কূপজীবী – অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী

কূপজীবী

১.

বহু পুরোনো ড্যাম্প পড়া জায়গায় একধরনের গন্ধ হয়। সোঁদা, শ্যাওলার মতো একটা গন্ধ। ঠিক সেইরকম একটা হালকা গন্ধ যেন আমি পাচ্ছি এই মুহূর্তে। তবে, খুবই হালকা গন্ধটা। যেন বহুদূর থেকে আসছে। খুব খেয়াল না করলে টেরও পেতাম না হয়তো গন্ধটা। কিন্তু, আমি গন্ধটা পাচ্ছি।

আমি বার কয়েক জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম যে, সেটা বাইরে থেকে আসছে কি না। কিন্তু, বাইরে এই মুহূর্তে চকচকে রোদ। বরং, বাইরের বাগান থেকে সুন্দর একটা ফুলের গন্ধ আসছে। এর মধ্যে ড্যাম্পের গন্ধ আসার প্রশ্নই নেই। তবে, নাকে সয়ে যাবে এটা। এতই হালকা যে, এক মিনিট পরেই আর সেই গন্ধ পাব না।

–প্রফেসর ব্যানার্জি, আপনি কি শুনছেন আমার কথা?

সত্যিই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম গন্ধটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে। প্রমথেশবাবুর কথায় আমার চিন্তায় ছেদ পড়ল। লজ্জিত বোধ করলাম। তিনি বোধ হয় এতক্ষণ বেশ কিছু কথা বলে ফেলেছেন, যার কোনোটাই আমি কিছুই শুনিনি। বললাম,

— সরি, প্রমথেশবাবু। আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। আপনি প্লিজ আর একবার বলুন কী বলছিলেন।

ভদ্রলোক হেসে বললেন,

— ইট’স ওকে। আমি বলছিলাম যে, আপনার বই দুটো পড়েছি। খুব সুন্দর লিখেছেন। এইসব জিনিসের এত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমি আগে কোনোদিন পড়িনি।

–ধন্যবাদ।

আমার সামনে কেউ আমার প্রশংসা করলে আমি কেমন যেন দিশাহারা বোধ করি। মানে, ঠিক বুঝতে পারি না কী করা উচিত। তাই তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পালটাতে বললাম,

— আপনি চা খাবেন, না, কফি?

— আমার চা-টাই চলে।

আমার সামনে বসা লোকটির নাম প্রমথেশ রায়চৌধুরী। বয়স চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ, যা খুশি হতে পারে। লোকটির চেহারায় একধরনের বনেদিয়ানা চোখে পড়ে। একটা বিশেষত্ব হল, ভদ্রলোকের বাঁ-পায়ে পাঁচটার জায়গায়, ছ-টা আঙুল। আমার অতিথির সামান্য পরিচয় ইতিমধ্যে পেয়েছি। রানাঘাটের দিকে তাঁদের বড়ো পৈতৃক ভিটেবাড়ি। পারিবারিক বড়ো ব্যাবসা আছে তিন পুরুষ ধরে। তিনি কিছু সমস্যা নিয়ে এসেছেন আমার কাছে। বলছিলেন যে, ওঁর আমাকে একটা গল্প বলার আছে।

ভদ্রলোক এতদূর থেকে এই ছুটির দিন সকাল সকাল নিশ্চয়ই অকারণে আসবেন না। তাই বললাম,

–এবার তবে আপনি বলুন কী গল্পর কথা বলছিলেন। তবে আপনার কথা শোনার আগে এই শেষবার বাধা দেব। একটু দাঁড়ান। ভেতর থেকে চা বলে আসি চিনি, দুধ চলবে?

–আমার সব চলে।

— বেশ।

ভেতরে চা বলে এসে আবার বসলাম নিজের জায়গায়।

–এইবার বলুন।

কিছু মানুষকে দেখলেই বোঝা যায় যে, এরা গুছিয়ে কথা বলবে। ইনি সেরকম একজন। ভদ্রলোক একটু প্রস্তুতি নিয়ে বলতে শুরু করলেন,

–গল্প ঠিক নয়, আমার জীবনের একটা ঘটনা আপনাকে বলব। তবে, ঘটনার প্রথমদিকটা আমার নিজের মনে নেই, বাবা-মায়ের মুখেই শোনা। আপনার কোথাও কোনো প্রশ্ন থাকলে প্লিজ আমাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করে নেবেন, প্রফেসর। তাহলে শুরু করি?

— নিশ্চয়ই।

— বেশ। আপনাকে তো বললামই যে, আমার বাড়ি রানাঘাটে। আমার জন্ম, স্কুল সব সেখানকার বাড়ি থেকেই। বড়ো, পুরোনো, পৈতৃক বাড়ি। বাড়ির সামনে বড়ো বাগান যাতে আম, কাঁঠাল হরেক গাছ আছে। অনেকবার শুটিং পার্টি অফার করেছে বাড়িতে সিনেমা বা সিরিজের শুটিং-এর। কিন্তু, আমরা রাজি হইনি। যদিও পুরোনো, তবু সব অত্যাধুনিক ব্যবস্থাই আছে।

এই বাড়ির পেছনের দিকে আছে একটা কুয়ো। আগেকার দিনের বাড়িতে যেমন থাকত আর কি। জলের জন্যে হয় কুয়ো বানানো হত, অথবা, পুকুর কাটা হত। সেরকমই পুরোনো আমলের একটা কুয়ো। আমি যে কাহিনি আপনাকে বলব তাতে এই কুয়োর একটা মুখ্য ভূমিকা আছে। যে সময়ের কথা বলছি, সেসময়ে আমার বয়স ছিল পাঁচ। তবে, এই ঘটনার কথা আমার কিছুই মনে নেই। ইন ফ্যাক্ট, ওই সময়ের বা তার আগের কোনো স্মৃতিই আমার নেই। আগেই বললাম, যা আপনাকে এখন বলব তা মা-বাবার মুখেই শোনা।

পাঁচ বছর বয়সে, একদিন দুপুরে, আমি খেলতে খেলতে বাড়ির পেছনের কুয়োতে পড়ে যাই। কীভাবে পড়েছিলাম, কী খেলছিলাম এইসব বলতে পারব না। মোদ্দা কথা, একা একা কোনোভাবে সেখানে গিয়ে কুয়োতে পড়ে গেছিলাম আমি। মা কিছুক্ষণ বাদেই আমায় খুঁজতে খুঁজতে সেখানে আসে এবং কুয়োয় উঁকি দিতেই দেখতে পায় যে, আমি বালতির দড়ি ধরে কোনোমতে ঝুলে আছি। মা চিৎকার করে লোক ডাকে। কাজের লোক এবং মালী এসে আমায় সেখান থেকে টেনে তোলে। এরপর সেই ট্রমা কাটতে আমার প্রায় তিনমাস লাগে। তবে, তিনমাসে আমি সম্পূর্ণ সুস্থ, স্বাভাবিক হতে পেরেছিলাম।

কিন্তু, এরপর আমি সুস্থ হলেও, সমস্যা দেখা দিল আমার মায়ের মধ্যে। কোনো একটা কারণে আমার কুয়োয় পড়ে যাওয়ার ঘটনাটা মায়ের মনে একধরনের ট্রমা সৃষ্টি করে।

আমার কুয়োয় পড়ে যাওয়ার প্রায় এক বছর পরে প্রথম ঘটনাটা ঘটে। একদিন ভোরের দিকে ঘুম ভাঙার পর বাবা দেখল মা পাশে নেই। প্রথমে একটু অবাক হল বাবা। কারণ, এত ভোরে ওঠার অভ্যাস বাড়ির কারুরই নেই। তবুও ভাবল মা নিশ্চয়ই বাথরুমে গেছে। কিন্তু, বহুক্ষণ বাদেও মা ফিরল না দেখে বাবা উঠে বসল। মা-কে খুঁজতে খুঁজতে নীচে নেমে এল। কিন্তু, নীচেও রান্নাঘরে বা অন্য কোথাও মা-কে না পেয়ে এইবার বাবা একটু অবাক হল। তখনই বাবার চোখে পড়ল যে, বাড়ির একতলার পেছনের দরজাটা হাট করে খোলা।

এত সকালে কুয়োপাড়ে মায়ের কী প্রয়োজন থাকতে পারে, তা ভেবে পেল না বাবা। মায়ের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে নিজেই বেরোল ওই পেছনের দরজা দিয়ে।

আর, তখনই বাবা দেখতে পেল মা-কে। মা কুয়োর ধারে এলিয়ে পড়ে আছে। পা পিছলে পড়ে গিয়ে চোট পেয়ে অজ্ঞান হয়েছে ভেবে বাবা দ্রুত দৌড়ে গেল মায়ের কাছে। কিন্তু, মায়ের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেল না বাবা। এবং, একবার ডাক দিতেই মা উঠে বসল। যেন এতক্ষণ খুব স্বাভাবিকভাবেই ঘুমিয়ে ছিল। বাবার ডাকে ঘুম ভাঙল। উঠে বসে মা নিজেও অবাক হল নিজের চারপাশে দেখে। বিস্মিত হয়ে বাবাকে প্রশ্ন করল,

— একী? আমি এখানে কী করছি?

বাবা দ্বিগুণ অবাক হয়ে বলল,

— সেটা তো তুমি বলবে। এই সকালে তুমি এখানে কী করছ? আর, এখানেই- বা ঘুমিয়েছিলে কেন?

এখানে ঘুমিয়েছিলাম? সেকী! আমার তো কিছুই মনে নেই। আমার তো শেষ মনে পড়ছে, রাতে বিছানায় ঘুমোতে গেলাম। তারপর এই এখন ঘুম ভাঙল। মা কিছুতেই মনে করে বলতে পারল না যে, কীভাবে সে ওখানে গেল বা কেন গেল। এই ঘটনাটা আমি কিন্তু তখনই জানতে পারিনি। বাবা, মা ঘটনাটা চেপে গেল সেবারের মতো। তা ছাড়া, আমি তখন ছোটো। স্বাভাবিকভাবেই তারা আমাকে বলার প্রয়োজনও বোধ করেনি। এইসব আমি পরে শুনেছি বাবা-মায়ের মুখেই।

এই ঘটনার পর কয়েক মাস নির্বিঘ্নে কাটল। কিন্তু, তারপর আবার একদিন একই ঘটনা ঘটল। আবারও একদিন সকালে উঠে মা-কে ঘুমন্ত বা অচৈতন্য অবস্থায় কুয়োর পাড়ে আবিষ্কার করল বাবা। এবং, এরপর থেকে মাঝে মাঝেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকল। রাত্রে মা ঘুমের মধ্যেই বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে ওই কুয়োর পাড়ে চলে যেত। তার নিজেরও মনে থাকত না রাতের ঘটনা।

— সোমনমবুলিজম। মানে, স্লিপ ওয়াকিং?

— হ্যাঁ। সেরকমই। অথচ, মায়ের কিন্তু এর আগে কোনোদিন ঘুমের মধ্যে চলার রোগ ছিল না। ইন ফ্যাক্ট, মায়ের বংশেও কারুর এই সমস্যা ছিল বলে জানা যায়নি। তবে, একরাতে বাবা মা-কে বাড়ি থেকে বেরোনোর আগেই ধরে ফেলেছিল। তখন গভীর রাত, বাবা হঠাৎই ঘুম ভেঙে টের পায়, মা বিছানায় নেই। তাই বাবা দ্রুত নীচে নেমে আসে। নেমে এসে দেখে, মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করছে। চোখ দুটো খোলা হলেও দৃষ্টি ঘোলাটে। ঘোরের মধ্যে কাজগুলো করছে।

বাবা ছুটে এসে মা-কে ধরে ফেলে এবং এত রাত্রে কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস করায় মা অদ্ভুত একটা উত্তর দেয়। মা বার বার একটাই কথা বলে যেতে থাকে, ‘বাবু আমায় ডাকছে। শুনতে পাচ্ছ না? বাবু ডাকছে।’

— বাবু মানে আপনি?

— ইয়েস। আমি।

–সেইসময় আপনি কোথায় ছিলেন?

–দ্যাট’স দি উইয়র্ড পার্ট। আমি সেইসময় নিজের ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে। অথচ, মা মনে করছে যে, আমি মা-কে কুয়োর দিক থেকে ডাকছি।

— তারপর?

–সেদিনের মতো বাবা সামলে নিয়েছিল। কিন্তু, এরপর আরও একদিন একই ঘটনা ঘটল। রাত্রে ঘুমের ঘোরে নীচে নেমে এল মা। বাবা এতদিনে সতর্ক থাকতে শুরু করেছিল। তাই এইবারও সময়মতো উঠে পড়েছিল। মা-কে ধরে ফিরিয়ে আনতে চাইলে আবারও মা একই কথা বলতে শুরু করে। ‘বাবু ডাকছে আমায়! আমায় যেতে হবে!’ বাবা তখন জোর করে মা-কে আমার ঘরে নিয়ে আসে। আমি ঘুমোচ্ছিলাম। আওয়াজে আমি ঘুম থেকে উঠে বসি। এখনও মনে আছে ঘটনাটা। আমি ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে দেখলাম মা অদ্ভুত ভাবলেশহীনভাবে চেয়ে আছে আমার দিকে। এদিকে বাবা মা-কে জাপটে ধরে বলছে— ‘এই তো বাবু! দেখো একবার। এই তো বাবু। ও তোমায় ডাকছে না! ও তো এখানে! নিজের ঘরেই আছে।’

আমার দিকে চোখ পড়তেই ধীরে ধীরে মায়ের দৃষ্টি স্বাভাবিক হল। হঠাৎ যেন ঘুম থেকে জেগে উঠেছে মনে হল। এত কিছু ঘটে যায়, অথচ মায়ের কিন্তু এইসব রাতের ঘটনা কিছুই মনে থাকে না স্বাভাবিক হওয়ার পর।

–আপনার মা-কে কি সাইকিয়াট্রিস্ট দেখিয়েছেন?

— হ্যাঁ। কিন্তু, কোনো ফল হয়নি।

— বুঝলাম। কিন্তু, মানসিক চিকিৎসার সময় লাগে। একদিনে হয়ে যায় না। আপনি যা বললেন আপনার মায়ের বিষয়ে, সেটা তো সম্পূর্ণ একটা মানসিক সমস্যা। আপনি যে ছোটোবেলায় কুয়োয় পড়ে গেছিলেন, সেই ঘটনার ট্রমা আপনার মা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর বার বারই মনে হয় যে, আমার ছেলে কুয়োয় পড়ে গেছে, তাকে তুলে আনতে হবে।

–ঠিকই তাই। বহু বছর ধরে চিকিৎসা চলেছে। কিন্তু, লাভ হয়নি। ঘুমের ওষুধের প্রভাবে হয়তো এই ব্যাপারটার ফ্রিকোয়েন্সি কমেছে। কিন্তু, মাঝে মাঝেই মা একই অবস্থায় চলে যেত কিছু রাতে।

–কিন্তু, প্রমথেশবাবু, আমি বুঝতে পারছি না যে, আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন?

খানিক চুপ করে থেকে ভদ্রলোক উত্তর দিলেন,

— আমি এতক্ষণ যা যা বললাম সেটা ভূমিকামাত্র। আমি কিন্তু মায়ের ব্যাপারে আপনার কাছে আসিনি, আমি এসেছি আমার নিজের সমস্যা নিয়ে।

— বেশ। শুনব। কিন্তু, আগে চা-টা শেষ করে নিন। ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে যে।

২.

প্রমথেশবাবু একটু তাড়াহুড়ো করেই চা শেষ করলেন। কাপ নামিয়ে রেখে বললেন,

–আমি কি বলা শুরু করব?

— অবশ্যই।

–বেশ। দেখুন, প্রথমেই আপনাকে নিশ্চিত করে একটা কথা বলে রাখি যে, আমার মনে কিন্তু ছোটোবেলায় ওই কুয়ো নিয়ে কোনোরকম ভয় ছিল না কোনোদিনই। মানে, ওই ঘটনার কোনো ট্রমা আমার মধ্যে নেই। কারণ, আমার ওই কুয়োয় পড়ে যাওয়ার ঘটনা মনেই নেই। এই কথাগুলো আপনাকে আগেভাগেই বলে রাখলাম, কারণ আমার পরবর্তী কথাগুলো শুনলেই আপনার মনে হবে যে, এগুলো আমার চাইল্ডহুড ট্রমার ফল।

–বেশ।

খানিকটা আশ্বস্ত হয়ে প্রমথেশবাবু শুরু করলেন,

–তখন আমার বয়স আট কি নয় হবে। একদিন রাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। কেন জানি না মনে হল, আমার ঘরের দরজার বাইরেই কেউ দাঁড়িয়ে আছে। খাট থেকে নেমে আমি দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই টের পাই ওপাশ থেকে কেউ যেন সরে গেল। আমি দরজা খুলে বাইরের বারান্দায় বেরোলাম। অন্ধকার চারিদিক। আমাদের বাড়িটা চারকোনা। প্রতিটা ঘর বারান্দায় খোলে। বড়ো বারান্দা চারিদিকে ঘিরে আছে আর মাঝখানে ফাঁকা বাগান। বাইরে অন্ধকার হলেও চাঁদের মৃদু আলোয় দেখতে পেলাম আমার উলটোদিকের বারান্দায় কেউ একজন দাঁড়িয়ে। একটা বাচ্চা ছেলে বলে মনে হল। মুখটা অস্পষ্ট। ছায়ায় ঢেকে আছে। কিন্তু বুঝতে পারছি, আমারই বয়সি একটা ছেলে এবং কেন জানি না খুব চেনা চেনা ঠেকল। আমি জিজ্ঞেস করি, ‘কে ওখানে?” কোনো উত্তর আসে না। তখনই চোখ পড়ে ছেলেটার হাতের দিকে। চাঁদের আলোয় দেখলাম যে, ছেলেটার হাতে আমার একটা খেলনা ধরা। আমার বেশ রাগ হয়। আমার খেলনা কেন নেবে ও? নিশ্চয়ই চোর। আমি ডান দিক ধরে দৌড়ে যাই ছেলেটাকে ধরার উদ্দেশ্যে। কিন্তু, যখন ওদিকের বারান্দায় পৌঁছোই, তখন কাউকে দেখতে পেলাম না। আশেপাশে ছেলেটাকে অনেক খুঁজলাম। কিন্তু, তাকে দেখলাম না। শুধু খেলনাটা মেঝেতে পড়ে আছে। ঠিক যে জায়গায় ছেলেটা ছিল, সেইখানেই ওটা পড়ে আছে মাটিতে। হাতে তুলে বুঝলাম সেটার গায়ের কিছুটা অংশ ভেজা। বারান্দার মেঝেতেও খানিকটা জল পড়ে আছে, দেখলাম।

আমি নিজের ঘরে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভুলেও যেতাম ঘটনাটা। যদি না এরপর থেকে আমি বাড়িতে মাঝে মাঝেই ওই ছেলেটার উপস্থিতি টের পেতাম। হঠাৎ হঠাৎ রাতে অনুভব করতাম কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়িময়। না দেখলেও কীভাবে যেন জানতাম যে, এটা ওই ছেলেটাই। আমি কিন্তু ভয় পেতাম না। আমার মনে একটা অদ্ভুত বিশ্বাস ছিল যে, এই ছেলেটা আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কারণ, আমি ওর চেয়ে বেশি শক্তিশালী।

যেমন, একরাতের ঘটনা বলি। রাতে আমার বাথরুম পেয়েছিল। পুরোনো বাড়ি। বাথরুম বেশ কিছুটা দূরে, বারান্দার একদম শেষ মাথায়। আমি বাথরুম গেলাম। ফিরে এসে আমার ঘরে ঢুকেই দেখতে পেলাম আমার বিছানায় ছেলেটা চাদর ঢেকে শুয়ে। আমার রাগ হল। আমি দৌড়ে গিয়ে এক হ্যাঁচকা টানে চাদর সরিয়ে দিলাম। দিতেই দেখলাম বিছানায় কেউ নেই! একটু আগেও চাদরের নীচে কেউ ছিল। কিন্তু, এখন নেই। লক্ষ করলাম বিছানার চাদর ভিজে আছে। কেউ যেন ভেজা গায়ে সেখানে শুয়ে ছিল একটু আগেও। সকালে এই ঘটনাটা বাবাকে বলায় বাবা, মা কেউই বিশ্বাস করেনি। মা নিজে ঘুমের মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ করলেও, এমনিতে মা বরাবরই খুব যুক্তিবাদী। অতএব, দোষ আমারই ওপর পড়ল। বলা হল, আমিই বিছানা ভিজিয়েছি। বিশ্বাসই করতে চাইল না যে, আমি সেই রাত্রে ঠিকই বাথরুমে গিয়েছিলাম। বিছানা আমি ভেজাইনি।

এরকমভাবেই কয়েক বছর চলল। মাঝে মাঝেই রাত্রে মা কুয়োর পাড়ে চলে যেত ঘুমের ঘোরে। আমিও শুনতে পেতাম ঘরের বাইরে কেউ ঘুরছে। কিন্তু, কিছু করতাম না আমি। সব কিছুই সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে যায় বোধ হয়।

আমি প্রমথেশবাবুকে বাধা দিয়ে একটা প্রশ্ন করলাম,

— একটু বাধা দিচ্ছি। আপনি কি কখনোই সেই ছেলেটার মুখ দেখেননি?

–দেখেছি। একবারই দেখেছি। তখন আমি বেশ কিছুটা বড়ো। বাথরুমে গিয়েছিলাম সেই রাতেও। আমাদের বাথরুমটা পুরোনো হলেও বাবা সেটাকে রেনোভেট করে একেবারে নতুনের মতো বানিয়েছিল। তাতে বাথটবও আছে। আমি বাথরুম সেরে বেরোনোর সময় হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম। আমার মনে হল বাথটবে কেউ একজন আছে। আমি ধীরপায়ে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। দেখতে পেলাম টানা প্লাস্টিকের পর্দার ওপারে কালো একটা ছায়া। দাঁড়িয়ে আছে কেউ একজন। আমি পর্দা সরিয়ে দিলাম। আর, তখনই দেখলাম আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। বা, বলা ভালো দাঁড়িয়ে আছি আমি নিজে! কারণ, ছেলেটার মুখ অবিকল আমার মতো! ঠিক যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হুবহু আমারই মুখ। আমি নিজেই দাঁড়িয়ে আছি নিজের মুখোমুখি। স্পষ্ট দেখলাম হলুদ বাবের আলোয়। আমি কিছু বললাম না। লাইট নিভিয়ে এসে শুয়ে পড়লাম। ছেলেটা ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল বলে মনে হল। ঠিক বলতে পারব না, কারণ আমি পেছন ফিরে দেখিনি। আমি ওকে বরাবরের মতোই সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলাম।

কিন্তু, তারপর থেকে আমি আর কোনোদিন সেটার মুখোমুখি হইনি। তার চলাফেরার আওয়াজ পেয়েছি, কিন্তু আমি উঠিনি বিছানা ছেড়ে। ইগনোর করেছি।

এইভাবেই কয়েক বছর চলল। তখন আমি অনেকটাই বড়ো। একরাতে আবার বাবা ঘুম ভেঙে দেখল যে, মা পাশে নেই। সেই রাতে কোনো এক কারণে আমিও উঠেছিলাম। বাবাকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেই আন্দাজ করলাম যে, মা আবার বেরিয়ে গেছে। বাবা আমায় দেখে কিছু না বলেই সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে লাগল। পিছু পিছু আমিও চলতে লাগলাম বাবার সঙ্গে। যথারীতি দেখলাম পেছনের দরজা খোলা। বাবা আলো জ্বালিয়ে দিল বাইরের। আমরা দু-জনেই বেরিয়ে এলাম। দেখলাম মা কুয়োর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঝুঁকে কুয়োর ভেতরে তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে। যদিও সেই দৃষ্টি স্বাভাবিক নয়। ঘোরলাগা অস্পষ্ট দৃষ্টি চোখের তারায়। বাবা মা-কে টেনে নিল,

— মধু। মধু। চলো। ওপরে চলো।

— বাবু।

— এই তো বাবু আমার সঙ্গে। ওই তো দাঁড়িয়ে।

— ওই যে। বাবু ডাকছে।

— কোথায় বাবু? বাবু এইখানে।

আমি কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা দেখছিলাম। মা-কে টেনে আনতে গিয়ে বাবার চোখ কুয়োর ভেতর পড়ল। আর, সঙ্গেসঙ্গেই দেখতে পেলাম বাবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। বাবাও কয়েক মুহূর্ত কুয়োর নীচের দিকে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রইল। আমার দিকে যখন মুখ ঘোরাল, তখন বাবার চোখে আমি একটাই অনুভূতি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলাম। ভয়! কুয়োর নীচে আমার বাবা কিছু একটা দেখতে পেয়েছে। আর, সেটা দেখেই বাবা প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। কিছু একটা এই মুহূর্তে আছে কুয়োর নীচে। বুঝতে পারছিলাম, আমি নীচে তাকালে এখনই দেখতে পাব সেটাকে। আমিও কৌতূহলী হয়ে সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। বাবা হঠাৎ কী দেখে এত ভয় পেল সেটা দেখতে। কিন্তু, বাবা আমায় সে-সুযোগ দিল না। মা-কে আর আমাকে দু-হাতে জাপটে ধরে, প্রায় টানতে টানতে ওপরে নিয়ে চলে এল। ঘরে ফিরে, আমায় সামনে দেখে মা কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার স্বাভাবিক হয়ে গেছিল। কিন্তু, তবুও সেই রাতে বাবা আমাকে নিজের ঘরে যেতে দিল না। আমায় মায়ের সঙ্গে শুতে বলল। নিজে সারারাত ঘরময় পায়চারি করে কাটাল। যতবার চোখ খুললাম, দেখলাম বাবা জেগে আছে। যেন একটা অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছে তার মনে।

পরের দিন স্কুল থেকে ফিরে দেখলাম বাবা লোক লাগিয়ে, একটা ঢালাই স্ল্যাব এনে কুয়োর মুখ ঢেকে দিয়েছে। বাবা আর কোনোদিন সেই কুয়োর কথা, বা, সেই রাতের কথা তোলেনি। আশ্চর্যভাবে এরপর থেকে মায়ের ঘুমের মধ্যে হাঁটাটাও বন্ধ হয়ে গেল। আমিও আর সেই অদ্ভুত ছেলেটার উপস্থিতি অনুভব করিনি এরপর থেকে।

৩.

ভদ্রলোক থামলেন। আমি প্রশ্ন করলাম,

— আপনি কখনো জিজ্ঞেস করেননি আপনার বাবাকে যে, সেই রাত্রে উনি কী দেখেছিলেন কুয়োর ভেতর?

— না। করিনি বহু বছর। তবে, কয়েক দিন আগেই করেছিলাম এই প্ৰশ্ন। করতে হয়েছে। কিন্তু, বাবা কোনো উত্তর দেয়নি।

–আর একটা কথা। ওই কুয়োর মুখ যে বন্ধ করে দিলেন তিনি। ওটা কি আপনারা ব্যবহার করতেন না?

— না। ওটা তো পরিত্যক্ত কুয়ো। বহু বছর আগে হয়তো ব্যবহার হত। কিন্তু, আমাদের সময়ে তো ট্যাপ ওয়াটার এসে গেল। তাই কুয়োর প্রয়োজন ছিল না আর। ওটা বরাবরই এমনি পড়ে ছিল।

–বেশ। কিন্তু, এত বছর পর হঠাৎ এই সমস্যা নিয়ে আবার আমার কাছে আসার নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে? আন্দাজ করতে পারি, আরও কিছু একটা ঘটেছে ইতিমধ্যে?

প্রমথেশবাবু এতক্ষণ ডান পায়ের ওপর বাঁ-পা চড়িয়ে বসে ছিলেন। এইবার বাঁ-পায়ের ওপর ডান পা দিয়ে বসলেন। বললেন,

— হ্যাঁ, প্রফেসর। আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন। কুয়োর মুখটা বন্ধ করার পর থেকে আমাদের জীবন খুব স্বাভাবিকভাবেই কেটেছে। আমি রানাঘাট থেকেই স্কুল শেষ করে, কলকাতার কলেজে ভরতি হলাম। পৈতৃক ব্যাবসার হাল ধরি কলেজের পরে। ততদিনে বিজনেস বেড়ে কলকাতায় মেন অফিস খোলা হয় এবং আমিও কলকাতাতেই থেকে যাই। তবে মা-বাবা কিছুতেই পুরোনো বাড়ি ছেড়ে এখানে আসেনি। ওই মাসে একবার করে দু-জন আসে। দু-তিনদিন কাটিয়ে চলে যায়। সেই কারণেই আমার আর ওই বাড়ি যাওয়া হয় না বহু বছর হল।

চলছিল ভালোই। কিন্তু সত্যি বলতে, আমি কোনোদিনই বোধ হয় ওই বাড়ি ছেড়ে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারিনি। মাঝে মাঝেই আমার পুরোনো বাড়ির কথা মনে পড়ত। রাতে স্বপ্ন দেখতাম।

— বাড়ির স্বপ্ন দেখতেন? নাকি, কুয়োর স্বপ্ন?

–আপনি আরও একবার সঠিক আন্দাজ করেছেন। বাড়ির না, আমি কুয়োটাই দেখতাম রাতে ঘুমের মধ্যে। মাঝে মাঝেই একটা অদ্ভুত স্বপ্ন হানা দেয় ঘুমের মধ্যে। আমি দেখি যে, আমি একটা অন্ধকার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। চারিদিকে স্যাঁৎসেঁতে শ্যাওলামাখা সবুজ দেয়াল। অন্ধকার কূপ, কিন্তু আমার একটুও দেখতে অসুবিধে হচ্ছে না। খুব স্বাভাবিক একটা হালকা সবজে আলোয় যেন সব দেখতে পাচ্ছি স্পষ্ট। মাথার ওপর তাকালে দেখতে পাই আলো। গোল একটা ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে সামান্য। বুঝতে পারি, আমি একটা কুয়োর নীচে দাঁড়িয়ে আছি। তখনই মনে হয় আমার পাশে কেউ একটা এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু, আমি সেদিকে তাকাই না। কারণ জানি না। কিন্তু, আমার সেদিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না। আমি চোখ বন্ধ করে নিই। আমার পাশে এসে যে দাঁড়িয়েছে, সে এইবার চলাফেরা করতে শুরু করে। আমার পায়ের নীচে জলে তার চলাফেরার শব্দ শুনতে থাকি। আমি অনুভব করতে পারি সে চাইছে, তীব্রভাবে চাইছে, যেন আমি তার দিকে তাকাই। কিন্তু, আমি তাকাই না। চোখ বন্ধ করে রাখি। সে আমায় ছুঁতে পারে না। আশ্চর্যভাবে, এত কিছুর মধ্যেও আমার যেন মনে হয় এই সত্তাটা আমায় ছুঁতে ভয় পাচ্ছে। সে আমাকে ভয় পায়।

ব্যস। এই অবধিই দেখি স্বপ্নটা। এরপরেই ঘুম ভেঙে যায় আমার। প্রতিবার এই একটাই দৃশ্য আমি দেখি। এখনও মাঝে মাঝেই রাতে আমি এই স্বপ্ন দেখি। আবারও বলছি ওই কুয়োয় পড়ে যাওয়া নিয়ে কিন্তু আমার কোনো স্মৃতি বা ভয় নেই। তবুও এই স্বপ্ন আমি দেখি।

একটু থেমে তিনি আবার বললেন,

— এইবার আপনার কাছে আসার কারণটা বলি। রিসেন্টলি, মানে এই কয়েক সপ্তাহ আগে হঠাৎই একরাতে ঘুম ভেঙে যায়। এবং, আমি একটা তীব্র টান অনুভব করি আমার পুরোনো বাড়ির প্রতি। বা, বলা যায়, স্পেসিফিকালি ওই পুরোনো কুয়োটার প্রতি। আমার মনে হয় আমার একবার ফিরে যাওয়া উচিত। এরপর থেকে সেই অনুভূতি চেপে বসল আমার ওপর। এতদিন যে বাড়িতে যাইনি, হঠাৎই বার বার মনে হতে লাগল যে, সেখানে ফিরে যাই। তাই আগের সপ্তাহে আমি বাবা-মাকে কিছু না জানিয়েই বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম। বাবা মোটেই আমায় দেখে খুশি হল না বুঝতে পারলাম। কিন্তু, মুখে কিছু বলল না।

–আরও একবার আপনাকে বাধা দিচ্ছি। আচ্ছা, এত বছরে আপনার বাবা- মা কখনো আপনাকে বাড়িতে আসতে বলেনি? পুজোর ছুটি বা অন্য সময়ে?

— মা বলেছে, কিন্তু বাবা বলেনি। ইন ফ্যাক্ট, বাবাই আমাকে কলকাতা পাঠিয়ে দিয়েছিল পড়তে। মায়ের আমার জন্যে মন কেমন করলে, বা, আমার বাবা-মাকে দেখতে ইচ্ছে করলে বাবা, মা চলে আসত কলকাতায় আমার ফ্ল্যাটে। কেন জানি মনে হত বাবা আমাকে ওই বাড়ি থেকে দূরে রাখতে চায়।

–বেশ। তারপর?

–হ্যাঁ, যা বলছিলাম। তো, গত সপ্তাহে ওই কারণেই আমি বাবাকে না জানিয়েই হঠাৎ বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম। চমকটা লাগল যখন বাড়ির পেছনে গিয়ে দেখলাম কুয়োর ওপরের ভারী ঢাকনিটা ভেঙে পড়েছে। মা-কে প্রশ্ন করে জানলাম, তিনদিন আগে রাতে হঠাৎ কুয়োর পাশের নারকেল গাছে বাজ পড়ে। গাছটা ভেঙে পড়ার সময় ওই কুয়োর ওপর এসে পড়ে। তাতে ওপরের ঢাকা স্ল্যাবের একাংশ ভেঙে পড়ে। আশ্চর্যের ব্যাপার, যে রাতে এই ঢাকনিটা ভেঙে পড়ে, ঠিক সেই রাত থেকেই অদ্ভুতভাবে আমার ঘুম ভেঙে প্রথমবার আমি এখানে ফিরে আসার আকর্ষণটা অনুভব করতে শুরু করেছিলাম। সেটা মনে আছে, কারণ পরের দিন সকালে শুনেছিলাম রানাঘাটে বিশাল ঝড় হয়েছে। এদিকেও হয়েছিল ঝড়-বৃষ্টি, কিন্তু ততটা নয়।

যাই হোক। বাড়ি ফিরলাম যে রাতে, সেই রাতেই এত বছর পর মায়ের সঙ্গে আবার আগের ঘটনা ঘটল। মানে, সেই রাতেই মা আবার স্লিপ ওয়াক করল। রাতে আমারও ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম বাবা ঘর থেকে বেরোচ্ছে মা-কে খুঁজতে। বাবার আগেই আমি দৌড়োলাম নীচে। বাবা বারণ করা সত্ত্বেও আমি গেলাম মা-কে ফিরিয়ে আনতে। বাবার যেহেতু বয়স হয়েছে, তাই বাবা আমার সঙ্গে পারল না। আমিই আগে আগে বেরিয়ে এলাম বাইরে। ঠিক সেই কত বছর আগের রাতেরই যেন পুনরাবৃত্তি। গিয়ে দেখলাম মা কুয়োর ধারে দাঁড়িয়ে নীচের দিকে চেয়ে কারুর সঙ্গে কথা বলে চলেছে বিড়বিড় করে। আমি গিয়ে বার কয়েক ‘মা’ বলে ডাকতে, মা আমার দিকে ফিরে তাকায়। চোখের ঘোলাটে দৃষ্টিতে এইবার বিস্ময় ফুটে ওঠে। মা বিড়বিড় করে, কেমন যেন ঘোরের মধ্যেই আমায় প্রশ্ন করল,

— বাবু, তুই কখন উঠলি?

ভাবলাম, মা ঘুম থেকে ওঠার কথা বলেছে। তাই উত্তর দিলাম,

— এই তো একটু আগে। ঘুম ভেঙে গেল। তুমি এখানে কেন এলে মা?

— না, না। তুই ওপরে কখন উঠে এলি?

—কী বলছ, মা? কোথায় উঠব?

–তুই তো নীচে ছিলি।

— কই নীচে ছিলাম? আমি তো ওপরের ঘরে ঘুমোই।

— কিন্তু… কিন্তু এখানে? তবে ওটা কে?

মা কুয়োর নীচের দিকে ফিরে তাকাল। আমার মন বলছিল যে, মায়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে আমার কুয়োর ভেতরে তাকানো উচিত নয়! নীচে তাকানোটা ভুল হবে। এমন কিছু দেখব যা আমি দেখতে চাই না। কিন্তু, একটা অদ্ভুত কৌতূহল আর আকর্ষণ আমায় পেয়ে বসেছিল। না তাকানোর তীব্র সতর্কতা এবং ততোধিক তীব্র তাকানোর আকর্ষণের যুদ্ধে জয়ী হল কৌতূহল। আমি কুয়োর ভেতর উঁকি দিলাম।

দুটো জ্বলন্ত চোখের দৃষ্টি চেয়ে আছে আমার দিকে। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম, কুয়োর দেওয়াল বেয়ে যেটা উঠে আসার চেষ্টা করছে সেটা… সেটা আর কেউ না, আমি! আমি! আমারই মতো দেখতে ওটা চেয়ে আছে আমার দিকে। ছোটো বয়সের আমি নই। এই এখনকার আমি। একই চেহারা, একই পোশাক। শুধু তার শরীর ভিজে আছে জলে। চুল আর সারাশরীর থেকে গড়িয়ে পড়ছে জল। তার চোখে দুঃখ, রাগ, হতাশাভরা দৃষ্টি। জীবনে এই প্রথমবার আমার ভয় করল!

আমি আর তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। বড়োজোর কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে ছিলাম সেদিকে। ততক্ষণে বাবা এসে গেছে। তারপরেই আমি কুয়ো থেকে চোখ ফিরিয়ে নিই। বাবা আমাকে টেনে সরিয়ে দিল। আমি আর বাবা মিলে মা-কে ধরাধরি করে নিয়ে ফিরে আসি ঘরে।

একটু বিরতি নিয়ে, নিজের বক্তব্য শেষ করার ভঙ্গিতে বললেন,

–এরপরেই আমি ঠিক করি যে, এই বিষয়টা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। কুয়োর রহস্যটার সমাধান হওয়া দরকার।

–আপনার কথা থেকে মনে হল আপনার বাবা কিছু একটা জানেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করেননি?

–না, করিনি। কারণ, আমি জানি তিনি বলবেন না। তিনি কিছু একটা চাপা দিতে চাইছেন। আর, সেই কারণেই আপনার কাছে আসা।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রমথেশবাবু বললেন,

— একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়, জানেন। আমার কেন জানি না মনে হয়, আমি কিছু একটা ভুলে যাচ্ছি পুরো ব্যাপারটায়। সেটা যে কী, তা কিছুতেই মনে করতে পারি না। কিছু একটা বাদ যাচ্ছে, বা, কিছু একটা ভুলে গেছি। কিন্তু, একটা ব্যাপার এত বছরে আমার কাছে পরিষ্কার, যে, এই কুয়োটা আমায় স্বস্তি দেবে না। আবার ওর মুখ ঢেকে দিলে হয়তো সেটার একটা ক্ষণস্থায়ী সমাধান হবে। কিন্তু, আমি পার্মানেন্ট সলিউশন চাই। এই রহস্যের মূল খুঁজে পেতে চাই আমি, প্রফেসর আপনার নাম অনেক শুনেছি। আপনার লেখা পড়েছি। আমার মনে হয়েছে গোটা বিষয়টা নিয়ে একটা যুক্তিযুক্ত, নিউট্রাল অ্যাঙ্গল থেকে ভাবনাচিন্তা হওয়া দরকার। তাই আপনার সাহায্য চাইতে এসেছি। আশা করি, আমায় নিরাশ করবেন না।

আমি এতক্ষণ ডুবে ছিলাম এই কাহিনির মধ্যে। অদ্ভুত কাহিনি। অদ্ভুত ঘটনা। বললাম,

— খুব ইন্টারেস্টিং! আপনার পৈতৃক বাড়ি গেলে কি সেই কুয়ো দেখা যায়?

— অবশ্যই। আপনি আসবেন, প্রফেসর? আপনি নিজে এলে তো খুবই ভালো হয়। আপনি কয়েক দিন এসে থাকুন না। আমিও থাকব না-হয় কয়েক দিন রানাঘাটে।

— বেশ তো। আমি ইউনিভার্সিটির কাজ গুছিয়ে নিতে পারলে এই সামনের উইকএন্ডে চেষ্টা করতে পারি। আপনি ফ্রি থাকবেন?

–আপনি যেদিনই সময় দেবেন আমি ফাঁকা করে নেব কাজকর্ম। এটাই তো নিজের ব্যাবসার সুবিধা।

–খুব ভালো। তবে, আমি আপনাকে ফোন করে জানাব। আপনি যে নম্বরে আসার আগে ফোন করেছিলেন তাতেই পাব তো আপনাকে?

— হ্যাঁ। ওটাই। থ্যাঙ্কু, প্রফেসর ব্যানার্জি। আজ তাহলে আমি উঠি। আপনার অনেকটা সময় নিলাম।

প্রমথেশবাবু বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। দরজার কাছে থামালাম,

— প্রমথেশবাবু।

— বলুন?

— আপনি কি শ্যাওলার সোঁদা গন্ধ পাচ্ছেন?

–গন্ধ? কই? না তো।

–আচ্ছা। ধন্যবাদ।

৪.

পরের উইকএন্ডে যাওয়া হল না। আমি ফাঁকাই ছিলাম, কিন্তু প্রমথেশবাবু ফোন করে জানালেন ওঁর কাজ পড়ে গেছে। তার পরের সপ্তাহতেও তাঁর হল না। কিন্তু, আমার মনে কৌতূহল বেড়েই চলেছিল।

আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে, প্রমথেশ রায়চৌধুরী নিজেই ইচ্ছে করে দেরি করছেন। নিজের মনে এক ধরনের দ্বন্দ্ব লড়ছেন মনে হয়। মানে, তিনি রহস্যের সমাধান চাইছেন সত্যিই। কিন্তু, তাঁরই মনের গভীরে কিছু একটা সেই কাজে তাঁকে বাধাও দিচ্ছে তাঁর অজান্তেই। এর কারণটা আমি ধরতে পারছি না এখনই।

ভদ্রলোক তাঁর অতীত ও বর্তমানের যে কাহিনি শুনিয়ে গেছেন, তাতেও অদ্ভুত কয়েকটা বিষয় আছে। না, ওইসব দৃশ্য দেখাটা অস্বাভাবিক নয়। ওইসব দেখার অনেক কারণ থাকতে পারে। হয়তো পুরোটাই মনের গভীরে অসুখ, বা, হয়তো এর কোনো অতিপ্রাকৃত কারণ আছে। থাকতেই পারে। কিন্তু, খটকাটা আমার অন্য জায়গায় লাগছে। গোটা গল্পের মধ্যে অদ্ভুত ব্যাপারটা হল, ভয়! প্রমথেশবাবু ছোটো থেকেই যেসব ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন তাতে তাঁর ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু, তিনি ভয় পাননি। তাঁর আচরণ থেকেছে স্বাভাবিক। আশ্চর্যরকমের নির্লিপ্ত ও নিশ্চিন্ত থেকেছেন সেই ছোটো থেকেই। এটারও কারণ ধরতে পারছি না। আমার মন বলছে খুব ইন্টারেস্টিং কিছু ব্যাপার আছে এই ঘটনাটায়। খতিয়ে দেখতেই হচ্ছে।

তাই ফোন তুলে কনট্যাক্ট লিস্ট থেকে ওঁর নাম্বার বের করে আরও একবার নিজে থেকেই ফোন করলাম ভদ্রলোককে। এইবার আর না বলার সুযোগ দিলাম না। কিছুটা জোর দিয়েই বললাম যাওয়ার কথাটা। তাতে লাভ হল। ঠিক করা হল যে, আগামী উইকএন্ডেই রানাঘাট যাওয়া হবে।

কথামতো শুক্রবার সন্ধেবেলা আমরা গাড়ি নিয়ে রওনা হলাম রানাঘাটের উদ্দেশে। প্রমথেশবাবুর নিজের গাড়ি। ড্রাইভার চালাচ্ছে আর আমরা পেছনের সিটে বসে। আমি শ্যাওলার গন্ধ পাচ্ছি আবার। জানলা নামিয়ে দিয়েও মৃদু গন্ধ আসছে। আমি মাইন্ড ডিসট্র্যাকট করতে জিজ্ঞেস করলাম,

— এই কয়েক দিনের মধ্যে কি আর কিছু ঘটেছে?

— ঘটেছে বলতে, মা আগের সপ্তাহে আরও একবার রাতে ঘোরের মধ্যে হেঁটে বেরিয়ে গেছে বাড়ির পেছনে। সেই একই ব্যাপার। আর, আমি ওই স্বপ্নটা আরও একবার দেখেছি এর মাঝখানে।

–সেই স্বপ্ন যে, আপনি কুয়োর নীচে রয়েছেন?

— হ্যাঁ।

–আচ্ছা।

বাবা বলছিল কুয়োর মুখ আবার ঢেকে দেবে। আমি বারণ করেছি। বলেছি যে, আগে আপনি দেখবেন, তারপর ওইসব করা যাবে’খন।

–ভালো করেছেন।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভদ্রলোক গলা খাদে নামিয়ে, কিন্তু খানিকটা উদ্‌গ্রীব ভঙ্গিতে প্রশ্ন বললেন,

–একটা প্রশ্ন করতে পারি আপনাকে?

–বলুন।

আপনার কি মনে হয়, যে, পুরো ব্যাপারটাই আমার মস্তিষ্কের বিকার? বিশ্বাস করুন, আমি নিজেই বহুবার ভেবেছি যে, সম্ভবত আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।

আমি এরকমই একটা প্রশ্ন আসবে বলে আশা করেছিলাম। তাই উত্তরে বললাম,

— দেখুন, গোটা ব্যাপারটা সাইকোলজিকাল হতেই পারে। কিন্তু, সেক্ষেত্রেও একটা ব্যাখ্যা থাকতেই হবে। যদি ধরে নিই পুরোটাই আপনার মস্তিষ্কের সৃষ্টি এক ধরনের বিভ্রম, তবে প্রশ্ন আসে যে বাড়ির তিনজন বাসিন্দা কীভাবে হ্যালুসিনেট করছে? আর, তা ছাড়াও আমার ধারণা ব্যাপারটা পুরোটা প্রাকৃতিক নয়।

–এরকম মনে হওয়ার কারণ?

–আমি আপনাকে ঠিক বোঝাতে পারব না। সহজ কথায় আমার মধ্যে একধরনের অনুভূতি কাজ করে। সিক্সথ সেন্স বলতে পারেন। এবং, আমার সেই অনুভূতি আমায় বলছে যে, বিষয়টা খতিয়ে দেখা উচিত। ঠিক সেই কারণেই আমি আপনার সঙ্গে আপনাদের পৈতৃক বাড়িতে যেতে রাজি হয়েছি, প্রমথেশবাবু।

–ওহ্।

–ইন এনি কেস, ইট’স টু আর্লি টু সে। কয়েকটা পয়েন্ট খতিয়ে না দেখা অবধি কোনো ধারণা করাটা ঠিক হবে না। আচ্ছা প্রমথেশবাবু, আপনি তো বললেন আপনার স্মৃতি শুধুমাত্র ওই পাঁচ বছর বয়স থেকেই আছে। তার আগের কোনো স্মৃতি আপনার নেই? তাই না?

–হ্যাঁ। আমার স্মৃতি ওই কুয়ো থেকে উদ্ধার হওয়ার পর থেকেই আছে। তার আগের কোনো মেমারি আমার নেই। শুধু কুয়োর ঘটনার নয়, কোনো স্মৃতিই নেই। পুরো ব্ল্যাঙ্ক স্লেট।

— আপনার একদম প্রথম স্মৃতি কী?

— আমায় ধরাধরি করে এনে বিছানায় বসানো হল। আমার গা এখনও ভেজা। কীভাবে ভিজেছে, তা জানি না। মনে করতে পারলাম না।

–কখনো মনে করার চেষ্টা করেননি এর আগের স্মৃতি?

— উম… না। প্রয়োজন বোধ করিনি তেমন।

— ওকে।

— আচ্ছা, প্রফেসর। আপনার হঠাৎ এই বিষয়ে ইন্টারেস্ট কেন?

–এ বিষয়ে বলতে কি আপনি অকাল্ট বা অলৌকিক বলতে চাইছেন?

— হ্যাঁ।

লম্বা কাহিনি। তবে, ছোটো থেকেই টের পেতাম আমার মধ্যে কিছু একটা আলাদা রয়েছে। এমন বহু কিছু মাঝে মাঝে প্রত্যক্ষ করতাম যা বুঝতে পারতাম শুধু আমিই দেখতে পাচ্ছি। ভয় পেতাম মাঝে মাঝে কিছু দেখে। কিন্তু, সেই কথাগুলো অন্যদের বলতাম না। পাছে কেউ যদি আমায় পাগল ভাবে। কিন্তু, এরপর কালক্রমে এমন কিছু ঘটনার সম্মুখীন হই যা আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখানের রেখাটা অনেকটা মিলিয়ে দিয়েছিল। আমি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম যে, আমাদের জানা এই জড় জগতের বাইরেও বহু কিছু আছে। ওয়েল। দ্যাট’স আ স্টোরি ফর সাম আদার টাইম। আপাতত সামনে বেশ টানা পথ। ওই যে একটা ছোট্ট দোকান দেখা যাচ্ছে। আসুন, দেখি একটু কফি পাওয়া যায় কি না।

৫.

মরচে ধরা লোহার বড়ো গেটটা খুলে যখন পুরোনো বাড়িটায় গাড়ি ঢুকছে, হাতঘড়ির রেডিয়াম ডায়ালে দেখলাম প্রায় রাত দশটা বাজছে। মানে, প্রায় তিন ঘণ্টা লাগল। বাড়িটা বেশ বড়ো, তবে পুরোনো হলেও মেরামত করে রাখা হয়েছে। পুরোনো আমলের গ্রিলের ডিজাইন আর জানলার পাল্লায় খড়খড়ি থেকেই বোঝা যায় বাড়ির বয়স কম নয়।

বাড়ির ভেতর ঢুকতেই প্রথমে একজন বয়স্ক মানুষের মুখোমুখি হলাম। প্রমথেশবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন,

–আলাপ করিয়ে দিই। এই আমার বাবা শ্রীনারায়ণ রায়চৌধুরী। আর বাবা, এই হলেন ড. অতীন্দ্র ব্যানার্জি। যাঁর কথা বলেছিলাম তোমায়।

ভদ্রলোক আমার দিকে মোটেই প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকালেন না। ভদ্রতা করে সাধারণ একটা-দুটো কথা বলে তিনি চলে গেলেন। আমি আসায় তিনি যে খুশি হননি, তা বেশ বোঝা যায়। তারপর পরিচয় হল প্রমথেশবাবুর মা, নির্মলা দেবীর সঙ্গে। মহিলা যে আমায় দেখে তাঁর স্বামীর মতো ক্ষুণ্ন হয়েছেন তা মনে হল না। বরং, তিনি অতিথি পেয়ে বেশ খুশিই হয়েছেন বলে মনে হল। বেশ যত্ন করে তিনি আমাদের বসিয়ে খাওয়ালেন রাতে। নীচের তলায় একটা ঘর আগে থেকেই সাজিয়ে রাখা ছিল আমার জন্যে। ডিনার শেষে আমি সেখানেই ঢুকে পড়লাম। অন্তত দু-দিন থাকার মতো জিনিস সঙ্গে নিয়েই এসেছি।

পরের দিন সকালে ওঠার তাড়া না থাকলে, কিছুটা রাত অবধি জেগে ব‍ই পড়া বা কাজ করাটা আমার সেই কলেজ-জীবনের অভ্যাস। এখানেও একটা বই পড়ছিলাম রাতে শুয়ে শুয়ে। বইটার নাম ‘ডেভিল ইন পিনস্টাইপস’, লেখক রবি সুব্রমনিয়ন। বেশ টান টান কর্পোরেট থ্রিলার। বইয়ের মধ্যেই ডুবে ছিলাম। কিন্তু, মনোযোগ ভঙ্গ হল হঠাৎ। মনে হল, দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতর শুধু বেডসাইড লাইটের আলো। কিন্তু, বাইরে ডিমলাইট আছে। দরজার নীচে তাকিয়ে মনে হল বাইরের দিকে, দরজার সামনেই কেউ চলাফেরা করছে। দরজার নীচের আলো-ছায়া যেন নড়ছে।

আমি বইয়ের পাতায় বুকমার্ক ঢুকিয়ে সেটা বন্ধ করলাম। তারপর খাট থেকে নেমে দরজা খুললাম। আর সঙ্গেসঙ্গেই সমস্ত আলো একসঙ্গে নিভে গেল। পকেটে মোবাইল নিয়েই বেরিয়েছি। তাতে ফ্ল্যাশলাইট অন করলাম। আলো ঘোরাতে লাগলাম ফাঁকা উঠোন জুড়ে। আমার দরজার বাইরে জল পড়ে আছে কিছুটা। আর, সেখান থেকে একজোড়া পায়ের ছাপ এগিয়ে গেছে। পায়ের ছাপ বরাবর আলো ফেললাম। আশ্চর্য! পায়ের ছাপ মাঝপথে শেষ হয়ে গেছে। যেখানে ছাপ শেষ হয়েছে, তার আশেপাশে কোনো দেওয়াল, বা, লুকিয়ে থাকার জায়গা নেই। অথচ, এখানেই মিলিয়ে গেছে ছাপগুলো। যেন হাঁটতে থাকা মানুষটা মাঝপথে গায়েব হয়েছে বা মাটি ছেড়ে শূন্যে চলতে শুরু করেছে এখান থেকে। পায়ের ছাপ দেখে মনে হয় কোনো বাচ্চার।

আশেপাশে আলো ঘোরাতে খেয়াল করলাম যে, আমার সামনে, উলটোদিকে বারান্দায় একজন দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক মোবাইলের আলো যতটা অবধি গিয়ে শেষ হয়েছে, সেই আলোর বৃত্তের বাইরে একটি বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু তার পা জোড়া দেখতে পাচ্ছি। বাকি শরীর অবধি আলো পৌঁছোতে পারছে না। আমি বারান্দা ঘুরে যখন সেই জায়গায় পৌঁছোলাম, তখন সেই ছায়ামূর্তিটি আর সেখানে নেই। তবে, মেঝেতে জল পড়ে আছে কিছুটা। জলের দাগ একটা দরজার কাছে গিয়ে শেষ হয়েছে। কিন্তু, দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজাটা বাড়ির পেছনদিকে খোলে। আন্দাজ করতে পারি, এটাই বাড়ির পেছনে কুয়োর কাছে যাওয়ার দরজা।

আমি নিজের ঘরে ফিরে এলাম। এখন একবার কুয়োটা দেখতে পেলে ভালো হত। কিন্তু, উপায় নেই। অন্যের বাড়িতে কাউকে না বলে একা একা বাড়িময় ঘুরে বেড়ানোটা অভদ্রতা। এখন রাত দুটোরও বেশি হয়ে গেছে। এখন কাউকে ডেকে তুলে দরজা খুলতে বলাটা বেয়াদপি হবে। বই আর খুললাম না। শুয়ে পড়লাম।

কিন্তু, এত রাতেও ঘুম এল না। কয়েকটা হিসেব মিলছে না। এই অন্ধকূপ থেকে উঠে আসা মূর্তিটিকে দেখতে প্রমথেশবাবুর মতোই কেন? তাঁর মা বার বার কীসের টানে সেখানে ফিরে যায়? আর, আজ আমায় দেখা দেওয়ার কারণ কী? কিছু কি বলতে চান তিনি?

৬.

কাল রাতে কিছু শুনেছেন নাকি?

প্রশ্নটা আমি করলাম প্রমথেশবাবুকে। সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসেছি আমরা দু-জন। তিনি উত্তর দিলেন,

–শুনেছি মানে… উম… একবার মনে হয়েছে যেন দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে। আমি উঠিনি। কেন বলুন তো? আপনি কিছু দেখেছেন নাকি?

–হ্যাঁ। তবে, কী দেখেছি সেটাই প্রশ্ন। আচ্ছা প্রমথেশবাবু, আপনি কি পাঁচ বছর বয়সে কুয়োতে পড়ার সময়ে মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন?

–না। কোনো চোট, আঘাত লাগেনি।

— বেশ। মাথায় চোট পেয়ে থাকলে আপনার স্মৃতিলোপের বিষয়টার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যেত।

— না, প্রফেসর। সেইরকম কিছু হয়নি। ওহ্… আপনি তো কুয়োটা দেখেননি। চলুন, খাওয়ার পর আপনাকে ওটা একবার দেখিয়ে আনি।

রাতে ঠিকই আন্দাজ করেছিলাম। গতকাল রাতে যে দরজার সামনে গিয়ে জলের দাগ শেষ হয়েছিল, সেটা খুলেই আমরা বাড়ির পেছনদিকের জমিতে বেরোলাম। দরজা থেকে খানিকটা দূরেই কুয়োটা। বেশ পুরোনো কুয়ো। এই দেখেই বোঝা যায় এই বাড়িটার চেয়েও প্রাচীন কুয়োটা। এ ধরনের ইটের গাঁথনি আজকাল আর হয় না। সম্ভবত বহুযুগ আগে জলের প্রয়োজনে এই জমিতে কুয়ো খোঁড়া হয়েছিল। পরে জমি কিনে বাড়ি-টাড়ি হয়েছে। কুয়োটার একদিক ভেঙে গেছে। মুখটা অর্ধেক ঢাকা। বাকিটা কুয়োর ভাঙা অংশের সঙ্গেই ভেঙে গেছে। উঁকি দিলাম নীচে। কালো জল চোখে পড়ল। আর কিছুই না। আর একটা পরিচিত গন্ধ পেলাম। সোঁদা, শ্যাওলার গন্ধ, যা প্রমথেশবাবুর থেকেও আসে আমি জানি এই গন্ধটা শুধু আমিই পাচ্ছি প্রথমদিন থেকে। কী মানে এই গন্ধের? কেন এই কুয়োর গন্ধ লেগে আছে প্রমথেশ রায়চৌধুরীর শরীরে? যেন কুয়োয় পড়ে যাওয়ার পর থেকেই এই গন্ধটা তাঁর সঙ্গে জুড়ে গেছে। আশ্চর্য!

তবে, কুয়োটায় কিছু একটা আছে। এটা আমার অনুভূতি। কিন্তু, সেটা অশুভ কি না… বলতে পারছি না। কেমন যেন মনটা ভারী হয়ে যায় এটার সামনে দাঁড়িয়ে।

কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পর বললাম,

— চলুন, এবার যাই। আপনার মা, বাবাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই।

— হ্যাঁ। চলুন।

সবে ঘুরে দু-পা এগিয়েছি। তখনই পেছনে একটা ‘ঝুপ’ শব্দ হল। কুয়োর জলে ভারী কিছু আচমকা পড়েছে বা কেউ ঝাঁপ দিয়েছে। দ্রুত ঘুরলাম, এগিয়ে গেলাম কুয়োর দিকে। কিন্তু, কিছু দেখতে পেলাম না। শুধু অনেকটা নীচে জলের ওপর আবর্ত দৃশ্যমান। এই পরিষ্কার দিনের আলোতেও কয়েক মুহূর্তের জন্যে ভয়ে আমার ঘাড়ের চুল দাঁড়িয়ে গেছে বুঝলাম। দু-জনেই একে অন্যের মুখের দিকে চাইলাম। কিন্তু, কী বস্তু একমুহূর্তের মধ্যেই আমাদের দৃষ্টি ঘুরতেই নীচে পড়ল, তার উত্তর আমাদের কারুর কাছেই নেই। ফিরে এলাম বাড়িতে। ফেরার সময়ে কেন জানি না মনে হতে লাগল কুয়ো থেকে কেউ একটা উঁকি দিয়ে আমাদের চলে যাওয়া দেখছে। কিন্তু, আমি জানি, পেছন ফিরে কিছুই দেখতে পাব না। তাই আর ফিরলাম না। বাড়িতে ঢুকে দরজা বন্ধ করার সময়ে আবারও সেই একই ‘ঝুপ’ শব্দ কানে এল। শব্দটা আমরা দু-জনেই শুনেছি। কিন্তু, কিছুই বললাম না আমরা।

বাড়িতে ঢুকে দেখলাম সামনের দিকে, বাইরে বারান্দায় বসে আছেন প্রমথেশবাবুর মা নির্মলা দেবী। আমি এগিয়ে গিয়ে তাঁর সামনের বেতের চেয়ারে বসলাম। মহিলা আমায় দেখে হাসিমুখে বললেন,

— তা, বাবা। কাল ঘুম হয়েছে?

–হ্যাঁ, মাসিমা। হয়েছে।

— ঠিক করে খেয়েছ তো সকালে?

–হ্যাঁ, খেয়েছি। লুচি, আলুরদম এমনিতেই আমার প্রিয়।

–হ্যাঁ। প্রমথেশেরও খুব প্রিয়।

–মাসিমা, আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করার ছিল।

–বেশ তো। বলো।

— আমায় সেদিনের ঘটনা বলতে পারেন। মানে, প্রমথেশবাবুর পাঁচ বছর বয়সে ঘটা দুর্ঘটনাটা। যতদূর শুনেছি, আপনিই তো প্রথম এসেছিলেন ডাক শুনে?

–হ্যাঁ। আমি সামনের বাগানে মালীর কাজ দেখা-শোনা করছিলাম। সেইসময়ে ডাক শুনি বাবুর। বাবু বিপদে পড়ে আমায় ডাকছে মনে হল। মালী দু-জনকে প্রশ্ন করলাম যে, তারা কিছু শুনেছে কি না। কিন্তু, ওরা জানাল যে, ওরা কিছুই শোনেনি। কিন্তু, আমি যেন স্পষ্টই শুনেছি ওর ডাক। আমি ছুটলাম বাড়ির পেছনের দিকে। আমার মন বলছিল যে, ডাকটা কুয়ো থেকেই আসছে।

আমি কুয়োর মুখ থেকে নীচে দেখলাম। মনটা কু গেয়েছিল। কিছু একটা অঘটন ঘটেছে আশঙ্কায় আমার…। কুয়োর নীচে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেলাম না প্রথমে। জল শান্ত। কিন্তু, কিছুক্ষণ বাদেই জল নড়ে উঠল। যেন নীচ থেকে কেউ উঠে আসছে। দেখলাম বাবুর মাথাটা উঠে এল জলের ওপরে! বাবু ভেসে উঠল, ওপরদিকে চাইল। ওকে দেখেই আমি চিৎকার করে উঠি। ততক্ষণে মালীরা এসে গেছিল। তারাই তাড়াতাড়ি দড়ি জোগাড় করে আনে। একজন নেমে গিয়ে তুলে আনে বাবুকে।

— তুলে আনার পর বলেছিল যে, কীভাবে কুয়োতে পড়েছে?

— না। এরপর প্রায় একমাস একটাও কথা বলেনি ও। আমাকে আর ওর বাবাকেও কয়েক দিন চিনতে পারেনি। প্রথম কয়েক দিন খাবারও খেতে পারছিল না। ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক হয়েছিল বাবু।

— ‘শক’ থেকে এরকম হয়ে থাকে অনেক সময়ে। যাই হোক। ধন্যবাদ। প্রমথেশবাবু এতক্ষণ আমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে কথোপকথন শুনছিলেন। আমি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে বললাম,

— আপনার বাবা…

–বাবা সকালে মর্নিং ওয়াকে গেছে। এখনও ফেরেনি।

–বেশ। আচ্ছা, সেইদিন যে দু-জন মালী আপনাকে উদ্ধার করেছিল, তাঁরা কি আছেন এখনও? যদিও সে-সম্ভাবনা খুবই কম।

উত্তরটা নির্মলা দেবী দিলেন,

–গঙ্গা এখানে নেই। অনেক বছর আগেই চলে গিয়েছে কোথাও। খবর রাখি না। তবে বাবুকে যে তুলে এনেছিল, সেই বিমল এখনও আছে।

এটা একটা সুখবর বটে। নির্মলা দেবীর কথার কিছু অসংগতি আছে। সেটা একবার ভেরিফাই করে নেওয়া যেতে পারে এই লোকটার থেকে। তাই উৎসাহী কণ্ঠে বললাম,

— বাহ্! গুড়, গুড়! তার সঙ্গে কথা বলা যায়?

–আজ তো আসার কথা নয়। তবে, ফোন করে দেব। দুপুরে একবারটি আসবে না-হয়। এখান থেকে বাড়ি খুব দূরে নয় তার। কাছেই থাকে।

— খুব ভালো হয় তবে। আজকেই একবার আসতে বলবেন তাকে। সেইসময়েই লোহার বড়ো গেটটা খোলার আওয়াজ হল। দেখলাম নারায়ণবাবু ঢুকছেন। ভাবলাম এই সুযোগে তাঁকেও কিছু প্রশ্ন করব। কিন্তু, তিনি আমায় সে-সুযোগ দিলেন না। আমায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই ওঁর মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। গটগট করে হেঁটে, বারান্দায় না থেমেই, বাড়িতে ঢুকে যাচ্ছিলেন। আমি ডাক দিলাম,

–মেসোমশাই!

ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে বিরক্তিমিশ্রিত ভঙ্গিতে বললেন,

— দেখুন। আমার মাথাটা ধরেছে। শরীরটা ভালো নেই। আমি রেস্ট নিতে যাচ্ছি। এই বলেই তিনি ঘরে ঢুকে গেলেন। আমায় আর কিছু বলার সুযোগই দিলেন না। সিঁড়ি দিয়ে ওঁর ওপরে উঠে যাওয়ার এবং দরজায় খিল দেওয়ার আওয়াজ পেলাম।

প্রমথেশবাবু আমায় একপাশে সরিয়ে নিয়ে, লজ্জিতভাবে বললেন,

— প্রফেসর, প্লিজ আপনি কিছু মনে করবেন না বাবার আচরণে। বাবার এই বিষয়টা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার ব্যাপারে প্রথম থেকেই আপত্তি ছিল। আমি যখন বললাম যে, আপনার কাছে যাব, বাবা তাতেও আপত্তি করেছিল। সেই কারণেই বাবা এরকম করছে।

— কিন্তু, এর কারণ কী? আপনার কী মনে হয়?

–সম্ভবত উনি ভয় পাচ্ছেন যে, এইসব কথা লোক জানাজানি হয়ে গেলে হয়তো মা-কে লোকে পাগল ঠাওরাবে। মনে হয়, সেটা নিয়েই বাবা দ্বিধাবোধ করছেন।

নিজের বলেই বললাম,

— ভয় তো বটেই। উনি এই বিষয়টা নিয়ে ভয় পাচ্ছেন। তবে, সেটা কি শুধুই এই কারণে?

আমি কাল রাতে একটা কথা ভাবছিলাম। কথাটা প্রমথেশবাবুকে বলা ঠিক হবে কি না ভাবছি। তাতে প্রমথেশবাবু আমার প্রস্তাবে রাজি হবেন কি না সেটাও আমি জানি না। তবু এই সুযোগে বলেই ফেললাম,

— আচ্ছা প্রমথেশবাবু, আপনি এই রহস্যের সমাধান করতে কতটা উৎসাহী? একটু অবাক হয়ে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন,

— হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?

— যদি সত্যিই আপনার উৎসাহ থেকে থাকে, তবে আমার একটা প্রস্তাব আছে। আপনি আর আমি একবার ওই কুয়োতে নামব।

কিছুক্ষণ বিস্মিত হয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকলেন প্রমথেশ রায়চৌধুরী। বললেন, — আপনি… আপনি ওতে নামতে চান?

— চাই। আপনাকে নিয়েই নামতে চাই। ওই কুয়োর নীচটা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আর, তাতে আরও একটা লাভ হলেও হতে পারে।

— কী লাভ?

হতে পারে যে, ওখানে আবার নামলে আপনার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ফিরে আসবে। আমার ধারণা এই রহস্যের সমাধানের সূত্র লুকিয়ে আছে আপনার সেই পাঁচ বছরের স্মৃতিতে।

কিছুক্ষণ ভাবলেন প্রমথেশবাবু। তাঁর মনে যে একটা দোটানা চলেছে বেশ আন্দাজ করতে পারি। তিনি একদিকে এই রহস্যের সমাধান দেখতে চাইছেন। আবার, অন্যদিকে তাঁর মনের গভীর থেকে তাঁর সাবকনশাসনেস তাঁকে বাধা দিচ্ছে। তাঁকে বারণ করছে আমার কথায় সায় দিতে। কিছু একটা মনের গভীরে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি তাঁকে আটকাতে চাইছে সেটা মনে করা থেকে।

শেষপর্যন্ত তিনি উত্তর দিলেন,

— বেশ। আমি ব্যবস্থা করছি নামার। আজই নামতে চান?

–না। কাল। আজ আমার একটু অন্য কাজ আছে। আচ্ছা প্রমথেশবাবু, আপনার জন্ম তো এখানেই হয়েছিল বললেন। তাই না?

— আজ্ঞে, হ্যাঁ।

— কোন হাসপাতালে জানতে পারি?

–হ্যাঁ। সদর হাসপাতালে। কেন বলুন তো?

–সদর হাসপাতাল এখান থেকে কতদূর? এখন বেরোলে দুপুরের আগে কি আমি ঘুরে আসতে পারব? কারণ, দুপুরে তো বিমল আসবে। তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। লাঞ্চের আগে একবার ঘুরে আসা যায়?

— হ্যাঁ। তা পারবেন। কিন্তু…

— আপনার ড্রাইভারকে তবে একবার বলে দিন গাড়ি বের করতে।

–বেশ। কিন্তু, সেখানে কী কারণে যেতে চাইছেন, প্রফেসর?

— কিছু না। জাস্ট একটা সন্দেহ হচ্ছে। সেটা চেক করে দেখতে চাই।

৭.

দুপুরের দিকে ফিরে এলাম হাসপাতাল থেকে। যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল একটা থিয়োরি পরীক্ষা করে দেখা। প্রমথেশবাবুর নিজের হুবহু প্রতিরূপকে বার বার দেখা এবং ওঁর মায়ের আচরণ থেকে আমার মনে একটা সন্দেহ দেখা দিয়েছিল। এমন নয় তো যে, নির্মলা দেবীর যমজ সন্তান হয়েছিল? একজন সন্তান মারা যায় ওই কুয়োয় পড়ে। এবং, সম্ভবত প্রমথেশবাবুই ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিলেন তাঁর যমজ ভাইকে। এবং, সেই স্মৃতি প্রমথেশবাবুর মস্তিষ্ক থেকে লোপ পায় ভাইয়ের মৃত্যুর পর। শুনেছি মানুষের মস্তিষ্ক সেইসব স্মৃতি ভুলে যেতে চায় যা কষ্ট বা ভয় সৃষ্টি করে। আমার একটা ধারণা হয়েছিল যে, প্রমথেশবাবুর ক্ষেত্রেও এরকমই কিছু একটা হয়েছে। তিনি আসলে কুয়োতে পড়েননি, তাতে পড়েছিল এবং মারা গেছিল তাঁর যমজ ভাই। সেই কারণেই প্রমথেশবাবুর শরীরে কোনো চোট, আঘাত ছিল না। এই স্মৃতি পুনরুদ্ধার হলে প্রমথেশবাবু গভীর আঘাত পাবেন। তিনি জানবেন তিনি ভ্রাতৃহন্তা। তাই বোধ হয় তাঁর বাবা এই বিষয়টা গোপন রাখতে তৎপর।

কথায় বলে, don’t let any stones unturned. যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই। সেই ভেবেই হাসপাতালের পুরোনো রেকর্ডস চেক করতে গিয়েছিলাম। প্রমথেশবাবুর জন্মদিনটা কালকেই কথায় কথায় ওঁর মা জানিয়েছিলেন। অতএব, একটু নিজের পরিচিত সোর্স কাজে লাগিয়ে এবং সামান্য দক্ষিণা দিয়ে, সহজেই হাসপাতালের একজন কর্মীর সাহায্যে পাওয়া গেল চল্লিশ বছরের পুরোনো বার্থ রেকর্ডস।

আর, সেটা দেখেই বোকা বনে গেলাম। সেখানে পরিষ্কার লেখা আছে, সেইদিন এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন নির্মলা রায়চৌধুরী। নিজের ওপর নিজেরই হাসি পেল। এরকম গল্প সাধারণত সিনেমায় হয়ে থাকে। ওই থ্রিলার বই বা কোরিয়ান সিনেমায়।

আর সময় নষ্ট না করে গাড়িতে এসে ড্রাইভারকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বললাম। বসে একটু লজিকালি ভাবতেই বুঝলাম যে, এই ‘যমজ ভাই” থিয়োরি ধোপে টেঁকে না। হিসেবমতো এই ভাইটি থেকে থাকলে, সে অন্তত পাঁচ বছর অবধি জীবিত ছিলই। সেক্ষেত্রে প্রতিবেশী ও আত্মীয়রা তার কথা জানবে। সেটা মোটেই এত সহজে প্রমথেশবাবুর থেকে গোপন রাখতে পারতেন না নারায়ণবাবু ও তাঁর স্ত্রী। অনুমানটা না মেলায়, একটু হতাশ যে হইনি, তা বললে মিথ্যে হবে। কিন্তু, তার থেকেও বেশি নিজেকে বোকা বলে মনে হতে লাগল। বেকার কয়েকশো টাকা গচ্ছা গেল।

দুপুরে রায়চৌধুরীদের বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখলাম বাগানে একজন বৃদ্ধ মালী কাজ করছে। ফুলগাছে জল দিচ্ছে। ড্রাইভার গাড়ি ঢোকাচ্ছে, সেই সুযোগে আমি তার দিকে এগিয়ে গেলাম,

–আপনার নাম বিমল?

–আজ্ঞে হ্যাঁ, সাহেব। আপনিই আমারে ডাকছেন বুঝি?

–হ্যাঁ। আপনাকে ছুটির দিন ডেকে আনার জন্যে ক্ষমা চাইছি। আসলে, কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই।

— ছি ছি, কর্তা। আমার কাছে ক্ষমা চান আপনে? আমি মুখ্য মানুষ। আপনে বড়ো মাস্টারমশাই। দাদাবাবু বলেছে আমায়। কন না। কন কী জানতি চান?

–আপনার দাদাবাবু ছোটোবেলায় একবার পড়ে গিয়েছিল বাড়ির পেছনের কুয়োতে। সেদিনের কথা মনে পড়ে?

–পরিষ্কার মনে আসে। মনে হয় যেন এই সেদিনের ঘটনা।

— বাহ্। আপনার স্মৃতিশক্তি তো বেশ ভালো বলতে হয়। তো, সেদিন আপনি দাদাবাবুর চিৎকার শুনে কুয়োর কাছে ছুটে গেছিলেন? তাই তো?

— না, না। আমি তো কিসু শুনতেই পাইনি। ও বউদিমণি হঠাৎ বলে, ‘বাবু ডাকচে। শুনতে পাচ্ছ?’ আমি আর গঙ্গা তো কিসু শুনতে পাইনি। আমরা আবার উলটে বললাম যে, আপনে ভুল শুনেছেন নিশ্চয়, বউদিমণি। কিন্তু, বউদিমণি দৌড়ালে বাড়ির পেছনে। আসলে মায়ের মন তো। বাছার বিপদ ঠিক টের পায়। আমরাও তার দেখাদেখি তার পিছু নিলাম।

— তারপর?

–ততক্ষণে বউদিমণি পৌঁছে গেছে কুয়াপাড়ে। তিনি চিৎকার করে আমাদের ডাকেন। আমি উঁকি দিয়ে দেখি, আমাদের দাদাবাবু নীচে পড়ে রয়েছে। একটা ইটের ধার ধরে ভেসে আছে। ওপরে আমাদের দিকে চেয়ে আছে। আমি আর গঙ্গা তাড়াতাড়ি দড়ি জোগাড় করি। আমার কোমরে কষে বেঁধে দেয় গঙ্গা। আর অন্য মুড়ো গাছের সাথে বেঁধে দিল। আমি কুয়ায় নেমে গেলাম ইটের খাঁজে খাঁজে পা রেখে। নারকেল-খেজুর গাছে ওঠা-নামার অভ্যাস ছিল এককালে। তাই নামতে পারলাম। তারপর দাদাবাবুকে তুলে আনলাম।

–বাহ্। খুব ভালো। আচ্ছা, একবার মনে করে বলুন তো, কুয়োতে নামার পর, কিছু ঘটেছিল?

— কী ঘটবে, সাহেব?

–অদ্ভুত কিছু। কিছু হয়েছিল বা কিছু দেখেছিলেন কি যা একটু অদ্ভুত লাগে আপনার?

একটু ভেবে বিমল বলল :

–না, সাহেব। কিছু দেখি নাই। আর, দেখবই-বা কী? কুয়ার নীচে আলো পুরা ঢোকে না। অন্ধকার। খানিক ভয় ভয় লাগচিল বটে। কিন্তু, কিছু তো দেখি নাই। তবে…

— তবে?

–আপনে বলায় মনে পড়ল। একটা আজব ব্যাপার হয়েছিল বটে।

–কী ব্যাপার?

–দাদাবাবুর শরীরটা সাংঘাতিক ভারী হয়ে ছিল প্রথমে। কিছুতেই তুলতে পারছিলাম না গায়ের জোর লাগিয়েও। যেন কয়েক মণি ওজনের পাথর একেবারে। কিন্তু, কিছুক্ষণ বাদেই যেন তার ওজন কমে যেতে শুরু করে। তখন আবার সহজেই তুলতে পারলাম। একদম হালকা। একটু বেশিই হালকা। যেন ওজনই নেই। অনেক ভেবেও এই ব্যাপারটার কূলকিনারা পাইনি সেসময়ে। ব্যাপারটা ভুলেই মেরেছিলাম, আজ আপনি জিজ্ঞেস করায় মনে পড়ল।

অদ্ভুত ব্যাপার তো। মনে মনে ভাবলাম। পকেট থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট তার হাতে দিয়ে বললাম,

–আপনাকে অকারণ ছুটির দিন ডেকে এনেছি। তাই এইটা দিয়ে আপনি মিষ্টি খাবেন।

বুড়ো হাসিমুখে নোটটা মাথায় ঠেকিয়ে ফতুয়ার পকেটে ভরল।

আমি ঘরে ঢুকতে দেখলাম লাঞ্চের আয়োজন হয়েই গেছে। প্রমথেশবাবু আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। ওঁর দেরি করিয়ে দেওয়ার জন্যে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে, হাত ধুয়ে খেতে বসলাম। ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন,

–আপনি কোথায় গেছিলেন বলুন তো, প্রফেসর?

–সদর হাসপাতালে। একজন পরিচিত ডাক্তার এখানে আছে। তার সঙ্গে দেখা করতে।

–ও।

আমার সাদা মিথ্যেটা প্রমথেশবাবু বিশ্বাস করলেন কি না বুঝলাম না। তবে, তিনি এই নিয়ে আর কথা বাড়ালেন না। আমিও খেয়ে তাঁর থেকে বিদায় নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা দিলাম। ভাবতে হবে আমায়। গভীরে ভাবতে হবে।

৮.

রাতের খাওয়ার সময় আজও নারায়ণবাবু আমাদের সঙ্গে খেলেন না। বুঝতে পারছি তিনি আমায় এড়িয়ে যাচ্ছেন। টেবিলেই প্রমথেশবাবু জানালেন কালকে কুয়োয় নামার ব্যবস্থা হয়ে গেছে। তবে, ব্যাপারটা যেন মা আর বাবাকে না জানাই। সকালে যখন ওঁর বাবা মর্নিংওয়াকে যাবেন, সেই সুযোগেই আমরা নামব।

কিন্তু, আমার নারায়ণবাবুর সঙ্গে কথা বলা দরকার। তাঁর কীসের ভয় সেটা জানতে হবে। তাই এইবার আমি সোজাসুজি নারায়ণবাবুর দোতলার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। ইচ্ছে করে একা এলাম। প্রমথেশবাবুকে আসতে বারণ করলাম সঙ্গে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম ভদ্রলোক ঘরে বসে বাংলা সিরিয়াল দেখছেন টিভিতে।

— আসতে পারি?

দরজার দিকে তাকাতেই তাঁর মুখে বিরক্তি আর আশঙ্কার একটা কালো মেঘ যেন নেমে এল। তবুও ভদ্রতার খাতিরে বললেন, আসুন।

আমি ঘরে ঢুকে তাঁর মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসলাম। নারায়ণবাবু আবার টিভির দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। আমি বললাম, নারায়ণবাবু, আপনাকে আমি একটাই প্রশ্ন করতে চাই।

— দেখুন মিস্টার…

— অতীন্দ্র ব্যানার্জি।

— হ্যাঁ, মিস্টার ব্যানার্জি, দেখুন আমি মনে করি, অকারণ একটা ফালতু ব্যাপার নিয়ে আমার ছেলে জলঘোলা করছে। কত বছর আগের একটা অ্যাক্সিডেন্ট নিয়ে হঠাৎ করে প্রমথেশ আবার কেন মেতে উঠল জানি না। আপনিই-বা কী করতে চান, আমার জানা নেই। কিন্তু, ব্যাপারটা আমার পছন্দ হচ্ছে না।

— নারায়ণবাবু, আপনার আশঙ্কার জায়গাটা বুঝতে পারছি।

এইবার কিছুটা গলা কাঁপল ভদ্রলোকের।

–আশঙ্কা? কীসের আশঙ্কা? আপনি কিছুই বুঝতে পারছেন না, মিস্টার ব্যানার্জি। তাই অবান্তর কথা বলবেন না।

— আমার একটাই প্রশ্ন আছে আপনাকে। করতে পারি?

কিছুক্ষণ তাঁর উত্তরের আশায় থেকেও তিনি হ্যাঁ বা না কিছুই বললেন না দেখে আমি বললাম,

–আপনি কোনদিন সত্যিটা জানতে পেরেছিলেন? যেদিন কুয়োর ভেতর তাকিয়ে ওকে দেখতে পেয়েছিলেন, সেইদিনই?

ভদ্রলোক কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু থমথমে মুখে বসে রইলেন। আমি আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালাম।

.

রাতে বিছানায় শুয়ে ল্যাপটপে একটা সিনেমা দেখতে বসলাম। কিছুদূর দেখেই শেষটা আন্দাজ করতে পেরে বন্ধ করে দিলাম। ভালো লাগল না আর দেখতে। কোনো রহস্যের শেষ জানা হয়ে গেলেই সেটার প্রতি ইন্টারেস্ট শেষ হয়ে যায়। কিন্তু, বাস্তবে রহস্যের শেষ আন্দাজ করতে পারলেও কি মাঝপথে ছাড়া যায়? আমি আজ সারাদিন ভেবেছি। মনে হয়, ঘটনার একটা ব্যাখ্যা আছে আমার কাছে। কিন্তু, সেটাকে ঠিক ব্যাখ্যা বলা যায় না। কারণ, ব্যাখ্যাটা প্রায় অসম্ভব এবং অবিশ্বাস্য। এটা মেনে নিতে আমার নিজের যুক্তিবাদী মনই কিছুটা বিদ্ৰোহ করছে। কিন্তু, অতীতের বহু অভিজ্ঞতা থেকে আমি এটা বুঝেছি যে, আমাদের জানা বাস্তবটাই সম্পূর্ণ সত্য নয়। এর বাইরেও বহু কিছু আছে। কিন্তু, একমাত্র এই হাইপোথিসিসেই সমস্ত ঘটনার একটা ব্যাখ্যা করা যায়। সত্যি বলতে, আমার আর ওই কুয়োতে নামার কোনো প্রয়োজন দেখি না। কারণ, আমি জানি কী আছে ওটার ভেতর। তবু নামতে হবে। অন্তত, প্রমথেশকে নামতেই হবে।

কুয়ো ভারি মজার জিনিস। গভীর কুয়োর ভেতর তাকালে প্রায় প্রতিটা মানুষেরই মনে একধরনের অদ্ভুত অনুভূতি দেখা দেয়। কেন? সেটা কি মানুষকে তার সবচেয়ে প্রথম স্মৃতি মনে করায়? জন্ম জঠরের স্মৃতি? নতুন সৃষ্টির স্মৃতি? আবার অনেকের মনে ভয় জন্ম নেয়। সেটা অনেকটা বদ্ধ জায়গার ফোবিয়া আর গভীর জলের ফোবিয়া মিলেমিশে হয়। বদ্ধ জায়গার ভয়কে বলে ক্লস্ট্রোফোবিয়া আর গভীর জলের ভয়কে বলে থ্যালাস্সোফোবিয়া। আচ্ছা, কুয়োর ভয়কে কি কোনো আলাদা ফোবিয়া বলে? মনে পড়ছে না।

কুয়ো দেখলেই আমার মনে হয় তার নীচে একটা সিংহ বসে আছে। কেন জানেন? আমায় ছোটোবেলায় দাদু পঞ্চতন্ত্রের একটা গল্প বলত। সেই খরগোশটার গল্প যে কুয়োয় পড়ে গেছিল। আর বেরোনোর কোনো উপায় ছিল না। হঠাৎ একটা সিংহ ওপর থেকে উঁকি দেয়। খরগোশ তাকে বোকা বানিয়ে কুয়োতে ঝাঁপ দিতে বলে। সিংহ ঝাঁপ দিতেই তার ওপর লাফিয়ে খরগোশটা উঠে আসে। না, না… গল্পটা বোধ হয় এরকম ছিল না। গল্পটা অন্য কিছু ছিল। কিন্তু… হঠাৎ এই গল্প কেন মনে হল?

এলোমেলো চিন্তাগুলো ঘুমের প্রাকমুহূর্তে আসে। এইসব ভাবনার মধ্যেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। দেখলাম আমি একটা অন্ধকার জায়গায় আছি। অনেক ওপরে চাঁদের মতো সাদা কিছু একটা। কিন্তু, ওটা কি চাঁদ? চাঁদে তো কলঙ্ক থাকে। ওতে নেই। একটা কান্নার শব্দ পেলাম। অন্ধকার, তবু দেখতে পাচ্ছি। একটা ছেলে বসে আছে। হাঁটু মুড়িয়ে, মাথা হেঁট করে। এ-ই কি কাঁদছে? আমি এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে ডান হাত রাখলাম। ছেলেটার জামাটা ভেজা। আর বড্ড ঠান্ডা। খুব ঠান্ডা। ছেলেটা মাথা তুলল। দেখলাম মাথার একদিক থেকে রক্ত পড়ছে। মাথার একদিক থেঁতলে আছে! ছেলেটার সারামুখে শ্যাওলা ধরে সবুজ! কী ভয়ংকর সে-মুখ!

ঘুমটা ভেঙে গেল। উঠে বসলাম বিছানায়। কোথায় আছি মনে করতে একটু সময় লাগল। তারপর আবার শুয়ে পড়লাম। শুতে গিয়েই খেয়াল করলাম আমার ডান হাতটা ভেজা…।

৯.

কুয়োর মধ্যে একটা মই ফেলা হয়েছে। শক্ত করে বাঁধা দড়ি দিয়ে, যাতে ফসকে না যায়। আপাতত কুয়োর সামনে শুধু আমি আর প্রমথেশবাবু দাঁড়িয়ে আছি। টি-শার্ট পরেছি দু-জনেই। হাতের ঘড়িটা খুলে মাটিতে রাখতে রাখতে দেখলাম সকাল ৭টা বাজছে। প্রমথেশবাবুর মুখ দেখে মনে হচ্ছে তিনি প্রচণ্ড দোলাচলে আছেন। বোধ হয় নামার কথাটা পুনর্বিবেচনা করছেন। আমি তাঁকে বললাম,

–প্রমথেশবাবু।

–বলুন।

–আপনি নিজেই আমার কাছে এসেছিলেন। আমায় সত্যিটা খুঁজতে বলেছিলেন। আমি শুধু তাই করেছি।

তাঁকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আমি মই বেয়ে প্রথমে নামতে শুরু করলাম। আমার কাঁধে রয়েছে একটা বড়ো, খালি ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ। আমার পেছনে নামতে শুরু করলেন প্রমথেশবাবু। যতই নামছি, ততই আলো কমে আসছে। আমার মনে হচ্ছে যেন অন্য কোনো জগতে প্রবেশ করছি ধীরে ধীরে। মইয়ের শেষ ধাপ পেরিয়ে নীচে নেমে দাঁড়ালাম। বেশ অনেকটা চওড়া কুয়োটা, তা আগেই বলেছি। হাঁটু অবধি এখনও জল আছে কুয়োর নীচে। একটা ছোটো টর্চ নিয়ে নেমেছিলাম। সেটা জ্বালিয়ে চারপাশের গোলাকার দেওয়ালটায় ফেললাম। উগ্র, সোঁদা গন্ধ আসছে শ্যাওলার। জায়গাটা চিনতে পারলাম। এই জায়গাটা আমি আগেও দেখেছি, গতকাল রাতেই। স্বপ্নে

প্রমথেশবাবুও নেমে দাঁড়িয়েছেন এতক্ষণে। তিনিও একটা টর্চ জ্বেলে আশপাশ দেখছেন। তিনি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেটা দেখে। আমি অনেক আগেই দেখেছি ওগুলো।

শ্যাওলা মাখা সারা দেওয়াল জুড়ে অজস্র আঁচড়ের দাগ। যেন কেউ বা কিছু একটা বার বার উঠে আসার চেষ্টা করেছে। ব্যর্থ হয়ে রাগে দেওয়ালে বৃথা আঁচড় কেটেছে। এই দাগগুলো একটাও নতুন নয়। সব পুরোনো। কিছু কিছু দাগ দেখে তো মনে হয় প্রায় এক শতাব্দী পুরোনো। বেশ কিছু দাগের ওপরে শ্যাওলার পরত পড়েছে।

প্রমথেশবাবু কাঁপতে কাঁপতে একটা দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁকে দেখে মনে হল ওঁর মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। তাঁর মুখ কুঁচকে গেছে। আমি তাঁকে কিছু বললাম না। আমি মেঝের জলে আলো ফেলে হাঁটতে লাগলাম। আশ্চর্য! কুয়োটা এত গভীর? এত বড়ো ছিল কি ওপরে? মনে তো হয় না। টর্চের আলো এক দেওয়াল থেকে ফেললে অন্য দেওয়াল অবধি পৌঁছোচ্ছে না। ওপরের কুয়োর মুখটা ছোটো লাগছে। যেন বহু দূর জগতের স্থির দাঁড়িয়ে থাকা চাঁদ। আমি অনুভব করতে পারছি, কুয়োটা স্বাভাবিক নয়। এটা আমাদের পরিচিত জগৎ নয়। এটা অন্য কিছু। অপার্থিব কিছু।

পায়ের কাছে শক্ত কিছু একটা পড়ে আছে টের পেলাম। দাঁতের ফাঁকে টর্চ কামড়ে ধরে, ঝুঁকে পড়ে দু-হাতে সেটাকে তুলে আনলাম। একটা কঙ্কাল! বেশ কয়েক বছরের পুরোনো। কঙ্কালটার আকার দেখেই বোঝা যায় কোনো বাচ্চার। খুলির একদিকটা ফাটা। আমি এটা খুঁজতেই এসেছিলাম। জানতাম এটা এখানে থাকবে। এটা কার কঙ্কাল তাও আমার জানা আছে। তবুও কঙ্কালটার বাঁ- পায়ের পাতার ওপর আলো ফেললাম। দেখতে পেলাম সেখানে ছ-টা আঙুলের হাড় রয়েছে।

প্রমথেশবাবু এখনও মাথা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। পুরোনো স্মৃতি, বহু যুগ, বহু শতাব্দীর স্মৃতি একসঙ্গে ভিড় করছে তাঁর মনে। তাঁর সব মনে পড়ে যাচ্ছে। চিনতে পারছেন নিজেকে। মনে পড়ছে, তিনি আসলে কে। তাঁর মুখে তীব্র যন্ত্রণার অভিব্যক্তি। ভাষা ভুলে যাচ্ছেন বোধ হয়, কথা বলতেও ভুলে যাচ্ছেন। বিড়বিড় করে জড়িয়ে জড়িয়ে, অনেক কষ্টে শুধু বলতে পারলেন,

–আমার… দোষ… ছিল… না। পড়ার… সময়েই দেয়ালে… ধাক্কা… লেগে… মাথা…. ফেটে…।

তিনি আর কথা বলতে পারলেন না। বসে পড়লেন জলের মধ্যে। অদ্ভুতভাবে দেখলাম জলের ওপর ভাসতে থাকা শ্যাওলা তাঁর শরীর বেয়ে উঠতে শুরু করেছে। তারা ওঁকে চিনতে পেরেছে।

আমি বললাম,

— আমি এবার ওপরে যাব, প্রমথেশবাবু।

কঙ্কালটা ব্যাগে ভরে নিলাম যত্ন করে। তারপর আর একবারও প্রমথেশবাবুর দিকে না তাকিয়ে উঠতে শুরু করলাম মই বেয়ে। উঠতে উঠতে একবার ভাবলাম পেছন ফিরে চাই। কিন্তু, পরক্ষণেই মত পালটালাম। কী দরকার? তাঁর স্বরূপ হয়তো পার্থিব এই চোখে দেখার মতো নয়। কিছু রহস্য থেকে যাক। লেখক হুমায়ুন আহমেদের একটা কথা মনে পড়ল, ‘প্রকৃতি রহস্য পছন্দ করে।’ তাই সব উত্তর জানতে নেই।

সব উত্তর জানতে চাইলে এই জগৎ রুষ্ট হয়।

কুয়ো থেকে ওপরে উঠে আসতেই দেখলাম নারায়ণবাবু দাঁড়িয়ে আছেন। প্রচণ্ড রাগী দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে আছেন। ব্যাগ খুলে কঙ্কালটা বের করে আনলাম। কঙ্কালটার দিকে চোখ পড়তে কিছু বলতে পারলেন না। আশ্চর্য! ওঁর তো এত তাড়াতাড়ি ফেরার কথা নয় প্রাতঃভ্ৰমণ থেকে। হাতঘড়িটা তুলে পরার সময়ে চমকে গেলাম। ঘড়িতে দেখলাম ১১.১৩ বাজছে। মানে, আমি প্রায় চার ঘণ্টা কুয়োর নীচে ছিলাম? অথচ, আমি নিশ্চিত যে ওঠা-নামা সবমিলিয়েও কুড়ি থেকে ত্রিশ মিনিটের বেশি সময় আমার লাগেনি। অর্থাৎ, একটু আগে যেখানে ছিলাম সেখানকার স্পেস- টাইম আমাদের নিয়মে চলে না।

আমি কঙ্কালটা নামিয়ে রাখলাম মাটিতে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম দাঁড়িয়ে। প্রমথেশবাবু উঠে এলেন না। নারায়ণবাবু কেমন যেন বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি দুর্বলভাবে আমায় জিজ্ঞেস করলেন,

–বাবু? বাবু কোথায়? প্রমথেশ কোথায়?

আমি একবার কঙ্কালটার দিকে চাইলাম, তারপর কুয়োর দিকে। নারায়ণবাবু ঠিক কার কথা জানতে চাইছেন ভেবে পেলাম না। শুধু বললাম,

–নারায়ণবাবু, সেদিন রাতে আপনি কুয়োর নীচে কী দেখেছিলেন তা কি এইবার বলবেন?

ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। দেখলাম তাঁর চোখের কোনা চিকচিক করছে। বললেন,

— না!

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,

–বেশ। আমি ফিরে যাচ্ছি। এখানে আমার কাজ শেষ হয়েছে। আপনাদের সাজানো সংসার নষ্ট করার ইচ্ছে আমার ছিল না। কিন্তু, এর মধ্যে একটা নিষ্পাপ আত্মা যে বারংবার মুক্তির আশায় এসেছে, তাকে আমি অগ্রাহ্য করি কীভাবে? কত বছর ধরে সে নিজের কথা বলতে চেয়েছে। কেউ শোনেনি। আপনি শুনেও শোনেননি। এইবার অন্তত ছেলেটার সৎকারের ব্যবস্থা করুন। ওকে শান্তি দিন।

ভদ্রলোক বসে পড়ে কঙ্কালটা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। পাগলের মতো কাঁদতে লাগলেন। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছরের চাপাকান্না আজ বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এল একসঙ্গে।

আমি কুয়োর ধার থেকে সোজা নিজের ঘরে এলাম। ভিজে জামাকাপড় বদলালাম। ব্যাগটা আগেই গুছিয়ে রেখেছিলাম। সেটা তুলে বেরিয়ে এলাম বাড়ির সামনের দরজা দিয়ে। দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে উঠে বসলাম। ড্রাইভারকে আগেই রেডি থাকতে বলা ছিল। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ড্রাইভার কলকাতার পথ ধরল।

১০.

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম রাস্তায়। ঘুম ভাঙল হর্নের শব্দে। বাইরে তাকিয়ে বুঝলাম আর আধঘণ্টায় কলকাতা ঢুকব।

গাড়িতে বসে বসে ভাবতে শুরু করলাম গোটা ব্যাপারটা।

পঁয়ত্রিশ বছর আগে এক দুপুরে নারায়ণ রায়চৌধুরী আর নির্মলা দেবীর একমাত্র সন্তান প্রমথেশ রায়চৌধুরীর মৃত্যু হয় বাড়ির পেছনের এক প্রাচীন কুয়োয় পড়ে গিয়ে। গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে রায়চৌধুরী পরিবারের মধ্যে কে বা কী তাঁদের ছেলের রূপ ধরে বসবাস করছিল, তা বলা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। আমি জানি না। তার সম্বন্ধে আমার শুধু একটা হাইপোথিসিস আছে।

পৃথিবীর সব মিথ ও উপকথায় জলনিবাসী উপদেবতা বা ‘ওয়াটার-স্পিরিট’- দের উল্লেখ খুঁজলেই পাওয়া যায়। জার্মান উপকথার ‘নিক্স’, গ্রিক পুরাণের ‘নাইয়াড’, জাপানিদের ‘কাপ্পা’ বা আমাদের ভারতীয় ‘পানি মুড়া’ বা ‘বাক’। যদিও কিছু ক্ষেত্রে এরা মৃতদের আত্মা আর কিছু ক্ষেত্রে অশুভ অপদেবতা। ইসলামে এক উপদেবতার উল্লেখ পাই, যার নাম— বিন্ন। এই ‘বিন্ন’-র উল্লেখ আবদুল্লাহ আল-শাহিদ মুহাম্মাদ হাবিব-এর লেখায় আছে। বলা হয়, এরা মানুষের সৃষ্টির আগে এই জগতে ছিল। যদিও এখন তারা বিলুপ্ত হয়েছে। এরা জলের উপদেবতা। এই উপদেবতারা যে সবসময় ক্ষতিকর, তা নয়। এরা মানুষের রূপ ধরতে পারে। মানুষের মধ্যেই এসে বসবাসও করতে সক্ষম।

পঁয়ত্রিশ বছর আগে একদিন কুয়োয় পড়ে যায় প্রমথেশ। সেটা নিছক দুর্ঘটনা নাকি কুয়োর মধ্যে থেকে কেউ তাকে ডেকেছিল, তা আমি বলতে পারব না। তবে, সেইদিন কুয়োয় পড়ার সময়েই, কুয়োর দেওয়ালে মাথায় চোট লেগে তার মৃত্যু হয়। সাহায্যের জন্যে ডাক দেওয়ার সময় পায়নি পাঁচ বছর বয়সি প্রমথেশ। তার মা নির্মলা দেবী ছাড়া আর কেউ তার ডাক শুনতে পায়নি। সেই ডাক সদ্যমৃত প্রমথেশের আত্মা ডেকেছিল নাকি সন্তানের বিপদে মায়ের মন জানান দিয়েছিল, তাও আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু, নির্মলা দেবীর কথায় আমি একটা অসংগতি পেয়েছিলাম। নির্মলা দেবী বলেছিলেন যে, ডাক শুনে কুয়োর কাছে গিয়ে প্রথমে কিন্তু দেখেছিলেন জল শান্ত। কেউ সদ্য পড়ে গিয়ে থাকলে জল শান্ত থাকার কথা নয়। তার মানে পড়ার ঘটনাটা হয়তো বেশ কিছুটা সময় আগে ঘটে গেছে। কিন্তু, তারপরেই প্রমথেশকে দেখা যায় জল থেকে মাথা তুলতে।

তাকে তুলতে নামে এক মালী। প্রথমে তুলতে গেলে মালী দেখে যে, ছেলেটার ওজন অস্বাভাবিক বেশি। ওপরে তুলতে পারছে না। কিন্তু, তারপরেই আশ্চর্যভাবে তার ওজন কমতে শুরু করে। শেষের দিকে তুলে আনার সময়ে তার ওজন অস্বাভাবিক রকমের কম হয়ে যায়। কোনো মানুষ বা কোনো প্রাণীর পক্ষে নিজের ইচ্ছেমতো ওজন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এখানেই আমার প্রথমবার মনে সন্দেহ জেগেছিল যে, কুয়ো থেকে সেদিন যাকে তুলে আনা হয়েছিল, সে প্রমথেশ নয়। তা ছাড়া, এত গভীর কুয়োয় পড়ে গিয়েও তার শরীরে কোনো চোট আঘাত লাগেনি, এটাও খুবই অস্বাভাবিক ব্যাপার।

আসল প্রমথেশের সেইদিনই মৃত্যু হয়েছিল। তার মৃতদেহ গত পঁয়ত্রিশ বছর পড়ে ছিল কুয়োর জলের নীচে। আর, তার রূপ ধরে যে উঠে এসেছিল সে অন্য কেউ। অন্য কিছু। সে কি প্রাচীন উপকথায় বর্ণিত কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা, নাকি, সম্পূর্ণ অন্য কিছু, তার উত্তর আমার কাছে নেই। ওই যে বললাম, সব উত্তর জানতে নেই। প্রকৃতি কিছু রহস্য লুকিয়ে রাখতে ভালোবাসে।

এই ঘটনার পর কয়েক মাস প্রমথেশ কোনো কথা বলেনি। বা, কাউকে চিনতেও পারেনি। সবাই ভাবল যে, দুর্ঘটনার ‘শক’। আসলে, সে কথা বলেনি কারণ, সে কথা বলতে জানত না। কাউকে চিনতে পারেনি কারণ, সে কাউকে চিনতই না। সেইসময়টা সে মানুষের জগতে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছিল। সে ধীরে ধীরে নিজের ইচ্ছেয়, নিজের আসল পরিচয় ভুলে গেল। সে শুধুই প্রমথেশের চেহারা হুবহু নকল করেছিল। কিন্তু, তার স্মৃতি বা আচার-আচরণের সঙ্গে সে পরিচিত ছিল না। তাই আগামী কয়েক মাসে সে ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে মিশে গেল। ভাষা শিখল, নিজের নতুন পরিচয় জানাল এবং একসময়ে সম্পূর্ণ সাধারণ মানুষ হয়ে গেল। নিজের সত্যিকারের পরিচয় তার নিজেরই আর মনেই থাকল না। সে থাকতে শুরু করল এই পৃথিবীতে এক মানবসন্তানের রূপে।

কিন্তু, পাঁচ বছর বয়সি প্রমথেশ? সে শান্তি পায়নি। তাই বার বার ফিরে আসত সে। ডাকত তার মা-কে। অভাগি মা তার মৃত সন্তানের ডাকও উপেক্ষা করতে পারত না, আবার বাড়িতে যে তাকে মা বলে আঁকড়ে ধরে থাকে, তাকেও নিজের সন্তান বলেই জানত। বাড়িতে থাকা প্রমথেশ কিন্তু সত্যিই নিজেকে নির্মলা দেবীর সন্তান ভাবত তার মায়ের মতোই। সেও হয়তো বহুযুগের না পাওয়া ভালোবাসার আশায়, নিজের জগৎ ছেড়ে উঠে এসেছিল এখানে, এই দম্পতির সন্তানের রূপে। এখানে কেউ কাউকে ঠকাচ্ছে না। কেউ কাউকে ধোঁকা দিচ্ছে না।

কিন্তু, অদ্ভুত এক দ্বিধায় পড়ল নির্মলা দেবীর মাতৃসত্তা। তিনি সাধারণ অবস্থায় তাঁর বাড়ির সন্তানকেই নিজের সন্তান বলে জানতেন। কিন্তু, অবচেতন মনে ডাক শুনতেন মৃত সন্তানের। তাঁর অবচেতন মন জানত যে, ওই কুয়োতেই আটকে রয়েছে তাঁর সন্তানের আত্মা।

এদিকে প্রমথেশরূপী যে বাড়িতে থাকতে শুরু করল, সে নিজের আসল পরিচয় ভুলে গেলেও, তার মনের অন্তরে সে জানত যে, সে শক্তিশালী। তাই বার বার মৃত ছেলেটিকে দেখেও সে ভয় পায়নি। বরং, ছেলেটির আত্মা তাকে ভয় পেত। ছেলেটি তার কিছু ক্ষতি করতে পারত না, করতে চায়ওনি। সে প্রতিশোধ চায়নি। সে চেয়েছে শান্তি, মুক্তি। সে শুধু বার বার চেয়েছে তার অস্তিত্বের কথা মনে করাতে। কারণ, সকলে তাকে ভুলে গেছে।

কয়েক বছর কাটল। মাঝে মাঝেই কুয়োর ভেতর থেকে তার ছেলের ডাক শুনে ঘোরের মধ্যে ছুটে যেতেন নির্মলা দেবী। তাঁকে ফিরিয়ে আনতে গিয়েই একবার নারায়ণবাবু রাতে কুয়োর মধ্যে কিছু একটা দেখতে পান। তিনি কী দেখেছিলেন, জানি না। সম্ভবত নিজের ছেলেকেই দেখেছিলেন এবং ভয় পেয়েছিলেন। কিন্তু, সেরাতে তিনি বুঝেছিলেন বা অনুমান করেছিলেন সত্যিটা। কিন্তু, মানুষের মন দুর্বল। যখনই পার্থিব জগতের পর্দা সরে গিয়ে সাধারণ মানুষের সামনে উঁকি দেয় অপার্থিব, তখন মন-প্রাণ দিয়ে তাকে অস্বীকার করতে চায় মানুষের মন। জোর করে পরিচিত বাস্তবকে আঁকড়ে ধরে সুরক্ষিত অনুভব করতে চায়। নারায়ণ রায়চৌধুরীও ঠিক তাই করলেন। তিনি ঠিক করেন যে, চোখের সামনের বাস্তবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানকেই আঁকড়ে ধরেন তিনি এবং সব জেনেও অতীতের মুখ চাপা দিয়ে দেন। ছেলেকে পাঠিয়ে দেন দূরে, যাতে ওই কুয়োর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়।

কিন্তু, এত বছর মানুষের মধ্যে থাকার পরেও, কোথাও যেন মানুষরূপী সত্তাটি কিন্তু বুঝতে পারত যে, কিছু একটা সে ভুলে গেছে। তার অন্তর জানান দিত যে, কোথাও কিছু একটা অস্বাভাবিক আছে। কিন্তু, পুরোটা কখনোই মনে করতে দিত না সে নিজেকে। এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব চলেছে সারাজীবন তার মনে।

কিন্তু দৈবাৎ, পঁয়ত্রিশ বছর পর সেই কুয়োর মুখ আবার খুলে যায় বজ্ৰপাতে। অতীত বেরিয়ে এসে মুখোমুখি দাঁড়ায় বর্তমানের। আর, প্রমথেশবাবু আসেন আমার কাছে। নিজের অজান্তেই তিনি আমায় সেই সত্যিটা খুঁজে বের করতে বলেন, যেটা তিনিই নিজে বহু বছর আগে লুকিয়েছেন। তিনি সম্পূর্ণ মানবে পরিণত হলেও, আমার অতিপ্রাকৃতকে চেনার অনুভূতির কাছে তিনি পুরোটা লুকিয়ে থাকতে পারেননি। কুয়োর নীচের শ্যাওলার গন্ধটা এত বছরে ফিকে হয়ে এলেও, পুরোটা লোপ পায়নি। সেই জলজ গন্ধ এখনও রয়ে গেছে তাঁর শরীরে।

ওঁর বাবা কখনোই চাননি যাতে আমি রহস্যের সমাধান করি। কারণ, তিনি জানতেন বা অন্তত সঠিকভাবেই সন্দেহ করেছিলেন গোটা বিষয়টা।

কিন্তু, আমি ওই বাড়িতে যেতে আমার মুখোমুখি হল আসল প্রমথেশের আত্মা। ছেলেটা আমাকে মরিয়া হয়ে জানানোর চেষ্টা করেছিল তার কথা। সে মুক্তি পায়নি পঁয়ত্রিশ বছর হল। তাকে ভুলে গেছে তার আপনজনরা। তাই আমাকে তো তাকে মুক্তি দিতেই হত।

আমার সঙ্গে এত বছর পর আবার কুয়োর ভেতর প্রবেশ করতেই এখনকার প্রমথেশের ভুলে যাওয়া স্মৃতি ফিরে আসে। তার সঙ্গে এই কুয়োর সম্পর্ক বহু প্রাচীন। আমার অনুমান্ সে অতি শক্তিশালী হলেও তার একটা সীমাবদ্ধতা আছে। সে ততক্ষণ তার অপার্থিব জগৎ ছেড়ে আমাদের পৃথিবীতে উঠে আসতে পারে না, যতক্ষণ না কেউ তাকে ডাকছে। কেউ আহ্বান করে তুলে না আনলে সে ওই কুয়ো ত্যাগ করতে পারে না। বহু শতাব্দী চেষ্টা করেও নিজে উঠে আসতে পারেনি। তাই তো কয়েক যুগ ধরে কুয়োর দেওয়ালে আঁচড়ের দাগ রয়ে গিয়েছে তার বিফল প্রচেষ্টার চিহ্ন হয়ে। উঠে আসতে তাকে সদ্যমৃত একটি বাচ্চার রূপ ধরতে হয়েছিল।

আমি তাকে আবার কুয়োর নীচে নিয়ে যেতেই তার যুগযুগান্তরের স্মৃতি ফিরে আসে। সে আমার সঙ্গে আর উঠে আসেনি। সে এখন কোথায়? কী হবে এবার রায়চৌধুরীদের, আমি জানি না।

কিন্তু, আমার ধারণা সে আবার উঠে আসবে। কারণ, তাকে আবার আহ্বান করা হবে। তার বাবা সব জেনেও তাকে আবার ডাকবে। তার মা নিজের অজান্তেই তাকে ডাকবে। সন্তানরূপে তাকে ফিরে পেতে চাইবে আবারও। সেও উঠে আসবে তাদের ডাকে সাড়া দিয়েই। তাদের সন্তান প্রমথেশ রায়চৌধুরী হয়েই থাকবে সে বাকি জীবন। কারণ, মায়া বড়ো বিষম বস্তু। এক অপার্থিব নিজেকে এই জগতের পার্থিব দুটো মানুষের সঙ্গে মায়ার টানে জড়িয়ে ফেলেছে। এই জগতের সবচেয়ে শক্তিশালী বন্ধন হল ভালোবাসা, যা উপেক্ষা করা খুব কঠিন।

.

Author’s Note:

আমি নিজে হুমায়ুন আহমেদের সৃষ্টি ‘মিসির আলি’-র ভক্ত। এই গল্পটা আমি আলাদা করে উৎসর্গ করতে চাই আমার অন্যতম প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ-কে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *