা করি, যদিও আমি নিজে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচ.ডি। ইউনিভার্সিটিতে ফিজিক্স পড়াই ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। যদিও আমার যে দুটো বই গত কয়েক বছরে বেস্টসেলার হয়েছে, সে দুটোর বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথমটায় বিভিন্ন দেশের ‘অকাল্ট’ কাণ্ডকারখানার বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। দ্বিতীয়টা হল ঈশ্বর, এনার্জি, মৃত্যু, তন্ত্র, বিজ্ঞান জাতীয় বিষয় নিয়ে গবেষণাধর্মী লেখা।

আমার একদমই ভালো লাগছে না সুবীরবাবুর প্রলাপ শুনতে। আবার ভদ্রতা করে তাঁকে তাড়িয়েও দিতে পারছি না। কারণ, আমার আজ বাড়ি ফিরতে দেরি হয়েছে আর সুবীরবাবু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছেন আমার জন্যে। ভদ্রলোক আমার দিকে না তাকিয়ে, মেঝের ওপর দৃষ্টি রেখেই বলে যাচ্ছেন। সেইসঙ্গে, মাঝে মাঝেই নিজের বাঁ-পায়ের গোড়ালির ওপরটা চুলকোচ্ছেন। আর, প্রতিবার সেটা দেখেই আমার অস্বস্তি হচ্ছে। কেন এই অস্বস্তিটা হচ্ছে বা ঠিক কীসের অস্বস্তি তা আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না। এই ব্যাপারটা আমার হয়। আগেও লক্ষ করেছি সেটা।

খুব একটা মনোযোগ দিয়ে যে তাঁর কথা এতক্ষণ শুনছিলাম, তাও নয়। কিন্তু, এর পরেই তিনি একটা কথা বললেন যাতে আমায় একটু নড়েচড়ে বসতেই হল।

–আমার মরা ছেলেকে আবার বাঁচিয়ে তোলার পর থেকেই এই বিপদটা হল।

আমি এইবার কথা বলতে বাধ্য হলাম,

–কী বললেন? আপনার মৃত ছেলেকে আপনি বাঁচিয়ে তুলেছেন?

সুবীরবাবু উত্তর না দিয়ে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে আবারও গোড়ালির ওপরটায় হাত বোলালেন।

— আপনি ঘটনাটা শুরু থেকে বলুন।

ভদ্রলোক আবার বলা শুরু করলেন,

— আমার বাড়ি মেদিনীপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে ইলেকট্রিক এসেছেই মাত্র দশ বছর হল। লোক বেশি থাকে না সেখানে। ওই গ্রামেই আমার পৈতৃক বাড়ি। আমার স্ত্রী মারা যায় আট বছর আগে ছেলে হতে গিয়ে। ছেলেকে নিয়ে আমি কলকাতার দিকে চলে আসি তারপরেই চাকরি নিয়ে। কিন্তু, আমার বাবা, মা গ্রামেই আছেন। তাই বছরে দু-একবার ছুটির সময়ে গ্রামে যাই।

কয়েক মাস আগে গরমের ছুটিতে ছেলেটাকে নিয়ে গেছিলাম এইবারও। সারাদিন ঠাকুরদা, ঠাকুমার কাছে থাকলেও, রাতে আমার সঙ্গেই ঘুমোত। জানেন নিশ্চয়ই যে, গ্রামের বাড়িতে বাথরুম এখনও বাড়ির বাইরে রাখাই নিয়ম। সেই রাতে ছেলে আমাকে না বলেই গেল বাথরুমে। আর, তাতেই সর্বনাশটা হল। একটু ভোরের দিকে আমার ঘুম ভাঙতে দেখি পাশে ছেলে নেই। উঠে তাকে খুঁজতে বাইরের বাথরুমে গিয়েই দেখি আমার ছেলে পড়ে আছে ভেতরে। মুখ

বিনিবিলি/ব্ল্যাক পার্ল

১২

থেকে গ্যাঁজলা বের হচ্ছে। এ লক্ষণ আমার চেনা। একটু খুঁজতেই পায়ে সাপের দাঁতের দুটো দাগ দেখতে পেলাম। শরীরে প্রাণ ছিল না, বেশ অনেকক্ষণ আগে কেটেছে। অতএব, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে লাভ ছিল না।

পাগলের মতো হয়ে গেছিলাম। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। তখনই একজন বলল, ‘নদীর পাড়ের শ্মশানে এক তান্ত্রিক বাসা বেঁধে আছে। তার কাছেই নিয়ে যাও।’ আমার তখন ঠিক, ভুল বিচার করার অবস্থা ছিল না। অতএব, তাই করলাম।

এরপর কী কী ঘটেছিল, আমার ঠিক মনে নেই। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম পরের চব্বিশ ঘণ্টা। তাই সেই তান্ত্রিক কী কী উপাচার আমায় দিয়ে করিয়েছিল, আমার মনে নেই। সে যা যা বলছিল, আমি তাই করছিলাম। তাকিয়ে ছিলাম শুধু আমার ছেলের নীল হতে থাকা লাশের দিকে। শুধু মনে আছে, বেশ কয়েক বার শরীরের বিভিন্ন জায়গা কেটে রক্ত দিয়েছি, এমন কিছু কিছু জিনিস খেয়েছি যার জন্যে বমি হয়েছে বার বার। কয়েকটা পাখি, একটা কাক… নাকি, মুরগি মারা হয়েছিল খুব বাজেভাবে। পুরোটাই আমার কাছে ঝাপসা।

সুবীরবাবু চুপ করে আমার দিকে তাকালেন। যেন বুঝে নিতে চাইলেন যে, আমি তাঁর কথা শুনছি কি না।

— গলা শুকিয়ে গেছে? জল খাবেন?

— হ্যাঁ।

আমি উঠে গিয়ে একটা কাচের গ্লাসে জল এনে দিলাম। তিনি ঢক ঢক করে পুরোটা খেয়ে ফেললেন। তিনি আবারও পায়ের দিকে হাত বাড়াচ্ছেন দেখে আমি তাঁকে দ্রুত প্রশ্ন করলাম,

— তারপর কী হল? আপনার ছেলে জীবিত হয়ে উঠল?

আমার গলার স্বরের মধ্যে থেকে অবিশ্বাসের ভাবটা যতটা সম্ভব দূরে রেখেই প্রশ্নটা করার চেষ্টা করলাম। ভদ্রলোক সেটা বুঝলেন কি না জানি না, কিন্তু ধীরে ধীরে ঘাড় নেড়ে বললেন,

–না। তখনই নয়। অনেক উপাচার শেষে, পরের দিন গভীর রাতের দিকে ছেলেকে একটা বাঁশের ভেলায় শুইয়ে, টেনে একটা নদীর ধারে নিয়ে গেল সেই তান্ত্রিক

এইটুকু শুনে আমার মনে সন্দেহ হল। তাই সুধীরবাবুর কথার মাঝখানেই জিজ্ঞেস করলাম,

— আপনি তো একটু আগেই বললেন, ‘নদীর পাড়ের শ্মশান’, তাহলে আবার এখন বলছেন ‘একটা নদীর ধারে নিয়ে গেল’! ব্যাপারটা স্পষ্ট হল না। নদী তো তাহলে শ্মশানের পাশেই ছিল, তাহলে আবার নিয়ে গেল কোন নদীতে?

সুধীরবাবু উত্তর দিলেন,

— সেটাই তো বুঝতে পারলাম না, জানেন। আমায় যেখানে নিয়ে গেল, ওটা সেই নদী নয়। আমি হলফ করে বলতে পারি যে, ওই অদ্ভুত নদীর ধারে আমি কোনোদিন আসিনি। নদীর জল ছিল খুব কালো। প্রথমে ভেবেছিলাম অন্ধকারে জল ওরকম লাগছে। কিন্তু, পরে বুঝেছিলাম ওই নদীর জল যেন সত্যিই কালো। আমার জন্ম ওই গ্রামে, ওখানে এরকম কোনো নদীর পাড় থাকলে আমি তা নিশ্চয়ই চিনতাম। কিন্তু, ওরকম কোনো নদীর পাড়… বা, ওরকম কোনো নদী আশেপাশে কোথাও নেই।

— মানে?

আমার কপালে বোধ হয় অবিশ্বাসের ভ্রূকুটিটা একটু বেশিই গভীরভাবে ফুটে উঠেছিল। তাই ভদ্রলোক কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

–সত্যি বলছি, বিশ্বাস করুন প্রফেসর… স্যার। আমি জিজ্ঞেসও করেছিলাম যে, এটা কোন নদী। লোকটা অনেকগুলো নাম বলেছিল ওই নদীর। একটা নাম কিছুটা চেনা— ‘বৈতরণি’। আর, কী সব অদ্ভুত নাম বলেছিল— স্টক… না, স্টিক…।

–স্টিক্স?

–হ্যাঁ, হ্যাঁ! ঠিক, ঠিক। ওই নামই বলেছিল। আরও কী-একটা যেন বলেছিল। কী-একটা ‘জু’।

— সান-জু?

–হ্যাঁ! ঠিক! কিন্তু আপনি কী করে জানলেন?

সুধীরবাবু অবাক হয়েছেন। কিন্তু, তাঁর চেয়েও অনেকগুণ বেশি অবাক হয়েছি আমি।

আমি এতক্ষণ দুটো ধারণা নিয়ে তাঁর কথাগুলো শুনছিলাম। এক, যে ভদ্রলোক মিথ্যে কথা বলছেন বা তাঁর মাথায় গণ্ডগোল থাকায় তিনি মনগড়া একটা কাহিনি শোনাচ্ছেন। দ্বিতীয় সম্ভাবনা, ঘটনাটা আংশিক সত্য। সাপে কাটা মৃতদেহ নদীর জলে ভাসিয়ে দেওয়ার লৌকিক রীতি বহু পুরোনো। ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যের বহু পরিচিত কাহিনি তার প্রমাণ। বা, সম্ভবত সেই গল্প থেকেই এই লৌকিক আচার শুরু হয়েছিল। তাই দ্বিতীয় সম্ভাবনা যে, কোনো এক ভণ্ড গ্রাম্য তান্ত্রিক, এক পুত্রশোক কাতর পিতাকে ঠকিয়েছে। কিন্তু, দুটো ক্ষেত্রেই একটু আগে যে কথাটা শুনলাম, তা খাটে না।

বৈতরণি হিন্দুধর্ম মতে সেই নদী যা মৃতরা পার করে জীবিতদের থেকে মৃতের জগতে প্রবেশ করে। দুটো জগৎকে আলাদা করে এই নদী। ঠিক সেরকমই গ্রিক এবং জাপানিজ মিথোলজিতে উল্লেখ আছে জীবিত ও মৃতদের জগতের মাঝে বয়ে চলা নদীর। গ্রিক পুরাণে সেই নদীর নাম ‘স্টিক্স’ এবং জাপানিজ-এ ‘সান- জু’। এই দুটো নাম সুবীরবাবু, কিংবা, এক প্রত্যন্ত গ্রামের কোনো ভণ্ড তান্ত্রিকের মুখে শোনাটা খুবই অপ্রত্যাশিত।

সুবীরবাবু কি ইচ্ছে করে আমার কাছে এসে এই গল্প শোনাচ্ছেন? তিনি গোটা ঘটনাটা সম্ভবত আগেই সাজিয়ে রেখেছেন মাথার মধ্যে। আমাকে তাঁর কাহিনিতে বিশ্বাস করাতেই এই দুটো নদীর নাম উল্লেখ করলেন না তো?

ভালো করে লক্ষ করলাম সামনে বসা মানুষটিকে। বোঝার চেষ্টা করলাম যে, মানুষটি কি একজন মানসিক রোগী? নাকি, জোচ্চোর? যদি দ্বিতীয়টা হয়, তবে তিনি নিঃসন্দেহে একজন দুর্দান্ত অভিনেতা। তাঁর চোখ-মুখে একধরনের অস্বাভাবিকতা, একধরনের আতঙ্কের কালো ছায়া যেন উঁকি দিচ্ছে। এতটা কি অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব?

বিষয়টা পরিষ্কার করার একমাত্র উপায়, তাঁর এই গল্পটা আমার শুনে যাওয়া। তাই আমি সুবীরবাবুকে কথা বলতে উৎসাহ দিলাম,

— তারপর?

— তারপর ভেলার ওপর শুইয়ে, ছেলেকে আমরা ভাসিয়ে দিলাম ওই নদীর জলে। জানেন ওই নদীর থেকে, মানে, ওই নদীর নীচ থেকে ক্রমাগত কেউ যেন ফিসফিস করে যাচ্ছিল। যেন, বহু বহু মানুষ ওই নদীর নীচে রয়েছে। তারা ডাকছে… বা, হয়তো সাবধান করছে আমায়। তান্ত্রিকের কথামতো ছেলেকে ভাসিয়ে দিয়ে ফিরে এলাম নিজের বাড়িতে।

বাড়িতে আমার বাবা, মা অনেক প্রশ্ন করল, যে, কোথায় তাদের নাতির মৃতদেহ? কী করছিলাম আমি সারারাত? কোনো উত্তর দিইনি। খুব ক্লান্ত ছিলাম, তাই কোনোভাবে স্নান সেরে ঘুমিয়ে পড়লাম। খাবারটুকু খেয়ে নেওয়ার মতোও শরীরে যেন জোর ছিল না। ঘুমের মধ্যে একটা বড়ো অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম একটা কালো দরজা! হ্যাঁ, সেই কালো দরজা। একটা কালো টিপ দরজা খুলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। দরজার ফাঁক থেকে উঁকি দিল একটা মাথা। দেখেই চিনতে পারলাম, এ তো আমার ছেলে বাবাই! কিন্তু, ওর শরীরটা কীরকম যেন লাগছে। ফ্যাকাশে সাদা শরীর। মুখে কেমন একটা অদ্ভুত হাসি… যা দেখলে… ভয় হয়।

ঘুম ভেঙে গেল। আর ঘুম এল না। খাবার খেলাম বটে কিছুটা। বাবা, মা আবার জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করল কালকের ব্যাপারে, আমি আবারও এড়িয়ে গেলাম। দিনের আলোয় মাথাটা কিছুটা পরিষ্কার হতে এইবার একটা তীব্র আফশোস আমায় চেপে ধরুন। এ আমি কী করলাম? অসম্ভবের আশায় যে আমি নিজের ছেলেটার শেষকৃত্যটুকুও করিনি সেটা হঠাৎই উপলব্ধি করলাম। তখন ‘হায়, হায়’ করলাম। ছুটলাম আবার সেই শ্মশানে।

কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলাম, কোথায় কী? কেউ নেই। সেই তান্ত্রিকও নেই, সেই নদীর পাড়টাও অনেক খুঁজেও আর পেলাম না। অনেকক্ষণ সেখানেই হতাশ হয়ে দাড়িয়ে থেকে, যখন বাড়ি ফিরে এলাম তখন সন্ধে হয় হয়।

বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছোতেই একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম, জানেন। একটা গন্ধ পেলাম। কেমন গন্ধ তা বলে বোঝাতে পারব না। গন্ধের উৎস যে আমার বাড়ি স্টো বুঝতে পারছিলাম। খেয়াল করলাম, আবহাওয়া যেন পালটে গেছে। একটুও বাতাস বইছে না, কেমন যেন থমথমে চারিদিক। অন্ধকার যেন সময়ের আগেই বেশি করে ঘন হয়ে এসেছে সেখানে।

হঠাৎ একটু দূরের একটা ঝোপ কেঁপে উঠল। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। দেখলাম, ঝোপের আড়াল থেকে দুটো হলুদ চোখের মণি তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চাঁদের হালকা আলোয় জোনাকির মতো বিন্দু দুটো জ্বলছে! ঝোপের আড়াল থেকে বিশালকায় প্রাণীটা বেরিয়ে আসতেই দেখলাম ওটা একটা কালো কুকুর। না, না… কুকুর অত বড়ো হয় না। একটা কালো নেকড়ে বেরিয়ে এল অন্ধকার কুঁড়ে। আমি গ্রামের ছেলে, আমি শেয়াল-নেকড়ে চিনি। কিন্তু, কখনো এত বড়ো, এত ভয়ংকর কোনো কুকুর বা নেকড়ে দেখিনি! ওটা আমার দিকে চাইল তার জ্বলজ্বলে চোখে। একটা গরম নিশ্বাস ফেলে ঘুরে গেল। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেল আমার বাড়ির দিকে। তখনই আমার মনে হল, আমাদের বাড়িটা ঘিরে আরও অনেকগুলো ওরকম কালো নেকড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

হঠাৎই দেখলাম আমার আর ছেলের যে ঘরটা, সেখানকার জানলার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। একবার ভাবলাম আমার বাবা বা মা বুঝি রয়েছে ওই ঘরে। কিন্তু, যে ছায়াটা জানলা থেকে সরে গেল, সেটা যেন একটা ছোটোছেলের মতো মনে হল। আমার মনে আবার আশা জেগে উঠল, জানেন স্যার!

কয়েক মুহূর্তের জন্যে আমি জমে গেছিলাম। নেকড়েটা সামনে থেকে সরে যেতেই আমি প্রায় দৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়লাম। দরজায় খিল দেওয়ার সময়ে স্পষ্ট টের পেলাম দরজার ঠিক বাইরেই ওই জন্তুটা দাঁড়িয়ে নিশ্বাস ফেলছে!

বাড়িতে ঢুকে দেখলাম চারদিকে অন্ধকার। বিজলি নেই। অন্ধকার হাতড়ে একটা মোম জ্বালালাম। তখনই মোমের আলোয় চোখে পড়ল একসার কালো পায়ের ছাপ পড়েছে মেঝেতে। ছোটো ছোটো পায়ের ছাপ, বাইরের দরজা থেকে একটা ছোটোছেলে চলে গেছে আমাদের ঘরের দরজার দিকে। যেন একটু আগে বাইরে থেকে কালো জল পায়ে কেউ উঠে এসেছে!

আমি ছুটে গেলাম আমাদের ঘরে। উত্তেজনায় আমার বুকের ভেতরটা যেন ফেটে বেরোচ্ছিল! ঘরে ঢুকেই দেখলাম আমার ছেলে, আমার বাবাই, বসে আছে খাটের ওপর! কিন্তু… কিন্তু তাকে জড়িয়ে ধরার বদলে আমায় থেমে যেতে হল ঘরে ঢুকেই।

— কেন?

প্রশ্ন করলাম আমি। সুবীরবাবুর হাতটা তাঁর পায়ের দিকে গেল। আবারও ওই জায়গাটা চুলকোতেই আমার সারাশরীরে অস্বস্তি হল। সোজা হয়ে বসে তিনি আবার কথা শুরু করলেন,

— কারণ, এ আমার বাবাই নয়! দেখতে অবিকল আমার ছেলের মতো হলেও, আমার ছেলের চোখে কখনো ওরকম হিংস্রতা থাকতেই পারে না! আপনি বিশ্বাস করবেন না, কোনো মানুষের মুখে-চোখে কোনোদিন ওরকম বীভৎস হিংস্রতা থাকতেই পারে না! মুখ দিয়ে একটা জান্তব গোঙানির মতো শব্দ করছে!

কিছু বোঝার আগেই আমার পেছনের দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল আর ও ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর! ঠিক কোনো হিংস্র বন্যজন্তুর মতো দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরতে গেল আমার গলা। গলা বাঁচাতে হাত দিয়ে ওকে ঠেকাতে গেলাম। এলোপাথাড়ি কামড়ে চলেছিল বাবাই। ডান হাত দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরে আটকাতে গেলাম। তখনই তীব্র একটা যন্ত্রণা অনুভব করলাম হাতে। তাকিয়ে যা দেখলাম… যা দেখলাম… উফ!

দু-হাতে মুখ ঢাকলেন সুবীরবাবু। আমি গ্লাসে আরও একটু জল ঢেলে এগিয়ে দিলাম তাঁর দিকে। তিনি সেটা থেকে দু-চুমুক খেয়ে কিছুটা স্বাভাবিক হলেন। গ্লাসটা ধরার সময়ে লক্ষ করলাম ভদ্রলোকের হাত কাঁপছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

— কী দেখলেন, সুবীরবাবু?

— দেখলাম… দেখলাম বাবাই কামড়ে আমার ডান হাতের কড়ে আঙুলটা ছিঁড়ে দিয়েছে! মুখের মধ্যে ওটা নিয়ে কামড়ে চলেছে। আমার আঙুল থেকে আর ওর মুখ থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ওর চোখ দুটো… ওই চোখ দুটো পুরো সাদা! পুরো! চোখে মণির লেশমাত্র নেই!

ভয়ে আমি চিৎকার করে উঠলাম। বুঝতে পারছিলাম, ছেলেকে ফিরিয়ে আনার তাগিদে আমি অন্য কিছুকে নিয়ে এসেছি। অমানুষিক কিছু! আমার চিৎকার শুনে আমার বুড়ো বাবা, মা এসে ঘরের দরজা ধাক্কাচ্ছে। দরজাটা কিছুতেই খুলছে না।

আঙুলটা গিলে নিয়ে বাবাই আবারও আমার গলা লক্ষ্য করে এগিয়ে এল কামড়ে দিতে! ওকে ফিরিয়ে আনার অপরাধে আমাকে খুন করবে ও! আমি আর ওকে আটকে রাখতে পারছি না! ওই রোগা ছোটো শরীরে অমানুষিক জোর! মৃত্যু আমার নিশ্চিত বুঝতে পেরে আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। জানি, একটু বাদেই ওর দাঁত বসে যাবে আমার গলায়, ও ছিঁড়ে খাবে আমায়।

ঠিক তখনই একটা বিকট শব্দ এল ঘরের জানলার দিক থেকে। চোখ খুলে দেখলাম কাচের জানলাটা ভেঙে পড়েছে। সেখান দিয়ে ঘরের মধ্যে লাফিয়ে পড়ল একটু আগে বাইরে দেখা সেই বিশাল কালো নেকড়েটা! পরমুহূর্তে সেটা ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। আরও একবার নিশ্চিত, বীভৎস মৃত্যুর আশঙ্কায় আমি চোখ বুজে ফেললাম। কিন্তু, তারপরেই ভুলটা বুঝতে পারলাম। নেকড়েটা আমায় লক্ষ্য করে ঝাঁপায়নি, সে ঝাঁপিয়েছে বাবাইয়ের ওপর। ওর কাঁধের কাছটা কামড়ে ধরে ওকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে কোথাও একটা। বাবাইও তার সর্বশক্তি দিয়ে বাধা দিচ্ছে নেকড়েকে। দুটো অপার্থিব শক্তি একে অপরের সঙ্গে যেন যুদ্ধে মেতেছে। কেউ হারতে নারাজ।

শেষপর্যন্ত জয়ী হল কালো নেকড়েটা। কামড়ে ধরল বাবাইয়ের একদিকের কাঁধ। আমার চোখের সামনে বাবাইকে মুখে করে টেনে নিয়ে গেল ওটা। অন্ধকারে মিলিয়ে গেল নিমেষে।

এই অবধি বলে থামলেন সুবীরবাবু। আমার মনে অনেকগুলো প্রশ্ন এতক্ষণ ধরে ফুটছিল।

— আপনার বৃদ্ধ মা, বাবা এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?

–বললাম তো। দরজার বাইরে। এইসব ঘটে যাওয়ার পর তাঁরা ঢুকতে পেরেছিলেন।

— তার মানে তাঁরা কিছুই দেখেননি?

— না।

— আপনি বাড়ি পৌঁছোনোর আগে তাঁরা আপনার ছেলেকে ঢুকতে দেখেননি ঘরে?

— না।

— বিশাল কালো নেকড়েটাকেও তাঁরা দেখেননি, তাই তো?

— না। তাঁরা দেখেননি।

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় হেলান দিয়ে বসলাম। বললাম,

— সুবীরবাবু। আপনার কি মনে হয় না যে, ব্যাপারগুলো খুবই অস্বাভাবিক। হয়তো আপনি যেমন ভাবছেন, আসলে তা ঘটেনি।

–মানে?

–আমি বলতে চাইছি যে, পুত্রশোক ও তারপর সারারাত জেগে শ্মশানের ওই ক্রিয়াকলাপ করার ফলে আপনার মস্তিষ্ক ক্লান্ত ছিল। আপনি নিজেই জানালেন যে, আপনার ঘুম হয়নি সেই দু-দিন। তাই আমার মনে হয়, সেদিন সন্ধের ঘটনাটা হয়তো অনেকটাই আপনার মনের কল্পনা। ধরুন, এমনও তো হতে পারে যে, আপনার ছেলে সেদিন ফিরে আসেনি, তাকে আপনি কল্পনা করেছিলেন, কারণ আপনার মনের গভীরে কোথাও বিশ্বাস ছিল যে, তান্ত্রিক আপনার ছেলেকে ফিরিয়ে দেবে। যে কারণে সেদিন সকালে সামান্য একবার ঘুম আসতে, তাতে আপনি দেখেছিলেন একটা কালো দরজা থেকে আপনার ছেলে বাবাই বেরিয়ে আসছে। গ্রামাঞ্চলে শেয়াল বা কালো নেকড়ে কি কম থাকে? রাতে সেরকমই কিছু আপনার ঘরে ঢুকেছিল এবং তার কামড়েই আপনার হাতের আঙুলটা কাটা যায়। আপনার মস্তিষ্ক দুটো ঘটনাকে জুড়ে একটা ভয়ংকর দৃশ্য আপনাকে দেখিয়েছে।

— কিন্তু…

— দাঁড়ান, সুবীরবাবু। আমার কথা শেষ হয়নি। পুরোটা শুনে নিন।

আমার কথার স্বপক্ষে একটা মূল যুক্তি হল যে, গোটা ঘটনাটা আপনার বাড়িতে ঘটছিল, অথচ বাড়িতে উপস্থিত আপনার বাবা, মা কিছুই প্ৰত্যক্ষ করলেন না, শুনলেন না কিছুই। এমনকী তাঁরা বাবাইকে বাড়িতে ঢুকতেও দেখেননি। আমার মনে হয়, এর মূল কারণ, গোটা ঘটনাটাই আপনি নিজের মনে দেখেছেন। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ‘হ্যালুসিনেট’ করা। সেইসময়ে আপনার মনের অবস্থা যা ছিল, তাতে এরকম হওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। ঘুমের অভাবে বা মস্তিষ্কে পরিমাণমতো অক্সিজেন না পৌঁছোতে পারলে মানুষ এরকম দেখে। আপনি কি আমার কথা বুঝতে পারছেন, সুবীরবাবু?

সুবীরবাবু কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দিলেন না। মনে হল, তিনি আমার কথাগুলো নিয়ে ভাবছেন। কিন্তু, তারপরেই নিজের পায়ের সেই জায়গাটা চুলকে নিয়ে বললেন,

— কিন্তু, তাহলে ওই কালো দরজাটা?

–কোন কালো দরজার কথা বলছেন, সুবীরবাবু? ওটা তো আপনি স্বপ্নে দেখেছেন।

–না। আমি তারপরেও দেখেছি ওই কালো দরজাটা। আমি… আমি ওর ভেতরে ঢুকেছি!

–কী?

–আমার কথা পুরো শেষ হয়নি, প্রফেসর সাহেব। আমি নিশ্চিত আমার পুরো কথা শোনার পর আপনি বিশ্বাস করবেন যে, আমি সত্যি বলছি।

–সুবীরবাবু, আপনি ভুল করছেন। আমি একবারও বলেছি না যে, আপনি মিথ্যে বলছেন। আপনি যা বলছেন, তা আপনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন যে, সেটাই সত্যি। তাই আপনি আপনার হিসেবে আমায় সব যথাযথ সত্যি কথাই বলছেন। আমি শুধু যুক্তি দিয়ে গোটা ঘটনাটা ভাবার চেষ্টা করছি। আর, আপনার কথা শুনতে আমি সত্যিই আগ্রহী। বাকিটা বলুন।

ভদ্রলোকের সামনে বসে আমার যে অস্বস্তি এখনও হচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু, শেষকথাটা আমি সত্যিই বলেছি। তাঁর গল্পটা আমার খুবই ইন্টারেস্টিং লাগতে শুরু করেছে। অতএব, উৎসাহ পেয়ে সুবীরবাবু বাকি ঘটনা বলতে শুরু করলেন,

–কয়েক সপ্তাহ পরের কথা। গ্রামের ঘটনাটার দু-সপ্তাহ পর আমি কলকাতায় ফিরে আবার চাকরিতে যোগ দিয়েছি সবেমাত্র। গোটা ঘটনাটা একটা দুঃস্বপ্ন ভেবে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলাম। বাবাইকে ছাড়া সেটা সম্ভব হচ্ছিল না। নিজের ছেলেকে কি এত সহজে ভোলা যায়? তাই আমি বেশিরভাগ সময়টাই অফিসে কাটাতে শুরু করলাম। সত্যি বলতে শুধু রাতটুকু ঘুমোনোর জন্যেই বাড়িতে ফিরতাম। খাবারদাবার সব বাইরেই সেরে বাড়িতে আসতাম।

সেদিনও রাত সাড়ে ন-টা নাগাদ হবে, অফিস থেকে ফিরছিলাম। আমার ভাড়াবাড়ির কাছের রাস্তায় এসে গেছি প্রায়। হঠাৎই ডান দিকে চোখে পড়ল একটা গলি। গলির মুখটা নিকষ কালো অন্ধকার। এরকম কোনো গলি এইখানে আগে কখনো চোখে পড়েছে বলে মনে পড়ে না। হঠাৎ মনে হল ভেতর থেকে কেউ আমার নামটা ধরে ডাকল। আমি এগিয়ে গেলাম সেদিকে। কিন্তু, বেশিদূর এগোতে হল না, কারণ গলি দিয়ে ঢুকে একটু এগোতেই একটা দরজা দেখতে পেলাম। কালো রঙের, পুরোনো ধরনের দরজা। ভেতর থেকে মৃদু ফিসফিসানির আওয়াজ আসছে যেন।

আমার আবারও মনে হল তার ভেতরেই কেউ যেন ‘বাবা” বলে ডাকল। কালো দরজাটা খুব অদ্ভুত। সেটা খোলার জন্যে কোনো হাতল নেই তাতে। খেয়াল করলাম, আমার আশেপাশে কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া ভাব ছেয়ে গেছে। যেন হঠাৎই ঘন কুয়াশার একটা পরত নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে। আমার কেমন যেন একটা ঘোর লেগে গেল। কাছে যেতে আরও ভালো করে শুনলাম ভেতর থেকে মৃদু ফিসফিসানির আওয়াজ আসছে। কোনো কথা বুঝতে না পারলেও, মনে হল আমার ছেলের গলার আওয়াজ শুনলাম। তবে শুধু ও নয়, একাধিক গলার স্বর যেন নিজেদের মধ্যেই ফিসফিসিয়ে গোপন আলোচনায় বসেছে। মনে হল, যেন ওরা আমাকে ডাকছে, আমায় নিয়েই কথা বলছে! কেউ যেন আমায় কানে কানে বলে দিয়ে গেল যে, ‘দরজাটা খোলো।” আমি কেমন যেন মন্ত্র-মোহিতের মতো কালো দরজাটার গায়ে হাত রাখলাম। মনে হল, যেন ঠান্ডা বরফে স্পর্শ করলাম। মৃদু কম্পন টের পেলাম যেন সেটায়। কেমন যেন তেলতেলে ভাব সেটার গায়ে, হাতে যেন কিছু লেগে যাচ্ছে। অনেকটা সদ্য আলকাতরা করা কাঠের ওপর হাত রাখলে যেমন মনে হয়, সেইরকম। আমি হালকা ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। কিছু দেখতে পেলাম না অন্ধকারে। কিন্তু, মনের ভেতর অস্বস্তি হতে লাগল। একটা ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এসে গায়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। দরজার ভেতরেই যেন হিমেল ঠান্ডা সব কিছু।

ভেতরে পা রাখলাম আমি। রাখতেই হত। কেউ যেন আমায় বাধ্য করছিল। ভেতরে ঢুকতেই বুঝলাম, আমি একা নই। চারিদিকে অন্ধকারে লুকিয়ে আছে অনেকে। ফিসফিস করে কথা বলছে, বোধ হয় আমায় নিয়েই। ওদের মধ্যে একটা গলা আমার পরিচিত। আমি জানি, ওদের মধ্যে একজন আমার মৃত ছেলে বাবাই।

হঠাৎই পায়ের পাতা ছুঁয়ে কিছু একটা চলে গেল। আমি চমকে উঠে পিছিয়ে এলাম দু-পা। কিন্তু, পায়ের পেছনেও কিছুর স্পর্শ পেলাম। আমি অনুভব করলাম যে, আমার চারপাশের মেঝেতে কিলবিল করছে অনেকগুলো… কিছু। ঠিক কী সেগুলো তা জানি না, কারণ ভেতরে সম্পূর্ণ অন্ধকার। কিন্তু যা-ই হোক, আমি নিশ্চিত এগুলো এই জগতের নয়! হতেই পারে না! এই পৃথিবীর বুকে এরকম কালো, অন্ধকার কোনো জীব নেই। এগুলোর জন্ম কোনো অন্ধকার, ভয়াবহ জগতে হয়েছে। এবং, আমি সেই জগতে এসে পড়েছি!

এইবার আমার ভয় করল। প্রচণ্ড ভয় করল! আমার মন বলতে লাগল… পালাও! পালাও! আমি প্রচণ্ড আতঙ্কে পেছনে ঘুরলাম। দরজাটা দেখতে পেলাম। সেটা খোলা আছে এখনও। কিন্তু… কিন্তু… এতদূরে কেন দরজাটা? আমি হলফ করে বলতে পারি যে, আমি বড়োজোর চার-পাঁচ পা হেঁটেছি ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করার পর থেকে। তাহলে আমি এতদূর কখন এলাম?

মাথায় তখনই সম্ভাবনাটা এল আর সেটা ভেবেই আমার মেরুদণ্ড বেয়ে তীব্র আতঙ্কের ঢেউ নেমে গেল। দরজাটা আমার থেকে দূরে চলে যাচ্ছে! হ্যাঁ… হ্যাঁ… প্রতি মুহূর্তে সেটা আরও ছোটো হচ্ছে! যতই দূরে চলে যাচ্ছে ওই দরজাটা ততই আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে আমার পরিচিত, পার্থিব জগতের সঙ্গে। দূর থেকে আরও দূরে চলে যাচ্ছে আমার বাইরে বেরোনোর একমাত্র পথ প্রতি মুহূর্তে। আমার মনের ভেতর কেউ বলে দিচ্ছে যে, একবার যদি ওই দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তবে বাইরের পৃথিবী আমার জন্য চিরতরে হারিয়ে যাবে। আমি হারিয়ে যাব এই অন্ধকার পৃথিবীতে। বাবাইয়ের মতোই দরজার এপাশে রয়ে যাব আমিও!

আমি ছুটলাম! প্রাণপণ ছুটলাম ক্রমশ ছোটো থেকে আরও ছোটো হতে থাকা দরজাটার দিকে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম আমার পেছনের অন্ধকারের জীবগুলো তীব্র আস্ফালনে হুংকার করছে যেন। তারা আমায় যেতে দেবে না! তারা মাটিতে ঘষটে ঘষটে, কিলবিল করে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। অন্ধকার আমায় গিলে খেতে চাইছে চারপাশ থেকে! পেছন থেকে স্পষ্ট শুনলাম বাবাই আমায় ডাকছে, “বাবা! বাবা! ফিরে এসো! একবার এদিকে দেখো!”

কিন্তু, আমি দৌড় থামালাম না। পেছন ফিরলাম না একবারও। কারণ, আমি জানি, একবার পেছন ফিরলে আমি এমন কোনো ভয়ানক দৃশ্য দেখব যার ফলে আমার মনের সমস্ত জোর চলে যাবে। আর, এরা আমায় ধরে ফেলবে। যে ডাকছে, সে আমার ছেলে নয়! ওই রাতে যে ফিরে এসেছিল আমার ছেলের মধ্যে, এটা সে!

আমি প্রায় দরজায় পৌঁছে গিয়েছি। ব্যস… আর একটু! আলো দেখতে পাচ্ছি সামনেই। রুদ্ধশ্বাসে দৌড় দিলাম। প্রায় বেরিয়ে এসেছিলাম… কিন্তু, তখনই…!

— তখনই?

স্বীকার না করে উপায় নেই, আমিও এতক্ষণে সুবীরবাবুর গল্পের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ঢুকে গেছি। ভদ্রলোক দরদর করে ঘামছেন গল্প বলতে গিয়ে। বার বার ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছেন কথার মাঝপথে। তাঁর দিকে আরও একগ্লাস জল এগিয়ে দিলাম। সেটা শেষ করে সুবীরবাবু বললেন,

–একটা পা আমি বাইরে বের করে দিয়েছি, ঠিক তখনই আমার বাম পা-টা কেউ ধরে ফেলল ভেতর থেকে! একেবারে শেষমুহূর্তে ওরা আমায় ধরে ফেলল! আমি প্রাণপণে ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম। পারলাম না। কে বা কী আমার পা চেপে ধরেছে, সেটা স্পষ্ট দেখতে পেলাম না। কিন্তু, মনে হল একটা কালো, সর্পিল অমানবিক হাত আমার পা ধরে আছে তার লম্বা কঙ্কালসার আঙুল দিয়ে! গায়ের এবং মনের সমস্ত জোর এক করে পা টেনে বের করলাম দরজার বাইরে। তাও সেই হাতটা আমার পা ছাড়ল না। টের পেলাম তার হাতের চাপ আমার পায়ে! সেই অন্ধকারের অশুভ জিনিসগুলো আমায় টেনে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। সে আমায় তাদের অংশ বানাতে চায়! আমি গায়ের সমস্ত জোর লাগিয়ে কালো দরজাটা বন্ধ করে দিলাম ওই অবস্থাতেই।

এরপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরে দেখলাম আমি রাস্তায়, একধারে পড়ে আছি। উঠে বসলাম। কিন্তু, সেই অন্ধকার গলি আর ওই কালো দরজা কোথাও দেখতে পেলাম না।

সুবীরবাবু কথা থামালেন। আমি একমনে তাঁর কথাগুলো শুনছিলাম দেখে তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছেন মনে হল। আমায় তিনি প্রশ্ন করলেন,

–স্যার, আপনি কি আমার কথা বিশ্বাস করলেন?

— হ্যাঁ, করলাম।

— প্রফেসর সাহেব, আমি এখনও মাঝে মাঝেই ওই কালো দরজাটা দেখতে পাই। যেখানে-সেখানে, পথে-ঘাটে হঠাৎ হঠাৎ ফুটে ওঠে ওই কালো দরজাটা। বার বার ডাকে আমায় ওরা! সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়! তাও মানিয়ে নিয়েছিলাম গোটা ব্যাপারটা, কিন্তু ক-দিন আগেই…।

— কী? কী হয়েছে ক-দিন আগেই?

— স্যার, কালো দরজাটা আমার বাড়ির ভেতর দেখতে পেলাম! আমার নিজের ঘরের দেয়ালে। অথচ, আমি জানি যে, ওখানে কোনো দরজা নেই। কোনোদিনই ছিল না! স্যার… ওই ওরা… মানে, কালো দরজার ওপারের ওরা আমায় ছাড়বে না, স্যার! আমি বুঝতে পারছি, ওরা আমার কাছে চলে আসছে ধীরে ধীরে। আমায় একদিন ঠিক টেনে নিয়ে যাবে ওই দরজার ওদিকে। ওই অন্ধকার জগতে!

আমার কষ্ট হল ভদ্রলোকের জন্য। সাংঘাতিক একটা মানসিক সমস্যায় ভুগছেন ভদ্রলোক। তাঁর সঠিক চিকিৎসা দরকার। আমি খুব শান্তভাবে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম,

–সুবীরবাবু, আপনি তো যতদূর শুনলাম একজন শিক্ষিত মানুষ। ছেলের মৃত্যুর শোকে আপনি এক অন্ধবিশ্বাসকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। তাতে আপনাকে সম্পূর্ণ দোষ দেয়া যায় না। মানুষ তীব্র আঘাতে তার সাধারণ বিচারবিবেচনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু, তারপরের ঘটনাগুলো নিয়ে আপনাকে আমি ভাবতে অনুরোধ করব। আপনি কি বুঝতে পারছেন যে, আপনার সঙ্গে যা যা ঘটেছে সেটা সত্যি নয়? আপনি ভেবেছেন সত্যি। আমি সেটা বিশ্বাসও করি। গ্রামের ঘটনার ব্যাখ্যা আমি আগেই দিয়েছি। এবার আপনার অফিস থেকে ফেরার পথে যা যা ঘটেছে তার একটা যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা আপনাকে আমি দেয়ার চেষ্টা করছি। দয়া করে আগে মন দিয়ে শুনবেন। সম্ভবত আপনি সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে জ্ঞান হারান। আপনি নিজেই বলছেন যে, আপনি অফিসে বেশি সময় দিতে শুরু করেছেন, কাজের মধ্যে ডুবে যেতে চেয়েছেন। অতএব, স্ট্রেসের ফলে হতে পারে আপনি সেদিন হঠাৎই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। আজকের এই ইঁদুরদৌড়ের দুনিয়াতে এটা খুবই কমন হয়ে গিয়েছে। আর, বাকি দৃশ্য আপনার ইম্যাজিনেশন

ভদ্রলোক আমার কথার উত্তর না দিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকলেন। আমি আবার বললাম,

–গ্রামের ঘটনা আপনার মনে গভীর দাগ কেটে গিয়েছে। স্বপ্নে আপনি দেখেছিলেন একটা কালো দরজার ওপার থেকে আপনার মৃত ছেলে বেরিয়ে আসছে। যার ফলে আপনার মনে তীব্র ‘এনটামা-ফোবিয়া’ দেখা দিয়েছে। দেখুন গুগল করে। এটা হল দরজার প্রতি আতঙ্ক। আপনার ক্ষেত্রে একটা বিশেষ ধরনের কালো দরজার প্রতি একধরনের ভীতি জন্মেছে মনের গভীরে। এটাও এক ধরনের সাইকিয়াট্রিক সিনড্রোম। আপনার একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্টের প্রয়োজন। আপনাকে আমি আমার এক বন্ধুস্থানীয় ভালো ডাক্তারের কনট্যাক্ট দিতে পারি। তিনি এইসব বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ। আমার থেকে বেশি আপনার এখন তাঁকেই প্রয়োজন।

সুবীরবাবু আবার নিজের পা চুলকোচ্ছেন। আমার কথার মাঝে তিনি বাধা দিলেন না, কিন্তু এরপর নিরুৎসাহ মুখে বললেন,

— আপনিও বিশ্বাস করলেন না! আমি আপনার বিষয়ে অনেক শুনেছিলাম। শুনেছি আপনি অতিপ্রাকৃত, অশুভ টের পান। তাই এসেছিলাম…

মোবাইল থেকে একটা নাম্বার আর নাম ছোটো একটা প্যাডের কাগজে লিখতে লিখতে বললাম,

–সুবীরবাবু। আপনারটা পুরোপুরি অন্য সমস্যা। আমার ধারণা আপনি সঠিক চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠবেন শীঘ্রই। এই নিন আমার বন্ধু ডা. রায়ের নাম্বার। আমার নাম করবেন। আমি আগেই বলে রাখব।

সুবীরবাবু অবহেলা ভরে আমার কাছ থেকে চিরকুটটা নিলেন। সেটা পকেটে রেখে উঠে দাঁড়ালেন এবং কোনো কথা না বলে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। আমার খুবই হতাশ লাগল। আমি বেশ বুঝতে পারছি তিনি যাবেন না ডাক্তারের কাছে। তাঁর মনের গভীরে ঢুকে গেছে যে আতঙ্ক, সেটা তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন।

বেরিয়েই যাচ্ছিলেন ভদ্রলোক। হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন। আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন,

— সেদিন আমার পা ধরা হাতটা বেরিয়ে এসেছিল। আমি তার ওপরেই দরজা বন্ধ করে দিই জোর করে। কিন্তু, যেহেতু সেটা বেরিয়ে এসেছিল ওই দরজা দিয়ে, তাই সেটা এখনও রয়ে গিয়েছে। আজও তার ধরা মুষ্টি ছাড়েনি। সে এখনও আমার পা একইভাবে আঁকড়ে ধরে আছে! এই দেখুন প্রফেসর…

সুবীরবাবু তাঁর বাঁ-পায়ের প্যান্ট একটু তুললেন। স্পষ্ট দেখলাম চারটে সরু আঙুলের ছাপ চেপে বসে রয়েছে তাঁর গোড়ালির ওপর। পুরোনো দাগ নয়, সেটা এখনও পায়ের মাংস চেপে বসে আছে। ঠিক যেন কোনো অদৃশ্য আঙুল সমেত হাত, এই মুহূর্তে চেপে ধরে আছে তাঁর পা!

এতক্ষণ ধরে অস্বস্তি হওয়ার কারণটা এইবার স্পষ্ট হল। কিন্তু, বিস্ময়ের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই ভদ্রলোক ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি যতক্ষণে বাড়ি থেকে তাঁর পিছু নিয়ে বেরিয়ে এলাম, ততক্ষণে তিনি চলে গেছেন। ভদ্রলোকের ফোন নাম্বারটাও রাখা হয়নি। আমি চিন্তিত হয়ে ফের স্টাডিতে এসে বসলাম। যেটা দেখলাম, সেটা কি চোখের ভুল?

আমি অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাস করি। কারণ, আমার নিজের বেশ কিছু পূর্ব- অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, আমাদের জানা-বোঝার বাইরেও অনেক কিছু ঘটে। আরও একটা ব্যাপার, সুবীরবাবু আমার বিষয়ে যা শুনেছেন, সেটা সত্যি। আমি সত্যিই সুপারন্যাচারাল-কে অনুভব করতে পারি। যাকে বলা হয় ESP. বা এক্সট্রা সেনসরি পারসেপশন। এবং, সেই কারণেই ভদ্রলোক যতবার তাঁর বাঁ-পায়ে চুলকোচ্ছিলেন, ততবার আমার একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। আমি কারণটা এতক্ষণ ঠিক ধরতে পারছিলাম না।

সত্যিই কি মৃতকে ফিরিয়ে আনা যায়? তবে কি তিনি যা যা বললেন, তা সব সত্যি? কিন্তু, তাহলে ওই নেকড়েটা কী ছিল? সেটা কোথা থেকে এল? আর, কোনো এক অশরীরী হাত কি সত্যিই আজও সুবীরবাবুর পা চেপে ধরে আছে? নাকি, ওটা অন্য কিছুর দাগ ছিল?

এর মধ্যে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর যে আমি খুব শিগগিরি নিজেই উপলব্ধি করতে চলেছি, তা তখনও জানতাম না।

২. দ্রষ্টা

সুবীরবাবু যে আর আসবেন না, তা জানতাম। কিন্তু, তবুও খুব চাইছিলাম আবার তিনি আসুন। কৌতূহল বড়ো বিষম বস্তু। কিন্তু, বেশ কয়েক মাস পেরিয়ে গেল, তাঁর দেখা পেলাম না। এরপর কলেজে সেমিস্টার পরীক্ষার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। ভদ্রলোককে আমি আর কোনোদিন দেখিনি। সুবীরবাবুর ব্যাপারটা ক্লোজড চ্যাপ্টার ধরেই নিয়েছিলাম।

উৎসবের শরৎ পেরিয়ে ইতিমধ্যে হেমন্তের ঠান্ডা হাওয়া একটু একটু করে ঢুকে পড়ছে কলকাতা শহরে।

এক রবিবার, সকালে বেশ খানিকটা দেরিতে ঘুম থেকে উঠে এককাপ কফি আর ফ্রেঞ্চ টোস্ট নিয়ে বসেছি ছাদের রোদে। সকালে হালকা ঠান্ডার আমেজ এসেছে। তাই আয়েশ করে কফির কাপে চুমুক দিলাম। আজ সারাদিন কোনো কাজ নেই। ঠিক করেছি আজকে একটা গোটা বই শেষ করব। গতকালই আচমকা একটা দুষ্প্রাপ্য পুরোনো বই পেয়ে গেছি কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথে। বইটার নাম ‘The Dark Side of History’, লেখক মাইকেল এডওয়ার্ডস। অকাল্ট কীভাবে সভ্যতার শুরু থেকে মানুষের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বইটার দাম দোকানদার চাইল পঞ্চাশ টাকা, আমি এককথায় তাই দিয়ে দিলাম। বইটা এই সময়ে, পুরোনো বই, কিনতে গেলেই অন্তত তিন-সাড়ে তিন হাজার টাকা লাগত। রবিবার সেটাই পড়ে শেষ করার ইচ্ছে ছিল।

দুটো টোস্ট শেষ হয়েছে, তখনই নীচের গেটে আওয়াজ পেলাম। ছাদ থেকেই উঁকি মেরে দেখলাম শুভঙ্কর এসেছে। শুভঙ্কর আমার কলেজের বন্ধু। ওই যাকে বলে জিগরি দোস্ত। ব্যাঙ্কে উঁচুপদে চাকরি করে এবং সেইসূত্রে থাকে পুণেতে। এইবার পুজোয় আসতে পারেনি বলে এখন বাড়ি এসেছে। বেশিদিন না, সাতদিনের ছুটি পায় বড়োজোর বছরে। জানুয়ারিতে বিয়ে ওর। তাই এখন এসেছে কেনাকাটা করতে, বিয়ের কাজ এগিয়ে রাখতে।

ওর অন্য আর একটা শখ আছে— জ্যোতিষচর্চা। তবে বলে রাখা ভালো, আমার এই বন্ধুবরটি যদি চাকরি ছেড়ে জ্যোতিষচর্চাকে পেশা হিসেবে নিত, নির্ঘাত না খেয়ে মরত। আজ অবধি একটাই গণনা সে সঠিক করেছিল,

–বুঝলি ভাই, আমার স্টারস বলছে যে, জ্যোতিষচর্চায় আমার উন্নতি নেই!

কিছুক্ষণ বাদেই চিলেকোঠার দরজা দিয়ে শুভঙ্কর ঢুকে এল। এসেই বলল,

— শিগগির তৈরি হ! বেরোতে হবে।

আমি একটুও ব্যস্ত না হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

— কোথায়?

— নর্থ কলকাতার দিকে। স্কুটার এনেছি। জি.পি.এস. ধরে চলে যাব।

–কিন্তু যাবটা কোথায়?

–একজন জ্যোতিষীর সন্ধান পেয়েছি। কাশীনাথ শাস্ত্রী। সে আবার নাকি চোখে সবসময় সানগ্লাস পরে থাকে। মুখ থেকে যা বেরোয় সেটাই একেবারে অব্যর্থ! তার কাছেই যাব। আমার আর শতরূপার কুষ্ঠি বিচার করাব।

হাসি চেপে বললাম,

–কেমন জ্যোতিষ তুই? নিজের বিয়ের গণনা অন্যকে দিয়ে করাতে হয় তোকে। ছোঃ!

–আহ্! খালি বাজে কথা। ওঠ, যেতে হবে তো!

–তুই যা! মাত্র সাতদিনের ছুটি পেয়েছিস, তার মধ্যেও এইভাবে বনের মোষ তাড়িয়ে সময় নষ্ট করতে চাইলে, ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম! কিন্তু, আমি নেই। আজ সারাদিন বই পড়ব।

— আরে, চল না। কী আছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার তো ব্যাপার। দুপুরের আগে বাড়ি চলে আসব। রাস্তায় জমিয়ে কোনো রেস্টুরেন্টে বিরিয়ানি খাওয়াব। কলকাতার বাইরে গিয়ে দুটো জিনিসই তো মিস করি— বাড়ি আর বিরিয়ানি। তৈরি হয়ে নে, নীচে কাকিমাকে বলেই এসেছি। এখুনি বেরোব।

শেষের ডিম পাঁউরুটিটা আমার প্লেট থেকে তুলে কামড় বসিয়ে, আমায় আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নীচে চলে গেল।

***

নর্থ কলকাতার পুরোনো বাড়ি হলেও জ্যোতিষ মহাশয়ের বাড়ির সামনের রাস্তাটা আসলে একটা গলি। গাড়ি ঢুকবে না, কিন্তু আমরা এসেছি স্কুটারে, অতএব অসুবিধে হল না। ভদ্রলোকের নাম এলাকায় সকলেই জানে, তাই বাড়িটা খুঁজে পেতে সমস্যা হল না।

দরজায় ধাক্কা দেওয়ার আগেই দরজা খুলে এক বয়স্ক মানুষ বেরিয়ে এলেন। শীর্ণকায় মানুষ, কাঁচা-পাকা চুল, দাড়ি। কাঁধ অবধি লম্বা চুল, আর নাভিছোঁয়া দাড়ি। পরনে একটা ফতুয়া ধুতি এবং চোখে কালো চশমা। শুভঙ্কর বলল,

— আমরা কাশীনাথ শাস্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।

বৃদ্ধ মুচকি হেসে বললেন,

–আমার নাম কাশীনাথ পণ্ডিত। সব জ্যোতিষীই ‘শাস্ত্রী’ হয় না।

শুভঙ্করের মুখ দেখে আমার হাসি পেয়ে গেল। ভদ্রলোক সরে গিয়ে আমাদের ঢোকার জায়গা করে দিলেন। ভেতরে সামান্য আসবাব। বাইরে একটা বসার ঘর, পাশে রান্নাঘর, উলটোদিকে বাথরুম। বসার ঘরেরই একপাশে খাট, অন্যপাশে বেতের টেবিল আর চারটে চেয়ার। কাশীনাথ একটা চেয়ারে বসলেন, আমরা দু- জন তাঁর মুখোমুখি। আমাদের জিজ্ঞেস করলেন,

–বলো, কী করতে পারি আমি?

শুভঙ্কর তাঁর দিকে দুটো কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলল,

— আমার নাম শুভঙ্কর চক্রবর্তী। সামনেই আমার বিয়ে। তাই যদি এই দুটো কুষ্ঠি বিচার…

— কিন্তু, আমি যে কুষ্ঠি বিচার করি না। তুমি ভুল শুনে এসেছ।

— সেকী! আপনি জ্যোতিষী নন?

— দেখো, তুমি যদি নিজের বিয়ের বিষয়ে জানতে চাও, তবে তোমার হাতটা আগে বাড়াও।

— ওহ্! তার মানে আপনি পামিস্ট। বেশ, তবে তাই দেখুন।

শুভঙ্করের হাত ধরে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

–তোমার বিয়ে কোন মাসে?

— জানুয়ারির দু-তারিখ।

— বিয়ে তোমার ওইদিনই হবে। কিন্তু, এই মেয়ের সঙ্গে নয়।

কথাটা শুনে শুভঙ্করের মুখ দেখলাম হাঁ হয়ে গেছে। বলল,

–মানে? আপনি কী বলতে চাইছেন?

— ঘাবড়ে যাবে না। তোমার জীবন সুখের হবে। তোমার ‘স্ত্রী ভাগ্য’ ভালো। কিন্তু, এই মেয়ের সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে না।

এইবার আমাকে কথার মধ্যে ঢুকতেই হল,

— আপনি শুধুই হাত দেখে এত কিছু বলে দিচ্ছেন?

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

— আরও বলতে পারি। শুভঙ্করবাবুর চাকরির ক্ষেত্র তো কলকাতা বলে মনে হচ্ছে না। বেশ কয়েক বছর আছে সেখানে। ভালো জায়গাতেই আছ। বিয়ের পর আরও উন্নতি হবে। বাবার শরীরের যত্ন নেবে। তাঁর স্বাস্থ্য আগামী কয়েক বছর খুব একটা ভালো যাবে না।

আমার মুখ থেকে একটা অবিশ্বাসসূচক শব্দ বের হয়েছিল। সেটা কানে যেতে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

–তুমি বোধ হয় এইসবে বিশ্বাস কর না! তাই না?

আমি হ্যাঁ বা না উত্তর দিলাম না। বললেন,

–আসলে ভবিষ্যৎ বলাটা খুব সহজ। কারণ, কেউ বর্তমানে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করতে পারে না যে, ভবিষ্যতে কী হবে। অতএব, যা খুশি বলে দিলেই হয়।

কাশীনাথ আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন,

–যদি আপত্তি না থাকে…

আমি খানিকটা ইতস্তত করছি দেখে শুভঙ্কর কনুই দিয়ে ঠেলা দিল। আমি হাত বাড়ালাম। তিনি আমার হাত ধরে বেশ দীর্ঘ সময় চুপ থাকলেন। তারপর বললেন,

— তুমি উচ্চশিক্ষিত, বিজ্ঞান তোমার বিষয়। কিন্তু, তুমি অতিপ্রাকৃতকে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস কর না।

আমার কেমন যেন জেদ চেপে গেল। বললাম,

–ক্ষমা করবেন, কিন্তু এগুলো যে কেউ বলতে পারে। এটাকে বলে ‘বার্নাম এফেক্ট’। ভবিষ্যদ্বক্তা ও জ্যোতিষরা এটার সাহায্যে যুগ যুগ ধরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

কাশীনাথ রাগলেন না। প্রশ্ন করলেন,

— তাই নাকি? সেটা কী জিনিস?

— বার্নাম এফেক্ট? খুব সহজ। এই যে পত্রিকায় মাসিক বা দৈনিক রাশিফল বেরোয়, নিজের রাশির কলামটা পড়লেই দেখা যায় সত্যিই কিছুটা মিলে যাচ্ছে। আসলে, লেখাটাই এমন কায়দায় লেখা হয় যাতে সবার সঙ্গেই লেখাগুলো মিলে যায়। যদি আমি অন্য রাশির কলামটাও পড়ি, তাহলেও দেখব যে, বেশ কিছু জায়গা নিজের সঙ্গে মিল পাব। যেমন, কোনো কিশোর বা কিশোরীকে তার বাবা, মা জ্যোতিষের কাছে নিয়ে আসা মানেই, এক-শোর মধ্যে নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা ছেলে বা মেয়ের পড়াশোনার বিষয়ে জানতে আগ্রহী।

জ্যোতিষীরা খুব সহজেই তাঁদের চমকে দিতে বলে, “ওর পড়াশোনার বিষয়ে জানতে এসেছেন তো? আজকাল অমনোযোগী হয়ে যাচ্ছে। ব্রেন ভালো। কিন্তু, আশানুরূপ ফলাফল পাচ্ছেন না।’

বিষয়টা হল, এটা দশ থেকে সতেরো বছর বয়সের স্কুলে পড়া প্রায় সব ছেলেমেয়ের ক্ষেত্রেই খাটে। জ্যোতিষরা এটাই করে থাকে। যেমন আমায় দেখে, আমার পরনের পোশাক দেখে, কথা শুনেই আপনি অনুমান করতে পারেন যে, আমি সুশিক্ষিত। গলায় দেখলেন এই তাবিজ, তাই বললেন যে, আমি সম্পূর্ণ নাস্তিক নই। পৃথিবীর ৯৯% যুক্তিবাদীই নাস্তিক নয়।

কাশীনাথ হাসলেন। শুভঙ্করের দিকে তাকিয়ে বললেন,

–তুমি একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়াও। তোমার আশা করি আর কিছু জানার নেই।

শুভঙ্কর আমার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করে উঠে দাঁড়াল। বাইরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। কাশী পণ্ডিত নিজের চোখের সানগ্লাস খুলে আমার দিকে তাকালেন। দেখতে পেলাম ভদ্রলোকের চোখের মণি নেই। অর্থাৎ, তিনি জন্মান্ধ! কারণ, এটা একধরনের ‘বার্থ ডিফেক্ট’ বলেই জানি। বৃদ্ধ বললেন,

কথা শুনে তুমি শিক্ষিত ভদ্রসন্তান সেটা হয়তো বোঝা যায়, কিন্তু বুঝতেই পারছ প্রফেসর যে, বাকিগুলো করার ক্ষমতা ঈশ্বর আমাকে দেননি। অতএব তোমার পোশাক, গলার তাবিজ, কোনোটাই আমি দেখতে পাচ্ছি না এই স্থূল চোখে। জন্ম থেকেই আমার দৃষ্টি নেই। তাই ওই জন্ম তারিখ থেকে ঠিকুজিকুষ্ঠি বিচারের ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু, প্রকৃতি বড়ো রহস্যময়। ঈশ্বর একহাতে কেড়ে নেন তো অন্যহাতে দান করেন। যেমন, আমাকে দৃষ্টির বদলে দিয়েছেন অন্তর্দৃষ্টি।

আমার বিস্মিত ভাব কাটার আগেই তিনি আবার বললেন,

–এই ক্ষমতা তো তোমারও আছে, প্রফেসর। ছোটো বয়স থেকেই তুমি অতিপ্রাকৃতর সংস্পর্শে এসেছ। অনুভব করতে পারো তাদের, যারা সাধারণের কাছে ধরা দেয় না। তোমার গলার ওই তাবিজটা সাধারণ নয়। ওটা প্রচণ্ড ক্ষমতাধর একটা রক্ষাকবচ। পার্থিব আর অপার্থিব, এই দুটো জগতের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছ তুমি। অন্ধকার আর আলো, দুটো জগৎকেই তুমি উপলব্ধি করতে শিখেছ। কিন্তু, সাবধান! অন্ধকারের দিকে দীর্ঘক্ষণ চেয়ে থাকলে, অন্ধকারও একসময় তোমার অন্তর দেখে নেবে! অনেক পরীক্ষা বাকি আছে সামনে। কালো দরজা খুলতে চলেছে!

আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম। আমার গলার এই তাবিজের গল্প কোনোভাবেই এই লোকটির জানা সম্ভব নয়। সে-ঘটনা পরে কোনোদিন বলব। লোকটি আমায় ‘প্রফেসর’ বলে সম্বোধন করছেন। যা যা বললেন তা হুবহু সত্যি! আমি ভুল করেছি। ইনি কোনো জ্যোতিষী নন। এঁর ক্ষমতা অনেকটা উচ্চস্থানীয়। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে ভূত, ভবিষ্যৎ দেখতে পারছেন এই ত্রিকালদর্শী পুরুষ!

আমি প্রশ্ন করলাম,

–কালো দরজা?

তিনি ঘাড় নেড়ে উত্তর দিলেন,

–হ্যাঁ। তার কাছাকাছি তুমি সাম্প্রতিককালে এসেছ অন্য এক ব্যক্তির মাধ্যমে। কিন্তু, নিকট ভবিষ্যতে আবারও সেই কালো দরজা তোমার সম্মুখে আসতে চলেছে। খুব সাবধান!

আমার হাত ছেড়ে দিলেন তিনি। মাথার রগ ধরে কয়েক মুহূর্ত বসে থেকে বললেন,

— আমার বড়ো ক্লান্ত লাগছে। আপনারা এইবার আসুন।

বুঝলাম তিনি আজকে আর কিছু বলবেন না। আমি বিনা বাক্যব্যয়ে উঠে দাঁড়ালাম। দরজার বাইরে শুভঙ্কর অপেক্ষা করছিল। স্কুটারের ওপর বসে সিগারেট টানছিল। আমি দরজা দিয়ে বেরোনোর সময়ে শেষ প্রশ্ন করলাম,

— আপনি কে?

অন্ধ কাশীনাথ মৃদু হেসে বললেন,

–বড়ো কঠিন প্রশ্ন। তার চেয়ে বরং নিজেকে চেনার চেষ্টা করো। এর উত্তর ভবিষ্যতের জন্যে তোলা থাক। প্রয়োজনে আমার কাছে আসতে দ্বিধা কোরো না, প্রফেসর সাহেব।

এই আমার সঙ্গে কাশীনাথ পণ্ডিতের প্রথম সাক্ষাৎ। এরপর বহুবার তিনি নানাভাবে আমায় সাহায্য করেছেন।

ওহ্। উল্লেখ্য, যে মেয়েটির সঙ্গে শুভঙ্করের সম্বন্ধ হয়েছিল, সে হঠাৎই একদিন আমার বন্ধুকে জানায় যে, সে বিয়ে করতে পারবে না। কারণ, সে অন্য একটি ছেলেকে ভালোবাসে। অতএব, সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। তবে, সেই মেয়েটি এটাও জানায় যে, তার মাসতুতো বোনের নাকি শুভঙ্করকে খুব পছন্দ। দিদির বিয়ে বলে মুখ ফুটে বলতে পারেনি বেচারি।

এরপর দুটো পরিবারের মধ্যে অনেক কথা হয়। এবং, অবশেষে নির্দিষ্ট দিনেই শুভঙ্করের বিয়ে হয়ে যায় নীলিমার সঙ্গে।

৩. রূপান্তর

ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি ইউনুস খানের ফোন পেলাম। ভদ্রলোকের সঙ্গে মাঝখানে কয়েক বছর যোগাযোগ ছিল না। তাই হঠাৎ ফোন পেয়ে খুশিই হলাম।

ড. ইউনুস খান পেশায় একজন স্বনামধন্য মাইক্রোবায়োলজিস্ট। তাঁর সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল অনেক বছর আগে, বিদেশে একটা কনফারেন্সে। সেখানে আমি এবং ড. খান দু-জনেই নিজেদের আলাদা বিষয় নিয়ে, আলাদা দুটো প্যানেলে নিজেদের গবেষণাপত্র প্রেজেন্ট করেছিলাম। রাতে বুফে ডিনার হলে তিনি নিজে এসে পরিচয় করেছিলেন।

— হ্যালো, ইন্ডিয়ান মনে হচ্ছে? নিজের দেশের লোক দেখে পরিচয় করতে এলাম।

–হ্যাঁ। হ্যালো। আমি ড. অতীন্দ্র ব্যানার্জি।

–বাঙালি? আমি ড. ইউনুস খান। আমার বিষয় মাইক্রোবায়োলজি। আপনার?

— ফিজিক্স

এই থেকেই কথা বাড়তে থাকে। কথাপ্রসঙ্গে আমার বইয়ের কথা উঠে আসে এবং আমার মিথোলজি ইত্যাদিতে গবেষণার কথা জানাই তাঁকে। তিনিও জানান যে, তাঁরও বিশাল কালেকশন আছে প্রাচীন পুথি ও বইয়ের। সেই থেকেই আমাদের সখ্য। আমার চেয়ে বয়সে বেশ কয়েক বছর বড়ো এবং বিদেশের একটা নামকরা ল্যাবের সঙ্গে যুক্ত তিনি। তবে, মূল বাসস্থান দক্ষিণ ভারতে। পড়াশোনার বিষয় আলাদা হলেও, যেহেতু ইন্টারেস্টের ব্যাপারটা একই, তাই আমাদের মধ্যে যোগাযোগ থেকেই গেছে সেই থেকে।

একবার দক্ষিণ ভারত সফরে গিয়ে তাঁর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলাম। তখনই খেয়াল করেছিলাম, স্ত্রীর প্রতি ভদ্রলোকের অপরিসীম ভালোবাসা। তাঁর স্ত্রী মানুষটিও খুবই ভালো এবং মিশুকে। কিছু মানুষের সঙ্গে প্রথম পরিচয়েই মনে হয় তাঁরা যেন অনেকদিনের চেনা। মিসেস খান সেরকমই একজন মানুষ। তাঁর বাড়িতে যে তিনটে দিন থেকেছিলাম, তাতে মনে হয়েছিল এঁরা যেন কতদিনের পরিচিত আপনজন। মিসেস পদ্মা খান কত সহজে ভাই বলে ডেকেছিলেন প্রথম সাক্ষাতে।

ডিনার শেষে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ড. খান বললেন,

— শোনো ব্যানার্জি, তোমায় এবার আমার আর পদ্মার লাভস্টোরি শোনাব। ‘লাভ’ মানে কিন্তু ‘ভালোবাসা’ নয়, এই লাভ হল ‘ফায়দা’ মানে প্রফিট। কারণ, আমাদের এই সম্পর্কে আমি সবচেয়ে লাভবান হয়েছি, আর পুরোটাই ‘লস’ হয়েছে তোমার দিদির।

পদ্মা ম্যাডাম তখন হেসে লুটোপুটি খাচ্ছেন। বললেন,

–আমাদের বাড়িতে যে-ই এসে থাকে, তাকে এই গল্প শুনিয়ে ও বোর করে, ভাই। ওর এই গল্প শোনার পর বুঝবে যে, ওর গবেষণাপত্রগুলো কতটা বোরিং হয়।

ড. খান শুনিয়েছিলেন তাঁদের বিয়ের গল্প।

–পদ্মা আর আমি, আমরা পড়তাম একই কলেজে। যদিও ও আর্টসে ব্যাচেলরস আর আমি বায়োতে ডক্টরেট করেছি। আমি ওকে প্রথম দেখি কলেজ ফেস্টে। যেখানে সবাই সাউথ ইন্ডিয়ান বা বলিউড গান আর নাচ করছিল, সেখানে হঠাৎই একটি মেয়ে স্টেজে ওঠে তানপুরা নিয়ে। সাবেকি কায়দায় স্টেজে উঠে সকলকে প্রণাম করতে অনেক ছেলেছোকরাই টিটকিরি মারতে শুরু করে। আমিও ব্যাপারটা বেশ মজাদার হবে ভেবে অপেক্ষা করছিলাম।

কিন্তু, তারপর মেয়েটা গান শুরু করল। মাই গড, ব্যানার্জি! একবার তুমি ওর গান শুনে দেখো। আমি, যে কিনা বরাবর হার্ড রক মেটাল ব্যান্ডের ফ্যান, সে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। গোটা ক্যাম্পাস চুপ হয়ে ছিল ও যতক্ষণ গান করল। যখন ও গান থামাল, তখন মনে হল স্বর্গ থেকে কেউ আমায় আবার এই অভাগাদের দুনিয়ায় ফিরিয়ে এনেছে।

আমি তৎক্ষণাৎ সেই মেয়েটির প্রেমে পড়ে যাই। স্টেজের পেছনে গিয়েছিলাম কথা বলতে, কিন্তু সাহস হয়নি সেদিন। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, মেয়েটির নাম পদ্মা আইয়ার। ব্রাহ্মণ, বিশাল বড়োঘরের মেয়ে! আমার মাথায় হাত পড়ল। দক্ষিণ ভারতীয়রা কীরকম গোঁড়া সেটা নিশ্চয়ই তুমি জানো। কিন্তু, বার বার মনে হতে লাগল যে, এই মেয়েকে ছাড়া আমি বাঁচব না। ভাবলাম, ব্যাপারটা ইনফ্যাচুয়েশন। কয়েক দিনে কেটে যাবে। কিন্তু, তা হল না। বরং, ততদিনে আমি শয়নে, স্বপনে শুধুই সেই মেয়েকে দেখছি।

একজন বন্ধুর মাধ্যমে প্রথম আলাপ করলাম। পরের তিনমাস তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চলে গেল। বিশ্বাস করবে? আমি তিনমাস ধরে রোজ একটা করে গোলাপ নিয়ে যেতাম এই আশায় যে, আজকে ঠিক সাহস করে মনের কথাটা তাকে জানিয়ে দেব। কিন্তু, কিছুতেই পারতাম না।

কিন্তু, মেয়েরা সব বোঝে। তাই আমাকে বলতে হয়নি। একদিন রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার সময় পদ্মা আমার হাতটা চেপে ধরল। যা বোঝানোর, শুধু ওইটুকুতেই বুঝিয়ে দিল।

ওর বাড়ি থেকে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নেয়নি। একটা এত বড়োঘরের মেয়ে ও, আর আমি হলাম বেজাতের এক অনাথ ছেলে। কিন্তু, পদ্মা প্রচণ্ড জেদি। একদিন সব ছেড়ে চলে এল আমার হাত ধরে। সব… সব ছেড়ে! নিজের প্রাসাদপ্রমাণ বাড়ি, বৈভব সব ছেড়ে আমার এক কামরার ভাড়াবাড়িতে উঠল। আমাকে বিয়ে করল।

আর জানো? তারপরেই আমার ভাগ্য পালটে গেল। পিএইচ.ডি থিসিস যে বিদেশি বিশেষজ্ঞের কাছে পরীক্ষা হতে গেছিল, তিনিই আমার গবেষণা দেখে প্রভাবিত হয়ে আমাকে ডেকে পাঠালেন পোস্ট ডক্টরেট করতে নিজের গবেষণাকেন্দ্রে। ব্যস! আর ফিরে তাকাতে হয়নি। আমি সব পেয়েছি! আমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। তাই তো বলি, আমার পুরোটাই ‘লাভ’!

কথাগুলো যখন ড. খান বলছিলেন, তখন দেখছিলাম তাঁর স্ত্রীর চোখে জল। সেদিন বুঝতে পারিনি তার কারণ। তিনি কি তবে সুখী নন? আফশোস করেন সেদিন সব ছেড়ে আসার?

প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিলাম যেদিন চলে আসি, তার আগের রাতে। ড. খান একটা কাজে ল্যাবে গেছিলেন। সেই ফাঁকে মিসেস পদ্মা খান জানিয়েছিলেন তাঁর একমাত্র দুঃখের কথা।

–আমার স্বামী আমায় সব সুখ দিয়েছে। সে চেঁচিয়ে বলে যে, আমায় পেয়ে সে সব কিছু পেয়েছে। কিন্তু, আমি যে তাঁকে সন্তান সুখ দিতে পারিনি, ভাই। টিউমার থেকে ক্যান্সার ছড়িয়ে যাওয়ার কারণে আমার একটা অপারেশন হয় কলেজে থাকতে। যার ফলে আমি কোনোদিন মা হতে পারব না। সব কিছু জেনেও ওই লোকটা আমায় তার হৃদয়ে স্থান দিয়েছিল। অথচ, ও ছিল আমাদের ইউনিভার্সিটির সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র। এত বড়ো একজন বিজ্ঞানী সে। তার তো অনেক ভালো, আরও অনেক বেশি প্রাপ্য ছিল। আমি তাকে কিছুই দিতে পারিনি ভালোবাসা ছাড়া। অথচ, আমার হাতটা সে কোনোদিন ছাড়েনি।

আমি আশ্চর্য হয়েছিলাম তাঁদের দেখে। খুশি হয়েছিলাম খুব। ওঁরা বলেছিলেন কয়েক বছর পর ওঁরা শিশু দত্তক নেওয়ার প্ল্যান করেছেন।

কিন্তু, তার একবছরের মধ্যেই একদিন সকালে উঠে খারাপ খবরটা পেলাম। ড. ইউনুস ছোট্ট একটা হোয়াটসঅ্যাপ করে জানালেন, পদ্মার ক্যান্সার ফিরে এসেছে। চিকিৎসা করাতে স্টেটসে যাচ্ছেন।

কিন্তু, সেখানে গিয়ে জানা গেল যে, আর কিছু করার নেই। কিছুটা ক্যান্সার সেল রয়ে গেছিল পদ্মার শরীরে। কোনো উপসর্গ ছাড়াই তা ধীরে ধীরে এতগুলো বছর ধরে ছড়িয়েছে। কেমো বা রেডিয়েশন, কোনো কিছুতেই এই অবস্থায় কাজ হবে না।

দ্বিতীয়বার ক্যান্সার ধরা পড়ার ঠিক মাত্র দু-মাসের মধ্যে মারা যান মিসেস পদ্মা আইয়ার খান।

এই ঘটনা তিন বছর আগের। স্ত্রীর মৃত্যুর পর হঠাৎ সবার সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করে গায়েব হয়ে যান ড. খান। আমি অনেক চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারিনি। ওঁর প্রাক্তন কলিগদের থেকে শুনেছি কেমন যেন বদলে গিয়েছিলেন ড. খান। মাথায় গণ্ডগোল দেখা দিয়েছিল স্ত্রীর মৃত্যুর আঘাতে, সেটাও শুনেছি। ল্যাবে ইস্তাফা দিয়ে, ব্যাঙ্কের বিপুল অর্থ তুলে নিয়ে প্রায় রাতারাতি নিজেকে পৃথিবী থেকে যেন মুছে ফেলেন ভদ্রলোক। ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট হিসেবে শুধু ইন্টারনেটে রয়ে গিয়েছে দু-শোর ওপর রিসার্চ পেপার, বহু পুরস্কার, সংবর্ধনার ছবি।

সেই লোক আজ তিন বছর পর হঠাৎ সকালে ফোন করলেন আমাকে। তাই আমি বিস্মিত ও খুশি দুটোই হলাম। কেমন আছেন? কোথায় ছিলেন? কী করছিলেন এতদিন? এইসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিনি শুধু ফোনে বললেন,

–সব প্রশ্নের উত্তর পাবে, ব্যানার্জি। তোমার সাহায্য চাই। প্লিজ, না কোরো না। লোকেশন পাঠাচ্ছি, তুমি রাজি থাকলে ফ্লাইট টিকিট আমি পাঠিয়ে দেব। যেভাবেই হোক অন্তত সাতদিনের ছুটি নিয়ে চলে এসো। দিনক্ষণ ইত্যাদি সব পাঠাচ্ছি টেক্সট করে।

এইটুকু বলেই তিনি ফোন ছেড়ে দিলেন। তারপর ফোনে পর পর মেসেজ এল অনেকগুলো। বিশেষ কারণে সঠিক জায়গাটা এখানে আমি উল্লেখ করব না। তবে, সেটা নির্দিষ্ট এয়ারপোর্টে নেমে আরও দেড়শো কিলোমিটার ভেতরে একটা জায়গা। ডিসেম্বরের যে সময়ে তিনি যেতে বলেছেন, সেসময়ে ইউনিভার্সিটিতে ছুটি পাওয়া চাপ হবে না। চাপ থাকলেও আমি অবশ্যই যেতাম। কারণ, ড. খানের কণ্ঠস্বরে এমন একটা আর্তি ছিল, যা উপেক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

নির্দিষ্ট দিনে দক্ষিণের একটা ছোটো এয়ারপোর্টে নেমে যখন ড. খানের পাঠানো গাড়িতে উঠে বসলাম, তখন অনুমানও করতে পারিনি যে, সুবীরবাবুর দেখা সেই কালো দরজা, বা, কাশীনাথের সাবধানবাণীর সঙ্গে আগামী ঘটনার কোনো যোগাযোগ থাকতে পারে।

***

এক জঙ্গলঘেরা গ্রামের মধ্যে, বড়োসড়ো একটা পুরোনো বাড়ির সামনে এনে ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করাল। এই এলাকার দেড় মাইল দূরে একমাত্র লোকবসতি একটা ছোটো গ্রাম। অন্য গ্রামগুলো আরও দূরে দূরে। তাদের মধ্যে রয়েছে জঙ্গল। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছ-ফুট চওড়া মেঠোরাস্তা চলে গেছে এঁকেবেঁকে এই বাড়িটা অবধি।

দরজা খুলে যে ভদ্রলোক আমায় ভেতরে অভ্যর্থনা করলেন, তাঁকে দেখে চমকে গেলাম। এই কি আমার পরিচিত, সদাহাস্য ড. ইউনুস খান? একজন মানুষ তিনবছরে এত পালটে যেতে পারে?

ড. খানের স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে। কালো, চোখ কোটরাগত, শীর্ণকায় শরীর। তবুও আমায় দেখে তাঁর দৃষ্টিতে যেন কিছুটা পুরোনো মায়া ভেসে উঠল, চোখের কোণ চিকচিক করল। বেরিয়ে এসে আমায় জড়িয়ে ধরলেন ড. খান।

–তুমি এসেছ, ব্যানার্জি? যাক, আমায় আর তোমার পদ্মা দিদিকে ভুলে যাওনি তবে!

কথা হল অনেকক্ষণ সামনের ঘরে বসে। কিন্তু, আমাকে কেন জরুরি তলব, তা পরিষ্কার করে বললেন না ড. খান। বললেন এখন রেস্ট নিতে। ওঁর কিছু কাজ আছে এখন, তাই একেবারে রাতে খাবার সময় কথা হবে। আমিও নিজে থেকে ঘাঁটালাম না। একটা ঘরে গুছিয়ে নিলাম নিজের জিনিসপত্র। আসবাব একদম যেটুকু না থাকলে নয়, সেটুকুই। এই অজ জঙ্গলের মধ্যে একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী কী করছেন ভেবে পেলাম না।

রাতে খাবার ব্যবস্থা দেখলাম ভালোই। একজন লোকাল লোক সকালে এসে খাবার রান্না করে দিয়ে যায়, সঙ্গে ঘরদোর পরিষ্কার। আবার বিকেলে এসে রাতের রান্না করে চলে যায়। আজকে রাতে রুটি, সবজি আর ডিম করেছে। খেতে খুব ভালো লাগল না মোটেই। ড. খানের দেখলাম কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। কোনোমতে নাকে-মুখে গুঁজে খেলেন। খেয়ে নিয়ে আমরা মুখোমুখি লিভিংরুমে এসে বসলাম। তারপর আসল কথাটা পাড়লেন,

— কিমিতি সম্বন্ধে তোমার কী ধারণা?

— কী? জ্যামিতি?

— উঁহু। জ্যামিতি নয়, কিমিত শাস্ত্র। মানে, অ্যালকিমিতি।

— ওহ্হ্। অ্যালকেমি! মানে, অপরসায়ন। তাই বলুন!

দু-দিকে ঘাড় নেড়ে ড. খান বললেন,

— ওই নামটাতে কিন্তু আমার আপত্তি আছে। ‘অপরসায়ন’ কিন্তু অ্যালকেমির একটা শাখামাত্র। অ্যালকেমি কিন্তু বহু শাখা মেলেছিল এককালে। উত্তর দিলে না, ব্যানার্জি? কী জানো অ্যালকেমির বিষয়ে?

— আমি যেটুকু জানি যে, প্রথম শতাব্দীর শুরুর দিকে অ্যালকেমির রমরমা ছিল চীন, ভারত, ইউরোপসহ মুসলিম দেশগুলোতে। এক ধাতুকে অন্য ধাতুতে পরিবর্তন করার শাস্ত্র। সিসা থেকে সোনা বানানোই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। অ্যালকেমির সর্বোচ্চ কীর্তি হিসেবে ধরা হত পরশপাথর বানানো, যাকে আমরা বলি ‘ফিলসফার’স স্টোন’। বিজ্ঞান আর জাদুর জগাখিচুড়ি। সেইসময়ের বহু জ্ঞানীগুণী লোক উঠে-পড়ে লেগেছিল বটে অ্যালকেমি নিয়ে, কিন্তু সবশেষে বলা চলে সেটা অপবিজ্ঞান। তাই বেশিদিন ধোপে টেঁকেনি। বেশিরভাগই শুধু গল্প আর কল্পনায় রয়ে গেছে।

একটা সিগারেট ধরিয়ে তাতে দুটো টান দিয়ে খান বললেন,

— ঠিকই বলেছ, তবে পুরোটা সঠিক নয়। পরশপাথর নির্মাণ করাটা শুধুমাত্র একদল লোভী মানুষের উদ্দেশ্য ছিল। ওটা জাস্ট উন্মাদের স্বপ্ন। আজকে আমি- তুমি জানি যে ‘লেড (সিসা)’ থেকে সোনা বানাতে গেলে তার নিউক্লিয়াস থেকে প্রোটন বের করে আনতে হবে, যা করতে পারমাণবিক বোমার সমান শক্তি লাগবে। তাই ওই কাজ কোনো ম্যাজিক পাথরের ছোঁয়ায় করা অসম্ভব।

— হ্যাঁ। সেটাই বলছিলাম।

— কিন্তু, অন্য অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি কিন্তু অ্যালকেমির অন্য শাখাগুলো নিয়েও কাজ করেছিলেন।

— যেমন?

যেমন ধরো ‘প্যানাসিয়া’ আবিষ্কার বা ‘অ্যালকাহেস্ট’ আবিষ্কার। সেই চেষ্টাও অনেকে করেছিলেন শুধুমাত্র বিজ্ঞান আর মানবতার অগ্রগতির স্বার্থে।

–প্যানাসিয়া মানে জানি। সকল ব্যাধি সারানোর এক ওষুধ। এমন ওষুধ যা সব ব্যাধি সারিয়ে দেয়। অনেকটা, প্রোফেসর শঙ্কুর মিরাকিউরলের মতো।

— কে? প্রোফেসর কী বললে?

আমি হেসে ফেললাম। ভুলেই গিয়েছিলাম যে, আমার সামনের ব্যক্তি বাঙালি নয়। তাই বললাম,

–কেউ না। উনি আমাদের বাংলা সাহিত্যের একজন কাল্পনিক চরিত্র। সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি। সত্যজিৎ রায়ের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন? বাই দি ওয়ে, অ্যালকেমি নিয়ে ওঁর একটা দুর্দান্ত গল্পও আছে।

ড. খান দেখলাম কিছুটা বিরক্ত হলেন। বুঝতে পারলাম, আমি যেমন ভেবেছি, উনি সেরকম নেহাতই গল্পের ছলে বিষয়টা উত্থাপন করেননি। উনি সিরিয়াস আলোচনা চাইছেন। অতএব, আমি প্রসঙ্গ পালটে বললাম,

–আর যেটা বলছিলেন। ‘অ্যালকাহেস্ট’ হল ইউনিভার্সাল সলভেন্ট, অর্থাৎ সর্ব-দ্রাবক।

–ঠিক, ঠিক। তবে, এইসব ছাড়াও আরও একটা মারাত্মক শাখা ছিল অ্যালকিমিতির। হিউম্যান ট্রান্সমিউটেশন!

কথাটা শুনে সোজা হয়ে বসলাম। ‘হিউম্যান ট্রান্সমিউটেশন’, অর্থাৎ ‘মানব- রূপান্তর’। মনের ভেতর থেকে যেন একটা অশনিসংকেত পেলাম। আমি যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় বললাম,

— বুঝলাম না।

— ‘হিউম্যান ট্রান্সমিউটেশন’ শব্দের অনেক মানে হতে পারে। যেমন ধরো, একটি মানবশরীরে পরিবর্তন আনা। কাটা অঙ্গ পুনরায় গজানো, বা, ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের সমষ্টি থেকে পূর্ণ মানবশরীর নির্মাণ। মানুষের শরীরকে অক্ষয় করে অমর হওয়া, বা, মৃত শরীরকে জীবিত করা। সবই হিউম্যান ট্রান্সমিউটেশনের ভেতরেই পড়ে।

কথাপ্রসঙ্গ কোনদিকে যাচ্ছে তা অনুমান করতে পারছি যেন কিছুটা। অতএব আমি একটু সতর্কভাবে প্রশ্ন করি,

— ড. খান, আমি কিন্তু এখনও বুঝতে পারছি না আপনি আমায় এইসব কেন বলছেন।

— কারণ… ড. ব্যানার্জি… আমি ঠিক এই কাজটাই করতে চলেছি। আর, আমার তোমার সাহায্য দরকার।

— কোন কাজ ড. খান?

–আমি মৃত ব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনতে চলেছি!

আমার কী বলা উচিত সেটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। তিনি নিজেই বললেন,

— কথাটা অসম্ভব শোনাচ্ছে, জানি। কিন্তু, আগে আমার সব কথা শুনে নাও। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে তাঁর সঙ্গে চলতে ইঙ্গিত করলেন। আমি বিনা বাক্যব্যয়ে তাঁর পিছু নিলাম। ঘরের এককোণ থেকে সিঁড়ি নেমে গেছে নীচে। তাই দিয়ে নেমে পড়লাম ড. খানের দেখাদেখি। একটা সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিতেই আমি থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম।

বেসমেন্টের নীচ থেকে ওপর বইয়ে ঠাসা। সারা দেওয়াল আর মেঝে জুড়ে আঁকা বিভিন্ন চিহ্ন। এগুলো একনজরে দেখলে যে কেউ বলে দেবে, এখানে কোনো ধরনের ‘স্যাটান ওরশিপ’ বা শয়তানের পুজো করা হয়। কিন্তু, আমি চিহ্নগুলো চিনতে পারলাম। এগুলো সবই অ্যালকেমির চিহ্ন। ঘরের মধ্যে একটা ছোটো মূর্তি আছে। ছাগমুখো, লম্বা শিংযুক্ত এক পুরুষমূর্তি। ডান হাতের দুটো আঙুল, মধ্যমা ও তর্জনী আকাশের দিকে দেখাচ্ছে, অন্য হাতের তর্জনী, মধ্যমা মাটির দিকে দেখাচ্ছে। হলিউড সিনেমার বহুপরিচিত শয়তান মূর্তি। সেটার সামনে এনে খান আমাকে প্রশ্ন করলেন,

–এটা কীসের মূর্তি বলো দেখি?

বুঝলাম তিনি আমাকে পরীক্ষা করতে চাইছেন। আমিও উত্তর দিলাম,

— বাপহোমেট। ইউরোপের প্রাচীন অ্যালকেমিস্টদের উপাস্য দেবতা এই ছাগমুখো দেবতাটি ভারসাম্যর প্রতীক। তাঁর দুটো হাতের আঙুলের মুদ্রা ‘coagulate’ ও ‘dissolve’ ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ, জমাট বাঁধা ও মিশে যাওয়া, যা অ্যালকেমির দুটো বিপরীত প্রক্রিয়া। অপরদিকে আবার এটা আকাশ ও মাটির দিকেও ইঙ্গিত করছে। তাই ইনি ভারসাম্যের প্রতীক।

ড. খান দেখলাম খুশি হলেন। বললেন,

–ঠিকই বলেছ, ব্যানার্জি। পরবর্তীকালে পাশ্চাত্যের দৌরাত্ম্যে অন্য অনেক দেবতার মতোই ইনিও শয়তান হয়ে গেলেন পপুলার কালচারে। বাপহোমেট ছাগমুখো গ্রিকদেবতা ‘প্যান’-এর প্রতিরূপও বটে, যিনি প্রকৃতি ও প্রজননের দেবতাও। তোমাদের হিন্দু ধর্মে এক ছাগমুখো চরিত্রের উল্লেখ আছে, যিনি নিজেও প্রজননের দায়িত্বে আছেন। কার কথা বলছি বলো তো?

–প্রিজাপতি দক্ষ।

–ঠিক! বাই দি ওয়ে, এটা জানো তো, যে, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার সময় যে দুটো আঙুল তুলে বন্ধুর মাথায় শিং বানাও, ওটাও কিন্তু এই মহাশয়ের প্রতীক। বাপহোমেটের ‘শিং’ অর্থাৎ ‘horn’ থেকেই ‘horny’ কথাটার উৎপত্তি বলে অনেকে মনে করে।

শেষ তথ্যটা আমারও জানা ছিল না। বিরাট বাড়ির বেসমেন্ট-এর অর্ধেক জুড়ে লাইব্রেরি। তাতে শুধুই অ্যালকেমির বই। বহু প্রাচীন পুথিও তিনি জোগাড় করেছেন। আমার ধারণা এখানে শুধু বই-ই আছে কয়েক কোটি টাকার। ড. খানের প্রায় পুরো পুঁজিই তিনি এতে লাগিয়েছেন আন্দাজ করতে পারছি। আরও মনে হচ্ছে যে, তাঁর পুরোনো সহকর্মীরা ঠিকই বলেছিলেন অনেকাংশে। ভদ্রলোকের মাথাটা পুরোপুরি ঠিক নেই সম্ভবত। এখানে যেটা চলেছে সেটা গবেষণা নয়, অবসেশনের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

মনে মনে স্থির করেই নিলাম যে, এখান থেকে আমি ফিরে যাব। এখানে আসাটা ঠিক হয়নি। কয়েকটা প্রাচীন পুথি আর বই টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে তিনি বললেন,

— তেরো শতকে ভারতবর্ষে লেখা হয়েছিল ‘রসরত্ন সমুচ্চয়’, লেখক ভগবত এতে ধাতু, খনিজসহ সমস্ত পদার্থর বিশ্লেষণ এবং শোধন পদ্ধতি লেখা আছে বিস্তারিতভাবে। এই বইটাকেই ভারতের নিজস্ব কিমিত-শাস্ত্রর সবচেয়ে প্রাচীন রিসার্চ নোটস বলা হয়। কিন্তু, সেটা ভুল কথা

একটা বই খুলে আমার সামনে ধরে তিনি বললেন,

–দেখো, প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতাতেও কিন্তু প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, সেইসময় মানুষদের রসায়ন আর অপরসায়নের জ্ঞান ছিল। আমি বহু রিসার্চ করে এক প্রাচীন ভারতীয় অ্যালকেমিস্টের সন্ধান পাই। তাঁর নাম আজকে আর জানা সম্ভব নয়। কিন্তু, তাঁর লেখা প্রাচীন কিছু পুথি আমি পেয়েছি। এবং, এর যতটা সম্ভব পাঠোদ্ধার করে আমি বুঝতে পেরেছি যে, ইউরোপে অ্যালকেমির ঝড় ওঠার বহুযুগ আগেই সফল ‘ট্রান্সমিউটেশন’ করা সম্ভব হয়েছিল। এমনকী মানব রূপান্তর পর্যন্ত তিনি করেছিলেন!

এই বলে তিনি একটা অতি প্রাচীন, জীর্ণ পুথি বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। সেটা লেখা সংস্কৃত আর তামিল মিশিয়ে। বইটা পুরোটাই ‘রূপান্তর’ বিদ্যার ওপর। বিভিন্ন অজানা গোলাকৃতি জটিল জ্যামিতিক আঁকায় ভরতি। ড. খান আবার বলতে শুরু করেছেন,

— প্রাচীন ভারতের এই অজানা পণ্ডিত সেই জায়গায় সফল হয়েছিলেন যেখানে ইউরোপীয় আর এশিয়ান অ্যালকেমিস্টরা বিফল হয়েছিলেন। কেন জানো? আমি বইয়ের পাতাগুলো থেকে চোখ না তুলেই জানতে চাইলাম,

–কেন?

–কারণ, উনি অ্যালকেমির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন আরও একটা প্রাচীন ভারতীয় বিদ্যাকে। তন্ত্র! তিব্বত দেশে যে মহাবিদ্যার উৎস, সেই তন্ত্রমন্ত্র জানা সম্ভব ছিল না কোনো ইউরোপীয়র। এইখানেই পার্থক্যটা চলে আসে এই ভারতীয় পণ্ডিতের সঙ্গে অন্যান্য বিদেশি অ্যালকেমিস্টের।

আমি অবাক হয়ে জীর্ণ পাতাগুলো উলটে চলেছিলাম। শেষের পাতাগুলো বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। কারণ, সেখানে পরিষ্কার আঁকা দেখতে পাচ্ছি একটা গোলাকার, জটিল চিহ্নর মাঝামাঝি একটি মানুষের ছবি। এই লিপির পাঠোদ্ধার না করেও বলা যায় যে, শেষের পাতাগুলোয় হিউম্যান-ট্রান্সমিউটেশনের পদ্ধতি লেখা হয়েছে!

একজন বিজ্ঞানীর সবচেয়ে বড়ো গুণ কী, জানেন? কৌতূহল। আর তার সবচেয়ে বড়ো দোষও সেটাই। কৌতূহল! কৌতূহলের বশেই বিজ্ঞানীরা সমস্যার সমাধান খুঁজে বেড়ায়, গবেষণায় ডুবে থাকে। আবার, তার বশেই অনেক সময়ে এমন কাজ করতেই থাকে যা আদতে ক্ষতিকর। এই মুহূর্তে আমার মনের ভেতরেও যে অনুভূতিটা জেগে উঠছে তা হল— কৌতূহল। প্রচণ্ড টান অনুভব করছি এই মুহূর্তে বইয়ের পাঠোদ্ধার করে পদ্ধতিগুলো নিজে করে দেখতে। মনের গভীরে কেউ যেন বলে দিচ্ছে যে, এর ফল ভালো হবে না। কিন্তু, তবুও আমি দোটানায় পড়লাম।

এই অবস্থায় ড. খানকে ছেড়ে গেলে তিনি উন্মাদ হয়ে যাবেন। আমি চাই না এই বিজ্ঞান রত্নটির শেষ পরিণতি এই হোক। কিন্তু, যদি একবার তাঁকে বোঝানো যায় যে, তিনি যেটা করছেন, তা পাগলামি; তিনি অলীক, অসম্ভবের পেছনে ধাওয়া করেছেন গত তিন বছর, তবে সম্ভবত আমি তাঁকে আবার সমাজের মাঝখানে, তাঁর বিজ্ঞানচর্চার মন্দিরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারব।

পাতা ওলটাতে ওলটাতে, একটা জায়গায় গিয়ে চোখ আটকে গেল। হাতে আঁকা একটা ছবি রয়েছে পুথির অর্ধেক পাতা জুড়ে। একটা কালো রঙের বন্ধ দরজার ছবি। মুহূর্তে মনে পড়ে গেল কয়েক মাস আগের সেই ভদ্রলোকের কথা। এই ছবিটার সঙ্গে কি তাঁর গল্পের কোনো সম্পর্ক আছে?

অতএব, মত পালটাতে হল। আমায় গভীরে যেতে হবে। যে রহস্যের উত্তর আমি এতদিন পাইনি, তা খুঁজে পাওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা থাকলে তা খতিয়ে দেখতে হবে। অতএব, আমি ড. ইউনুসকে সাহায্য করব। তা ছাড়া, এই অবস্থায় যদি আমি তাঁকে ছেড়ে যাই, তবে আমি নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারব না।

মন থেকে আমি যদিও জানতাম যে, গোটা ব্যাপারটাই একটা অসম্ভব অবসেশন বই আর কিছু নয়। কিন্তু, খান এরপর একটা অদ্ভুত প্ৰমাণ আমায় দিলেন। ওই পুথির সাহায্যে তিনি একটা এমন কাজ করে দেখালেন যা সাধারণ জ্ঞানে অসম্ভব।

আমায় বললেন,

— আমি জানি তুমি অবিশ্বাস করছ। স্বাভাবিক। শুরুতে আমারও মনে অনেক সংশয় ছিল, ব্যানার্জি। কিন্তু, তোমায় একটা প্রমাণ আমি এখুনি দেখাতে পারি যাতে তোমার মনের সন্দেহ দূর হবে। অ্যালকেমি আর তন্ত্রর মিলনে যে বিদ্যা এই বইয়ে সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের পরিচিত জ্ঞানের থেকে অনেক এগিয়ে। এসো আমার সঙ্গে। তুমি এখুনি এক অসম্ভবকে সম্ভব হতে দেখবে।

বেসমেন্টের মেঝেতে যে বড়ো বড়ো বৃত্তগুলো আঁকা রয়েছে সেগুলোকে বলে: ‘ট্রান্সমিউটেশন সার্কলস’ বা ‘রূপান্তর-বৃত্ত’। এরকমই একটা বৃত্তের ওপর খান একমুঠো বালি রাখলেন। তারপর বিভিন্ন মুদ্রা আর মন্ত্রপাঠ করলেন। প্রথমে কিছুই হল না। তারপরেই বালি গরম হয়ে লাল হয়ে উঠল। দেখতে দেখতে তা কাচের টুকরোয় পরিণত হল! যে রিঅ্যাকশন ঘটতে প্রচণ্ড তাপ আর চাপ লেগে থাকে, সেটা চোখের সামনে ঘটল মাত্র কয়েক মুহূর্তে। আমি সত্যিই বিস্মিত হয়ে কয়েক মুহূর্ত কিছু বলতে পারলাম না। দেখলাম ড. খান আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছেন। বললেন,

–এখন যা ম্যাজিক মনে হচ্ছে, তা আসলে ভবিষ্যতের বিজ্ঞান। দশ বছর আগেও যদি আমাদের কেউ বলত যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেবে, আমাদের হয়ে লেখা লিখে দেবে, আমরা কি সেটাকে কল্পবিজ্ঞান বলে উড়িয়ে দিতাম না? কিন্তু, আজকে সেটাই চরম বাস্তব আমাদের কাছে।

কিন্তু, বিস্মিত হওয়ার আরও বাকি ছিল। এরপর তিনি অন্য একটা বৃত্তে, দেওয়ালে টাঙানো একটা চার্ট অনুযায়ী কপার, জিঙ্ক, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পলি-ফেনল আর চিনি রাখলেন। হিসেব করে, ছোট্ট একটা ইলেকট্রনিক দাঁড়িপাল্লায় মেপে প্রতিটা পরিমাণ ও পরিমাপ মতো।

এরপর একইভাবে কিছু মন্ত্র আওড়ালেন আর মুদ্রা করলেন হাত দিয়ে। তবে, এইবার প্রক্রিয়া একটু জটিল আর লম্বা হল আগের চেয়ে। সেই বৃত্তটা যেন লাল আলোয় জ্বলে উঠল। তারপরই অদ্ভুত একটা আলোর ঝলক আর তারপরেই চোখের সামনে দেখলাম একটা লাল আপেল রাখা সেখানে, যেখানে একটু আগেই কয়েকটা আলাদা পদাৰ্থ ছিল,

— অসম্ভব!

মুখ থেকে কথাটা বেরিয়ে এল। খান এগিয়ে গিয়ে আপেলটা তুলে নিলেন। আমার হাতে দিয়ে বললেন,

— খেয়ে দেখো, ব্যানার্জি। সম্পূর্ণ নিরাপদ আর সুস্বাদু।

–এ কীভাবে সম্ভব?

–অ্যালকেমি আর তন্ত্রর সাহায্যে, ব্যানার্জি। আমার কী মনে হয়, জানো? এই যে কিছু পির, ফকির আর সাধুবাবারা হাত মুঠো করে ফল এনে দেন শূন্য থেকে, সেটা অ্যালকেমির চমৎকার। বুজরুক আর জাদুকরদের বাদ দাও। প্ৰকৃত সিদ্ধপুরুষ যাঁরা, তাঁরা সাধনা আর অভ্যাসের মাধ্যমে সম্ভবত বিনা রূপান্তর— বৃত্তেই ‘ট্রান্সমিউটেশন’ করতে পারেন। তার দ্বারাই বাতাস থেকে দরকারি সামগ্রী শুষে নিয়ে তা বদলে দেন ইচ্ছেমতো ফলে।

আমি তাজ্জব হয়ে শুধু শুনছিলাম এইসব। এইবার তাঁর স্বর পালটে গেল। একটু থেমে বললেন,

–ঠিক একইভাবে, আলাদা আলাদা পদার্থ থেকে আমরা বানাব সম্পূর্ণ মানুষ। জীবিত করব তাকে। আমায় সাহায্য করো, ব্যানার্জি। পুথির ভাষা আর নকশা খুব কঠিন, আর হিউম্যান ট্রান্সমিউটেশন খুবই জটিল। একার পক্ষে এ কাজ সম্ভব নয়। সংস্কৃত, প্রাচীন সিজিল চিহ্ন, তন্ত্রমন্ত্র এবং বিজ্ঞানের জ্ঞান, আমার জানা মতে তোমার চেয়ে ভালো আর কারুর নেই। এই পুথির লেখা আমি একা উদ্ধার করতে পারব না। তোমার সাহায্য পেলে এই মিরাকলকে বাস্তব করতে পারি আমরা দু-জন! আমায় সাহায্য করো, ভাই! আমরা ইতিহাস গড়ব একসঙ্গে!

স্বচক্ষে যা দেখলাম তারপর আর পিছিয়ে আসা যায় না। শুধু শেষ প্রশ্নটা করলাম যে বিষয়টা এতক্ষণ এড়িয়ে গিয়েছেন খান। যদিও উত্তরটা জানা আছে, তবুও তাঁর মুখ থেকেই শুনতে প্রশ্ন করলাম,

–কাকে জীবিত করতে চান আপনি, ড. খান?

চোখ নামিয়ে তিনি উত্তর দিলেন,

— সেটা তো তুমি জানোই, ব্যানার্জি। আমার জীবনে তো একজনই ছিল, এবং আজও সে-ই সব কিছু জুড়ে আছে। বলো ব্যানার্জি, তুমি কি চাও না তোমার পদ্মা দিদি আবার ফিরে আসুক আমাদের মধ্যে?

আমার কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। মন বলছে যে, এর পরিণতি ভালো হবে না। কিন্তু, আমি যদি তাঁকে সাহায্য না করি, তবুও তিনি এই কাজ করতে যাবেন একাই। এবং, তাতে ফল আরও মারাত্মক হতে পারে।

আমি কিছু না বলে নিজের ঘরে চলে এলাম। দেখলাম ইতিমধ্যে অ্যালকেমির অনেকগুলো বই আমার ঘরে রেখে দিয়েছেন ড. খান। তিনি জানেন যে, না বুঝে-শুনে আমি কোনো প্রোজেক্টে নামব না।

অ্যালকেমির প্রধান সূত্র বা বলা চলে মূল সূত্র হল ‘সমতুল্য বিনিময়’ বা ‘ইকুইভ্যালেন্ট এক্সচেঞ্জ’। বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ল অফ কনজারভেশন অফ মাস’ বলা হয়। যে বস্তু আমি নির্মাণ বা ট্রান্সমিউট করতে চাই, তার সমপরিমাণ দ্রব্য আমায় দিতে হবে। অ্যালকেমি শুধু সেই দ্রব্য ব্যবহার করে অন্য বস্তুতে রূপান্তর করে। যেমন, খান ওই আপেলটা বানানোর জন্য একটা আপেলের মধ্যে থাকা প্রতিটা দ্রব্য আলাদা আলাদাভাবে, পরিমাণ-পরিমাপ সঠিক হিসেবমতো রূপান্তর-বৃত্তর মধ্যে রেখেছিলেন।

ঠিক একইভাবে আমরা যদি মানবদেহ বানাতে চাই, তবে একটি মানুষের শরীরে থাকা সবক-টা দ্রব্য জোগাড় করে রাখতে হবে হিউম্যান-ট্রান্সমিউটেশন সার্কলে। কিন্তু, রূপান্তর করতে আরও একটা বস্তু প্রয়োজন— ‘এনার্জি’। ‘এনার্জি কনজারভেশন’ সূত্র অনুযায়ী সমপরিমাণ শক্তিও প্রয়োজন। ভর ও শক্তি যে আসলে একই জিনিস, তা বহু বছর আগেই আইনস্টাইন প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন তাঁর বিখ্যাত ‘স্পেশাল থিয়োরি অব রিলেটিভিটি’-তে। তাই আমাদের প্রয়োজন এনার্জি। এই সার্কলগুলোর কাজ হল প্রকৃতির এনার্জিকে ব্যবহার করে রূপান্তর ঘটানো। কিন্তু, প্রকৃতির এনার্জি ব্যবহার কি এতই সহজ? যে কাজ করতে একটা গোটা নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরের প্রয়োজন পড়ে বিজ্ঞানীদের, শুধু তন্ত্র আর অ্যালকেমির বলে তা এত সহজে কীভাবে করা সম্ভব হচ্ছে?

আমার ধারণা কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। কোথাও একটা কিছু আছে যা আমরা ধরতে পারছি না। বই পড়ার ফাঁকে এইসব ভাবনা ভাবতে ভাবতেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

***

আগামী কয়েক দিন আমি আর ড. খান কাজ চালিয়ে গেলাম বাড়ির বেসমেন্টে। দেখলাম খান সেটাকে ‘ল্যাব’ বলে সম্বোধন করছেন। মনে মনে হাসি পেল। হায় রে! কোথায় ড. খান-এর সেই এয়ার কন্ডিশন্ড ল্যাব, যেখানে অত্যাধুনিক যন্ত্ৰ, অণুবীক্ষণ যন্ত্র ইত্যাদি ভরতি ছিল। আর, কোথায় এই পুরোনো বাড়ির, তন্ত্র-বৃত্ত আঁকা পাতালঘর।

যত জটিল রূপান্তর, ততই বেশি শক্তি প্রয়োজন, আর ততই জটিল হবে ট্রান্সমিউটেশন সার্কলের নকশা। তাই বেসমেন্টের বিরাট জায়গা জুড়ে একটা অতি জটিল নকশা বৃত্ত এঁকেছেন খান। এই অবধি আমার সাহায্য প্রয়োজন তাঁর হয়নি।

গত তিনদিন, ড. খান সমস্ত জিনিসপত্র জোগাড় করেছেন। আমি শুধু সেই পুরোনো পুথি ঘেঁটে পাতার পর পাতা মন্ত্র, অনুবাদ করে লিখে গেছি। বইয়ের সম্পূর্ণ অনুবাদ প্রায় হয়ে এসেছে। আমার কাজ শেষের মুখে।

পঞ্চম দিন, অর্থাৎ, আগামীকাল হল পরীক্ষার দিন। আমি মনে-প্রাণে চাই যেন আমাদের পরীক্ষা অসফল হয়। কারণ, আমি জানি যে, এখানে খান যা করতে চলেছেন, তা প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ। প্রকৃতি তার বিরুদ্ধাচরণ পছন্দ করে না। এর চরম মূল্য সে নিয়ে থাকে।

শেষবারের মতো কথাটা আমি ড. খানকে জানালাম। তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিলেন,

–হ্যাঁ। আমি জানি। তুমি ঠিকই বলেছ। আর, সেইজন্য আমি চরম মূল্য দেব। ব্যানার্জি, তুমি কি বুঝতে পারছ যে, এই জিনিসগুলো রূপান্তর করে শুধু দেহ বানানো যাবে। কিন্তু, প্রাণ?

প্রশ্নটা আমার মনেও ছিল, কিন্তু ইচ্ছে করেই কথাটা বলিনি। কারণ, আমার মনে একটা ধারণা প্রথম থেকেই ছিল যে, শেষপর্যন্ত জড়বস্তু সৃষ্টি হলেও, প্রাণপ্রতিষ্ঠা হবে না। কিন্তু, এইবার খান নিজেই সেই প্রসঙ্গ তোলায় আমি জানতে চাইলাম,

–আপনি কী বলতে চাইছেন?

—প্রাণ বা আত্মা মানেই হল এনার্জি। ‘সমতুল্য বিনিময়’ অনুযায়ী স্থূলদেহে সেই প্রাণশক্তি তাকে দিতে হবে অন্যের প্রাণশক্তিতে ভাগ বসিয়ে। সেই প্রাণশক্তি আমি পদ্মাকে দেব নিজের প্রাণশক্তির থেকে ভাগ বসিয়ে! আমার অর্ধেক প্রাণশক্তি, মানে, আমার আয়ুর অর্ধেক আমি আমার স্ত্রী-কে দেব। হয়তো এতে আমাদের দু-জনেরই জীবন অতি স্বল্পায়ু হয়ে যাবে। কিন্তু, আমি এই দীর্ঘ একাকী জীবন চাই না। নিজের জীবনের শেষ কয়েকটা বছর আমি আমার ভালোবাসার সঙ্গেই কাটাতে চাই।

খানের চোখের কোণ চিকচিক করছে। আমি আর কিছু বলতে পারলাম না।

***

মানবদেহের ৯৯% হল অক্সিজেন, কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন আর ফসফরাস, ০.৮৫% হল পটাশিয়াম, সোডিয়াম, সালফার, ক্লোরিন এবং ম্যাগনেশিয়াম। বাকি খুব সামান্য পরিমাণে লোহা, কোবাল্ট, তামা, জিঙ্ক, আয়োডিন এবং অতি স্বল্প পরিমাণ সেলেনিয়াম ও ফ্লুরিন। এই দিয়েই বানানো আমাদের শরীরের প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেটস, ফ্যাটস, মিনারেলস আর বেশিরভাগ জল।

এই সমস্ত জিনিস একজায়গায় রাখা হয়েছে। হিউম্যান ট্রান্সমিউটেশন সার্কল আঁকা ছিল আগেই। কিন্তু, এটা শুধুমাত্র দেহ বানাতে পারে। এর সঙ্গে আত্মাকে আহ্বান করতে নকশায় কিছু অদলবদল করা হয়েছে। আজ সারাদিন ধরে আমি আর ড. খান তাই করেছি। জ্যামিতিক নকশাগুলোর মাঝে জায়গামতো আমি লিখে দিয়েছি প্রাচীন মন্ত্র। এই মন্ত্রের শক্তিতেই আহ্বান জানানো হবে খানের মৃতা স্ত্রী পদ্মার আত্মাকে। কিন্তু, এই মন্ত্র আর রূপান্তর-বৃত্ত, দুটোকেই জাগ্ৰত হতে হবে ঠিক একসঙ্গে। এই দুটো অ্যাক্টিভ হওয়ার মুহূর্তে একচুল অমিল হলেই তা সফল হবে না। কাল পূর্ণিমা। পুথি অনুযায়ী এই ক্রিয়া একমাত্র পূর্ণিমায় করা যায়। বুঝতে পারলাম, সেই কারণেই আমাকে এই সময়ে ডাকা হয়েছে।

আগামীকাল আমার কাজ হবে মন্ত্র পাঠ করে যাওয়া, আর খান বাকি মূল কাজগুলো করবেন। দুটো প্রক্রিয়াই জটিল এবং তা শেষ হতে হবে একসঙ্গে। একই মুহূর্তে। গত পাঁচদিন আমি আর খান রিহার্সাল দিয়ে সেটা করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের দু-জনের ক্রিয়াই এখন ঠিক তেরো ঘণ্টা তিন মিনিট বাইশ সেকেন্ড লাগছে।

আজ সব প্রস্তুতি করে নিয়ে আমরা শুতে যাওয়ার আগে, বেসমেন্টে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম সব কিছু। কাল সকাল থেকেই আমরা শুরু করব কাজ।

আমার মনে প্রবল অশুভ সংকেত স্পষ্ট। তবু এতদূর এসে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয় আমাদের পক্ষে। তাও শেষবারের মতো একবার আমি খান-কে বললাম,

–ড. খান, আরও একবার ভেবে নিন। আমরা যা করতে চলেছি তার ফলাফল সম্বন্ধে আমরা কিন্তু জানি না। আবারও বলছি, এই প্রকৃতি বিরোধী কাজে আমার সায় নেই। আমাদের পরিচিত জগতের বাইরে যে জগৎটা আছে, তার সঙ্গে আমার যেটুকু পরিচিতি ঘটেছে ইতিমধ্যে সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, সেই জগৎ বড়ো ভয়ংকর। বিপদের সম্ভবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

— কীরকম বিপদ?

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,

— দুটো জগতের মধ্যে এমন বহু অপার্থিব সত্তা থাকে যারা ক্রমাগত চেষ্টা করে এই জগতে আসার। এবং, সেই মাধ্যম সাধারণত হয় একটা শরীর। হতে পারে পদ্মা দিদির বদলে, তার শরীরের মাধ্যমে ফিরে এল অন্য কেউ।

খান আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন,

— জানি। তাই ব্যবস্থা রেখেছি।

খান পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করে টেবিলে রাখলেন। বললেন,

–সেরকম কিছু হলে আমি নিজের হাতে তাকে শেষ করব।

আমি আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারলাম না।

রাতে ঘুম আসতে দেরি হল। মস্তিষ্ক উত্তেজিত হয়ে ছিল আগামীকালের চিন্তায়। হঠাৎ বাইরে একটা অদ্ভুত ঘরঘরে শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। শব্দটা বাইরে থেকে আসছে। জঙ্গলের দিক থেকে।

বিছানা থেকে উঠে গিয়ে জানলার কাছে দাঁড়ালাম। জানলার দশ হাত দূর থেকে শুরু হয়েছে জঙ্গল। সেখানে কিছু একটা আছে। অন্ধকার কেমন যেন জমাট বাঁধছে একটা জায়গায়। আর, সেখানে ওই জমাট অন্ধকারে দেখতে পেলাম চাঁদের আলোয় আগুনের গোলার মতো দুটো চোখ! শ্বাপদ কোনো জন্তুর চোখ নিশ্চয়ই। জঙ্গলে শ্বাপদ জন্তু থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু, কেন তবে আমার অনুভূতি, আমার সমস্ত চেতনা জানান দিচ্ছে যে, আমি যা দেখেছি সেটা পার্থিব কোনো অস্তিত্ব নয়?

জমাট অন্ধকার থেকে বিশালকায় একটা প্রাণী বেরিয়ে এল। প্রথমে ভাবলাম সেটা একটা বাঘ, কিন্তু তারপরেই ছায়ামূর্তিটা আকার নিল। লম্বা দুটো কান, লোমশ কালো শরীর আর লেজ। লম্বাটে চোয়ালে চাঁদের আলোয় ঝকঝক করে উঠল ধারালো, সুচালো দাঁতের সারি! একটা কালো কুকুর বা নেকড়ের রূপ ধরছে ওই অন্ধকার!

কয়েক মুহূর্তের জন্যে সেটা তাকিয়ে রইল আমার দিকে। যেন সাবধান করে দিতে চাইল আমায়। তারপরই চাঁদের দিকে মুখ তুলে অদ্ভুত এক অপার্থিব সুরে সেটা ডেকে উঠল। যেন মনে হল একাধিক অদৃশ্য প্রাণী অসীম শোকে কেঁদে উঠছে আগামীর আশঙ্কায়।

এরপর যেমন আচমকা সেটা এসেছিল, ঠিক সেভাবেই হঠাৎ দেখলাম, সেটা নেই। জঙ্গল তার স্বাভাবিক ছন্দে মৃদু মৃদু দুলছে বাতাসে। কোথায় সেই অন্ধকার? কোথায় সেই ভয়ানক কালো নেকড়ে? ফুটফুটে জোছনার আলোয় মায়াবী লাগছে এই শান্ত জঙ্গলকে

হঠাৎই মনে পড়ল সুবীরবাবুর কথা। কালো নেকড়ে! কালো দরজা!

তবে কি আমার উত্তপ্ত মস্তিষ্ক আমাকে এইসব দৃশ্য দেখাচ্ছে! নিশ্চয়ই তাই। নিজের মনকেই যেন কিছুটা জোর করে আশ্বস্ত করে আমি আবার গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

***

সকাল থেকে আমরা দু-জন বিভিন্ন মুদ্রা আর মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেছি। মাঝে মাঝে থামছি, একইসঙ্গে। আমাদের আগে থেকেই ঠিক করে কোঅর্ডিনেট করা রয়েছে কোন কোন জায়গায় বিরতি দেব আর কতক্ষণের জন্য বিরতি দেব। সেই বিরতির ফাঁকে কয়েক চুমুক জল আর প্রোটিন-গ্লুকোজ শেক খাচ্ছি। ইতিমধ্যে দশ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হয়েছে, আরও তিন ঘণ্টা মতো চালিয়ে যেতে হবে।

ট্রান্সমিউটেশন বৃত্তের মধ্যে আরও দুটো বস্তু দেওয়া হয়েছে। একটা হল খানের মৃতা স্ত্রীর মাথার কয়েকটা চুল। সেটা ডি.এন.এ. সোর্স হিসেবে কাজ করবে। যাতে কাঙ্ক্ষিত মানুষের দেহটাই আমরা ফিরে পাই। সঙ্গে খান নিজের কিছু রক্ত দিয়ে বৃত্তের ভেতর আরও একটা বিশেষ চিহ্ন এঁকেছেন। এই রক্তে আঁকা চিহ্নর মানে, এই রক্তবাহক মানুষের প্রাণশক্তিকেই এই চিহ্নর সাহায্যে উৎসর্গ করা হচ্ছে এই ক্রিয়ায়।

সন্ধে নামার সঙ্গেসঙ্গেই প্রকৃতি রুদ্র রূপ নিতে শুরু করেছে। ঝড় আর বজ্রপাতের আওয়াজ এই মাটির নীচের ঘর থেকেও পাচ্ছি। প্রকৃতিও যেন তীব্রভাবে প্রতিবাদ করছে আমাদের এই ক্রিয়াকলাপের। মুহুর্মুহু গর্জন করছে আকাশ।

সামনেই কোথাও বাজ পড়ল আর সঙ্গেসঙ্গে ঘরের বিদ্যুৎ চলে গেল। এমারজেন্সি হালকা আলো জ্বলে উঠল বটে। তবে কেন জানি না, আমার মনে একটা ভয়ের অনুভূতি সঞ্চারিত হল। চারপাশের পরিস্থিতিটাই কেমন যেন একটা

অবাস্তব মনে হতে লাগল।

আমাদের ক্রিয়া শেষের দিকে এগোচ্ছে। আমি ক্লান্ত। খান নিজেও ক্লান্ত, কিন্তু তাঁর উৎসাহে কোনো কিছুই চিড় ধরাতে পারেনি। আমাদের মন্ত্রর সঙ্গে সঙ্গেই তাল মিলিয়ে ঝড়ের দাপট বেড়েই চলেছে।

আর মাত্র একটা মন্ত্রপাঠ বাকি। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় চিৎকার করে আমায় বারণ করছে মন্ত্র শেষ করার জন্য। ঠিক ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে একসঙ্গে দু-জনে শেষ করলাম মন্ত্র। কয়েক মুহূর্তেই সব চুপচাপ। কোনো শব্দ বা পরিবর্তন নেই। নিজের বুকের উত্তেজিত হৃৎস্পন্দন শুনতে পাচ্ছি। তবে কি আমরা অসফল হলাম?

এরপরেই ঘটল অবিশ্বাস্য একটা ঘটনা। হঠাৎ মনে হল সারাঘর যেন ধোঁয়ায় ভরে গেছে। এত ধোঁয়া এল কোথা থেকে? আর, হঠাৎই ঘরের তাপমাত্রা যেন কয়েক ডিগ্রি হ্রাস পেয়েছে। মুখ থেকে শ্বাস ছেড়ে দেখলাম বাষ্প বেরোচ্ছে।

— ওই দেখো!

ড. খানের কথায় তাঁর দিকে তাকাতে দেখলাম তিনি কোনার দেওয়ালের দিকে হাত তুলে দেখাচ্ছেন। সেদিকে তাকাতেই চমকে গেলাম। এতক্ষণ যেখানে নিরেট দেওয়াল ছিল, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে একটা দরজা! ঠিক যেমন পুথিতে আঁকা দেখেছিলাম। একটা কালো রঙের দরজা! একধরনের অদ্ভুত কম্পন হচ্ছে ওটাতে। যেন ওই দরজাটা জ্যান্ত কিছুর মতো শ্বাস নিচ্ছে। মৃদু আলোতে ওটার গায়ে দেখতে পাচ্ছি যেন কালো শিরা-উপশিরা ফুটে উঠেছে।

দরজার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে ড. খান বললেন,

–ও মাই গড! তুমি শুনতে পাচ্ছ, ব্যানার্জি? শুনতে পাচ্ছ?

— কী শুনতে পাব?

— তুমি শুনতে পাচ্ছ না? ওই তো দরজার ভেতর থেকে পদ্মার গলা শোনা যাচ্ছে। ওই তো ও আমাকে ডাকছে! শোনো, শোনো!

— আমি কিছুই শুনতে পাচ্ছি না, ড. খান।

–ও আমায় ডাকছে! ওই তো! আমায় দরজা খুলতে বলছে! ও ওদিকেই আছে! আমি… আমি আসছি, পদ্মা!

–না! না!

আমি তাঁকে আটকানোর আগেই ড. ইউনুস পাগলের মতো ছুটে গিয়ে দরজা ধাক্কা দিলেন। বিনা শব্দে খুলে গেল দরজাটা! প্রচণ্ড অশুভ একটা উপস্থিতি আমি টের পেলাম নিজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে!

পরমুহূর্তে একটা লালচে মায়াবী আলোয় জ্বলে উঠল ঘরের মেঝেতে আঁকা বিশাল বৃত্তটা। প্রতিটা নকশা লাইন বরাবরই লাল আলোয় জ্বলজ্বল করছে। রূপান্তর-বৃত্ত জেগে উঠেছে! এদিকে দেওয়ালের গা থেকে কালো দরজাটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে! ওটার কাজ শেষ হয়েছে। খুলে দেওয়া হয়েছে দুই জগতের মাঝের দরজা। অ্যাক্টিভ হয়ে উঠেছে ট্রান্সমিউটেশন সার্কল! তাই এনার্জি টানছে সেটা আশপাশ থেকে।

ঘরের বৈদ্যুতিক আলোগুলো কাঁপতে কাঁপতে নিভে গেল সবগুলো। শুধু ওই একটা লাল আভা ছড়িয়ে পড়ল সারাঘরে। একটা প্রচণ্ড জোর বজ্রপাত হল যেন ঘরের মধ্যেই আর তীব্র লাল আলোর ঝলকানি! চোখ ধাঁধিয়ে দিল আমাদের। হাত দিয়ে চোখ ঢাকলাম।

কয়েকটা সেকেন্ড কাটল। আমার মনের ভেতর তীব্র অস্বস্তি হচ্ছে। মন বলছে খুব খারাপ, ভয়াবহ কিছু একটা অপেক্ষা করছে আমার জন্যে।

ধীরে ধীরে চোখ খুললাম ভয়ংকর কিছু দেখার আশঙ্কা নিয়ে। চোখ খুলে কিছুই দেখতে পেলাম না দুর্ভেদ্য অন্ধকারে। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে চোখ সয়ে এল একটু। আমরা দু-জন ছাড়াও তৃতীয় কিছু একটার উপস্থিতি টের পেলাম অন্ধকারে। তৃতীয় কোনো প্রাণীর নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। শব্দটা ওই বৃত্তটার মধ্যে থেকেই আসছে, যেটা একটু আগেই জ্বলে উঠেছিল লাল আলোয়। অন্ধকারে ওই বৃত্তের ওপরে কেউ একটা হাতে পায়ের ওপর ভর করে বসে আছে মেঝেতে। অন্ধকারে তার অবয়বও হালকা দেখতে পাচ্ছি এখন। কিন্তু, আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় চিৎকার করছে আমার ভেতর। আমায় আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

খান এইবার কথা বললেন,

— আমি… আমি টর্চ জ্বালছি।

আমার মন বলছে যে, যে দৃশ্য আমরা দেখব, সেটা চরম খারাপ কিছু। আমার এই মুহূর্তে এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু, নিজের জায়গা থেকে নড়তে পারলাম না!

তিন ব্যাটারির টর্চের আলোয় ঝলসে উঠল গোটা পাতালঘর। টর্চের আলো পড়ল সামনের দিকে।

যে দৃশ্য দেখলাম তার জন্যে পৃথিবীর কোনো মানুষ প্রস্তুত থাকতে পারে না! আমার সারাশরীর আতঙ্কে কাঁপছে! আতঙ্কে ছিটকে দু-জনেই পিছিয়ে এলাম অনেকটা!

যে বস্তুটা আমাদের চোখের সামনে আছে, সেটা জীবিত। মানুষের শরীরের যা যা থাকে, তার সবই আছে। একটা মাথা, দুটো হাত, দুটো চোখ, দুটো কান, একটা নাক, মুখ সব আছে। কিন্তু, এটাকে মানুষ কখনোই বলা যায় না! কারণ, অ্যালকেমি আর তন্ত্রর সাহায্যে খান একজন জীবিত প্রাণী সৃষ্টি করতে পেরেছেন ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে মানুষের দেহের প্রতিটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকলেও সেগুলো কোনোটাই জায়গামতো লাগেনি! মাথাটা উলটো, তাতে শুধু একটা চোখ আড়াআড়িভাবে গালের একদিকে বসানো। নাক-মুখ কিচ্ছু নেই, থুতনি ওপরের দিকে, মাথা নীচে। লম্বা, কালো চুল ওলটানো মাথাটা থেকে মাটির দিকে ঝুলে আছে। দেহের ডান পা-টা জায়গামতো আছে, কিন্তু পায়ের পাতা উলটো। দ্বিতীয় পা-টা বুকের মাঝখান থেকে উঠে বেরিয়ে আছে। তার দুটো হাতই দেহের একইদিকে জোড়া লেগে আছে। সম্ভবত পিঠের দিকে আছে। বুক থেকে ওঠা পায়ের হাঁটুর কাছে একটা কান আছে। দ্বিতীয় কানটা দেখা যাচ্ছে না কোথায়। উদরের উলটো দিকে বুক। আর, তার একদিকে মনে হচ্ছে নাক… যেটা থেকে নিশ্বাসের শব্দ আসছে। সভয়ে দেখলাম একটা হাতের মুঠি খোলা, তাতে দ্বিতীয় চোখটা বসানো! মাথার মাঝের চোখ আর হাতের তালুর মধ্যের চোখের মণি একসঙ্গে নড়ছে আলো পড়ায়। আমাদের দেখছে সেটা!

মানব রূপান্তর সফল হয়েছে! কিন্তু, তা মানব সৃষ্টি করেনি! সমস্ত অঙ্গ এলোমেলোভাবে শরীরে লেগে একটা অশুভ অস্তিত্বের সৃষ্টি হয়েছে।

ড. খান আমার পাশে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছেন। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সামনের এই ভয়ানক শরীরের দিকে। আমার মস্তিষ্ক আমাকে বার বার বলছে এই অশুভ সত্তাকে পৃথিবীর বুকে রাখা যায় না! আমাদের বিরাট বড়ো ভুল হয়ে গেছে। ইট’স অ্যান অ্যাবোমিনেশন! দেখলাম খানও একই কথা উপলব্ধি করেছেন। টর্চ জ্বলন্ত অবস্থাতেই নামিয়ে রেখে, তাঁর হাতে ধীরে ধীরে উঠে এল পিস্তল। খান সেটা তাক করলেন সামনের ওই প্রাণীটার দিকে। তাঁর হাত কাঁপছে!

আমি বাধা দিলাম না। চোখ ঘুরিয়ে ফেললাম ওই প্রাণীটার দিক থেকে। খান হাত শক্ত করলেন। ট্রিগারে আঙুলের চাপ পড়ছে।

হঠাৎই, ঠিক সেই মুহূর্তে ওই প্রাণীটা আওয়াজ করল। ডেকে উঠল মানুষের মতো, অথচ অদ্ভুত ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজে।

–ইউ… নুস!

এই গলার স্বর অমানুষিক হলেও আমার পরিচিত। কিন্তু, কথা বলছে কোথা থেকে বোঝা গেল না। কারণ, তার মুখ দেখা যাচ্ছে না।

খানের হাত থেকে পিস্তল খসে পড়ল মাটিতে। কাঁপা গলায় বলে উঠলেন,

— প… পদ্মা!

খান এগিয়ে যেতে যান ওইদিকে। আমি তাঁর পথ আটকে দাঁড়ালাম। হাত

চেপে ধরে বললাম,

–ড. খান! কী করছেন? ওটা আপনার স্ত্রী নয়! ভালো করে দেখুন, ওটা পদ্মা দিদি হতেই পারে না! ওটা একটা অশুভ শক্তি যা আমাদের ভুলে সৃষ্টি হয়েছে!

— না… না! কিন্তু, ও যে আমায় ডাকছে। এটা পদ্মার গলার আওয়াজ। আমি ঠিক চিনি!

তখনই আরও একবার ডেকে উঠল ওটা,

— ইউ… নুস!

এইবার আর ড. খানকে ধরে রাখা গেল না। খান ছিটকে গেলেন ওই বস্তুটার কাছে। জড়িয়ে ধরলেন সেই অদ্ভুত আকারের জীবকে। প্রবল আবেগে কাঁদতে লাগলেন।

–পদ্মা! পদ্মা! এই তো আমি। তোমার কাছে এসেছি। তুমি… তুমি ফিরে এসেছ আমার কাছে! এই তো আমি! তোমার ইউনুস!

–খিদে! খুব… খিদে!

একটা হাতের তালুর একটা চোখ দিয়ে খানকে দেখছে। দ্বিতীয় হাতটা দিয়ে সেটা খানের কাঁধ জড়িয়ে ধরল। হাতটা রাখল খানের কাঁধে!

পরমুহূর্তে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠলেন খান! দেখলাম তাঁর কাঁধে রাখা হাতটা ছাড়িয়ে নিতে ছটফট করছেন ড. খান! আমি ছুটে গিয়ে তাঁকে টেনে সরিয়ে আনলাম কিছুটা দূরে। টর্চের আলোয় প্রথমে পরিষ্কার দেখতে না পেলেও, সরিয়ে আনতে দেখলাম তাঁর কাঁধের একদিকের এক খাবলা মাংস নেই। গভীর একটা ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে শার্ট ছিঁড়ে। প্রবল গতিতে রক্ত বেরোচ্ছে ক্ষত থেকে! সেটা একহাত দিয়ে চেপে ধরে কাতরাচ্ছেন তিনি।

কী ঘটেছে বুঝতে না পেরে ওই জীবটার দিকে তাকালাম। যা দেখলাম তাতে ভয়ে আর ঘেন্নায় আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। ওটার দ্বিতীয় হাতের তালুতে দেখা যাচ্ছে দুটো লাল ঠোঁট। সেটার ফাঁক দিয়ে দেখলাম রক্তমাখা দাঁত আর জিভ। মুখটা নড়ছে! কামড়ানো মাংস চিবোচ্ছে! তার মুখটা, যেটা এতক্ষণ মুঠো থাকায় দেখতে পাইনি, সেটা তার অন্য হাতের তালুতে!

কাঁধে হাত রাখার সময় খানের কাঁধের থেকে মাংস খুবলে নিয়েছে ওই মুখ! ঠোঁটের ধার গড়িয়ে লাল রক্ত পড়ছে।

৪. নরক দ্বারের রক্ষীরা

সেই রাতে কী মানসিক পরিস্থিতি নিয়ে ওপরে দু-জন উঠে আসি তা আজ আর মনে করতে চাই না। কোনোমতে টেনে বের করে আনি ড. খানকে। বেসমেন্টের দরজা বন্ধ করে দিই বাইরে থেকে।

কোনোভাবে ওপরে উঠে এসে ড. খানের কাঁধের ক্ষতে আমি ফার্স্ট এইড করে দিচ্ছিলাম। নীচে ওই জিনিসটা দাপাদাপি করে চলেছে। ক্রমাগত তার ঘ্যাসঘ্যাসে গলায় ডেকে চলেছে। যেন অসীম পৈশাচিক খিদের আগুন ক্রমাগত তার পেটে জ্বলছে। তার চিৎকার সহ্য করা যায় না। কান চেপে বসে কাঁদছিলেন খান।

ততক্ষণে আমি বাইরে থেকে আরও একটা শব্দ পাচ্ছি। অনেকগুলো নেকড়ে একসঙ্গে করুণ স্বরে ডেকে উঠছে। সঙ্গে মনে হল কাক ডাকছে অনেকগুলো। ভোর প্রায় হয়ে এসেছে।

–ওকে কিছু খেতে দিতে হবে। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।

বলে উঠে গেলেন খান। ফ্রিজ থেকে কিছু খাবার নিয়ে গিয়ে তাঁর স্ত্রীকে (অন্তত তাঁর মতে তাই) খাওয়াতে নিয়ে গেলেন। খুব সাবধানে দরজা খুলে খান ভেতরে ঢুকলেন। কিন্তু, একটু বাদেই বেরিয়ে এলেন।

— কিছুই খাচ্ছে না খাবার। কী করব বুঝতে পারছি না।

–গুলি চালিয়ে পদ্মা দিদির আত্মাকে আপনার শান্তি দেয়া উচিত ছিল, ডক্টর খান। ওই বিকৃত পৈশাচিক দেহে যা এসেছে, তা আপনার স্ত্রী নয়।

কিন্তু ড. খান পরিষ্কার জানান যে, তাঁর পক্ষে তা সম্ভব নয়। এটা তাঁর স্ত্রী। তাঁর ভালোবাসার পদ্মা। যে রূপেই হোক, সে ফিরে এসেছে।

আমার তখনই মনে পড়ল সুবীরবাবুর কথা। তাঁর সঙ্গেও এমনই কিছু ঘটেছিল না? তাঁকে অবিশ্বাস করার জন্যে মনে মনে আফশোস হল। আমি ড. খানকে বললাম,

–আপনার ফ্রিজে যদি কাঁচা মাংস বা মাছ কিছু থাকে, তবে সেটা দিয়ে দেখতে পারেন।

অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে ড. খান আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি বিস্তারিত তাঁকে বোঝাতে গেলাম না। খানও আমায় কোনো প্রশ্ন না করে, ফ্রিজে রাখা কিছু কাঁচা মাংস বের করে আনলেন। বেসমেন্ট খুলে সেগুলো এগিয়ে দিতেই দেখতে পেলাম একটা হাত বেরিয়ে এল। হাতের তালুর মাঝখান থেকে একটা লম্বা জিভ বেরিয়ে এসে সেটাকে টেনে নিল। ভেতর থেকে চিবিয়ে খাওয়ার আওয়াজ ভেসে এল কিছুক্ষণ। তারপরেই ড. খান ভয়ার্ত মুখে, খালি প্লেট হাতে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। হাড় পর্যন্ত চিবিয়ে খেয়েছেন দেখলাম। ড. ইউনুস আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,

— আমাদের ভুলের আরও একটা ভয়ংকর পরিণাম এটা। পুরোনো একটা অভিজ্ঞতাতেও শুনেছি যে, মৃত্যুলোক থেকে যে ফিরে আসে, সে মানুষের খাদ্য খেতে পারে না। তারা ফিরে আসে কাঁচা মাংসভুক হয়ে। মৃতদের ফিরিয়ে আনার সাইড এফেক্ট। এই কারণেই সম্ভবত ‘হিউম্যান ট্রান্সমিউটেশন’-কে অ্যালকেমির নিষিদ্ধ বিদ্যা বলা হয়। নিজের সৃষ্টির এই ভয়ংকর পরিণাম দেখেই সম্ভবত সেই প্রাচীন ভারতীয় অ্যালকেমিস্ট তাঁর লেখা রিসার্চ নোটস লুকিয়ে ফেলেছিলেন জনসমক্ষ থেকে। কিন্তু, এক বৈজ্ঞানিক হিসেবে নিজের সৃষ্টির মায়া কাটিয়ে ধ্বংস করা কতটা কঠিন তা আপনি, আমি সহজেই বুঝতে পারি। তাই হাজার খারাপ হলেও ফলাফল জেনেও নিজের হাতে লেখা ওই পুথি নষ্ট করে দিতে পারেননি। ওটা তাঁর সারাজীবনের সাধনার ফল। কিন্তু, তিনি চাননি কেউ আবারও তাঁর পথে হাঁটুক। কিন্তু, এত যুগ পরে আমরা আবার তাঁর ভুলের পুনরাবৃত্তি করেছি।

দু-হাতে মুখ ঢেকে সোফাতে ধপ করে বসে পড়লেন ড. ইউনুস। বললেন,

–আমি পারব না, ব্যানার্জি। আমি পারব না নিজের হাতে ওকে মেরে ফেলতে। আমি জানি যে জীবটা নীচের ঘরে রয়েছে, সে আমার স্ত্রী পদ্মা নয়। কিন্তু, আমি পারব না!

আমি কিছু বললাম না। আমি ক্লান্ত। ড. খান আবার বললেন,

— তুমি ফিরে যাও, ব্যানার্জি। আজকেই তো তোমার ফেরার টিকিট। আমি তোমার ঋণ কোনোদিন ভুলব না। শেষ অনুরোধ, আমাদের কথা কাউকে জানিয়ো না। আমার জীবনের শেষ কয়েকটা বছর আমি এখানেই অতিবাহিত করতে চাই। এইটুকু অনুরোধ।

সকালে যখন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলাম তখন আরও একটা অদ্ভুত দৃশ্য আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল। আকাশে কালো মেঘ সূর্য ঢেকে রেখেছে। কেউ বলবে না এটা সকাল, যেন সন্ধ্যা নামার আগের মুহূর্ত। একঝাঁক কাক বাড়িটাকে অদ্ভুতভাবে চক্রাকারে ঘিরে আকাশে উড়ছে। তারা ডেকে চলেছে ক্রমাগত

বাড়িটার সামনের বাগানে চোখ পড়তেই আমার পা যেখানে ছিল, সেখানেই আটকে গেল। গেটের ঠিক সামনেই দরজার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুটো বড়ো বড়ো কালো নেকড়ে। একমুহূর্তের জন্যে মনে হল, এখুনি ওরা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, ছিঁড়ে খাবে আমাকে। কিন্তু, পরমুহূর্তেই আমার ইন্দ্রিয়রা আমায় জানিয়ে দিল যে, ওরা এখানে আমার জন্যে আসেনি।

আমি ধীরপায়ে নেমে এলাম সিঁড়ি দিয়ে বাইরের ফাঁকা জায়গাটায়। খুব সাবধানে পাশ কাটালাম নেকড়ে দুটোর। ওরা একবার আমার দিকে তাকাল, তারপর আবারও মুখ ফিরিয়ে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল পুরোনো বাড়িটার দিকে। বাড়িটা থেকে যতই দূরে যেতে লাগলাম, ততই যেন অশুভর ছায়া একটু একটু করে কেটে যেতে লাগল। আবহাওয়া ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। খানিকটা দূরে গিয়ে একবার পেছনদিকে তাকালাম। দেখলাম বাড়িটার চারপাশে, আলো- ছায়ায় মিশে, ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটা কালো কুকুরের অবয়ব।

ওরা অপেক্ষায় আছে। আমি জানি ওরা কীসের অপেক্ষায় আছে। এই নেকড়েরা এই পৃথিবীর বাসিন্দা নয়। ওরা মৃতদের জগতের প্রাণী। ওরা ওই জগতের রক্ষক। পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই মৃত্যুলোকের উল্লেখ আছে। নরক, হেল, জাহান্নম, টারটারস যে নামেই সেই মৃত্যুলোককে ডাকা হোক, সেটার দ্বারপাল বা প্রহরী হিসেবে উল্লেখ আছে কালো কুকুর বা নেকড়ে জাতীয় প্রাণীর। খ্রিস্ট ধর্মের ‘হেল হাউন্ডস’, গ্রিক মিথোলজির মৃত্যুদেব হেডিসের পোষ্য ‘সেরবেরাস’, নর্সের ‘গার্মর’। থেরাবদ বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে উল্লিখিত ‘মহাকাহা’, হিন্দু ধর্মে যমের দুই পোষ্য ‘শর্বর’ ও ‘শ্যামা’। প্রকৃতির কিছু নিয়ম আছে যা অলঙ্ঘনীয়। মৃতের জগৎ থেকে ফিরে আসাটা তার নিয়মবিরুদ্ধ। তাতে সৃষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হয়। আর তাই, যখনই এরকম কিছু ঘটে, যখনই ওই অন্ধকার জগতের থেকে কিছু চলে আসে এদিকে, তখনই এরা আসে। ওই জগতের কালো দরজার প্রহরীরা আসে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে! ঠিক যেমনভাবে সুবীরবাবুর ছেলেকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল একটা হেলহাউন্ড। এখনও ওরা অপেক্ষায় আছে সুযোগের। আমি জানি ওরা ঠিকই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে ওই অশুভ অস্তিত্বটাকে সেখানে, যেখান থেকে সে এসেছে।

ওই বাড়ির বেসমেন্টে যে জীবটাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, ওটা পৃথিবীর বুকে একটা ব্যত্যয় বা অসংগতি। আর, প্রকৃতি কোনোরকম অসংগতি পছন্দ করে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রকৃতি সেই অসংগতিকে নষ্ট করে ফেলে। শুধু তাই নয়, যে বা যারা তার সমতা নষ্ট করে, তাদেরও ছাড়ে না। এটাই জগতের নিয়ম।

যেহেতু এইবার সম্পূর্ণ ক্রিয়ায় আমার ভূমিকা মুখ্য ছিল না, তাই সম্ভবত আমি রক্ষা পেলাম। কিন্তু ড. ইউনুসের ক্ষেত্রে তা বলা যায় না। সুবীরবাবুর মতোই তিনিও খুলে ফেলেছিলেন সেই কালো দরজা। তাই ওই কালো দরজা তাঁর পিছু ছাড়বে না। সৃষ্টিকর্তার নিয়ম ভাঙার অপরাধে তাঁকেও একদিন ঠিকই টেনে নিয়ে যাবে অন্ধকারের প্রাণীরা, ওই কালো দরজার ওপারে।

সত্যি… ভালোবাসা বড়ো বিষম বস্তু!

***

এরপর কয়েক মাস কাটল। খানের সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি। গোপনীয়তার স্বার্থে এই ঘটনার কথা কাউকে বলিনি। আজ আপনাদের কাছে এই গল্প বলছি নাম পরিবর্তন করে ও সঠিক স্থানের উল্লেখ না করে। তার কারণ, আজকেই খবরের কাগজের ভেতরের পাতায় একটা ছোট্ট খবর চোখে পড়ল। অবসরপ্রাপ্ত বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ড. ইউনুস খান গতকাল রাতে মাথায় পিস্তল চালিয়ে আত্মহত্যা করেছেন দক্ষিণ ভারতে তাঁর নিজস্ব বাড়িতে। আশেপাশের লোকের কথায় জানা যাচ্ছে যে, অনেকদিন ধরেই তিনি মস্তিষ্কের সমস্যায় ভুগছিলেন। রাতে বার বার ভয় পেতেন। বলতেন, কারা যেন তাঁকে নিয়ে যেতে আসছে।

খবরটা পড়ে মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। জানতাম এটাই হওয়ার ছিল। নিজের আয়ু এমনিতেই কমিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।

আর, আমি? এই একই পরিণতির কতটা কাছাকাছি আমি নিজেও এসেছিলাম সেকথা ভাবতেই শিউরে উঠি আজও।

কাশীনাথ পণ্ডিতের কথা মনে পড়ল। তিনি আমায় সতর্ক করেছিলেন যে, অন্ধকারের বেশি গভীরে তাকিয়ে থাকতে নেই, কারণ তাহলে একদিন অন্ধকার ও ফিরে তাকায়। সেইদিন, ওই বাড়ির বেসমেন্টে আমি সামান্য ঝলক দেখেছিলাম ওই অন্ধকার জগতের। আমি জানি একবার যে ওই জগতের সংস্পর্শে আসে, তার ওপর সে ছাপ রেখে যায়। আমি এমন অনেক কিছু দেখতে পাই, শুনতে পাই, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভব করতে পারি, যা সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত। এই পার্থিব জগৎ আর অপার্থিব অন্ধকার জগতের মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছি আমি। আমি, প্রফেসর অতীন্দ্র ব্যানার্জি।

.

References:

1. A brief history of Indian alchemy covering pre-vedic, to vedic and ayurvedic period (circa 400BC to 800AD); Ali M; Bull. Indian Inst. Hist. Med. Hydrabad, 1993.

2. Critical Review of Rasaratna Samuccaya: A comprehensive treaties of Indian Alchemy; D S Rajput et al.; Anc. Sci. Life, July- Sept, 2016.

3. Full Metal Alchemist : Brotherhood (Anime series )

4. Composition of Human Body — Wikipedia.

5. Illustration of makeup of human body, Youst / Getty images, by Anne Marie Helmenstine, Ph.D, 11 Feb, 2019.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *