প্রতাপগড়ের নাঘনখ রহস্য – ২৫

পঁচিশ

বেলা দশটা নাগাদ পুলিশ সুপার মিঃ ভোসলে গোরেগাঁও এলেন। বিরাট পুলিশ দল একের পর এক লরিতে এলো। – ডঃ সেন তার সহকর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন অনেকক্ষণ। তারপর বললেন :

—মিঃ ভালেরাও ত্রিশজন ফোর্স রিজার্ভ রেখে আর সবাইকে দিয়ে প্রতাপগড় পাহাড়টাকে সম্পূর্ণ ঘিরে ফেলার ব্যবস্থা করুন। একটা কাঠবিড়ালিও যেন চোখের আড়ালে পালাতে না পারে। তারপর ঐ রিজার্ভ ফোর্স নিয়ে আপনি দুর্গের চূড়ায় চলে যান। আই শ্যাল মিট ইউ দেয়ার সার্প এট টুয়েলভ।

তারপর সঙ্গের সহকারী সুপারকে বললেন : মিঃ টেলাং, আপনি টর্চ লাইটগুলো রেডী করুন। মাউন্টেনিয়ারিং-এর সরঞ্জাম রেডী করুন। এক ইউনিট্‌ টিয়ার গ্যাস্ ও বেশ কয়েকটি গ্যাস-মাস্ক থাকবে দুর্গের উপরে।

এ সবই আমি বাই টুয়েলভ দুর্গের উপরে চাই। হ্যাঁ, ভালো কথা! ইন্‌সপেক্টর তুলজাপুরকার, আপনি বাইরের সুড়ঙ্গ মুখে থাকবেন। ওখানে বেশী লোক দাঁড়াবার জায়গা নেই। দশ জন সেপাই থাকবে আপনার সঙ্গে। কোন রাইফেল্ ম্যান দরকার নেই। আটটা স্টেনগান আর ছ’টো টীয়ার গ্যাস থাকবে। অতো ছোট জায়গায় ‘ক্লোজ, কোয়ার্টার ব্যাটল’ আমস অর্থাৎ স্টেন ইজ দি বেস্ট, কি বলেন? আপনার সব লোকের যেন গ্যাস-মাস্ক সঙ্গে থাকে? আমি মাইক্রোফোনে যোগাযোগ রাখব। কি করতে হবে, সে অর্ডারও দেব, যদি সুড়ঙ্গ থেকে কেউ পালাতে চায়, ডু নট ফায়ার— ইফ ইউ কুড এভয়েড,। ওকে?

—ওকে স্যার-

—দেন্ গো এণ্ড টেক্ পজিশন—

সব ব্যবস্থা হয়ে গেলে পুলিশ সুপারকে ডঃ সেন বললেন :

—মিঃ ভোসলে, গত রাত্রে আমাদের উচিত ছিল দুর্গে পাহারার ব্যবস্থা করা। তা হ’লে হয়তো দুটো যুবক মারা যেত না।

—ডঃ সেন, আমার কিন্তু তা মনে হয় না। ওরা প্রতিশোধ নিতে, আতংক ছড়াতে খুন করতই, গতকাল অথবা অন্য কোন দিন। কিন্তু আগন্তকরা কেন এখানে আসে সেটা ভেবেছেন। ওরা কারা জানেন?

—হ্যাঁ! প্রথম ভেবেছিলাম ওরা সাধারণ ডাকাত। তারপর ভাবলাম কোন গুপ্তধনের সন্ধানে ওরা দুর্গে খোঁজাখুজি করছে। সেটা আবার পুরানো দুর্গগুলোতে থাকতেও পারে। কিন্তু গাড়ীটা বানকট্ বন্দরের দিকে নিয়ে যাওয়ায় বুঝতে পেরেছিলাম, ওরা আরব সাগরের তীরে যেতে চায়। স্মাগলার দলের লোক ছাড়া ঐ দুর্গম বন্দরে কে আর যেতে চাইবে?

—ডঃ সেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। গাড়ী উদ্ধারের খবর পেয়ে আমি সী-কাস্টমসের সঙ্গে যোগাযোগ করি, গোয়েন্দা মারফত কিছু মারাত্মক খবরও পেয়েছিলাম। আপনাকে গোপন করার প্রয়োজন নেই। বিখ্যাত ইন্টারন্যাশনাল স্মাগলার গাজী মস্তান এই এলাকায় কোথাও ঘাঁটি করেছে। গাজী মস্তানের গ্যাং এখন তাদের কার্যকলাপ এদিকেই বেশী করছে। কাস্টমস আর নতুন কোস্ট গার্ডদের জলপথে আর আকাশ পথে জোরদার টহলদারীর জন্য গাজী মস্তানের গ্যাং দুবাই-বন্ধে জোন ছেড়ে দিয়েছে। শোনা গেছে দুবাই টু শ্রীবর্ধন, বানক ও রত্নগিরি, ঐ তিনটি বন্দরে ওদের যাতায়াত। তা ছাড়া ডিপ ইনসাইড মেইনল্যাণ্ড ওরা ঘাঁটি করার চেষ্টা করছে।

পৃথ্বীরাজ ঐ সব কথা রুদ্ধশ্বাসে শুনছিল। গাজী মস্তান! ওরে বাবা! সে যে বিরাট নামজাদা স্মাগলার।

ছাব্বিশ

প্রতাপগড় দুর্গের বিশাল পাহাড়টাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছে পুলিশ দিয়ে। প্রাচীনকালে একেই হয়তো অবরোধ বলা হ’তো। জোরালো মাইক্রোফোন হাতে মিঃ ভোসলে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছেন। কখনও কখনও নীচের গুহা মুখের পুলিশ অফিসার মিঃ তুলজাপুরকারকে মাইক্রোফোনে নির্দেশ দিচ্ছেন।

মিঃ ভোসলে প্রাক্তন আর্মি অফিসার। অপারেশনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সব ব্যবস্থা পরখ করে নিতে চান, সব ব্যবস্থা যখন তার মনের মত হ’লো, তখন তিনি পৃথ্বীরাজ ও ডঃ সেনকে গ্যাস্-মাস্ক পড়ে নিতে বললেন।

মিঃ ভোসলে, মিঃ ভালেরাওকে নিয়ে দুর্গের উপরের গুহা ঘরে এলেন। তার পিছনে ডঃ সেন এবং পৃথ্বীরাজ। তাদের পিছনে অনেক পুলিশ। অনেকগুলো শক্তিশালী টর্চ জ্বালিয়ে সুড়ঙ্গের মধ্যে বেশ কয়েক ধাপ ‘ নেমে, মিঃ ভোসলে গর্জন করে উঠলেন। বদ্ধ সুড়ঙ্গে মাইক্রোফোনের সেই আওয়াজ; এবং তার সঙ্গে পুলিশ সুপারের নাটকীয় সেই আদেশ, পাহাড়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কাঁপুনী ধরিয়ে দিল। পৃথ্বীরাজও প্রথমে সেই ভৌতিক গম গম আওয়াজে চমকে উঠেছিল। পুলিশ সুপার মিঃ ভোস্‌লে মাইকে বললেন :

তোমরা যারা সুড়ঙ্গের মধ্যে লুকিয়ে আছ,—বাহার আও, হাতিয়ার ডাল দো, বরণা নতীজা বহুত খারাপ হোগা— আমার কাছে অনেক গ্যাস আছে। আমি সুড়ঙ্গে গ্যাস্ ফায়ার করে বিষাক্ত গ্যাসে ভর্তি করে দেব। যদি বাঁচতে চাও, – হাতিয়ার ডাল দো, বাহার আও। বার বার ঐ আদেশের পরেও কিন্তু কোন সাড়া শব্দ নেই কোথাও। নিঃশব্দ সুড়ঙ্গ যেন মৃত্যুপুরীর মত। পৃথ্বীরাজ ডঃ সেনকে বললো : ছোটমামা তাহলে বোধহয় কেউ ভিতরে নেই।

ঠিক তখনই পর পর টীয়ার গ্যাস সেল ফাটানো হলো, সুড়ঙ্গের অন্ধপথে। মুহূর্তে চোখজ্বালা করা ধোঁয়া উপরে ধেয়ে এলো। আর সেই দুর্যোগের মধ্যে নীচ থেকে অনেক গুলি, বোমার শব্দ কানে এলো। স্টেনগানের ফায়ারের শব্দও এলো। মিঃ তুলাপুরকার কেমন আছেন জানবার জন্য মিঃ ভোসলে দ্রুত গুহাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

সাতাশ

শীতকালের মেঘহীন দুপুরের আকাশ মনে হয় অনেক উপরে উঠে গেছে। নীচে ঝলমলে রোদ প্রতাপগড় দুর্গের সারা গায়ে। নীচে সুড়ঙ্গ-মুখে তখন প্রচণ্ড উত্তেজনা। কাঁদানে গ্যাসের তেজ যখন কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না, তখন সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকা দুর্বত্তরা হঠাৎ সুড়ঙ্গের বাইরে পর পর অনেকগুলো বোমা ফাটায়। সেই আকস্মিক আক্রমণে চার পাঁচ জন পুলিশ আহত হয়। ওরা গুহা মুখে পাহারা দিচ্ছিল। কিন্তু শীঘ্রই মিঃ তুলজাপুরকার সামলে নিলেন। যে সব দুর্বৃত্তরা পাহাড়ের গা বেয়ে পালাতে চেষ্টা করছিল, স্টেন গানের বাস, কায়ার তাদের ঝাঁঝরা করে দিল। তারপর নীচের সুড়ঙ্গ মুখের ভিতরেও পর পর টীয়ার গ্যাস্ ফাটানো হলো।

মিঃ ভোসলে নীচের ওসব ঘটনা কিছু দেখলেন, কিছুটা বুঝে নিলেন। তারপর ডঃ সেন আর পৃথ্বীরাজকে দুর্গের চূড়ায় অপেক্ষা করতে বলে দলবল নিয়ে গুহার মধ্যে গেলেন।

বাছাই চারজন পুলিশ গ্যাস্-মাস্ক পরে, তীব্র ফোকাস লাইট জ্বেলে, স্টেনগান হাতে নিয়ে সুড়ঙ্গে নেমে গেল। মিঃ ভোলে তাদের পরিচালনা করছেন। সুড়ঙ্গের মুখ ছোট, কিন্তু যত নীচে নেমে গেছে, সুড়ঙ্গ বেশী চওড়া হয়েছে। তিন চারজন লোক সোজা হয়ে সিড়ি বেয়ে পাশাপাশি নেমে যেতে পারে। কিছুটা দূরে দূরে এঁকে বেঁকে নেমে গেছে সুড়ঙ্গ। তার প্রতি বাঁকে ছোট ছোট গুহা ঘর অনেক। সেইসব খোলা গুহা ঘরে বেশ বড় বড় কাঠের বাক্স রয়েছে। বিরাট বড় বড় ভালা লাগানো সেগুলোতে।

এসব দেখার সময় নেই তখন মিঃ ভোলের। তিনি সুড়ঙ্গটাকে ‘বম্‌বিং অপারেশন করে, সব দুর্ব ওদের নীচের গুহা মুখের বাইরে বের করে দিতে চান। কারণ, সেখানে জনসাধারণ দর্শক হিসেব উপস্থিত নেই, কিন্তু যদি দুর্গের চূড়া দিয়ে ওরা বেরুতে চায় তবে ‘একাউণ্টারে’ অনেক সাধারণ লোক মারা যাবে। পাহাড় চূড়ায় প্রচুর লোক জমেছে।

মিঃ ভোসলে বার বার সাবধান করে চলেছেন সঙ্গীদের। সুড়ঙ্গের মধ্যে উল্টোপাল্টা গুলি ছুঁড়লে রে-কোসেট্‌ করে নিজের গায়েই লাগতে পারে। অনেকটা নীচে নামার পর একটি বাঁক ঘুরতেই, একজন পুলিশের হাতের টর্চটি গুলি লেগে পড়ে গেল। যতদূর সম্ভব দেওয়ালের গায়ে লেপটে থেকে স্টেনগানের গুলির বন্যা বইয়ে দিল পুলিশরা। তারপর অনেকক্ষণ আর কোন সারাশব্দ নেই।

হঠাৎ নীচের গুহা মুখে প্রচণ্ড বোমা ফাটার আওয়াজ এলো। পরপর অনেক বোমা ফাটিয়ে অবশিষ্ট দুর্বত্তরা সুরঙ্গ থেকে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু এবার মিঃ তুলজাপুরকার ভুল করেন নি। সুড়ঙ্গের মুখ পাহারা দেবার এমন ব্যবস্থা করেছেন যে একটি কাঠবিড়ালীও গুলি না খেয়ে পালাতে পারবেনা।

হলোও ঠিক তাই। প্রচণ্ড বোমাবাজি করে, সেই ধোঁয়ার আড়াল নিয়ে দুর্বত্তরা পালাতে চেয়েছিল। কারণ উপর থেকে স্টেনগানের গুলির হিসহিসানী ক্রমশঃ কাছে আসছিল। মিঃ ভোস্‌লের পুলিশ দল, প্রতিটি বাঁকে নেমে আসার আগে প্রচণ্ড গুলি চালাতে চালাতে আসছিলেন। যাকে বলে চিরুনি অভিযান অর্থাৎ রিয়াল কম্‌বিং অপারেশন।

আঠাশ

প্রথমে ছজন লোক বেড়িয়ে আসতেই মিঃ তুলজাপুরকারের লোকেরা দুজনকেই বুলেটে ঝাঁঝরা করে দিল। ছদিক থেকে বাধা পেয়ে, পালাবার পথ নাই দেখে, দুর্বৃত্তরা গুহার মুখের বাইরে তাদের রাইফেল, রিভলবার ছুড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে চীৎকার করে বললেন :

—হাম লোক হাতিয়ার ডাল দিয়া, গোলী মাত চালাও—

মাথার উপর হাত তুলে একে একে আটজন দুর্বৃত্ত সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে এলো। আর তাদের পিছনে পিছনে উদ্ধত হস্তে স্টেনগান নিয়ে একে একে মিঃ ভোসলে ও অন্য পুলিশরা বেরিয়ে এলো। মিঃ তুলজাপুরকারের লোকেরা আটজনকে বন্দী করে নিয়ে গেল। তারপর এখানে সেখানে পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো পাহাড়ের নীচে নিয়ে যেতে বলে, মিঃ ভোসলে আবার সুড়ঙ্গ পথে অনেক লোকজন নিয়ে দুর্গে ফিরে চললেন।

বেলা প্রায় তিনটের সময় দুর্গের চূড়ায় প্রচণ্ড ভীড় জমে গেছে। সুড়ঙ্গের মধ্য থেকে একে একে সাতটা ছোট সিন্দুক, ছত্রপতি শিবাজীর মূর্তির পাদদেশে এনে রাখা হ’লো। পৃথ্বীরাজ তখনও কাঁদানে গ্যাসের জন্য কেঁদে যাচ্ছে। রুমাল ভিজিয়ে ডঃ সেনও চোখ মুছছেন।

সাতারার কালেক্টার এবং পুলিশ সুপার মিঃ ভোলেরাও দাঁড়িয়ে কিন্তু কিছুতেই মান্ধাতার সিন্দুকের ডালা খোলা দেখছেন। আমলের তালাগুলো খোলা গেল না। বন্দী দুর্বৃত্তদের কারও কাছে চাবি নেই। অনেক জেরা করার পর জানা গেল, চাবিগুলোর কথা একজন লোকই শুধু জানে। সে হ’লো রঘুবীর কালে। গাজী মস্তানের ডান হাত রঘুবীর কালে। দেশের কোন জেল তাকে বন্দী করে রাখতে পারে নি। জেল থেকে পালানোর রেকর্ড করেছে রঘুবীর কালে।

প্রতাপগড় দুর্গের চূড়ায় ছত্রপতি শিবাজীর মূর্তির পায়ের কাছে রাখা সিন্দুকের তালা ভেঙে যখন ডালা তুলে ধরা হ’লো, তখন পৃথ্বীরাজের চোখে অবাক বিস্ময়। সকলেরই প্রায় সেই অবস্থা। ছ’টি সিন্দুকের মধ্যে রয়েছে থরে থরে সাজানো সোনার বিস্কুট। সূর্যের আলো পড়ে সেই বিস্কুটগুলো ঝিকিমিকি করছে। আর সপ্তম সিন্দুক বোঝাই ছিল সহস্র হাত ঘড়ি আর সহস্র গ্যাস্ লাইটার। পৃথ্বীরাজের মনে পড়ে গেল, রত্নগিরির সিপাই পাণ্ডারী বিড়ি ধরাতো দামী গ্যাস লাইটার দিয়ে। সেটাও যে স্মাগল করা হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই।

আশাতীত সাফল্যে মিঃ ভোসলে পরিশ্রান্ত হলেও বেশ চঞ্চল। হাসি মুখে বললেন :

—ডঃ সেন, প্রতাপগড় ফোর্ট যেন ভারতের ফোর্টনক্স হয়ে গেছে, তাই না?

পৃথ্বীরাজ কোনও বইয়ে পড়েছিল, ফোর্টনক্স হ’লো, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মজুত স্বর্ণ ভাণ্ডার। মহারাষ্ট্রে এসে সব কিছুতেই তার শিবাজীর স্মৃতি মনে আসছে। পৃথ্বীরাজ বলল :

—ছোট মামা, এত মজুত সোনা যদি ছত্রপতি শিবাজীর সময়ে প্রতাপগড়ে পাওয়া যেত, তবে তার সুরাট অভিযানের প্রয়োজন হ’তো না, তাই না?

সবগুলো সিন্দুক নামাবার ব্যবস্থা করে, দলবল নিয়ে সবাই নীচে চলে গেল। সব ক’টা মৃত দেহ মহাবালেশ্বরে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা হয়ে গেল। যারা আহত তাদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশও আছে, তাদেরও মহাবালেশ্বর পাঠানো হ’লো।

ঊনত্রিশ

গোরোগাঁওর বসতির উঠোনে বসে চা খেতে খেতে মিঃ ভোলে বললেন :

—পৃথ্বীরাজ, এবার মহাবালেশ্বর যাবে তো? না আরও কিছুদিন গোরেগাঁও থেকে যাবে? বলেই তিনি মিটি মিটি হাসছেন।

—আমার স্কুল খুলতে দেরী আছে। কিন্তু বাড়ীতে কি হচ্ছে কে জানে! ইচ্ছে হয় এখুনি কলকাতা চলে যাই।

পুলিশ সুপার বললেন : ডঃ সেন, পৃথ্বীরাজ এখানে বেড়াতে না এলে, আপনিও আসতেন না। আর চোরাচালানদার, স্মাগলারদের খবরও আমরা পেতাম না। আমরা ভাবতেও পারি নি, এত ডিপ ইনসাইডে স্মাগলাররা ঘাঁটি বানাতে পারে। প্রতাপগড় ফোর্ট কোস্ট লাইন থেকে অনেক দূরে, তাই না?

—সে কথা সত্যি! কাস্টমস্ আর কোস্টগার্ডরা অনেক তৎপর হয়েছে বলেই ওরা বোধহয় দেশের এত অভ্যন্তরে ঘাঁটি করেছে। ডঃ সেন বললেন।

—ডঃ সেন, আপনাদের অনেক ধন্যবাদ। যতদিন ইচ্ছা সরকারী অতিথি হয়ে আপনারা মহাবালেশ্বরে বেড়াতে পারেন। তাছাড়া বম্বে থেকে কলকাতা এয়ার প্যাসেজ আমরা ব্যবস্থা করে দেব। শুধু বলবেন, কবে ফিরবেন আপনারা। সাতারার কালেক্টর বললেন :

—আপনাকে আবার হয়তো বম্বে আসতে হবে একবার। আমি সরকারের কাছে পৃথ্বীরাজের নাম অ্যাওয়ার্ডের জন্য রেকমেও করেছি। কি, পৃথ্বীরাজ আবার আসবে তো?

—আসব, তবে একা নয়। বাবা, মা, দিদির সঙ্গে আসব। আবার মহাবালেশ্বর বেড়িয়ে যাবো সবাই। মহাবালেশ্বর আমার খুব ভাল লেগেছে।

মাওলী বসতি থেকে পৃথ্বীরাজের বিদায় নেওয়া অনেকের কাছে খুবই দুঃখের হয়েছিল। এক সময় অসহায় ছেলেটিকে ওরা খুব ভালবেসে ফেলেছিল। কিন্তু সব থেকে যে বেশী কষ্ট পেয়েছিল, সে হ’লো ছোট্ট মাওলী মেয়ে হীরামন। গোরেগাঁও ছেড়ে আসার সময় সেই আদিবাসী মেয়েটিকে পৃথ্বীরাজ কোথাও খুঁজে পেল না। তাকে কিছু বলা হলো না।

শেষ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *