বিজয়নগর – ৪

এক বিদেশি পর্যটকের চোখে : বিজয়নগর নগরী পর পর সুদৃঢ় প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। প্রাচীরের ভিতরে সুরক্ষিত আশ্রয়স্থলও রয়েছে। এই প্রাচীরের অনেক জায়গায় জলপূর্ণ পরিখা রয়েছে। অন্য ধরনের সুরক্ষায় ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রথম প্রাচীর থেকে নগরীর দূরত্ব অনেকখানি। এর মধ্যে কত ক্ষেত পড়বে, যেখানে নগরবাসী ধান বোনে, কত বাগান আর ঝিল, যে ঝিল দুইটির জলধার থেকে আসে। এই জল প্রথম সারির বেষ্টনীর মধ্যে দিয়ে আসে। এখন বসন্তকাল বলে জলাধারে প্রচুর জল রয়েছে। রয়েছে ফলের বাগিচা আর তাল-খেজুরের কুঞ্জ। তাছাড়া রয়েছে অনেক বসতবাটি।

ক্ষুদ্র জলাশয়ের পাশ দিয়ে প্রবেশের আগে দুটি বুরুজ। ভেতরে গেলেই দেখা যায় দুই দিকে দুটি মন্দির। তার একটি প্রাচীরবেষ্টিত এবং বৃক্ষসমাচ্ছন্ন। তারপর সুন্দর সুন্দর শ্রেণীবদ্ধ আবাসগৃহ। এগুলি সবই সেনানায়ক, ধনী এবং সম্মানীয় ব্যক্তিবর্গের। এইসব গৃহ অনেক মূর্তি সজ্জিত এবং নানারকম নয়নমুগ্ধকর অঙ্কনে শোভিত। আসল রাজপথ দিয়ে চলতে চলতে আপনি এসে পৌঁছোবেন প্রধান প্রবেশদ্বারগুলির একটিতে। সেটি পার হলেই রাজপ্রাসাদের সম্মুখে বিশাল একটি উন্মুক্ত চত্বর। এর বিপরীত দিকে আর একটি দ্বার, যেখান দিয়ে নগরীর অন্য প্রান্তে পৌঁছানো যায় ৷ এই উন্মুক্ত স্থান দিয়ে সমস্ত যানবাহন, মালপত্র এবং সবকিছু আসে, কারণ নগরীর কেন্দ্রস্থল বলে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এই বেষ্টিত স্থানটির আয়তন লিস্বনের যাবতীয় দুর্গের আয়তনের চেয়েও বেশি।

আরও অগ্রসর হলে দুটি মন্দিরকে যুক্ত দেখা যাবে। এর একটির দ্বারদেশে প্রতিদিন বহু মেষ বলি দেওয়া হয়। কারণ নগরীর অন্য কোথাও মেষ বলি হয় না, বিক্রিও হয় না। মন্দিরের বিগ্রহকে মেষের রক্ত সমর্পণ করা হয়। মুণ্ডগুলি বিগ্রহের পাশে রেখে দেওয়া হয়। প্রত্যেকটি মেষের জন্য তারা একটি করে চক্রম্ (মুদ্রা বিশেষ) প্রদান করে।

বলিদানের সময় একজন যোগী (পুরোহিত) উপস্থিত থাকেন। তাঁর ওপরই মন্দিরের ভার। বলিদান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যোগী শিঙা বাজান। বিগ্ৰহ যে বলিদান গ্রহণ করেছেন এটি তারই সংকেত।

মন্দিরের নিকটে রয়েছে একটি বিজয়রথ যেটি নানা মূর্তি ও শিল্পকার্য খোদিত। বছরের বিশেষ একদিনে তারা এটিকে টেনে নগরের পথে নিয়ে যায়। যেসব রাস্তায় এটি আড়াআড়িভাবে যেতে পারে সেই সব রাস্তায় নিয়ে যাওয়া হয়। কারণ এটি এতবড় সে এটিকে কোণার দিকে ঘোরানো যায় না। আরও অগ্রসর হলে প্রশস্ত এবং সুন্দর রাস্তা দেখা যাবে। যার ওপর সুন্দর সুন্দর সব বাড়ি রয়েছে। ধরে নিতে হবে এই সমস্ত অট্টালিকা ধনী ব্যক্তিদের। যাদের এমন রাস্তায় থাকার ক্ষমতা রয়েছে। এই রাস্তায় বহু বণিকের বাস। এখানে আপনি মণিমাণিক্য, হীরা, জহরৎ মোতি মুক্তা, পোশাক পরিচ্ছদ, এবং পৃথিবীতে প্রাপ্ত যাবতীয় সামগ্ৰী ইচ্ছা করলে কিনতে পারেন। প্রত্যেকদিন বিকালে এখানে মেলা বসে যেখানে অশ্ব, টাট্টু ঘোড়া ছাড়াও লেবু, কমলালেবু, আঙুর এবং বাগানের সব রকম সবজী, কাঠ ইত্যাদি সবই মেলে। একটি সড়ক রয়েছে যেখানে শুধু কারিকর ও শ্রমশিল্পীরা রয়েছে। তারা নানা ধরনের দ্রব্য বিক্রি করে। এখানকার প্রতিটি রাস্তাতেই মন্দির রয়েছে, কারণ এগুলি আমাদের দেশের মতো ধর্মসংক্রান্ত ভ্রাতৃসংঘ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু সবচেয়ে প্রধান এবং বৃহত্তম দেবালয়টি নগরীর বাইরে অবস্থিত। প্রতি শুক্রবার এখানে হাট বসে, যেখানে প্রচুর শূয়োর, মুরগী, সামুদ্রিক শুকনো মাছ এবং দেশের আরও অনেক কিছু পাওয়া যায়। যে সবের নাম আমার জানা নেই। এইভাবে নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে বাজার বসে প্রতিদিন।

নগরীর আয়তন সম্বন্ধে আমি এক্ষেত্রে লিখছি না। কারণ একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে এটি দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু আমি একটি পাহাড়ে উঠেছিলাম, যেখান থেকে আমি নগরীর অনেকটা অংশ দেখতে পেয়েছিলাম। এটি একাধিক পর্বতমালার মধ্যে স্থাপিত বলে সারা শহরকে দেখতে পাওয়া যায় না। সেখান থেকে আমি যতটা দেখেছিলাম তাতে আমার মনে হয়েছিল যে এটি রোম নগরীর মতোই বড়। দেখতেও অপূর্ব। এই নগরের ভিতরে গৃহসংলগ্ন উদ্যানে বহু বৃক্ষ-কুঞ্জ রয়েছে, তাদের ভেতর নালা দিয়ে জল বয়ে যায়। কোনো কোনো জায়গায় জলাশয় রয়েছে। রাজপ্রাসাদের পাশে খেজুর জাতীয় গাছের বীথিকা। তাছাড়াও রয়েছে ভালো ভালো ফলের গাছ। রয়েছে আম, সুপারি, কাঁঠাল, লেবু, কমলালেবুর গাছ, যারা এত কাছাকাছি যে মনে হয় যেন ঘন অরণ্য। এখানে সাদা আঙুরও রয়েছে। নগরীর সমস্ত জল আগে দেখা দুটি জলাধার থেকে আসে।

নগরীতে অসংখ্য মানুষের বাস। তার সংখ্যা আমি উল্লেখ করতে চাই না। কারণ সেটি অবিশ্বাস্য বলে মনে হবে। তবে আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, যে কোনো সৈন্যদল তারা অশ্বারোহী বা পদাতিক হোক কোনো বড় বা ছোট রাস্তায় জনতার ভীড় ভেঙে এগিয়ে যেতে পারবে না। মানুষ আর হাতির সংখ্যা খুব বেশি।

পৃথিবীর কোনো নগরীতে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী এত সহজলভ্য নয়, যেমন ধান গম ভারতীয় শস্যদানা কিছু পরিমাণে যব, শিম, মুগডাল, মুসুরী এবং নানারকমে দানাশস্য যা দেশের লোকেরা খাদ্যরূপে গ্রহণ করে। এ সবের বিরাট মজুতভাণ্ডার রয়েছে এবং সেগুলো অত্যন্ত সস্তা। কিন্তু অন্যান্য শস্যের মতো গম অতটা প্রচলিত নয়। সবাই আপনারা দেখতে পাবেন রাস্তা এবং হাট বাজার অসংখ্য বোঝাই করা বলদের গাড়িতে ভর্তি। তাদের সংখ্যা গোণা যায় না। অনেক সময় এমনও হয় যে রাস্তা পার হওয়ার সময় আপনাকে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। নইলে অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরে যেতে হবে। এখানে মুরগী, হাস এবং গৃহপালিত পাখি যথেষ্ট রয়েছে। নগরীতে যে দামে একটি মুরগী কিনতে পাওয়া যায়, নগরীর বাইরে একই দামে চারটি মুরগী পাওয়া যায়।

এদেশে অনেক তিতির পাখি রয়েছে, তবে সেগুলি আমাদের দেশের মতো নয়। তারা ইতালির তিতিরের (ইস্টার নাম) মতো। এরা তিন শ্রেণীর। এক শ্রেণীর পাখির পর্তুগালের মতো একটি ক্ষুদ্র কাঁটা রয়েছে। আর এক শ্রেণী রয়েছে যাদের প্রত্যেকের পা দুটি খুব তীক্ষ্ণ। অন্য এক ধরনের রয়েছে যারা রঙচঙে এবং এদেরই বাজারে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এ ছাড়াও রয়েছে কোয়েল, খরগোস, সমস্ত ধরনের বন্য মোরগ এবং জলাশয়ে বাস করে এমন সব পাখি যাদের হাঁসের মতো দেখতে। এই সব পাখি এবং শিকারের জন্তুদের জীবন্ত বিক্রয় হয়। খুব সস্তায় তাদের পাওয়া যায়। ছয় বা আটটি তিতির পাখি এক ভিন্‌টেমে পাওয়া যায়। তারা এই দামে কখনো দুটি এবং কখনো একটি খরগোস দেয়। অন্যান্য পাখির ক্ষেত্রে তারা এত বেশি দেয় যে গুণে শেষ করা যায় না। এমনকি বড় বড় পাখির ক্ষেত্রেও তারা এত বেশি সংখ্যায় দেয় যে ছোট ছোট পাখিগুলো নজর এড়িয়ে যায়। যেমন ঘুঘু পায়রা এবং ও দেশের অন্যান্য পাখি। ঘুঘু রয়েছে দুই রকমের। কতকগুলি পর্তুগালের ঘুঘুর মতো এবং কতগুলি গান গাওয়া পাখিদের মতো বড়। প্রতিদিন এত বেশি পরিমাণে ভেড়া মারা হয় যে গুণে শেষ করা যায় না। কারণ প্রতি রাস্তায় ভেড়ার মাংস বিক্রেতার দেখা মিলবে। সেগুলি এত পরিষ্কার এবং চর্বিযুক্ত যে মনে হবে বুঝি শুয়োরের মাংস। আপনি শুয়োরের মাংসও কিছু কিছু রাস্তায় কসাই-এর বাড়িতে পাবেন। সেই মাংস এত শ্বেতবর্ণের এবং পরিষ্কার যে অন্য কোনো দেশে এমন পাবেন না। এরপর পোভোসে (লিস্বনের নিকটবর্তী একটি স্থান) যেমন দেখতে পাওয়া যায় তেমনি এখানেও আপনি দেখবেন বোঝা বোঝা লেবু আনা হচ্ছে। এছাড়াও আনা হচ্ছে মিষ্টি ও টক কমলালেবু, বুনো বেগুণ, এবং বাগানে উৎপাদিত অন্যান্য দ্রব্য এত বেশি পরিমাণে আনা হয় যে অবাক হতে হয়। এখানকার নগরীর অবস্থা অন্যান্য নগরীর মতো নয়, যেখানে প্রায়ই দ্রব্য সামগ্রী, যোগাতে টান পড়ে। কারণ এখানে সব কিছুরই প্রাচুর্য। যে পরিমাণ মাখন,তেল এবং দুধ এখানে বিক্রি হয় চিন্তা করা যায় না। গরু, মহিষ যেভাবে প্রতিপালন করা হয় এমন দেখা দুর্লভ। এখানে ডালিম এবং থোকা থোকা আঙুর সস্তায় পাওয়া যায়।

বিদেশী পর্যটকটি আরও দীর্ঘ বিবরণ লিখে গিয়েছেন।

নৃত্যগীত নিয়মিতো অভ্যাস করছে দয়াবতীরা। বিশেষ করে দয়াবতীর কণ্ঠস্বর যেন কোকিলকণ্ঠ। মুক্তি দয়াবতীকে জড়িয়ে ধরে আজ।

–এ কি করছিস?

-আর পারছি না। এত মিষ্টি স্বর, স্থির থাকতে পারি না।

–কি যা তা বলছিস?

সবাই একসঙ্গে বলে ওঠে—ঠিক বলেছে।

অবলা বলে—তোর সুর এখন যেন দেবলোক স্পর্শ করার চেষ্টা করছে। একেই বলে বোধহয় কিন্নর কণ্ঠী। কিছুদিন হল তোর ওপর কিছু ভর করেছে।

দয়াবতী হেসে ওঠে।

—হাসলে যে?

—কিন্নরদের মুখ কেমন দেখতে জানিস?

—না। নিশ্চয় দেবী কিংবা অপ্সরার মতো।

–না, কিন্নর তো পুরুষ। তাছাড়া তারা ঘোড়া-মুখো।

সবাই দয়াবতীর দিকে দৃষ্টি ফেলে।

-আর কিন্নরীরাও।

—হ্যাঁ, কিন্নরীদের মুখও অমন।

—অত শত জানি না। ওরা সব স্বর্গবাসী। কেমন দেখতে, জানার দরকার নেই। তোর সংগীত শুনে দূর থেকে কেউ তোর রূপের কথা ভাববে না।

দয়াবতী বিষণ্ণ কণ্ঠে বলে—আমার তো রূপ নেই।

অবলা বলে-আমরা সবাই পরিপূর্ণ নারী, এমনকি শ্রীমতীকেও আর ছোট বলা চলবে না। কথায় কথায় অভিমান করা আমাদের মানায় না। তাছাড়া কার ওপর অভিমান করব আমরা? আমাদের যারা স্নেহ করতেন তাঁরা হারিয়ে গিয়েছেন হয়তো। ভবানীদির ওপর অভিমান করা যায়?

দয়াবতী বলে—আবোল তাবোল বকিস না। আমি অভিমান করিনি।

—তাহলে রূপ নেই বলে অত দুঃখ কিসের? সবাই কি রূপসী হয়ে জন্মায়? তাছাড়া তোর মতো কণ্ঠস্বর কয়জনের হয়?

সেই সময় গুরুদেব প্রবেশ করেন। সবাই সোজা হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি বলেন—কাল প্রত্যুষে মঞ্জরী আর শ্রীমতী আমার সঙ্গে যাবে। শয্যাশায়ী এক পীড়িত ব্যক্তি রয়েছে। সারা গায়ে যার ঘা। আমি তোমাদের আরও দুই-একজনকে অন্য কাজ দেওয়ার চেষ্টা করব। তবে এসব কাজে ঈশ্বরের আনুকূল্য প্রয়োজন হয়। আমি সফল হলে আমার উদ্দেশ্য তোমরা হয়তো বুঝতে পারবে। এতে অনেক ঝুঁকি। আমার প্রাণ সংশয়ও হতে পারে।

দয়াবতী গুরুদেবের পায়ের সামনে আছড়ে পড়ে কেঁদে ওঠে— না না, গুরুদেব। এসব আপনি করবেন না। আপনি আমাদের আশ্রয়স্থল। আপনি আমাদের ঈশ্বর।

–সারা জীবন সেই ধারণারই সৃষ্টি করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু আমি জানি তেমন কিছু নাই। তাই আমি একটু চেষ্টা করতে চাই।

দেবদাসীরা ক্রিয়াশক্তির সুখের দিকে আকূল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। তিনি বলেন—তোমাদের দেবীর অংশে জন্ম। আর সেই দেবীর লাঞ্ছনা সর্বত্র। ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের ভোগ্য তোমরা। কেন? তোমরা জান না। কেউ জানে না। শুধু এই ভাবেই চিরকাল চলেছে, এমন ধারণা সবার মনের মধ্যে রয়েছে। তাই সরস্বতীদের অমন দশা হয় ৷

দেবদাসীরা কেঁপে ওঠে।

—অথচ সেবার মাধ্যমে তোমরা মানুষের কতখানি শ্রদ্ধা পেতে পার, আমি জানি। স্ত্রীপুরুষ নির্বিশেষে সবাই তোমাদের আপন ভাবতে পারে।

শ্রীমতী বলে—হ্যাঁ, গুরুদেব। আমি অনুভব করেছি।

–তোমাদের কাছে আমার একটিই আজ্ঞা, কখনো এসব কথা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে না।

.

প্রত্যুষে গুরুদেব শ্রীমতী ও মঞ্জরীকে নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশের দিকে রওনা হন। সেখানে পৌঁছোতে একটু সময় লাগবে। কিন্তু উপায় কি, রোগী যদি শয্যাশায়ী হয় তাহলে তার কাছেই যেতে হয়। এতদিন ক্রিয়াশক্তি এই ধরনের রোগীকে দেখতে যেতেন না, তারা কেউ ডাকত না। তারা ওষুধ নিয়ে চলে যেত। ডাকতে সাহস পেত না। কিন্তু শ্রীমতী অসুস্থদের গৃহে যাওয়ার পর থেকে গুরুদেবও যান। এতদিন যাননি বলে মনে মনে একটা দুঃখ হয়। তবে রাজপুরীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য যেতে হয় বলে, তিনি সাধারণত বাইরে যেতে পারেন না। শ্রীমতী মঞ্জরীকে নিয়ে একাই যায়। ওদের এভাবে পাঠাতে তাঁর দ্বিধা হয়। বন জঙ্গলের পথে শুধু হিংস্র পশু তো থাকে না। ভরসা এই যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পীড়িতের গৃহের কোনো পুরুষমানুষ এসে নিয়ে যায়।

আজ গুরুদেব নিশ্চিন্ত, সঙ্গে তিনি নিজে রয়েছেন। আজ তিনি ওদের দুজনার কাজ দেখবেন। তাছাড়া আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসা সম্ভব কিনা তারও পরীক্ষা হয়ে যাবে। যদি সেই পরীক্ষা ব্যর্থ হয় তাহলে অতি যত্নে লালিত তাঁর একটি স্বর্গ ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। ভাগ্যাহত সরস্বতীদের নিষ্কৃতির পথ চিরকাল রুদ্ধ হয়ে যাবে হত।

একটি জীর্ণ কুটিরের সামনে দাঁড়ান তাঁরা। একজন শীর্ণকায়া স্ত্রীলোক তাঁদের দেখে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ওরা লক্ষ্য করে স্ত্রীলোকটি বিগত-যৌবনা নয়। গৃহের অভ্যন্তরে একটা হালকা দুৰ্গন্ধ।

গুরুদেব ঝুঁকে পড়েন রোগীর ওপর। ভালোভাবে দেখতে থাকেন ভ্রূকুঞ্চিত করে। তারপর শ্রীমতীকে দেখতে বলেন। শ্রীমতী নির্বিকার চিত্তে তার একটা পা তুলে দেখে। সে আর্তনাদ করে ওঠে। এরপর তার একটি হাত উঠিয়ে নিয়ে আলোয় ধরে। তারপর রোগীকে বলে—দেখতে পেয়েছিলে?

গুরুদেব চমকে ওঠেন। এ কেমন ধরনের প্রশ্ন? তিনি রোগীর মুখের দিকে কৌতূহলের দৃষ্টি তাকান।

রোগী বলে—না, গাছে হেলান দিয়ে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলাম, সেই সময় হাতে কামড়ালো। তারপরেই পায়ে। কী জ্বালা! ভেবেছিলাম সাপে কামড়েছে।

–না, সাপে কামড়ালে দেখা যেত। অন্য কোনো পোকা। যখন ফুলে উঠল তখন গুরুদেবের কাছে এলে এভাবে পড়ে থাকতে হত না।

-আমাদের অত সাহস হয়নি। আপনারা দয়া করে ভালো করে দিন। নইলে আমার স্ত্রী না খেয়ে মরবে।

গুরুদেব বুঝতে পারেন বিজয়নগরে একজন ধন্বন্তরীর উদয় হয়েছে। অতটুকু একটি মেয়ে যেদিন মন্দিরের দ্বারে মায়ের হাত ধরে এসে দাঁড়াল সেদিনই তার চোখ দুটো দেখে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই চোখের দৃষ্টি অতলান্ত। তিনি শ্রীমতীকে বলেন—আজকে আমি আর দেখব না। তোমরাই দেখ। এরা কেউ আপত্তি করবে না।

অনেক সময় নিয়ে রোগীর সব রকম ব্যবস্থা করে গুরুদেব যখন ওদের দু’জনকে নিয়ে কুটিরের বাইরে চলে এলেন স্ত্রীলোকটি তখন ওদের পায়ের সামনে উপুর হয়ে প্রণাম করে। গুরুদেব অভ্যস্ত। কিন্তু ওরা দু’জনা লজ্জিত। হাত ধরে তুলে বলে—একি করছেন।

—এতদিন দেবতাকে দেখেছি, আজ দুই দেবীকে দেখলাম। এমন যে হয় আমি কল্পনা করিনি। আমার স্বামীর ব্যথার যথেষ্ট উপশম হয়েছে। উনি আর আর্তনাদ করছেন না।

শ্রীমতী বলে—মনে হয় কমে যাবে। তবে গায়ে অনেক দাগ থাকবে।

গুরুদেব বলেন—শ্রীমতী, তোমাকে আমি জেনেছি আগেই, কিন্তু আজ মঞ্জরীর মধ্যে যা দেখলাম—

শ্রীমতী কেঁদে ফেলে বলে—ওকে দেখে মনে হচ্ছিল ও যেন রোগীটির মা। এতটুকুও ঘৃণা নেই, কী অগাধ স্নেহ, হ্যাঁ স্নেহ। ছাড়া আর কি বলব?

গুরুদেব বলেন—হ্যাঁ ৷

মঞ্জরী সংকোচে জড়োসড়ো হয়।

শ্রীমতী বলে—তুমি আর মানুষ থাকো না মঞ্জরী, যেন অন্য জগতের কেউ। গুরুদেবও কেমন হয়ে যান। সত্যিই তো সেই শৈশব থেকে মন্দিরে রয়েছেন, শেষবেলায় এসব কি দেবীদর্শন? দেবদাসীর রূপ ধরে এ কারা তাঁকে দেখা দিতে এসেছে? অমরু আর অতীশ কি এদের উপযুক্ত হবে?

পাহাড়ি রাস্তার বিপরীত দিকে দেখা গেল দুইজন তরুণ নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছে। তাদের দেখে শ্রীমতীরা চিনতে পারে। ওরা থমকে যায়।

গুরুদেব বলেন—থামলে কেন? ওদের এদিকে আসার কথা ছিল।

দুজনেই বিস্মিত হয়ে গুরুদেবের দিকে দৃষ্টি পেলে।

তিনি বলেন—ওরা জানে না, তোমরা আছ।

শ্রীমতী ভাবে, গুরুদেব কি করে বুঝলেন, ওই তীক্ষ্ণ চেহারার মানুষটার মধ্যে সে একটা আকর্ষণ অনুভব করে। মঞ্জরী ওকে ফিসফিস করে বলে—এই সেই সুন্দর পুরুষ। এখানে এল কি করে? আমার পা ভেঙে পড়ছে। তুই আমাকে একটু ধরবি?

ওই দুই তরুণের একজন বলে—গুরুদেব আপনি আমাদের কোন কাজে ডেকেছিলেন বলেছিলেন।

–কাজ তো বটেই। কিন্তু একটু আগে তোমরা যদি পৌঁছাতে তাহলে এরা দুজনে এক অসাধারণ কাজ করেছে চাক্ষুস দেখতে পেতে।

–আমাদের আপনি তো সেকথা বলেননি।

—না না। দৈবাৎ ঘটে গিয়েছে।

গুরুদেব ওদের সবিস্তারে সব কিছু বলেন। ওরা উভয়ের দিকে চেয়ে থাকে। ঠিক যেন বিশ্বাসযোগ্য নয়। সুন্দর তরুণটি বলে-আমরা গিয়ে দেখতে পারি?

—নিশ্চয়। চল।

আবার সবাই মিলে কুটিরের কাছে যায়। শ্রীমতীরা অনুভব করে, এ যেন অন্য ধরনের সুখ।

কুটিরের দুয়ার খোলা ছিল। স্ত্রীলোকটি মঞ্জরীর কাছে গিয়ে বলে—এক জায়গায় রক্ত বের হচ্ছে।

—নতুন করে বেঁধেছি বলে অমন হয়েছে। ও কিছু না। এখন ভালো লাগছে? —হ্যাঁ। আপনারা দুজনা দেবী। ঠাকুর আপনাদের সঙ্গে করে এনেছেন। ও ভালো হয়ে যাবে। ওর এত শাস্তি আমি দেখিনি।

দুই তরুণ সব শোনে সব দেখে।

সবাই বাইরে আসে।

একটু এগিয়ে গুরুদেব তরুণদের সামনেই শ্রীমতীদের বলেন—তোমরা দুজনা উচ্চবংশীয় হলেও দেবদাসী। কিন্তু এদের মধ্যে একজন মলয়াবন্ত পর্বতের পাদদেশ থেকে বহুদূর পর্যন্ত বিশাল অঞ্চলের ভূস্যাধিকারী। নাম অতীশ। আর অন্যজন খুবই পরিচিত, তবে চেনো কিনা জানি না। অন্যজনের নাম অমরু। একশত পদ লিখে বিখ্যাত।

শ্রীমতীর সর্বাঙ্গে শিহরণ। এই নামই পিতার মুখে শুনেছে। বাবা বলেছিলেন মাত্র ঊনিশ বছর বয়সের এক কিশোরের লেখা ওই কাব্যগাথা। এই সেই কিশোর। এখন যুবক। মহা সৌভাগ্য তার।

শ্রীমতী নিম্ন স্বরে বলে—আমি জানি।

—তুমি জান? কোথা থেকে জানলে?

—বাবা।

–তোমার বাবা পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন তাহলে।

অমরু বলে—উনি জীবিত নন?

-না, তাহলে কি এই মন্দিরে ওকে স্থান নিতে হত? মহারাজার নিজস্ব বাহিনীর কর্মচারি ছিলেন। নিহত হন। তিনি তোমার গ্রন্থের খবর প্রথম থেকে জানতেন ৷ বলতে গেলে প্রকাশিত হওয়ার সময় থেকেই বুঝতে পারছি।

—আমি বিস্মিত হচ্ছি। এই সব বিষয়ে ওঁর প্রবল অনুসন্ধিৎসা ছিল। সেই পিতার কন্যার তীক্ষ্ণধী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

—ভুল বলনি।

—চিকিৎসার কথাও শুনলাম।

শ্রীমতীর হৃদয় আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে নিজেকে তিরস্কার করে বলে—এতটা ভালো নয়। সে যত যা-ই হোক দেবদাসী।

ঋষ্যকুট পর্বতের দিকে সাদা মেঘে রোদের প্রতিফলন। সূর্যোদয়ের পর থেকে খুব দ্রুত আকাশের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ক্রিয়াশক্তি বলেন—একে প্রতিভাময়ী বলা চলে। আমি এই প্রথম এমন একজনকে দেখলাম। কিন্তু কি করব? শুধু প্রতিভাময়ী নয়, এ অত্যন্ত সুন্দরী, এরা দু’জনেই ৷

মঞ্জরী বলে ওঠে—গুরুদেব, আপনি ওর সঙ্গে আমার তুলনা করছেন? ও তো-

–আমি তুলনা করছি না। তবে তোমার সেবাপরায়ণতা দেখে আমি রূপের ভেদাভেদ বিচার করতে ভুলে গিয়েছি।

অতীশ বলে—ঠিক। আমি দেখেছি কুটির থেকে বাইরে আসার আগে উনি রোগীর ললাটে হস্তস্পর্শ করে সান্ত্বনার হাসি হেসে চলে এসেছিলেন। বোঝাই গেল, রোগীর ক্ষেত্রে ওঁর ভেদাভেদ নেই। বোধহয়, আপনার মতো অবস্থা।

একটা হালকা হাসির আওয়াজ ভেসে ওঠে।

.

পর্যটকের আরও বিবরণ :

উত্তরদিকে নগরীর প্রাচীরের বাইরে তিনটি খুব সুন্দর মন্দির রয়েছে, যার একটিকে বলা হয় বিশালাক্ষ্মী। এটি রাজ্যবাসীর কাছে খুব পবিত্র ও শ্রদ্ধার স্থান। এখানে বহু তীর্থযাত্রীর সমাগম হয়।

প্রধান দ্বারদেশের বিপরীত দিকে বহু সুন্দর সুন্দর অট্টালিকা সমন্বিত একটি চমৎকার সড়ক রয়েছে। বাড়িগুলির ঝুলবারান্দা রয়েছে, থামের উপর রয়েছে খিলান শ্রেণী, যেখানে মন্দিরে আগত তীর্থযাত্রীরা অবস্থান করে। এখানে উচ্চশ্রেণীর মানুষেরও তীর্থভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। এই একই রাস্তায় রাজার একটি প্রাসাদ রয়েছে। মন্দিরে এলে তিনি ওই প্রাসাদে থাকেন।

প্রথম দ্বারদেশের ওপরে একটি নারী-তীর্থযাত্রীর মূর্তি রয়েছে। এই দ্বার একটি সুউচ্চ বুরুজ বিশিষ্ট, যেটির সর্বাঙ্গে পুরুষ ও নারী মূর্তির সারি। এতে মৃগয়ার দৃশ্যও রয়েছে, আরও বহু বিষয়ের মূর্তি রয়েছে। এই বুরুজটি উপর দিকে উঠতে উঠতে ক্রমশ সরু হয়ে আসছে। সেই সঙ্গে মূর্তিগুলোও ধীরে ধীরে ছোট হয়ে এসেছে।

প্রধান দ্বারের বিপরীত দিকে রয়েছে চারটি স্তম্ভ যার দুটি স্বর্ণমণ্ডিত এবং অন্য দুটি তাম্রমণ্ডিত। যে দুটি থেকে কালের প্রভাবে, আমার মনে হয় স্বর্ণ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। মন্দিরের সবচেয়ে নিকটে যেটি রয়েছে সেটি বর্তমান রাজা প্রদান করেছেন। অন্যান্যগুলি তাঁর পূর্ব পুরুষদের দ্বারা প্রদত্ত। মন্দিরের প্রবেশ দ্বারের বাইরের সমস্ত অংশ তাম্রমণ্ডিত এবং গিলটি করা। ছাদের ওপরের প্রত্যেক দিকে ব্যাঘ্রসদৃশ কোনো বৃহদাকার জন্তু। সেটিও গিল্টি করা। বিগ্রহের মন্দিরে প্রবেশ করলে প্রতিটি স্তম্ভের গায়ে সজ্জিত গর্ত যাতে তৈল প্রদীপ রাখা হয়। প্রদীপগুলি প্রতি রাতেই জ্বালানো হয়। এদের সংখ্যা আড়াই তিন হাজার। মন্দির অতিক্রম করলে একটি ক্ষুদ্রাকার মন্দির দেখা যাবে। যেটি অনেকটা গীর্জার নীচের সমাধি গৃহের মতো। আর একটু অগ্রসর হলে উপাসনালয়ের মতো দেখতে, যেখানে ওদের উপাস্য দেবতার বিগ্রহ রয়েছে। এখানে পৌঁছোবার আগে তিনটি দরজা রয়েছে। এই পবিত্র স্থানটি খিলান-যুক্ত। বাইরের আলো প্রবেশ করে না বলে এটি অন্ধকার এবং সবসময় মোমবাতি দ্বারা আলোকিত। প্রথম প্রবেশদ্বারে দ্বাররক্ষীরা রয়েছে যারা ওই স্থানের ভারপ্রাপ্ত ব্রাহ্মণদের ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেয় না। এবং আমি যেহেতু ওদের কিছু দিয়েছিলাম তাই ওরা আমাকে প্রবেশ করতে দিল। এক প্রবেশ পথ থেকে অন্যটির মধ্যবর্তী স্থানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মূর্তি রয়েছে। আসল বিগ্রহ একটি গোলাকার প্রস্তর খণ্ড যার কোনো আকার নেই। এরই ওপর ওদের প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠা। এই অট্টালিকার বহির্ভাগ সম্পূর্ণরূপে তামার গিলটি করা। মন্দিরের পশ্চাতে বাইরের দিকে আমি যে বারান্দাগুলোর কথা বলেছি সেখানে শ্বেতবর্ণের স্ফটিকের একটি মূর্তি রয়েছে, যেটি দৃঢ়হস্ত বিশিষ্ট। এক হাতে রয়েছে (কি রয়েছে মূল রচনার নেই), অন্য হস্তে তরবারি এবং অন্যগুলিতে পবিত্র প্রতীক। এর পদতলে রয়েছে একটি মহিষ এবং একটি বৃহদাকার জন্তু। যেটি এটিকে বধ করতে সাহায্য করছে। এই মন্দিরে অষ্টপ্রহর একটি ঘৃতের প্রদীপ জ্বলছে। এর চতুর্দিকে আরও ছোট ছোট মন্দির ও উপসনালয় রয়েছে।

.

পশুপতি মন্দিরের দেবদাসীদের মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন চলছে কয়েকদিন হল। এমনকি ভবানী দিদিও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সে ওদের দু-একবার জিজ্ঞাসা করে কোনো সদুত্তর পায়নি। শেষে একদিন গুরুদেবকে একা দেখে তাঁর সামনে গিয়ে প্রণাম করে দাঁড়িয়ে থাকে।

–কি হল ভবানি, কিছু বলতে চাও।

—হ্যাঁ। গুরুদেব।

-বল।

—এদের মধ্যে একটা চাপা অস্বস্তি দেখতে পাচ্ছি। জিজ্ঞাসা করলে বলে না।

—হ্যাঁ, সত্যি একটা অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে।

–আপনি জানেন প্ৰভু?

—জানি বৈকি। আমিই যে সৃষ্টি করেছি সেই অস্বস্তি।

ভবানী বিস্মিত হয়ে চেয়ে থাকে কি বলবে ভেবে পায় না।

–আচ্ছা ভবানী এখানে যারা দেবদাসী হয়ে আছে, তারা কি কুৎসিত? –না, না, ঠাকুর। একজনও তেমন নেই। এমনকি সবচেয়ে যে খারাপ, সে ও অনেক ভালোর চেয়ে ভালো।

—আর সুন্দরী?

—আমি তো নগরে বেশি যাই না। তবে শ্রীমতীর মতো কাউকে দেখব বলে কল্পনাও করি না। রানীদের মধ্যেও কেউ আছেন বলে বিশ্বাস করি না। তাঁদের সবাইকে তো দেখেছি।

—সরস্বতী নামে একজন—

—না না, ঠাকুর ওই হতভাগীর কথা বলবেন না।

-এখানকার দেবদাসীদের ভবিষ্যৎ কি হতে পারে বলে তোমার ধারণা?

—জানি না। আমি দেখতে যেমন ছিলাম, এরা সবাই তার চেয়ে ভালো দেখতে। আমার ভবিষ্যৎ মোটামুটি বোঝা যায়। কিন্তু এরা অল্পবয়সী, হয়তো অনেকেই এখানে থেকে যাবে। শুনেছি পথের ভিখারিনীও হতে হয়েছে অনেককে। যা হওয়ার হবে। ওসব নিয়ে আমি ভাবি না। প্রত্যেকেই নিজের নিজের কপাল নিয়ে এসেছে।

–তুমি এই মন্দিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এর মঙ্গল তুমি চাও। ভবানী ঘাবড়ে যায়। গুরুদেব তাকে এত কথা জিজ্ঞাসা করছেন কেন? সে তো কোনো বিষয়ে আলোচনার যোগ্য নয়।

—জান ভবানী আমি ভাবছি চেষ্টা করে এদের দু’একজন করে মন্দিরের দেবদাসীত্ব থেকে নিষ্কৃতি দিতে চেষ্টা করব।

ভবানী ভয়ে চেঁচিয়ে ওঠে—ঠাকুর–

—ভয় পেলে কেন?

—বিগ্রহ কুপিত হবেন না? মন্দিরের সবার উপরের অভিশাপ বর্ষিত হবে না?

—বোধহয় না। আমি এঁকে পূজা করি। একান্তে ধ্যান করি। মনে হয় ওঁর সম্মতি রয়েছে। যুগ যুগ ধরে দেবতা ব্যথা পাচ্ছেন। দেবদাসী রাখতে হলে যোগ্য সম্মান দিয়ে রাখতে হবে। তাদের মধ্যে গার্হস্থ জীবনের লোভ উঁকি দেবে না। তাদের দেখে রাজা প্রজা কারও মনে কলুষ চিন্তার উদয় হবে না। তারা হবে পূজনীয়া, প্রণম্যা।

ভবানীর চোখের সামনে অন্য দৃশ্য ফুটে ওঠে। এই দৃশ্য চিন্তার অবকাশই তার হয়নি। সে বলে—তাহলে কি হবে এদের?

—সংসারে দেওয়ার চেষ্টা করব।

—দেবদাসীদের কোনো পরিবার সংসারে গ্রহণ করতে রাজি হবে?

—তাই দেখছি। তুমি চুপ করেই থাক। ওরা জানতে পেরেছে বলে এত অস্বস্তি ৷ কিন্তু পশুপতিদেব আমাকে যেন এগিয়ে দিচ্ছেন। তুমি এদের অস্বস্তি বাড়িয়ে দিও না।

—না। আমি রন্ধন করি। দেবতার পুজো করি। আর আপনাকে গুরু বলে মানি। দেবতার চেয়ে পৃথক বলে ভাবি না আপনাকে। ভাববই বা কেন? আপনি তো ঠাকুরই।

.

রাজপ্রাসাদ থেকে মাঝে মাঝে এক আধজন কর্মচারি এসে ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করে। কখনো তাঁকে পত্র দিয়ে যায়। কখনো তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে পরামর্শ নিয়ে যায়।

একদিন একজন উচ্চশ্রেণীর কর্মচারি ক্রিয়াশক্তিকে কথাপ্রসঙ্গে বলে—ঠাকুর, আপনার মন্দিরে রূপসী দেবদাসী আছে শুনলাম।

—তুমি এ ধরনের কথা আমাকে—

কর্মাচারি তাড়াতাড়ি গুরুদেবের পদস্পর্শ করে বলে—আমি এক আশঙ্কায় আপনাকে বলে ফেলেছি।

-কিসের আশঙ্কা?

-মহারাজা নাকি বলাবলি করেছেন আপনার মন্দিরে রূপবতী দেবদাসী থাকা সত্বেও তিনি জানতে পারেননি বলে অবাক হয়েছেন।

—হুঁ। দেখো, ওরা কে কতখানি রূপ ধরে, আমি ততটা গুরুত্ব দিই না। আমি ওদের নৃত্যগীত আর শিক্ষার দিকে লক্ষ্য রাখি। সেই সঙ্গে ওদের মনে যাতে ভক্তির প্রকাশ পায় তাও দেখি।

—গুরুদেব তেমন কেউ থাকলে রানী হতে চলেছেন।

—দেখা যাক।

কর্মচারি বিদায় নিতেই তিনি শ্রীমতী আর মঞ্জরীকে ডেকে বলেন—কাল প্রত্যুষে তোমরা আমার সঙ্গে যাবে।

সবাই বুঝল কোনো রোগীর চিকিৎসা করতে হবে। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে দেখে গুরুদেব মন্দির ছেড়ে দ্রুতপদে বাইরে চলে গেলেন। জানল না তিনি রাজসভার দিকে চললেন।

পরদিন ক্রিয়াশক্তি দুজনকে নিয়ে জনহীন এক জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে বিশাল বটগাছের নীচে গিয়ে দাঁড়ালেন। মঞ্জরীর গা ছম্ছম্ করে। এ কোথায় নিয়ে এলেন তাদের? এখানে তো কোনো লোকালয় নেই। কার চিকিৎসা হবে? শ্রীমতী ভীত না হলেও গুরুদেবের উদ্দেশ্য বুঝতে পারে না।

–তোমাদের ভয় করছে?

শ্রীমতী বলে—না কিন্তু এখানে এলাম কেন?

–আমি দুজন ব্যক্তিকে এখানে আসতে বলেছি। তাদের আমি দুটি প্রশ্ন করেছিলাম। তারা আজ উত্তর দেবে।

—তাতে আমাদের কিসের প্রয়োজন?

—তারা এলে বুঝতে পারবে।

তারা এলো। আর তাদের দেখে এদের দুজনার সর্বাঙ্গে তড়িৎপ্রবাহ বইতে শুরু করল। শ্রীমতীকে মঞ্জরী অতীশ সম্পর্কে তার মনোভাব অকপটে বলে ফেলেছে। পরক্ষণেই বলেছে একথা না বললে সে থাকতে পারত না। অথচ এই আশা পোষণ করা নিশ্চয় পাপ। শ্রীমতী অতটা উচ্ছ্বাস প্রবণ হতে পারে না। তবে অমরুর মতো পুরুষ শুধু স্বপ্নে দেখার বেশি সে ভাবে না।

গুরুদেবকে তারা প্রণাম করে। তিনি বলেন—আমি তোমাদের পিতৃতুল্য। অনেক চিন্তা করে, আর দ্বিধা কাটিয়ে আমি তোমাদের চারজনকে এখানে এনেছি। আমার মনে হয়েছে এতে তোমাদের মঙ্গল হওয়ার সম্ভাবনা। কন্যার অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হয় না এক্ষেত্রে। তবু আমি তাদের প্রকৃতি অনুযায়ী নির্বাচন করেছি। এখন তোমরা দুজনা বল তোমাদের বাবা মা এবং পিতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মতো রয়েছে কিনা।

অতীশ বলে—গুরুদেব, আমার পিতা অতিবৃদ্ধ। বলতে গেলে আমি তাঁর বৃদ্ধ বয়সের পুত্রসন্তান। আমার চেয়ে বয়সে বড় তাঁর আরও তিন কন্যা রয়েছে। আমার মূল্য তাঁর কাছে খুবই বেশি। তাই তিনি এতে সম্মতি দেননি প্রথমে। আমার মা এঁর সেবাপরায়ণতার কথা শুনে বলে উঠলেন, সেকি! তুমি ভুলে গেলে সেই কন্যাকুমারীর কথা? গুরুদেব জানতে চান, কোন ঘটনার কথা। অতীশ বলে—ওঁরা দুজনে সেই কথা উল্লেখ করলেন না। শুধু বাবা বলেন—তোমার মা অনুমতি দিলে আমি বাধা দেব না। আমার মা বলেন—তোমার বোনেরা নানা কথা বলবে। প্রজারাও বলবে। তুমি সহ্য করতে পারবে?

-পারব।

একথা শুনে গুরুদেব বলেন—প্রস্তুত হয়েই এসেছ বলতে চাও?

—হ্যাঁ।

মঞ্জরী শ্রীমতীকে আঁকড়ে ধরে। গুরুদেব তাকে বলেন—তুমি ওই প্রস্তরখণ্ডের ওপর বসো মঞ্জরী।

সে বসে পড়ে।

—এবারে তোমার উত্তর জানতে চাইব অমরু।

অমরু মৃদু হেসে বলে—আমার বাবার গত বছর মৃত্যু হয়েছে।

—শোন অমরু, তোমার পিতৃবিয়োগের কথা বিজয়নগরের মানুষকে ডেকে বলতে হয়নি। এমনিতেই সবাই জেনে গিয়েছে।

–মা, আমার মুখে সব শুনে বলেন, তাড়াতাড়ি গিয়ে নিয়ে আয়। একা থেকে থেকে দম বন্ধ হয়ে যায় সারাদিন। তুই রাজসভায় কিংবা ঘরের কোণে মুখ গুঁজে থাকিস। আশেপাশে কোনো বাড়ি নেই। কবে আনবি?

গুরুদেব আর অতীশ উভয়ের মুখেই হাসি।

অমরু বলে—অতীশ হাসতে পারে কিন্তু আমাকে তো একটা ব্যবস্থা করতে হবে। একজন মানুষ গেলে একটা শয্যারও তো দরকার হয়। আছে কিনা কে জানে।

অতীশ বলে—আছে। তোমার পিতার শয্যাটি বড়। তাছাড়া আর একটা রয়েছে।

গুরুদেব বলেন—তুমি এত জান, ও জানে না।

—ওর চোখ দুটো শোভাবর্ধনের জন্য। এদিকে মা ও ছেলে কারও সাহায্য নেবেন না। কায়িক সাহায্যও নয়। অমরুর পোশাক দেখেই তো বুঝতে পারছেন।

গুরুদেব হেসে ফেলেন। তিনি উভয়ের মধ্যে নিবিড় বন্ধুত্বের সম্পর্ক উপলব্ধি করেন। মনে মনে পশুপতিনাথকে বারবার প্রণতি জানান। তিনি তাঁকে সাহায্য করছেন। অন্যদের বিষয়েও করবেন হয়তো।

এক সময় শ্রীমতীও কখন যেন মঞ্জরীর পাশে পাথরের উপর বসে পড়ে। সে-ও যেন দেহের শক্তি হারিয়েছে। তার সামনে ঠিক এক অভিনয় হয়ে চলেছে। যেন সত্যি নয়। সত্যি হলেও হয়তো অধরা থেকে যাবে।

গুরুদেব সবাইকে বলেন—তোমরা এখনি আমার সঙ্গে মন্দিরে চল। খুব দ্রুত তোমাদের বিবাহসম্পন্ন করতে হবে। নইলে বিপদও হতে পারে।

তরুণ দুজনা কি যেন অনুমান করল। তারা গুরুদেবের সঙ্গে চলল।

মন্দিরে দুই তরুণ সহ গুরুদেবকে প্রবেশ করতে দেখে দেবদাসীরা সারি বেঁধে দাঁড়াল। ভবানীও তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ক্রিয়াশক্তির পরে সে-ই এখানকার সবার মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন।

গুরুদেব বলেন—তোমরা সবাই বিগ্রহের সামনে চল। এদের বিবাহে তোমরা সাক্ষী।

ভবানী থেকে শুরু করে দয়াবতী, সবার চোখে বিস্ময়।

তরুণ দুজনে ওদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। শ্রীমতী এবং মঞ্জরী লজ্জাবনত। সাথীদের দিকে মুখ তুলে চাইতে পারে না। তাদের মনে হয় তারা এদের প্রতারিত করেছে। তারা যখন নতুন জীবনের অজানা পথে অগ্রসর হতে চলেছে। তখন এরা আগের মতোই একঘেয়ে দিন কাটাবে। মঞ্জরী দয়াবতীকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুপাত করে। অবলা অশ্রুসজল শ্রীমতীর মুখ চুম্বন করে।

বিগ্রহের সম্মুখে শাস্ত্রমতে তাদের বিবাহ সম্পন্ন হল। গুরুদেব ক্রিয়াশক্তি বলেন—আমি যে কদিন জীবিত রয়েছি। তোমাদের আরও কয়েকজনকে তাদের গার্হস্থ জীবনে স্থাপন করার চেষ্টা করব।

দয়াবতী অমরুদের বলে—আমরা দেবদাসী। তবু আপনাদের দুজনকে আত্মীয় বলে মনে হচ্ছে। এরা দুজনেই আমাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। আমরা আপনাদের মঙ্গল কামনা করি।

অতীশ বলে—দেবদাসী সম্বন্ধে আমার কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। আমরা দেশের মানুষদের অসংখ্য গোষ্ঠীতে ভাগ করে সেগুলিতে বিশেষ বিশেষ দোষগুণ আরোপ করি। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে সেটা ঠিক না, উচিতও নয়।

গুরুদেব বলেন—তোমরা অনর্থক দেরি করছ! তেমন দিন এলে এই মন্দিরের দ্বার চিরকালই উন্মুক্ত পাবে। তোমরা তখন কোথায় যাবে?

অমরু বলে—আমার গন্তব্যস্থল মাত্র একটিই রয়েছে নগরে। মা নিশ্চয় চিন্তিত হয়ে রয়েছেন। মাঝে মধ্যে বাড়িতে ফিরতে আমার দেরি হয় ঠিকই। তবু মায়ের দুশ্চিন্তার অভাব ঘটে না। কখনো কখনো অদ্ভুত অদ্ভুত বিপদের কল্পনা করে ছটফট্ করেন।

গুরুদেব বলেন—তুমি নতুন কিছু বলছ না, অধিকাংশ মায়েরাই অমন। অতীশ তুমি কোথায় যাবে এখন?

—আমিও এর বাড়ি ৰাব। দেখব, সত্যিই শয্যার অভাব রয়েছে কিনা। থাকলে একটা ব্যবস্থা করে নেব। শয্যার চেয়েও আমি খাদ্যের অভাবের আশঙ্কা করছি। দেখব হয়তো অমরুর খাবার ছাড়া কিছু নেই।

সবাই হেসে ওঠে।

—রাজধানীতে তোমার লোকজন নেই?

—সব আছে। হাতি ঘোড়াও রয়েছে।

–তোমাকে আগামীকাল হাতিঘোড়া লোকজন নিয়েই বাড়িতে ফিরতে হবে। রাজধানীর নজরে পড়ুক আমি চাই। তুমি রওনা হবে অমরুর গৃহ থেকে। সেখানে

অমরু ওর মা এবং নববধূ তোমাদের শুভযাত্রার সূচনা করে দেবেন।

—তাই হবে গুরুদেব।

.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *