মানসী তুমি – পরিচ্ছেদ ১৩

১৩.

জগন্নাথ সাহুর বাড়ির কাছে ওরা যখন পৌছাল তখন জানালাটা বেশ অন্ধকার, লাইটপোস্টটা অনেকটা দূরে—অত দূর পর্যাপ্ত আলোটা পৌঁছয় না, তাই কেমন যেন একটা আলোছায়ার ছমছমানি। হঠাৎ পিছন দিক থেকে একটা মৃদু পদশব্দ কানে আসতেই কিরীটী একপাশে সরে দাঁড়িয়ে সুব্রতর হাত ধরে আকর্ষণ করল।

কি ব্যাপার?

চুপ, ঐ দেখ—কে যেন এই দিকেই আসছে!

সুব্রত দেখল অবগুণ্ঠনবতী এক নারী একটু যেন দ্রুত পদেই ঐদিকে আসছে। অবগুণ্ঠনবতী সামনাসামনি আসতেই কিরীটী মৃদুকণ্ঠে ডাকল, শুনছেন!

অবগুণ্ঠনবতী না দাঁড়িয়ে আরও জোরে গতি বাড়িয়ে দেয়। কিরীটী দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে বলে, শুনুন, দাঁড়ান মানসী দেবী!

হঠাৎ যেন থমকে দাঁড়াল এবার অগ্রবর্তিনী।

মানসী দেবী, আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে—এই শহরে সবচেয়ে বড় যে হোটেলটা, সেই হোটলেরই দোতলায় যোল নম্বর ঘরে উঠেছি আমি। আমার নাম কিরীটী রায়—আপনার জন্য আমি অপেক্ষা করব।

নারীমূর্তির দিক থেকে কোন সাড়াশব্দ এল না।

আমি জানি সমুদ্রের জলে আপনার মৃত্যু হয়নি, আপনি বেঁচে আছেন। যাক, আমি কিন্তু অপেক্ষা করব হোটেলে আমার ঘরে। এস সুব্রত!

কিরীটী আর দাঁড়াল না। হনহন করে এগিয়ে গেল।

কিরীটী চেয়ারে চুপচাপ বসে একমনে পাইপ টানছে। সুব্রত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, রাত এগারোটা বেজে দশ মিনিট।

তোমার ধারণা, সত্যিই তিনি আসবেন? সুব্রত বললে।

কিরীটী কোন কথা বলল না, অন্যমনস্ক ভাবে জানালার ওপাশে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।

আমার মনে হয়—

কিরীটী সুব্রতকে তার কথা শেষ করতে দিল না, বললে, মানসী যদি না—

কিন্তু কিরীটীর কথা শেষ হল না, ওদের ঘরের বদ্ধ দরজার গায়ে মৃদু টোকা শোনা গেল। সঙ্গে সঙ্গে কিরীটী উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে অবগুণ্ঠনবতী এক নারী।

আসুন—আসুন মানসী দেবী।

আগন্তুক কমধ্যে প্রবেশ করল। কিরীটী দরজাটা আবার বন্ধ করে দিল। গুণ্ঠন মোচন করল অবগুণ্ঠনবতী। স্থির দৃষ্টিতে তাকাল কিরীটী মুখের দিকে।

বসুন, দাঁড়িয়ে কেন?

আপনি আমাকে চেনেন? মানসী প্রশ্ন করল।

কিরীটী একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল মানসীর মুখের দিকে। মনে মনে সে মানসীর ফটোর সঙ্গে ওর চেহারাটা মিলিয়ে নিচ্ছিল।

চিনি বললে যেমন সবটা বলা হবে না, তেমনি চিনি না বললেও সত্যের অপলাপ করা হবে মানসী দেবী। আপনার সঙ্গে পূর্বে সাক্ষাৎ পরিচয় না হলেও আপনার ফটোর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে!

আমার ফটো? আমার ফটো কোথায় পেলেন আপনি?

আপনার বাবা পরেশবাবুর কাছ থেকে। আপনার বাবা বিশ্বাস করেননি যে জলে ড়ুবে আপনার মৃত্যু হয়েছে। তাই তিনি আপনার সন্ধানে আমাকে নিযুক্ত করেছেন। কিন্তু আপনি দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন!

সত্যিই আমি মরিনি সেদিন কিরীটীবাবু, বসতে বসতে বলল মানসী।

আমিও তাই বিশ্বাস করেছিলাম।

কিন্তু কেন আপনি বিশ্বাস করেছিলেন, আমি সাঁতার জানতাম বলে?

কিছুটা তাই বটে, তবে আরও কারণ ছিল, আমি অবিশ্যি জিজ্ঞাসা করব না সেদিন কেমন করে আপনি রক্ষা পেয়েছিলেন।

আপনি হয়তো একটা কথা জানেন না কিরীটীবাবু, আমাকে সেদিন হত্যা করবারই চেষ্টা করা হয়েছিল।

তাও আমি অনুমান করেছিলাম, কিরীটী বলল।

জানেন, সরবতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে আমাকে হত্যা করবার চেষ্টা হয়েছিল।

বিষ?

হ্যাঁ, কিন্তু নোনা জল কিছু পেটে ঢাকায় বমি করে ফেলি জলের মধ্যে, আমার বিষের ক্রিয়াও একটু একটু করে কেটে যায়। এবং কথাটা বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই আমি সাঁতরে তাদের নাগালের বাইরে চলে যাই। কারণ আমি বুঝতে পেরেছিলাম নাগালের বাইরে না চলে গেলে আবার আমাকে হত্যা করবার চেষ্টা করা হবে।

কার কথা বলছেন?

কার কথা বলব বুঝতে পারছি না, কারণ, আমি দুজনকে সন্দেহ করি—

আপনার স্বামী শরদিন্দুবাবু আর সুকুমারবাবুকে? কিন্তু সেসময় তো সুকুমারবাবু বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন, যতদূর জানি।

ছিল সে—তাকে ঐ ঘটনার আগের দিন আমি সী বীচে দেখেছিলাম।

আপনার স্বামী জানতে পেরেছিলেন?

সম্ভবত না।

আপনি তাকে কিছু বলেননি?

না। কারণ বুঝেছিলাম যে পুরীতে এসেও সুকুমার যখন আমাদের সঙ্গে দেখা করেনি তখন কথাটা গোপন রাখতে চায়।

সেদিন যা ঘটেছিল আমাকে বলবেন?

আমার স্বামী মানসী বলতে লাগল, বিবাহের পর থেকেই সুকুমারকে নিয়ে আমাকে সন্দেহ করত—

আমি জানি।

জানেন?

হ্যাঁ, আপনার ডাইরি পড়েই জেনেছি।

আমার ডাইরি আপনি কোথায় পেলেন?

আপনার বাবা আমায় দিয়েছেন।

জানেন কিরীটীবাবু, পুরীতে একটা কিছু ঘটবে এই আশঙ্কা করেই আমি ডাইরিটা আমাদের বাড়িতে রেখে এসেছিলাম–যাতে সেটা আমার আকস্মিক মৃত্যু ঘটলে এদের মানে স্বামী ও সুকুমারের হাতে না পড়ে।

বিবেচনার কাজই করেছিলেন।

মানসী আবার বলতে লাগল, ঐ ব্যাপার নিয়েই সেদিন সকালের দিকে স্বামীর সঙ্গে আমার কিছুটা তর্কাতর্কি হয়। তারপর অবিশ্যি ইদানীং যেমন প্রায়ই হত শরদিন্দুই ব্যাপারটা মিটিয়ে নেয়। দুপুরের দিকে দুজনে বসে গল্প করছিলাম আর দুজন দুগ্লাস লেমন স্কোয়াশ নিয়ে মধ্যে মধ্যে চুমুক দিচ্ছিলাম। হঠাৎ শরদিন্দু বললে, তুমি সমুদ্রে সাঁতার কেটে কতদূর যেতে পার মণি?

বললাম, অনেক দূর অবধি যেতে পারি—কেন?

না, এমনি জিজ্ঞাসা করছি ভয় করবে না তোমার?

বাঃ, ভয় করবে কেন? বেশ কালই তোমাকে দেখাব–

কাল কেন—আজই চল না, দেখাবে!

বেলা তখন চারটে বেজে গিয়েছে—তুমি বোস, আমি তৈরী হয়ে আসি বলে আমি বাথরুমে চলে গেলাম। ফিরে এসে দেখি শরদিন্দু ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, আমি তাড়াতাড়ি এক চুমুকে গ্লাসটা শেষ করে ঘর থেকে বের হয়ে পড়লাম। তারপর সোজা হোটেলের বাইরে চলে এলাম।

আর শরদিন্দুবাবু? কিরীটী প্রশ্ন করলে।

তাকে দেখলাম বীচের দিকে হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছে। অনেকটা এগিয়েও গিয়েছে সে। তখন—প্রায় বীচের মাঝামাঝি–

কিন্তু তা কি করে সম্ভব মানসী দেবী—অত তাড়াতাড়ি তিনি অত দূরে চলে যাবেন কি করে? আপনি ঠিক দেখেছিলেন তো আপনার স্বামীকে?

নিশ্চয়ই। তার গায়ে একটা সবুজ স্ট্রাইপ দেওয়া বুশশার্ট ছিল আর পরনে পায়জামা। না, আমার ভুল হয়নি।

কিন্তু সময়ের দিক থেকে বিবেচনা করলে ব্যাপারটা যে বিশ্বাসযোগ্য নয়, কিরীটী তা বুঝতে পারলেও মুখে সে কথা প্রকাশ করে না, চুপ করে থাকে।

ছুটতে ছুটতে গিয়ে শরদিন্দুকে ধরলাম, মানসী বলতে লাগল এবং তাকে কোন কিছু বলার অবকাশ না দিয়েই সোজা গিয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। মাথার মধ্যে কেমন যেন হঠাৎ ঝিম ঝিম করে উঠল, কিন্তু কেয়ার করলাম না—ঢেউয়ে গা ভাসিয়ে এগিয়ে গেলাম।

আপনার স্বামী-শরদিন্দুবাবু?

সে তখন সী-বীচে দাঁড়িয়ে।

মানসী বলতে লাগল, হঠাৎ চোখে যেন কেমন অন্ধকার দেখি। গা-টা এলিয়ে যায়—সেই সময়ই বোধ হয় কিছু নোনা জল পেটে ঢুকে গিয়েছিল, গা গুলিয়ে বমি হবার পর একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠলাম। তখনই মনের মধ্যে আমার কেমন যেন সন্দেহ হয় শরদিন্দু আমাকে শরবতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দেয়নি তো?

হঠাৎ বিষের কথা কেন আপনার মনে হল? কিরীটী প্রশ্ন করল।

শরদিন্দু ঝগড়ার সময় একদিন আমাকে বলেছিল–তুমি বিষ খেয়ে মর! তুমি মরতে পার না—আমি বিষ এনে দেব আমাদের ল্যাবরেটারী থেকে! বলেছিলাম, বেশ তো, আমার মৃত্যুই যদি তোমার কাম্য হয় তো এনে দিও বিষখাব। জানেন কিরীটীবাবু, আরও একটা কথা হঠাৎ সেই সময় মনে পড়ে গিয়েছিল আমার!

কি?

একদিন ওর সুটকেস ঘাঁটতে ঘাঁটতে ছোট একটা হোমিওপ্যাথিকের শিশি পেয়েছিলাম তার মধ্যে সাদা গুঁড়ো ভর্তি ছিল, মনে হয় সেটা বিষ, তাই আমার ঐ মুহূর্তে মনে হয়েছিল—যে সময়টা আমি বাথরুমে ছিলাম সেই অবসরে শরদিন্দু আমার অলক্ষ্যে শরবতে বিষ মিশিয়ে দেয়নি তো৷ কথাটা মনে হবার সঙ্গে সঙ্গেই আমি ডিসিশন নিই—আর ফিরে যাব না!

সাঁতার কাটতে কাটতে অনেক দূরে দৃষ্টির বাইরে চলে গেলাম। এদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে তখন চারিদিকে—সব ক্রমশ আবছা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সাঁতরাতেও আর পারছিলাম না, বড্ড ক্লান্ত লাগছিল—সেই সময় একটা জেলেডিঙি মাছ ধরে ফিরে আসছিল—আমি চিৎকার করে ডাকতেই তারাই আমাকে তুলে নেয়। তারা তো আমাকে দেখে অবাক। সে রাতটা তাদেরই ঝুপড়িতেই কাটাই আমি এবং তারপর তিনটে দিন আমার ওঠবার ক্ষমতা ছিল না–কাঁপিয়ে জ্বর এসেছিল। সেই জ্বরের ঘোরেই আমি জেলে আর জেলেবৌকে জানিয়েছিলাম আমার সব কথা, বলেছিলাম পুলিশ সমুদ্রের ধারে আমার ডেড বডির খোঁজ করতে পারে—তারা আমার কথা যেন পুলিশকে না জানায়, জানালে পুলিশ আবার আমাকে শরদিন্দুবাবুর হাতে তুলে দেবে। তাই ওরা কাউকে কিছু জানায়নি। আমি প্রায় এক মাস তারপর ঐ ঝুপড়ির মধ্যেই কাটাই।

হাতে আমার সোনার চুড়ি ছিল চার গাছা করে আট গাছা, তারই দুগাছা বেচে জামাকাপড় কিনি আর ওদের বকশিশ দিই এবং তাদের বলি তারা যদি আমার কথা কাউকে না জানায়, তাহলে আরও টাকা দেব। তারপর এক মাস পরে পুরী ছেড়ে এক রাত্রে চলে গেলাম কটকে।

কটকে কেন–কলকাতায় গেলেন না কেন?

তার তিনটি কারণ ছিল—প্রথমত, আমার দৃঢ় ধারণা হয়েছিল সেদিন আমার শরবতের গ্লাসে বিষ মিশিয়ে আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাই কলকাতায় ফিরে গেলে আবার হয়তো আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হবে। দ্বিতীয়ত, আমি স্থির করেছিলাম আসল ঘটনাটা আমাকে জানতে হবেই, কিন্তু কলকাতায় গেলে সে ব্যাপারে আমার কোন সুবিধা হবে না। এবং তৃতীয়ত, কলকাতায় গেলে কোথায় থাকব, কার কাছে থাকব—তার ওপর অনেক চেনাজানা লোক আছে সেখানে। যদি একবার তাদের চোখে পড়ে যাই আমার সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে। তাই স্থির করেছিলাম আপাতত আমার অজ্ঞাতবাস চলুক।

কটকে মাস চারেক ছিলাম আমার এক বান্ধবীর বাড়িতে। হঠাৎ তার সঙ্গে একদিন বাজারে দেখা হয়ে গিয়েছিল, তাকে সব কথা আমি খুলে বলি ও তার ওখানেই ছিলাম।

কলকাতায় যাননি?

গিয়েছিলাম এই মাসের প্রথমে—দিন তিনেকের জন্য।

ও, আচ্ছা, তারপর? কিরীটী বললে।

মাসখানেক আগে হঠাৎ কাগজে দেখলাম একজন চিত্রাভিনেত্রীর জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছে–ফটো ও অ্যাপ্লিকেশন দিলাম পাঠিয়ে, ওরা মানে নীলমণিবাবু ডেকে পাঠালেন আমাকে–কটকেই আমার ক্যামেরা ও ভয়েস টেস্ট নেওয়া হল। কন্ট্রাক্ট সই করলাম ওঁদের ফিল্ম কোম্পানিতে।

কলকাতায় গিয়ে আমি আরও একটা কাজ করেছিলাম কিরীটীবাবু—আমি শরদিন্দু ও সুকুমারকে ফোন করে জানিয়েছিলাম আমি মরিনি বেঁচে আছি আর আমি জেনেছি আমাকে বিষ দেওয়া হয়েছিল!

কি কথা হয়েছিল তাঁদের সঙ্গে আপনার ফোনে?

মানসী তখন ফোন করার ব্যাপারটা আগাগোড়া বলে গেল।

কিরীটী শুনল সব কথা নিঃশব্দে। তারপর বলল, শরদিন্দুবাবু-আব সুকুমারবাবু দুজনেই এখন পুরীতে, আপনি জানেন?

জানি। তারা আমার ফোন পেয়েই পুরীতে ছুটে এসেছে–সত্যি-সত্যিই আমি মরেছি না বেঁচে আছি সে ব্যাপারে নিঃসংশয় হবার জন্য। আর সেটা জানতে পেরেই নীলমণিবাবুকে চিঠি দিয়েছি আমি আর ফিল্মে কাজ করব না বলে।

জগন্নাথবাবুর সঙ্গে আপনার পরিচয় হল কি করে?

জগন্নাথবাবুই তো আমার বান্ধবী শ্রীমতীর বাবা!

তিনিও কি ব্যাপারটা জানেন?

জানেন বৈকি, শ্ৰীমতীই সব বলেছে তাঁকে।

এদিকে রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। বাইরে অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে। কিরীটী বলল, এবার আপনি কি করবেন?

ভাবছিলাম কাল পরশু বাবার কাছে ফিরে যাব।

না না—এখন না। আপনাকে এখনও কিছুদিন জগন্নাথবাবুর বাড়িতেই থাকতে হবে। কারণ আমার মন বলছে হত্যাকারী আপনাকে খুঁজে বের করবেই এবং আবার হত্যা করবার চেষ্টা করবে!

কিন্তু কেমন করে আমার খোঁজ সে পাবে কিরীটীবাবু?

পাবে নয়—এতদিনে হয়তো পেয়েছে। আমরা যেমন উদয়বাবুর কাছ থেকে তাদের ছবির স্টিল ফটো দেখে বুঝতে পেরেছিলাম, সেইভাবে হয়তো সিনেমা কাগজ বলাকায় প্রকাশিত আপনার ছবি দেখে সে বুঝতে পেরেছে লক্ষ্মী দেবীই মানসী দেবী। ফলে সে পুরীতে আবার দুবছর বাদে ছুটে এসেছে।

যাক সে কথা, রাত শেষ হয়ে এল মানসী দেবী—এবার আপনি জগন্নাথবাবুর বাড়ি চলে যান, আর দেরি করবেন না।

আমি যদি কাল আমার বান্ধবীর ওখানেই যাই? মানসী বলল।

না, সেখানে যাবেন না, আমার অনুরোধ। সবাই জানে আপনার বর্তমান ঠিকানা জগন্নাথবাবুর বাড়ি—আমার অনুমান যদি মিথ্যা না হয়, হত্যাকারীকে সেখানে আসতেই হবে— হ্যাঁ, আসবেই এ ব্যাপরে নিশ্চিত। ভাল কথা, জগন্নাথবাবুর বাড়িতে আর কে কে আছেন?

মাসীমা অর্থাৎ তার স্ত্রী ও তিনি।

আর কেউ নেই—কোন চাকরবাকর?

আছে—গোপী চাকর, সেই ঐ বাড়িতে সব কিছু করে।

কত বয়স তার—তাকে বিশ্বাস করা যায়?

চল্লিশ-বিয়াল্লিশ হবে, মনে হয় বিশ্বাসী। অনেক বছর আছে ওঁদের কাছে।

ঠিক আছে। আপনি কিন্তু সন্ধ্যার পর একেবারেই বাড়ির বাইরে যাবেন না। কিরীটী বলল, আচ্ছা নীলমণিবাবু বা অন্য কেউ জগন্নাথবাবুর বাড়িতে এসেছিলেন আপনার সঙ্গে দেখা করতে বা আপনার খোঁজে?

না। নীলমণিবাবু বারতিনেক ফোন করেছিলেন।

ঠিক আছে। আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করব আপনাকে—

কি বলুন?

ধরুন শরদিন্দুবাবু যদি নির্দোষ হন, আপনি কি তার কাছে ফিরে যাবেন?

না, ও-বাড়ি আর আমি ফিরব না।

তাহলে কি বাবার কাছে যাবেন?

এখনও ঠিক করিনি, কারণ বাবাই আমার বর্তমান দুর্ভাগ্যের কারণ। বাবার কথা ভেবে সেদিন যদি শরদিন্দুকে বিবাহ না করতাম, তাহলে এই দুর্ভাগ্যের মধ্যে হয়তো আমাকে এইভাবে জড়িয়ে পড়তে হত না! বলল মানসী।

কিরীটী বুঝতে পারে, মানসী তার বাবাকে ক্ষমা করতে পারেনি। একটু থেমে কিরীটী বলল, যান এবার আপনি, আর আপনার ফোন নম্বরটা রেখে যান, দরকার হলে আমি ফোন করব, আর আপনিও প্রয়োজন হলে এই হোটেলে আমাকে ফোন করতে পারেন সুব্রত।

কি, বল? সুব্রত জবাব দিল।

ওঁর সঙ্গে যাও–দূর থেকে ওঁকে অনুসরণ করবে জগন্নাথবাবুর বাড়ি পর্যন্ত।

মানসী ও সুব্রত অতঃপর ঘর থেকে বের হয়ে গেল। যাবার আগে ফোন নাম্বারটা এক কাগজে লিখে দিয়ে গেল মানসী।

ঘণ্টাখানেক পরে হোটেলের ঘরে ফিরে এসে সুব্রত দেখে, কিরীটী পাইপটা দুই ঠোঁটের ফাঁকে চেপে ধরে ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে।

পৌঁছে দিয়ে এলে মানসী দেবীকে? কিরীটী প্রশ্ন করল।

হ্যাঁ, পথ এক রকম ফঁকাই ছিল-সুব্রত বলল।

তোমাকে আজই একবার পুরীতে যেতে হবে সুব্রত।

যাব। কিন্তু কেন?

উদয়বাবু নিশ্চয়ই হোটেলে আসবেন, আর যদি না-ই আসেন, মিসেস ভট্টাচার্যর কাছ থেকে তার ঠিকানাটা জেনে তার সঙ্গে আজই দেখা করে মানসীর কথাটা তাঁকে জানাতে হবে।

তাঁকে জানাতে চাও কেন কথাটা?

জানাতে চাই এই কারণে যে, তিনি জানলে কথাটা কোনক্রমে শরদিন্দুবাবু এবং সুকুমারবাবুও জানতে পারবেন।

তাঁদের তুমি জানাতে চাও কেন?

কারণ তাদের মধ্যে মানসীকে যে হত্যার চেষ্টা করেছে সে মানসীর সংবাদটা পেলে আর সময় নষ্ট করবে না। উদয়বাবু ছাড়াও আর একজনকে মানসীর ঠিকানাটা তোমায় জানাতে হবে।

থানা আফিসারকে বোধ হয়?

হ্যাঁ, আর তাকে বোলো তিনি যেন প্রস্তুত থাকেন, আমার ফোন পেলেই তিনি এখানে চলে আসবেন।

তুমি তাহলে এখানেই থাকছ?

হ্যাঁ, তুমি দেরি কোরো না, কাজ শেষ হলেই সোজা এখানে চলে আসবে।

ঠিক আছে। তবে আমার কিন্তু মনে হয়, শরদিন্দুবাবুই তার স্ত্রীকে হত্যা করবার চেষ্টা করেছিলেন সেদিন।

মানুষের মন বড় বিচিত্র সুব্রত, কখন কোন পথে যে আনাগোনা করে অনেক সময় তা সে নিজেও টের পায় না।

কিন্তু সুকুমারবাবু তো সত্যি সত্যিই ভালোবাসতেন মানসীকে!

ভয় তো আমার সেখানেই। জান তত ভালোবাসা অন্ধ! শুধু তাই নয়, ভালোবাসাটা প্রচণ্ড স্বার্থপর, আর স্বার্থপরতা থেকেই জন্ম নেয় হিংসা। হিংসার কুটিল গতিক, আর দেরি কোরো না, রওনা হয়ে পড়। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পুরী এক্সপ্রেস ভুবনেশ্বরে আসবে সেই ট্রেনেই পুরী চলে যাও।

সকাল পৌনে নটা নাগাদ একটা সাইকেল রিকশায় চেপে পুরীর হোটেলের কাছাকাছি আসতেই দূর থেকে হঠাৎ সুব্রতর নজরে পড়ল হোটেল থেকে উদয়বাবু আর শরদিন্দুবাবু কথা বলতে বলতে বেরুচ্ছেন। সুব্রত আর এগুলো না। রিকশা থামিয়ে সেখানেই নেমে পড়ে ভাড়া মিটিয়ে দিল।

সুব্রত দেখল, ওঁরা কথা বলতে বলতে ঐদিকেই আসছেন। দুজনে কথার মধ্যে এমনই মশগুল যে কেউ এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন না। ক্রমে ওঁরা দুজনে ওর পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলেন সুব্রতর দিকে তাকালেন না। প্রচণ্ড হাওয়া কিন্তু তা সত্ত্বেও উদয়বাবুর কথার কিছু অংশ ওর কানে এল।

জগন্নাথবাবুর বাড়িতে খোঁজ নিয়েই তো আপনাকে বলছি, লক্ষ্মী দেবী ওখানে নেই—ঐটুকু ছাড়া আর কোন কথা সুব্রতর কানে এল না।

সুব্রত বুঝতে পারে, মানসীর বর্তমান ঠিকানা উদয়বাবুর অজ্ঞাত নয় এবং সে ইতিমধ্যে মানসীর খোঁজে ঘুরেও এসেছে ভুবনেশ্বরে।

এখন কি কর্তব্য? মনে পড়ল, কিরীটী তাকে বলে দিয়েছে লক্ষ্মী দেবী যে বর্তমানে ভুবনেশ্বরেই আছেন কথাটা উদয়বাবুকে জানাতে। সুব্রত হন হন করে হেঁটে চলল যেদিকে উদয়বাবু ও শরদিন্দুবাবু এগিয়ে গেছেন।

বেশী দূর তখনও যায়নি ওঁরা। দুজনে গল্প করতে করতে চলেছেন।

কাছাকাছি গিয়ে সুব্রত পশ্চাৎ দিক থেকে ডাকল, উদয়বাবু, শুনছেন?

সুব্রতর ডাক শুনে উদয়বাবু ঘুরে দাঁড়ালেন।

আরে সুব্রতবাবু যে, কাল সন্ধ্যায় আপনার খোঁজ করেছি, আজ সকালেও এইমাত্র আপনাদের হোটেল থেকে ঘুরে এলাম, শুনলাম আপনি নেই!

হ্যাঁ, লক্ষ্মী দেবীর সঙ্গে ছবির কনট্রাক্ট করতে আমি ভুবনেশ্বরে গিয়েছিলাম।

দেখা পেলেন?

পেয়েছি বৈকি, কনট্রাক্টও সই হয়ে গিয়েছে।

তবে শুনেছিলাম লক্ষ্মীদেবী ভুবনেশ্বরে নেই—নীলমণিবাবুর ছবিতে কাজ করবেন না জানিয়েছেন।

ঠিকই শুনেছিলেন, তিনি ভুবনেশ্বরে ছিলেন না। একটা জরুরি কাজে কলকাতায় গিয়েছিলেন, গতকালই সকালে ফিরেছেন, আমি আজই আবার কলকাতায় চলে যাচ্ছি—চার-পাঁচ দিন পরে ফিরব, তখন আপনার কনট্রাক্ট সই করাব।

সুব্রত আড়চোখে লক্ষ্য করলে, লক্ষ্মীদেবীর কথা শুনে শরদিন্দুবাবুর চোখের দৃষ্টি প্রখর হয়ে ওঠে। সুব্রত আর দাঁড়াল না, বললে, তাহলে চলি উদয়বাবু!

সেই দিনই রাত্রে। রাত তখন বারোটা হবে। নিযুতি রাত। কিরীটীর পূর্বব্যবস্থা মত জগন্নাথবাবু হোটেলে চলে এসেছিলেন কিরীটীর ঘরে। মানসী একা তার বাড়িতে।

জগন্নাথবাবু বলছিলেন, মেয়েটার কোন বিপদআপদ হবে না তো কিরীটীবাবু? আপনার নির্দেশমত বাড়িতে কেবলমাত্র সে আর তার মাসিমা রয়েছে—গোপীকেও ছুটি দিয়ে দিয়েছি!

কিছু চিন্তা করবেন না জগন্নাথবাবু, আশেপাশে সাদা পোশাকে পুলিশ বাড়িটার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখে সর্বক্ষণ ঘোরাফেরা করছে।

কিন্তু আপনি যে বলেছিলেন, মেয়েটার ওপর অ্যাটেম্পট হতে পারে।

 যাতে হত্যাকারী অ্যাটেম্পট নিতে পারে, সেইজন্যই তো ঐ ব্যবস্থা করেছি!

আপনার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না কিরীটীবাবু!

আমি চাই দুবছর আগে পুরীর হোটেলে শরবতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দিয়ে মানসীকে যে হত্যা করবার চেষ্টা করেছিল, মানসী বেঁচে আছে জেনে আবার সে মানসীকে হত্যা করবার একটা অ্যাটেম্পট নিক আজ রাত্রে। আর তাই আমি আজকের সব প্ল্যান ঠিক করেছি। সে আসুক—আসতে দিন তাকে। বাড়িটা অরক্ষিত আছে জানতে পারলে সে আজ আবার একটা অ্যাটেম্পট নিতে কোন দ্বিধা করবে না।

তা তো বুঝলাম কিন্তু–

ভয় নেই আপনার জগন্নাথবাবু, সেবারে মানসী অরক্ষিত ছিল, তার মনের মধ্যে কোন সন্দেহ ছিল না বলে নিশ্চিন্তও ছিল, কিন্তু এবার সে অরক্ষিত নয়। হত্যাকারীকে আমি হাতেনাতে ধরতে চাই এবং সেইভাবে তাকে ধরতে না পারলে তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে না।

হত্যাকারীকে কি আপনি সনাক্ত করতে পেরেছেন কিরীটীবাবু?

কিন্তু কিরীটী জবাব দেবার সময় পেল না। ঘরের টেলিফোনটা ক্রিং ক্রিং শব্দে ঘরের স্তব্ধতা বিদীর্ণ করে বেজে উঠল। কিরীটী প্রস্তুতই ছিল। তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে রিসিভারটা তুলে নিল, হ্যালো!

অপর প্রান্ত থেকে সুব্রতর গলা শোনা গেল—কিরীটী, একজন ভদ্রমহিলা, মাথায় ঘোমটা—এইমাত্র বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করল, মানসীই দরজা খুলে দিয়েছে–

ঠিক আছে। তুমি এগোও, আমি আসছি।

কিরীটী ফোনের রিসিভারটা নামিয়ে রেখে বলল, আমার ফিরতে বেশী দেরি হবে না জগন্নাথবাবু, আপনি এখানেই থাকুন। বলে কিরীটী বের হয়ে গেল।