মৃত্যুর আগে জাগরণ
খ্রিষ্টাব্দ উনিশ—শো পঁয়ষট্টিতে, কলকাতার শুকলাল কার্নানি হাসপাতালের এক কামরায়, পঁচাত্তর বছর বয়সে, রোদে আর বৃষ্টিতে মেশা এক ভাদ্রের দিনে, শান্তভাবে ও ধীরে—ধীরে মারা যাচ্ছেন দেবকীদাস মুখোপাধ্যায়।
বাইরে, কামরার সামনে করিডরে, অথবা কোনো বারান্দায়, কিংবা হাসপাতালের বাগানে ঘুরে—ফিরে অপেক্ষা করছে তাঁর পুত্র, কন্যা, জামাতা, পুত্রবধূ (সকলেই প্রৌঢ়, সকলেই ক্লান্ত), একটি দৌহিত্রী ও একটি পৌত্র (বয়স যথাক্রমে একত্রিশ ও চব্বিশ), আর কতিপয় বিবিধ আত্মীয়—বন্ধু, যারা অন্ত্যেষ্টির ব্যবস্থাপনার ভার নিয়েছে। বেলা দশটায় এসেছে তারা, এখন প্রায় চারটে; চরম বার্তাটি এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।
কামরার ভিতরে দু—জন নার্স, দক্ষ ও শ্বেতবসনা, একটি যুবক ডাক্তার রোগীর শিয়রে উপবিষ্ট, মাঝে—মাঝে একজন বিশারদ এসে দেখে যাচ্ছেন, টেবিলে বিবিধ যন্ত্রপাতি ওষুধ ইঞ্জেকশন সাজানো। এঁরা আরোগ্যের আশা আর রাখেন না, তবে যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন যাতে মৃত্যু যন্ত্রণাহীন হয়।
আর বৃদ্ধ দেবকীদাস—তাঁর নাকে অক্সিজেনের নল লাগানো, হাত দুটি কোমরের উপর ভাঁজ করা, ঠোঁট ঈষৎ উন্মুক্ত, টান হয়ে শুয়ে নিশ্বাস নিচ্ছেন নিয়মিত ছন্দে, যেন গভীরভাবে ঘুমন্ত। মৃত্যু বলতে যে—সব ভয়াবহ ছবি আমাদের মনে জাগে তার কোনো চিহ্ন তাঁর মুখে নেই; হাসপাতালে মাসাধিকব্যাপী বিশ্রাম ও শুশ্রূষা তাঁর চেহারায় কোনো হানি ঘটতে দেয়নি, পাতলা সাদা চুলের তলায় তাঁর ডিম্বাকৃতি কপালটি এখনো সুচারু; আর টিকোলো নাক ও পাতলা ঠোঁট নিয়ে তাঁর গৌরবর্ণ ব্রাহ্মণ মুখাবয়ব দেখে এখনো ঠিক ধারণা করা যায় না যে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যু সেই মুখশ্রীকে কালিমালিপ্ত ক’রে দেবে।
সুখে মারা যাচ্ছেন দেবকীদাস, গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন, কিন্তু স্বপ্নহীনভাবে নয়। বরং বলা যায়, ডাক্তারি মতে তাঁর ঘণ্টা বেজে যাবার পরেও তিনি যে এতক্ষণ ধরে জীবিত আছেন, তার কারণই স্বপ্নের আকর্ষণ। স্বপ্নে একটি জন্তুকে দেখছেন তিনি, কোনো রোমশ নৈশ জন্তু, অস্পষ্ট, অন্ধকারের সুড়ঙ্গ পথে সঞ্চরমাণ, নিঃশব্দে, তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে, স্পর্শময়। কিন্তু ‘দেখছেন’ কথাটা সংগত নয় এখানে; কেননা সুস্থ মানুষের স্বপ্নে যেমন সব কর্তৃবাচ্য ভাববাচ্যে অনূদিত হয়ে যায়, এই মুমূর্ষুরও তা—ই হচ্ছে; তাঁর নিজের আর কৃত্য কিছু নেই, এখন এক অজ্ঞাত শক্তির তিনি অধীন—এক চিন্তাহীন, চেষ্টাহীন, অধিকৃত অবস্থায় এই শেষ মুহূর্তগুলি মসৃণভাবে গড়িয়ে যাচ্ছে তাঁর উপর দিয়ে। বলা বাহুল্য, এটা তাঁর মরণশীলতার শেষ দশা, এর আগে অন্য কয়েকটা পর্যায় তাঁকে পেরোতে হয়েছিল।
অধিকাংশ মানুষের মতো, দেবকীদাসও অনেকটা সময় লেগেছিল তাঁর মৃত্যুর সন্নিকটতা বুঝে নিতে ও মেনে নিতে। একদিন হঠাৎ বুকের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা উঠল, অজ্ঞান অবস্থায় তাঁকে নিয়ে আসা হলো হাসপাতালে, জ্ঞান ফিরে পেয়ে তাঁর প্রথম চিন্তা: ‘আমি বাড়ি যাবো, আমার অনেক কাজ পড়ে আছে।’ তিন বছর আগে পিশাচ—সংহিতার একটি ইংরেজি অনুবাদ আরম্ভ করেছিলেন, নানা অবান্তর কারণে অর্ধেকের বেশি এগোয়নি। আর তাঁর বহুকালের পরিকল্পিত রোমানি ভাষার শব্দতত্ত্ব বিষয়ক নিবন্ধ—এতদিনে সেটাতে সবেমাত্র হাত দিতে পেরেছেন। কী সেই নিগূঢ় ঐতিহাসিক যোগ, যার জন্য তথাকথিত জিপসিদের মুখে—হোক হাঙ্গেরিতে বা স্পেনে বা আয়ল্যান্ডে—এখনো বহু শব্দ শোনা যায় যা অবিকলভাবে আধুনিক বাংলা: এই বিষয়টি তাঁর আলোচ্য। প্রশ্নটি কৌতূহলোদ্দীপক, কিন্তু এ—মুহূর্তে পৃথিবীতে কেউ তা নিয়ে ভাবছে না—হাইডেলবার্গে ডক্টর সিমারমান ও কলকাতায় তিনি ছাড়া। আর পিশাচ—সংহিতা—সেই মনোমুগ্ধকর বিরল পুঁথি (খুব সম্ভব ত্রয়োদশ শতকের), যাকে বলা যায় মনুসংহিতার একটি তান্ত্রিক ব্যঙ্গানুকৃতি, বর্ণিলভাবে আদিরসাত্মক, যার ব্যাকরণে পাণিনির মুণ্ড চর্বিত ও বক্তব্যে সনাতন ধর্ম ছিদ্রিত হয়েছে, সেটির প্রথম ইংরেজি অনুবাদ (লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি ফোটোস্ট্যাট কপি পাবার পরে) প্রকাশ করার উচ্চাশা তিনি পোষণ করছেন। এই সব প্রয়োজনীয় কর্ম থেকে তাঁকে নিবৃত্ত করবে তুচ্ছ কোনো শারীরিক বৈকল্য, তা দেবকীদাস কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। হাসপাতালে প্রথম কয়েকটা দিন এই কারণে বড়ো অশান্ত ছিল তাঁর মন।
পুত্রকন্যা অর্থব্যয়ে কার্পণ্য করেনি, সব প্রাপণীয় চিকিৎসা ও সেবাযত্ন তিনি পাচ্ছিলেন। কিন্তু যেহেতু তাঁকে সংবাদপত্র ছাড়া আর কোনো পাঠ্যবস্তু দেয়া হচ্ছিল না, তাই দিনমানব্যাপী অবকাশ ও দৈহিক বিশ্রাম তাঁর মনকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল আনুষঙ্গিক অন্য দু—একটা দুশ্চিন্তায়, এমনকি অনেক আগেকার ও অনেক আগে ভুলে—যাওয়া এক আক্ষেপে। থেকে—থেকে তাঁর মনে পড়ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর চাকুরি—জীবন। তাঁকে ডেকে এনেছিলেন স্বয়ং স্যর শিবশঙ্কর (তখন দেবকীদাস সামান্য স্কুলমাস্টার, মহানির্বাণতন্ত্র বিষয়ে একটি পুস্তিকামাত্র প্রকাশ করেছেন), কিন্তু সেই বিদ্যোৎসাহী উদারচেতা পুরুষের আকস্মাৎ মৃত্যু হলো, আর তারপর পনেরো বৎসরেও দেবকীদাসের পদোন্নতি হলো না। তাঁর বিরুদ্ধে আপত্তি উঠল যে তিনি বিশেষজ্ঞ নন, পল্লবগ্রাহী, তাঁর কৌতূহল বড়ো বেশি ব্যাপক; যিনি ‘শূন্যবাদের ভূমিকা’ লেখার দু—বছর পরে প্রকাশ করেন কবিয়াল গানের সংকলন (তাও সব অশ্লীলতা অবর্জিত রেখে), তারপর স্কীট সাহেবের ব্যুৎপত্তি নির্দেশে একুশটি ভুল দেখিয়ে ‘ক্যালকাটা রিভিউ’—তে সমালোচনা প্রকাশ করেন (আর, একই সময়ে, কিছুটা অশোভনভাবে, বীরবলি বাংলা সমর্থন ক’রে বীরবলি ভাষাতেই ‘সবুজপত্রে’ একটি প্রবন্ধ) এবং যার স্বরচিত ‘এ কম্পারেটিভ স্টাডি অব বেঙ্গলি, ওড়িয়া অ্যান্ড অ্যাসামীজ ফোনেটিক্স’—এ অনেক সিদ্ধান্ত অনুমানমাত্র—তাঁকে কী ক’রে আধুনিক অর্থে ‘স্কলার’ বলা যায়? তিনি যে উৎসাহপ্রবণ, কোনো—না—কোনো বিষয় নিয়ে সর্বদা চেষ্টাশীল, এটাই তাঁর অসারতার প্রমাণ ব’লে কথিত হলো; কালক্রমে চাকুরিক্ষেত্রে তাঁকে অতিক্রম ক’রে গেলেন এমন কেউ—কেউ, যাঁরা ছাত্রজীবনের অবসানের পরে আর ধবল কাগজের ধ্যানভঙ্গ করেননি, কিন্তু নিয়মিতভাবে কর্তৃপক্ষকে ভজনা ক’রে গেছেন। অনেকবার সূক্ষ্ম ও স্থূলভাবে অসম্মানিত হতে হতে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন দেবকীদাস। তুচ্ছ ঘটনা—শত্রুরা অজ্ঞাতসারে তাঁকে উপকৃত করেছিলেন, তাঁকে দিয়েছিলেন স্বকর্মের জন্য অখণ্ড স্বাধীনতা ও সুযোগ—কিন্তু এই দীর্ঘকাল পরে তা যেন একটি তিক্ত স্বাদ ছড়িয়ে দিল তাঁর মনের মধ্যে।
সঙ্গে—সঙ্গে, হাসপাতালের নির্গ্রন্থ কামরায় শুয়ে শুয়ে, তাঁর মনে পড়ল তাঁর লাইব্রেরি—ঘরটি—বহু বৎসর ধ’রে বহু চেষ্টায় ও অর্থব্যয়ে অর্জিত তাঁর পুস্তকভাণ্ডার। নানা ধরনের নানা বিষয়ের বই—চটি পুস্তিকা থেকে স্থূলকায় বিশ্বকোষ পর্যন্ত; কাশীতে ও কাঠমাণ্ডুতে সংগৃহীত কয়েকটি মূল্যবান তালপাতার পুঁথি; কিছু বটতলা; দেশে—বিদেশে ভাগ্যে—খুঁজে—পাওয়া কিছু বিরল গ্রন্থ। সুনিদ্রার পরে এক—একটি রাত্রি ভোর হয়। আর বইগুলির বিচ্ছেদবেদনা তাঁর মনে আরো তীব্র হয়ে ওঠে। ওদের নিয়ে, ওদেরই মধ্যে জীবন কেটেছে তাঁর, এবং তা—ই কাটবে ব’লে ধ’রে নিয়েছিলেন, তাহলে কেমন ক’রে এটা হতে পারছে যে সারাদিনে একবারও তাঁর দেখা হচ্ছে না ওদের সঙ্গে? আর তাছাড়া অন্য এক প্রশ্ন… কী হবে বইগুলোর, তিনি যখন গত হবেন? এ—যাত্রায় না—হয় সেরে উঠছেন, কিন্তু ঘটনাটি তো অনিবার্য। কতবার ভেবেছেন কোনো প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশে দানপত্র লিখে রাখবেন, কিন্তু আসক্তি তাঁকে বাধা দিয়েছে। এদিকে তাঁর পুত্র আয়কর—বিভাগের অধিকর্তা, জামাতা চক্ষুচিকিৎসক, নাতিরা শিক্ষা পেয়েছে ডাক্তারিতে বা যন্ত্রবিদ্যায়, ওই সব পেশা থেকেই নাতনিদের জন্য পাত্র পাওয়া গেছে বা খোঁজা হচ্ছে: তাঁর কোনো নিকট আত্মীয়ের পক্ষে ওই সব বই কখনো ব্যবহার্য হবে, এমন সম্ভাবনা আণুবীক্ষণিক। ওরা বিব্রত হবে, একদল ঘর—ভর্তি নিষ্প্রয়োজনীয় বইগুলো নিয়ে বিব্রত হবে; এমন দিন আসবে যখন খুবই যুক্তিসংগতভাবে সেগুলোর কোনো ‘ব্যবস্থা’ করতে চাইবে ওরা; আর তখন, তাঁর মৃত্যুর কয়েক মাস বা কয়েক বছর পরে, কোনো অর্থগৃধু ব্যবসায়ীর সৌজন্যে, তাঁর পুরো লাইব্রেরি নিলামে চড়বে একদিন—যারা বহুকাল ছিল সহবাসী, তাঁরই পরিকল্পিত সামঞ্জস্যে সংবদ্ধ, তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে কোথায় ছড়িয়ে পড়বে কে জানে। কিংবা হয়তো তাঁর স্মৃতির প্রতি পৌত্তলিক সম্মানবশত তারা স্তূপ ক’রে বাড়ির মধ্যেই জমিয়ে রাখবে কোথাও—বছরের পর বছর আর ফিরে তাকাবে না, এদিকে বৃষ্টি তার কাজ ক’রে যাচ্ছে, কীটরা তাদের কাজ ক’রে যাচ্ছে, হঠাৎ একদিন বইয়ের বদলে একরাশি কাগজের গুঁড়ো দেখতে পেয়ে ব্যথিত ও নিশ্চিন্ত হবে তারা। মনোকষ্টের এও একটি কারণ ছিল বৃদ্ধের পক্ষে—এই সব দুশ্চিন্তা—হাসপাতালে প্রথম দশ—বারো দিন।
কিন্তু এর পরে তাঁর হৃদযন্ত্র আবার একদিন দুরাচারী হলো, আর সেই আঘাত থেকে সামলে ওঠার পর তিনি মুমূর্ষুতার দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করলেন।
‘আমি মারা যাচ্ছি’: এই বার্তা এবারে তাঁর মস্তকে পৌঁছল, কিন্তু তা থেকে তাঁর মনে কোনো ত্রাস বা যন্ত্রণার সঞ্চার হলো না। হয়তো তার কারণ এই যে পূর্বোক্ত ‘আমি’টির সঙ্গে তিনি ঠিক মেলাতে পারছিলেন না নিজেকে, তাঁর অতি পরিচিত দেবকীদাস মুখোপাধ্যায়কে। ওই ‘আমি’র মৃত্যু একটা নির্বস্তুক তথ্য, যা সংবাদপত্রে দেবকীদাসেরও চোখে পড়বে—এমনি মনে হচ্ছিল তাঁর। কিন্তু একই সঙ্গে, তাঁর চৈতন্যে সেই দেবকীদাসের একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছিল; এতদিন যিনি ছিলেন পণ্ডিত ও গ্রন্থকার, কিয়ৎপরিমাণে যশস্বী বললেও অত্যুক্তি হয় না, তিনি অকস্মাৎ হয়ে উঠলেন এক বাসনাবিদ্ধ রক্তমাংসের মানুষ। শরীর থেকে মরা চামড়ার মতো তাঁর মন থেকে খসে পড়ল তাঁর কর্মজীবন, তৎসংক্রান্ত সব খেদ ও দুশ্চিন্তা। সমুদ্রের মধ্যে লোষ্ট্রের মতো ডুবে গেল সেই বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে তিনি এক ধূসর অতীতে কর্ম করতেন। পিশাচ—সংহিতার অনুবাদ, রোমানি ভাষা বিষয়ে তাঁর সন্দর্ভ—এগুলো সমাপ্ত হলো না বলে এখন আর তিনি পরিতপ্ত নন, শঙ্কাকুল নন তাঁর গ্রন্থাগারের ভবিষ্যৎ নিয়ে। একদল বানরকে টাইপরাইটারের সামনে বসিয়ে দিলে তারা দশ লক্ষ বছরের মধ্যে শেক্সপীয়রের সব নাটক লিখে উঠবে, এ—কথা যদি সত্য হয়, তাহলে—আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে কেউ—না—কেউ নিশ্চয়ই রচনা করবে রোমানি ভাষা বিষয়ে সেই প্রামাণিক গ্রন্থ, তিনি যা আরম্ভ করেছিলেন, কারো—না—কারো উদ্যোগে পিশাচ—সংহিতার অনুবাদও প্রকাশিত হবে। তাহলে: কী এসে যায়? আর তাঁর সংগৃহীত বইগুলি বিষয়ে তাঁর মনে একটি নতুন চিন্তার উদয় হলো: তিনি যেন উপলব্ধি করলেন যে তাঁর সঙ্গে—সঙ্গে ওই বইগুলিরও মৃত্যু হবে, কেননা তিনি তাদের সঙ্গে যে—সম্বন্ধ স্থাপন করেছিলেন, তা ছিল তাঁরই ব্যক্তিগত সৃষ্টি, বহু বৎসর ধ’রে তা বিবর্তিত হয়েছিল, সেই সম্বন্ধটি একবার অবসিত হলে, আকারে—প্রকারে অস্তিত্ব থাকলেও তাঁর ব্যবহৃত একটি বইও আর থাকবে না, তাঁর পঠিত কোনো—একটি বই অন্য কেউ পড়বে না কোনোদিন। অতএব ছাপা কাগজ ও বাঁধাই সংবলিত যে—বস্তুগুলিকে তিনি অতি যত্নে রক্ষা করেছিলেন (যা আসলে কোনো পরিবর্তনশীল অন্তঃসারের আধারমাত্র), তা হস্তান্তরিত বা উপেক্ষিত বা বিনষ্ট হলে কী এসে যায়? এই স্বার্থপর চিন্তা তাঁকে সান্ত্বনা দিল, কিন্তু তা অনুধাবন করতে গিয়ে তিনি ক্লান্তিবোধ করলেন, তাঁর দুর্বল—হয়ে—আসা মননশক্তি এক কোমলতর আশ্রয় খুঁজল। দু—একটি নারীমূর্তি উদিত হলো তাঁর স্মরণে।
দেবকীদাসের বয়স যখন তেইশ, পিতামাতার নির্দেশে ও আয়োজনে একটি ষোড়শবর্ষীয়া সব্রাহ্মণকন্যার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁর যুবক—চিত্তে ঈষৎ চাঞ্চল্য জেগেছিল অন্য একজনের জন্য—ভাটপাড়ায় তাঁদেরই প্রতিবেশিনী এক কিশোরী বিধবা, মেয়েটিও কম্পিত হয়েছিল যেমন অল্প হাওয়াতেই গাছের পাতা নড়ে ওঠে—কিন্তু সেই ছোট্ট বাতাস থেকে ঝড় তোলার মতো ক্ষমতা ছিল না দেবকীদাসের; পিতার মতে বিধবাবিবাহ গর্হিত জেনে, তাঁর গোপন বাসনা তিনি চেপে দিয়েছিলেন। আর বিয়ের পরে, একটি সুশ্রী তন্বীকে সঙ্গিনী পেয়ে, অন্যজনকে ভুলতেও তাঁর দেরি হয়নি। শান্ত চোখের মানুষ ছিল সর্বাণী, মৃদুভাষিণী, অনুগত স্ত্রী, গুরুজনের সেবায় অক্লান্ত, সন্তানপালনে নিষ্ঠাবতী—পুরোনো হিন্দু ঐতিহ্যের সব শ্রী ও সুষমা দিয়ে তৈরি একটি মেয়ে। দেবকীদাসও তাকে দিয়েছিলেন স্নেহ যত্ন প্রীতি—যৌথ পরিবারের অসংখ্য দাবি মিটিয়ে যতটা সম্ভব ততটাই। স্ত্রীকে নিয়ে তৃপ্ত, একটি পুত্র ও একটি কন্যার মুখ দেখে হৃষ্ট—নির্বিরোধ, নির্মল ছিল তাঁর দাম্পত্যজীবন। কিন্তু বিবাহের মাত্র পাঁচ বছর পরে মৃত্যু হলো সর্বাণীর—তখনকার দিনের অচিকিৎস্য টাইফয়েড রোগে—ধীর, নম্র, প্রতিবাদহীন মৃত্যু। ‘আর কিছুদিনের মধ্যেই আবার দেখা হবে তার সঙ্গে—’ হঠাৎ এই কথাটা ঝিলিক দিল দেবকীদাসের মনে। ‘না—না—ও—সব বাজে, দেহ ভস্ম হয়ে যায়, আর পরজন্ম যদি বা থাকে সেখানে আমরা কেউ কাউকে চিনব না।’
স্ত্রীর মৃত্যুর সময়ে তিনি ছিলেন পূর্ণ যুবক, কিন্তু স্বাভাবিক শোক স্বাভাবিকভাবে প্রশমিত হবার পরেও পুনর্বিবাহের প্রস্তাব তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এর কারণ আর—কিছুই নয়, এক ধরনের আলস্য—কোনো বিশেষ কর্মে নিবিষ্ট হলে অন্য সব বিষয়ে আমাদের যে—ঔদাসীন্য আসে, তা—ই। আসলে এই সময় থেকেই তিনি গবেষণা কর্মে মন দিলেন—প্রথমে স্ত্রীর শোক ভোলার জন্য, তারপর ক্রমশ সেটাই তাঁর অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল, ওই সূক্ষ্ম, সুদূর ক্রিয়াকলাপই হয়ে উঠল তাঁর জীবনের আশ্রয়। ধূসর হলো সর্বাণীর স্মৃতি, সেই সঙ্গে নারী—সংক্রান্ত চিন্তা থেকেও নিষ্কৃতি পেলেন। এমনি কাটল একে—একে চৌদ্দ বছর, হয়তো তাঁর অবশিষ্ট আয়ুষ্কালও এমনি কাটত, যদি না দৈবে দেখা হয়ে যেতো—
কার সঙ্গে? কোথায়? তীব্র শীত, বিস্বাদ খাদ্য, সূর্য অদৃশ্য বা ক্ষীণজ্যোতি, বিরলবাক লোহিতবর্ণ কর্মতৎপর জনতা। এসেছেন লন্ডনের প্রাচ্য বিদ্যালয়ে এক বৎসরের জন্য আমন্ত্রিত অধ্যাপক হয়ে। কিন্তু সেই তুষারের শবাচ্ছাদন, সেই ধোঁয়া, মেঘ, কুয়াশার আস্তরণ—তারই তলায় প্রচ্ছন্ন ছিল সে, তিনি জানতেন না। একদিন, অবশেষে সেই উত্তরদেশেও যখন শীত মন্দীভূত হলো (ওদের ভাষায় তারই নাম গ্রীষ্ম), তাঁর দেশে ফেরার প্রায় তিন মাস বাকি, বাঙালিদের এক প্রীতিসম্মেলনে দেখা হয়ে গেল।
সে চারুশীলা। তাঁর প্রথম যৌবনের প্রতিবেশিনী, উনিশ বা কুড়ি বছর আগে যার সঙ্গে তাঁর নিঃশব্দ ও বাঙ্ময় দৃষ্টি বিনিময় হতো—সে ঘর ছেড়ে পালিয়েছিল, পাথুরেঘাটার এক ধনীপুত্রকে গোপনে বিয়ে ক’রে লন্ডনে; সে—বিয়ে ভেঙে যাবার পর দেশে আর ফেরেনি, বা ফিরতে পারেনি—সেই থেকে বাসিন্দা হয়েছে ইংল্যান্ডের, সব অর্থেই স্বাধীনা। নিঃসন্তান, আর বিয়ে করেনি (যদিও তার অর্থ এ—রকম নাও হতে পারে যে অন্য পুরুষ বিষয়ে অভিজ্ঞ হয়নি কখনো), কর্ম করে এক প্রকাশকের আপিশে, যাঁরা ভারত—বিষয়ক পুঁথিপত্র ছেপে থাকেন। দেবকীদাস, বংশগতভাবে রক্ষণশীল—এই পূর্ব ইতিহাসে বিতৃষ্ণ হতে পারতেন তিনি, তাঁর মনে হতে পারত চারুশীলার গতিপথ তার নয়নের দৃষ্টির মতোই বক্র, আর তাঁর নিজের পক্ষেও অনাচার হবে যদি কোনো নারীর সঙ্গে তিনি আকস্মিকভাবে যুক্ত হন;—এ—সব দ্বিধা তাঁকে যে বিব্রত করেনি তাও নয়, কিন্তু তাঁর সব পারিবারিক সংস্কার ছাপিয়ে তাঁকে বিদ্ধ করল এক আহ্বান, এক উষ্ণ, সজীব মোহময় উপস্থিতি—যৌবনের স্মৃতি দিয়ে রাঙানো, নূতনের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল। ভাটপাড়ার সনাতনপন্থার বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহ করেছিল একটি দুর্বল তরুণী মেয়ে—তাঁর নিজের পক্ষে যা সম্ভব হয়নি—সেই বিদ্রোহে মুগ্ধ না—হয়ে তিনি পারলেন না। অন্য দেশ, অন্য পরিবেশ, ভিন্ন লোকাচার, এক চঞ্চল, পরিবর্তনশীল জগৎ—আর তারই মধ্যে ওই কান্তিময়ী সাহসিকা। সে যেন চোখের পলকে হরণ করে নিলো তাঁকে, তার ফুরিয়ে—আসা শেষ তীব্রতার চাপে ভেঙে দিল তাঁর ভীরুতা ও সংশয়—সব সাধিত হলো অতি সহজে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে, যেন দু—জনেই ছিল বহুকাল ধ’রে প্রস্তুত, বহুকাল ধ’রে অপেক্ষমাণ, যেন কোনো করুণাশীল দৈবের পরিকল্পনায় আজ দু—জনেই অভিভূত ও বাধ্য। নায়িকা তাঁকে হাতে ধ’রে নিয়ে গেল জীবনের অন্য এক স্তরে; দীক্ষা দিল এমন সব রহস্যে এতদিন যা তাঁর পক্ষে শুধু জনশ্রুতি ছিল। দেবকীদাস অর্জন করলেন এমন কোনো—কোনো জ্ঞান, যা পুস্তকে বা পাণ্ডুলিপিতে বিবৃত নেই; তিনি অশ্রুপাত করলেন নাট্যশালায়; চিত্রশালায় কোনো নগ্নাকে দেখে প্রতিমার সামনে ভক্তের মতো দাঁড়ালেন, প্রীত হলেন পল্লী অঞ্চলে কোনো তিনশো বছরের পুরোনো সরাইখানায় রাত্রি কাটিয়ে; স্নিগ্ধ লঘু দ্রাক্ষামদিরার স্বাদ নিলেন, আবিষ্কার করলেন ওই হিমাহত অমিত্র দ্বীপে এক মনোমুগ্ধকর শ্যামলিমা;—এতদিনে ইংল্যান্ড দেশটা তাঁর অভিজ্ঞতার মধ্যে প্রবিষ্ট হলো। এক হৃদয়মন্থনকারী জাগরণ যেন, এক অযাচিত অবিশ্বাস্য উপহার। কিন্তু, যখন দেবকীদাসের মনে হচ্ছে তাঁর জীবন নতুন ক’রে আরম্ভ হলো, তখনই একদিন জাহাজ ঘাটায় জলের ব্যবধান বেড়ে চলল দু—জনের মধ্যে, তিনি বন্দরের ভিড়ে মোহিনীকে হারিয়ে ফেললেন।
হাসপাতালের কামরায়, বিছানায় বন্দী, দেবকীদাস ভুলে গেলেন তাঁর বর্তমান বয়স; কিংবা, প্রাণশক্তি ক্ষীয়মাণ বলে, তাঁর কাছে ঝাপসা হয়ে গেল যৌবন ও বার্ধক্যের ভেদ, অতীত ও বর্তমানের মধ্যে বিচ্ছেদরেখা। কোথায় আছি আমি, কী করছি, কে চলছে আমার সঙ্গে? আছি লন্ডনে, খুঁজে পেয়েছি যাকে চেয়েছিলাম… এখনো চাই। এখনো? কতকাল হয়ে গেল! কিন্তু এই প্রশ্নটি মুহূর্তের বেশি দাঁড়াতে পারল না, ‘কতকাল’ বলতে কী বোঝায় তা যেন ঠিক ধারণা করতে পারলেন না তিনি; এখন তাঁর মধ্যে যা চলছে তা যেন স্মৃতি নয়, ঘটনা, শুধু মনে—মনে ভাবা নয়, প্রত্যাবর্তন। চারুশীলা এখন কোথায় আছে, কেমন আছে, তার বয়স যে এতদিনে সত্তর হবার কথা, সে বেঁচে আছে কিনা সে—বিষয়েও যে নিশ্চয়তা নেই—এ—সব চিন্তা একবারও তাঁকে বিব্রত করল না। সেই দিনগুলি, চারুশীলাকে নিয়ে কানায় কানায় ভরা এক—একটি পাত্র, যা ডুবে গিয়েছিল এক ঝাপটে সমুদ্রে—আজ তা—ই ঢেউ হয়ে, বাতাস হয়ে তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল—প্রথম দেখা থেকে জাহাজ—ঘাটে বিদায় পর্যন্ত। বাঁচলেন তিনি আরো একবার, স্পন্দিত হলেন, কষ্ট পেলেন। তাঁর রক্তে আবার জেগে উঠলেন স্মরদেবতা, তিনি পাঁচ আঙুলে আঁকড়ে ধরলেন বিছানার চাদর, দাঁত বসিয়ে দিলেন বালিশে (যেমন করেছিলেন তিরিশ বছর আগে এক ভারতগামী জাহাজের কামরায়), নিঃশব্দ চিৎকারে উচ্চারণ করলেন একটি নাম; তারপর এক আকস্মিক স্বচ্ছ মুহূর্তে বর্তমানে ফিরে এসে ভাবলেন, ‘সার্থকতা—এখানেই। মেধা, জ্ঞান, কীর্তি বা ক্ষমতায় নয়—এই হৃৎস্পন্দনে, অনুকম্পনে।’ কিন্তু এই আবেগের চাপ তাঁর দুর্বল দেহ সহ্য করতে পারল না; তাঁর বৃদ্ধ চোখ থেকে সব আলো হারিয়ে গেল হঠাৎ; তিনি আবিষ্ট হলেন সেই মূর্ছায়, যা থেকে আর জাগরণ নেই। তাঁর মরণাপন্নতার উপান্ত্য দশা উপস্থিত হলো। সেই থেকে আজ তৃতীয় দিন।
প্রথম দু—দিন কিছুটা উদ্ভ্রান্ত ছিলেন দেবকীদাস। সব স্থান ও তথ্য এখন নিশ্চিহ্ন, সব নাম লুপ্ত, তাঁর পঁচাত্তর বছরের চেনা পৃথিবী একটি—দুটি সংকেতের মধ্যে গুটিয়ে গেছে। কখনো একটা ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাচ্ছেন—ধাপে—ধাপে, এঁকে—বেঁকে, অন্ধকার থেকে আরো অন্ধকারে; কখনো গলি প্যাঁচালো, দুই দিকে দেয়ালের চাপে গুমোট—হঠাৎ ভয়, সামনে—পিছনে কিসের যেন শব্দ। আবার কখনো উৎক্ষিপ্ত হয়ে আলোয়, নাগরদোলায় ঘুরন্ত—জোরে, এত জোরে যে দম আটকে আসে—টুকরো দৃশ্য, ভেসে উঠেই মিলিয়ে যায়—কোনো মুখ, কোনো রাস্তা, কোনো জানলা, কোনো হোটেলের ঘর—সব অস্পষ্ট, অস্থির—এক পরিচালকহীন বিরক্তিকর ঘূর্ণি—আর এই সবের মধ্য দিয়ে, ফাঁকে—ফাঁকে, যেন কোনো গোপন রন্ধ্রপথ রচনা ক’রে নিয়ে, এক মূর্তি, বা পরিলেখ, বা আভাসমাত্র—যেন তাঁরই জন্য উদ্ভূত, তাঁকে ডাকছে, অপেক্ষা ক’রে আছে তাঁরই জন্য। এ—ই কি তাহলে মৃত্যু? …না বহুবিশ্রুত ভগবান? নাকি তা—ই? কিন্তু ভগবান কি আছেন? আমরা যার নাম দিয়েছি ভালোবাসা—ভালোবাসা কি সম্ভব? কেন অনবরত চেষ্টা করি আমরা সব ভাঙনে, সব রচনায়? কিছু কি নেই যার কাছে ফেরার জন্য জীবন ভ’রে, সব কাজে, সব খেলায়, সেই চরম? মৃত্যু… ভালোবাসা… ভগবান… নেই—কিন্তু কে বলে নেই?—ওই তো! অবশিষ্ট ক্ষীণতম চৈতন্য দিয়ে দেবকীদাস যেন মূঢ়ের মতো আঁকড়ে ধরলেন এই তিনটি শব্দকে—মৃত্যু, ভালোবাসা, ভগবান—মর্ত্যলোকের সঙ্গে শেষ যোগসূত্র তাঁর; আর তাও যখন ছিন্ন হলো, তখনই তিনি প্রবেশ করলেন তাঁর মরণশীলতার ক্ষণস্থায়ী অন্তিম পর্যায়ে।
আজ সকাল থেকে সব অবান্তর দৃশ্য লুপ্ত হয়েছে; এখন তাঁর অন্ধকার সুনির্দিষ্ট ও অবিচ্ছিন্ন, তাই আরামদায়ক। কোনো রোমশ জন্তু, নৈশ, অস্পষ্ট, অন্ধকারের সুড়ঙ্গ পথে নড়ছে, নিঃশব্দে, তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে, স্পর্শময়। শ্যাওলার স্পর্শ, কদম্বের, ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে—থাকা চোরকাঁটার; আর গন্ধ—এক উষ্ণ, সজীব, উন্মাদক ঘ্রাণ, অন্ধকারে আশা ছড়িয়ে, এক বিপুল, অচিন্ত্য নবজাগরণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। সারাদিন ধ’রে খেলা চলল তাঁর সঙ্গে ওই অস্পষ্ট সত্তার; তারপর আহ্নিক আকাশে সূর্য যখন অস্ত যায়, দেবকীদাস সর্বাঙ্গ দিয়ে অনুভব করলেন সেই স্পর্শ—প্রতি রোমকূপে তার শিহরন, দংশন, প্রভুত্ব—এক অনির্বচনীয় আনন্দ ও যন্ত্রণায় নিমজ্জিত হয়ে। কিন্তু, সেই জন্তুর নাম ভালোবাসা, না ভগবান, না মৃত্যু, তা বোঝার মতো ক্ষমতা তাঁর ছিল না—এক অমেয় অনুভূতির মধ্যে নির্ভেদ ও নির্বাক হয়ে গিয়েছিল মানুষের সব ধারণা ও কল্পনা। সূর্যাস্তের আগেই ডাক্তাররা তাঁকে মৃত ব’লে ঘোষণা করলেন।
