প্রতাপগড়ের নাঘনখ রহস্য – ২০

কুড়ি

রাত তখন প্রায় পৌনে এগারোটা হবে। অমাবস্যার রাত। কালো অন্ধকার। চারদিকে জংলী ঝিঁঝিঁর ডাক একটানা কর্কশ ঐক্যতানের মত শোনাচ্ছিল। ডঃ সেন আর পৃথ্বীরাজ নিঃশব্দে এগিয়ে চলল দুর্গের দিকে। কিন্তু ওরা টেরও পেল না আর একজন নিকষ কালো রং এর মানুষ ওদের অনুসরণ করছে। হাতে তার ছোট বর্শা, সেটা লাঠি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।

দুর্গে উঠবার যে একটি মাত্র পথ আছে, সে পথ দিনের বেলাতেই চড়া কষ্টকর। রাত্রের অন্ধকারে সে পথ আরও অনেক বেশী কষ্টসাধ্য। ছোট পেনসিল টর্চ জ্বালিয়ে সে পথ চলা মোটেই সহজ ছিল না। পাহাড়ের গায়ে প্রায় হাত রেখে রেখেই ডঃ সেন আর পৃথ্বীরাজ উপরে উঠছিল। তবে তাদের তাড়াহুড়ো করার কিছু ছিল না। নিঃশব্দে ধীরে ধীরে আঁকাবাঁকা পথ ধরে ওরা উপরে উঠে এলো। একটা ছোট পাথরও ওদের পায়ে লেগে গড়িয়ে পড়ল না। কোন রকম শব্দ হলে পাছে ওদের নৈশ অভিযান ব্যর্থ হয়, তাই ওরা অত্যন্ত সতর্কভাবে উপরে উঠে এলো।

সামনেই সোজা পথ দুর্গের প্রবেশ দ্বারে চলে গেছে। পথটুকু বেশী ঢালুও নয়। একটু এগিয়ে গেলেই বা’দিকে বিখ্যাত বিজাপুরী সেনাপতি আফজল খাঁর সমাধিমন্দির। সেই সমাধিতে কবরের পাশে একটি প্রদীপ জ্বলছে। ডঃ সেনের ভাবনা তখন একটাই, কি করে সেই প্রদীপের আলো এড়িয়ে দুর্গে যাওয়া যায়। বলা যায়না আশে পাশে লুকিয়ে থেকে কেউ ওদের গতিবিধির উপর নজর রাখছে কি না!

চারদিকে কালোর মধ্যে প্রদীপের জ্বলন্ত শিখা মনে হয় যেন একটি মুক্তো। গুটিপোকার মত সাইজের। তার চারদিকে আলো ছড়িয়ে পড়েছে। একটি ছোট্ট প্রদীপের আলো যে এত জোরালো হতে পারে, সেটা নিকষ কালোর ব্যাকগ্রাউণ্ডে ছাড়া বোঝা যাবে না।

সমাধি পার হতে গিয়ে ওরা প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে চললো। বহুক্ষণ অন্ধকারে থাকলে অন্ধকারটাও যেন হালকা হয়, চোখ সওয়া হয়ে যায়। দৃষ্টি আর অনুভূতি দিয়ে যেন অনেককিছু দেখা যায়।

অবশেষে অভিযানের প্রথম পর্ব শেষ হলো। ওরা দুর্গের প্রবেশ পথে এলো। তারপর সকাল বেলার দেখা পথ ধরে, অত্যন্ত সতর্কভাবে দুর্গের চূড়োয় পৌঁছলো।

সেখানে গাছপালা কোন কিছু নেই। তাই কীটপতঙ্গ প্রাণীর কোন সাড়াশব্দও নেই। এতক্ষণ চলার উত্তেজনায় ঠাণ্ডা কতটা পড়েছে বোঝেনি। এবার পাহাড় চূড়োয় হাল্কা হাওয়ায় কনকনে ঠাণ্ডা ওদের মেরুদণ্ডে শিহরণ জাগালো। শিবাজীর মূর্তির বেদীর নীচে বসে, ডঃ সেন ফিস্ ফিস্ করে পৃথ্বীরাজকে বললেন :

—আমরা চারদিক থেকে এখন অরক্ষিত। তাই পিছনটা পাহাড়ে বা বেদীতে ঠেকিয়ে রাখবি! রাত্রে বা বনে জঙ্গলে নিজের পিছন কক্ষণো অরক্ষিত রাখতে নেই।

কিন্তু সেই উন্মুক্ত অন্ধকার চূড়োয় কিছুতেই অজ্ঞাত আক্ৰমণ- কারীর হাত থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়।

তারপর একটু বিশ্রাম ক’রে প্রায় হামাগুড়ি দিয়েই সকালের দেখা ডঃ সেন কান পেতে শুনতে চেষ্টা গুহাঘরের কাছে এলো দু’জনে। করলেন, লোকজনের কোন সাড়া শব্দ সেখান থেকে আসে কিনা। কারণ, তার ধারণা হয়েছিল, যদি সেই ভৌতিক শব্দ কিছু অ্যাপ্লিফায়ার দিয়ে বাজানো হয়, তবে তা হবে ঐ গুহাঘর থেকেই। ওখানেই থাকবে টেপরেকর্ডার।

একুশ

অমাবস্যার অন্ধকার রাত। দরকার হলে সারা রাতটাই এখানে তাদের কাটাতে হবে। পাহাড় চূড়ায় অল্প অল্প হাওয়া বইছে। ঠাণ্ডায় হাত পা অবশ হয়ে আসছে। পৃথ্বীরাজ ছোটমামার পিছনে বসে। ডঃ সেন কোয়ার্টজ ঘড়িটা টিপে দেখলেন। রাত সাড়ে বারোটা। আর ঠিক তখনই উজ্বল নীল আলোর একটা সরু ধারা নীচ থেকে কারা যেন উপরে ফেললো। তীব্র নীল আলোটা কোন শক্তিশালী টর্চের, তার কাঁচটা অবশ্যই নীল রং-এর হবে। শিবাজীর মূর্তির গায়ের উপর দিয়ে, ডাইনে বায়ে বার ছয়েক ঘুরে আলোটা নিবে গেল। মিনিট খানেকের মধ্যে আরও দু’ দু বার আলো সেভাবে দুর্গের চূড়া ছুয়ে গেল। হামাগুড়ি অবস্থা থেকে তখন দুজনে, শুয়ে পড়েছে। যাতে তাদের কেউ না দেখতে পায়।

প্রায় শুয়ে শুয়ে ডঃ সেন বুকে হেটে এগিয়ে চললেন ভাঙা প্রাচীরের কাছে, গুহা মুখের পাথরের কাছে, আর মনে মনে ভাবছেন তখনই হয়ত টেপ রেকর্ডার বেজে উঠবে, তার শব্দ অ্যাপ্লিফায়ার হয়ে ছড়িয়ে পড়বে অমবস্যার রাত্রে পাহাড়ে জঙ্গলে। ঠিক সেই সময় দূর থেকে একটা লরী এসে যেন দুর্গের পশ্চিম দিকে থামলো।

ডঃ সেন অনেকটা ঝুঁকে পড়েছেন। ভাবছেন এতো রাত্রে এখানে একটা লরী বা ভারি গাড়ী কেউ নিয়ে এসেছে। ঠিক তখনই রাত্রের নিস্তব্ধতা ভেদ করে, ‘হর হর মহাদেও’ বলে চীৎকার করে, কে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল ডঃ সেনের পায়ের গোড়ালির উপর। আর সঙ্গে সঙ্গেই বিকট চীৎকার করে, আক্রমণকারী ছিটকে পড়ল ডঃ সেনের পায়ের উপর থেকে। কিছু একটা পাহাড়ের গা বেয়ে নীচে পড়ার শব্দ হলো। তখন একজন কেউ পৃথ্বীরাজ আর ডঃ সেনের পা ধরে পিছনে টেনে আনার চেষ্টা করতে করতেই বলল : কোথাও চোট লাগেনি তো সাব। অন্ধকারে ভালো দেখতে পারছিলাম না। কথাগুলো শুনেই টর্চের আলো ফেললো পৃথ্বীরাজ আগন্তকের মুখের উপর।—সর্দার তুমি এখানে?

—আমি না এলে তোমরা আজ বাঁচতে না।

ডঃ সেন সর্দারকে জড়িয়ে ধরলেন আনন্দে। তখন দুর্গের নীচে পথে, কোন ভারী গাড়ী স্টার্ট দিয়ে চলে গেল। নীচে থেকে আলো কেউ ফেলল না।

ছোট টর্চের আলো জ্বেলে আক্রমণকারীকে খুঁজে পাওয়া গেল না। তখন তিনজনে সাবধানে সেই ছোট গুহাঘরে প্রবেশ করল। দিনের বেলা দেখা ঘরটি তখন আর সে রকম নেই। যেখানে পাগলটা সকালে বসেছিল, সেখানে কালো অন্ধকার একটা সুড়ঙ্গের মুখ। কত বড় সুড়ঙ্গ, কোথায় তার শেষ কে জানে। কে জানে কত রহস্য সেখানে লুকিয়ে আছে।

টর্চের আলো ফেলে অসমান সিড়ি ভেঙে তিনজনে সুড়ঙ্গের খানিকটা নীচে গিয়ে দেখল। সুরঙ্গ অনেক নীচে চলে গেছে। তার শেষ কোথায় কে জানে। তিনজনে উঠে এলো উপরে। রাত্রে আর নীচে যাওয়া উচিত হবে না। ডঃ সেন বললেন :

—দুর্গের অধিপতি, অবরুদ্ধ হ’লে এরকম সুড়ঙ্গ দিয়েই হয়তো দুর্গের বাইরে পালিয়ে যেত। এই সুড়ঙ্গের অন্য মুখও হয়ত নির্জন কোনখানে গিয়ে বাইরে যাবার পথ করে দিয়েছে।

পৃথ্বীরাজ বলল : কাফ্রী জলদস্যু সিদ্ধি জোহর যখন পাহালা দুর্গ—অবরোধ করেছিল, শিবাজী বোধহয় এরকম কোন সুড়ঙ্গ পথ ধরে দুর্গ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। সিদ্দি জোহর জানতেও পারেনি বহু দিন পর্যন্ত। বোকার মত অবরোধ চালিয়ে গিয়েছিল।

—ঠিকই বলেছিস। কাল দেখা যাবে এর শেষ কোথায়। আজকের অভিযানের আর কোন গুরুত্ব নেই! আজ আর ভৌতিক শব্দ বাজবেনা চল, ফিরে যাই।—

বাইশ

বেলা হতে না হতেই দারোগা মিঃ ভালেরাও গোরেগাঁও চলে এসেছেন। সঙ্গে এক ঝুড়ি সঙ্গ তুলে আনা স্ট্রবেরী। দারোগা এসেই দেখেন, পঞ্চাশ ষাট জন মাওলী জড়ো হয়েছে পৃথ্বীরাজদের ঘরের কাছে। সকলের চোখেমুখেই উত্তেজনা। গত রাত্রের ঘটনা শুনে দারোগাবাবুও অবাক। বললেন :

—চলুন, সেই হতভাগাকে খুঁজে বের করি! বেঁচে আছে না মরে গেছে কে জানে।

—খুঁজে হয়ত লাভ হবে না। তবু চলুন।

—কেন বলছেন একথা, ডঃ সেন?

—ওদের দলের লোকেরা ওকে নিশ্চয়ই আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার জন্য ওখানে রেখে দেবে না!

—তা বটে। আপনাদের মুখচোখ দেখে মনে হয় সারারাত ঘুমোন নি! আপনারা বিশ্রাম নিন্, আমরা খুঁজে দেখে আসি!

—তা কি হয় নাকি? চলুন আমরাও যাই।

দলবেধে প্রতাপগড়ের পাহাড়টার পশ্চিম আর দক্ষিণ দিকের নীচের এলাকাগুলি অনেক খোঁজাখুজি করা হ’লো। কোথাও কিছু নেই। বড় বড় পাথরের খণ্ড পাহাড়ের গায়ে এখানে সেখানে উঁচু হয়ে আছে। কাছে না গিয়ে খোঁজা যায় না। মাওলীরা কাঠ বিড়ালির মত পাহাড়ে চড়ে চড়ে খুঁজল। এদিকে তখন ডঃ সেন অবাক বিস্ময়ে পাহাড়ের দিকে চেয়ে আছেন।

রক ক্লাইম্বিং করার সময় লোহার নাল পাহাড়ের গায়ে পোঁতা হয় পা রাখার জন্য। তেমনি বড় বড় নাল প্রতাপগড়ের পাহাড়ের গায়ে কারা যেন পুঁতে রেখেছে। ডঃ সেন কয়েকজন মাওলী যুবককে উপরে উঠতে বললেন। শক্ত মজবুত লোহার রড় পাহাড়ের গায়ে গাঁথা। ডঃ সেনের সন্দেহ হল হয়ত যারা ভৌতিক শব্দ করে, তাদের লোকেরা এই সব ঘন ঘন বসানো লোহার রডের উপর পা রেখেই উপরে কোথাও ওঠে যায়। পা ফেলে ডঃ সেন আর পৃথ্বীরাজও কিছুটা উপরে উঠে গেল।

তখন বেশ উঁচু থেকে মাওলী যুবকদের চেঁচামেচি শোনা গেল। কিছুটা উপরে একটা পাথরের পাশে দাঁড়িয়ে ওরা চীৎকার করছে। কিছু যেন বলতে চাইছে ওরা। ভীষণ উত্তেজিত তারা।

যেখানে দাঁড়িয়ে কয়েকজন মাওলী চীৎকার করছিল, সেই পাথরের পিছনে বিরাট একটা সুড়ঙ্গের মুখ দেখা গেছে। তাই এত চেঁচামেচি। মোটা শরীর নিয়ে মিঃ ভালেরাও উপরে উঠে হাঁপাতে লাগলেন।

শুকনো ঘাস দিয়ে মশাল বানিয়ে, আগুন ধরিয়ে কয়েকজন যুবক সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পরে আবার তাদের চীৎকার শোনা গেল। সবাই সেখানে গিয়ে দেখতে পেল প্রায় পনের বিশ গজ ভিতরে, একটি লোক চিত হয়ে শুয়ে আছে। চিনতে দেরী মরে কাঠ হয়ে আছে। মৃত হ’লো না, এই সেই গাঁজাখোর পাগল। দেহ বাইরে বের করে, নীচে আনা হ’লো। কোন কঠিন কিছুর আঘাতে তার মাথা ফেটে গেছে। পৃথ্বীরাজ সর্দারের দিকে চাইতেই দু’জনার চোখা চোখি হ’লো, কিন্তু কেউ কিছুই বললো না। তাহ’লে পাগলটাই কাল রাত্রে তাদের খুন করতে চেয়েছিল।

একটি যুবক সুড়ঙ্গের মধ্য থেকে আরও কয়েকটি জিনিস কুড়িয়ে আর একটা পেল, দুটো বড় টর্চ লাইট। কাচগুলো নীল রং এর। লাউড স্পিকার, ভাঙা। আর একটা ক্যাসেট। ডঃ সেন ক্যাসেট টি মিঃ ভালেরাওকে দিয়ে বললেন :

—এটা পকেটে রাখুন। আর বোধ হয় অশ্বখুরধ্বনি প্রতাপগড়ে বাজবে না। কারণ আসল জিনিসটি এখন আপনার পকেটে।

— আমি মহাবালেশ্বর গিয়েই বাজিয়ে শুনব। এতো দেখছি একটা ইংরাজী ছবির ক্যাসেট!

বলেই তিনি উল্টেপাল্টে সেটা দেখে পকেটে পুরলেন।

ঠিক হলো, পর দিন সকালে পুলিশ বাহিনী এলে, পুরো সুরঙ্গটা সার্চ করা হবে। সার্চ লাইট, গ্যাস-মাস্ক—আরও অনেক কিছু জোগাড় করতে হবে। গোরেগাঁও-এ কয়েকজন পুলিশ পাঠাবার ব্যবস্থা করবেন রাত্রের জন্য—একথা বলে দারোগাবাবু চলে গেলেন। ভীষণ উত্তেজিত হয়ে, জীপে উঠতে গিয়ে পা ফসকে প্রায় পড়ে গিয়েছিলেন আর কি।

তেইশ

কিন্তু পরের দিনের জন্য সব কিছু অপেক্ষা করল না। প্রচণ্ড প্রতিহিংসায় দু’জন মাওলী যুবকের প্রাণ নিয়ে নিল অজ্ঞাত আততায়ীরা। রাত্রে সে কথা বেশী লোকে জানতে পারেনি। সে রাত্রে যে সব ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেল তার অভিজ্ঞতা ডঃ সেন আর পৃথ্বীরাজ জীবনেও ভুলতে পারবে না।

পাহাড় খুঁজে পাগলের মৃতদেহ পাবার পর তা পোস্ট মর্টেম করার জন্য ব্যবস্থা করে দারোগাবাবু চলে যান। সন্ধ্যার মুখে বিশ জন কনস্টেবল নিয়ে এক সাব-ইন্‌সপেক্টর এসে ডঃ সেনের সঙ্গে দেখা করল। ওরা রাত্রে গোরেগাঁও আর দুর্গের মধ্যেকার পথে পাহারা দেবে। সুড়ঙ্গের মুখ পাহারা দেবার জন্য লোকের ব্যবস্থাও হলো।

গোটা মাওলী পাড়াটা সারাদিন দারুণ উত্তেজনার মধ্যে কাটিয়ে ডঃ সেন সর্দারকে বিশেষ সন্ধ্যার পর একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। করে বলে দিয়েছেন, সন্ধ্যার পর কেউ যেন আজ বাইরে না যায়। রাত্রের খাওয়া দাওয়ার পর শুয়ে শুয়ে কথা হচ্ছিল।

—ছোটমামা! তোমার কি মনে হয় সুড়ঙ্গের মধ্যে খোঁজ করলে কিছু পাওয়া যাবে?

—সঠিক কিছু বলা যায় না। এবার ঘুমিয়ে পর। দেখা যাক কাল কি হয়। তবে আমাদের এখানের কাজ শেষ। এবার বাড়ি ফেরার কথা ভাব।

রোজকার মত ডায়েরী লেখা শেষ ক’রে ডঃ সেন ঘুমিয়ে পড়েছেন। মাওলী গ্রামও ঘুমন্ত। পাড়ার কুকুরগুলোও কোন সাড়া শব্দ করছে না। হয়ত পুলিশের দলের দু একজন ছাড়া সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তখনই দূর থেকে শত শত অশ্বখুরধ্বনি শোনা গেল।

অনেক ঘোড়া যেন বহুদূর থেকে ছুটে আসছে। সেই ধ্বনি ক্রমশঃ তীব্র হতে তীব্রতর হতে শুরু করলো। একদম কাছে প্রতাপগড়ের দক্ষিণে নয়, পশ্চিমে নয় এবার। একেবারে মাওলী গ্রামের দিকে দুর্গের পাদদেশে।

ডঃ সেনের ঘুম ভেঙে গেল। তাড়াতাড়ি পৃথ্বীরাজকে ঘুম থেকে তুলে, দুজনে পুলিশদের ডেকে তুললেন। প্রচণ্ড শক্তিশালী মাইক্রোফোনে, শক্তিশালী লাউড স্পিকারে শত শত খুরের ধ্বনি রাত্রের আকাশ কাঁপিয়ে দিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। সব কিছু চুপচাপ হয়ে গেল। তারপর হঠাৎ ভয়ংকর―রণ-হুংকার শোনা গেল— ‘হর হর মহাদেও’। যারা শুনেছে তাদের বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল।

অজানা আশংকায় অনেকেই ঘরের বাইরে আসেনি। সর্দার কয়েকজনকে নিয়ে ডঃ সেনের কাছে ছুটে এলো। বলল : – সাব। এদিকে কখনও এমন হয় নি। কার সর্বনাশ হয়ে গেল কে জানে। হায়, হায়।

রাত তখন একটা দেড়টা হবে। ডঃ সেন সাব ইন্‌সপেক্টরকে বললেন : আপনার লোক জনকে দুভাগ করে দুর্গের দক্ষিণ আর উত্তর-পূর্ব দিকের ছ’দিকের পথই অবরোধ করুন। কেউ যেন এই এলাকা থেকে পালাতে না পারে।

তারপর সর্দারকে বললেন : তুমি বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখতো গ্রামের সব লোক বাড়িতে আছে কিনা?

পৃথ্বীরাজ চুপ করে ছিল। বলল : ছোটমামা, আমাদের জন্য আজও এক হতভাগার জীবন গেল?

কিছুক্ষণ পরে উত্তেজিত সর্দার দৌড়ে ফিরে এলো। ছটি মাওলী যুবককে পাওয়া যাচ্ছে না। ডঃ সেন বললেন :

—হায় ভগবান। দু’টি প্রাণ আজ শেষ হলো। সর্দার তাড়াতাড়ি যত আলো, মশাল পারো শীঘ্র জোগাড় করো। আমরা এখুনি দুর্গে অনুসন্ধানে যাব।

চব্বিশ

দলে দলে মশাল নিয়ে চললো। পুলিশ সাব ইন্‌সপেক্টর বিরাট দল নিয়ে চলে গেল দুর্গের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। ডঃ সেন অন্য দল নিয়ে দুর্গের উপরে উঠতে শুরু করলেন। রণ-হুংকার সেদিক থেকেই এসেছে।

শেষ রাত্রের অন্ধকার তখন হাল্কা হয়ে এসেছে। মশাল হাতে সবাই দুর্গের চূড়ায় উঠেছে। সর্দার গুহাঘরের মধ্যে ঢুকেই চীৎকার করে বলল : সাব, জলদি আসো, দু’টো লোক এখানে শুয়ে আছে।

সবাই ভিতরে গিয়ে যা দেখলো, তাতে বিস্ময়ে, দুঃখে সকলের মন ভেঙে গেল। ছ’টি তরতাজা মাওলী যুবক চিত হয়ে শুয়ে আছে পাশাপাশি। যেন ঘুমুচ্ছে। তাদের চোখে মুখে তখনও আতংকের ছাপ। উন্মুক্ত বুকের নীচে পেট যেন ফালি ফালি করে ছেড়া। হিংস্র, বিভৎস হত্যা।

ডঃ সেন দুজনার নাড়ি পরীক্ষা করে দেখলেন, অনেকক্ষণ মারা গেছে। কিন্তু একজনের পেটের কাছে কিছু একটা চিক্‌মিক্‌ করে উঠলো। ডঃ সেন হাতে তুলে দেখলেন, সেটা স্টীলের একটা ‘বাঘ নখ’। হত্যাকারীরা হাতের পাঁচ আঙ্গুলেই হয়তো পড়েছিল। একটি খুলে পড়ে গেছে!

মৃতদেহ নিয়ে সবাই নীচে গ্রামে এলো। সারা গ্রামে দুঃখের ছায়া। ভোর হতেই মিঃ ভালেরাও গোরেগাঁও এলেন। ডঃ সেনকে বললেন : খবর কি এদিককার। পুলিশ সুপার মিঃ ভোসলে বিরাট বাহিনী নিয়ে আসছেন দশটার মধ্যে। আপনি মশাই যাদু জানেন? কালকের টেপ বাজিয়ে, যা বলেছেন, তাই শুনতে পেলাম।

কোন কথা না বলে ডঃ সেন সেই স্টীলের বাঘ নখটা দারোগার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন :

—এই দেখুন, সেই ভৌতিক বাঘ নখ। ওদের আরও টেপ, ছিল। কাল রাত্রে বাজিয়েছে, আর দুজন মাওলীকে খুন করেছে। ঐ দেখুন গ্রামের লোক কান্নাকাটি করছে।

—বলেন কি, অ্যাঁ?

বলেই দারোগাবাবু মৃতদেহ দেখতে গেলেন। ডঃ সেন বললেন : —হত্যাকারীরা এই এলাকা থেকে পালাতে পারে নি। ওরা এখানেই কোথাও আছে। আপনার পুলিশ আর মাওলী যুবকেরা কাউকে দুর্গের কাছে আসতে দিচ্ছে না, কাউকে চলে যেতে দেওয়াও হচ্ছে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *