১
অমিতা একদা সুন্দরী। তার অর্থ এই নয় যে সাতচল্লিশ বছর বয়েসেও সে যখন কোনও বিয়ে বাড়িতে যায় তার দিকে কেউ দু’বার ফিরে তাকায় না। তার নিজেকে অনুজ্জ্বল রাখার মতো পরিমিত প্রসাধন ও বেশবাসের মধ্যে প্রকট হয়ে ওঠা স্নিগ্ধ রুচির জন্যে একবার, আরেকবার তার শরীরের মিত অনাবৃত অংশটুকুর চিকন মসৃণতা ও চোখেমুখে ফুটে ওঠা আত্মবিশ্বাসের জন্যে। অর্থাৎ অমিতা কি তা ও জানে, ছোটবেলা থেকেই জেনে এসেছে, এবং বয়েস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সাতচল্লিশে এখন আর তা জানার জন্যে কোনও আগ্রহ নেই। অমিতার নিজের কৌতূহল থাক বা না থাক, বিয়েবাড়িতে কিংবা কোনও ফাংশনে ওর চেয়ে সাতাশ বছরের ছোট কোনও নির্বোধ ছোকরার চোখের দৃষ্টি যখন ওকে হঠাৎ অপ্রস্তুত ও আহত ক’রে ওকে ভিতরে ভিতরে হাসিয়ে ফেলে এবং সে হাসি ওর ঠোঁটের কোণে জেগে উঠেই মরে যায়, তখন ওর আদৌ মনে হয় না যে ওর শরীর থেকে কিছু হারিয়ে গেছে।
বিয়েবাড়িতে এই সেদিন এক আত্মীয়া কার সঙ্গে যেন পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলছিল, কম বয়েসে অমি যে কি সুন্দরী ছিল….
যার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল সে সহাস্যে বললে, তার স্মৃতি কিন্তু সর্বাঙ্গে লেগে আছে।
অমিতাও হেসে ফেলেছিল। আজকাল ড্রেসিং টেবলের সামনে বসে চুল আঁচড়ানোর সময় চুলের দিকেই চোখ থাকে, নিজেকে দেখতেও অনেক সময় ভুলে যায়। কিন্তু রসিক ব্যক্তিটির কথাটা মোটেই ভাল লাগল না। ওর সুন্দর চেহারাটা এখন কি শুধুই স্মৃতি হয়ে গেছে নাকি। কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে হেসে ফেলেছিল, কিন্তু ফেরার সময় মুহূর্তের জন্যে মনে পড়তেই নিজেকে প্রশ্ন করেছিল, স্মৃতি হয়ে গেছি? সঙ্গে সঙ্গে ভুলেও গেল। কিন্তু ভুলতে পারেনি জ্যাঠা টাইপের এক স্বল্প পরিচিত প্রৌঢ় আত্মীয়টির কথা।
তোবড়ানো অ্যালুমিনিয়ম ঘটির মতো মুখ প্রৌঢ়টি অযাচিতভাবে এগিয়ে এসে হাসি উপছে দিয়ে পরিহাস করল, বলছ, একদা সুন্দরী!
কথাটা মিথ্যে নয়, মিথ্যে নয় বলেই হয়তো বুকের মধ্যে গিয়ে লেগেছে। সাতচল্লিশেই এই, তা হলে সাতান্নয় বা সাতষট্টিতে গিয়ে কি হবে!
এই রকম ছুটকোছাটকা ঘটনা ওকে শরীর সম্পর্কে সচেতন করে দেয় কদাচিৎ। কিন্তু অন্য সময় ও নিজেকে ভুলেই থাকে। সংসার এমন এক জাঁতাকল ওসব মনে পড়ানোর অবসরই দেয় না।
বয়েস অমিতাকে দিয়েছে কিঞ্চিৎ মেদ এবং সব বিষয়ে একধরনের অনুৎসাহ। ফলে সে এখন নিছক একজন গৃহবধূ। যার সময় কাটে গৃহকর্ম বা তার তদারকিতে, এবং বড় মেয়ে বা ছোট ছেলের জন্যে উৎকণ্ঠা নিয়ে। উৎকণ্ঠা কখনও কখনও স্বামীর জন্যেও যে হয় না এমন নয়। মুকুল মেয়ে, সে-ই বড়, কলেজ থেকে ফিরতে দেরি করলে নানান উৎকণ্ঠা নানা দিকের, ছেলেটি দিদির চেয়ে তিন বছরের ছোট, সেও কলেজে, কিন্তু তার খেলা এবং আড্ডা আছে, তবু তারও বাড়ি ফেরার একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে, ঘড়ির কাঁটা তা পার হয়ে গেলেই : কেন যে দেরি করে, রাস্তাঘাটের আজকাল যা অবস্থা, অ্যাকসিডেন্ট তো লেগেই আছে, অতএব বুকের ভেতরটা কেমন যেন করতে থাকে। উৎকণ্ঠা বরং স্বামীকে নিয়েই কম। তার কারণ এমন নয় যে মনের গোপন অন্দরমহল থেকে স্বামী বিবাহিত জীবনের এই পঁচিশটা বছরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে শুধুই একটা অস্তিত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিয়ের পর পর বছর পাঁচেক বিবাহবার্ষিকী ঘটা করেই হয়েছিল, ঘটার পরিমাণ কমতে কমতে কখন যে তা ঘটনা হিসেবেও জীবন থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে অমিতার মনেও পড়ে না। সুখী দম্পতি একদিন শুধুই সুখী সংসার হয়ে গেলে নিজেদের অজান্তেই কখন বাচ্চা বয়েসের ফ্রকের গায়ে-হাতায় যে উৎফুল্ল ফ্রিল বা লেসের কাজ হাসে তা নিঃশব্দে উবে যায়। অভ্যস্ত প্রয়োজনের পোশাকেই তখন খুশি থাকতে ইচ্ছে করে। ভালবাসা আছে এবং থাকবে, এটুকু বিশ্বাস এসে গেলেই আর হয়তো ব্যাঞ্জো বাজানোর প্রয়োজন হয় না। কথা না বলেও তখন অনেক কথা বলা যায়, অস্তিত্বটুকুই অনেকখানি।
ছেলের রেজাল্ট, ভাল হোক বা মন্দ, মেয়ের অসুখ— এসব সময়ই প্রমাণ করে দেয়, আমরা আছি। ঠিকই আছি। দুটো অনতিবয়স্ক মুখ তখন একই সঙ্গে হাসে, একই মুহূর্তে বিবর্ণ হয়।
স্বামীকে নিয়ে অমিতার উৎকণ্ঠা ছেলেমেয়েদের নিয়ে যতখানি, ঠিক ততখানি না হওয়ার কারণ বোধহয় একটাই। অর্থাৎ অসিতেশের বাড়ি ফেরার কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই। তাই ঘড়ির কাঁটা ন’টার ঘর পার না হলে উৎকণ্ঠার পারা নীচেই পড়ে থাকে। বরং কোনও দিন সাত তাড়াতাড়ি সে ফিরে এলে অমিতা ভুরু কুঁচকে অসিতেশের মুখের দিকে তাকায়। অসুখবিসুখ কিছু! শরীর খারাপ! ক্বচিৎ কদাচিৎ যদি অসিতেশের বাড়ি ফিরতে ন’টা পার হয়ে যায়, তখনই উৎকণ্ঠা ওকে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাতে বাধ্য করে। ওই একটাই ভয়। পথেঘাটে কোনও অ্যাকসিডেন্ট নয় তো!
আশঙ্কা বুকের মধ্যে জমাট বাঁধতে শুরু করলে বেশিক্ষণ তা চেপে রাখা যায় না।
মুকুল পড়ার টেবিলে মাথা গুঁজে থাকতে থাকতে হঠাৎ হয়তো প্রশ্ন করেছে, মা, বাবা এল না এখনও? কোথাও গেছে নাকি?
মুকুলের প্রশ্নের জবাব, না নিজেকেই স্তোক, নিশ্চিন্ত ভাব করে উত্তর এসেছে, হবে হয়তো, এসে যাবে এখনই।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে বিচলিত না হয়ে পারেনি।
তারপর সকলকে নিশ্চিন্ত করে অসিতেশ যখন ফিরেছে, চাপা উদ্বেগ কোনও দিন ফেটে পড়েছে রাগে, কোনও দিন বুকের ভেতরটা নিরুদ্বেগ শান্ত হলেও মুখ অভিমানে পাথর। নিশ্চল নির্বাক।
অমিতা কোনও প্রশ্ন করেনি, কিন্তু অসিতেশ নিজেই ফিরিস্তি দেবার চেষ্টা করেছে, অপরাধ করে ফেলেছে এমন ভাব করে অপ্রতিভ ছেলেমানুষি হাসি দিয়ে দোষ ঢাকতে চেয়েছে।
এ সব মুহূর্তে অমিতা এমন ভান করে যেন ওসব ছেঁদো অজুহাত শোনার কোনও আগ্রহই নেই।
আড্ডা-পাগল মানুষটাকে চিনতে বাকি নেই অমিতার। এত দিনে অভিযোগ অভিমান মরে গেছে। ওসব ছিল একেবারে সেই প্রথম দিকে, পঁচিশ বছর পরে স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে কবে থেকে মানুষটার স্বভাবচরিত্র স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করেছে তা মনে পড়ে না। ‘স্বামী’ শব্দটাও এখন আর কানে বেসুরো শোনায় না।
আসলে বিয়ের পর ওকে স্বামী-স্বামী ভাবতেও কেমন অসুবিধে হত কিংবা মজা লাগত।
আলাপ-পরিচয় সেই কলেজ জীবনে, সমাজ ইতিমধ্যে টালমাটাল খেতে খেতে যে-জীবনকে ইদানীং নিতান্ত অনুচ্ছল নিস্তরঙ্গ স্রোতস্বতী বানিয়ে দিয়েছে, তা পঁচিশ বছর আগে ছিল হঠাৎ পাথর ফাটানো উচ্ছ্বাসের ফোয়ারা থেকে জেগে ওঠা পাথুরে পথের আঁকাবাঁকা সফেন ঝরনা। সে-সব ছিল প্রথম মুক্তির দিন, উন্মাদনায় রাঙানো। তা সত্ত্বেও ওদের দু’জনের সম্পর্ক এতই অস্বচ্ছ ছিল যে, তাকে বন্ধুত্ব বলা যায় কি না সে-বিষয়ে অমিতার নিজেরই সন্দেহ ছিল। অনেকখানি সময় কাছে কাছে থাকলেই সে কাছের মানুষ হয়ে ওঠে না। মনের মধ্যে দূরবীন থাকলে সে হাসে, কথা বলে একজনের সঙ্গে, কিন্তু সামনে দেখতে পায় অন্য কাউকে। না, অমিতার জীবনে সে-রকম কেউ ছিল কি না জানতে হলে ওকেই এখন স্মৃতি খুঁড়তে হবে।
পঁচিশ বছর আগের সেই শিউলি-ফোটা সুগন্ধের দিনগুলোই বড় ভাল ছিল, হঠাৎ হঠাৎ ফিরে যেতে ইচ্ছে করে, অবশ্যই কদাচিৎ, ঝিরঝির বৃষ্টির খোলা জানালায় দাঁড়ালে। কিন্তু সে ফুরসতই বা কোথায়, মুকুলের সালোয়ার কিংবা অসিতেশের ট্রাউজার্স শুকোনোর দুশ্চিন্তায় বৃষ্টি ওকে উদাস করতে পারে না। ধোয়া আকাশ কখন আবার রোদ্দুর উপহার দেবে সেই আশায় মনের বিরক্তি চেপে রাখতে হয়।
কোনও জড়তা নিয়ে ওরা কলেজে ঢোকেনি, কারণ নিষেধ অমান্য করার একটা নেশা ওই সময়টাকেই পেয়ে বসেছিল। ফলে নিঃসঙ্কোচে মিশতে পেরেছে, কে কখন যেচে আলাপ করতে আসবে তার অপেক্ষায় থাকেনি। দল বেঁধে সিনেমা, চায়ের কাপ সামনে রেখে টেরিকাটা সহপাঠীকে বুদ্ধিদীপ্ত উপহাস, প্রেম জিনিসটাকেই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার দিন। চারপাশে জটলা থাকলে কাউকে বিশেষ করে চোখেই পড়ে না। বরং দু’-চারজনকে জোড় বাঁধতে দেখলেই তাদের নিয়ে হাসাহাসি। গোপন অপছন্দের কোনও মেয়ে হলে ঠাট্টার স্বরে : যাক তরে গেলি, বাবা-মার দুশ্চিন্তা রইল না। এটা অবশ্য বলেছিল প্রণয়, যার নাম ছাড়া আর কোথাও প্রেমের উপস্থিতি ছিল অসম্ভব, এবং বলেছিল কুহুকে, যার প্রত্যর্পণে কুহুস্বরে ‘স্টুপিড’ শব্দটা গালে চড় মারার সামিল মনে হয়েছিল অমিতার। প্রণয়ের নাম অবশ্য ছিল প্রণয়বল্লভ, যা প্রথম প্রথম ওদের সমস্বর উপহাসের বিষয় ছিল। কুহু এবং প্রণয় অবশ্য এ উপন্যাসের কোনও চরিত্র নয়, অতএব অনতিবিলম্বে বিস্মরণীয়।
অমিতাদের দলটি ছোট ছিল না, আদিমকালে পরিবার বড় হতে হতে যেমন স্বাভাবিক নিয়মেই পৃথক পৃথক গোষ্ঠী হয়ে দূরে সরে যেত, ওদের দলটিও তেমনই কিভাবে যেন কফি হাউসে ভিন্ন টেবিলে, ভিন্ন ভিন্ন টেবিলে গিয়ে উপদল হয়ে গিয়েছিল। অসিতেশের এই অন্য টেবিলে সরে যাওয়াকে সে-সময় স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছিল, পরে অবশ্য তার পিছনে কোনও বিশেষ কারণ অনুমান করতে অমিতার ভালই লাগে।
না স্কুলে, না কলেজে, অমিতার পরীক্ষার রেজাল্ট কোনও দিনই চমকপ্রদ ছিল না। কিন্তু তার অর্থ এমন নয় যে ও ছাত্রী হিসেবে খারাপ ছিল। সহপাঠীদের অনেকেই ওকে ভাল ছাত্রী হিসেবে গণ্য করত। ছেলেবন্ধুদের কেউ কেউ অকারণ মনভেজানো ভঙ্গিতে বলত, রেজাল্ট নিয়ে কি ধুয়ে খাবি, তোর চোখেমুখে দিব্যি একটা বুদ্ধির দীপ্তি আছে। শুনে ভালই লেগেছিল, এবং হয়তো বিশ্বাস করেও বসত, কিন্তু তার আগেই রেণুকা বলে বসল, দীপ্তি? ওটা বুদ্ধির নয় রে, ওটা ওর টিউবলাইটের মতো চেহারার।
—দারুণ! কে বলে উঠেছিল? অশোক কি!
অন্য সবাই তখনও হাসছে। অমিতাও। মজাদার কথাটা উপভোগ করার জন্যে কিছুটা, বেশিটা ওর সুন্দর চেহারার প্রশংসা শুনে। স্বর ঠাট্টার হলেও সুরের মধ্যে খুশি করে দেওয়ার আমেজ ছিল বলে।
মুগ্ধ ভাব ভেঙে দিয়েছিল অশোকই হয়তো। ‘যাঃ অমিতা ওরকম সিরিঙ্গি রোগা নাকি। টিউব লাইটের মতো? ও তো সিলিম।’
অমিত একটা হাল্কা থাপ্পড় মেরেছিল অশোককে।
বাঁদরামিতে অতুলনীয় অশোক সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠেছে, আঃ, ডিলাইটফুল! হাতের যে জায়গাটাকে কাব্য করে বাহু বলে, স্পর্শ পাওয়া সেই জায়গার ওপর হাত বুলোতে বুলোতে বলেছিল।
এ সব পঁচিশ বছর আগের ঘটনা। সাতচল্লিশ বছর বয়েসেও এ সব টুকরো কথা একরঙা এই বিবর্ণ জীবনে কোনও কোনও দিন হঠাৎ মনে পড়ে যায়। প্রায় চুল আঁচড়ানোর সময় এলোপাথারি কিছু কিছু সাদা চুল চোখে পড়ে যাওয়ার মতো। প্রথম প্রথম আয়নায় চোখ রেখে টেনে তুলে দিত, এখন আর ইচ্ছেও হয় না। প্রকৃতির হাতে ওদের ছেড়ে দিয়েছে, কারণ নিজের শরীরই বুঝিয়ে দিচ্ছে প্রকৃতির হাতে নিজেকে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া গতি নেই। সবই মেনে নিতে হয়।
অথচ এক সময়, মানে সেই পঁচিশ বছর আগে কোনও কিছু মেনে নেওয়াতেই ওর ছিল ঘোর আপত্তি।
সে জন্যেই কেউ কেউ বলত ওর নাকি বেশ এক ব্যক্তিত্ব আছে। কথাটা সত্যি কি না সে-বিষয়ে ওর সংশয় ছিলই, তার উপস্থিতি কোথায়, খুঁজে পেতে দেখতে ইচ্ছে করত, পেত না, তবু কেমন বিশ্বাস করে বসেছিল, আছে।
এ জাতীয় তোষামুদে কথা আজকাল আর কেউ বলে না। নান্টু তো নয়ই।
অসিতেশের ডাকনাম নান্টু।
—তুমি তো ক্লাসমেটকে বিয়ে করেছিলে, খারাপ কিছু হয়েছে? ফ্ল্যাট, গাড়ি। আমাদের মতো দু’-দুটো জুয়েল ছেলেমেয়ে নিয়ে একটা হ্যাপি ফ্যামিলি। মুকুল বলেছিল।
হাসিতে ফেটে পড়া ছাড়া উপায় ছিল না। মুখ ফুটে বেরিয়েছিল, হাসিতে ভেজানো : বাঁদর!
ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, দুটো শব্দ।
কলেজের, মুকুলের কলেজের দু’-একজন পুরুষ বন্ধু, মেয়ে বন্ধুরাও মাঝে মাঝে আসত। ডেকে নিয়ে যেত। কখনও ঘরে বসেই আড্ডা দিত। ওর পুরুষ বন্ধু অর্থাৎ সহপাঠীদের কাউকে যে অমিতার খারাপ লাগে, তাও নয়। তাদের দিব্যি ছেলে-ছেলে লাগত, ঈষৎ আদর-আপ্যায়নের ভাষায় কথা ও বলত।
ওরা এখন দিব্যি খোলামেলা, কোথাও কোনও সঙ্কোচ নেই। অমিতাদের সময়েই তো বেড়া ভেঙেছিল, ওরাই। কিন্তু সেটা ওই বাইরের জগতে, কফি হাউসে, চায়ের দোকানে, কলেজের করিডরে। বাড়িতে ভিজে বেড়াল। কোনও দিন একটু দেরিতে ফিরলে মায়ের বকুনি আড়াল করা টিপ্পনী : সেই কখন কলেজ ছুটি হয়েছে, এত দেরি করে এলি? কিন্তু ওইটুকুর জন্যেই যথেষ্ট সঙ্কোচ ছিল। সিনেমায় গিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে ফিরিয়ে দেখা, কেউ দেখছে না তো। মেলায় গেলে মেয়ে বন্ধুদের গায়ে গায়ে। কেউ দেখে ফেললে, কে আবার, ও তো মল্লিকা, এমন করে ধরল, আজ যা মজা হয়েছে না…..
ওদের সময়ে শুধু বাইরেটা বদলেছে, ঘর বদলায়নি। আর এখন?
মনে মনে চিন্তা করে অমিতার ধারণা হল, নাঃ, কিচ্ছু বদলায়নি। যা বদলেছে, তা শুধু বাইরে।
সে জন্যেই হয়তো মুকুলের ছেলে বন্ধুদের আনাগোনায় ঈষৎ উদ্বেগ উঁকি দিয়ে যেত।
একদিন খুব সাজগোজ করে কলেজে বেরোচ্ছে মুকুল। মুখে ফূর্তি ফূর্তি ভাব, দু’-চারটে স্প্রে নিল। সেন্ট! ওটা বিয়েবাড়ি ছাড়া ভাবতেই পারত না অমিতা। ইচ্ছেই হত না।
মেয়ের সাজগোজের দিকে তাকাল, তারপর মুখের দিকে। কেমন একটা খটকা লাগল, বুকের ভেতরে চাপা প্রশ্ন। কিন্তু সেটা মুখ ফুটে বলার উপায় নেই, সাহসও নেই। বললেই তো আমাকে আমার মায়ের মতো ভাববে। সে-সব গল্প তো ও নিজেই একসময় মেয়েকে শুনিয়েছে। ‘তোরা তো কত স্বাধীন।’
যখন মেয়েকে কিছু বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু বলতে পারে না, তখন নিজের মনেই হাসে অমিতা। নিজেকেই উপহাস করে। ‘আয়, তোরা দেখে যা।’ কলেজের সেই নিরুদ্দেশ বন্ধুকে ডেকে বলে, ‘দেখে যা, আজ আমি মেয়ের কাছেও কত অসহায়। তোরা তো আমার মধ্যে ব্যক্তিত্ব আবিষ্কার করেছিলি, সেই ব্যক্তিত্ব এখন কেমন ধুলোয় লুটোচ্ছে। এককালের প্রেমিকারাও সবাই শেষে এক সময় মা হয়ে যায়।
নান্টুর কাছে ওর ব্যক্তিত্ব বোধহয় এতখানি হারিয়ে যায়নি।
তবু মেয়েকে কিছু না বলেও পারেনি। যতখানি মোলায়েম করা যায় মেয়ের চোখে চোখ রেখে কিছু খুঁজতে খুঁজতে হাসি-হাসি ভাব করে বলেছে : সমঝে চলিস।
মুকুল বলে বসল, অমিতাও নাকি ক্লাসমেটকে বিয়ে করেছিল, খারাপ হয়েছে কিছু!
মুকুল গটগট করে কলেজে বেরিয়ে গেল ওকে একরাশ দুর্ভাবনার মধ্যে ফেলে রেখে।
ওর প্রাচীন জীবনের কথা মুকুলের জানার কথা নয়। সে-সব কথা যতখানি সম্ভব আড়ালে রাখতে বাধ্য করেছিল ওর ব্যক্তিত্ব। তা সত্যি সত্যি থাক বা না থাক।
অমিতার মাসতুতো দিদি, বছর তিনেকের বড়, অমলা একদিন বেড়াতে এসে দেখল, মুকুল টিভির সামনে একটা সমবয়স্ক ছেলের সঙ্গে বসে গল্প করছে।
—কি রে, কি করছিস?
মুকুল হেসে বললে, উইম্বলডন। বসো না অম্লামাসি, দ্যাখো।
অমলা ঠোঁট উল্টে সরে গেল।
আর ছেলেটি অস্বস্তি বোধ করে কিছুক্ষণ পরে চলে যেতেই মুকুল এল। ছেলেটি কে, অমিতাকেই জিগ্যেস করতে পারত। করল মুকুলকে।
মুকুল তাচ্ছিল্যের স্বরে বললে, ক্লাসমেট।
সঙ্গে সঙ্গে অমলার বেয়াদপি ঠাট্টা, দেখিস মায়ের মতো ক্লাসমেটকে বিয়ে করে বসিস না।
রসিকতাটা অমিতার আদৌ ভাল লাগেনি।
অমিতা যে নিজের ইচ্ছেয় বিয়ে করেছিল তা গোপন করেনি। মুকুল যখন ক্লাস নাইনে, আভাসে জানিয়েও দিয়েছিল। কারণ আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের কথায় তা কখনও কখনও প্রকাশ পেয়ে যেত মুকুলের সামনেই। মেয়ে হয়তো অনেক কিছু ভেবে বসবে এই আশঙ্কায় কিছুটা আভাস দিয়ে রেখেছিল। যেন ব্যাপারটা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমন ভাবে।
ক্লাসমেট কথাটা বলেনি, কারণ ক্লাস-মেট থাকার সময় কিছু ঘটেনি। তখন তো নান্টু অর্থাৎ অসিতেশকে, সম্ভবত অবহেলা দিয়েই, কফি হাউসে পাশের টেবিলে সরিয়ে দিয়েছে। অবহেলা অবশ্য অমিতার দিক থেকে ছিল না, আগ্রহও নয়। আগ্রহ কারও প্রতি ছিল না, যদিও বন্ধু ভাবতে, আড্ডা দিতে অনেককেই ভাল লাগত।
অথচ মুকুল বলে বসল, তুমি তো ক্লাসমেটকে বিয়ে করেছ!
ওর মাথায় এসব অমলাই ঢুকিয়েছে কি না কে জানে। মুকুল পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করায় রীতিমত খুশি হয়েছিল -অমলা, হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে এসে হাজির। প্যাকেট খুলতেই বেশ একটা ভাল শাড়ি।
বললেন, এবার তো কলেজে ঢুকবি, ওসব ছাইপাঁশ ছেড়ে শাড়ি পরতে শুরু কর।
তার আগেই শাড়ির রং আর ডিজাইন ভাল লেগে গেছে মুকুলের, ওটা যে ওকে উপহার, তা বুঝতে পারেনি। শাড়ির ওপর ভাল লেগে যাওয়ার নরম হাত বুলিয়ে বলেছে, ফ্যান্টাস্টিক। তোমাকে খুব মানাবে গো, অম্লামাসি।
শুনে অমলার মুখে অবাক হাসি, ও মা আমাকে মানাবে কি রে, এ তো তোর জন্যে। তিনটে লেটার পাওয়ার প্রাইজ।
সঙ্গে সঙ্গে, ম্যাগো, শাড়ি! হাঁটতে-চলতে হোঁচট, বাসে আঁচল ধরে টানাটানি? হো হো করে হেসে উঠেছে মুকুল।
তারই জবাবে অমলার ওই ছাইপাঁশ ছেড়ে শাড়ি পরার কথা।
মুকুল মুহূর্তে মুখের অপছন্দ সরিয়ে ফেলেছে, আফটার অল অম্লামাসি, যে এক একসময় ওর পড়ার ঘরে গিয়ে প্রায় বন্ধু হয়ে ওঠে, ভালবাসা ছিটোয়, সে কিনা ওর রেজাল্ট দেখে খুশি হয়ে একটা দামি শাড়ি দিতে এসেছে। তাকে মর্যাদা না দেওয়াটা অন্যায়।
চোখে নম্র হাসি এনে বললে, দিচ্ছ যখন, পরব, এই বিয়ে বাড়িটাড়ি গেলে।
তারপর : যাই বলো অম্লামাসি, সালোয়ার-কামিজে কত সুবিধে বলো, ছুটে গিয়ে বাস ধরা যায়, হাঁটতে-চলতে কত ফিট লাগে …
অমলামাসি হেসে বললে, হবে হয়তো, তবে আমরাও বাসে-ট্রামে যাতায়াত করেছি, শাড়ি পরেই। অসুবিধে লাগেনি।
—সে সব তোমাদের প্রাচীন কালের কথা, তখন এত ভিড় ছিল না। আর তোমরা তো বাড়ি থেকে বেরোতেই না। বাড়ি থেকে কলেজ, কলেজ থেকে বাড়ি।
অমলা অবাক ভাব করল, আমরা বাড়ি থেকে বেরোইনি!
—আমাদের মতো ইয়াব্বড় একটা শপিং ব্যাগ, মালপত্র ঠাসাঠাসি, হাতে ঝুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিউ মার্কেট থেকে এসে বাস ধরেছ? এত ভিড়ই ছিল না।
অমিতাদের তখন গাড়ি ছিল না, অমলাদেরও নয়। সে সব কথা কতবার মুকুলকে বোঝাতে চেয়েছে অমিতা, কলেজ ছেড়ে বেরিয়ে কি কষ্টের জীবন গেছে, পায়ে দাঁড়ানোর যুদ্ধ, অমিতার আর নান্টুর, নান্টু অর্থাৎ অসিতেশের।
আসলে ওর ডাকনামটা জানতে পারার পর ঠাট্টা করে ঠাট্টার স্বরে ‘নান্টু’ বলে ডাকতে ডাকতে ওই নামটাই কখন যে স্থায়ী এবং স্বাভাবিক হয়ে গেছে, অমিতার মনেও পড়ে না।
যেমন এক সময় কফি হাউসের সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে অসিতেশকে খুঁজে পেত না। বরং প্রণয়বল্লভকে খুঁজে পেত, শুভময়কে, কুহুকে, মল্লিকাকে এবং এবং এবং।
বিবাহিত জীবনের পঁচিশ বছর পর, সাতচল্লিশে পৌঁছে অমিতার জীবনে যে এমন একটা দুর্দৈব ঘটে যাবে, যেতে বসেছে, তা ওর কল্পনার বাইরে ছিল।
ও নিজেকে এতকাল অনেক উদার মনে করত, অনেক মর্ডান। এখন মনে হচ্ছে বুকের ভেতরে মডার্ন বলে কিছুই নেই। মানুষের মন বোধহয় আজও তেমনই প্রাগৈতিহাসিক।
নিজের সাজগোজ করার ইচ্ছে কোনও দিন ছিল না, চাকরি ছাড়ার পর, তখন মুকুল আর ছেলে টুটু এসে গেছে, অমিতা রীতিমত গৃহবধূ হয়ে পড়েছে, তখন আর সাজগোজের কথা মনেও পড়ত না। ইচ্ছে তো কবেই মরে গেছে।
অফিস-অফিস চিন্তায়, কয়েকটা বছর কিভাবে যেন হারিয়ে গিয়েছিল, তারপর হঠাৎ দেখা হওয়ার পর যখন একটু একটু করে কাছে এসে পড়ছে, অসিতেশ বলেছিল, সে জন্যেই তো এত ভাল লাগত, সাজগোজ করতে না বলেই।
—ইনোসেন্ট ইনোসেন্ট লাগত? অমিতার মুখে কৌতুক।
অসিতেশও হাসছে। তুমি তো আমাকে পাত্তাই দিতে না। হাল ছেড়ে দিয়ে তাই পাশের টেবিলে চলে গিয়েছিলাম।
—সত্যি? অমিতার কাছে এটা একটা খবর। ওর বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়েছিল।
তবু হেসে বলেছে, আমি তো ভেবেছিলাম আমাদের কথাবার্তায় বোরড হয়ে ….
জীবনে এক-একটা সময় আসে যখন বড় নিঃসঙ্গ লাগে। একা একা। বিশেষ করে কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়ে আসার পর। জমাট আড্ডার সেই নেশাটা রক্তে থেকে যায়, অথচ ক্রমে ক্রমে সকলেই বিচ্ছিন্ন, দূরে দূরে, হঠাৎ তাদের মধ্যে কেউ ফোন করলে, হামলে পড়তে ইচ্ছে করে, ‘আয় না রে, চলে আয়, আর নয়তো, ‘আমিই যাচ্ছি, বল কোথায়,’ ফোন ছাড়তে ইচ্ছে করে না। ওরা এড়িয়ে গেলে, কান্না এসে যেত, একদিন আড্ডায় মশগুল হতে পেলে মনে হত সেই ফেলে আসা আনন্দের দিনগুলোতেই যেন ফিরে গেছি। চোখেমুখে যেন আনন্দ উপছে পড়ত।
একাকিত্ব আরও দুঃসহ লাগত, কারণ তার সঙ্গে একটা উদ্বেগও জড়িয়ে থাকত। থাকত। হাল্কাভাবে
হাল্কাভাবে চাকরি খোঁজা, দু’-একটা অ্যাপ্লিকেশন, বিজ্ঞাপন দেখা। তারই ফাঁকে কারও সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, ব্যস্তত্রস্ত, অফিস যাচ্ছে। অভিনন্দনসূচক হাসি দিয়ে, ‘পেয়ে গেছিস, কোথায়?’ তারপর সে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত বাসে উঠে পড়তেই বিষণ্ণতায় ভরে উঠত সারা মন।
অমিতা সচ্ছল পরিবারের মেয়ে, চাকরি পেতে দু’ দিন দেরি হলে এমন কিছু আর্থিক সঙ্কটে পড়বে না। কিন্তু না-পাওয়ার একটা ব্যর্থতা তো থাকেই, কেমন এক ধরনের শূন্যতা, অপরের কাছে, অনেকের কাছে, যে দেশে মানুষের চেয়ে চেয়ার কম থাকে, স্বজনপোষণ কিংবা দুর্নীতি যোগ্যতাকে ডিঙিয়ে যায়, সে দেশে ভাগ্য না মেনে উপায় নেই, ভাগ্যই একমাত্র আশাভরসা। দুম করে একদিন চাকরি পেয়ে যাওয়াতে অমিতার অন্তত তাই মনে হয়েছিল।
ইন্টারভিউয়ের চিঠি পেয়ে একটুও আহ্লাদ হয়নি, কারণ প্রথমবার পেয়ে মনে হয়েছিল চাকরিটাই পেয়ে গেছি। মনে হয়েছিল এই অসংখ্যের ভিড়ে আমারও কিছু দাম আছে। নিজেকে দামি মনে হয়েছিল।
তাই সেবার ইন্টারভিউ দিয়ে এসেও কোনও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেনি। মন বলছিল, হবে না, হবে না।
বাবা-মা বাড়িতে কোনও বিষয়ে আলোচনা করলে অমিতাও ওর মতামতটা জানিয়ে দিত, স্বাভাবিক গলায়। এক সময় দেখল, বাবা ওর মত জানতে চাইলেও ও এড়িয়ে যাচ্ছে। সাহস পাচ্ছে না। যেন নিজের কাছেই মনে হচ্ছে, ওর মতামতের কোনও গুরুত্ব নেই। গলার স্বরও যেন দশ ডেসিবেল নীচে নেমে গেছে। চাকরির বাজারে যার কোনও দাম নেই, তার মতামতেরও কোনও দাম থাকতে পারে না। যে যত ওপরে উঠতে থাকবে তার কথার দামও তত বাড়বে। ওপরে উঠতে পারলে তার আকাট মূর্খতাকেও লোকে ভাবে মহামূল্যবান।
মাস তিনেক পার হয়ে গিয়েছিল বলেই ভেবেছিল পাবে না।
কিন্তু পেয়ে গেল।
ওর হাতব্যাগে ছোট্ট একটা ডায়েরি আছে। তাতে ছেড়ে আসা বন্ধুদের কারও কারও টেলিফোন নম্বর, কারও কারও টেলিফোন নেই বলে তাদের ঠিকানা। প্রথম প্রথম দু-চারজনকে ফোন করত, কেউ কেউ কেমন ছাড়া ছাড়া, যেন অন্য কোথাও কোনও টান আবিষ্কার করেছে। আবার
দু’-একজন এমন আঁকড়ে ধরত যে আধ ঘণ্টার আগে ছাড়তেই চাইত না।
মা একদিন পাশ দিয়ে যাবার সময় বললে, এবার রেখে দে।
রাগ হয়েছিল। সত্যি তো, চাকরি-বাকরি করি না, কতগুলো কল হয়ে গেল কে জানে। তার পরই মনে হল, কই ওরা তো কেউ নিজে থেকে বড় একটা করে না। কিন্তু যার কোনও সঙ্গী নেই, টেলিফোনই যে তার একমাত্র সঙ্গী এ-কথা মা বোঝে না কেন?
রাগে কিংবা অভিমানে তাই হাতব্যাগের মধ্যে ডায়েরিটা অবহেলায় ফেলে রেখেছিল। চাকরির চিঠিটা পেয়েই ডায়েরিটা খুঁজে দেখতে ইচ্ছে হয়েছিল।
হাঁফাতে হাঁফাতে গিয়ে বাবাকে দেখাল।
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাবা দিন তারিখ সময় দেখল, এবং অমিতা দেখল বাবার মুখে দিব্য এক প্রৌঢ় হাসি ছড়িয়ে পড়ছে।
মায়ের মুখেও। খুশি খুশি মুখে বললে, কালই আমি কালীবাড়িতে পুজো দিয়ে আসব।
অমিতার তখন পুরোপুরি বিশ্বাস হচ্ছে না। তত দিনে নিজের যোগ্যতার ওপর আর কোনও আস্থা নেই। মনে হচ্ছে, নিছক ভাগ্য। ভাগ্য মানলে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারানোর ভয়টাও এসে যায়।
না থাক, চাকরিতে জয়েন করি, তারপর।
চাকরি তো পেয়েছি, থাকবে তো, রাখতে পারব তো। একবার মনে হয়েছিল, একটা সপ্তাহ যাক, কিংবা একটা মাস, পায়ের নীচে মাটি পেয়েছি কি না দেখে নিই। কিন্তু ধৈর্যে কুলোল না। এমন একটা খবর সকলকে না শোনাতে পেলে আনন্দ নেই।
হাত ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করে একটার পর একটা ফোন করে গেল। ‘আজ আর সময় নেই রে, শুধু খবরটা দিলাম। পরে একদিন করব।’ তারপর আবার একজনকে।
পরপর ফোন করে যাচ্ছে। আর মা হাসছে, বাবা হাসছে ওর রকমসকম দেখে। মেয়েকে এত খুশি হতে কোনও দিন দেখেনি যেন। এবার আর বলছে না, অনেকগুলো কল হয়ে গেল।
সাতচল্লিশ বছর বয়েসে এসে অমিতা সব বুঝতে পারছে। একটা বেকার ছেলে সম্পর্কে তবু একটা অজুহাত আছে। ‘কোথায় আর পাচ্ছে, দিন না একটা জোগাড় করে।’ কিন্তু বেকার মেয়ে? বেকারই তো, পরীক্ষা পাশ করে বসে থাকা মেয়েদের পক্ষে যেন আরও বড় অপমান। আরও লজ্জার। বাবা-মা’র পক্ষে তো বটেই। পরীক্ষা পাশ করে বসে থাকার উপায় নেই। হয় চাকরি করো, আরও দু-পাঁচ বছর কাটিয়ে দাও ওয়েটিং রুমে। আর নয়তো একটাই গন্তব্য : বিয়ে।
আত্মীয়স্বজনরা বেড়াতে এলে কিংবা দেখা হলে কেউ বাবা-মা’র শরীরস্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন করে না। প্রশ্ন একটাই : বিয়ে দিয়ে দিন। উদারপন্থী কেউ কেউ : তাই চাকরিই করুক। অমিতা জানে চাকরি করলে ওই উদারতা বড়জোর দু-পাঁচ বছর স্থগিত থাকবে। ওয়েটিং রুমে যারা অপেক্ষা করে তাদের সম্পর্কে কেউ ভাবে না, ট্রেন আদৌ আসবে কি না। রাত কাবার করে দিলে জমাদারটা ঝাড়ু হাতে এসে জিগ্যেস করে, ট্রেন কখন?
বাবা-মা যাই ভাবুক, অমিতার একবারও মনে হয়নি ও ওয়েটিং রুমে।
আমি স্বাবলম্বী, আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি। তার চেয়েও বড় কথা আমি স্বাধীন। অমিতার গলার স্বরেও আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছিল।
মনে মনে একট প্ল্যান করে ফেলল মাঝারি গোছের একটা হোটেলে কি রেস্টুরেন্টে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের সব্বাইকে ডেকে খাওয়াবে, আড্ডা দেবে। ‘পার্টি’ শব্দটা মাথায় আসতেই হেসে ফেলেছিল। না, অত কিছু নয়, পার্টিফার্টিতে ও অভ্যস্তও নয়।
চাকরি মানেও যে এক ধরনের একঘেয়েমি, বুঝতে সময় লাগল না। চাকরিটা বেশ মনের মতোই হয়েছিল, তবু।
মাইনেপত্তর জেনে বাবা তো অবাক।—সে কি রে, ঢুকেই এত?
আনন্দের সঙ্গে কিছুটা দীর্ঘশ্বাস মেশানো ছিল কি না অমিতা খুঁজে দেখেনি। বাবা-মা’র খুশি যেন উপরি পাওনা।
বাবা বলেছিল, কোম্পানি-টোম্পানিতে চাকরিই ভাল। ওখানে যোগ্যতার কদর আছে। আর সরকারি চাকরিতে
তারানাথ গাভমেন্টে চাকরি করতেন বলেই হয়তো তার ওপর এত বীতশ্রদ্ধ ছিলেন। প্রথম জীবনে শুধুই এখান থেকে ওখানে বদলি। শেষে এখানে এসে থিতু হয়েছিলেন। পৈতৃক বাড়িটা ভোগ করতে পেরেছেন। কর্পোরেশনে চাকরি করলেও তারানাথের বাবা বেশ কিছু টাকাও রেখে গিয়েছিলেন, বেতন অনুপাতে সঞ্চয় এবং স্থাবর সম্পত্তি অত্যধিক হওয়াই রীতি, তাই সে সম্পর্কে তারানাথ কোনও দিন নিজেকে প্রশ্ন করেননি। তিনি তাঁর কর্তব্য করে গেছেন, ছেলেমেয়েদের ভাল স্কুল কলেজে পড়িয়েছেন। দু’ মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন গহনা এবং নগদ পণ দিয়ে। ব্যতিক্রম শুধু অমিতা।
তারানাথ তখনও চাকরিতে বহাল। কিছুটা সিনিয়র পোস্টে। রিটায়ারমেন্টের দিনও যে খুব বেশি দূরে ছিল তাও নয়। তবু তাঁর মাসমাইনে এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছিল যে অমিতার বেতনের অঙ্কটা শুনে চমকে উঠতে হয়েছিল। দারুণ খুশি হয়েছিলেন। সন্তানের সাফল্য মানে নিজেরই সাফল্য। কিন্তু আনন্দ থিতিয়ে যাওয়ার পর বুকের মধ্যে কোথাও একটু খিঁচখিঁচ করেছে। নিজেকেই মনে মনে বলেছেন, শেষে আমি কি নিজের মেয়ের ওপরই জেলাস হয়ে পড়লাম নাকি! ছেলেমেয়ে শুরুতেই যদি শেষ বয়েসের বাবাকে ছুঁয়ে ফেলে তা হলে আনন্দ বেশি হয় ঠিকই। কিন্তু রাগ অভিমান বেড়ে যায় নিজের চাকরিটার ওপর। শালারা ঠকিয়েছে। এই সব সময়ে বাবার অসততা আর কাঁটার মতো বেঁধে না, মনে মনে যুক্তি দাঁড় করান, বাবা ঠিক কাজই করে গেছেন।
তারানাথ অবাক হয়েছেন, অমিতা তা শুনে আরও খুশি। কিন্তু সব উল্লাসে জল ঢেলে দিল মল্লিকা।
তার আগে যাকেই ফোন করেছে সে-ই কংগ্রাচুলেট করেছে, কেউ কেউ রীতিমত অবাক। মল্লিকাও ফোনে সে রকমই ভাব করল, তারপর দু’-চারজনের খবরাখবর দিয়ে বললে, অখিল তো সবাইকে টেক্কা দিল, অখিলকে মনে আছে?
একটু চিন্তা করে নিয়ে অমিতা বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, জিওলজি না জিওগ্রাফি …
মল্লিকা হাসত হাসতে বললে, কোম্পানির ফ্ল্যাট, গাড়ি, পার্কস … মাইনেটা বলেনি, অনুমান করা যায়।
অমিতা চাকরিটা পেয়ে বেশ তৃপ্ত বোধ করেছিল। কিন্তু মানুষের বোধহয় কোনও অবস্থাতেই সুখী হবার উপায় নেই। মল্লিকাও জুটিয়ে নিয়েছে, বন্ধুবান্ধবীদের দু’-একজনও। সে সব খবর ভালই লেগেছিল। যারা এখনও পায়নি তাদের জন্যে একটু সমবেদনাও। অথচ অখিল নন্দী, যাকে ওর ভাল করে মনেই পড়ে না, তার সৌভাগ্যে আনন্দ হল না। মনে হল কোথায় যেন ও ছোট হয়ে গেছে। অন্তত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বন্ধুবান্ধবদের চোখে।
পায় তো পাক না, যার যা ভাগ্যে আছে সে তা পাবেই। আর তা নিয়ে মন খারাপ করেও লাভ নেই। আমার অত হিংসে নেই।
তবে একটা ব্যাপার ঘটে গেল। কোনও ঘটনাই বাইরে ঘটে না। বাইরে যা কিছু ঘটে তা শুধুই খবর। খবরের কাগজের পাতাগুলোর মতো নিষ্প্রাণ। যা সত্যি সত্যি ঘটে তা মনের মধ্যে, বুকের ভেতরে।
সেখানে আঁকা হয়ে গিয়েছিল পার্ক স্ট্রিট এলাকার কোনও সুন্দর একটা রেস্টুরেন্ট বা হোটেলের বুফে রুম। ঝকঝকে কাচ, পালিশ করা দরজা, নরম কার্পেট, ছোট ছোট সুদৃশ্য টেবিল, কাট গ্লাসের সাজসজ্জা, উর্দি পরা বয়, মিহি রঙিন আলো। দু’-চারবার যে এ সব জায়গায় যায়নি তা নয়। কিন্তু সে শুধু দু-তিনজন মিলে। দিদি জামাইবাবুর সঙ্গে একবার। বুঝতে অসুবিধে হয়নি, উপলক্ষ দিদির চাইনিজ খাওয়ার বায়না নয়।
—না, একদম না।
এই তিনটি শব্দ অস্ফুটেও উচ্চারণ করেনি, বুকের ভেতরটাই বলে উঠেছিল। যা ভেবে বসছেন তা নয়। আসলে চাকরি পাওয়ার আনন্দে অমিতা ভেবেছিল কলেজের সেই ছেড়ে আসা বন্ধুদের যার যার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে সবাইকে ডেকে এনে কোনও ভাল হোটেলে রেস্টুরেন্টে জমায়েত হবে, আড্ডা দেবে, চাই কি তারপর দলবেঁধে বোটানিক্স কি ডায়মন্ডহারবার, নিদেনপক্ষে কোনও সিনেমা। এ সবই প্রথম মাসের মাইনে পেয়ে। কিন্তু মল্লিকার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে, ওর মনে হল, এত উল্লাসের কিছু নেই। কই, আর তো কেউ ওকে জানায়নি। আর অখিল নন্দীর খবরটা ওরা পেয়ে থাকলে ওর উচ্ছ্বাস দেখে তো হাসাহাসি করবে। তাই মনকে বোঝাল, না, একদম না।
সাতচল্লিশ বছর বয়েসে পৌঁছে অমিতার মনে হল চাকরিটা না ছেড়ে দিলেই ভাল ছিল। চাকুরে মেয়ে হয়েই সারাজীবন কাটিয়ে দিলে কি ক্ষতি হত? চাকুরে মেয়েদের কি ছেলেমেয়ে থাকে না। তার বদলে ও কিনা এখন নিতান্তই একজন হাউসওয়াইফ। অথচ ওই চাকরিটা ছিল বলেই না ফ্ল্যাটটা কেনা গিয়েছিল। ওর একার টাকায় অবশ্য নয়। অসিতেশ আর অমিতা দু’জনেই জমানো টাকা ঢেলেছে, দু’জনেই লোন নিয়েছিল। অমিতা প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে। অসিতেশ হাউসিং থেকে।
বুদ্ধিটা তারানাথ দিয়েছিলেন।
কিন্তু ফ্ল্যাটটা অসিতেশের একার নামে হয়েছে শুনে অসন্তোষের ছাপ তাঁর মুখে। — সে কি, দু’জনের নামে নয় কেন? জয়েন্ট হলেই তো ভাল হত?
অমিতা হেসে উঠেছে। – কি যে বলো, ওর নামে মানেই তো আমারও।
ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে সে খবরেই মা খুশি, তবু ওর হাসি দেখে মা হাসেনি।
মেজদি বোঝাবার চেষ্টা করেছে! তবু ….
অমিতা হাসতে হাসতে বলেছে, ওকেই যদি বিশ্বাস না করতে পারি, যদি ধরো ঠকায়, তা হলে ফ্ল্যাট নিয়েই বা কি হবে?
এ সব অলুক্ষুণে কথা তখন ওর মাথায় আসেনি। আসত না। বরং দিদিদের প্রতি কেমন একটা করুণা হয়েছে। তোদের হাসি, আনন্দ, গল্প, সিনেমা যাওয়া, চাইনিজ খাওয়া, পুরী কিংবা দার্জিলিং বেড়াতে যাওয়া, ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখী সংসার, অথচ ভেতরে একটা ফাটল আছে নাকি? না থাকলে স্বামীকে অবিশ্বাস করার কথা মাথায় আসে কি করে।
সাতচল্লিশ বছর বয়েসে এসে অনেক দিন আগের একটা দৃশ্য মনে পড়ে গেল অমিতার।
বাবার সঙ্গে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেছে। মুকুল আর টুটু তখন স্কুলে পড়ে।
গিয়ে দেখল, বাড়ির একটা দেওয়ালে শ্যাওলা পড়ে নোংরা, বোধহয় ছাদের ট্যাঙ্ক থেকে জল গড়িয়ে পড়ে পড়ে হয়েছে, বাবা ধুতি আর গেঞ্জি পরে হাতে একটা বোতল নিয়ে কি ঢালছে সেখানে।
—ও কি করছ? কি হয়েছে?
মুকুল আর টুটুও ছুটে গেল।
বাবা সলজ্জ হাসি হাসি মুখে বোতলটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। –চ, আমি যাচ্ছি।
অমিতার তখনও কৌতূহল।—কি করছিলে কি?
তারানাথ হাসলেন, বললেন, অঙ্কুরে বিনাশ।
বললেন, এই দেখ, দেওয়ালের ফাঁকে একটা অশ্বত্থ গাছের চারা গজিয়েছে, এখন মাত্র দুটো পাতা, উপড়ে দিয়েছি, এসিড দিয়ে শেষ না করে দিলে কবে দেওয়ালে ফাটল ধরবে।
একটু থেমে বললেন, বাড়ি থাকলেই তো হয় না, চতুর্দিকে চোখ রাখতে হয়, ফাটল না ধরে।
তখন মনে হয়েছিল বাবার পাগলামি। ছোট্ট এইটুকু একটা অশ্বত্থচারা, টেনে উপড়ে দিলেই যথেষ্ট। তার জন্যে এসিড নিয়ে এসে ঢালা। এই ক’রে বুড়ো বয়েসে হাত পোড়াও। এই জন্যেই সেকেলে লোকগুলোর সঙ্গে দু’ দণ্ড বসে গল্প করা যায় না।
অমিতা মনে মনে ভাবল, আমার কি এখন আর চুনবালি নিয়ে এসে ফাটল সারানোর মতো অবস্থা আছে!
