প্রতাপগড়ের নাঘনখ রহস্য – ৫

পাঁচ

সেদিন বিকেলে মাওলীদের গ্রামের একটি কুঁড়ে ঘরের বারান্দায় একটি মাছরের উপর পৃথ্বীরাজ বসেছিল। একটু দূরে একটি মাওলী মেয়ে ওর দিকে চেয়ে বসেছিল। মেয়েটির বয়স দশ-বারো বছর হবে। দক্ষিণের খাড়া পাহাড়টি দেখলে মনে হবে অতি দুর্গম। পাহাড়টির চূড়ায় মনে হয় যেন পাঁচিলে ঘেরা একটি দুর্গ রয়েছে।

পৃথ্বীরাজ মাওলী মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল :

তোমার নাম কি?

হীরামন।

পিছন দিকে দেখ, ঐ পাহাড়ের মাথায় ওটা কি একটা দুর্গ? কি নাম ওটার?

ওটা পরতাপ গড়।

পৃথ্বীরাজ চমকে ওঠে। এটাই কি তাহলে সেই বিখ্যাত ফোর্ট! ছত্রপতি শিবাজীর একটা শক্ত ঘাটি ছিল একদিন। শিবাজী কখনও এই দুর্গে যুদ্ধে হারেন নি। রাবার কাছে শুনেছে সে কথা। হঠাৎ তার বাড়ির কথা, বাবা, মা, দিদির কথা মনে পড়ল। মাওলী সর্দার মহাবালেশ্বরে গিয়েছে। হলিডে ক্যাম্পে গিয়ে ফাদারকে নিয়ে আসবে। ফাদার গাড়ি নিয়ে না এলে পৃথ্বীরাজ যেতে পারবে না। পৃথ্বীরাজ ভাবল, মহাবালেশ্বর গিয়ে বাবাকে চিঠি লিখবে। যা যা ঘটেছে সব কথা লেখা ঠিক হবে না। দূর থেকে বাবা মা দিদি অযথা ভাববে। তার চেয়ে বরং বাড়ি গিয়ে আসর জমিয়ে গল্প বলা যাবে! স্কুলের বন্ধুরাও সব কথা জানে না। মহাবালেশ্বর গিয়ে ওদের বললেও অবাক হবে তারা।

প্রতাপগড় দুর্গের দিকে তাকিয়ে যখন পৃথ্বীরাজ এসব কথা ভাবছিল, তখন সর্দার ফিরে এলো। সঙ্গে তিনজন লোক। তাদের একজন হলিডে ক্যাম্পের অফিসার মিস্টার পান্‌ছে। একজন পুলিশ অফিসারও এসেছেন। মহাবালেশ্বরের দারোগা। তৃতীয় ব্যক্তি একজন ডাক্তার।

এরা কেউ মাওলী সর্দারের কথা বিশ্বাস করেনি যে পৃথ্বীরাজ বেঁচে আছে। ওদের চোখের চাহনি দেখলেই তা বোঝা যায়। পৃথ্বীরাজ জিজ্ঞেস করল : মিস্টার পাছে, ফাদার হেভিলিংক এলেন না, অন্য ছাত্ররা কেউ এলো না?

না, ওরা আজ ভোরে বম্বে চলে গেছেন।

—অ্যাঁ। বম্বে চলে গেছে?

পৃথ্বীরাজের মাথাটা একবার ঘুরে উঠলো যেন। এত দূর দেশে তাকে ফেলে রেখে সবাই চলে গেল! একটা টাকাও তার কাছে নেই। সে একা ফিরে যাবেই বা কি করে? এত দূর দেশে ওকে একলা ফেলে রেখে গেল!

ওরা কবে ফিরে আসবে বম্বে থেকে?

দারোগা মিস্টার ভালেরাও বললেন, সে কথা পড়ে হবে। ভাবছ কেন, আমরা তো রয়েছি। তোমার কোন চিন্তা নেই। তারপর ডাক্তারবাবুর দিকে তাকিয়ে দারোগা বললেন: ডাক্তার চ্যবন দেখুন- তো ছেলেটি ভালো আছে কিনা। বলে দারোগাবাবু সর্দারকে সঙ্গে নিয়ে একটু দূরে গেলেন। মিস্টার পাছে কাছে এসে বললেন : ‘পৃথ্বীরাজ তুমি ভেব না। তুমি বাবাকে একটা চিঠি লিখবে আজ রাত্রে। কালই আমি কলকাতা পাঠিয়ে দেব।

তা হ’লে ফাদার বম্বে থেকে ফিরে আসবেন না বোধ হয়। কিন্তু কেন!

তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ, তা ওরা জানেন না। তাই। —ওরা জেনে যেতে পারেন নি, তুমি বেঁচে আছ।

ওরা ভেবেছে আমি মরে গেছি, তাই না?

বলেই পৃথ্বীরাজ দুচোখ মুছলো। তাড়াতাড়ি মিষ্টার পান্‌ছে বললেন!- না, না, তা ঠিক নয়। সাতারা জেলা কালেক্টর কাল তোমায় দেখতে আসবেন। যতদিন তোমার বাবা না আসছেন ততদিন তুমি আমাদের গেস্ট, হয়ে মহাবালেশ্বরে থাকবে। কেমন?

অনেকক্ষণ ধরে পরীক্ষা করে ডাক্তার চ্যবন বললেন : হি ইজ পারফেক্টলি অলরাইট। ইট ইজ এ মিরাকল। দারোগাবাবু কাছে এসে বললেন: পৃথ্বীরাজ, কলকাতা ছাড়া এখানে কাছাকাছি তোমার কোন আত্মীয় স্বজন আছেন! ধর বম্বে বা পুনায়?

হ্যাঁ, আমার বড় মামা, বম্বে আই, আই টিতে গণিতের অধ্যাপক।

—ঠিকানাটা মনে আছে তোমার?

—হ্যাঁ লিখে দিচ্ছি।

—এখানে কেন, মহাবালেশ্বরে গিয়ে লিখে দিও।

সে কথায় কান না দিয়ে পৃথ্বীরাজ ডাক্তার চ্যবনকে বলল : ডাক্তারবাবু, আমার শরীর ঠিক আছে তো?

হ্যাঁ।

কোন ঔষধ খাবার দরকার নেই তো?

না, কয়েকটা ভিটামিন ট্যাবলেট খেতে পার।

তবে আমি এখন মহাবালেশ্বরে যাব না।

সকলেই অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠলো, সেকি? এই জংলী বস্তীতে থাকবে? ছেলেটির কথায় ওরা বিস্ময়ে হতবাক।

হ্যাঁ, আমি বাবাকে কলকাতায় এবং বড়মামাকে বম্বেতে চিঠি লিখে দিচ্ছি। বড়মামা এলে দয়া করে এখানে নিয়ে আসবেন। তার সঙ্গেই আমি মহাবালেশ্বরে যাব।

অনেক বার বুঝিয়েও ওরা পৃথ্বীরাজকে রাজি করাতে পারল না।

দারোগা আবার সর্দারকে নিয়ে একটু দূরে চলে গেলেন। তখন সর্দার বলল : স্যার, ওর বাবা চিঠি পেয়ে কবে আসবে তার ঠিক নেই। ততদিন ওকে নিয়ে আমরা কি করবো?

আমিই বা কি করবো— দারোগাবাবু রাগে ফেটে বললেন, ওকে বোঝাও, রাজি করাও।

স্যার, আপনি যদি ওর মামাকে ‘তার’ পাঠান, তা হ’লে হয়তো তাড়াতাড়ি আসবে। সর্দারের দিকে কট্‌মট্ করে তাকিয়ে দারোগাবাবু বললেন : মাথায় তো বৃদ্ধি আছে বেশ। তবে ছেলেটিকে এখানে নিয়ে এসেছিলি কেন? যদি মারাত্মক ভাবে আহত হ’তো, যদি মরে যেতো? তবে তো তোদের জেলে পুরতাম।

অন্যায় হয়ে গেছে স্যার। তবে ওতো অজ্ঞান হয়েছিল পরের দিনও।

দারোগাবাবু রেগে একবার সর্দারের দিকে তাকিয়ে, সবাইকে নিয়ে জীপে উঠে মহাবালেশ্বরে চলে গেলেন। যেতে যেতে নিজের মনেই বললেন : আজই টেলিগ্রাম করছি বম্বেতে। কাল ভোরে দুজন সিপাই পাঠিয়ে দেব। যতদিন কেউ না আসে, তারা ওকে দেখে শুনে রাখবে, যতসব ঝামেলা।।

ছয়

পরের দিন দুপুর বেলা প্রতাপগড়ের দিকে তাকিয়ে পৃথ্বীরাজ ভাবছিল নানা কথা। মাওলীদের গ্রাম গোরেগাঁও প্রতাপগড় পাহাড়ের পাদদেশে, খুব বেশী দূর হলে আধ মাইলটাক হবে। পরিষ্কার আকাশের নীচে প্রতাপগড় দুর্গকে মনে হচ্ছিল, দুর্ভেদ্য, দুর্গম। দুর্গের উপর কোন গাছপালা আছে বলে মনে হয় না। মনে হয় পাহাড়ের উত্তঙ্গ চূড়া খোদাই করে দুর্গটা বানিয়েছে। এমন সময় সর্দার কাছে এল। পৃথ্বীরাজ বলল :

—সর্দার, তুমি চাও না দু’চার দিন আমি তোমাদের সঙ্গে থাকি? বেশ তো আছি। যা দাও তাই খাই। শুয়ে বসে সময় কাটাই। আমাকে তোমরা বাঁচিয়েছ— সেকথা সহজে যেন না ভুলে যাই, সে জন্যই আর ক’টা দিন তোমাদের সঙ্গে কাটাতে চাই। জীবনে তোমাদের সঙ্গে আর হয়ত দেখা নাও হতে পারে। তাই না? কথাগুলো বলতে বলতে পৃথ্বীরাজের চোখ ছলছল করে উঠলো। মাওলী সর্দার, তার গায়ের রং প্রতাপগড় পাহাড়ের পাথরের মতই। পাথরে খোদাই করা যেন তার শক্ত সমর্থ চেহারা। কথাগুলো শুনে তার মুখ করুণ হয়ে গেল। বলল :

—রাজা সাব! তোমাকে এখানে রাখার মত ক্ষমতা আমাদের কোথায়? তুমি বাড়িতে কি খেতে, তা জানিও না। এখানে কি খাচ্ছ বলোতো! বজরার কালো রুটি, আমের আচার আর কাঁচা পেঁয়াজ। দুধও তোমায় বেশী খেতে দিতে পারি না। যখন খাও তখন লক্ষ্য করিনা ভাবছো?

কথা ঘুরিয়ে পৃথ্বীরাজ বলল :

ঐ দুর্গটাই শিবাজী মহারাজের প্রতাপগড় দুর্গ, তাই না? ওখানে কেউ থাকে?

ঠিক যে কেউ থাকে, তা বলা যায় না। তবে সেনাপতি আফজল খাঁর সমাধির উপর ছোট ‘মাজার’ আছে। সেখানে দিনরাত প্রদীপ জ্বলে। একটি লোক দেখাশুনা করে। তা ছাড়া দলে দলে লোক দুর্গ দেখতে আসে, আবার দিনে দিনেই চলে যায়।

দেখলে ত মনে হয় ঐ দুর্গে ওঠার পথ নেই। অথচ লোকেরা যাতায়াত করে। কোন দিক দিয়ে পথ?

আমাদের এখান থেকে দেখলে মনে হবে পথ নেই। তুমি যদি দক্ষিণ বা পশ্চিম দিক থেকে দেখ, তবে মনে হবে কাঠবিড়ালিও ঐ পাহাড়ে উঠতে পারবে না। এত খাড়া। কিন্তু উত্তর-পূর্ব দিকে পথ আছে। পাহাড়ী পথে জীপ গাড়ি অনেক দূর পর্যন্ত উঠতে পারে। প্রতি বছর সেই পথ মেরামত করা হয়।

তোমরা সেখানে যাও?

না, তবে কনট্রাক্টরের কাজ করতে আমাদের লোকেরা যায় ওখানে।

জানো সর্দার! এখন তোমরা দুর্গে ওঠার পথ বানিয়েছ। কিন্তু শিবাজী মহারাজ, তার সৈন্যরা কি করে ঘোড়ায় চড়ে ঐ পাহাড়ী পথে দুর্গে যেতেন, ভাবতে পারো?

—রাজা সার্! তুমি সুস্থ হয়ে উঠলে তোমায় ঘোড়ায় চড়া শেখাব। দেখবে ছোট ছোট ছেলেরা টাট্টু ঘোড়ায় চড়ে কি করে ছুটোছুটি করে বেড়ায়।

আমাকে দুর্গটা ভালমত দেখিয়ে দেবে তো?

—নিশ্চয়ই।

সর্দার চলে গেল। সহাদ্রি হিসে সন্ধ্যা নামে যেন বেশ আয়োজন ক’রে। প্রথমে চারদিক থমথমে হয়ে আসে। তারপর কোথাও নিস্তেজ সূর্যের ছায়া পড়ে, আবার কোথাও কোন পাহাড়ের। আলো ছায়ার খেলা চলতে চলতে ক্রমশঃ আকাশের রং স্লেটের মত কালো হয়ে আসে। ঠিক তখনই নানা পাখীর ডাকে জঙ্গল ভরে যায়। যেন রাত হবার আগে পাখীরা সব দরকারি কথাবার্তা সেরে নিতে চায়। তারপর হঠাৎ চারদিকে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। একলা বসে বসে পৃথ্বীরাজ সন্ধ্যা নেমে আসা দেখতে দেখতে যেন ইতিহাসের পুরানো দিনে চলে গেল! দূর থেকে কয়েকটি ঘোড়া ছুটে আসার শব্দ তার কানে এলো। মনে হ’লো, শিবাজী মহারাজের অশ্বারোহী কয়েকজন সৈন্য যেন কাছের দুর্গ পাণ্ডবগড় থেকে প্রতাপগড়ে আসছে। ঘোড়ার খুরের শব্দ কাছে এসে থেমে গেল। চারটি মাওলী ছেলে টাট্ট-ঘোড়া থেকে নেমে এলো। সঙ্গে সর্দার। পৃথ্বীরাজ তাদের দেখে বলল—তোমরা এলে, আমার মনে হ’লো যেন শিবাজী মহারাজের সৈন্যরা পাণ্ডবগড় দুর্গ থেকে এখানে এলো। সর্দার বলল, ‘তার মানে, তোমার তবিয়ত্, এখনও ঠিক হয়নি। এই দেখ, তোমার বয়সী ছেলেরা কি সুন্দর ঘোড়া ছুটিয়ে এলো। ওরা কাল সকালে আবার আসবে।

পৃথ্বীরাজের এখানে সব কিছু ভাল লাগছে। কলকাতা থেকে বাবা এলে খুব ভাল হবে। বাবার এসব জায়গা দেখা। ওরা মহাবালেশ্বর থেকে পায়ে হেটে ট্রেকিং করে প্রতাপগড় ফোর্ট দেখে গেছেন। কত গল্প করেছেন বাবা। পথে বাগান থেকে ষ্ট্রবেরী তুলে তুলে খেয়েছেন। পৃথ্বীরাজও হয়ত ট্রেকিং-এর পথ ধরেই এসেছে। তবে তখন তার জ্ঞান ছিল না, মাওলীরা কাধে করে নিয়ে এসেছিল আহত পৃথ্বীরাজকে।

আজ বার বার বাড়ীর কথা মনে পড়ছে। মার কথা, বাবার কথা, আর দিদির কথা, ফাদারের কথা, মাষ্টার মশায় ও বন্ধুদের কথাও মনে পড়ছে। কলকাতায় পৌঁছে বাবার কাছে না শোনা পর্যন্ত ওরা ভাববে পৃথ্বীরাজ হারিয়ে গেছে, মারা গেছে। ওদের জন্য দুঃখ হ’লো।

সাত

পরদিন ভোর বেলা এক মজার ব্যাপার ঘটলো। দারোগা ভালেরাও অনেক ষ্ট্রবেরী নিয়ে গোরেগাঁও এলেন। টাটকা যেন সদ্য বাগান থেকে তোলা। বোটাগুলো তখনও ভিজে ভিজে। পৃথ্বীরাজ স্ট্রবেরী ভীষণ ভালবাসে একথা দারোগাবাবু জানেনও না।

বেলা এগারোটা নাগাদ সাতারার কালেক্টর আর পুলিশ সুপার মিঃ ভোসলে পৃথ্বীরাজকে দেখতে এলেন। অনেক কথাবার্তা হবার পর, কালেক্টর সাহেব বললেন : খোকাবাবু, তুমি আমাদের সঙ্গে চলো। মহাবালেশ্বরে সার্কিট হাউসে থাকবে। থ্যাংকু আংকেল! আপনাদের আপত্তি না থাকলে আমাকে মাওলীদের এখানেই থাকতে অনুমতি দিন। আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না। মিঃ ভোলে বললেন : তুমি ক্যালকাটার ছেলে, তাই কি তোমার পাহাড়ী গ্রাম ভাল লাগছে?

শুধু তাই নয়। আমি প্রতাপগড় ফোর্ট না দেখে যাব না।

সে তো তুমি আজই দেখতে পার। আবার মহাবালেশ্বর থেকে এসেও দেখে যেত পার।

তা ঠিক, কিন্তু আমি পায়ে হেটে অথবা ঘোড়ায় চড়ে ঐ দুর্গ দেখব। ছত্রপতি শিবাজীর সৈন্যরা কিভাবে যে ঘোড়ায় চড়ে ঐ দুর্গে উঠতেন, তা ভাবা যায় না। তাই না আংকেল্? কালেক্টর আর পুলিশ সুপার অনেক বুঝিয়েও পৃথ্বীরাজকে রাজি করাতে পারলেন না। অবশ্য ডাক্তারের রিপোর্টে বলা হয়েছে, সে একদম সুস্থ। কালেক্টর পুলিশ সুপারকে বললেন— মিঃ ভোসলে, আপনার কি মনে হচ্ছে না ছেলেটি ক্রেজি? ব্রেনের কোন আঘাতের জন্যই হয়তো সে এমন ব্যবহার করছে, তাই না?

ইউ আর পারফেক্‌টলি রাইট আই থিংক।

মিঃ ভোসলে সর্দারকে বললেন, ছেলেটি তোমাদের এখানেই থাকবে। ওর আত্মীয়-স্বজন কেউ না আসা পর্যন্ত। তারপর দারোগা ভালেরাওকে তিনি বললেন, দুজন সিপাইকে এখানে পোস্টিং করুন। ওর খাওয়া-দাওয়ার জিনিসপত্রের ব্যবস্থা করুন। কিছু ফল, দুধের ব্যবস্থাও করবেন।

আমি স্যার, আজ কিছু ষ্ট্রবেরী ওর জন্য নিয়ে এসেছি স্যার। বাকী সব ব্যবস্থা করছি।

ভেরী গুড।

কালেক্টর আর পুলিশ সুপার চলে গেলেন। দারোগাবাবু সর্দারকে

নিয়ে সব ব্যবস্থা করতে চলে গেলেন। দারোগাবাবু ভাবছেন, ছেলেটিকে নিয়ে একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না কি!

আট

পাওয়াই-এ বম্বের ইন্‌ডিয়ান ইন্‌স্‌টটিউট্‌ অব্, টেকনোলজির টাউনসিপ ছোট্ট এবং ছবির মত। টাউনসিপের একটি কোয়ার্টারে থাকেন পৃথ্বীরাজের বড় মামা। ছোট সংসার, স্বামী স্ত্রী আর ছেলে জয়ন্ত। বড় মামা গণিতের অধ্যাপক, দিনরাত পড়াশুনা নিয়েই থাকেন।

বহু বছর পর ছোটভাই ডক্টর অনিল সেন বড়দার কাছে বেড়াতে এসেছেন। ডঃ সেন পৃথ্বীরাজের ছোটমামা। ছ’দিন হলো এসেছেন, দাদা বৌদির সঙ্গে গল্প করে মহানন্দে দু’টো দিন কেটে গেছে। সেদিন সকালে দুই ভাই ড্রয়িং রুমে বসে গল্প করছিলেন। দুজনার সামনে কফির পেয়ালা আর হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। ওটা দাদা-ভাই-এর একসঙ্গে চলে। এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠলে বড়ভাই দরজা খুলে দেখে, পিয়ন টেলিগ্রাম দিতে এসেছে। টেলিগ্রাম পড়ে বড় ভাই চুপচাপ কি যেন ভাবছে। তাই দেখে ডঃ সেন বললেন,

কি দাদা, কার টেলিগ্রাম? চুপচাপ দাড়িয়ে কি ভাবছো? বড়ভাই টেলিগ্রামটা ডঃ সেনের হাতে দিলেন। ওতে লেখা আছে :

পৃথ্বীরাজ রেসকিউড। ওয়েল্। কাম্ মহাবালেশ্বর! মিট্‌ ও সি পুলিশ স্টেসন। ডঃ সেন ভাবলেন, পৃথ্বীরাজ তো সেজদির ছেলে। থাকে কলকাতায়। টালিগঞ্জে। মহাবালেশ্বর এলো কবে? দাদাকে জিজ্ঞেস করলেন,

দাদা, পৃথ্বীরাজ টালিগঞ্জ থেকে করে মহাবালেশ্বর এলো, কিছু জানো?

না, খানিকটা ভেবে বড় ভাই উত্তর দেন। তখন ডঃ সেন জোরে বৌদিকে ডাকলেন :

বৌদি এঘরে একবার এসো তো।

কি হ’লো আবার। বলতে বলতে তিনি ড্রয়িং রুমে এলেন। বৌদি, সপ্তাহ খানেকের মধ্যে টালিগঞ্জ থেকে কোন চিঠি পেয়েছো?

হ্যাঁ, কালইতো সেজদির একটা চিঠি পেয়েছি। কি হয়েছে? তোমরা এত গম্ভীর কেন?

পৃথ্বীরাজের মা ওর বড়মামিমার সমান বয়সী। স্বামীর সেজ বোন পৃথ্বীরাজের মাকে সেজদি বলেই উনি ডাকেন, যদিও সম্পর্কে উনি বড়।

চিঠিখানা তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো তো।

বড়ভাই বলেন—কাল চিঠি এসেছে, তবু আমায় একবার বলোনি তো?

সেটা আবার নতুন কি। কোন চিঠি পড়া বা লেখার সময় হয় নাকি তোমার? বলে চিঠি আনতে চলে গেলেন।

বার ছয়েক চিঠি পড়ে, ডঃ সেন গম্ভীর মুখে বললেন—দাদা, এখুনি আমায় মহাবালেশ্বরে যেতে হবে। কি করে যাওয়া যায়, বলোতো?

কেন? দাদা-বৌদি এক সঙ্গে জিজ্ঞেস করেন।

টালিগঞ্জ থেকে সেজদি লিখেছে, একদল ছাত্রের সঙ্গে পৃথ্বীরাজ এক্সকারসনে গেছে মহাবালেশ্বরে। তারপর ঐ টেলিগ্রাম। ঘটনাটা পরিষ্কার কিছু বোঝা যাচ্ছে না। রেস্‌কিউড—ওয়েল, তার মানে পৃথ্বীরাজ কোন বিপদে পড়েছিল। উদ্ধার করা হয়েছে। শারীরিক কোন ক্ষতি হয়েছিল—এখন ভাল আছে। বেড়াতে বেরিয়েছিল ছাত্রদের সঙ্গে, তাই টীচার দু’একজন সঙ্গে ছিলেন নিশ্চয়ই। কিন্তু টেলিগ্রাম করেছে মহাবালেশ্বরের থানার ও.সি.। দেখতো দাদা, এখন পুণে যাবার কোনও ট্রেন আছে কিনা?

তাই তো! এখন প্রায় দশটা বাজে! এখন কি গাড়ি পাবে। দেখি টাইম্‌ টেব্‌ লটা। ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস্ থেকে বেলা বারোটা পঁয়তাল্লিসে সেকেন্দ্রাবাদ এক্‌সপ্রেস ট্রেনটি ছাড়বে! দাদর স্টেশনে আসবে তার দশ বারো মিনিট পরে। ঐ ট্রেন পুণেতে পৌঁছবে বিকেল পাঁচটা নাগাদ। অবশ্য রাত্রেও একটা ট্রেন আছে। ভোরে পুণেতে পৌঁছবে। ডঃ সেন বললেন।

বৌদি, তুমি খাবার রেডি কর! আমি স্নান সেরে আমি। বিকেল পাঁচটায় পুণে পৌঁছে, রাত্রেই মহাবালেশ্বরে যেতে হবে।

বড়ভাই বললেন, হাঁরে, টালিগঞ্জে একটা টেলিগ্রাম পাঠাব?

না, না। কক্ষনো না। কি লিখবে তাতে? যা পাঠাবার আমি মহাবালেশ্বর থেকেই পাঠাব। তোমরা এ নিয়ে আর চিন্তা করনা।

নয়

মহাবালেশ্বর থানা থেকে ছজন সিপাই এসেছে। পৃথ্বীরাজ যেখানেই যায় কাছাকাছি বেড়াতে, ওদের একজন না একজন সঙ্গে থাকে। অবশ্য বেশী দূরে পৃথ্বীরাজ যায় না। গোরেগাঁও-এর দক্ষিণ দিকে একটা পাকা রাস্তা প্রতাপগড় দুর্গ টাকে প্রায় বেড় দিয়ে পশ্চিমে পাহাড়ী এলাকায় হারিয়ে গেছে। ঐ পথ পর্যন্ত সে যায়। প্রতাপগড়ের পাদদেশে, এখানে সেখানে জঙ্গল ছড়িয়ে আছে। পৃথ্বীরাজ পুরানো ইতিহাসের কথা ভাবে—ঐ সব জঙ্গলে শিবাজীর সৈন্যরা লুকিয়ে থেকে, শত্রুদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে যুদ্ধে হারিয়ে দিয়েছে।

যে দুজন সিপাই থানা থেকে এসেছে, তাদের সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গেছে পৃথ্বীরাজের। ওদের একজন বুড়ো, আর অন্যজন একদম বাচ্চা। গোঁফদাড়ি ভালো মত গজায় নি, অথচ সিপাই হয়ে বসেছে। ওর নাম পাণ্ডারী। ওদের বাড়ি রত্নগিরি জেলায়, আরব সাগরের তীরে, কঙ্কন উপকূলে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হ’লো, পাণ্ডারী বিড়ি খায়। কিন্তু বিড়ি ধরায় একটা গ্যাস-লাইটার দিয়ে। দেখলেই বোঝা যায় খুব দামী সেটা। পৃথ্বীরাজ গ্যাস-লাইটারটি হাতে নিয়ে দেখেছে। খুব ভারী, মনে হয় খুব দামীই হবে। ওর ছোট মামারটা এত ভারীও নয়, সুন্দরও নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *