বিজয়নগর – ৩

বিজয়নগর সাম্রাজ্যে দোষীকে খুব কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। একজন চোর যত সামান্য সামগ্রীই চুরি করুক না কেন তার একটা হাত এবং একটা পা সঙ্গে সঙ্গে কেটে ফেলা হয়। চুরি যদি গুরুতর ধরনের হয় তাহলে তার চিবুকের নীচে বাঁকানো লোহা ঢুকিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। যদি কেউ কোনো সম্ভ্রান্ত মহিলা বা কুমারীকে ধর্ষণ করে তার জন্যও একই শাস্তি। কোনো ভূস্বামী, সেনানায়ক উচ্চপদস্থ কোনো ব্যক্তি যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাকে জীবন্ত অবস্থায় কাঠের শূলে দেওয়া হয়। সেই শূল তার পেটের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে যায়। নিম্নস্তরের কোনো মানুষ যদি কোনো অন্যায় করে, তাহলে তাকে বাজারের মধ্যে শিরশ্চেদ করার আদেশ দেন রাজা। হত্যার অপরাধেও একই শাস্তি, যদি সেই হত্যা কোনো দ্বন্দ্বযুদ্ধে না হয়। কারণ যারা দ্বন্দ্ব যুদ্ধ করে, তারা বিশেষভাবে সম্মানিত হয় এবং জীবিত ব্যক্তি মৃতের ভূসম্পত্তির অধিকারী হয়। তবে মন্ত্রীর অনুমতি ছাড়া কেউ দ্বন্দ্ব যুদ্ধ করতে পারে না, যে অনুমতি সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায়।

অন্য ধরনের চটকদার শক্তিও রয়েছে। রাজার মর্জি অনুযায়ী অপরাধীকে হাতির নীচে ফেলে দেওয়া হয়। হাতি তার দেহটাকে পা দিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

মন্দিরের দেবদাসীরা কখনো স্বচক্ষে এইসব শাস্তি প্রদান দেখেনি। শুনেই সর্বাঙ্গ হিম হয়ে যায়। তবে সমাজের নিয়ম-কানুন গুরুদেব ক্রিয়াশক্তির কাছে সবিস্তারে শুনেছে। না শুনেই অনেক জিনিস তারা জানত। যেমন সমাজে ব্রাহ্মণেরা হল শ্রেষ্ঠ। তারা সৎ, তারা জীবহত্যা করে না। তাদের খাদ্য নিরামিষ। ঋজু সুঠাম চেহারা হলেও তারা খুব একটা শক্তিশালী হয় না। বুদ্ধি তাদের প্রখর। তাই তারা উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত এবং তাদের তত্ত্বাবধানে রাজ্য চলে।

গুরুদেব বলেন, সহমরণ প্রথা সমাজে বহুদিন ধরে চলে আসছে।

শ্রীমতী সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন তোলে-আগে যিনি বিজয়নগরের অধিপতি ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পরে সমস্ত রানী সহমরণে গিয়েছিলেন?

– হ্যাঁ।

—সব?

—অবশ্যই? অবাক হচ্ছ কেন?

–আমি ভেবেছিলাম, যাঁরা যাতায়াতে শকট পান না, পদব্রজে যাওয়াই যাদের একমাত্র উপায়, তাঁরা নিষ্কৃতি পেয়েছেন।

—শ্রীমতী, নিরাশ্রয় বিধবাদের মূল্য কোথায়?

শ্রীমতী আর কিছু বলেনি। মায়ের কথা মনে পড়েছিল তার। বাবা জীবিত থাকলে মায়ের এই দশা হত না। কিন্তু মা না থাকলে তার কি দশা হত? সে বুঝতে পারে না। তবে সিদ্ধান্ত নেয় গুরুদেবের কোনো আলোচনায় প্রশ্ন তুলবে না।

সহমরণেরও অনেক নিয়ম রয়েছে, কারণ এটি খুবই সম্মানজনক তাদের পক্ষে। তাদের স্বামীদের যখন মৃত্য হয় তখন তারা তাদের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে বিলাপ করে। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ যদি অতিমাত্রায় কান্নাকাটি করে তাহলে বুঝতে হবে স্ত্রীলোকটির স্বামীর সন্ধানে যাওয়ার ইচ্ছা নেই। তাদের আত্মীয়স্বজনদের বিলাপ বন্ধ হলে সদ্য বিধবাটিকে বংশের সম্মান যাতে ক্ষুণ্ণ না হয় তার জন্য সহমরণে যেতে প্ররোচনা দিতে থাকে। মৃত ব্যক্তিকে বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা দ্বারা নির্মিত এবং পুষ্পশোভিত একটি চন্দ্রাতপের নীচে শোয়ানো হয়। স্ত্রীলোকটিকে তারা একটি অকেজো অশ্বের পৃষ্ঠে চাপায়। সে অনেক অলংকারাদি সজ্জিত হয়ে গোলাপ ফুলে আবৃত হয়ে পেছনে পেছনে যায়। সে এক হাতে একটি আয়না এবং অন্য হাতে এক গুচ্ছ ফুল নেয়। তার সঙ্গে সঙ্গে যায় নানারকমের বাদ্যযন্ত্র। তার আত্মীয়স্বজনেরাও তার সঙ্গে আনন্দ করতে করতে যায়। একজন পুরুষ একটি ক্ষুদ্র ঢাক বাজাতে বাজাতে যায়। পুরুষটি গান গাইতে গাইতে বলে স্ত্রীলোকটি তার স্বামীর সঙ্গে মিলিত হতে যাচ্ছে। উত্তরে সদ্য বিধবাটিও বলে, সে তাই যাচ্ছে।

শ্মশানে উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত বাদকদলের সঙ্গে সে অপেক্ষা করে। স্বামীর দেহ একটি বৃহৎ গর্তে রাখা হয়। আগে থেকেই সেটি প্রস্তুত করা থাকে। সেটি কাঠ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। অগ্নি সংযোগের আগে মৃতের মা কিংবা নিকট আত্মীয় এক পাত্র জল মাথায় নিয়ে এবং হাতে একটি জ্বলন্ত কাষ্ঠখণ্ড নিয়ে গর্তটি তিনবার প্রদক্ষিণ করে। প্রতি প্রদক্ষিণে পাত্রটিতে একটি করে ছিদ্র করে। তিনবার প্রদক্ষিণের পর পাত্রটি ভেঙে ফেলে এবং জ্বলন্ত কাষ্ঠখণ্ডটি গর্তটিতে নিক্ষেপ করে। তারপর গর্তের কাষ্ঠগুলিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

দেহ সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হলে স্ত্রী এগিয়ে এসে তার নিজের পদদ্বয় ধৌত করে এবং একজন ব্রাহ্মণ এগিয়ে এসে রীতি অনুযায়ী কিছু অনুষ্ঠান করেন। স্ত্রীলোকটি তার সমস্ত অলংকার খুলে ফেলে সেগুলি তার স্ত্রীলোক আত্মীয়দের মধ্যে বিতরণ করে। যদি তার পুত্র থাকে, তাহলে সেই পুত্রের প্রশংসা করে আত্মীয়দের কাছে।

অলংকার বিতরণের পর তার সব কিছুই খুলে নেওয়া হয়, এমনকি তার পরিধানের মূল্যাবান বস্ত্রও। তাকে পরিয়ে দেওয়া হয় একটি অতি সাধারণ হলুদ রঙের শাড়ি। এরপর তার আত্মীয়ারা তার একটি হাত ধরে। অন্য হাতে সে একটি গাছের ডাল নেয়। এরপর সে ছুটে গিয়ে জ্বলন্ত গর্তের কিনারায় উঁচু জায়গায় দাঁড়ায়। তখন আত্মীয়রা একটি বস্ত্রখণ্ডে কিছু চাউল বেঁধে দেয়। অন্য হাতের বস্ত্রে চিরুণী পানের ডাবর আর আয়না বেঁধে দেয়, যাতে স্বামীর পাশে গিয়ে সেগুলি সে অঙ্গসজ্জায় ব্যবহার করতে পারে। সে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মাথায় একটি তৈলপাত্র রেখে আগুনে ঝাঁপ দেয়। সঙ্গে সঙ্গে এতক্ষণ যে সমস্ত আত্মীয়স্বজন হাতে কাষ্ঠখণ্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তারা সেগুলি নিক্ষেপ করে তাকে তাই দিয়ে ঢেকে দেয়। এরপর তারা উচ্চকণ্ঠে শোক-ক্রন্দন শুরু করে।

.

সহমরণে যাওয়া যত গৌরবের হোক না কেন দেবদাসীদের কারও হৃদয় স্পর্শ করেনি। কারণ এরপর এই বিষয়টিকে তারা আলোচনার বিষয়বস্তু করেনি। শুনে যাওয়ার তাই শুনেছে। তার চেয়ে তাদের কাছে আরও আকর্ষণীয় একজন বারবনিতার কথা, প্রথম যৌবনে রাজা যার প্রেমে পাগলা হয়েছিলেন সেই বারবনিতা তখনই রাজাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিল যে, কোনোদিন যদি তিনি সিংহাসন লাভ করেন তাহলে তাকে রানীর মর্যাদা দিতে হবে। রাজা তাঁর প্রতিজ্ঞা পালন করেছেন। সেই বারবনিতা সত্যই আজ রানী। তার নামে নগরও নির্মাণ করেছেন। পদব্রজে যাতায়াতকারী রানীরা যেমন সহমরণ ছাড়া অতি সামান্য মর্যাদার অধিকারিণী তেমনি বহু রানী রয়েছেন যাঁদের সম্মান এবং সুযোগ তাদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। তাঁদের প্রত্যেকের রয়েছে পৃথক পৃথক বাসগৃহ। সেখানে রয়েছে তাঁদের নিজস্ব দাসীবৃন্দ, পরিচারিকা এবং মহিলারক্ষী। এখানে কোনো পুরুষের প্রবেশের অধিকার নেই। শুধু নপুংশকেরা যেতে পারে। কারণ তারাই তাঁদের পাহারা দেয়। এই রানীরা কোনো পুরুষকে দেখতে পান না। শুধু রাজার অনুগ্রহে কিছু উচ্চপদস্থ বৃদ্ধ ব্যক্তি তাঁদের দেখতে পারে। যখন এই সমস্ত রানী বাইরে যেতে চান তখন চারদিকে আবৃত শিবিকা তাদের বহন করে, যাতে কেউ তাদের দেখতে না পায়। তিন চারশো নপুংশক সঙ্গে যায়, সাধারণ মানুষদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই রানীদের প্রত্যেকের অনেক অর্থ, মণিমাণিক্য এবং ব্যক্তিগত অলংকার রয়েছে যেমন অনন্ত, বালা,মোতিমুক্তো, হীরা—প্রতিটিই পরিমাণমতো।

রাজা প্রাসাদের অভ্যন্তরে স্বতন্ত্রভাবে থাকেন। যখন তাঁর মনে কোনো পত্নীর সান্নিধ্য লাভের বাসনা জাগে তখন কোনো নপুংশক তাঁকে ডাকতে যায়। সেই নপুংশক কিন্তু রানী যেখানে রয়েছেন সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। সে নারীরক্ষীদের মাধ্যমে রানীকে জানায়। রানী তখন রাজা যেখানে রয়েছেন সেখানে যান কিংবা রাজাই তাঁর কাছে যান। এইভাবেই দিন যায়।

অন্তঃপুরের এত সব খবর দেবদাসীরা জানতে পারে প্রাসাদের সাধারণ দাসীদের কেউ যদি মন্দিরে পূজা দিতে কিংবা হেমাঙ্গিনীর বার্তা নিয়ে কোনো দাসী এলেও রাজপরিবারে অনেক কিছু জানতে পারা যায়। দেবদাসীদের সবাই গুরুদেবের আড়ালে তাদের ঘিরে ধরে। তারা বুঝতে পারে, এসব তাদের পক্ষে অনুচিত। তবু প্রবল আকর্ষণ বোধ করে। সেই সময়ে ভবানীদিদিও গুটি গুটি এসে উপস্থিত হয়। তারপর রাজপুরীর লোক চলে গেলে ভবানী সবাইকে বলে—এটা তোমাদের পক্ষে ঠিক নয়। এতে মন চঞ্চল হয়। এই কথা শুনে অবলা, এমনকি দয়াবতীও হেসে ওঠে। ভবানীদি রান্নাঘরের দিকে ছোটে। পেছনের হাসির শব্দ তাকে যেন তাড়া করে। তবে প্রাসাদ থেকে আসে যারা তাদের কাছে রাজার দৈনন্দিন জীবন যাত্রারও কিছু খবর তারা পায়। রাজা শেষরাতে ঘুম থেকে উঠে অনেকখানি তিল তৈল পান করে। তারপর একজন এসে তাঁর সর্বাঙ্গে তিলতেল মর্দন করে। এরপর রাজা একজন ‘কুস্তিগীরের সঙ্গে কুস্তী লড়েন। এইভাবে তাঁর গায়ের তেল ঘাম হয়ে ঝরে পরে। তখনও সূর্য পূর্বাকাশে উঁকি দেয় না। ইতিমধ্যে রাজার বিদ্যুৎগতিতে অশ্ব চালনার কথা আগেই বলা হয়েছে। সবাই বোঝে, রাজা মানে শুধু রূপসী রানী পরিবৃত হয়ে অলস জীবনযাপন নয়। যে সব সোনালি চুলের বিদেশিরা রাজধানীতে আসে তারা কচিৎ কখনো রাজার দর্শন পেয়ে এবং তাঁর কাহিনী শুনে চমৎকৃত হয়। তারা রাজাকে শ্রদ্ধা করে তাদের প্রতি তাঁর হার্দিক ব্যবহারের জন্য। ফলে তাঁর সময়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বেড়ে চলে এবং রাজা তাঁর পছন্দমতো তেজি অশ্বের সংখ্যা বৃদ্ধি করে চলেন।

.

কয়েকদিন সমানে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি যেমন নেশা ধরায়, তেমনি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিরক্তি এনে দেয়। পশুপতি মন্দিরের দেবদাসীরা দীর্ঘক্ষণ নৃত্যগীতে মগ্ন থেকেও বাইরের আকাশে কোনো বৈচিত্র্য দেখতে পেল না।

মুক্তি বলে ওঠে—ধুস্, আর ভালো লাগে না।

মাধবী ওকে বলে—তোর অনাবৃষ্টি ভালো লাগে?

অবলা বলে—ছুতো নাতায় তর্ক করতে নেই। মুক্তি খারাপ কিছু বলেনি।

—আমিও খারাপ কিছু বলিনি। আমি জানি অনাবৃষ্টি দীর্ঘস্থায়ী হলে আরও ভয়ঙ্কর। তাতে শ্রীমতীর মতো মেয়েদের ঘর ছাড়তে হয়।

মুক্তি বলে—কিসের সঙ্গে কি। আমি জানি কোনোটাই বেশি ভালো নয়। সব কিছুর মধ্যে সমতা থাকলে ভালো লাগে। তাই বলে, দুর্ভিক্ষ হবে না? বন্যা হবে না? আসলে সবই ঈশ্বরের দান বলে মেনে নিতে হয়। তাঁর উদ্দেশ্য আমরা বুঝব কি করে?

কিছুক্ষণ স্তব্ধতা বিরাজ করে।

হঠাৎ দয়াবতী বলে ওঠে—বাব্বাঃ, মুক্তি এত জ্ঞানী জানতাম না তো?

মাধবী বলে—এই একঘেয়ে বৃষ্টি মুক্তিকে জ্ঞানবতী করে তুলেছে। সে একান্তে চিন্তার অবকাশ পেয়েছে। তাই জ্ঞান বেড়েছে।

শ্রীমতী এতক্ষণে মুখ খোলে। সে বলে—তাই বোধহয় কালিদাস ‘মেঘদূত’ লিখেছিলেন।

মঞ্জরী বলে—কালিদাসের নাম কারও অজানা নয়, মেঘদূতও পরিচিত নাম কিন্তু তাতে কি লেখা রয়েছে আমরা বোধহয় কেউ জানি না।

দয়াবতী বলে—পশুপতি মন্দিরের দেবদাসী হয়ে মেঘদূত পড়ার সখ? শুনলে সবাই ছি ছি করবে। ওটা বিরহা-বিরহিনীর কাব্য। আমাদের কারও হৃদয়ে কল্পনা করেও বিরহ সৃষ্টি করা উচিত নয়। মুক্তির মনে স্বর্ণালী চুলের বিরহ রয়েছে হয়তো। ওদের মধ্যে একজনের মুখও কি ওর মনে গেঁথে নেই।

মুক্তি বলে—তাই নাকি? তবে আমিও সদ্য ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার কথা বলি। সেদিন রাজপ্রাসাদের কাছে বাজারে আমরা সবাই তো গিয়েছিলাম। হঠাৎ একজন মানুষকে দেখলাম। বেশ দীর্ঘদেহী, সুপুরুষ কিনা জানি না। যে ভালোভাবে দেখেছে সে বলতে পারে।

মঞ্জরী বলে ওঠে—কে দেখেছে?

—জানি না, আমি অন্তত দেখিনি। তবে তার হাতে একটি বাঁশি দেখেছি। হাবভাব দেখে বোঝা যায় বাঁশি বাজানোই তার পেশা, কিংবা নেশা। যা হোক, আমি দেখলাম দয়াবতী প্রথমে তার বাঁশির দিকে চেয়ে রইল। তারপর অনেক কৌশলে তার মুখ দেখল। দয়াবতীর পুলকিত হাবভাব। তারপর এক কাণ্ড।

দয়াবতী বলে ওঠে—মিথ্যে বলবি না কখনো। বানিয়ে বানিয়ে সব বলছে।

—আমি তো শেষই করলাম না। কি করে বুঝলে বানিয়ে বলছি। দয়াবতী সবাইকে বলে—তোরা কেউ ওর কথা বিশ্বাস করিস না। অবলা বলে—সেই বিচার আমরা করব। তার আগে বাকিটুকু শুনে নেব। দয়াবতীকে রাগ করতে সাধারণত কেউ দেখেনি। কিন্তু আজ বেশ ক্রোধান্বিত। মুক্তি বলে—দয়াবতী তাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে মনে হল লজ্জায় মরে যাচ্ছে। লোকটা খুবই অপ্রস্তুত। সে অপরাধীর মতো তাড়াতাড়ি সরে গেল।

দয়াবতী কাঁদতে কাঁদতে বলে—মিথ্যে কথা। আমাকে এভাবে অপমান করলি শেষে?

অবলা বলে—থাক্, এই নিয়ে আর কোনো কথা না বলাই ভালো। তোরা সবাই দয়াবতীকে ভুল বুঝিস। আসলে ও কিন্তু সাধারণ নয়। ও শিল্পী, ও ঈশ্বর-মুখী।

শ্রীমতী বলে—তুমি ঠিক বলেছ। লোকে যতই বলুক আমরা দেবদাসী। আসলে আমরা আশ্রিতা একটা সম্মান চাপানো হয়েছে আমাদের ওপর। তবে গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষ আমাদের শ্রদ্ধা করে দেখেছি। বিজয়নগরের অধিবাসীরা সেই সম্মান করে কি? জানি না। না জানলেও ক্ষতি নেই। কারণ আমাদের অধিকাংশের মধ্যে প্রতিভা রয়েছে সৌন্দর্য আছে, পবিত্রতা আছে। নীচতা আমাদের নেই। দেবদাসী না হয়ে সাধারণ থাকলে, আমরা অনেক কিছু হতে পারতাম। কিংবা সংসারের দারিদ্র্য গ্রাস করত।

.

গুরুদেব ক্রিয়াশক্তি মাঝে মাঝে তাদের মন্দিরের আশেপাশের বনাঞ্চল দেখাতে নিয়ে যান। তিনি তাদের পথে ঘাটে যেতে দিলেও এইসব অঞ্চলে একা যেতে দেন না। বুনো হাতি তো রয়েছে। তাছাড়া অজানা আশঙ্কাও থাকতে পারে। তিনি ওদের নিয়ে যান ছোটখাটো ঝোপঝাড় চেনাতে, যার পাতা ও শিকড় থেকে রোগ নিরাময়ের জন্য নানারকম ওষুদ তৈরি করা যায়। গুরুদেবের এ বিষয়ে খ্যাতি আছে। ওদের মধ্যে শ্রীমতী এই বিষয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যেই সে দেবদাসীদের শরীরের হেরফের হলে ভালো করে দিয়েছে। গুরুদেব শুনে একটু বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কারণ শ্রীমতী মিশ্র ওষুধ প্রয়োগ করে। কোন গাছের সঙ্গে অন্য গাছের শিকড় বেটে ওষুধ দেয়। সে এ ওষুধ মন্দিরের আশেপাশের ঝোপঝাড় থেকেই পেয়ে যায়। একদিন সূর্যোদয়ের একটু পরেই সে একা গিয়েছিল একটা শিকড়ের সন্ধানে। ওষুধটি একজন শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তির। সে মনুষ্যচক্ষুর আড়ালে বাড়িতে বসে থাকে। এক নারী তার দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছিল, তাই তার চিবুকে একটি লোহার বালা ঝোলে। তার স্ত্রী এসেছিল গুরুদেবের কাছে। তার স্বামীর পেটে অসহ্য যন্ত্রণা হয়। আগে মাসে এক আধবার হত, এখন মাঝে মাঝেই হচ্ছে। গুরুদেবের কাছে যখন রোগীরা আসে তাঁর সঙ্গে শুধু শ্রীমতী থাকে। তিনি স্ত্রীলোকটির কথা শুনে বলেন—ওকে না দেখলে তো ওষুধ দিতে পারব না। রোগের লক্ষণ জানতে ওর সঙ্গে কথা বলা দরকার।

-ও তো আসতে পারবে না।

–তাহলে চিকিৎসা হবে না।

স্ত্রীলোকটি কেঁদে ওঠে।

গুরুদেব বলেন—সে কি সত্যই জঘন্য অপরাধী?

–ঠাকুর, সে সব অনেক কথা। আমার তাড়াতাড়ি ওষুধের দরকার। ওর যন্ত্রণা দুচোখে দেখা যায় না।

—তাই তো। দেখা দরকার।

শ্রীমতী বাল–গুরুদেব আমার একটা প্রার্থনা রয়েছে।

জিজ্ঞাসু নেত্রে উনি শ্রীমতীর দিকে তাকান।

—আমি গিয়ে রোগীকে দেখব?

গুরুদেবের মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠে—তুমি!

—হ্যাঁ, ঠাকুর। এই স্ত্রীলোকটির বয়স দেখছেন, মাঝবয়সী। এর স্বামী নিশ্চয় আরও বয়স। অনেক দিনের ঘটনা বলে মনে হয়। শাস্তি তো ওর হয়ে গিয়েছে। রাজা কি বলেছেন ওকে একঘরে করতে? ওর রোগ হলে কি চিকিৎসার সুযোগ নিতে পারবে না? আমি অবগুণ্ঠিতা হয়ে যাব। আপনি আমার প্রার্থনা পূরণ করুন। আপনি আমার গুরু, চিকিৎসা শাস্ত্রেও তাই।

গুরুদেব কিছুক্ষণ চিন্তা করে শ্রীমতীকে বলেন—তুমি ঠিক বলেছ। আমি সাধারণ ধারণার বশীভূত হয়ে পড়েছিলাম। আজকাল এমন বিভ্রম হচ্ছে দেখছি।

পরে স্ত্রীলোকটিকে প্রশ্ন করেন—তোমার বাড়ি কতদূরে?

—বেশিদূর নয়। এঁর কোনো বিপদ হবে না।

গুরুদেব অনুমতি দিলেন। আর শ্রীমতী গুরুদেবের পা জড়িয়ে ধরল।

-একি করছ শ্রীমতী?

—প্রতিক্ষণে আমি আপনাকে নতুন করে চিনতে পারি বাবা।

মধ্যবয়স্কা স্ত্রীলোকটির চোখে জল। সে দূর থেকে তাঁকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে। পথে নেমেই স্ত্রীলোকটি বলে-আপনি দেখতেও দেবীর মতো, মনও তেমন। আপনি আমার স্বামীকে ঘৃণা করেননি। অথচ আমি আপনাকে প্রত্যাশাও করিনি। আমি আপনাকে প্রথম দেখলাম। তবু আপনি সাগ্রহে একজন ঘৃণিত মানুষকে দেখতে যাচ্ছেন।

–আমি তো ব্যক্তিটি ঘৃণিত কিংবা শ্রদ্ধেয় কিনা তার বিচার করতে যাচ্ছি না। আমি যাচ্ছি, তার রোগের নিরাময় করতে, পারি কিনা চেষ্টা করতে। এতে আমার স্বার্থই বেশি। আর যদি তাঁকে সুস্থ করতে পারি তাহলে আপনি নিশ্চয়ই আনন্দিত হবেন। আমার আনন্দও কম হবে না।

স্থানটি মনোরম কিন্তু কুটিরটি ছন্নছাড়া। শ্রীমতী লক্ষ্য করে আগে যেকটি কুটির রয়েছে যাদের প্রতিবেশী বলা যায় তারা কৌতূহলের দৃষ্টি নিয়ে দেখে তাকে।

–তোমার পড়শিরা আসে না?

—আসে, তারা সাহায্যও করে। তারা ওর বন্ধুবান্ধব আত্মীয়।

—তারা ঘৃণা করে না?

–না, তারা ওকে শৈশব থেকে চেনে।

—তাহলে?

–ও অন্যায় করেনি, ভুল করেছিল।

—কি ভুল?

—আমাদের বিয়ের পরই সেই বছর ছিল নববর্ষের উৎসব। রাস্তায় ও ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েছিল। একজন সম্ভ্রান্ত গৃহবধূ তার পাশেই দাঁড়িয়েছিল। তার পরনের পরিধেয় বস্ত্র ছিল অসাধারণ। ওর ইচ্ছা হল, অমন একটি আমার জন্য কিনে দেবে। ও ভাবল ওটি যদি রেশমের তৈরি হয় তাহলে হয়তো আমাকে কিনে দিতে পারবে না। মহিলার ওড়নার প্রান্ত হাওয়ায় উড়ছিল, আমার স্বামী হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখতে গিয়েছিল ওটা রেশমের কিনা।

—রেশম তো দেখলেই মোটামুটি বোঝা যায়।

—ওর কোনো ধারণা ছিল না। একথা ওর পরিচিতেরা বিশ্বাস করে, কিন্তু সাধারণ কেউ বিশ্বাস করবে না। ও শৈশবে মাতৃহীন। জীবনে একমাত্র নারী আমি। সেই নারী চিৎকার করে ওঠেন, ওঁর ওড়নায় হাত দেওয়া মাত্র। তারপর যা হওয়ার হয়ে গেল। শাস্তি পেয়ে ও কোথায় যেন লুকিয়ে ছিল। একদিন বন্ধুরা ওকে ধরে আমার কাছে নিয়ে এল।

শ্রীমতী কুটিরে প্রবেশ করতে একজন জীর্ণশীর্ণ প্রায়-বৃদ্ধ ব্যক্তি আতঙ্কিত দৃষ্টিতে শ্রীমতীর দিকে চেয়ে বলে উঠল—আপনি ভুলে চলে এসেছেন। আমায় দোষ দেবেন না। সত্যি আপনি এই ঘরে ঢুকছেন আমি জানতাম না।

ওর স্ত্রী বলে—আমি ওঁকে এনেছি। তোমার কোনো দোষ নেই।

-কেন এনেছ। এই বালা ঝুলছে, বলনি সে কথা?

—বলেছি।

—আমি কিন্তু কিছু জানি না, আপনি বিশ্বাস করুন।

শ্রীমতী তার অবগুণ্ঠন সরিয়ে দেয়। লোকটি তার মুখের দিকে বিস্ময়ে চেয়ে থাকে। অস্ফুট স্বরে বলে—আপনি দেবী। স্বর্গ থেকে এসেছেন। আমার খুব যন্ত্রণা। আপনি ভালো করে দিন দেবী।

লজ্জিত শ্রীমতী বলে—আমি দেবী নই। অতি সাধারণ একজন মানবী। তবে আপনার চিকিৎসার জন্যই এসেছি। আমার গুরুদেবের নাম আপনি নিশ্চয় শুনেছেন।

—তাঁকে সবাই চেনে।

—তিনি আমাকে চিকিৎসাবিদ্যা শেখান।

শ্রীমতী তাকে ভালোভাবে দেখে। তার জন্য তার গায়ে হাত দিতে হয়। সে ছিটকে সরে যায়।

—অমন করবেন না।

শ্রীমতী দুটো গাছের শিকড় দিয়ে স্ত্রীলোকটিকে বলেন—এটি ভালোভাবে বেটে তুলসীর রস আর মধু দিয়ে দিনে তিনবার খাওয়াতে হবে। দশদিন পরে আমাকে জানালে ভালো হয়।

—জানাব। আপনি দয়া করে এসেছেন, এটাই সৌভাগ্য।

–না না, আমি এমন কিছু জানি না। তবে আমার গুরুদেবের তুলনা নেই। আমি তাঁর সঙ্গে আপনার উপসর্গ নিয়ে পরামর্শ করতে পারব।

স্ত্রীলোকটি শ্রীমতীকে বাইরে নিয়ে এলে শ্রীমতী তার স্বামীর নাম জিজ্ঞাসা করে।

সে বলে—স্বামীর নাম তো নিতে নেই। পশুপতিনাথের বাস যে পর্বতে, সেই স্থানেরই নাম।

শ্রীমতী হেসে বলে—বুঝেছি কৈলাস।

—হ্যাঁ।

—কুটিরে শুধু তোমাদের দু’জনকে দেখলাম, সন্তান নেই?

স্ত্রীলোকটি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। বলে—সেই ভয়ঙ্কর দিনের আর কদিন আগেই বা বিয়ে হয়েছিল। ও আমাকে পাগল করে দিত। কিন্তু সেদিনের পর থেকে স্পর্শ করে না।

—স্পর্শ করেন না মানে?

-ভালোবাসার স্পর্শ। ও ভয় পায়। একটা অনাগ্রহ এসে গিয়েছে। বেঁচে কি লাভ আমার বলুন। সন্তানহীনা এক নারী, যে স্বাীমীর নিবিড় স্পর্শ থেকেও বঞ্চিত। শ্রীমতী ভাবে, সংসার সম্বন্ধে সে কতটুকু জানে? এত যে কুটির দেখতে পায় তারা, সেগুলোর ভেতরে কত শোক-দুঃখের ইতিহাস নীরবে রচিত হচ্ছে, কে খোঁজ রাখে? তার মধ্যে যতটুকু আশা-আনন্দ তাই আঁকড়ে রেখে মানুষ বাঁচে, স্বপ্ন দেখে।

.

কৈলাস সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে। গুরুদেব ক্রিয়াশক্তি বুঝতে পারেন শ্রীমতী অসাধারণ প্রতিভাময়ী। তিনি তাকে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করেন। সেই সঙ্গে বুঝতে পারেন দু-এক বছরের মধ্যেই তিনি অশক্ত হয়ে পড়বেন। মন্দিরের দায়িত্ব কাকে দেবেন? দিলে শীঘ্রই ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু কোথায় সেই ব্রাহ্মণ যে জিতেন্দ্রিয়? সরস্বতী মন্দিরে দুজন ব্রহ্মচারী পুরোহিত রয়েছেন তিনি জানেন। রাজাকে অনুরোধ করতে হবে, তাঁদের একজনকে পশুপতি মন্দিরের ভার দিতে। তার আগে শ্রীমতীদের এবং দু-একজনকে দেবদাসীত্ব থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া। কিন্তু কি করে? যাদের কথা ভাবেন, তারা কি আদৌ সম্মত হবে দেবদাসীদের গ্রহণ করতে? তিনি নিজে অনুরোধ করলে কি তারা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে? এ পর্যন্ত কোনো বিষয়ে তেমন ঘটেনি। কিন্তু বিবাহের বিষয়ে পারিবারিক সম্মতিও প্রয়োজন রয়েছে। পশুপতি কি করবেন জানা নেই। নববর্ষ আসতে আর আটমাস বাকি রয়েছে। সেই মহোৎসব এবং মহাভোজের রাতে রাজ্যের সমস্ত নর্তকীদের উপস্থিতি অবশ্য পালনীয়। পশুপতি মন্দিরের পুরোহিত রাজার এই নির্দেশকে গোপনে অগ্রাহ্য করেছেন। দেবদাসীরাও সবাই জানে। নগরীতে খবর রটেছে যে সব মন্দিরের সব দেবদাসী এই বৃহৎ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকে না। কথাটা শুনে ক্রিয়াশক্তির মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্নমানুষও বিচলিত না হলেও, জানেন একটু বেশি ঝুঁকি নিচ্ছেন। তিনি নিজের গুরুদেবকে স্মরণ করেন। তিনি দেখা দিয়েছিলেন ত্রিশ বছর পূর্বে কুম্ভমেলায়। বলেছিলেন, সিদ্ধপুরুষদের মধ্যেও অহংভাব আসতে পারে, সাবধান। পারিস তো সমাজের কল্যাণ করে যাস। এরপর আর দেখা হয়নি পরমহংসের সঙ্গে। এখন তিনি সমাজের কাজেই উদ্যোগী হয়েছেন।

ক্রিয়াশক্তি মাঝে মাঝে শ্রীমতীকে নিয়ে আশেপাশে অসুস্থ ব্যক্তির বাড়িতে যান। তিনি সর্বত্র যেতেন না। কিন্তু শ্রীমতীর দ্বারা কৈলাসের নিরাময়ের পরে তিনি সর্বত্রই যাওয়ার চেষ্টা করেন। শ্রীমতীর সঙ্গে মঞ্জরী মাধবীদেরও কেউ কেউ থাকে।

দূর থেকে একটা কুটির দেখিয়ে শ্রীমতী গুরুদেবকে বলে—ওই যে কৈলাসের কুটির।

—সুন্দর দেখতে তো!

—এমন ছিল না। তখন তো কাজ করতে পারত না।

—হু। তুমি ওদের সংসারে শান্তি এনে দিয়েছ। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করবেন। শ্রীমতী মনে মনে ভাবে, শান্তি তো সম্পূর্ণ আসেনি।

সেইসময় কৈলাসের স্ত্রী তাদের দেখতে পেয়ে ছুটতে ছুটতে আসে। ক্রিয়াশক্তি উদ্বিগ্ন হয়ে বলেন—মেয়েটা পড়ে যাবে যে।

–আমাদের দেখে আনন্দ হয়েছে। ভাবতে পারেনি এদিকে আসব। মঞ্জরীর চোখে বিস্ময়

কৈলাসের স্ত্রী একটু দূর থেকে গুরুদেবকে নত হয়ে প্রণাম করে। তারপর শ্রীমতীকে ডাকে। মঞ্জরীও শ্রীমতীর সঙ্গে যায়। কিছুক্ষণ কথা বলার পরে কৈলাসের স্ত্রীর নিকট থেকে শ্রীমতী যখন ফিরে এল, তখন তার সারা মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত। মঞ্জরীর মুখেও সেই আনন্দ প্রতিবিম্বিত।

ক্রিয়াশক্তি বলেন—এত আনন্দ কিসের?

শ্রীমতী গুরুদেবের মুখের দিকে চেয়ে বলে—জীবনে প্রথম এই স্ত্রীলোকটি সন্তান-সম্ভবা।

স্তম্ভিত দুই দেবদাসী চেয়ে দেখে গুরুদেবের দুই চোখ অশ্রুসিক্ত। তিনি শ্রীমতীর মাথায় হাত রেখে বলেন—একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা করেই তুমি আমার সারা জীবনের সাফল্যকে অতিক্রম করেছ। আমি কোনো ব্যক্তির চিকিৎসা করে একটি সংসারের পরিপূর্ণতা এভাবে ফিরিয়ে দিতে পারিনি।

—গুরুদেব সবই আপনার দান।

–না না, একথা বলো না শ্রীমতী। ঈশ্বর তোমাকে অনেক কিছু দিয়েছেন। আমি সেই মহাশক্তির সামান্য পূজারী মাত্র। যদি তোমাকে আমি সার্থকভাবে রক্ষা করতে পারি সেটাই হবে যথেষ্ট।

সেই সময় আঁকাবাঁকা পথের আড়াল থেকে কয়েকজন পুরুষকে তারা আসতে দেখে। ক্রিয়াশক্তি তাদের দেখে বিস্মিত হন। শ্রীমতীরাও দ্বিধাগ্রস্ত। এদের দেখলে বোঝা যায়, একেবারে সাধারণ মানুষ নয়। চেহারা আর পোশাক পরিচ্ছদে এদের পরিচয় মেলে। দু’জন প্রবীণ এবং দুজন নবীন। তারা ক্রিয়াশক্তিকে দেখে বিস্মিত না হলেও, প্রত্যাশা করেনি বলে মনে হল। পথের উপরেই তারা গুরুদেবের পদধূলি গ্রহণ করে।

একজন হেসে বলে—ভালোই হল, দেবদর্শন হয়ে যাবে।

—কোথায় যাচ্ছিলে?

যে ব্যক্তিটি তরুণ, সংকুচিত কণ্ঠে সে বলে—তেমন নির্দিষ্ট কোথাও নয়। ওঁদের অভিযোগ, আমি নাকি রাজকার্যে মন দিই না। শুধু পাহাড়-পর্বত বনাঞ্চল আর মানুষের মন নিয়ে ব্যস্ত থাকি।

গুরুদেব বলেন—সে তো উত্তম কাজ।

তরুণ অন্যদের দিকে চেয়ে সরলভাবে হাসে। তারাও হাসে। একজন বলে—ঠাকুর এ পরিশ্রমে বিমুখ।

—মনে তো হয় না। কদিন আগেই দেখলাম এক ক্ষিপ্ত ষণ্ডের শিং ধরে ভিড় থেকে দূরে ঘুরিয়ে দিল। পরিশ্রম বিমুখ হলে এড়িয়ে যেত। কয়েকজন আহত হত।

সবাই হেসে ওঠে। একজন বলে–আপনার সাক্ষ্যে ও বেঁচে গেল। কিন্তু সত্যিই ও মাটিতে পা ফেলে চলে না।

এবারে গুরুদেবেরও মুখে পবিত্র হাসি ফুটে উঠল। বললেন—এক আধজন এমন থাকা ভালোই। বৈচিত্র্যের স্বাদ মেলে। সবাই হেসে ওঠে।

এদিকে শ্রীমতী এবং মঞ্জরী স্থানুর মতো পথের ধারে দাঁড়িয়ে। আবহাওয়া চমৎকার, অথচ শ্রীমতীর মুখমণ্ডল ঘর্মাক্ত। যে পুরুষটিকে আড়াল থেকে মন্দিরে দেখেছিল আজ তাকে ভালোভাবে দেখল। তাকে নিয়েই আলোচনা। ষাঁড়ের শিং ধরে যে ঘুরিয়ে দিতে পারে সে যথেষ্ট বলশালী। অথচ তাকে কেন্দ্র করেই অভিযোগের কৌতুক।

মঞ্জরী লক্ষ্য করে তরুণটি শ্রীমতীর রূপ দেখে মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল। তারপর থেকে স্বাভাবিক।

গুরুদেব বলেন—এরা এই মন্দিরের দেবদাসী।

একজন প্রবীণ বলে—তেমনই অনুমান করেছিলাম।

মঞ্জরী সহসা ভীত হয়ে পড়ে। ভাবে, এঁরা যদি শ্রীমতীর কথা রাজার কানে তোলেন? সে আতঙ্কিত চোখে শ্রীমতীর দিকে চায়। দেখে শ্ৰীমতী অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেও বোধহয় আতঙ্কিত। কিন্তু গুরুদেবকে স্বাভাবিক বলে মনে হল।

তিনি বলেন—কিন্তু দেবদাসী হলেই সবার ক্ষেত্রে পরিচয় শেষ হয়ে যায় না। তুমি অমরু তসি এই সাম্রাজ্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ সভাসদ। কিন্তু তাতেই কি তোমার পরিচয় শেষ হয়ে গেল? এটুকু কেউ জানলে তোমার কিছুই সে জানল না।

সবাই ঘাড় হেলিয়ে সায় দেয়। একজন প্রবীণ ব্যক্তি বলে—সে তো দেখলেই বোঝা যায়। এঁর রূপ অসাধারণ, সচরাচর দেখা যায় না।

গুরুদেব বলেন—সেটাই আমার চিন্তা। ভাগ্যের পরিহাস বলতে হবে যে আমি সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী হয়েও একজন সংসারী ব্যক্তির মতো এদের দু-একজনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছি। তোমরা সবাই আমার স্নেহাস্পদ। কিন্তু তার আগে সব কথা শেষ করি। তাছাড়া এদের সামনে এভাবে বলা বিসদৃশ। তাই আমি তোমাদের বলি; নারীর রূপ চিরস্থায়ী নয়। যৌবন অতিক্রান্ত হলে সেই রূপ অস্তমিত হতে থাকে। কিন্তু গুণ? নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গুণ আজীবন স্থায়ী হয়। এ অসামান্য গুণবতী। এ যখন কিশোরী ছিল, এর মা দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চল থেকে মেয়ের হাত ধরে এসে একে আমার হাতে সমর্পণ করেছিলেন।

গুরুদেব সহসা থেমে যান। ওদের দিকে এগিয়ে গিয়ে মঞ্জরীর মস্তক স্পর্শ করে বলেন—আমি জানি তুমি শ্রীমতীকে ভালোবাস। তাই তোমার সামনেই ওর প্রশংসা করেছি।

মঞ্জরী নিম্নস্বরে বলে—আমার খুব গর্ব হচ্ছে গুরুদেব। আপনি আরও বলুন। সব গুণের কথা বলুন। আমি সবসময় ওর কাছে থেকেও ওকে চিনতে পারি না। আপনি বলুন, আমি শুনি।

—তুমি অসাধারণ। তবে আমি বুঝতে পারছি, তোমাদের দুজনের খুব অস্বস্তি হচ্ছে। তোমরা বরং মন্দিরে ফিরে যাও। এদের সঙ্গে কথা বলে আমি ফিরব। শ্রীমতীকে বলে দিও এরা রাজাকে কিন্তু বলবে না। কোনো ভয় নেই।

শ্রীমতীর যেন ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। তবু ফিরতে হল। সেই সময় অমরুকে লুকিয়ে দেখতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল। অমরুও ঠিক একই সময় তার দিকে চেয়েছিল। সেই দৃষ্টির মধ্যে কোনো লুকোচুরি ছিল না, কিন্তু মুগ্ধতা ছিল, অন্তত শ্রীমতীর মনে হল।

সম্ভবত ভালোভাবে দেখার অবকাশ পায়নি সে। তার মনের মধ্যে অমরু নামটা বারবার উচ্চারিত হচ্ছিল। কেমন যেন চেনাচেনা।

মঞ্জরীও তখন নিজের চিন্তায় বিভোর। সেই সুন্দর তরুণটি যে তার দিকে কয়েকবার চেয়েছেন তার মনের মধ্যে খচখচ্ করছে। সে পাপচিন্তা করছে। উচিত হচ্ছে না। সে তো দেবদাসী। পশুপতি দেব তার সব।

—শ্ৰীমতী।

মঞ্জরীর ডাকে শ্রীমতী অবাক হয়। মনে হয় আর এক অপরিচিতা মঞ্জরী তাকে ডাকছে। কোনো উচ্ছ্বাস নেই, বরং দুঃখভারাক্রান্ত।

—কি বলছ?

—আমার মধ্যে বোধহয় পাপ ঢুকেছে।

– কেন?

বারবার একটা চিন্তা আসছে। আমি দেবদাসী। অমন চিন্তা আমার মনে আসা উচিত নয়।

—কোন চিন্তা?

–তোকে আমি সব বলি। না বলে আর পারছি না। ওই অতীশ নামে মানুষটির কথা ঘুরে ফিরে মনের মধ্যে আসছে। আমাকে উনি বারবার দেখছিলেন।

শ্রীমতী বলে—তাতে কি হয়েছে? শুধু একটা ভয়, এঁরা রাজার কাছে আমাদের কথা বলবেন কিনা।

মঞ্জরী বলে—গুরুদেব তোকে বলতে বলেছেন যে ওঁরা রাজার কাছে আমাদের কথা বলবেন না।

—সত্যি?

—হ্যাঁ।

শ্রীমতীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সে যেন একজন সমব্যথী পেয়েছে। যেভাবেই হোক তার মনের অবস্থার সঙ্গে মঞ্জরীর মানসিক অবস্থার কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে।

—তুই হাসছিস?

—কিছু মনে করো না। এই হাসি আসল হাসি নয়। আমিও যে নারী, তার ওপর তোমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গিনী।

রাতে ভবানীদিদি এসে বলে—গুরুদেব তোমাদের ডাকছেন।

মঞ্জরী চমকে ওঠে—আমাকেও।

—হ্যাঁ। তোমাদের দু’জনকেই।

–ভবানীদিদি, এই সময়ে তো উনি ডাকেন না।

–আমিও তাই জানতাম। কিন্তু ডাকছেন যখন নিশ্চয় কোনো কারণ রয়েছে।

মঞ্জরী ভবানীদির সামনেই কেঁদে ফেলে।

—কাঁদছ কেন? গুরুদেব ডাকছেন। তুমি শুনতে পাচ্ছ না?

—পাচ্ছি তো। সেইজন্যেই কাঁদছি। আমার আশ্রয় বোধহয় হারালাম।

ভবানীদি ওকে কাছে টেনে নিয়ে বলে—পাগলামী কোরো না। এতো খুব আনন্দের। গুরুদেব তোমাদের দু’জনের কথা নিশ্চয় বেশি করে ভাবছেন।

গুরুদেবের কক্ষে উঁচুতে একটি মাত্র বাতায়ন, তারই নীচে একটি অতি সাধারণ ভূমিশয্যা। তার পাশে একটি মৃগচর্মের আসন। নিজের গৃহে থাকলে এ আসনে তিনি অধিকাংশ সময়ে যোগাসনে বসে থাকেন। ওখানেই তাঁর চক্ষুদ্বয় নিমীলিত থাকে অধিকাংশ সময়। তবে কথাবার্তা ওখানে বসেই বলেন। এই কক্ষে থাকলে ভূমিশয্যায় নিদ্রা খুবই কমই যান। সবাই জানে তিনি সাধনায় মগ্ন থাকতেই চান ৷ ইচ্ছাও তাই। তবে পিতৃ আদেশে কর্তব্য করছেন। পিতা প্রথম জীবনেই চলে গিয়েছিলেন। শিশুপুত্রের মাকে বলেছিলেন, তাঁর ইচ্ছার কথা। ক্রিয়াশক্তি পিতৃ আজ্ঞা পালন করে চলেছেন। পিতার আশীর্বাদেই গুরুদেব পরমহংসের সাক্ষাৎ মেলে।

গুরুদেব তাই আসনের অদূরে তাদের বসতে বললেন। ওরা প্রতীক্ষা করে। তিনি একটু পরে বলেন—শ্রীমতী, তোমার মধ্যে ঈশ্বর রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা দিয়েছেন। সঠিক ঔষধ নির্বাচন করতে হলে রুগ্ন ব্যক্তিকে বিন্দুমাত্র ঘৃণা করলে চলে না। তার প্রতি মমত্ববোধ থাকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাছাড়া অতি সূক্ষ্ম অনুভূতিও থাকতে হয়। তোমার সব গুণই রয়েছে। আর মঞ্জরীকে ডেকেছি তোমাকে সহায়তা করতে। আমি লক্ষ্য করেছি, তোমাদের দুজনার মধ্যে প্রগাঢ় হৃদ্যতা রয়েছে যা সচরাচর চোখে দেখা যায় না। মঞ্জরী, তুমি হবে সেবিকা। রুগ্ন ব্যক্তি পুরুষ কিংবা নারী যে বয়সেরই হোক না কেন, তাকে সন্তানবৎ ভাবতে হবে। সেবিকার মন হবে সন্ন্যাসিনীর মতো। নিজের রুগ্ন স্বামীকেও সেই চোখে দেখা উচিত। তবে সাধারণ অসুখ-বিসুখের কথা বলছি না। সেখানে পুরুষ পুরুষই, নারী নারীই এবং শিশুরা তো সবসময়েই শিশু। আমি শুধু গুরুতর অসুখ কিংবা আপাত দৃষ্টিতে মৃত্যুপথগামী ব্যক্তিদের কথা বলছি।

মঞ্জরী বলে ওঠে—গুরুদেব এ সৌভাগ্য আমার স্বপ্নেরও অতীত ছিল। আমার শিশু ভাইটি অসুস্থ হলে তার শুশ্রূষা আমিই করতাম। মা সেই সময় ছিলেন রুগ্ন। তাঁর সেবাও আমি করতাম। প্রাণ ঢেলে করতাম।

-খুব ভালো হয়েছে তাহলে।

–কিন্তু আমরা যে দেবদাসী।

—হ্যাঁ, দেবদাসী বটে। দেখি কি করতে পারি। তোমরা দুজনে পরশুদিন আমার সঙ্গে যাবে প্রত্যুষে। কাল আমি একবার রাজসভায় যাব।

ওরা দুজনা নিজেদের ঘরে চলে আসে। কিন্তু মনে উত্তেজনা থাকলেও অনেক কথা বলার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে।

পরদিন নৃত্যগীত শিক্ষাকালে, তারা দু’জনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে একটা নীরবতা বিরাজ করে। সবার দৃষ্টি তাদের দু’জনার দিকে নিবদ্ধ।

মঞ্জরী বলে—কি হল তোদের। আমরা দুজনা কি অস্পৃশ্য? অবলা দি, তুমিও ওদের দলে?

অবলা বলে–কেউ কারও দলে নয়। দেবদাসীদের আবার দল। তাদের জাতও নেই। ব্রাহ্মণ হোস্ কিংবা যা-ই হোস, তোরা দেবদাসী।

মঞ্জরী বলে—ঠিকই তো।

মাধবী বলে—তবু একটা পার্থক্য তো রয়েইছে। তোরা গুরুদেবের সঙ্গে ঘুরিস, তিনি তোদের ডেকে পাঠান।

—হ্যাঁ। কালও আমরা তাঁর সঙ্গে যাব।

দয়াবতী বলে—তবে? এ তো সঙ্গীত নয় যে আমার খাতির বেশি। আমার এতে আনন্দই হচ্ছে। বিগ্রহের দিকে চাইলে যেমন আনন্দ হয় তেমনি।

-সংগীত নয়, এটা চিকিৎসা আর সেবা। দেবদাসীর কখনো কখনো রুগ্নব্যক্তির সেবাদাসী হতে হলে দয়াবতীর যেমন আনন্দ হয়-

দয়াবতী নিমেষে মঞ্জরীর পাশে উঠে গিয়ে, তাকে জড়িয়ে ধরে বলে—প্রাণের কথা বলেছিস। এর চেয়ে ভালো কিছু আছে নাকি? আমাদের শুধু গোপনীয়তা ভালো লাগছিল না। এবারে তোদের জন্যে গর্ব হচ্ছে।

সেই সময় গুরুদেব সেখানে উপস্থিত হন। ওরা নিমেষে চুপ করে যায়। গুরুদেব বলেন—আমি রাজসভায় যাচ্ছি, তোমরা দয়াবতীর কথামতো চলবে। ভবানীও তোমাদের অনেক সাহায্য করবে।

ওরা বুঝতে পারে না, গুরুদেব এসব কথা বলছেন কেন। তিনি কি কোনো কারণে বিচলিত? তাঁর মতো সংযমী পুরুষ কখনো বিচলিত হতে পারেন না। হয়তো অন্য কোনো চিন্তা করছেন।

রাজসভায় যাওয়ার সময় গুরুদেব বলেন—আমি এই সভাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাবি। তোমরা জান না, বিজয়নগর সাম্রাজ্য কত বড়, এমনকি এই নগরীও কত বিশাল এবং বৈচিত্রপূর্ণ তোমাদের সেই ধারণা নেই। কারণ তোমরা অন্য কোনো নগর দেখনি। যে সব বিদেশি এখানে আসে তারা নিশ্চয় বুঝতে পারে।

.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *