এক
ছয়ই ডিসেম্বর পৃথ্বীরাজের দিদি তিতিলের জন্মদিন, আগের দিন বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। পৃথ্বীরাজের মনে তাই ছুটির মেজাজ, বন্ধুদের সঙ্গে খেলে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেই দেখে, খুব হৈচৈ হচ্ছে। গাড়ি বারান্দায় পরিচিত বিলেতি সাইকেলটি দাঁড় করানো। অর্থাৎ ফাদার হেভিলিংক অলরেডি এসে গেছেন। খুব ছোটবেলা থেকেই ফাদার তিতিলকে দেখছেন। বলতে গেলে চোখের সামনেইতো বড় হয়ে উঠলো তিতিল। প্রতিবছরের মত এবারও এসেছেন, জন্মদিনে তিতিলকে আশীর্বাদ জানাতে।
ফাদার হেভিলিংক ডাব্ লিনের লোক। অনেক বছর আগে মিশনারী হিসেবে এসে বাংলাদেশকে ভালবেসে ফেলেছেন। উনি আবার পৃথ্বীরাজ-তিতিলদের স্কুলে ইতিহাস পড়ান।
বসবার ঘরে ঢুকেই পৃথ্বীরাজ দেখলো, মার মুখ গম্ভীর। এতক্ষণ নিশ্চয়ই তাহ’লে ওর পুণে-মহাবালেশ্বর বেড়াতে যাওয়া নিয়েই কথাবার্তা চলছিল। কাল বাদে পরশু আটই ডিসেম্বর পৃথ্বীরাজ অন্য ছাত্রদের সঙ্গে যাবে এক্সকারসনে। ত্রিশজন ছাত্র, তিনজন শিক্ষক, ফাদার হেভিলিংক হবেন দলপতি। মার ঘোরতর আপত্তি, দিদি তিতিলও নারাজ, শুধু বাবার আগ্রহেই পৃথ্বীরাজ এবার বম্বে- পুণে-মহাবালেশ্বর বেড়াতে যেতে পারছে।
ঘরে ঢুকতেই ফাদার বললেন : হ্যালো পৃথ্বীরাজ, আর ইউ রেডি ফর দ্য জার্নি?
গুড ইভনিং ফাদার। আমি রেডি।
পৃথ্বীরাজের বাবা পাশেই বসেছিলেন, মা তাঁর দিকে কটমট ক’রে একবার তাকিয়ে বাড়ির ভিতর চলে গেলেন।
ছত্রপতি শিবাজীর স্মৃতিতে ভরা পুণে-মহাবালেশ্বরে বেড়াতে যাবে বলে পৃথ্বীরাজের মনে একটা আনন্দের জোয়ার বয়ে চলছিল, অথচ এই বেড়াতে যাওয়া নিয়ে বাড়িতে একটা অশান্তি চলছে বেশ কয়েক দিন ধরে, মা রাণী দেবী ছেলেকে একলা ছাড়তে চাইছেন না। সকালেও একবার বাবা আর মার মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে, ঐ বেড়ানো নিয়ে।
ছেলেকে আসকারা দিয়ে নষ্ট করছ। যা চায় তাই করছ। গত বছর আমার কথা না শুনে ছেলেকে নর্থ-লখিমপুর যেতে দিয়ে কি বিপদে পড়েছিলে, তা ভুলে গেছ?
সত্যি সেবার খুব সাংঘাতিক বিপদে পড়েছিল পৃথ্বীরাজ। চোরা শিকারী আর মাক্বনা হাতি অধ্যুষিত জঙ্গলে ওকে বন্দী করে রেখেছিল বহুদিন চোরা শিকারীরা।
সেকথা মনে পড়ায়, একটু চুপ করে থেকে, পৃথ্বীরাজের বাবা বলেন : এবার একলা মোটেই যাচ্ছেনা। ফাদার হেভিলিংক সঙ্গে আছেন। চৌদ্দ বছরের ছেলেকে আঁচলের আড়ালে রাখলে, ও একটা কাওয়ার্ড ছাড়া আর কিছু হবে না ভবিষ্যতে।
কিন্তু পুণে-মহাবালেশ্বর বাড়ির কাছে নয়। ছেলেটার আপদ বিপদ শরীর খারাপও তো হ’তে পারে! বাণী দেবী আঁচলে চোখ মোছেন।
তেমন দরকার হ’লে তোমার বড়দা তো আই. আই. টি. পাওয়াই- এ আছেন। আর শরীর খারাপ ত কলকাতাতে থাকলেও হতে পারে। তুমি আবার ওকে আর্মি অফিসার বানাতে চাও। আসলে চাও ও একটা কাওয়ার্ড হয়ে থাক। আরও উনত্রিশটা ছেলেও তো যাচ্ছে। তাদের বাড়িতেও কি গৃহযুদ্ধ চলছে?
জিজ্ঞেস ক’রে দেখ গিয়ে কার বাড়ি কি হচ্ছে। তোমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করেনা—বাণী দেবী আবার চোখ মোছেন।
আসলে বাণী দেবীর মনটা নরম। পৃথ্বীরাজের বাবা বলেন মাঝে মাঝে তোদের মায়ের দু’চোখের পিছনে মাইথন আর পাঞ্চেত ড্যাম আছে। মাঝে মাঝেই তার জল উপছে পরে।
একটু পরে বাণী দেবী প্লেটে কিছু কেক, ফল আর সন্দেশ নিয়ে ঘরে এলেন। ফাদারকে বললেন : এটুকু খেয়ে নিন। কেক আপনার ভিতিল বানিয়েছে। প্লেট হাতে নিয়ে ফাদার বললেন : থ্যাংকু ম্যাডাম। থ্যাংকু তিতিল।
তারপর পৃথ্বীরাজের বাবাকে বললেন : মহাবালেশ্বর খুব সুন্দর জায়গা। চারিদিকে শিবাজীর অনেক ফোর্ট ছড়িয়ে আছে। ছেলেরা ট্রেকিং করবে, খুব এনজয় করবে।
বাণী দেবীকে বললেন : ম্যাডাম, আপনি শুধু শুধু ভাবছেন। ত্রিশজন ছেলেকে নিয়ে আমরা তিনজন টীচার যাচ্ছি। ভয়ের কিছু নেই।
ঠিক তখনই কলকল হাসি ছড়িয়ে তিন চারটে মেয়ে বসবার ঘরে এলো। ওরা সবাই তিতিলের বন্ধু। ফাদার সবাইকে চেনেন। ফাদার কে দেখে সবাই ঝংকার দিয়ে উঠলো :
গুড ইভনিং ফাদার।
গুড ইভনিং মেয়েরা। এসো, এসো, বসো। আজ তোমাদের একটা গল্প বলবো। ফাদারের চারদিকে চেয়ার টেনে সবাই বসলো।
পৃথ্বীরাজ এবার কোথায় বেড়াতে যাচ্ছে জানো? আমার সঙ্গে ওয়েষ্টার্নঘাট পর্বত দেখতে যাবে পরশু দিন! তিতিলের বন্ধু সুমি বলল : ফাদার ওয়েষ্টার্নঘাট পর্বত একজ্যাক্টূলি কোথায়? ফাদার বলেন : ভারতের পূর্ব উপকূলকে বলে করমণ্ডল উপকূল, ঠিক তেমনি ভারতবর্ষের পশ্চিম উপকূল আছে আরব সাগর তীরে। তার দু’টো অংশের দুই নাম। কঙ্কন উপকূল আর মালাবার উপকূল। তবে সব দিক থেকে পশ্চিম আর পূর্ব উপকূল আলাদা রকমের। পশ্চিম উপকূল বরাবর ওয়েষ্টার্নঘাট পর্বত মালা চলে গেছে মহারাষ্ট্র থেকে কেরালা পর্যন্ত। ওয়েষ্টার্নঘাট পর্বত মালাকে পশ্চিম ঘাট পর্বতমালাও বলে। অনেকে বলে সহ্যাদ্রি হিল রেঞ্জ।
পৃথ্বীরাজ বলল :
দাঁড়াও ফাদার, এটলাসটা নিয়ে আসি, বলেই সে পড়ার ঘরের দিকে চলে গেল।
মানচিত্র এনে মহারাষ্ট্রের ম্যাপ বের ক’রে পৃথ্বীরাজ টেবিলের উপর রাখলো, সবাই ঝুঁকে দেখতে লাগলো। ফাদার তার ধবধবে সাদা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন :
এই দেখ কঙ্কন উপকূলকে ডেকান্ প্লেটো অর্থাৎ তোমাদের দাক্ষিণাত্যের মালভূমি থেকে আলাদা করে রেখেছে ওয়েষ্টার্ন ঘাট বা সহ্যাদ্রি হিলরেঞ্জ। সহ্যাদ্রি হিলরেঞ্জ নীচু হতে হতে দাক্ষ্যিণাত্যের মালভূমির সঙ্গে মিশেছে। এই অঞ্চলে পুণে থেকে বেলগাঁও পর্যন্ত এলাকায় মহারাজ! শিবাজী মারাঠা রাজ্য স্থাপন করেছিলেন।
পৃথ্বীরাজ বলল : ফাদার, পড়েছি শিবনরী দুর্গে শিবাজী জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আরও কত সব নাম করা দুর্গ আছে সেখানে। নামগুলো শুনলে ভীষণ একসাইটমেন্ট হয়।
ফাদার বললেন: হ্যাঁ, সেকথা সত্যি। কত বিখ্যাত ফোর্ট— তোর্ণা, পুরন্দর, প্রতাপগড়, রায়গড়, পাণ্ডবগড়, লোহাগড়, বিশালগড়, পানহালা আর সাতারা ফোর্ট। আমাদের দেশেও এত ক্যাসেল, এত কাছাকাছি নেই।
ফাদার, আমাদের কি ঐসব দুর্গ দেখাবে?
হ্যাঁ, হ্যাঁ! সব দুর্গ যেন দখল করতে চলেছেন – তিতিল ঠাট্টা করে। ফাদার বললেন : না না, দুটো দুর্গ শুধু তোমাদের দেখাব, পুরন্দর আর প্রতাপগড় ফোর্ট।
ফাদার হেভিলিংক চলে গেলেন। পৃথ্বীরাজ মাকে বলে : তুমি এত ভাবছ কেন মা? আমি খুব ভালো ছেলে হয়ে থাকবো। রোজ রোজ তোমায় চিঠি লিখবো।
দুই
পৃথ্বীরাজের মনে অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল রাজধানী অথবা গীতাঞ্জলী এক্সপ্রেস চড়ে কোথাও বেড়াতে যায়। বড় মামা আই. আই. টি. বম্বের অধ্যাপক। অনেকবার সেখানে যাব যাব করেও যাওয়া হয়নি। এবারও গীতাঞ্জলী এক্সপ্রেসে বম্বে এসে মামাবাড়ী যাওয়া হলো না। ওরা পুণেতে চলে এলো। ডেকান্ কুইন্ ট্রেণে চড়ে, অনেক টানেলের মধ্য দিয়ে সহ্যাদ্রি পর্বতমালা পার হয়ে ওরা পুণে এলো। খাড়াক্ ভাসলার ডিফেন্স একাডেমি আর পুরন্দর ফোর্ট দেখে পৃথ্বীরাজ পথের কষ্ট ভুলে গেল। তার চেয়ে কিছু বেশী বয়সী ছেলেরা খাড়াক্ ভাসলায় ট্রেনিং নিচ্ছে। ভবিষ্যতে ওরা ভারতের সেনাপতি হবে।
পুরন্দর ফোর্টে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে মনে পড়ছিল শিবাজীর কথা। এক সময় ছত্রপতি শিবাজী এখানে চলে ফিরে বেড়াতেন।
.
পুণে থেকে মহাবালেশ্বর একশ বাইশ কিলোমিটার দূরে। প্রথমে প্রায় আশি কিলোমিটার দক্ষিণে যেতে হবে সাতারা-কোলাপুরের পথ ধরে। তারপর ডানদিকে ঘুরে, কঙ্কন উপকূলের দিকে, পশ্চিমে আরও চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার গেলেই মহাবালেশ্বর।
সহ্যাদ্রি হিলরেঞ্জের উঁচু নীচু পথ বেয়ে মহাবালেশ্বর যেতে পথে পড়ে দুটো বিখ্যাত হিল স্টেশন— ‘পাঞ্চগণি’ আর ‘ওয়াই’। পাঁচটি পাহাড়ের উপরে বলে পাঞ্চগণি নাম। আর ওয়াই শহরের পাশ দিয়ে কৃষ্ণানদী যাত্রা শুরু করেছে। সমগ্র দাক্ষিণাত্য পার হয়ে বঙ্গো- পসাগরে মিশেছে। শিবাজীর সঙ্গে যুদ্ধে যাবার আগে, বিখ্যাত সেনাপতি আফজাল খাঁ শেষ যুদ্ধ ঘাটি স্থাপন করেছিলেন এই ওয়াই শহরে।
মহাবালেশ্বরের চারদিকে দশ বারো কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় বারোটি দেখবার মত জায়গা আছে। ঐ জায়গাগুলোকে বলে ‘পয়েন্ট। পয়েন্টগুলো আশপাশের পাহাড়ের চুড়ায় অথবা গভীর খাদের উপরে, বা এক কোণায় পাহাড়ের গায়ে। ঐ সব পয়েন্ট থেকে চারদিকের দৃশ্য মানুষের চোখকে মুগ্ধ করে। মহাবালেশ্বরের কাছা- কাছি পয়েন্টগুলো চার থেকে পাঁচ হাজার ফুট উচুতে অবস্থিত। ঐ সব পয়েন্টগুলো থেকে কৃষ্ণানদী আর কয়না নদীর জঙ্গলে ভরা উপত্যকা দেখা যায়। পাহাড়ের গায়ে গায়ে থোক্ থোক্ জঙ্গল লেপটে আছে। গভীর দুর্গম সে জঙ্গল। গাছগুলি কোন কারণে যেন বেশী উঁচু নয়। ডালপালা ছড়িয়ে নিবিড় অরণ্য গড়ে তুলেছে। সেই জঙ্গলে চলাফেরা করতে পারে শুধু অরণ্যবাসীরা, ছোট ছোট জীবজন্তু; আর শংখচূড় সাপ। বিরাট চেহারার কাঁকড়া- বিছের রাজত্বও সেই পাহাড়ী জঙ্গলে।
কৃষ্ণা আর কয়না নদীর উপত্যকার অপূর্ব বন্য সৌন্দর্য দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার টুরিস্ট আসে মহাবালেশ্বরে। একত্রিশটা হোটেল, তিনটে হলিডে হোম আর ছ’টো হলিডে ক্যাম্প ছাড়াও অনেক প্রাইভেট হোটেল-রেস্টুরেন্ট আছে সেখানে। ফাদার হেভিলিংক দুজন শিক্ষক আর ত্রিশজন স্টুডেন্ট নিয়ে এসেছেন। সরকারী হলিডে ক্যাম্পে উঠেছেন।
ভোরবেলা পুণে থেকে রওনা হয়ে দুপুরের আগেই ওরা মহাবালেশ্বর এসেছে। ওদের হলিডে ক্যাম্পের ইনচার্জ মিঃ শ্যাম- গোবিন্দ পান্ছে। ক্যাম্পের মুখেই মিঃ পান্ছে ওদের সম্বর্ধনা জানাল : গুড মর্নিং ফাদার, আশা করি আপনাদের আসতে কোন কষ্ট হয় নি।
গুড মর্নিং, না কোন কষ্ট হয় নি। তবে স্টুডেন্টরা ট্যায়ার্ড। পুরন্দর ফোর্টে কাল ওদের অনেক হাঁটিয়েছি। আজ আরাম করবে সবাই।
বেশ তো। ওরা কখন লাঞ্চ খাবে বলে দিন। আমার লোকেরা সব রেডী করে দেবে।
ওদের হলিডে ক্যাম্প থেকে ‘ভীন্না’ লেক দেখা যায়, আরও দূরে দেখা যায় ‘লিঙ্গমালা’ জলপ্রপাত। ভীন্না লেক মহাবালেশ্বরের এক অপূর্ব আকর্ষণ। লেকের চারদিকে পার দেখা যায় না। গভীর জঙ্গল লেকের জলের উপর যেন ঝুঁকে পড়েছে। ছোট ছোট বোট নিয়ে টুরিস্টরা লেকের জলে ভাসছে।
পাহাড়ী হাওয়া আর ভীন্না লেকের হাওয়ায় শরীর যেন জুড়িয়ে গেল। জিনিসপত্র গুছিয়ে ওরা স্নান সেরে, খাবার খেয়ে নিল। তারপর বিশ্রাম। ফাদার লাঞ্চের পর চার্চে চলে গেছেন।
তিন
তখন বেলা প্রায় তিনটে বাজে কি বাজেনি, মিঃ পান্ছে এসে বললেন : তোমরা বিকেলে কি বেরুবে না একদম? ফাদার ফিরে আসুক, তারপর বলব। তখনই ফাদার ফিরে এলেন। কি করছো তোমরা ইয়ং ফ্রেণ্ডস?
ফাদার, মিঃ পানছে জিজ্ঞেস করছেন, আমরা আজ বিকেলে বেরুবো কিনা…বলল টুটুল।
নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, তোমরা যদি ফিট্ থাক তবে নিশ্চয়ই বেরুবে। আমার মত বুড়ো মানুষেরই ঘরে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না। আমরা খুব ফিট্ আছি ফাদার… বলল বিক্রম। মিঃ পান্ছে বললেন :
তবে বম্বে পয়েন্টে গিয়ে আজ সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখবে চলো। এখান থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে। সেখানে দাড়িয়ে সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। দেখবে কত টুরিস্ট সেখানে হাজির হয়েছে।
সহ-দলপতি প্রিয়বাবু ভূগোলের শিক্ষক, তিনি বললেন : চার-পাঁচ কিলোমিটার পথ কিছু নয়। কিন্তু মিঃ পান্ছে, বলুন তো চড়াই কেমন হবে? খুব চড়াই পথ নয়তো?
প্রিয়বাবুর ভারিক্কি চেহারা, ভুরিটা বেশ এগিয়ে আছে। ছেলেরা বলে, প্রিয় স্যারের ভূরি আগে আগে চ’লে, ওকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। মিঃ পান্ছে বললেন : বম্বে পয়েন্টের পথ এমন কিছু খাড়াই নয়। ফাদার তখনই সম্মতি দিলেন।
দলে দলে ট্যুরিস্ট চলেছে বম্বে পয়েন্টে। বম্বে পয়েন্ট এমন একটি জায়গা, যেখান থেকে পশ্চিম দিকের বহু পাহাড় দেখা যায়। নীচে চাপ চাপ জঙ্গল উপত্যকায় গালিচার মত ছড়িয়ে আছে। ওরা সেখানে যেতেই সূর্যের তেজ কমে এলো। পশ্চিম আকাশে ধূসর পাহাড়ের মাথায় সোনার থালার মত নিস্তেজ সূর্যটা যেন ঝুলে রয়েছে। সূর্য যত নীচে নামছে, পাহাড়ে পাহাড়ে তখন রং-এর খেলা চলেছে। অবাক বিস্ময়ে সবাই সেই সূর্যাস্ত দেখছিল।
ক্লাস টেনের ছাত্র পল্লব সেন তন্ময় হ’য়ে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে কখন যে এক কিনারে চলে গিয়েছিল টের পায় নি। আর একটু সরে এলেই উত্তর দিকের খাদে পড়ে যাবে সে। হঠাৎ পৃথ্বীরাজ পল্লবকে ঐ অবস্থায় দেখে, চেঁচিয়ে ওকে সরিয়ে আনতে গিয়েই পা ফসকালো। সেখানে কোন গাছপালা কিছু নেই, কিছুই সে ধরতে পারলো না। আকুল দু’টি হাত দিয়ে পাথর ধরতে চেষ্টা করলো, কিন্তু সে পাথরও তার ভার সইতে পারলো না।
প্রথমে একখণ্ড পাথর; আর তার সঙ্গে সঙ্গে পৃথ্বীরাজ চীৎকার করে উঠেই গভীর খাদে, নীচে অদৃশ্য হয়ে গেল! সন্ধ্যার সেই অল্প আলোতে কেউ নীচের কিছু দেখতেই পেল না, কোথায় পৃথ্বীরাজ তলিয়ে গেল নিমেষে।
হৈ-চৈ চেঁচামেচির মধ্যে কেউ কেউ নীচে নামতে চেষ্টা করল। কিন্তু সাহস করে নীচে নামার কোন পথই পেল না। মিঃ পান্ছে এক মুহূর্ত সেখানে অপেক্ষা না করে, চলে গেলেন থানায়।
অনেক লোকজন, আলো, অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে, জঙ্গল কাটা দা’ নিয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকের জঙ্গল যতদূর সম্ভব খুঁজে দেখলো। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হ’ল। পৃথ্বীরাজের কোন সন্ধান পাওয়া গেলনা।
ফাদার হেভিলিংক, অন্য দুজন শিক্ষক আর দলের অন্যরা সেই রাত্রে কেউ ঘুমুতে পারল না। পৃথ্বীরাজের দু’একজন বন্ধু রাত ভোর কাদলো। আকস্মিক ঐ দুর্ঘটনা তাঁদের সবাইকে বিমূঢ় করে ফেলেছে। থানার দারোগা মিঃ ভালেরাও বার বার ছাত্রদের সান্ত্বনা দিলেও কোন ফল হলো না।
চার
পরদিন খুব ভোরে ফাঁদার সবাইকে নিয়ে থানায় এসে দেখেন, দারোগা মিঃ ভালেরাও একটা ছোটখাটো অভিযানে বের হচ্ছেন। ত্রিশ চল্লিশ জন পাহাড়ী জোয়ান লাঠি, জঙ্গল কাটা বড় দায় নিয়ে তৈরী হয়েছে। ফাদারও দলবল নিয়ে ওদের সঙ্গে চললেন।
যেখান থেকে পৃথ্বীরাজ পড়ে গিয়েছিল, তার ঠিক নীচে চাপ চাপ ঘন সন্নিবিষ্ট জঙ্গল। তারও নীচে উঁচু-নীচু পাহাড়ের গা। সারাটা সকাল খুঁজে বাইনোকুলারের একটা ভাঙা অংশ ও ভাঙা কিছু ডালপালা ছাড়া আর কোন চিহ্ন পাওয়া গেল না। বাইনোকুলারের ভাঙা অংশ হাতে নিয়ে ফাদার বললেন : ও লর্ড। এই বাইনো- কুলারটাতো আমিই পৃথ্বীরাজকে ওর গত জন্মদিনে প্রেজেন্ট করেছিলাম। সে কথা শুনে সবাই দুঃখে ভেঙে পড়ল।
.
যেখানে বাইনোকুলারের টুকরো পড়ে ছিল, সেখান থেকে একটা পায়ে চলা পথ নীচে চলে গেছে। মানুষের চলার পথ নয়। কোন বন্যজন্তু বা শেয়ালদের চলার পথ হয়তো। সে পথ ধরে ছদিকের জঙ্গলের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গায় ফাদার দলবল নিয়ে এলেন। তার পাশ দিয়ে একটা প্রচলিত পায়ে চলা পথ ছদিকের জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেছে। মধ্যিখানে একটা ছোট পাহাড়ী জলস্রোত পাঁক খেতে গিয়ে ছোট একটা ডোবার মত জলাশয় সৃষ্টি করে, আবার নীচে চলে গেছে। কিন্তু কোথাও পৃথ্বীরাজকে পাওয়া গেল না। তার আর কোন চিহ্নও কোথাও দেখা গেল না।
.
সেদিন দুপুরেও একদল অনুসন্ধানকারী তন্ন তন্ন করে সমগ্র এলাকাটা খুঁজেও আর কিছু পেল না। ঐ দলে সাতারা জেলার কালেক্টর আর পুলিশ সুপার মিঃ ভোসলেও ছিলেন।
সন্ধ্যাবেলা কালেক্টর আর পুলিশ সুপার হলিডে ক্যাম্পে এসে দেখেন, ছাত্ররা তাদের জিনিসপত্র বাঁধা-ছাঁদা করছে। ওরা পরদিন ভোরে কলকাতা ফিরে যাবে। সারা হলিডে ক্যাম্পে বিষণ্ণতা। ফাদার হেভিলিংক চোখের জল মুছে বুকে ক্রশ, এঁকে বললেন :
মিঃ ভোসলে আমি মনে কোন মিথ্যা আশা রাখছি না। আমি কী করে পৃথ্বীরাজের বাবা-মাকে ফেস্ করবো, ওহ, লর্ড।
ফাদার, এরকম ঘটনা আগে এখানে ঘটেনি। তবু আমি বলতে পারি নিরাশ হবার মত এমন কিছু কারণ নেই। মনে হয় আর দু’ এক দিন আপনারা থেকে গেলে ভাল হত। ব্যাপারটা আমার কাছে রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে।— মিঃ ভোসলে বললেন।
ইম্পসিবল। ছেলেদের মুখের দিকে আমি তাকাতে পারছি না। ওরা যা বুঝবার বুঝে নিয়েছে। আর এখানে থাকতে চাইছে না। কেউ ভালমত খাওয়া দাওয়া করছে না।
কখন যাবেন কাল?
খুব ভোরে। সন্ধ্যায় বম্বে পৌঁছতে চাই।
সাতারার জেলা কালেক্টর ফাদারকে বললেন :
দেখুন ফাদার, ছেলেটির আহত বা নিহত দেহ আমরা পাই নি। এই এলাকায় নরখাদক জন্তু জঙ্গলে নেই। আর সে জন্যই ছেলেটির কোন চিহ্ন না পেয়ে আমরা সমস্যায় পড়েছি। যত রহস্যময়ই ঘটনাটা হোক না কেন, ছেলেটি যে মারা গেছে একথা আমরা বলতে পারছি না।
পুলিশ সুপার বললেন আর সে অন্য কোন খবরও ছেলেটির নেকস্ট অফ কিন’-এর কাছে পাঠাতে পারছি না। কিছুক্ষণ থেকে, বিদায় জানিয়ে ওরা দুজনে হলিডে ক্যাম্প থেকে চলে গেলেন।
.
মহাবালেশ্বরে দু’টো বিখ্যাত মন্দির আছে। মহাবালেশ্বর মন্দির আর অতিবালেশ্বর মন্দির। সেখানে পাথরে খোদাই করা বিরাট এক গরুর মুখ আছে। প্রবাদ আছে ঐ গরুর মুখই দাক্ষিণাত্যের পাঁচটি বড় নদীর উৎস। স্থানীয় অধিবাসীরা ঐ দুটো মন্দিরে পালায়-পার্বণে দূর দূর গ্রাম থেকে পুজো দিতে যায়।
পৃথ্বীরাজ যেদিন দুর্ঘটনায় পড়ল, সেদিন গোরেগাঁও এলাকার ‘মাওলী’রা মন্দিরে পূজা দিয়ে জঙ্গলের সংক্ষিপ্ত পথে ফিরছিল। গোরেগাঁও প্রতাপগড় দুর্গের কাছে, উত্তর দিকের একটি মাওলী অধিবাসীদের গ্রাম। এমনিতে মহাবালেশ্বর থেকে প্রতাপগড় দুর্গ সড়ক পথে প্রায় চব্বিশ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু পাহাড়ী জঙ্গলের পথে খুব বেশী হলে দশ-বারো কিলোমিটার হবে।
.
সেদিন মাওলীরা সন্ধ্যার সময় যখন ছদিকের পাহাড়ের উপত্যকার পথ ধরে যাচ্ছিল তখন ছোট একটা জলাশয়ের কাছে একটি ছেলেকে উবু হয়ে পড়ে থাকতে দেখে। সেখানে এসে হয়ত ছেলেটি জল খেতে চেয়েছিল। ছেলেটির জামা প্যান্ট ছিঁড়ে গেছে। কাঁটা ছেড়া হাতে পায়ে রক্ত ঝরছে অল্প অল্প। মাওলীদের দলে পুরুষ ও মেয়ে মানুষে মিলে অনেকে ছিল। ওরা ছেলেটির চারপাশে ঘিরে দাড়াল। একটা পাহাড়ী কাঁকড়া বিছে হুল তুলে ছেলেটির দিকে যেতেই একজন মাওলী পাথর দিয়ে ওর মাথাটা থেতলে দিল। তখন উপত্যকার মাথায় স্লেট রং-এর আকাশ অন্ধকার হয়ে আসছিল। একজন জলের ছিটা চোখে দিয়ে ছেলেটির জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে চাইছিল। বেশ কয়েকবার ঠাণ্ডা জলের ঝাপটা লাগায় পৃথ্বীরাজ অতি কষ্টে চোখ মেলে চাইল। চারদিকে চেয়ে বুঝতে পারল না, সে কোথায়! বা’ হাতে ভাঙা বাইনোকুলারটা ধরাই রয়েছে। তার সামনে অপরিচিত একদল লোক দাঁড়িয়ে। তারা দেখতে সাঁওতালীদের মত।
পৃথ্বীরাজ পায়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ডান পা কাছে টেনে আনতে গিয়েই যন্ত্রণায় প্রায় কেঁদে উঠল। ভয়ে ভয়ে সেদিকে চেয়ে রইল। তখন ভাঙা হিন্দীতে একজন মাওলী বলল : ভয় নেই, বিছেটাকে মেরে ফেলেছি।
মাথা থেতলে গেলে কি হবে, প্রায় তিন ইঞ্চি লম্বা হুল ধনুকের মত বেঁকে থর্ থর্ করে কেঁপে উঠছে। খয়েরী রং-এর ভয়ংকর বিষধর পাহাড়ী কাঁকড়া বিছে।
মাওলীদের সর্দার সস্নেহে পৃথ্বীরাজের দেহ হাত দিয়ে তুলে ধরে, ভাঙা হিন্দিতে বলল : তুমি কোথা থেকে এসেছো? এখানে কি করে এলে?
পৃথ্বীরাজ কোন কথা না বলে, ডান হাত মাথার পিছনে বুলিয়ে, সামনে এনে দেখে, হাত রক্তে ভিজে গেছে। রক্ত দেখে আবার পৃথ্বীরাজের মাথা ঘুরে গেল। সর্দারের কোলেই প্রায় অজ্ঞান হয়ে গেল। অপরিচিত ভাষায় চেঁচামেচি করে তারা পৃথ্বীরাজকে কাধে নিয়ে চলল। তখন পৃথ্বীরাজ সম্পূর্ণ অজ্ঞান হয়ে পড়েছে।
.
দু’টো দিন কেটে গেছে। মাওলীরা বনজ ঔষধ দিয়ে পৃথ্বীরাজকে সুস্থ ক’রে তুলেছে। গাছের পাতার ছাউনি দেয়া ঘরের চাল। পাথর কেটে ইটের মত বানিয়ে ঘরের দেওয়াল গাঁথা হয়েছে। নীচু নীচু ঘর, নিকানো উঠোন। গায়ে গায়ে জড়ানো ঘরগুলো মিলেমিশে গোরেগাঁও-এর মাওলী গ্রাম। গোরেগাঁও-এর উত্তরে জঙ্গলে ঢাকা নীচু পাহাড়। আর দক্ষিণে নীচু ঢালু জমি। তারও দক্ষিণে হঠাৎ একটা উঁচু পাহাড় যেন দক্ষিণ দিককে সম্পূর্ণ আড়াল করে রয়েছে। ধারে কাছে এত বড় পাহাড় আর একটাও নেই।
