মানসী তুমি – পরিচ্ছেদ ৩

০৩.

পুরী যাবার দিন কুড়ি আগে হঠাৎ একটা ব্যবসা-সংক্রান্ত জরুরি কাজে শরদিন্দুকে দিল্লী যেতে হল এক দিনের জন্য এবং আশ্চর্য, শরদিন্দু একাই গেল।

শরদিন্দু দিল্লী গিয়েছে জানত সুকুমার কিন্তু জানত না শরদিন্দু একা গিয়েছে। সেরাত্রে কারখানা থেকে ফিরে সুকুমার বহুকাল পরে তার বেহালাটা ঝাড়পোছ করে বাজাতে বসে। কতক্ষণ বাজিয়েছে মনে নেই, হঠাৎ একসময় চমকে ওঠে সুকুমার—দোরগাড়ায় দাঁড়িয়ে মানসী।

তুমি যে এমন চমৎকার বেহালা বাজাও, জানতাম না তো! মানসী বলল।

তুমি শরদিন্দুদার সঙ্গে দিল্লী যাওনি?

যাইনি যে তা তো দেখতেই পাচ্ছ। কিন্তু থামলে কেন, বাজাও না বলতে বলতে মানসী ঘরের মধ্যে এসে প্রবেশ করল।

মানসী, তুমি যাও–সুকুমার হঠাৎ বলল।

না, আমি যাব না।

মানসী, কেন তুমি বুঝতে পার না—

আজ সারাটা রাত তোমার বেহালা বাজান শুনব। বাজাও—মানসী এগিয়ে গিয়ে খাটের ওপর বসল।

মানসী, তুমি কি সত্যিই কিছু বুঝতে পার না—শরদিন্দুদা চায় না, তুমি আমার সঙ্গে কথা বল!

জানি। মানসী হাসতে হাসতে বলে, ভুলে যাও কেন আমি মেয়েমানুষ! আর তুমিই বা এত ভীতু কেন?

একটা কথার জবাব দেবে মানসী, তুমি কি শরদিন্দুদাকে আমাদের পূর্ব পরিচয়ের কথা বলেছ?

মানসী হাসতে হাসতে বলে, তোমার কি মনে হয়?

সুকুমার মানসীর মুখের দিকে তাকায়। মানসীকে সে যেন ঠিক ঐ মুহূর্তে চিনতে পারে না। যে মানসীর সঙ্গে তার পরিচয় প্রায় তিন বছরেরও বেশী, এ যেন সেই মানসী নয়।

মানসী বলে, অমন করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কি দেখছ সুকুমার?

না, কিছু না। সুকুমার শান্ত গলায় বললে। অমন ভয়ে ভয়ে হাত বাড়ালে কি কিছু পাওয়া যায়? যায় না। তুমি মনে মনে যতই আমাকে দোষী ভাব না কেন, ভাল করে নিজের মনে যাচাই করে দেখ, তা হলেই বুঝবে আমার দিক থেকে যদি কোন দোষ থেকেও থাকে, তার কারণও তোমার ঐ ভীরুতা।

ঠিক ঐ সময় বাড়ির সামনে একটা গাড়ি থামার শব্দ শোনা গেল। সুকুমার বললে, এত রাত্রে আবার কে এল? কথাটা বলে সুকুমার উঠে গিয়ে তিনতলার খোলা জানালাপথে নীচে উঁকি দিল। বাড়ির গেটের সামনে একটা ট্যাক্সি এসে থেমেছে, আর ট্যাক্সি থেকে নামছে শরদিন্দু। সুকুমার তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে বললে, বৌদি, দাদা ফিরেছে!

সে কি! তার তত আগামী কাল ইভনিং ফ্লাইটে ফিরবার কথা দিল্লী থেকে।

যাও-নীচে যাও বৌদি।

অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন, তোমার দাদা আসুক না।

তুমি যদি না যাও তো আমাকেই এ ঘর ছেড়ে যেতে হবে বৌদি!

কি তখন থেকে বৌদি-বৌদি করছ। আমার নামটাও ভুলে গিয়েছ নাকি সুকুমার?

আঃ, কেন দেরি করছ! দাদার চোখে তুমি কি সর্বনাশের আগুন দেখতে পাওনি? সুকুমার বললে।

এক শর্তে আমি যেতে পারি সুকুমার, যদি তুমি কথা দাও যে তুমি আগের মত আমার সঙ্গে মিশবে! মানসী বলে ডাকবে!

সুকুমার দরজার দিকে এগিয়ে যায়। বলে, দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াও, আমাকে যেতে দাও।

মেয়েমানুষ জীবনে একবারই ভালোবাসতে পারে সুকুমার!

সিঁড়িতে ঐ সময় জুতোর শব্দ পাওয়া গেল। মানসী ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

দোতলা ও তিনতলার মাঝামাঝি সিঁড়িতে পৌছাতেই শরদিন্দুর সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। মানসীর। মানসী দাঁড়াল না, সিঁড়ির ধার অতিক্রম করতে করতে বললে, এ সময় কিসে ফিরলে?

প্লেনটা তিন ঘণ্টা লেটে ছেড়েছিল যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য তুমি এখনও ঘুমোওনি? শরদিন্দু বললে।

না, সুকুমার ঠাকুরপোর সঙ্গে গল্প করছিলাম। কথাগুলো বলে মানসী আবার সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল।

সুকুমার আড়াল থেকে লক্ষ্য করল, শরদিন্দু আর মানসী তাদের ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। সুকুমার যেমন দরজার আড়ালে দাঁড়িয়েছিল তেমনি ভাবেই আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

পরের দিন সকালে নীচে নেমে ডাইনিং-হলে ঢুকে সুকুমার দেখল, একাকী এক কাপ চা নিয়ে বসে আছে শরদিন্দু। তার চোখমুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, বাকি রাতটুকু সে ঘুমোয়নি।

সুকুমার নিঃশব্দে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। শরদিন্দু একবার তাকাল সুকুমারের মুখের দিকে, তারপর আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিল।

গোকুল এসে ঘরে ঢুকল, ছোট দাদাবাবু, চা দেবো?

বৌদি কোথায় গোকুল, তাকে যে দেখছি না?

বৌদিমণি তো এখনও স্নানের ঘর থেকে বেরোয়নি।

সুকুমার–শরদিন্দু ডাকল।

কিছু বলছ দাদা?

মণির শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। তাই ভাবছি ওকে নিয়ে কটা দিন কোথাও বাইরে থেকে ঘুরে আসব!

বেশ তো, যাও না, কবে যাবে?

দু-একদিনের মধ্যেই বের হয়ে পড়ব ভাবছি-শরদিন্দু বলল।

কোথায় যাবে কিছু স্থির করেছ?

ওয়ালটেয়ার বা পুরী—

স্নান-শেষে প্রসাধন সেরে ঐ সময় ঘরে ঢুকল মানসী। পরনে তার একটা হালকা আকাশনীল রঙের বুটি দেওয়া জামদানী ঢাকাই শাড়ি। ভিজে ভিজে চুলের রাশ পিঠের ওপর ছড়ানো। গা থেকে দামী সাবানের মৃদু গন্ধ ছড়াচ্ছে।

মানসী হাসতে হাসতে বলল, দেখ সুকুমার, আমি অনেক ভেবে দেখলাম, না বাপু, তোমাকে আমি সেকালের মত ঠাকুরপো-ঠাকুরপো বলে ডাকতে পারব না, তোমাকে আমি সুকুমার বলেই ডাকব-কি বল তুমি? কথাটা শেষ করে মানসী শরদিন্দুর মুখের দিকে তাকাল।

শরদিন্দু বলল, বেশ তো, তাই ডেকো।

ও কি, এখনও তুমি চায়ের কাপ সামনে নিয়ে বসে আছ? কখন চা দিয়ে গিয়েছি আমি তোমায়।

স্ত্রীর কথায় শরদিন্দু চায়ের কাপটা টেনে নিতে যেতেই মানসী বাধা দিল, থাক, ও চা আর খেতে হবে না—আমি আবার চা তৈরি করে দিচ্ছি।

গোকুল ঐ সময় ট্রেতে করে টি-পট, মিল্ক-পট ও চিনির পাত্রে চিনি নিয়ে ঘরে ঢুকল।

তোমার বাবুর অমলেট ভেজেছ?

হ্যাঁ।

হঠাৎ শরদিন্দু ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল, তোমরা চা খাও মণি, আমি একটা জরুরি ট্রাংক কল বুক করেছি ঘণ্টাখানেক আগে, দেখি সেটা দেরি হচ্ছে কেন।

শরদিন্দু দাঁড়াল না। ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

সুকুমার বোবা হয়ে বসে থাকে।

কি ব্যাপার সুকুমার—সুকুমার বলে ডাকব বলায় কি রাগ করলে নাকি?

সুকুমার কোন জবাব দেয় না।

কাপে চা ঢেলে চিনি মিশিয়ে দুধের কাপটা এগিয়ে দিতে দিতে সুকুমারের দিকে চেয়ে মানসী বলল, কি হল, অত গম্ভীর কেন?

মানসী, আমি ভাবছি মেসে চলে যাব।

ওমা, সে কি! মেসে কেন যাবে?

তুমি যখন কিছুই বুঝতে চাও না, বোঝবার ইচ্ছেও নেই—

দূরে সরে গেলেই কি আমাকে ভুলতে পারবে সুকুমার?

মানসী, তুমি কি এতটুকু সিরিয়াস হতে পার না!

বিশ্বাস কর সুকুমার, আমার মত সিরিয়াস কম মেয়েই পাবে। তারপর কিছুক্ষণ থেমে বললে, আমিও তো মানুষ সুকুমার। আমারও তো মন বলে একটা পদার্থ আছে!

সুকুমারের মনে হল শেষের দিকে মানসীর গলাটা যেন ধরে এল।

মানসী তাকাল সুকুমারের দিকে। তার দুই চোখে জল টলটল করছে।

আমার বোধ হয় এখান থেকে চলে যাওয়াই ভাল–

আমার শেষ কথা শোন সুকুমার, তুমি যদি এখান থেকে চলে যাও—আমি জেনো ঠিক সুইসাইড করব।

ঐ সময় শরদিন্দু ঘরে এসে ঢুকল।

মানসী, আমরা কালই পুরী রওনা হচ্ছি! শরদিন্দু বললে, সমুদ্র তো তুমি কখনও দেখনি!

দেখেছি।

দেখেছ–? কবে?

কবে কি—অনেকবার আমি সমুদ্র দেখেছি—উত্তাল সেই ঢেউয়ের মধ্যে কত দিন মনের আনন্দে ভেসে বেড়িয়েছি। ঢেউয়ের মাথায় দোদুল দোলায় দুলেছি, মানসী বলে, সমুদ্র আমার অনেক দিনের স্বপ্নের সমুদ্র সমুদ্রের সেই অতল জলের তলায় যেন হারিয়ে গিয়েছি আমি

শরদিন্দু গম্ভীর হয়ে এবারে বললে, ঠিক আছে! এবারে আর স্বপ্ন নয়, তুমি সত্যি সত্যি সমুদ্র দেখবে।

ঐদিনই সন্ধ্যার পর সুকুমারের সেদিন শরীরটা খারাপ। কোথাও বের হয়নি, নিজের ঘরে একটা আরামকেদারায় বসে একটা ইংরেজী বই পড়ছিল। মানসী এসে ঘরে ঢুকল। মানসীর পরনে একটা রক্তলাল তাঁতের শাড়ি। সোনালী জরির চওড়া পাড়। হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন মানসীর সর্বাঙ্গে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। অবাক হয়ে সেদিকে চেয়ে থাকে সুকুমার।

কি দেখছ সুকুমার-মানসী বললে!

দাদা কোথায়? বাড়ীতে নেই?

না। শুনলাম এখনও রিজার্ভেশন পাননি! তাই ছোটাছুটি করছেন। বলছিলেন রিজার্ভেশন পেলে গাড়িতেই পুরী যাবেন-গাড়িতেই যদি যাওয়া হয় তো তুমিও চল না।

না।

জান সুকুমার, আমার মন যেন বলছে, তোমার সঙ্গে জীবনে আর আমার দেখা হবে না, আর তুমিও তো তাই চাও—তাই না?

হঠাৎ ঐ কথা তোমার মনে হল কেন মানসী? সুকুমার বললে।

আবার বড় কষ্ট সুকুমার–

 কি হয়েছে মানসী? সুকুমার বললে।

তুমি তো জান—আমি অনেক দিন থেকে ডাইরি রাখি। যেদিন আমি থাকব না সেদিন আমার ডাইরিটা তুমি পড়ে দেখ।

নীচে থেকে ঐ সময় শরদিন্দুর গলা শোনা গেল—গোকুল!

শরদিন্দুর গলা শুনেই মানসী বলল, চলি–

তোমার ডাইরিটার কথা কি বলছিলে?

পরে বলব। মানসী আর দাঁড়াল না। ঘর থেকে বের হয়ে গেল।