ভূস্বর্গ
‘নমস্কার,’ আমি ক্যাম্পে পৌঁছানো মাত্র আমাকে সহাস্যে অভ্যর্থনা করলেন আমার পূর্বপরিচিত ডক্টর শঙ্করদাস বটব্যাল, নৃতত্ত্ববিদ, উত্তর—পূর্ব সীমান্ত অঞ্চল বিষয়ে ভারত—সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। ‘এঁরা আমার সহকর্মী: ডক্টর মাহেশ্বর, জয়পুর ইনস্টিটিউট অব বায়ো—কেমিস্ট্রির ডিরেক্টর; ত্যাগরাজ বড়ুয়া, ভাষাবিজ্ঞানী; আর ইনি হেমকান্ত ভৌমিক, সর্বভারতীয় মনোবিজ্ঞানী—সংস্থার স্থাপয়িতা। আপনাকে আজ আমাদের মধ্যে পেয়ে আমরা আনন্দিত, আশা করি আপনিও এখান থেকে কিছু সঞ্চয় নিয়ে ফিরতে পারবেন। আসুন—আমাদের প্রাতরাশ তৈরি। আজ শীত খুব কম, তাই তাঁবুর বাইরে টেবিল দিতে বলেছি।’
‘আপনার আসতে কষ্ট হলো, জানি,’ খেতে—পেতে ডক্টর বটব্যাল আবার বললেন, ‘কলকাতা থেকে প্লেনে গৌহাটি, সেখান থেকে হেলিকপ্টারে কোহিমা, তারপর দেড়শো মাইল পাহাড়ি পথে জিপ;—জায়গাটা সুগম নয় এখনো, কিন্তু আপনি যা দেখবেন তার তুলনায় ওটুকু কষ্ট নগণ্য। না, আমি নৈসর্গিক দৃশ্যের কথা বলছি না, যদিও সেটাও উল্লেখের অযোগ্য নয়; আমি লক্ষ করছি আপনি মাঝে—মাঝে বেকন—ডিম ভুলে গিয়ে সপ্রশংসভাবে এদিক—ওদিক দৃষ্টিপাত না—ক’রে পারছেন না। আপনার সামনে ওই উঁচু পাহাড়টার নাম হলো জাপভো, আপনার বাঁয়ে বরাইল পর্বতমালা দিগন্তকে প্রায় আটকে রেখেছে; কিন্তু ওরই মধ্যে ওই যে কুয়াশার মতো একটু ফাঁক দেখছেন, সেখানেই, এক ক্ষুদ্র উপত্যকায়, পর্বতবেষ্টিত আঙ্কাট বনের এক গহ্বরে লুকিয়ে আছে আমাদের আশ্চর্য আবিষ্কার, যা আপনাকেও আমাদেরই মতো ভাবিত করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। “মহাভারতে মানুষ ও দেবতা” বিষয়ে আপনার সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অংশত মনোজ্ঞ প্রবন্ধটি আমি পড়েছিলাম ব’লেই আপনাকে এই দুরধিগম্য ভারত সীমান্তে আসার জন্য প্ররোচিত করলাম। আমরা কয়েকটি সত্যিকার দেবদেবীর সন্ধান পেয়েছি, সিদ্ধেশ্বরবাবু।’
‘ও—ভাবে বললে অত্যন্ত বেশি অত্যুক্তি হয় না,’ মৃদু হেসে ডক্টর মাহেশ্বর বললেন। ‘আমাদের মানতেই হবে, মহাভারতের বর্ণিত দেবতার কয়েকটি লক্ষণ ওরা সম্প্রতি অর্জন করেছে; ওদের দেহে ঘাম বা স্বেদ ক্ষরণ হয় সপ্তাহে মাত্র এগারো দশমিক সাতাশি গ্রাম—আধ আউন্সেরও কম; ওদের চোখে মিনিটে চারবারের বেশি পলক পড়ে না; আর প্রায় সম্পূর্ণ ধ্যানস্থ অবস্থায় ওরা সময় কাটায়।’
‘“সময়” কথাটা ঠিক প্রযোজ্য নয় এখানে,’ বললেন হেমকান্ত ভৌমিক, ‘বরং এ—ভাবে বলা ভালো যে ওরা যেহেতু ধ্যানস্থ তাই ওরা সময়ের বাইরে চ’লে গেছে। ওদের আধো—বোজা চোখের তলায় টর্চ ফেলে, ওদের ভাবকুঞ্চনহীন মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে, ওদের মস্তিষ্ককোষে বৈদ্যুতিক শক চালিয়ে—আমি নিশ্চিত জেনেছি যে ওরা কখনো স্বপ্ন দেখে না; আর তা—ই থেকে আমার সিদ্ধান্ত এই যে স্মৃতি ও চিন্তার দ্বারা ওরা বিড়ম্বিত নয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলে চিত্তভ্রংশ—ডিমেনশিয়া; অথচ পারিভাষিক অর্থে উন্মাদ ওদের বলা যায় না, অতএব ওদের ভবযন্ত্রণাহীন দেবদেবী ব’লে কল্পনা করার লোভ হয় বইকি। তবে—সুখের বিষয়—একটি মৌলিক জৈব লক্ষণ ওরা কাটিয়ে উঠতে পারেনি; ওরা মরণশীল—বর্তমানে মরণাপন্ন।’
‘এক বছর আগে আমরা যখন প্রথম এখানে এসেছিলাম,’ কথাটা আবার তুলে নিলেন ডক্টর বটব্যাল, ‘তখন ওদের এতদূর পর্যন্ত অবক্ষয় ঘটেনি; তখনও ওরা চ’লে—ফিরে বেড়ায়, কিছু কথাবার্তাও বলে। ওদের ভাষা—পাঞ্জাবি, ভোজপুরি, চাটগাঁর বাংলা আর চাখেসাং উপজাতির ভাষা মিলিয়ে এক জগাখিচুড়ি বুলি—সেটা বুঝতে প্রথমে একটু অসুবিধে হয়েছিল আমাদের; তাছাড়া বাচনভঙ্গি এত অস্পষ্ট আর গলার আওয়াজও এত নিচু যে হঠাৎ মনে হয় কোনো পোকা হয়তো মানুষের ভাষা আয়ত্ত করার চেষ্টা করছে। ওদের উনপঞ্চাশজনের মধ্যে আমরা প্রথমে একজনকে বেছে নিলাম—স্পষ্টত সে—ই দলপতি—আয়তলোচন, তীক্ষ্ণনাসা, শালপ্রাংশু, গৌরবর্ণ এক পঞ্চনদভূমির সন্তান, আমরা তার নাম দিয়েছি ধীরসিং, যদিও ওই নামটা যে “তার” সেটা তার মাথায় ঢোকাতে পারিনি। অনেক ধৈর্যে, অনেক পরিশ্রমে অল্প—অল্প ক’রে কথা বলালাম তাকে এবং আরো কয়েকজনকে দিয়ে, তিনজন পুরুষ ও দুজন মেয়ের প্রতিটি কথা টেপ ক’রে নিয়ে আমরা চারজনে মিলে শুনলাম অনেকবার, প্রফেসর বড়ুয়া দু—খাতা ভর্তি নোট নিলেন; এমনি ক’রে, প্রায় ছ—মাসের চেষ্টায়, অন্য দু—একটা অনুমানের সাহায্যে, ওদের ইতিহাস মোটামুটি উদ্ধার করা গেল।’
‘ঠিক উদ্ধার নয়, পুনর্নির্মাণ,’ মন্তব্য করলেন ত্যাগরাজ বড়ুয়া। ‘সবগুলো শব্দ আমরা যে ঠিক শুনেছি বা ঠিক বুঝেছি সে—বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি। আমি টেপগুলো থেকে যে—কটি ফলাফল পেয়েছি তা এই: ওরা পাঁচজনে মিলে ব্যবহার করেছিল মাত্র তিনশো ছাব্বিশটি শব্দ (তার মধ্যে প্রধান বক্তা বীরসিং একশো একাত্তরটি); শব্দগুলির মধ্যে শতকরা প্রায় চল্লিশটি অস্ট্রিক, সাঁইত্রিশটি সংস্কৃতজাত, বাকি তেইশটি ভোটবর্মি। কিন্তু উচ্চারণ শোচনীয়ভাবে বিকৃত, ক্রিয়াপদে নিত্যবর্তমান ছাড়া বচন নেই, সংখ্যাবাচক শব্দ একটিও পাইনি; তাই ঈষৎ অসতর্ক না—হয়ে বলা যায় না যে আমরা যা অর্থ করেছি ওরাও ঠিক তা—ই বলতে চেয়েছিল। অথচ, ভাবতে দুঃখ হয়, ওই ডিঙ্গু উপত্যকার আঙ্কাট বনের মধ্যে, অনার্য রমণীদের সঙ্গে গাঙ্গেয় পুরুষদের মিশ্রণের ফলে, হয়তো আরো একটি নতুন উপভাষার সৃষ্টি হতে পারত ভারতবর্ষে—যদি না ওই মারাত্মক গুল্ম দৈবাৎ খুঁজে পেতো ওরা।’
‘তবে কয়েকটা তথ্যকে বোধহয় স্বীকার্য ব’লে ধ’রে নেয়া যায়,’ বলতে লাগলেন ডক্টর বটব্যাল। ‘ওই আটাশজন পুরুষ আজাদ হিন্দ ফৌজে সৈনিক ছিল; চব্বিশ বছর আগে যখন বর্মা—ভারত সীমান্তে যুদ্ধ চলছে তখন কোনোক্রমে ব্যাটালিয়ন থেকে ছিটকে পড়ে, নিরুদ্দেশভাবে ঘুরতে—ঘুরতে এসে পড়ে ডিঙ্গু উপত্যকায়, তারপর বিবিধ কারণে আবদ্ধ থেকে যায় সেখানেই। কী সেই ঘটনা—মার্কিন পোষিত ইংরেজের গুলিগোলা, না জাপানিদের প্রতিশ্রুতিভঙ্গ, নাকি অন্ধকার বা বর্ষার সুযোগে ওদেরই স্বেচ্ছাকৃত পলায়ন—যার ফলে ওই আটাশজন যূথভ্রষ্ট ও পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে, তা সঠিকভাবে জানার কোনো উপায় নেই, আমাদের দিক থেকে প্রয়োজনও নেই। কিন্তু জঙ্গলে সন্ধান ও খনন ক’রে যে—সব জিনিস পাওয়া গেছে তাদের সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য ব’লে মনে হয়: পেতলের বোতাম, খাকি মিলিটারি কোর্তা (যা আজাদ হিন্দ ফৌজের ইউনিফর্ম ব’লে শনাক্ত হয়েছে), জাপানে তৈরি রাইফেল, চাখেসাংদের ঘরোয়া তীর—ধনুক, আর সবচেয়ে ইঙ্গিতময়—কয়েকটি করোটি, পুরুষ মেয়ে ও শিশুর কঙ্কাল; আরো ব্যাপকভাবে খনন করলে আরো বেরোনো সম্ভব ব’লে মনে হয়। দলের মেয়েরা কোত্থেকে এলো, এ—কথা বার—বার জিগেস ক’রে বীরসিংহের মুখে উত্তর পেয়েছিলাম, “ওরৎ বমারু,” প্রফেসর বড়ুয়ার মতে যার অর্থ হলো, “ওই মেয়েরা আমাদের,” বা “ওরা আমাদের স্ত্রী” (চাখেসাং ভাষায় “বমারু” মানে আমাদের, আর ওরৎ অবশ্য “আউরৎ”—এর অপভ্রংশ)—সর্বনামের বহুবচন লক্ষণীয়। কিন্তু কী ক’রে ওই একুশটি মেয়ে “ওদের” হলো, সে—বিষয়ে কিছুই বের করা গেল না ওদের মুখ দিয়ে—হয়তো তা ওদের মনেও ছিল না ততদিনে; কিন্তু বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য থেকে আমরা তা অনুমান ক’রে নিতে পেরেছি। ওই আটাশজন যেখানে এসে পৌঁছেছিল সেটা স্পষ্টতই একটা চাখেসাং পল্লী; নবাগতদের তীর—ধনুক নিয়ে আক্রমণ করে চাখেসাংরা, উত্তরে ওরা গুলি চালাতে থাকে—স্ত্রীলোক দেখতে পেয়ে, বলা বাহুল্য, সৈনিকদের রণস্পৃহা আরো উগ্র হয়ে উঠেছিল। যতদূর মনে হয়, একটি নিষ্ঠুর হত্যা ও নারীধর্ষণকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয় ডিঙ্গু উপত্যকায়, চব্বিশ বছর আগে। হয়তো অরণ্যনিহিত আদিবাসীরা আগে কখনো আগ্নেয়াস্ত্র দেখেনি; ওর ক্ষমতা বিষয়ে অনভিজ্ঞতাবশতই বহু লোক নিহত হয়; অবশিষ্টেরা—বাস্তুভিটা ও আহতদের পরিত্যাগ ক’রে পালাতে গিয়ে হয়তো অনাহারে বা শ্বাপদের মুখে প্রাণ হারায়। খণ্ডযুদ্ধে বিজয়ীদের হাতে ধৃত হলো একুশজন চাখেসাং রমণী—মাথা—পিছু একের চাইতে সামান্য কম।’
‘আর তারপর,’ ডক্টর মাহেশ্বর বাঁকা হেসে বললেন, ‘সম্ভবত তার অল্প পরেই ওরা সর্বনাশী লোংচু ফলের স্বাদ পেল—আমরা কিছুটা ব্যঙ্গার্থে যার নাম দিয়েছি অ্যামব্রোসিয়া ইন্ডিকা।’
আমি রুদ্ধশ্বাসে শুনছিলাম এতক্ষণ, এবারে একটা প্রশ্ন না—করে পারলাম না, ‘সেটা কী ব্যাপার? লোংচু? অ্যামব্রোসিয়া ইন্ডিকা?’
‘সেটা যে কী তা নিয়ে দেশে—বিদেশে গবেষণা চলছে,’ উত্তর দিলেন মনোবিজ্ঞানী হেমকান্ত ভৌমিক। ‘হয়তো কোনো যুগান্তরকারী ভেষজ বেরোবে তা থেকে, বা বিজ্ঞান আরো একবার পরাস্ত হবে প্রকৃতির কাছে;—সঠিকভাবে কিছু বলার মতো সময় এখনো আসেনি। কিন্তু কী ক’রে ওই কল্পনাতীত উদ্ভিদের আমরা সন্ধান পেলাম সেটা আপনাকে আগে শোনাতে চাই। আমরা যখন ওই উনচল্লিশজনের পল্লীতে প্রথম যাতায়াত শুরু করি, তখন আমাদের সবচেয়ে বেশি চমক লেগেছিল ওদের যৌন জীবনের প্রকাশ্যতায় ও ব্যাপ্তিতে। সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা—দিনের যে—কোনো সময়ে আমরা ওদের মৈথুনরত দেখতাম, উঠোনে ঘাসের উপর, ঘরের দাওয়ায়, আশেপাশে বনের মধ্যে ঝরা পাতার বিছানায়; কখনো কয়েকজন ব্যস্ত আর অন্যেরা দর্শক, আর কখনো বা এক উন্মুক্ত ও সমবেত রতিমহোৎসবে একই সঙ্গে উনচল্লিশজন নিয়োজিত। মেয়েদের সংখ্যাল্পতার জন্য কোনো—কোনো নারী বিভিন্ন উপায়ে একাধিক পুরুষের সঙ্গে সংগত হচ্ছে; এক মহাকামিনীকে দেখেছিলাম—বাড়ির তিন দরজায় আগত তিন অতিথির যুগপৎ তৃপ্তি—সাধন করছে। আমাকে মানতে হবে আমার প্রবীণ জ্ঞাননেত্রেও এর বীভৎসতা অনুভূত হয়েছিল, কিন্তু আমাদের উপস্থিতি দেবদেবীদের কিছুমাত্র আড়ষ্ট বা বিব্রত করতে পারেনি। আমরা প্রথম—প্রথম গাছপালার আড়াল থেকে লুকিয়ে দেখতাম, ছবি নিতাম, কিন্তু ক্রমে আমাদের সন্দেহ হলো এরা এদের পারিপার্শ্বিক বিষয়ে নিশ্চেতন, প্রায় দশায়—পড়া ভক্তের মতো বাহ্যজ্ঞানহীন—আস্তে—আস্তে আমরা এগিয়ে গেলাম, খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, তবু এরা একইরকম নির্বিকার হয়ে রইল। আমাদের সভ্যতা দ্বারা কলুষিত দৃষ্টি কত যে পীড়িত হয়েছিল সেই সব দৃশ্যে, কত কঠিন চেষ্টায় দমন করতে হয়েছিল ঘৃণা, বিতৃষ্ণা ও নিজেদের ইন্দ্রিয়পীড়ন, আপনার মতো একজন সহৃদয় সাহিত্যিককে তা বলা বাহুল্য, সিদ্ধেশ্বরবাবু। কিন্তু আমরা বৈজ্ঞানিক; আমাদের কাছে একটি সদ্য—ফোটা গোলাপের চাইতে একটি শটিত শব কম হৃদয়গ্রাহী নয়; জগতের চোখে যা অসহনীয়রকম কুৎসিত ও অশ্লীল, আমাদের চোখে তাও সম্ভাব্য জ্ঞানের উপাদান। ক্রমশ, ওদের আচার—আচরণে অভ্যস্ত হবার পর, আমরা কয়েকটি অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করলাম। ওদের যে শুধু লজ্জা নেই তা নয়, ঈর্ষাও নেই, প্রতিদ্বন্দ্বিতাও নেই, যৌনক্রিয়ায় সঙ্গী বা সঙ্গিনীর বিষয়ে কোনো অধিকারবোধ নেই; সব নারী স্বাধীনা ও সামান্যা, সব পুরুষ স্বেচ্ছাচারী। সম্পত্তিহীন, সংঘর্ষহীন, পাপবোধহীন, দাসত্বহীন, প্রভুত্বহীন এক আদর্শ সমাজে বা সমাজহীনতায় ওরা অবস্থিত; ওরা যেন স্বর্গের প্রসূন, আদিমতম স্বর্ণযুগের সন্তান। আমাদের বিস্ময় ও মুগ্ধতা প্রায় অসীমে পৌঁছল।’
‘আর তারপরেই,’ ডক্টর মাহেশ্বর বলতে লাগলেন এবারে, ‘কয়েকটি প্রশ্ন দুর্বারভাবে আক্রমণ করল আমাদের। কেন ওদের মধ্যে যৌনক্রিয়ার বিস্তার এত বেশি যে সেটাকেই ওদের প্রধান কৃত্য বলা যায়? আমরা দেখতে পাচ্ছি ওরা অন্য সব ব্যাপারেই সম্পূর্ণ নিশ্চেষ্ট, মনুষ্যোচিত অন্য কোনো বৃত্তির কোনো পরিচয় দিচ্ছে না, আমরা যাকে “কাজ” বলি ওদের জীবনে তা অস্তিত্বহীন—তাহলে ওদের ক্ষুৎপিপাসার নিবৃত্তিই বা কী ক’রে হয়? আর কেনই বা ওই মৈথুনোন্মাদ অতি সমর্থ স্ত্রী ও পুরুষদের একটিও সন্তান নেই? কেন নেই সারা পল্লীতে কোনো শিশু বা বালক বালিকার চিহ্ন? এই সঙ্গে আরো কঠিন একটি প্রশ্ন যুক্ত হলো, যখন বীরসিংহের অনিচ্ছুক সহায়তায় ওদের পূর্ব ইতিহাস আমরা জানতে পারলাম। চব্বিশ বছর আগে যারা ছিল সৈনিক, আর যারা ছিল ভোগ্যা রমণী, তাদের বয়স এখন পঞ্চাশ অথবা ষাটের ঊর্ধ্বে হওয়া উচিত, খুব কম করে ধরলেও আটচল্লিশ নিশ্চয়ই—অথচ ওই উনচল্লিশের মধ্যে এমন একজনও নেই, যার চক্ষু, কেশ, ত্বক বা অন্য কোনো অঙ্গ অতি সূক্ষ্মভাবেও জরাস্পৃষ্ট, যাকে দেখে মনে হয় না শারীরিক স্বাস্থ্যে ও যৌবনে ভরপুর। এ কি সম্ভব? নাকি আমরাই সব ভুল দেখছি, ভুল ভাবছি? এ—সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে—খুঁজে আমরা যখন উদ্ভ্রান্ত, তখন লক্ষ করলাম যে সারাদিনে ওদের খাদ্য হলো একটি বা দুটি শুকনো ফল, যা প্রথমে আমরা মনাক্কা ব’লে ভুল করেছিলাম। বীরসিংকে অনেকক্ষণ জেরা করার পরে তার মুখ থেকে “লোংচু” কথাটা বেরিয়ে পড়ল। আমরা রহস্যের চাবি খুঁজে পেলাম, কিন্তু এখন দেখছি চাবিটাও রহস্যময়!’ ডক্টর মাহেশ্বর নিশ্বাস ফেলে চুপ করলেন।
‘লোংচু!’ পরমুহূর্তেই ব’লে উঠলেন হেমকান্ত ভৌমিক, ‘আঙ্কাট বনে স্বচ্ছন্দজাত, কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে তার প্রথম ভোক্তা হলো খুব সম্ভব বীরসিং, আর তারপর তার দলভুক্ত অন্যেরা। চাখেসাংদের তাড়িয়ে দেবার পর এরা প্রথম কিছুদিন কী ভাবে কাটিয়েছিল, তা কল্পনা করা শক্ত নয়; ফেরারি সেপাই, ইংরেজ সরকার আর আজাদ হিন্দ দুয়েরই মতে “বিদ্রোহী”, দূরে লোকালয়ে যেতে ভরসা পাচ্ছে না, খাদ্যের খোঁজে বনে—বনে ঘুরছে, গুলিগোলা নিঃশেষ বলে চাখেসাং তীরধনুক দিয়ে শিকার করছে পাখি, খরগোশ ইত্যাদি, গলা—চুলকানো বুনো আনাজ কুড়িয়ে খাচ্ছে। এই অবস্থাতেই দৈবাৎ একদিন ফলটি দেখতে পেয়েছিল বীরসিং, দেখার পরে ভক্ষণ না—ক’রেও পারেনি—ঠিক দৈবাৎ হয়তো নয়, তার সাহস আর কৌতূহল সাধারণের চাইতে বেশি ছিল ব’লেও। আমরাও ফলটি খুঁজে পেয়েছি, সিদ্ধেশ্বরবাবু, যদিও—বলা বাহুল্য—তার স্বাদগ্রহণ থেকে সাবধানে বিরত রেখেছি নিজেদের। ফলগুলি অরুণবর্ণ ও ডিম্বাকৃতি, উপরের অংশটা সূক্ষ্ম, হঠাৎ দেখলে মনে পড়ে কোনো দুগ্ধবতী যুবতীর স্তনাগ্র, যা পানতৃপ্ত শিশুর ঠোঁট থেকে এইমাত্র খসে পড়েছে। ঘন পল্লবযুক্ত একটি গুল্মে এরা জন্মায়, অরণ্য যেখানে নিবিড় শুধু সেখানেই—পাতার আড়ালে এমনভাবে লুকিয়ে থাকে যে সহজে চোখে পড়ে না, যেন মানুষকে এই মারাত্মক নেশা থেকে বাঁচাবার জন্যই প্রকৃতির এই কৌশল। এখানকার জমির উর্বরতার তুলনায় ফলনও তেমন প্রচুর নয় এদের, আমরা আঙ্কাট বনে অনেক ঘোরাঘুরি ক’রেও বারোটির বেশি লোংচু ঝোপ দেখতে পাইনি; ফল ধরে শরৎকালে, বছরে একবার মাত্র। আমরা লক্ষ করেছি, ফলগুলি পশুপাখিদের দ্বারা অভুক্ত ও অস্পৃষ্ট থেকে যায়—তাদের জান্তব স্বজ্ঞা রক্ষা করে তাদের, নয়তো অনেক আগেই আঙ্কাট বনের নিরামিষভোজী প্রাণীদের বংশলোপ হতো। এখন এই লোংচু ফলের গুণপনার কথা শুনুন: লেনিনগ্রাদ বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতার বসু—বিজ্ঞানমন্দির ও লক্ষ্ণৌয়ের বায়োলজিক্যাল ল্যাবরেটরি থেকে এ—পর্যন্ত আমরা যে—সব রিপোর্ট পেয়েছি সেগুলি মোটামুটি পরস্পরের সমর্থক: ইঁদুর, খরগোশ ও গিনিপিগের উপর পরীক্ষা ক’রে জানা গেছে ফলটি অবিশ্বাস্যভাবে কামোদ্দীপক ও রেতোবর্ধক; শুধু তা—ই নয়, নিয়মিত সেবন করলে তা যৌবনকে স্থায়িত্ব দিতে পারে; শুকনো অবস্থায়, বা শীতাতপের তারতম্য ঘটলে তার ক্ষমতা হ্রাসপ্রাপ্ত হয় না; কিন্তু এই সব আশ্চর্য বরের বিনিময়ে তা সম্পূর্ণ হরণ ক’রে নেয় প্রজননশক্তি। কলকাতায় ব্যাঙ আর টিকটিকির উপরেও পরীক্ষা করা হয়েছিল, কিন্তু তাদের কোনো পরিবর্তনই হয়নি; এ থেকে বোঝা গেছে যে শুধু উষ্ণরক্তবান প্রাণীরাই লোংচুর দ্বারা উপকৃত বা নিহত হবার যোগ্য—হয়তো সবচেয়ে বেশি যোগ্য মানুষ ও তার নিকট জ্ঞাতিরা। ব্রঙ্কস চিড়িয়াখানায় এক বৃদ্ধ শিম্পাঞ্জি এক সপ্তাহ লোংচুসেবনের পরে এমন প্রচণ্ড কামোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত হয়েছিল যে—যথোচিত সংখ্যক শিম্পাঞ্জিনীর অভাবে তাকে নার্কোটিক ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়।’
‘ব্যাপারটা হয় কী, জানেন—’ হেমকান্তবাবুর মুখ থেকে কথাটা প্রায় কেড়ে নিলেন ডক্টর মাহেশ্বর, ‘লোংচু ফল জীবদেহের মেটাবলিক ক্রিয়া অত্যন্ত শ্লথ ক’রে দেয়, উদ্যমের ব্যয় ন্যূনতম মাত্রায় এসে ঠেকে, তন্তু ও কোষের ক্ষয় অণুপরিমাণ হয় মাত্র, বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে—সঙ্গে শিরাগুলি কাঠিন্যলাভ করে না—অর্থাৎ, অন্তত আপাতিক দৃষ্টিতে—লোংচুসেবীরা চিরযৌবন লাভ করে। আর যেহেতু ওই ফলের মধ্যেই স্বাস্থ্যরক্ষার উপযোগী জল ও খাদ্য প্রাণ আছে—আবর্জনাহীন বিশুদ্ধ ও সংহতভাবে—তাই স্থূলতর খাদ্য উৎপাদন বা উপার্জনের শ্রম থেকে তা মুক্তি দেয় মানুষকে। এখন কথাটা হচ্ছে: মেটাবলিক ক্রিয়া যদি অত্যন্ত কমিয়ে দেয়া হয় তাহলে যৌন ক্ষমতাও হ্রাস পেতে বাধ্য, কিন্তু এ—ক্ষেত্রে তার ঠিক উল্টোটাই ঘটছে কেন? লেনিনগ্রাদের অধ্যাপক অস্ট্রোভস্কি আর বার্কলির ডক্টর ল্যাংটন—স্মিথ দু—জনেই স্বাধীনভাবে এই অদ্ভুত স্ববিরোধ লক্ষ করেছেন: লোংচু শুধু যৌন গ্রন্থি ও ক্ষরণের পক্ষে তেজস্কর, কিন্তু অন্য সমস্ত বিষয়েই মান্দ্যসাধক। তেমনি আশ্চর্য: আমাদের পরিচিত অন্য সব মাদকেরই মাত্রা ক্রমশ না—বাড়ালে কোনো ফলাফল হয় না; কিন্তু লোংচুতে অভ্যস্ত হলে তার পরিমাণ নিজে—নিজেই কমে যেতে থাকে; এই যেমন আমাদের উনচল্লিশজনের পক্ষে দৈনিক একটি—দুটি ক’রে ফলই এখন যথেষ্ট। এই সব সমস্যা নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত হবার কারণ ছিল, যদি না সম্প্রতি ওই বীরপল্লীতেই সমাধানের ইঙ্গিত পেতাম। আমরা প্রথমে এসে যা দেখেছিলাম, আর আপনি আজ ওদের যে—অবস্থায় দেখবেন, সিদ্ধেশ্বরবাবু—এ—ছয়ের মধ্যে এক অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটে গেছে। এখন ওদের নিষ্ক্রিয়তা এতদূর পর্যন্ত ব্যাপ্ত যে মৈথুনেও আর আসক্তি বা সচেষ্টতা নেই; ওদের পেশীগুলি সর্বদাই শিথিল, ধমনীস্পন্দন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে, স্নায়ুতন্ত্র একেবারে নিঃসাড়। কিন্তু যেহেতু দৃশ্যত ওদের যৌবন একেবারে পূর্ণোজ্জ্বল, দেহে কোথাও রোগলক্ষণ নেই, তাই ওদের চোখে দেখে মুমূর্ষু ব’লে ধারণা করা যায় না, বরং মনে হয় দেবতুল্য কোনো অলৌকিক জীব।’
ভাষাতত্ত্বের দিক থেকেও ওই ধরনেরই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি আমি,’ মৃদু হেসে ত্যাগরাজ বড়ুয়া বলতে লাগলেন। ‘“লোংচু” কথাটার ব্যুৎপত্তি কী, আক্ষরিক অর্থ কী, এ—সব প্রশ্ন বেশ ভাবিয়েছে আমাকে। যদি বীরসিং—গোষ্ঠী ওই ফলের আবিষ্কারক হয়, তাহলে কি নামকরণও ওদের ব’লে ধ’রে নেয়া যায়? এই ধারণাটি নিয়ে বেশ কিছুদিন খেলা করেছিলাম আমি, কিন্তু পরে তা বর্জন করতে বাধ্য হই। বিশ্বভারতীর চীনা ভবনের একটি গবেষক আমাকে জানালেন যে খ্রিষ্টপরবর্তী ছয় শতকের ক্যান্টনীয় কথ্য বুলিতে “লুং—চি” অর্থ ছিল স্বর্গধাম। ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওজিহারাকে চিঠি লিখে জানলাম, আট শতকের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ “মানিওশু”তে (যার সঙ্গে “মেঘদূতম্”—এর তুলনা ক’রে মূল্যবান একটি প্রবন্ধ লিখেছেন ওজিহারা) “রাংচাই” কথাটা একুশবার পাওয়া যায়, যার অর্থ সেকালে ছিল “পিতৃগণের পুণ্য বাসভূমি”। জাপানি বর্ণমালায় “ল” নেই, বিদেশী শব্দের ওই ব্যঞ্জন জাপানি উচ্চারণে “র” হয়ে যায়; এবং শিন্টো ধর্মে “পিতৃগণ” ও “দেবগণ” সমার্থক; এ থেকে মনে করা যায় যে “লুং—চি”রই জাপানি রূপ হলো “রাংচাই”। এর পরে চোদ্দটি আদিবাসী গ্রামে ঘুরে—ঘুরে আমি জানলাম যে তাদের মধ্যে বংশপরম্পরায় একটি সংস্কার চ’লে আসছে—কোনো—এক অলৌকিক গুণসম্পন্ন ফল, যার স্বাদ একবার নিলে মানুষের ক্ষুৎপিপাসা আধিব্যাধি কিছুই থাকে না, তারই নাম চাখেসাং ভাষায় “লোংচু” বা “লিংচিন” বা “লাংচাই”, আর পশ্চিম অঞ্চলের অঙ্গামিদের ভাষায় “চংগালু”; চাখেসাংদের মতে শব্দটা মুখে আনতে পারে শুধু রজস্বলা নারীরা; পুরুষ, বালক, বালিকা বা বৃদ্ধা তা উচ্চারণ করলে তৎক্ষণাৎ তার মৃত্যু হবে। এ—সম্পর্কে আরো যে—সব কৌতুকাবহ ও শিক্ষাপ্রদ উপকথা শুনলাম, তা বিবৃত করার সময় এখন নেই, সিদ্ধেশ্বরবাবুর কৌতূহল হলে সন্ধ্যার পরে শোনাবো আপনাকে। তবে এ—বিষয়ে আমি প্রায় নিঃসন্দেহ যে আমাদের বীরপল্লীর কোনো চাখেসাং রমণী, ওই ফল ভক্ষণ ক’রে অতিশয় আহ্লাদিত হয়ে তার ছেলেবেলা থেকে শোনা “লোংচু” কথাটা প্রথম উচ্চারণ করেছিল। তিব্বতি “লোচ” শব্দ, যার অর্থ পুংজননেন্দ্রিয়, যা থেকে প্রাকৃত বাংলায় “লুচ্চিয়া” বা “লুচ্চে” শব্দ উদ্ভূত, তার সঙ্গে ক্যান্টনীয় “লুং—চি” মিশে গিয়ে “লোংচু” শব্দ তৈরি হয়েছিল, আমার উল্লিখিত সবগুলি তথ্যই এই অনুমান সমর্থন করে। অবশ্য লিখিত সাহিত্য না—থাকলে কোনো শব্দার্থ বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়া যায় না, তবু সব তথ্য মিলিয়ে দেখলে আমাদের মানতেই হবে “লোংচু”র একমাত্র সম্ভবপর সংস্কৃত প্রতিশব্দ হলো “অমৃত”।’
‘চলুন, সিদ্ধেশ্বরবাবু, অমৃতের ক্রিয়াকলাপ স্বচক্ষে দেখে আসবেন,’ গম্ভীর গলায় এ—ক’টি কথা উচ্চারণ ক’রে ডক্টর বটব্যাল চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন।
জিপ থামল অরণ্যের প্রান্তে; তারপর একটি ঢালু বনপথ বেয়ে আধ ঘণ্টা ধ’রে অবতরণ: আমরা বীরপল্লীতে পৌঁছলাম। পেয়ালার তলাকার গর্তের মতো জায়গাটা, উপরে আর—একটি ওল্টানো নীল পেয়ালা যেন ঢাকনার মতো, উঁচু—নিচু পাহাড়ের ফাঁকে খানিকটা শ্যামল সমতল। পাখির ডাক ছাড়া শব্দ নেই, পাতার ঝিরঝির ছাড়া শব্দ নেই, আমাদের জুতোর শব্দও ঘাসের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। দশ—বারোখানা কুটির—বোঝা যায় কোনো—এককালে বাসযোগ্য ছিল, কিন্তু এখন জীর্ণ, চালে খড় নেই, বাঁশের বেড়া খসে পড়ছে, মাটির ভিটে বহু বর্ষায় বিধ্বস্ত। যা ছিল এককালে উঠোন, এখন সেখানে (এই শীতের শেষেও) লম্বা—লম্বা ঘাস আর আগাছার জঙ্গল। বহুদিন ধ’রে এই চাখেসাং পল্লী প’ড়ে আছে অমার্জিত ও অসংস্কৃত; ঋতুর পর ঋতু, বছরের পর বছর, প্রকৃতি যা ক্ষয় করেছে তার পরিপূরণ ঘটেনি—আর এই ভাঙাচোরা ঘরগুলোর দাওয়ায়, কেউ শুয়ে, কেউ আধো শুয়ে, কেউ হেলান দিয়ে, ঝিমন্ত, তন্দ্রাচ্ছন্ন, নিশ্চল, নির্বাক, আপাতত সময়ের দ্বারা অস্পৃষ্ট: সেই উনচল্লিশজন। মেয়েরা সবাই পীতকান্তি, পুরুষেরা গৌরবর্ণ বা তাম্রবর্ণ বা শ্যামল। এই সুন্দর অরণ্যভূমিতে, এই গভীর শান্তি ও স্তব্ধতার মধ্যে জীবিকাজনিত শ্রম থেকে মুক্ত—কী না হতে পারত এরা, মানুষের কোন স্বপ্নকে না মূর্তি দিতে পারত? বৈভ্রাজ কাননে ভ্রাম্যমাণ কিন্নর—কিন্নরী; অলিম্পাসে অমর সমাবেশ; বৈকুণ্ঠধামে স্বর্বেশ্যাসমেত ইন্দ্রাদি দেবগণ: এই সব ছবি, একের পর এক, আমার মনে ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল। আমাকে প্রথমেই যা আঘাত করল তা ওদের চোখ—ধাঁধানো যৌবন ও নগ্নতা। পুরুষদের কটিতট মাত্র আবৃত, কিন্তু মেয়েরা সম্পূর্ণ আবরণহীন: এক—একটি পুরুষ যেন তরুণ হেরাক্লেস বা আপোলো, বা বৈদিক দীপ্তিশালী আদিত্য, বা দ্রৌপদীর স্বয়ংবরসভায় অর্জুন। খাজুরাহো ও কোণারক, রুবেন্স ও রদ্যাঁ, টিজিয়ানো, দ্যলাক্রোয়া, ইয়ান স্টেন—বহু চিত্র, বহু মূর্তি, বহু স্মৃতি আমার মনের মধ্যে ভেসে—ভেসে উঠে মিলিয়ে গেল। কিন্তু, যা নিতান্তই পশুর সরলতা ও সৌন্দর্য, অথবা যাকে বলা যায় নিশ্বসিত জড়বস্তুর নয়নমোহন লাবণ্য, যা ওরা অমন অনাবিল ভাবে চোখে দেখার সুযোগ দিল আমাকে, তা ওই শিল্পীরা কেউ চিত্রিত করতে পারেননি, কেউ পারেননি মানুষের মুখশ্রী থেকে তার মনোজাত কলুষ সম্পূর্ণ বর্জন করতে। সেই গতি, সেই চঞ্চলতা, সেই প্রাণহিল্লোল, যার দ্বারা একইভাবে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে রচিত চিত্র ও কল্পিত দেবদেবী—যা আমাদেরও আশান্বিত ও অস্থির করে তোলে—এই নিমীলচক্ষু, রিক্তবল উনচল্লিশ জনে তার তিলপরিমাণ চিহ্ন নেই। ওদের মুখমণ্ডল ওদের নিতম্বের মতোই মসৃণ, প্রশান্ত ও ভাবলেশহীন; দেখে মনে হয় যেন ওরা নির্বিকল্প সমাধিতে মগ্ন; ওদের ঘিরে—ঘিরে কোনো স্বপ্ন রচনা করা যায় না। আমি বুঝলাম ওদের মস্তিষ্ক থেকে চিন্তা সম্পূর্ণ বহিষ্কৃত হয়ে গেছে, ওরা শূন্য এখন, এক—একটি অন্তঃসারবর্জিত আধার; ওদের মনের ধ্বংসকে আহার ক’রে—ক’রে অক্ষয় হয়ে আছে ওদের রূপযৌবন। আমরা ঘুরে—ঘুরে বার—বার দেখতে লাগলাম ওদের, কেউ চোখ ফেরালো না। আমার সঙ্গীরা হাততালি দিলেন, ক্যামেরা খুলে ছবি তুললেন, ওদের রক্তের চাপ পরীক্ষা করলেন; ওরা একই রকম নিঃসাড় হয়ে রইল। নির্বেদ—আমাদের পক্ষে ধারণাতীত নির্বেদে ওরা আচ্ছন্ন। আমি কিছুক্ষণ পরে আর তাকাতে পারলাম না; এক বিশাল বিষণ্ণতা আমাকে অভিভূত করল, আমার মনে হলো আমি সমগ্র মানবজাতির অপমৃত্যুর ছবি দেখছি।
‘ওরা ম’রে যাচ্ছে,’ ফেরার পথে ডক্টর বটব্যাল বলতে লাগলেন, ‘বিনা কষ্টে, বিনা বোধে বিনা প্রতিরোধে ম’রে যাচ্ছে। রোগ, জরা, অপুষ্টি বা কোনো দৈবদুর্বিপাক নয়—ওদের মৃত্যুর কারণ হলো নিরবচ্ছিন্ন সুখ ও নিরাপত্তা, সংঘাতের অভাব, সংগ্রামের অভাব, স্বেচ্ছাচারী অপ্রতিহত অধিকার। ওরা প্রমাণ করছে যে কোথাও কোনো বাধা যদি না থাকে, যদি পরিবেশ হয় সর্বতোভাবে সর্বদা শুধু অনুকূল, তাহলে জীবনজনিত ক্লান্তির চাপেই ধ্বংস হয়ে যায় জীবন। একটা খুব সাধারণ ও ছোটো উদাহরণ নিন: সন্তান। সন্দেহ নেই, জীবন—নাট্যে সন্তানই নেয় আমাদের শত্রু ও ঘাতকের ভূমিকা, তারই জন্মক্ষণে আমাদের মৃত্যুর মুখবন্ধ রচিত হয়, এবং সে সাবালক হয়ে উঠলে আমাদের পদচ্যুতি অনিবার্য। কিন্তু, সন্তানের সঙ্গে সংঘাত ও অচেতন প্রতিযোগিতার ফলেই আমাদের জীবনতৃষ্ণা বেড়ে যায়; আমরা শিখি—ক্ষীয়মাণ শরীর সত্ত্বেও নানা নতুন কৌশলে জীবনটাকে আঁকড়ে থাকতে, হেরে গিয়েও একটা হার না মানার জেদ জন্মায় আমাদের মধ্যে। ওই বীরগোষ্ঠী অমৃতফল খুঁজে না পেলে কী হতো তা সহজেই ভাবা যায়; এতদিনে শতাধিক সাবালক পুত্রকন্যা ও তাদের সন্ততি নিয়ে একটি সুখে দুঃখে বিরোধে ও বন্ধুতায় ভরা জীবন্ত মানব সংসার গ’ড়ে উঠত এই ডিঙ্গু উপত্যকায়; তাহলে ওরা বাধ্য হতো চেষ্টাপরায়ণ হতে, চাষ করতে, ফসল ফলাতে, নতুন জমি দখল ক’রে নিতে, নতুন বাসস্থল তৈরি করতে, তাহলে কোনো—কোনো প্রতিবেশী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধে ও বিবাহে যুক্ত হতো ওরা: তাহলে মানুষের আবহমান ইতিহাস হঠাৎ এক জায়গায় এসে এমন নাটকীয়ভাবে, ভয়াবহভাবে থেমে যেতো না। কিন্তু লোংচু ফল ওদের দেবতা ক’রে দিতে পারল না, শুধু মানবিক বৃত্তিগুলিকে একেবারে নষ্ট ক’রে দিল।’
আমি জিগেস করলাম, ‘ওদের বাঁচাবার কি কোনো উপায় নেই?’
‘কোনো উপায় নেই,’ উত্তর দিলেন হেমকান্ত ভৌমিক। ‘আমরা অনেক রকম চেষ্টা ক’রে দেখেছি, কোনো চিকিৎসায় কোনো ফল হয়নি। আগে ওদের একটিমাত্র জীবলক্ষণ ছিল মৈথুনকামনা, তা চ’লে যাবার সঙ্গে—সঙ্গে ওরা দ্রুতবেগে পতনের দিকে এগোচ্ছে। এখন আর কোনো ইচ্ছে নেই ওদের, আর ইচ্ছা—বৌদ্ধ ভাষায় তৃষ্ণা তা—ই আমাদের দুঃখের আকর, কিন্তু তা—ই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। আমাদের সব ইচ্ছে আসলে বাঁচার ইচ্ছে, আমাদের সব দুঃখ আসলে মৃত্যুভয়। এই দুই মৌলিক বৃত্তিকে কেন্দ্র ক’রেই আমাদের নিজ—নিজ সত্তায় অনুভূতি উদগত হয়, স্থায়িত্ব পায়। সেই কেন্দ্র থেকে চ্যুত হয়ে গেছে লোংচুসেবীরা। আমরা প্রথম এসে লক্ষ করেছিলাম ওদের স্মৃতিশক্তি ওদের বাক্শক্তির মতোই ক্ষীণ ও অস্পষ্ট; নিজেদের নাম ভুলে গেছে ওরা, গুনতে ভুলে গেছে; দিন ও রাত্রির প্রভেদ অনুভব করলেও সকাল ও বিকেলের পার্থক্য অনুভব করে না। আর এই এক বছরের মধ্যে ওদের স্মৃতি ও সময়চেতনা একেবারে শূন্যে এসে ঠেকেছে; ফলত ওরা যে “আছে” তাও ওরা অনুভব করে না, আর অতএব ওরা যে মারা যাচ্ছে তাও জানে না। স্মৃতিরহিত, সময়চ্যুত অস্তিত্ব সম্ভব হতে পারে প্রলয়ের পরে অনন্তশায়ী বিষ্ণুর, কিন্তু তাঁরও থাকে স্বপ্ন, যে—স্বপ্নকে আমরা শেষ পর্যন্ত সৃষ্টি ব’লে শনাক্ত করি। কিন্তু মানুষের পক্ষে সময় ও স্মৃতি অপরিহার্য—কিংবা বলা যায় স্মৃতির জন্য তার সময়চেতনা অক্ষুণ্ণ থাকে; তা থেকে স্খলিত হয়ে পড়লে “জীবন” আর সম্ভব হয় না। তাই ওই উনচল্লিশজনকে এখনই মৃত ব’লে ঘোষণা করতে দোষ নেই। আপনি ওদের জন্য চিন্তিত হবেন না, সিদ্ধেশ্বরবাবু, আর দু—সপ্তাহের মধ্যে ওদের মোহময় তন্দ্রা চিরনিদ্রায় অবসিত হবে। আমরা তাই শকুনের মতো অপেক্ষা করছি এখানে, ওদের শবগুলি আমাদের গবেষণার পক্ষে বিশেষ জরুরি। আমাদের আশা, শবব্যবচ্ছেদ ক’রে লোংচুর ক্রিয়াকলাপ বিষয়ে নতুন জ্ঞান আমরা আহরণ করতে পারবো।’
‘বলতে গেলে সেটাই শেষ আশা,’ এবারে কথা বললেন ডক্টর মাহেশ্বর। ‘আপনি হয়তো কোনো সময়ে এ—বিষয়ে কিছু লিখবেন, সিদ্ধেশ্বরবাবু, তাই আপনাকে কয়েকটা তথ্য জানিয়ে রাখছি। লোংচুর মধ্যে চারটে ভিন্ন—ভিন্ন উপাদান পাওয়া গেছে; তাদের নাম দেয়া হয়েছে ভাস্কন (VN), মোটন (MT), অক্সিন (XN) ও স্টেরিন (ST)। ভাস্কনের ফলে জন্মনিরোধ ঘটে, মোটনের ফলে কামোদ্দীপনা ও চিরযৌবন; অক্সিন দেয় পুষ্টি ও স্বাস্থ্য আর স্টেরিন আনে বন্ধ্যত্ব ও বুদ্ধিলোপ। উপাদানগুলি যে—মাত্রায় লোংচুতে পাওয়া যায় তাতে পরিবর্তন ঘটালে কী ফলাফল ঘটবে বা ঘটতে পারে তা—ই নিয়ে এখন বারোজন বিজ্ঞানী দেশে—বিদেশে গবেষণা করছেন। এবং—আরো জরুরি প্রশ্ন: স্টেরিনকে অন্যগুলো থেকে বিশ্লিষ্ট করা সম্ভব কিনা, নাকি অন্য তিনটির সংযোগেরই একটি উপজাতক হলো স্টেরিন। যদি স্টেরিন বাদ দিয়ে অন্য তিনটিকে অনাহত অবস্থায় পাওয়া যায় আর সেই তিনটিকে বিশ্লিষ্ট করা যদি সম্ভব হয়, তাহলে আমরা তৈরি করতে পারবো একটি নতুন অব্যর্থ জন্মনিরোধক, একটি শক্তিশালী রতিবর্ধক রসায়ন, আর সেই সঙ্গে—ভাবতেও রোমাঞ্চ হয় আমাদের এমন একটি ভেষজ, যা বৃদ্ধকে দেবে নবযৌবন, আর রোগের আশঙ্কা বহুগুণ কমিয়ে মানুষের গড় আয়ু একশো বছরে তুলে দেবে। তখন আমরা ঘোষণা করতে পারবো মানব—ইতিহাসে এমন এক নবযুগ, যা এতদিন শুধু কবিকল্পনায় আবদ্ধ ছিল। অবশ্য এই সব রঙিন সম্ভাবনা নিয়ে অগ্রিম উৎসাহিত না—হওয়াই ভালো, কেননা এই উপাদানগুলিকে ল্যাবরেটরিতে উৎপন্ন করা যায় কিনা, বা লোংচুর ফলন কী—উপায়ে আরো প্রচুর হতে পারে, এ—সব পরীক্ষা এখনো আরম্ভও হয়নি, আর পৃথিবীতে যার পরিমাণ অতি অল্প তা অস্ত্রনির্মাণে কাজে লাগলেও চিকিৎসায় ফলপ্রসূ হতে পারে না। কিন্তু প্রথমে, সকলের আগে, সর্বনাশী স্টেরিনকে বিশ্লিষ্ট করা দরকার—এখনো, দশমাসব্যাপী চেষ্টার পরেও তা সম্ভব হয়নি, এবং তা না—হওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো দিকে এগোবার কোনো কথাই ওঠে না। যদি এমন হয় যে শেষ পর্যন্ত তা অসম্ভব থেকে গেল, কিংবা যদি স্টেরিনকে বিশ্লিষ্ট করলে অন্য উপাদানগুলি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তাহলে—’ ডক্টর মাহেশ্বর মুহূর্তের জন্য থামলেন।
‘—তাহলে?’
‘তাহলে অগত্যা লোংচু গাছটিকে নির্বংশ না—ক’রে উপায় থাকবে না—পাছে ওই উনচল্লিশ জনের মতো অন্য কোনো মানবগোষ্ঠী এই বিষাক্ত অমৃতের আস্বাদ পায়। কিন্তু এই সুরম্য ও ধনোৎপাদক অরণ্যভূমির উপর জীবাণুধ্বংসী বোমা না—ফেলে কী ক’রে তা সম্ভব হতে পারে, সেও এক নিদারুণ সমস্যা।’ ডক্টর মাহেশ্বরের ভ্রূ কুঞ্চিত হলো; অবশিষ্ট পথ বিজ্ঞানীরা আর কথা বললেন না।
