বিজয়নগর – ১

ভারতবর্ষের উত্তরখণ্ডে তখন পরাক্রান্ত মুসলমান সাম্রাজ্য। দক্ষিণ-ভাগেও তাদের প্রভাব অনেকটা বিস্তৃত। তারই মধ্যে দীর্ঘ তিনশো বৎসর স্থায়ী এক হিন্দুসাম্রাজ্যের উত্থান ঘটল—নাম তার বিজয়নগর। অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিন্দু রাজ্য অধ্যুষিত দক্ষিণের রাজন্যবর্গ উত্তরের শক্তিশালী মুসলমানদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধে পারদর্শী একজন হিন্দু সমরনায়কের অধীনে সঙ্ঘবদ্ধ হল। তার ফলে এই বিজয়নগর সাম্রাজ্য যার বিস্তৃতি ছিল মহারাষ্ট্রের নিন্মাঞ্চল থেকে সুদূর সিংহল গমনের সমুদ্র পর্যন্ত।

বিজয়নগর সাম্রাজ্যের নাম রাজধানীর নামেই নামাঙ্কিত। এটি একটি দুর্গ নগরী। এর চতুর্দিকে পর পর তিনটি প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত ছিল। এই ভূখণ্ডের উপর দিয়ে তুঙ্গভদ্রা নদীর প্রবাহ আজও অব্যাহত। তবে এক সময়ে তার গতির মধ্যে যে হাস্যলাস্যের ধ্বনি ঝঙ্কৃত হত এখন তেমন আর দেখা যায় না। মনে হয় যেন অতীত গৌরবের কথা ভেবে সে ম্রিয়মান। গতির মধ্যেও শ্লথতা লোকে বুঝতে পারে না, বোঝার কারণও নেই। তারা অতি ক্ষুদ্র আনেগুণ্ডি রাজ্যের কথা জানবে কি করে? এই আনেগুণ্ডির রাজাই বিজয়নগরের প্রথম নৃপতি। লোকে বলে তিনি ছিলেন ওয়ারেঙ্গলের রাজার মন্ত্রী। রাজ্য মুসলমান সুলতান দ্বারা আক্রান্ত এবং অধিকৃত হলে তিনি চলে আসেন আনেপত্তিতে। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ভাই বাক্কা। তিনিও ওয়ারেঙ্গনের উচ্চপদস্ত কর্মচারি ছিলেন।

বিজয়নগরের পত্তন নিয়ে একটি চমকপ্রদ প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে। তুঙ্গভদ্রার অপর তীর ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। রাজী সেখানে মৃগয়ায় যেতেন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে। একদিন মৃগয়ার সময় রাজার কুকুরগুলো যখন এক ঝাঁক খরগোশের পিছু ধাওয়া করল তখন খরগোশেরা প্রাণভয়ে পালিয়ে না গিয়ে রুখে দাঁড়াল এবং কুকুরদের আক্রমণ করল। কুকুরেরা সভয়ে পালিয়ে এসে তাদের প্রভূর পায়ের কাছে জড়ো হয়ে কাঁপতে থাকল। রাজা এবং সবাই এই অদ্ভুত কাণ্ড দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান। মৃগয়া স্থগিত রেখে তিনি ফিরে এলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন সবকিছু জানিয়ে গুরুদেবের উপদেশ নিতে হবে।

কৃষ্ণানদীর তীরে ছিল সিদ্ধপুরুষ মাধবাচার্যের আশ্রম। মাধবাচার্যই রাজা এবং তাঁর ভাই-এর গুরু। পরদিনই তাঁরা ছুটে গেলেন গুরুদেবের কাছে। সব শুনে মাধবাচার্য বললেন, ওই স্থানটিই হবে তোমাদের ভবিষ্যতের রাজধানী। ওখানে নগরী গড়ে তোলো। মাধবাচার্যের অপর নাম ছিল বিদ্যারণ্য। তাঁর জন্ম কৃষ্ণানদীর তীরবর্তী এক গ্রামে। প্রথমে নগরীর নাম বিদ্যারণ্যের নামেই রাখা হয়েছিল। পরে সেটি পরিবর্তিত হয়ে বিজয়নগর হয়। প্রথমে নগর, তারপর রাজ্য এবং সব শেষে সাম্রাজ্য। এই দুর্গ নগরীকে বলতে গেলে পাঁচটি পর্বত আড়াল করে রেখেছে। পর্বতগুলির নাম ঋষ্যকূট, অঞ্জনা, মাতঙ্গ, মলয়াবন্ত ও হেমকূট। রামায়ণের বহু চরিত্রের লীলাক্ষেত্র এই ভূমি। ওই মাতঙ্গ পর্বতে সুগ্রীব ও হনুমান আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই ভূখণ্ড শিব শক্তি ও বিষ্ণুর পবিত্র স্থান।

বিজয়নগরের অধীশ্বরেরা নিজেদের রাজত্বকালে কত সুদৃশ্য মন্দির নির্মাণ করে গিয়েছেন। এখানে রয়েছে রামমন্দির, বিরুপাক্ষ বা পম্পাপতি মন্দির। পম্পাপতির অর্থ পম্পার পতি। ব্রহ্মার কন্যা কিংবা পম্পাতীর্থ। তুঙ্গভদ্রার নামও এখানে পম্পানদী। আরও কত দেবদেবীর মন্দির রয়েছে। মুক্তি নরসিংহ, পাতালেশ্বর নবদুর্গা। তারকেশ্বরের মন্দিরে যেখানে শিবের ক্রোড়ে ক্ষুদ্রাকৃতির দুর্গা বসে রয়েছেন, রয়েছে সরস্বতীর মন্দির, পট্টভিরাম মন্দির। মন্দিরের শেষ নেই।

রাজারা ধর্মবিষয়ে গোঁড়া নন মোটেই। এখানে যেমন রয়েছে বৌদ্ধ চৈত্য, তেমনি রয়েছে জৈন মন্দির। সবার ধর্মাচরণ নির্বিঘ্নে নিশ্চিন্তে করে।

.

মা একদিন তার ত্রয়োদর্শী মেয়ে শ্রীমতীর হাত ধরে অনেক পথ অতিক্রম করে বিজয়নগরের পশুপতি মন্দির দ্বারে এসে উপস্থিত হল। তখন মধ্যাহ্ন। মহানগরীর মন্দিরের পথে তেমন লোকজন দেখা যায়না। শ্রীমতী তৃষ্ণার্ত হলেও মাকে বলতে দ্বিধা। মায়ের মনের অবস্থা সে জানে। তিনি জানেন কন্যা আর কোনোদিনই সগৃহে ফিরতে পারবে না, যেখানে সে পিতৃস্নেহে লালিত হয়েছে কিছুদিন আগে পর্যন্ত। মা হয়তো একা সপ্তহে ফিরবে; কিন্তু শ্রীমতীকে সঙ্গে করে কিছুতেই নিয়ে যাবে না। সেকথা ভেবে তারও বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছিল। সবাই বলে সে খুব বুদ্ধিমতী। তাই বোধহয় কাঁলে না। সে বুঝতে পারছিল জীবনে আজ শেষ দেখা দেখে নেবে মাকে। এর পরে দেবতার পায়ে সমর্পিতা হয়ে যাবে সে, যদি এঁরা তাকে গ্রহণ করেন। মা তাকে অনেকবার তার ভবিষ্যৎ জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। সব চেয়ে সহজ উপায় ছিল গ্রামেরই খুবই অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলের সঙ্গে বিবাহ। সে সাহস পায়নি। এখানকার অবস্থা সম্পূর্ণ চাষবাসের উপর নির্ভরশীল। পর পর তিনবছর খরা চলছে। লোকে প্রথমে অর্ধাহারে থাকতে শুরু করল, তারপর এখন অনাহার। চেনা অচেনাদের অনেকে মরতে শুরু করেছে। তুঙ্গভদ্রার জলধারায় বাঁধ দিয়ে বাঁধানো খালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় বলে বিজয়নগরের আশেপাশের কৃষিক্ষেত্রে জলাভাব থাকে না। সর্বদাই হরিৎ ক্ষেত্র। কিন্তু তাদের গ্রাম রাজধানী থেকে বহুদূরে। কৃষ্ণা নদীও তাই।

পিতা জীবিত থাকলে তাদের হয়তো অনাহারের প্রান্তে এসে উপস্থিত হতে হত না। কারণ তার পিতা ছিলেন বিজয়লাভের সেনা বিভাগের এক উঁচুদরের সেনা। তাঁর ভূমিকাও তাই ছিল অনেকের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভাগ্য বলে একটা কথা রয়েছে। গত বছর সুলতানের সৈন্যদের পশ্চাদ্ধাবন করার সময় সহসা একটি তীর এসে তাঁর বুকে বিঁধে যায়। তিনি পড়ে গিয়ে আর উঠলেন না। খবর এনেছিল গ্রামেরই একজন। সে সেই যুদ্ধে ছিল। পিতার মৃত্যু ঠিক যুদ্ধ করে হয়নি। তাঁর আত্মা হয়তো সেজন্য তৃপ্ত নয়। তিনি সব সময় বলতেন, সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করতে করতে মৃত্যুর স্বাদ আলাদা। সে জানে তার পিতা ছিলেন জ্ঞানী। যুদ্ধ তাঁর পেশা। সেই পেশায় পারদর্শী হতে তিনি এতটুকুও কার্পণ্য করেননি। কিন্তু তাঁর নেশা ছিল পুস্তক। তাঁর কাছে শ্রীমতী অনেক কিছু শিখেছে।

বহুবার সে গভীর রাতে মাকে নিঃশব্দে কাঁদতে দেখেছে। সে তখন মাকে জড়িয়ে ধরে কাছে টানত। মায়ের কান্না আর শব্দহীন থাকত না, ফুঁপিয়ে উঠত। সে জানে মা তাকে এখানে রেখে গিয়ে গ্রামে ফিরছে নিশ্চিত মৃত্যুকে বরণ করতে। স্বামী নেই, একমাত্র কন্যাও আর কখনো কাছে থাকবে না। কোনো পিছুটান নেই। মরণে তার ক্ষোভ নেই। মরণের সময় হয়তো আবছা হাসির রেখা ফুটে উঠবে তার অনাহারক্লিষ্ট মুখে। এভাবে কেউ তো সাধারণত মরতে পারে না। তখন কি মায়ের চোখের সামনে তার মুখ ভেসে উঠবে? নাকি বাবার? হয়তো দু’জনারই। কিংবা তীরবিদ্ধ বাবার কল্পিত মুখখানা যা সে নিজেও দেখে শয়নে স্বপনে সেইমুখ।

আজ মন্দিরের দ্বারদেশে এসে মা তাকে কাছে টেনে নিয়ে মুখচুম্বন করে। বলে, তোর রূপ পার্বতীর মতো। এই মন্দিরই তোর উপযুক্ত স্থান। পশুপতি তোকে ঠিক দেখবেন। আমি জানি পশুপতির মতো মানুষও রয়েছেন পৃথিবীতে। কিন্তু সে তো দুর্লভ। আমার তেমন সাধই ছিল। একবার দেবদাসী হলে সেই সাধ পূর্ণ হওয়ার নয়।

মা থেমে যায়। একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি এগিয়ে এলেন ধীরে ধীরে। প্রথম দর্শনেই ধারণা হয় তিনিই এই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। প্রধান পুরোহিত বলা তো কম বলা হল। ইনি নিশ্চয় একজন সিদ্ধপুরুষ। নইলে একটা জ্যোতির্বলয় তাঁর মস্তকের চতুর্দিকে ফুটে উঠেই আবার মিলিয়ে গেল কেন? এমন তো সে দেখেনি। শুনেছে সিদ্ধপুরুষের অমন হয়। মায়ের মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে তিনি বলেন—তুমি কি পুজো দিতে চাও মা?

মনে মনে মা বলে, আপনি তো সবই জানেন ঠাকুর।

মা ঘাড় নেড়ে জানায়, পুজো সে দেবে না।

—তবে, বিগ্রহ দর্শন?

—হ্যাঁ বাবা, দর্শন অবশ্যই করব। মন্দিরে এসে বিগ্রহ দর্শন করব না? সাধ্য থাকলে প্রাণভরে পুজো দিতাম। সেই সাধ্য আর নেই। আমি এসেছি আপনার কাছে।

-আমার কাছে?

—হ্যাঁ ঠাকুর। আমি এক হতভাগিনী। দেশে দুর্ভিক্ষ। গ্রামে মড়ক। আমার স্বামী যুদ্ধে নিহত। নিজের জন্য ভাবি না। আমার মেয়ের জন্য এসেছি। একে আপনি আশ্রয় দিন।

–আমি আশ্রয় দেব?

–একে দেবতার কাছে সমর্পণ করলাম।

–এতো কিশোরী, রূপবতীও বটে। একে কোন্ কাজ দেব?

—দেবদাসী।

পূজারীর মুখে বিস্ময়। তিনি কিশোরীর মুখের দিকে ভালো করে চেয়ে দেখেন। তারপর মাকে বলেন দেবদাসীর অর্থ বোঝ?

—হ্যাঁ, দেবতার পদাশ্রিতা। দেবতাই তার মন-প্রাণ, জীবন-যৌবন।

—সহজ অর্থে তাই বটে। কিন্তু সব কিছু জান?

—আমি গ্রামের সামান্য একজন গৃহবধূ। সব কিছু জানার ক্ষমতা কোথায়? প্রয়োজনও নেই। আমি শুধু জানি আমার মেয়ে এখানে অন্তত অনাহারে মরবে না। মনুষ্যরূপী পশুরাও একে ছিঁড়ে খাবে না। এখানে আপনি আছেন।

বৃদ্ধ আকাশের দিকে চেয়ে বলেন—খাওয়ার নানান প্রক্রিয়া থাকে মা। যাহোক তোমার মেয়ের অনাহারে মৃত্যু হবে না, এটাই তুমি চাও।

—হ্যাঁ বাবা।

—জীবনে আর কখনো সংসারধর্ম করতে পারবে না সে কথা জানা সত্ত্বেও?

-হ্যাঁ।

-তোমার সঙ্গে হয়তো জীবনে আর দেখা হবে না।

মা কেঁদে ফেলে বলে—সব জানি, সব জানি। তবু তার মতই আমার মত।

সে গ্রামে থাকতে চায় না।

বৃদ্ধ কিশোরীকে প্রশ্ন করেন—তুমি ঘর বাঁধতে চাও না?

—গ্রামে থাকব না।

—বিয়ে করবে না?

—কেউ নেই।

-দেবতার পায়ে নিজেকে সমর্পণ করে দিতে পারবে?

–বাবা বলতেন, চেষ্টা আর সাধনায় অসাধ্যও সাধ্য হয়। বাবা অনেক কিছু শিখিয়েছিলেন আমাকে

—তুমি লেখাপড়া শিখেছ?

— হ্যাঁ।

বৃদ্ধ অবাক হয়ে আবার বলেন—শিখেছ?

—হ্যাঁ, যতটা পেরেছি। বাবা তো চলে গেলেন। নইলে আরও শিখতাম।

-তোমার নাম কি?

—শ্ৰীমতী।

–সত্যি? তোমাকে তাহলে বলি, এই বিজয়নগরের পত্তন হয়েছিল যাঁর পরামর্শে সেই সিদ্ধপুরুষের মায়ের নামও ছিল তোমার নামে।

শ্রীমতীর সারা দেহে শিহরণ জাগে।

মা ভাবে, তার মেয়ের আশ্রয় সুনিশ্চিত।

মেয়ে ভাবে, তার তো অতীতের শ্রীমতী হওয়ার সম্ভাবনা আর সৌভাগ্যের পথ চিরতরে বন্ধ হতে বসেছে।

বৃদ্ধ বলেন—আমি একে গ্রহণ করলাম। তবে একে অনেক কিছু শিখতে হবে। নাচ গান তো বটেই। মনে হয় তোমার মেয়ে পারবে।

বিগ্রহ দর্শন করে মা মেয়ের কাছ থেকে বিদায় নেয়। মেয়ে প্রধান দ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে সজল নয়নে মায়ের গমন পথের দিকে চেয়ে থাকে। সে খেয়াল করে না তার পাশে একজন দুজন করে আরও কয়েকজন এসে দাঁড়িয়েছে। মা চোখ মুছে পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায়।

মেয়েরা শ্রীমতীকে ঘিরে ধরে। ওদের অনেক কৌতূহল, অনেক প্রশ্ন চব্বিশ পঁচিশ বছরের একজন বলে—তুমি এত ছোট বয়সে চলে এলে কেন? আর একজন বলে—তোমার বাড়ি কোথায়?

সঙ্গে সঙ্গে একজন জিজ্ঞাসা করে—তোমাকে ডাকাতে ধরে নিয়ে গিয়েছিল বুঝি?

শ্রীমতী বলে ওঠে—কেন, ডাকাতে ধরবে কেন?

আর একজন হেসে বলে ওঠে—ওকে ধরে নিয়েছিল বলে, ও ভাবে সবাইকে বুঝি ডাকাতে ধরে। ওর মামা তাই ওকে মন্দিরের সামনে ফেলে রেখে গিয়েছিল। ঠাকুর দয়া করে স্থান দিয়েছেন। দেখতে তো একটু সুন্দর, তবে তোমার মতো নয়। এই বয়সেই যা রূপ।

কেউ বলে-নাচ গান জান?

একজন কচি মুখের মেয়ে তার হাত ধরে বলে—তুমি আমার সঙ্গে থাকবে। শ্রীমতী থতমত খেয়ে যায়। সেই সময় বৃদ্ধ এসে সবাইকে হেসে বলেন—ওর সঙ্গে তোমাদের পরিচয় হবেই। এখন ছেড়ে দাও। অনেক দূর থেকে এসেছে। হয়তো অভুক্ত রয়েছে।

তাঁর কথায় মেয়েরা শান্তভাবে ভেতরে চলে যায় ৷

—তুমি চল।

দুদিনের মধ্যে শ্রীমতী বুঝতে পারে বৃদ্ধের অঙ্গুলি হেলনে এই মন্দিরের সব কিছু পরিচালিত হয়। এত ক্ষমতা যার তিনি এত কোমল স্বভাবের এবং ঈশ্বরে নিবেদিত প্রাণ হন কিভাবে? তার এক এক সময়ে মনে হয় ইনি নররূপী ঈশ্বর। এখানকার দেবদাসীদের কথাবার্তায় সেই রকমই অনুভূত হয়। মন্দিরের তো অভাব নেই বিজয়নগরে। কত মন্দির এবং সেইসব মন্দিরের কত পূজারী রয়েছে। তাঁদের মধ্য থেকে তাঁকেই রাজপরিবারের গুরুরূপে নির্বাচন করার অন্য কোনো কারণ নেই। গুরুর নাম ক্রিয়াশক্তি। এই নামে তিনি পরিচিত এবং বিখ্যাত। শ্রীমতীর ভাগ্য ভালো যে তার এবং তার মায়ের সঙ্গে বিজয়নগরে এসে সর্বপ্রথম এঁরই সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ঈশ্বরের অভীপ্সা ছাড়া এমন কখনো হতে পারে না। হয়তো গ্রাম ছেড়ে চলে আসার সময় তার স্বর্গীয় পিতাও ওপর থেকে এই প্রার্থনাই করেছিলেন ঈশ্বরের কাছে।

আরও কিছুদিন কেটে যায়। শ্রীমতী অনুভব করে গুরুদেব তাকে অদৃশ্যভাবে সবার থেকে একটু স্বতন্ত্র করে রেখেছেন। সবাই হুমড়ি খেয়ে তাকে তাদের কথা বলতে পারে না। অথচ তাদের চোখে মুখে তীব্র কৌতূহল আর আকাঙ্খা। তার নিজেরও কি অন্যদের সম্বন্ধে জানার ইচ্ছা নেই? থাকাটাই তো স্বাভাবিক। সবার চেয়ে ছোট হলেও সেও তো নারী।

অন্যান্য দেবদাসীর সঙ্গে তারও নৃত্যগীতের শিক্ষা শুরু হয়। তারা সবাই অনেক বেশি জানে। কেউ কেউ তো রীতিমতো পারদর্শিনী। প্রথম দিনেই মাধবী নামে একজন এসে তাকে বলে—তুই ঠিক পারবি। দেখে বোঝা যায় তোর মধ্যে সুরও আছে ছন্দও আছে। কচি মুখের মঞ্জরী প্রথম দিনেই তার ঘরে তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। ক্রিয়াশক্তি হেসে সম্মতি দিয়েছিলেন। রাতে মঞ্জরী তাকে বলে—একটা কথা বলবি?

-কোন কথা?

–তোর মা কি নাচ-গান জানতেন?

—না। একথা জানতে চাইলে কেন?

—দয়াবতী শেখাতে শেখাতে বলছিল, তোর মধ্যে নাচ গান দুটোই আছে। তাড়াতাড়ি শিখে যাবি। দয়াবতী গান খুব ভালো জানে, তাই শেখায়।

কথাটা শুনে শ্রীমতীর আনন্দ হয়। সে বলে—ভালোই তো। তোমরা কত সুন্দর নাচো, দয়াবতী দিদির কী সুন্দর গানের গলা। মনে হয় স্বর্গ থেকে ভেসে আসছে কোনো দেবীর বা অপ্সরার সঙ্গীত।

—মুক্তি বলে, এমন গলা পৃথিবীতে খুব কম আসে। হয়তো একশো বছরে একবার।

– ঠিক বলেছ। এত ভালো গান আমি কখনো শুনিনি। কল্পনাই করিনি।

—রাজপুরীতে প্রায়ই যেতে হয় তাকে।

-কেন?

-রানীরা ডেকে পাঠান। মন খারাপ হলে, গান শুনে তৃপ্তি পেতে।

—রানীদেরও অতৃপ্তি?

—তুই খুবই ছেলেমানুষ। সম্পদ মানুষকে কতটুকু তৃপ্তি দেয়? নারীদের মনের জ্বালা কতটুকু মেটে তাতে? রাজার শত শত রানী। তার মধ্যেও শ্রেণীভেদ।

—শ্রেণীভেদ?

—হ্যাঁ। বোধহয় রূপের তারতম্যে এই পার্থক্য গড়ে ওঠে। যারা সাধারণ মানের রানী, তারা অধিকাংশ সময়ে পদব্রজেও যাতায়াত করে।

–সে কি? তবে কেন রানী করা হল?

-হয়তো রাজার কোনো অসতর্ক মুহূর্তে সেই হতভাগিনীকে নজরে পড়েছিল এবং সে তার স্পর্শ পেয়েছিল। তাই সে রানী। যারা শকট কিংবা ডুলিতে যাতায়াত করে তারা সত্যই সুন্দরী। তোরও সুযোগ মিলবে। তখন দেখিস।

—তাদের অতৃপ্তি কিসে তবে?

–আমি আর বলতে পারব না। গুরুদেব নিশ্চয় চান না সব কিছু তোকে বলি। তুই খুব ছোট।

—তিনি তোমাকে বলেছেন?

—না। তবে আমরা সবাই গুরুদেবকে বুঝতে পারি। যাকে শ্রদ্ধা করা যায় যাঁকে ভালোবাসা যায়, তাঁর মন বুঝতে কি অসুবিধা হয়?

—না। কিন্তু কতদিন পরে বলবে?

—বলতে হবে না। তুই নিজেই বুঝবি। তবে একটা কথা বলে দিচ্ছি। কখনো রাজপুরীতে গেলে সব সময় রাজার নজরের বাইরে থাকবি।

– কেন?

—উনি সঙ্গে সঙ্গে তোকে রানী করে রাজপুরীতে রেখে দেবেন। —দয়াবতী দিদি তো মাঝে মাঝে রাজপুরীতে যান। রাজা তাকে কিন্তু রানী করেননি।

—দয়াবতীদির কণ্ঠস্বরে যাদু রয়েছে। তাঁর রূপ নেই। থাকলে কবে রানী হয়ে যেত।

—তাই হয় নাকি?

—হবে না কেন? রাজা আর দেবতায় কতটুকু পার্থক্য?

—কিন্তু বয়স? দয়াবতীদিদির বয়স চব্বিশ। রাজার বয়স অনেক বেশি। দেবতার বয়স বাড়ে না।

—পুরুষের আবার বয়স। তাছাড়া রাজার বয়স বাড়ে না।

–তোমার কথা শুনতে ভালো লাগছে না।

–তুই যে বলিস আমাকে দেখতে কচি কচি। আমাকে তোর ভালো লাগে?

—লাগে। তবে এখনকার কথাগুলো শুনতে ভালো লাগছে না। মন কেমন করে দেয়।

মঞ্জরী একটু থমকে যায়। শ্রীমতী কেসে খুব ভালোবাসে। ভালোবাসে তার স্বভাবের জন্য। সে ধীরে ধীরে বলে—তুই অনেক আঘাত পাবি। মনে রাখিস পৃথিবীটা কল্পনা দিয়ে গড়া নয়। এখানে পথ চললে ধুলো লাগে, কাদা লাগে, পোশাক ময়লা হয় ৷

-আমাদের গ্রামেও অনেক ধুলো। চাষের ক্ষেতে ধুলো উড়ছে বৃষ্টির অভাবে। তারই জন্য বাধ্য হয়ে এখানে চলে আসতে হয়েছে। ধুলোমাটি আমার বড় প্রিয়, বড় আপন। আমার পোশাকও দেখেছিলে কত মলিন ছিল, তোমাদের পোশাকের মতো পরিষ্কার ছিল না। তবু গ্রামের লোকের কথাবার্তা এমন নয়।

– কেমন?

—তুমি যেভাবে বলার চেষ্টা করছ, একটা কুৎসিত কিছুর ইঙ্গিত দিতে গিয়েও থেমে গেলে।

মঞ্জরী বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে বলে—আমারই ভুল হয়েছিল। তোর বয়স এখনো অনেক কম। তোকে আমি কিছু বলব না। অনেক সময় তোকে আমার সমবয়সী ভেবে ফেলি। তবে তুই কিছুদিনের মধ্যেই বুঝবি। রক্তে একটু দোলা লাগুক। এতকিছুর মধ্যেও যখন কোনো সময়ে নিজেকে খুব একা একা লাগবে তেমন কোনো দিনে আমার কাছে এসে তুই-ই কিছু জানতে চাইবি।

–আমার এখনই একা একা লাগে মায়ের জন্য।

মঞ্জরী বিষণ্ণ হাসি হেসে বলে—তুই ভাবিস আমাদের কারও মা নেই, বাবা নেই, ভাই বোন কেউ নেই। সব আছে, আমাদেরও সব আছে।

শ্রীমতী মঞ্জরীর বিষণ্ণ মুখ দেখে ধাক্কা খায়। সে ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে তার কাঁধে মাথা রেখে বলে—আমি স্বার্থপর তাই নিজের কথাই ভাবছিলাম। তুমি আমাকে ক্ষমা কর ৷

—সেকি! ক্ষমা কেন? তুই ছোট তো তাই অমন বলেছিস।

–তোমার মা বাবাদের জন্য কষ্ট হয় না?

—হতো, খুব হতো, দিনের পর দিন কেঁদেছি। এখন অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।

-আমারও অমন হবে?

–না হলে, বাঁচবি কি করে?

—মাকে ভুলে যাব?

—কেউ কি ভোলে? প্রথমে অহরহ মনে পড়ে, তারপর ক’দিন পর পর। তারপর মাসে।

-তারপর? বছরে একবার?

—জানি না। তেমন অবস্থায় এখনো পড়িনি। আমার ভাইটির কথা মনে পড়ায় কালও কেঁদেছি। জানি, যে মুখ মনের মধ্যে ভেসে ওঠে, সেই মুখের ইতিমধ্যেই অনেক পরিবর্তন হয়েছে। যেমন আমার মা। তাকে সধবা দেখেছিলাম। বাবা তারপর মারা গিয়েছে খবর পেয়েছি। তবু আগের মায়ের চেহারাই তো দেখি। মঞ্জরীর হাত দুটো জড়িয়ে ধরে শ্রীমতী কেঁদে ফেলে বলে—আমাকে ক্ষমা কর। আর কখনো এমন বলব না।

মঞ্জরী হেসে ফেলে বলে—একই বলে ছেলেমানুষী। ক্ষমা চাওয়ার কি হল? আমার সঙ্গে তো তোর ক্ষমা চাওয়া-চাওয়ির সম্পর্ক নয় ৷

.

কয়েকদিন পরে গুরুদেব একদিন দেবদদাসীদের বললেন—আজ তোমাদের নৃত্যগীত শিক্ষা বন্ধ থাকবে। তার পরিবর্তে তোমরা দুপুরে বিগ্রহের সামনে আসবে। তোমাদের আমি বিজয়নগরের ইতিহাস সম্বন্ধে কিছু বলব। তোমরা নগরীর পাঁচজন সাধারণ মানুষ তো নও। তোমাদের একটা বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।

সবাই ভাবে, বিশেষ দায়িত্ব আবার কি? বিগ্রহের সামনে নৃত্যগীত আর রাজপুরীর কোনো নির্দেশ থাকলে সেটি পালন করা। মঞ্জরী ঠিক সেরকম ভাবল না। গুরুদেব দেশের ইতিহাস শোনাবেন বলেছেন। কেন বলেছেন তাও বুঝতে পারে সে। শ্রীমতীকে বলে যেতে চান। কারণ একমাত্র সে-ই তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী। তাকে সামনে রেখে অন্যদের বলবেন, যাতে দেশ সম্বন্ধে তাদেরও ধারণা হয়। তবে মঞ্জরী এ সম্বন্ধে কোনো মন্তব্য করে না। এমন কি শ্রীমতীকেও কিছু বলে না। বরং শ্রীমতীর কল্যাণে কিছু জ নতে পারবে ভেবে আনন্দিতই হয়।

নির্দিষ্ট সময়ে সবাই বিগ্রহের সামনে এসে গুরুদেব তাদের বিগ্রহের সামনে বসতে বলে নিজেও আসন গ্রহণ করেন। তিনি বলেন—তোমরা ভাবছ, তোমাদের কোন পাঠ দেব।

শ্রীমতীর মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ে—খুব ভালোই হয় তাহলে।

গুরুদেব হেসে বলেন—পড়তে খুব ভালো লাগে তোমায় আমি জানি। তবে আজকে তোমাদের ডেকেছি একটা ধারণা দিতে। এই বিজয়নগর তো এত শক্তিশালী সম্পদশালী ছিল না। এটি ছিল খুবই ক্ষুদ্র। তোমরা জান মাধবাচার্য নামে একজন সিদ্ধপুরুষ আজকের বিজয়নগরের শক্তিশালী হয়ে উঠার মূলে। তিনি এই সাম্রাজ্যের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। দুইভাই হরিহর আর বাক্কার একান্ত অনুরোধে। তিনি এদের গুরুদেবও ছিলেন। আমাদের দেশ সম্পদশালী হয়ে ওঠার প্রধান কারণ কিন্তু পররাজ্য অধিকার করার মাধ্যমে নয়, বাণিজ্যের মাধ্যমে। মাধবাচার্যের পুত্র সায়নাচার্যও ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাশালী। তাঁর সম্বন্ধে সঠিক কিছু আমি বলতে পারব না। কারণ হরিহর আর বাক্কার মৃত্যুর পরে এই বিজয়নগর মুসলমান দ্বারা আক্রান্ত হয়। তখনকার মহারাজ সেই আক্রমণ প্রতিহত করলেও তাঁর স্বভাবের জন্য সায়নাচার্য বিরক্ত হয়ে রাজ্য ত্যাগ করে পূর্বদিকে চলে যান। কেউ কেউ বলে তিনি অঙ্গবঙ্গের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন। যাহোক ওসব জেনে তোমাদের লাভ নেই। তবে একটা কথা সব সময় মনে রেখো, বিজয়নগরের মানুষেরা অত্যন্ত দেশপ্রেমিক এবং স্বাধীনচেতা। এ দেশের পথের ভিখারীকেও তোমরা অবজ্ঞা করবে না। তোমরা জান না, দিল্লির সুলতান একবার আনেগুণ্ডি আক্রমণ করে এখানকার তৎকালীন রাজপরিবারের প্রত্যেককে হত্যা করে তাঁর প্রতিনিধিকে এই দেশ শাসনের জন্য রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু দু-চার মাস পরেই সে দিল্লিতে ফিরে গিয়ে বলেছিল, তার পক্ষে এখানে থাকা অসম্ভব। সর্বদা প্রাণভয়ে থাকতে হয়। সুলতান তখন আনেগুণ্ডিরই এক রাজপুরুষকে রাজ্যশাসনের ভার দেন।

শ্রীমতী বলে—এখনকার রাজা কি তাঁরই বংশধর?

–না, বিজয়নগর ধীরে ধীরে সম্পদশালী হয়ে উঠলেও রাজার পরিবর্তন হয়েছে। সব রাজবংশেই এমন হয়। কখনো রাজা অপুত্রক হলে কিংবা কখনো সিংহাসন অধিকারের জন্য সংঘর্ষ ঘটলে বংশধারার পরিবর্তন হয়। কিন্তু তাতে বিজয়নগর সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠায় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। যাহোক, আজ তোমাদের ডেকেছি, কিছু কিছু মন্দির দেখাবার জন্য। তোমরা তো নিজেরা কোথাও যেতে পার না। তাই বলে তোমরা বন্দি ভেব না নিজেদের। ইচ্ছে করলে, আমার অনুমতি নিয়ে নগর দেখে আসতে পার। এই রাজ্যে মেয়েরা অনেক নিরাপদ।

সেই সময় মধ্যবয়সী একজন নারী এসে গুরুদেবকে আভূমি নত হয়ে প্রণাম করে বলে—আমার একটু দেরি হয়ে গেল প্রভু। রাজপথে দুই ষাঁড়ের লড়াই বেঁধেছিল। ভীড় জমে যায়। ভয়ও করছিল।

গুরুদেব হেসে ফেলেন। বলেন—শেষ পর্যন্ত কে জিতল।

—বোধহয় লালরঙের ষাড়টাই জিতেছে। কারণ কালোটা পেছিয়ে যেতে যেতে একটা দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেল।

গুরুদেব বলেন-আমাদেরও এই দশা না হয়।

কেউ তাঁর কথা বুঝতে পারে না। শ্রীমতী বলে ফেলে—একথা বললেন কেন?

সবাই হতচকিত হয়। এমনকি মধ্যবয়সী নারীও।

গুরুদেব গম্ভীর হয়ে বলেন–এমনিই বললাম। ওসব কথা থাক। হেমাঙ্গিনী এসে গিয়েছে। ও হল প্রাসাদের বিগ্রহের সেবাদাসী। তোমাদের মতো নৃত্যগীত ওর জানা নেই। তবে ওর ভেতরে যথেষ্ট সংগীত রয়েছে।

একথা শুনে হেমাঙ্গিনী অবাক হয়ে তাকায়।

—আমি জানি তুমি অবাক হবে। কিন্তু যখন একদিন নিমীলিত চোখে বিগ্রহের সামনে আপন মনে মন্ত্রোচ্চারণ করছিলে, তখন আমি মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম।

হেমাঙ্গিনীর মুখ লাল হয়ে ওঠে। সে কিছু বলতে পারে না।

—হেমাঙ্গিনী তোমার ওই স্তব ঈশ্বরের কাছে না পৌঁছোলে, কার স্তব পৌঁছাবে? ওই স্তরের মধ্যে ধ্বনিত হয় নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিবেদনের আকুতি। তবে তোমার চেয়েও নিবেদিত-প্রাণ কারও দর্শনও মিলতে পারে ভবিষ্যতে তার কণ্ঠস্বরও হয় যদি কোকিলকণ্ঠী।

শ্রীমতী সহসা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। মঞ্জরী তাকে চেপে ধরে বলে–কাঁদছিস কেন?

গুরুদেব শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে থাকেন। হেমাঙ্গিনী তাকে কাছে ডেকে নেয়। শ্রীমতী আঁচলে চোখ মুছে শান্ত হয়ে বসে। হেমাঙ্গিনীর আত্মনিবেদনের কথা গুরুদেবের মুখে শুনে তার কেন যে কান্না পেল, নিজেই বুঝতে পারে না।

গুরুদেব শ্রীমতীর দিকে একবার দৃষ্টি ফেলে বলেন—হেমাঙ্গিনী একাহারী। সন্ধ্যার পর সামান্য প্রসাদ পায় ৷

শ্রীমতী ভাবে, তবু কী সুন্দর স্বাস্থ্য।

গুরুদেব বলেন—নীরোগ শরীর নির্ভর করে, নির্মল হৃদয় আর পরিমিত আহারে। যাহোক এসব অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। হেমাঙ্গিনী বরং আজকে কয়েকটা মন্দির দেখিয়ে দাও। আগামী কাল একটু আগে এসে আরও কিছু দেখিয়ে দিও। আমি তো অত পারব না।

—না গুরুদেব, এই সামান্য কারণে আপনি কেন যাবেন। আপনার যখন যা প্রয়োজন আমাকে বলবেন, আমি দিয়ে যাব।

–তোমাকে সন্ধ্যারতির আগে ফিরে যেতে হবে তো।

–আপনি ভাববেন না। আমরা তাহলে আসি?

—হ্যাঁ হ্যাঁ এসো।

সবাই মন্দির ছেড়ে পথে পা রাখতেই চঞ্চল হয়ে ওঠে। হেমাঙ্গিনী স্মিত হেসে বলে—মনে হচ্ছে, তোমরা এতদিন খাঁচায় বন্দি ছিলে?

শ্রীমতী বলে—অদৃশ্য খাঁচা।

—সেটা কিরকম?

—আমি তো নতুন। এরা অনেকে দুই তিন বছর রয়েছে। তবু একা একা বাইরে যেতে পারে না। ওরা বলে, যদি কিছু হয়ে যায়? যদি কেউ কিছু বলে? আমরা দেবদাসী কিনা।

—না থাকলেও সবাই বুঝতে পারে। সাধারণ ঘরের মেয়েরা একটু অন্যরকম। আমাদের চলন-বলনে এক ধরনের শৃঙ্খলা রয়েছে। ওরা বাধাহীন।

অন্য সবাই শ্রীমতীর কথা শুনছিল। তাদের এতকিছু মনে আসেনি। অথচ শ্রীমতীর কথাগুলো যেন তাদেরই কথা যা বলতে পারেনি কখনো।

হেমাঙ্গিনী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে—তুমি অনেক ভাবো। এখন বুঝতে পারছি মন্দিরে তুমি যে কেঁদে উঠেছিলে তারও একটা কারণ রয়েছে।

শ্রীমতী হেমাঙ্গিনীর একটা হাত জড়িয়ে ধরে চলতে থাকে। নিজের মায়ের কথা মনে হয় তার। বুকের ভেতরে টনটন করে ওঠে।

হেমাঙ্গিনী বলে—আমরা প্রথমেই নগরীর একটি দ্বারের দিকে যাচ্ছি।

বিপরীত দিক থেকে জনশূন্য রাজপথ ধরে আসছিল একজন অশ্বারোহী। নগরীর কোলাহল এখানে পৌঁছয় একটু দেরিতে। সে তাদের দলের দিকে চেয়ে অশ্ব থামিয়ে নেমে পড়ে। এর আগে আরও দু-একজন কৌতূহলের দৃষ্টিতে তাদের দেখেছিল বটে, কিন্তু এভাবে থেমে যায়নি। তাছাড়া অশ্বারোহী যেন কাকে নিম্নস্বরে ডাকল। ওরা থেমে যায়। লোকটি আবার ডাকল—হেমা

শ্রীমতীরা স্তব্ধ হয়ে যায়। তারা সবাই একসঙ্গে হেমাঙ্গিনীর মুখের দিকে চায়। তার মুখ বিবর্ণ বলে মনে হল। সে যেন অন্য হেমাঙ্গিনী। গুরুদেব যে হেমাঙ্গিনীর কথা তাদের বলেছেন, এ যেন সে নয়। সে বলে- তোমরা একটু এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াও। আমি আসছি। বেশি সময় লাগবে না।

ওরা কিছুটা এগিয়ে গিয়ে থামে। মনে তীব্র কৌতূহল। তাই বারবার পেছনে ফিরে দেখছিল। দু’জনে কথা বলছে। কোনোরকম অস্বাভাবিকতা নেই। কিছুক্ষণ পরে যেন হেমাঙ্গিনী নিজেকে ছিনিয়ে নিয়ে দৃঢ়পদে তাদের কাছে এসে পৌঁছে বলে—চল।

ওরা প্রথমে নীরবেই চলছিল। মাঝে মাঝে শুধু হেমাঙ্গিনীর দিকে চাইছিল। হেমাঙ্গিনী একটু অন্যমনস্ক মুক্তি প্রশ্ন করে—উনি আপনার পরিচিত তো বটেই।

—হ্যাঁ, পরিচিত না হলে নাম ধরে ডাকে? ত্রিশ বছর পরে দেখা হল।

—তবু চিনতে পারলেন উনি?

—আমিও অবাক হচ্ছি।

-আপনার গ্রামের কেউ?

–না, পাশের গ্রামের।

মঞ্জরী বলে—আত্মীয়?

–না, কোনো সম্ভাবনাই ছিল না আত্মীয়তার। বয়স আমাদের কম ছিল তো। বুঝিনি।

শ্রীমতী বলে—আপনার কথা বুঝতে পারলাম না।

স্নিগ্ধ হাসি হেমাঙ্গিনীর মুখে ছড়িয়ে পড়ে। বলে—তোমার বয়স কম। কিন্তু প্রখর বুদ্ধি রয়েছে তোমার। আমি এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলাম। তবে তোমাদের মনে একটা কৌতূহল থেকে যাবে। তাই বলেই ফেলি। খুব অল্প বয়সে ওই পুরুষটি আমাকে যেমন চাইত, আমিও ওকে তেমনি চাইতাম। জাতের মধ্যে উঁচু নিচু শ্রেণী রয়েছে জানতাম, কিন্তু তার মধ্যেও আরও নানা ভেদাভেদ থাকে জানতাম না। আর জানলেই বা কি। জীবনে সঠিকভাবে একজনকেই তো চায় নারী বা পুরুষ। অভিভাবকেরা আমাদের সরিয়ে দিলেন। এর পরে তো কিছু করার ছিল না।

অবলা নামে মেয়েটি বিষণ্ণ কণ্ঠে বলে—না, কিছুই করার ছিল না। থাকে না।

—এই তো বুঝতে পেরেছ। আমি তাই দেবতার সেবায় নিজেকে সমর্পণ করলাম। এর পরে ওপথে যাওয়ার প্রবৃত্তি কি থাকে? এমন হওয়ার পরও অনেকেই সংসারী হয়। কি করে হয় আমি বুঝতে পারি না। কল্পনাও করতে পারি না। হয়তো ওরাই ঠিক। নইলে সংসার চলবে কি করে? নারী কায়মনোবাক্যে একটা সংসারই তো চায়। সে চায় সন্তানসন্ততি। আমি নিশ্চয়ই খাপছাড়া।

শ্রীমতী বলে ওঠে—আপনিই ঠিক।

হেমাঙ্গিনী হেসে ওর চিবুক তুলে ধরে বলে—তুমি জানবে কি করে? সেই বয়স তো হয়নি। অবিশ্যি দেরিও নেই।

-বয়সের দরকার কি? অনুভূতি রয়েছে।

হেমাঙ্গিনী ওকে জড়িয়ে ধরে বলে—তাই আমি দেবতার সেবায় নিজেকে সঁপে দিলাম। মা বাবা খুব আঘাত পেয়েছিলেন, বেশিদিন বাঁচেননি। কিন্তু আমি তো নিরুপায়। অনেক চেষ্টায় রাজমাতার আশ্রয় পেলাম।

মুক্তি বলে—দেবদাসী হলেন না কেন?

—আমার মধ্যে নাচ-গান তেমন নেই। মনের মধ্যে একটা আকুতি রয়েছে, যা দেবতাকে সমর্পণ করি।

শ্রীমতী বলে–আপনি দেবী।

–আর তুমি একটা পাগ্‌লী। চল।

মুক্তি বলে—আর অশ্বারোহী?

—মনে হল, ছন্নছাড়া জীবন কাটাচ্ছে। দু’জনের মনের গঠন যে এক রকমই ছিল। ইচ্ছে করেই কিছু জিজ্ঞাসা করলাম না। শুধু বললাম, এই দেখাই যেন শেষ দেখা হয়। ও বলল—আমি তো জানতাম শেষ দেখা করেই শেষ হয়েছে। কিন্তু দৈবের কথা কেউ তো বলতে পারে না।

.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *