আমি, অমিতা সান্যাল
পরীক্ষার খাতা দেখতে—দেখতে মাঝে—মাঝে তিনি অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছেন। রাত এখন এগারোটা, বাড়ি চুপচাপ, চমৎকার নিরিবিলি সময়, ভেবেছিলেন শোবার আগে অন্তত দশখানা দেখে উঠবেন আজ—কিন্তু এগোচ্ছে না, চোখের সামনে আঁকিবুঁকিগুলো মাঝে—মাঝেই অস্পষ্ট, আঙুলের ফাঁকে নীল পেন্সিল নিশ্চল। এদিকে তাঁর এক বান্ডিল বাকি এখনো, আর সময় আছে আর মাত্র সাতদিন।
না, কোনো বৈষয়িক বা পারিবারিক সমস্যা নয়। বরং বলা যায় ব্যক্তিগত—কিন্তু কী থাকতে পারে ব্যক্তিগত তাঁর জীবনে, তিনি, এক প্রৌঢ়া বিধবা, মাস্টারি আর নাতি—নাতনিদের মধ্যে যিনি অনেকদিন হলো নিজেকে ভাগ ক’রে দিয়েছেন! আসলে কোনো সমস্যাই নয়, তাঁর জীবনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই সত্যি বলতে—নেহাতই মন—গড়া এক ব্যাপার, কারো খেয়ালের ফানুস, কারো মগজ থেকে ছিটকে—পড়া দুটো শব্দ—আর তাই কিনা তাঁর জরুরি কাজে বাধা দিচ্ছে, যেহেতু এক উচ্চাভিলাষী যুবক কোনো—এক তুচ্ছ বিষয়কে টেনে—হিঁচড়ে ফেনিয়ে—ফাঁপিয়ে ডক্টরেটের থিসিস লিখতে চায়! এর চেয়ে হাস্যকর কথা আর কী হতে পারে।
হাস্যকর—যে—প্রশ্ন নিয়ে যুবকটি তাঁর কাছে এসেছিল, সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অবান্তর এক প্রশ্ন, তাঁরই নিজের বিষয়ে, কিন্তু তাঁর কল্পনার মধ্যেও কখনো যা ছিল না, এবং যা প্রথম শুনে তাঁর মনে হয়েছিল বটুক—গবেষকটি মানসিকভাবে ঠিক সুস্থ নেই। অথচ এখন, এই নিরিবিলি রাত্তিরে, মনে—মনে যেন তারই উত্তর হাতড়ে বেড়াচ্ছেন তিনি—যদিও তাঁর এক বান্ডিল খাতা এখনো বাকি, আর সময় আছে আর মাত্র সাতদিন মাত্র।
‘আপনি অমিতা সান্যাল, হিরণ্ময়ী মহিলা—বিদ্যাপীঠের দর্শনের অধ্যাপিকা?’ অচেনা যুবকটি সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ালো—এত বিনয় তার ভঙ্গিতে, এত বিস্ময় তার দৃষ্টিতে, যা এক ক্ষুদ্র কলেজের অখ্যাত অধ্যাপিকার কখনোই প্রাপ্য হতে পারে না। একটুক্ষণ সে তাকিয়ে রইল তাঁর মুখের দিকে, কেমন অদ্ভুতভাবে হাসল। অমিতা সান্যাল ঠান্ডা গলায় জিগেস করলেন, ‘কী চাই আপনার?’
তিন মিনিটের মধ্যে জানা গেল যে সে, হিমাংশু ভৌমিক, বাংলা সাহিত্যে গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তিপ্রাপ্ত, সে এই দুপুর—রোদ্দুরে চ’লে এসেছে সুদূর সিঁথি থেকে প্রথমে চেতলায় তাঁর কলেজে, তারপর কলেজ থেকে ঠিকানা নিয়ে যাদবপুরের গলির মধ্যে খুঁজে—খুঁজে তাঁর বাড়িতে—শুধু এই কথাটুকু জানার জন্য যে তিনি, হিরণ্ময়ী মহিলা—বিদ্যাপীঠের অধ্যাপিকা অমিতা সান্যাল, কখনো নীলকণ্ঠ রায়কে চিনতেন কিনা।
‘কে নীলকণ্ঠ রায়?’
‘কবি—কবি নীলকণ্ঠ রায়,’ নরম গলায় জবাব দিল হিমাংশু, সারা মুখে হেসে, ঈষৎ আত্মচেতনভাবে, যেন রঙের টেক্কা টেবিলে ফেলছে, এমনি তার ধরনটা। ‘আমি তাঁকে নিয়েই গবেষণা করছি।’
ও—সেই ‘আধুনিক’ কবি নীলকণ্ঠ রায়, যিনি মাত্র কয়েক বছর আগে মারা গেলেন, তাঁকে নিয়েও ‘গবেষণা’! প্রবীণ অধ্যাপিকার ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গের হাসি ফুটল, কেননা তিনি গবেষণা বলতে বোঝেন অতি সূক্ষ্ম তাত্ত্বিক আলোচনা, বা লুপ্ত অথবা বিস্মৃতপ্রায় পুরোনোর পুনরুদ্ধার এবং তাঁর এও বিশ্বাস যে কালের পরীক্ষা যা উত্তীর্ণ হয়নি তা পণ্ডিতের আলোচনার অযোগ্য। সম্প্রতি তিনি অনেকবার যা ভেবেছেন সেই কথাটাই আবার বললেন মনে—মনে—‘সত্যি, আমাদের শিক্ষার মান কোথায় নেমে যাচ্ছে!’ আর মুখে, অস্ফুট স্বরে—‘তা আমার কাছে কী—জন্য…?’
‘আপনি কখনো চিনতেন কি নীলকণ্ঠ রায়কে?’ আগ্রহের আতিশয্যে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল যুবকটি, হাতের বইটাকে শক্ত ক’রে আঁকড়ে ধরল।
‘আমি? না তো।’ তৎক্ষণাৎ জবাব শোনা গেল।
‘কিন্তু আমি শুনেছি আপনার স্বামী স্কটিশ চার্চে তাঁর সহপাঠী ছিলেন।’
‘তা হতে পারে, কিন্তু আমি জানি না।’
‘কী আশ্চর্য, স্বামীর সহপাঠী—তবু দেখা হয়নি তাঁর সঙ্গে?’ বিরক্তি তাঁর কথার সুরে, কিন্তু উৎসাহী যুবকটি তাতে দমল না। ‘দয়া ক’রে একটু ভেবে দেখবেন কি? যদি কখনো—অনেক আগে—আমরা তো অনেক পুরোনো কথা ভুলে যাই? …আপনার স্বামীর মুখে নীলকণ্ঠ রায়ের কথা শুনেছিলেন কি কখনো? কোনো চিঠিপত্র আছে কি? কিছুই জানেন না তাঁর বিষয়ে—যে—কোনো সাধারণ—তথ্য… যা আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত তুচ্ছ… যদি কিছু মনে পড়ে আপনার—’
‘আমার মনে হচ্ছে আপনি সময় নষ্ট করছেন,’ তরুণ গবেষকের আবেদনে একটু রূঢ়ভাবেই বাধা দিলেন অমিতা সান্যাল, ‘আপনার নিজেরও, আর আমারও।’ শরীরের ঊর্ধ্বাংশ আরো একটু মুইয়ে দিয়ে হিমাংশু বলতে লাগল, ‘আমি হয়তো অসময়ে এসেছি, আপনি ব্যস্ত আছেন, কিন্তু কেন এলাম সেটুকু অন্তত বলতে দিন। আপনি নিশ্চয়ই জানেন—’ একটু থামল সে, হাতের বইখানার পাতা ওল্টালো ‘নিশ্চয়ই জানেন নীলকণ্ঠ রায়ের কবিতায় “অমিতা সান্যাল” নামটা চারবার পাওয়া যায়?’ প্রৌঢ়া মহিলার মনে পড়ল ও—রকম একটা কথা কে যেন তাঁকে বলেছিল একবার—বোধহয় বাংলা বিভাগের কাবেরী ঘোষ, তার বয়স অল্প, চলতি কালের বই পড়ার বদভ্যাস এখনো কাটাতে পারেনি—বলেছিল খুব হালকাভাবে অবশ্য, একটা অর্থহীন খুচরো খবর হিশেবে শুধু, কিন্তু হিমাংশু ভৌমিকের বলার ভঙ্গিটা একেবারেই ভালো লাগল না তাঁর। উত্তর দিলেন, ‘আর তাই, যেহেতু আমার ওই নাম—আপনি তথ্যের খোঁজে আমার কাছে ছুটে এলেন! আমি বুঝতে পারছি না আপনি থিসিস লিখছেন, না উপন্যাস।’ বদ্ধপরিকর গবেষক এই বিদ্রূপেও অপ্রতিভ হলো না, বরং এবার পিঠ সোজা ক’রে বসল, গম্ভীর চোখে তাকালো। ‘আমি ধ’রে নিয়েছি নামটা কাল্পনিক, কিন্তু কল্পনার তলায় কখনো কোনো তথ্য থাকে না তাও তো নয়।’ ‘এ—ক্ষেত্রে কিছুই নেই।’ ‘একটা কথা জিগেস করছি, আপনার উত্তর পেলে অশেষভাবে কৃতজ্ঞ হবো। কবিতাগুলি প’ড়ে আপনার নিজের কী মনে হয়েছে?’ ‘আমি পড়িনি।’ ‘কখনো পড়েননি?’ এই প্রথম ম্লান দেখালো উৎসাহী যুবকটিকে; তা লক্ষ ক’রে, মনে—মনে খুশি হয়ে, অমিতা সান্যাল আবার বললেন, ‘আমি কবিতা বেশি পড়ি না। আর আজকাল কবিতা যা হচ্ছে, পড়লেও বোঝার কোনো উপায় নেই।’ হিমাংশু ঢোক গিলল এই কথা শুনে, পুরো এক—মিনিট—মতো চুপ ক’রে রইল, তারপর যেন হঠাৎ মনস্থির ক’রে জোরালো গলায় ব’লে উঠল, ‘কিন্তু এই কবিতাটায় না—বোঝার মতো কিছুই নেই। এই যে, একত্রিশ পৃষ্ঠায়—“অভ্যর্থনা ও বিদায়” ব’লে যেটা আছে—একবার প’ড়ে দেখবেন? বলেন তো আমি প’ড়েও শোনাতে পারি।’ ‘না, না, শোনাতে হবে না—’ আগন্তুককে আরো তাড়াতাড়ি বিদায় দেবার জন্য অধ্যাপিকা অনিচ্ছা কাটিয়ে বই হাতে নিলেন, উক্ত রচনাটিতে চোখ বুলিয়ে গেলেন একবার, ভালো—মন্দ কিছুই লাগল না। তবে হ্যাঁ—“অমিতা সান্যাল” নামটা—সাঁওতাল মেয়ে কৃষ্ণকলি নয়, পল্লীবালিকা রঞ্জনা নয়, উজ্জয়িনীর মালবিকা নয়—একেবারে পদবিসুদ্ধ, জ্বলজ্যান্ত এক বাঙালি ভদ্রমহিলার নাম—সত্যি, কবিতা নিয়ে কী ছেলেমানুষি হচ্ছে আজকাল! কোনো মন্তব্য না ক’রে হিমাংশুর দিকে বই এগিয়ে দিলেন, কিন্তু হিমাংশু বোধহয় অন্যমনস্ক ছিল সেই মুহূর্তে, বা তিনি অসাবধান—বইটা হঠাৎ প’ড়ে গেল তাঁর হাত থেকে, তুলতে গিয়ে মুখপত্রের ছবিটা বেরিয়ে পড়ল। সেই ছবির দিকে একবার তাকালেন অধ্যাপিকা—ঝাপসা, খুব ঝাপসাভাবে নীলকণ্ঠ রায়ের মুখটা তাঁর চেনা মনে হলো।
আর এখন, রাত্তির যখন সাড়ে এগারোটা পেরিয়ে গেছে, বাড়ি চুপচাপ, আশেপাশের জানলাগুলোতে আলো নিবে যাচ্ছে একে—একে, আবার সেই বই খুলে ছবিটা দেখছেন তিনি—টেবিল—ল্যাম্পের আলোয়, পরীক্ষার খাতার বান্ডিল সরিয়ে রেখে। অর্থহীন প্রশ্ন—নিশ্চয়ই—কোনো উপাধিপ্রার্থী উদ্ভ্রান্ত যুবক ছাড়া সকলের কাছেই তা—ই—কিন্তু তবু, যে—মুহূর্তে ছবির মুখটা তাঁর চেনা মনে হলো (যদিও নিরাশ গবেষকটিকে তার কিছুই তিনি বুঝতে দেননি), তখন থেকে অস্পষ্ট একটা কৌতূহল তিনি অনুভব করছেন, নিজের সঙ্গে একটা খেলা খেলছেন যেন, যাতে অন্য কারো কোনো অংশ নেই। একটি আধ—বয়সী সাদা—পাঞ্জাবি—পরা ভদ্রলোককে দেখা যাচ্ছে—মুখটা গোল ছাঁদের, চওড়া কাঁধ, নাকের বাঁশি ফোলা—ফোলা, ঠোঁট পুরু, পাতলা চুল চাঁদির উপর ল্যাপ্টানো, ভুরুর মধ্যিখানে কপালের চামড়া রাগী ধরনে কুঁচকে আছে। মনে হয় কোনো ইঞ্জিনিয়ার বা ব্যাঙ্কের ম্যানেজার, শক্তপোক্ত কেজো কোনো সংসারী মানুষ, যার চেহারা নেহাত চলনসইয়ের চাইতে একটুও ভালো হবার দরকার নেই। আর এই নাকি একজন কবি—বিখ্যাত কবি!
হ্যাঁ, দুঃখের বিষয়, বিখ্যাত। যুবকটি এসে যাবার পরে এই চারদিনে কিছু খোঁজ—খবর নিয়েছেন তিনি, এক কপি কিনেও এনেছেন ‘নীলকণ্ঠ রায়ের কবিতা’, অন্য কাজের ফাঁকে—ফাঁকে পাতা উল্টেছেন। এবড়োখেবড়ো ছন্দ, অদ্ভুত জগাখিচুড়ি ভাষা—না আছে মধুসূদনের কল্লোল, না রবীন্দ্রনাথের ঝংকার, কোথাও শোনা যাচ্ছে না কোনো সুন্দরী ঝর্নার নুপুরের বোল বা বিদ্রোহী বীরের উদাত্ত কণ্ঠ—অনেক সময় মনে হয় যেন হেঁয়ালি বা রসিকতা বা স্বপ্নের ঘোরে প্রলাপ বকছে কেউ; কিন্তু তবু (বা হয়তো সেইজন্যই) আজকালকার ছেলেরা নাকি ‘নীলকণ্ঠ’ বলতে মূর্ছা যায়, কাগজে—পত্রে অনবরত লেখালেখি হচ্ছে তাকে নিয়ে, সম্প্রতি এক চিত্রাভিনেত্রীও এক সাক্ষাৎকারে ঘোষণা করেছেন তাঁর প্রিয় কবির নাম নীলকণ্ঠ রায়। কলেজে কোনো—কোনো সহকর্মিণীর মুখে অমিতা সান্যাল এ—সব কথা সহাস্যে শুনেছিলেন, ধ’রে নিয়েছিলেন এটাও এক উটকো হুজুগ—ছেলেদের সরু প্যান্ট আর দাড়ি, আর ছুকরিদের সালোয়ার কামিজের মতোই কিছুদিন মাতামাতি চলবে যা নিয়ে। নীলকণ্ঠ বিষয়ে ইংরেজি বিভাগের চল্লিশোত্তর প্রধান অধ্যাপিকার উৎসাহ দেখেও তিনি বিচলিত হননি, কেননা—সকলেই জানে—অনেক সময় বয়স্করা তরুণদের ফ্যাশনের গাঙে গা ভাসান শুধু নিজেদের ‘জলচল’ রাখার ঈষৎ অসাধু উদ্দেশ্য থেকে;—এই সবই উপেক্ষা ক’রে গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু কাবেরী ঘোষ যখন বলল নীলকণ্ঠের কবিতা সামনের বছর থেকে বাংলা অনার্স—কোর্সে পাঠ্য হতে পারে, তখন অমিতা সান্যালকে থমকাতে হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য—তার মানে কয়েক হাজার ছেলেমেয়েকে পড়ানো হবে প্রতি বছর, বছরের পর বছর, আর সেই ডিগ্রিধারী কয়েক হাজারের মধ্যে আবার কয়েকজন নীলকণ্ঠ রায়ের কবিতা পড়াবে, এমনি—তাহলে কি… তাহলে কি বাংলাদেশে অনেকের কাছে নীলকণ্ঠ রায় হয়ে উঠবেন তেমনি একজন, যেমন আমার কাছে মধুসূদন, বা রবীন্দ্রনাথ, বা শেলি, বা কীটস; তাঁকে নিয়েও অনেক গল্প গ’ড়ে উঠবে, ছড়িয়ে পড়বে সত্যে—মিথ্যায় মেশানো অনেক রটনা—যেমন আমরা ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি মধুসূদন বা রবীন্দ্রনাথ বা শেলির বিষয়ে—আজ থেকে ধরা যাক কুড়ি বছর বা চল্লিশ বছর পরে? কিন্তু অত দূরে যাবার দরকার কী—এখনই, এই তো সেদিন, আমি যখন বললাম ভদ্রলোক দেখতে কিন্তু মোটেও কবির মতো নন, কাবেরী তক্ষুনি ব’লে উঠল, ‘কেন, সুন্দর তো!’—এদিকে এক উচ্চাভিলাষী উদ্ভ্রান্ত যুবক উঠে—প’ড়ে লেগেছে নীলকণ্ঠের জীবনী লেখার জন্য, তল্লাশ করছে ‘অমিতা সান্যাল’ নামের পিছনে কোনো তথ্য লুকিয়ে আছে কি নেই।
বেচারা হিমাংশু ভৌমিক! এমন একটা বিষয় নিয়েছে যাতে আগে কেউ আঁচড় কাটেনি। শেষটায় না বানিয়ে—ছানিয়ে পাতা ভ’রে দেয়। কিন্তু… ছবিটা আমার চেনা—চেনা লাগছে কেন? আমি কি কখনো চিনতাম এই ভদ্রলোকটিকে? দেখেছিলাম?
একটা ঝাপসা ছবি, বইয়ের ছবিটার মতো নয়—মাথা—ভর্তি চুল ছিল মনে হয়, আরো ছিপছিপে, অমন রাগী আর সন্দিহান নয় মুখের ভাব, বরং যেন ভিতু আর সন্ত্রস্ত—না, বইয়ের ছবিটার মতো নয়, তবু কোথায় যেন আদল পাওয়া যাচ্ছে—যেমন ছেলের মুখে মাঝে—মাঝে বাবার—কিন্তু কী ক’রে বলি, এত ঝাপসা, এত ফ্যাকাশে, এত দূরে, প্রায় মনেই পড়ে না। সেই কতকাল আগে কালিম্পঙে বেড়াতে গিয়ে… আমার বিয়ের ঠিক পরের বছর… যার সঙ্গে দু—চারবার খুব আলতোভাবে দেখা হয়েছিল আমাদের, পথ চলতে—চলতে কখনো, বাজারে কিছু কিনতে গিয়ে হয়তো বা—‘এই যে,’ ‘কী—রকম?’, ‘আজ সকালে খুব কুয়াশা হয়েছিল,’ ‘ওইদিকে একটা ঝর্না আছে দেখেছেন?’—এই ধরনের বাক্যবিনিময়ের পরে যাঁর সঙ্গে কথাবার্তা আর এগোতো না, এই কি সেই নীলকণ্ঠ রায়? নীলকণ্ঠ রায় নাম ছিল কি ভদ্রলোকের? কোনো সময়ে আমার স্বামীর—ঠিক বন্ধু নন, সহপাঠী ছিলেন কি? তা—ই তো শুনেছিলাম তখন, তা—ই তো মনে পড়ে। …ঠিক? কী ক’রে বলি—এত ঝাপসা, এত দূরে, আর এত অল্প দেখাশোনা। একদিন এসেছিলেন কি আমাদের বাড়িতে? কোনো—এক বিকেল, কোনো—এক বারান্দা, পেয়ালা—ভর্তি অরেঞ্জ পিকোর সুগন্ধ… কবে… কোথায়? স্বামী বেঁচে নেই, কাকে জিগেস করি? কে আমার স্মৃতিকে সাহায্য করবে?
—কিন্তু কী—সব বাজে কথা ভাবছি! এদিকে এই খাতার বান্ডিল, আর সময় আছে আর মাত্র সাতদিন।
হাত বাড়িয়ে একটি খাতা টেনে নিলেন অমিতা সান্যাল, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম—ছাপানো ব্রাউন—রঙের মলাটওয়ালা খাতাটা স্পর্শ করামাত্র, সেই নোট—মুখস্থ—করা একই একঘেয়ে ও বুদ্ধিহীন উত্তর চোখে দেখামাত্র, তাঁকে আক্রমণ করল এমন এক অবসাদ যার সঙ্গে লড়াই করার মতো একফোঁটা শক্তিও আর খুঁজে পেলেন না নিজের মধ্যে। কুৎসিত কাজ—এই খাতা দেখা—শুধু টাকার জন্য ক’রে যাচ্ছি বছরের পর বছর! স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে এইখানে আমার জীবন এসে ঠেকেছে—শুধু একটি উপার্জনের যন্ত্র; মেয়ে, জামাই, ছেলে, ছেলের—বৌ, নাতি—নাতনি—এদের সন্তোষসাধনের একটি উপায় শুধু, এদের আরো বেশি বিলাসিতার জোগানদার। এরাই আমার আপন জন, আমার জীবন এদেরই নিয়ে—অর্থাৎ আমার নিজের কোনো জীবন নেই।
ঠেলিয়ে সরিয়ে রাখলেন পরীক্ষার খাতা, কবিতার বইটা খুলে আবার কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়লেন। ‘অভ্যর্থনা ও বিদায়’ ব’লে কবিতাটাতে একটি নায়িকার আলেখ্য আঁকা হয়েছে—আলেখ্য নয়, আভাসমাত্র, একটি রেখাও স্পষ্ট নয়, এক পার্বত্য দৃশ্যের সঙ্গে এমনভাবে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে যে ‘অমিতা সান্যাল’ নামটা না—থাকলে প্রায় বোঝাই যেতো না কোনো নারীর উল্লেখ আছে এই কবিতায়। অন্য দুটি ছোটো কবিতায় এই তথাকথিত ‘অমিতা সান্যাল’—এর সঙ্গে লেখকের আবার দেখা হচ্ছে (অন্তত তা—ই ধ’রে নিতে হবে পাঠককে), একবার তারার আলোয় এক বিধ্বস্ত প্রাসাদের সামনে, আর—একবার বনের মধ্যে ঝাপসা জ্যোৎস্নায়। ‘অভ্যর্থনা ও বিদায়’—এ আছে বিকেলের আলো আর ছায়া, আর অন্য দুটিতে রাত্রি, আর অন্ধকার, অথবা এমন এক আলো যার পরতে—পরতে অন্ধকার মিশে আছে। অমিতা সান্যাল, কবিতা প’ড়ে তেমন অভ্যস্ত নন, ‘হেঁয়ালি—কবিতা’ প’ড়ে আরো কম অভ্যস্ত, অনেক চেষ্টা ক’রে এটুকু তথ্য উদ্ধার করতে পারলেন। আর তারপর হঠাৎ, যেমন সুইচ টিপলে আলো জ্ব’লে ওঠে, তাঁর মনে প’ড়ে গেল।
একদিন আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন তিনি (মানে, নীলকণ্ঠ রায়), আমার স্বামী দেখতে পেয়ে ডেকে আনলেন তাকে—যেন অনিচ্ছায় এলেন ভদ্রলোক, মেলামেশায় তেমন পটু নন, ধরনধারন একটু খাপছাড়া মতো—কাচে ঢাকা বারান্দায় বসে ছিলাম আমরা, বাইরে বিকেলবেলার রোদ্দুর, পাহাড়ি দৃশ্য, উঁচু—নিচু ছায়া আর রোদ্দুর ছিল বাইরে; তিনি (মানে, নীলকণ্ঠ রায়) চায়ের সঙ্গে অনেকগুলো আদা—বিস্কুট খেয়েছিলেন, বা অন্য কোনোরকম বিস্কুটও হতে পারে। আমরা মংপুতে যে কুইনিনের কারখানা দেখতে গিয়েছিলাম, সেই গল্প খুব মন দিয়ে শুনছিলেন, বা হয়তো আমার উদ্ভিদবিজ্ঞানী স্বামীর মুখে গাছপালা বনজঙ্গলের গল্প—নিজে বেশি কথা বলেননি, মাঝে—মাঝে কোনো ঠাট্টার কথায় আচমকা হেসে উঠছিলেন শব্দ ক’রে। সন্ধ্যা হয়ে এলো, আমরা একসঙ্গে বেড়াতে বেরোলাম তিনজনে, কয়েক মিনিট পরে তিনি একটু আকস্মিকভাবে আমাদের ছেড়ে অন্য একটা রাস্তা নিলেন—আর তারপর আর দেখা হয়নি, ওই অমিশুক স্বল্পভাষী খাপছাড়া মানুষটির কথা আর ভাবিওনি কখনো। লক্ষ করার মতো কেউ নয়, মনে রাখার মতো কোনো ঘটনা নয়—অথচ এতকাল পরে ফিরে এলো সেই বিকেল, সেই বারান্দা, সেই উঁচু—নিচু ছায়া আর রোদ্দুর—এই কবিতাটায়। হিমাংশু ভৌমিক কি ঠিক দরজায় টোকা দিয়েছে তাহলে, তার অনুমান বিশুদ্ধ পাগলামি নয়?
অমিতা সান্যালের বুকের মধ্যে কেঁপে উঠল হঠাৎ; টের পেলেন তাঁর মুখ লাল হয়ে উঠেছে—অনেকদিন পর ও—রকম হলো ব’লে সেই অনুভূতিটা অদ্ভুত লাগল।
কিন্তু তাঁর ন্যায়শাস্ত্র—পড়া মন তাঁকে উদ্ধার করল তক্ষুনি।
—না, কিছুরই কোনো প্রমাণ নেই। এই কবিতাগুলির লেখক, আর যার সঙ্গে কালিম্পঙে আমাদের দেখা হয়েছিল—এরা কি একই নামের দুই আলাদা ব্যক্তি হতে পারেন না? বইয়ের ছবির সঙ্গে মিল? কিন্তু আমার কি মনে আছে তিনি দেখতে ঠিক কেমন ছিলেন? দু—চারবার দেখা পাহাড়ি শহরে রাস্তায় যেমন হয়ে যায়, বেড়ানো ছাড়া আর তো কোনো কাজ নেই সেখানে… একদিন সুগন্ধি দার্জিলিং চা আর বিকেলবেলার বারান্দায় ব’সে আমার স্বামী ছাড়া অন্য একজন… কিন্তু দেখতে কেমন জানি না, হয়তো আমি তাঁর দিকে বেশি তাকাইনি। তাঁর নাম সত্যি কি ছিল নীলকণ্ঠ রায়? কী জানি, হয়তো ‘রায়’ নয়, ‘চৌধুরী’, হয়তো ‘নীলকণ্ঠ’ নয়, ‘সিতিকণ্ঠ’। আচ্ছা, ধ’রে নেয়া যাক এই বিখ্যাত কবির সঙ্গেই, বা পরে যিনি বিখ্যাত কবি হলেন তাঁর সঙ্গেই দেখা হয়েছিল আমাদের—তাহলেও প্রশ্ন: ‘অমিতা সান্যাল’ নামের কোনো বিশেষ তাৎপর্য আমরা কেন খুঁজবো? অতি সাধারণ নাম, কত আছে বাংলাদেশে—আর আমার নাম যে অমিতা তা হয়তো তিনি জানতেনও না। নাকি জানতেন? শুনেছিলেন দু—একবার? সেটা অসম্ভব নয়, আমার স্বামী হয়তো বলেছিলেন, ‘অমিতা, এবার চা দাও,’ বা ওই রকম কিছু—আর সান্যাল পদবি তো আমার স্বামীর, সেটা তাঁর আগে থেকেই জানা ছিল। কিন্তু এ থেকে কোনো মীমাংসায় পৌঁছানো যায় না—এমনও হতে পারে যে নামটা তিনি লিখেছিলেন শুধু কানে শুনতে ভালো লেগেছিল ব’লে, ছন্দে ঠিক ব’সে গিয়েছিল ব’লে—ছয়ের বদলে পাঁচ অক্ষরের কোনো নাম হলে, ধরা যাক অমিতা মৈত্র বা মীরা সান্যাল হলে, তাঁর কোনো কাজে লাগত না। আর তাছাড়া—আমি যদিও কবিতার কিছু বুঝি না, তবু এটুকু দেখতে পাচ্ছি যে নামটা প্রত্যেকবারই লাইনের শেষে এসেছে, আর ‘সান্যাল’ খুব সুবিধাজনকভাবে মিল জুগিয়ে গেছে ‘চাতাল’, ‘অন্তরাল’, ‘কঙ্কাল’ আর ‘চিরকাল’—এর সঙ্গে। অর্থাৎ, কবিতা লেখার সাধারণ মিস্ত্রিগিরির জন্যই ওই নামটার দরকার হয়েছিল—বলা যেতে পারে একটা পেরেক বা ইস্ক্রুপের চাইতে ওটা বেশি কিছু নয়, ওর পিছনে গূঢ়তর কোনো অর্থের সন্ধান শুধু সে—ই করতে পারে, একটা ডি. ফিল ডিগ্রি পাবার নেশায় যার কাণ্ডজ্ঞান সুদ্ধ লোপ পেয়েছে।
তাঁর পুরোনো ধারণায় ফিরে আসতে পেরে তিনি নিশ্চিন্ত বোধ করলেন, তর্কটাকে কয়েকটা বৈকল্পিক সূত্রের আকারে সাজিয়ে নিলেন মনে—মনে:
১। কবি নীলকণ্ঠ রায়ের সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি।
২। কবি নীলকণ্ঠ রায়ের সঙ্গে বহুকাল আগে আমার দেখা হয়েছিল, কিন্তু তিনি আমার নাম জানতেন না।
৩। কবি নীলকণ্ঠ রায়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, তিনি আমার নামও জেনেছিলেন, কিন্তু—যদি না অন্য কোনো অমিতা সান্যালকে তিনি ভেবে থাকেন, তাহলে ওই নামটা নিঃসন্দেহে তাঁরই রচিত, অন্তত আমার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
৪। কবিতার অস্পষ্ট নায়িকার সঙ্গে আমার বা অন্য কোনো অমিতা সান্যালের কোনো সম্পর্ক নেই; নামটা ব্যবহৃত হয়েছিল শুধুমাত্র ছন্দ, মিল ও ধ্বনির প্রয়োজনে। (এটাই সবচেয়ে বেশি সম্ভবপর ও বিশ্বাসযোগ্য, তবু সম্ভাবনা হিশেবে এও বিবেচ্য হতে পারে যে—)
৫। আমার সঙ্গে কবি নীলকণ্ঠ রায়ের দেখা হয়েছিল, তিনি আমার নাম জেনেছিলেন, মনে রেখেছিলেন, আর দৈবাৎ—আকস্মিকভাবে—অচেতনভাবে—
এখানে এসে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইলেন অমিতা সান্যাল, যেন তাঁর নিজের চিন্তায় নিজেই ভয় পেয়ে। আস্তে, অতি মৃদু হাতে আর—একবার খুললেন বইটা, সঙ্গে—সঙ্গে কয়েকটা নতুন প্রশ্ন তাঁকে ছেঁকে ধরল। শিরোনামা কেন ‘অভ্যর্থনা ও বিদায়’, যদিও কবিতার মধ্যে আসা অথবা চ’লে যাওয়ার উল্লেখমাত্র নেই? ‘তন্ময় চাতাল’—মানে? বারান্দা অর্থে ‘চাতাল’ হতে পারে, কিন্তু জড়বস্তু ‘তন্ময়’ হতে পারে না, তবে কি বক্তাই তন্ময় ছিলেন—বারান্দায় ব’সে? ‘দূরত্বের নীল পর্দা নড়ে ওঠে’—‘নীল’ বললেই আকাশ মনে হয়, কিন্তু আকাশ তো নড়ে ওঠে না কখনো—কী বলা হচ্ছে? পর্দা… ছিল কি একটা ঘর আর বারান্দার মাঝখানকার দরজায়… নীল রঙের? …পড়ন্ত বেলা, উঁচুনিচু ছায়া আর রোদ্দুর, আর সন্ধ্যা, একটি নির্জন পথ, আর অন্ধকার—সবই আছে এই কবিতায়, আর ওই সব রেখা, ছায়া, আলো আর অন্ধকার দিয়ে যেন তৈরি করা হয়েছে কোনো—এক অনির্ণেয় অমিতা সান্যালকে। এমনি মনে হলো প্রৌঢ়া মহিলাটির, পাঁচবারের বার কবিতাগুলি পড়ার পর মনে হলো যেন কালিম্পঙের সেই কিছুক্ষণ সময়, যা কিছুক্ষণ পরেই আর ছিল না, এই লাইনগুলোর ফাঁকে—ফাঁকে তা চলছে এখনো। তা—ই কি? সত্যি কি তা—ই? নাকি আমিও অসম্ভব কথা ভাবতে শুরু করলাম, অত্যুৎসাহী যুবক—গবেষকটির মতোই, হয়তো তারই কল্পনায় সংক্রমিত হয়ে?
অমিতা সান্যাল দ্রুত হাতে বইয়ের পাতা ওল্টাতে লাগলেন, দ্রুত চোখে মিলিয়ে দেখলেন তারিখগুলোকে। কবির জন্ম ১৯০২, ‘অভ্যর্থনা ও বিদায়’ লেখা হয়েছিল ১৯৩৭—এ, অন্য দুটি বিয়াল্লিশ সালে, আর আমরা কালিম্পঙে গিয়েছিলাম… আমার বিয়ের পরের বছর, তার মানে… ১৯২৭… মানে, নীলকণ্ঠের বয়স তখন পঁচিশ—মাত্র পঁচিশ, ছেলেমানুষ!—আর আমিও তা—ই, একুশ বছরের মেয়ে আমি তখন। কথাটা মনে হওয়ামাত্র অমিতা সান্যাল এক অস্বাভাবিক উত্তেজনা অনুভব করলেন, তাঁর বয়স যে কখনো একুশ ছিল সেটা এক বিস্ময়কর ঘটনা বলে মনে হলো তাঁর—আমি তখন কেমন ছিলাম, কেমন দেখতে ছিলাম, সেদিন সেই বিকেলবেলার বারান্দায় আমাকে কেমন দেখাচ্ছিল? হঠাৎ একটা ইচ্ছার চাপে কেঁপে উঠলেন তিনি, সেই সময়কার নিজেকে একবার চোখে দেখার জন্য—এখনই, এই মুহূর্তে, এই নিরিবিলি রাত্তিরে আশে—পাশে কেউ যখন জেগে নেই। কেউ জেগে নেই তবু কেমন লজ্জা, পা টিপে—টিপে উঠে গেলেন, চাবি ঘোরাবার ন্যূনতম শব্দ ক’রে আলমারি খুললেন, ফটোর অ্যালবাম নিয়ে ফিরে এসে বসলেন টেবিলে, ঝুঁকে পড়লেন পুরোনো একটা ছবির উপর। অনেক পুরোনো, হলদে হয়ে গেছে—হঠাৎ যেন চিনতেই পারলেন না ছবিটা কার। তাঁর ছাত্রীরা, যাদের তিনি ‘খুকি’ বলে ভাবেন, তাদেরই মতো একজন—ছিপছিপে, গোল গাল, কপাল অতি মসৃণ, আর গলার উপর চামড়া কেমন আঁট হয়ে বসেছে, আর চুল কেমন ঘন আর কুচকুচে কালো—ছেলেমানুষ, নেহাত ছেলেমানুষ। এখনকার আমাকে যারা চেনে, ভালোবাসে বা বাসে না, যারা আমাকে ‘মা’ বা ‘দিদানি’ বা ‘অমিতা—দি’ বা ‘মিসেস সান্যাল’ বলে ডাকে, তারা ভাবতেও পারবে না আমি একদিন এইরকম দেখতে ছিলাম। মুখখানা মন্দ নয়, ঠিক সুন্দর বলা যায় না যদিও… আর ভাবটা কেমন কাঁচা, কেমন সরল আর ঈষৎ বোকা ধরনে নিশ্চিন্ত—যেন সবেমাত্র বেরিয়েছে এই পৃথিবীতে, এখনো পথঘাট চেনে না আর সেজন্যে কোনো আপশোশও নেই।
তাহলে এই সেই মেয়ে, যে কালিম্পঙে তার স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিল, বসেছিল কাচে ঢাকা বারান্দায় অন্য দু—জনের সঙ্গে, উঁচু নিচু পাহাড়ি দৃশ্যের মুখোমুখি? সেই মেয়ে—আমি। সেই অন্য মানুষটি—নীলকণ্ঠ রায় অল্প বয়সে—আমিও জানি—কত তুচ্ছ কারণে দুলে ওঠে বুক, কত মুহূর্ত কেটে যায় যেন স্বপ্নের মধ্যে, আর সেই পঁচিশ বছরের যুবকটি, যে ভবিষ্যতে একজন বিখ্যাত কবি হবে, সেও হয়তো… হয়তো কিছু কল্পনা করেছিল, কিছু অনুভব করেছিল—সেদিন, সেই কালিম্পঙের বিকেলবেলায়। কিন্তু তা—ই যদি হবে তাহলে নিশ্চয়ই সত্যিকার নামটা লিখত না, সেটা যে ভদ্রতা নয় এটুকু সাংসারিক বুদ্ধি তার নিশ্চয়ই ছিল? আর তাছাড়া, এ কি সম্ভব যে সেই ছোট্ট ঘটনাটুকু—‘ঘটনা’ বলতে ঠিক যা বোঝায় তাও নয়—সেই কয়েকটি মুহূর্ত, অতি সাধারণভাবে কাটানো কিছু সময়—সেটা দশ বছর পরেও, পনেরো বছর পরেও মনে ছিল তার—বা হঠাৎ, অন্য সব ভাবনা আর ব্যস্ততা পেরিয়ে নাড়া দিয়েছিল তার মনের মধ্যে? আমরা ভুলে গিয়েছিলাম, কিন্তু সে মনে রেখেছিল তা কি সম্ভব? আর তাই কি লিখেছিল সত্যিকার ‘অমিতা সান্যাল’ নামটাই—ইচ্ছে ক’রে, যেন মনে—মনে হেসে—যাতে আমার চোখে পড়ে কোনো—একদিন, মনে প’ড়ে যায়? আশ্চর্য নয় কি যে কোথাকার কোন টাটকা—পাশ—করা ছোকরা—নিজে না—বুঝে, শুধু অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে—ছুঁড়ে, তুলে আনলো আমার জন্য আমারই এক টুকরো হারানো জীবন, আমি নিজে কখনোই যা খুঁজে পেতাম না? পুরোনোর পুনরুদ্ধার—তা শুধু অক্ষরের নয়, লিখনের নয়, জীবনের ব্যাপারেও হতে পারে, এই কথাটা আগে আমি ভাবিনি কখনো। আশ্চর্য—সেই মানুষ, যাকে খুব ঝাপসাভাবে দু—চারবার মাত্র দেখেছিলাম আমি—এতকাল পরে আবার সে ধ’রে ফেলল আমাকে, যেন মধ্যবর্তী দীর্ঘ বছরগুলি কিছুই নয়—আমাকে ফিরিয়ে দিল সেই দিন, সেই বিকেল, সেই বারান্দা, আমার একুশ বছর বয়সের কয়েকটি মুহূর্ত।
—কী হয়েছে আমার, কী ভাবছি আমি, কী অর্থ হয় এ—সবের?
অমিতা সান্যাল কপালে একবার হাত বুলোলেন, জোরে নিশ্বাস নিলেন একবার; বন্ধ করলেন ছবির অ্যালবাম, কবিতার বই; সামনের সাদা দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে রইলেন চুপ ক’রে—রাত্তির যখন একটা প্রায় বাজে, গভীর নির্জন নিরিবিলি সময়, আর তাঁর মনে অস্থিরতা, এক প্রশ্নের ঢেউ ওঠা—পড়া করছে অবিরাম। কত কিছু এখন মনে হচ্ছে আমার—কিন্তু এগুলি তো আমারই ভাবনা, যেন একটা গল্প বানিয়ে যাচ্ছি মনে—মনে, হিমাংশু ভৌমিক আমার মুখে যা শুনতে চায় সেই গল্প—কিন্তু অন্যজন কী ভেবেছিল তা কী ক’রে জানবো? সে বেঁচে থাকলে জিগেস করতাম তাকে—হ্যাঁ, আমি সোজা চলে যেতাম ওই পাতলা—চুলের চওড়া—নাকের ভদ্রলোকটির কাছে—‘বলুন সত্যি ক’রে, আপনি কি আমাকে ভেবেই এ—সব কবিতা লিখেছিলেন? আপনার “অমিতা সান্যাল” কি আমি?’ কী উত্তর দিতো সে? ‘আপনি কী বলছেন আমি বুঝতে পারছি না।’ এড়িয়ে যেতো আলগোছে, আমাকে অল্প কথায় বিদায় দিতো, যেমন আমি সেদিন হিমাংশুকে দিয়েছিলাম। হয়তো মনে—মনে বলতো, ‘আমার কথা আমি কবিতাতেই ব’লে দিয়েছি—আর কেন?’—তা—ই তো, এই আঁকাবাঁকা ছন্দের কয়েকটা লাইন—এ ছাড়া আর কিছুই নেই: এ থেকেই নিংড়ে নিতে হবে উত্তর, যদি আদৌ কোনো উত্তর থাকে কোথাও। …কিন্তু কথাটা হচ্ছে, হিমাংশু কাল আসবে—আমি স্পষ্ট অনিচ্ছার ভাব দেখিয়েছিলাম, কিন্তু আমি জানি সে না—এসে ছাড়বে না। কী বলবো আমি তাকে কাল? এমন একটা ব্যাপার—প্রমাণ করা যেমন অসম্ভব, অপ্রমাণ করাও ঠিক তেমনি। কী বলবো? পরিষ্কার ‘না’, এক কথায় ‘না’—‘আমি চিনতাম না নীলকণ্ঠ রায়কে, কখনো দেখিনি, কিছুই জানি না তাঁর বিষয়ে, কিছুই শুনিনি।’ ব্যাস, মামলা ডিসমিস, আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, মন থেকে এই বাজে অশান্তিটা ঝেড়ে ফেলা গেল। কিন্তু নাছোড় হিমাংশু যদি তার পরেও আবার জিগেস করে, ‘আপনি কি এর মধ্যে কবিতাগুলি আবার পড়েছিলেন? আপনার কী মনে হলো জানতে পারি?’
আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়লেন তিনি। বিছানার একপাশে বাবলি ঘুমিয়ে আছে, এগারো বছরের বাড়ন্ত মেয়ে—সারাদিন যেখানে থাক যা—ই করুক, রাত্রে দিদানির কাছে তার শোয়া চাই। ঘুমের মধ্যেও কী হালকা তার নিশ্বাস, আবছা আলোয় কী সুন্দর তার মুখখানা। আর গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করলেন একটু, কপালে চুমো খেলেন। দু—এক বছরের মধ্যেই কিশোরী হয়ে উঠবে ও, একদিন একুশে পড়বে, এমনকি আমার মতো ছাপ্পান্ন বছর বয়সেও পৌঁছবে একদিন। এখনকার বাবলিকে দেখে কে সে—কথা কল্পনা করতে পারবে? আর এখনকার আমি, আর ছবিতে ওই একুশ বছরের মেয়েটা—কে বলবে একই মানুষ! সত্যি, মানুষের জীবনটা কী? জন্ম নেয়, বড়ো হয়ে ওঠে, কাজকর্ম করে, কিছু সন্তানের জন্ম দেয়—কোন অন্ধকারে মিলিয়ে যায় তারপর। আমার স্বামী—আর পঞ্চাশ বছর পর কে তাঁকে মনে রাখবে। এই বাবলি, এখনো তার দিদানি না—হলে চলে না—কিন্তু তারও কাছে আমি ছায়া হয়ে যাবো একদিন। শেষ পর্যন্ত—কারোরই কোনো চিহ্ন থাকে না। কিন্তু কারো কারো থাকে। মৃত্যু, যা সকলের পক্ষেই সর্বনাশ, তাও দেখছি কারো কারো বেশ কাজে লেগে যায়। যেন পুঁজি পাটা মাটির তলায় লুকানো ছিল, এইবার মহাজনের হাতে সুদে খাটছে। গবেষণা গোয়েন্দাগিরি… এমনকি ‘অমিতা সান্যাল’কে শনাক্ত করার চেষ্টা। অদ্ভুত—এই সেদিনও যে মানুষটা বেঁচে ছিল, হয়তো ট্রামে—বাসে ঘুরে বেড়াতো, রাস্তায় বেরোলে কেউ চিনতো না—তাকে হঠাৎ গল্পের মানুষ ক’রে তোলা হচ্ছে। আমি জানতাম কালের পরীক্ষা পেরোনো অত সহজ নয়। কিন্তু হয়তো সেই পরীক্ষার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নেই, প্রথম থেকেই মিনিটে—মিনিটে তা চলতে থাকে, হয়তো সেই পাতলা—চুলের চওড়া নাকের মানুষটা এখনই উত্তীর্ণ, তার অন্য এক নতুন জীবন এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আর এখন এক ভক্ত বটুক ছুটে এসে আমাকে জিগেস করছে সেই জীবনে আমার কোনো অংশ আছে কিনা। ‘আছে কিনা’ নয়—নিতে চাই কিনা, এ—ই হলো প্রশ্ন। কেননা ওই কবিতার অমিতা সান্যাল—সে হতে পারে যে—কেউ, অথবা কেউ নয়, এতবার পড়ার পরে আমি এখন আর একজন ‘ভদ্রমহিলা’ ব’লে ভাবতে পারছি না তাকে, আমার মনে হচ্ছে সেও একটা শব্দ শুধু, বা ছবি, বা বলা যাক অছিলা—রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলি বা মালবিকার মতোই—তবু কেউ একজন আমাকে সেই কল্পনার জন্মস্থল ব’লে অনুমান করছে, আমিও মনে—মনে জানি সেটা অসম্ভব নয়, আমি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না। কেউ নেই যে বলতে পারে ও—রকম হয়েছিল বা হয়নি, যেহেতু আমাকে নিয়ে এই মামলা আর আমি তার একমাত্র সাক্ষী, তাই আমার ইচ্ছের উপরেই পুরো ব্যাপারটা নির্ভর করছে, আমি যা বলবো তা—ই মেনে নেবে লোকেরা। ইচ্ছে, তুমি কোনদিকে যাবে? কেন, যা সত্য তা—ই বলতে দোষ কী? ‘একবার দেখা হয়েছিল কালিম্পঙে, আমরা বারান্দায় ব’সে চা খেয়েছিলাম একদিন’—দোষ কী? যদি কথাটা কোথাও ছাপার অক্ষরে লেখা থাকে তাতেই বা আপত্তির কারণ কী হতে পারে? কেউ কিছু মনে করবে? কিন্তু আমার তো কোনো দায়িত্ব নেই এতে—সেই অন্যজন যদি কিছু ভেবে থাকে, বা অনুভব ক’রে থাকে, আমি কী করতে পারি? কেউ—কেউ অবিশ্বাস করবে আমার কথায়, হিমাংশুর লেখায়? তা, অন্তত নীলকণ্ঠ প্রতিবাদ করতে পারবে না, সে নিজে সব বাদানুবাদের বাইরে চলে গেছে। অতএব আমি, অমিতা সান্যাল… আর কবিতার সেই অস্পষ্ট নায়িকা… আমরা আস্তে—আস্তে মিশে যাবো পরস্পরের মধ্যে—হয়ে উঠবো একটা গল্প, সত্যে—মিথ্যায় মেশানো একটা রচনা… যেমন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনেক, শেলিকে নিয়ে অনেক তেমনি অন্য একজনের জীবনের মধ্যে জায়গা ক’রে নেবো আমি, যদিও তখন তার মুখের দিকে ভালো ক’রে তাকিয়েও দেখিনি, আর যদিও আমি সারা জীবনে এই প্রথম নীলকণ্ঠ রায়ের কবিতা পড়লাম।
তাঁর এতক্ষণকার উত্তেজনা হঠাৎ তাঁকে ছেড়ে গেল এবার, সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল আরাম, মনে সুখ, প্রায় এক ছেলেমানুষি ধরনের প্রফুল্লতা। হ্যাঁ—এক গল্প, কোনো—কোনো বইয়ে, ফুটনোটে, লোকের মুখে… এক ক্ষুদ্র কলেজের নগণ্য শিক্ষিকা… অনেকদিন ধ’রে যাঁর জীবন মানে দাঁড়িয়েছে শুধু চাকরি, আর ছেলে মেয়ে জামাই বৌ নাতি নাতনি… এক বয়স্ক মধ্যবিত্ত অতি সাধারণ ভদ্রমহিলা… তার নাম… এক নতুন পথে রওনা হলো আজ… আর থামতে পারবে না… চলবে বছরের পর বছর… লোকেরা ভাববে তা—ই নিয়ে, রং চড়াবে, কত কী… বানিয়ে নেবে নিজেদের মনে এই আমাকে নিয়ে, যে—আমি সমুদ্রে একটা বিন্দুর বেশি আর—কিছুই নই। ‘বাবলি, আমার সোনামণি,’ নিচু গলায় গুনগুন ক’রে তিনি বলতে লাগলেন, অন্ধকারে ঘুমন্ত নাতনির মুখের দিকে তাকিয়ে, ‘বাবলি, তুমি বড়ো হয়ে জানবে তোমার দিদানি সারা জীবন ভ’রে শুধু মাষ্টারনি আর দিদানি ছিল না, শুধু তোমার বাবার আর পিসিদের মা ছিল না, সেও একদিন… তাকেও একদিন… কেউ একজন অচেনা মানুষ… একবার…’
অমিতা সান্যালের চোখ জড়িয়ে এলো, গলার আওয়াজ মিলিয়ে গেল আস্তে—আস্তে, নাতনির গা ঘেঁষে শুয়ে খুব শান্তভাবে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।
