রাজপাট – ১১

১১ 

কার্তিক মাসেতে কন্যা 
তুলসির গোড়ে বাতি। 
ঘুরি আসে তোমার সাথ 
কান্দে লইয়া ছাতি। 

রাত্রে চাটুজ্যেবাড়ি ও বরকত আলির বাড়িতে ভাগাভাগি করে থেকে গেলেন অতিথিরা। সকালে লুচি, আলুর দম ও ঘরে তৈরি সন্দেশ দিয়ে প্রাতরাশ হল চাটুজ্যেবাড়িতেই। তারপর সরকারি অতিথিরা বিদায় নিলেন। খেতে খেতে বরকত আলি ভৈরবের পাড় বাঁধাবার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন একবার। তাঁকে পৃথকভাবে এই বিষয়ের জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছে। 

সরকারি অতিথিরা চলে যেতেই সিদ্ধার্থকে নিয়ে পড়লেন বরকত আলি। তাকে সঙ্গে করে গ্রাম দেখাতে চান তিনি। এতবার এসেছে, কিন্তু গোটা গ্রাম ঘুরে দেখার কথা কখনও মনে হয়নি তার। গ্রামে ঢুকে মোহনলালের বাড়ি পর্যন্ত যে-রাস্তা, তাকেই সে চিনেছে ভালরকম। আজ সে বরকত আলির সঙ্গে যেতে রাজি হল কারণ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের পক্ষে ঘোরাঘুরি ও জনগণের মধ্যে প্রবেশ করতে পারা সংগঠনের সহায়ক। এই অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ে কিছু খবরাখবরও বরকত আলি তাকে সরবরাহ করবেন বলে মনে হল। 

গতরাতে ভাল ঘুম হয়নি বলে বন্ধুরা কেউ বেরুতে চাইল না। তারা বরং শুয়ে-বসে কাটানোই বেশি পছন্দ করল। একাই সে বেরুল বরকত আলির সঙ্গে। তাঁদের সঙ্গে রইল নানা বয়সের আরও পাঁচ-সাতজন। তারা সিদ্ধার্থ ও বরকৃত আলির সঙ্গে কিছু ব্যবধান রেখে চলতে থাকল। দেখতে দেখতে সিদ্ধার্থর মনে হল, বড় অপরিচ্ছন্ন এ গ্রাম। বরকত আলির বাড়ি, চাটুজ্যেবাড়ির বা সেনদের বাড়ি যে-ভাগে, তাকে দেখে গোটা গ্রাম সম্পর্কে অনুমান করলে ভুল হবে। ভেতরের দিকে পথ অপরিসর। উঁচু-নিচু কর্দমময়। পথের দু’ ধারে গা ঘেঁষাঘেঁষি মাটির বা ইটের বাড়ি। বাড়ির সামনে রোগা ও ন্যাংটো শিশুরা খেলা করছে কাদার ওপরেই। হয়তো বর্ষায় জল জমেছিল। তার থেকে উৎপন্ন কাদা আর শুকোতে পারেনি কারণ সেখানেই বাঁধা গোরু-মোষের গোবর ও চোনা ক্রমাগত প্রবেশ করছে কাদায়। খেলতে খেলতেই শিশুরা যত্র-তত্র বসে পড়ে মল-মূত্র ত্যাগ করছে। মাছি ভনভন করছে। কোনও কোনও জায়গা রীতিমতো পূতিগন্ধময়। 

বরকত আলি দেখাচ্ছেন—ওই হল মসজিদ। গ্রামের মানুষের টাকায় তৈরি। এমনকী চাটুজ্যে আর সেনরাও দিয়েছে তাদের অনুদান মসজিদ তৈরির জন্য। এই মসজিদের প্রত্যেকটি ইট এই গ্রামের মাটিতে, গ্রামের মানুষের দ্বারা তৈরি। এমনকী গোটা বাড়িটি নির্মাণ করেছে গ্রামেরই রাজমিস্ত্রি করম মণ্ডল। খুব বড় মিস্ত্রি সে। কলকাতাতেও এমনকী কদর পেয়ে যায়। করম মণ্ডল হল মুসলিম লিগের নেতা। 

সিদ্ধার্থ দেখল মসজিদ। একটি সুন্দর ছিমছাম দোতলা বাড়ি। সামনে অনেকখানি খোলা জায়গা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এ গ্রামেরই মানুষ এই মসজিদকে পরিচ্ছন্ন রাখে। 

মসজিদ পেরিয়ে আবার ফসলি জমি। সামনে একটি বটতলা বাঁধানো রয়েছে মজলিশের জন্য। এখান থেকে বসতি পশ্চিমদিকে বাঁক নিয়েছে। বাঁকের মুখে ছোট একতলা স্কুলবাড়ি।— তৈরি হয়েছে মাত্র দু’বছর আগে। যুধিষ্ঠির সেনের মেয়ে কবিতা মাধ্যমিক পাশ হয়ে বসেছিল। পড়ানোর কাজটা সে-ই পেয়ে যায়। আরও একজন শিক্ষক দরকার এই স্কুলে। কিন্তু বাইরে থেকে কেউ-ই আসতে চায় না। এ গ্রামে মাধ্যমিক পাশ ছেলেমেয়েও আর নেই। স্কুলই ছিল না বলে এ গ্রামের ছেলেমেয়েদের মধ্যে পড়ার রেওয়াজ ছিল না। কবিতা হরিহরপাড়ার স্কুলে নাম লিখিয়ে এসেছিল। শুধু পরীক্ষা দিয়ে আসত। এমনকী সে মাধ্যমিকও পাশ করেছে এমনই ব্যবস্থাপনায়। যদি এই স্কুলের মান উন্নত করা যায় তা হলে গ্রামের শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাবে। 

নিরন্তর কথা বলছিলেন বরকত আলি। সিদ্ধার্থ শুনছিল। সে ভাল বক্তা। ভাল শ্রোতাও। এখন সে শ্রোতার ভূমিকা পালন করছে। বরকত আলি তাকে দেখাচ্ছেন একটি খুঁটি। আর খুঁটির চারপাশ ঘেরা তিন টুকরো জমি। এই সেই সীমানাবিন্দু, যেখানে মিশেছে তিন থানার অধিকার এই তিনটুকরো জমির একটি ডোমকল থানার। একটি নওদা থানার। একটি হরিহরপাড়ার। তেকোনা গ্রাম এখানেই তার নামের সকল বিশেষত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 

সিদ্ধার্থ ভাবছিল, তা হলে কি এই গ্রাম তিনটি পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চলের মধ্যবর্তী হিসেবে বহু আগে থেকেই চিহ্নিত? কত আগে থেকে? বর্তমান থেকে উলটোপথে হাঁটতে হাঁটতে আদিতে পৌঁছে যেতে ইচ্ছে করে তার। কারণ ইতিহাস সে ভালবেসেছিল। ইতিহাসের প্রতি তার আছে এক আন্তরিক আকর্ষণ। কিন্তু ইতিহাসের সঙ্গ করার সময় নেই তার। সমস্ত সময় সে দিয়েছে রাজনীতিকে। বহরমপুর শহরের নানাজনের নানা সমস্যায় সে হস্তক্ষেপ করে। তা ছাড়া সংগঠনের কাজে সে নিয়োজিত থাকে যতখানি বেশি সময় সম্ভব। জনসংযোগ করে। বিভিন্ন পাড়ায় ও বস্তিতে বিভিন্নরকম মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে। সে একবার যাকে জানে, তাকে আর ত্যাগ করতে পারে না। ত্যজন তার স্বভাবে নেই। এমনকী খারাপ বা বদমায়েশ হিসেবে চিহ্নিত কোনও ব্যক্তি সম্পর্কেও সে কোনও বিরূপতা লালন করতে পারে না। তার বিচার-বিশ্লেষণ সবই নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে। সে ভাল-মন্দ তারই নির্ধারণ করে যে দলের মধ্যে প্রধান হয়ে দেখা দেয়। সাধারণ মানুষ তো দোষগুণ সংবলিত হবেই। 

এইভাবে ঘুরে ঘুরে সংগঠনের কাজ করতে গিয়ে সে জীবনের কাছ থেকে গ্রহণ করে চলেছে শিক্ষা। এই শিক্ষার কোনও শেষ নেই। সে কেবল তার মনকে গ্রহণ করার জন্য সদাপ্রস্তুত রাখে। এভাবেই সে উপলব্ধি করেছে, ভাল করার মধ্যে দিয়ে মানুষের যত কাছাকাছি আসা যায়, আর কোনও কিছুর মধ্যে দিয়েই তা সম্ভব হয় না। এমনকী এই কাছাকাছি আসার মধ্যে দিয়ে বিপুল আস্থা পর্যন্ত অর্জন করা সম্ভব। আর জনগণের আস্থাই একজন নেতার পক্ষে সর্বোত্তম মর্যাদার। সিদ্ধার্থর ক্ষমতা নগণ্য, তবু সে সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। স্কুল পর্যায় থেকে রাজনীতি করে বলেই সম্ভবত, যে-কোনও শ্রেণির মধ্যে মেলামেশার ক্ষমতা তার আছে। বহরমপুরে সে গড়ে তুলছে তার একান্ত আস্থাভাজনের দল। এই দল তার কথামতো কাজ করে। যে-কোনও কাজ। এই দলে ঝাড়ুদার রিকশাওয়ালা থেকে গুন্ডা-বদমায়েশও আছে। যেমন কাবুল মির্জা। বহরমপুরে কাবুল মির্জাকে চেনে না এমন কেউ নেই। সিদ্ধার্থর সঙ্গে তার গভীর সংযোগ। মির্জার মতো মানুষকে পুরোপুরি সৎপথে নিয়ে আসার মহান ব্রত গ্রহণ করা সম্পর্কে সিদ্ধার্থ কখনও আগ্রহ প্রকাশ করেনি। সে শুধু দেয় মানুষের মর্যাদা আর দরকার মতো মানবিক কিছু কর্মও তাদের দিয়ে করিয়ে নেবার অপেক্ষা রাখে। 

.

স্কুল পেরিয়ে গেলেন বরকত আলি। গ্রামের বসতি এখানে শেষ হয়ে অপার শস্যক্ষেত্রে মিশে গেছে। এই হেমন্তের ভরা ক্ষেত বড় সুন্দর। একে দেখলে পৃথিবীর আর কোনও কলুষ-কালিমার কথা মনে আসে না। নোংরা পূতিগন্ধময় বসতির থেকে চোখ ফিরিয়ে সিদ্ধার্থ কিছুক্ষণ অপলক দেবল ওই ক্ষেতের রূপ। যেন বিছিয়ে আছে একখণ্ড ভারতবর্ষ—এমনই ভাবনায় আবেগদীপ্ত হল সে। কিন্তু ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে ফের তার নাকে এল পূতিগন্ধ। আলের ধারে ধারে সবুজের অপরূপ সৌন্দর্যের মধ্যে মলত্যাগ করে গেছে মানুষ। হাওয়ায় ভাসছে তারই গন্ধ। সেগুলি দৃশ্যকে কলুষিত করছে। হাওয়াকে করছে দূষিত। সিদ্ধার্থ আর থাকতে না পেরে রুমাল বার করে নাক চাপল। বরকত আলি তা লক্ষ করে বললেন— শালারা আর হাগার জায়গা পায় না। কী নোংরা! থুঃ! 

তাঁর অনুসরণে বাকিরাও নিষ্ঠীবন ত্যাগ করে পরপর। বরকত আলি বিবৃতি দিয়ে চলেন। মাত্র তিন-চারটি গৃহেই আছে বিজ্ঞানসম্মত পয়ঃপ্রণালী। বাকি সকলের প্রকৃতি ভরসা। নদীর ধার আছে, বাঁশবাগান, ক্ষেত-জমি। ভোরবেলা ঘটি হাতে যে যেখানে পারে কাজ সারে। ফাঁকা জায়গা মল-মূত্রে ময়লা করে রাখে। সিদ্ধার্থর গা গুলিয়ে উঠছিল। সে তবু ফিরে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করল না। 

প্রাচীন এই গ্রাম। এখানে বড় স্কুল নেই। হাসপাতাল নেই। বিদ্যুৎ নেই। পয়ঃপ্রণালী নেই। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ন্যূনতম চাহিদাও এখানে পূরিত হয়নি। সে কী ত্যাগ করবে! কোনটা পরিহার করবে। জনচেতনায় যদি পরিচ্ছন্নতা বোধটুকুও না জন্মায়, তার দায়ভাগী সে নিজেও কিছুটা হয়ে পড়ে না কি? এ কোন প্রগতি যা নিয়ে সরকারিভাবে তারা গর্ববোধ করে? 

সে বরকত আলির সঙ্গে সঙ্গে যায়। এক সুদূরবিস্তৃত বড় খাল তার চোখে পড়ে। মজাগঙ্গা। বরকত আলি বুঝিয়ে দেন। দূরে, ভৈরব যেখানে পশ্চিমে প্রায় লম্বভাবে বাঁক নিয়েছে সেখানে মজাগঙ্গা ভৈরবে মিশেছে। বর্ষার পর মাস দুয়েক জলে ডুবে থাকে মজাগঙ্গা। নদীর স্মৃতির মতো। কেন-না মজাগঙ্গা নদীই ছিল একদা। হয়তো ভৈরবের অববাহিকা। কিংবা কে জানে, কত শত বৎসর আগে, স্বয়ং গঙ্গারই খাত ছিল এখানে! যদি ভৈরবের অববাহিকা হয় এই খাল, তা হলে ভৈরব আবার এই খাতে ফিরে আসতে পারে। তখন? বরকত আলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যাখ্যা করেন। তখন ধুয়ে-মুছে যাবে তেকোনা গ্রাম। অতএব ভৈরবের পশ্চিমপাড় বাঁধানো খুবই প্রয়োজন বলে তাঁর ধারণা। ইতিমধ্যে অনেকখানি জমি নদের গর্ভের ধন হয়েছে। 

সিদ্ধার্থ লক্ষ করল, মজাগঙ্গার অংশটি অন্যান্য জমির চেয়ে নিচু। জল নেমে গেলে এখানে চাষ হবে। কিন্তু ভৈরব এতদূর চলে এলে সত্যি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তেকোনা গ্রাম। 

বরকত আলি হাত কচলে তাঁর বক্তব্য আরও প্রশস্ত করেন তখন—জেলাশাসকের কাছে বা সেচদপ্তরে যদি এ নিয়ে একটু তদ্বির করা যায়! আপনাদের আদেশের অপেক্ষায় আছি। আপনি যদি একবার রাসুবাবুকে বলেন। রাসুবাবুর কথা ছাড়া, সাহায্য ছাড়া এ কাজ হয় কী করে! আপনি তো রাসুবাবুর কাছের লোক। তা ছাড়া আপনি আমাদের মোহনের বন্ধু। আপনাকে আমরা এ গাঁয়ের ছেলে বলেই মনে করি। 

সিদ্ধার্থ তাকাল বরকত আলির দিকে। তার অস্বস্তি হচ্ছিল। স্কুলে পড়াকালীন সে যখন মোহনলালের সঙ্গে এ গ্রামে এসেছে তখন বরকত আলির ছেলেরা ছিল তার খেলার সঙ্গী। এখন এই মানুষ তাকে আপনি-আজ্ঞে করছেন। সে কথাটা বলি-বলি করেও বলল না। বরং বরকত আলির উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করল। পাড় বাঁধাবার জন্য আন্দোলন করতে চাইছেন। ভাল কথা। মুর্শিদাবাদের যে-কোনও জায়গা থেকেই এই আন্দোলন শুরু করা যায়। কিন্তু তার কেবলই মনে হচ্ছে, এই মানুষটির আরও কিছু বলার আছে। 

তারা এগিয়ে চলেছিল বাঁশবাগানের দিকে। এই বাগানের কাছেই বরকত আলি ও সেনদের কাজিয়া করা জমি। সিদ্ধার্থ বরকত আলির কথার কোনও জবাব দেয়নি এখনও। নিজের মতো দেখছিল ও ভাবছিল সে। বরকত আলি ভাবলেন, তাঁর কিছু-বা কম হয়েছে বলা। যেন তিনি যথার্থ বুঝিয়ে বলতে পারেননি যা বলতে চান। এই পঞ্চায়েত সি পি আই এম-এর দখলে। মুসলিম লিগ সমর্থিত হলেও আসন সি পি আই এম-এর। এই আসন যে ধরে রাখা দরকার তা সিদ্ধার্থকে বোঝানো উচিত। তিনি তখন বলতে শুরু করলেন আগামী নির্বাচনের কথা। তাঁর হিসেব। তাঁর প্রত্যাশা। মুসলিম লিগ যদি সমর্থন তুলে নেয়, তা হলেও, পাড় বাঁধাবার কাজ শুরু করতে পারলে সি পি আই এম-এর জয় সুনিশ্চিত হতে পারে। 

সিদ্ধার্থের কাছে বরকত আলির প্রকৃত উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যায় তৎক্ষণাৎ। সকল কল্যাণের মূল উদ্দেশ্য নির্বাচন। আসনের জন্য লড়াই। সে বরকত আলির দিকে তাকিয়ে হাসে। বরকত আলি তার জন্য পুলক অনুভব করেন। তাঁর এটুকু বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, বহরমপুরের নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ হতে পারলে তাঁর ক্ষমতা শতগুণে বৃদ্ধি পাবে। এবং স্বয়ং জেলা সম্পাদক রাসবাবুর কাছাকাছি যেতে পারলে বরকত আলি একজন গণ্যমান্য নেতা! তাঁর মনের তলায় স্বপ্ন লকলক করে। কে জানে, কোনও দিন, কোনও একদিন, হয়তো, হয়তো, হ্যাঁ-হ্যাঁ-হ্যাঁ এম এল এ-হ্যাঁ-এম এল এ-— হা হা—এমেলে হতে পারবেন তিনি! ইয়া আল্লা! লোকে বলবে বরকত আলি এমেলে। হবে না কেন? হবে না-ই বা কেন? যারা এখন এম এল এ, এমপি তারা সকলেই তো আর গভ থেকে স্খলিত হওয়া মাত্রই এম এল এ, এম পি হয়নি। তাদেরও হামাগুড়ি দিতে হয়েছে। অপূর্ব পরিতোষে তাঁর হৃদয় পূর্ণ হয়ে যায়। তিনি সিদ্ধার্থর দিকে আপ্লুত চোখে তাকান। তখন সিদ্ধার্থ কথা বলে—ওই অতখানি জমিতে চাষ নেই কেন? 

বরকত আলি মুখ করুণ করেন—সে আর কী বলব দুঃখের কথা। আজ কত বৎসর হল ওই জমি নিয়ে সেনদের সঙ্গে কাজিয়া আমার। 

—তাই? কী হয়েছিল? 

—দশ বৎসর আগেকার কথা। দশরথ সেন আমার কাছে ওই জমি বাঁধা রেখে কর্জ নিয়েছিল। পাঁচ হাজার টাকা। তা ধরেন দশ বৎসরে পাঁচ হাজার টাকার কত মূল্য বেড়েছে। সঙ্গের সুদ যদি নাও ধরি। জমির মূল্যও বেড়েছে। কিন্তু ওই জমি তো আর বেচতে পারব না আমি। একবার বন্যায় সব কাগজপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। আমার আর সব জমির নকল দলিল করিয়ে নিয়েছি। কিন্তু এই জমির হয়নি কারণ বন্যার পর থেকে সেনরা বলছে দশরথ সেন দেনা শোধ করে দিয়েছিল। অতএব এই জমি তাদের। দশরথকাকা বেঁচে থাকলে এরকম হত না। এই গ্রামের লোক সব জানে। কিন্তু যুধিষ্ঠির সেন আদালতে গেল। কী বলব আপনাকে। এই জমি আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ছেড়ে যদি দিই, লোকে বলবে এতদিন মিথ্যা বলছিলাম। এখন কথা হল, আমি সুদের কারবার করি না। লোকে দরকারে ধার চাইলে দিই। যে যার সুবিধামতো এটা ওটা বাঁধা দেয়। আমার ধর্মে সুদের কারবার গুনাহ্ জানেন তো? সেনরা যদি আমাকে জমিটা লিখে দিত, আমি ওদের সব টাকা মকুব করে দিতাম। 

—আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন তো অর্জুন সেন? 

—হ্যাঁ। এবারেও দাঁড়াবে। 

—জমির ব্যাপারটা নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে ফেলা যায় না? 

—কীভাবে? 

—দু’জনে ভাগাভাগি করে নিলেন। 

—আমার আপত্তি ছিল না কিন্তু তারা রাজি হবে বলে মনে হয় না। 

—আপনি প্রস্তাব করুন। আদালত-উকিল করে তো আপনাদের দু’জনেরই টাকা যাচ্ছে।

—কিন্তু মধ্যস্থ কে হবে? 

—দেখি। মোহনের সঙ্গে কথা বলব। তবে চাচা, পাড় বাঁধানোর আন্দোলনের আগে আরও একটা জরুরি কাজ আছে। তার জন্য আপনার সাহায্য চাই। 

—আমার সাহায্য! 

বরকত আলি খুশি এবং গর্বিত হয়ে ওঠেন। সিদ্ধার্থকে নিয়ে গ্রাম দেখতে বেরিয়েছেন প্রধান। অতএব কৌতূহলী লোক বাড়ছিল। এখন মাঠের কাজ ফেলে অনেকেই তাঁদের পাশে। তাঁদের খানিক তফাতেই বড় বৃত্ত রচিত হয়েছে। সিদ্ধার্থ সকলকে আরও এগিয়ে আসতে বলে এবং বক্তৃতার রকমে ময়না বৈষ্ণবীর বৃত্তান্ত অবগত করায়। শেষ পর্যন্ত বলে—এ ঘটনা এ জেলায় নতুন নয়। বরং এত ব্যাপক যে জনগণকে সতর্ক করার জন্য কয়েকটি বেসরকারি সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা এ ব্যাপারে গ্রামে গ্রামে কাজ করছে। যেখানে দারিদ্র্য আছে সেখানেই এমন ঘটনা ঘটতে পারে। ভারতবর্ষ একটি গরিব দেশ। এ দেশে আছে আন্তর্জাতিক নারীপাচার চক্র। এখান থেকে মেয়েদের নিয়ে বড় বড় শহরের নিষিদ্ধপল্লিতে বিক্রি করে দেওয়া হয়। দারিদ্র্য বা অজ্ঞতার সুযোগে কাজের লোভ দেখিয়ে বা বিয়ে করে ঠকানো হয় তাদের। কখনও দেশের বাইরেও পাচার করা হয়। কোনওদিন আপনাদের গ্রামের মেয়েটিও এসবের শিকার হতে পারে। সুতরাং, আপনাদের ঘরের পাশেই যদি হয়ে থাকে এরকম ঘটনা—তার জন্য আপনাদের প্রতিবাদ করা উচিত। 

গুঞ্জন উঠল ভিড়ের মধ্যে। এবম্বিধ বিষয়ে অনেকেই অবগত আছে। এর মুখে ওর মুখে দূরের খবর ঘরে এসে পড়ে। বিয়ে করে নিয়ে গেল, আর কোনওদিন ফিরল না। কাজের লোভ দেখিয়ে নিয়ে গেল। আর হদিশ নেই। শোনা যায় ঠিকই। সাময়িক আলোচনা হয়। তারপর সবাই ভুলে যায়। নিজের ঘরে যদি এমন ঘটনা পায়ে পায়ে চলে আসে, তখন কিন্তু বোঝা যায় না। সন্দেহ হয় না কোনও লোককে। মনে হয়, এ তো দিব্যি ভদ্র ভালমানুষ। মানুষ প্রত্যাশা করে অপরাধ দোষী ব্যক্তিটির চোখে-মুখে লেগে থাকে বুঝি-বা। বাস্তবে তা হয় না। অপরাধীর চোখ-মুখ সাধারণ, নির্ভেজাল সাদাসিধে। কখনও কখনও অপরাধের ইচ্ছা চোখের মণি হয়ে ওঠে। কিন্তু অপরাধে অভ্যস্ত মানুষ তা আড়াল করে নেয় সহজেই। 

সমবেত জনতার মনে পড়ল দাফালিদের মেয়েটার কথা। ইদরিশের বউয়ের দিদি। সেই যে বিয়ে হয়ে গেল মেয়েটার, আর একটিবারের তরেও ফিরল না। হতে পারে সে-ও কোনও চক্রের কবলিত। তবে ঘোষপাড়ার মঠের মতো এমন প্রাচীন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এ কর্মে লিপ্ত হতে পারে—এ কথা বিশ্বাস করতে তাদের কষ্ট হয়। 

সিদ্ধার্থ প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছিল। এবার সে বলল— আপনারা আশেপাশের গ্রামে খবর ছড়িয়ে দিন। আমরা এটা নিয়ে আন্দোলন করব। বরকতচাচা আমাদের নেতৃত্ব দেবেন। 

বরকত আলি হকচকিয়ে গেলেন। জনতা হর্ষধ্বনি করল। সিদ্ধার্থ বলল— আমরা প্রথমে হরিহরপাড়ায় অমরেশ বিশ্বাসের কাছে যাব। ওঁকে গোটা ব্যাপারটা বলা দরকার। প্রয়োজন হলে ওঁকে সঙ্গে নিয়ে থানায় যাব ঘোষপাড়া মঠের প্রধান ও শংকর নামের লোকটিকে গ্রেপ্তার করার দাবি জানাতে। থানা আমাদের দাবি মেনে নিলে ভাল। কিন্তু যদি না নেয় তখন বরকতচাচার নেতৃত্বে আপনারা এগিয়ে আসবেন। হরিহরপাড়া থানায় আমরা গণদাবি জানাব। 

সমবেত মুখগুলি প্রায় একইরকম লাগে দেখতে। আলাদা করে চেনা যায় না। বোঝা যায় না আন্দোলন করতে তারা আদৌ আগ্রহী কি না। সিদ্ধার্থ তাদের কাছে নতুন। সে জানে, এই এলাকার মানুষের সমর্থন পেতে গেলে তাকে বরকত আলির ওপর নির্ভর করতে হবে। অতএব সে বরকত আলিকে নেতা হিসেবে ঘোষণা করতে দ্বিধা করেনি। সকলকে যে-যার কাজে যেতে বলে সিদ্ধার্থকে নিয়ে ফেরার পথ ধরলেন বরকত আলি। তাঁর মুখে নায়কোচিত গাম্ভীর্য। বললেন—এটা আপনি কী করলেন? 

—কোনটা? 

—এই নেতৃত্ব, মানে আপনি থাকতে আমি… 

—আমার প্রশ্নই ওঠে না। আপনি এলাকার প্রধান। সি পি আই এম-এর একজন বর্ষীয়ান নেতা। তা ছাড়া আপনি কি মনে করেন না এই ঘটনা থানায় জানানো দরকার? 

—হ্যাঁ। মনে হয়। আমার ঘরেও মেয়ে আছে। 

সিদ্ধার্থ চাটুজ্যেবাড়িতে ফিরে যায়। আজ তার বহরমপুরে ফিরে যাবার কথা ছিল। সে জানে না এর পরের ঘটনা কী ঘটতে চলেছে। জানে না, যা করছে ঠিক করছে কি না। শুধু ময়না বৈষ্ণবীর কথার ওপর নির্ভর করে একটি প্রাচীন মঠের বিরুদ্ধে লোকজনকে খেপিয়ে তোলার মধ্যে দুর্বহ অনিশ্চয়তা থাকে। কিন্তু সে কিছুতেই ময়না বৈষ্ণবীকে অস্বীকার করতে পারছে না। সে হৃদয় দিয়ে ওই মহিলাকে বিশ্বাস করে বসে আছে। অনেকসময়, হৃদয়ই প্রথম সত্যের দর্শন পায়। যুক্তি আসে হৃদয়েরই পদচ্ছাপ অনুসরণ করে। 

আর তখন, ময়না বৈষ্ণবীর আনা সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। পথ-চলতি লোকজন দেখলেই চাষের কাজ ফেলে উঠে আসে অন্যরা। বলে—ওগো, শুনেছ, খবর শুনলে? 

কী? 

মেয়ে পাচার হচ্ছে। 

তা তো শুনি কখনও কখনও। নিজের চোখে দেখিনি বাপু। 

দেখোনি। এবার দেখবে। তোমার আমার মেয়েও চুরি যেতে পারে। সাবধান। খুব সাবধান।

বলো কী! 

তা হলে আর বলছি কী! এই হরিহরপাড়াতেই হচ্ছে যখন। 

কে করেছে? ধরা পড়েছে কেউ? কাদের মেয়ে পাচার হচ্ছিল ভাই? কোথায় করছিল? 

রও সও বাপু, রও সও। অত প্রশ্ন করলে চলবে কেন? ঘটনা ঘটেছে হরিহরপাড়াতে তা তো বললাম। মেয়ে এনে লুকিয়ে রাখে ঘোষপাড়ার মঠে। 

বলো কী! অবাক কলি বোঝা ভার, গুপ্তলীলা চমৎকার! 

আরে বলে না, আড়ালে বসে ভাত খায়, তবু বেটির রোজা থায়! 

তা যা বলেছ। 

এবং পাড়ায়-পাড়ায়, চায়ের দোকানে, ইস্কুল মাস্টারের মধ্যে, ঝিয়ে-ঝিয়ে, বউয়ে-বউয়ে এই আলোচনাই হতে থাকে কেবল। এবং কথায় কথায় খবর পল্লবিত হয়। ঘোষপাড়ার মঠ অবশেষে লোকজবানিতে মেয়ে বিক্রির কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। 

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *