প্রতাপগড়ের নাঘনখ রহস্য – ১৫

পনেরো

পরের দিন অর্থাৎ অমাবস্যার দিন ডঃ সেন ভোর হবার আগেই পৃথ্বীরাজকে ডেকে তুললেন। তখনও অন্ধকার কাটে নি। ডঃ সেন বললেন,-–নে ওঠ। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। কেড্‌স্ জুতো থাকেতো পরে নিবি। একথা বলে নিজেও জঙ্গলবুটটা পরে নিলেন। পাহাড়ে-পর্বতে যেখানে বরফ পড়ে না, সে সব জায়গায় নরম ‘সোল্’-এর জুতো পরে চলাফেরা করা সহজ। জঙ্গলবুট,স্ আর কেস্ পরে চলা ফেরা করলে শব্দও হয় না। পাহাড়ে চলা ফেরা করতে অবশ্য ছোট ছুরি আর সাদা চকখড়ি লাগেনা। কিন্তু ডঃ সেন তাও নিলেন, বললেন, —চক্‌খড়ি দিয়ে আজ রাত্রের অভিযানের ল্যাণ্ডমার্কগুলো চিহ্নিত করে রাখতে হবে। চল দেরী হয়ে যাচ্ছে।

পৃথ্বীরাজ দেখলো, ছোটমামা তার প্রিয় রিভলবারটাও সঙ্গে নিলেন। তারপর দুজনে চললেন প্রতাপগড় দুর্গের দিকে।

এত ভোরে বেরুবার মুখেও দু’একজন মাওলীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল গ্রামের মধ্যেই। ওরা কারও সঙ্গে কোন কথা না বলে, দুর্গের কাছে পাকা রাস্তায় এলেন। পথটি দুর্গকে প্রায় বের দিয়ে উত্তরদিক থেকে দুর্গের পশ্চিম-দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। দুর্গের সবচেয়ে খাড়া দিকের পথের উপর, ডাক-তার বিভাগের বিশেষ বিশেষ খাম্বার উপর চক্‌ খড়ি নিয়ে ক্রস্ চিহ্ন আঁকা হলো। দুর্গের পাহাড়ের গায়ে কোন গাছপালা নেই। নেড়া পাহাড়, এখানে সেখানে কিছু ঝোপঝাড়। তার মধ্যে প্রধান প্রধান কিছু পাথরের গায়ে সাদা চিহ্ন আঁকা হলো। তারপর দুর্গকে বায়ে রেখে ওরা গোটা পাহাড়টা প্রদক্ষিণ করে প্রবেশ পথে এলেন। পাহাড়ী এলাকায় শেষ রাত্রে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে। তবু দুজনার কপালে মাথায় ঘাম জমে গেছে।

দূরে কনট্রাক্টরের লোকেরা কাজে যাবার জন্য আস্তে আস্তে তৈরী হচ্ছে। তাদের কাছে গিয়ে দু’জনে একটু বিশ্রাম করে নিল। তখন সূর্য কিছুটা উঁচুতে উঠেছে।

ষোল

কিছুক্ষণ পর দুজনে দুর্গে যাবার জন্য পাহাড়ী পথ ধরে উপরে চললো। দুর্গটা পাহাড়টির একদম মাথায়। একটা ঢালু পথ দুর্গের প্রধান ফটক থেকে ঐ পাহাড়ের গা বেয়ে, অর্ধেক বেড় দিয়ে নেমে এসেছে। ওরা সেই পথ ধরে উপরে চললো। অনেকটা উপরে ওঠার পর বিজাপুরের সেনাপতি আফজল খাঁর সমাধি ঠিক পথের বা’দিকে দেখা গেল। সেই ভোর বেলাতেও একটি প্রদীপ জ্বলছে সমাধি বেদীর শিয়রে। একজন লোক সমাধির চারদিকটা পরিষ্কার করছে। তার সঙ্গে কোন কথা না ব’লে ওরা দুর্গের ফটকের দিকে চলে এলো।

দুর্গের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করতে সিড়ি ভেঙে অনেকটা উপরে উঠতে হয়। তারপর দু’জনে ছোট দুর্গটি ঘুরে দেখে, সবচেয়ে উপরে এলো। সেখানে এক প্রশান্ত বেদীর উপর পাথরের বিশাল অশ্বারোহী শিবাজীর মূর্তি। খোলা তলোয়ার হাতে চিরপরিচিত মূর্তিটি যেন সজীব। পৃথ্বীরাজ চারদিকে তাকিয়ে দেখে অবাক হয়ে গেল। দুর্গের চূড়া আশেপাশের সব পাহাড়ের চেয়ে উঁচু। এখানে শিবাজীর মূর্তির পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে চারদিকে বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়। ডঃ সেনও বিস্ময়ে বললেন: কি রকম কম্যানডিং পজিসন দেখছিস্? একটা বাইনোকুলার থাকলে অনেকদূর পর্যন্ত মানুষ, জন্তু জানোয়ারের চলাফেরাও নজরে রাখা যায়।

পৃথ্বীরাজ বললো : মনে হয় যেন ছত্রপতি শিবাজীর মূর্তিটি গোটা সহ্যাদ্রি হিলসের এলাকা দেখে নিচ্ছে, নজর রাখছে। জানো ছোটমামা, বাইনোকুলার আমি নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু সেদিন বম্বে পয়েন্ট, থেকে পড়ে যাওয়ার সময় ভেঙে গেছে।

মূর্তিটির ঠিক পিছনেই অল্প একটু জায়গা। তারপর পাহাড়ের ভয়ংকর খাদ। নীচে পথটাকে মনে হয় সরু কালো ফিতে, কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে ডঃ সেন বললেন :

এই দেখ, এই সেই পাহাড়ের খাদ যেখান দিয়ে ভৌতিক অশ্ব- গুলো চূড়োয় উঠে আসে। কি আজগুবি আর অবিশ্বাস্য ব্যাপার। পাহাড়ী কুসংস্কার। আমরা কিন্তু ঐ নীচেই ডাক-তার বিভাগের কিছু খাম্বায় আর পাথরে চিহ্ন রেখে এসেছি—বুঝতে পারছিস্ তো?

পৃথ্বীরাজেরও তাই মনে হয়েছিল। ডঃ সেন তখন মূর্তির চার- পাশে ঘুরে ঘুরে দুর্গের সামান্য উঁচু প্রাচীর পরীক্ষা করে দেখছিলেন। জনপ্রাণীর কোন সাড়া শব্দ নেই কোথাও। এতো ভোরে কেউ প্রতাপগড় দুর্গের উপরে আসে না। হঠাৎ ডঃ সেন জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে শুরু করলেন। অনেক উচ্চতায় অক্সিজেন কম হ’লে হয়ত ওভাবে নিশ্বাস নিতে হয়। কিন্তু এ পাহাড় সামান্যই উঁচু। পৃথ্বীরাজ বুঝতে পারল না কেন ছোট মামা ও রকম করছেন। কই, তার তো কোন কষ্ট হচ্ছে না শ্বাস নিতে।

পৃথ্বীরাজ দেখল, ছোট মামা জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে প্রাচীরের দিকে এগিয়ে চলেছেন। পৃথ্বীরাজ ছোট মামার কাছে যেতেই তার নাকে পোড়া পোড়া বিশ্রি গন্ধ এলো। পশ্চিম দিকে এক জায়গায় নীচু প্রাচীরটাও ভাঙা। ভাঙা প্রাচীরের কাছে গিয়ে দু’ধাপ নীচে নেমে, একটা বড় পাথরের আড়ালে ডঃ সেন দাড়ালেন। পিছনে এসে পৃথ্বীরাজ দেখে, ছোটমামা পকেট থেকে রিভলবার বের করলেন। তারপর হঠাৎ দুর্বোধ্য মারাঠী ভাষায় চেঁচিয়ে বললেন :

—ভেতরে কে আছ বেরিয়ে এসো।

যখন কেউ দুবার ডাকলেও এলো না তখন ডঃ সেন পাথরটির পাশ দিয়ে একটা গর্তের মুখে এলেন। সেই গর্তের মুখ দিয়ে দেখা গেল, ভিতরে একটা ঘরের মত জায়গা। ছোটমামার সঙ্গে পৃথ্বীরাজও সেই গুহাঘরে ঢুকলো আর সঙ্গে সঙ্গে তীব্র গাঁজা পোড়ার গন্ধে নাক জ্বালা ক’রে উঠলো।

সতেরো

গুহা ঘরের মেঝেটা একটা চাতালের মত, অন্ধকার নয়, উপর থেকে একটা গর্ত দিয়ে প্রভাতের আলো ভিতরে এসেছে। আর ঘরের এক কোণে আধা উলঙ্গ একটা মাঝবয়সী লোক জড়োসড় হয়ে বসে আছে। তার হাতেই গাঁজার কলকে। অল্প ধোয়া বেরুচ্ছে। দশ-বারো মিনিট সেই প্রায় বন্ধ গুহাঘরে গাঁজার ধোয়া টানলে এমনিতেই নেশা হবে।

খোলা রিভলবার হাতে ডঃ সেন তার দিকে এগিয়ে গেলেন। বা’ হাতের লাঠি দিয়ে আস্তে খোঁচা দিয়ে লোকটাকে উঠে দাঁড়াতে বললেন। কিন্তু লোকটি নড়ল না। কোন কথাও বলল না।

তবে কি লোকটা পাগল নাকি! তখন হিন্দীতেও তাকে উঠে আসতে বলা হলো। কিন্তু বোকার মত ফ্যাল্ ফ্যাল্ করে তাকিয়ে রইল লোকটা। ভয় ভাবনা তার যেন কিছুই নেই। ডঃ সেন বললেন :

—পৃথ্বীরাজ, তুই এর দিকে নজর রাখ। বলেই তিনি লাঠি দিয়ে চারদিকের দেওয়াল ঠুকে ঠুকে দেখলেন, কোন সুড়ঙ্গ আছে কিনা কোথাও। কোন দেওয়াল ফাঁপা হলেও কিছু একটা সন্দেহ করা যেতে পারে। তা না হ’লে একে পাগল ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় কি করে? এরপর ডঃ সেন একটা কাণ্ডই করে বসলেন।

—এই নাও, আরও গাঁজা কিনে খেও। বলে একটা পাঁচ টাকার নোট লোকটার কাছে রাখলেন। পৃথ্বীরাজ অবাক হয়ে বলে :

—ছোট মামা তুমি ওকে গাঁজা কিনে খেতে পাঁচটা টাকা দিলে?

—তাইতো দেখলি! এবার বলে দে ওকে গাঁজার দোকানটা কোথায়!

—মহাবালেশ্বর থেকে ছাড়া গাঁজা ও কোথায় পাবে? তুমি কি ঠাট্টা করছ ছোট মামা?

—মহাবালেশ্বরে ও যায় বা যেতে পারে বলে তো মনে হয় না। ওকে কেউ না কেউ কিনে এনে দেয়। কিন্তু সে কে বা কারা, তোর জানতে ইচ্ছে করে না?

—নিশ্চয়ই করে। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। লোকটা পাগল অথবা আপাততঃ পাগল সেজে থাকতে চায়। তাই ওর কাছ থেকে এখন কোন ভয় নেই। তাই দু’জনে ঘরটা ভালমত পরীক্ষা করে দেখলো। কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়ল না। তারপর দু’জনে বাইরে আসার পথে এলো।

প্রভাত সূর্যের আলোতে হঠাৎ কিছু একটা চিক্‌মিক্‌ করে উঠলো গর্তের মুখে। হাতে তুলে নিয়ে ডঃ সেন দেখলেন, সেটা একটা ইরামিক ব্লেড। বুড়ো আঙ্গুলের নখের উপর ‘ধার’ পরীক্ষা করে বুঝলেন, ব্লেডটি বেশী পুরানো নয়। তবে কিছু একটা কেটে কেটে ‘ধারে’র দু’একটা জায়গা ভোতা হয়েছে।

—পৃথ্বীরাজ, দেখতো খুঁজে প্লাসটিক বা তারের কোন কাটা টুকরো পাওয়া যায় কিনা?

কিন্তু নিজেই তিনি পেয়ে গেলেন। লাল-কালো প্লাটিকের কাটা টুকরো। তামার তারের টুকরোও মিললো। ডঃ সেনের মুখে হাসি। বললেন :

—পৃথ্বীরাজ ছত্রপতি শিবাজীর জন্ম কি মাসে? ফেব্রুয়ারী মাসেই তো?

—হঠাৎ একথা জিজ্ঞেস করছ কেন?

—ব্লেড দিয়ে তার কেটে মাইক বা অ্যাপ্লিফায়ার বাজাবার ব্যবস্থা কেউ করেছিল, খুব অল্প দিন আগে। শিবাজীর জন্মদিনে নয়। হয়ত বড়জোর মাসখানেক আগের কাটা এই প্লাসটিক আর তামার তার। গত অমাবস্যা সময়কারও হতে পারে, একটু চুপ থেকে বললেন : ‘চল, বড্ড ক্ষিদে পেয়েছে।

ফেরার পথে নীচে নামতে নামতে ডঃ সেন বললেন : আজ রাত্রে আর ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা যাবে না রে। এই অমবস্যাই হয়ত নিস্তব্দ থাকবে।

—কেন ছোট মামা?

—দেখবি সত্যি কি মিথ্যা বলছি। তবে ঘোড়ার খুরের শব্দ না হ’লেও, দু’এক জনার লাশ পাহাড়ের নীচে পাওয়া যেতে পারে। আমার লাশও হতে পারে। তবে যারই হোক, পেট বাঘ নখ দিয়ে ছেঁড়া থাকবে।

—যদি ঘোড়ার খুরের শব্দই না শোনা যায়, যদি ভৌতিক ঘটনা না ঘটে তবে আজ রাত্রে বেরিয়ে লাভ কি ছোট মামা?

–তোর ভয় করছে নাকি? তবে তোকে বের হ’তে হবে না।

—এটা তুমি কি বলছো? তুমি বের হবে আর আমি শুয়ে ঘুমুবো? তা হয় না। বরং তার চেয়ে কাল ভোরে লোকে দু’টো লাশই খুঁজে পাক। মামা আর ভাগ্নের, পেট থাকবে ফালি ফালি ক’রে ছেড়া কি ব’লো?

—দু’জনেই হো হো করে হেসে উঠলো।

আঠারো

বেলা বাড়তেই হুড়মুড় করেই যেন দারোগা মিঃ ভালেরাও-এর জীপ গোরেগাঁও-এ পৃথ্বীরাজদের ঘরের কাছে এলো। উত্তেজনায় ব্যস্ত হয়ে বললেন :

—পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে ডঃ সেন, আপনাদের গাড়ীটা পাওয়া গেছে। হনুমন্ত রাও-ও সুস্থ হয়ে উঠেছে। তবে মাথায় এখনও কাঁচা ঘা।

—কোথায় ফেলে রেখে গেছে বলুন তো?

—বম্বে-পানার্জী রোডে পোলাপুর আর মাহাদ্-এর মধ্যিখানে।

—গাড়ীটা বম্বে রোডের উপরেই ফেলে রেখে গেছে? না এদিক সেদিকে?

—পোলাদপুর আর মাহাদ-এর মাঝপথ থেকে পশ্চিমে একটা পথ সোজা আরব সাগরের দিকে চলে গেছে। ঐ পথ ‘বানকট্” নামে একটা ছোট বন্দরে শেষ হয়েছে। ঐ পথে, বম্বে-পানার্জী রোড থেকে প্রায় নয়-দশ কিলোমিটার ভিতরে গাড়ী পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এক ফোটা পেট্রল তাতে ছিল না।

—কি বন্দর বললেন? বানক? সেটার নাম তো শুনিনি।

—হ্যাঁ, আপনারা তো স্রেফ বম্বে, মার্মাগাও, পানার্জী, মাঙ্গালোর, কোচিন—এসব বড় বন্দরের নামই জানেন। আরও কত ছোট ছোট বন্দর আরব সাগরের তীরে যে আছে তা জানলে অবাক হয়ে যাবেন। সব এখন চোরাচালানদের রাজত্ব।

—বানকটূ বন্দরও কি কুখ্যাত নাকি?

—বানকটে সাবিত্রী নদীর মোহনায় একটা ফোর্ট আছে। ফোর্ট ভিক্টোরিরা। সেটা মশায় স্মাগলারদের পুরানো আড্ডা। ভাঙা চোরা ফোর্ট। তবে শুনেছি দুই দল স্মাগলারদের ঐ ফোর্ট নিয়ে ঝগড়া হওয়ায়, ওটা এখন কেউ ব্যবহার করে না।

—বলেন কি? দেশের আইনের হাত ততদূর যায় না কি? স্মাগলারদের মর্জির উপর সব চলছে?

—না, তা নয়। বানকট্ হ’লো বম্বে আর রত্নগিরি বন্দরের ঠিক মধ্যিখানে। বম্বের দক্ষিণে আরও তিনটি ছোট ছোট বন্দর, আলিবাগ, জজিরা আর শ্রীবর্দ্ধন—তারপরই বানকট, ঐ গোটা আরব সাগর এলাকা সি-কাস্টমসের, কোস্ট গার্ডদের আওতায়। তাড়া খেয়ে অনেক স্মাগলার লঞ্চ নিয়ে বানকটে আসে। যেহেতু পশ্চিমঘাট পর্বত ঐ দিকে প্রচণ্ড খাড়াই, তাই বানকটে লোক যাতায়াত করে খুব কম। তাই আইন কানুন একটু ঢিলাঢালা তো ওখানে হবেই।

বেশ একটু চুপ ক’রে থেকে ডঃ সেন বললেন : মিঃ ভালেরাও, এখনও কি বুঝতে পারেননি, কারা আমাদের গাড়ী ছিনতাই করেছিল? তারা কোথাকার লোক? মহাবালেশ্বরের স্থানীয় লোক নয়, আর টুরিস্টও নয় নিশ্চয়ই। তারা বানক অঞ্চল থেকে এসেছিল, তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। তেল থাকলে ও গাড়ী বানকটে পেতেন। কিন্তু কেন ওরা এখানে এসেছিল। কেন?

তারপর আবার ডঃ সেন দারোগা মিঃ ভালেরাওকে বললেন :

—কাল একবার সকালের দিকে এখানে আসবেন?

—কেন বলুন তো?

—এখন কিছু বলবো না। অবশ্য সঠিক কিছু এখন জানিও না। শুধু আন্দাজ করছি, কাল এলে অনেক কথা জানতে পারবেন।

—আরে মশায়! আপনি যে শার্লক হোমস্ হয়ে গেলেন! ব্যাপার কি?

—শালক হোমস্ আমি নই। আমি ডঃ অনিল সেন।

—অনিল হোমস্ আর শার্লক্ সেন—যাই হোন না কেন, আপনাদের বলিহারী যাই মশায়। মাঝে মাঝে মনে হয় আপনারা মানুষই নন। দেবতা। ঐ এক রত্তি ছেলে, পাঁচ হাজার ফুট উঁচু পাহাড় থেকে পড়েও বেঁচে আছে। আর আপনিও মহাবালেশ্বরে গোটা পঞ্চাশ হোটেল থাকতেও, পরে আছেন একটা জংলী বস্তিতে। তাও কাল্পনিক রহস্যের গন্ধ পেয়ে। এখন যাই ডঃ সেন, কাল ভোরে না হয় একবার আসবো।

—না হয় নয়, একবার দয়া করে আসবেন। মনে হয় অনেক কিছু আপনাকে জানাতে পারব।

—বেশ তো, আসব! বলে মিঃ ভালেরাও জীপে উঠে চলে গেলেন।

উনিশ

রাত্রে খাবার খেয়ে, তাড়াতাড়ি দু’জনে শুয়ে পড়ল। মনে হবে যেন তাদের খুবই ঘুম পেয়েছে। ডঃ সেন পাশ ফিরে শুয়ে বললেন : তোর কি মনে হয়—ঐ গাঁজাখোর পাগলটা এমনি পাগল, না সাজা পাগল?

পৃথ্বীরাজ বলল : ছোট মামা, প্রথমে সবটা কেমন যেন খাপছাড়া খাপছাড়া লাগতো। কিন্তু মনে হয় এখন পরিষ্কার কিছু বুঝতে পারছি। একটি পাগল একলা নির্জন জায়গায় গাঁজা খায়, মাইকে ভৌতিক শব্দ হয়, আর কয়েক জন লোক তোমাদের আহত করে গাড়ী কেড়ে নিল। এসবের মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে মনে হয়।

তোর কি মনে হয় এরা একই দলের লোক? ডঃ সেন জিজ্ঞেস করেন।

—তা মনে হয়। তবু ঠিক যেন বুঝতে পারছি না।

ডঃ সেন একটু চুপ করে থেকে বললেন : বুঝতে পারবি। আবার এই ঘটনাগুলো ভাবতো? অন্ধকার রাত্রেই শুধু শত শত ঘোড়ার ছুটে আসার শব্দ হয়। কেউ যদি ঐ শব্দ হবার সময় শব্দের কাছে থাকে, তাকে মেরে ফেলা হয়, বাঘ নখ দিয়ে পেট ফালি ফালি করে কাটা থাকে অন্যদের ভয় দেখাবার জন্য। তার অর্থ একটাই হতে পারে, যারা ওখানে যাতায়াত করে। তারা হয়ত কোন গুপ্তধনের সন্ধান দুর্গে পেয়েছে। অনেক প্রাচীন রাজাদের দুর্গেই তা পাওয়া যায়। অথবা ওরা আত্মগোপনকারী কোন খুনী অথবা রাজনৈতিক দলের লোক। অথবা সে কালের বিখ্যাত প্রতাপগড় ফোর্ট এখন আরব সাগরের চোরাচালানদারদের শক্ত ঘাটি।

পৃথ্বীরাজ বলল : ছোটমামা, আমার মনে হয় ওরা স্মাগলার। দারোগাবাবু বলেছিলেন বন্দর বানকট, বম্বে-পানাজী রোড থেকে মাত্র চল্লিশ-পঞ্চাশ কিলোমিটার পশ্চিমে। আর ঐ পথ নির্জন। তোমাদের গাড়ীটাও ও পথেই পেয়েছে পুলিশ।

—আমারও তাই মনে হয়। হয়ত জলদসুদের মত দুর্ধর্ষ চোরা- চালানদারদের কাজকর্মের সঙ্গে আমরা জড়িয়ে পড়েছি। নে, এবার শুয়ে পর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *