তিনকাল – ৫

পাঁচ

অসিতেশ বেশ নামী কোম্পানিতে আছে। চৌরঙ্গির ওপর আকাশছোঁয়া বাড়ি, নানা জায়গায় তার ভিন্ন ভিন্ন ডিভিশন। কম মাইনের যুগে দু’-তিনবার কোম্পানি বদলেছে, কখনও বেশি মাইনের লোভে, কখনও মনে হয়েছে যোগ্য সমাদর পাচ্ছে না। আরেকটু ভাল সুযোগ পেলেই অমিতার সঙ্গে আলোচনায় বসে যেত। এখানে কি কি অসুবিধে, ওখানে কি কি সম্ভাবনা। অমিতা সাধ্যমতো পরামর্শ দিত, কারণ তখন অসিতেশ অমিতার মতামতকে গুরুত্ব দিত। শেষবার এই অফিসটায় যখন এল অমিতাও দারুণ খুশি। শুধু মাইনে অনেক বেড়ে গেল বলেই নয়, কোম্পানির নামটাও লোকের কাছে বলার মতো। বাড়িটাও যেতে আসতে চোখে পড়ে। ট্যাক্সির আমলে বাড়িটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মুকুলকে, টুটুকে দেখিয়ে বলেছে, বাবার অফিস। অর্থাৎ তোদের বাবার অফিস। বলার সময় বেশ আপ্লুত বোধ করেছে। অমিতা নিজেও যখন চাকরি করত তখন অসিতেশও ছোট প্রতিষ্ঠানে। কর্মীর সংখ্যাও সেখানে কম। সে সময় প্রয়োজনে হুটহাট করে অমিতাও চলে গেছে কোনও কোনও দুপুরে বা বিকেলের দিকে। সটান গিয়ে বসেছে, গল্প করেছে। হয়তো দু’জনে একসঙ্গে বেরিয়ে বাড়ি ফিরেছে। প্রথম প্রথম ভিড়ের বাস, অমিতা সঙ্গে থাকলে শেয়ারের ট্যাক্সি। অসিতেশ হয়তো গোটা একটা ট্যাক্সিই নিতে চেয়েছে, অমিতা রাজি হয়নি। ফালতু খরচে একেবারে রাজি হত না। ফ্ল্যাট কিনতে হবে না! দু’জনের রোজগারে একটা ফ্ল্যাট কেনাই তখন একমাত্র লক্ষ্য।

ওই ছোটখাটো অফিসে যখনই গেছে দু’-চারটি ফিটফাট মেয়েকে কাজ করতে দেখেছে। নিজেদের প্রতিষ্ঠানে ও অমিতাই একমাত্র মহিলা ছিল না, বেশ কয়েকজনই ছিল। ছিমছাম চেহারার কোনও একজনকে দেখলে তাকে নিয়ে বাড়িতে দু-একটা সরস রসিকতা করতেও ছাড়ত না।

অসিতেশের এই বড় কোম্পানিতে মেয়েদের সংখ্যা এত বেশি যে, তাদের কাউকে নিয়ে রসিকতা করতেও ইচ্ছে হয়নি। দু’-একবার এ অফিসেও গিয়েছে, রিসেপশনিস্ট মেয়েটি অসিতেশের স্ত্রী পরিচয়টুকু জানার সঙ্গে সঙ্গে এত সদয় সৌজন্য দেখিয়েছে যে তাকে নিয়ে কোনও পরিহাস করা অভদ্রতা হত।

ক্রমে ক্রমে উন্নতি হয়েছে অসিতেশের। পৃথক চেম্বার, টেবিলে তিন তিনটি টেলিফোন। ঠাণ্ডা ঘর। কষ্টের টাকায় কেনা ছোট্ট ফ্ল্যাট চাবিবন্ধ পড়ে রইল, তখন কোম্পানির দেওয়া বিশাল ফ্ল্যাট, গাড়ি, ড্রাইভার। আর অসিতেশ তখন সদাই কর্মব্যস্ত। ফিরে আসত ক্লান্ত শরীর টেনে টেনে, গলার টাইয়ের ফাঁস খোলার মতো শক্তিটুকুও যেন নেই। সংসারে কোনও দিকে চোখ দেওয়ার সময়ই নেই, ইচ্ছেও না।

জরুরি প্রয়োজনে একবার অফিসে গিয়েছিল অমিতা।

রিসেপসনিস্ট মেয়েটি বদল হয়ে গেছে, সে পরিচয় পেয়েও প্রোফেশনাল ভদ্র হাসি দুলিয়ে বললে, পাবেন কি, দেখি!

ইন্টারকমে ফোন করে বললে, সরি, মীটিং-এ আছেন।

অমিতা বেশ আহত বোধ করল। মেয়েটির ওপরই ভেতরে ভেতরে চটে গেল, প্রকাশ করল না। বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, আরে, আমি ওর স্ত্রী, ধর্মপত্নী, যাকে কলেজ লাইফ থেকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখে এসেছিল। আমি তাকে বিয়ে করে কৃতার্থ করেছি। খবর দাও, ও এক্ষনি এসে ডেকে নিয়ে যাবে। ওর চেম্বারে।

ব্যক্তিত্ব হারানো ভিতু ভিতু মুখে ওকে বলতে হ’ল, আমি কি তা হলে একটু বসব?

মেয়েটি আবার আপ্যায়নী হাসি ঝরাল, বসবেন? ওঁর সময় হবে বলে তো মনে হয় না। এম ডি-র সঙ্গে মীটিং তো।

আত্মমর্যাদায় ঘা লেগেছে। ফোনে বোঝাতে পারবে না বলেই এসেছে। কাজটাও জরুরি। সংসারের জরুরি কাজগুলো যে অফিসের জরুরি কাজের কাছে তুচ্ছ তা তো অমিতার জানার কথা। তবু আত্মসম্মানে লাগল।

জেদ করেই যেন বললে, তবু বসি কিছুক্ষণ।

অনেকক্ষণ বসে থাকার পর বেশ বিনীতভাবেই বললে, এবার দেখুন, যদি এসে থাকে।

মেয়েটি ফোন তুলল, কার সঙ্গে যেন কথা বলল। তারপর, সরি, এখনও ফেরেননি মীটিং থেকে।

এরপর আর কোনও দিন যায়নি, এমনকি অফিসে ফোনও করত না। এমন একজন কর্মব্যস্ত মানুষকে কাজের মধ্যে ফোন করাও অপরাধ মনে হত।

রিসেপসনিস্ট মেয়েটির বিরুদ্ধে একটা চাপা অনুযোগ নিয়েই রাত্তিরে বলেছিল, দুপুরে তোমার অফিসে গিয়েছিলাম।

—তাই বুঝি? তারপরই : আই ওয়াজ সো বিজি, কথা বলতেই পারতাম না।

কাগজগুলো এগিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে অমিতা।

একটু পরে দরজার এপার থেকেই বললে, লোকটা চলে গেছে। সন্ধেবেলা আসতে বলেছিলাম, ফিরে গেল। বলে গেল, আসতে পারবে না, পৌঁছে দিতে বলেছে।

উত্তর এল, সই করে দিয়েছি, তুমিই তা হ’লে দিয়ে এসো। আমার সময় হবে না।

সে দিনের ঘটনাটা মনে পড়ে গেল বড় অ্যালবামটা খুলে ছবিগুলো দেখতে দেখতে।

ছবিগুলো দেখতে দেখতে স্বগতোক্তি করল, এর নাম উন্নতি।

ধাপে ধাপে উন্নতি হয়েছে অসিতেশের, আর সেই সব সময়ের গ্রুপফটো সাঁটা আছে অ্যালবামের পাতায়। কারও ফেয়ারওয়েল পার্টি, কখনও কোনও গেট টুগেদার। কখনও কারও প্রোমোশনের জন্যে অভিনন্দন। তিরিশ চল্লিশজন লোকের মুখ। একেবারে শেষ লাইনের কোনা ঘেঁষে দাঁড়ানো অসিতেশ কেমন একটু একটু করে মাঝখানে এসেছে, এগিয়ে এসেছে সামনের লাইনে এবং শেষে একেবারে সামনের চেয়ারে এক পাশে বসা অবস্থা থেকে এম ডি.-র মাত্র দু’ চেয়ার দূরে আত্মসচেতন ভাব নিয়ে বসা। এই অ্যালবামটা ওর উন্নতির দলিল। এই ছবিগুলোয় মেয়েদের মুখও যেন ধীরে ধীরে বেড়েছে। শেষ ছবিটায় অনেকগুলি মুখ। ছবির নীচে নামগুলো দেওয়া আছে, ছাপার অক্ষরে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে দেখল বেশির ভাগই অবাঙালি। চার পাঁচজনকে চিনতে পারল। চাপে পড়ে কয়েকবার অফিসের পার্টিতে যেতে হয়েছে। সেখানেই দেখেছে বা আলাপ হয়েছে। এখনও যে মাঝে মাঝে যেতে হয় না তা নয়। তবে কদাচিৎ যায়। এ নিয়ে মনোমালিন্যও কম হয় না। কোনও কোনও বার অসিতেশ এমন ভাবে অনুরোধ করে, যেন বিনয়ের অবতার। আসলে অমিতা অনেক আগেই বুঝে গেছে ওর পার্টিতে যাওয়া অসিতেশের স্ট্যাটাস সিম্বল। না গেলে খারাপ দেখায়, সম্মান থাকে না, তাই। ইদানীং আর জিদ করে না।

কেন? ‘একদা সুন্দরী’ হয়ে গেছে বলে!

শেষ ছবিটায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মেয়েদের মুখগুলো দেখছিল। ম্যাগনিফাইং গ্লাস থাকলে আরও ভাল বোঝা যেত। কোথায় যে রেখেছে মনে পড়ছে না।

আসলে ও মেলাতে চাইছিল, মেলে কি না খুঁজে দেখছিল।

অথচ মুখটাই ওর মনে নেই, স্পষ্ট করে দেখতেও পায়নি। শুধু উজ্জ্বল এক ঝলক বিদ্যুৎ মনে হয়েছিল। এ রকম কোনও মেয়ের পাল্লায় যদি পড়ে থাকে….

অমিতার বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। ও নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিল। বহুকাল আগে থেকেই তো অসিতেশ ওর মনের ভেতর থেকে দূরে সরে গেছে। ও নিজেই বুঝতে পারে। তা হলে প্রেম ভালবাসা বলে কিছু নেই? শরীরই সব?

মুকুল আর ছেলে দেখে ফেলবে এই ভয়ে, নাকি অসিতেশের সঙ্গে চোখোচোখি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ও চট করে দোকানে ঢুকে পড়েছিল। ভাল করে মেয়েটিকে দেখাও হয়নি। দেখার খুব ইচ্ছে ছিল। কত সুন্দরী সে? আমার চেয়ে অনেক, অনেক? নাকি তার মধ্যে অসিতেশ অন্য কোনও চটক দেখেছে?

অ্যালবামটা আলমারির মধ্যে তুলে রেখে কি মনে হতে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল।

বহুবার ইচ্ছে হয়েছে, তবু নিজের দিকে তাকায়নি। তাকানোর ইচ্ছেই হয়নি। নিছক চুল আঁচড়েছে, হঠাৎ হঠাৎ টিপ পরেছে, পাফ বুলিয়েছে। ওগুলোও যেন সংসারের অঙ্গ।

ভাল করে তাকিয়ে দেখল আয়নায়। সাদা চুলগুলো বড় বেশি প্রকট হয়ে ওর দিকে তাকাচ্ছে। গালের ভাঁজে গলায় বয়েসের ছাপ পড়েছে কি?

চুলে কলপ লাগানোর কথা মনে আসতেই হেসে ফেলল অমিতা।

যাকে এই মুহূর্তে ছেড়ে চলে যেতে পারলে স্বস্তি পেত, তাকেই টেনে রাখার কথা ভাবতে পারছে কি করে।

অসিতেশ বহুকাল আগে থেকেই চুলে কলপ লাগিয়ে আসছে।

তাতে অমিতার যে আপত্তি ছিল তাও নয়।

একটা নামী পার্লারে মাঝেমাঝে গিয়ে চুল কালো করে আসে অসিতেশ।

একবার ঠাট্টা করে অমিতা বলেছিল, এ বয়েসে ইয়াং সেজে কি লাভ।

অমিতার মনে একটা ক্ষীণ সন্দেহ ছিল, ভাবতে ভালও লাগছিল যে ওর কাছেই অসিতেশ ইয়াং থাকতে চাইছে।

ভুল ভেঙে গেল।

অসিতেশ বললে, ওপরওয়ালাদের চোখে ইয়াং না থাকলে ওপরের চেয়ারে পৌঁছনো যায় না।

অমিতা বললে, ওপরওয়ালারা অত নির্বোধ নয়। তারা মাথার ওপরের চুল সাদা না কালো তা দেখে না, মাথার ভেতরে কি আছে সেটাই দেখে।

—সেটাও আছে, যথেষ্ট পরিমাণে।

সাকশেস বোধহয় অহঙ্কার দেয়, অহঙ্কার বাড়িয়ে তোলে। আর সেটাই অপছন্দ করত অমিতা। দূরত্ব বেড়েছে বোধহয় সে কারণেই। একসময় পরস্পর পরস্পরকে সমান সমান মনে করত। একজন আরেকজনের যুক্তি পরামর্শ শুনত। সাফল্য হয়তো অসিতেশের মনে একটা ধারণা এনে দিয়েছিল, ও নিজেই সব কিছু ভাল বোঝে। অমিতার সঙ্গে আলোচনা করা অর্থহীন, ও অনেক নিচু স্তরের মানুষ। অতএব আমিই সংসার, আমাকে কেন্দ্র করেই সংসার চলছে, এমন একটা ধারণা হয়েছিল অসিতেশের। অন্তত অমিতার সে রকমই মনে হয়। সংসারে শান্তি রাখার জন্যে একটু একটু করে ও তা মেনেও নিয়েছিল। মেনে নেবার চেষ্টা করত। সকলেই হয়তো তাই করে। দাদু-দিদার কথা মনে পড়ে যায়। ছেলেবেলায় মায়ের অনুযোগও কম শোনেনি, তবু দেখে বোঝা যেত কোথাও কোনও চিড় ধরেনি। রিটায়ারমেন্টের পর বাবা বড় তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। মাও। ওই অত বড় বাড়িটায় মা আর বাবা একা হয়ে গেছে। বাড়িটাকেও বার্ধক্যের রোগে ধরেছে। তবু অমিতা যে দিন মুকুল আর ছেলেকে নিয়ে দেখা করে আসতে গিয়েছিল, দু’জনের মুখে সমান হাসি দেখেছে। যেন হঠাৎ আনন্দে ভরে উঠেছে বাড়িটা। দুটো মানুষের চার হাত এক হয়ে গিয়ে মেয়ে আর নাতি নাতনিকে কতখানি আদর আপ্যায়ন করা যায়, ভালবাসা বিলিয়ে দিয়ে বুক ভরিয়ে নেওয়া যায় সে জন্যেই ব্যস্ত। যতই একাকিত্ব থাক, মনে হয়েছে ওরা পরস্পরকে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। এও কি নিজের অস্তিত্ব মুছে দিয়ে মানিয়ে নেওয়া? হয়তো তাই। হয়তো ওরাও শৈশবে দেখা সেই দাদু-দিদার মতো হয়ে গেছে।

কিন্তু অমিতা পারছে না কেন! এত মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও পারেনি কেন?

এখন তো আর সে সবের কোনও প্রশ্নই নেই। সে দিনের দেখা ঘটনার পর।

উমা বলেছিল, তুই তো কো-এড কলেজে পড়া মেয়ে, তুই এ সব কি বলছিস? ছোট্ট একটা কি দেখলি আর এত সব ভেবে বসেছিস।

আসলে উমাকে ও সব কথা বলতে পারেনি, বললেও বোঝাতে পারত না। সেই বিদ্যুৎ ঝলকের মতো মেয়েটার মুখ দেখতে পেলে আরও স্পষ্ট বুঝতে পারত ও। কিংবা অসিতেশের সামনাসামনি হয়ে গেলে তার বিভ্রান্ত মুখও সব কথা বলে দিত।

এই রকম বিভ্রান্ত মুখ একদিন দেখেছিল।

শীত চলে যাওয়ার পর শীতের পোশাক-আশাক শাল-আলোয়ান সব স্তূপীকৃত করে রাখছিল ডাইং ক্লীনিঙে পাঠানোর জন্যে। সে জন্যেই কোটের ট্রাউজার্সের পকেট হাতড়ে হাতড়ে দেখছিল কিছু আছে কি না। টাকার ব্যাগ, চাবি, জরুরি কাগজপত্র কিছু থাকলে একবার যদি চলে যায় ফেরত পাওয়া যাবে না।

মুকুল আর ছেলের পোশাক বের করা, টিফিন সাজানো আর অন্য কি এক সাংসারিক ব্যস্ততায় একবার পকেট হাতড়ে দেখতে ভুলে গিয়েছিল।

অসিতেশ অফিস থেকে ফিরে আগের দিনের কোটটাই খুঁজল, তার পকেটে কি এক জরুরি কাগজ ছিল।

ম্রিয়মাণ মুখে অমিতাকে বলতে হল, ওটা ধুতে পাঠিয়েছি।

সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড চটে গেল অসিতেশ। —পকেটগুলোও হাত ঢুকিয়ে দেখতে পার না? কি করো কি সারাদিন?

কাচুমাচু মুখে অমিতা চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। ‘কি করো কি সারাদিন?’ ওর কি ধারণা বাড়িতে কাজের লোক থাকলেই গৃহিণীদের আর কোনও কাজ থাকে না। শুয়েবসে কেটে যায়?

ওর রাগ আর চিৎকারের সামনে নিজে রীতিমত ছোট হয়ে গিয়েছিল অমিতা, ছোট লাগছিল। দোষটা নিজের বলেই আরও অপমান লাগছিল। এত জরুরি যখন, নিজেই তো বের করে রাখতে পারতে! মনে এল, কিন্তু বলতে পারল না।

অসিতেশ বললে, যাও গিয়ে এখনই বের করে নিয়ে এসো, দোকান বন্ধ হয়নি এখনও। একটা কার্ড, ভিজিটিং কার্ড, একজনের ফোন নম্বর লেখা আছে।

ভাগ্য ভাল ড্রাইভার তখনও চলে যায়নি।

ডাইং ক্লীনিঙের দোকানটা সবে বন্ধ হচ্ছে।

কার্ডের কথা বলতেই লোকটা হাসি-হাসি মুখে বললে, আছে, বের করে রেখেছি। কাল সকালে আসুন, দিয়ে দেব।

পুরনো চেনা দোকান, তারাই অমিতাকে তোয়াজ করে আসছে। তাকেই উদ্বেগ উৎকণ্ঠার কাঁদো কাঁদো স্বরে তোষামোদ করতে হল, তার মন ভেজাবার জন্যে।

শাটার টানছিল, আবার তুলল।

কার্ডটা বের করে এনে দিল। আঃ, কি স্বস্তি।

হাসি হাসি মুখ করে বাড়ি ফিরেছিল সে দিন।

তার পর থেকে আর কাপড় ধুতে পাঠানোর আগে পকেট হাতড়ে দেখতে ভুল হত না।

সেজন্যেই শীতের পোশাকগুলো ডাইং ক্লীনিঙে পাঠানোর আগে পকেট উল্টে উল্টে দেখছিল।

হাতে একটা ছোটখাটো কাগজ বেরোল। বের করে ভাঁজ খুলে দেখল একটা ক্যাশ মেমো। বেশ নামী দোকানের।

কি জিনিস কৌতূহল হতে পড়ে দেখল। এক ডজন লেডীজ রুমাল। বেশ দামি।

ভেবেছিল হয়তো ওর জন্যেই কিনেছে, কিংবা মুকুলের জন্যে। কিন্তু রুমালের প্যাকেট গেল কোথায়। কাল ফিরে এসে দেয়নি। কোথাও ফেলে আসেনি তো? নাকি গাড়িতেই পড়ে আছে। গাড়িতে পড়ে থাকলে অবশ্য ড্রাইভার রামভজন দিয়ে যেত। অথবা সকালে যে গাড়ি ধোয় সে দিয়ে যেত। গাড়ি ধোয়ার লোকটা অবশ্য মেরে দিতেও পারে।

মনে মনে ভাবল, ইস, এত টাকা দামের রুমাল, নির্ঘাত ফেলে এসেছে কোথাও।

এত দামি রুমাল কেনাই বা কেন। বলতে হবে। অমিতার জন্যে হলে কোনও মানেই হয় না, ও কোথায় বা যাচ্ছে! মুকুলের জন্যে হলে, বলতে হবে এখন থেকে ওকে এত দামি জিনিস ব্যবহারে অভ্যস্ত করা উচিত নয়।

অসিতেশ অফিস থেকে ফিরতেই ও ক্যাশ মেমোটা এগিয়ে দিল।

–তোমার পকেটে ছিল।

ক্যাশ মেমোটা হাতে নিল অসিতেশ, সঙ্গে সঙ্গে ওকে কেমন বিভ্রান্ত দেখাল।

তবু কিছু সন্দেহ করেনি অমিতা।

ও ভেবেছিল ওটা কিনে কোথাও ফেলে এসেছে বলেই অসিতেশের মুখের চেহারা বদলে গেল।

সে কথাই বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই ক্যাশ মেমোটা নাড়াচাড়া করে উল্টো পিঠটা দেখে বলে উঠল, ওঃ, এই নম্বরটা।

উল্টো পিঠটা দেখাল। পেন্সিলে লেখা একটা নম্বর।

যে-ভাবে দেখাল খটকা লাগারই কথা।

অমিতার ভুরুতে ভাঁজ পড়ল।

অসিতেশ বললে, ফাইল নম্বরটা লেখার জন্যে কাগজ চাইলাম, মিসেস গিডভানি এটাই দিল।

তারপরই : বাব্বা, এত দামি রুমাল কেনে ও?

মিসেস গিডভানিকে অনেক দিন আগে একবার দেখেছিল অমিতা। কি একটা কাজে রবিবারে বাড়িতে এসেছিল।

অসিতেশের পি এ না সেক্রেটারি কি যেন। মোটাসোটা এক বয়স্ক মহিলা। দেখতেও সুশ্রী বলা যায় না।

বিদঘুটে চেহারার জন্যে পছন্দ হয়নি, আবার নিশ্চিন্তও হয়েছিল।

তবু হেসে বলেছিল, আর মেয়ে পেলে না।

অসিতেশ গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলেছিল, দারুণ শার্প।

অমিতার মনে হয়েছিল, হতেও পারে, হয়তো হাতের কাছে এটাই ছিল, সেটাই এগিয়ে দিয়েছে।

ঘটনাটা ভুলেও গিয়েছিল।

আবার মনে পড়ে গেল। আর উমা ভাবল কিনা, নিউ মার্কেটের দৃশ্যটা দেখে ও অকারণ সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠেছে।

যেন ওর উচিত অসিতেশের পিছনে গোয়েন্দা লাগিয়ে সব জানা।

যেন ডিভোর্সের মামলা খাড়া করার জন্যে এ সব দরকার।

এ বয়েসে ডিভোর্সের কথা ও ভাবতেই পারে না।

কিন্তু এই এক ছাদের নীচে থাকাও অসম্ভব। অসিতেশের ওপর ঘৃণা ছাড়া ওর মনে এখন আর কিছুই নেই। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে আত্মমর্যাদাই সবচেয়ে বড় অনুভূতি যা পরস্পরকে রক্ষা করে চলতে হয়। একজনের আত্মসম্মানে ক্রমাগত আঘাত দিলে সে সম্পর্ক টেকে না। মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস আত্মসম্মান। অসিতেশ ডিভোর্স চাইলেও ও দিতে রাজি নয়। আবার এই অসম্মানের মধ্যেও থাকতে পারবে না।

অথচ ও কি করবে খুঁজে পাচ্ছিল না। সে জন্যেই আরও অসহায় লাগছে।

এই বয়েসে নতুন করে অসিতেশ যদি ওই নচ্ছার মেয়েটার চটক দেখে ভুলে থাকে, প্রেমে পড়ে থাকে, তা হলে তো ও ডিভোর্স চাইতেও পারে। চাইবেই। কিন্তু এত সহজে অমিতাই বা ওকে মুক্তি দেবে যদি কেন। যদি প্রেমে পড়ে থাকে! প্রেম শব্দটা মনে হতেই হাসি পেল ওর। প্রেম আবার কি, ওটা তো নিছক শরীরের সম্পর্ক ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। যে শরীর অমিতার হারিয়ে গেছে। আশ্চর্য, শরীর হারিয়ে গেলেই কি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় নাকি? যায় না! সে সম্পর্ক প্রেম ভালবাসার চেয়েও অনেক গভীর। যা দাদু-দিদার মধ্যে ছিল। বাবা-মা’র মধ্যে আছে। অথচ অমিতা আর অসিতেশের মধ্যে কবেই উবে গেছে। কারণ অসিতেশ তার অ্যাম্বিশনের নেশায় ওই গভীর সম্পর্কটাই কোনও দিন গড়ে তুলতে চেষ্টা করেনি।

ওই ছোট্ট ফ্ল্যাটটা তালাবন্ধ হয়ে পড়ে আছে। ওটা কেনার পিছনে অমিতার নিজেকেও যৌবনের সুখ আর সঞ্চিত টাকা দিয়ে দিতে হয়েছিল। অসিতেশ কয়েকবারই ওটা বেচে দেওয়ার কথা বলেছে, ও রাজি হয়নি। এখন বললে ও হয়তো বেচে দিয়ে পুরো টাকাটাই দিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তার পরিবর্তে ডিভোর্স চেয়ে বসবে। কে জানে নাও চাইতে পারে। আজকাল তো ডিভোর্সের প্রয়োজন হয় না। আইন এড়ানো সম্পর্ক নিয়েও সকলের চোখের সামনে থাকা যায়, ঘুরে বেড়ানো যায়। কেউ কিছু মনে করে না, সমাজ মেনে নেয়, বড়জোর আড়ালে মুচকি হেসে ব্যাপারটাকে তাচ্ছিল্য দেখায়।

সময় কত কিছু বদলে দিচ্ছে, বদলে দেয়।

অমিতার মনে হল মেয়েরা যতই এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছে ততই যেন নিরাপত্তা হারিয়ে ফেলছে। অথচ ওরা নিরাপত্তার খোঁজেই এগিয়ে যেতে চেয়েছিল। শিক্ষা, চাকরি, ভালভাবে বাঁচা, স্বাধীনতা কিংবা আত্মমর্যাদা— সবই তো সেই সিকিউরিটির সন্ধান। দাদু-দিদাকে দেখেছে, স্বাধীনতা কাকে বলে, নিরাপত্তা কি জিনিস দিদা জানতই না। জানার ইচ্ছেও ছিল না। বাবা-মাকে দেখেছে, রাগারাগি করত কখনও কখনও, পরস্পরকে খোঁটা দিতেও ছাড়ত না, অথচ পরস্পরের ওপর অপার বিশ্বাস, তুমি তোমার বাইরের জগৎ নিয়ে থাকো, ঘরের জগৎটা আমার। সেখানে আমি পূর্ণ স্বাধীন।

আর অমিতা? অমিতাও বিশ্বাস করতে চেয়েছিল। ‘তোমার নামে থাকাও যা আমার নামে থাকাও তাই। ‘ এক কথায় চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিল। খোঁজ রাখেনি সময় পাল্টে যাচ্ছে। মানুষ ক্রমশই শুধু আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। শুধু আমি-সর্বস্ব। স্ত্রী-পুত্রকন্যা, সমাজ, এই পৃথিবী শুধু আমার জন্যে। সমস্ত কিছুই শুধু আমার উপভোগের সামগ্রী। আমার মূল্যেই তারা মূল্যবান।

ফেরার পথ শুধু একটাই। বাবা-মা। অবসন্ন-হৃদয় দু’টি বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। যাদের হৃদয়ের মধ্যে কোনও দিন কারও স্থানাভাব হবে না, অমিতা জানে। আর ওই জীর্ণ, পলেস্তারা খসা, শ্যাওলা ধরা পুরনো দিনের বাড়িটা। পুরনো দিনের বলেই ওর হৃদয়টাও অনেক বড়। যারই প্রয়োজন হোক আশ্রয় দিতে কার্পণ্য করবে না। বড়দি বলেছিল, ওতে তো আমাদেরও অংশ আছে। বাড়িটা সে সব কোনও দিন ভাবেনি, ভাবে না। ও শুধু দু’ হাত বাড়িয়ে কাছে নেবার জন্যে, বুকের ভেতরে টেনে নেবার জন্যে আকুল হয়ে আছে। হয়তো কান্না থমথম চোখে। বাবা-মা’র মতোই।

দুঃখ পাবে বাবা-মা, অমিতা জানে। কিন্তু একা হয়ে যাওয়া ওই মানুষ দুটিকে সুখও তো দিতে পারবে ও। সঙ্গ। তার চেয়ে বড় সুখ আর কি আছে।

মুকুলকে ডাকল অমিতা, আয় মুকুল তোর সঙ্গে অনেক কথা আছে।

মুখে হাসি আনার চেষ্টা করল।

সে দিনের রাগ এখনও পুষে রেখেছে কি না জানে না।

‘তুমিও তো ক্লাসমেটকে বিয়ে করেছিলে, খারাপ হয়েছে কিছু?’ কথাটা সেদিন ওকে বড় একটা ধাক্কা দিয়েছিল। কিছুক্ষণের জন্যে নিজেকে বিভ্রান্ত লেগেছিল।

মুকুল কলেজে বেরিয়ে যাওয়ার পর চোখে জল এসে গিয়েছিল।

তুই আমার বুকের ভেতরটা তো কোনও দিন দেখতে পাসনি মুকুল। তুই জানবি কি করে। জানলে তোরা হয়তো আমার জন্যে দুঃখ পাবি, কষ্ট পাবি, সে জন্যেই জানতে দিইনি, আড়াল করে রেখেছি চিরটা কাল। আমি চাইনি তোদের কাছে তোর বাবার অসম্মান হোক। সে জন্যেই তোরা কিছু জানতে পারিসনি। কিন্তু আজ যে তোদের না বলে উপায় নেই। আমাকে সব বলতে হবে।

অমিতা কষ্টের হাসি হাসল। ক্লাসমেট ক্লাসমেট বলেছিলি কেন। আসল কালপ্রিট তো কোনও ক্লাসমেট নয়, কোনও বন্ধু নয়, কোনও প্রেমিক নয়। আসল অপরাধী এই সময়। চারপাশের দেওয়ালগুলো ভেঙে দিয়ে সমাজটাকে বদলাতে চেয়েছে এই সময়। মানুষগুলোকে মুক্তি দিতে চেয়েছে। অথচ দেখো, মানুষের মনই বদলে ফেলেছে।

মুকুল বললে, তার আগে তোমার সঙ্গে আমারও অনেক কথা আছে।

অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকাল অমিতা। ওর ভেতর পর্যন্ত নড়ে উঠল। ভয় পেল। কি বলবে মুকুল? অমিতার মতোই কি কোনও ভুল করে বসেছে ও!

মুখে হাসি টেনে বললে, সে দিন তুমি আমাকে এত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলে বলেই রেগে গিয়েছিলাম। একটু সেন্ট মেখে কলেজে গেলেই ভেবে নাও কেন, কারও প্রেমে পড়ে গেছি!

হেসে বললে, তোমরা কেউ বদলাও না মা।

একটু থেমে : তুমিই বলেছিলে, ফ্রক পরা বয়েসে পাশের বাড়িতে দোল খেলতে গিয়েছিলে….

হাসতে হাসতে বললে, আমারও সে দিন ঠিক সে-ই রকমই খারাপ লেগেছিল।

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, আমরা অত ঝপ করে কারও প্রেমে পড়ি না, মা।

হাসল।

হঠাৎ হেসে উঠে বললে, আজ অনিন্দ্যকে নিয়ে আসব, আমার খুব বন্ধু।

থামল।

বললে, ওকে আমার বেশ ভাল লাগে, তুমি একটু আলাপ করে দেখো না! বেশ ব্রাইট ছেলে।

স্নেহ আর কৌতুকে মেশা হাসিটা চেপে দিল অমিতা। বললে, বেশ তো। কিন্তু তোর সঙ্গে আমার যে অনেক জরুরি কথা আছে।

—কি কথা?

অমিতা কিভাবে বলবে খুঁজে পাচ্ছে না। একটু বিব্রত দেখাল ওকে।

তারপর হঠাৎ বললে, তোদের দু’জনকে নিয়ে আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাই। আমি আর পারছি না রে, পারছি না।

দু’ চোখ জলে ভেসে গেল।

এতকাল লুকিয়ে লুকিয়ে রেখে মেয়ের কাছে সব খুলে বলা যে কি কষ্ট!

ক্বচিৎ কখনও মায়ের বিমর্ষ মুখ ও দেখেছে। বর্ষার দিনে ব্যালকনির ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের চোখ কখনও উদভ্রান্ত মনে হয়েছে। কিন্তু সে সবকে নিতান্ত সাময়িক মনে করে কোনও দিন গুরুত্ব দেয়নি।

তাই মাকে এভাবে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখে মুকুল অবাক হয়ে গেল। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর দুঃখটা কোথায় খুঁজে বের করতে চাইল। ও তো মাকে চিরকাল সুখী ভেবে এসেছে। সুখী হওয়ার জন্যে মানুষের যা কিছু চাই সবই তো পেয়েছে মা। মাসিদের কাছে শুনেছে মা দারুণ সুন্দরী ছিল। যে দেখত সে-ই রূপের প্রশংসা করত। সে সৌন্দর্য মুকুল শুধু অ্যালবামের ছবিতেই দেখেছে, শৈশবে দেখা মায়ের সেই চেহারা ওর মনেও পড়ে না। কারণ মাকে তো ও চিরকাল সুন্দর দেখে আসছে, মায়ের আজকের চেহারাও ঠিক তেমনি সুন্দরই মনে হয়। দাদুর কাছে শুনেছে লেখাপড়ায় যা আশা করেছিলেন, তার চেয়েও ভাল রেজাল্ট দেখিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল মা। নিজের চেষ্টায় ভাল চাকরিও পেয়েছিল। নিজের পছন্দমতো বিয়েও করেছে। মাসিদের কাছে শুনেছে, প্রেমের বিয়ে। বন্ধুদের মায়ের সঙ্গে তুলনা করে ওর গর্ব হয়। ‘তোর মা কি মডার্ন রে, অমন মা পেলে বর্তে যেতাম।’ কে এক বন্ধু বলেছিল। এই বিশাল ফ্ল্যাট, দামি ঘরজোড়া কার্পেট, বন্ধুদের চোখ ঝলসে দেবার মতো আসবাবপত্র, গাড়ি, ড্রাইভার, মায়ের হাতে পরিপাটি করে সাজানো সংসার, সবার ওপরে বাবার মতো স্মার্ট হ্যান্ডসাম স্বামী, গর্ব করে বলার মতো চাকরি, এই সচ্ছলতা! এ ছাড়া আর কি চায়; চাইতে পারে কোনও মহিলা। বাইরে থেকে দেখলে তো যে কেউ মাকে সুখী মনে করবে। তা হলে তার কিসের দুঃখ।

মজা এই, দুঃখের কোনও ছবি হয় না, কাউকে এঁকে দেখানো যায় না। বুকের গোপনে লুকিয়ে রাখা কষ্ট প্রকাশ করার কোনও ভাষা নেই। ওটা শুধু কোনও কোনও মুহূর্তে তার বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে আবিষ্কার করতে হয়, চোখের অশ্রুবিন্দুতেও তার প্রতিবিম্ব পড়ে না।

—কেন মা, কি হয়েছে? অবাক হয়ে প্রশ্ন করল মুকুল।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অমিতা। বললে, বোস মুকুল, তোকে আমার অনেক কথা বলার আছে।

অমিতা এই মুহূর্তটার কথা বহু দিন ধরে বহু বার ভেবেছে। ওর ভয় ছিল, বলতে গিয়ে ও শুধু কান্নায় ভেঙে পড়বে, গুছিয়ে বলতে পারবে না। কোনটার পর কোনটা বলবে ঠিক করতে না পেরে মুকুলকে শুধুই বিভ্রান্ত করে তুলবে। সব কথা তো ওর মনেও নেই। ভুলে গেছে, ভুলে যাবার চেষ্টা করেছে। রয়ে গেছে শুধু ক্ষতটুকুই। সেটা ক্রমশ বেড়েছে, জ্বালা ধরিয়েছে। কোন কথা কোথায় লাগে, কোন ব্যবহার কতখানি আঘাত দেয় তা কি অন্যকে বোঝানো যায়!

আশ্চর্য, বলতে গিয়ে অমিতা দেখল ও কিছুই ভোলেনি। সব একে একে মনে পড়ে যাচ্ছে। একে একে সব বলে গেল অমিতা, সব। সেই অভাব অনটনের দিনে কি কষ্ট সহ্য করেছে। ‘সকালে রান্না করে দিয়ে অফিস গিয়েছি, ফিরে এসে রান্না করেছি।’ যা কিছু সঞ্চয় ছিল কি নিঃস্বার্থভাবে ঢেলে দিয়েছে, বাবার দেওয়া গহনা। আর অসিতেশের সাকশেস আসার সঙ্গে সঙ্গে মানুষটা কত দূরে সরে গেছে, ব্যবহার বদলে ফেলেছে।

ভেবেছিল শেষ অবধি বলবে না। বলতেই হল।

সেই ক্যাশ মেমো, নিউ মার্কেটে দেখা এক ঝলক বিদ্যুতের মতো একটি মেয়ে। নিঃসন্দেহে অল্পবয়সী। তারও আগে পিসতুতো বোনের দেওয়া গোপন খবর : হ্যাঁ রে অমু, গাড়িতে অসিতেশের সঙ্গে সুন্দর মতো একটা মেয়েকে দেখলাম, খুব হাসাহাসি করে গল্প করছিল, ভাল করে দেখতে পেলাম না, স্পীডে বেরিয়ে গেল। বললে, একটু খোঁজ নিস।

হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল অমিতা : কাকে দেখতে কাকে দেখেছিস।

একটু থেমে বলেছে, হতেও পারে, হয়তো অফিসের কেউ। কোথাও কাজে যাচ্ছে।

কি গভীর বিশ্বাস ছিল তখন।

অমিতার কথা শুনতে খুব খারাপ লাগছিল মুকুলের। ছেলেবেলা থেকে বাবাকে জেনে এসেছে একজন আদর্শ পুরুষ। বাবার আদলেই একজন অদেখা কল্পনার হীরো বানিয়ে এসেছে। তার জন্যে মাও কম দায়ী নয়। ছেলেবেলা থেকে বাবার সম্পর্কে ওর মনে এত শ্রদ্ধা জাগিয়ে এসেছে মা নিজেই। আর আজ এ সব কি কথা বলছে মা! মায়ের জন্যে ব্যথা পাচ্ছিল মুকুল, কষ্ট হচ্ছিল ওর বুকের মধ্যে। কিন্তু বাবার ছবিটা কিছুতেই যেন বদলাতে পারছে না। ঘৃণা করতে ইচ্ছে হচ্ছে, তবু ঘৃণা করতে পারছে না।

শেষে ওই অদেখা মেয়েটার কথা বলল অমিতা। অমিতা জানে, চরিত্রহীন স্বামীকে কোনও স্ত্রী সহ্য করতে পারে না। তার কাছে এর চেয়ে বড় অসম্মান আর কিছু নেই। তেমনই চরিত্রহীন কোনও বাবাকেও সহ্য করতে পারে না কোনও সন্তান। ছেলেমেয়েদের কাছে সেটাই সবচেয়ে বড় অসম্মান। এর চেয়ে বড় গ্লানি আর নেই।

পিসতুতো বোনের কথা, ক্যাশমেমোর কথা, নিউ মার্কেটে এক ঝলক দেখা মেয়েটির কথা বলে গেল অমিতা।

আর পর মুহূর্তেই অমিতা অবাক হয়ে গেল। মুকুল অবাক হবার ভঙ্গিতে বলে উঠল, সো হোয়াট?

যেন ব্যাপারটা কিছুই নয়।

মুকুল বললে, দেখো মা, তুমি আর যা কিছু বললে, সবই মেনে নিচ্ছি, শুনতে আমারও কষ্ট হচ্ছে। বাবা তোমাকে কোনও দিন তোমার প্রাপ্য সম্মান দেয়নি বলে রাগ হচ্ছে। কিন্তু এত দিন আমাদের জানতে দাওনি কেন?

অমিতা বিষণ্ণ গলায় বললে, তোদের সুখের কথা ভেবে। তোদের দুঃখ দিতে চাইনি।

তারপর কান্নার স্বরে বলে উঠল, আমি অনেক সহ্য করেছি, আর পারছি না রে, পারছি না।

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, এ বাড়িতে আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি বাবার কাছেই চলে যাব। লক্ষ্মীটি, তোরাও আমার সঙ্গে চল। তোদের ছেড়েও যে আমি থাকতে পারব না।

একটু থেমে বললে, টুটুকেও তুই বোঝা, ওকে আমি বলতে পারব না।

মুকুল কোনও জবাব দিচ্ছিল না, চুপ করে ছিল।

অমিতাও চুপ করে থেকে কান্নার চোখে বললে, যাবি তো?

মুকুল অনেকক্ষণ চুপ করে রইল, মায়ের মুখের দিকে ও তাকাতে পারছিল না, চোখে চোখ রাখতে পারছিল না।

তারপর মাথা নিচু করে বললে, না মা, তা হয় না।

মুকুলের কাছ থেকে এমন একটা কথা শুনতে হবে কল্পনাও করেনি অমিতা।

ওর দু’চোখ জলে ভেসে গেল। আকুলভাবে বলে উঠল, কেন হয় না মুকুল, কেন হয় না?

মাথা নিচু করেই রইল ও, চোখ তুলে তাকাতে পারছে না।

বললে, মা, তোমার দুঃখ তোমার কষ্ট তোমার অপমান আমি সবই বুঝতে পারছি। কিন্তু মা, বি প্রাকটিক্যাল।

ধীরে ধীরে মাথা তুলল এবার। বললে, চলে যাবে বলছ, ওটা তোমার রাগ, অভিমান।

সব শোনার পরেও মুকুল ওকে এভাবে বাধা দেবে ভাবেনি অমিতা। ওর ধারণা ছিল, মুকুল আর টুটুও এ বাড়ি ছেড়ে ওর সঙ্গে যেতে রাজি হবে।

অমিতার বড় অসহায় লাগল। তবু বলে উঠল, না রে মুকুল, রাগ অভিমান নয়। ওটা আত্মসম্মান। আত্মসম্মানের চেয়ে বড় আর কিছু নেই।

মৃদু হাসল মুকুল। বললে, সেল্ফ-রেসপেক্ট? ওটা তো একটা ছেঁদো কথা, তোমাদের যুগের কথা। এ যুগে মানুষকে প্রাকটিক্যাল হতে হয়। বি প্রাকটিক্যাল।

অবাক চোখে তাকিয়ে রইল ও মুকুলের দিকে। মুকুলের কোনও কথাই ও বুঝতে পারছে না। যেন সম্পূর্ণ অন্য ভাষায় কথা বলছে ও।

মুকুল আবার বললে, তোমার দুঃখ আমি বুঝি মা, তোমার কষ্ট আমি বুঝি। তোমাকে অসম্মান নিয়ে থাকতে হচ্ছে তাও জানি। কিন্তু ভেবে দেখো, যারা চাকরি করে তারাও অনেক অসম্মান সহ্য করে থাকে।

কি বলছে মুকুল, এ কোন ভাষায় কথা বলছে। একটা বর্ণও তো ও বুঝতে পারছে না। ও কি ভুলে গেছে যে আমি ওর বাবার স্ত্রী, যাকে ভালবেসে বিয়ে করেছিলাম, দু’জনে মিলে একটা সংসার গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম। আত্মসম্মান আর পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিতের ওপর।

অসহায়তায় ওর মুখ বিবর্ণ।

মুকুল তখনও বলছে, তোমার এই সাতচল্লিশ বছর বয়েসে কে চাকরি দেবে, কিসের ওপর দাঁড়াবে। আমাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছ? দাদুর ওই পেনশনের টাকায় ওই পোড়ো বাড়িটাই মেরামত করতে পারে না। আমরা তো তোমার মতো কষ্টে মানুষ হইনি মা। হতে দাওনি। এই ফ্ল্যাট, এই গাড়ি, এই সব পোশাক, বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজনদের সমীহ— এসব ছেড়ে তুচ্ছ একটা আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা যায় না মা, বেঁচে থাকা যায় না।

অমিতার দু’চোখ তখন জলে ভেসে যাচ্ছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ও মুকুলের দিকে।

বলতে চাইল, তোরা একালের মানুষ, তোরা বুঝতে পারবি না, আত্মসম্মানই আমদের সবচেয়ে বড় পুঁজি। সহ্য করেছি, ভুলে থাকতে চেয়েছি, শুধু তোদের মুখ চেয়ে।

অমিতার মনে হল সত্যি মুকুলের কোনও দোষ নেই। ও কি করে বুঝবে আমাকে। সময় যে সব বদলে দেয়। আমি বাবা-মাকে বুঝতে পারিনি, পাশের বাড়ি দোল খেলতে গিয়েছিলাম বলে কেন রেগে গিয়েছিল মা বুঝতে পারিনি। দাদু-দিদাকেও বুঝিনি, শুধুই হাসাহাসি করেছি।

এখন এতকাল পরে, অমিতার মনে হল, আমার আর কিছুই করার নেই, একটা বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে শুধুই অপেক্ষা করে থাকতে হবে। বিবর্ণ মুখে।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *