প্রেমিকারা – বুদ্ধদেব বসু

প্রেমিকারা

একশো—দশ স্ট্রিটের মোড়ে সাবওয়ে থেকে উঠে এলাম। জুনের শেষ, গ্রীষ্মের শুরু, উচ্ছল ব্রডওয়ে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে দূরে, হাডসনের বাঁকে, আটলান্টিকের মোহানায়—সারা মানহাটন রঙিন, ছাইরঙা বাড়িগুলো গোলাপি। কতবার, কে জানে কতবার, সাবওয়ের সিঁড়ি দিয়ে উঠলাম, এই একশো—দশ স্ট্রিটের মোড়ে। এখন আর ভুল গাড়িতে উঠি না, টাইমস স্কোয়ারে শাটল ধরার জন্য সবুজ তীরের দিকে তাকাতে হয় না আর, সব মুখস্থ। আমি এই শহরের হয়ে গিয়েছি। আমার কাজের কোনো বাঁধা—ধরা সময় নেই, তবু ইচ্ছে ক’রে ফিরি, এই শহরের তীব্রতর স্বাদ নেবার জন্য। আপিশ—ছুটির সময়েই আপিশ—ফেরতা তুঙ্গ প্রহর আজ পেরিয়ে গেছে—গ্রীনিচ—গ্রামে পেপার ব্যাক—হাউস—এ ঢুকেছিলাম (হা ঈশ্বর, এদের এক—একটা বইয়ের দোকানে ঢুকলে মাথা—খারাপ হয়ে যায়!)—নিউ ইয়র্কের অর্ধেক লোকের ডিনার হয়ে গেছে এতক্ষণে—তবু কী—ভিড়, এখনো কী—ভিড়! লক্ষ—লক্ষ মানুষ, নানা জাতের, নানা দেশের, নানা রঙের, মেয়ে, পুরুষ, বুড়ো, ছোকরা: তাদের মধ্যে আমিও। পিঁপড়ের জাঙালের মতো ছুটছে: আমিও। কেউ কারো দিকে তাকায় না, কিন্তু আমি তাকাই ওদের দিকে—গম্ভীর, রেখা—পড়া মুখগুলি, বাড়ি গিয়ে ডিনারের আশা, যার—যার গোপন দুশ্চিন্তা, স্ত্রীর অথবা স্বামীর সঙ্গে দেখা হবার আশা—অথবা দুঃখ। প্রত্যেকেই নিঃসঙ্গ, কিন্তু আমি এক সঙ্গময় সমুদ্রে আকণ্ঠ ডুবে আছি। আজ বেরোবার সময় ভুল দরজা দিয়ে উঠে এসেছি উল্টো ফুটপাতে, হঠাৎ ধাঁধা লেগেছিল, আমার হোটেলটাকে চিনতে পারিনি মুহূর্তের জন্য। সাবওয়ের এই এক অবদান—একই শহর, একই চৌরাস্তা, বাড়ি, আকাশ—নতুন—নতুন রূপে দেখা দেয়, পোশাকের ছাঁট বা রং বদলে যেমন প্রেমিকা, তেমনি। আর দশদিন, দু—শো চল্লিশ ঘণ্টা। তারপর এই সিঁড়ি দিয়ে আর উঠবো না, দেখবো না উঠে আসতে—আসতে ক্রমশ—বড়ো—হতে—থাকা চৌকো আকাশটাকে, উপরে উঠে অবাক হয়ে যাবো না আকাশের তলায় আরো বড়ো একটা জগৎ দেখে। সেই একই সব মুখ, কিন্তু বদলে গেছে এখন, এই গ্রীষ্মের সন্ধ্যা হালকা হাওয়া ছড়িয়ে দিয়েছে, এখন তাকাচ্ছে সবাই পরস্পরের দিকে, কেউ আর নিঃসঙ্গ নেই। এই ব্রডওয়ের সান্ধ্য ভিড় এমনি হেসে হেসে ভেসে যাবে, আমি থাকবো না। তাকে ছেড়ে যেতে হবে—তাকেই। পৌনে—আটটা, আটটায় তার আসার কথা: চলো জলদি। একটা ফোন করা যাক, যেন দেরি না করে। এই ড্রাগস্টোরেই—না, এক মিনিট দূরে সেই পেস্ট্রির দোকান: চলো, ছোটো। মেয়েটাকে দেখতে চাই একবার, ছেলেটাকেও। স্বামী—স্ত্রী? না, বড্ড বেশি মিল চেহারায়, নিশ্চয়ই ভাই—বোন। দিনেমার, ছিপছিপে লম্বা দু—জনেই, নিখুঁত ব্লন্ড, ঋগ্বেদের ইন্দ্র আর ইন্দ্রাণী। হায়, অমন রূপ নিয়ে দোকানদারি, স্বর্গের দেবীরা বোতাম টিপে—টিপে যোগ—বিয়োগ করেন। আমার আগে তিন খদ্দের, আমি একমনে মেয়েটাকে দেখছি, এতদিন থাকলাম একটা ডেট কেন চাইলাম না, ডলির যেদিন রাত্তিরে কাজ পড়ে তার আপিশে—কিন্তু কে জানে ওরাও যদি স্বামী—স্ত্রী, আমি আবার আংটি—ফাংটি দেখে বুঝতে পারি না, তা একটু আলটবাল্ট আলাপ করলেই জেনে নেয়া যেতো। কিন্তু ওই একটু চোখে—চোখে হাসি, যা ওরা বিশ্বজনকে বিলিয়ে দেয়, তার বেশি আর এগোনো হলো না আমার, দশদিন পরে চ’লে যাবো। আমি শো—কেসে রাখা একটা ফ্রুট—কেক চাইলাম, যাতে মেয়েটিকে নিচু হতে হয় বের করার জন্য। (কী তন্বী, যেন তরুণ বেণু; কী নমনীয়, যেন বেতস; আমার শুভ্রা, আমার তন্বী—কার না কবিতা?) বাক্সে ভ’রে দিল, আমি বললাম কাগজে মুড়ে বেঁধে দাও, যাতে ওর লম্বা টিকোলো আঙুলের খেলা আর—একটুক্ষণ দেখতে পাই। এখন এটাকে ব’য়ে নিয়ে যেতে হবে, যদিও মিষ্টি—ফিষ্টি আমি একদম খাই না, ডলিরও তেমন পছন্দ নয়। সভ্য জগতে কেন বলা যায় না, ‘কিছু চাই না, তোমাকে একটু দেখতে এলাম, আর—একবার তোমার নীল চোখের দিকে তাকাতে এলাম?’ দরজার কাছে এসে মনে পড়ল—টেলিফোন। ‘বেলা ঘুমোয়নি এখনো, মার্থা আসামাত্র আমি বেরিয়ে পড়বো।’ ‘মার্থা কখন আসবে?’ ‘সময় হয়ে গেছে—যে—কোনো মুহূর্তে, ওই যে ডোর—বেল, এলো বোধহয়। তাহলে এক্ষুনি দেখা হচ্ছে—পনেরো মিনিটের মধ্যে।’

আ—এক্ষুনি। পনেরো মিনিট! ছুট—ছুট বাড়ির দিকে। দোকানের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে আমার লন্ড্রির ধোপানি, হাওয়া খাচ্ছে, কী যেন একটা মশলা চিবোয় সব সময়, তার কথায় তাই খোশবয়। আমাকে দেখে হাসল—একটু দাঁড়াবো?—না পনেরোর মধ্যে দু—মিনিট বোধহয় চ’লে গেল, সময় নেই, আর দশদিন মাত্র। কী ভালো এই শহর, কী সুন্দর আজকের সন্ধ্যাবেলাটা, প্রথম সত্যিকার নিঃশীত দিন, সব কাচের দরজা খোলা, সারা মুলুক রাস্তায়, ফুলওয়ালি ফলওয়ালিরা ফুটপাতে। কী ভালো এই অপেক্ষার বারো—সাড়ে—এগারো—এগারো মিনিট। আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার চারতলার জানলায়, বাইরে তাকিয়ে, বাস—এর পর বাস এসে থামছে, ওরই একটা থেকে নামবে সে—আমার প্রিয় মুখ, চোখ, ঠোঁট, গাল, সব—কিছু নিয়ে অবিকল সে, প্রস্তুত। বিশাল দশদিন এখনো হাতে আছে আমার—অফুরান সময়—রাজত্ব। আশা করি ট্যাক্সিতে আসবে না, বাস—এ এলে তাকে নামতে দেখবো, দেখবো তার দুলে—দুলে হাঁটা, এই রঙিন আলোয়, তাকে তাকাতে দেখবো রাস্তার ওপার থেকে আমার জানলার দিকে। দুরুদুরু, বুকের মধ্যে দুরুদুরু, আমি অপেক্ষার চাপে কাঁপছি, আমার বয়স আর বিয়াল্লিশ নয়, আঠারো। চলেছি ঘোড়ার গাড়িতে, পাশে মঞ্জু। কী ভাগ্যে আমি আজ ভার পেয়েছি ওকে হোস্টেলে পৌঁছিয়ে দেবার। কী আনন্দ, মঞ্জুকে দশটার মধ্যে ফিরলেই চলবে, এখন মাত্র সাড়ে—আটটা। ওর হোস্টেলের ঠিক উল্টো পথে আমি যেতে বলেছি গাড়োয়ানকে—রমনার দিকে—ঘণ্টা হিশেবে ভাড়া দেবো বলেছি, যাতে আস্তে চালায়। ফাল্গুনের সকাল, সবুজ রমনা, গলফ—কোর্স রেস—কোর্স, ঢালু ছাদওয়ালা বাড়িগুলো যে যার বিশাল বাগানের মধ্যে লুকোনো জনপ্রাণী নেই। মঞ্জু আমার পাশে, কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে, অমন গা ঘেঁষে আগে কখনো বসিনি আমরা। ঢুলকি তালে গাড়ি চলছে, ঘোড়ার খুরের শব্দে যেন আলস্য, মাঝে—মাঝে পাতার ঝিরঝির, কেমন ঝিম—ধরা নেশায় ভরা এই সকালবেলাটা। কথা নেই বেশি, শুধু মাঝে—মাঝে চোখে—চোখে তাকানো; আমরা একা, তাই আজে—বাজে কথার আব্রু এখন ছিঁড়ে ফেলা যায়; প্রতি মুহূর্তে আমার চোখে আরো সুন্দর হয়ে উঠছে সে, আমার ভালোবাসা তাকে সুন্দর ক’রে তুলছে। চোখ থেকে ঠোঁটে ছড়াল হাসি, ঠোঁট খুলে গেল, ঝিলিক দিল দাঁত, জিভ, সরে এসে দেখলাম আমি কী রকম লাল ক’রে দিয়েছি তার ঠোঁট দুটোকে। সে—ই আমার প্রথম। মানে, প্রথম চুমো খাওয়া। ঈষৎ হাঁপাচ্ছিল মঞ্জু, আমার হঠাৎ মনে হলো: অত কাছে থেকে মুখ দেখা যায় না। কোনটা ভালো, চুমো, না তাকিয়ে থাকা? কিন্তু মঞ্জুই মুখ এগিয়ে দিল এবার, আমাদের সাহস বেড়ে গেল, হঠাৎ দেখি রাস্তায় একটি বছর চোদ্দর দেহাতি ছেলে গোল—গোল চোখে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে, হাসছে। আমরা জানলার কপাট পর্যন্ত তুলে দিইনি, আমরা নিষ্পাপ, আমরা শিশু; এই পৃথিবী স্বর্গ। শিশু আমরা দুজনে, আমার বড়োজোর সাত, আর টুনটির বোধহয় পাঁচও পোরেনি, ফরিদপুরে মামাবাড়িতে বেড়াতে এসেছি। আমার সব খেলা টুনটির সঙ্গে, আমি পুতুলকে কাপড় পরাই, মাটিতে গর্ত ক’রে উনুন জালি, ঘাস—পাতা ছিঁড়ে কুটনো কুটে দিই তার রান্নার জন্য, আমি চেষ্টা করছি টুনটির মতো হতে, সে যা ভালোবাসে তা—ই ভালোবাসতে, তার জন্য প্রায় মেয়ে হয়ে যাচ্ছি আমি, আমার সমবয়সী ছেলেগুলোকে টুনটির তুলনায় বাঁদরের মতো লাগছে। কিন্তু সন্ধ্যাবেলা আমার পুরুষ—সত্তা জেগে ওঠে, আমি তাকে পড়াবার ভার নিয়েছি, দ্বিতীয় ভাগ খুলে যুক্তাক্ষর শেখাই, আমাদের মধ্যিখানে একটা হারিকেন লণ্ঠন, দুটো বড়ো বড়ো ছায়া পড়ে দেয়ালে, আমি পড়ানো ভুলে ছায়া দুটোকে দেখি, দুটোই ছোটো কিন্তু একটা একটু বড়ো, কিন্তু লণ্ঠনটা অত কাছে বলে দুটোই খুব বড়ো, আমাদের সঙ্গে—সঙ্গে ওরা মাথা নাড়ে, হাত নাড়ে, আঙুল বাঁকায়, আমার মজা লাগে দেখতে, আমি ওর পিছনে কুঁকড়ে ব’সে দুই ছায়াকে এক ক’রে দিই দেয়ালে, সরে—সরে গিয়ে আমার ছায়াকে ছুঁড়ে দিই ওর ছায়ার উপর, লণ্ঠনটাকে ঝাঁকানি দিয়ে—দিয়ে নানা রকম অদ্ভুত আকৃতি তৈরি করি—টুনটি খলখল ক’রে আহলাদি ধরনে হেসে ওঠে, আবার একটু—একটু ভয়ও পায়। এই এক রহস্য, ছায়া, এক আদিম সান্ধ্য রোমাঞ্চ, হাল আমলের ব্যাপ্ত বিদ্যুৎ যা ধ্বংস ক’রে দিয়েছে। কিন্তু আমাদের এই কোহিনুর হোটেলে বিদ্যুৎ নেই, সারাদিন জ্বলজ্বলে রোদ্দুর আর রাত্রে পৃথিবী হারিয়ে যায় শুধু আমরা থাকি—আমি আর ইলা—এই ছোট্ট ঘরে তেতলায়, দরজার বাইরে প্রকাণ্ড ছাদ, ছাদের উপরে আরো বড়ো আকাশ, আর সামনে আকাশের সমান বড়ো—বিশাল, প্রবল, চঞ্চল—ঢেউ, ঢেউয়ের পর ঢেউ, সারা রাত চলে ঝড়ের মতো শব্দ, কিন্তু দিন ভ’রে নীল, সাদা, ফেনিল, সবুজ, বেগুনি—সমুদ্র। সারা আকাশ এই ঘরের মধ্যে, দিগন্ত এই ঘরের মধ্যে, আর সমুদ্রের স্বর, উচ্ছ্বাস, নিশ্বাস—সব আমাদের, আমাদের জন্য। ইলা এই প্রথম এলো পুরীতে, রাত্রে তার ঢেউয়ের শব্দে ভয় করে, আমরা প্রায় সারা রাত না ঘুমিয়ে কাটাই। ইলা যে এখন আমারই, আমার স্ত্রী, এই ধারণাটায় আমি অভ্যস্ত হতে পারছি না এখনো, প্রতি বার মনে হয় কোনো অন্যায় করছি, যা উচিত নয় তা—ই করছি, আর তাই যেন রোমাঞ্চের অন্ত নেই। এ কি সত্যি? সত্যি আমরা, ইলা আর আমি, তেতলার একলা ঘরে, সামনে সমুদ্র, মাথার উপর তারা ভরা রাত্রি, অন্ধকারের বুকের মধ্যে আমরা লুকোনো? কোনটা সত্যি? এই দিন, রাত্রি, ঢেউয়ের তোলপাড়, রক্তের তোলপাড়—নাকি বিয়ে, সংসার, ভবানীপুরের খুপরি ফ্ল্যাট, সন্ধ্যাবেলা দম—আটকানো কয়লার ধোঁয়া? চলেছি আমরা চৌরঙ্গির ট্রামে নিউ মার্কেটে, ইলার পাশে মেয়েদের আসনে বসেছিলাম আমি, কিন্তু এলগিন রোডে সাদা—কাপড়—পরা কয়েকটি নার্স উঠল, আমি দরজার কাছে লম্বা আসনটায় সরে এলাম। পরের স্টপে একটি ফিরিঙ্গি মেয়ে উঠে তক্ষুনি ব’সে পড়ল আমার পাশে, তার ও—পাশে এক পাদ্রি সাহেব বসলেন, অবশিষ্ট কয়েক ইঞ্চিতে একটি ছোটোখাটো ক্লান্ত কেরানি জায়গা ক’রে নিলো কোনোমতে। তিনজনের আসনে চারজন, পাদ্রিসাহেবটি মোটাসোটা, বেশ আঁটাআঁটি হচ্ছে, আমি চেষ্টা ক’রেও ফিরিঙ্গি মেয়েটির দেহের স্পর্শ এড়াতে পারছি না, নড়াচড়া করতে গেলে আরো বেশি অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু মেয়েটির ভঙ্গিতে বিব্রত হবার একটুও লক্ষণ নেই, আমি দেখছি তার মুখ বিরক্তিতে কুঁচকে যায়নি, চোখ দুটি বেশ প্রফুল্ল, যেন পাদ্রিসাহেবের গা বাঁচিয়ে তার শরীরের ভার আমারই উপর ছেড়ে দিয়েছে, আমি কথা বললেও সহজভাবে জবাব দেবে হয়তো। সুখ ছড়িয়ে পড়ছে আমার শরীরে—শীতের পড়ন্ত বেলার রোদ্দুর আমার পিঠে, আর এই এক অন্য উষ্ণতা—নিজেকে আমার অপরাধী লাগছে যেহেতু এই ট্রামেই ইলা (হলোই বা আমার দিকে পিঠ ফেরানো), আর যেহেতু অপরাধবোধ, তাই আমেজ আরো গাঢ়, যেন কোনো বাগানে দুলছি দোলনায়—খুব আস্তে (আসলে ট্রামের ডাইনে—বাঁয়ে দুলুনি), চোখ বুজে আসছে, বাতাসে পাচ্ছি ফুলের গন্ধ (আসলে মেয়েটির চুলের লোশন, মুখের পাউডার, বুকে—গোঁজা রুমালের সেন্ট)—এমনি কাটল দশ—না, পাঁচ মিনিট হয়তো, তিনশো সেকেন্ড, এক অনন্তকাল, আমি অনুভব করলাম আমার শরীর দিয়ে এক তরুণীকে, এক তরুণ সত্তা, এক অজানা জীবন—উষ্ণ, নরম, নতুন এবং অনাবিষ্কৃত। আমাদের সঙ্গে একই স্টপে নামল মেয়েটি, ইলা আমার সঙ্গে আছে বলে আমাকে অন্য সব ইচ্ছে চেপে দিতে হলো (অন্তত ঠিকানাটা কি জেনে নেয়া যেতো না?), এমনকি রাস্তায় নেমে আর তাকাবারও চেষ্টা করলাম না—টের পেলাম না, কখন ওই স্পর্শময়ী হারিয়ে গেল চৌরঙ্গির ভিড়ে, চিরকালের মতো, শুধু পাঁচ মিনিটের কদমফুল আমাকে উপহার দিয়ে। এমনি হারিয়ে যায় সবাই, কাউকে ধ’রে রাখা যায় না, যার সঙ্গে জীবন কাটাচ্ছো, যাকে বলছো স্বামী অথবা স্ত্রী, সেও অনেক আগে হারিয়ে গেছে। আমরা প্রত্যেকে প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছি, কেউ কাউকে চিনি না। পেল্লায় পার্টি, মদের স্রোত বয়ে যাচ্ছে এই প্রহিবিশনের শহরে, হাসিতে কথায় চাপা প’ড়ে গেছে আরব সাগরের মৃদুগুঞ্জন, নাগরদোলার মতো ঘুরছে চিত্র—তারকা, কোটিপতি, কূটনৈতিক, ইত্যাদিরা। আমি লেবু—পানি খাচ্ছি, আমি স্থির থাকতে চাই, আমি চোখে—চোখে রাখছি ওই পাণ্ডুবরণী ফরাসি কাউন্টেসকে, শরীরের খাপে—খাপে বসানো কালো মখমলের পোশাক তাঁর, যা দেখতে অতি সহজ সরল কিন্তু যার প্রতি তন্তুতে লুকিয়ে আছে শিল্পীর প্রতিভা, চাতুর্য, বৈদগ্ধ্য—অন্তত তা—ই ধ’রে নেয়া যায়—আমাকে জেনে নিতে হবে ডিওরের তৈরি কিনা। আমি আসামাত্র দু—চার মিনিট পেয়েছিলুম এই ভারতপ্রেমিকা লেখিকাকে, এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে জিগেস করেছিলাম তিনি কি বোদলেয়ারের ভক্ত; উত্তরে, চোখে হেসে, মর্মরস্বরে, তিনি আমাকে শুনিয়েছিলেন সেই আশ্চর্য কবিতার প্রথম স্তবক, যার শিরোনামা ‘ভ্রমণের আমন্ত্রণ’। তাঁর ঠোঁট থেকে ফরাসি শব্দগুলো বিন্দু—বিন্দু মধুর মতো ঝ’রে পড়ল আমার কানের উপর, তাঁর ইংরেজি বলার বিদেশী টান মুগ্ধ করল আমাকে, তাঁর চোখের কোলে বয়সের সূক্ষ্ম রেখাগুলিতে আমি এক নতুন সৌন্দর্য দেখতে পেলাম। কিন্তু তার পরেই বিবর্ধমান ভিড়ের চাপে আমাকে সরে আসতে হলো, আমি ওই মোহময়ীর সামনে আর এগোতে পারছি না, সব সময় দেখতে পাচ্ছি না ওই উজ্জ্বল কালো মখমলের পোশাকে ঢাকা তন্বীকে, যেন কৌটোর মধ্যে রত্ন, যেন খাপের মধ্যে তলোয়ার—কী—রোমশ কালো ওই মখমল, বোদলেয়ারের কবিতার মতো, কালো, যার গা ফেটে জ্যোতি বেরোচ্ছে। বোকার মতো দাঁড়িয়ে—দাঁড়িয়ে শুধু লেবু—পানি গিলছি—বরং একটা সিনজানো নেয়া যাক এবার, না—ও—সব জোলো রোমান্টিকে কাজ নেই, ক্লাসিক্যাল স্কচই ভালো। না—মদ্য নয়, খাদ্য চাই এখন, আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে ভ্যাটিকান দেখার পরিশ্রমে, এইমাত্র হোটেলে ফিরলাম, বেলা তিনটে। ডাইনিং—রুম বন্ধ, বেসমেন্টে স্ন্যাক—বার—এ এসেছি। অসময়, আমি ছাড়া খদ্দের নেই, শুধু লং—বেঞ্চে ব’সে একটি চওড়া কাঁধের জর্মান যুবক বিয়ার খাচ্ছে। আমি খেতে—খেতে মুখ তুলেছি একবার; রাস্তায় একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্থির হয়ে, ছবির মতো। আবছা আলোর বেসমেন্টে আমি, একতলা উপরে ফুটপাতে মেয়েটি, বাইরে গ্রীষ্ম, ঝকঝকে কাচের জানলা দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—যেন রঙ্গমঞ্চে এসে দাঁড়ালো নায়িকা। পাতলা সাদা নিচুগলার পোশাক তার পরনে, আমি বতিচেল্লির ছবি ভাবছি, কিন্তু হঠাৎ সেই বাসন্তিকা যেন হাত নাড়ল, হাত নেড়ে ইঙ্গিত করল যেন—একবার, দু—বার—তারপর নিচু হয়ে, কাচে প্রায় নাক ঠেকিয়ে হাত দিয়ে নির্ভুল বার্তা পাঠালো—এসো। কাকে? জর্মান লোকটি নিশ্চল, তার পিঠ একইভাবে ফেরানো, আর মেয়েটি আছে সেখান থেকে তাকে দেখতে পাবারও কথা নয়। আমাকে?—যাঃ! আমি আমার অমলেটে মন দিলাম আবার, কিন্তু—যে নিজে এগিয়ে এসে ধরা দিচ্ছে তাকে হুট ক’রে ফেরত পাঠানো কি বোকামি নয়? নয় কাপুরুষতা? জীবনের প্রতি অসৌজন্য? অন্তত দেখা যাক না ব্যাপারটা কী। কিন্তু চোখ তুলে দেখি—নেই। খাওয়া ছেড়ে উঠে এসেছি বাইরে—নেই। গেল কোথায়? ভোজবাজি নাকি? সারা বিকেল ওই মেয়েটাকেই ভাবছি, রাগ হচ্ছে নিজের উপর, আর রাত্রে যখন ভিয়া ভেনেতোয় ফ্যাশনদোরস্ত ভিড় জমে উঠেছে, আমি হাঁটছি কাফে থেকে কাফেতে, সারি—সারি মুখে চোখ ফেলে ফেলে—কিন্তু, দেখলেও কি আর চিনতে পারবো এখন? আমি কি সত্যি দেখেছিলুম, নাকি আমার হঠাৎ উস্কে—ওঠা কামনা দিয়ে গ’ড়ে তুলেছিলুম এক বাঞ্ছনীয়াকে? আসলে হয়তো অতি সাধারণ রাস্তা—হাঁটুনি ছিল মেয়েটা (সেই চৌরঙ্গির ট্রামে আমার পাঁচ মিনিটের প্রতিবেশিনীরই মতো)—আমাকে বিদেশী দেখে ভেবেছিল সহজ শিকার—আর তারই জন্য আমি নষ্ট করলাম সারাটা বিকেল, সারাটা সন্ধ্যা—আর কোথাও নয়, রোমে, যেখানে, আজই সকালে, মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, আমি জীবনে প্রথমবার দেখেছি সিস্টিন চ্যাপেল আর ভ্যাটিকানের ঐশ্বর্য! ওই পাতলা সাদা পোশাক, গলার ডৌল, বুকের চেরা রেখা, যা নিশ্বাসের সঙ্গে ওঠে নামে, ওই সস্তা ফেরি—করা রূপের ডালি—আমি কি তারই জন্য এতগুলো ঘণ্টা ধ’রে ভুলে ছিলাম এই শাশ্বতী নগরীকে, অমর মিকেলাঞ্জেলোকে? এই তো, আমার নতুন—কেনা বইগুলো সাজানো আছে শেলফে; টমাস মান—এর উপন্যাস, রিল্কের কবিতা, সফোক্লিস—এর একটা চমৎকার নতুন অনুবাদ—আর আমি ছটফট করছি ডলি আসছে না বলে, আমার দিনগুলি উড়ে চ’লে যাচ্ছে হয় ডলির সংসর্গে, নয়তো বা তার অপেক্ষায় ব’সে থেকে—থেকে;—যে—সব ঘণ্টাগুলিতে আর—একবার ‘ফিলোকটিটিস’ পড়া যেতো, শোনা যেতো দেবদূতের পাখা—ঝাপটানি, দেখা যেতো নরকের আগুন থেকে সরস্বতীকে ফাউস্টের কাছে উঠে আসতে, সেই সব সময়কে টইটুম্বর ভ’রে রেখেছে ডলি গর্ডন, যে কবিতা বোঝে না, মেট্রপলিটান মিউজিয়মে যেতে চায় শুধু ওদের ফোয়ারা—বাগানের ধারে ব’সে লাঞ্চ খাবার সুখের জন্য, যার সময় হলো না বলে (বা ইচ্ছে হলো না বলে) আমি মোৎসার্টের ‘দন হুয়ান’ শুনতে পেলাম না, টিকিট পেয়েও ছেড়ে দিলাম। কী নিষ্ঠুর এই ব্যাপারটা—লোকেরা যার নাম দিয়েছে প্রেম। কী যন্ত্রণা—এই অপেক্ষা! আধ ঘণ্টা হয়ে গেল, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চোখ টাটাচ্ছে আমার, দশবার টেলিফোনের কাছে গিয়ে দশবার ফিরে এসেছি। আমার কী—দায়? তার আসার কথা, দেরি হলে সে—ই খবর দেবে: সেটা তারই কর্তব্য, দায়িত্ব। আমার খিদে পেয়ে গেছে, সেই কখন লাঞ্চে খেয়েছিলাম হ্যামবার্গার (একা—একা ভালো জিনিস খেতে ভালো লাগে না)—তার এটুকু পর্যন্ত বোধ নেই যে তারই জন্য আমি না—খেয়ে ব’সে আছি। আমি বেরিয়ে যাই না কেন—এসে ফিরে যাক ডলি, শাস্তি পাক, বুঝে নিক সেও নয় মহারানী আর আমিও নই দাসানুদাস। ডলি ইচ্ছে ক’রে করে এটা, আমাকে কাঁটাগাছে ঝুলিয়ে রেখে তামাশা দেখে দূর থেকে, নিজের ক্ষমতার আস্বাদ নেয়। এদিকে আর দশদিন মাত্র। সত্যি সে কি ভালোবাসে আমাকে? নাকি একবার ধরা দিয়ে প্যাঁচে প’ড়ে গেছে, আমার সোনালিয়া এখন ছটফট করছে খাঁচায়? অথচ এই মানুষই, আমি যখন হোটেল ম্যাস্কট—এ সর্দির জন্য বেরোতে পারছি না, বাইরে শীত, রোজ এসেছে আমার জন্য খাবার নিয়ে—চিংড়ি, হ্যাম, মুরগি, আপেল, রাইন ওয়াইন, নিজের সেঁকা টাটকা নরম গরম রোল—একদিন লিফট খারাপ ছিল, হেঁটে উঠে এসেছিল আমার দশতলায়, হাতে খাবার ঝুড়ি, মাথায় রুমাল বাঁধা, তার হিস্পানি চোখে টলটলে আলো, ওভারকোটে বরফের গুঁড়ো, ঠান্ডায় আর সিঁড়ি ভাঙার পরিশ্রমে নিশ্বাস ঘন, ঈষৎ ঠোঁট খোলা, আমার জন্য স্বাস্থ্য আর আনন্দের ডালি সাজিয়ে, যেন প্রাণময়ী, যেন অন্নপূর্ণা। আমি অপলক চোখে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে—ডলি, ডোরা, ডলরেস—আমার ধলেশ্বরী, আমার দোলনচাঁপা—কেমন ক’রে জিম গর্ডন তাকে ছেড়ে যেতে পেরেছিল! ভালোবাসা: তবে কি তাকে এক মুহূর্তের হতেই হবে? বাসনা, বাসনার উন্মেষ—শুধু কি তারই নাম ভালোবাসা, বাসনার তৃপ্তি হলেই রঙিন ছবির উল্টো পিঠ বেরিয়ে পড়ে? আ—যদি ডলির বদলে হতো সেই ফরাসি কাউন্টেস, যার ঠিকানা আমি রাখিনি, যার নাম পর্যন্ত আমি ভুলে গিয়েছি, অথচ যার সঙ্গে হয়তো আমার হতে পারত মনের মেলামেশা, এমন এক ধরনের ভালোবাসা যাতে থেকে—থেকে গোঁয়ারের মতো উৎপাত করে না শরীর! তার সাহায্যে আমিও হয়তো খুঁজে পেতাম রাসিনের চাবি, বরফের আগুন, দ্বিপদীর ঢাকনায় লুকোনো বিদ্যুৎ; বুঝে নিতাম, কী সেই গোপন জাদু, যার জন্য বিদগ্ধ ফরাসি মাত্রেই রাসিন বলতে অজ্ঞান, অথচ বিদেশীরা কিছুতেই যার নাগাল পায় না। কত বড়ো লাভ হতো আমার জীবনে, নতুন রাজত্ব জয় করার মতো। কিন্তু এমন কোনো—কোনো সময় আসে যখন আমরা আর জয় চাই না, আনন্দও চাই না—শুধু শান্তি চাই। আর শান্তি দিতে পারে—শুধু শরীর। বই বড্ড ভাবায়, বই খারাপ। শরীর কোনো তর্ক তোলে না, শরীর ভালো। কোনো সুন্দরী সামনে ব’সে থাকলেও মন শান্ত হয়, যেন একটা গোলাপি নেশা অজান্তে ছড়িয়ে পড়ে মনের উপর, আমাকে কোনো চেষ্টা করতে হয় না। আর তাই আমি ডলি গর্ডনকে চাই। দেখো—পৌনে ন—টা, রাস্তায় আলো জ্ব’লে গেছে—সে করছে কী? আর পনেরো মিনিটের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে ফ্লেউর—দ্য—লিস—সাতাশি স্ট্রিটের সেই ছোট্ট ফরাসি রেস্তোরাঁ, ভিড় নেই, শামুক আর ঠান্ডা মিঠে সোটার্ন দেয় চমৎকার—যেখানে আজ ডলিকে নিয়ে ডিনার খাবো ব’লে সকাল থেকে পথ চেয়ে আছি। কেন আসছে না? এও কি সম্ভব যে তার মেয়ে এখনো ঘুমোয়নি, বা মেইড আসেনি এখনো? নাকি কোনো বিপদ হলো? রাস্তায় কোনো মাতাল ছোকরার শেভ্রোলে তাকে চাপা দিয়ে গেল? লিফটের রশি ছিঁড়ে পড়ল হঠাৎ? আমি যেন ডলিকে দেখতে পেলাম হাসপাতালে, চাদরে ঢাকা—সুন্দরী সে নেই আর, সে নয় আর, একটা থ্যাঁতলানো রক্তমাংসের পিণ্ড হয়ে গেছে। এই উৎকণ্ঠা অসহ্য, আমি আত্মাভিমানে জলাঞ্জলি দিয়ে টেলিফোন তুলেছি: এনগেজড। দু—মিনিট পরে তার গলা পাওয়ামাত্র বড্ড রাগ হলো আমার, জেগে উঠল আমার ঈর্ষাবৃত্তি, অস্পষ্ট সব অভিযোগ, সন্দেহ। ‘অত্যন্ত, অত্যন্ত দুঃখিত, আমাকে ক্ষমা করো—কিন্তু মার্থা এলো এইমাত্র, আর তখন বললে ডোর—বেল বাজল?’ রান্নাঘরের সিঙ্ক সারাতে।’ ‘ও। এনগেজড ছিল কেন? মার্থাকে ওর বয়—ফ্রেন্ড ফোন করেছিল।’ ‘তবে যে বললে এইমাত্র বেলাও ঘুমুচ্ছিল না।’ ‘তবে যে তখন জ্যানিটর এসেছিল, আমার তা একটু আগে তোমার টেলিফোন কার সঙ্গে কথা বলছিলে?’ ‘আমি না— এলো মাথা?’ ‘আহা—এইমাত্র মানে একটু আগে। মার্থাও ঢুকেছে, সঙ্গে—সঙ্গে ওর ফোন।’ ‘সে এত দেরি করল কেন?’ ‘ওর দিদিমাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিল।’ ‘দিদিমা মারা যাচ্ছেন?’ এর উত্তরে ছোট্ট হাসি শুনলাম। ‘তুমি তোমার রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থেকো, আমি ট্যাক্সি নিয়ে আসছি এক্ষুনি—কেমন?’

এতক্ষণ একটু সন্দিগ্ধভাবে ডলির কথাগুলি শুনছিলাম—জ্যানিটর, মার্থার বয়—ফ্রেন্ড, দিদিমা, সবই বিশ্বাসযোগ্য শোনাচ্ছে, কিন্তু কে জানে, আসল কথাটা অন্য কিছু কিনা, সে নিজে মুখে যা বলবে তার বেশি তো জানার উপায় নেই আমার, তার দিনরাত্রির, সারা অতীতের, সারা জীবনের কতটুকুই বা জানি আমি। অপমান লাগছিল টেলিফোনে তার হালকাবলা কথাগুলোয়, যেন ব্যাপারটা তেমন জরুরি নয় তার কাছে, আসতে পারে তো ভালো, না—পারলেও তেমন আপশোশ নেই; যে—কোনো কারণেই হোক, এই দেরি করাটা যে কত অন্যায়, আমার পক্ষে কত কষ্টের, সে—বিষয়ে নিশ্চেতন যেন। কিন্তু শব্দবাহন কালো যন্ত্র থেকে শেষ কথাটি খসে পড়ামাত্র আমার মনের ভাব একেবারে বদলে গেল; ‘মোড়ে দাঁড়িয়ে থেকো, আসছি এক্ষুনি—’ এই কথাটা আমার মনের মধ্যে ফুটিয়ে তুলল অন্য এক ডলিকে—ডলি—ডলরেস—ধলেশ্বরী—মুখে মধু, চোখে সত্য, আর হৃদয়ে যার বিশুদ্ধ মমতা। আমরা ঢুকে পড়েছি যে—কোনো একটা রেস্তোরাঁয়—ভাগ্যে খোলা ছিল তখনও—মস্ত উঁচু সিলিংওয়ালা ঘর, পাথরে তৈরি আঠারো—শতকী বাড়ি, একটি লম্বা জোয়ান আধো—ঘুমন্ত ওয়েটার আমাদের আপ্যায়ন করছে। এটারও প্রায় বন্ধ হবার সময়, কিন্তু লোকটি আমাদের তাড়া দিচ্ছে না, মস্ত শরীর নিয়ে তার চলাফেরা শিথিল, চোখের কোণ লালচে, মুখটা রেখা—পড়া, গম্ভীর। হয়তো তার তন্দ্রার ভাবটা কাটাবার জন্য, বা আমরা ছাড়া আর খদ্দের নেই বলে, দু—একটা আলাপ করল আমাদের সঙ্গে (ডলিকে আর আমাকে স্বামী—স্ত্রী ব’লে ধ’রে নিয়ে)। খুব ধীরে ইংরেজি বলে সে, বুয়েনোস আইরেস—এ দেশ,—তার মতে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শহর—আমার দীর্ঘশ্বাস পড়ল যেহেতু ওই শহর আমি খুব সম্ভব জীবনে কখনো দেখতে পাবো না, কিন্তু ডলি তার সঙ্গে সোৎসাহে হিস্পানি বলতে শুরু করল। আমাদের সামনে ব্রকলি আর ব্রেন—কাটলেট সাজানো, লোকটি দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে, ডলির চোখ বার—বার ছুটে যাচ্ছে তার দিকে; ‘লোকটি হ্যান্ডসাম, তা—ই না? মুখটা ভারি ইন্টারেস্টিং, তা—ই না—’ ‘দেখে মনে হয় অ্যালকোহলিক, কী বলো?’—আমার কানে—কানে এমনি সব মন্তব্য করছে ডলি, আর মাঝে—মাঝে আমার হাতে চাপ দিচ্ছে, যেন আমাকে তার নিষ্ঠা বিষয়ে আশ্বস্ত করার জন্য, আর আমি ভাবছি কী হলো, কোথায় গেল সেই বুক—মোচড়ানো বিরাট আগ্রহ, যা দু—ঘণ্টা আগে আমার প্রতিটি স্নায়ুকে কাঁপিয়ে তুলছিল, ব্রডওয়ে আর একশো—দশের মোড়ে যখন দাঁড়িয়ে ছিলাম? আর তার ট্যাক্সি যখন থামল—সত্যি ডলি, এই দীর্ঘ অপেক্ষার পর সত্যি তার সুন্দর, সুগন্ধি শরীর—আমার সেই মুহূর্তের আনন্দ এরই মধ্যে উবে গেল কেমন ক’রে? তবে কি এরই জন্য তাকে ছেড়ে গিয়েছিল জিম গর্ডন? তবে কি শুধু তাকেই ভালোবাসা যায়, যে কাছে নেই, বা ধরা দেয়নি? শুধু কি আমাদের বাসনার একটা উপচ্ছায়া ছাড়া ভালোবাসা আর—কিছুই নয়? তবে কি কাছে পাওয়ার চাইতে দূরে থাকাই ভালো? আমরা ভালোবাসতে চাই, সেই চাওয়া থেকেই জন্ম নেয় ক্ষণিকারা, দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায় অন্ধকারে, সময়ের গর্ভে, স্বপ্নের গহনে—তবু নতুন স্বপ্নেরও শেষ নেই। স্মৃতি থেকে স্বপ্ন, স্বপ্ন থেকে স্মৃতি—অফুরান। যেমন ধরো ভিয়েনার সেই ওয়েইট্রেস, পুষ্ট দেহ, টুকটুকে গাল, আমি যার দিকে আড়ে—ঠারে না—তাকিয়ে পারছিলাম না, ইন্ডিয়ান স্টাডিজ—এর প্রফেসরের সঙ্গে ডিনারের নিমন্ত্রণে এসে। এটাকে বলে ‘গ্রিক ইন’, বহুকালের পুরোনো, ঠান্ডা পাথরের দেয়াল বেয়ে আইভি উঠেছে বাইরে, ভিতরে সারি—সারি কতগুলো অসমতল গুহা, কোনোটা দু—ধাপ থেমে, কোনোটা তিন ধাপ উঠে, দেয়ালের ব্র্যাকেটে ছোটো—ছোটো কম—আলোর বাতি—আধো—অন্ধকার, পালিশ—না—করা ওক—কাঠের টেবিলে চাদর নেই, কিন্তু আছে চার ভাষায় ছাপা বড়ো—বড়ো অক্ষরে এক বিজ্ঞপ্তি, সেটা প’ড়ে আমি চঞ্চল হয়ে উঠি। ‘এই ইন—এ আড্ডা দিয়েছেন বেটোফেন, মোৎসার্ট, গ্যেটে, হাইনে; এখানে জন্ম নিয়েছে তাঁদের অনেক রচনার পরিকল্পনা।’ অধ্যাপক ‘গীতগোবিন্দ’ বিষয়ে কী বলছেন আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আমার কৌতূহল অদম্য হয়ে উঠেছে এই ইন বিষয়ে আরো অনেক তথ্য জানার জন্য। কতদিনের পুরোনো? সাত—শো বছর? সাড়ে—ছ’শো? বাড়িটা কী ছিল আগে? মধ্যযুগে সন্ন্যাসীদের? না কোনো ওমরাহের দুর্গ? কী সেই ঘটনা, যার ফলে এটি পরিণত হলো সরাইখানায়? এখানে কোনো স্মৃতিচিহ্ন আছে কি গ্যেটে বা বেটোফেনের? অধ্যাপক ঠিক জানেন না, শুনেছিলেন এককালে, এখন মনে নেই—গত পঁচিশ বছর ধ’রে তিনি সংস্কৃত চর্চায় ডুবে আছেন, অন্য কোনো দিকে মন দেবার সময় পাননি। ‘ওয়েইট্রেসটিকে জিগেস করা যায় না?’ প্রফেসর তাকে জেরা ক’রে—ক’রে ইংরেজিতে বুঝিয়ে দিতে লাগলেন আমাকে, দেখা গেল সেও খুব বেশি খবর রাখে না, কিন্তু তাতে তেমন ক্ষতি নেই আমার—আমি আরো দু—মিনিট ধ’রে দেখতে পেলাম এই মেদল নিটোল অরুণকান্তি পীনস্তনী রূপসীকে, যেন রুবেন্সের ছবি থেকে উঠে—আসা, কোনো পৌরাণিক নায়িকা যেন ধূলির ধরায় নেমে এসেছে আমার গেলাসে মদ ঢেলে দেবার জন্য, এই আশ্চর্য গুহা যেন তারই সঙ্গে মিলনস্থল—কিন্তু এখান থেকে বেরোনোমাত্র আর তাকে দেখতে পাবো না কোনোদিন, কোনো ভোরবেলার ঝাপসা ধূসর স্বপ্নের মধ্যে সে ডুবে যাবে—আমার সিনসিনাটির হাসপাতালের সেই নিগ্রো নার্স দুটির মতো। আমাকে দেখামাত্র, কেন জানি না, উদ্বেল হয়ে উঠল তারা, একজন বালিশে চাপড় দিচ্ছে, চাদর টান করছে আর—একজন (যদিও সবই ঠিক ছিল); ‘শুয়ে পড়ো, শুয়ে পড়ো, ডাক্তার আসবে এক্ষুনি—’ বলতে—বলতে আমাকে প্রায় ঠেলে শুইয়ে দিল (ডাক্তার এলে কেন শুতে হবে, তার কোনো ব্যাখ্যা না—দিয়ে); আমার মুখের উপর নিচু হলো দু—জনে দু—দিক থেকে, বিধল আমাকে দুইজোড়া নিকষ—কালো মখমল—চোখ; একজন বলল, ‘আমার নাম জেনি, ওর নাম ফ্যানি, যে—কোনো কিছু দরকার হলে ডেকো আমাদের, নাম ক’রে ডেকো, যে—কোনো সময়ে, আমরা সারারাত আছি আজ—ঠিক তো? দ্যাটস এ নাইস বয়।’ আমি লাল হলাম, আমার বলতে ইচ্ছে হলো আমি ‘বয়’ও নই, ‘নাইস’ও নই, আমার বয়স বিয়াল্লিশ, আমি আমার দেশের একজন বাঘা সাহিত্য—সমালোচক, হেন লেখক নেই আমার কলমের খোঁচাকে যিনি ভয় না পান—কিন্তু আমি হাঁ করার আগেই ‘তোমার গার্ল—ফ্রেন্ড নেই?’ ব’লে জেনি (বা ফ্যানি) আমার গায়ের উপর এতটা নিচু হলো যে তার বুক দুটি উপচে বেরিয়ে পড়ল আমার চোখের সামনে—মেঘলা রঙের, স্নিগ্ধ, ভরপুর তালফলের মতো, আমি বাধ্য হলাম চোখ নামিয়ে নিতে, তক্ষুনি ডাক্তার ঢুকলেন আর আমার কৃষ্ণসার হরিণীরা চকিত হয়ে সরে গেল। বুকে—পিঠে টোকা, ঠিক আছে সব, কিন্তু এই ওয়ার্ডে আমার নাকি সুবিধে হবে না—কেন হবে না বুঝলাম না, কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যে আমি বদলি হলাম একটি একা ঘরে, সেখানে আরাম অনেক বেশি কিন্তু জেনি নেই, ফ্যানি নেই, তাদের কাছে বিদায় নেবারও সময় হলো না, আমার নানা—রঙিন কল্পনার আকাশে একটি নিকষ কালো আঁচড় কেটে তক্ষুনি তারা অদৃশ্য হলো। আমার চোখের সামনে বরফে—ঢাকা সাদা পৃথিবী, কিন্তু মনের মধ্যে কালো আরো দীপ্ত, কোমল কালো গভীর চোখ, আর কোঁকড়া কালো উত্তাল চুল ঢেউ তুলছে। সে কি ছিল না এক নতুন সৌন্দর্য, যা ঝিলিক দিয়েছিল আমার সামনে—মুহূর্তের জন্য? আমার মনে হলো আসলে ওরা প্রগলভ নয়—ওই জেনি আর ফ্যানি হয়তো আমাকে বিদেশী দেখে করুণা করেছিল, হয়তো তাদের স্নেহবৃত্তি অতৃপ্ত, হয়তো তাদের নিঃসঙ্গতায় যে—কোনো ক্ষণিক সান্ত্বনা তারা খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু কেনই বা অন্য কথা ভাবছি যখন জ্যান্ত ডলি আমার কাছে উপস্থিত, এই লম্বা দিন শেষ হলো অবশেষে, আর ন—দিন আছি এখানে, রাত এখন নিশুতি, অন্ধকারে ডলির চোখ তারার মতো জ্বলছে—ধ’রে নেয়া যাক এই বিশ্বজগতে আর—কিছু নেই, শুধু আছি পরস্পরের আমরা দু—জনে, আমি তার বুকে মাথা রেখে আস্তে—আস্তে ঘুমিয়ে পড়ছি। আ, এই সেই শান্তি, যার মতো ভালো আর—কিছুই নয়, যার জন্য ভুলে থাকা যায় মিকেলাঞ্জেলো, টমাস মান, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, চেষ্টা, দায়িত্ব, মৃত্যুভয়—সব। যেন ঘুমের মধ্যে আর—এক পল্লা ঘুম, এক জীবন—ডোবানো আশ্বাস—কয়েক দিনের, কয়েক ঘণ্টার, কয়েক মুহূর্তের। আমি ঘুমিয়ে পড়ছি ডলির বুকে মাথা রেখে, আমি জেগে উঠছি, নাকি স্বপ্ন দেখছি? ওই পিঁপড়েগুলো করছে কী ওখানে? একটা মরা ফড়িং টেনে নিয়ে চলেছে—আমার শেলফের উপর থেকে, জানলার তাকের উপর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের গর্তে, বাসায় এক বিপুল ভোজ। কী শক্তি, কী দার্ঢ্য, আর গতির কী বেগ। মনে হচ্ছে ফড়িংটির পাখা ক্ষীণভাবে নড়ছে মাঝে—মাঝে—পুরোপুরি ম’রে গেছে কি, নাকি ওরা মুমূর্ষুর শরীরেই আটকে দিয়েছে ওদের আঠার মতো দাড়া, আমি কি ফড়িংটাকে মুক্তি দেবো যন্ত্রণা থেকে? একটা বই তুলে চাপ দিলাম আমি, ফড়িং চেপটে গেল, কিন্তু পিঁপড়ে একটাও মরল না, ঠিক তেমনি আটকে আছে দাড়াগুলো। এক, দুই, চার, বারো—ঠিক চৌদ্দটা, এত ছোটো যে চোখে ঠিক মালুম হয় না (আমাকে তিন বার গুনতে হলো), তাদের তুলনায় ফড়িংটা ততই বড়ো, যত বড়ো আমাদের তুলনায় হাতি। আমার শেলফে কাগজপত্র বইয়ের স্তূপ উঁচু হয়ে আছে, জানলার তাক নিচুতে, তারপর আবার জানলা বেয়ে উঠে নেমে যেতে হবে বাইরের দেয়াল বেয়ে—কী সহজে এই বিপদসংকুল বন্ধুর পথে চড়াই—উৎরাই করছে ওরা, কাঞ্চনজঙ্ঘার চুড়োয় উঠে নেমে যাচ্ছে উপত্যকায়—যে—কোনো বাধা টপকে যাচ্ছে বা এড়িয়ে যাচ্ছে, যুদ্ধের ট্যাঙ্কের মতো, আমাদের হিশেবে ঘণ্টায় একশো মাইল বেগে—ওই অণুপরিমাণ আশ্চর্য জীব। আমি একটা পোস্টকার্ড দিয়ে ওদের বাধা দেবার চেষ্টা করি, কিন্তু বেড়া দিয়ে বন্যা ঠেকাবার চেষ্টা যেমন, এও তেমনি—ওরা পিলপিল করে বেয়ে উঠছে, টপকে যাচ্ছে—ওরা দুর্বার, ওরা অজেয়। একটা—দুটোকে আমি আঙুলে টিপে মেরেও ফেললাম, তক্ষুনি অন্য দু—জন তাদের জায়গা নিলো, বাহিনী ছত্রভঙ্গ হলো না। আমি তাকিয়ে—তাকিয়ে দেখতে লাগলাম এই বিক্রমাদিত্যের বিজয়যাত্রা—মুগ্ধ, কিছুটা ভীত, যেন এই অমানুষিক শ্রম চোখে দেখেও ক্লান্ত হয়েছি আমি, তারপর টের পেলাম বাইরে ট্রামের শব্দ, এই সকালবেলাতেই শুরু হয়ে গেছে কলকাতার জ্যৈষ্ঠমাসের গরম—এক লম্বা গরম ভীষণ দিন আমার সামনে, আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই উঠতে হবে আমাকে, দাড়ি কামাতে হবে, নাইতে হবে, ভাবতে হবে কী দিয়ে ভরানো যায় এই দিন, এতগুলো ঘণ্টা, আবার ঘুমিয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত। আমি তো পিঁপড়ের মতো বলবান নই, আমার আশ্রয় কোথায়?
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *