অনুদ্ধারণীয় – বুদ্ধদেব বসু

অনুদ্ধারণীয়

কখনো ঢালু, কখনো চড়াই, ভুটিয়াদের পায়ে পায়ে তৈরি, আঁকাবাঁকা, বার্চ ওক মেহগনির ফাঁকে—ফাঁকে সান্ধ্য সোনালি জাল ছড়ানো, ঠান্ডা সবুজ গন্ধে—ভরা বনপথ—ওরা নিয়ে এলো তাঁকে একটি বিশৃঙ্খল বাগান পেরিয়ে, বনের মধ্যে অন্তরঙ্গভাবে লুকোনো এক অপেক্ষমাণ ও নির্ধারিত বাংলোয়।

দরজার ধারে চোখোচোখি হলো দু—জনের: এক বৃদ্ধ, গলার চামড়া ঢিলে, মোটা পশমি কোটের তলায় হলদে রঙের মাফলার গোঁজা, আর একটি প্রায়—চল্লিশ যুবক, ছিপছিপে টান শরীর, পাতলা ঠোঁট, চোখে চশমা, কোমর ছাড়িয়ে নামানো একটি পুরো—হাতার সোয়েটার গায়ে।

ভিতরে একটি লম্বা, সরু চতুষ্কোণ ঘর, কাঠের মেঝে আবরণহীন, জানলার বাইরে সূর্যাস্তের আভা, লম্বা, সরু চতুষ্কোণ একটি টেবিলের তলায় লোহার উনুনে কাঠকয়লার আগুন, আর উপরে চায়ের সরঞ্জাম, দার্জিলিঙের বিখ্যাত বিয়াঙ্কার নাম—ছাপানো দুটো কাগজের বাক্স, একটি লম্বা কাচের গ্লাস, একটি কাচের জগে পানীয় জল, এক বোতল ব্যালেনটাইন হুইস্কি।

বৃদ্ধটি প্রথম কথা বললেন, ‘অমিত, তুমি?’

‘অনেকদিন পর দেখা হলো। আমি কথা বলতে চাই, আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই,’ অস্থিরভাবে, দ্রুত উচ্চারণে বলতে লাগল যুবকটি। ‘কিন্তু আপনি বোধহয় অতটা পথ হেঁটে এসে ক্লান্ত হয়েছেন? বসুন। এই এখানটায়—আগুনের কাছে, ওটা আপনারই জন্য। মাফলারটা খুলে রাখবেন নাকি? দেখতে পাচ্ছেন, গাছের ফাঁকে—ফাঁকে আকাশ কেমন গোলাপি—লাল? সন্ধ্যা: আপনার প্রিয় সময়। হেমন্ত: আপনার প্রিয় ঋতু। দার্জিলিং আর ঘুমের মধ্যে, এখান থেকে দূরে নয়, অসাধারণ সুন্দর দু—একটা দৃশ্য আছে।’ হঠাৎ থেমে গেল যুবকটি, একটু যেন লজ্জা পেয়ে। বৃদ্ধের দিকে আর—একবার তাকিয়ে বলল, ‘ওই হ্যারিস—টুইডটা আপনাকে নিউ ইয়র্কে পরতে দেখেছিলাম না? ওই হলদে মাফলারটাই কি মেট্রপলিটান অপেরায় হারিয়ে গিয়েছিল একবার?’

বৃদ্ধটি হেসে বললেন, ‘জামাকাপড় বিষয়ে তোমার স্মরণশক্তি তো অসাধারণ।’

‘আপনার বিষয়ে আমার স্মরণশক্তি বরাবরই অসাধারণ। আমি যখন স্কুলে পড়ি আপনার লেখা থেকে মুখস্থ ব’লে যেতে পারতাম—শুধু কবিতা নয়, পাতার পর পাতা গদ্য। আপনার প্রথম তিনখানা বইয়ের অনেক কবিতা এখনো আমি আউড়ে যেতে পারি। কিন্তু ইদানীং আপনার লেখা আর পড়ি না। গত দশ বছরে যা—কিছু বেরিয়েছে আপনার, তার কিছুই আমি পড়িনি। ইচ্ছে ক’রেই পড়িনি। কখনো পড়বোও না।’

‘অতবার বলছো কেন? আমার তো আর এ—বয়সে স্বীকৃতি শোনার প্রয়োজন নেই—বিশেষত তোমার মুখ থেকে।’

‘আপনার অহমিকা উপভোগ—বিশেষত, আমার পক্ষে। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, এর পরে আমি যা বলবো তাও আপনার আত্মশ্লাঘাকে খাদ্য জোগাবে। অন্তত আপনি তা—ই অর্থ ক’রে নেবেন কথাগুলোর যেহেতু আপনি কোনো—কোনো বিষয়ে অন্ধ, কোনো—কোনো বিষয়ে বধির, কোনো—কোনো বিষয়ে ভীত। তা না হলে চলে না আপনার। কিন্তু তবু—আমি না—ব’লে পারছি না। আমি অনেকদিন ধ’রে অপেক্ষা করছি আপনার জন্য। কয়েকটা কথা বলার জন্য। এতদিনে সুযোগ পেলাম।’

বৃদ্ধটি আস্তে—আস্তে বললেন, ‘তাহলে আমার ট্যাক্সির চালক তোমাদেরই লোক ছিল?’

‘সার্থক আপনার বহুবচনের ব্যবহার,’ চশমার পিছনে যুবকের চোখ দুটি হাসল। ‘হ্যাঁ—“আমরা”। আমাদের মধ্যে “আমি” ব’লে কেউ নেই। ঘুমের যে—দোকানে আপনি অর্কিড কিনলেন, তার মালিক—উদ্ভিদবিদ্যায় বিশারদ ও সদালাপী লোকটি—সেও “আমরা”। দার্জিলিঙে আপনার ওয়েভারলি হোটেলের সুদর্শন বাঙালি ম্যানেজারটিও তাই। আপনার ট্যাক্সি হঠাৎ বিগড়ে গেল, সারাতে দেরি হবে; “আমরা” আপনাকে বিশ্রামের জন্য নিয়ে এলাম এখানে। আপনি কি আমাকে দেখে অবাক হয়েছিলেন?’

‘তাহলে তুমিও মানো যে অবস্থাবিশেষে একবচন অনিবার্য?’

‘অন্তত দুর্নিবার, অন্তত দুর্মর। তার উদাহরণ তো আপনি। অবাক হয়েছিলেন?’

‘তুমি আর আমাকে অবাক করতে পারবে না, অমিত। কে না জানে, জগৎকে যারা বদলে দিতে চায়, তাদের পক্ষে সবই সম্ভব।’

‘সবই…?’ হঠাৎ একটা ছায়া পড়ল যুবকটির মুখে, ব্যস্ত হয়ে ব’লে উঠল, ‘কিন্তু আমি আমার প্রাথমিক কর্তব্য ভুলে যাচ্ছিলাম। সামান্য আয়োজন করেছি আপনার জন্য—’ টেবিলে সাজানো জিনিসগুলোর উপর চোখ ফেলল সে। ‘আপনি নিউ ইয়র্কে ব্যালেনটাইন খেতেন না?’

বৃদ্ধটি মৃদুস্বরে বললেন, ‘এ—দেশে ব্যালেনটাইন! মারাত্মক দাম। কী দরকার ছিল? আর এ—মুহূর্তে আমার চায়ের জন্যই তেষ্টা পেয়েছে।’

‘ভাবলাম, আপনাকে অতিথিরূপে পাবার সৌভাগ্য আর যদি আমার না হয়—’ যুবকটি মুখ নিচু ক’রে চা ঢালতে লাগল। ‘আপনার চিনি তো এক চামচে? চা ভালো? একটা স্যান্ডউইচ চেখে দেখবেন না? এটা হ্যাম, এটা চিকেন, এটা ক্যাভিয়ার।’

‘ক্যাভিয়ার! তুমি করেছো কী?’

‘সেবারে আমি যখন মস্কোতে গেলাম, আপনি আমাকে ক্যাভিয়ার আনতে বলেছিলেন: ফেরার সময় তাড়াহুড়োয় আমার মনে ছিল না।’

‘মনে ছিল না, সেইটে মনে রেখেছো। অনিন্দ্য তোমার আতিথেয়তা, অমিত।’

‘আমার আতিথেয়তা এখনো আরম্ভ হয়নি।’ যুবকটি দরজার দিকে তাকালো; একটি নেপালি এসে টেবিলে রাখল ঢাকনা—পরানো কেরোসিন—ল্যাম্প, জানলায় জানলায় পর্দা টেনে দিয়ে বেরিয়ে গেল। দু—জনেই চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিল: নিঃশব্দে কাটল কিছুক্ষণ। বন্ধ ঘরে, লণ্ঠনের আলোয়, ঠান্ডা পার্বত্য রাতের শ্রুতিগম্য স্তব্ধতার মধ্যে, দার্জিলিং—চায়ের সৌরভ নিশ্বাসে টেনে নিতে—নিতে, কথা না—বলেও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল মানুষ দুটি; এক ছিপছিপে টান—চামড়ার জ্বলজ্বলে যুবক, আর মেদ—ঝ’রে—যাওয়া শীর্ণ এক বৃদ্ধ।

খালি পেয়ালাগুলো মেঝেতে নামিয়ে রেখে যুবকটি বলল, ‘এবার আপনার চুল কিছুটা সাদা দেখছি।’

বৃদ্ধ সহাস্যে বললেন, ‘আমি অপেক্ষা করছি সেই দিনের জন্য যেদিন আমার সব চুল সাদা হয়ে যাবে।’

‘তা নাও হতে পারে, তা নাও হতে পারে,’ নিচু গলায় দু—বার বলল যুবকটি।’

<div style=”text-align: justify;”>

শুনুন, আপনাকে একটা কথা বলি। আমার যত শত্রু আছে পৃথিবীতে—পার্লামেন্ট, প্ল্যানিং কমিশন, সুপ্রিম কোর্ট, গণতন্ত্র, ধনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র—সবচেয়ে বড়ো শত্রু হলেন: আপনি!’

‘ষোলো বছর বয়সে আমার কবিতা প’ড়ে তোমার চোখে জল এসেছিল, সেজন্য এখনো আমাকে ক্ষমা করতে পারছো না?’

‘চতুর আপনি—আমার এই লজ্জার কথাটা মনে রেখেছেন। হ্যাঁ—চোখে জল! যখন মেদিনীপুর বন্যায় বিধ্বস্ত, বাঁকুড়া জেলায় মায়েরা তাদের সন্তান বেচে দিচ্ছে, আর যখন কলকাতায় হাজার ফুটপাতে মাছির মতো ম’রে যাচ্ছে মানুষগুলো—খেতে না—পেয়ে, শুধু খেতে না—পেয়ে!—আমার তখন কবিতা প’ড়ে চোখে জল এসেছিল। ছন্দের আনন্দ, ভাষার মাদকতা, প্রেমের বেদনা, বেদনার গৌরব, আর এক ব্যাপ্ত, বিলাসী বিষাদ—ধূসর নয়, বহুবর্ণরঞ্জিত; বন্ধ্য নয়, স্বপ্নগর্ভ; এই সব তীব্র বিষ আমি পান করেছিলাম আপনার বইয়ের পাতা থেকে—শুধু আপনারই নয় অবশ্য, কিন্তু আপনিই প্রথম আমার জীবনে, আমার কাছে প্রথম অপরাধী আপনি। যৌবনের প্রথম দশ বছর—আমার সবচেয়ে সক্ষম, সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বছরগুলি—আমি নষ্ট করেছি স্বপ্নের মধ্যে হারিয়ে গিয়ে, আপনারই পরামর্শে, বিনায়ক দত্ত!’

বৃদ্ধ বললেন, ‘অতটা নাটকীয়তা নিষ্প্রয়োজন, অমিত। আস্তে বলো।’

‘আপনি বাধা দেবেন না, আমাকে বলতে দিন। আমার ওই “অমিত” নামটা—প্রাগৈতিহাসিক “শেষের কবিতা”র অবদান; ওই এক অভিশাপ ছিল আমার জীবনে, যেন জন্ম থেকেই আমাকে কবিতার ল্যাজে বেঁধে দেয়া হলো।’

‘তোমার চিত্রকল্প সুচিন্তিত হলো না। কবিতাকে লাঙ্গুলধারী জীব ব’লে কি কল্পনা করা যায়?’

‘কেন, পেগাসাস! গ্রিকদের পক্ষীরাজ ঘোড়া!’

‘চমৎকার বলেছো!’ হাতে তালি দিয়ে, পিছনে মাথা হেলিয়ে, সশব্দে হেসে উঠলেন বিনায়ক দত্ত। অমিত একটু চুপ ক’রে থেকে বলল, ‘অনেকদিন পর আপনার হাসি শুনলাম।’ আর—একবার তাকালো সে বৃদ্ধের দিকে, লণ্ঠনের আলোয় অনেক সাদা দেখতে পেল তাঁর চুলে—সে প্রথমে যা ভেবেছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। ‘কিন্তু সেই বাঁধন আমি ছিঁড়ে দিয়েছি,’ আবার দ্রুতবেগে সে বলতে লাগল—‘পেগাসাস, সরস্বতী, সাফো, লি—পো, বাল্মীকি; এঁরা সবাই আজ মৃত আমার কাছে—মৃত, পাতালবাসী, অস্তিত্বহীন। বলা বাহুল্য, আপনিও তা—ই। মানুষের কান্না আমার কানে পৌঁছেছে, কোনো কবিতা আর আমাকে কাঁদাতে পারবে না। আপনি কি জানেন সে—কান্না কী? “বৃথা এ—ক্রন্দন, বৃথা এ—অনলভরা দুরন্ত বাসনা।”—তা নয়, তা নয়! ক্ষুধিতের চিৎকার, উৎপীড়িতের আর্তনাদ, বঞ্চিতের বিক্ষোভ, বিদ্রোহের গর্জন। আপনি কি তা শুনেছেন কখনো, বিনায়ক দত্ত? অপদার্থ, অক্ষম, আত্মমগ্ন সব ভাবুকের মন আপনি অফুরন্তভাবে বিশ্লেষণ করেছেন আপনার উপন্যাসে, আয়নার সামনে ব’সে তৃপ্তিহীনভাবে নিজেরই প্রতিকৃতি এঁকেছেন—কিন্তু সত্যিকার মানুষকে কখনো দেখতে পাননি। অথচ আপনি কিনা এতই সংবেদনশীল যে ছাপার অক্ষরের দশ পাতা জুড়ে বর্ণনা করতে পারেন ঘুম থেকে তন্দ্রা পেরিয়ে পুরো জেগে ওঠার তিন মিনিট সময়! আপনার কি মনে হয় আপনি ক্ষমার যোগ্য?’

বৃদ্ধটি মৃদুস্বরে বললেন, ‘অত ক্রোধ কেন, অমিত? তুমি তো তোমার ইউনাইটেড নেশনসের চাকরি ছেড়ে দিয়েছ—আর তো তোমার বিবেকপীড়া নেই।’

‘না, নেই! সেইজন্যেই আজ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছি আপনার সামনে; সেইজন্যই আজ সন্ধ্যায়, ঘুম আর দার্জিলিঙের মধ্যপথে এই নির্জনতায়, আপনার সঙ্গে আমার এই রঁদেভূ। আমার চাকরি—শুধু দেশে—দেশে ফোঁপরদালালি ক’রে বেড়াবার জন্য ট্যাক্সো—ছুট পাঁচ হাজার ডলার মাইনে; আমার কার্ডিয়াক আর মার্সিডিজ বেঞ্জ; হেস্টিংসে গঙ্গার ধারে আমার বাগান—ঘেরা বাড়ি; প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, তারপর অর্থ ও প্রতিপত্তি অর্জনে আমার লজ্জাকর কৃতিত্ব; এমনকি আমার স্ত্রী, আমার দশ বছরের মেয়ে, আমার বৃদ্ধ বিপত্নীক বাবা—সব আমি ত্যাগ করেছি। রেখেছি শুধু মনের মধ্যে এক অনির্বাণ স্ফুলিঙ্গ, যা একদিন সারা পৃথিবীতে আগুন ধরিয়ে দেবে। হ্যাঁ, সারা পৃথিবীতে—কিন্তু প্রথমে এখানেই, এই দীনতম, বুভুক্ষুতম ভারতবর্ষে। আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না; আমি আপনাকে বিপ্লবের তুবড়ি ছোটাতে বলছি না, উপকারী গণ—সংযোগের জন্য তিব্বত সীমান্তে রাস্তা খুঁড়তেও পাঠাতে চাচ্ছি না। আপনি আমার পক্ষে আপোশের অতীত, আমার বিপরীত ব’লেই শ্রদ্ধেয়। আমি চরমপন্থী—আপনারই মতো; আমি ঐকান্তিক—আপনারই মতো অন্তত তা—ই হতে চাচ্ছি। যে—ভাবে দুর্গ রক্ষা করেছেন আপনি জীবন ভ’রে বৈরীবেষ্টিত হয়ে, ঠিক সেইভাবে—আমি আজ প্রস্তুত। কিন্তু—আমার দুর্গের আয়তন আপনার কল্পনাতীত, আমার শত্রুর সংখ্যা আপনার কল্পনাতীত, আমার অস্ত্রাগার আপনার কল্পনাতীত। আপনার সঙ্গে আমার ব্যবধান মেরুপ্রতিম।’

বৃদ্ধটি মৃদুভাবে নড়ে উঠলেন একবার, একবার যুবকটির দিকে সূক্ষ্ম চোখে তাকালেন, যেন সে যা বলতে চাচ্ছে তা সঠিকভাবে বুঝে নেবার জন্য—তারপর, যেন কিছু—একটা করার জন্যই পিঠ বেঁকিয়ে টেবিলের উপর দিয়ে হাত বাড়ালেন। অমিত তা লক্ষ ক’রে তক্ষুনি হুইস্কি ঢেলে তাঁর সামনে রাখল। ‘জল নেবেন তো? এই ঠিক?’ নিচু হয়ে উনুনটার গায়ে হাত রাখল একবার। ‘আপনার শীত করছে না তো?’

‘সব ঠিক আছে। চমৎকার। বলো। তোমার কথা শুনতে আমার ভালো লাগছে।’

‘ভালো লাগছে?’ যুবকটির ঠোঁটে বিদ্রূপ ঝলক দিল। ‘আপনি বোধহয় এতেও কবিতা দেখতে পাচ্ছেন? মানুষের মুক্তি—ক্ষুধা আর দাসত্ব থেকে মুক্তি—এও বোধহয় একটা কবিতা আপনার কাছে?’

‘আমি কথাটা বলিনি; তুমিই বললে।’

হঠাৎ একটু লাল হলো যুবকটি; কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে কাটল। ‘দেখছি আপনি না—বোঝার ভান করছেন,’ নিচু গলায় আরম্ভ করল অমিত, ‘আমাকে সব কথাই খুলে বলতে হবে। তাহলে শুনুন: আমি ধ্বংস চাই। ধ্বংসের পথে মুক্তি: এই আমার স্লোগান। ম্যানহাটন স্কাইলাইনের ধ্বংস, ক্রেমলিনের নিপাত, লন্ডন পার্লামেন্টের পতন, পৃথিবীর সব স্বর্গপুরীর উচ্ছেদ, বৈজয়ন্তধামের অবলোপ। যেখানেই ক্ষমতা জমে উঠেছে, সেখানেই বোমা, আগুন, ডিনামাইট। সব সংঘ, সমিতি, রাজনীতি, জনহিতৈষণা—সব প্রতিষ্ঠানের ধ্বংস। রাষ্ট্রের ধ্বংস। সমাজের ধ্বংস। দাস আর অত্যাচারী, বধ্য আর ঘাতক—কতবার এরা স্থানবিনিময় করল ইতিহাসে—শুধু স্থানবিনিময়!—আমি সেই সম্পর্কটারই বিলুপ্তি চাই। চাই সেই নতুন পৃথিবী, যেখানে কেউ থাকবে না নেতা বা জনগণ, কমিসার বা কমরেড, ভোটপ্রার্থী বা ভোটদাতা, শাসক বা শাসিত—থাকবে শুধু মানুষ, নির্মল, সুখী, স্বাধীন ও বিকশিত মানুষ।—আপনার ঠোঁটে কৌতুক দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু আমার পরের কথাটাই প্রমাণ করবে যে এটা আমার অবাস্তব কল্পনা নয়, আমার কর্মসূচিও প্রস্তুত। অন্য সব—কিছুর আগে প্রাথমিক পদক্ষেপস্বরূপ—আমি চাই—’ মুহূর্তকাল থামল যুবকটি, মুখ থেকে ছুঁড়ে বের ক’রে দিল কথাটা: ‘—কবিতার ধ্বংস। কবিতা—যা মানুষকে বুদ্ধিভ্রষ্ট করে, সম্মোহন আনে হৃদয়ে, উপহার দেয় অলীক এক আনন্দ, জগতের সঙ্গে এক ভ্রান্ত ঐক্যবোধ; যা কখনো—কখনো এমনও ভান করে যেন সব অন্যায়ের তা ক্ষতিপূরণ—সেই সর্বনাশী কবিতার আমি প্রথমেই ধ্বংস চাই। আমি দেখতে পাচ্ছি আপনার ঠোঁটে একটি কথা উঠে আসছে, আমি জানি সেই কথাটা কী—আর দুঃখের বিষয়, মানিও; কবিতার ধ্বংস অসম্ভব। হ্যাঁ, আমি জানি।’ অমিতের কণ্ঠস্বর ক্রমশ উঁচু পর্দায় উঠতে লাগল, ‘যখন নবাগত দুর্ধর্ষ শ্বেতাঙ্গরা অনার্যরক্তে গাঙ্গেয়ভূমি প্লাবিত ক’রে দিচ্ছে তখনই হয়তো রচিত হচ্ছিল ঋগ্বেদ; যখন ওভিড তাঁর মনোমুগ্ধকর পুরাণকাহিনী লিখছেন, রোমে তখন ক্রীতদাসেরা নিক্ষিপ্ত হচ্ছে সিংহের মুখে; ফ্লোরেন্সে যখন যীশুর নাম ক’রে ঝাঁকে—ঝাঁকে জ্যান্ত মানুষ পোড়ানো হচ্ছে, ঠিক তখনই লিওনার্দো তাঁর মোনা লিসার ধ্যানরূপে তন্ময়; ইংল্যান্ডে যখন কয়লা খনির গুহার মধ্যে জন্তুর মতো হামাগুড়ি দিয়ে পিঠের উপর বোঝা টেনে নিয়ে যাচ্ছে আটমাস—অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীলোকেরা, তখনই উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর পুষ্পপক্ষীদের বন্দনায় মুখর হয়ে উঠেছিলেন। আর রিলকে—আপনার প্রিয় কবি—প্রথম যুদ্ধের পরে জর্মানি যখন বিধ্বস্ত, এক টুকরো চকোলেটের দামে বিকিয়ে যাচ্ছে যুবতী মেয়ে, রিলকে তখন সচ্ছল সুইজারল্যান্ডের পল্লীধামে ব’সে কান পেতে আছেন দেবদূতের পাখার শব্দ শোনার জন্য। …কিন্তু অত দূরে যাবারই বা দরকার কী, আমাদের রবীন্দ্রনাথকেই ধরা যাক। আপনি কি কখনো ভেবেছেন যে আমরা যখন ইংরেজ শাসনের কলঙ্কদুঃখে ডুবে গিয়েছি, সেই মুহূর্তেই ধ্বনিত হলো “সন্ধ্যাসংগীত”—“বিদ্রোহী এ—হৃদয় আমার জগৎ করিছে ছারখার।” এমন কথা আবহমান বাংলা সাহিত্যে আর কবে শোনা গিয়েছিল! অসংখ্য মানুষের সংসারযাত্রা, অসংখ্য মানুষের সুখ—দুঃখ: তা যেন শুধু একটিমাত্র হৃদয়ের ইচ্ছার অধীন। কী দুঃসাহস! কী দম্ভ! কী—নির্লজ্জ স্পর্ধা!’

‘তোমারও তা—ই,’ খুব মৃতস্বরে, প্রায় মনে—মনে বললেন বিনায়ক; অমিতের তা কর্ণগোচর হলো না। ‘আমি যদি রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টান হতাম,’ নিশ্বাস ফেলে সে তক্ষুনি আবার বলতে লাগল, ‘তাহলে আমি বলতাম যে কবিতাই মানুষের সেই সহজাত, দুর্জয় আদিপাপ, ভগবানের করুণা ভিন্ন যা থেকে নিস্তার নেই। কিন্তু যেহেতু আমার ধর্মে ভগবানকে সসংকোচে দাঁড়াবার মতো ইঞ্চিখানেক জায়গা ও আমি দিতে পারি না, যেহেতু আমার অবলম্বন শুধু পুরুষকার, তাই এই পাপক্ষালনের দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে। আমি ভেবে দেখেছি কবিতার অবলোপ যদি অসম্ভব হয়, তাহলেও আমার হতাশ হবার কারণ নেই; আমি অন্তত প্রতীকীভাবে তাকে হত্যা করতে পারি। আর তাই—’ যুবকটির গলা নিচু হতে—হতে প্রায় বাতাসে মিলিয়ে গেল—‘তাই আপনার জন্য আমার এই ব্যাকুল প্রতীক্ষা।’

যুবকটি থামল; তার ঠোঁটের কোণে এক বিন্দু ফেনা বৃদ্ধটি লক্ষ করলেন। এতক্ষণ, মাঝে—মাঝে হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে, নিঃশব্দে ব’সে ছিলেন তিনি; এবারে একটি নিচু, নরম হাসি বেরোল তাঁর গলা দিয়ে।

‘তুমি ভুল করছো। আমার কবিতা অত ভালো নয়। আমি প্রতীক হতে পারি না।’

‘কিন্তু আপনি হলেন—যাকে বলে টিপিক্যাল, আদিপাপের সব লক্ষণ আছে আপনার মধ্যে। বহুকাল ধ’রে চর্চার ফলে এখন এমনকি আপনার মুখের রেখাতেও তা পরিস্ফুট। আপনার হিতৈষীরা মাঝে—মাঝে চেষ্টা করেছে আপনার সংশোধন ঘটাতে; কিন্তু আপনি থেকে গেছেন অনুতাপরহিত, অনুদ্ধারণীয়। যত আক্রমণের ঝড় উঠেছে আপনার বিরুদ্ধে, আপনি প্রতিবার তার উত্তর দিয়েছেন আরো একটি বই লিখে, যাতে কেউ—কেউ বলে, আপনি আরো আশাহীনভাবে নিজেকে আরো গভীরভাবে অভিযুক্ত করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি ভুলে যাননি আপনার কিঞ্চিৎ সুবুদ্ধি জাগাবার আশায় কত লোক কতই না পরিশ্রম করেছে? রবীন্দ্রনাথের শতবার্ষিকীর বছর কেমন রটে গেল যে দ্য গোল সরকার আপনাকে ভাড়া ক’রে প্যারিসে নিয়ে গিয়েছিল—আর—কোনো কারণে নয়, ভারতের “জাতীয় কবি”র অপবাদ রটাবার জন্য! আর তারপর এই সেদিন “ওসিয়া” নিয়ে হৈ—চৈ—আপনি শুনছেন?’

বৃদ্ধটির থুতনি তাঁর বুকের কাছে নেমে এসেছিল, মাথা হেলিয়ে অলসভাবে বললেন, ‘ওই আদ্যক্ষরগুলো আমার বড্ড গুলিয়ে যায় আজকাল কত কিছুর যে ছড়াছড়ি! “ওসিয়া” ব্যাপারটা কী বলো তো?’

‘ব্যাপারটা হলো—’ হালকা হাসি ফুটল যুবকটির মুখে, ‘O.S.E.A.—Operation South—East Asia। একটি আন্তর্জাতিক গুপ্তচরসংঘ। এর উল্টো পক্ষে যে—সংস্থাটি আছে, তার নাম প্যান এশিয়া বা প্যানেসিয়া—সর্বরোগহর দাওয়াই। জগৎ জুড়ে এই খেলা চলছে।’

‘আশ্চর্য! আমি যদি শুধু স্বপ্নবিলাসী কবি হই, অসংশোধনীয়ভাবে বাস্তববিমুখ, তাহলে কী ক’রে কোনো গুপ্তচর—সংঘের কাজে লাগতে পারি?’

‘এতেই বোঝা যায় আপনার দেশের লোককে আপনি কত কম চেনেন! আপনি—অমার্জনীয় রবীন্দ্র—ভক্ত—লবস্টার—শ্যাম্পেন ডিনার খেয়ে রবীন্দ্রনাথকে “অশিক্ষিত” ব’লে ঘোষণা করেছিলেন, এও যদি কেউ বিশ্বাস করে—’ হঠাৎ হো—হো শব্দে হেসে উঠল অমিত, পরমুহূর্তে হাসি থেমে গেল, রেখা পড়ল কপালে। ‘কিন্তু আপনি কি এখনো বোঝেননি বাঙালিরা কত সহজে যে—কোনো কথা চেটে—পুটে খেয়ে নেয়—যদি তাতে মেশানো থাকে ঈর্ষার ব্রণক্ষরণ, কুৎসার দুর্গন্ধ। আমি জানি, আপনার সর্বনের সেই বক্তৃতায় সশরীরে উপস্থিত ছিল “ট্রুথ” পত্রিকার বাণেশ্বর পাল, আর “সত্যযুগ”—এর তামস তলাপাত্র; কিন্তু কলকাতায় যখন পঞ্চাশটা কাগজ জোট বেঁধে আপনার গলা কাটছে, তখন ওই দুই ব্যক্তি স্মৃতিশক্তি ও বাকশক্তি হারিয়ে জড়পদার্থে পরিণত হয়েছিল। উদ্দেশ্য সাধু তাদের; স্বদেশবাসীকে পুঁজভক্ষণের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে চায়নি। এও আমি জানি যে “ওসিয়া” অভিযানের প্রচ্ছন্ন নায়ক ছিল অমরেশ বাগচী, যার প্রথম কয়েকটি কবিতাকে আপনি পঁচিশ বছর আগে আকাশে তুলেছিলেন। সেও ছিল জনকল্যাণের মহৎ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। আর যারা রাত—বিরেতে বেনামি টেলিফোনে কুৎসিত কথা ছিটিয়ে দিত আপনার আর সুপ্রিয়া দেবীর কর্ণকুহরে, তারাও অনেকে অনেকবার আপনাদের বাড়িতে আপ্যায়িত হয়ে গেছে।—কিন্তু আমি এদের ক্ষমা করতে পারি, জানেন; আমি সকলকে ক্ষমা করতে পারি—আপনাকে ছাড়া। যে—দেশে অধিকাংশ মানুষ স্বল্পাধিক অনাহারক্লিষ্ট, যে—দেশে অবস্থাপন্ন লোকেরাও অসাম্য ও আমলাতন্ত্রের চাপে বিকৃত হয়ে যায়, সে—দেশে কোনো কৃতী ও উন্নতশির পুরুষের বিরুদ্ধে ঈর্ষা বিদ্বেষ আক্রোশ তো অনিবার্য।—কিন্তু আপনি, আপনার কি কখনো ইচ্ছে করে না ঊর্ধ্বে উঠে যেতে; ইতরের ঈর্ষা, মূর্খের আক্রমণ, মলময় কণ্ঠনালী থেকে উদগিরিত পুরীষনিস্রাব—আপনার কি ইচ্ছে করে না বেগে ঘুরে দাঁড়ালো অমিত, এ—সবের ঊর্ধ্বে উঠে যেতে, বাইরে চ’লে যেতে? আপনি কি কখনো একুশ শতকের কথা ভাবেন না? প্রার্থনা করেন না সেই মঙ্গলময় দিনটিকে, যেদিন আপনার দত্ত উপহার আর তার গ্রহীতাদের মধ্যে ব্যবধান হয়ে আর দাঁড়িয়ে থাকবে না আপনার সজীব, শারীরিক উপস্থিতি, অনেকের পক্ষে বিরক্তিকর বৈশিষ্ট্যে গড়া আপনার ব্যক্তিত্ব?—ওঃ, আমার গরম লাগছে!’ মাথার ওপর দিয়ে টেনে এক ঝটকায় সোয়েটারটা খুলে ফেলল। বৃদ্ধটির চোখে পড়ল তার হিপ পকেট থেকে বেরিয়ে—থাকা একটা কালো, ইস্পাতে তৈরি আকৃতি। চেয়ারের হাতল থেকে হলদে মাফলারটি তুলে নিয়ে গলায় জড়ালেন তিনি, আস্তে—আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তোমার স্বগতভাষণ শুনলাম, বারান্তরে সংলাপ হবে। এতক্ষণে গাড়ি সারানো হয়ে গেছে নিশ্চয়ই?’

যুবকটি স্থির হয়ে দাঁড়ালো তাঁর মুখোমুখি শান্ত গলায় বলল, ‘দরজার ও—পিঠে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। বাগানের বাইরে। আপনি বয়স্ক ও মাননীয়; আপনার পক্ষে কায়িক সংগ্রামের চেষ্টা শোভন হবে না।’

বৃদ্ধ ফিসফিস ক’রে বললেন, ‘ওরা মানে—“তোমরা”? কিন্তু আমি তোমাকে “তোমরা” ব’লে ভাবতে পারি না; তুমি আমার কাছে অদ্বিতীয়ভাবে অমিত বিশ্বাস।’

‘সেইজন্যই, সেইজন্যই,’ আপাতত অসংলগ্নভাবে উত্তর দিল যুবকটি। ‘তাই তো আপনাকে আজ প্রয়োজন আমার, অন্য সব—কিছুর উপরে আপনাকেই। আপনি কি এখনো ক্লান্ত হননি—আপনাকে ঘিরে জমে—ওঠা সব অবান্তরতায়, আবর্জনায়, অর্থহীন বিতর্কে; আপনাকে কি পীড়িত করে না পাঠকদের অমনোযোগ, আপনার শূন্যসার সমকালীন খ্যাতি? আপনার নিজের কথা জানি না, অন্য কারো কথা জানি না—কিন্তু, আমি এখন আপনাকে দেখতে চাই বিশুদ্ধ ও নির্দ্বন্দ্ব; আমি চাই আপনাকে সেই ভাবীকালে উত্তীর্ণ ক’রে দিতে, যখন আপনার সৃষ্টি হয়ে থাকবে না আপনারই ক্ষুদ্র অস্তিত্বের দ্বারা সংশয়াচ্ছন্ন ও ধুমল; যখন ধীরে—ধীরে আপনি উদ্ঘাটিত হবেন আপনার সম্পূর্ণ অপরিচিত বহু পাঠকের কাছে; আবিষ্কৃত হবে আপনার সব বক্রোক্তি, কূটোল্লেখ, প্রচ্ছন্ন আত্মজীবনী, প্রচ্ছন্ন আত্মসমালোচনা; যে—রশ্মিজাল আপনি এক—একটি বিশেষণ থেকে বিকীর্ণ করেছিলেন, একই পঙক্তির মধ্যে পুরে দিয়েছিলেন যে—সব উক্তি ও তার প্রতিবাদ। আমি বয়সে আপনার চেয়ে পঁচিশ বছরের ছোটো; তাই আশা করছি আপনার সেই অবিমিশ্র আত্মপ্রকাশের আরম্ভ আমি দেখতে পাবো।’

এক ভারি, বিরাট স্তব্ধতায় ভরা, কানের মধ্যে ঝাঁ—ঝাঁ শব্দের মতো—এমনি কাটল কিছুক্ষণ। বৃদ্ধ দেখলেন তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক আত্মহারা যুবক—উন্মাদ, হয়তো বিপজ্জনক, কিন্তু স্নেহের যোগ্য, করুণার যোগ্য; আর যুবকটি যেন কুয়াশার মধ্য দিয়ে অস্পষ্টভাবে দেখতে পেল তার কুড়ি বছর আগেকার নিজেকে—সেই সব নষ্ট, সুঘ্রাণ, কবিতায়—আক্রান্ত দিন—এক বৃদ্ধের মুখমণ্ডলে, জরাসৃষ্ট রেখায়, কোনো পুরোনো, হলদে—হয়ে—যাওয়া ছবির মতো। বৃদ্ধ একবার ডাকলেন, ‘অমিত।’

যুবকটির কাঁধ নড়ে উঠল—হয়তো বিনয়ের, হয়তো অসহিষ্ণুতার ভঙ্গিতে। নিচু গলায় বলল, ‘কিছু চাই আপনার?’

‘তুমি আমাকে যত বড়ো মূল্য দিলে তা আমার পক্ষে অভাবনীয়। এবার একটা ট্যাক্সি আনিয়ে দাও।’

‘আপনি ফিরে যেতে চান? কিন্তু কোথায় বলুন তো?’ একটি ছোট্ট হাসি অমিতের ঠোঁট বেঁকিয়ে দিল, ঝিলিক দিয়ে উঠল সাদা, ভেজা দাঁতের সারি। একটুক্ষণ পায়চারি করল অমিত—সে পিঠ ফেরানো মাত্র বিনায়ক তার হিপ পকেট থেকে বেরিয়ে—থাকা কালো চোঙাটি আবার দেখতে পেলেন—তারপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, ‘কেন বললেন অভাবনীয়? যা—কিছু আপনি লিখেছেন জীবন ভ’রে, সব কি তাহলে বানানো কথা? সত্যি কি আপনি নিঃসঙ্গ ব’লে গর্বিত নন, বাইরের ওই পাহাড়গুলোর মতোই যে—ভবিষ্যৎ সুদূর ও মস্ত বড়ো উঁচু, আপনি কি তারই গুহার মধ্যে অন্তরীণ নন তাহলে? কেন, এতদিন পরে, এই বৃদ্ধ বয়সে, নিজেকে আপনার কবিতা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চান—শুধু বেঁচে থাকার জন্য, এক ক্ষুদ্র, সাধারণ মানুষের মতো বেঁচে থাকার জন্য? ভেবে দেখুন, যে—দেবীর দর্শন আপনি পেয়েছিলেন তাঁর আঘাতে কত জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে—কত সুন্দর ও মহান সম্ভাবনা বিচূর্ণ—উন্মাদ হোল্ডার্লিন, কোলরিজ আফিঙের নেশায় নিশ্চল, চোরাই কারবারে অবলুপ্ত র‍্যাবো। আর আপনি কী ক’রে আশা করেন সুস্থ দেহে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে, আপনি কি কোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত নন? আপনি ছোটো হয়ে যাবেন না, আমি আপনাকে যেমন দেখতে চাই, তেমনি বড়ো হয়ে উঠুন আপনি—এখনই, এই মুহূর্তে, আমার চোখের সামনে—পেরিয়ে যান সব সমকালীন সাংসারিক সীমা, সব বাঁধন ছিঁড়ে ফেলুন। আপনার কি ভয় করছে? আসুন, আমি আপনাকে সাহায্য করছি—’ অমিত হাত বাড়ালো, যেন বৃদ্ধকে স্পর্শ করার জন্য, পরমুহূর্তে সেই হাতেরই এক ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে ইস্পাতে তৈরি কালো যন্ত্রটি বের ক’রে টেবিলের উপর রাখল।

আবার নামল নীরবতা। মুখোমুখি, লম্বা, সরু, চতুষ্কোণ, অবরুদ্ধ সেই ঘরটায়, লণ্ঠনের দুর্বল আলোতে, এক স্তব্ধ, হিম, পার্বত্য রাতের নির্জনতায়, লম্বা সরু চতুষ্কোণ টেবিলটার দু—দিকে দাঁড়িয়ে পরস্পরকে অবলোকন করল দু—জনে—এক টান—চামড়ার ঋজু ছিপছিপে যুবক, আর এক ম্লানচক্ষু পাংশুকপোল বৃদ্ধ, আর তাদের মধ্যিখানে, দোলনায় ঘুমন্ত শিশুর মতো, শুয়ে রইল শান্ত টেবিলের উপর সেই কালো চোঙাটি, যেন দু—জনের মধ্যে কোনো সম্ভবপর সেতুবন্ধের ইঙ্গিত। বিনায়ক একবার তাকালেন সেদিকে, তাঁর দৃষ্টি যেন প্রতিহত হয়ে ঘরের চারদিকে ঘুরে এসে আবার আটকে গেল অমিতের মুখে। তার কপালে কয়েকটা স্বেদবিন্দু লক্ষ করলেন তিনি; মনে হলো তাঁর জুতো আর মোজা ফুঁড়ে কাঠের মেঝে থেকে ঠান্ডা উঠে আসছে। তাঁর ঠোঁটের পাশে গর্তের মতো একটা ভাঁজ পড়ল।

‘অত ব্যস্ত কেন, অমিত, এমনিও আমার আর বেশিদিন নেই।’

‘কে জানে—কে জানে,’ যেন কষ্টকরভাবে নিশ্বাস নিয়ে যুবকটি বলল, ‘আরো দশ বছর হতে পারে। আরো কুড়ি বছর হতে পারে। আমি আপনাকে অদৃষ্টের হাতে ছেড়ে দিতে পারি না। আমি আপনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

বৃদ্ধের শিথিল কণ্ঠমণি একবার নড়ে উঠল: তিনি ক্ষীণ স্বরে তাঁর শেষ আবেদন জানালেন: ‘আমার আরো কয়েকটা বই লেখার ছিল।’

‘আ!’ একটা চিৎকার, জয়ধ্বনি আর আর্তনাদের মাঝামাঝি একটা শব্দ, যুবকটির গলা ছিঁড়ে বেরোল। ‘আপনি এখনই অতীতবচন ব্যবহার করছেন! আমার দাবি মেনে নিয়েছেন তাহলে। আপনি আমার সঙ্গে একমত। অলিখিত বা অসমাপ্ত কাব্য বিশ্বের বাতাসে অনেক ভেসে বেড়াচ্ছে, আপনি সেজন্য চিন্তিত হবেন না। আর তাছাড়া,’ একটু থামল অমিত, তার কপালে স্বেদরেখা আরো স্পষ্ট হলো—‘আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না, শুধু মনস্থির করতেই অনেকদিন কেটে গেল। ছ—মাস ধ’রে, দীর্ঘ ছ—মাস ধ’রে আমি এই নির্জনে ব’সে শুধু চিন্তা করেছি, পরিকল্পনা করেছি—উন্মুখ, কম্পমান, কিন্তু পুরোনো দু—একটা দুর্বলতায় বাধাগ্রস্ত। এখন আর চিন্তা নয়, কাজ: দ্বিধা নয়, বিস্ফোরণ। কিন্তু তার আগে আমাকে নিজের কাছে প্রমাণ করতে হবে যে আমি এই বিশাল দায়িত্ব কাঁধে নেবার যোগ্য, জগৎকে বদলে দেবার যোগ্য, আর সেই প্রমাণের জন্য আমার পক্ষে সবচেয়ে উপযুক্ত উপাদান—আপনি। আমি এককালে আপনার জীবনে অংশ নিয়েছিলাম; আপনার আর আমার মধ্যে সামান্য স্মৃতি অনেক আছে, আপনি মর্মস্পর্শী লিখন সমেত আমাকে আপনার নতুন বই উপহার দিয়েছেন; আমি বরফের ঝড়ের মধ্যে গাড়ি চালিয়ে রাত তিনটের সময় আইডলওয়াইল্ড এয়ারপোর্টে গিয়েছি আপনার জন্য; আপনার স্ত্রী আমাকে মায়ের মতো ভালোবেসেছেন। আপনার চেয়ে যোগ্য উপাদান কিছু নেই আমার। আপনি উইল করেছেন? সুপ্রিয়া দেবীকে আপনার সব বইয়ের স্বত্ব লিখে দিয়েছেন তো? আপনি আমার প্রথম পরীক্ষাস্থল—আমার পৌরুষের, আমার প্রতিজ্ঞার, আমার অপ্রতিরোধ্য শক্তির। আমার সংযম, আমার নিষ্ঠা, আমার আত্মবিজয়: আপনি তার প্রমাণ দেবেন আমাকে। আপনার বালিগঞ্জের বসার ঘরে অনেক আনন্দিত সন্ধ্যা আমি কাটিয়েছি—আমার চপল, বিলাসী, নিষ্ফল, রোমান্টিক যৌবনে। আমার সেই অতীত—যার মধ্যে পরতে—পরতে জড়িয়ে আছেন আপনি—তার স্মৃতির গতিরোধক সম্মোহন থেকে মুক্ত না—হলে আমার চলবে না। আর দু—মিনিটের মধ্যে, আপনারই সঙ্গে, নিহত হবে আমার রোমান্টিক যৌবন, আর— অন্তত সাংকেতিকভাবে, সেই তীব্র, মদির, হৃদয়নন্দন কবিতা, যা না—জেনে, না—বুঝে অত্যাচারীকে প্রশ্রয় দেয়, দিয়ে এসেছে যুগে—যুগে। আমি কোনো সাহায্যকারী ডেকে আপনাকে অসম্মান করব না; আপনি স্থির হয়ে দাঁড়ান দু—হাতে টেবিলটা চেপে ধরুন। কবে আমার কাছে অনাগত এসে পৌঁছবে, আমি সেজন্য ব’সে থাকতে পারি না; আমি ঝাঁপিয়ে পড়বো তার উপর, সৃষ্টি ক’রে নেবো একই মুহূর্তে, একই আঘাতে—আপনার আর আমার ভবিষ্যৎ। বিনায়ক দত্ত: আপনি আর আমি আজ সহযোগী, সহযাত্রী; আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠভাবে, বিপুলভাবে আমরা হয়ে উঠছি পরস্পরের অংশীদার—হয়ে উঠছি ইতিহাস, ভাবীকাল, অজাত এক নতুন পৃথিবীর প্রথম সোপান; আজ থেকে—উত্তরপুরুষের শিক্ষার জন্য, প্রেরণার জন্য, এক চূড়ান্ত, ভয়াবহ, উল্লসিত উদাহরণস্বরূপ অচ্ছেদ্যভাবে দুটি নাম যুক্ত হয়ে গেল; বিনায়ক দত্ত, আর তাঁর ভক্ত সুহৃদ, তাঁর হত্যাকারী—অমিত বিশ্বাস।’

বৃদ্ধটির চোখের সামনে ভেসে উঠল অমিতের ঘর্মাক্ত, রক্তিম, উজ্জ্বল মুখমণ্ডল, স্ফীত শিরা কপালে, ঠোঁটের কোণে ফেনা, আর তার হাতের মুঠিতে ধরা কালো ইস্পাতের অগ্রভাগ। ফুসফুসে অনেকখানি বাতাস একসঙ্গে টেনে নিলেন তিনি, নিশ্বাস ছাড়ার সঙ্গে—সঙ্গে বললেন, ‘হায় অমিত বিশ্বাস, অনুদ্ধারণীয় রোমান্টিক!’

পিস্তল ছোড়ার শব্দে বাক্যটি বিচূর্ণ হয়ে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *