প্রেমপত্র – বুদ্ধদেব বসু

প্রেমপত্র

ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্য দিয়ে বর্ষাতি গায়ে হাঁটতে—হাঁটতে মাঝে মাঝে একটু থামছিলেন তিনি—ফুসফুস ভ’রে নিশ্বাস নেবার জন্য, কয়েক ঢোক হালকা হাওয়া গিলে নেবার জন্য। ভারি ভালো—এই ঝিরঝির বৃষ্টি, এই টাটকা হাওয়া যেন সদ্য—ঘুম—ভাঙা, এই শান্ত সরু বাঁকা গলিটি, যা—একটু বন্ধুর যদিও, পাথরে বাঁধানো, একটু বেশি পরিচ্ছন্ন আর একটু বেশি জনবিরল—তবু ঝাপসাভাবে স্মরণে আনে বেলতলা রোড। তাহলে… ফিরে যাচ্ছি? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই: আমার চাকরি, আমার পরিবারবর্গ, আমার ‘বাক’ পত্রিকা, আমার ভাষাবিজ্ঞানপরিষৎ—সব কলকাতায়, আমি না—ফিরলে কলকাতার চলবে কেন? কিন্তু তার এখনো তিনদিন দেরি আছে।

…একটা চৌরাস্তা পাওয়া গেল, কাফে, ডাইনে এক ডরিক স্তম্ভযুক্ত অট্টালিকার সামনে সখী পরিবৃতা ডায়ানা, একটা বড়ো রাস্তা স্কুটারের শব্দে স্ফুটমান। এটা রোম, আমি রোমে এসেছি, স্মৃতি আর সৌন্দর্যে ভরা অফুরন্ত নগরে—এইমাত্র পৌঁছলাম, এই প্রথমবার। …এর পর? ডায়ানাকে পাশ কাটিয়ে পরের গলিটা—তা—ই না বলল হোটেলের মেয়েটি? মনে হচ্ছে ওই রাস্তা ঠিক! আবার একটা সরু পাথুরে গলি, দু—দিকে ছোটো—ছোটো দোকান—আসবাব, রুপোর বাসন, জামাকাপড়, বই—কাচের পিছনে চারটে ভাষার নতুনতম বই—ঢুকতে লোভ হয়, কিন্তু এখন থাক: আগে চিঠি। বৃষ্টি থেমে এলো, শেষ কয়েক বিন্দুর উপর ভেসে উঠল রোদ্দুর, উদ্ভাসিত হলো মস্ত বড়ো চৌকো চত্বর—লোকের ভিড়, ট্যাক্সি এসে থামছে, দুটো ঘোড়ায় টানা ফ্যান্টনগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে অতিশৌখিন ব্রাভুদের জন্য—আর চত্বর যেখানে শেষ হলো সেখানেই এক সোপানশ্রেণী; উঁচু, উদার, গরীয়ান, পুঞ্জীভূত নিঃশব্দ অভ্যর্থনার মতো। এ—ই, তাহলে, পিয়াজ্জা দি স্পানিয়া। চেয়ে দেখার জন্য থামলেন না তিনি, দ্রুত এগিয়ে এলেন।

চোখে পড়ল একটা দেয়াল—ফলকে বিনীত বিজ্ঞপ্তি: কীটস—শেলি হাউস। ওই তেতলার ঘর—ওই জানলা, যা দিয়ে মাঝে—মাঝে তাকিয়ে থাকত এক ভিনদেশী যুবক, এক অখ্যাত, মুমূর্ষু কবি—কিছু না—দেখে, কিছু না—বুঝে। আর কয়েক মিনিট পরেই আমি পৌঁছব সেই ঘরে, দেখব সেই জানলা থেকে হিস্পানি সোপান—যে—আমি পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত দিল্লিকে আমার পশ্চিম সীমান্ত বলে ভেবেছিলাম। শেলি—কীটস আমাকে কয়েক মুহূর্ত ক্ষমা করুন: আগে চিঠি।

সামনের ফোয়ারাটার দিকে দৃষ্টিপাত করেও তিনি চোখ ফিরিয়ে নিলেন; দুটো বাড়ি পরেই আমেরিকান এক্সপ্রেস। গ্রীষ্মকাল, মার্কিন ট্যুরিস্টের ভিড়, লম্বা লাইন প্রত্যেক কাউন্টারে। আট—দশজনের পিছনে তিনি দাঁড়িয়েছেন। দেখছেন খোপে—খোপে সাজানো চিঠিগুলো—নানা রঙের খাম, হাওয়াই ডাকের লাল নীল হলদে সবুজ নিশেন—ওড়ানো, ঝলমলে টিকেটে যেন মুকুট—পরানো তার ভিতরে কত ভাষা, কত আশা, কত সুখ, কত সান্ত্বনা। ওই হালকা ছাইরঙের খামটা মনে হচ্ছে… না, ওটা অন্য একজনকে দেয়া হলো। চোখ দিয়ে অনেক খুঁজে—খুঁজেও যেন তাঁর চেনা ছাইরঙা খামটি কোথাও দেখতে পেলেন না। তবে কি একটা এয়ার—লেটার মাত্র, নাকি দুই ছত্রের ছবি—পোস্টকার্ড? নাকি এমনও হতে পারে যে ওই অগুনতি এনভেলাপের মধ্যে একখানাতেও তাঁর নাম লেখা নেই?

হঠাৎ মনে হলো গরম; গা থেকে বর্ষাতি খুলে হাতের ভাঁজে নিলেন। কে সেই দূরের বন্ধু, যার চিঠির জন্য তিনি এত ব্যাকুল? দুঃখের বিষয়, এই প্রশ্নের উত্তর বড়ো গতানুগতিক। এক নারী, যার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল—আকস্মিকভাবে, দুঃসহভাবে—বিশাল আমেরিকার মধ্য—পশ্চিমের কোনো শহরে, যার জন্য অনেকগুলো সপ্তাহ ধরে তাঁর দিন হয়ে উঠেছে ভারাক্রান্ত, আর রাত্রি উত্তাল, আর এখন যার অনুপস্থিতি তাঁর সঙ্গে—সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে—য়োরোপের শহর থেকে শহরে, দেশ থেকে দেশে, অবিরাম। আর অবিরাম সেই নারীর চিঠি, সব দেশে, সব শহরে, ট্রেনে যেতে—যেতে, রেস্তোরাঁয় খেতে—খেতে, কোনো নদীর ধারে বেঞ্চিতে ব’সে, কোনো মিউজিয়ামের সিঁড়িতে ব’সে: ভ্রমণকালে যা—কিছু তিনি দেখেছেন, যত দৃশ্য, যত চিত্র, যত প্রাসাদ, যত পুরোনো পুঁথি—সব—কিছুর ফাঁকে—ফাঁকে ঢেউয়ের মতো উঠছে আর পড়ছে সেই চিঠিগুলো, তাঁর প্রৌঢ় রক্তে গোপন এক চঞ্চলতা, কোনো অসুখের আরম্ভের মতো উত্তেজক ও সুখদায়ক। তিনিও লিখেছেন অবশ্য—সারাদিনের ক্লান্তির পর হোটেলের ঘরে রাত্তির জেগে, কখনো কোনো নতুন শহরে পৌঁছানোমাত্র, কখনো বা পথ চলতে—চলতে মনে—মনে বাক্য রচনা করেছেন যা লিখতে গিয়ে পরে আর মনে পড়েনি। কোনো উল্লেখযোগ্য খবর দেবার নেই, কোনো প্রশ্নের জবাব দেবার নেই, এমন কোনো কথা নেই যা নতুন: তবু—লিখতেই হয়। লিখতে হয় এমন এক ভাষায় যা দু—জনের পক্ষেই বিদেশী, অন্যজন তবু মাঝে—মাঝে তার মাতৃভাষা জর্মান ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু তিনি পাঁচটা য়োরোপীয় ভাষা পড়তে পারলেও লিখতে পারেন শুধু সেই ইংরেজিটা, যা খুব ভালোভাবে জানেন বলে এতকাল তাঁর ধারণা ছিল। কিন্তু মনের এই বিশেষ অবস্থায় বিশেষ এক ব্যক্তিকে চিঠি লিখতে গিয়ে দেখলেন যে তিনি ইংরেজি বলতে যা বোঝেন, তা এক আঁটোসাঁটো কষ্টকর পোশাক মাত্র, যার মধ্যে তাঁর ভাষাতত্ত্ব সংক্রান্ত গবেষণাকে কোনোমতে তিনি ধরাতে পারেন, কিন্তু যা দিয়ে কোনো হৃদয়ের কথা বলা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। কঠিন এই বাধা—কিন্তু তবু তাঁকে লিখতেই হয়। কী তোলপাড় তাঁর বুকের মধ্যে—তার সঙ্গে পাল্লা দেবার মতো শব্দ খুঁজে পান না, নিজের অদৃষ্টকে ধিক্কার দেন সেই অন্যজন বাংলা জানে না বলে, আবার পরমুহূর্তেই কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়েন অদৃষ্টের কাছে, যেহেতু তাঁর জীবনে—ইতিমধ্যেই বার্ধক্যের ছায়া—পড়া তাঁর গতানুগতিক বাঙালি জীবনে এমন একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটতে পারল।

এই রোমে তার শেষ চিঠি আসবে। শেষ, কেননা এখান থেকেই তিনি সোজা যাচ্ছেন কলকাতায়, আর তাঁর পক্ষে কলকাতা মানেই এক নিটোল, সুশৃঙ্খল, সুবিজ্ঞাপিত জীবন—বৃত্ত, যার অন্তর্ভূত হয়ে আছে বাইরে ঘরে আরো অনেকে, আর যার মধ্যে এমন—কিছুরই স্থান নেই, যা তাঁর পক্ষে বিশুদ্ধভাবে ব্যক্তিগত। তিনদিন পরে যেই পূর্বগামী প্লেনে উঠবেন, অমনি হারিয়ে যাবে মহাসমুদ্রের ওপারে, এক দূর—পশ্চিম মহাদেশের কোনো—এক অক্ষাংশরেখায়, তাঁর ঘুম—ভাঙানো দুঃখ—জাগানো বাসনাময়ী। যা ছিল দুই হুলুস্থুলু হৃৎপিণ্ডে জীবন্ত, তা নিষ্প্রাণ মানচিত্রে আঁকা এক বোবা বিন্দুতে পরিণত হবে। সেইজন্য আজকের চিঠিটা খুব জরুরি।

কাউন্টারের ওদিক থেকে আওয়াজ এলো: ‘ইয়েস, স্যর?’

‘রে, বিরূপাক্ষ,’ বলে তিনি পাসপোর্ট খুলে ধরলেন; সুশ্রী ছোকরা কেরানিটি, যন্ত্রের মতো নিপুণ, মুহূর্তকাল পরেই তাঁর প্রত্যাশা পূরণ করল। খামটা চোখে দেখা মাত্র এক অদ্ভুত অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল তাঁর মনে, যেন সব দূরত্ব লুপ্ত হয়ে গেছে মুহূর্তের জন্য, জীবনে যেন বিচ্ছেদ বলে কিছু নেই। আর আমি কিনা ভাবছিলাম চিঠি বুঝি এলো না—এত ভাগ্যবান হয়েও এত অবিশ্বাসী আমি!

বিরূপাক্ষ সরে গেলেন, দাঁড়ালেন দেয়াল ঘেঁষে এক নির্জন কোণে। সাবধানে খামের প্রান্তে নখ চালিয়ে চালিয়ে চিঠি খুললেন। একখানা বড়ো মাপের কাগজ, শক্ত কড়কড়ে সাদা—কিন্তু বড্ড বেশি সাদা, অবিশ্বাস্যভাবে ধবল। কিছু লেখা নেই, একটি কালির ফোঁটা, কলমের আঁচড় নেই কোথাও—এপিঠ—ওপিঠ, উপর থেকে নিচে, এধার থেকে ওধার পর্যন্ত সাদা, নির্বাক, নিষ্কলঙ্ক। কিন্তু উপর, নিচ, ডান, বাঁ—এই কথাগুলোরই বা অর্থ কী, যেহেতু কিছু লেখা নেই এটুকুও বোঝা যাচ্ছে না কাগজটা কোনদিকে ধরতে হবে। অথচ লেফাফার উপর হাতের লেখা নির্ভুল, আব্রাহাম লিঙ্কনের ছবির উপর ডাকঘরের মার্কা নির্ভুল, আর লেফাফাটা—ফিকে ছাইরঙের, সারা গায়ে এরোপ্লেনের জলছাপ আঁকা, ফ্রান্সে প্রস্তুত, তাও নির্ভুলভাবে এবার। …তাহলে? রাস্তায় বেরিয়ে রুমালে কপাল মুছলেন বিরূপাক্ষ, হঠাৎ বড়ো ভারি হয়ে ওঠা বর্ষাতিটা কাঁধে ফেলে ফুটপাতে দাঁড়ালেন। ওই যে একটা কাগজের স্টল—অনেকদিন জগতের কোনো খবর রাখি না, কেমন চলছে দেখা যাক। দ্রুত—ধাবমান মোটরগাড়ির জন্য বিপজ্জনক রাস্তা সাবধানে পেরিয়ে এসে তিনি কিনলেন একখানা প্যারিসে ছাপা ‘নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউন’, একখানা ‘ল মদ’, আগের দিনের একখানা ‘ফ্রাঙ্কফুর্টার সাইটুং’ আর শেষ মুহূর্তে রোমের দ্রষ্টব্য বিষয়ে একটি ছোটো পুঁথি—কিনেই অনুশোচনা হলো নিজের উপর আবার এই কাগজগুলোর বোঝা চাপালেন বলে, সত্যি কি আমি এখন জগতের জন্য উৎসুক? আরো একবার রাস্তা পেরিয়ে, হিস্পানি সিঁড়ি ছাড়িয়ে যেতে—যেতে হঠাৎ একটা সাইনবোর্ডের সামনে থমকে দাঁড়ালেন: ‘ব্যাবিংটন টি—হাউস’। অপ্রত্যাশিত ইংরেজি ভাষায় ওই লেখাটুকু দেখামাত্র তাঁর বাঙালি কণ্ঠে চায়ের তৃষ্ণা জেগে উঠল—মনে পড়ল তিন সপ্তাহ আগে এডিনবরায় শেষ সত্যিকার চায়ের স্বাদ পেয়েছিলেন—য়োরোপীয় মহাদেশের অনেককিছু ভালো হলেও কেউ সেখানে চা বোঝে না, এবার এই ইংরেজ নামাঙ্কিত চা—ঘরে হয়তো সত্যিকার ট্যানিন রসে গলা ভেজানো যাবে। দোকানটিতে ঢোকামাত্র তাঁর ভালো লাগল—শান্ত, চুপচাপ, আধো—অন্ধকার, দু—কোণে দু—জন মাত্র খদ্দের খুব ঝাপসা ও নিঃশব্দ হয়ে ব’সে আছে—ওই জানলার ধারে টেবিলটি, চায়ের সঙ্গে জগতের খবর চেখে—চেখে বিভ্রান্ত আধ ঘণ্টা সময়—সম্ভাবনাটা রমণীয় বলে মনে হলো তাঁর। এলিয়ে বসলেন গদি—আঁটা বেঞ্চিতে, একটার পর একটা কাগজ খুলে প্রধান হেডলাইনগুলোতে চোখ বুলিয়ে গেলেন, কিন্তু মনে হলো জগতে কিছুই ঘটছে না, অন্তত নতুন কিছুই ঘটছে না—কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগ, কোনো নির্বাচনের ডামাডোল, দেশে—দেশে মনোমালিন্য, খণ্ড যুদ্ধ, কপট মৈত্রী—কতকাল, কতকাল ধ’রে এই সবই দেখে আসছেন কাগজে, ভিন্ন—ভিন্ন নামে, ভিন্ন—ভিন্ন তারিখে, ঘুরে—ফিরে একই খবর। নিশ্বাস ছাড়লেন বিরূপাক্ষ, ক্লান্ত হাতে কাগজগুলোকে সরিয়ে দিলেন। একটি বেঁটে গোলাপি—গালের ইতালিয়ান মেয়ে রুপোর পটে চা নিয়ে এলো, তার ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা পোশাকের দিকে তাকিয়ে বিরূপাক্ষর বুকের স্পন্দন একটু দ্রুত হলো।

…সত্যি কি তা—ই? একেবারে নিষ্কলঙ্ক ধবল? আমি ভুল দেখিনি তো? সন্তর্পণে, চারদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে, পকেট থেকে ছাই—রঙা লেফাফাটি বের করলেন—এবারেও ভিতর থেকে একখানা অচিহ্নিত কাগজ শুধু বেরোল। কাগজটি তুলে একবার নাকের কাছে ধরলেন বিরূপাক্ষ, মনে হলো ক্ষীণ একটি সুবাস পাওয়া যাচ্ছে—তাঁর চেনা—এষার ব্যবহৃত সুগন্ধের মতো যেন। কী, কী হতে পারে? কী হতে পারে? এপিঠ—ওপিঠ দু—পৃষ্ঠা জোড়া চিঠি লিখে, তারপর সে কি মনের ভুলে একখানা সাদা কাগজ ঢুকিয়ে দিয়েছিল খামের মধ্যে? না, সম্ভব নয়, এক—লক্ষে—এক পরিমাণও সম্ভব নয় এ—রকম ভুল—বিশেষত এষার মতো মানুষের পক্ষে, অতি তীব্র আবেগের চাপেও যার আত্মস্থতা নষ্ট হতে আমি কখনো দেখিনি। কিন্তু যদি সেই লাখে এক—ই আমার ভাগ্যে ঘটে গিয়ে থাকে? যা সাধারণত হয় না, তা কখনোই হবে না, এমন কথা কে বলতে পারে? কিন্তু ভুল যদি হয়ে থাকে, নিশ্চয়ই সেটা ধরা পড়েছে তক্ষুনি, আর সঙ্গে—সঙ্গে আসল চিঠিখানা ডাকে ফেলা হয়েছে? …কিন্তু—তাহলে—অন্যটি পৌঁছল না কেন?

এক ধরনের ভদ্রতাবোধবশত আধ পেয়ালা চা খেলেন বিরূপাক্ষ, টেবিলে মোটা বখশিশ রাখলেন গোলাপি—গালের বেঁটে মেয়েটির জন্য, কাগজগুলোকে সেখানেই ফেলে দু—মিনিটের মধ্যে ফিরে এলেন আমেরিকান এক্সপ্রেসে।

‘দয়া ক’রে একটু দেখবেন আমার আর—কোনো চিঠি আছে কিনা।’

কেরানিটি ধৈর্যশীলভাবে নির্দিষ্ট খোপে খুঁজে এসে বলল, ‘সরি, স্যর।’

যুবকটির হলদে নেকটাইয়ের দিকে তাকিয়ে বিরূপাক্ষ ঢোক গিললেন।

‘বিকেলের দিকে আর—একবার ডাক আসবে কি?’

‘বিকেলের ডাকে বিদেশী চিঠি আসে না। তাছাড়া আমরা খোলা থাকি তিনটে পর্যন্ত। আপনি কাল সকালে আবার খোঁজ নেবেন।’

বিরূপাক্ষ এই প্রথম উপলব্ধি করলেন যে মানুষের জীবনে অন্য সব—কিছুর মতো, চিঠিও নিয়তিনির্ভর। কত সহজে আমরা ধ’রে নিই যে কোনো চিঠি লেখা হলেই ডাকে ফেলা হবে, ডাকে ফেলা হলেই যথাসময়ে যথাস্থানে পৌঁছবে। অধিকাংশ চিঠি অধিকাংশ সময় গন্তব্য খুঁজে পায় তা সত্য, কিন্তু দিকভ্রষ্ট চিঠির কথাও কি শোনা যায় না মাঝে—মাঝে? আর পৃথিবী ভ’রে এই যে ডাক—চলাচলের ব্যবস্থা—আন্তর্দেশীয়, আন্তর্মহাদেশীয়, আন্তঃসামুদ্রিক—এই অতি জটিল ও অতি নিপুণভাবে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা, মানুষের সঙ্গে মানুষের সহযোগের এই শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, যার ফলে আলাস্কার কোনো গ্রামের ডাকবাক্স থেকে উদ্ধৃত হয়ে কোনো চিঠি পাঁচ দিন পরে অবধারিতভাবে বিলি হয় ব্যাঙ্ককের কোনো গলির মধ্যে নম্বর—মুছে—যাওয়া জীর্ণ বাড়িতে—এও কি নয় এক বিস্ময়, যাকে অলৌকিক বললেও অত্যুক্তি হয় না? কত বিরাট সব ফাঁড়া হা ক’রে আছে এর মধ্যে—কোনো কেরানির ক্লান্তি, কোনো হরকরার অমনোযোগ; জল, ঝড়, আগুন, যানবাহনের দুর্ঘটনা। ভাবতে গেলে কোনো চিঠি নির্বিঘ্নে হাতে পাওয়া তেমনি আশ্চর্য, যেমন আমাদের বছরের পর বছর ধ’রে সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকা; যে—কোনো চিঠি হারিয়ে যেতে পারে, যে—কোনোদিন আমরা ম’রে যেতে পারি বা হতে পারি আশাহীনভাবে রুগ্ন—অথচ এখনো নিষ্ফল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে বেঁচে আছি বলে, বা এতকাল ধ’রে এত চিঠি পেয়ে আসছি বলে, আমরা কৃতজ্ঞ পর্যন্ত হতে শিখি না।

—কিন্তু আমি বোধহয় একটু বাড়াবাড়ি করছি ব্যাপারটা নিয়ে; একটি প্রত্যাশিত পত্রকে কেন্দ্র ক’রে যে—বৃত্তে আমি এখন ঘুরছি তার বাইরে এক বিশাল জগৎ ছড়িয়ে আছে—খবর কাগজের বুদ্বুদধর্মী জগৎ নয়, অন্য এক মায়াবী জগৎ, যার মধ্যে ধ্বংসস্তূপও সুন্দর ব’লে প্রতিভাত হয়, আর জীবনের সব চাঞ্চল্যের উপর এমন একটি রঙিন আচ্ছাদন ছড়িয়ে পড়ে, যাকে আমরা স্থায়িত্ব ব’লে ভুল করি। এটা রোম, আমি রোমে আছি, এই প্রথম এলাম, আজ আর কালকের দিনটা শুধু থাকব, অথচ বেলা সাড়ে—দশটা পর্যন্ত কিছুই দেখলাম না!

মনস্থির করে ট্যাক্সি নিলেন বিরূপাক্ষ; অনেক—কিছু দেখে, অনেকটা অর্থব্যয় ক’রে, ভালো ঘুম হবার জন্য ডিনারের সঙ্গে দেড় গ্লাস কিয়ান্তি পান ক’রে—যথোচিতভাবে ক্লান্ত, অনভ্যস্ত বলে মদিরায় ঈষৎ ঝাপসা, রাত প্রায় এগারোটায় হোটেলে ফিরলেন। লিফটে উঠতে উঠতে ঘুম পাচ্ছিল, কিন্তু যে—মুহূর্তে চাবি ঘুরিয়ে ঘরে ঢুকলেন, আলো জ্বেলে দেখলেন একটি পরিপাটি বিছানা, জানলায় মেরুন রঙের পর্দা, শিয়রের টেবিলে খনিজ জলের বোতল—রুটিনমাফিক আরামের আয়োজন, যা যে—কোনো দেশেই টাকার বিনিময়ে পাওয়া যায়—সে—মুহূর্তে তাঁকে আচ্ছন্ন করল সেই অবসাদ, যাকে প্রায় হতাশা বলা যায়, যা অনুভব করে হঠাৎ কোনো ভ্রাম্যমাণ কোনো রাত্রে যদি সে অসুস্থ হয়ে পড়ে, ঘুমের চেষ্টা ক’রে—ক’রে ক্লান্ত হয়ে মাঝে—মাঝে শিয়রের বাতি জ্বেলে দেয়, আবার তক্ষুনি আলো নিবিয়ে পাশ ফেরে, আর ঝাপসা আধো—ঘুমে অন্ধকারে তার মনে হয় সে শুয়ে আছে তার নিজের বাড়িতে অভ্যস্ত বিছানায়, ডাকলেই কেউ সাড়া দেবে, আর্তনাদ করলে ছুটে আসবে কোনো প্রিয়জন, যখন তার কল্পনা তাকে জপায় যে পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ দেশ তার দেশ, সবচেয়ে আরামের বিছানা যেটা হরিদাসী রোজ পেতে রাখে তার জন্য, আর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য সেই পলেস্তারা—খসা তেতলা বাড়িটা, যেটাতে তার প্রথম চোখ পড়ে রোজ সকালে—আর তারপরেই মনে প’ড়ে যায় সে এখন আছে অনেক দূরে অন্য এক দেশে, সমস্ত রাত ছটফট ক’রে কাটালেও কাউকে কাছে পাবে না। মা একদিনের জন্যও অন্য কোথাও গেলে কোনো—কোনো শিশুর যেমন ‘পরান পোড়ে’ (ছেলেবেলার একটা বাঙাল কথা হঠাৎ মনে প’ড়ে গেল বিরূপাক্ষর), তেমনি এক কষ্ট তাঁকে অভিভূত করল—অন্য কোথাও এ—রকম তাঁর মনে হয়নি যেন চান ফিরে যেতে, শুধু ফিরে যেতে তাঁর নিজের বাড়িতে যেখানে আছে তাঁর আপন জনেরা, একমাত্র যেখানে তাঁর সুখ, তাঁর নিরাপত্তা। কিন্তু প্রশ্ন এই: কোনটা তাঁর স্বদেশ, কোথায় তাঁর বাড়ি, আর কে—ই বা তাঁর আপনজন।

বিরূপাক্ষ যান্ত্রিকভাবে শুতে যাবার জন্য তৈরি হতে লাগলেন; হাতের ঘড়ি খুলে, পকেটের জিনিসপত্র উল্লোড় করলেন টেবিলের উপর, পাজামা—পাঞ্জাবির উপর ড্রেসিংগাউন জড়িয়ে ব’সে পড়লেন চেয়ারটায়। আজ সারাদিনে যা দেখেছেন সেগুলোকে মনের মধ্যে জীয়িয়ে তোলার চেষ্টা করলেন—কোনো স্থির দীপ্তি, কোনো সমভাবসম্পন্ন স্বাধীন সত্তা, আমাদের আকস্মিক আনন্দ বা বেদনার যা বহির্ভূত—শেষ পর্যন্ত তা—ই কি আশ্রয় নয় মানুষের—যেমন তাঁর ভাষাবিজ্ঞান, কিংবা যেমন মিকেলাঞ্জেলো, রাফায়েল, দোনাতেল্লো, যারা ভুলিয়ে দেন রেনেসাঁসের অকথ্য সব পাপ, বিষ, ছোরা, জ্যান্ত—পোড়ানো হাজার মানুষের যন্ত্রণা। কিন্তু আমি শুধু নাম আউড়ে যাচ্ছি, বইয়ের বুলি ভাবছি, আমি কিছু দেখিনি। বিচ্ছেদ ঘটেছে আমার চোখের সঙ্গে মনের, যুদ্ধ চলছে শরীরের সঙ্গে আত্মার, আমি যেখানে আছি আমি সেখানে নেই। কিছু বলো, এষা, কিছু বলো আমাকে—আমাকে রোম দেখতে দাও। এই আমি প্রথম এসেছি, হয়তো আর কখনো আসব না।

হালকা ঝকঝকে মূল্যহীন ইতালিয়ান মুদ্রা, রাশীকৃত ইতালিয়ান নোটের চাপে ফুলে—ওঠা ওয়ালেট, ঠিকানার খাতা, পাসপোর্ট, আজে—বাজে টুকরো কাগজ—এই সবের মধ্য দিয়ে তাঁর হাত যেন তাঁকে অমান্য ক’রে এগিয়ে গেল। আবার সেই সাদা কাগজ, সবুজ ঢাকনা—দেয়া টেবলল্যাম্পের আলোয় নীলচে। যেন আছে, কোনো কথা লুকিয়ে আছে ওর মধ্যে, ডালিমের শক্ত খোলসের তলায় দানার মতো—বা যেন নির্জন ঘরে দর্পণের শূন্যতা, কোনো দরজা খোলা হলে, গেলে, যে—কোনো মুহূর্তে যা ভ’রে উঠতে পারে। কোনো পর্দা সরে কাগজটাকে আলোর গায়ে তুলে ধরলেন বিরূপাক্ষ, তখন সেটা দেখাল ডিমের খোলার মধ্যে শাঁসের মতো হলদে—সোনালি। টেবিলের উপর টান ক’রে পেতে দেখতে লাগলেন আরো মন দিয়ে, উজ্জ্বলতর আলোর জন্য ল্যাম্পের গলাটা খুব কাছে নামিয়ে আনলেন। কয়েক সেকেন্ড পরে মনে হলো যেন ঝাপসা দু—একটা অক্ষর দেখা যাচ্ছে এখানে—ওখানে। বিরূপাক্ষ চোখ ঘষলেন, তাঁর পুরোনো পুঁথি প’ড়ে অভ্যস্ত চোখের সবটুকু জ্যোতি সংহত করলেন ওই কাগজখানার উপর; আরো কয়েকটা অক্ষর ফুটে উঠল।

হঠাৎ তাঁর মনে প’ড়ে গেল বহুদিন আগে এক গোয়েন্দা—গল্পে অদৃশ্য কালির কথা পড়েছিলেন—কাগজটা আগুনে সেঁকলেই লেখা ফুটে ওঠে। আরো আগে, যখন স্কুলে পড়েন, কে যেন বলেছিল পাতিলেবুর রসে নিব ডুবিয়ে লিখলেও ঠিক অমনি হয়, নিজে একবার পরীক্ষা ক’রে দেখেছিলেন কথাটা ঠিক। …তাহলে—এই ব্যাপার! সাবধানে দু—হাতে তুলে বালবের ঠিক তলায় ধরলেন কাগজটা: তাঁর চোখের সামনে, যেমন ফট—ফট খই ফোটে কড়াইয়ে, বা ভোরবেলার আলোর ছোঁওয়ায় কুঁড়িগুলি ফুল হয়ে ওঠে, তেমনি বেরিয়ে আসতে লাগল সাদার উপরে কুচকুচে কালো অক্ষরগুলি, একটা দিক ভর্তি হয়ে গেল। এবারে উল্টো পিঠ—এটাতে বেশি সময় লাগল না।

আর এখন—বার্তা, ভাষা, আশ্বাস, সেই দূরবাসিনীর হৃদয়ের ক্ষরণ, কানায়—কানায় ভরা এক পাত্র—তাঁর সামনে, তাঁর অধরস্পর্শের অপেক্ষায়। একটুও অবাক হলেন না বিরূপাক্ষ, কোনো উত্তেজনা অনুভব করলেন না—বরং মনে হলো এটাই স্বাভাবিক ও যথোচিত, মনে—মনে নিজেকেই দোষ দিলেন এষার এই ছোট্ট নির্দোষ চাতুরীটুকু প্রথমেই ধরতে পারেননি বলে। কিন্তু একটু পরেই তাঁর কপালে গাঢ় হয়ে রেখা পড়ল, ভারি হলো নিশ্বাস, মুহূর্তের জন্য নিজের প্রকৃতিস্থতা বিষয়ে সংশয় জাগল।

চিঠিখানা এমন এক ভাষায় লেখা, যা তিনি জানেন না।

লম্বা চিঠি, এপিঠ—ওপিঠ ভরা অক্ষর, কাটাকুটি নেই, লাইনের ফাঁকে—ফাঁকে ছাড়া সাদা নেই কোথাও, কিন্তু তিনি—ইন্দো—য়োরোপীয় ভাষাতত্ত্বে বিশেষজ্ঞ, অনেকগুলো ভারতীয় আর য়োরোপীয় ভাষা নিয়ে যিনি সর্বদা কাজ ক’রে থাকেন—সেই তিনি তাঁর সামনে মেলে ধরা কাগজখানার একটি শব্দেরও ঘোমটা সরাতে পারলেন না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর তাঁর প্রতীতি জাগল যে চিঠিটা এক সাংকেতিক ভাষায়, হেঁয়ালির আকারে লেখা হয়েছে, কেননা এতে দেখা যাচ্ছে বহু ভিন্ন—ভিন্ন লিপি—রোমান হরফের ফাঁকে—ফাঁকে গ্রিক, রুশ, হিব্রু, গথিক, দেবনাগরি, কোনোটাকে ব্রাহ্মী লিপি বলে সন্দেহ হয়—এমনকি মাঝে—মাঝে চৈনিক চিত্রাক্ষর, প্রাচীন মিশরী প্রতীকবর্ণ, এমনকি মাঝে—মাঝে বাংলাও, আর কখনো বা এমন কোনো—কোনো চিহ্ন, যা বিরূপাক্ষর অনুমানেরও অতীত। শুধু, উল্টো পিঠের একেবারে তলায় মার্জিন ঘেঁষে বড়ো—বড়ো অক্ষরে লিখেছে ‘এষা’ (এটুকু তাকে বিরূপাক্ষই মকশো করিয়েছিলেন), আর তাতেই বোঝা গেল কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ, আর সেই একটি কথাই শুধু পড়া গেল।

নিচু, নরম গলায় বিরূপাক্ষ হেসে উঠলেন। আমাকে পরীক্ষা করতে চাচ্ছে, আমি কেমন ভাষাবিদ! মৃদু ঠাট্টা করত আমাকে, যখন এর অভ্যাসদোষে কোনো শব্দের ব্যুৎপত্তি তাকে বোঝাতে যেতাম, চাইতাম তাকে বাংলা শেখাতে, সংস্কৃত শেখাতে। সে বলত, ‘আমেরিকায় এই বারো বছর কাটিয়েও ইংরেজিটা ঠিক রপ্ত করতে পারলাম না তার ওপর আবার আরো! রক্ষে করো!’ তার যুক্তি ছিল যে অনেকগুলো ভাষা শিখলে কোনো ভাষাই শেখা হয় না, এবং অনেক শেখার পরেও আরো অনেক অজানা ভাষা অবশিষ্ট থাকবেই। আমি বলতাম, কিন্তু যেটুকু শেখা যায় সেটুকুই লাভ। তা হতে পারে, কিন্তু যে—কোনো অবস্থায় মানুষের অজ্ঞতা অসীম—এটা তো মানবে! কৌতুকহাস্যে শেষ হতো এই তর্ক—কিন্তু এখন, যেন তার সেই কথারই সত্যতা প্রমাণের জন্য এই চিঠি পাঠিয়েছে আমাকে, চোখে আর ঠোঁটে বিদ্যুৎ হেনে যেন আমাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করছে—কেমন, পড়ো দেখি… একটু সময় দাও আমাকে, একটু সময় দাও—দেখো তোমার এটা! সব চাতুরী ধ’রে ফেলছি।

কিন্তু সে, আমি যার নাম দিয়েছিলাম এষা, যে ছেলেবেলায় তার ঠাকুরমার মুখে—মুখে কয়েকটা হিব্রু আর ইডিশ শব্দ শিখেছিল, আর তার এককালীন স্বামীর সংসর্গে খানিকটা রাশিয়ান, কিন্তু সত্যি বলতে জর্মান আর ইংরেজি ছাড়া কোনো ভাষাই যে জানে না—তার পক্ষে এ—রকম একটা বিশ্বম্ভর হেঁয়ালিরচনা কি সম্ভব? একেবারে সম্ভব নয় তা—ই বা কী করে বলি, কেননা অনেক সাধারণ অভিধানেই হিব্রু, রুশ, গ্রিক, বর্ণমালা পাওয়া যায়, হয়তো আমারই ফেলে—আসা কোনো বই থেকে দু—চারটে বাংলা আর দেবনাগরি অক্ষর চিনে নিয়েছে, আর আমি যেগুলোকে ভাবছি চৈনিক, মিশরী, ব্রাহ্মী লিপি, সেগুলি হয়তো তার নিজেরই উদ্ভাবিত কোনো রেখাঙ্কন—হয়তো সেগুলো দিয়ে পাণ্ডুলিপিকে অলংকৃত করা হয়েছে শুধু, যেমন অনেকে পরবর্তী বাক্যটি ভাবতে—ভাবতে কাগজের মার্জিনে ছবি আঁকে, তেমনি। …কিন্তু এমন যদি হয় যে পুরো চিঠিখানাই অর্থহীন, এক শূন্যগর্ভ শিল্পিত পেটিকামাত্র—তাছাড়া আর—কিছু নয়? দেখো না—হাতের লেখাটাও কেমন কৃত্রিম, রোমান অক্ষরগুলো ছাপার হরফের মতো, যেখানে—সেখানে ক্যাপিটেল ছিটোনো—মাঝে—মাঝে এষার লেখার আদল এলেও ঠিক চেনা যাচ্ছে না। মনে হয় বহু সময় নিয়ে বহু ধৈর্য ধ’রে লিখতে বা আঁকতে হয়েছিল এই চিঠি—কিন্তু অত সময় সে কখন পেল, কী ক’রে অমন ধৈর্যশীল হতে পারল সে, আমি তার নিজের কণ্ঠ শোনার জন্য কত ব্যাকুল, তা জেনেও?

এষা, এই পরিহাস কেন?

…পরিহাস? তবে কি সে আমাকে তার সর্বস্ব দেয়নি, কিছু হাতে রেখেছিল? তবে কি এই শেষ মুহূর্তে, শেষ বিদায়ের আগে, সে চাচ্ছে নিজেকে ফিরিয়ে নিতে, বাতিল ক’রে দিতে তার সঙ্গে আমার সম্বন্ধ—সে, আমার হৃদয়বর্তী নির্ঝরিণী? না, না, তা হতে পারে না, হতে পারে না। আমাকে বিশ্বাস করতে হবে। ওই তো আছে তার স্বাক্ষর—স্পষ্ট, আমার সবচেয়ে চেনা ভাষায় সবচেয়ে প্রিয় দুটি অক্ষর—আমি কি এত দুর্বল যে এর পরে আরো প্রমাণ চাইব? মিথ্যে নয়, পরিহাস নয়, আমি পারব এর বার্তা বুঝে নিতে—আমাকে পারতেই হবে।

এক ঘণ্টা কাটল, তবু বিরূপাক্ষর কপাল মসৃণ হলো না, তাকিয়ে থেকে—থেকে চোখের মধ্যে টনটন করতে লাগল। আবার যেন নৈরাশ্য ঘিরে ধরল তাঁকে, ক্লান্তির চাপে ভেঙে পড়ছে শরীর, কিন্তু ঘুম নেই, মনের এই অবস্থায় শুতে যাওয়া অসম্ভব। এষা, বলো আমাকে, এর অর্থ কী, বলো—যদি হয় প্রত্যাখ্যান, তাও ব’লে দাও। আর দু—দিন পরেই দুস্তর ব্যবধান—তার আগে আমাকে বলো তোমার শেষ কথা—বলো, আমার এই বেদনাদীর্ণ জাগরণ, তা কি সত্য? তা কি সত্য নয়?

টেবিলের উপর টেলিফোনটাতে চোখ পড়ল তাঁর। হাত ঘড়িতে দেখলেন দেড়টা। মধ্য—পশ্চিম আমেরিকায় এখন সন্ধ্যা সাড়ে—আট—খুব সম্ভব বাড়িতেই আছে এখন, ডিনার সেরে, বাসনকোশন ধুয়ে, একলা ব’সে ‘লাইফ’ পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছে, বা টেলিভিশনে খবর শুনছে হয়তো—আর কী করার থাকে সন্ধ্যার পরে মফস্বলি মার্কিনী মানুষের? কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা ক’রে বিরূপাক্ষ একটা দূরপাল্লা নম্বর চাইলেন।

হাওয়ায় ভাসা মেয়েলি গলা পর—পর—রোম, নিউ ইয়র্ক, শিকাগো—যেন প্রায় চিন্তার মতোই দ্রুত কোনো তরঙ্গ ভেসে চলেছে—দু—এক মুহূর্ত নীরবতা, তারপর স্পষ্ট আওয়াজ শোনা গেল, ‘হ্যালো।’

মুহূর্তের জন্য নিশ্বাস নিতে পারলেন না বিরূপাক্ষ—এষার গলা অবিকল তার, একটু ভারি, যেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, যেন আর—একটু হলেই মুখ দেখা যাবে। তাঁর কানের মধ্যে ওই নৈর্ব্যক্তিক ‘হ্যালো’ শব্দের প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যেতে একটু সময় লাগল।

আবার ওপার থেকে: ‘হ্যালো।’

‘আমি বিরূপাক্ষ, রোম থেকে বলছি।’

‘তুমি! আশ্চর্য—আমি ঠিক তোমার কথাই ভাবছিলাম। কেমন আছো?’

‘তুমি আমাকে চিঠি লিখেছিলে—রোমের ঠিকানায়?’

‘হ্যাঁ—নিশ্চয়ই। পাওনি?’

‘পেয়েছি—কিন্তু সেটা কোনো চিঠি কিনা বুঝতে পারছি না।’

‘বুঝতে পারছো না?’ ঝাপসা একটু হাসির আওয়াজ ভেসে এলো।

‘একটা বর্ণ বুঝতে পারছি না, এষা। তুমি করেছো কী?’

‘আমি তোমাকে সারাক্ষণ চিঠি লিখে চলেছি।’

‘সারাক্ষণ?’

‘সারাক্ষণ। মনে—মনে। সব কথা লেখা যায় না জানো তো।’

‘কিন্তু এই চিঠিটা—শোনো—কী লিখেছিলে এটাতে? কোন ভাষায় লিখেছিলে? বলো, এষা, উত্তর দাও—কী লিখেছিলে? কোন ভাষায়?’

‘তুমি জিগেস করছো কী লিখেছিলাম? কোন ভাষায়? তুমি!’ আবার ঝিরঝির হাসি।

‘এষা—আমাকে দয়া করো—বলো, কী লিখেছিলে!’

‘লিখেছিলাম—’ এর পরেই অদ্ভুত একটা আওয়াজ এলো, যেন এষার কণ্ঠ আর নয়, কোনো ফাঁস—লাগা গলা থেকে বেরোনো অক্ষম অর্ধোচ্চারিত হিজিবিজি।

নিজের গলায় চিৎকার শুনলেন বিরূপাক্ষ—‘বলো! বলো! কী লিখেছিলে?’

‘লিখেছিলাম—’ আবার সেই অদ্ভুত, বিকৃত আওয়াজ। যেন কোনো কথা আরম্ভ হয়েই বেঁকে—চুরে দুমড়ে যাচ্ছে, যেন দম ফুরোনো সেকেলে গ্রামোফোনে ভাঙা রেকর্ডের আর্তনাদ, বা কোনো বাঁদর যেন মানুষের নকলে কথা বলার চেষ্টা করছে। বিরূপাক্ষ যতবার ডাকেন, ‘এষা! এষা! …শুনছো?’ ততবার সেই একই শব্দ।

তারপর টেলিফোন কেটে গেল। ক্ষণকাল অপেক্ষা ক’রে বিরূপাক্ষ আবার সেই একই নম্বর চাইলেন, অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পর অপারেটর জানাল আটলান্টিকে ঝড় উঠেছে, কাল সকালের আগে লাইন পাওয়া যাবে না।

বিরূপাক্ষ টের পেলেন তিনি কাঁপছেন, গাল বেয়ে তিরতির ক’রে ঘাম নামছে। জানলার পর্দা সরিয়ে আধখানা শার্সি খুলে দিলেন, কয়েক ঢোক খনিজ জল খেয়ে আবার বসলেন চিঠির সামনে।

কী কথা হলো টেলিফোনে? কিছুই না, শুধু জানা গেল যে এষা চিঠি লিখেছিল। কিন্তু… সেটুকু জানাও তো অনেকখানি। হ্যাঁ, লিখেছিল, কিন্তু এটাই যে সেই চিঠি তার কী প্রমাণ? ‘বুঝতে পারছো না? …তুমি জিগেস করছো কী লিখেছিলাম? তুমি!’ আবছা হাসি, সস্নেহ, কিন্তু ঈষৎ যেন ঠাট্টাও মেশানো আছে, যেন অবাক হচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না বলে, যেন আমার ওপর যে—বিরাট আস্থা সে রেখেছিল, আমি তার অযোগ্য বলে প্রমাণিত হচ্ছি। যদি আর—একটু কথা বলতে পারতাম, যদি হঠাৎ ওই যান্ত্রিক গোলযোগ ঝাঁপিয়ে না—পড়ত আমাদের ওপর, যদি প্রকৃতির খামখেয়াল আমাদের বিচ্ছিন্ন ক’রে না—দিত! কিন্তু ওই কথাটা—‘আমি তোমাকে সব সময় চিঠি লিখে চলেছি মনে—মনে। সব কথা লেখা যায় না জানো তো।’—এর চেয়ে স্পষ্ট আর কী হতে পারে? সব কথা লেখা যায় না যেহেতু বলার কথা অন্তহীন। আর তাছাড়া (সেটাই হয়তো আসল কারণ) ভাষার শক্তি আর কতটুকু? আঁটোসাঁটো, কষ্টকর পোশাক—তা কি শুধু কোনো বিদেশী ভাষা, যেমন আমার পক্ষে ইংরেজি, বা এষার পক্ষে রাশিয়ান? ভাষা ব্যাপারটাই কি সংকীর্ণ নয়, আনুমানিক নয়—আমরা যাকে মাতৃভাষা বলি, তাও? বা কিছুটা বেশি—এই যা তফাৎ। ইংরেজি বলে, হিস্পানি বলে, বাংলা হিন্দি তামিল বলে—কিন্তু বলার মতো বলতে পারে ক—জন? বরং তাদেরই মুখে—মুখে ক্ষয়ে—ক্ষয়ে যাচ্ছে ভাষা, তাদেরই হাজার—হাজার খবরকাগজে ময়লা হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে, ধ্বসে পড়ছে বিশেষণ, প্রবাদ, রসিকতা, সদুক্তিগুলি চর্বিত চর্বণে পরিণত হচ্ছে।—যে—সব লেখা ভাষার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ বলে স্বীকৃত, তাতেও কি ধরা পড়ে না এখানে একটা মোটা ছুঁচের ফোঁড়, ওখানে এক টুকরো ঢিলে সুতো, আর কোথাও বা অর্ধেক—লুকোনো আলপিনের জোড়—শুধু ফাঁকে—ফাঁকে মণিমুক্তো ঝিলিক দেয় বলে সেগুলোকে আমরা লক্ষ্য করি না? মনের মধ্যে যা থাকে নিটোল ও উজ্জ্বল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ, কিন্তু ভাষার ছাঁচে ফেলতে গেলেই তা কুঁকড়ে যায়, বা ফেঁপে ওঠে, ফেটে, ফেঁসে ঘনত্ব হারিয়ে হয়ে ওঠে একটি আপোশমাত্র—অমোঘ নয়, স্থান, কাল, অবস্থা অনুসারে আপেক্ষিক। হ্যাঁ—আপেক্ষিক, কেননা সময় অনবরত বদলে দিচ্ছে ভাষাকে—অমন জ্বলজ্যান্ত শেক্সপীয়র পড়ার জন্যেও টীকা না—হলে চলে না আজকাল, আঠারোশতকী বাংলা গদ্য সাধারণ পাঠকের অবোধ্য। বা ধরা যাক চাটগাঁ ও বাঁকুড়ার দুই সমকালীন গ্রামীণ মানুষ—দুজনই ‘বাংলা’ বলে, কিন্তু পরস্পরের মধ্যে ভাষার সেতুবন্ধ প্রায় অসম্ভব। অনুবাদে কত বদলে যায় রচনা—যেতেই হবে, কেননা সব ভাষা সমানভাবে ভাগ্যবতী নয়, প্রত্যেক ভাষাতেই আছে এমন কোনো—কোনো ইঙ্গিত, শব্দবন্ধ, ছন্দস্পন্দ, আলো—আঁধারি, যা তারই পক্ষে অনন্য, দ্বিতীয় কোনো ভাষার পক্ষে যা নাগালের বাইরে। আর যাকে আমরা বলি মৌলিক রচনা, তাও তো অনুবাদ—চিন্তা থেকে ভাষায়, কল্পনা থেকে মূর্তে: সবচেয়ে দুরূহ ও কষ্টসাধ্য এই অনুবাদ—আর হয়তো সবচেয়ে কম সফল। কত ভালোই হতো, যদি আমরা পারতাম একই তাঁতে অনেকগুলো ভাষাকে বুনতে, যদি থাকতো এমন কোনো বকযন্ত্র, যাতে নানা ভিন্ন ভাষার ভিন্ন—ভিন্ন গুণপনাকে চোলাই ক’রে নিতে পারতাম। হয়তো অমনি ক’রেই গ’ড়ে উঠতে পারে—অমুক বা তমুক ভাষা নয়, শুধু ভাষা, মানুষের চিরকালের প্রতীক্ষিত সেই ভাষা, যাতে স—ব কথা বলা যায়। আর হয়তো তেমনি কিছু চেষ্টা করছে এষা—ছোটো মাপে, তার নিজের গরজে, চেয়েছে আমারই জন্য এক বিশেষ, গোপন, বহুমিশ্র, সাংকেতিক ভাষা তৈরি করতে, যা অন্য কেউ না—বুঝলেও আমি সহজেই যার তল খুঁজে পাবো—অন্তত সে তা—ই ধ’রে নিয়েছে—যেহেতু আমি ভাষাবিদ, আর যেহেতু আমি তাকে ভালোবাসি। তাহলে… আমি প্রথমে যা ভেবেছিলাম তা—ই ঠিক!

—কিন্তু কী ক’রে হবে? এষা তো আমার মতো পুঁথি—খেকো মানুষ নয় (ভাগ্যিশ নয়!)—এ—রকম একটা কল্পনা তার মাথায় কী ক’রে আসবে? এই আপত্তি বিরূপাক্ষর মনে দ্বিতীয়বার ভেসে উঠল, কিন্তু এবারে তিনি সচেতনভাবেই সরিয়ে দিলেন সেটাকে, এষার পক্ষে এই লিপি রচনা অসম্ভব, এ—রকম একটা প্রস্তাব এখন আর তাঁর বিবেচনার যোগ্য বলে তাঁর মনে হলো না। সমস্ত ব্যাপারটাকে এক ভিন্ন দিক থেকে দেখতে পেলেন তিনি, নিজেকে জিজ্ঞাসা করলেন: এষার কতটুকু তুমি জানো, বলো তো?—না, প্রতিবাদ কোরো না; তোমাকে মানতে হবে তুমি অন্যভাবে ব্যস্ত ছিলে তাকে নিয়ে—সংকীর্ণ শরীর ও সময়ের মধ্যে হাঁপিয়ে—ওঠা সেই উপস্থিতি, দিনে—দিনে আসন্নতর বিদায়ের চাপে তীক্ষ্ণ—হয়ে—ওঠা দিনরাত্রিগুলি, তার বাইরে দূর—সন্ধানের সময় ছিল না তোমার, ইচ্ছেও ছিল না। বড়ো বেশি ব্যগ্র হাতে তুমি ধরতে চেয়েছিলে তাকে, বড়ো বেশি ধৈর্যহীনভাবে, তাই তোমার আঙুলের ফাঁক দিয়ে সে খসে প’ড়ে গেছে, এষাকে ভাবলে এখন তোমার মনে পড়ে তার চোখের হাসি, চুলের গন্ধ, স্পর্শের কাঁপন—আর কিছু নয়, শুধু সেইটুকুই। তোমাকে মানতে হবে তোমার এই ভালোবাসায় বেশি কিছু তুমি ধরাতে পারোনি, ছোটো খিদে নিয়ে শুধু কোণখামচি ভেঙে চেখেছিলে।

—কিন্তু সেই ত্রুটির সংশোধন হবে এবার। তারই উপায় এই চিঠি। বিরূপাক্ষ আবার সংকেতময় কাগজটিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন; টের পেলেন না, কখন কখন তাঁর মাথা এলিয়ে পড়ল চেয়ারের পিঠে, তাঁর সব ভাবনা ঝাপসা হতে হতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। হঠাৎ এক সময় চমকে উঠে দেখলেন তিনি চেয়ারে ব’সে ব’সে ঘুমুচ্ছিলেন, ঘাড়ে বড্ড ব্যথা হয়েছে, আর টেবল—ল্যাম্পের আলোকে বিবর্ণ ক’রে দিয়েছে মেরুন রঙের পর্দার আভায় লাল—হয়ে—ওঠা রোদ্দুর।

আমেরিকান এক্সপ্রেসে কোনো চিঠি পেলেন না সেদিন, পাবেন বলে আশাও করেননি। বেলা কাটালেন পথে—পথে ঘুরে—বিভ্রান্ত, উদ্দেশ্যহীন, এলোমেলো। অনেক গলি, অনেক পিয়াজ্জা, অনেক মূর্তি প্রাসাদ গির্জে ফোয়ারা বাগান; কিন্তু তাঁর অন্য সব কৌতূহল আজ মৃত, তাঁর চোখে অন্য কিছুর জন্য দৃষ্টি নেই। তিনি রোমে আছেন, এই চিন্তা আজ আর তাঁকে বিব্রত করল না; মনেও পড়ল না প্লেনে আসতে—আসতে ভেবেছিলেন যে পিয়াজ্জা নাভোনায় বের্নিনি রচিত চার—নদীর মূর্তি তাঁকে দেখতেই হবে (কেননা তার অন্যতম নদী গঙ্গা); এমনকি, ছেলেবেলায় পড়া যে—দুই কবির অনেক লাইন এখনো তাঁর ভাষাতত্ত্বের চাপে পিষ্ট হয়ে যায়নি, তাদের কবর বা স্মৃতিসদন দেখার জন্যও কোনো আগ্রহ তিনি অনুভব করলেন না। অন্য কাজ, বিশেষ একটি কাজ যেন গ্রেপ্তার করে নিয়েছে তাকে, তা সম্পন্ন না—হওয়া পর্যন্ত তাঁর ছুটি নেই।

অগস্ট মাস, বেলা বাড়তে বাড়তে রোদ্দুর কড়া হয়ে উঠল, দেড়টা নাগাদ আশ্রয় নিলেন একটা কাফেতে। প্রথমে প্রচুর বরফের সঙ্গে এক গ্লাস কাম্পারি, শুকনো গলা ভিজিয়ে নিয়ে হেঁয়ালিটি বের ক’রে খুলে ধরলেন—আজকের দিনে এই প্রথমবার। হঠাৎ একটা অঘটন ঘটল। চোখ ফেলা মাত্র তিনটে শব্দে লাফিয়ে উঠে বিধল তাঁর মগজে: গথিক অক্ষরে লেখা ‘ফের্ন’ (জর্মানে ‘দূর’), পরের লাইনে গ্রিক ‘অয়কস’ (‘বাড়ি’), আর তারই কয়েকটা শব্দ পরে রুশী হরফে ‘আলো’—নিশ্চয়ই বাংলা কথাটা? …এত সহজ! প্রায় শব্দ ক’রে হেসে উঠেছিলেন তিনি, কিন্তু গবেষণার কঠিন পদ্ধতিতে অভ্যস্ত বলে তখনই নিজেকে সামলে নিয়ে সতর্ক হলেন। …কোথায় লুকিয়ে আছে ক্রিয়াপদ? অব্যয় কোনগুলো হতে পারে? কোন ধরনের ব্যাকরণ এই বিচিত্র লিপির যোগসূত্র? কিছুই অনুমান করা যাচ্ছে না, একটি পুরো বাক্য ধরা দিচ্ছে না এখনো। …তবু, একটা আরম্ভ করা গেছে, দেয়ালে তিনটে ছোট্ট ফুটো পাওয়া গেল, যেন সূর্য ওঠার আগেকার ভোর, এর পরেই আলোয় আকাশ ভ’রে যাবে। তিনটে আবিষ্কৃত শব্দের মধ্যে একটা যে ‘আলো’, এটাও একটা শুভলক্ষণ বলে মনে হলো তাঁর; ‘দূর’, ‘বাড়ি’, ‘আলো’—হয়তো লিখেছে, ‘ওই দূর বাড়িতে আমার জন্য আলো জ্বলছে’—অর্থাৎ, ‘আমি তোমার অভাবে কষ্ট পাচ্ছি।’ …কিন্তু ‘আমি ওই দূরের আলো থেকে বাড়ি ফিরতে চাই—’ এও তো হতে পারে। তাহলে তো অর্থ একেবারে উল্টে যায়। কত ভিন্ন—ভিন্ন বাক্যে ওই তিনটে শব্দ স্থান পেতে পারে—তার মধ্যে কোনটা? তাছাড়া, ওই তিনটে শব্দ যে একই বাক্যের অন্তর্ভুক্ত, তারই বা নিশ্চয়তা কী? যতিচিহ্নগুলি অস্পষ্ট; আর গ্রিক, গথিক, রুশী হরফ হাতের লেখায় দেখে তো অভ্যেস নেই আমার, বাঙালি শিশু যেমন যুক্তবর্ণ গুলিয়ে ফেলে, তেমনি আমার ভুল হচ্ছে না তো? যদি কোনো সাহায্য পেতাম, যদি বহু ভাষার অভিধান থাকতো হাতের কাছে, দু—একজন মহাবিদ্বান পুরুষ… এই রোমে কি আছেন কেউ? তাঁর মনে পড়ল এনরিকো কার্টুচ্চির নাম—ইতালির শ্রেষ্ঠ ভাষাবিজ্ঞানী, কিন্তু তাঁর গবেষণার জগৎ মঙ্গোলীয়, আমার সমস্যাটি ঠিক তাঁর এলাকার মধ্যে পড়ে না। …আমি কি চ’লে যাবো জেনেভায়, যেখানে আছেন শার্ল দুবোয়া, যিনি দশ খণ্ডে প্রাচীন ইন্দো—য়োরোপীয় ভাষাসমূহের তুলনামূলক অভিধান প্রণয়ন ক’রে এক বিরাট কীর্তি স্থাপন করেছেন? ধারণাটি নিয়ে মনে—মনে খেলা করলেন বিরূপাক্ষ—এই কয়েকমাস আগে দুবোয়ার সঙ্গে দেখা হলো মায়র্কে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে, ‘উত্তর—ভারতীয় ভাষাসমূহে আনুনাসিক শব্দের বিবর্তন’ বিষয়ে আমার এক ক্ষুদ্র নিবন্ধের তিনি সমর্থন করলেন—তিনি আমাকে বিমুগ্ধ করবেন বলে মনে হয় না। কিন্তু—কী বলবো গিয়ে? এই চিঠি—নিতান্ত ব্যক্তিগত, গোপন—তা কি অন্য কাউকে দেখানো সম্ভব? …তা, আমি তো কৌতুকের ভান ক’রে বলতে পারি—‘আমার এক মার্কিনী ছাত্রী একটা হেঁয়ালি বানিয়ে পাঠিয়েছে আমাকে—দেখুন তো এটার কোনো অর্থ হয় কিনা, নাকি বিলকুল বুজরুকি?’ …আর তাছাড়া, পণ্ডিতের কাছে সবই জ্ঞানের বিষয়, আর জ্ঞান কখনো ব্যক্তিগত হয় না; যে—মন নিয়ে শল্য—চিকিৎসক সংবিবস্ত্রা নগ্নীকৃত সুন্দরীর উপরে অস্ত্র চালান, সেই মন নিয়েই এই চিঠিটাকে বিশ্লেষণ করবেন শার্ল দুবোয়ার মতো বা ট্যুবিঙ্গেনের ইয়োয়াখিম সিনের মতো কোনো জ্ঞানীজন। আরো কথা এই যে তাঁদের দক্ষতার শলাকায় উদ্ঘাটিত হবে শুধু আক্ষরিক অর্থ, কিন্তু নিহিত বার্তা আমারই জন্য কুমারী থাকবে। যত ভাবলেন, ততই বিরূপাক্ষর মন এই প্রস্তাবের দিকে উৎসুক হয়ে উঠল, মনে হলো দেশে ফেরার আগে, যে ক’রে হোক, এই সারা—মন—জোড়া অশান্তির ভার তাঁকে নামাতেই হবে। কোনো বাধা নেই, তাঁর ছুটি এখনো ফুরোয়নি, ফিরতি—টিকিটের মেয়াদ আরো তিন সপ্তাহ, হাতে কিছু টাকাও আছে। তিনি কয়েকটা দিন দেরি ক’রে দেশে ফিরলে কারো কোনো ক্ষতি হবে না।

রাভিওলির প্লেট অর্ধভুক্ত রেখে উঠে পড়লেন, ট্যাক্সি নিয়ে এলেন তাঁর প্লেন—কোম্পানির আপিশে, কালকের যাত্রা বাতিল ক’রে, কলকাতায় টেলিগ্রাম পাঠিয়ে, সন্ধ্যার পর জেনেভার ট্রেন ধরলেন।

কিন্তু শার্ল দুবোয়া অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। ট্যুবিঙ্গেনে এসে শুনলেন, ইয়োয়াখিম সিন গ্রীষ্মের ছুটিতে পর্তুগালে বেড়াতে গেছেন। ট্যুবিঙ্গেন থেকে হাম্বুর্গ, সেখানে তিনি অধ্যাপক হেলমুট শেলের খোঁজ করাতে সকলেই অবাক হলো, কেননা সেই অশীতিপর পণ্ডিত বছরখানেক আগে কবরস্থ হয়েছেন। এলেন প্যারিসে, কিন্তু সর্বনের আঁরি প্যের তখন কুইবেক—এ, অক্টোবরের আগে ফিরবেন না। মুহূর্তের জন্য নৈরাশ্যে নুয়ে পড়লেন বিরূপাক্ষ, মনে হলো দুর্ভাগ্য তাঁকে পদে—পদে হানা দিচ্ছে, হয়তো এই অশান্তির বোঝা নিয়েই তাঁকে বাকি জীবন কাটাতে হবে।

য়োরোপে তাঁর শেষ রাত্রিটি কাটল প্যারিসের বাম তীরে এক সস্তা হোটেলে। শুতে যাবার আগে তাঁর অবশিষ্ট বিদেশী টাকা গুনলেন তিনি—থার্ড ক্লাস ট্রেনে ভ্রমণ করেছেন এ—ক’দিন, পারতপক্ষে ট্যাক্সি নেননি, কম ক’রে খেয়েছেন, সম্ভব হলেই রাত্রিগুলি ভ্রমণে কাটিয়েছেন—হোটেলের বিল বাঁচাবার জন্য—কিন্তু তবু যা খরচ হয়ে গেল তা ভারতীয় মাপে তুচ্ছ নয়। ভালো স্বামী তিনি, ভালো পিতা, কর্তব্যপরায়ণ, মার্কিন দেশে অধ্যাপনার আয় থেকে যা বাঁচাতে পেরেছিলেন তা নিয়ে যাচ্ছেন পরিবারের জন্য—সে—টাকাটা তিনি নিজের ব’লে মনেই করেন না; তাই এই শেষ দফায় খামখেয়ালি আন্দাজি ব্যয়ের জন্য ঈষৎ অনুশোচনা হলো তাঁর। তাও তো সব নিষ্ফল হলো। হয়তো এই চিঠি, বা হেঁয়ালি, বা পরিহাস, বা যা—ই হোক—হয়তো এই ব্যাপারটা আমার ভুলে যাওয়াই উচিত, আমার কি জীবনে আর কাজ নেই যে এ—রকম একটা ছেলেখেলা নিয়ে সময় কাটাবো?

বিছানায় শুয়ে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, হঠাৎ একটা নতুন চিন্তা তাঁকে চঞ্চল ক’রে তুলল। এই যে এত ঘোরাঘুরি ক’রেও কোনো সাহায্যকারীর দেখা পেলেন না, তাও হয়তো অভিপ্রেত, পরিকল্পিত; সে চায় না আমি অন্য কারো সাহায্য নিই; এই পরীক্ষায় আমি বিশুদ্ধভাবে নিজের চেষ্টায় উত্তীর্ণ হবো, এই তার দাবি আমার ওপর। কথাটা মনে হওয়ামাত্র একটা সুখের ঢেউ বয়ে গেল তাঁর বুকের তলায়, আরো নিবিড় হয়ে ঘুম নামল চোখে, মনে হলো এই জটিল খেলার মূলসূত্রটি তিনি ধরতে পেরেছেন। আস্তে—আস্তে তাঁর চোখে ঘুম নামল।

জেগে উঠে দেখলেন তখনও আলো ফোটেনি। তাঁর প্লেন ছাড়বে দশটায়, সময় আছে। মাত্র ঘণ্টাতিনেক ঘুমিয়েছেন—তবু বেশ হালকা লাগছে, ঘোরাঘুরির ক্লান্তির কোনো চিহ্ন নেই। আলো জ্বেলে আবার বসলেন সেই কাগজখানা নিয়ে; ছ—ঘণ্টা পরে একটি অনুমানে পৌঁছলেন। চিঠির প্রথম তিনটি শব্দ মধ্যযুগীয় লাতিন অপভাষায় লেখা, তার অর্থ খুব সম্ভব—‘তুমি চলে যাবার পর—’।

***

নির্দিষ্ট তারিখের দশ দিন পরে তিনি ফিরে এলেন কলকাতায়, নির্দিষ্ট চাকরিতে যোগ দিলেন আবার, কাঁধে তুলে নিলেন নির্দিষ্ট সব দায়িত্ব। টাকা যা বাঁচিয়ে আনতে পেরেছিলেন তা দিয়ে পৈতৃক বাড়িটির সংস্কার করালেন, স্ত্রীকে কিনে দিলেন রেফ্রিজরেটর, রেডিওগ্রাম, নতুন আসবাবপত্র; আবার ঢুকে গেলেন তাঁর অভ্যস্ত, পুরোনো জীবনের বৃত্তের মধ্যে—অতি সহজে, বিনা প্রতিরোধে।

পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে তিনি ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে এমন কয়েকটি ক্ষীণকায় গবেষণা প্রকাশ করলেন, যা নিয়ে বৈদেশিক বিশেষজ্ঞ মহলে সজীব আগ্রহ উদীপ্ত হলো। কিন্তু বিদেশে যা স্বাভাবিকভাবেই শুধু বিশেষজ্ঞদের আলোচ্য, স্বদেশে তা—ই বিস্ময়করভাবে রেখাপাত করল লোকমানসে। বলা বাহুল্য, তিব্বতি ভাষার ধাতুরূপে সংস্কৃতের প্রভাব কতটুকু, কোন—কোন হিব্রু ও গ্রিক শব্দ প্রাচীন পারসিক থেকে আহৃত, তাগালগ ভাষা কতদূর পর্যন্ত তামিল ও সিংহলির আত্মীয়, এবং তাতে পালি ও মাগধী প্রাকৃতের মিশ্রণই বা কতখানি—এ—সব প্রশ্ন মানুষের দৈনিক জীবনের পক্ষে সর্বত্রই সমানভাবে অবান্তর; কিন্তু যেহেতু অবোধ্য বস্তুও উত্তেজনার খোরাক জোগাতে পারে, আর যেহেতু দেশপ্রেমের প্ররোচনায়, এবং নিজেদের তুচ্ছতার ক্ষতিপূরণরূপেও, আমরা ভারতীয়রা কোনো অনুমিত প্রতিভাবানকেও অতিকৃত ক’রে দেখতে ভালোবাসি, তাই একদিন—অক্সফোর্ড, ইংলন্ডের ‘দি ফিললজিস্ট’ আর কেমব্রিজ, মাস—এর ‘জর্নাল অব লিঙ্গুইস্টিক স্টাডিজ’—এ প্রকাশিত দুটো দীর্ঘ ও সপ্রশংস আলোচনা দৈবাৎ জানাজানি হয়ে যাবার ফলে—একদিন কলকাতার একটি বহুল প্রচারিত দৈনিক পত্রে বিরূপাক্ষ রায়কে নিয়ে একটি বিশেষ প্রবন্ধ ছাপা হলো, ধুয়ো ধ’রে অন্যান্য কাগজেও লেখালেখি হলো অনেক—‘বাগীশ্বর’, ‘ক্ষণজন্মা গীষ্পতি’, ‘বিশ—শতকী মিথ্রিদাতেস’—এই সব পুষ্পল অভিধা তাঁকে অর্পণ করল সাংবাদিকেরা, এক নিরীহদর্শন কিন্তু চতুর যুবক কোনো—এক অসতর্ক মুহূর্তে পাঠরত অবস্থায় তাঁর ছবি তুলে নিয়ে ছাপিয়ে দিল বম্বাইয়ের এক সচিত্র ইংরেজি সাপ্তাহিকে। এর পর ব্যাপারটি ক্রমশ ঘোরালো হয়ে উঠতে লাগল, দিল্লির দেবতারা অকস্মাৎ তাঁর অস্তিত্ব বিষয়ে সচেতন হয়ে তাঁর উপর অর্পণ করলেন পদ্মবিভূষণ উপাধি; আর তার পরের বছর পশ্চিমবঙ্গীয় কর্ণধারগণ, গুণগ্রাহিতায় দিল্লির সঙ্গে টেক্কা দিয়ে, তাঁকে উপঢৌকন দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম সম্মান—পদবি, যা সাধারণত শুধু মৃতপ্রায় মহাস্থবিরদের জন্য সংরক্ষিত থাকে।

এই অপ্রত্যাশিত ও তাঁর পক্ষে সম্পূর্ণ অনাবশ্যক ঘটনাগুলোতে অত্যন্ত বিব্রত বোধ করলেন বিরূপাক্ষ। বাড়িতে ও কর্মস্থলে রবাহূত সমাজব্রতী ভদ্রমহোদয়গণ: পত্রে ও টেলিফোনে বহু অপরিচিত ব্যক্তির ও কখনো বা কোনো খ্যাতনামার অনুরোধ, কোনো—না—কোনো পত্রিকার তরফ থেকে সাক্ষাৎকারের জন্য প্রার্থনা; তাঁকে বলা হচ্ছে বহুবিধ আন্দোলনে অংশ নিতে, বহুবিধ সংস্থার সভাপতি, উপসভাপতি বা উপদেষ্টা হতে, বহুবিধ ইস্তাহারে স্বাক্ষর ও বহুবিধ সভামণ্ডপে ভাষণ দিতে; সুয়েজ—সংকট, মহাকাশ—অভিযান, চীন—ভারত সম্পর্ক, শিল্পীর স্বাধীনতা, এমনকি একটি পরিকল্পিত কালীমন্দিরের স্থাপত্য, এমনকি ভারতীয় ফিল্মে চুম্বন—প্রদর্শনের যৌক্তিকতা—এই ধরনের বহুবিধ বিচিত্র বিষয়ে তাঁর মতামত চাওয়া হচ্ছে দেখে তাঁর বিস্ময়ের সীমা রইল না। ভারতের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত বিতর্কের কেন্দ্রস্থলে তাঁকে টেনে আনার চেষ্টা হলো কিছুদিন; উত্তর—ভারতীয়রা ধ’রে নিল তিনি সংস্কৃতে পণ্ডিত ব’লেই হিন্দির সমর্থক হবেন, আর দক্ষিণ—ভারতীয়রা আশান্বিত হলো এই ভেবে যে কোনো বাঙালি কখনো হিন্দি—বিরোধী না—হয়ে পারে না; ফলত, দু—দিক থেকেই প্রচুর চাটুবাক্য তাঁর উপর বর্ষিত হতে লাগল। আসছে তাঁর নামে পাঁচটা বৈদেশিক দূতাবাস থেকে নিমন্ত্রণ; দিল্লি, বম্বাই, জলন্ধর, এর্নাকুলাম থেকে নানা অনুষ্ঠানে যোগ দেবার আহ্বান; পূর্ব য়োরোপে বা পূর্ব—দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত—সরকার কর্তৃক প্রেরিতব্য কোনো সাংস্কৃতিক দৌত্যের নেতা হবার জন্য অনুরোধ। কেমন ক’রে তিনি সামলে উঠবেন এ—সব, কী করবেন এগুলোকে নিয়ে? প্রথম ধাক্কায় অসহায় বোধ করলেন বিরূপাক্ষ—উদ্ভ্রান্ত, বিপন্ন, অসহায়, আর সেইজন্যই, যেন টাল সামলাতে না পেরে, এমন দু—একটা কাজ ক’রে ফেললেন যা তাঁর পক্ষে অনুচিত ও অনুপকারী। স্বাক্ষর দিলেন দু—একটা বিবৃতিতে (শুধু আগন্তুকদের সত্বর বিদায় দেবার জন্য, তাতে কী লেখা আছে তা ভালো ক’রে না—প’ড়েই); বহুসংখ্যকের উপরোধে (কেননা অনবরত অসম্মতি জানাতে হলে বড়ো বেশি ক্ষয় হয়) গতানুগতিক বক্তৃতা করলেন কোনো—কোনো সভায়—কিন্তু এরই মধ্যে একটি ছোট্ট ঘটনার ফলে তিনি আত্মরক্ষায় বদ্ধপরিকর হলেন। একদিন তাঁর এক সহকর্মী (বয়সে তাঁর চেয়েও বড়ো) তাঁকে বললেন, ‘একটা কথা বলি বিরূপাক্ষবাবু, আপনি এখন কর্তাদের নেকনজরে আছেন—এই মওকায় একটা মোটা গ্র্যান্ট আদায় করে নিন না “বাক” পত্রিকার জন্য, চাইকি একটু চেষ্টা করলে আমাদের ভাষাবিজ্ঞান—পরিষদের জন্য এক খণ্ড জমিও বাগাতে পারেন।’ ‘নেকনজর’, ‘মওকা’, ‘আদায়’, ‘বাগানো’—এক—একটা কথায় যেন বিরূপাক্ষর অন্ত্রতন্ত্র ককিয়ে উঠল, কিন্তু ঠিক এই ভাষা ব্যবহার করলেন তাঁর প্রবীণ সহকর্মীটি, আর এমন সুরে, চোখের এমন ভঙ্গিসহযোগে, যেন এই পরামর্শমতো কাজ না—করা বিরূপাক্ষর পক্ষে মূঢ়তা হবে। আর বিরূপাক্ষ তৎক্ষণাৎ বুঝে নিলেন এ—অবস্থায় তাঁর কর্তব্য কী; বুঝে নিলেন তাঁর বাঁচার একমাত্র উপায় হলো সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ, দুর্বল পোকার মতো গর্তে লুকোতে হবে তাঁকে, প্রায় নিশ্চল শামুকের মতো বর্ম রচনা করতে হবে নিজেকে ঘিরে। এর পর থেকেই তিনি নির্বিচারে প্রত্যাখ্যান করতে লাগলেন প্রতিটি প্রস্তাব—মৃদুভাবে, দৃঢ়ভাবে, সবিনয়ে, কখনো কিঞ্চিৎ রূঢ়ভাবেও, কখনো কোনো রাজমন্ত্রী বা লোকনায়কের অসন্তোষ উৎপাদন করেও। সেই উগ্র বিজ্ঞাপনের আলো, যা অকস্মাৎ পড়েছিল তাঁর মুখের উপর, তা সাবলীলভাবে অন্যদিকে সরে গেল, কোনো সভায় কেউ বিরূপাক্ষ রায়কে দেখতে পায় না, দিল্লিতে বা কলকাতায় কোনো সমিতির তিনি সদস্য নন, সব রকম তাৎকালিক বিষয়ে নীরব থাকেন বলে তাঁর নাম কখনো কাগজে—পত্রে দেখা যায় না। এই সমাজবিমুখতার জন্য কোনো—কোনো মহলে কিছুদিন পর্যন্ত নিন্দিত হলেন তিনি; কিন্তু যেহেতু পদের তুলনায় পদপ্রার্থীর সংখ্যা সর্বদাই অনেক বেশি, তাই তাঁর অভাব কোথাও অনুভূত হলো না (কেউ—কেউ তাঁর অপসারণে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লেন); প্রভাবশালী পুরুষেরা বর্জন করলেন তাঁকে, জনসাধারণ তাঁর নাম ভুলে গেল; বিরূপাক্ষ আপদভুক্ত হলেন।

ইতিমধ্যে তাঁর পারিবারিক জীবনেও কিছু পরিবর্তন ঘটল। মেয়ে বিয়ে করল তার স্বনির্বাচিত এক তরুণ চিত্রকরকে; সরকারি ভূতত্ত্ববিভাগে চাকরি নিয়ে ছেলে চলে গেল রাঁচিতে; আর তাঁর স্ত্রী সুহাসিনী এক সুখী ও স্বতন্ত্র জীবনধারা গ’ড়ে তুললেন। যৌবনের প্রথম ঝাপট কেটে যাবার পর থেকে স্ত্রীর সঙ্গে বিরূপাক্ষর সম্বন্ধ ধীরে—ধীরে শিথিল হয়ে আসছিল—হয়তো তার কারণ ভাষাবিজ্ঞানে তাঁর অত্যধিক আসক্তি, বা স্ত্রীর দিক থেকে কোনো অচেতন বিমুখতা; বহু বছর ধ’রেই (এষার সঙ্গে সংযোগের কয়েকটা সপ্তাহ বাদ দিয়ে) তাঁর জীবন নারীসম্পর্করহিত, আর সেটাই তাঁর অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। তাই তিনি মনঃক্ষুণ্ন হলেন না যখন, তিনি বিদেশ থেকে ফেরার স্বল্পকাল পরেই, কিছুটা অকালে, তাঁর স্ত্রী প্রাকৃতিক নিয়মে কন্দর্পসেবার ভার থেকে মুক্তি পেলেন। আর এখন, বাড়িতে যখন বলতে গেলে স্বামী—স্ত্রী ছাড়া বাসিন্দা নেই, তখন দু—জনে হয়ে উঠলেন পরস্পরের পক্ষে সুদূর, প্রায় যোগসূত্রহীন। কন্যার (বা কন্যার মধ্যস্থতায় জামাতার) প্রভাবে, সুহাসিনী নিজেকে চিত্রকলার রসজ্ঞ বলে ভাবতে শিখলেন; তাদের সঙ্গে নানা প্রদর্শনীতে যাচ্ছেন তিনি, তরুণ শিল্পীদের বাড়িতে ডেকে আপ্যায়ন করছেন। তাছাড়া তাঁকে কিছুটা ব্যস্ত রাখে তাঁর দক্ষিণ—কলকাতা মহিলা—সংসদ, যার কর্মসচিবরূপে তিনি স্বাধীনতা—দিবস ও প্রজাতন্ত্র—দিবসে রাজভবনে নিমন্ত্রিত হন, নারী—কল্যাণসম্পৃক্ত বিষয়ে মাঝে—মাঝে আলোচনা করেন আকাশ—বাণীতে। আর আছে বছরে দু—বার ছেলের কাছে বেড়াতে যাওয়া, মানভূম—ছোটোনাগপুর অঞ্চলে রমণীয় পার্বত্যভূমিতে মোটরভ্রমণ, নাতি—নাতনির সঙ্গে বন্ধুস্থাপনের অনাবিল আনন্দ। এবং যেহেতু এর কোনোটাতেই বিরূপাক্ষ কোনো অংশ নেন না, তাই—শুধু স্ত্রীর সঙ্গে নয়, পুরো পরিবারের সঙ্গেই তাঁর ব্যবধান ক্রমে বেড়েই চলল।

এ নিয়ে প্রথম—প্রথম ছোটোখাটো সংঘর্ষ হয়নি তা নয়। মেয়ের নতুন বিয়ের পর সুহাসিনীর মুখে এই অভিযোগটি প্রখর হয়ে উঠেছিল যে বিরূপাক্ষর মতো একজন বিদ্বান মানুষ, যাঁর মতামতের কিছু মূল্য আছে বলে ধ’রে নেয়া যায়, তিনি অসিত সামন্তর ছবি বিষয়ে একেবারে নীরব। ‘নিজের জামাই বলে বলছি না, কিন্তু সত্যিই তো ওর ছবি খুব ভালো—অসাধারণ!’ এখন বিরূপাক্ষ ছবি বলতে বোঝেন এমন জিনিস, যাতে চিত্রিত বিষয়গুলিকে স্পষ্টভাবে চেনা যায়, তাকানোমাত্র ধরা পড়ে জল, পাহাড়, জন্তু, মানুষ, দেবদেবী ইত্যাদি, সব মিলিয়ে একটা দৃশ্যমান কাহিনীর মতো যেন—যার কিছু—কিছু নমুনা সেবার বিদেশে দেখে তাঁর অবস্থা হয়েছিল ময়—নির্মিত ইন্দ্রপ্রস্থে দুর্যোধনের মতো—ছবিতে আঁকা আহত সৈনিকের বুক থেকে গড়িয়ে—পড়া টাটকা লাল রক্তের ফোঁটা মুছে দেবার জন্য প্রায় রুমাল বের করেছিলেন, ওই উজ্জ্বল রৌদ্রের ঝলক যে প্রাকৃত বস্তু নয়, একটি পটের উপর বর্ণলেপনের ফলাফল মাত্র, তা বুঝে নিতে একটু সময় লেগেছিল। অবশ্য মোগল বা রাজপুত ছবিতে রাধার অভিসার বা দোলখেলাও তাঁর মন্দ লাগে না, মানুষগুলো পুতুলের মতো হলেও দেখামাত্রই বোঝা যায় ব্যাপারটা কী—কিন্তু অসিতের হাতের কাজ, তাঁর মনে হয়, কোনো শিশুরও হতে পারত: ভাঙাচোরা, আঁকাবাঁকা লাইন, আবোলতাবোল রঙের ছোপ, মোটের উপর আমাদের চেনা কোনো—কিছুর মতো নয়—এমনকি এটুকু পর্যন্ত মালুম হয় না যে ছবিটা মাথার উপর দাঁড়িয়ে আছে কি নেই। তাঁর বুদ্ধি তাঁকে জপায় যে এটাই হয়তো নতুন কায়দা (কেননা এ—ধরনের কিছু নমুনা তিনি বিদেশেও সেবার দেখেছিলেন)—কিন্তু সে যা—ই হোক, এ—সবে কিছু এসে যায় না তাঁর, তাঁর জীবন থেকে এগুলো শতযোজন দূরে। সেজন্যই নীরব থাকেন তিনি; পাছে তাঁর স্ত্রী, বা কন্যা, বা স্বয়ং শিল্পী—জামাতা ও—সব ছবির রহস্য তাঁকে বোঝাতে শুরু করে, সেই আশঙ্কায় মনের ভাবটি খুলেও বলেন না। এই সময়ে মাঝে—মাঝে সুহাসিনীর সঙ্গে তাঁর এই ধরনের নিভৃত সংলাপ চলত:

‘শনিবার অসিতের এগজিবিশন খুলবে আর্ট—সেন্টারে। তুমি আসছো তো?’

‘দেখি।’

‘এর মধ্যে আবার দেখাদেখির কী আছে। এই প্রথম অসিতের একলার এগজিবিশন হচ্ছে—আর তুমি আসবে না, এ কি হয়!’

‘আমি ছবির কিছু বুঝি না।’

‘ছবি তো বোঝার জিনিস নয়, দেখার জিনিস।’ (একটু আত্মসচেতনভাবে কথাটা বলেন সুহাসিনী, আর বিরূপাক্ষ মনে—মনে বলেন, ‘খুকুর কথা, খুকু অসিতের মুখে রোজ শোনে, আর অসিত হয়তো কোনো বইতে পড়েছিল কখনো।’)

‘আমি—মানে—আমি ব্যস্ত থাকি তো।’

‘ব্যস্ত তো সবাই থাকে। তাই বলে কি আর—কিছু করে না?’

‘বেশ, যাবো।’

‘তোমার কোনো উৎসাহ নেই কেন, বলো তো? এ—সপ্তাহের “অভিযান”—এ অসিতের কথা কী লিখেছে, জানো?’

‘কী?’

‘লিখেছে—“নক্ষত্রলোক” ছবিটির জন্য অসিত সামন্তকে আমরা সর্বান্তঃকরণে অভিনন্দন জানাই।’

‘বাঃ!’

‘একদিন অসিতের ফাইলটা তোমাকে দেখতে দেবো।’

‘ফাইল? ফাইল কিসের?’

‘যেখানে যা রিভিউ বেরোয় তার কাটিং আরকি। দেখবে, কত লোক কত ভালো কথা বলেছে।’

বিরূপাক্ষ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘শনিবারের এগজিবিশনে লেডি প্রমীলা চ্যাটার্জি আসছেন। উদ্বোধন করবেন—কে বলো তো?—শঙ্করানন্দ সিংহরায়!’

নামটা অস্পষ্টভাবে চেনা মনে হয় বিরূপাক্ষর।

‘ভেবে দেখো, অত বড়ো একজন ফিল্ম—ডিরেক্টর, দেশে—বিদেশে কত নাম—তিনি উদ্বোধন করবেন! অসিতের ইচ্ছে ফিল্ম—লাইনে কিছু কাজ করে—এই পোড়া দেশে ছবির তো বিক্রি নেই, কিন্তু ফিল্মে পয়সা আছে—শঙ্করানন্দর পরের প্রোডাকশনে অসিত যদি আর্ট—ডিরেক্টর হতে পারে—’

‘নিশ্চয়ই! নিশ্চয়ই!’ সুহাসিনীর কথায় বাধা দিয়ে বিরূপাক্ষ ব’লে ওঠেন, ‘সে তো খুব ভালো কথা।’

‘বাইরে এত প্রশংসা—আর তুমি ঘরের লোক হয়ে কিছু বলো না, এটা কি ভালো দেখাচ্ছে?’

‘কী বলতে বলো আমাকে?’

‘তুমি কী বলবে তাও আমি ব’লে দেবো!’ সুহাসিনী ঝাঁঝিয়ে ওঠেন এবার। ‘তোমার নিজের মেয়ে—জামাই—তাদের জন্য কি এতটুকু দরদ নেই তোমার! শুধু তো শ্বশুর নও—দেশের মধ্যে একজন গণ্যমান্য মানুষ তুমি—তোমার কাছে উৎসাহ পেলে অসিতের কত আনন্দ হবে বোঝো না?’

এর পর সুহাসিনী আরো কিছুক্ষণ ধ’রে খেদোক্তি ক’রে চলেন, বিরূপাক্ষ রা কাড়েন না।

কিংবা কয়েক বছর পরে:

‘তুমি তাহলে যাচ্ছো না?’

‘বলেছি তো—’

‘লীলা এতবার ক’রে বলেছে তোমাকে, চিঠিতে লিখেছে—’

‘আমার কাজ আছে এখানে।’

‘বেশ তো। তোমার বইপত্র নিয়েই চলো। মস্ত বাংলো পেয়েছে দেবু—এখানকার মতোই আলাদা ঘরে থাকবে, কেউ তোমাকে বিরক্ত করবে না।’

একটু ভেবে বিরূপাক্ষ জবাব দেন, ‘কিন্তু কখন কোন বইটার দরকার হবে তা কি আগে থেকে বলা যায়?’

‘ওদের একবার দেখতেও ইচ্ছে করে না তোমার?’

‘বাঃ, দেখা তো হয়। ওরা তো আসে মাঝে—মাঝে।’

‘ওদের আসা, আর তোমার যাওয়া—এ—দুটো কি এক হলো? তুমি গেলে ওরা কত খুশি হবে ভাবো তো! দিনে—দিনে কেমন অদ্ভুত হয়ে যাচ্ছো তুমি—একটা ফুটফুটে ছোট্ট নাতনি, তাকে এ—পর্যন্ত একবার কোলে নিয়েও তো দেখলে না!’

‘তাকে কোলে নেবার লোকের তো অভাব নেই,’ অন্যমনস্কভাবে একটা বেফাঁস কথা ব’লে ফেলেন বিরূপাক্ষ।

দুই ঘূর্ণিত চোখে তিরস্কার ছিটিয়ে সুহাসিনী চাপা গলায় বলে ওঠেন, ‘আশ্চর্য! তুমি কি একটা মানুষ!’

কিন্তু এই ধরনের বিতণ্ডাও এখন অতীতের কথা। তিনি স্বার্থপর, তিনি আত্মকেন্দ্রিক, নিজের একটি অতি ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে আটকে আছেন সব সময়, নিজের সন্তানের জন্যও কোনো মমত্ববোধ নেই তাঁর, নিজেকে ছাড়া কাউকে তিনি ভালোবাসেন না—এই সব কথা শুনে—শুনে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন বিরূপাক্ষ, সুহাসিনীরও ব’লে—ব’লে ক্লান্তি এসে গেছে। বিরূপাক্ষ যে কোনো আমোদে—উৎসবে যোগ দেন না, নিকটতম আত্মীয়দের সন্তোষসাধনের জন্যও এক চুল স’রে আসেন না তাঁর নিয়মাবদ্ধ দিনযাপন থেকে—এ নিয়ে কোনো প্রতিবাদও আর ওঠে না আজকাল, কেউ কিছু আশা করে না তাঁর কাছে, সবাই তাঁকে মেনে নিয়েছে। মেনে নিয়েছে—তিনি যা, ঠিক তা—ই ব’লে, ‘স্বামী’ বা ‘বাবা’ বা ‘দাদামশায়ের’ মার্কা—মারা একটি শূন্য হিশেবে, যেন তিনি এই বাড়িতে থেকেও নেই, যেন স্বাভাবিক স্নেহবৃত্তিতে আবদ্ধ হলেও তাঁর সঙ্গে তাঁর পরিবারের কোনো সংযোগ এখন সম্ভবপরতার পরপারে। সুহাসিনী মাঝে—মাঝে করুণার সুরে ছেলে—মেয়েকে বলেন, ‘সারা জীবন মরা অক্ষর ঘেঁটে—ঘেঁটে মানুষটার মনই ম’রে গেছে—এ—রকম উনি ছিলেন না আগে, তোরা তো দেখেছিস—’ আর অন্যেরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে প্রসঙ্গটাকে চাপা দিয়ে দেয়, কেননা সকলেই জানে এ নিয়ে কথা ব’লে কোনো লাভ নেই।

***

কিন্তু তবু, এতদূর পর্যন্ত নির্ভার ও বিচ্ছিন্ন হয়েও, এমন বিক্ষেপহীন অখণ্ড অবকাশ পেয়েও, বিরূপাক্ষ এই দশ বছরে তাঁর আসল কাজে প্রায় কিছুই এগোতে পারলেন না। অবিরাম শ্রম, ঋতুনিরপেক্ষ প্রয়াস—তা থেকে উদ্গত হয়েছিল শুধু সেই তিনটি ক্ষুদ্র পুঁথি, যার বিপজ্জনক সাংসারিক পরিণাম থেকে তিনি সযত্নে রক্ষা করেছিলেন নিজেকে। ওগুলো কিছু নয়—দু—একটি প্রাথমিক পল্লব শুধু, তাতে এমন কোনো নির্দেশ নেই যে গোল রক্তিম আপেলটিতে তিনি অবশেষে দাঁত বসাতে পারবেন। নিশ্চিতি—বহু দূরে; প্রমাণ—কিছুই নেই। সেই পত্রখানা এখনো তেমনি দুর্ভেদ্য হয়ে আছে, যেমন ছিল দশ বছর আগে রোমে এক গ্রীষ্মের সকালে। সেটিকে ঘিরে—ঘিরে অনেক ঘুরেছেন তিনি; বেরিয়ে এসেছেন তাঁর ‘ইন্দো—য়োরোপীয়’ গণ্ডি ছেড়ে, কিছুটা হিব্রু আর চৈনিক শিখে নিয়েছেন, দিনের পর দিন ন্যুব্জপৃষ্ঠ হয়ে কাটিয়েছেন ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে; বহু বই ঘেঁটে কয়েকটি লুপ্ত লিপির সঙ্গে কিঞ্চিৎ পরিচিত হয়েছেন; তাঁর নিজের অর্থাভাব (কেননা তাঁর ভাগ্য তাঁকে ধনের পথে পা বাড়াবার ক্ষমতা দেয়নি), ভারতে বিদেশী মুদ্রার অনটন, বিদেশী বইয়ের আমদানির হ্রস্বীকরণ—এই সব বাধা ডিঙিয়ে আনিয়েছেন লন্ডন থেকে অনেকগুলি স্বল্পখ্যাত ভাষার অভিধান, অনেক রাত্রে তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমোননি; আর তবু, এই ব্যাসকূট এখনো ভেদ করতে পারলেন না।

অবশ্য অনেক আলোকবিন্দুও তিনি পেরিয়ে এসেছেন। অনেক মুহূর্ত, যখন প্রেমিকের সঙ্গে মিলনের ক্ষণে অসতী স্ত্রীর ব্যগ্রতা নিয়ে আঁকড়ে ধরেছেন কলম, লিখতে শুরু করেছেন যা সে—মুহূর্তে তাঁর মনে হয়েছে ওই পত্রের আক্ষরিক অনুবাদ। কিন্তু প্রথম কয়েকটি বাক্য লেখার পরেই সংশয় তাঁকে স্তম্ভিত ক’রে দিয়েছে, পরবর্তী বাক্যটি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোন রন্ধ্রে লুকিয়ে আছে, আর তিনি কেমন ক’রে তার সন্ধান পাবেন—এই কুটিল ও অফুরান চিন্তায় তাঁর ধূসর মাথাটি নুয়ে পড়েছে টেবিলের উপর। দশ বছরে প্রায় সাড়ে—তিনশো টুকরো তিনি লিখে উঠেছেন, তাছাড়া অগুনতি টীকা—টিপ্পনী—শব্দার্থ, সম্ভবপর অন্বয়, সম্ভবপর ব্যাকরণের বিবিধ অনুপুঙ্খ—বারোখানা মোটা খাতাভর্তি আঁকিবুঁকি হিজিবিজি লেখা, যার অর্থ তাঁর নিজেরই কাছে এখন অস্পষ্ট—যতবার ভাবেন, এই বুঝি গুপ্ত চাবি হাতে এসে গেল, ততবার সেই বিভ্রান্তি আরো বেড়ে যায়। এর প্রধান কারণ—তাঁর অনুমিত বা কল্পিত অনুবাদগুলির বিষয়গত অনৌচিত্য ও অসংগতি, যাকে হাস্যকর বললে অত্যুক্তি হয় না। কোনোটায় যেন পাওয়া যায় সে—বছরের আসন্ন হৈমন্তিক ঋতুর মেয়েলি ফ্যাশনের বর্ণনা (‘এবারে মেয়েদের ফ্যাশন লুঠ ক’রে নেবে তোমাদের দেশের চিতাবাঘ আর ময়ূর!’); কোনোটায় যেন রুশ—মার্কিন ঠান্ডা লড়াইয়ের সূক্ষ্ম রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করা হচ্ছে; আবার কোনোটাকে দেশান্তরগামী পাখিদের বিষয়ে একটি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধের আরম্ভ বলে মনে হয়। কোনোটায় ধরা পড়ে অবিশ্বাস্য অশ্লীলতা, আবার কোনোটা যেন রবিবারে কোনো মেথডিস্ট পাদ্রির সাংসারিক সদুপদেশ। স্পষ্টত, এর একটাও তাঁর অন্বিষ্ট বার্তা হতে পারে না; স্পষ্টত, প্রত্যেকটাই ভুল। দূরত্বের একটি সূক্ষ্মতম অংশও তিনি পেরোতে পারেননি এখনো।

ক্লান্তির মুহূর্তে কখনো তিনি ভেবেছেন এষাকেই লিখবেন এই রহস্য উদ্ঘাটন ক’রে দিতে, কিন্তু নানা কারণে সেটা তাঁর যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়নি। প্রথমত, এষার নিজের কাছে এই বিচিত্র লিপির প্রতিলিপি নাও থাকতে পারে, আর চিঠিখানা তিনি মুহূর্তের জন্যও হাতছাড়া করতে নারাজ—নয়তো ব্লক করিয়ে যত ইচ্ছে ছাপা কপিও পেতে পারতেন। অবশ্য বিরূপাক্ষ তাঁর খাতার পাতায় প্রায় পঞ্চাশটি প্রতিলিপি এঁকে রেখেছেন—তাঁর যতদূর বিশ্বাস শেষ তিনটি একেবারে নিখুঁত, অতএব এষাকে একটি প্রতিলিপি পাঠিয়ে দেবার কোনো বাধাই ছিল না। কিন্তু—অনেকদিন হয়ে গেল, এমন যদি হয় এই হেঁয়ালির অর্থ এষা নিজেই এখন ভুলে গেছে? যদি এমন হয় সে নিজে ভুলে গেছে, এখন আমার কাছে জানতে চায় কী লিখেছিল? খুব সম্ভব তা—ই, খুব সম্ভব তা—ই। রোজ ডাকবাক্স হাতড়ে দেখে এষা—সেই আশায়। মাঝে—মাঝে টেলিফোনের শব্দে চমকে ওঠে। ‘আশ্চর্য! তুমি বুঝতে পারছো না? … তুমি!’ কী অগাধ আস্থা আমার ওপর, আমাকে অন্য কারো সাহায্য নিতে দেবে না, আমাকে সে করে দিল একেবারে নিঃসঙ্গ, সম্পূর্ণ স্বনির্ভর। এখন যদি আমি তারই কাছে উত্তর জানতে চাই, তাহলে কি আমি অযোগ্য বলে প্রমাণিত হব না—শুধু অযোগ্য নয়, প্রতারক? পাশা খেলতে ব’সে যারা ঠকায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় যারা বই থেকে টোকে, যারা চায় লটারির টিকিট কিনে রাতারাতি লক্ষপতি হতে—আমি তো, আর যা—ই হোক, তাদের দলভুক্ত নই। এত অনিশ্চয়তার মধ্যেও বিরূপাক্ষর দুটি বিশ্বাস অটল থেকে যায়: (১) এই চিঠি এষার অনির্বাণ ভালোবাসারই নিদর্শন—তিনি যাতে না ভোলেন, যাতে মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে না ভোলেন, সেইজন্যই এই কঠিন প্যাঁচে সে ফেলেছে তাঁকে, এবং অতএব (২) এর মর্মোদ্ধার একান্তভাবে তাঁরই কৃত্য, এবং তাঁর পক্ষে সম্ভব। কেমন অস্পষ্টভাবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে তাঁর মনে হয় যে এই প্রতিজ্ঞায় যেহেতু তাঁকে বাঁধা হয়েছে, সেজন্যেই তা পালনের শক্তি তাঁর মধ্যে নিহিত আছে ব’লে ধরে নিতে হবে। বাধা আর কিছুই নেই—এখনো যথেষ্ট মন দিতে পারছি না; বাইরের কারুকার্যে মুগ্ধ হয়ে বোধহয় পেটিকার ঢাকনা খুলতেই ভুলে যাচ্ছি।

এইজন্য, বেশ সুচিন্তিতভাবেই, অনেকবার লুব্ধ হওয়া সত্ত্বেও, বিরূপাক্ষ এষার সঙ্গে কোনোরকম যোগস্থাপন থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিলেন। অসম্ভব ছিল না তাঁর পক্ষে আর—একবার সেই দূর দেশে যাওয়া, যেখানে এক অখ্যাত শহরে এষাকে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন। কোনো—এক সময়ে—যখন তাঁর উপর স্বদেশী সরকারের এবং বৈদেশিক দূতাবাসগুলির সুদৃষ্টি পড়েছিল, সে—রকম একটা কথাও উঠেছিল একবার; কিন্তু তিনি ইচ্ছে ক’রেই (বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ক’রে) সম্ভাবনাটিকে চাপা পড়তে দিয়েছিলেন। না—উচিত হবে না, যতদিন না তারই দেয়া এই কাজটুকু ক’রে উঠতে পারছি, ততদিন এষার সঙ্গে আবার দেখা করার আমি অধিকারী নই। সে, আমার নম্র, মৃদুভাষিণী প্রেমিকা—সে ধৈর্যশীলভাবে অপেক্ষা ক’রে আছে আমার মুখে তার চিঠির অর্থ শোনার জন্য। সে যা ভুলে গেছে তা আমি তাকে মনে করিয়ে দেবো—এইজন্য তার অপেক্ষা। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর।

কিন্তু কে এই এষা, যাকে বা যার স্মৃতিকে এই প্রৌঢ় পণ্ডিত উৎসর্গ ক’রে দিয়েছেন তাঁর সময়, স্বাস্থ্য, অভিনিবেশ? আর ‘স্মৃতি’, ওই গুরুভার, রশ্মিচ্ছুরিত শব্দ, তারই বা অর্থ কী? বললে আর কি আমার নাড়ি চঞ্চল হয়? ঘুমের ঘোরে আর কি তার কণ্ঠস্বর আমি শুনতে পাই? তার নাম মনে—মনে জপলে আর কি বালিশে কান পাতলে স্পষ্টভাবে মনে পড়ে তার মুখ? যদি এমনকি সে হঠাৎ আমার দরজায় টোকা দেয় একদিন, আমি কি তাকে দেখামাত্র চিনতে পারবো? এই সব প্রশ্ন মাঝে—মাঝে ভেসে ওঠে তাঁর মনে, তিনি তক্ষুনি ঠেলে সরিয়ে দেন। আর এটাই হয়তো গভীরতর কারণ, যেজন্য কোনোরকম প্রত্যক্ষ যোগসাধনের চেষ্টা তিনি করেননি কখনো। পাছে দেখা হলে পুরোনো সুর ফিরে না আসে। পাছে খুচরো কথায় বেলা বয়ে যায়, যেন আমরা দু—জন অতি সাধারণ পরিচিত মাত্র। পাছে চিঠি লিখলে এমন উত্তর আসে, যা অন্য যে—কেউ লিখতে পারত। না, ও—ভাবে নয়, কোনো সহজ পথে নয়—ও—পথে আমার গন্তব্যে আমি পৌঁছবো না। এষা কে, কী, কেমন, তাতে কী এসে যায়। কী এসে যায়, যদি সে আমার কাছ থেকে অপরিমেয় দূরে সরে গিয়ে থাকে? আমি তো সেই দূরকেই ছুঁয়ে আছি, ঝর্না যেমন তার যাত্রার আরম্ভক্ষণেই ছুঁয়ে থাকে সমুদ্রকে, তেমনি। চিঠি, এই চিঠি আছে আমার: তার চরম বার্তা—তার নামাঙ্কিত সর্বশেষ উপহার—এ—ই যথেষ্ট। এমনি, পর—পর বছরগুলি যেমন কেটে গেছে, এমনি ভেবেছেন বিরূপাক্ষ, স্পষ্টত সচেতনভাবেও নয়। সত্যি বলতে, সময়ের ঢেউ লেগে—লেগে তথ্যগুলি সব ধ্বসে গিয়েছিল—এমনকি এক—এক সময় মধ্য—পশ্চিম আমেরিকার সেই ছোটো শহরটির নামও তিনি মনে করতে পারেন না; এষার বাড়ির নম্বর ছিল ১৩০২ না ১২০৩, সে—বিষয়ে নিশ্চিত হতে হলে হলদে হয়ে যাওয়া নোটবইয়ের পাতা ওল্টাতে হয়—কিন্তু এই ধারাবাহিক অবক্ষয়ের মধ্যে স্থির হয়ে আছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাঁর মনের মধ্যে অবিরতভাবে রূপান্তরিত হচ্ছে—একটি ধারণা, তাঁর অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু যেন—এই চিঠি, অক্ষর, সম্ভাব্য কোনো সমাচার।

এক—এক রাত্রে বিরূপাক্ষ তাঁর খাতাপত্র খুলে বসেন, তাঁরই কলমের আঁকিবুঁকিতে বিক্ষত পাতাগুলি ওল্টাতে ওল্টাতে উৎসাহ আর নৈরাশ্যের দুই প্রান্তের মধ্যে পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকে তাঁর মন। মাঝে—মাঝে নুয়ে পড়েন রহস্যলিপিটির উপর, টেবল—ল্যাম্পের আলোর তলায় সেটিকে টান ক’রে ধ’রে, যেমন করেছিলেন প্রথম এটি হাতে পাবার পর রোমের হোটেলে, যেন আশা যে এখন—পর্যন্ত—অনাবিষ্কৃত কোনো নতুন অক্ষর ফুটে উঠবে হঠাৎ, বা দৃশ্যমান অক্ষরগুলির মধ্যে কোনো নতুন সম্বন্ধ ধরা পড়বে। নিশ্চয়ই কোনো নিয়ম লুকিয়ে আছে এর তলায়, কোনো গাণিতিক সূত্র—নিশ্চয়ই ব্যাপারটা আসলে খুব সরল, যেমন একবার সংখ্যার বদলে চিহ্নকে কাজে লাগাতে পারলে অবশিষ্ট বীজগণিত নিজে থেকেই উন্মীলিত হয়, এও নিশ্চয়ই তেমনি। কিন্তু কেন আমি এত চেষ্টা করেও সেই মূলসূত্রটি খুঁজে পাচ্ছি না? বিরূপাক্ষ নিজের উপর বিরক্ত হন তাঁর টীকা—টিপ্পনীগুলি অমন বিশৃঙ্খল বলে, তার যখন যা মনে এসেছে তা—ই লিখে রেখেছেন, কোনো আঁটো পদ্ধতি অনুসরণ করেননি—তাঁর কি উচিত ছিল মার্কিনী প্রথায় কার্ড—ইনডেক্স সাজানো, বর্ণানুক্রমিক নির্ঘণ্ট তৈরি করা? এই চিঠির সঙ্গে আপাতত যা অসম্পৃক্ত, সেই তিব্বতি ও সিংহলি ভাষার চর্চা ক’রে তিনি কি তাঁর লক্ষ্য থেকে আরো দূরে এসেছেন? কিন্তু পদ্ধতি—তা—ই কি সব? আসল কথাটা কি দৃষ্টি নয়, দৃষ্টির ক্ষমতা যথোচিত হলেই কি সব রহস্য উন্মোচিত হয় না? কয়েক বছর আগে আমার ছোটো অক্ষর পড়তে কষ্ট হচ্ছিল, ঝাপসা দেখতাম, চশমা নেয়ামাত্র সব পরিষ্কার হয়ে গেল। গ্যালিলিও তাঁর নিজের তৈরি দূরবীন দিয়ে তাকিয়ে, তবে চাঁদের পাহাড় দেখতে পেলেন। রঞ্জন—রশ্মির সাহায্যে দেখা গেল সজীব মানুষের কঙ্কাল, তার ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড। কিন্তু কোথায় সেই আশ্চর্য রশ্মি, যা এই কাগজখানাকে ফুঁড়ে বেরিয়ে যেতে পারবে, অনেক দূরে, যেখানে অপেক্ষা ক’রে আছে আমার জন্য সব তর্কের অতীত এক নিশ্চিতি?

রাত ভারি হয়, বেজে যায় একটা, দেড়টা, দুটো, চোখে ঘুমের নেশা ও মনের তলায় অশান্তি নিয়ে ঝাপসা হয়ে ব’সে থাকেন বিরূপাক্ষ, যেন এক মৃদু উত্তেজনা গায়ে জড়িয়ে, রাত্রির নীরবতায় আচ্ছন্ন। তন্দ্রার চাপে তাঁর ভাবনাগুলি এলোমেলো হয়ে ওঠে; যে—বিশ্বাস তাঁর মধ্যে বদ্ধমূল বলে তিনি এতকাল ধ’রে জেনেছেন, তাও যেন হারিয়ে যায় কোনো—কোনো মুহূর্তে, তাঁর মনে ভয়াবহভাবে প্রশ্ন হানা দেয়: এষা ব’লে সত্যি কি কেউ আছে? কখনো ছিল? আমি কি তাকে দেখেছিলাম কখনো, ছুঁয়েছিলাম? যদি সে আমার কল্পনা না হয়, যদি সত্যি তার অস্তিত্ব থাকে কোথাও, তবে সে আসে না কেন? কোনো কথা কেন বলে না? তাকে আসতেই হবে, প্রমাণ করতে হবে নিজেকে, আমার উপর সমস্ত ভার চাপিয়ে দিয়ে নিজে নিষ্ক্রিয় থাকার অধিকার তার নেই। কখনো—কখনো ঘুমের পর্দা ঠেলে তাঁর চোখের সামনে ফুটে ওঠে নারীমূর্তি—ব’সে আছে তাঁর টেবিলের পাশে ইজি—চেয়ারে, ঘরের সে—দিকটায় ছায়া বলে তার মুখ অস্পষ্ট, কিন্তু তার দেহের রেখাগুলি যেন মূক নয়, যেন সর্বাঙ্গ দিয়ে শব্দহীনভাবে কিছু বলছে সে, বলতে চাইছে। কিন্তু—কী? বিরূপাক্ষ কান পাতেন, মন দিয়ে শোনার জন্য এলিয়ে দেন মাথা, কেমন একটা ঝিমঝিম শব্দ, কোনো ছোট্ট পোকার একটানা গুঞ্জনের মতো, শুনতে—শুনতে ঝামরে নামে ঘুম, হঠাৎ জেগে উঠে দেখতে পান আলোর তলায় সেই কাগজখানাকে। হিব্রু হরফ, গ্রিক হরফ, দেবনাগরি। তাঁর সন্ধান, তাঁর জীবনের কাজ, তাঁর পরীক্ষা। এর পরে আরো যদি প্রমাণ চাই তবে কি আমি নিজেরই দৈন্য প্রমাণ করব না? বিরূপাক্ষ খাতাপত্র সরিয়ে উঠে দাঁড়ান, মনে হয় তাঁর কেন্দ্রে তিনি ফিরে এলেন এবার, আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়েন কিন্তু অনেকক্ষণ পর্যন্ত ঘুম আসে না।

এমনি দোলা—তাঁর দিনে, তাঁর রাত্রে; অন্য যা—কিছু তাঁকে করতে হয়, তার সঙ্গে—সঙ্গে, অন্তরালে।

দশ বছর কাটল। ইতিমধ্যে আরো একটি পুঁথি প্রকাশ করলেন বিরূপাক্ষ: শো—দেড়েক পৃষ্ঠা মূল লিখন, সাতাশি পৃষ্ঠা টীকা—হরেক রকম চিহ্নে ও লিপিতে সমাকীর্ণ—তার শিরোনামা: ‘চৈনিক, রাশিয়ান ও প্রাচীন ইরানির সঙ্গে সংস্কৃতের সম্বন্ধ বিষয়ক প্রস্তাব’—যাতে ইন্দো—ইয়োরোপীয় ভাষাসমূহের উৎপত্তি বিষয়ে নতুন একটি ধারণা উপস্থিত করা হয়েছে। বিদেশী পণ্ডিতমহলে এটি আরো বেশি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করল, অনেক বাদানুবাদ হলো তাঁর প্রতিপাদ্য নিয়ে, অনেকেই তীব্র প্রতিবাদ করলেন, কেউ নিবন্ধটিকে চিহ্নিত করলেন ‘বৈপ্লবিক’ ব’লে, আবার কেউ বা আক্ষেপ করলেন এই ব’লে যে অন্য অনেক হিন্দুর মতোই, শ্রীযুক্ত রে খেদজনকভাবে বিজ্ঞান ছেড়ে মিস্টিসিজম—এর দিকে ঝুঁকেছেন। ছ—মাসের মধ্যে বইটির জর্মান ও ফরাসি অনুবাদ বেরিয়ে গেল, কিন্তু যেহেতু ভারতে তখন রাজনৈতিক বিপর্যয় চলছে, তাই পূর্বোল্লিখিত দুর্ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি হলো না এবার; তাঁর পক্ষে আকাঙ্ক্ষিত ও উপাদেয়ভাবে তাঁর এই নতুন প্রয়াসটি স্বদেশে সম্পূর্ণ অলক্ষিত রয়ে গেল। কাঁটায়—কাঁটায় বাষট্টি বছর বয়সে অধ্যাপনা থেকে অবসর নিলেন তিনি—যদিও চাইলেই আরো বছর তিনেক ঝুলে থাকার কোনো বাধা ছিল না, আর সুহাসিনী সেজন্যে অনেক পিড়াপিড়িও করেছিলেন। একই সময়ে ‘বাক’ পত্রিকার সম্পাদনাভার অর্পণ করলেন এক তরুণতর সহকর্মীকে, অনেক প্রতিবাদ অগ্রাহ্য ক’রে ভাষাবিজ্ঞানপরিষদের সভাপতির পদও ত্যাগ করলেন। এখন তাঁর সমস্ত সময় গবেষণার জন্য তাঁর নিজের দখলে। কিন্তু তাঁর আত্মীয়রা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করল—তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আশাতীতভাবে বদলে গেল এ—সময়ে। এখন আর তিনি পুঁথিপত্রে নাক গুঁজে সারাদিন কাটান না, তেতলায় লাইব্রেরি—ঘরে তাঁর চেয়ারটি প্রায়ই খালি প’ড়ে থাকে, ন্যাশনাল লাইব্রেরির সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ শিথিল। বিদেশ থেকে স্থূলকায় যে—সব জর্নাল আসে—এতদিন যা পাওয়ামাত্র ব্যগ্র হাতে পাতা ওল্টাতেন—সেগুলো অনেক সময় মোড়ক না—খুলে তুলে রাখেন। আরো আশ্চর্য: পারিবারিক সম্মেলনে যোগ দেন মাঝে—মাঝে, পুত্র কন্যা জামাতা পুত্রবধূর সঙ্গে হালকা হাসিঠাট্টায় মেতে ওঠেন—পপ—আর্ট বা বিটলস সংগীত বিষয়েও তাঁকে কৌতূহলী বলে মনে হয়। লক্ষ করা গেল, বাড়িতে যখন কন্যা বা পুত্রবধূর সমবয়সী মেয়ে—বন্ধুরা আসে, তখন তিনি, অন্যদের অগুপ্ত অস্বস্তি ঘটিয়ে, অনাহুতভাবে সেই তরুণীমণ্ডলে কিছুক্ষণ সময় কাটান, কিছুটা বিস্ময়ের চোখে তাকান তাদের দিকে, অনাবশ্যক আলাপ করেন, আর মাঝে—মাঝে এমন চটুল কথাও ব’লে ফেলেন, যা তাঁর বয়স ও মর্যাদার পক্ষে বেমানান। ছেলে কিছুদিন হলো আরো বড়ো পদ নিয়ে কলকাতায় বদলি হয়ে এসেছে; এতদিন যাকে বিশেষ লক্ষ করেননি, সেই পৌত্রী এগারোতে পড়ার পর থেকে হঠাৎ তার সঙ্গে ভাব জমে উঠছে বিরূপাক্ষর, তাকে নিয়ে বেড়াতে যান রবীন্দ্রসরোবরে বা গঙ্গার ধারে, তার ছেলেমানুষি বকুনি শুনতে—শুনতে তাঁর মুখে মুগ্ধতা ফুটে ওঠে। একদিন সকালে তাঁকে উত্তেজিত দেখা গেল দৈনিকপত্রে সদ্যমৃতা মধুবালার ছবি দেখে ও জীবনবৃত্তান্ত প’ড়ে; অমন একজন অসামান্যা রূপসী—যার সচল ও সবাক ছায়ামূর্তি সারা দেশের হৃদয় জয় করেছিল, তার অভিনয় একবারও না—দেখে তাঁকে ম’রে যেতে হবে, এ—কথা ব’লে এমনভাবে আক্ষেপ করতে লাগলেন যাতে ছেলের বৌ উদগত হাসি চাপতে পারল না। ‘আচ্ছা দেখি,’ সান্ত্বনার্থে সে শ্বশুরকে বলল, ‘যদি কোথাও “মুঘল—ই—আজম” আসে, আপনাকে নিয়ে যাবো।’ বিরূপাক্ষ সাগ্রহে জিগেস করলেন, ‘এখনকার সুন্দরী কারা?’ ‘এখন?’ পুত্রবধূ গড়গড় ক’রে কয়েকটা নাম আউড়ে গেল, কার অভিনয়ের কী বৈশিষ্ট্য, তার বর্ণনা দিল, বিরূপাক্ষ মন দিয়ে শুনলেন। ‘এখন সায়রা বানুর একটা বই হচ্ছে। যাবেন?’ ‘বই’? ‘বই’ মানে? ছেলে উত্তর দিল, ‘ফিল্মকেই “বই” বলে আজকাল।’ ‘আজকাল কেন—অনেকদিন ধ’রেই,’ মন্তব্য করল ছেলের—বৌ। ‘সত্যি বলছো? আশ্চর্য! আমি জানতাম না। তবেই বোঝো—’ অনেকদিন আগে শোনা একটা কথার অচেতন প্রতিধ্বনি ক’রে বিরূপাক্ষ অবান্তরভাবে বললেন, ‘তবেই বোঝো, একটা ভাষা পুরোপুরি শিখে ওঠাও কত শক্ত—তায় আবার অনেকগুলো!’ ছেলের—বৌ ততক্ষণে খবর—কাগজে আমোদপ্রমোদের বিজ্ঞাপনগুলো দেখছিল, মুখ তুলে বলল, ‘এই তো “বিজলী”তে হচ্ছে, বলেন তো টিকিট আনতে পাঠাই।’ ‘পাগল নাকি?’ ছেলে কড়া গলায় প্রতিবাদ ক’রে উঠল, ‘বাবার ওপর এই অত্যাচার ক’রে লাভ আছে কিছু!’—কিন্তু সকলকে স্তম্ভিত ক’রে দিয়ে বিরূপাক্ষ এক সপ্তাহের মধ্যে পরিবারের মহিলা ক—টিকে সঙ্গে নিয়ে দু—দুটো হিন্দি ফিল্ম দেখে এলেন—যাতে সায়রা বানু আর তনুজা রূপায়িত। মেয়ে বলেছিল, ‘আমি লিখে দিতে পারি, বাবা দশ মিনিটের মধ্যে পাগল হয়ে বেরিয়ে আসবেন হল থেকে—’, কিন্তু সে—রকম কিছু ঘটল না, বরং বাড়ি ফিরে এসে বিরূপাক্ষ দুই নায়িকার রূপ ও অভিনয়নৈপুণ্য নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করলেন অনেকক্ষণ ধ’রে।

তাঁর এই অদ্ভুত পরিবর্তন—যাতে পরিবারবর্গের খুশি হবার কথা ছিল—তা কিন্তু কারো মনেই আশানুরূপ প্রীতি উৎপাদন করল না। বহুদিনের অভ্যাসবশত (আর সত্যি বলতে তাঁর অনুপস্থিতি কারো কোনো অসুবিধে ঘটায়নি বলেও) সকলেরই মনে হলো যে অন্য সব বিষয়ে নির্লিপ্ত ও উদাসীন থেকে, তেতলার লাইব্রেরি—ঘরে দিন কাটালেই তাঁকে মানায়; যেন তাঁর পাণ্ডিত্যের তুঙ্গ শিখর থেকে বড়ো সাধারণ স্তরে নেমে আসছেন তিনি; তাঁর কাছে অনেক সময় অনেক আঘাত পেয়েও তিনি একজন ‘অসাধারণ মানুষ’ ব’লে তাদের মনে যে—গর্বটুকু ছিল তা যেন তিনি অন্যায়ভাবে ভেঙে দিচ্ছেন। কন্যার মনে নতুন ক’রে অভিমান হলো এ—কথা ভেবে যে বাবা অসিতের ছবি নিয়ে কখনো কিছু বলেননি আর আজ সস্তা হিন্দি ফিল্ম নিয়ে ছেলেমানুষের মতো মাতামাতি করছেন, তাই সে প্রতিবাদ করতে পারল না যখন অসিত একদিন মুচকি হেসে বলল, ‘তোমার বাবার ঘিলু গ’লে যাচ্ছে,’ এদিকে সুহাসিনীও একদিন কথায় কথায় ছেলের—বৌকে বললেন, ‘তোমার শ্বশুরকে আর সিনেমা দেখার জন্য খেপিও না তো, শেষটায় না ভীমরতিতে ধরে।’

অবশ্য বিরূপাক্ষ তখনও তাঁর গোপন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, শুধু তাঁর রণকৌশল বদলে গিয়েছিল। পুরো সমস্যাটিকে এখন এক ভিন্ন দিক থেকে দেখতে পাচ্ছেন তিনি; কোনো—কোনো তন্দ্রাচ্ছন্ন গভীর রাত্রে তিনি ইতিপূর্বে যা অনুভব করেছিলেন, এখন তা—ই বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে; অর্থাৎ তিনি মেনে নিয়েছেন যে তথাকথিত ‘বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি’, যার অনুসরণের আপ্রাণ চেষ্টা তিনি করেছেন এতদিন—এই বিশেষ ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। এতদিন ধ’রে এত দিক থেকে আক্রমণ ক’রে আসছি লিপিটিকে; বাঁয়ে থেকে ডাইনে, ডাইনে থেকে বাঁয়ে, উপর থেকে নিচে, কোনাকুনি; অনেক রকম সাংকেতিক বর্ণমালা উদ্ভাবন করে, অনেক রকম মিশ্রভাষার কাঠামো গ’ড়ে তুলে, কিন্তু যা ফলাফল পেয়েছি তা সবই অগ্রাহ্য, সবই আরো ভুল পথে আমাকে নিয়ে গিয়েছে। ক্রমশ তাঁর মনে হতে লাগল তাঁর ভাষাজ্ঞানও আসলে অজ্ঞানতারই একটি প্রচ্ছদমাত্র; এত ছোটো এই জীবন (আবার অচেতনভাবে অন্য একজনের প্রতিধ্বনি ক’রে তিনি ভাবলেন)—এর মধ্যে ক—টাই বা ভাষা আমরা শিখতে পারি! অসংখ্য ভাষা আছে, যাদের বিষয়ে অণুমাত্র ধারণা আমার নেই, যাদের অস্তিত্ব আছে ব’লেও আমি জানি না, আর আমি যাদের তুলনায় নগণ্য এক শ্রমিকমাত্র, তেমন সব প্রতিভাবানেরাও সেই বিশাল বাবেল—স্তম্ভের কাছে আমারই মতো শিশু ছাড়া আর কী? বান্টু, সোয়াহিলি, এস্কিমো—সকলেই সবাক ও সুব্যক্ত, মার্কিনী আদিবাসীরা সংখ্যায় হ্রাসপ্রাপ্ত ও অন্য এক বলীয়ান ভাষার দ্বারা পরিবৃত হয়েও, এখনো নাকি শো—পাঁচেক বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে। তাহলে কী নিষ্ফল, কী অর্থহীন এই আমরা, যারা নিজেদের ভাষাবিদ ব’লে ভেবে থাকি—মাত্র দশ, বারো, বা বড়োজোর কুড়িটি ভাষার মূলধন নিয়ে! তাছাড়া, ভাষা তো শুধু মানুষেরই সম্পত্তি নয়; বেড়ালের আছে প্রেমসংগীত, শিম্পাঞ্জিরা তর্কপরায়ণ, গৃহপালিত কুকুর শুধু কণ্ঠস্বরের উচ্চাবচ ছন্দের দ্বারা জানাতে পারে ক্ষুধা, ভয়, আদর ও চোরের আগমন। কিন্তু বুনো কুকুরের গলায় স্বরগ্রামের এই ব্যাপ্তি নেই—বলা হয়ে থাকে, মানুষের সহবাসী হয়ে, মানুষের অনুকরণ ক’রে, গৃহপালিত কুকুর তার ‘ভাষা’ শিখেছে। কিন্তু—এই অনুমান কি সব ক্ষেত্রে গ্রাহ্য? ধরা যাক বাদুড়—মানুষের সংসর্গ থেকে সুদূর সেই দিবান্ধ জীব, যাদের কণ্ঠনিঃসৃত কোনো ধ্বনি আমরা সাধারণ জীবনে কালে—ভদ্রে শুনতে পাই, পঞ্চাশ বছর আগে এক জর্মান পণ্ডিত তাদেরও ভাষার শব্দলিপি প্রকাশ করেছিলেন। আর সম্প্রতি ক্যালিফর্নিয়ায় একদল বিজ্ঞানী জলহস্তীর ভাষা রেকর্ড ক’রে নিয়েছেন, তার স্বরগ্রামের ব্যাপ্তি নাকি মানুষেতর জীবের পক্ষে অসাধারণ। এখন পর্যন্ত মানবসমাজে এই ধারণা চলছে যে মানুষই শুধু সত্যিকার অর্থে ‘কথা বলতে’ পারে—যেহেতু সে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, যেহেতু তার জিহ্বা ও কণ্ঠনালীর ক্ষমতা অসামান্য, যেহেতু তার মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের গঠন অতি জটিল… এই ধরনের নানা যুক্তি সাজিয়ে মানুষই মানুষের শ্রেষ্ঠতা প্রমাণ করেছে। কিন্তু কে জানে হয়তো মাছেরাও বোবা নয়—আমাদেরই কর্ণপটাহের শক্তি অতি সীমিত, আর এমন কোনো যন্ত্রও এখনো বেরোয়নি, যাতে মাছেদের অতি মৃদু বা অতি প্রচণ্ড আওয়াজ ধরা পড়তে পারে। আমরা নিজেরা মানুষ বলে মানুষের চোখেই জগতের দিকে তাকাই, মানুষের মন আর বুদ্ধি নিয়ে অন্য প্রাণীদের আচার—ব্যবহার লক্ষ করি (তা ছাড়া উপায় নেই আমাদের)—এ—অবস্থায় কী ক’রে নিশ্চিত হওয়া যায় যে অন্য প্রাণীদের ভাষা বিষয়ে, বা মানুষের ভাষার উৎস বিষয়ে যা—কিছু এতদিন ধ’রে অনুমিত হয়েছে, সেগুলি সবই নয় বাতাসে—ভেসে—বেড়ানো লতাভন্তুর মতো অস্পষ্ট ও অস্থায়ী?

ভঙ্গি থেকে, নৃত্য থেকে, যুদ্ধ থেকে, চিৎকার বা শীৎকার থেকে—ভাষার জন্ম বিষয়ে যত তত্ত্ব তিনি এককালে পড়েছিলেন, তার কোনোটাকেই বিরূপাক্ষ এখন আর মানতে পারেন না—তাঁর কল্পনায় ভাষাগুলির পরিবারগত বিভাগও লুপ্ত হয়ে গেছে, চৈনিকের সঙ্গে ইংরেজির কিছুমাত্র সম্পর্ক নেই, এই সর্বস্বীকৃত প্রস্তাবেও তিনি সন্দিহান হয়ে উঠেছেন। তাঁর মনে হয় এ—বিষয়ে পুরাণ—কথাই সত্যবাদী। কোনো—এক উচ্চারণ, জড় বিশ্বে প্রথম প্রাণের শিহরন যেন—তারই প্রতিধ্বনি যুগে—যুগান্তরে গড়িয়ে গড়িয়ে রচনা করেছে সেই সব শব্দসমষ্টি, স্বর ও ব্যঞ্জন, প্রস্বর ও অনুস্বর, যার বহুবিচিত্র সামঞ্জস্যকে আমরা ভাষা বলে অভিহিত করি। যেমন জলে ঢিল পড়লে অনেকগুলি সমকেন্দ্রিক বৃত্ত গ’ড়ে ওঠে, এও তেমনি, শুধু তার বিস্তার অনিঃশেষ, ঢেউ কখনো থামে না। প্রতিধ্বনির ঢেউ, অনুরণনের অনুকম্পন—আসল নয়, বিভিন্ন ধরনে ভেজাল, অর্থাৎ, সব ভাষাই আদিভাষার অপভ্রংশমাত্র—সাঁওতাল বা মুণ্ডাদের তথাকথিত অপরিণত ভাষা যতটা, সংস্কৃত বা গ্রিক, ইংরেজি বা ফরাশির মতো তথাকথিত দক্ষ ভাষাও ততটাই। আর তাই আমরা পরস্পরের ভাষা বুঝতে পারি না, একই ভাষায় বা উপভাষায় কথা ব’লেও অনেক সময় পরস্পরকে বুঝতে পারি না; বানর, বাদুড়, জলহস্তীর মন আমাদের কাছে অনাবৃত থেকে যায়, এই জগৎ ও জীবনের যত না আমরা ব্যাখ্যা করি সবই হয় শোচনীয়রূপে আংশিক ও সংশোধনসাপেক্ষ। কিন্তু আসিসির সন্ত ফ্রান্সিস পাখিদের সঙ্গে সংলাপ চালাতেন, গুণাঢ্য ‘পৈশাচিক’ প্রাকৃতে ‘বৃহৎ কথা’ লিখে প’ড়ে শুনিয়েছিলেন বনের পশুদের, অর্ফিউসের গান মুগ্ধ করেছিল বৃক্ষ, শিলা, শ্বাপদবংশকে। এই কাহিনীগুলো এক বিশ্ব—ভাষার দিকেই ইঙ্গিত করছে না কি—কোনো কৃত্রিম এসপেরান্তো বা সওদাগরি বেজিক—ইংলিশ নয়, নয় কোনো বিশেষ ভূখণ্ডে আবদ্ধ বা কোনো ক্ষুদ্র কার্যসিদ্ধির উপায় শুধু—কিন্তু ব্যাপকতম অর্থে সর্বজনীন, নিখিল প্রকৃতির স্বাভাবিক মাতৃভাষা, পৃথিবীর অসংখ্য, বিচ্ছিন্ন অস্তিত্বের মধ্যে যোগসূত্র? যেমন ভগ্নাংশ অন্তহীন হলেও পূর্ণসংখ্যার মধ্যে সবই সমাহৃত থাকে, তেমনি মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর সমস্ত খণ্ড ভাষাকে ধারণ ক’রে আছে সেই আদি বাক্, যা তার নিজের মধ্যে অনন্য ও অমোঘ, কিন্তু বহুর মধ্যে বিকীর্ণ হয়ে আছে বলে আমাদের বিশেষীকৃত বিজ্ঞান যার নাগাল পায় না। তারই কোনো একটি রশ্মি যদি আমাকে ধরা দেয় কখনো, তাহলে পৃথিবীর কোনো ভাষাই আমার অজানা থাকবে না, আর মুহূর্তে প্রাঞ্জল হয়ে যাবে সেই বার্তা, যাকে আক্ষরিক উপায়ে এতদিন ধ’রে খুঁজে—খুঁজে আমি শুধু শ্রান্ত করেছি নিজেকে।

বিরূপাক্ষ তাঁর কল্পনার সাহসে চমকে উঠলেন, প্রথমে প্রায় ভয় পেলেন। আমার পক্ষে উচিত হবে কি সেই পথ থেকে স’রে দাঁড়ানো, যা আমার বহুকালের অভ্যস্ত, আর যাতে বহু জ্ঞানীজন তাদের পদচিহ্ন এঁকে রেখে গেছেন? আমি যা ভাবছি তাতে কোনো বিচারবুদ্ধির সমর্থন তো নেই। কিন্তু কোনো বিচারবুদ্ধি কি রঞ্জন—রশ্মি ধারণা করতে পেরেছিল? ত্বক মাংস ভেদ ক’রে দেহের অভ্যন্তরীণ রহস্য ফুটিয়ে তুলবে, এমন কোনো রশ্মি যদি আবিষ্কৃত হয়ে থাকে, তাহলে কেন, কোনো—একদিন, আমরা খুঁজে পাবো না অন্য এক অদৃশ্য কিরণ, যা লিপি ও অর্থবোধের আচ্ছাদন পেরিয়ে যে—কোনো ভাষার মর্মকথা উদ্ঘাটন করবে? এই ঘনত্বভেদক রশ্মি, যা কিছুদিন আগেও ছিল কল্পনাতীত—তা তো সৃষ্টির আরম্ভ থেকে প্রকৃতির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল, আর এখন তা নিতান্ত এক প্রাকৃত বস্তু বলেই গণ্য। তেমনি, সেই আদিভাষাও অপেক্ষা ক’রে আছে—কবে হঠাৎ আমাদেরই কারো হাতে তার আবরণ উন্মোচিত হবে। সহজ—খুব সহজ—মাঝখানে একটি পাতলা পর্দা শুধু, যেন প্রায় নড়ে ওঠে এক—এক সময়, প্রায় এগিয়ে এসে ধরা দিতে চায়।

ভাবতে—ভাবতে বিরূপাক্ষর মনে হলো অলৌকিকে ও প্রাকৃতে সাধারণত যে—পার্থক্য করা হয়, সেটাই মানুষের সবচেয়ে বড়ো কুসংস্কার। আমরা কিছুই উদ্ভাবন করতে পারি না, মাঝে—মাঝে শুধু আবিষ্কার ক’রে থাকি। আছে—সবই আছে একই সঙ্গে এই বিশ্বে—আমাদের ঈপ্সিত, আমাদের দুরাশার সন্ধান—যা—কিছু এ—মুহূর্তে আমাদের ধারণার অগম্য তাও আছে: শুধু খুঁজে পাওয়া দিয়ে কথা। আমি কি তবে তেমনি কোনো আবিষ্কারের প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি, যাকে লোকেরা পরে বলবে আশ্চর্য, যুগান্তরকারী? বিরূপাক্ষর বুকের মধ্যে দুরুদুরু ক’রে উঠল, বিস্ময়ে ও বিনয়ে অভিভূত হয়ে তিনি বুকে হাত চেপে মাথা নিচু করলেন। সঙ্গে—সঙ্গে অন্য একটি কথা তার মনের তলা থেকে লাফিয়ে উঠল, যেন স্পষ্ট পথরেখা দেখতে পেলেন চোখের সামনে। আক্রমণ অনেক হলো—এবার আত্মসমর্পণ। আমি যা খুঁজছি তা তো স্বয়ংপ্রভ (কেননা জগতের ভাষাগুলি তারই দুর্বল প্রতিফলন মাত্র)—তা পাবার জন্য কেন প্রয়োজন হবে বুদ্ধি, বিদ্যা, বিশ্লেষণ, পরিশ্রম? সূর্য ওঠামাত্র আলোকিত হয় জগৎ—তা কি চেষ্টা ক’রে বুঝতে হয় আমাদের? যে—পরিত্যক্ত বন্ধ ঘরে বহুকাল ধ’রে অন্ধকার জমে আছে, আর বৈদ্যুতিক বৈকল্যের ফলে যে ঘর পাঁচ মিনিট আগে অন্ধকার হলো—একটি দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালামাত্র দুটোতেই তো একই সময়ে আলো ফুটবে। বহুকালের পুঞ্জিত তিমির কাটাবার জন্যও এক লহমাই যথেষ্ট। তাহলে—জ্ঞানে কী—লাভ? এক মূর্খ বনচর দস্যু অকস্মাৎ ছন্দোবদ্ধ শ্লোক উচ্চারণ করেছিল। এক চতুর তস্কর নিহত জন্তুর অন্ত্রতন্ত্র দিয়ে প্রথম বীণায় তার বেঁধেছিল। আমাকে এবার সব শিক্ষায় জলাঞ্জলি দিতে হবে। ভান করতে হবে যেন আমার প্রতিজ্ঞা আমি ভুলে গিয়েছি। একেবারে নতুন ক’রে আরম্ভ করতে হবে আমাকে।

এটাই কারণ, যেজন্য বিরূপাক্ষর দৈনিক রুটিন অমন চমকপ্রদভাবে বদলে গিয়েছিল, অথবা তিনি রুটিন ব্যাপারটাকেই ভেঙে দিয়েছিলেন। তিনি অপেক্ষা করছেন—এই অপেক্ষার সময়টুকু খুব সহজভাবে তাঁকে কাটাতে হবে, নিজের উপর কোনোরকম জবরদস্তি না ক’রে, চিন্তাহীন, নিরভিমান। তাঁর দিনগুলিকে ভরাতে হবে হাতের কাছে যখন যা পাওয়া যায় তা—ই দিয়ে—আর এ—কথা ভাবা প্রকাণ্ড ভুল যে হাতের কাছে সহজে যা পাওয়া যায় তা—ই তুচ্ছ, বা তাঁর পক্ষে অবান্তর। না—সবই সম্পৃক্ত হয়ে আছে পরস্পরে, সবই সেই পূর্ণসংখ্যার বহুবিচিত্র ভগ্নাংশ। সব—কিছুই তাঁর পক্ষে এখন প্রয়োজনীয়। তাঁকে লক্ষ ক’রে দেখতে হবে যুবতী মেয়েদের অঙ্গভঙ্গি, সিনেমার পর্দায় রূপসীদের সচেতন লাস্য, কেমন ক’রে বালিকার লাজুক ঠোঁট থেকে সারা মুখটিতে হাসি ছড়িয়ে পড়ে, পুত্রবধূর পোষা কুকুরটি কেমন করুণভাবে মুখ তুলে তাকায়, সন্ধ্যায় তাঁর বাথরুমের আয়নায় সূর্যাস্তের যে—রেখাটুকু ঠিকরে পড়ে সেটি কেমন উদ্ভাসিত ক’রে তোলে দেয়ালগুলোকে—শুনতে হবে মন দিয়ে বৃষ্টির শব্দ, রাস্তায় জল দেবার শব্দ, ভোরবেলা প্রথম ট্রামের শব্দ—এই সব উপাদানের অন্তঃসারকে জমিয়ে রাখতে হবে গোপন কোনো খাদ্যের মতো তাঁর নিজের মধ্যে, যেখানে তাঁর অজ্ঞাতসারে তিলে—তিলে বেড়ে উঠছে, কোনো বিশাল মাতার গর্ভে বহুকাল ধ’রে জায়মান কোনো ভ্রূণের মতো—সেই বার্তা, যা তিনি এতকাল ধ’রে ব্যর্থভাবে বাইরে খুঁজেছেন। যেন এক দূর নক্ষত্রের বিভা অনেক আলোকবর্ষ পেরিয়ে এগিয়ে আসছে পৃথিবীর দিকে, মানুষের দিকে… তাঁর দিকে। যা আমার কিছু করার নেই—যা আমার কিছু ভাবার নেই, আমি শুধু প্রস্তুত—আসন্ন তাকে আসতে দেয়া ছাড়া।

বিরূপাক্ষর এই নতুন উপলব্ধির অন্যদিকেও কিছু ফলাফল হলো। সেই চিহ্নাঙ্কিত কাগজখানা—এতদিন ধ’রে যার বহু পরিচর্যা তিনি করেছিলেন, রেখেছিলেন স্বচ্ছ প্লাস্টিকের খামের মধ্যে টান ক’রে ঢুকিয়ে (পাছে ভাঁজে—ভাঁজে ছিঁড়ে যায়), যাতে মাসে একবার ক’রে কীটনাশক ওষুধ ছিটোতে কখনো ভোলেননি—সেটিকে তাঁর শোবার ঘরের লোহার সিন্দুকে তুলে রাখলেন এবার, তাঁর বহু বছরের শ্রমপ্রস্তুত টীকা—টিপ্পনিভরা খাতাগুলো সুদ্ধ। এখন আর তিনি বিশ্বাস করতে পারেন না যে ওগুলো তাঁর কোনো কাজে লাগবে; তাঁর ঈষৎ হাসি পায় সেই সব দিনের কথা ভেবে, যখন তিনি শুতে যেতেন বালিশের তলায় প্লাস্টিকের খামটিকে নিয়ে, হাতের কাছে রাখতেন খাতা, পেন্সিল, বেডসুইচ; অতীতের সেই মুহূর্তগুলিকে তাঁর করুণ ব’লে মনে হয়, যখন তিনি গভীর রাতে আলো জ্বেলে উঠে বসেছেন বিছানায়, জ্বোরো হাতে লিখে গিয়েছেন পঙক্তির পর পঙক্তি, নানা রকম নকশা এঁকেছেন, অনুমিত বাক্যগুলিকে নিঃশব্দে উচ্চারণ করেছেন ঠোঁট নেড়ে নেড়ে, তারপর হঠাৎ সংশয়ের ছোরায় বিদ্ধ হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়েছেন। অসংখ্যবার পর্যবেক্ষণের ফলে সেই চিঠির একটি সম্পূর্ণ ও নিখুঁত প্রতিলিপি সুদৃঢ়ভাবে অঙ্কিত হয়ে গেছে তাঁর মগজে; অন্ধকারে চোখ বুজলেই প্রতিটি রেখা ভেসে ওঠে তাঁর চোখের সামনে; তিনি ইচ্ছে করলে অনেকক্ষণ ধ’রে রাখতে পারেন সেটাকে, আর যদি কখনো মনে—মনে বলেন, ‘আমার ঘুম পেয়েছে—এখন থাক,’ তাহলেই তা আস্তে—আস্তে মিলিয়ে যায়। ঘুমের আগে, বা সকালে জেগে ওঠার মুহূর্তে, এমনি এক খেলা চলে তাঁর সঙ্গে ওই রহস্যলিপির।

উপবিষ্ট কাজে দিন কাটাবার ফলে বিরূপাক্ষ বরাবরই কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগেছেন, ইদানীং তার প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রাথমিক প্রাতঃকৃত্যের জন্য মিনিট পনেরো সময় ধ’রে রাখতে হয়। বিরক্তি ভুলে থাকার জন্য তিনি কোনো হালকা মেজাজের বই বা পত্রিকা হাতে নিয়ে বসেন, কিন্তু একদিন মনে প’ড়ে গেল যে ভাষাবিজ্ঞান সম্পর্কে যেটুকু তাঁর স্বকীয় চিন্তা, তার প্রথম উন্মেষ হয়েছিল, বহুকাল আগে—তাঁর লাইব্রেরি—ঘরে নয়, ছাত্রদের পড়াতে—পড়াতে নয়—এই শৌচাগারের স্নিগ্ধ নির্জনতায়। সঙ্গে—সঙ্গে, অনেকদিন পরে, মূল পাণ্ডুলিপিটি একবার চোখে দেখার ইচ্ছে হলো তাঁর; সেটি সিন্দুক থেকে বের ক’রে নিয়ে প্রকোষ্ঠে ঢুকলেন। তেমনি আছে—অর্থাৎ, মাস ছয় আগে যেমন দেখেছিলেন, তেমনি। কিছুদিন ধরেই বোঝা যাচ্ছিল যে লিপিখানার কায়িক অস্তিত্ব নির্ভরযোগ্য নয়: যে—অক্ষরগুলি প্রথমে ছিল নিকষকালো, তা অনেক আগেই ধারণ করেছিল খয়েরি বর্ণ, কিন্তু তাও এতদিনে হলদে ও ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে, এত যত্ন সত্ত্বেও কয়েকটি কুঞ্চনরেখা দেখা দিয়েছে কাগজখানাতে, তার শুভ্রতাও এখন ধূসর ব’লে মনে হয়। বিরূপাক্ষ চেষ্টা করলেন একেবারে নতুন চোখে তাকিয়ে দেখতে, যেন এই প্রথম দেখছেন, কিন্তু ভান টিকল না, দৃষ্টিপাত করামাত্র সমস্ত পূর্ব—ইতিহাসের চাপে কাগজখানা তাঁর হাতে যেন ভারি হয়ে উঠল। না—নতুন ক’রে দেখার কিছু নেই, সব জানেন তিনি, সব যুদ্ধ পেরিয়ে এসেছেন, অনেক ধূপ দগ্ধ করেছেন, কিন্তু এই অক্ষরময়ী দেবীমূর্তির চোখের পলক পড়েনি। দীর্ঘশ্বাস পড়ল বিরূপাক্ষর, আসীন অবস্থায় অন্যদিনের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় কাটালেন তিনি—অন্যমনস্কতার ফলে এতটাই বেশি যে দরজায় টোকা পড়ল, বাইরে থেকে তাঁকে জানানো হলো যে চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে (‘আসলে হয়তো ওরা ভয় পেয়েছে আমি অজ্ঞান—টজ্ঞান হয়ে যাইনি তো—এ—রকম তো প্রায়ই হচ্ছে আজকাল।’)—বিরূপাক্ষ ওদের আশ্বস্ত করার জন্য ‘আসছি’ ব’লে উঠে দাঁড়ালেন, আর হঠাৎ, তাঁর কোনো দ্রুত বা অসতর্ক ভঙ্গির ফলে, পাণ্ডুলিপিটি প্লাস্টিকের খাম থেকে খসে প’ড়ে গেল। পড়ল একেবারে সেখানে, যেখানে তিনি সদ্য মলত্যাগ করেছেন। মুহূর্তকাল চিন্তা না—ক’রে তিনি নোংরা জলে হাত ডুবিয়ে সেটি তুলে নিলেন, অন্ধভাবে বেসিনের কল খুলে তার তলায় পেতে দিলেন কাগজখানাকে। পরিষ্কৃত—বড়ো বেশি পরিষ্কৃত—পীতবর্ণ অক্ষরগুলি জলের মধ্যে গলে যেতে লাগল, নিশ্চিহ্ন হলো সব লিখন, আর কাগজখানা গুঁড়ো—গুঁড়ো হয়ে ঝ’রে পড়ল বেসিনের উপর, গর্ত দিয়ে স্বচ্ছন্দে চলে গেল সেই নাগরিক পাতালে, যেখানে অসংখ্য মানুষের ক্লেদের স্রোত প্রবহমান। আর এই সবই ঘটল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে, তাঁর চোখের সামনে—বিরূপাক্ষ দ্বিতীয়বার চিন্তা করার সময় পেলেন না, স্মৃতিচিহ্নরূপেও একটি টুকরো বাঁচাতে পারলেন না। যতক্ষণে তিনি কল বন্ধ করেছেন, ততক্ষণে কোনো চিহ্ন নেই।

এই দুর্ঘটনার প্রথম আঘাতে বিরূপাক্ষর মনে একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন ভাব জেগে উঠল। নিজেকে তাঁর মনে হলো অপরাধী—তাঁরই অমনোযোগের ফলে কোনো প্রিয়জনের মৃত্যু হলো যেন, এমন কেউ, যে জীবনব্যাপী সঙ্গী ছিল তাঁর। কিন্তু কারো মৃত্যু হলে আমরা যেমন তখনকার মতো মৃতের কথা বেশি ক’রে ভাবি, মৃত ব্যক্তি নতুন ক’রে বেঁচে ওঠে আমাদের মনে, তেমনি প্রবলভাবে বিরূপাক্ষর মনে পড়ল—সেই বাস্তব মানুষটিকে, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন এষা, যেমন তাকে দেখেছিলেন, কুড়ি বা পঁচিশ বছর আগে, মধ্য—পশ্চিম আমেরিকার এক ক্ষুদ্র শহরে। তাঁকে বিস্মিত ক’রে, প্রায় অভিভূত ক’রে স্পষ্ট হয়ে ফিরে এলো এষার মুখশ্রী, দেহকান্তি, কণ্ঠস্বর। হঠাৎ যেন ঝাপট দিল বাসনা, তাকে আবার দেখার জন্য, স্পর্শ করার জন্য। মনে পড়ল রোদ, ঝিরঝির বৃষ্টি, হালকা হাওয়া, পাথরে বাঁধানো গলি আর উদার পিয়াজ্জা—নিজেকে দেখতে পেলেন আমেরিকান এক্সপ্রেসে, দশ—বারোজনের পিছনে চিঠির জন্য দাঁড়িয়ে; সেই মুহূর্তের আশা, উৎকণ্ঠা, ব্যর্থতায় তাঁর বুকের মধ্যে আবার মুচড়ে উঠল। আর তারপর, এমনি অস্থিরতায় কেঁপে—কেঁপে, ধীরে—ধীরে তিনি খুঁজে পেলেন সমাধান, এগিয়ে গেলেন সেই শান্ত অবসানের দিকে, যা সময় আমাদের অজান্তে তৈরি ক’রে রাখে আমাদের জন্য, যাতে মানুষ অত্যন্ত বেশি কষ্ট না পায়। থেমে গেল সেই স্মৃতি ও বাসনার ঢেউ, যা চিঠিখানা লুপ্ত হবার ফলে পুনর্জীবিত হয়েছিল, বিরূপাক্ষ তা টেরও পেলেন না। যা কোনো দূর কালে বাস্তব ছিল, তা বিশুদ্ধ একটি ধারণায় রূপান্তরিত হলো তাঁর মনে, তাঁর চিন্তা এক নতুন ভারসাম্য খুঁজে পেল। মূল চিঠিখানা আর নেই ব’লে এখন আর তিনি পরিতপ্ত নন, বরং তার আকস্মিক অবলোপে একটি ঔচিত্য দেখতে পান। জড়বস্তু পঞ্চভূতে বিলীন হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক—বাঞ্ছনীয় বললেও ভুল হয় না, কেননা তার পরেও কিছু থেকে যায়, আর সেই উদ্বৃত্ত তখনই স্পষ্ট হয়ে ফোটে, যখন বস্তুর আড়াল সরে যায়। কে না বোঝে, দেবীকে আমাদের সারা জীবনের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার জন্যই প্রতিমার বিসর্জন দরকার। কিংবা হয়তো চেষ্টা ক’রে ছড়িয়ে দিতেও হয় না, যে—বাতাসে আমরা নিশ্বাস নিই, এও তারই মতো স্বতঃক্রিয়। যখন গুমোট, যখন গাছের পাতাটি নড়ে না, তখনও তো বাতাস আছে—সব সময়, সকলের জন্য। এটা কী—আমি যাকে এতকাল ধ’রে ভেবেছি ‘চিঠি’, ‘আমার চিঠি’? ওই ‘আমার’ কথাটা অহংকারী নয় কি, ভ্রান্ত নয় কি? ও—রকম কোনো কাজ, কোনো দায়িত্ব, কোনো সারাক্ষণের সঙ্গী—তাছাড়া সত্যি কি বাঁচতে পারে কেউ? হেসে—খেলে বেঁচে থাকে লোকেরা, যে—কোনো একটা ছুতো ক’রে কাটিয়ে দেয় সময়—যতদিন না আসল কাজে ডাক পড়ে। ‘এই নাও চিঠি—তোমার চিঠি—কী লেখা আছে প’ড়ে দেখো।’ একই চিঠি জনে—জনে, অথচ প্রত্যেকে ভাবে তা শুধু তারই জন্য—আর তাই তো রহস্য এত গভীর। কোনো সভায়, কোনো পরিষদে, কোনো সম্মেলনে এর সমাধান হবে না, কোনো কাজে লাগবে না পাণ্ডিত্য বা বিচারবুদ্ধি, যে যার নিজের মনে উত্তর খুঁজবে—শুধু নিজেরই মধ্যে, বাইরে কোথাও নয়। বাড়ির লোকেদের মুখের দিকে মাঝে—মাঝে আড়চোখে তাকান বিরূপাক্ষ, কখনো রাস্তায় বেরোলে লোকেদের মুখের ভাব লক্ষ করেন—এদের মধ্যে কারো হাতে কি পৌঁছে গেছে চিঠি, বা পৌঁছবে শিগগির, কেউ কি জানে সে কোন আশায় অস্থির হয়ে ছুটোছুটি করছে? তাঁর মনে হয় এরই জন্য তাঁর নাতনি কিশোরী হয়ে উঠছে, অত যত্ন নিয়ে সাজে তাঁর মেয়ে আর ছেলের—বৌ, তাঁর ব্যস্ত চাকুরে—ছেলের দৃষ্টি মাঝে—মাঝে উদাস হয়ে যায়, তাঁর জামাই রং—তুলি নিয়ে খেলা করে। তারা চায়, তারাও তা—ই চায়, যা তাঁর মধ্যে বড়ো হয়ে উঠেছে এতদিন ধ’রে, তাঁকে ভ’রে রেখেছে কানায়—কানায়, বছরের পর বছর। তা—ই চায় তারা—কিন্তু এখনো তা টের পায়নি। এক—এক সময় কাউকে ডেকে প্রায় তাঁর গোপন কথাটি ব’লে দিতে ইচ্ছে করে, বলতে ইচ্ছে করে, ‘পেয়েছো? চিঠি পেয়েছো?’—কিন্তু শেষ মুহূর্তে সামলে নেন নিজেকে, পাছে ওরা ভাবে তিনি পাগল হয়ে যাচ্ছেন।

যেন জীবনে এই প্রথমবার বিরূপাক্ষর সুখী মনে হলো নিজেকে; তিনি বেঁচে আছেন এটুকুই যেন যথেষ্ট, আর—কিছু তাঁর করণীয় নেই, কাঙ্ক্ষণীয় নেই। আসলে সত্যি হয়তো তাঁর মাথার মধ্যে কোনো গোলযোগ ঘটছিল এই সময়ে; কখনো কোনো পণ্ডিতি বইয়ের পাতা খুললে ভালোমতো অর্থ বুঝতে পারেন না, মনে—মনে ভাবেন, ‘এ—সব লোকে লেখে কেন? এ—সব দিয়ে কী হয়?’ একদিন তাঁর স্বরচিত একটি পুরোনো নিবন্ধ দৈবাৎ তাঁর হাতে পড়েছিল, দু—পৃষ্ঠা প’ড়েই এত শ্রান্তিবোধ করলেন যে সোফায় এলিয়ে ব’সে চোখ বুজতে হলো। আর—একদিন তাঁর মেয়ে একটা ফরাসি পত্রিকার কাটিং নিয়ে এলো তাঁর কাছে—হুয়ান মিরো বিষয়ে একটা ছোট্ট আলোচনা—সেটা প’ড়ে বুঝিয়ে দিতে গিয়ে বেশ কয়েকবার থামতে হলো তাঁকে, অভিধান দেখতে হলো। এতে তিনি নিজেই অবাক হয়ে গেলেন, কিন্তু দুঃখিত হলেন না—বরং তাঁর ভালো লাগল এ—কথা ভেবে যে তাঁর ভাষাজ্ঞানের শক্ত আঁটুনি থেকে এতদিনে তিনি মুক্তি পেয়েছেন। তাঁর দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণতর হয়েছে, কিছু পড়তে হলে চোখের খুব কাছে ধরতে হয়, কিন্তু চশমা বদল করার জন্য তাঁর গরজ নেই, কেননা পুঁথিপত্র তাঁর জীবন থেকে দূরে সরে গেছে। ঝাপসা—সেই ঘটনাটি, যা থেকে এবং আরো দূরে—এতদিনে খুব অন্য সব গজিয়ে উঠেছিল বলা যায়—এবং এককালে যা কতই না বৃহৎ ব’লে তাঁর মনে হয়েছিল। হয়তো সেটাকে ‘ঘটনা’ বলাই ভুল, কেননা কথাটার মধ্যে একটা সমাপ্তির ভাব আছে, আর আসলে সেটা হয়তো এখনো ঘটছে, রোজ ঘটে যাচ্ছে, কোনোদিন শেষ হবার কোনো নিশ্চয়তা নেই। একটা খেলার মতো ব্যাপারটা, এবং খেলাটাই আসল—কেন, কার জন্য, সে—সব কথা অবান্তর। আর তাই, এই খেলায় যে তাঁকে প্রথম নামিয়েছিল, সেই মানুষটি প্রায় মুছে গেল তাঁর মন থেকে, তার আসল নাম তিনি ভুলে গেলেন, তাঁর নিজের দেয়া ‘এষা’ নামটিও ভুলে গেলেন। আর সেই লুপ্ত লিপিখানা, যা তাঁর স্মরণে অঙ্কিত ব’লে তিনি ধ’রে নিয়েছিলেন, তাও আর মানসচিত্র হয়ে ঘন—ঘন ধরা দেয় না তাঁকে; অনেক নিদ্রাহীন রাত কাটাবার পর এখন বালিশে মাথা ঠেকানোমাত্র তিনি ঘুমিয়ে পড়েন, এক ঘুমে রাত ভোর হয়; স্বপ্নে মাঝে—মাঝে ফিরে যান তাঁর ছেলেবেলায়, কখনো বা দেখেন তাঁর মায়ের মুখ, যিনি আজ পঁয়ত্রিশ বছর ধ’রে মৃত। এমনি সুখে বিরূপাক্ষর জীবনের শেষ বছরটি কাটল।

চৈত্র মাসের একটি সকাল। রাতভোর সুনিদ্রার পর বিরূপাক্ষ এইমাত্র জেগে উঠেছেন। জেগেছেন, কিন্তু বিছানা ছাড়েননি, চোখও খোলেননি। কেন জানেন না, আজ জেগে ওঠামাত্র তাঁর অসাধারণ সুখী মনে হচ্ছে নিজেকে, শুয়ে—শুয়ে সেই অনুভূতিটুকু উপভোগ করছেন, আধো ঘুমে, চোখ না—খুলে। তাঁর পাতলা চুলগুলি নাড়িয়ে দিচ্ছে ফুরফুরে হাওয়া—ইলেকট্রিক পাখার নয় (স্পষ্ট টের পেলেন তিনি), বাইরের বাতাস, সমীরণ, মলয়সমীরণ। ওই ‘মলয়সমীরণ’ কথাটাকে যেন জিভ দিয়ে চাখলেন একবার, ঈষৎ কৌতুকের ধরনে, হঠাৎ যেন লবঙ্গের সুবাস পেলেন, তারপর সেই গন্ধ জয়দেবের কয়েকটি মসৃণ অনুপ্রাসে অনূদিত হয়ে গেল। খাবার ঘর থেকে মেয়েলি গলার আওয়াজ ভেসে এলো—তাঁর মনে পড়ল বাড়ি আজ ভরা, খুকু আর অসিত কাল রাত্রে এসে থেকে গিয়েছিল, এক ভাই—ঝি বেড়াতে এসেছে ভাগলপুর থেকে—ঠিক বেড়াতেও নয়, তার মা—বাবা পাঠিয়ে দিয়েছেন সুহাসিনীর কাছে, যাতে চারদিকে তল্লাশ ক’রে বিয়ের সম্বন্ধ স্থির করা যায়—‘বি. এ. পাশ ক’রে ব’সে আছে মেয়েটা।’—আর ইতিমধ্যেই অসিতের ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে অনুরাগের পথে কিঞ্চিৎ এগিয়েও গেছে মেয়েটি। বাড়ির লোকেদের মুখগুলি একে—একে মনে পড়ল বিরূপাক্ষর—কী ভালো, কী ভালো ওরা সবাই—আমি সত্যি বোধহয় অসিতের উপর কিছু অবিচার করেছি, মাঝে—মাঝে দুঃখ দিয়েছি সুহাসিনীকে, লীলাকে—তবু ওরা কত ভালোবাসে আমাকে—আশ্চর্য! তাঁর ভাবতে ভালো লাগল যে ওদের সকলকে নিয়ে, সকলের সঙ্গে তিনি বেঁচে আছেন, ভাবতে ভালো লাগল যে ভাই—ঝির শিগগিরই বিয়ে হবে, আবার দুটি মানুষ নতুন ক’রে আবিষ্কার করবে সেই চিরপুরোনো রহস্য, আবার আসবে ঘাসের মতো শিশুরা, পৃথিবীর যৌবন অক্ষুণ্ণ থাকবে। খুকুর বিয়েতে, দেবুর বিয়েতে আমি কিছুটা—নির্লিপ্ত ছিলুম, কিন্তু এবারে রীতিমতো কন্যাকর্তা সেজে অভ্যর্থনা করব অতিথিদের, খাওয়ার সময় ঘুরে—ঘুরে তদারক করব। টুংটাং শব্দ—চা সাজানো হচ্ছে—একে—একে এবার উঠে পড়বে সবাই, চায়ের টেবিল সরগরম ক’রে তুলবে। নাতনির গলার আওয়াজ কানে এলো তাঁর—‘দিদানি, তুমি আমার অমলেটটা ক’রে দিয়ো—কেমন?’ দিদানি নিজের হাতে না—করলে অমলেট ওর মুখে রোচে না, সেটা যদি কখনো পুড়েও যায়, তবু মুখে দিয়ে বলে, ‘চমৎকার!’—কী মিষ্টি হয়েছে দেবুর মেয়েটা, বড়ো হতে হতে রীতিমতো সুন্দরী হবে মনে হয়। তাঁর বোজা চোখের তলায় হঠাৎ একটি মুখ ভেসে উঠল—নারীর মুখ—মুখের তলায় দেহ আকৃতি নিল ধীরে—ধীরে—কে? আমি কোথায় এলাম? সমুদ্র, দিগন্ত থেকে দিগন্তে অফুরান, ঢেউয়ের পরে ঢেউ অফুরান, ছুটে আসছে নীলের উপর ফেনিল, অনবরত ভাঙছে আর ফিরে আসছে—আর তারই তীর ধ’রে—ধীরে হেঁটে যাচ্ছে সেই নারী, স্বচ্ছবসনা, বিজয়িনীর মতো ভঙ্গিতে, প্রতি পদক্ষেপে যৌবনের দ্যুতি ছিটিয়ে, বিশাল আকাশের তলায়, যেন সূর্যের আলোকে তার গাত্রবাস ক’রে নিয়ে, আর সমুদ্রকে তার সাক্ষী। আমি কি এ—রকম একটি দৃশ্য সিনেমায় কখনো দেখেছিলাম? নাকি এমন কেউ, যাকে আমি চিনতাম, দেখেছিলাম কখনো? কে হতে পারে, নাম কী? হঠাৎ মনে প’ড়ে গেল—মধুবালা। মধুবালা… মধুমালা… মধুমতী… অন্য কোনো নাম কি ছিল না? অনেক চেষ্টা করেও অন্য কোনো নাম তাঁর স্মরণে এলো না, কিন্তু নারীটিকে ঠিকমতো শনাক্ত করা অসম্ভব মনে হলো, অথচ এই ধারণাটি ক্রমশ আরো জোরালো হয়ে উঠল যে একে তিনি চিনতেন, দেখেছিলেন কখনো। তাঁর দৃষ্টির সবটুকু শক্তি তিনি সংহত করলেন সেই যুবতীর উপর—তাঁরই দিকে আসছে সে, এখন বেশি দূরেও নেই, কিন্তু সেই অল্প দূরত্বটুকু কিছুতেই যেন পেরোনো যাচ্ছে না, মেয়েটি গতিশীল হয়েও কী ক’রে অমন নিশ্চল হতে পারে, সে—কথা ভেবে তাঁর অবাক লাগল। আর তারপর দেখলেন, কোনো নারীমূর্তি আর নেই, সমুদ্র আর আকাশ মিলিয়ে গেছে, তার বদলে একটি অক্ষর ফুটে উঠেছে তাঁর চোখের সামনে, অন্ধকার পটের উপর উজ্জ্বল একটি সংকেত। আর সঙ্গে—সঙ্গে কেমন একটা অস্বস্তি নামলো তাঁর শরীরে, বুকের ভিতরটাতে টান পড়ছে যেন, আর তারপর এক অদ্ভুত দৃশ্যে তাঁর যেন দম আটকে এলো। সারি—সারি অক্ষর—শ্রেণীবদ্ধ, সুবিন্যস্ত—চারদিক থেকে ঘিরে আছে তাঁকে, একদল সৈন্য যে—ভাবে শত্রুর দুর্গ দখল ক’রে নেয়, তেমনি সুশৃঙ্খলভাবে। সেই সব অক্ষর—এবারে তাঁর মনে প’ড়ে গেল—তাঁর বহুকালের চেনা… তাঁর অচেনা… কিন্তু এখন আর অচেনা নেই। অক্ষরগুলি যেন নিজে—নিজেই প্রবিষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাঁর মধ্যে—ছড়িয়ে পড়ছে বীজাণুর মতো তাঁর রক্তের স্রোতে, মেরুদণ্ডের মজ্জায়, তাঁর মাংসের মধ্যে বিঁধে যাচ্ছে ছুঁচের মতো, তাঁর প্রতি রোমকূপে সাড়া তুলছে তাদের অর্থ, ভাব, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যঞ্জনা। ‘আ! এতদিনে! তাহলে—সত্যি, সব সত্যি!’

তিনি চাইলেন শব্দ ক’রে কথাটা বলতে, কিন্তু ক্ষীণ একটু কাশির মতো আওয়াজ শুধু তাঁর কানে পৌঁছল। মনে হলো এই অতর্কিত আক্রমণে তিনি যেন ভাঁজে—ভাজে খুলে যাচ্ছেন, বয়ে যাচ্ছেন সমতলেনামা ঝর্নার মতো দিকে—দিকে—সকলের দিকে, সকলের জন্য ভালোবাসার ভারে আরো বড়ো হতে হতে দূর—দূরান্ত পেরিয়ে যাচ্ছেন। কোথায় যাচ্ছি? এই প্রশ্ন তাঁর মস্তিষ্কে ঝিলিক দিয়েই মিলিয়ে গেল। আনন্দ—এক অকল্পনীয় আনন্দে তিনি আচ্ছন্ন;—আনন্দ, যন্ত্রণার মতো অসহ্য, তাঁকে চূর্ণ ক’রে দিচ্ছে, হৃৎপিণ্ড ভীষণভাবে স্পন্দিত হচ্ছে, যে—সমুদ্র একটু আগে তাঁর চোখ থেকে হারিয়ে গেল, এখন তা—ই গর্জন করছে তাঁর কানে, কিন্তু অর্থহীনভাবে নয়, তিনি যেন তারই মধ্যে আবির্ভূত অক্ষরগুলির শব্দরূপ শুনতে পাচ্ছেন। কিন্তু তখনও তাঁর চেতনা সম্পূর্ণ লোপ পায়নি; একটা অস্পষ্ট ইচ্ছা তিনি অনুভব করলেন—যদিও ঠিক ঠাওরাতে পারলেন না সেটা কি মূত্রত্যাগের ইচ্ছা, না তৃষ্ণানিবারণের, না কি—এইমাত্র তিনি যা জানলেন, তা লিখে রাখতে চান অন্যদের জন্য? তাঁর শরীর উঠে বসার জন্য নড়ে উঠল। কিছুক্ষণ পরে পুত্রবধূ তাঁর প্রাতঃকালীন চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখল, বিরূপাক্ষর মাথা বালিশ থেকে সরে এসেছে, একটা পা ঝুলে আছে খাটের বাইরে, তাঁর দেহ নিস্পন্দ, মুখে শান্তি, আর তাঁর ঠোঁটের রেখা দেখে মনে হয় তিনি যেন কিছু বলতে চান।
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *