রাজপাট – ১০

১০ 

কার্তিকে হিমের জন্ম 
হয় হিমপাত। 
ভয়ে মরে বিষ্ণুপ্রিয়ার 
শিরে বজ্রাঘাত। 

আয়োজনের কোনও ত্রুটি করেননি বরকত আলি। এই ঘোর গ্রামে, বিদ্যুৎ পৌঁছতে না পারার পরিস্থিতিতে যতখানি সুব্যবস্থা করা সম্ভব, তিনি করেছেন। সরকারি অতিথিদের আতিথ্যে ত্রুটি থাকুক-এ তাঁর কাম্য ছিল না। সকাল থেকে চতুর্দিকে ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি। কোথাও কোনও ভুল না হয়ে যায়। 

পাম্প বসানোর কাজে তাঁরা আসছেন ঠিকই, তবে বরকত আলির মনে আছে অন্য ভাবনা। এইসব প্রযুক্তিবিদ ও পদস্থ আধিকারিকদের খুশি করতে পারলে যদি তাঁদের ধরে করে তেকোনা থেকে মরালীগ্রাম পর্যন্ত ভৈরবের পশ্চিমপাড়টা বাঁধিয়ে নেওয়া যায়, তবে পরের পঞ্চায়েত নির্বাচনে আবার তিনি জয়লাভ করতে পারেন। এ গ্রামে গতবার তিনি সি পি আই এম-এর হয়ে সামান্য সীমায় জয়ী হয়েছিলেন। কংগ্রেসের হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অর্জুন সেন। তাঁর জয় হয়নি একমাত্র এ-কারণেই যে, মুসলিম লিগের পূর্ণ সমর্থন পেয়েছিলেন বরকত আলি। এই অঞ্চলে মুসলিম লিগ যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু এবারের নির্বাচনে মুসলিম লিগের সমর্থন সম্পূৰ্ণ অনিশ্চিত। আর তা যে বরকত আলির নিজেরই কারণে তা নিজের কাছে স্বীকার করতেই হয়। মুসলিম লিগের প্রধান করম মণ্ডলের সঙ্গে গোলমাল বাঁধিয়ে ফেলেছেন বরকত আলি। 

ব্যাপারটা প্রথম দিকে সামান্যই ছিল। বরকত আলিকে সাহায্য করার বিনিময়ে করম মণ্ডলের ভাই গজব মণ্ডল একেবারে বিনি পয়সায় বারংবার তাঁর পাম্পসেট নিয়েছে জমিতে সেচন করার জন্য। পাম্পসেট চালানো প্রায় হাতি পোষার খরচ। নিজের জমির জন্য চালানো একরকম। কিন্তু দিনের পর দিন পরের জমির জন্য তেলখরচ করে যাওয়া সাধারণ চাষাভুসো মানুষের সাধ্য কী! বরকত আলিরও তো লাভ-লোকসান আছে! পঞ্চায়েতে বিবিধ উন্নয়ন খাতে যে সরকারি সুবিধা আসে, তার থেকে কিছু ভাগবখরা তাঁর হস্তগত হয় ঠিক কথাই, কিন্তু ব্যয়কে ব্যয় বলে স্বীকার করে না নিলে চলবে কেন! তা ছাড়া ওই সুবিধা নেওয়া পর্যন্তই। প্রধান হওয়ার দৌলতে পঞ্চায়েতের অর্থ তাঁর হাতেই ব্যয়িত হয়। কিন্তু টাকার ব্যাপারে তিনি সৎ। অতএব বরকত আলি একবার গজবের কাছে পাম্পের ভাড়া চেয়ে বসলেন। এক কথায় দু’ কথায় হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছল। বরকত আলি পঞ্চায়েত, গজব মণ্ডলের স্পর্ধা খর্ব করতে তার গালে চড় কষিয়ে দিলেন। গজব মণ্ডল পাল্টা মারতে উঠেছিল। কিন্তু বরকত আলি পঞ্চায়েত মানুষ। তাঁর লোকজন তাঁকে ঘিরে থাকে সর্বদাই। গজব মণ্ডল মারমুখী হতেই বরকত আলির লোকজন তাকে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ফেলে। করম মণ্ডল স্বয়ং গ্রামে উপস্থিত থাকলে সেদিন সি পি আই এম ও মুসলিম লিগের সংঘর্ষ হত নিশচয়ই। কিন্তু করম মণ্ডল একজন পাকা ও গুণী রাজমিস্ত্রি হওয়ায় তাঁকে প্রায়ই বাইরে কাজে যেতে হত। এমনকী সুদূর কলকাতা মহানগরীতেও তিনি পদার্পণ করে থাকেন। অতএব সেদিন গজব মণ্ডলের বউ আর মা এসে বরকত আলির হাতে-পায়ে ধরেছিল এবং বরকত আলি মায়াবশত গজব মণ্ডলকে মুক্তি দিয়েছিলেন। কাজটা কাঁচা হয়েছিল সন্দেহ নেই। কারণ মুক্তি পেয়ে গজব মণ্ডল ঠান্ডা গলায় বলেছিল—জোর দেখালেন খুব ভাল কথা। কিন্তু মনে রাখবেন আমাদের জোরেই আপনার এত রোয়াব। 

—যা যা ঘর যা। 

অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেছিলেন বরকত আলি। কিন্তু তাঁর মনে ভয় ঢুকেছিল। 

প্রতিবার করম মণ্ডল গ্রামে ফিরে বরকত আলির সঙ্গে দেখা করে। কিন্তু ওই ঘটনার পরে আর করেনি। করম মণ্ডল এসেছে শুনে বরকত আলি নিজেই করম মন্ডলের ছেলে এনায়েত মণ্ডলকে দিয়ে তাকে ডেকে পাঠিয়েছিল। বিকেলে এনায়েত এসে বলেছিল— আব্বার শরীর খারাপ। আসতে পারবে না। 

তা তো হতেই পারে। আব্বার শরীর খারাপ হতে পারে। সে আসতে পারবে না এমনও হতে পারে। কিন্তু বরকত আলি লক্ষ করেছিলেন, এনায়েত বলল না—আব্বা আপনাকে একবার সময় করে বাড়িতে যেতে বলল। এবং আহূত না হয়েও করম মণ্ডলের সঙ্গে দেখা করতে যেতে বরকত আলির আত্মসম্মানে লেগেছিল। অথচ ওই আত্মসম্মানটুকু পাশে সরিয়ে রেখে যদি যেতে পারতেন সেদিন বরকত আলি, আর কথায় কথায় হালকা করে দিতে পারতেন ব্যাপারটা, তা হলে হয়তো এবারও মুসলিম লিগের সমর্থন পাওয়া তাঁর আটকাত না। যদিও পরে যখন দেখা হয়েছে রাস্তায়, করম মণ্ডল যথাযথ অভিবাদন জানাতে ভোলেনি। কুশল প্রশ্নও সে করেছে এবং নিজের সংবাদও দিয়েছে কিছু কিছু। কলকাতার একটি বহুতল আবাসন প্রকল্পের কাজে সে নিযুক্ত এখন। যদিও এই ধরনের আবাসন প্রকল্পের কাজ বহরমপুরেই সে পেয়ে যাবে শিগগির কারণ সেখানকার গোড়ার মাঠ এলাকায় খুব বড় করে গড়ে উঠবে এমনই এক আবাসন প্রকল্প। সে কাজ করবে সেখানেই দীর্ঘকাল। তখন বরকত আলি নিজের অপরাধবোধ থেকেই সম্ভবত, কিছুটা গায়ে পড়ে বলেছিলেন—গ্রামের মানুষ গ্রামে না থাকলে কি ভাল দেখায়! করম মণ্ডল বরং গ্রামেই ফিরে আসুক। চাষ-বাস দেখুক। 

এবং চাষ-বাস প্রসঙ্গেই তিনি দেখেছিলেন করম মণ্ডলের মুখ শক্ত হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী খবরাখবর যা তাতে এটা স্পষ্ট যে এই পঞ্চায়েতে মুসলিম লিগ আগামী নির্বাচনে সি পি আই এম-কে সমর্থন করবে না। তারা হয়তো নিজেরাই দাঁড়াবে সরাসরি। কে দাঁড়াবে তিনি জানেন না। তবে তারা যে কংগ্রেসের অর্জুন সেনকে সমর্থন করছে না—এতেই বরকত আলি আপাতত খুশি। 

একপক্ষে ভাল যে মোহনলাল এ সময় গ্রামে এসেছে। নির্বাচনী প্রচারের সময় মোহনলালের সহায়তা পাবেন এমনই আশা বরকত আলির। সঙ্গে তার বন্ধু সিদ্ধার্থ, বহরমপুর শহরে একজন উদীয়মান নেতা। বরকত আলি জানেন, সিদ্ধার্থ রাসবাবুর কাছের মানুষ। সিদ্ধার্থর মাধ্যমে রাসুবাবুর অনুমতি ও সহায়তা নিয়ে ভৈরবের পাড় বাঁধানোর কাজটি তিনি এগিয়ে নিতে পারেন। এখান থেকে লোকজন নিয়ে গিয়ে বহরমপুরের সেচ দপ্তরে ধর্না দেবার কথা তিনি বহুবার ভেবেছেন। কিন্তু তার জন্য প্রাথমিকভাবে হরিহরপাড়ার সি পি আই এম নেতা অমরেশ বিশ্বাসের সমর্থন দরকার। আর অমরেশ বিশ্বাসের কর্মনীতি নির্ধারণ করে দেন রাসুবাবুই একথা সবাই জানে। বস্তুত বহরমপুর ও অবশিষ্ট মুর্শিদাবাদের বিরাট অঞ্চলে সি পি আই এম-এর কর্মনীতি রাসুবাবুর দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। 

বরকত আলি যদি শুধু মানুষের কষ্ট ও জীবনের অনিশ্চয়তার দিকে তাকিয়ে এই পাড় বাঁধানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতেন তা হলে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য কারওকে ধরা-করার প্রয়োজন হত না। কিন্তু যেহেতু তাঁর অন্তরালের উদ্দেশ্য আপন কার্যসিদ্ধি সে-কারণে সরাসরি রাসবাবুর সঙ্গে দেখা করে আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে তাঁর বাঁধছে। স্বার্থসন্ধান হত্যা করেছে তাঁর সারল্যকে। কিন্তু তিনি এই পর্বে এখনও পৌঁছতে পারেননি যাতে সুচতুরভাবে স্বার্থভাবনাগুলি ঢেকে ফেলা যায়। সেদিক থেকে দেখতে গেলে বরকত আলিকে খুব ঝানু রাজনীতিক বলা যাবে না। বরং বলা যেতে পারে, তিনি ক্রমশ ঝানু হয়ে উঠছেন। 

যে-জমি নিয়ে সেনদের সঙ্গে কাজিয়া, সেই জমিটুকু নিয়েও সিদ্ধার্থর সঙ্গে কথা বলবেন বলে স্থির করেছেন বরকত আলি। যদিও যে-জমি নিয়ে আদালতে দাখিল হয়ে গেছে, সে-জমি সম্পর্কে দল আর কী বিহিত করবে! তবুও বলে রাখবেন। বলা তো যায় না কখন কার দ্বারা কী উপকার হয়! আদালতের নিষ্পত্তি ছাড়াও আরও একটি বিধান আছে এই দুনিয়ায়—তার নাম গায়ের জোর। জোর যার মুলুক তার, একথা আজও সত্য। তবে হ্যাঁ, শুধু গায়ের জোর নয়, তার সঙ্গে এই কলিযুগে দরকার হয় কিছু বুদ্ধি। এই এলাকায় সি পি আই এম-এর ঘাঁটি আরও শক্ত করতে পারলে বরকত মিঞার জোর বাড়বে। মাঝে মাঝে তিনি আকাশ-পাতাল ভাবেন। কী করে মুসলিম লিগ বা কংগ্রেসের লোকগুলিকে নিজের দলে টেনে আনা যায়। ভেবে কোনও কিনারা পান না। 

এ সমস্তই বরকত মিঞা ভেবে চলেছিলেন যখন পঞ্চরসের আসর বসব-বসব করছে। চারদিকে হ্যাজাক জ্বলছে। মঞ্চেও দেওয়া হয়েছে অনেকগুলি বাতি। লোক ঠিক করে রাখা আছে। তারা মাঝে মাঝে বাতিগুলিকে দম দেবে। বরকত মিঞার নিজের বাড়িতে এবং চাটুজ্যেবাড়িতে যত চেয়ার ছিল এনে সাজানো হয়েছে সরকারি বাবুদের জন্য। গ্রামের লোকজন বসেছে মাটিতে মাদুর বা কাগজ বিছিয়ে। বরকত আলির বাড়িসংলগ্ন বাগানে এই আসর। এই অনুষ্ঠানের জন্য বাগানের বেশ কিছু ফলন্ত গাছ উপড়ে ফেলতে হয়েছে। তা নিয়ে খেদ করেছিল বরকত আলির বিবি আর মেয়ে। 

—অন্য কোথাও এই আসর বসান যেত না! ফলন্ত গাছ কাটলে ঘরে অকল্যাণ হয় তা জানো? 

সখেদে বলেছিল মা-মেয়ে। মেয়েকে প্রাণেরও অধিক ভালবাসেন বলে অপরাধ স্বীকার করেছিলেন বরকত আলি। কিন্তু তাঁর কিছু করার ছিল না। ভরা ক্ষেতের ফসল তুলে তো আর মঞ্চ বাঁধা যায় না। মাঠ নেই তেকোনা গ্রামে। ভৈরবের গর্ভে যেতে যেতে ফেলে ছড়িয়ে রাখার মতো জমি এখন অকুলান। থাকার মধ্যে আছে কেবল মজাগঙ্গা সংলগ্ন ওই বিবাদের জমি। তাতে হাত দেওয়া চলে না। অতএব, তিনি ফুলন্ত মেয়েটির মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন— রাগ করিস না ফিরোজা। আবার ভাল করে বাগান করে দেব আমি। তুই রাগ করলে যে সংসারে আরও অকল্যাণ হবে মা। 

ফিরোজার চোখে জল এসে গিয়েছিল। আগামী জ্যৈষ্ঠে তার বিবাহ স্থির হয়েছে। তার স্বামী চতুষ্কোনার মানুষ। তবে এই বছরই বহরমপুরের একটি উচ্চতর বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছে। বিদ্বান স্বামী হতে চলেছে তার। তবু ইদানীং সামান্য কারণেই তার চোখে জল এসে যাচ্ছে। সারাক্ষণ তার মনের মধ্যে বাজতে থাকে এক বিচ্ছেদবিষণ্ন সুর। সে চোখের জল মুছতে মুছতে ঘরে চলে গিয়েছিল। বরকত আলি দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন। গাছগুলিকে ফিরোজার বিবাহের সময় কাটতেই হত। মেয়ের বিয়ের আয়োজন তো বাড়ি থেকে সাত হাত দূরে করতে পারতেন না তিনি। যদিও সে-প্রসঙ্গ উল্লেখ করার কথা একবারও তাঁর মনে এল না। তিন ছেলের পর ওই এক মেয়ে। মেয়ে যাতে কষ্ট পায়, বরকত আলির বুকে তা বৃহত্তর কষ্ট হয়ে বাজে। 

মোহনলাল তার বন্ধুদের নিয়ে মাটিতেই বসতে যাচ্ছিল। কিন্তু বরকত আলি হাঁ-হাঁ করে ছুটে এলেন। অতঃপর তারাও বসল চেয়ারেই। একমাত্র সেনরা ছাড়া সারা গ্রামই এখানে উপস্থিত। মহিলা ও বাচ্চারা বসেছে প্রথমে। মাটিতে। অনেক পুরুষও আছে সেই দলে। এরপর চেয়ারের সারি। তাতে সরকারি বাবুদের নিয়ে বরকত আলি স্বয়ং। তাঁর পাশে মোহনলাল ও তার বন্ধুরা। গ্রামের যুবকেরা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে নিয়ে এসেছে উঁচু-উঁচু বেঞ্চ আর তাতেই বসেছে। 

বিরাট শ্রোতৃমণ্ডলী। কিন্তু অনুষ্ঠানের আয়োজন সামান্য। হারমোনিয়াম, তবলা, বাঁশি ও সানাই। আজ হচ্ছে লালনের পালা। লালনের গানের সঙ্গে বাঁশি সানাই জমবে না কিন্তু নাটকীয় মুহূর্তগুলিকে সাজিয়ে তোলার জন্য বাঁশি ও সানাই নইলে চলে না। লালনের সঙ্গিনীর ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য একটি মেয়েও আছে এই পঞ্চরসের দলে। লায়লা-মজনু পালায় সেই হয় লায়লা। ফুলনদেবীতে ফুলন। 

তেকোনা গ্রামে এমন আসর বসে কদাচিত। অনেক আগে মরালী গ্রামে আলকাপের একটি দল ছিল। ইদরিশের বাপ জোয়ান বয়সে সেই দলে অভিনয় করত। ইদরিশ পেয়েছে বাপের গুণ। 

আজকের পালায় ইদরিশ অনেকগুলি গান গাইবে। মাসুদা ঘোমটা দিয়ে মেয়েকে কোলের কাছে নিয়ে এক কোণে বসেছে। তার চোখ আনন্দে চিকচিক করছে। তার আগল-পাগল স্বামী আজ কত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সে ইদরিশের গান শুনেছে মাত্র। মঞ্চের ওপর তাকে কখনও দেখেনি। মঞ্চের পেছনে চট দিয়ে ঘেরা যে-ঘর, তাতেই আছে ইদরিশ ও অন্যান্য অভিনেতারা। মাসুদার মনে মনে রাগ হচ্ছে অকারণেই। কারণ ওই ঘেরাটোপের মধ্যে আছে অভিনেত্রীটিও। ইদরিশ কি তারই সঙ্গে বেশি বেশি কথা বলছে? মাসুদা এইসব ভেবে ঈর্ষা বোধ করছে। আসর দেখার আনন্দের পাশাপাশি এই ঈর্ষা তার চোখ ভিজিয়ে দিচ্ছে। এই মুহূর্তে মাসুদার মানসিক অবস্থা বড় বিচিত্র। সে গর্বিতা, কুপিতা, ঈর্ষান্বিতা। সব মিলিয়ে সে বড় অস্থির। তার ইচ্ছে করছে সে এখন ছুটে যায় ওই ঘেরাটোপে আর ইদরিশের মুখোমুখি হয়ে বলে—’শুনছ! আমি এসেছি। আমি আমি। তোমার মাসুদা।’ অর্থাৎ মেয়েটিকে সে বুঝিয়ে দিতে চায় সে আছে। পুরোপুরি আছে। 

বরকতের বিবি আর ফিরোজার সঙ্গে চাটুজ্যেবাড়ির নয়াঠাকুমা ও নন্দিনী বসেছেন দোতলার বারান্দায়। বারান্দা থেকে দিব্যি দেখা যাচ্ছে মঞ্চ। আর শেষ পর্যন্ত ময়না বৈষ্ণবী থেকেই গিয়েছে এই আসর দেখতে। লালনের পালাই তাকে থাকতে উৎসাহিত করেছে। কিংবা কে জানে, সিদ্ধার্থকেই বারবার দেখতে পাবার আশায় সে থেকে গেল কিনা। কারণ সকলের অলক্ষে তার দৃষ্টি চলে যাচ্ছে মঞ্চের বিপরীতে বসা সিদ্ধার্থর দিকেই। সে ভাবছে বারবার। সিদ্ধার্থ কি সত্যি তার স্বামীরই মতো হুবহু? নাকি ওই তরুণ বয়স ও সাধারণ্য? কিংবা তার বাইরেও ছেলেটির মধ্যে কিছু আছে। এমন কিছু যা চোখ টানে। মনকে তার দিকে ধাবন করায়। সিদ্ধার্থর প্রতি ময়না বৈষ্ণবীর দৃষ্টি নিষ্কাম। কিন্তু আকর্ষণবিহীন নয়। 

হারমোনিয়াম বেজে উঠল জোরে। একজন গান ধরল। তার গলা বড় চড়া। সে কোনও শব্দবর্ধক যন্ত্র ছাড়াই তার কণ্ঠ আসরের শেষ সীমায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হল। যে-গান সে ধরেছে তা বহুশ্রুত। পঞ্চরসের দলগুলি যা বহুশ্রুত, যা জনপ্রিয় তাকেই অভিনয় করে এবং গায়। 

সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে 
লালন ভাবে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে 
কেউ মালা কেউ তসবি গলায় 
তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায়
যাওয়া কিংবা আসার বেলায়
জাতের চিহ্ন রয় কার রে!
যদি সুন্নৎ দিলে হয় মুসলমান
নারীর তবে কী হয় বিধান
বামন চিনি পৈতা প্রমাণ 
বামনি চিনি কীসে রে! 
জগত বেড়ে জাতের কথা 
লোকে গৌরব করে যথা তথা 
লালন সে জাতের ফাতা 
ঘুচিয়েছে সাত বাজারে। 

গায়কের স্বর মিঠে নয়। তবে তার গানে বড় আবেদন আছে। শুরুর পক্ষে সে ধরেছে চমৎকার। চেনা গানে লোকের মন বসে দ্রুত। গান শেষ করে সে এখন লালনের বিষয়ে বলছে। 

এই গঙ্গা-পদ্মা-ভাগীরথী, এই ভৈরব বাঁশলই-ময়ূরাক্ষী, এই রাঢ় ও বাগড়ির ভূখণ্ড, এই বন্যা ও ভাঙনের ভৌগোলিক ঘটনাসমূহ এবং হয়তো-বা এই জেলা মুর্শিদাবাদের ইতিহাস এখানকার মানুষের মুখে দিয়েছে এক নিজস্ব উপভাষা। বাংলাকে আশ্রয় করে গড়ে উঠলেও কেতাবি বাংলার সঙ্গে তার অনেকই তফাত। প্রতিষ্ঠিত বাংলা ভাষার সঙ্গে এই আঞ্চলিক উপভাষা পাশাপাশি স্বচ্ছন্দে সহাবস্থান করছে। কিন্তু এই উপভাষা আদ্যন্ত সীমানাভিত্তিক। রাঢ়ের সঙ্গে বাগড়ির ভাষা মেলে না। এমনকী বিত্ত ও ধর্মগত বিভাজনের মধ্যেও এই ভাষার পার্থক্য নিহিত থাকে। 

পঞ্চরসের এই আসর বাগড়ির নিজস্ব ভাষাতেই হয়ে চলেছিল। তাতে সরকারি বাবুদের কিছু-বা অসুবিধা হচ্ছিল। যদিও তাঁরা সম্ভবত এর রস আস্বাদন করছিলেন। আসরের ভূমিকা মতো সেই লোকটি বলে চলেছিল লালন ফকিরের কথা। গলার স্বর খাদে ও উচ্চগ্রামে নামিয়ে উঠিয়ে সে বলে চলেছিল-লালন কেবল বাউল সাধক ছিলেন না। তিনি ছিলেন মরমি কবি ও সংগীতকার। তিনি প্রায় দশ হাজার গান রচনা করেছিলেন। সেইসব গান কেউ লিখে রাখেনি। এখন কেউ কেউ সংগ্রহ করছেন। লালন হিন্দু ছিলেন না, মুসলমানও ছিলেন না। হিন্দুর ঘরে জন্ম নিয়ে তিনি সিরাজ সাঁইয়ের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন। সিরাজ সাঁই ছিলেন সহজিয়া ধর্মের সাধক। তাঁর হিন্দু শিষ্য যেমন ছিল, মুসলমান শিষ্যও ছিল প্রচুর। 

কথা শেষ হল। হারমোনিয়াম ও সানাই ভরে বেজে উঠল একটি প্রচলিত হিন্দি গানের সুর-কবুতর যা যা যা, কবুতর যা যা। লালনের জীবন ও গানের সঙ্গে এই সুরের কোনও সংযোগ বা সাদৃশ্য নেই। কিন্তু বহুল প্রচলিত গানের মধ্যে দিয়ে একটি অন্তরঙ্গ আবহ তৈরি করাই শিল্পীদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকবে। 

মাথায় বাবরি চুল পরে আরও কয়েকজনের সঙ্গে মঞ্চে প্রবেশ করল ইদরিশ। সে-ই লালন হয়েছে। এ এক বিশ্রামের দৃশ্য। পথিকেরা পথ চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম করছে। হিন্দু কায়স্থবংশীয় যুবক এখন ইদরিশ। বিশ্রামরত অবস্থায় সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। তার শরীরে জ্বরের সঙ্গে দেখা দিল বসন্তরোগের লক্ষণ। সহযাত্রীরা তাকে ফেলে পালাল। এরপর শুরু হল লালনের কষ্ট ও যন্ত্রণা। রোগমুক্তির জন্য কয়েকজন অন্ত্যজ নারী তার সেবা করল। এরা নারীবেশী পুরুষ, কারণ সত্যিকারের অতগুলি নারী পাওয়া এই দলের পক্ষে সম্ভব নয়। নারীদলের সেবায় সুস্থ হলেও একচক্ষু গেল লালনের। এরপর সে পথে পথে ঘুরে বেড়াল। শেষ পর্যন্ত দরবেশি ফকির সিরাজ সাঁইয়ের সাক্ষাৎ পেল এবং তাঁর শিষ্য হল। 

.

বছর পঁচিশ আগেও এই ধরনের অনুষ্ঠানের নাম ছিল আলকাপ। সেই আলকাপই পরিবর্তিত হয়ে আজকের পঞ্চরস। তবে আলকাপ ছিল অনেক বেশি মৌলিক। পঞ্চরসে যেমন প্রচলিত গানের সুর ঢুকেছে, আলকাপে তা ছিল না। এমনকী আলকাপে ছিল না কোনও নারী। কোনও সুদেহী সুদর্শন তরুণ তাতে মেয়ে সাজত। আলকাপ অনুষ্ঠানের জন্য কোনও মঞ্চও ছিল না। 

পঞ্চরসের আসর দেখতে দেখতে সিদ্ধার্থর মনে পড়েছিল আলকাপের কথা। তার যখন ছ-সাত বছর বয়স, তখন একদিন লুকিয়ে মোল্লাগেড়ের বস্তিতে গিয়ে আলকাপ দেখেছিল। তার সেই বালকবেলার চোখ আগ্রাসী হয়ে উঠেছিল দেখতে দেখতে। সময়ের জ্ঞান ছিল না। তার তখন মনে হয়েছিল এমন অসামান্য অনুষ্ঠান সে আর দেখেনি। বাড়ি ফিরে বাবার হাতে মার খেয়েছিল। তিনি বলেছিলেন —–কুরুচিকর। অথচ আলকাপের ঠিক কোন কোন জায়গায় লুকিয়ে আছে কুরুচি, সে বুঝতেই পারেনি। 

একটা সময় পর্যন্ত এইসব তাকে টানত। যাত্রা-নাটক-আলকাপ-গম্ভীরা। ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল সব কোথায়। কী এক দুর্যোগ এল, আর সে সব ছেড়ে দিল। যেভাবে এক-একটা নদী শুকিয়ে মজা খাল হয়ে পড়ে থাকে, সিদ্ধার্থর নিজেকে অনেকটা সেইরকম মনে হয়। এইসব কথা সে কারও কাছে প্রকাশ করে না। তার অনেক বন্ধু। অনুগামী। পরিচিত জন। অথচ ভেতরে ভেতরে কী ভীষণ তার নিঃসঙ্গতা। 

বাবার সেই প্রহার মনে পড়তেই বুকের মধ্যে টনটনিয়ে উঠল তার। বড় অস্থির ছিলেন সেই মানুষ। বুদ্ধদেব বন্দ্যোপাধ্যায়। তার বাবা। অস্থির ছিলেন এবং সন্দেহপ্রবণ। কখন যে কোন বিষয় তাঁর অপছন্দ হত, আর তিনি ক্ষেপে উঠতেন, তাঁর মধ্যে কিছু উন্মাদ লক্ষণ প্রকাশ পেত—তার কোনও ঠিক ছিল না। এই সমস্ত কিছুকেই তারা মনে করেছিল স্বাভাবিকতাই। সব মানুষ তো একরকম হয় না। এই মানুষটাও তাঁর নিজের মতো—এমনই সব বিশ্বাস তারা করত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবার ওই উন্মাদনাই তাদের নিঃস্ব করে দেয়। অথচ সিদ্ধার্থ অস্বীকার করতে পারে না, সে তার বাবাকে গভীর ভালবাসে। 

এই আসর, এই গান আর ভাল লাগল না তার। সে উঠে পড়ল। জনঅরণ্যের বাইরে সে যেতে চাইল তখন। মোহনলাল বলল—কোথায় যাচ্ছিস? 

—আসছি। 

আসরের আলো ছেড়ে বেরিয়ে সে প্রথমে কিছুই দেখতে পেল না। কিছুক্ষণ সে অপেক্ষা করল অন্ধকারে। তারপর চোখ সইয়ে হাঁটতে লাগল রাস্তা দিয়ে। সিগারেট ধরাল। বরকত আলির বাড়ির সীমানা পেরিয়ে দক্ষিণে এগোলেই ভৈরবের পাড় ঘেঁষা পথ। ভৈরবের পাড় ধরে যেতে যেতে বাউলদের আখড়ার কাছে বাঁক নিয়েছে। আকাশে চাঁদ আছে। অমাবস্যা পেরিয়ে এখন তার শুক্লপক্ষের দিকে গমন। চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে ভৈরবের জল। রাস্তার একদিকে পরপর বাড়ি। আর ভৈরবের পাড়ের দিকে মাঝে মাঝে দোকান। গাছপালা। এক-একটি যেন ভৈরবের জলকে চুম্বনোদ্যত হয়ে ঝুঁকে আছে। 

একটি ঝাঁপ-ফেলা দোকানের সামনে বসল সিদ্ধার্থ। আরও একটা সিগারেট ধরাল। নদীর হাওয়ায় সিগারেট দ্রুত ফুরিয়ে যায়। পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে তার স্কুলের বন্ধু কনককে মনে পড়ল। স্নান করতে গিয়ে জলে ডুবে মারা গিয়েছিল কনক। গোটা ব্যাপারটা ঘটেছিল তার চোখের সামনেই। ফারাক্কায় পিকনিক করতে গিয়েছিল তারা। জলে ঝাঁপাঝাঁপির ইচ্ছেটা তীব্র ছিল তখন। শীতের গঙ্গা দুই পার শুকোতে শুকোতে মাঝবরাবর শীর্ণ হয়ে বইছিল। সেখানে জল কতখানি গভীর তারা জানত না। জানার ইচ্ছে বা তাগিদও বোধ করেনি কারণ তারা প্রত্যেকেই ভালরকম সাঁতার জানত। জলে ঝাঁপিয়ে নিজের মনে উল্লাস করতে করতে সে হঠাৎ দেখেছিল একটি হাত উঠছে আর নামছে। সে চিৎকার করেছিল। প্রত্যেকেই তারা ছুটেছিল কনকের দিকে। কিন্তু শীতের নদীতেও সাহায্যের কোনও অবকাশ না দিয়ে ডুবে গিয়েছিল কনক। শেষ পর্যন্ত ফরাক্কার পুলিশ কনকের দেহ উদ্ধার করেছিল। পরে জানা গিয়েছিল, জলের শৈত্য ওর পেশিসমূহ নিষ্ক্রিয় করে দেয়। 

কতদিন আগেকার কথা, তবু আজও কনকের মৃত্যু তাকে তাড়া করে। মাঝে মাঝে স্বপ্নে আসে ওই দৃশ্য। কনক ডুবে যাচ্ছে, সে ধরার জন্য সাঁতরাচ্ছে। কিন্তু পৌঁছতে পারছে না কিছুতেই। ভারী জল তার বুকে চেপে বসছে। আর কনক ডুবে যাচ্ছে ক্রমশ। 

অপমৃত্যু! কনক তার জীবনে দেখা প্রথম অপমৃত্যু। এরপর? সে আর ভাবতে পারে না। অতীত নিয়ে অধিকক্ষণ নাড়াচাড়া করতে তার কষ্ট হয়। সে উঠে পড়ল বেঞ্চ থেকে। আরও কিছুক্ষণ হাঁটল সামনে। সারা গ্রাম স্তব্ধ। কেউ-ই আর ঘরে বসে নেই। সকলেই আসরে গিয়েছে। কিংবা হয়তো রয়ে গেছে কোনও বৃদ্ধ বা রোগী। কোনও শোকগ্রস্ত কিংবা ধান্দাবাজ। একটি ঝাঁপ-ফেলা দোকানের অভ্যন্তর হতে আসা সরু আলোর ফালি তার চোখে পড়ল। সে দাঁড়াল আলোর রেখা বরাবর। পুরুষ ও নারীর কণ্ঠস্বর কানে এল তার। সে অবাক হল। দোকানের মধ্যে নারীকণ্ঠ কেন! দেওয়ালের কাছে এল সে। বাঁশের বেড়ার দোকান। গায়ে মাটি লেপে দেওয়া আছে, তাই ফাঁকফোকর বন্ধ। তার নাকে লাগল ঝাঁঝাল গন্ধ। জড়িত স্খলিত উচ্চারণও শুনতে পেল সে। 

চুল্লুর ঠেক। অবাক হল সে। এ গাঁয়ে চুল্লুর ঠেক আছে আগে শোনেনি সে। 

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *