তিনকাল – ২

দুই

তারানাথকে এ পাড়ায় চেনে না এমন লোক নেই। পাড়ায় প্রসিদ্ধি ঘটে নানা কারণে। বাড়িতে বুলডগ এবং গ্যেটে লেখা ‘কুকুর হইতে সাবধান’ তার একটি। বাড়িতে কোনও বদ্ধ-উন্মাদ ছেলে বা নতচক্ষু লাজুক এবং সুন্দরী মেয়ে থাকলেও বাবারা বিখ্যাত হয়ে যান, অবশ্যই পাড়ায়। অমিতা কম বয়েসে সুন্দরী ছিল, যার স্মৃতি এখনও তার প্রৌঢ়ত্ব ছুঁই-ছুঁই শরীরের কিঞ্চিদধিক মেদসঞ্চয় ও যৎকিঞ্চিৎ সাদা চুলের বেয়াড়াপনা উপেক্ষা করেও আবিষ্কার করা যায়। পাড়ায় তারানাথের পরিচয় এ সবের একটি কারণেও নয়। অমিতাও কোনওকালে নতচক্ষু লাজুক ছিল না। স্কুলের বয়েস থেকে ও উজ্জ্বল এবং ঋজু, এবং সেই বয়েস থেকেই যে কোনও লোকের সঙ্গে হেসে দু’ কথা না বলে ও পাশ কাটিয়ে যেত না। এবং মজার কথা, কোনও লোকের সঙ্গেই ও দু’-চার কথার বেশি অপব্যয় করত না। অথচ কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে এই মেয়েই অনর্গল। সমবয়সী বা প্রেমিক হওয়ার উপযুক্ত যুবকদের তাই অমিতাকে দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, এ মেয়ে দোকানের শো-কেসে সাজানো থাকলে প্রাইস-ট্যাগ অর্থাৎ দাম লেখা কার্ডটিতে নির্ঘাত লেখা থাকবে : মূল্য : দুর্লভ। সুতরাং ‘প্রেম’ নামক বায়বীয় বস্তুটি অমিতার কাছে অধরা থেকে যাওয়া বিস্ময়কর নয়। হৃদয়ে প্রেমসঞ্চার ঘটতে হলে কিছুটা দূরত্ব প্রয়োজন, অথচ এ মেয়ে বড় চটপট বেশি কাছে এসে যায়। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই যখন ভ্রম দূর হয়, বোঝা যায় এই কাছে আসা প্রায় দূরবীনে দূরবস্তুর কাছে আসার মতো কাচের ও পিঠে রাখা হাতে এ পিঠ থেকে হাত রাখলে ব্যবধান সামান্যই মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দুস্তর। ছোঁয়াই যায় না।

অমিতা এ সব কিছুই বুঝত না, কারণ কেউই নিজেকে দেখতে পায় না।

অথচ ওর মনে যে ঈষৎ শূন্যতা ছিল না তাও নয়। কিন্তু সামনে কোনও গন্তব্য থাকলে অনেক সময় শূন্যতা টের পাওয়া যায় না। এক সময় গন্তব্য ছিল ভাল রেজাল্ট, তারপর গন্তব্য পাল্টে চাকরি, আরও ভাল চাকরি।

ভবানীপুরের এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি মেয়ে চাকরি করে, কেউ কেউ ভাল চাকরি।

সুতরাং তারানাথকে যে এ পাড়ার সকলেই চেনে এবং কিঞ্চিৎ সমীহ করে তার কারণ অমিতা বা অমিতার চাকরি নয়।

আসলে এই বাড়িটাকেই সকলে অনেককাল থেকে দেখে আসছে। হয়তো প্রথম দিকে বাড়িটার গায়ে কিছু দুর্নামও লেখা ছিল। কর্পোরেশনে চাকরি করে এই প্রকাণ্ড বাড়ি হাঁকানোর যুক্তিযুক্ত কারণ খুঁজে না পাওয়ার জন্যে। কিন্তু তার পর তো দিনকালই পাল্টে গেল, একা কর্পোরেশন আর সন্দেহজনক রইল না। ব্যাঙের ছাতার মতো সরকারি অফিস বাড়তে লাগল, বেসরকারিও কম নয়। সেই সব স্থানে-অস্থানে কর্মরত ব্যক্তিরাও পাড়ার পুরনো বাড়ি কিনে নিয়ে তিনতলা চারতলা তুলে ফেলল। তার অনেকগুলিরই ইতিহাস রহস্যময়। ফলে তারানাথের পিতাঠাকুরের দুর্নাম কবেই মুছে গেছে। মুছে দিয়েছেন স্বয়ং তারানাথ।

তারানাথ একটি সরকারি অফিসে চাকরি করে এসেছেন, পদমর্যাদাও গোপন রাখার মতো নয়। শার্ট-কোট-ট্রাউজার্সে ফিটফাট হয়ে অফিসে গেলেও বাড়ি ফিরে ধুতি-গেঞ্জি, লোকজন এলে বড়জোর ফুলহাতা টুইলের শার্ট। ঝিনুকের বোতাম গলা অবধি আঁটা।

বাড়িটা ল্যান্সডাউন আর জগুবাজারের মাঝামাঝি জায়গায়, কেউ দেখা করতে এলে একটাই অনুযোগ : অনেকখানি হেঁটে আসতে হয়। তারানাথের নিজের কোনও অভিযোগ নেই। একে তো ছেলেবেলা থেকেই হেঁটে গিয়ে বাসট্রাম ধরার অভ্যাস, (তখন ট্রাম ছিল) তা ছাড়া নিজের বাড়ি—এই বোধটুকুই অনেক কষ্ট লাঘব করে দেয়।

বাবার সম্পর্কে বাজারে কিছু কানাঘুষো আছে জানতেন বলেই কিনা কে জানে, তারানাথ নিজে খুব ভালমানুষ হবার চেষ্টা করেছেন।

সকালে বাজার যাওয়ার সময় দেখা হলে হরসুন্দরবাবু মাঝে মাঝে বলেন, আপনি তো নমস্য ব্যক্তি। সত্যি সত্যি হেসে একটা নমস্কারও করেন।

চশমা পরা রিকশাওয়ালা যেমন দেখা যায় না, তেমনি কলকাতায় হরসুন্দরবাবুদেরও দেখা পাওয়া দুরূহ।

চাকরিবাকরি ভালই করেন ভদ্রলোক, কিন্তু ভোরবেলায় বালতি আর খুরপি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। দু’ পাশের চওড়া ফুটপাথ জুড়ে যে এত সুন্দর সুন্দর ফুলের গাছ, সাদা নুড়ি পাথর কিংবা রঙিন ইট দিয়ে গোল করে ঘেরা, এ সব ওঁরই কীর্তি। পাড়ার ইজ্জতই বাড়িয়ে দিয়েছেন। যদিও প্রথম প্রথম দু’-একজন ওঁকে মালি বলে ভুল করেছে। উনি যখন একমনে কাজ করে যান, একাগ্রমনে, তখন তাঁর পাশে অঙ্কনরত গণেশ পাইনকে দেখলে কি আরও একনিষ্ঠ মনে হবে? হরসুন্দরবাবু প্রশংসা পান, মৃদু সমালোচনা এবং ফালতু অ্যাডভাইসও।

হরসুন্দরবাবু তারানাথকে নমস্য ব্যক্তি বলেন শুধুই নিজের বিনয়ী চরিত্রের জন্যে নয়। আসলে এ পাড়ায় তারানাথের মতো পরোপকারী মানুষ খুব কম। পাড়ায় ঝঞ্ঝাট তো জল সপ্লাই, ডাস্টবিন সরানো, জঞ্জাল পরিষ্কার কিংবা দু’-একজনের প্ল্যান স্যাংশন। বাবার সহকর্মীদের অনেকের সঙ্গেই তারানাথের চেনাজানা ছিল, কর্পোরেশন নামক ওই গোলকধাঁধায় কে কোথায় বসে এবং কখন আসে, এই সব ঘাঁতঘোঁত ওঁর জানা ছিল বলেই যেচে এগিয়ে যেতেন। অনেক অসাধ্যসাধন করেছেন। সে জন্যেই পাড়ায় তাঁকে চেনে না এমন লোক নেই।

লোকেও যেচে উপকার করতে এসেছে। সম্ভবত অমিতা সুন্দরী এবং শিক্ষিতা বলেই। তার ওপর চাকুরে।

—মেয়ের বিয়ে দিন এবার। হাতে পাত্র আছে ভাল, বলেন তো…

অমিতা শুনে বলেছে, ওদের মাথা ঘামাতে বারণ করো। আমার বিয়ে, যদি করি, আমিই করব।

তারানাথ সে কথা মনে মনে ভেবেই রেখেছেন। বাবা-মা’র ওপর ভরসা করে বিয়ে করবে এমন মেয়েই নয় ও, তা জানেন।

‘যদি করি’ কথাটা খট করে কানে লাগল স্বর্ণলতার। তারানাথের স্ত্রী, অর্থাৎ অমিতার মা।

মায়ের মন বুঝবে কেন, হাসিহাসি মুখে বললেন, সবই তো হল, এবার একটা বিয়ে করে ফেললেই আমরা নিশ্চিন্ত।

সব বাবা-মা তাই ভাবে। অনেকের ক্ষেত্রে যে ওটাই সমস্যার শুরু হয়ে দেখা দেয়, তা জেনেও। যেমন অনেক মেয়ে ভাবে বাবা-মা’র কাছে থাকার সময় কোথাও এতটুকু স্বাধীনতা নেই। পদে পদে বাধা। একবার বিয়ে হয়ে গেলে স্বামীকে নিয়ে অখণ্ড স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতা খণ্ড খণ্ড হয়ে যেতে সময় লাগে না।

তারানাথ আর স্বর্ণলতার বড় খারাপ লাগত। প্ৰথম প্ৰথম ভাবতেন বিয়ে করব না মানে বিশেষ একজন আছে যাকে বিয়ে করবে। পরে ভুল ভাঙল।

চোখের সামনে একটা মেয়ে নিত্যদিন অফিস যাচ্ছে, আসছে, ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ছে, কিংবা টিভি দেখছে। কলেজে পড়ার সময়ে তবু বন্ধুবান্ধব ছিল, বাড়িতেও আসত তারা, হইহল্লা আড্ডা, তখন কিছু মনে হত না। একটা মেয়ে, এই কচি বয়েসের মেয়ে, দুদ্দাড় করে অফিসে বেরিয়ে যায়, সন্ধেবেলা ক্লান্তভাবে ফেরে, তারপর চুপচাপ নিজের ঘরে, কার আর দেখতে ভাল লাগে।

তারানাথ বললেন, ইজ দিস এ লাইফ? এটা কি একটা জীবন নাকি!

অমিতা হেসে ফেলল।

স্বর্ণলতা বললেন, হাসিস না। এরপর লোকে বলবে মেয়ের রোজগারে খাচ্ছি।

অমিতা অবাক হয়ে বলল, তা কেন বলবে। বাবা কি চাকরি করছে না?

—তবু বলে।

তারানাথ অনেক দিন ধরেই লক্ষ করছিলেন। মাঝে মেয়ের একটা প্রোমোশনের কথা শুনেও কোনও উল্লাস হল না। লোকে তো মেয়ে চায় বাড়িতে হাসি-উল্লাস থাকবে বলে। রেকর্ডে ক্যাসেটে গান বাজবে বলে। বাড়িটা আনন্দে খুশিতে ভরে থাকবে বলে।

অথচ সব থেকেও কি যেন নেই। চুপচাপ, একঘেয়ে, মায়ের সঙ্গে তর্কবিতর্কও করে না। অথচ কোনও দুঃখ আছে বলেও তো মনে হয় না।

ভেবে ভেবে মনে হল, বোরড়। একটানা একঘেয়ে চাকরিতে কোনও আনন্দ থাকার তো কথা নয়।

মেয়ে চাকরি পাওয়ার পর একদিন বলেছিলেন, হ্যাঁ রে, অফিসে তুই কি হংসমধ্যে বক যথা?

পুরনো চালের মানুষ, তাই রসিকতাও পুরনো ধরনের। অর্থাৎ জানতে চাইছিলেন অফিসে একমাত্র মেয়ে চাকুরে কি না।

বুঝতে অসুবিধা হয়নি অমিতার, জন্মাবধি বাবার কথা এই ধরনের বলেই। হেসে বলেছে, যে হারে বাড়ছে, পুরুষরাই এরপর বক হয়ে যাবে। আমাদের অফিসে বিস্তর।

—তা হলে বাড়ি ফিরে গোমড়া মুখে বসে থাকিস কেন? তাদের নিয়ে এসে আড্ডা দিলে তো পারিস।

অমিতা হেসেছে : আড্ডা মানে তো পলিটিক্স আর পরচর্চা।

অমিতার নিজেরও অবাক লাগে, এমনকি নিজেকে নিয়েও। ওর সমবয়সী মেয়েরাও অফিসে ঢুকেই ক্রমে ক্রমে কেমন বদলে যায়। দু’ দিন আগে কলেজে ইউনিভার্সিটিতে কত তরতাজা—কত স্বপ্ন, উচ্চাশা, তার মধ্যে স্বার্থচিন্তা থাকে না বললেই চলে। দেশ, মানুষ, সমাজ—কত কি নিয়ে ভাবে। আদর্শ বলে কি এক অদৃশ্য বস্তু সব সময় চোখের সামনে থাকে। অফিসে ঢুকেই কেন যে পাল্টে যায়। নিজেকে দেখেও বুঝতে পারে।

একটা কথা অবশ্য বলল না, যদিও মুখে এসে গিয়েছিল। বলতে বাধল।

কে আর সময় নষ্ট করে ওর সঙ্গে আড্ডা দিতে আসবে। তারা বেশির ভাগই তো বিবাহিতা, স্বামী ছাড়া সন্তানও আছে এবং তার জন্যে এক একদিন এক এক রকম দুশ্চিন্তা। আর বাকি ক’জন তো প্রেমিকের সঙ্গে লেপ্টে থাকে, বিয়ের অপেক্ষায়। এ কথা বাবাকে বলা যায় না, বললেই : তা তুই এবার একটা বিয়ে করে ফেললেই তো পারিস, আমাদের কোনও আপত্তি নেই।

আজকাল কেউই বড় একটা আপত্তি করে না। আপত্তি করার মতো খুব গুরুতর কারণ না থাকলে। সব বাবা-মা জেনে গেছে বিয়ে দেওয়া এখন অনেক কঠিন কাজ। শুধু টাকা ঢাললেই হয় না, ও সব ছোটাছুটি শরীরেও পোষায় না। আর তার পরও তো গভীর অনিশ্চয়তা। তার চেয়ে নিজেরা করলে অনেকখানি দায়মুক্ত। যদিও সে ক্ষেত্রেও দায়মুক্ত হওয়া যায় কি না সন্দেহ। এই যে ছেলেবন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশায় তেমন আপত্তি না করা। এর মধ্যে উদারতা কতখানি সন্দেহ আছে, আসলে এ-ও হয়তো এক ধরনের প্রশ্রয়। দায় থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে।

ষোলো-সতেরোয় অমিতার একবার প্রেম-প্রেম ভাব এসেছিল। বেশি দূর এগোয়নি। বুকে যে খুব একটা ক্ষত রেখে গেছে তাও নয়। বেবাক ভুলেই গেছে। আর ও পথে এগোয়নি, কারণ বাধা হয়ে দাঁড়ায় ওর ব্যক্তিত্ব। সেই যে ছেলেবেলা থেকে ঘাড় উঁচু করে হাঁটতে শিখেছিল, সেটাই বাধা কি না কে জানে।

তারানাথ বললেন, কতকাল ছুটি নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাইনি, ভাল লাগে না।

একটু থেমে বললেন, তোর তো ছুটি পাওনা হয়েছে, চল না দিনকয়েক পুরী বেড়িয়ে আসি। যাবি?

কথাটার মধ্যে অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে এমন সন্দেহ করার কিছু খুঁজে পাওয়ার কথা নয়।

বাবাকে দেখে, মাকে দেখে, অমিতার নিজেরই এক একসময় খারাপ লাগে। ওদের জন্যে একটা চাপা কষ্টও আছে। সে জন্যেই মাঝে মাঝে মনে হত, বেশ তো আছি। বাবা-মাকে বৃদ্ধ বয়েসে সঙ্গ দিতে পারার মধ্যেও সার্থকতা থাকে। আমি তো সত্যি সত্যি স্যাক্রিফাইস করছি না। লোকে অবশ্য তাই বলবে। জীবনটা বাবা-মা’র জন্যে নষ্ট করে দিল। অমন সুন্দরী মেয়ে…

সুন্দরী হওয়ার এই এক সুবিধে। বিয়ে হয়নি এ কথা কেউ ভাববে না।

বাবার কথাটা ওকে যেন ভীষণভাবে নাড়া দিল।

পুরনো দিনের বাড়ি, কিন্তু বেশ বড়সড়। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, দু’ মেয়ের বিয়ে এ সব মিটিয়ে বাড়িটার মেরামতি খরচ জোগানোর মতো মাইনেপত্তর ছিল না প্রথম দিকে, পরে টাকাপয়সার অভাব তেমন না থাকলেও উৎসাহ চলে গেছে। রং ফেরানো হয় না, দেওয়ালের শ্যাওলা চেঁছে তুলে ফেলার কথা মনেই পড়ে না।

তারানাথের একটিই ছেলে। ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করত। গর্বে ভরে উঠত তারানাথের বুক। অমিতাও গর্ব করে ওর বন্ধুদের বলেছে। তারপর সেই ছেলে কুয়েতে চাকরি নিয়ে চলে গেল। দু-একবার এসেছিল, ওখানেই বিয়ে করেছে, একটি গুজরাতি মেয়েকে। ব্যস, তারপর আর আসার নাম করে না। বড় মেয়ে বাঙ্গালোরে, মেজ দুর্গাপুরে। সে তবু কখনও সখনও আসে। নাতি নাতনিদের নিয়ে তারানাথের সে বড় আনন্দের দিন। একটা ছোট্ট শিশুর সঙ্গ পেলে মনে হয় স্বর্গসুখ। প্রকৃতি বা ঈশ্বর যার ওপরই বিশ্বাস রাখো না কেন, সে মানুষকে সব বয়েসের জন্যে কিছু না কিছু সুখের ব্যবস্থাও করে রেখেছে। মানুষ নিজেই যদি সেই সুখগুলোকে উপড়ে ফেলে, তা হলে ছায়া পাবে কোথায়। যে দেবার তাকে দোষ দিয়ে লাভ কি। সে গ্রীষ্মের রোদ্দুর যদি দিয়ে থাকে গাছের ছায়াও দিয়েছে।

অমিতাকে নিয়ে তারানাথ আর স্বর্ণলতার একটা স্বপ্ন ছিল। বিয়ে-থা করবে, নাতি নাতনি উপহার দেবে, কাছে না থাক কাছে-কাছে থাকবে।

পুরী বেড়াতে যাবার একটু ইচ্ছে যে হল না অমিতার, তা নয়। ওর মনে হল দিনকয়েক ঘুরে এলে মন্দ কি। তার চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিল দুটো সমস্যা। এই বাড়িতে, কাজের লোক থাকলেও, একা-একা থাকবে কি করে? ও ক’টা দিন তো বাড়ি ফিরতেই ইচ্ছে হবে না। দ্বিতীয় ভয়, ও না গেলে ওকে একা রেখে বাবা-মাও যাবে না। মানুষটার জীবনে কিছুই তো নেই। মায়ের জীবনেই বা কি আছে। একটু বেড়িয়ে আসার ইচ্ছে হয়েছে, সেটুকুও কেড়ে নেবে!

অমিতা এক মুহূর্ত কি যেন ভাবল, তারপর হেসে বললে, বেশ তো, চলো না। ছুটি নিয়ে নেব।

একটু থেমে বললে, আমাদের কোম্পানির একটা হলিডে-হোম আছে, খবর নেব?

তারানাথ বললেন, পাবি? তা হলে তো খুবই ভাল হয়।

না, পায়নি। ওর নতুন চাকরি, পুরনোরা আঁটঘাঁট জানে, অনেক আগে থেকে বুক করে রেখেছে।

অতএব হোটেল।

দুর্গাপুর খবর পেয়েই নেচে উঠল, আমরাও যাব।

তারানাথ এক ঝাড় শিউলি ফোটা গাছ। বললেন, গ্র্যান্ড।

স্বর্ণলতা খুশি। সবাই একসঙ্গে হলে কি ভাল যে লাগবে!

তারানাথ হাসলেন, সবাই বলছ কেন? সে বাবু তো আমাদের ত্যাগই করেছে। আরেকজন আমাদের ভুলেই গেছে।

ক্ষোভ অবশ্য ছেলের বিরুদ্ধেই বেশি। কি লাভ হল এত লেখাপড়া করিয়ে, ব্রিলিয়েন্ট হয়ে? শুধু টাকা রোজগারের জন্যে?

একবার চিঠিতে লিখেছিল : বাড়িটা ঠিকমতো মেনটেন করো, দরকার হলে জানিয়ো, টাকা পাঠাব।

চিঠিটা পেয়ে খেপে গিয়েছিলেন, ছেলে আমাকে টাকা দেখাচ্ছে, তোর টাকায় আমি ইয়ে করি।

স্বর্ণলতা শান্তস্বরে বলেছে, তুমি চুপ করে বসো তো, প্রেসার বেড়ে যাচ্ছে।

অমিতার সামনেই বলেছিলেন তারানাথ, ওই অভব্য কথাটা। বাবার মুখে ও কোনও দিন কোনও অশালীন কথা শোনেনি। তাই বুঝতে অসুবিধা হল না, এই প্রচণ্ড রাগের পিছনে বাবার বুকে কতখানি চাপা কষ্ট লুকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছে দাদাকে নিয়ে এত গর্ব ওর, এত ভাল মনে হত দাদাকে, সে তো প্রচুর টাকা জমিয়েছে, প্রচুর, তার পরও এই বাড়িটার ওপর লোভ? তার পরই মনে হয়েছে, ভুল, লোভ বাড়িটার ওপর নয়, শৈশবের স্মৃতির ওপর। যদি কোনও দিন ফিরে আসে, আসবেই, তখন হয়তো এই বাড়িটাই ওকে শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। অমিতা এর একখানা ঘর পেলেই খুশি, না পেলেই বা কি। মেসে-হস্টেলে চলে যাবে, কিংবা পেয়িংগেস্ট হয়ে থাকবে।

বড়দি অবশ্য একদিন বলেছিল, এ বাড়িতে আমাদের সকলেরই রাইট আছে।

শুনতে খুব খারাপ লেগেছিল, মনে হয়েছিল বড়দি যেন এখনই বাবাকে দিয়ে লিখিয়ে নিতে চায়।

স্বর্ণলতার বাইরে বেড়াতে যাওয়ার শখ ষোলো আনা। ছেলেমেয়েরা যখন বেশ ছোট, কয়েকবার গোয়ালছাড়া হয়ে চরে বেড়াতে পেরেছেন। তারপর থেকে এক ছেলে তিন মেয়ের সংসারে ছুটি জিনিসটা কোনও দিন আদায় করতে পারেননি। ওদের স্কুল, স্কুলের পরীক্ষা, তার ফাঁকে যদি বা ওদের ছুটি হয়, তখন পুজোর ভিড় আর পরীক্ষার পর এতগুলো ছেলেমেয়ের শীতের পোশাক সঙ্গে নিতে হবে, এই আতঙ্কেই যাওয়া হত না। ওরা কলেজে ওঠার পর একবার দু’বার কাছেপিঠে গিয়েছিলেন।

বেড়ানোর কথা কখনও ছেলেমেয়েরা তুললে স্বর্ণলতা গম্ভীর মুখে বলতেন, যে গোয়ালে ঢুকিয়েছে তোর বাবা সেখান থেকে কি আর ছুটি পাব।

মায়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা চাপা ক্ষোভ দেখে ওরা বিষণ্ণ হত, কিন্তু হেসে উঠে একে অপরকে বলত, মা আমাদের সব গরু বলছে, শুনছিস।

তারানাথ বলতেন, আমাকে রাখাল বলছে, আমি ঢুকিয়েছি তো, গোয়ালে।

অবশেষে যেটুকু বা ক্ষোভ, হাসাহাসির মধ্যেই উবে যেত।

অথচ পুরী বেড়াতে যাওয়ার কথায় স্বর্ণলতাই বাধা দিয়ে বসেছিলেন।

—বাড়িঘর ফাঁকা রেখে যাবে? যা দিনকাল …

তারানাথ আসলে যে নিজে বেড়াতে যেতে চাইছিলেন, তা তো নয়। অমিতার কথা ভেবেই বলেছিলেন। সেও রাজি। মা বাগড়া দিচ্ছে দেখে যদি বেঁকে বসে সেই আশঙ্কায় রাগতস্বরে বললেন, কি সোনাদানা আছে, যেটুকু আছে সে তো লকারে।

তারপর : হরসুন্দরবাবুকে বলে যাব একটু চোখ রাখতে, পাশের ওই ভবানীবাবুরাও তো রইলেন।

হরসুন্দরবাবু তো এমনিই চোখ রাখেন, বাড়তি কাজ একবার করে বাড়িটার দিকে তাকানো।

এক একজন মানুষের এক এক এক রকম নেশা। হরসুন্দরবাবুর নেশা পুরো রাস্তাটাকে সুন্দর করা। ফুটপাথ দু’ দিকেই বেশ চওড়া, সিমেন্ট বাঁধানো ছিল এককালে, সব উঠে গিয়ে ঘাস হয়ে গিয়েছিল। সেই ঘাস বেশি মাথা তুললে হরসুন্দরবাবু নিজের হাতেই ছেঁটে দেন। আর মাঝে মাঝে কোত্থেকে সব ফুলের গাছ কিনে এনে দিব্যি ছোট ছোট ফুল গাছের দ্বীপ বানিয়ে তোলেন। চারপাশ ঘিরে কোথাও ইটের জাফরি করা ঘের, কোথাও জাল দিয়ে ঘিরে দেন। রাস্তার টিউবওয়েল থেকে বালতি করে জল এনে ভোর সকালে তাদের তেষ্টা মেটান। ইটের ঘের দিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত নন, লাল রং এনে ব্রাশে করে সেগুলোকে রঙিন করে দেন মাঝে মাঝে, জালগুলোর রং সবুজ। খরচখরচা সব নিজের, তবে আসল খরচ ওই শরীরের পরিশ্রম। কেউ বললে গায়ে মাখেন না, বলেন, শরীর ফিট থাকে। তারানাথবাবু একদিন দেখেন, কোত্থেকে এনে সাদা গোল গোল বা ডিমের মতো মসৃণ নুড়ি পাথর বিছিয়ে দিয়েছেন ফুলগাছের চারপাশে। তার ফলে সারা রাস্তাটারই চেহারা ফিরে গেছে। ছেলেবেলায় রেললাইনের ধারে এসব পাথর দেখেছেন, আর চওড়া বর্মা টাকের স্লিপার। আজকাল সে সব উঠে গেছে, দেখাই যায় না।

তাই প্রশ্ন করেছিলেন, কোথায় পেলেন?

হরসুন্দরবাবু স্পষ্ট উত্তর দেননি, হাসতে হাসতে আকাশের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছেন, উনি জুটিয়ে দেন। ফুলও ফোটান উনি।

সত্যি, প্রতি সকালে সারা রাস্তা ঝলমল করে নানা রঙের ফুলে। এমন অঙ্ক কষে কষে গাছ লাগিয়েছেন যে, সব সীজনেই কিছু না কিছু ফুল ফুটবেই।

যন্ত্রণা একটাই, পাড়ার ছোট ছোট ছেলেগুলো সুন্দর দেখতে নুড়ি বেছে বেছে নিয়ে পালায়। মার্বেল খেলে কিংবা স্কুলের ব্যাগে জমায়। নিয়ে গিয়ে বন্ধুদের দেখাবে।

তারানাথ একদিন রেগে ধমক দিয়েছিলেন, হরসুন্দরবাবুর কোনও রাগ নেই : আঃ ছেড়ে দিন, ক’টা আর নেবে।

তারানাথ রীতিমত রেগে গিয়েছিলেন পাড়ার এক বুড়ো ভদ্রলোকের ওপর। ·

হরসুন্দরবাবু আসার আগেই খুব ভোরবেলায় বুড়োটা এসে বেছে বেছে ভাল ফুলগুলো তুলে ঝোলায় ভরেন।

দোতলার বারান্দা থেকে চিৎকার করে আপত্তি করায় বৃদ্ধ লোকটি যেন তার কাজে কোনও অন্যায় খুঁজে পাচ্ছে না এমন মুখ করে বললে, পুজোর জন্যে নিচ্ছি।

যেন তা হলেই সাতখুন মাপ।

হরসুন্দরবাবু আকাশের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেন, কে ফুল ফোটায়। অথচ লোকটির ও সব পুজোআচা ঠাকুরদেবতায় কোনও বিশ্বাস আছে বলে মনে হয় না।

একদিন যেন কি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, সবই যদি উনি করে দেবেন তা হলে মানুষকে দুটো হাত দিয়েছেন কেন?

আসলে ভেতরে ভেতরে হরসুন্দরবাবুকে তারানাথ বেশ শ্রদ্ধা করেন। তাই একটা বাচ্চা ছেলে নুড়ি নিলে বা ভক্তপ্রাণ বৃদ্ধ ফুল ছিঁড়লে ওঁর গায়ে লাগে!

সে জন্যই চেঁচিয়ে বলেছিলেন, আপনি তো পুণ্যি করছেন, খেটে মরছে আরেকটা লোক, লজ্জা হয় না আপনার? নিজে একটা গাছ লাগালেও তো পারেন।

যারা পরের বাগানে ফুল তুলে পরলোকের জন্যে পুণ্য সঞ্চয় করে, তাদের এ সব গায়ে লাগে না। তবে তারানাথকে দেখতে পেলে বেশ কয়েক গাছ ছেড়ে দূরের গাছগুলোর দিকে দৃষ্টি দেয়।

সে জন্যেই একদিন হরসুন্দরবাবুকে বলেছিলেন, সক্কালবেলায় আমার কাজ হয়েছে আপনার ফুল পাহারা দেওয়া।

—আমার ফুল? হরসুন্দরবাবু অবাক।

আসলে ফুলগুলো তারানাথ কেন পাহারা দিতেন তাও উনি জানেন। ফুলগুলো ফুটে থাকলে বাড়ির সামনেটা দেখতে ভাল লাগে। ওঁর বাবা চিরকাল বিষয়ী লোক ছিলেন, বাড়ির সামনে একচিলতে জমি বাগানের জন্যে ছেড়ে রাখাকে অপব্যয় ভেবেছিলেন। তার বদলে একখানা ঘর বাড়ানোকে বুদ্ধিমানের কাজ বিবেচনা করেছিলেন। তার জন্যে একটু ক্ষোভও যে ছিল না তা নয়। তবু কোনও দিন মনে হয়নি সামনের ফুটপাথের ধারে ফুল ফোটোনো যায়।

এই হরসুন্দরবাবুকেই তারানাথ বললেন, দিনকয়েকের জন্যে পুরী বেড়াতে যাচ্ছি, বাড়িটার দিকে একটু চোখ রাখবেন।

তারপর হাসতে হাসতে : আপনিও তো দিনকয়েক বেড়িয়ে এলে পারেন কোথাও।

হরসুন্দরবাবু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, এই এত ছেলেমেয়ে, কার কাছে রেখে যাব বলুন তো।

তারানাথ হকচকিয়ে গিয়েছিলেন, প্রথমটা বুঝতেই পারেননি। উনি জানতেন হরসুন্দরবাবুর মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলে একটিই। কলেজে পড়ে।

—এত কোথায়? বলেও ফেলেছিলেন।

তারপর চোখে পড়ল ওঁর বাড়ানো হাতের তর্জনী ফুটপাথের গাছগুলোকে দেখাচ্ছে। হো হো করে হেসে উঠলেন। তা ঠিক, তা ঠিক।

.

বাড়ি সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হতে পেরেছিলেন বলেই যে পুরীতে আসা তা নয়। ওটা শুধু স্বর্ণলতার খুঁতখুঁতুনি দূর করার জন্যে।

অমিতাও খুব উৎফুল্ল, বারান্দা থেকে চিৎকার করে বাবা-মাকে শোনাল, দুর্গাপুরের ব্যাচ এসে গেছে।

ঠিক ছিল সবাই একসঙ্গে যাবে, রাতের ট্রেনে।

পুরীতে আজকাল অটো হয়েছে তারানাথ জানতেন না। কতকাল আগে এসেছেন, সে সময় তো সাইকেল রিকশাই সম্বল ছিল। মাঝেমধ্যে কারও কাছে শুনে থাকতেও পারেন, স্মৃতির কুঠুরিতে সে কথা আগলে রাখার প্রয়োজন বোধ করেননি। যাওয়ার কোনও প্রশ্নই উঠত না, সুতরাং অপ্রয়োজনীয় কথাগুলোও যদি জমিয়ে রাখতে হয়, মগজে প্রয়োজনের কথাগুলো তো তা হলে জায়গা পাবে না।

সদলবলে সাইকেল রিকশার দিকে এগোচ্ছিলেন, ট্রেন লোট ছিল বলে শরীরে ক্লান্তি, মনে বিরক্তি।

কুলিটাই জানাল, অটো আছে।

আর কিছুক্ষণের মধ্যেই অটোর আওয়াজকে ছাপিয়ে সমুদ্রের গর্জন দূর থেকে ভেসে আসতে শুরু করেছে। একটা বিরাট আশা এবং আশ্বাস যেন ক্রমশ এগিয়ে আসছে।

অমিতা জানতই না ওর জন্যে কি অপেক্ষা করে আছে।

ওদের তিন বোনের নামের মধ্যে কোনও মিল নেই। তারানাথের মেজো মেয়ের নাম কল্পনা। জামাই ত্রিদিব। একটি ছেলে, টুকটুক। তা থেকে অমিতার মুখে শুধুই টুকু।

শরীরে ক্লান্তি ছিল, মনে উদ্বেগ, হোটেলে বুক করে আসা ঘর দুটো ভাল হবে কি না। জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখা যাবে তো। একে, মাঝারি ধরনের হোটেল। বাইরে থেকে বুক করে আসছে বলে হয়তো পিছনের দিকে ঠেলে দেবে।

ঢালু থেকে উঠে সী-বীচের রাস্তায় পৌঁছতেই সমুদ্রগর্জন কেন বলে তা বোঝা গেল, কিন্তু সেটা আর তখন বিস্ময় নয়, কারণ চোখের সামনে তখন আরও বড় বিস্ময়। টুকু তো একেবারে হতভম্ব।

অমিতার ইচ্ছে হচ্ছিল অটো থেকে নেমে সমুদ্রের ধারে ছুটে যেতে।

একটাই কথা বারবার মনে হচ্ছে, এত দিন কেন আসেনি।

—একেবারে বোরড় হয়ে যাচ্ছি রে, ভাল লাগে না। অফিসে খুব বন্ধু হয়ে যাওয়া একজনকে বলেছিল। ওর চেয়ে বছর দুয়েকের বড়ও হতে পারে। কিন্তু দু’ দিনেই তুই-তুই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অঞ্জনা।

অঞ্জনা হেসে বলেছে, বিয়ে করে ফ্যাল।

অমিতা তখন তো কিছুই জানত না, বিয়ে ব্যাপারটাকে কল্পনায় ভেবে নেওয়ার চেষ্টা করত। মেজদি আর বড়দিকে দেখে। সে যেটুকু ধারণা ছিল, চেহারাটা যে খুব লোভনীয় তা মনে হত না। আবার দু’-একজন বন্ধুকে দেখে মনে হত, তেমন খারাপই বা কি। দিব্যি সুখে আছে।

ওর কথাটা পাশের টেবিলের প্রৌঢ় গিরীশবাবুর কানে গিয়েছিল।

হেসে বললেন, ব্রাদার, একটা বছরেই এই? আমার কুড়ি বছর হয়ে গেল।

অফিসের মেয়েদের ব্রাদার বলা ওঁর ধারণা খুব বড় রসিকতা। কখনও কখনও আরেক ধাপ এগিয়ে অঞ্জনাকে অঞ্জনবাবু বা অমিতাকে অমিতবাবুও বলেন। ওদের কাছে কিন্তু এই রসিকতা আদৌ স্বাদু লাগে না। বরং লোকটিকে অপছন্দই করে ওরা, কখনও কখনও নির্বুদ্ধিতা ভেবে ক্ষমা করে দেয়।

অমিতা পুরী যাচ্ছে শুনে গিরীশবাবু খুব উৎসাহ দিলেন, বাঃ বাঃ, দেখবেন একেবারে ফ্রেশ এনার্জি নিয়ে ফিরে আসবেন।

বয়েসে যত ছোটই হোক মেয়েদের উনি কিন্তু তুমি বলতেন না। সবসময় আপনি। কেউ কেউ পছন্দ করত, কেউ কেউ করত না।

অঞ্জনা ফিসফিস করে বলেছিল, ওটা আসলে নিজের বয়েস কমানোর চেষ্টা। আসলে একটা কোনও ব্যাপারে মানুষটাকে অপছন্দ করে বসলে তার সব কিছুই তখন অপছন্দের হয়ে যায়।

ফ্রেশ এনার্জি কি না জানে না, অমিতার কিন্তু সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের মধ্যে মনে হল ও নিজেই যেন বদলে গেছে। হোটেলের ঘর দেখে আরও খুশি। ঘরের সামনেই বেশ চওড়া খোলা বারান্দা। সটান বেরিয়ে এসে দাঁড়াল বারান্দার কার্নিসের ধারে। মনে হল দোতলার এই বারান্দা থেকে হাত বাড়ালেই আছড়ে পড়া ঢেউগুলো ছুঁতে পারবে।

ব্যাপারটা ঘটে গেল ওই বারান্দায় দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখতে দেখতে।

—সেজদি, দেখে যা, দেখে যা, আজ সমুদ্রটা একেবারে সবুজ।

সত্যি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল অমিতা। রংটা রাতারাতি পাল্টে গিয়ে একেবারে সবুজ হয়ে গেল কি করে ভেবে পাচ্ছিল না।

গতকাল তো দিব্যি নীল ছিল।

সবুজ আর সবুজের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বালির ওপর। আর সেই সবুজ ঢেউ ভেঙে পড়ছে সাদা ফেনার রেখা হয়ে। যত দূর চোখ যায়, একটার পর একটা। দূরে সারি সারি পাল টাঙানো ছোট ছোট নৌকো যেন একটা দিক ঘিরে রেখেছে। এ ছবি ও আগে দেখেনি। পাল-ছাড়া নৌকোগুলোই দেখেছে।

দিদি-জামাইবাবু কাছে এসে দাঁড়াতেই অমিতা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল, সমুদ্রের জলের কত রকম রং রে। দ্যাখ, দ্যাখ।

ত্রিদিবের একটু জ্ঞান দেওয়া স্বভাব।

বিজ্ঞের মতো বলল, মানুষের মতোই।

একটু থেমে হাসতে হাসতে বলল, কাল হাতে নিয়ে দেখেছ। স্নান করার সময়। জল কিন্তু জলের মতোই।

অমিতা নিছক ঠাট্টা ভেবে হাসল। তার পরই খটকা লাগল, কী বলতে চাইছে! সেজদিকে ঠেস দিয়ে কিছু বলছে, নাকি ওকে। মানুষ যে রং বদলায় ও তো জানে, কতবার দেখেছে।

ত্রিদিব হয়তো আরেকটু জ্ঞান দিতে চাইল। বললে, জল জলের মতোই, কিন্তু এক একরকম আলো পড়ে কখনও নীল, কখনও সবুজ, আবার ঢেউ ফেটে পড়লে সাদা।

টুকু মাসি বলতে অজ্ঞান। সব সময় অমিতার কাছে কাছে। কখন এসে পা জড়িয়ে ধরেছে, অমিতা ওকে কোলে তুলে নিল, কার্নিসের জন্যে ও দেখতে পাচ্ছিল না।

সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ওই সাদা ফেনার রেখাগুলো দেখতে পেয়েই টুকু বলে উঠল, হোয়াইট।

দু-চারটে রং টুকু এর মধ্যেই শিখে ফেলেছে, হয়তো ত্রিদিবই শিখিয়েছে। তবে ইংরেজিতে। বাংলা তো আপনা-আপনি শিখে যাবে।

সবাই হেসে উঠল টুকুর মুখে ‘হোয়াইট’ শুনে।

ত্রিদিবের হয়তো ধারণা হয়েছিল, ও খুব উচ্চস্তরের কোনও দার্শনিক কথা বলছে। এবং নিশ্চয়ই সন্দেহ হয়েছিল অমিতা বা কল্পনা কেউই তা উপলব্ধি করতে পারছে না।

তাই আবার বললে, মানুষের রংও পাল্টে যায়। তার ওপর এক এক রকম আলো পড়লে সেও কখনও সবুজ, কখনও নীল, কখনও স্রেফ জল। কোন ধরনের আলো পড়ছে, কোন অ্যাংগল থেকে, সব বদলে যায়, সব বদলে যায়।

তারানাথ কখন এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন, অমিতার কোল থেকে টুকুকে নিজের কোলে টেনে নিয়ে তাকে সমুদ্র দেখাচ্ছেন, ওরা সচেতন ছিল না।

উনি ভগবান-টগবান নিয়ে জীবনে কখনও বিশেষ ব্যতিব্যস্ত হননি। পুজো-আর্চায় বিশ্বাসও করেন কি না সন্দেহ।

হঠাৎ বলে বসলেন, দিস ইজ গড।

কথাটায় ওরা সকলেই চমকে উঠল, আর টুকু আধো আধো ভাষায় প্রশ্ন করল, গড? বলেই দু’ হাত জড়ো করে নমস্কারের ভঙ্গি করল। ইংরেজি ভাষার মধ্যে দিয়ে ও গডকে চিনেছে, আর এও জানে, ঠাকুরদেবতাকে নমস্কার করতে হয়।

ওর ভঙ্গি দেখে সবাই হাসল।

আর তারানাথ সবাইকে শুনিয়ে বললেন, একেই তো ভগবান বলে। এই প্রকৃতি, এই সৌন্দর্য, এই রহস্য।

হাসতে হাসতে বললেন, আগেকার দিনে এই তীর্থস্থানগুলো যারা বানিয়েছিল, তারা এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যেই ভগবানকে দেখেছিল। ঘিঞ্জি মন্দিরগুলোয় নয়। গঙ্গোত্রী গোমুখ, অমরনাথ দ্বারকা, কন্যাকুমারিকা, যেখানেই যাও পাহাড়পর্বত, নয়তো সমুদ্র।

এতকাল পরে বাবার কথাগুলো কোনও দাগ কাটে না। মনে পড়ে জামাইবাবুর কথাগুলো। মানুষের রংও পাল্টে যায়। তার ওপর এক এক রকম আলো পড়লে …

আলোটা কি অসিতেশ ওর ওপর ফেলেছিল, না ও ফেলেছিল অসিতেশের ওপর। কেমন আলো?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *