পেরেক – অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী

পেরেক

উপক্রম:

‘বাবা! ও বাবা! এই অদ্ভুত পেরেকটা কীসের গো?”

বড়ো পুরোনো বাড়িটার ভেতরদিকের কোনো একটা ঘর থেকে ময়নার প্রশ্নটা ভেসে এল বাইরের ড্রয়িং রুমে।

‘কী আবার পেল খুঁজে? মেয়েটা দিন দিন দুরন্ত হচ্ছে।’

নিউজপেপার থেকে চোখ না তুলেই কথাটা রায়বাবু বললেন স্ত্রী বন্দনা দেবীকে উদ্দেশ করে। বন্দনা দেবী তখন রায়বাবুর অফিস থেকে পাঠানো দু-জন হেল্পারকে দিয়ে ঘরের আসবাব সেট করাচ্ছিলেন। তিনি উত্তর দিলেন,

‘স্বাভাবিক। তোমার আদরেই তো দিন দিন বাঁদর হচ্ছে। ওই পেছনের ঘরগুলো পুরোনো, নোংরা। কবে, কোন দেয়াল ভেঙে পড়বে, ঠিক নেই। সাপখোপ, পোকামাকড়ের কথা ছেড়েই দিলাম। ওদিকে যেতে যত বারণ করি, ময়না সেই ওদিকেই যাবে। এত অবাধ্য!’

সত্যিই ময়না মেয়েটা বড্ড দস্যি হয়েছে। মনে মনে ভাবলেন রায়বাবু। তবে, এই কোলাহল ভালো লাগছে তাঁর। গত কয়েক মাস তো একাই কাটিয়েছেন এই পুরোনো বড়ো বাড়িটায়। তাই এতদিন পর আবার পরিবারের কোলাহল তাঁর কানে বড়োই মধুর ঠেকছে।

গ্রামীণ ব্যাঙ্কের ম্যানেজার পদে তিন মাস আগেই দীপক রায় যোগ দিয়েছেন এই আশুপুর গ্রামে। তাঁকে কোয়ার্টার হিসেবে এই বিশাল পুরোনো জমিদার বাড়িটা দিয়েছে সরকার থেকে। এই বড়ো জমিদার বাড়িটা একসময় কার ছিল, তা আজকে আর কেউ মনে রাখেনি। কোনো এক রাজা সিংহরায়ের মহল ছিল বলে জানা যায় শুধু স্থানীয় লোকেদের মুখে। সরকার অনেকদিন আগেই বাড়িটা বাজেয়াপ্ত করেছে। এটারই সামনের দিকটা একটু মেরামত করে তাঁর কোয়ার্টার বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এখানে বদলি হয়ে আসার পর গত কয়েক মাস দীপক রায় একাই থেকেছেন এখানে। বিয়ের পর আবার কয়েক দিন ব্যাচেলর জীবন আর কি। প্রথমেই পরিবারকে এখানে নিজের সঙ্গে আনা এতদিন সম্ভব হয়নি। ময়নার স্কুল তার কারণ। হুট করে বছরের মাঝখানে স্কুল পালটে আনা যায় না আজকাল। ক্লাস সিক্সেও ময়নার স্কুলে খুবই পড়ার চাপ। তাই কয়েক মাস রায়বাবু একাই থেকেছেন আশুপুরে। তবে, প্রতি উইকএন্ডে রায়বাবু বাড়ি চলে যেতেন কলকাতায়। আবার রবিবার রাতে ফিরতেন। এই ক-দিন এভাবেই চলছিল। কয়েক দিন আগে ময়নার স্কুল ছুটি পড়ায় আপাতত দিন পনেরোর জন্যে স্ত্রী আর মেয়েকে গতকাল তিনি এখানে এনেছেন। কলকাতায় বড়ো হওয়া ময়না কোনোদিন এত বড়ো, পুরোনো বাড়ি দেখেনি। এখানে আসার পর থেকে তার আনন্দ আর ধরছে না। আর, সেই আসা থেকেই ময়না ছুটে বেড়াচ্ছে বাড়ি জুড়ে। মায়ের বকুনিতেও তার উৎসাহে ভাটা পড়ছে না।

কলকাতার ঘুপচি ফ্ল্যাটে থেকে অভ্যস্ত ময়নার কাছে এই বাড়ি যেন খোলা ময়দান। তাই আসার পর থেকেই ছুটোছুটি করে চলেছে। পেছনের পুরোনো ঘরে যেতে বারণ করা হয়েছে। শোনে না কথা। রোজ নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করছে মহা আনন্দে।

এদিকে তাঁর স্ত্রী বন্দনা শুরু করেছেন ঘরদোর গোছানো। এতদিন যেভাবে সেভাবে থেকেছেন দীপকবাবু। কিন্তু, এইবার স্ত্রী তাঁর সব জিনিস গুছিয়ে দিয়েই যাবেন বলেছেন। ‘এভাবে কি মানুষ থাকে’ বাড়িতে ঢুকে, বরের একার সংসার দেখে এই কথাটাই বলেছিলেন বন্দনা রায়। তাই স্ত্রীর আদেশে অফিস থেকে দু- জন লোক আনিয়েছেন রায়সাহেব। তাদের সঙ্গে নিয়েই সকাল থেকে ঘরদোর গোছানোর কাজে ব্যস্ত বন্দনা দেবী।

‘বাবা, একইরকম আরও দুটো পেরেক আছে। দেখে যাও না!’

পাঁচ বছরের মেয়ে ময়নার উৎফুল্ল গলা আবার ভেসে এল ভেতরের কোনো ঘর থেকে।

খবরের কাগজটা পাশে রাখতে রাখতে রায়বাবু বললেন,

‘হুঁ। এবার বকা দিতে হবে কড়া করে। কোথাকার কোন পুরোনো পেরেক পেয়েছে। জং ধরা লোহায় হাত-টাত কেটে গেলে বিপদ। যাই, দেখে আসি।’

দীপক রায় সুখী সংসারী মানুষ। বউয়ের হাতে দায়িত্ব দিয়ে নিজে পায়ের ওপর পা তুলে বসে ছিলেন আর খবরের কাগজ পড়ছিলেন। আর একবার স্ত্রীর দিকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন রায়বাবু। সবে এক পা বাড়িয়েছেন। হঠাৎই সারাবাড়ি কেঁপে উঠল কয়েক মুহূর্ত থরথর করে! টুলের ওপর দাঁড়িয়ে, একজন লোক একটা ফটো দেওয়ালে ঝোলাতে যাচ্ছিল, সে পড়ল মাটিতে। দীপকবাবু নিজেও টাল সামলাতে না পেরে সোফায় আবার বসে পড়লেন। আচমকা ভূমিকম্প?

কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ সারাবাড়ি জুড়ে গুঞ্জরিত হল ময়নার প্রবল আর্ত চিৎকার! পরমুহূর্তে কম্পন থেমে গেল। রায়বাবু দ্রুত উঠে ছুটে ভেতরে গেলেন, তাঁর পেছনেই ছুটলেন বন্দনা দেবী আর সঙ্গের কর্মচারী লোক দুটি।

প্রথমে কোথা থেকে ময়নার চিৎকারটা ভেসে এসেছে, কোন ঘর থেকে, তা ঠাওর করতে পারল না তারা কেউই। একজন হেল্পার বলল,

— আওয়াজ ওদিক থেকে এল মনে হয়!

ওদিকটা ভাঙাচোরা। বহুযুগ মেরামত হয়নি। একটা প্যাসেজ ধরে এগিয়ে গিয়ে একটা ছোট্ট, অন্ধকার খুপরিমতো ঘরে পৌঁছোল তারা।

ভেতরের পুরোনো ঘরটা অদ্ভুতভাবে দিনের বেলাতেও অন্ধকার। দেওয়ালে একটাও জানলা দেখতে না পেয়ে কারণটা বোঝা গেল। ধুলোর গন্ধ জানান দেয় ঘরটা বহু বছর পর খোলা হয়েছে। অন্ধকারে কিছু দেখতে পেলেন না দীপকবাবু। পকেট হাতড়ে লাইটার বের করে জ্বালতে গেলেন তিনি। কিন্তু, অনেকবার চেষ্টা করেও সেটা জ্বলল না। কর্মচারীদের একজন তার মোবাইলে আলো জ্বালাল। আলোটা ঘরের ভেতরে ফেলতেই সকলে দেখতে পেল ফ্রক পরা ছোট্ট মেয়েটা মেঝেতে পড়ে আছে অচৈতন্য হয়ে। ছুটে গেল তারা সেদিকে। কিন্তু, একী! ময়নার মুখের দিকে আলো ফেলতেই চমকে গেল সকলে। অচৈতন্য ময়নার চোখের দু-কোণ দিয়ে অশ্রুর মতো দুটো ধারা নেমে গেছে। তবে সেটার রং লাল, লাল রক্ত! আর, ময়নার হাতে আলগা মুঠোর ভেতর থেকে কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। জিনিসটা অদ্ভুত কারুকার্য করা, ছোটো ছুরির মতো আকারের জিনিস। কিন্তু, সেটা ছুরি নয়, কারণ সেটার কোনো ফলা বা ধার নেই। তিনদিক থেকে কোনাকুনি নেমে গিয়েছে সুচালো হয়ে। জিনিসটা আসলে অদ্ভুত কারুকার্য করা একটা পেরেক!

১.

‘পৃথিবীর সব ধর্ম ও পুরাণ, ভালো আর মন্দর কথা বলে। যেখানে ভগবান আছে, সেখানেই শয়তানকেও থাকতে হবে। “দ্য ইটারনাল কনফ্লিক্ট অফ গুড ভার্সেস ইভিল”। হিন্দুদের ঈশ্বর থাকলে অসুরও আছে। খ্রিস্টান ধর্মে আছে গড আর ডেভিল, ইসলামে আছে আল্লাহ্ আর ইবলিশ। আবার জোরোস্থিয়ানদের ঈশ্বর হল “আহুরা মাজদা” আর শয়তান হল “দেইব”। প্রসঙ্গত এইটা আবার আমাদের হিন্দু ধর্মের ঠিক উলটো নাম। অসুরের থেকে “আহুর”, দেব থেকে “দেইব”। ইট’স অল অ্যাবাউট ব্যালান্স। “ইন” আর “ইয়াং”। সায়েন্সও ঠিক সেই মতেই চলে। নেগেটিভ আর পজিটিভ; ইলেকট্রন আর প্রোটন। গোটা জগৎটাই, একটা ফালক্রামে আটকে থাকা লিভারের মতো পারফেক্ট ব্যালেন্সে চলে। ব্যালান্স একটু বিগড়ে গেলেই ধ্বংস।’

আমার কথায় বাধা পড়ল। বুকপকেটে রাখা মোবাইল ফোনটা কাঁপছে। আমি ক্লাসে ঢুকে সাধারণত ফোন বন্ধ রাখি। আজ ভুলে গেছি। ফোন বের করে দেখলাম আমার এক পূর্বপরিচিত সিনিয়র, দীপকদা। এখন ধরব না। আমার ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা আমার ফিজিক্স ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে লেকচার শুনছে, এ দৃশ্য দেখতে আমি অভ্যস্ত। ভালো লাগে যখন দেখি ‘রিলিজিয়াস স্টাডিস’-এর মতো অফবিট বিষয় নিয়েও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কৌতূহল আছে। আজকে যেমন এসেছি অন্য একটা ইউনিভার্সিটিতে এই বিষয়ে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে। ফোনটা টেবিলে রেখে আবার শুরু করলাম,

‘এই তো সমস্যা, মিথোলজি নিয়ে বলতে বলতে আবার বিজ্ঞানে ঢুকে গেছি। সেটা আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় নয়। তাই আমাদের টপিকে ফেরা যাক। তো, কথা হচ্ছিল, শয়তান নিয়ে, ধর্ম নিয়ে। হিন্দু ধর্মতে ঠিক “শয়তান” কনসেপ্ট না থাকলেও, পাপ-পুণ্য আছে, দেবতা-অসুর আছে। সব ধর্মেই নেগেটিভ শক্তি আছে। বৌদ্ধ ধর্মের যেমন বুদ্ধ আছেন, তেমনই আছেন…। বৌদ্ধ ধর্মের শয়তান সত্তার নাম কে বলতে পারবে?’

প্রশ্নটা শুনে সবাই বেশ চিন্তায় পড়ল। কিন্তু, পেছনের ডেস্ক থেকে একটা হাত উঠেছে।

‘হ্যাঁ। তুমি বলো।’

‘মারা?’

ইয়েস! ভেরি গুড! “মারা” বা সংস্কৃতর “মার” রাক্ষস। সিদ্ধার্থকে এই মার রাক্ষস প্রলোভন দেখিয়েছিল। তাঁকে ঈশ্বরের পথ থেকে সরিয়ে দিতে লোভ দেখিয়েছিল। গল্পটা চেনা লাগছে?’

একদল ছাত্রছাত্রী ঘাড় নাড়ল। একজন বলেই দিল,

‘যিশাস ক্রাইস্টকে ডেভিলের প্রলোভন দেখানোর গল্পটা।’

‘কারেক্ট! ঠিক যেভাবে মার রাক্ষস বুদ্ধকে সব জাগতিক ঐশ্বর্য আর সুখের প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে পথচ্যুত করতে চেয়েছিল, সেভাবেই একবার এক পাহাড়ের চূড়ায় শয়তান যিশুকে দেখা দিয়েছিল। তাঁকেও প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিল। এইজন্যে আমি সবসময় বলি যে, সব পৌরাণিক কাহিনির অরিজিন আসলে একই। অনেক আলাদা আলাদা ধর্মের গল্পের মধ্যে মিল পাবে। যেমন, আমাদের মনুর সময়ে বন্যা আর বাইবেলের নোয়ার সময়কার বন্যার গল্প। হুবহু একইরকম।’

আরও আধঘণ্টা এই বিষয়ে আলোচনা চলল। মোট দেড় ঘণ্টা সময় যে কীভাবে কেটে গেল টেরই পেলাম না। এরপর মানপত্র আর স্মারক হাতে তুলে দিয়ে সভা শেষ হল। ছাত্রদের থেকে বিদায় নিয়ে, ক্লাস থেকে বেরিয়ে দেখলাম ফোনে আটটা মিসড কল দীপকদার। কল ব্যাক করলাম।

‘হ্যালো।’

‘হ্যালো। অতীন্দ্র?’

‘হ্যাঁ, দীপকদা। বলো। কী খবর?’

‘খবর ভালো না, ভাই। খুব বিপদের মধ্যে আছি।’

‘কেন? কী হয়েছে?’

‘আমার মেয়েটা…। এখন কলকাতার নার্সিং হোমে।’

‘সেকী! ময়না? কী হয়েছে ময়নার?’

‘ভাই, আমি জানি তুমি ব্যস্ত মানুষ। তবু… একবার আসতে পারবে?’

‘আরে, অবশ্যই। কোন নার্সিং হোম?’

***

গাড়িতে যেতে যেতে দীপকদার কথা ভাবছিলাম। কলেজে আমার সিনিয়র ছিল। অন্য ডিপার্টমেন্ট যদিও। দীপকদা কমার্স, আমি সায়েন্স। তবু পরিচয় কীভাবে হয়েছিল তা মনে পড়ে না। তবে, দীপকদা আর বন্দনা বউদির বিয়েতে খেয়েছি। সঙ্গে ময়নার জন্মদিনেও আগে গেছি কয়েক বছর। তবে, গত দু-বছর নিজের ব্যস্ততার কারণেই যোগাযোগ একটু কমে গেছে।

মনে প্রশ্ন জাগছিল যে, হঠাৎ আমায় যাওয়ার জন্য এরকম আর্তি জানানোর কারণ কী? দীপকদার সব আত্মীয় কলকাতাতেই থাকে। আবার বলল যে, আমার বিশেষ সাহায্য চাই। কী সাহায্য? তবে কি অতিপ্রাকৃত কিছু? তবে কি সেই কারণেই আজ আমাকে মনে পড়ল তার!

এইসব এলোমেলো চিন্তা করতে করতেই কখন যেন আমার গাড়ি নার্সিং হোমের গেটে পৌঁছে গেছে। নার্সিং হোমে ঢুকে দেখলাম লবিতে বসে আছে দীপক রায়। দু-বছর আগে শেষ দেখা দীপকদা যেন অনেকটাই বুড়ো হয়ে গেছে। গালে কয়েক দিনের না কাটা দাড়ি, চোখে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। আমায় দেখে এগিয়ে এল। আমায় কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বলল,

‘ভাই। আমার মেয়েটাকে বাঁচাও। ‘

‘কী হয়েছে ময়নার?”

‘আমার মেয়ে কোমায় রয়েছে! ডাক্তার বলছে সে অন্ধ হয়ে গেছে!’

কয়েক মুহূর্ত কিছু বলতে পারলাম না, এতটাই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললাম,

‘তুমি বোসো। একটু গুছিয়ে বলো তো কী হয়েছে।’

দীপকদা গুছিয়ে ঘটনাটা বলতে পারল না যদিও। ওর এখন যা অবস্থা তাতে গুছিয়ে কথা বলতে পারার কথাও নয়। কিন্তু, যা শুনলাম, তাতে বুঝলাম কোনো একটা অজানা কারণে ময়না তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। শুধু তাইই নয়, দৃষ্টি হারাবার ঠিক আগের মুহূর্তে প্রচণ্ড ভয়ও পেয়েছে। ডাক্তার বলেছে দুটো চোখেরই অপটিক নার্ভ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। সেইসঙ্গে জীবিত হলেও ময়না কোমাটোস স্টেজে রয়েছে। হঠাৎ এরকম হওয়ার কোনো কারণ মেডিক্যাল সায়েন্স দিতে পারেনি। সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই অস্বাভাবিক ও ব্যাখ্যার বাইরে।

সব শুনে প্রশ্ন করলাম,

‘দীপকদা, তুমি কি কিছু সন্দেহ করছ?”

ঘাড় নেড়ে উত্তর দিল,

‘হ্যাঁ। এই ঘটনা স্বাভাবিক নয়। ময়না যখন দৃষ্টি হারায় তখন সে ঘরে একা ছিল। আর ওই চোখের কোল দিয়ে রক্ত ঝরা, ওটাও অদ্ভুত। তা ছাড়া, ডাক্তারও তো কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারছে না।’

‘বুঝতেই পারছি তোমার মনের অবস্থা। আমি কতটা কী করতে পারব জানি না, দীপকদা। একবার কি মেয়েটাকে দেখা যায়?”

‘হ্যাঁ। এসো আমার সঙ্গে।’

ময়নাকে দেখতে তার কেবিনে ঢুকলাম। আর, তার কাছাকাছি আসতেই আমি যেন একটা ঝটকা খেলাম। এটা ঠিক কীরকম অনুভূতি আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না। পাশে তাকিয়ে বুঝলাম এই অনুভূতিটা কেবল আমারই হচ্ছে। কারণ, দীপকদা স্বাভাবিকভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। মানে, নিজের মেয়েকে এভাবে দেখে যতটা স্বাভাবিক মানুষ থাকতে পারে আর কি। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, প্রচণ্ড শক্তিশালী একটা নেগেটিভ এনার্জি ময়নার ওপর প্রভাব ফেলেছে। না, সেটা এই মুহূর্তে এখানে নেই, কিন্তু সেটা যেন ময়নার ওপর তার স্বাক্ষর রেখে গেছে। একমাত্র অত্যধিক ‘পাওয়ারফুল’ কোনো অপশক্তিই তার অনুপস্থিতিতেও এতটা নেগেটিভ এনার্জির সিগনেচার রেখে যেতে পারে। সেটা কী বস্তু তা ভেবেই শিউরে উঠলাম।

ময়নার চোখ বন্ধ। যেন ঘুমিয়ে আছে বিছানায়। পাশে একগাদা মেশিন চলছে, স্যালাইন চলছে। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। দাঁড়িয়ে থেকে কোনো লাভও নেই।

বন্দনা বউদি কাঁদছেন বসে। আমি কী করব ভেবে পেলাম না। বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে ফুটফুটে ছোট্ট মেয়েটাকে ওইভাবে দেখাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। তখনই বন্দনা বউদি এসে হাতটা চেপে ধরলেন। কিছু বলতে পারলেন না। কিন্তু, তাঁর চোখে অসহায় মায়ের করুণ আর্তি স্পষ্ট।

নীচে নেমে এসে দীপকদা বলল,

‘ওর ঘরে ঢুকে তোমার মুখ-চোখ পালটে যেতে দেখেছি, অতীন্দ্র। অতীন্দ্ৰ, সত্যি বলো। আমার মেয়েটা ঠিক হবে তো? ওর কি খুব বিপদ?”

কথাটা তাকে জানানো ঠিক হবে কি না ভাবলাম। শেষে কিছুটা বলেই দিলাম, ‘হ্যাঁ। কিছু একটা অতিপ্রাকৃত ময়নার এই অবস্থার কারণ, সেটা আমি নিশ্চিত কিন্তু, সেটা কী তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না, দাদা। ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে হবে। আমার মনে হয় ওই আশুপুর না কোন জায়গা বললে, ওই বাড়িটায় আমার একবার যাওয়া প্রয়োজন। অন্তত এই অস্বাভাবিক ঘটনার কারণটা জানা দরকার। আমায় সেখানকার ঠিকানাটা দাও তো। আর, বাই রোড সেখানে কীভাবে যাব সেটাও বলে দাও।’

দীপকদা আমার কথা থামিয়ে বলল,

‘তার দরকার নেই। আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাব তোমায়। কবে যাবে?’

‘না, না! সেকী! তুমি এখানে ময়না আর বউদিকে ফেলে কোথায় যাবে?’

‘এখানে থেকেই-বা আমি গত একসপ্তাহ কী করতে পেরেছি? এখানে থেকে মেয়েকে এভাবে দেখে আমার ভেতরটায় যে কী চলছে, তা যদি তোমায় দেখাতে পারতাম, ভাই! এভাবে বসে না থেকে তার চেয়ে বরং কিছু চেষ্টা করি। আমারও মন বলছে এই রহস্যের উত্তর ওই গ্রামের বাড়িতে আছে।’

‘কিন্তু, বউদি…’

‘এখানে আত্মীয়স্বজন সবাই আছে। আমি যেতে পারব। তুমি কবে যেতে পারবে সেটা বলো?’

ভেবেই রেখেছিলাম আমি যে, যত তাড়াতাড়ি হয়, ততই ভালো।

‘দেরি নয়। সম্ভব হলে আজকেই বলতাম। কিন্তু, আজ তো দিন প্রায় শেষ। তাই কাল সকালেই চলো তবে।’

২.

কলকাতা থেকে আশুপুর যেতে লাগে চার ঘণ্টা মতো। কংক্রিটের জঙ্গলের সীমানা পেরিয়ে, সবুজঘেরা এই কয়েক ঘণ্টার পথ মনোরম হত, যদি না পরিস্থিতি এতটা গম্ভীর হত। ইউনিভার্সিটি থেকে দু-দিনের ছুটি নিয়েছি। গাড়ির পেছনের সিটে আমি আর দীপকদা বসে, গাড়ি চালাচ্ছে দীপকদার ড্রাইভার বিলাস। রাস্তায় আমি দীপকদার সঙ্গে দু-একবার কথা বলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। বুঝতে পারছি দীপকদার মন পড়ে আছে মেয়ের কাছেই। ঘুরে-ফিরে দীপকদা বার বার শুধু প্রশ্ন করছে, ‘ময়না ঠিক হবে তো?’ কিন্তু এর উত্তর যে আমারও জানা নেই।

আশুপুর গ্রামের সীমানায় প্রথমেই পড়ে একটা শ্মশান। দেখলাম বেশ ভিড়। এদিকে এখনও ইলেকট্রিক চুল্লি আসেনি বা কোনো কারণে বিকল। কারণ, দেখতে পেলাম চিতা সাজানো হচ্ছে। তাও একটা নয়, তিন-তিনটে চিতা সাজানো হচ্ছে। একটা ছোটো গ্রামে একসঙ্গে তিনজনের মৃত্যু একটু অস্বাভাবিক ঠেকল। এক যদি না কোনো দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

জায়গাটা পেরিয়েই যাচ্ছিলাম… কিন্তু, হঠাৎই শ্মশানের দিক থেকে একটা বাতাস বইল, সেই বাতাস গাড়ির খোলা জানলা দিয়ে আমার মুখে লাগল।

‘গাড়ি থামান।’

বলে উঠলাম।

‘এখানে?’

প্রশ্ন করল ড্রাইভার।

‘হ্যাঁ। থামান।’

আর কিছু না বলেই গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। একটু আগের এই বাতাস… এটা স্বাভাবিক নয়! হাওয়া যে এতটা ভারী হতে পারে আমার ধারণা ছিল না। মুহূর্তের জন্যে মনে হয়েছিল যে, তীব্র বিষাক্ত বাষ্প এসে লাগছে মুখে-চোখে। শ্মশানের দিক থেকে যে বাতাস এল সেটায় কিছু একটা অশুভর ইঙ্গিত আছে। তীব্র অশুভ কিছু! গতকাল ময়নাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে আমার এই অনুভূতি হয়েছিল। হ্যাঁ… ঠিক! আমি এখানেও স্পষ্ট সেই একই ইঙ্গিত পাচ্ছি।

শ্মশানে ঢুকে দেখলাম তিনটে মৃতদেহ শুইয়ে রাখা। মুখ ঢাকা সাদা কাপড়ে। আমায় দেখে লোকে একটু অবাক হয়েছিল। কিন্তু, আমার পেছনে ব্যাঙ্কের ম্যানেজারবাবুকে দেখে তারা আমায় আটকাল না। আমি ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে প্রথম মৃতদেহর মুখের ওপর থেকে কাপড় সরালাম। চমকে উঠে দু-পা পিছিয়ে এলাম। মৃতব্যক্তি বড়োজোর ত্রিশ-বত্রিশের যুবক। বিকৃত মুখে ভয়ের চিহ্ন স্পষ্ট। কিন্তু, সবচেয়ে বীভৎস ব্যাপার হল, মৃতের চোখ দুটো নেই। পুরোপুরি নেই! চোখের পাতা অর্ধেক বন্ধ থাকলেও দেখা যাচ্ছে… চোখের জায়গায় দুটো গহ্বর। ভেতরটা পুড়ে কালো অঙ্গারের মতো বীভৎস। কোনো এক অশুভ শক্তি এই ব্যক্তির দুটো চোখ গলিয়ে দিয়েছে! ‘আই বল’ গলে গিয়ে চোখের দুটো কোনা বেয়ে বেরিয়ে এসেছিল। অশ্রুর মতো কালো দাগ স্পষ্ট। একটু এগিয়ে গিয়ে বাকি দুটো মৃতদেহর মুখ থেকেও কাপড় সরিয়ে দিলাম। দ্বিতীয়জন এক বয়স্ক মহিলা আর তৃতীয় ব্যক্তি এক মধ্যবয়সি পুরুষ। কিন্তু, যা আশঙ্কা করেছিলাম, তা-ই চোখে পড়ল। এদের প্রত্যেকের মৃত্যু একইভাবে হয়েছে। প্রত্যেকটা মৃতদেহর চোখ গলে গেছে। দু-চোখের দু-ধারে কালো তরল গড়িয়ে পড়ার দাগ। এই মৃতদেহগুলো ছুঁয়ে আসা বাতাসই একটু আগে আমায় অশুভ ইঙ্গিত দিয়েছে। কোনো এক ভয়ংকর অপশক্তি এদের এরকম নিদারুণ বীভৎস মৃত্যুর কারণ।

আমার মন বলছে সামনে বিপদ আসছে। যে শক্তির মুখোমুখি হতে চলেছি, সেরকম কিছুর মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা আমার আগে হয়নি। কয়েক মাস আগে ঈকপা মঠের বৃদ্ধ প্রধান লামার সাবধানবাণী মনে পড়ল। তিনি আমায় নিকট ভবিষ্যতে এক অপশক্তির বিষয়ে সাবধান করেছিলেন। তবে কি…।

দিনের আলোতেও গা ছমছম করল।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে উপস্থিত লোকেদের উদ্দেশে প্রশ্ন করলাম,

‘এদের কী হয়েছিল? কেউ জানেন?’

প্রথমে কেউ কিছু বলল না। দীপকদা তাঁদের উদ্দেশে বলল,

‘ইনি আমার বন্ধু। মস্তবড়ো শিক্ষক। ইনি আমাকে সাহায্য করতেই এসেছেন। কী হয়েছে এখানে? ওঁর প্রশ্নের উত্তর দাও। ত

ভিড়ের থেকে এক বৃদ্ধ এগিয়ে এসে বলল,

‘গেরামের ওপর আপদ নেমে এসেছে, বাবু! গত কয়েক দিন ধরে রোজ রাতে কেউ-না-কেউ মারা যাচ্ছে, বাবু। রাতে ঘরের বাইরে কেউ থাকলেই চোখ জ্বালায়ে দিচ্ছে, বাবু! চোখ জ্বালায়ে মেরে ফেলছে! শয়তানের দৃষ্টি লেগেছে গাঁয়ে! কাল রাতে কখন জানি আমার জোয়ান ছেলেটা… বাথরুম যাবে বলে উঠেছেল। হঠাৎ চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে ছুটে গিয়ে দেখি…

বৃদ্ধ আর বলতে পারল না। রাতের দৃশ্য মনে করে শিউরে উঠল। আরও কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, প্রত্যেকের সঙ্গেই একই ঘটনা ঘটেছে। রাতে কেউ বাইরে বা খোলা জায়গায় থাকলে তার প্রাণ যাচ্ছে গত ছ-রাত ধরে। চিৎকার শুনে লোকে গিয়ে শুধুই চোখের কোটর থেকে ধোঁয়া বেরোনো, চোখ গলে পড়তে থাকা মৃতদেহ দেখতে পাচ্ছে। অর্ধেক লোক ইতিমধ্যে গ্রাম ছেড়েছে। বাকিরা এতটাই গরিব যে, ইচ্ছে না থাকলেও এই সর্বনাশা গ্রাম ছাড়ার উপায় নেই; তাই আছে। অন্ধকার হওয়ার আগেই মৃতদেহগুলো দাহ করে ঘরে ফেরার উদ্দেশ্যে, দাহকাজ দ্রুত শেষ করতে চাইছে।

গাড়িতে এসে বসলাম আমরা। আমার মাথা ধরেছে। বাড়িটায় পৌঁছোনো দরকার। মন বলছে, ময়নার হঠাৎ অন্ধত্ব আর এই অদ্ভুত মৃত্যুগুলোর মধ্যে কোনো কানেকশন আছে। আর, সেটা ওই বাড়িটায় গেলেই জানতে পারব।

৩.

বাড়িটার সামনে নেমে অবাক হলাম। দীপকদা যেমন বলেছিল, সেই অনুযায়ী বাড়িটা পুরোনো হলেও মেরামত করা হয়েছে। কিন্তু, বাড়িটা দেখে আমার পোড়োবাড়ি ছাড়া কিছুই লাগল না। দীপকদার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেও বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে বড়ো বাড়িটার দিকে। নিজের মনেই বলল,

‘আশ্চর্য। এই ক-দিনে যেন বাড়িটা আরও এক-শো বছর বুড়িয়ে গেছে! কিন্তু… কিন্তু…. তা কীভাবে সম্ভব…’

বাড়িটার থেকে প্রচণ্ড নেগেটিভ এনার্জির ভাইবস আসছে। আমার সারাশরীরে অনুভব করতে পারছি। এখানে কিছু একটা অশুভ ছিল; কিন্তু এখন নেই। কিন্তু, তার রেশ রেখে গেছে বাড়ির প্রতিটা ইটের কোনায় কোনায়। বাড়ির বাইরে বেশ বড়োসড়ো বাগান আছে। আম, জামরুল, কাঁঠাল চিনতে পারছি, কিন্তু সবক- টা গাছের পাতায় হলুদের আভাস। যেন অকাল জাড়ে তাদেরও শুকিয়ে, ঝরে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করলাম, এতক্ষণ যে মৃদু হাওয়া বইছিল, আশ্চর্যভাবে বাগানের ভেতরে তা নেই। একটাও গাছের পাতা নড়ছে না।

দীপকদা এগিয়ে গিয়ে দরজার তালা খুলতে আমরা ভেতরে ঢুকলাম। ভেতরটা অন্ধকার, কিন্তু, লাইটের সুইচ দিতে আলো জ্বলল না। ড্রাইভার চেক করে বলল ফিউজ উড়েছে। দুর্ঘটনার দিনই এটা হয়েছে নিশ্চয়ই। দীপকদা ফোন করে একজন লোক ডাকিয়ে নিল নতুন ফিউজ লাগাতে। কিছুক্ষণ বাদেই একজন লোক এল। দ্রুত কাজ করতে লাগল। বুঝলাম সেও অন্ধকার নামার আগেই বাড়ি ঢুকে পড়তে চাইছে স্বাভাবিকভাবেই। বাইরে এত ঠান্ডা না থাকলেও বাড়ির ভেতর যেন অনেকটাই বেশি ঠান্ডা। দেখলাম লোকটি কাঁপছে। সেটা ঠান্ডায়, না, পরিস্থিতির ভয়ে, তা বুঝলাম না। কাজের ফাঁকেই আমি লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম,

‘তোমার নাম কী?’

‘রমেশ।’

‘আচ্ছা রমেশ, একসপ্তাহ আগে কি এদিকে ভূমিকম্প হয়েছিল?’

‘ভূমিকম্প? কই? না তো।

আলো জ্বেলে দিয়ে লোকটা দ্রুত চলে গেল। পালাল বললেও ভুল হবে না। সারাগ্রাম আতঙ্কে রয়েছে।

ড্রাইভারকে বাইরের ঘরে বসিয়ে আমরা ভেতরের ঘরে এলাম। ভেতরের বেডরুমে ঠাকুরের আসন পাতা আছে। গিয়ে দেখলাম প্রতিটা ঠাকুরের ছবি কেমন যেন অস্পষ্ট। বহু পুরোনো ছবি যেমন ঝাপসা হয়ে যায়, সেরকম। অথচ, ছবিগুলোর ফ্রেমগুলো বেশ নতুন। ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে দীপকদাও বিস্মিত হয়েছে দেখলাম। বললাম,

‘দীপকদা, পেছনদিকের পুরোনো ঘরগুলো দেখে আসি, চলো। ওই ঘরটা কোনদিকে?’

কোন ঘরের কথা বলছি সেটা বুঝেই দীপকদা দেখলাম ইতস্তত করছে। বলল, ‘আজ বাদ দাও, অতীন্দ্র। ওদিকে আবার ইলেকট্রিক লাইন নেই। কাল সকালেই না-হয়…’

‘না। এখনই চলো। মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট তো আছেই। ভয় নেই, কিছু হবে না।’

আমার হাত আপনা থেকেই আমার গলার তাবিজটায় চলে গেল। এই তাবিজ আমায় আজ অবধি অনেক বিপদ থেকে রক্ষা করেছে। ঘাড় নেড়ে দীপকদা এগোল, তার পেছনে আমি।

বাড়ির পেছনদিকে অনেকগুলো পুরোনো ঘর আছে। যাওয়ার সময়ে সবগুলো একবার করে দেখলাম আলো ফেলে। ভাঙাচোরা ইট, বালি ছাড়া দেখার কিছুই নেই। সবশেষে আমরা ঢুকলাম সেই ঘরটায় যেখানে ময়নাকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেছিল। আসলে এটা ঘর নয়, কারণ কোনো দরজা নেই। বোঝাই যাচ্ছে এই ঘরের কোনো দরজা ছিলই না, চারদিকে দেওয়াল তুলে এই জায়গাটাকে কেবল ঘিরে ফেলা হয়েছিল। যে বা যারা এই ঘরটা বানিয়েছিল, তারা চায়নি কেউ এই ঘরে কোনোদিন প্রবেশ করুক। কিন্তু, কালের প্রকোপে অনেকদিন আগেই ছাদের সঙ্গে, এদিকে দেওয়ালের একাংশও ভেঙে পড়েছে। দেওয়াল ভেঙে বেশ চওড়া একটা ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। তাই খেলতে খেলতে ময়না সহজেই এখানে ঢুকতে পেরেছিল। জায়গাটা ছোটো, বহুযুগ সূর্যের আলো না ঢোকায় স্যাঁৎসেঁতে। ঘরের মেঝের ব্যাপারটা সবচেয়ে অদ্ভুত। মেঝের এককোণ থেকে আর এককোণ, তির্যক একটা ফাটল এবং সেটা প্রাচীন নয়। কয়েক দিন আগেই ফাটলটা সৃষ্টি হয়েছে বোঝা যায়। আগেই বলেছি, এই ঘরগুলোয় আলো নেই, তাই মোবাইলের আলোয় চারদিক দেখছি। এই ঘরে অশুভর উপস্থিতি ছিল। কোনো শক্তিশালী অশুভ শক্তি এখানে ছিল বহু বছর। আমি অনুভব করতে পারছি। কিন্তু, এখন সে নেই। এই ফাটলটা সম্ভবত তার মুক্তি ঘটিয়েছে।

হঠাৎ চোখে পড়ল মেঝের ওপর কিছু একটা পড়ে আছে। এগিয়ে গিয়ে বস্তুটার ওপর আলো ফেললাম। জিনিসটা একটা বড়ো পেরেক। দেখতে অনেকটা ছোটো ছুরির মতো। কিন্তু, এটা তিনকোনা গজাল। তিনটে ফ্ল্যাট সাইড একটা পয়েন্টেড মুখে এসে মিলেছে। এটা পেতলের তৈরি, মাথার দিকটায় কারুকার্য করা। তিনদিকে তিনটে ছোট্ট মূর্তির মুখ খোদাই করা হাতলের শেষ মাথাটায়। জিনিসটা দেখেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘ফুরবা!’

দীপকদা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,

‘কী?’

‘ফুরবা বা ফুরপা। একে “তন্ত্র কিল’ বা “বজ্র লিক’ও বলে। কিন্তু এ জিনিস এখানে কীভাবে এল?

‘এটাই তো ময়নার হাতে ধরা ছিল।’

‘কী? কখন?’

‘আমরা সেদিন ওকে ঠিক এখানেই অজ্ঞান অবস্থায় পাই। ওর হাতে এটা ধরা ছিল। ওকে নিয়ে যাওয়ার সময় এটা এখানেই পড়ে গেছে হয়তো।’

‘এটা আগে বলোনি তো!

‘এটা… মানে… এই কথাটা মনে ছিল না। কিন্তু এটা কী? এর সঙ্গে কী সম্পর্ক?’

আমি উত্তর না দিয়ে মোবাইলের আলোয় মেঝেতে খুঁজতে লাগলাম। আর, যেটা খুঁজছিলাম সেটা পেয়েও গেলাম। মেঝেতে একটা ছোটো ত্রিভুজাকৃতি গর্ত। এই কিলটা এখানেই মেঝেতে বেঁধানো ছিল। আমি ধুলোর ওপরেই বসে পড়লাম। হাত দিয়ে পরিষ্কার করতে লাগলাম মেঝে। ধুলোর আস্তরণের নীচে প্রাচীন চিহ্ন ফুটে উঠতে লাগল। ঘরের মেঝে জুড়ে একটা সমকোণী ত্রিভুজ সৃষ্টি করা হয়েছে, সেটার বাকি দুটো কোণে আলো ফেলতে দেখতে পেলাম এখনও গাঁথা রয়েছে আরও দুটো ফুরবা পেরেক।

আমার মাথা ঝিমঝিম করছে। এখানে কী ঘটেছিল সেটার অনুমান করতে পারছি। আমায় দেখে দীপকদা জিজ্ঞেস করল,

‘কী ওটা? এর সঙ্গে ময়নার কী সম্পর্ক?’

“বজ্রযান’-এর নাম শুনেছ?’

‘না।’

‘বৌদ্ধ ধর্মের একটা শাখা। তন্ত্রমন্ত্রর শাখা। তাতে তন্ত্র-যন্ত্র বলে কিছু জিনিস আছে। এই তিনকোনা ফুরবা পেরেক, বজ্রযান তন্ত্রে ব্যবহৃত এক যন্ত্র। এর ব্যবহার হয় শুধুমাত্র কোনো মারাত্মক অপশক্তিকে দূরে রাখতে, বা, বন্দি রাখতে। এটা একধরনের তান্ত্রিক ‘সিল’ (seal) বলতে পারো। এই ঘরে, এই ‘ফুরবা’র মাধ্যমে কোনো এক অশুভ শক্তিকে সিল করা হয়েছিল বলে আমার ধারণা। তোমার মেয়ে, খেলার ছলে এই পেরেক মাটি থেকে তুলে ফেলে। আর, তাতেই এই মেঝের নীচে বন্দি অপশক্তি, বহুযুগ পর মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে আসে। মেঝের এই ফাটল তার প্রমাণ। ‘

‘কিন্তু… কিন্তু… এই জিনিসটা যদি এতই শক্তিশালী হয়, তবে আমার মেয়ে এসে এত সহজে কীভাবে ওটা তুলে ফেলল?’

‘জানি না। অনুমান করতে পারি যে, এই বন্ধনী দুর্বল হয়ে গেছিল। আসলে, প্রতিটা যন্ত্রের ও বস্তুর যেমন একটা এক্সপায়ারি ডেট থাকে, সেইরকম তন্ত্রযন্ত্রেরও থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার শক্তি ক্ষয় হয়। অথবা, এটাও হতে পারে যে, এখানে বন্দি থাকা অজানা অপশক্তিটাই ময়নাকে প্রভাবিত করেছিল। সাহায্য করেছে তাকে পেরেক তুলে ফেলতে। তার মস্তিষ্কে ঢুকে তাকে নিয়ম বলেছে কীভাবে তন্ত্র ত্রিভুজ ভেঙে মুক্ত করতে হবে তাকে।’

উঠে দাঁড়ালাম। কী সেই ভয়ানক অপশক্তি, সেটা জানতে হবে। সেটা না জানলে কিছুই করা সম্ভব নয়। একজায়গায় একাধিক তন্ত্র-পেরেকের ব্যবহার আমি কোনোদিন শুনিনি বা কোথাও পড়িনি। কিন্তু, এর মানে যে মারাত্মক দাঁড়ায়! ত্রিভুজ হল জিয়োমেট্রির প্রথম পরিবেষ্টিত আকার বা ‘ক্লোজড স্পেস’। ত্রিভুজের তিনকোনায় তিনটে পেরেক মানে কাউকে বা কিছু একটাকে আটকে রাখা হয়েছিল এর সাহায্যে। এর মানে দাঁড়ায় যে, মেঝেতে বন্দি অপশক্তি এতটাই মারাত্মক যে, তাকে বন্দি রাখতে একটা নয়, তিন-তিনটে বজ্ৰ-কিলক লেগেছিল। এই তথ্যটা কি দীপকদাকে জানানো উচিত? কিন্তু, কী লাভ বলে? অকারণ তার দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে আর কাজ নেই।

ঘরে আলো ফেলে আবার খুঁজতে শুরু করলাম। কিছু একটা থাকতেই হবে। মন বলছে, কিছু সূত্র পাবই। এই শয়তানের হদিশ দিতে পারে সেরকম কিছু একটা যে বড়ো প্রয়োজন। অথচ, সেরকম কিছুই পেলাম না। কিন্তু, আমার যে কিছু একটা চাইই চাই। কিছু সামান্য ইঙ্গিত। একটা ছোট্ট মেয়ের জীবন বাজি রয়েছে। গ্রামের প্রতিটা লোকের জীবন সংশয় রয়েছে। ঈশ্বর কি এই শয়তানের বিরুদ্ধে কোনো ইঙ্গিত দিয়েই সাহায্য করবে না আমায়?

ঘরের এককোণ থেকে ‘চিকচিক’ গোছের আওয়াজ পেয়ে আলো ঘোরালাম সেইদিকে। দেখলাম একটা ইঁদুর দেওয়ালের একটা ইটের ফাঁকে ঢুকে গেল। ইটটা আলগা হয়ে কিছুটা বেরিয়ে আছে। কী মনে হওয়ায় সেইদিকে গেলাম। ইটটা ধরে টান দিতেই দেওয়ালে একটা চৌকো খুপরি দেখতে পেলাম। তাতে কিছু একটা রাখা। বহুযুগের ধুলোর আস্তরণে জিনিসটা কী বোঝা যাচ্ছে না। মোবাইলটা দীপকদাকে ধরতে বলে, জিনিসটা ভালো করে পরীক্ষা করলাম। টেনে বের করতে গিয়ে দেখলাম বেশ ভারী একটা পাথর। বের করে আনলাম দু-হাতে টেনে। সাইজ দুটো থান ইট মিলিয়ে যা সাইজ হয়, সেরকম। ফ্ল্যাট ট্যাবলেট আকারের পাথর। ধুলোয় ঢাকা বলে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু পাথরের ফ্ল্যাট সারফেসের ওপর হাত রেখে বুঝলাম, এতে খোদাই করা কিছু অক্ষর আছে, দু-দিকেই। অর্থাৎ, এটা একটা প্রাচীন প্রস্তরলিপি। আলোয় নিয়ে গিয়ে, এটাকে পরিষ্কার করে ভালোভাবে দেখতে হবে।

পাথরটা দেখে দীপকদা জিজ্ঞেস করল,

‘ওটা কী?’

‘মনে হচ্ছে কোনো স্টোন-ইনস্ক্রিপশন। মানে, প্রস্তরলিপি। এর থেকে কোনো হদিশ পেলেও পেতে পারি।’

‘আর, ওই বাকি দুটো পেরেক?’

“তুলে ফেলো মেঝে থেকে। ‘

‘সেকী! এই যে বললে ওগুলো তুলেই বিপদ হয়েছে।

‘তিনটে পেরেক দিয়ে সিল করা হয়েছিল। একটা সরাতেই সিল ভেঙে গেছে। বাকি দুটো ওখানে থাকা-না-থাকা একই ব্যাপার। তুলে নাও বাকি দুটোও।’

দীপকদা বাকি দুটো ফুরবা তুলতে লাগল। ওগুলো তুলে আমাকে দিতে দিতে বলল,

‘চলো তবে। এখান থেকে বের হই। এগুলো তুমি তোমার কাছেই রাখো।’

‘হ্যাঁ। এগুলো পরে কাজে লাগবে আমাদের। এই তিনটে দিয়ে…

আমার কথায় বাধা পড়ল একটা তীব্র, আর্ত চিৎকারে। কেউ একটা পরম মৃত্যুযন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। মরণ আর্তনাদ! ছুটলাম বাড়ির সামনের দিকে। বসার ঘরে এসেই দেখলাম সদর দরজা খোলা! আর, আমাদের ড্রাইভার নেই। সর্বনাশ! সে কি তবে বাইরে গেল?

দীপকদা বেরোতে গেল। তাকে বাধা দিলাম।

‘তুমি বেরিয়ো না। আমি যাব। পাথরটা ধরো। ‘

‘কিন্তু…’

‘বাইরে যা-ই থাক, আমি আশা করি, এই তিনটে পেরেক আর আমার এই গলার তাবিজ আমায় রক্ষা করবে। তুমি দরজা বন্ধ করো। আমার গলার আওয়াজ না পেলে খুলবে না। ‘

দীপকদা আর কিছু বলার আগেই ছুটে বেরিয়ে গেলাম। যাওয়ার আগে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করতে ভুললাম না।

৪.

চিৎকারটা একবারই শোনা গেছে, তাই বেরিয়ে এসে কয়েক সেকেন্ড দেরি হল আওয়াজটা কোনদিক থেকে এসেছে সেটা অনুমান করতে। বাগানের ডান দিক থেকেই আওয়াজ এসেছে বলে মনে হয়েছে, তাই সেইদিকেই ছুটলাম। আমার অনুমানটা যে ভুল নয়, সেটা কিছুটা এগোতেই বুঝতে পারলাম। একটা প্রচণ্ড অস্বাভাবিক, অশুভ উপস্থিতি টের পাচ্ছি সামনে থেকে! গোটা এলাকাটা জুড়ে এই অশুভ সত্তাটা তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে! আমার পা নিজের থেকেই থেমে গেল। সামনে এগোলে আমার বিপদ হতে পারে। আমি জানি সেটা। কিন্তু, আমাকে যেতেই হবে। মনের জোর একত্রিত করে এগিয়ে গেলাম আরও একটু।

মোবাইলটা ফেলে এসেছি ভুলে, যদিও চাঁদ আর গাছপালার আলো- আঁধারিতে মোটামুটি দেখা যাচ্ছে সবই। একটা ঝোপের দিকে কিছু একটা নড়াচড়া করছে। সন্তর্পণে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। চাঁদের আলোয় দেখলাম মাটিতে আমাদের ড্রাইভার পড়ে আছে। যন্ত্রণায় মুখটা বিকৃত, আর তার চোখের দুটো কোটর থেকে ধোঁয়া উঠছে। চোখের ধার বেয়ে কালো কান্নার মতো বেরিয়ে মাটিতে পড়ছে গলিত চোখ দুটো! ঠিক যেন একটু আগে কেউ গরম শলাকা দিয়ে চোখ গলিয়ে দিয়েছে! কাঁপতে কাঁপতে ড্রাইভারের শরীরটা একসময়ে নিশ্চল হয়ে এলিয়ে পড়ল। লোকটা আমার সামনে তীব্র যন্ত্রণায় মারা গেল।

না, এটাই সবথেকে ভয়ের দৃশ্য নয়। আসল ভয়ের বস্তুটা মৃতদেহর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দ্বিতীয় মূর্তিটা এইবার চোখে পড়ল! মৃতদেহটার ঠিক মাথার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো ছায়ামূর্তি। অন্ধকারের সঙ্গে সেটা এতটাই একাত্ম যে, ওটাকে প্রথমে চোখে পড়েনি। চোখে পড়তও না যদি না সেই জমাট বাঁধা অন্ধকার থেকে প্রচণ্ড ঋণাত্মক একটা অনুভূতি এসে আমার প্রতিটা ইন্দ্রিয়কে সতর্ক করে দিত!

আমার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে সে। ওইই সে! হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত এই সেই অপবিত্র সত্তা যা ওই তন্ত্র পেরেকের বাঁধন থেকে মুক্তি পেয়েছে! হাসপাতালে ময়নার ঘরে, শ্মশানের ওই মৃতদেহগুলোয় এবং এই পুরোনো রাজবাড়ির গুপ্তঘরে, যার অশুভ শক্তির স্বাক্ষর টের পেয়েছি, এইই সে! আর, ঠিক সেই মুহূর্তে আমি উপলব্ধি করলাম একটা কথা। আমি আমার জীবনে এতটা প্রাচীন, শক্তিশালী, ধ্বংসাত্মক অশুভ কিছুর মুখোমুখি হইনি! আমি যদি সাবধান না হই, সামান্য ভুলচুক হলেই আমার সর্বনাশ নিশ্চিত!

সে আমার আসার আওয়াজ পেয়েছে। ধীরে ধীরে মাথা ঘোরাচ্ছে আমার দিকে! আমার এই মুহূর্তে পালানো উচিত, কিন্তু আমার পা ভারী। আমার শরীর অবশ হয়ে গেছে এই অপশক্তির সর্বগ্রাসী নেগেটিভ এনার্জির উপস্থিতিতে। আমি একচুল নড়তে পারছি না। আমার মন বলছে যদি একবার আমি তার মুখ দেখে নিই, তবে সেটা আমি সহ্য করতে পারব না। হয়তো… হয়তো আমি প্রাণে মরব না এই তিনটে পেরেক ও তাবিজের কারণে, কিন্তু আমার অবস্থাও ময়নার মতোই হবে। তার দৃষ্টি মানুষের চোখ সহ্য করতেও পারবে না। তার এক নজরে পুড়ে যায় মানুষের রক্তমাংসের চোখ। এক অভিশপ্ত মৃত্যু নেমে আসে যে তার মুখদর্শন করে তার ওপর। আমার অন্তর থেকে কেউ সতর্ক করছে, ‘চোখ বন্ধ করো! চোখ বন্ধ করো!’ আমি মনের সব জোর এক করে চোখের পাতা বন্ধ করলাম। যা-ই ঘটুক, চোখ খুলব না!

শক্ত করে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিন্তু, তবুও তার প্রতিটা গতিবিধি আমি নিজের অনুভূতিগুলো দিয়ে টের পাচ্ছি। প্রতিটা সেকেন্ড যেন অনন্তকাল মনে হচ্ছে আমার। শয়তানটা এগিয়ে আসছে! তার তীব্র নেগেটিভ উপস্থিতি আমি চোখ বুজেও টের পাচ্ছি নিজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মস্তিষ্কে বিপদসংকেত বাজছে ক্রমাগত। ওটা এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে আমার দিকে। কাছে… আরও কাছে!

শয়তানটা এখন আমার ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তার মুখ আমার মুখের একদম কাছে। তার ঠান্ডা বিষনিশ্বাস আমার মুখে পড়ছে! নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তির শেষবিন্দুটা ব্যবহার করতে হচ্ছে, চোখের পলক বন্ধ রাখতে। কিছুতেই চোখ খোলা যাবে না! ও একটা হাত বাড়াচ্ছে, আমার গলা লক্ষ করে। তাকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা বা উপায় কোনোটাই আমার কাছে এই মুহূর্তে নেই। আমি… আমি জানি না কী করব!

তার হাত আমার গলা স্পর্শ করতেই টের পেলাম যেন একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল সেই স্পর্শের মধ্যে দিয়ে। সেই শয়তানটা পরমুহূর্তে আমার থেকে কয়েক মিটার ছিটকে দূরে চলে গেল! আমি কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। তার মানে সে আমায় ছুঁতে পারবে না। যতক্ষণ তিনটে তন্ত্র পেরেক আমার কাছে আছে, তার স্পর্শ থেকে আমি সুরক্ষিত। শুধু আমায় নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তি দিয়ে চোখ বন্ধ রাখতে হবে, যতক্ষণ না বিপদ কেটে যায়!

কতক্ষণ এভাবে কাটল জানি না। আমার মনে হচ্ছে যেন অনন্তকাল ধরে আমি দাঁড়িয়ে আছি চোখ বন্ধ করে। তার হিংস্র উপস্থিতি সারাক্ষণ নিজের আশেপাশে টের পাচ্ছি। তারপর হঠাৎই টের পেলাম যে, তার উপস্থিতি মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণ আরও অপেক্ষা করলাম, নিশ্চিত হতে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুললাম। নাহ্, সে নেই।

এগিয়ে গেলাম ড্রাইভারের মৃতদেহর দিকে। পাশে এখনও আধপোড়া সিগারেটটা পড়ে আছে। সিগারেট খেতে বাইরে এসে জীবনটা দিল। প্রচণ্ড আফশোস হল আমার। একজন নিরীহ লোকের প্রাণ গেল এভাবে! তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না তার চোখবিহীন মৃতদেহর দিকে। একবার ভাবলাম মানুষটাকে তুলে ভেতরে নিয়ে যাই। কিন্তু, পরক্ষণেই মনে হল যে, সেটা উচিত নয়। আফটার অল এটা একটা খুন! পুলিশ আসবে, তদন্ত করবে। মৃতদেহ নড়ানো যাবে না।

অগত্যা একাই ফিরে এলাম বাড়িটায়।

৫.

রাতটা আমরা দু-জন কীভাবে কাটালাম তা ভাবলে এখনও ভয় করে। ঘরের বাইরে একটা মৃতদেহ আর সেইসঙ্গে একটা পৈশাচিক উপস্থিতি বার বার হানা দিচ্ছে। তার থেকে নির্গত নেগেটিভ এনার্জি আমি টের পাচ্ছি মাঝে মাঝেই। মাঝখানে একবার দূর থেকে একজন মহিলার আর্তনাদ কানে এল। কেঁপে উঠলাম। বুঝতে পারলাম যে, আরও এক হতভাগ্য অশুভ শক্তির শিকার হল। মন শান্ত রাখতে আমি সারারাত পাথরটার লিপি নিয়ে বসে থাকলাম। আর দীপকদা কেমন যেন পাথরের মতো হয়ে গেছে। সিগারেটের পর সিগারেট শেষ করছে আর মাঝে মাঝেই কেঁপে কেঁপে উঠছে। ব্যাঙ্কের কর্মচারী মানুষটির জন্যে এই পরিস্থিতি কল্পনার অতীত। তার মনের অবস্থা আন্দাজ করতে পারছি।

একজন মানুষ, যে গোটা জীবন ধরে কিছু ধারণা নিয়ে বেঁচেছে। আর পাঁচটা মানুষের মতোই, অপার্থিব কিছুর অস্তিত্ব তার কাছে বইয়ের পাতা, সিনেমার বা মজলিশের আড্ডা অবধিই সীমাবদ্ধ। সেই মানুষটাকেই যদি আচমকা এনে দাঁড় করানো হয় এরকম একটা ভয়ের পরিস্থিতিতে, বলা হয় যে, এতদিন যা জানতে সব মিথ্যে, আমাদের জগতের বাইরেও আছে অন্য এক অন্ধকার জগৎ যার বাসিন্দারা কেউই জীবিত নয়, তারা ভয়ংকর, তারা অপশক্তিধর, তখন মস্তিষ্কের ওপর কতটা প্রবল চাপ পড়ে, তা আমি জানি। ওইজন্যেই তো বলে ‘ইগনোরেন্স ইজ এ ব্লিস!’ কিছু সত্য না জানাই ভালো। কিছু রহস্যের উত্তর না পেলেই মঙ্গল।

ভোর হতেই পুলিশে খবর দিলাম। দারোগাবাবু বিশেষ প্রশ্ন করলেন না। তিনিও গ্রামের পরিস্থিতি জানেন। আমাদের আশ্বস্ত করলেন যে, ব্যাপারটা তিনি বুঝে নেবেন। আমার থেকে ঠিকানা নিয়ে জানালেন যে, ময়নাতদন্ত হয়ে গেলে দেহ পাঠিয়ে দেবেন। মৃতর পরিবারের সঙ্গেও তিনিই যোগাযোগ করে নেবেন। তাঁর থেকেই জানলাম আরও এক মহিলা কাল খুন হয়েছে একইভাবে। দারোগা বলছিলেন,

‘নেহাত গ্রাম, তাই ব্যাপারটা মিডিয়া থেকে দূরে রাখা গেছে এখনও। সিরিয়াল কিলার বলে রিপোর্ট লেখা হচ্ছে।’

আমি নীচুস্বরে প্রশ্ন করলাম,

‘আপনি বিশ্বাস করেন যে, এটা সিরিয়াল কিলারের কাজ?’

ইনস্পেকটর আমার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে শুধু বললেন,

‘কিছু একটা তো লিখতে হবে, প্রফেসর সাহেব। সবসময় কি সত্যিটা বলা যায়?’ পুলিশ ডেডবডি তুলে নিয়ে চলে গেল। আমি আবার কাল রাতে ওই ঘরে পাওয়া শিলালিপি নিয়ে পরীক্ষা করতে বসলাম দিনের আলোয়। একটা আতশকাচ পেলে সুবিধে হত, কিন্তু, আপাতত তা নেই। অতএব, কষ্ট করেই ছোটো ছোটো লেখা পড়ে একটা কাগজে লিখতে শুরু করলাম।

দীপকদা চেয়ারে বসেই পর পর সিগারেট খাচ্ছিল আর আমার কাজ দেখছিল জিজ্ঞেস করল,

‘এটা কোন ভাষা?’

‘পালি।’

‘পালি? নামটা শোনা শোনা মনে হচ্ছে, স্কুলের ইতিহাস বইতে এই নামটা পড়েছিলাম যেন।’

‘পঞ্চম থেকে প্রথম খ্রিস্টপূর্বে ভারত উপমহাদেশে এই ভাষার প্রচলন। বৌদ্ধ ধর্মের বেশিরভাগ লেখা এই ভাষায়।’

‘তুমি এই ভাষা জানো?’

মৃদু হেসে বললাম,

‘আমার পড়াশোনার বিষয়গুলোর মধ্যে একটা হল মিথোলজি। সেই স্বার্থে অন্তত বেসিক কয়েকটা প্রাচীন ভাষা কাজ চালানো গোছের শিখতে হয়েছে। সংস্কৃত, পালি, তামিল, ল্যাটিন আর হিব্রু মোটামুটি ভালোই জানি।’

‘আমি তো জানতাম ভারতের সব পুরোনো ধর্মগ্রন্থ সংস্কৃতে লেখা।’

‘হিন্দু ধর্মের সব লেখাই প্রায় সংস্কৃতে। কিন্তু, সংস্কৃত ছিল শিক্ষিত, উচ্চশ্রেণির মানুষদের ভাষা। তাই শুধু ব্রাহ্মণরা হিন্দু ধর্মগ্রন্থ পাঠ করতে পারত। বৌদ্ধ ধর্ম যখন দেশে ছড়াল তখন বৌদ্ধদের টার্গেট কিন্তু ছিল সাধারণ মানুষ। তাই তারা নিজেদের সব গ্রন্থ লিখল প্রচলিত পালি ভাষায়। তারা বলল, বৌদ্ধ ধর্ম সাধারণ মানুষের ধর্ম। তাই এর ধর্মগ্রন্থ পাঠ করার অধিকার সবার আছে। অতএব, তারা “মাস’ ল্যাংগোয়েজকেই প্রাধান্য দিল। “ত্রিপিটক’ নামে তিনটে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থর নাম নিশ্চয়ই শুনেছ? সেই স্কুলে-পড়া ইতিহাস বইয়ে। সেগুলোও কিন্তু এই ভাষাতেই লেখা।’

‘তার মানে এই লেখা বৌদ্ধ ধর্মের?’

‘সব কিছু সেদিকেই তো ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই ‘বজ্র-কিলয়’ও তো বৌদ্ধ ধর্মেরই দেবতা।’

‘দেবতা? এই তো বললে এগুলো তন্ত্র পেরেক।

‘হ্যাঁ।। সব বলতে সময় লাগবে। আগে এটার পাঠোদ্ধার করি। এটা জরুরি। তোমার মোবাইলে গুগল অন করো তো, দরকার হবে। সারারাত মোবাইলে কাজ করে আমার ব্যাটারি শেষ।’

আরও দেড় ঘণ্টা লাগল পুরোটা মোটামুটি উদ্ধার করতে। তাও কয়েকটা অক্ষরে ডাউট আছে। কিন্তু, কাজ চলবে। অন্ধকারে এতক্ষণে আলো দেখতে পাচ্ছি কিছুটা। মাথা তুলে দেখলাম দীপকদা ঠায় বসে। কষ্ট হল মানুষটাকে দেখে। বিশ্বাস, অবিশ্বাস, সাধারণ লজিক সব ভেঙেচুরে খান খান হয়ে যাচ্ছে তার। এই মুহূর্তে সব ছেড়ে নিজের জানা, পরিচিত জগতে যেতে চাইছে তার মন। তবুও মেয়ের মুখ চেয়ে সেটা করা সম্ভব নয় তার পক্ষে।

আমায় দেখে প্রশ্ন করল,

‘হল? কিছু পেলে?’

‘হ্যাঁ। মোটামুটি সবই পেয়েছি। এর ইতিহাস, তন্ত্র ক্রিয়াপদ্ধতি, সব। সব বলব তুমি চাইলে, কিন্তু এখন না। গাড়িতে যেতে যেতে। কলকাতা যেতে হবে এখনই। আবার সন্ধের আগে ফিরতে হবে। সময় কম।’

‘এখন কলকাতা যাবে?’

‘হ্যাঁ। কিছু জিনিসপত্র আনতে হবে। আর একজনের সাহায্যও লাগবে। এই পাথর থেকে সবই জানতে পারলাম। কিন্তু, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা জানতে পেরেছি সেটা হল…’

‘কী?’

‘কালকের সেই ডেমনের নাম। যে অশুভ সত্তাটা এতদিন এই প্রাসাদের নীচে বন্দি ছিল, তার পরিচয় জেনেছি।’

‘নাম? কী নাম তার?’

‘সন্নি-যখ। দ্য ডেমন অফ ব্লাইন্ডনেস!’

‘কী? শনি… কী?’

‘সব বলছি। তবে, এখনই আমাদের বেরোনো উচিত। নাহলে সব জোগাড়যন্ত্র করে রাতের মধ্যে ফেরা যাবে না।’

‘আবার আজ রাতে আসতে হবে?’

‘নিশ্চয়ই। নাহলে যে আজকে রাতে আবার কেউ মারা যাবে। আর, এই অশুভ শক্তি প্রতি রাতে শক্তি সঞ্চয় করছে। তাই আমরা যত দেরি করব, সে তত শক্তিশালী হবে।’

‘এগুলো ওই পাথরে লেখা আছে?’

‘না। দারোগার কথা থেকে অনুমান করলাম। তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে, যারা যারা গত কয়েক দিনে মারা গেছে, তারা কোথাকার লোক। তাঁর কথা থেকেই জানলাম যে, প্রথমদিকে শুধুই এই আশেপাশের লোকজন মরেছে। কিন্তু, গতকাল একইভাবে মারা গেছে পাশের গ্রামের একটা লোক, যা এখান থেকে প্রায় এক-শো কিলোমিটার দূর। অর্থাৎ, ওই অপশক্তি তার ক্ষমতার পরিধি বাড়াচ্ছে। অতএব, আমরা যত দেরি করব, তার ক্ষমতার বৃত্ত আরও প্রসারিত হবে।’

হাতঘড়ি দেখলাম। ভোর সাড়ে ছ-টা বাজে। বললাম,

‘আর দেরি নয়। চলো, রওনা হই।’

গাড়ির স্টিয়ারিং-এ আমি বসলাম আর আমার পাশে সামনের সিটে দীপকদা। লোকটা মনে মারাত্মক কৌতূহল চেপে আছে, বুঝতে পারছি। উশখুশ করছে পুরো ব্যাপারটা জানার জন্যে। তাই পাকারাস্তায় উঠে, সামনে থেকে চোখ না সরিয়েই বললাম,

‘পুরো ব্যাপারটা জানতে গেলে, তোমায় আগে বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস কিছুটা জানতে হবে।’

‘বলো। শুনব। আমি তো বুঝতে পারছি না এই তন্ত্রমন্ত্র বুদ্ধ ধর্মে এল কীভাবে? বৌদ্ধ ধর্ম বলতে তো আমি শুধুই গৌতম বুদ্ধর কথা জানি। শাস্তির ধর্ম। ত

‘হ্যাঁ। তিনি সূচনা করেছিলেন ঠিকই। মোটামুটি ষষ্ঠ থেকে চতুর্থ খ্রিস্টপূর্বের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে বৌদ্ধধর্মের সূচনা হয়। ঠিক কোন সময়ে, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। পরবর্তীকালে তা দুটো প্রধান ভাগে বিভক্ত হয়। প্রথমটা হল ‘থেরাবধ’, পালি ভাষায় যার অর্থ ‘জ্যেষ্ঠদের মার্গ’। দ্বিতীয় ভাগ ‘মহাযান’। এই দ্বিতীয় মার্গের আবার একটা শাখা হল ‘বজ্রযান’, যা কিনা, তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মর তন্ত্র শাখা। ইতিহাসবিদদের মতে, তিন থেকে তেরো খ্রিস্টাব্দ নাগাদ একদল ভারতীয় যোগী এই শাখার পত্তন করেন। গল্পে আছে এই যোগীরা অসম্ভব শক্তিশালী সিদ্ধপুরুষ ছিলেন। সেযুগে তাঁরা ‘মহাসিদ্ধি’ নামে পরিচিত ছিলেন। এঁরা আদতে ছিলেন বনে, জঙ্গলে, গুহায় থাকা শৈব অঘোর সন্ন্যাসী। এই ভয়ংকর তন্ত্রসাধকরা বৌদ্ধ মনাস্ট্রির নির্দেশিত পথে ঈশ্বর সাধনা করতে অস্বীকার করেন এবং দলবদ্ধভাবে তাঁরা তন্ত্রসাধনার মার্গ বেছে নিয়েছিলেন। এঁদের হাত ধরেই উঠে এল বৌদ্ধ ধর্মের নতুন শাখা ‘বজ্রযান’, যাকে অনেক সময় তন্ত্রযান, মন্ত্রযান বা ‘তান্ত্রিক বোদ্ধিজিম’ও বলা হয়।

এই বজ্রযান পরবর্তীকালে ছড়িয়ে পড়ল আমাদের বাংলা, আসাম ও পূর্ব ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলোতে। এ ছাড়া, তিব্বত, ভুটান, চীনসহ জাপানেও এর প্রচলন হয়। চীনের তন্ত্রবিদ্যা ‘টাংমি’ বা জাপানের গুপ্তবিদ্যা ‘মিক্কিয়ো’, সবই বজ্রযানেরই অন্য নাম। শুনলে হয়তো অবাক হবে, আমাদের বাঙালির ‘মা তারা’ কিন্তু হিন্দু বৈদিক দেবী নয়। তিব্বতি তন্ত্রে, ‘তারা’ নামে এক দেবীর উল্লেখ আছে। সেই থেকেই কিন্তু আমাদের আজকের পরিচিত কালী মা এসেছেন। আর তাই আমাদের তারাপীঠ হয়ে ওঠে তন্ত্রের পীঠস্থান।

‘সেকী!’

‘একদম তাই। তোমার কখনো মনে হয়নি? এই আমাদের, মানে আসাম, বাংলা আর উড়িষ্যার পুজো-আচ্চার নিয়ম কেন উত্তর ভারতীয়দের থেকে আলাদা? যেখানে উত্তর ভারতে পুজোর সময় নিরামিষ খাওয়া নিয়ম, সেখানে আমাদের মা কালীকে বলি ও আমিষ ভোগ দেয়া হয়। আসলে এই অঙ্গ, বঙ্গ ও কলিঙ্গ সেই প্রাচীনকাল থেকেই মাতৃশক্তির সাধক। এখানে বৈদিক দেব-দেবীদের থেকে, তান্ত্রিক দেব-দেবীরাই বেশি প্রচার পেয়েছিলেন এই মহাযোগীদের জন্যে। তাঁদের দাপট গোটা দেশে থাকলেও, এই পূর্ব ভারতে তাঁদের প্রচার হয়েছিল অনেক বেশি।

তবে শুধু ভারত নয়, এ ছাড়াও বৌদ্ধ ধর্ম আরও দেশে ছড়িয়েছিল। যেমন ধরো ‘শ্রীলঙ্কা’, বা, সেই যুগের ‘সিংহল’ দেশ। তবে, সেদিকে আদি বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিপত্তিই ছিল বেশি। শ্রীলঙ্কা জুড়ে আজও বহু শান্তিস্তূপ, বৌদ্ধমূর্তি আর অপূর্ব সুন্দর প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্য আছে। এই পাথরলিপি সেইসময়কার সিংহলের।

‘এটা? তবে এটা এখানে এল কী করে? এসব কি এতেই লেখা আছে?’

‘হ্যাঁ। শিলালিপি অনুযায়ী এটা প্রাচীন সিংহলের। তবে, এটা সম্পূর্ণ তান্ত্রিক বজ্রযান ক্রিয়ার লিপি। সিংহলের তন্ত্রলিপি দু-শো বছর বা তারও আগে আগে এই বাংলায়, তোমার বাড়িতে এল কীভাবে, সেটা লম্বা কাহিনি।’

‘বলো।’

‘বলব। আগে এই দোকানটায় একটু চা-কেক খেয়ে নেয়া যাক। এরপর নন- স্টপ লম্বা জার্নি।’

৬.

পূর্বকথা।

পূর্ব ভারতের কোনো এক পাহাড়ি গুহা। একজন বীভৎস দর্শন, জটাধারী, চিতাভস্ম মাখা, প্রায় উলঙ্গ সন্ন্যাসী চোখ বন্ধ করে বসে। তাঁর পায়ের কাছে একজন ব্যক্তি বসে। তার পোশাক, চেহারা সন্ন্যাসীর সম্পূর্ণ বিপরীত। তার গায়ে স্বর্ণ অলংকার আর রাজকীয় সাজ। তবু, এই মুহূর্তে সেই ব্যক্তি এই সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে অনুনয়ের ভঙ্গিতে বসে।

‘বাবা! বাবা! চোখ খুলুন। কৃপা করুন।

চোখ না খুলেই সন্ন্যাসী বললেন,

‘বলছি তো। ভাগ! ভাগ! আমি কিছু করব না। মর তোরা! সব মর! আজ নয়তো কয়েক বছর পর সেই তো মরবিই তোরা সব। সিংহলের পতন অনিবার্য!’

রাজপুরুষটি সন্ন্যাসীর ধুলোমাখা ময়লা পা ধরল।

‘আপনি মহাসিদ্ধি গোরক্ষনাথ। আপনি ছাড়া আর কে পারে আমাদের এই বিপদ থেকে বাঁচাতে?’

সন্ন্যাসী চোখ খুলে রাজপুরুষের দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে বললেন,

‘আমি তোদের বিপদ থেকে বাঁচাতে পারব না, তা তো বলিনি। পারি! কিন্তু, বাঁচাব না। মর তোরা সব, মর মর মর! ‘

‘বাবা! কৃপা করুন!’

‘কেন? তোদের দাম্ভিক রাজার দম্ভ কই গেল? সে তো দণ্ডমুণ্ডের বিধাতা ভাবে নিজেকে। চোখ উপড়ে মানুষ মারে! রাজকুমারীর দিকে কেউ দেখলে তার চোখ উপড়ে নেয়। যা যা, তাকে গিয়ে বলে দে! তার নিজের মৃত্যুও একইভাবে হবে! হা হা হা! যা! যা, ভাগ!

‘বাবা। আপনি তো অন্তর্যামী। আপনার থেকে কোনো কিছুই গোপন করার নেই। আমাদের রাজার ভুল হয়েছে। আমরা সেই দোষ স্বীকার করছি। কিন্তু, তার মাশুল নিরীহ প্রজারা দিচ্ছে। আমি দূর সিংহল দেশ থেকে, বহুদিনের পথ অতিক্রম করে এসেছি। এসেছি আপনার সাহায্যের আশায়। আমায় ফেরাবেন না, মহাযোগী! এইবারের মতো আমাদের উদ্ধার করুন!’

উগ্র যোগীর মন নরম হল বলে মনে হল না। কিন্তু একটু ভেবে বললেন,

‘বেশ। আমি যাব। কিন্তু মনে রাখিস, সন্নি-যখের অভিশাপ থেকে সিংহলের মুক্তি নেই। এইবারের মতো যদি আমি সিংহলকে রক্ষা করেও দিই, আজ থেকে বহুযুগ বাদে আবার পতন হবে তোর দেশের। অবশ্যম্ভাবীকে খণ্ডন করা যায় না, বিলম্বিত করা যায় মাত্ৰ।

‘তা হোক, বাবা! কিন্তু এইবার, অন্তত এইবার রক্ষা করুন!’

‘বেশ, তবে তাই হোক। তুই ফিরে যা। যথার্থ সময় হলে আমি যাব।’

‘সত্যি অভয় দিচ্ছেন, বাবা?’

গোরক্ষনাথ পুনরায় ধ্যানমগ্ন হয়েছেন। আর কোনো উত্তরের আশা বৃথা বুঝে গুহা থেকে বেরিয়ে এলেন মন্ত্রী সুভাষণ। সিংহলের তাম্বপানি রাজ্যের শাসক সিংহবিরা-র প্রধানমন্ত্রী সে। বাইরে জনা ত্রিশেক সৈনিকের একটা পল্টন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল মন্ত্রীর। শুভাষণ বেরিয়ে তাদের দেশের পথে ফেরত যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।

গত তিন মাস সিংহলে কেউ শান্তিতে ঘুমোয়নি। এক শয়তান প্রেতের আতঙ্কে। ঘটনার সূত্রপাত একবছর আগে, সবার অজান্তে। যেদিন পোলান্নারুয়া মন্দিরে বুদ্ধর পুজো দিতে গিয়ে রাজকুমারী শ্রুতিশ্রীর সঙ্গে প্রথম চোখাচোখি হয় পূজারি প্রজ্ঞাধরমের, সেদিন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পূজারি প্রজ্ঞাধরমেরও মন বার বার বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছিল ভগবান বুদ্ধর পুজোর সময়ে। বার বার তার ইচ্ছে করছিল তার পেছনে বসে থাকা রাজকুমারীর মুখটি দেখতে, বার বার দেখতে। বুদ্ধর কাছে সে ক্ষমা চাইছিল মনে মনে এই কারণে। আর রাজকুমারী? সে সামনের বুদ্ধর প্রস্তরমূর্তির দিকে যতক্ষণ না চেয়ে ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে দেখেছিল সেই তরুণ পূজারিকে। পাশে বসে থাকা প্রার্থনারত অন্যান্য সখীদের দৃষ্টি এড়িয়ে বার বার সে চোরা চাউনিতে দেখেছিল তরুণ পূজারির সুঠাম দেহ, ঘর্মাক্ত পিঠ, পেশিবহুল বাহু। কই? আগে কোনো রাজপুরুষ তো তাকে এতটা মোহিত করতে পারেনি যতটা এই ব্রাহ্মণ পূজারি সেদিন করেছিল!

প্রথম দর্শনেই একে অপরের প্রেমে পড়ে দু-জন। এরপর তাদের প্রণয় কীভাবে এগিয়েছিল তার সাক্ষী ছিলেন একমাত্র মন্দিরের হাসিমুখ বুদ্ধ। বহুবার রাতে, সবার অগোচরে গোপন অভিসারে বের হয়েছে রাজকুমারী। আর, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রজ্ঞাধরম রাজকুমারীর কাছে এসেছে ভালোবাসার টানে। এভাবেই চুপিসারে চলে এক বছর।

কিন্তু তারপর একদিন, যা হওয়ার সেটাই হল। রাজা সিংহবিরা জানতে পারেন তাঁর কন্যা আর বুদ্ধ মন্দিরের পুরোহিতের গোপন প্রণয়কাহিনি। তিনি তৎক্ষণাৎ আদেশ দেন প্রজ্ঞাধরমকে বন্দি করে আনতে।

রাজকুমারীর দিকে চোখ তুলে তাকানোর অপরাধে প্রথমেই, সর্বসমক্ষে অঙ্গারতপ্ত শলাকা দিয়ে তার চোখ গলিয়ে দেওয়া হয়। তারপর বহুক্ষণ অত্যাচারের পরে তাকে নিক্ষেপ করা হয় অন্ধকূপে! সেই দৃষ্টিহীন ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত অবস্থায় তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে দু-দিন জীবিত ছিল পুরোহিত। যন্ত্রণায় চিৎকার করেছিল টানা দু-দিন। সেই চিৎকার শুনে রাজকুমারী বহুবার অনুনয় করেছিল একবার অন্তত তাকে প্রেমিকের কাছে যেতে দেওয়ার জন্য। কিন্তু, রাজার আদেশে তাকেও কক্ষে বন্দিনী রাখা হয়েছিল দু-দিন। রাজা চেয়েছিলেন পুরোহিতের চিৎকার যেন সারানগরী শুনতে পায়। সবাই জানুক যে, রাজকুমারীর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাজা কতটা ভয়ংকর! প্রজ্ঞাধরমের এই আর্তনাদ মুখ বুজে সহ্য করেছিল সারানগর। সাহস করে, রাজাদেশ অমান্য করে কেউ একফোঁটা জলও দিতে আসেনি তাকে। প্রজ্ঞাধরমের সেই যন্ত্রণাক্লিষ্ট চিৎকার শুধু সহ্য করতে পারেনি একজন— রাজকুমারী নিজে। সে রুদ্ধকক্ষেই আত্মহনন করে। শোনা যায় রাজকুমারীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রেমিকের চিৎকার থেমে গেছিল। শুধু কান্না ভেসে এসেছিল। বোধ হয় সে নিজের হৃদয়ে কোনোভাবে টের পেয়েছিল যে, তার প্রিয়তমা আর নেই। নিজেরও মৃত্যু আসন্ন তা বুঝতে পারে বুদ্ধর পূজারি। কিন্তু, মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে সে এক ভয়ংকর কাজ করেছিল।

নিজের রক্ত দিয়ে অন্ধকূপের মাটিতেই এঁকেছিল তন্ত্রের কিছু নিষিদ্ধ চিহ্ন। তার গুরুর থেকে প্রাপ্ত গুপ্তবিদ্যা ব্যবহার করে সে আহ্বান করেছিল স্বয়ং শয়তানকে।

মৃত্যুর আগে চিৎকার করে কিছু কথা বলেছিল যা শুনেছিল শুধুমাত্র কারারক্ষীরা। তার শেষ কথাগুলো ছিল,

‘এই দেশে বুদ্ধ নেই! ঈশ্বর নেই! আমার প্রাণ, আমার আত্মা আমি উৎসর্গ করছি ‘মারা’কে! মারা! আমার ধর্ম, আস্থা, অর্জিত পুণ্য এ সমস্ত আমি ত্যাগ করে তোমায় স্মরণ করছি। আমায় শক্তি দাও! ক্ষমতা দাও যাতে মৃত্যুর পরেও আমার প্রতিহিংসা আমি পূরণ করতে পারি। সিংহলের পতন হোক! আমায় গ্ৰহণ করো ‘মারা’!’

সারা সিংহলের আকাশ লাল হয়ে উঠেছিল সেই মুহূর্তে। বিদ্যুৎ নেমে এসেছিল আকাশ থেকে মাটিতে। আর, সেই মুহূর্তে মৃত্যু হয়েছিল প্রজ্ঞাধরমের। দেশের মানুষ শোকাহত হয়েছিল এই তরুণ ব্রাহ্মণ আর তরুণী রাজকুমারীর করুণ পরিণতি জেনে। সবাই ভেবেছিল, এইভাবে করুণ সমাপ্তি হওয়া উচিত ছিল না। কিন্তু, তারা জানত না যে, এটা সমাপ্তি নয়। এটা ছিল শুরু— এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের শুরু!

পণ্ডিতরা বলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর অশুভ সৃষ্টি হয় নিষ্পাপ, অত্যাচারিত মানুষের অভিশাপ থেকে। আর, সবচেয়ে ভয়ংকর অভিশাপ সৃষ্টি হয় অতৃপ্ত ভালোবাসা থেকে। তখন ভালোবাসাই রূপ নেয় বিকৃত, অমঙ্গলকর, অশুভ কিছুর— ভয়ংকর কিছুর!

রাজকুমারী আর পূজারির মৃত্যুর পরের দিন রাতে রক্ষীরা এক আশ্চর্য দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে। অন্ধকূপ থেকে কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতে উঠতে ঢেকে ফেলছে সারানগরীর আকাশ। অন্ধকূপের কাছে গিয়ে দেখার চেষ্টা করে কয়েক জন। নীচে তাকিয়ে অন্ধকারে কিছুই দেখতে পায় না তারা। দুটো কালো হাত উঠে চেপে ধরে দু-জন রক্ষীর পা। তাদের টেনে অন্ধকূপে নামানোর পর শুধু একবার তাদের মৃত্যুচিৎকার শুনেছিল বাকিরা। কী হচ্ছে বোঝার আগেই তারা টের পায় যে, অন্ধকার মৃত্যুকূপ থেকে কেউ একটা উঠে আসছে, কিছু একটা উঠে আসছে! সেই রাতে একজন প্রহরী শুধু প্রাণরক্ষা করে পালাতে পেরেছিল, কারাগারের বাকি সব রক্ষী ও বন্দি সেই রাতে মারা যায়। সকালে গিয়ে দেখা যায় প্রায় শ-দুই মানুষের বিকৃত মৃতদেহ পড়ে আছে কারাগারের ভেতরে ও বাইরে। প্রত্যেকের মুখ ভয়ে ও যন্ত্রণায় বিকৃত। চোখের মণি গলে চোখ বেয়ে কালো ধারা হয়ে নেমে এসেছে। সেই দৃশ্য দেখে আতঙ্কে কাঠ হয়ে গেছিল সকলে।

বুঝতে বাকি থাকে না যে, মৃত্যুর পরেও প্রতিহিংসা নিতে ফিরে এসেছে প্রজ্ঞাধরম। শয়তান ‘মারা’র কাছে নিজের আত্মার বিনিময়ে সে রাক্ষসযোনি লাভ করেছে। সে পরিণত হয় এক রাক্ষসে। লোকে তাকে আঞ্চলিক ভাষায় নাম দিল— ‘সন্নি-যখ’ যার অর্থ ‘অন্ধত্বের রাক্ষস’। তার মুখের দিকে দৃষ্টি পড়লেই মানুষের চোখ গলে মৃত্যু হচ্ছে। নিজের ভোগ করা মৃত্যুযন্ত্রণার স্বাদ সে সবাইকে দিতে চাইছে। প্রেতরূপে সারা মানবজাতি এখন তার শত্রু।

এরপর শুরু হল মৃত্যুমিছিল। প্রতিরাতে অভিশাপ হয়ে সিংহলের বুকে নেমে আসতে লাগল সন্নি-যখ। তাকে অনেক চেষ্টা করেও আটকানো যায়নি। সারারাজ্য প্রাণভয়ে রাত কাটাচ্ছে গত তিন মাস ধরে। ভক্তি ও নিষ্ঠা যখন বিপথগামী হয়, তার ফলাফল হয় ভয়ংকর। তার মতো শক্তিশালী শয়তানকে আটকাতে পারে একমাত্র কোনো মহাশক্তিধর তান্ত্রিক।

সেই আশায় সিংহল থেকে এই ভারত দেশে এসেছিলেন মন্ত্রী সুভাষণ, মহাসিদ্ধি গোরক্ষনাথের কাছে। সিংহলের শেষ আশা তিনিই।

কিন্তু, এখন মন্ত্রী ফিরছেন খালি হাতে। তিনি জানেন না কবে মহাসিদ্ধি আসবেন। যদি বেশি দেরি করেন, তবে ততদিনে যে আর কোনো জীবিত মানুষ থাকবে না দেশে! তিনি জানেন না, আদৌ মহাসিদ্ধি আসবেন কি না।

৭.

‘তারপর? মহাসিদ্ধি গোরক্ষনাথ এসেছিলেন? আটকাতে পেরেছিলেন সন্নি-যখকে?’

প্রশ্নটা করল দীপকদা। তাকে এতক্ষণ ধরে পালি শিলালিপি থেকে পড়া গল্পটা সংক্ষেপে বলছিলাম। আমি উত্তর দিলাম,

‘হ্যাঁ। এসেছিলেন গোরক্ষনাথ। তবে, তার আগেই রাজাকে একইভাবে হত্যা করেছিল পিশাচ। মহাসিদ্ধির ভবিষ্যদ্বাণী ফলেছিল ঠিকই। বোধ হয় তিনি চেয়েছিলেন যেন রাজা তাঁর কৃতকর্মর জন্য শাস্তি পান। রাজার মৃত্যুর ঠিক পরেই সিংহলে এসেছিলেন তিনি। তবে তিনি, এই শয়তানকে চিরতরে শেষ করতে পারেননি। তার প্রমাণ তো নিজের চোখেই দেখেছ। মহাসিদ্ধি বন্দি করেছিলেন ওই শয়তানকে। পোলন্নারুয়ার মন্দিরেই তাকে বন্দি করেছিলেন, নিজের চোখ ও প্রাণের বিনিময়ে।’

‘সেকী! তবে সে এখানে, এই বাংলার গ্রামে এল কী করে?’

‘মহাসিদ্ধি রাক্ষসকে কয়েদ করেছিলেন একটা পাথরে। এই ঘটনা চতুর্থ শতাব্দীর। এরপর সেটা এখানে কীভাবে এল, তা স্পষ্ট নয়। কারণ, শিলালিপি শুধু এই অবধি ঘটনা বলেছে। তারপর শুধুই এই রাক্ষসকে বন্দি করার উপায় লেখা। তবে, আন্দাজ করতে পারি কিছুটা পরের ঘটনা।’

‘কীরকম?’

‘বহুযুগ রাক্ষস বন্দি ছিল বুদ্ধমন্দিরেই। সম্ভবত কোনো তান্ত্রিক পরিবার, বংশানুক্রমে পাহারা দিত। এর বহুযুগ পর, আঠেরোশো বিশের দিকে সিংহলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হল। তাতে সেই তান্ত্রিক উত্তরসূরিকে বোধ হয় ভিটেছাড়া হতে হয়। তখন সে এই পাথর নিয়ে এই বঙ্গদেশে চলে আসে।’

‘হ্যাঁ, হয়তো এটাই ঘটেছিল।

‘অথবা, আরও একটা কারণ থাকতে পারে সেই পাথরটাকে সরিয়ে ফেলার— শয়তানের শক্তিক্ষয় করতে। ‘

‘শক্তিক্ষয়? কীভাবে?’

‘যেকোনো শক্তিরই একটা উৎপত্তিস্থল থাকে। যেমন দেবতাদের, তেমন দানবের। শ্রীলঙ্কায় উৎপত্তি হওয়ার কারণে সন্নি-যখ সেদেশের মাটিতে অসীম শক্তিশালী। বিদেশের মাটিতে তার শক্তি অনেকটা কম হওয়ার কথা।’

‘সেকী! তুমি বলতে চাইছ এই শয়তান আগে আরও শক্তিশালী ছিল?’

‘হ্যাঁ! ভেবে দেখো, একজন মহাসিদ্ধি যাকে পুরোপুরি শেষ করতে পারেননি, নিজের চোখ আর প্রাণ খুইয়ে তাকে বন্দি করেছিলেন মাত্র। তাহলেই ভাবো কতটা ভয়ংকর আর শক্তিশালী জিঘাংসা থেকে এই রাক্ষসের সৃষ্টি। বহুযুগ আগে সে গোটা সিংহলকে ধ্বংস করতে বসেছিল। সে এখনও গ্রাম ছেড়ে বের হয়নি, অতএব তার শক্তি অনেকটাই কমেছে। কিন্তু, সে শক্তিসঞ্চয় করছে। অতএব, আমাদের হাতে সময় নেই বেশি।’

দীপকদা কিছু বলল না। আমি আবার বললাম,

‘তোমার এই বাড়ি তো বলেছিলে আসলে সিংহরায় জমিদারদের প্রাসাদ ছিল। কে বলতে পারে, হয়তো এই সিংহরায় আসলে সিংহলের আদি বাসিন্দা ছিল। তা আর আজকে জানার উপায় নেই। যাই হোক, তারপরেও শয়তানের ক্ষমতা খুব কম ছিল না। তিনটে পেরেক ব্যবহার দেখেই সেটা বোঝা যায়।’

‘কেন? এই তিনটে পেরেকের বিশেষত্ব কী?’

‘ফুরবা’ বা ‘তন্ত্র কিলক’ একটা অত্যন্ত শক্তিশালী তন্ত্রসাধনী। বলা হয় এতে ‘বজ্রলিয়’ নামে এক ভয়ংকর বৌদ্ধ তন্ত্রদেবতার অধিষ্ঠান। বজ্রকিলয় বা বজ্রকুমার হল সব অপশক্তির ধ্বংসের দেবতা। এরকম তন্ত্র পেরেক একটাই অত্যন্ত শক্তিশালী। এই ক্ষেত্রে তিন-তিনটে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথমবার ওই ঘরে গিয়ে সেটা দেখেই অবাক হয়েছিলাম। তাতেই বুঝেছিলাম যে, ‘সিল’ করা সত্তাটি এতটাই শক্তিশালী যে, একটা নয়, তিনটে কিলক ব্যবহৃত হয়েছে।’

গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল এত কথা বলতে গিয়ে। কিছুটা জল গলায় ঢেলে আবার শুরু করলাম,

‘তিনটে পেরেক দিয়ে ত্রিভুজ বানানো হয়েছিল। ত্রিভুজ হল প্রথম দ্বিমাত্রিক আকার যা বদ্ধ পরিসর সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, তিনটে পেরেক দিয়ে ত্রিভুজ মানে কিছুকে বন্দি করার ইঙ্গিত। এবং, সেটা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ভয়ানক।’

‘তাহলে? এবার উপায়? আমার মেয়ের কী হবে, অতীন্দ্র? সে কি আর কোনোদিন…’

‘সত্যি বলতে আমিও জানি না ময়না আর দৃষ্টি ফিরে পাবে কি না। তবে, তার সৌভাগ্য বলতে পারো যে, এই শয়তানের মুখ দেখার সময় তার হাতে একটা পেরেক ছিল। এই পেরেক তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে। আর, আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে শয়তানকে বরাবরের মতো শেষ করার উপায়। ‘

‘সেকী! কীভাবে?’

‘প্রথমত আগেই বলেছি, রাক্ষসের শক্তি গত দু-শো বছরে কিছুটা ক্ষয় হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই শিলালিপি অনুযায়ী, সন্নি-যখকে চিরতরে শেষ করতে গেলে আগে তার বর্ণনা লাগবে। আজ অবধি এইটা কারুর কাছে ছিল না। সেই কারণেই তাকে কিছুতেই শেষ করা যায়নি। কারণ, যে তার মুখ দেখে, সে-ই তৎক্ষণাৎ মারা যায়। তার বর্ণনা করে যাওয়ার সুযোগ কেউ পায় না। কিন্তু এইবার, ময়না আমাদের সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র! সে যে শয়তানের মুখ দেখেও জীবিত!’

মনে হল না দীপকদা খুব একটা ভরসা পেয়েছে। বলল,

‘কিন্তু অতীন্দ্র, ময়না তো কোমায়। সে কীভাবে বর্ণনা দেবে রাক্ষসের?’

‘ময়না প্রচণ্ড শক পেয়েছে। সে এই মুহূর্তে কিছুই বলতে পারবে না। কিন্তু, আমাদের হাতেও সময় নেই। একটা রাত দেরি মানেই আরও কারুর জীবন সংশয়। তাই তাকে আজই আটকাতে হবে। কাল রাতে দু-জনের মৃত্যু আমি আটকাতে পারিনি; চোখের সামনেই একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, আর একজনের আর্তনাদ তো আমরা দু-জনই শুনেছি। আরও কারুর মৃত্যু আমি হতে দেব না। কিছুতেই না।

‘নিজেকে দোষ দিয়ো না। ভবিতব্য খণ্ডায় কে? কিন্তু, ময়নাকে দিয়ে কথা কীভাবে বলাবে?’

‘তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করে।’

‘হোয়াট? তুমি এটা করতে পারো?’

‘হয়তো পারি, কখনো চেষ্টা করিনি। তবে, এই ক্ষেত্রে আরও একজন যোগ্য লোক আছেন। এই কলকাতা শহরেই তাঁর বাড়ি। তিনিই পারবেন এই প্রাচীন শয়তানকে শেষ করতে।’

দীপকদা সন্দিহান ভঙ্গিতে বলল,

‘এত শিয়োর কীভাবে হচ্ছ? স্বয়ং মহাসিদ্ধি গোরক্ষনাথ যা পারেননি, তা ইনি কীভাবে পারবেন? তাঁর ভেতর কী আছে যা গোরক্ষনাথেরও ছিল না?’

‘উঁহু। ঠিক তার উলটোটা। আমরা এখন যাঁর কাছে যাচ্ছি, সেই মানুষটার কাছে এমন একটা জিনিস নেই, যেটা গোরক্ষনাথের ছিল। তাই তিনি সফল হননি।’

‘কী হেঁয়ালি করছ, অতীন্দ্র? কী নেই এই লোকের কাছে, যা গোরক্ষনাথের ছিল?’

আমি মৃদু হাসলাম। উত্তর দিলাম না।

৮.

গলির মুখে গাড়ি রেখে পুরোনো বাড়িটার দিকে এগিয়ে গেলাম। উত্তর কলকাতায় কাশীনাথ পণ্ডিতের বাড়িটার সামনে আরও একবার এসে দাঁড়াতে হল আমাকে। বাড়ির বাইরের কলিং বেল বাজাতে গিয়ে দেখলাম, ঘরের দরজা খোলাই আছে। চৌকাঠ পেরোতেই ভেতর থেকে কাশীনাথ সাড়া দিলেন,

‘আরে, আরে! কী সৌভাগ্য! এ যে প্রফেসর এসেছে! বিখ্যাত মানুষের পায়ের ধুলো আমার ঘরে!

‘কেমন আছেন, পণ্ডিতমশাই?’

‘চলে যাচ্ছে, প্রফেসর সাহেব। শরীর ভালো না। আপনার কী খবর? সঙ্গের মানুষটি কে?’

‘ইনি আমার দাদা। আরও একবার আপনার সাহায্যপ্রার্থী হয়ে এলাম, পণ্ডিতমশাই। এইবার একটি ছোটো মেয়ে এবং সেইসঙ্গে অনেকগুলো মানুষের প্ৰাণ বিপন্ন।’

কাশীনাথ এতক্ষণ ভেতরে রান্নাঘর থেকে কথার উত্তর দিচ্ছিলেন। এইবার ঘরে এসে ঢুকলেন। আর তাঁকে দেখেই দীপকদা একটা ‘অ্যাঁক!’ করে আওয়াজ করল। কারণ, ঘরে প্রবেশ করা মানুষটির চোখের মণি ঘোলাটে সাদা। তিনি জন্মান্ধ।

দীপকদা এতক্ষণে আমার কথার মানে বুঝতে পেরেছে বোধ হয়। গোরক্ষনাথের যেটা ছিল, সেটা কাশীনাথের নেই। আর সেটা হল ‘দৃষ্টি’!

আমি বললাম,

–সব গুছিয়ে বলার সময় নেই, পণ্ডিতমশাই। আপনি আমার সঙ্গে চলুন। কিছু জিনিসপত্র আমাদের লাগবে। সেগুলো জোগাড় করতেও কয়েক ঘণ্টা লাগবে। পুরো ঘটনাটা গাড়িতে যেতে যেতে আপনাকে বলছি।

কাশীনাথ পণ্ডিত লোকটি আশ্চর্য। আমায় আর একটাও প্রশ্ন না করে, একটা কাপড়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন। চোখে কালো চশমা লাগাতে ভুললেন না। ব্যাপারটা যে সিরিয়াস, সেটা তিনি বুঝতে পারছিলেন। তাঁকে আর দীপকদাকে নিয়ে আমি সোজা ময়নার নার্সিং হোমের উদ্দেশে রওনা হলাম।

কাশীনাথ পণ্ডিতকে নার্সিং হোমে নিয়ে যাওয়ার পথেই কাল অবধি ঘটা সব ঘটনার বিবরণ দিলাম। পাথরের লিপির কাহিনি আর মন্ত্রর ব্যাপারেও বললাম। তাঁর কাছ থেকে কী সাহায্য চাই সেটাও জানালাম। সব শুনে কাশীনাথ মৃদু হেসে উঠলেন। বললেন,

‘প্রফেসর সাহেব, আপনি বড়োই বুদ্ধিমান মানুষ। এক ভয়ানক রাক্ষসের সবচেয়ে বড়ো মারণশক্তিকে আপনি তারই দুর্বলতা বানিয়ে দিতে চাইছেন।’

‘ঠিক ধরেছেন, পণ্ডিতমশাই। এই শয়তানকে একমাত্র আপনিই ধ্বংস করতে পারবেন। সে হল ‘ডেমন অফ ব্লাইন্ডনেস’, তাই তার মানুষ মারার প্রধান উপায়টাই আপনার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হবে। আপনি তার মুখ না দেখেও তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন। তাই তো আপনার কাছে আসা।’

‘একটা কথা জানো, প্রফেসর… ‘

‘কী কথা?’

‘যেদিন তোমার বন্ধুর সঙ্গে প্রথম আমার বাড়ি এসেছিলে, সেইদিনই আমার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল। সেটা ঠিক বুঝিয়ে বলার নয়। কেমন যেন মনে হয়েছিল যে, তোমার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হওয়ারই ছিল। এবং, এর পেছনে কোনো বিশেষ কারণ আছে।’

‘আপনি একবার আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন। আমার সৌভাগ্য যে, সেদিন শুভঙ্করের সঙ্গী হতে রাজি হয়েছিলাম। সেটাই আমার কাছে যথেষ্ট কারণ।’

‘হয়তো তাই। বা, হয়তো সেই কারণটা আমরা এখনও জানি না। ভবিতব্য বড়োই অদ্ভুত বস্তু, প্রফেসর।

নার্সিং হোমে ভিজিটিং আওয়ার ছিল না। তবু অনেক বলে, পরিচিত ডাক্তারের ফোন-টোন করে, ময়নার সঙ্গে একজনের দেখা করার অনুমতি পেলাম। আমি আর দীপকদা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। শুধু কাশীনাথ পণ্ডিত ভেতরে ঢুকলেন। কাচের বড়ো জানলা দিয়ে আমরা ভেতরের কেবিনটা দেখতে পাচ্ছিলাম। ময়না চুপচাপ ঘুমিয়ে আছে। কাশীনাথ গিয়ে প্রথমে পরম স্নেহে মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর ময়নার ডান হাতটা নিজের দুটো মুঠোয় ধরে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলেন মাথা নীচু করে। লক্ষ করলাম, মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছিলেন কাশীনাথ। এরকমটা তো আগে দেখিনি কখনো!

বললেন,

‘কিছু সমস্যা হয়েছে মনে হচ্ছে।’

দীপকদা আমার কথা শুনে প্রশ্ন করল,

‘কেন? কী সমস্যা?’

‘কাশী পণ্ডিতকে কখনো এই ‘ট্রান্স’ স্টেটে এরকম কেঁপে উঠতে দেখিনি। কী দেখছেন উনি?’

বিশ মিনিট পর কাশী পণ্ডিত বেরিয়ে এলেন ময়নার চেম্বার থেকে। তাঁর মুখের ভাব বদলে গেছে। কিছু একটা ঘটেছে নিশ্চয়ই। কাশীনাথ আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে বললেন,

‘কী ভয়ংকর! এই বাচ্চা মেয়েটিকে এরকম কিছুর মুখোমুখি হতে হয়েছে ভাবলেই…’

‘আপনি দেখতে পেয়েছেন তাকে?’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনি কেঁপে উঠছিলেন কেন মাঝে মাঝে? বিড়বিড় করে কিছু যেন বলছিলেনও। বাইরে থেকে আমি শুনতে পাইনি।’

কাশীনাথ ইচ্ছে করেই যেন আমার প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন। বললেন, ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তন্ত্রক্রিয়ার জোগাড়যন্ত্র করে বেরিয়ে পড়তে হবে। সন্ধের আগে পৌঁছোতেই হবে আশুপুর। সময় কম, প্রফেসর সাহেব।’

আমাদের সঙ্গে দীপকদাও বেরোতে যাচ্ছে দেখে তাকে আটকালাম।

‘দীপকদা, তুমি তোমার মেয়ের পাশে থাকো। পরিবারের পাশে থাকো। তোমায় আর বিপদে ফেলতে পারি না আমি।’

‘না, না। এ কী বলছ? বরং, তুমিই প্রাণের ঝুঁকি নিয়েছ আমার মেয়ের জন্য।’ উত্তরটা কাশীনাথ দিলেন,

‘এটাই আমার কর্ম। আমাদের কর্ম আমরা করব। আপনার কর্ম এই অবধি‍ই ছিল। বাকি পথ শুধু আমাকে এবং প্রফেসর অতীন্দ্রকে চলতে হবে।’

এতটাই গাম্ভীর্যপূর্ণ ভঙ্গিতে তিনি কথাটা বললেন যে, দীপকদা থেমে গেল। আমি তাকে বললাম,

‘তুমি এখানে থাকো। আমরা চেষ্টা করব কথা দিলাম। কিন্তু, সব কিছুর পরেও আমি নিশ্চিত নই ময়নার দৃষ্টি আদৌ ফিরবে কি না। কিন্তু, এইবার ভাইয়ের অনুরোধ রাখো। আর যেয়ো না।’

‘কিন্তু…’

‘কোনো কিন্তু নয়। আমার সঙ্গে কাশীনাথ পণ্ডিত তো আছেনই।’

***

অনেক চেষ্টা করেও সব জোগাড় করে দুপুরের আগে বেরোতে পারলাম না। নেহাত গ্রীষ্মকাল, তাই সন্ধে দেরিতে হয়। গাড়ি ছোটালাম যত দ্রুত সম্ভব। আমার পাশেই কাশীনাথ বসে। হাওয়ায় তাঁর লম্বা সাদা চুল আর দাড়ি উড়ছে। ভদ্রলোক চুপচাপ কিছু ভাবছেন। চোখে কালো চশমা থাকায় তাঁর চোখ বন্ধ না খোলা বুঝতে পারছি না। তিনি এমনিতে বেশ খোশমেজাজি মানুষ, কিন্তু ময়নার সঙ্গে দেখা করার পর থেকেই চুপচাপ হয়ে গেছেন। জেগে আছেন কি না বুঝতে আমি নিজে থেকেই প্রশ্ন করলাম,

‘কী ভাবছেন, পণ্ডিতমশাই?’

কয়েক সেকেন্ড উত্তর এল না। ভাবলাম, ভদ্রলোক নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছেন। কিন্তু, তারপরেই তিনি উত্তর দিলেন,

‘ভাবছি প্রফেসর, ভাবছি। অনেক কিছু একবারে মাথায় এসে ভিড় করছে। আচ্ছা, তুমি কি জানো, এই সন্নি-যখের সিল প্রস্তর বাংলায় কেন আনা হয়েছিল?’

‘ঠিক বলতে পারি না। সম্ভবত শ্রীলঙ্কায় ব্রিটিশ আমলে বিদ্রোহের সময়ে আনা হয়েছিল।’

‘সেটা কবে আনা হয়েছিল, সেটা জরুরি নয়। কেন আনা হয়েছিল, সেটা জরুরি।’

‘বেশ, কেন আনা হয়েছিল?’

‘কারণ, এটাই গোরক্ষনাথের আদেশ ছিল।’

‘সেকী! কেন? আপনি কীভাবে জানলেন সেটা?’

তিনি আবারও আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। উলটে আমায় আরও একটা প্রশ্ন করলেন,

‘আচ্ছা, আরও একটা বিষয় বলো। তোমার কী ধারণা? যে, শিলালিপির মন্ত্র পাঠ করলেই এই রাক্ষসকে শেষ করা যাবে?’

‘তাই তো লেখা আছে। আপনার কি তাই মনে হয় না?’

‘যে দ্বেষের জন্ম অপূর্ণ চাহিদা থেকে হয়, সেটা বড়ো শক্তিশালী হয়। তার মুক্তি একমাত্র তার অপূর্ণ বাসনার পূর্ণতাতেই সম্ভব।’

আমি বুঝতে পারলাম না ওঁর কথার ইঙ্গিত কোনদিকে। মাথাও লাগাতে ইচ্ছে করছে না। একবার ওই ভয়ংকর প্রেতের থেকে রক্ষা পেয়েও, আমি দ্বিতীয়বার তার মুখোমুখি হতে চলেছি। এ আমার দুঃসাহস, নাকি, বোকামি, তা সময়ই বলবে। আমি কি আদৌ বেঁচে ফিরে আসতে পারব?

আমার গলার এই রক্ষাকবচটাকে আমি কোনোদিন সন্দেহ করিনি। কিন্তু, আজ কেন করছি? এতদিন আমি এত শক্তিশালী কোনো অপশক্তির মুখোমুখি হইনি বলেই কি আমি বিশ্বাস হারাচ্ছি?

আমার ভয় করল। স্টিয়ারিং-এর ওপর হাত কাঁপল। মনে হল, এখুনি গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে ফিরে যাই এই ভয়ের থেকে দূরে।

‘অতীন্দ্ৰ।’

কাশীপণ্ডিতের স্বর কেমন যেন অন্যরকম শোনাল। তিনি আবার বললেন,

‘শুভশক্তির ওপর বিশ্বাস হারিয়ো না, অতীন্দ্র। যে মহাকাল এতদূর তোমার নৌকোর হাল ধরে এসেছে, এই ঝড়ের মধ্যেও সেই নৌকোই পার করবে। বিশ্বাস রাখো তার ওপর। বিশ্বাস রাখো নিজের ওপর। দুর্বলতা ত্যাগ করো। যা কিছু অশুভ, তারা সর্বদা দুর্বল জায়গাতেই প্রথম আঘাত হানে।

এই কথাগুলো… এরকমই কথা আমাকে আগেও একজন বলেছে। সেও সাবধান করেছিল আমায়।

মুহূর্তে ভয় কাটল। একটা হাত বুকে রাখলাম। অনুভব করলাম গলার তাবিজটাকে। এটা আমায় যে দিয়েছিল সে একজন রহস্যময় ব্যক্তি। এর ভেতর কী আছে, সেটাও আমার জানা নেই। কিন্তু, শুধু এটুকু জেনে এসেছি যে, এই জিনিসটা সাধারণ নয়।

আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সূর্য একদিকে ঢলে পড়তে শুরু করেছে। সন্ধে হতে আর দেরি নেই। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গ্রামে পৌঁছোনোটাই আগে দরকার। কাশীনাথ নিজেও আর কথা বললেন না। বাকি পথটা নীরব রইলেন।

হাইওয়ে থেকে নেমে গ্রামের মেঠোপথ ধরলাম।

৯.

বাড়িটায় ঢুকতে সন্ধে ছ-টা বাজল। তারপর এই বৃহৎ তন্ত্রক্রিয়ার সমস্ত জোগাড়যন্ত্র করতে করতে রাত দশটা। ওই ছোটো ভাঙা ঘরটাতেই ক্রিয়ার ব্যবস্থা করা হল, যেখানে বন্দি ছিল সে। কাশীনাথ পণ্ডিত হোম অগ্নিতে প্রথম আহুতি দিয়ে ক্রিয়া শুরু করলেন। এই কাজ তাঁকেই করতে হবে। আমি তাঁর সহকারীর ভূমিকায় তাঁকে সাহায্য করতে পারি মাত্র।

ক্রিয়ার প্রথম কাজ হল তিনটে ফুরবায় আরও একবার ‘বজ্রলিয়’ দেবকে জাগ্রত করা। এই দেবতা, অন্যান্য তিব্বতি তান্ত্রিক দেবের মতোই ভয়াল দর্শন ‘হেরুক’ শ্রেণির দেব। স্বয়ং বজ্রপাণির অমর্ষ, ক্রুদ্ধ রূপ ইনি! নীলবর্ণ, ত্রিমস্তক, ছয় বাহু আর ছয় পদধারী, সদা-ক্রুদ্ধ দেবতা। নরকরোটি শোভিত মুকুট, সামনের মুখটি নীলবর্ণ ভয়ংকর, অন্য দুটো মুখ সাদা ও লাল। তাঁর সামনের দু-হাতে দুটো ফুরবা ধরা, দুটো রাক্ষস মূর্তিকে পদদলিত করে দাঁড়িয়ে থাকেন। এক একদিকের তিন পায়ে, একটা করে রাক্ষস। সম্ভবত, এর থেকেই তিনটে ‘কিল’ ব্যবহারের আইডিয়াটা এসেছে। তাকে জড়িয়ে ধরে আছেন নীলবর্ণ দেবী বজ্ৰকিলাই।

বার বার একটা মন্ত্র আউড়াচ্ছেন কাশী পণ্ডিত,

‘ওম বজ্রকিলীকিলয় সর্ববিঘ্নেন বাম হুম ফট!’

পরবর্তী ক্রিয়া হল রাক্ষসের বর্ণনা দিয়ে একটা বিশেষ মন্ত্র পাঠ করে আহুতি দেওয়া। কাশীনাথের কথায় এই প্রথম তার বর্ণনা পেলাম। বিকট, ভয়াল, চোখহীন এক অপদেবতা। মুখ বীভৎস, সাদা আর তার চোখের জায়গায় দুটো গর্ত। তার সেই চোখের গহ্বরে আছে— অন্ধকার। সেই অন্ধকার যা ছিল সৃষ্টিরও আগে। আদি, প্রাচীন, সর্বগ্রাসী অন্ধকার!

এরপর… এরপর তিনবার তার নাম ডাকতে হবে। তিনবার কারণ ‘নির্বাণ’- এর তিনটে দ্বার— ত্রিরত্ন। তাই তিন সংখ্যার অনেক মাহাত্ম্য বৌদ্ধ তন্ত্রে।

‘সন্নি-যখ! সন্নি-যখ! সন্নি-যখ!’

অপেক্ষা করতে লাগলাম নিশ্বাস বন্ধ করে। এক মিনিট, দু-মিনিট, পাঁচ মিনিট। নাহ্, কিছুই অনুভব করতে পারছি না।

কাশীনাথ বললেন,

‘ভুল হচ্ছে। এটা তার নাম নয়। এই নাম তো সিংহলের বাসিন্দারা তাকে দিয়েছিল। তার আসল নাম ধরে ডাকতে হবে।’

আমার মনে পড়ল, আমি আজকে গাড়িতে গল্প বলার সময়ে মূল চরিত্রদের নামগুলো উল্লেখ করতেই ভুলে গেছি। তাই তাড়াহুড়ো করে বললাম,

‘প্রজ্ঞাধরম। পূজারির আসল নাম।’

আমার কথাটা তাঁর কানে গেল বলে মনে হল না। তাই আরেকবার বলতে গেলাম, কিন্তু থেমে গেলাম। কারণ, বুঝলাম কাশীনাথ ঠিকই শুনেছেন। কারণ, এইবার তিনি তিনবার ডেকে উঠলেন,

‘প্রজ্ঞাধরম! প্রজ্ঞাধরম! প্রজ্ঞাধরম!’

এইবার কাজ হল। কারণ, তিনবার নামটা ডাকতেই অনুভব করলাম চারপাশের পরিবেশ পালটে যেতে শুরু করেছে। ডাকা হয়েছে তাকে; এবার সে আসছে! কাশীনাথ ইশারা করতে, আমি এতক্ষণ হাতে ধরে রাখা কালো একটা কাপড় চোখে বেঁধে নিলাম। কাশীনাথের সাবধানবাণী ভেসে এল কানে,

‘গাত্রবন্ধন করো। মনে রেখো, আমার ওপর তার শক্তি বিফল হতেই তোমার ওপর আক্রমণ চালাবে সে। তোমায় সে জোর করে চোখ খোলানোর চেষ্টা করবে। তোমার মনে ভ্রম সৃষ্টি করবে! তোমায় ভয় দেখাবে! তোমার অতীতের সমস্ত ভয়কে সে তোমার সম্মুখে এনে দাঁড় করাবে। কিন্তু মনে রেখো, চোখ খুলবে না। তার মুখের দিকে দৃষ্টি পড়লেই তোমার নিশ্চিত মৃত্যু!’

‘জানি। আমি তৈরি! সে এসে গেছে, পণ্ডিতমশাই। আমি তার উপস্থিতি কাছেই অনুভব করতে পারছি।’

পায়ের নীচে মৃদু কম্পন অনুভব করছি। প্রতি মুহূর্তে সেটা বাড়ছে। একসময় সেটা প্রায় ভূমিকম্পর মাত্রায় পৌঁছোল। সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে আমি দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিলাম।

‘পণ্ডিতমশাই? আপনি ঠিক আছেন তো?’

‘হ্যাঁ। খুবই শক্তিশালী, প্রাচীন এই শয়তান। সাবধান!’

এইবার ঘরে তৃতীয় উপস্থিতি টের পেলাম। সেই অশুভ উপস্থিতি যার সম্মুখীন আমি আগের রাতে হয়েছি! তখন আমার কাছে তিনটে তন্ত্র পেরেক ছিল, যা আমায় রক্ষা করেছে। কিন্তু, এই মুহূর্তে… এই মুহূর্তে তার তীব্র অপশক্তির সামনে নিজেকে উলঙ্গ মনে হচ্ছে। তার জিঘাংসা ভরা, অন্ধকার দৃষ্টি আমি নিজের শরীরে অনুভব করছি! কী তীব্রতা সেই অশুভ দৃষ্টির! আমি নিজের গলার তাবিজ চেপে ধরে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কাশী পণ্ডিত মন্ত্র উচ্চারণ করে চলেছেন। কিন্তু, তারপরেই টের পেলাম ঘরে এতক্ষণ যে অগ্নি থেকে তাপ আসছিল সেটা আসা বন্ধ হয়ে গেল। মুহূর্তে সারাঘরে নেমে এল হিমেল ঠান্ডা।

হবন অগ্নি নিভিয়ে দিয়েছে! সর্বনাশ!

বদ্ধ ঘরের মধ্যে তীব্র হাওয়া শুরু হয়েছে। যেন মস্ত একটা সাইক্লোনের মাঝখানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে সব কিছু! কপালে এবং গায়ে কিছু জিনিস উড়ে এসে লাগল। ঘরের সব জিনিস এদিকে-ওদিকে উড়িয়ে দিয়েছে! কিন্তু… কিন্তু… তাহলে একে আটকাব কীভাবে? এই পিশাচ যে আমাদের সব আয়োজন পণ্ড করে দিচ্ছে নিমেষে! এই ক্রিয়ার শেষ আচার হল, সন্নি-যখকে বরাবরের মতো শেষ করতে গেলে এই শয়তানের কপাল এবং দুটো চোখে তিনটে পেরেক একসঙ্গে বিদ্ধ করতে হবে। তার জন্যে আমাদের তার কাছ অবধি পৌঁছোতে হবে, স্থির থাকতে হবে অন্তত কয়েকটা মুহূর্ত! কিন্তু এখন যে তার কোনোটাই সম্ভব না!

তাকে ধ্বংস দূরে থাক, এখান থেকে আমরা প্রাণ নিয়ে বেরোতেই পারব না! আমাদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ! তার শক্তি আমাদের থেকে অনেক বেশি! আমাদের মৃত্যু নিশ্চিত।

চোখ বন্ধ অবস্থাতেও টের পেলাম, সে প্রথমে ধেয়ে গেল মন্ত্র পাঠ করতে থাকা কাশীনাথের দিকে। তাঁর মুখোমুখি গিয়েই বোধ হয় সে বুঝল যে, এই ব্যক্তি অন্ধ! তার শক্তি এর ওপর নিষ্ফল। তারপরেই সেটার সম্পূর্ণ রোষ-দৃষ্টি নিজের ওপর অনুভব করলাম। রাক্ষসের কালদৃষ্টি তার শিকার খুঁজে নিয়েছে। এগিয়ে আসছে আমার দিকে। কাশী পণ্ডিতের চিৎকার কানে এল,

‘আমার সন্দেহই ঠিক ছিল! একে এভাবে আটকানো যাবে না, প্রফেসর! একে অন্য পথে আটকাতে হবে! সাবধান! যা-ই ঘটুক, চোখ খুলবে না।

আবার সেই ভয়ংকর পিশাচ ঠিক আমার মুখের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে! তার ঠান্ডা নিশ্বাসের তীব্র বিকট গন্ধ আমার নাকে লাগছে। টের পেলাম আমার শরীর জুড়ে অজস্র সরীসৃপ কিলবিল করে উঠছে! সারাশরীর জুড়ে কয়েকশো সাপ যেন হেঁটে বেড়াচ্ছে। চোখের পাতায় বিছে জাতীয় কিছু বার বার হুল ফুটিয়ে চলেছে! চোখের বন্ধন সরিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু, আমি জানি এসব শয়তানের মায়া। এগুলো সত্যি নয়, আমায় চোখ খোলানোর জন্যে আমার মনে ভ্রম সৃষ্টি করা হচ্ছে।

বিভ্রমে লাভ না হতে তার মাত্রা আরও বাড়ল। পিঠ হেলান দেওয়া দেওয়াল থেকে টের পেলাম কয়েকটা হাত বেরিয়ে এসে আমায় পেছন থেকে জাপটে ধরছে। প্রচণ্ড ইচ্ছে করছে চোখ খুলে ফেলতে। কিন্তু আমি জানি, চোখ খুললেই সামনে ভয়ংকর একটা মুখ দেখব। আর, সেটাই আমার এই জীবনে দেখা শেষ দৃশ্য হবে।

মনে হল, আমার ঠিক পাশে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে! না দেখেও আমি জানি ওটা কে! ওটা আমারই একটা ভুলের ফল। মৃতকে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে যে ভুল করেছিলাম, সে-ই। ওটার হাত, পা, মুখ, চোখ কোনোটাই সঠিক জায়গায় নেই। তার উলটো মাথাটার মাঝখানে আড়াআড়িভাবে রয়েছে একটা চোখ। তার একটা হাতের তালুতে রয়েছে মুখ। তার থেকে বেরিয়ে রয়েছে লোলুপ, কাঁচা মাংসলোভী জিভ!

চারপাশে ঘুরছে ওই চারপেয়ে প্রাণীরা। বিশালকায় নরকের কুকুররা কালো দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে। ওরা আমায় তাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়। এখুনি তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার ওপর! নিজেদের চোয়ালের মধ্যে আমায় টেনে নিয়ে যাবে নরকে!

তারপরেই আরও একটা উপস্থিতি টের পেলাম। সেই অন্ধকার, দীর্ঘকায় মৃত্যুদেব! শিনিগামি! তার একহাতে ধরা বিশাল অস্ত্রটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে। নেমে আসবে এখুনি আমারই গলায়! স্বয়ং মৃত্যুর থেকে আমি একবার পালাতে পেরেছি, অন্যের প্রাণের বিনিময়ে। কিন্তু, এইবার? এইবার সে ঠিকই খুঁজে নিয়েছে!

না, না, না! এরা এখানে আসতে পারে না! এগুলো সত্যি নয়! আমার অনুভূতিকে প্রভাবিত করছে এই শয়তান প্রেত!

দাঁতে দাঁত চেপে, সমস্ত ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে চোখ না খুলে দাঁড়িয়ে রইলাম। এখন আমার এমন অনুভূতি হচ্ছে যেন দুটো হাত আমার চোখের ওপর চাপ দিচ্ছে। কিছু যেন দংশন করে চলেছে আমার কানে ও চোখের পাতায়! প্রচণ্ড ব্যথা করছে দুটো চোখে। জ্বলে যাচ্ছে, যেন লঙ্কার গুঁড়ো ঘষে দিচ্ছে কেউ চোখে! এগুলো কি সব ভ্রম? এইবার আমার মনেও সংশয় সৃষ্টি হচ্ছে। বুঝতে পারছি, বেশিক্ষণ আমি নিজের হাতগুলোকে নিজের বশে রাখতে পারব না। আরও কিছুক্ষণ এই যন্ত্রণা চললে আমার হাত নিজে থেকেই চোখের বাঁধন খুলে ফেলবে! আমার মুখের ঠিক সামনেই এখনও তার উপস্থিতি টের পাচ্ছি স্পষ্ট। বড্ড অসহায় লাগছে!

তখনই কাশীনাথের মন্ত্র কানে এল। কিন্তু, এই মন্ত্র কেন পড়ছেন তিনি? এই মন্ত্র শিলালিপির মন্ত্র নয়। এটা মৃত আত্মাকে আহ্বান করার তান্ত্রিক মন্ত্ৰ। কোনো আত্মাকে আহ্বান করছেন তিনি। কিন্তু, কাকে ডাকছেন কাশী পণ্ডিত? কাশীনাথ পণ্ডিতকেও নিশ্চয়ই অচল করে রেখেছে শয়তান। তাই তিনিও কিছু করতে পারছেন না। কিন্তু, কাকে স্মরণ করছেন তিনি?

গমগম করে উঠল কাশীনাথ পণ্ডিতের গলা,

শ্রুতিশ্ৰী! শ্রুতিশ্ৰী! শ্রুতিশ্ৰী!’

শ্রুতিশ্রী! মানে— মানে সিংহলের রাজকুমারী! তাঁকে ডাকছেন কাশীনাথ!

ঘরে নতুন একটা উপস্থিতি টের পেলাম। তবে, এই উপস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। এই উপস্থিতি কায়াহীন। এর শুধুই উপস্থিতি আছে, শরীর নেই। সে আত্মা! এই আত্মা অশুভ নয়, আমি নিশ্চিত!

হঠাৎই চোখের ওপর থেকে চাপ ও যন্ত্রণা কমে গেল। আশেপাশের ভয়ের অনুভূতিগুলো নিমেষে উবে গেল। বুঝতে পারলাম আমি ঠিক আগের মতোই মাটিতে দাঁড়িয়ে আছি। ভূমি আর কাঁপছে না। এতক্ষণ যা যা অনুভব করেছি সব মায়া, বিভ্ৰম!

কিন্তু, দুটো অপার্থিব উপস্থিতিই এখনও বর্তমান। তারা এখনও এখানেই আছে। রাক্ষসের দৃষ্টি আর আমার ওপর নেই। অন্যত্র তার দৃষ্টি। আমি কাঁপা হাতে চোখের ওপর থেকে কালো কাপড় একটু সরিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। দেখতে পেলাম কালকের সেই আকৃতিটাকে। কালকের মতোই আমার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে। কিন্তু, দ্বিতীয় সত্তাটা আমার অচেনা।

একটি আবছায়া নারীমূর্তি। অস্পষ্ট স্বচ্ছ শরীর। অপূর্ব সুন্দরী এক নারী দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে রাজবেশ, শরীরে স্বর্ণ আভূষণ এবং সে অলংকারধারিণী। এ-ই রাজকুমারী শ্রুতিশ্রী! সিংহলের রাজকুমারী শ্রুতিশ্ৰী!

কখন যেন আমি চোখের বাঁধন খুলে ফেলেছি। দেখতে পাচ্ছিলাম রাজকুমারীর আবছায়া অবয়ব। তার দু-চোখে এখনও ভেসে আছে অসীম দুঃখ। না পাওয়ার যন্ত্রণা। সে চেয়ে আছে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তার প্রেমিকের দিকে, যে এখন এক ভয়ানক অপশক্তিতে পরিণত হয়েছে। মৃত্যুর পরেও সে ফিরে এসেছে অপূর্ণ প্রেমের জিঘাংসা পূরণ করতে। তবুও শ্রুতিশ্রী তাকে চিনতে পেরেছে। কারণ, তার দৃষ্টিতে দুঃখ, মায়া আর ভালোবাসা ধরা দিচ্ছে এই ভয়ানক পিশাচের প্রতি।

আর, এই শয়তান? সে কি চিনতে পেরেছে তার প্রেমকে?

হ্যাঁ! নিশ্চয়ই চিনেছে! তা না হলে সে আমায় ছেড়ে একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে থাকবে কেন?

সেই মুহূর্তে কাশীনাথের চিৎকার শুনলাম।

‘প্রফেসর! এবার!’

এতক্ষণে কাশীনাথ পণ্ডিতও বোধ হয় শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্তি পেয়েছেন। বিন্দুমাত্র দেরি না করে একটা পেরেক ছুড়ে দিলেন আমার দিকে। আমি জানি আমার কর্তব্য কী। এইই সুযোগ!

কাশীনাথ পণ্ডিত পিশাচের মুখোমুখি ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁর হাতের পেরেক দুটো ঢুকিয়ে দিলেন তার চোখের অন্ধকার কোটরে! আর, ঠিক সেই মুহূর্তে আমি পেছন থেকে লাফিয়ে তৃতীয় পেরেকটা ঢুকিয়ে দিলাম পিশাচের কপালের ওপরে মাথা লক্ষ করে। সেইসঙ্গেই বজ্রকিলকের তন্ত্র ত্রিভুজ সম্পূর্ণ হল!

বিকট, অপার্থিব একটা চিৎকারে সারা আকাশ, বাতাস কেঁপে উঠল। মাটিতে বসে পড়ল মূর্তিটা। তার শরীর থেকে কালো একটা ছায়ার মতো প্রলেপ যেন বাষ্পায়িত হয়ে উড়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে লাগল। কালো ছায়া সরে যেতে সেই জায়গায় দেখলাম মাটিতে ঝুঁকে, হাঁটু গেড়ে বসে আছে এক তরুণ। মুখে এখনও যন্ত্রণা আর গভীর দুঃখ তার। চোখের কোটর শূন্য।

দেখতে পেলাম ধীরপায়ে তার দিকে যে নারীমূর্তিটা এগিয়ে এল, তার দু- চোখে অশ্রু! নিজের প্রেমিকের হাজার বছরের কষ্টে সেও সমব্যথী। নারীমূর্তিটা একটা হাত বাড়িয়ে দিল তরুণের দিকে। পুরুষটি তার হাতটা ধরল। রাজকুমারী শ্রুতিশ্রী দু-হাতে পরম যত্নে প্রজ্ঞাধরমের মুখটা তুলে ধরল। ঝুঁকে নিজের মুখটা ঠিক প্রেমিকের মুখের ওপর আনল। শ্রুতিশ্রীর দু-চোখ থেকে দুটি অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল প্রজ্ঞাধরমের মণিবিহীন দুটো চোখের গহ্বরে। ধীরে ধীরে তাতে চোখ ফুটতে শুরু করল। একসময়ে পুরোপুরি দৃষ্টি ফিরে এল তার। দেখলাম, সেই পুরুষটির চোখের কোল বেয়েও জল নামছে। বহুযুগ পর নিজের প্রেয়সীকে দেখতে পাওয়ার আনন্দে।

আমার চোখের সামনেই হাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে গেল মূৰ্তি দুটো। কত শতাব্দী পর মিলিত হল দুটো হৃদয়! যারা প্রাণ দিয়েছিল ভালোবেসে, নিয়ম ভেঙে। যাদের ভালোবাসা জয় করেছে কালচক্রকে। জয় করেছে মৃত্যুকে।

১০.

ভোরের দিকে গাড়ি নিয়ে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হলাম আমরা। আসার আগে গ্রামের লোকেদের জানিয়ে আসতে ভুললাম না যে, বিপদ কেটে গেছে। দুঃখের বিষয়, এর মধ্যে বেশ কয়েকটি নিরীহ মানুষের প্রাণ গেল। গাড়িতেই দীপকদার ফোন এল। আপ্লুতভাবে জানাল যে, এইমাত্র ডাক্তার দেখে বলেছে যে, তার মেয়ের দৃষ্টি ফিরে এসেছে। ডাক্তার নাকি বলেছে, ‘ইট ইজ নাথিং লেস দ্যান আ মিরাল’।

যাক। শেষপর্যন্ত এইটা ভালো খবর। কিন্তু, কিছু ব্যাপার পরিষ্কার হচ্ছিল না আমার কাছে। গতকাল রাতের একটা খটকা আমার এখনও রয়ে গেছে।

কাশীনাথ পণ্ডিত ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন আমার পাশের সিটে বসেই। একটু বাদে তাঁর ঘুম ভাঙায় তাঁকেও ময়নার দৃষ্টি ফিরে আসার সুসংবাদ দিলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম,

‘আচ্ছা, পণ্ডিতমশাই, আপনি কীভাবে জানলেন যে, রাজকুমারীর আত্মাকে ডাকলে এই রাক্ষসকে আটকানো যাবে?’

আড়মোড়া ভেঙে কাশী পণ্ডিত উত্তর দিলেন,

‘আসলে, যে অপসত্তার সৃষ্টি হয়েছিল না পাওয়া ভালোবাসা থেকে, তাকে একমাত্র তার হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসাই আটকাতে পারে। সন্নি-যখকে শেষ করার একমাত্র উপায় প্রজ্ঞাধরমের আত্মাকে মুক্তি দেয়া। অতএব, তাকে আটকানোর সব পদ্ধতি বিফল হওয়ায় শেষ চেষ্টা হিসেবে রাজকুমারীর আত্মাকে আহ্বান করি।’

‘উফ! আপনি এটা সময়মতো না ভাবলে যে কী হত, পণ্ডিতমশাই!’

‘না, প্রফেসর সাহেব। তুমিই তো এর মূল কাণ্ডারি। তোমার সাহস আর বুদ্ধি ছাড়া এই অসম্ভব কার্য সম্ভব ছিল না আমার একার পক্ষে। তবে, প্রেতের মুক্তি হলেও, সিংহলের মুক্তি নেই। প্রজ্ঞাধরমের অভিশাপ বৃথা যায়নি।’

‘মানে?’

শ্রীলঙ্কার অবস্থা তো গত কয়েক বছরেই দেখলে।’

সব শেষ হয়েও কিছু একটা যেন শেষ হচ্ছিল না। কিছু একটা বিষয় মনের মধ্যে খটকা দিচ্ছে। কিছু একটা মিসিং। কিন্তু সেটা কী— তা মনে করতে পারছি না। আরও কয়েক ঘন্টা ড্রাইভ করার পর প্রথমে গেলাম কাশী পণ্ডিতের বাড়ি। তাঁকে ছেড়ে দিয়ে নিজের বাড়ি যাব আমি। গিয়ে ঘুম! গত দু-রাত ঘুম প্রায় হয়নি বললেই চলে। কাশী পণ্ডিত আমায় বিদায় দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজা খুলে ঢোকার আগেই আমার মাথায় একটা কথা এল। তাঁকে পিছু ডাকলাম,

‘পণ্ডিতমশাই! একটু দাঁড়ান। একটা বিষয় বুঝলাম না… ‘

কাশীনাথ কালো চশমা খুলে, তাঁর জ্যোতিহীন দৃষ্টি আমার দিকে ফেরালেন। তাঁর ঠোঁটে হালকা হাসি। যেন তিনি জানেন আমি কী প্রশ্ন করব।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

‘আমি শিলালিপি পড়ে জানা কাহিনি আপনাকে শুনিয়েছিলাম। মন্ত্ৰ অনুবাদও আমার থেকেই আপনি শুনেছিলেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে, পুরোহিত বা রাজকুমারীর নাম আমি আপনাকে নিজে বলিনি শিলালিপিতে বর্ণনা করা কাহিনি শোনানোর সময়। কিন্তু, গতকাল রাতে আমার প্রথমে মনে হল প্রেতকে ডাকার সময় আপনি আগে থেকেই প্রজ্ঞাধরমের নামটা জানতেন।’

কাশীনাথ উত্তর দিলেন না। আমি আবার বললাম,

‘এরপর আপনি শ্রুতিশ্রীর নাম ধরে তার আত্মাকে আহ্বান করলেন। অথচ, আমার স্পষ্ট মনে আছে, এই নামটা আমি আপনার সামনে একবারও উল্লেখ করিনি। তাহলে আপনি কাল রাতে তার নাম ধরে কীভাবে ডাকলেন? আপনি কি তবে আগেই জানতেন প্রাচীন সিংহলের এই ঘটনা? কিন্তু, কীভাবে?’

উত্তরটা কাশী পণ্ডিত সরাসরি দিলেন না। বরং, একটা অদ্ভুত কথা বললেন,

‘তুমি কি জানো? তন্ত্রমতে, বহু সাধনা একজন্মে পূরণ হয় না। শুধু তাই নয়, খুব শক্তিশালী অপশক্তি তার চিহ্ন জন্মান্তরেও রেখে যায়। যেমন ধরো, কোনো ব্যক্তি যদি অতিপ্রাকৃত শক্তির আঘাতে দৃষ্টি হারিয়ে থাকে মৃত্যুর ঠিক পূর্বে, তবে কিন্তু পরের জন্মেও তার অন্ধ হয়ে জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। ‘

‘ম… মানে?’

‘আমি ক্লান্ত, প্রফেসর। তুমিও ক্লান্ত। যাও। এবার বাড়ি যাও। আবার দেখা হবে।

কথাটা বলেই নিজের ঘরে ঢুকে দরজা দিলেন কাশী পণ্ডিত। আমি হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম গাড়ির স্টিয়ারিং-এ। কীসের কথা বলতে চাইলেন তিনি? কার কোন অপূর্ণ কাজ? জন্মান্তর? কার কথা বললেন?

কয়েক মুহূর্ত বুঝলাম না তাঁর কথার মানে। তারপরেই বিদ্যুতের মতো একটা সম্ভাবনা মাথায় এল। শিলালিপির পদ্ধতিতে শয়তানকে কাবু করা সম্ভব নয়, এই কথাটা সে-ই জানতে পারে যে আগেও সেই তন্ত্র ক্রিয়া ব্যবহার করে বিফল হয়েছে। তাকে শেষ করতে না পেরে বন্দি করেছিল, নিজের দৃষ্টি ও প্রাণের বিনিময়ে। যার কার্য অসম্পূর্ণ থেকে গেছিল আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে সে হল মহাসিদ্ধি গোরক্ষনাথ! প্রেতের অন্ত না করেই তার মৃত্যু হয়েছিল

সে-ই কি মৃত্যুর পূর্বে নির্দেশ দিয়ে গেছিল যেন এই রাক্ষসকে বন্দি করা প্রস্তরখণ্ডটা এই বাংলায় কোথাও এনে রাখা হয়? কারণ, সে জানত যে পরজন্মে তার জন্ম হবে এই বাংলায়? আগের জন্মের অপূর্ণ কাজ পরের জন্মে শেষ করলেন মহাসিদ্ধি। কাশীনাথ কি নিজের পূর্বজন্মের পরিচয় আগেই জানতেন? মনে হয় না। সম্ভবত, নার্সিং হোমে ময়নার দৃষ্টিতে সন্নি-যখের মূর্তি দেখেই তাঁর পূর্বস্মৃতি ফিরে এসেছিল। সেই কারণেই ওরকম পরিবর্তন এসেছিল কাশীনাথের মধ্যে। কারণ, পূর্বজন্মের স্মৃতি তাঁর ফিরে এসেছিল হাসপাতালে। মহাসিদ্ধি গোরক্ষনাথই কি তবে এই জন্মে…?

নাহ্… আর ভাবতে পারছি না আমি। আমার মাথাটা গুলিয়ে যাচ্ছে। বাড়ি গিয়ে ঘুমের বড়ো প্রয়োজন।

গাড়ি স্টার্ট দিলাম আমি। থাক। এইসব প্রশ্নের উত্তর তোলা থাক আগামীর জন্যে। উত্তর না পেলেও ক্ষতি নেই। সব প্রশ্নের উত্তর জানতে নেই।

আপাতত একটা অন্ধকারকে পরাস্ত করা গেছে। শুভর জয় হয়েছে অশুভকে হারিয়ে। আলো জয় করেছে অন্ধকারকে।

কে জানে আবার কবে ওই অন্ধকার জগতের কেউ বা কিছু উঁকি দেবে আমাদের জগতে। কে জানে কোন ভয়ংকর অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করে আছে আমার জন্যে আগামীতে…।

.

Author’s Note:

১। ফুরবা (Phurba)/ ফুরপা— তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মে ব্যবহৃত একটি অতি শক্তিশালী অস্ত্র। এটি কাঠ বা ধাতু দিয়ে বানানো তিনকোনা গজাল বা পেরেক বিশেষ। সাধারণত অশুভকে আটকাতে এর ব্যবহার হয়ে থাকে। তন্ত্রমতে এই এক-একটা পেরেকে অধিষ্ঠিত থাকেন মহা ভয়ংকর ‘বজ্রকিলয়’ দেবতা। তবে, তিনটে তন্ত্র-পেরেকের একসঙ্গে ব্যবহারের কথা শোনা যায় না। জানলে আশ্চর্য হবেন যে, আমাদের বাংলায় তন্ত্রমতে ‘কিলয়’ (কিল— মানে পেরেক)-এর ব্যবহার আছে। এর আদি ইতিহাস আসলে এই ফুরবা।

২। বজ্রকিলয়— নীলবর্ণ এই দেবতা তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের এক অতি শক্তিশালী এবং ভয়ংকর দেবতা হিসেবে পরিচিত। তাঁর ছয় বাহু, ছয় পদ এবং তিন মস্তক। তাঁর সঙ্গে সবসময় তাঁর সঙ্গিনী নীলবর্ণ দেবী দীপ্তচক্র থাকেন। তাঁর তিনটে পায়ের নীচে দু-জন রাক্ষসকে তিনি পিষে রাখেন, যা অশুভ নাশ করার চিহ্ন। বজ্রকিলয় দেব অধিষ্ঠিত থাকেন ফুরবা-তে। বেশিরভাগ সময় তাঁর তিনটে মাথা খোদাই করা থাকে ফুরবার হাতলের মাথায়।

৩। বজ্রযান— ‘যান’ যা মানুষকে তার উদ্দেশ্যে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। সেই কারণেই বৌদ্ধ ধর্মের এক-একটি শাখাকে ‘যান’ বলা হয়। এর দুটো শাখা, হীনযান এবং মহাযান। মহাযান পরবর্তীকালে আরও দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এর মধ্যে বজ্রযান হল তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম। সবচেয়ে ভয়ংকর তন্ত্রক্রিয়া সমস্ত এরই অংশ। এই শাখার গোড়াপত্তন করেছিলেন কিছু প্রচণ্ড শক্তিধর মহাযোগী, যাঁদের মহাসিদ্ধি নামে সম্বোধন করা হত। মহাসিদ্ধি গোরক্ষনাথ তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

৪। শ্রীলঙ্কায় প্রচুর প্রাচীন বুদ্ধমন্দির আছে। যদিও এখানে তন্ত্রযানের প্রচলন ছিল না। তারা আদি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিল। এই গল্পে উল্লিখিত মন্দিরটি বাস্তবে ছিল।

৫। সন্নি-যখ— প্রাচীনকালে সমস্ত রোগ-জরাকেই অপদেবতার অভিশাপ বলে বিশ্বাস করা হত। অন্ধত্বকে মনে করা হত সন্নি-যখ নামের এক দেবতার অভিশাপের ফল। তাকে দূরে রাখতে অনেক সময় তামিল গৃহস্থরা তাদের বাড়ির বাইরে একধরনের কানা সন্নি-যখের মুখোশ রাখত। তাদের বিশ্বাস এই মুখোশ এই অপদেবতাকে দূরে রাখে।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *