চার
মেয়েদের জীবনে এমন একটা বয়েস আসে, মেয়ে বড় হলে যখন মা মেয়েকে দু’বোন বলে ভ্রম হয়। সত্যি ভুল হয় কি না অমিতা জানে না। কিন্তু কয়েক বছর আগেও কেউ কেউ পরিহাস করে বলত ওকে। এ ক’বছরে কেউই যে সে রকম কোনও ঠাট্টা শোনায়নি অমিতার তা খেয়ালই ছিল না। ঠাট্টা হলেও ওর মধ্যে একটা প্রশস্তি থাকে। অর্থাৎ চেহারায় এখনও জৌলুস আছে। শরীরে যৌবন থাকা আর চেহারায় জৌলুস থাকা এক জিনিস নয়। এই বয়েসে পৌঁছে এক এক সময় মনে হয় শরীরই মরে গেছে। জীবন যেন কোনও একটা জায়গায় পৌঁছে থেমে পড়েছে। আসলে মানুষকে কে বাঁচিয়ে রাখে? হয়তো জীবন সম্পর্কে কোনও স্বপ্ন। অমিতার মনে হয় ওর জীবন থেকে সেই স্বপ্নটাই হারিয়ে গেছে।
মুকুল এমন ছিল না, মুখের ওপর এ ধরনের কথা বলে বসবে ভাবতেও পারেনি।
অমিতা চুপ করে গিয়েছিল।
কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে মুকুল চলে যাবার পর ও নিজেকেই দোষ দিল। একটুও রাগ হল না। ভেবে দেখল ও নিজে যখন মুকুলের বয়েসে ছিল তখন তো এমনই উদ্ধত হয়ে উঠত মায়ের ওপর। বাবা-মায়ের তরফ থেকে কোনও দিন তেমন বাধানিষেধ পায়নি। যা পেয়েছিল সবই বড়দি। মেজদির বেলায় কম, ওর বেলায় তো একেবারেই না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মা যে একেবারে বদলে গিয়েছিল তা বুঝতে অসুবিধে হত না। কিছু কিছু নিজের চোখেই দেখেছে, দেখে খারাপ লেগেছে, ওদের পক্ষ নিয়ে দু-একবার প্রতিবাদও যে করেনি তা নয়। কিন্তু প্রতিবাদ করেই বা কি হবে, যাদের পক্ষ নিয়ে প্রতিবাদ, তারাই যদি মেনে নেয় তা হলে তাদের বাঁচাবে কি করে।
কালের গুণে তারানাথ আর স্বর্ণলতা রাশ ঢিলে করতে শুরু করেছিলেন, নাকি অমিতার নিজেরই জেদ জয়ী হয়েছিল তা অবশ্য ও জানে না।
শুনেছে ও জেদি ছিল ছোটবেলা থেকেই। জেদ বেড়ে গিয়েছিল সম্ভবত সেই ছোট্ট ঘটনা থেকে। নেহাতই তুচ্ছ ঘটনা, ভুলে যাবারই কথা। কিন্তু ভুলতে পারেনি দেখে ও নিজেই অবাক হয়।
অমিতার তখন তেরো চোদ্দো বছর বয়েস, স্কুলে পড়ে। সেটা দোলের দিন, মেজদির বিয়ে হয়নি তখনও, সবে কলেজে, দাদা কুয়েত চলে যায়নি।
ওদের ভাইবোনদের মধ্যে দারুণ ভাবসাব ছিল। বাড়িতে তখন পরিষ্কার দু’-দুটো দল। এক দিকে বাবা-মা, আরেক দিকে তিন ভাইবোন। ও, দাদা, মেজদি। বড়দির অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। কদাচিৎ আসা-যাওয়া।
ওরা তিন ভাইবোন দোল খেলবে বলে বেশ খানিকটা আবির কিনে এনেছে আগের দিনই। পাড়ারও কেউ কেউ আসত।
হঠাৎ চোখে পড়ল পাশের বাড়ির ছেলেমেয়ে হুড়োহুড়ি করে রং খেলছে, পরস্পরকে আবির দিচ্ছে। আর সে কি হইহল্লা। যেন আনন্দের হাট বসে গেছে। ওই আনন্দের মধ্যে কি একটা নেশা ছিল।
পাশের বাড়ির সঙ্গে বেশ সদ্ভাব ছিল ওদের। অঞ্জলি তো বন্ধু।
চোখে চোখ পড়তেই অঞ্জলি ডাকল, চলে আয়, চলে আয়।
একটা হাতছানি অনেকক্ষণ থেকেই বুকের মধ্যে ডাকছিল। অঞ্জলির ডাক শুনেই এক ঠোঙা আবির নিয়ে ছুটে গেল।
রং খেলে আবির মেখে এক বুক আনন্দ নিয়ে ফিরে আসতেই মায়ের সামনাসামনি পড়ে গেল।
আর সে কি বকুনি, কি বকুনি।
আগে থেকেই রেগে টং হয়ে ছিলেন স্বর্ণলতা।
ও চুপ করে থাকার চেষ্টা করছিল, কিন্তু ওই চুপ করে থাকার জন্যেই স্বর্ণলতার রাগের পারদ উঠছিল তরতর করে।
উত্তর দিচ্ছে না দেখে হঠাৎ ওর চুলের মুঠি ধরে ফেললেন স্বর্ণলতা।
রাগের স্বরে বললেন, আর যাবি কোনও দিন!
চুল ছাড়িয়ে নিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়ল অমিতা।
প্রথমটা বুঝতেই পারেনি ও কি এমন দোষ করেছে। রং আর আবির নিয়ে কিছুক্ষণ হইহল্লার আনন্দ পাওয়ার মধ্যে কি এমন অপরাধ থাকতে পারে বুঝতেই পারেনি। কোনও অন্যায় করেনি বলেই অন্যায়টা কোথায় দেখতে পায়নি।
বিভ্রান্ত ভাবটা কেটে যাওয়ার পরই তেরো-চোদ্দো বছর বয়েসের একটি মেয়ের পক্ষে আপত্তি কোথায় খুঁজে পেতে দেরি হল না।
বুঝতে পারল আপত্তি কেন। অঞ্জলির একটা দাদা আছে না। ওদের চেয়ে দু’ক্লাস ওপরে পড়ে।
বুঝে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে চোখ ঠেলে জল এসে গেল।
সুশেনদাকে তো ও দাদার মতোই মনে করে।
সমস্ত শরীর তখনও থরথর করে কাঁপছে। রাগে, অভিমানে, লজ্জায়।
ওর কেমন যেন মনে হল, মায়ের ওই রাগ, ওই বকুনি যেন প্রকারান্তরে বলতে চাইছে, অমিতা ও বাড়িতে গিয়ে ওর সতীত্ব দিয়ে এসেছে।
তাই মা যেই রাগের মাথায় চুলের মুঠি ধরে বলল, ‘আর যাবি কোনও দিন, অমনি দৃপ্ত ভঙ্গিতে ও জবাব দিল, যাব, যাব, যাব। একশোবার যাব।
স্বর্ণলতা অবাক হয়ে গিয়ে চুপ করে রইলেন। আর কোনও কথাই বলেননি। সরে গিয়েছিলেন।
সেই মা কি করে যে এত বদলে গেল অমিতা ভেবে পায় না। সময় কি সব কিছুই বদলে দেয়।
অথচ এই সাতচল্লিশ বছর বয়েসে পৌঁছে অমিতা কেন নিজেকে বদলে ফেলতে পারছে না।
অমিতার মনে হল, ও যেন ক্রমে ক্রমে ওর সেই পুরনো দিনের মা হয়ে যাচ্ছে।
নিজেকে বুঝতে পারাই হয়তো সবচেয়ে কঠিন। আর নিজেকে না বুঝতে পারলে অন্যকেই বা কি করে বুঝতে পারবে।
এখন ভেবে দেখলে মনে হয়, পুরো ব্যাপারটাই হয়তো আধিপত্য। স্নেহ প্রীতি ভালবাসার মধ্যেও হয়তো এটাই কাজ করে যায়। সব সময় ভাবে আমি তো ওর ভালর জন্যেই বলছি, ভালর জন্যেই করছি। কথাটা মিথ্যেও নয়। তবু এর মধ্যে কোথায় আধিপত্যবোধ কাজ করে। তোমার কিসে ভাল তা আমিই সবচেয়ে ভাল বুঝি। কারণ, তুমি আমার। সন্তান কিংবা স্বামী। স্বামীর কাছে স্ত্রী। এ সেন্স অফ প্রপার্টি, এটাই গোড়ার কথা। বোধহয় অ্যানিমেল ইনস্টিংক্ট। কিংবা প্রকৃতিও বলা যেতে পারে।
রাগের মাথায় অমিতার মনে হয়েছিল, পাশের বাড়িতে দোল খেলতে যাওয়াকে মা ভেবেছে ও সেখানে গিয়ে নিজের সতীত্ব রেখে এসেছে। কিংবা তা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা আছে ভেবে নিয়েছিল। কিংবা ভেবেছে প্রেম-ফ্রেম করে বসবে, যার পরিণতি কোথায় গিয়ে পৌঁছবে তার ঠিকানা নেই।
অর্থাৎ মা আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল, বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কারণ, তুই যে আমার।
সেই মা অসিতেশকে দেখে বলে বসল, ছেলেটিকে বাপু আমার ভালই লেগেছে।
বাবার প্রশংসা, মায়ের এই কথাগুলো আর জামাইবাবুর ‘কোয়াইট হ্যান্ডসাম,’ সবগুলো মিলেমিশেই কি অমিতার ভেতরটা নরম করে দিয়েছিল? নাকি অসিতেশের বলা ‘তুমি তো আমাকে অপছন্দই করতে, সে জন্যেই সরে এসেছিলাম’ এই কথাগুলো ওর কাছ থেকে করুণা আদায় করে নিয়েছিল। কারণ অসিতেশ সম্পর্কে ওর সত্যি সত্যি কোনও পছন্দ বা অপছন্দ গড়ে ওঠেনি। নিতান্তই খড়ি দিয়ে স্লেটে লেখা নাম, ভিজে হাত পড়লেই যা মুছে যায়। অথচ তার জন্যেই ও ধীরে ধীরে কি করে যে এত তীব্র আকর্ষণ বোধ করতে শুরু করেছিল, ওর নিজের কাছেই দুর্বোধ্য লাগে। এই আধিপত্যবোধ থেকেই? এই মানুষটা আমার একটা কথাও উপেক্ষা করে না, আমাকে খুশি করার জন্যে সব সময় ব্যগ্র! অর্থাৎ ও এখন আমার। চিরকাল আমার থাকবে।
অথচ বিয়ের পর ওর নিজেরই অজান্তে কিভাবে যেন ঠিক উল্টো হয়ে গেল। কেন গেল? তার কারণ ভালবাসা প্ৰেম এ সবও হয়তো ওই আধিপত্যবোধ। কেউই সচেতন থাকে না যে দুটো শরীর এক হয়ে সন্তানের জন্ম দিতে পারে, কিন্তু দুটো মন কখনও এক হয় না। প্রত্যেকটি মানুষ শুধু রক্তমাংসের শরীরেই পৃথক নয়, প্রত্যেকের নিজস্ব মন আছে। সেই মন সবসময় স্বাধীন থাকতে চায়। চায় বলেই কখন কি করে বসে তার হদিস পাওয়া যায় না।
রেগে গিয়ে অমিতা দৃঢ়স্বরে বলেছিল, যাব, যাব, যাব। অথচ আর একদিনও যায়নি। সেটা স্বর্ণলতার নিষেধের জন্যে নয়। ও ক্রমে ক্রমে স্বাধীনতা আদায় করে নিতে পেরেছিল বলেই। স্বাধীনতা পাওয়ার পর দেখল, অঞ্জলির দাদা ওকে কোনও দিনই টানেনি।
কিন্তু তা হলে মুকুলের কথা শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল কেন।
‘ক্লাসমেটকে বিয়ে করা কি খারাপ কিছু?’
মুকুল কি তা হলে সত্যি সত্যি কোনও ছেলেবন্ধুর প্রেমে পড়ে গেছে?
মনে মনে বলেছিল, তুই লেখাপড়াটা কর, ভালভাবে পাশ করে নে, নিজের পায়ে দাঁড়াবার ব্যবস্থা করে নিয়ে যা খুশি করিস, বাধা দেব না।
ওটা আসলে নিজেকে স্তোক দেওয়া।
অমিতা বেশ বুঝতে পারে, ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে ও পায়ের তলায় মাটি খুঁজছে।
ওরাই যে এখন ওর সহায়, সম্বল। আমার। এই বয়েসে এসে একা হয়ে যাওয়ার ভয় ওকে গ্রাস করে ফেলছে। সেখানে মুকুলও যদি ওকে একা করে দেয় সেই আতঙ্কে ও বিভ্রান্ত বোধ করছে।
বাবাও কি একই ভয় পেয়েছিল? ভয় আর আনন্দ একই সঙ্গে?
তারানাথের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছিল, কিন্তু আশা কি কখনও মানুষের সঙ্গ ছাড়ে?
একমাত্র অমিতার অনুপস্থিতিতেই ওকে নিয়ে আলোচনা করা যেত।
স্বর্ণলতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন, কি রকম ছেলে যে ওর পছন্দ বুঝি না।
তারানাথের কপালে রেখা পড়ত। বলতেন, ওই একটাই দুশ্চিন্তা।
তারপর হেসে উঠে : ওর বিয়েটা হয়ে গেলে হাত-পা ঝাড়া।
একটু থেমে রসিকতা করে বলতেন, তারপর একদিন ফুরুত করে চলে যাব। ব্যস। একা এসেছিলাম, একা চলে যাব।
স্বর্ণলতা রেগে গিয়ে বলতেন, কি শখ রে। ‘চলে যাব’ কথাটা ভেংচি কেটে উচ্চারণ করতেন, তারপর : এই বুড়িটা বেতো পা নিয়ে পড়ে থাকবে, না!
রাগত উপহাসে : সারা জীবন জ্বালিয়েছ, অত সহজে তোমাকে রেহাই দেব যেন। ওপরে গিয়ে দেখব হাত পুড়িয়ে নিজে রাঁধছ, নিজে খাচ্ছ।
একটু থেমে : কাজের লোক এখনই মেলে না, তো তখন? পেনশন দেখিয়ো তাদের, তারা বুড়ো আঙুল দেখাবে।
আসলে এত যে রঙ্গরসিকতা তার পিছনে একটা প্রগাঢ় দুঃখ খেলা করে যায়। পরস্পরের প্রতি রাগ অভিমান হাসিঠাট্টা ছাড়া দুঃখ আড়াল করার। চেপে রাখার আর কোনও উপায় আছে নাকি!
এই পৃথিবীটার কি যে এক অদ্ভুত নিয়ম!
মানুষ যখন সুখী থাকে তখন সুখের বোধ থাকে না।
এই পলেস্তারা ওঠা শ্যাওলা ধরা পুরনো বাড়িটায় তখন সুখ উপছে পড়ছে। অথচ একদিনের জন্যেও বুঝতে পারেননি তারানাথ। এক ছেলে আর তিন তিনটি মেয়ে। অসুখবিসুখ কারও না কারও লেগেই থাকত। স্কুলে ভর্তি করার জন্যে ছোটাছুটি। একে ধরো তাকে ধরো, পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে উদ্বেগ। কলেজ থেকে কে ফিরতে দেরি করছে … আর সব ছাপিয়ে একটাই দুশ্চিন্তা, একই মাসে দুটো বিয়ের নেমন্তন্ন থাকলে। মাইনে কম ছিল। ভাবনাচিন্তাই বেশি।
এখন মনে হয় সবই অর্থহীন। শেষ সময়ে ছেলে মুখে জল দিতেও আসতে পারবে না হয়তো। যেন তার হাতের জল পাওয়ার জন্যে কতই কাঙাল হয়ে আছি। বড় মেয়ে তো বাঙ্গালোরে, আসতেই পারে না। ছেলে কুয়েত দেখেছে, টাকা দেখাচ্ছে। মেজ মেয়েই বা ক’বার আসে, তবু পুরী গিয়েছিল বলে ক’টা দিন আনন্দে কাটল।
বাজারে বেরোনোর সময় হরসুন্দরবাবুর সঙ্গে দেখা হতেই দু-চার কথা না বলে চলে যাওয়া অভদ্রতা। পুরী যাওয়ার ওই ক’দিন সকাল বিকেল দরজা জানালা ঠেলে দেখে গেছেন সব ঠিকঠাক আছে কি না।
ভদ্রলোক ফুটপাথে আবার নতুন ক’টা ফুলের চারা নিয়ে এসে বসিয়েছেন, ঝারি করে জল দিচ্ছিলেন।
তারানাথ হাতের থলি দোলাতে দোলাতে বললেন, আপনার সংসারটাই ভাল, বুঝলেন হরসুন্দরবাবু।
তারানাথ বাঁ হাতের থলিটা এ দিক থেকে ও দিক দুলিয়ে ফুটপাথের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত অবধি ফুলগাছগুলো দেখালেন।
বললেন, কেউ ছেড়ে যায় না।
বুকের গভীরে কেউ একা হয়ে গেলে বাইরের লোকের কাছেও নিঃস্বতা প্রকাশ না করে পারে না।
হরসুন্দরবাবু প্রথমে হেসেছিলেন, তারপর বললেন, এ কথা বলবেন না। আপনার ছেলে তো একটা জুয়েল। জামাইরাও কম যায় না। এ তো গর্ব করে বলার মতো। ছোট মেয়েও চাকরি করছে …।
তারানাথকে কেমন বিভ্রান্ত দেখাল। বললেন, একে একে সবাই শুধু গর্ব হয়ে গেল! মানুষ রইল না।
হরসুন্দরবাবু সান্ত্বনা দিলেন, কালের ধর্ম। সবাই এখন বাইরে চলে যাচ্ছে, দূরে দূরে। না গিয়েও তো উপায় নেই। বলে হাসলেন।
বাজারের পথে যেতে যেতে তাই মনে হয়েছিল, একসময় সত্যি তো সুখী ছিলাম। ওরা সবাই তখন কাছে কাছে। অথচ টাকাপয়সার অভাব ছিল বলে সুখটা টেরই পেতে দেয়নি। এখন এত দিনে বুঝতে পারছি, সেটাই সুখের দিন।
পুরী থেকে ফিরে এসে একটাই পরিবর্তন দেখা গেল। যা চেয়েছিলেন তাই। অমিতার মুখে হাসি ফুটেছে আবার। কেন, সে সম্পর্কে অবশ্য নিঃসন্দেহ ছিলেন না। তবু হাসি যে ফুটেছে সেটুকুই যথেষ্ট। আগে মেয়েটাকে কেমন মরা-মরা লাগত, অফিস থেকে ফিরত ধুঁকতে ধুঁকতে। ক্লান্ত হয়ে। এখন ওর শরীর থেকে সব ক্লান্তি যেন ঝরে গেছে।
হঠাৎ একদিন সন্ধে পার করে ফিরল। একটু দেরি করেই।
এসেই হাসি হাসি মুখে স্বর্ণলতাকে বললে, সরি, সরি।
তারপর : রাত্তিরে কিছু খাব না।
তারানাথ মেয়ের হাবভাব দেখে খুশি হয়েছিলেন। যদিও রাত হচ্ছে বলে উদ্বেগ যে ছিল না তা নয়। কিন্তু অমিতা আবার পুরনো দিনের মতো ‘সরি, সরি’ বলছে দেখে খুশিই হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন দেরি করে ফেলেছে বলেই ওর এই ক্ষমাপ্রার্থনার মজাদার ভঙ্গি।
কিন্তু পরের কথাটা শুনেই স্বর্ণলতার মুখ ভার। চিরকাল এই একটা ব্যাপারকে উনি অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন। ছেলেমেয়েদের দু’বেলা পেট ভরে খাওয়া। একটা দিন ব্যতিক্রম হলেই যেন শরীর ভেঙে পড়বে। অথচ নিজের বেলায় খাওয়ায় কোনও রুচি নেই, লোভ দূরের কথা।
যতই স্বাধীনতা পাক, এই একটা ব্যাপারে অমিতাকে মায়ের আব্দার মান্য করে চলতে হয়েছে। চাকরি পাওয়ার পর থেকে যত্নটা আরও বেড়ে গেছে। বিশেষ করে এই রাত্তিরের খাওয়ায়। সকালে তাড়াহুড়োয় নাকে-মুখে গুঁজে বেরিয়ে যায় বলেই রাত্তিরে এক সঙ্গে বসে খাওয়ার সময় তদারকির মাত্রা বেড়ে গেছে।
চাকরি করছে বলেই ধমকধামক কমিয়েছেন কি না কে জানে। এ মেয়ে তো এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, রেগে গেলেই হয়তো বলে বসবে, এ বাড়িতে আমার থাকা পোষাবে না। ও আছে বলেই তো এ বাড়িটায় এখনও প্রাণ আছে, তারানাথের মুখে কথাবার্তা শোনা যায়।
রাগ চেপে মুখে আহ্লাদি হাসি এনে বললেন, কেন রে, কোথাও নেমন্তন্ন ছিল?
— না, না।
অমিতার হাসিটার মধ্যে কি একটু লাজুক ভাব জড়িয়ে ছিল!
বললে, ছুটির সময় অসিতেশ এসে হাজির।
—তা বাড়িতে নিয়ে এলি না কেন? তারানাথ বললেন।
স্বর্ণলতা বলে বসলেন, বেশ করেছে, ওর তো কাজ নেই, এসে একটা বুড়োর সঙ্গে ভ্যাজ ভ্যাজ করবে।
থাবড়া খাওয়া মুখ করে হাসলেন তারানাথ। —তা ঠিক, তা ঠিক।
এর আগে একদিন, বোধহয় রবিবার, অসিতেশ নিজেই এসেছিল। যেটুক শুনেছেন মেয়ের কাছে, তাতে স্পষ্ট বুঝতে পারেন মাঝে মাঝে ওদের দেখাসাক্ষাৎ হয়। কোনও একটা কোম্পানিতে, নাম ভুলে গেছেন, মোটামুটি ভাল চাকরিই করে। সে জন্যেই স্বপ্ন লেগে আছে চোখে। তবে মেয়েকে বিশ্বাস নেই, শেষে হয়তো একদিন অবাক করে বলে বসবে, আরে দূর, ও তো স্রেফ বন্ধু।
অসিতেশ যে দিন এসেছিল, স্বর্ণলতা যথাযোগ্য আপ্যায়ন করে সরে এসেছিলেন। —যা তোরা গিয়ে গল্প কর।
কিন্তু বুড়োটার ঘটে কি বুদ্ধি আছে নাকি। সেই যে গিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসল সরে আসার নাম নেই।
অসিতেশকে বাসস্টপে পৌঁছে দিতে গেল অমিতা, আর সেই ফাঁকে স্বর্ণলতা বলেছিলেন, তোমার কোনও দিন আক্কেল হবে না।
ভ্যাজ ভ্যাজ করার কথায় সে জন্যেই মুখে থাবড়া খাওয়া ভাব হল তারানাথের।
—বাইরে যত সব আজেবাজে খেয়ে এসেছিস তো?
স্বর্ণলতার কাছে বাইরে খাওয়া মানেই আজেবাজে খাওয়া।
অমিতা মুখ কাচুমাচু করে বললে, কি করব বলো, অসিতেশ এমন নাছোড়বান্দা
তারানাথকে বেশ খুশি লাগছিল। হয়তো ভেবেও নিলেন নাছোড়বান্দাকে এবার বান্দা বানিয়ে নে, তা হলেই আমরা খুশি।
মাকেও অখুশি মনে হল না, তাই হাত-পা নেড়ে চোখমুখের এমন ভাব করল যেন অমিতাও দারুণ খুশি।
বললে, আজেবাজে? একবার গিয়ে খেয়ে দেখে এসো।
বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বললে, কিছুতেই ছাড়ল না। সেই ট্যাংরায় নিয়ে গিয়ে চীনে রেস্টুরেন্টে চাইনিজ ফুড। আঃ, এখনও জিভে লেগে আছে।
পার্ক স্ট্রিটে কিংবা এখানে-ওখানে দুপুরের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ‘আজেবাজে’ খাবার কম খায়নি ও, কিন্তু ট্যাংরায় যাওয়ার সাহসই হয়নি ওর বন্ধুদের। অথচ অসিতেশের সঙ্গে ওখানে ওর যেতে একটুও ভয় করেনি। কেমন যেন মনে হচ্ছিল হাওয়ায় ভেসে চলেছে। ভয় তো দূরের কথা, কোনও ভাবনাচিন্তাই মাথায় আসেনি। অসিতেশের ইচ্ছের কাছেই নিজেকে ছেড়ে দিয়েছিল। আমি তোমার সঙ্গে আছি, ব্যস।
একজন মানুষের সঙ্গ কি শেষ অবধি কোনও নেশা ধরিয়ে দেয়? দেখা না হলে সমস্ত মন বিরক্তিতে ভরে যায় কেন! দেখা হলেই সমস্ত শরীর ফোয়ারা হয়ে ওঠে কেন। অমিতা নিজেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছিল, একেই কি প্রেম বলে? নাকি ওর শরীর শরীর চাইছিল?
এত দিন বাদে এখন আর ভাল করে মনেই পড়ে না। সে দিনের সেই অমিতার সঙ্গে আজকের এই অমিতাকে কিছুতেই যেন মেলাতে পারে না ও। আজ মনে হচ্ছে পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।
মুকুল মুখের ওপর কয়েকটা রূঢ় কথা বলে চলে গেল। সমস্ত মন বিস্বাদ হয়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। ইচ্ছে হল চিৎকার করে বলে, তোর জন্যে, তোদের জন্যেই আজ আমি এত অসহায়। শুধু তোদের কথা ভেবেই আমি চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিলাম, সংসারের কথা ভেবে।
স্বর্ণলতা মাঝেমাঝেই বলতেন, এভাবে ছেলেমেয়ে মানুষ হয় না।
অসিতেশের চড়চড় করে উন্নতি হয়েছে তখন, আর সেই উন্নতি দেখে অমিতাও নিশ্চয় খুশি হয়েছিল। অফিসের সহকর্মীদের কাছে অসিতেশের কোম্পানির নাম আর তার ডেজিগনেশন জানাতে গিয়ে গর্বও হয়েছে। গর্ব হবারই কথা।
অসিতেশ অ্যাম্বিশন ছাড়া জীবনের অন্য কোনও অর্থ আছে মনে করত না। তার জন্যে ও নিজেকে তৈরিও করেছিল। পরিশ্রমকে এতটুকু ভয় পেত না। অ্যাম্বিশন। যা চাই তা পেতেই হবে। ওপরের ওই উঁচু পোস্ট। এক এক সময় অমিতার সন্দেহ হয়, ওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া, এত কাছে এসে পড়া, বিয়ে করতে চাওয়া, এ সবও ওই চাপা অ্যাম্বিশন থেকে নয় তো! কলেজজীবনে ইচ্ছে হয়েছিল কাছে আসতে, পারেনি। সুযোগ যখন এসে গিয়েছে, পুরীতে বেড়াতে গিয়ে, তখন ওকে আমার চাই-ই।
প্রথম প্রথম, মুকুল হওয়ার পরও অফিসে কোনও অস্বস্তি বা ঝামেলা হলে অমিতার মনমেজাজ খারাপ হয়ে যেত। এসে বলত। কে ওকে ডিঙিয়ে ওপরে উঠে গেছে সে কথাও।
অসিতেশের নিজেরও মাইনে তখন কম। সান্ত্বনা দিয়ে বলত, ও সব গ্রাহ্য করলে চলে না। — দু’জনেই যদি চাকরি না করি ভালভাবে বাঁচা যাবে না। ছেলেমেয়েদের মানুষ করা যাবে না।
তারপর অসিতেশের মাইনের অঙ্কটা যেই ফুলেফেঁপে উঠল, পার্কস, অফিসের গাড়ি, ওদের পরীক্ষার রেজাল্ট একটু খারাপ হতেই, বলে বসল, নিজে ওদের দিকে লক্ষ দেবে না, এ রকম রেজাল্ট তো হবেই।
সে দিনই বলেছিল, ও ক’টা টাকার লোভে চাকরিটা রেখে কি লাভ। তার চেয়ে ছেড়ে দিয়ে ওদের দিকে একটু চোখ দাও।
একটা বছর দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে কেটে গেছে। কি করবে ঠিক করে উঠতে পারেনি। বারবার মনে পড়েছে এই চাকরিটাই একদিন ওকে একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দিয়েছিল। নিজের পায়ে দাঁড়াবার সাহস জুগিয়েছিল। কাজকে ভালবেসে ফেলে একাকিত্ব দূর হয়ে গিয়েছিল। ছেড়ে দাও বললেই কি ছেড়ে দেওয়া যায়।
মনের মধ্যে একটা অভিমান গুমরে উঠেছিল। ওই ছোট্ট ফ্ল্যাটটাই তখন মাথা গোঁজার স্থান। কিনে ফেলতে পারলে আর মোটা টাকা ভাড়া গুনতে হবে না। দু’জনের টাকায় মাসে মাসে লোনের কিস্তি শোধ করেছে।
অসিতেশ জিগ্যেস করেছে, জয়েন্ট নামে করব তো?
অমিতার তখন অগাধ বিশ্বাস অসিতেশের ওপর। হেসে উঠে বলেছে, না বাবা, সব জায়গায় আমি ছোটাছুটি করতে পারব না।
এখন অসিতেশ অনেক বড় ফ্ল্যাট কিনতে পারবে। কেনার কথা বলেও। ছোট্ট ফ্ল্যাটটা তুচ্ছ হয়ে গেছে আজ। তা যাক, কিন্তু ওর পিছনে অমিতার নিজের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, কষ্ট স্বীকার করে থাকা, সব ভুলে গেল কি করে।
স্ত্রী কি স্বামীকে ঈর্ষা করে? সে এক বিচিত্র অনুভূতি ছিল তখন। এক দিকে সাফল্যের আনন্দ, স্বামীর জন্যে গর্ববোধ। আত্মীয়স্বজন কেউ এলে না শুনিয়েও পারত না। অন্য দিকে মনে হত ও নিজে যেন তুচ্ছ হয়ে গেছে। কে যেন একবার প্রশংসা করে বলেছিল, তোর মধ্যে একটা ব্যক্তিত্ব আছে। ভাল লেগেছিল শুনতে। অসিতেশের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ওর কখনও কখনও মনে হত ওর ব্যক্তিত্ব যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তি দিয়ে বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে যেটা সঠিক মনে হত বলতে দ্বিধা করত না।
হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করে বসল, নিজের বুদ্ধির ওপরই ওর কোনও আস্থা নেই। মতামত জানাতেও কুণ্ঠা বোধ করে। অসিতেশ যা বলে তাই মেনে নেয়। নিজেরই মনে হয়, ও তো ঠিকই বলছে। কোন ফাঁকে ওর ব্যক্তিত্বই হারিয়ে গেছে ও জানতেও পারেনি। অসিতেশের পছন্দ অপছন্দই যেন সব।
অথচ একটা চাপা কষ্ট রয়েই গেছে। পাশাপাশি থেকেও টের পেয়েছে দূরত্ব বেড়ে গেছে। দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে।
এক একসময় অসহ্যও লাগে।
ছেলের বাড়াবাড়ি অসুখ হল একবার। বড় ডাক্তার দেখাতে দেরি করে ফেলার জন্যে অমিতাই দায়ী কি না তাও মনে নেই। নিজের ওপর বিশ্বাসই তখন হারিয়ে বসছে, ও চাইছিল, অসিতেশও সঙ্গে চলুক। ভাল করে সব কথা বলতে পারবে।
তার জন্যে দুটো দিন দেরি হয়ে গেল। অসিতেশের সময় কোথায়। সে কি উৎকণ্ঠা। নার্সিংহোমে নিয়ে যেতে হল ছেলেকে।
জীবনমৃত্যুর টানাটানি। অমিতার চোখ ছাপিয়ে জল।
অসিতেশের চোখেমুখেও বিভ্রান্তি। একটু ঠেলা দিলেই চোখে কান্না এসে যাবে। কনসালটেন্ট যিনি এসেছিলেন, নামী ডাক্তার, তার সামনে অসিতেশের মতো আত্মবিশ্বাসী, অহঙ্কারী, ইগো-সর্বস্ব মানুষটা হাতজোড় করে নত হয়ে পড়েছে, বিবর্ণ মুখে বলছে, যে করে হোক ওকে বাঁচিয়ে তুলুন, টাকার জন্যে ভাববেন না, যা লাগে …।
অমিতার বুক সে দিন অসিতেশের প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠেছিল। ছেলেকে বাঁচানোর জন্যে এই আকুল আবেদন, এ তো আমাকেই বাঁচানোর জন্যে। ওকে ভালবাসার ভেতর দিয়ে আমাকেই ভালবাসা।
অথচ সে দিনই বাড়ি ফিরে একা বসে বসে মাথা নিচু করে কি যেন ভাবছিল অসিতেশ।
ক্লান্ত শরীর নিয়ে নার্সিংহোম থেকে ফিরে এক কাপ চা নিয়ে দিতে গেল অমিতা।
চায়ের কাপটা নামাতেই একটু শব্দ হল, অসিতেশ মাথা তুলল, ওর মুখের দিকে তাকাল। তারপর হঠাৎ কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল, আমি জানতাম একদিন না একদিন এ রকম কিছু ঘটবে।
অবাক হয়ে তাকাল অমিতা।
অসিতেশ বলে উঠল, সংসার মানে সংসার। ছেলেমেয়েদের দিকে নজর রাখা। হাজার বার বলেছি, চাকরিটা ছেড়ে দাও।
উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, কিসের জন্যে চাকরি, এ ক’টা টাকা মাইনের জন্যে। অফিসের কাউকে বলতেও লজ্জা!
ছেলের জীবনমৃত্যু নিয়ে টানাটানি, সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত তখন অমিতা। ভেতরে ভেতরে মৃতপ্রায়। ডাক্তার কোনও ভরসা দিতে পারেননি।
অমিতার মন বলে উঠল, আমারই দোষ, আমারই দোষ।
কাঁদো কাঁদো গলায় ও বলে উঠল, আমি ছেড়ে দেব, ছেড়ে দেব।
ছেলে সেরে উঠতেই ও অফিসে গিয়ে রেসিনেশন লেটারটা দিয়ে এসেছিল।
অফিসের কল্যাণী শুনে কপালে চোখ তুলেছে! এ কি করছেন অমিতাদি, পরের বছরই তো আপনার প্রোমোশন। নকুলবাবু রিটায়ার করছেন …
শুনে শুধু হেসেছে অমিতা। তারপর : না ভাই, আর নয়। এখন থেকে আমি শুধুই হাউসওয়াইফ।
টাকাকড়ি যা পেয়েছিল বেশি সুদের লোভে বন্ড না ডিবেঞ্চার কিনতে বলেছিল অসিতেশ। ফর্ম ভর্তি করতে গিয়ে অকুপেশনের ঘরে কলম থেমে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে লিখেছিল : হাউসওয়াইফ। গৃহবধূ।
.
সাতচল্লিশ বছর বয়েসে পৌঁছে অমিতার মনে হল ওর পায়ের তলায় মাটি নেই। জীবনে কোনও দিন ও এত অসহায় বোধ করেনি।
কেবলই মনে হচ্ছে ও একটা অন্ধগলির মধ্যে ঢুকে পড়েছে, বেরোনোর রাস্তা নেই।
আমি হারিয়ে গেছি!
কেবলই মনে হচ্ছিল, এই বাড়িটায়, এই বিশাল ফ্ল্যাটে থাকার আমার কোনও অধিকার নেই। নিজেকে অশুচি মনে হচ্ছিল।
একটা ছোট্ট ঘটনায় যে এভাবে ওর জীবনে সব ওলোটপালোট হয়ে যেতে পারে অমিতা কোনও দিন ভাবেনি। একটু একটু করে অসিতেশের প্রতি ওর যে এতখানি বিতৃষ্ণা জমা হয়ে আছে ও কোনও দিন টেরও পায়নি। কোনও দিন বুঝতে পারেনি একই ঘরে থেকেও অসিতেশ ওকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। নাকি নিজেই সরে এসেছে।
সাকশেস কি মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, নাকি মানুটাকেই বদলে ফেলে।
ব্যাঙ্ক থেকে তোলা ঝকঝকে একটা নোটের বান্ডিল এগিয়ে দিয়ে অসিতেশ বলেছিল, দিস ইজ ইওর স্যালারি। ঠাট্টা করেই বলেছিল, বলত, সংসার খরচের টাকাকে। হেসে হাত বাড়িয়ে নিত ও।
সে দিন আরেকটা বান্ডিল এগিয়ে দিয়ে বললে, এটা নাও, মুকুল আর টুটুর জন্যে বেশ ভাল ভাল পোশাক কিনে দিয়ো।
তারপর : ভদ্রসমাজে ওদের বের করা যায় এমন পোশাক।
একটু থেমে বললে, মিস্টার ভারুচার বাড়ি গিয়ে তো দেখলে ওর বাড়ির সকলে কি ধরনের জামাকাপড় পরে।
তারও পরে যেন মনে পড়ে যাওয়ায় বললে, হ্যাঁ, তোমারও।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল অমিতা। যাক, মনে পড়েছে তা হলে।
হাত বাড়িয়ে টাকাটা নিতে তখন আর অস্বস্তি হয় না। প্রয়োজনে চেয়েও নেয়।
কিন্তু চাকরি ছাড়ার পর বাড়তি কোনও টাকা চাইতে রীতিমত সঙ্কোচ হত।
যখন চাকরি পেল, প্রথম মাসের মাইনে পেয়ে মাকে একটা দামি শাড়ি কিনে দিয়েছিল, বাবাকে একটা কাশ্মীরি শাল।
তারানাথ হেসে বলেছিলেন, এ সব করতে গেলি কেন, সবই তো খরচ করে বসেছিস।
নিজে টাকা রোজগার করার মতো আনন্দ নেই, তার চেয়ে বেশি আনন্দ সে টাকা নিজের ইচ্ছে মতো খরচ করতে পারা। দোকানের শো-কেসে চোখে লেগে যাওয়া ছোট্ট একটা চুলের ক্লিপ কিনতে হলে বাবার কাছে হাত পাততে হত, কিংবা কলেজে টিফিন খরচ বাঁচিয়ে। মায়ের কাছে বায়না করতে হত একটা নতুন চটি কিনতে হলে : বাবাকে বলো না।
চাকরিটা ছিল বলেই বিয়ের পর টুকিটাকি জিনিস কিনেছে ছেলেমেয়ের জন্যে, মুকুলের জন্যে ফ্রক, ছেলের জন্যে জুতো। অসিতেশের পরামর্শ নিতে হয়নি, কিংবা তার অনুমতি। বরং অসিতেশ ফিরে আসতেই প্যাকেট খুলে জামাটা বিছানার ওপর মেলে হেসে প্রশ্ন করেছে, ভাল হয়নি? মুকুলের। ছেলে নতুন জুতো পরে গটগট করে হেঁটে বাপিকে দেখিয়েছে।
একবার একটা টাই, দেখেই পছন্দ হয়ে যাওয়ায় কিনে ফেলে দু’দিন চেপে রেখেছিল। তারপর বের করে, দিল একদিন।
টাইটা পেয়ে খুশি হয়েছিল অসিতেশ। তারপর : হঠাৎ?
—তোমার জন্মদিন না?
জন্মদিনটা মনে রেখেছে অমিতা, সে জন্যে আরও খুশি।
তখন টানাটানির সংসার, ছেলেমেয়ে দু’জনই ছোট, সে জন্যে আরও। তবু স্বাধীনতা ছিল। সে স্বাধীনতা কেউ কেড়ে নেয়নি, তবু অমিতার নিজেকে অতখানি স্বাধীন মনে হত না। কারণ, নিজের উপার্জন তো নয়।
টাকা জিনিসটা বড় অদ্ভুত। ওটা নিজের উপার্জন না হলে খরচ করার অধিকারও যেন কমে যায়।
সংসারে রীতিমত সচ্ছলতা এসে গেছে। সংসার খরচের জন্য যে অঙ্কটা অমিতা হাত পেতে নিত, তা নিয়ে হিসেব করে চললে আগের মতো দু’-একটা বেহিসেবি শখ যে মেটানো যেত না তা নয়।
তবু কিভাবে যেন অমিতার ব্যক্তিত্ব নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল।
দুপুরের গরমে ঘেমে নেয়ে পাঁচ সাতটা দোকান ঘুরে আধ ডজন কাপ-প্লেট কিনে আনল। মুকুলকে দেখাতে সেও বললে, ফ্যান্টাস্টিক! দারুণ সুন্দর হয়েছে মা।
অসিতেশকে অবাক করার জন্যে ওকে সেই কাপেই চা এগিয়ে দিল।
প্রথমে অসিতেশ লক্ষই করেনি, কি একটা কাগজ পড়তে পড়তে চায়ে চুমুক দিচ্ছিল।
অধৈর্য হয়ে অমিতার মনে হল, চোখে না পড়ালে ও তাকিয়ে দেখবেও না।
শেষে হাসতে হাসতে বলতে হল, কাপটা দেখেছ?
হাতের কাগজ নামিয়ে অসিতেশ দেখল। খুব একটা পছন্দ হয়েছে বলে মনেও হল না।
অমিতা দামটা বলল। দরদস্তুর করে ও যে দামটা কমাতে পেরেছিল তার জন্যে ওর মনে হয়েছিল কিছু বাড়তি প্রশংসাও ওর প্রাপ্য।
তার বদলে অসিতেশ বললে, কিনলেই যখন আরও ভাল এক সেট কিনলেই পারতে। লোকজন এলে তারা কি বলবে, এই কাপে আমরা চা খাই!
একটু থেমে বললে, এসব ডিজাইন আজকাল আউটডেটেড।
সঙ্গে সঙ্গে অমিতার সমস্ত মন বিষণ্ণ হয়ে গেল। আসলে ও তো আরও দামি কাপ-প্লেট খোঁজেনি, অসিতেশকে জিগ্যেসও করেনি কত দামের কিনবে। প্রত্যেকটি জিনিস কি অসিতেশকে প্রশ্ন করে, তার পছন্দ অপছন্দ জেনে কিনতে হবে নাকি! ওর রুচিকেই যেন তুচ্ছ করে দেওয়া হল। তুচ্ছ হয়ে গেল দুপুরে রোদ্দুরে ঘাম-চিটচিট ক্লান্তি দিয়ে কেনা এই জিনিসগুলো।
অথচ এই অসিতেশই ওর রুচির কত প্রশংসা করেছে। এখন যেন বলছে, সেই অভাব-অনটনের দিনগুলোর পক্ষে তোমার রুচিকে প্রশংসা করা যেত। আজ আর নয়। তুমি সেটাকে ছাড়িয়ে উঠতে পারনি, আমার আজকের এই সাফল্যের যোগ্য হয়ে উঠতে পারনি।
সমস্ত মন বিষাক্ত হয়ে গিয়েছিল অমিতার। নিজেকে বিভ্রান্ত লাগছিল। অসহায়। ওর মনে হয়েছিল, ওর যেন আজ আর কোনও দাঁড়াবার জায়গা নেই।
ছোট ছোট অসংখ্য ঘটনার কথা ওর মনে পড়তে লাগল। পুরনো দিনের কথা। যে সব কথা ও, রাগ পড়ে যাওয়ার পর তুচ্ছ বলে ভুলে যেতে চেয়েছিল। ভেবেছিল ভুলেই গেছে। কিন্তু না, একটাও ভোলেনি। ভোলা যায় না।
সারা শরীর চিড়বিড় করছে রাগে। ওর হঠাৎ মনে হল আমি এই সংসারের কেউ নেই। আমি শুধু একজন কেয়ারটেকার, এই সংসারের। একজন বেতনভোগী কেয়ারটেকার। যার কাজ শুধুই সংসারটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা। তার বাইরে কিছু নয়। কোনও স্বাধীনতা নেই, কোনও অধিকার নেই। কোথাও প্রাণের যোগ নেই। দুঃসহ, দুঃসহ।
মনে মনে বলে উঠল, আমি আর পারছি না, পারছি না।
অসিতেশ যেন নাগালের বাইরে চলে গেছে। অনেক ওপরে, অন্য এক জগতের মানুষ হয়ে গেছে। আর আমার কাজ নিজেকেও সাজিয়েগুছিয়ে ওর যোগ্য করে রাখা। ওর ওপরের জগতের মানুষগুলো দেখে যেন বলে, মেড ফর ইচ আদার।
‘রাজযোটক,’ বিয়ের দিনেই কে যেন বলেছিল। জামাইবাবু, এসে দেখে যাও তোমার ‘কোয়াইট হ্যান্ডসাম’ আজ কত কুৎসিত হয়ে গেছে।
নিজেরই অবাক লাগছিল, এই লোকটার সঙ্গে এতকাল কাটিয়ে এসেছে ও কি করে।
এক সঙ্গে? নিজের কাছেই খটকা লাগল।
ওর মনেও পড়ে না কবে শেষ একসঙ্গে হয়েছিল।
এই বাড়িটায় আজ আর ওর কোনও অস্তিত্বই নেই। ও এখন পর্দার আড়ালে থাকার লোক হয়ে গেছে, যে আড়াল থেকে সংসারের সব কিছু তদারকি করে।
ওর মনে পড়ল, কতবার ওর মনে হয়েছে এই বাড়িটা ছেড়ে চলে যাই। পারেনি। চোরা কাদায় ওর দুটো পা আটকে গেছে। যত উঠে আসার চেষ্টা করবে ততই তলিয়ে যাবে। এখন আর উঠে আসার উপায় নেই।
ছেলেবেলার একটা ঘটনা ওর মনে পড়ছে। ওটা কোনও দিনই ভুলতে পারবে না।
নবদ্বীপে বাবা-মা’র সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিল ওরা। ওর তখন ফ্রক পরার বয়েস, যদ্দূর মনে পড়ে মেজদি সবে শাড়ি পরতে শুরু করেছে। মা বোধহয় বায়না ধরেছিল রাসের মেলা দেখতে যাবে। মায়ের বাপের বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করা রাধামাধব ছিল, যদিও ওঁদের মধ্যে কোনও বৈষ্ণব-বৈষ্ণব ভাব ছিল না। কিন্তু বাপের বাড়িতে কোনও বিগ্রহ থাকলে তার একটা টান বোধহয় থেকেই যায়। বাবার ধর্মকর্মে কোনও আস্থা ছিল না। তবু রাজি হয়ে গিয়েছিল।
সেই মেলা অমিতার মনের ওপর কোনও ছাপ রেখে যায়নি। যদি বা স্মৃতিতে কিছু দাগ থাকত সেই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা সমস্ত কিছু মুছে দিয়ে মনের ওপর দগদগে ঘা হয়ে রয়ে গেছে।
ফেরার সময় মনে আছে বাবা বলেছিল নৌকোয় করে গঙ্গা পার হয়ে ট্রেন ধরতে হবে। তা হলে তাড়াতাড়ি পৌঁছনো যাবে।
শুনে ওদের কি উল্লাস। দাদা, বড়দি, মেজদির দেখাদেখি অমিতাও খুব খুশি। নৌকোয় চড়ে গঙ্গা পার হয়নি তার আগে। কিন্তু গঙ্গা দেখে তেমন খুশি হতে পারেনি। কলকাতার গঙ্গার মতো এত চওড়া নয়।
নৌকো চলতে শুরু করেছে, মাঝগঙ্গা পার হতে হতেই বেশ কয়েকটা নৌকোয় দেখতে পেল, মাঝিরা জাল ফেলছে।
মাঝিরা বললে, আজ্ঞে, ইলিশও ওঠে।
তারানাথ জানতেন না। বললেন, ইলিশ ওঠে এই জালে?
আর তখনই দেখা গেল একজন জাল গোটাচ্ছে, আর তার মধ্যে দু’-তিনটে রুপো-ঝকঝক ইলিশ মাছ। ল্যাজের একটা কি দুটো ঝাপটা দিয়েই স্থির হয়ে গেল।
নৌকোয় বসে বসেই তারানাথ কাছাকাছি নৌকোর মাঝির সঙ্গে দরদস্তুর করলেন। কিনে নিয়ে রেলের রানিং রুমে ঠাকুরকে দিলে মাছ-ভাত রান্না করে দেবে, কে যেন বলে দিয়েছিল।
বর্ষা কাল, তাই ভয় ছিল বৃষ্টি না নামে।
পাড়ে এসে মাছ কেনা হল, আর স্বর্ণলতা বললেন, এসেছি যখন গঙ্গায় একটা ডুব দিয়ে যাই।
ফ্রক-পরা বয়েসটার অনেক দোষ। কোনও বাধানিষেধ মানতে চায় না। কোনও উপদেশ শুনতে চায় না।
সবাই জিনিসপত্তর রেখে একে একে ডুব দিয়ে আসছে, আর অমিতা এ দিক ও দিক দেখছে। আরও যারা গঙ্গাস্নান করছে তাদের।
হঠাৎ চোখ পড়ল একটু দূরে গঙ্গার পাড়ে এক জায়গায় বেগুনি রঙের থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে।
ও বয়েসে সুন্দর কিছু দেখলেই হয়তো তা পেতে ইচ্ছা করে।
ছুট ছুট ছুট।
একটা জায়গায়। গঙ্গার পাড় ঘেঁষে বেশ খানিকটা কাদা শুকিয়ে আছে। সেটুকু পার হলেই ওই ফুলের ঝোপ।
দৌড়তে গিয়েই, ও নিজে লক্ষও করেনি প্রথমটা, ক্রমশ ওর পা ডুবে যাচ্ছে কাদায়। যত এক পায়ে ভর দিয়ে অন্য পা তুলতে যায় ততই একটা পা কাদায় আরও ডুবে যাচ্ছে। যত চেষ্টা করছে ততই কাদার মধ্যে বসে যাচ্ছে। আতঙ্কে ওর চোখে জল এসে গেছে তখন। দু’ পায়ের হাঁটু অবধি কাদায় বসে গেছে। ডুবছে, আরও ডুবছে।
প্রচণ্ড ভয়ে অমিতা চিৎকার করে উঠেছিল :
দু’ হাত তুলে ও তখন চিৎকার করছে, বাবা আমি ডুবে যাচ্ছি। বাবা আমি ডুবে যাচ্ছি।
আর ওকে দেখতে পেয়ে নৌকোর মাঝিরাও ছুটে এল।
বাবা মা দাদা সকলেই।
অমিতা দেখল, বাবা কাদার ওপর কয়েক পা এগিয়েই পা বসে যাচ্ছে দেখে ফিরে গেল। মাঝিদের কি যেন বলল।
মৃত্যু কি তা ওই ফ্রক-পরা বয়েসে অমিতা জানতও না। তবু ওর মনে হল ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই মৃত্যুভয় যে কি ভয়ঙ্কর সেই প্রথম জানল। আতঙ্কে ওর দু’চোখ ছাপিয়ে জল। মাঝিরাও কয়েক পা এগিয়ে এসেই ফিরে গেল, তাদেরও পা ডুবে যাচ্ছে।
আর তখনই মাঝিরা নৌকোর দিকে ছুটে গেল। কয়েকটা কাঠের পাটাতন এনে পটাপট কাদার ওপর ফেলল। সেই পাটাতনের ওপর পা ফেলে ফেলে একজন মাঝি এগিয়ে এসে অমিতাকে টেনে তুলল। পাড়ে নিয়ে এল।
জীবন কি, মৃত্যু কি, কিছুই বুঝে ওঠার মতো বয়েস সেটা নয়। তবু অমিতার মনে হল জীবন ফিরে পেয়েছি।
জীবন ফিরে পেয়েছে, কিন্তু আতঙ্কের স্মৃতিটা রয়েই গেছে।
এতকাল পরে, এই সাতচল্লিশ বছর বয়েসে, ওর মনে হচ্ছে চোরা কাদায় ওর পা দুটো আটকে গেছে। যতই উঠে আসার চেষ্টা করবে ততই তলিয়ে যাবে। তলিয়ে যাবে।
নিজের দুঃখের কথা, কষ্টের কথা কোনও একজনকে না বলে শান্তি পাওয়া যায় না।
কিন্তু কার কাছে গিয়ে ও নিজের দুঃখের কথা, কষ্টের কথা বলবে। কেউ বুঝবে না।
কেউ আজ আর ওকে বাঁচাবার জন্যে ছুটে আসবে না। কেউ ওকে বাঁচাতে পারবে না। যতই চেষ্টা করবে আরও গভীরে তলিয়ে যাবে।
একটা দৃশ্য ও কোনও দিন ভুলতে পারেনি। চোখের সামনে আজও দেখতে পায় বাবা ছুটে আসছে চিৎকার করতে করতে, কিন্তু কয়েক পা এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে যেই দেখল পা ডুবে যাচ্ছে, পা টেনে তোলা যাচ্ছে না, তখনই কোনও ক্রমে ফিরে গেল।
ভালবাসা স্নেহ সব তুচ্ছ, তুচ্ছ।
মানিয়ে নেওয়া ছাড়া এখন আর কোনও উপায় নেই।
টাকার বান্ডিলটা হাত পেতেই নিয়েছিল। ‘তোমার এ মাসের স্যালারি।’ হাসতে হাসতে বললেও বিষাক্ত তীরটা ঠিক জায়গাতেই বিঁধেছিল। আরেকটা টাকার বান্ডিল। পোশাকপরিচ্ছদে অফিসের মিস্টার ভারুচার মতো হতে হবে। ‘তোমার জন্যেও।’
যে মানুষটা দূরে সরে গেছে তার কাছ থেকে টাকাটা নিতে অসহ্য এক যন্ত্রণা। মনেই পড়ে না কবে ওরা দু’জনে একসঙ্গে হয়েছে, কবে নিজেদের একসঙ্গে মনে হয়েছে। মনে পড়লে এই টাকাটা আরও কুৎসিত মনে হত।
ভালবাসা থাকলে এসব কিছুই মনে হবার নয়। অমিতা বেশ বুঝতে পারে ভালবাসা কবেই মরে গেছে।
মিস্টার ভারুচার পরিবারের সমান হবে বলেই মুকুলকে আর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নিউ মার্কেটে গিয়েছিল। বেশ কিছু দিন পরে। ইচ্ছেই ছিল না, তবু।
নোটের বান্ডিলটা মুকুলকে দেখিয়ে বলেছিল, সব তোদের জন্যে বাপি দিয়ে গেছে।
মুখে হাসি আনারও চেষ্টা করেছিল।
মুকুলের দারুণ ফূর্তি। বলে উঠল, ও বাপি, ইউ আর গ্রেট।
অমিতাকে বললে, বাপি আমাদের ভীষণ ভালবাসে, না মা?
তারপরই কৌতুকে হেসে, তোমাকেও।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটনাটা ঘটে গেল।
একটা দোকান থেকে বেরিয়ে আরেকটা দোকানে ঢুকছিল ওরা। মুকুল আর ছেলে আগেই ঢুকে পড়েছে।
ঢুকতে গিয়েও স্থির হয়ে গেল অমিতা।
চলমান হাল্কা ভিড়ের ওপারে গিয়ে চোখ আটকে গেল। অসিতেশ আর উজ্জ্বল বিদ্যুতের মতো একটি মেয়ে।
হাসতে হাসতে কথা বলছিল, মেয়েটিও যেন ওর গায়ে দুলে পড়ছে।
বাঁদিকে মোড় নিয়ে ওরা অদৃশ্য হয়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে অমিতার মনে হল ও যেন একটা ঘূর্ণি ঝড়ের মধ্যে পড়ে গেছে।
দোকানে ঢুকে পড়েই ও মুকুল আর ছেলের মুখের দিকে তাকাল। খুঁটিয়ে দেখল ওদের।
দেখল ওদের। ওরা আগেই দেখে ফেলেনি তো!
অমিতার সমস্ত মুখ বিবর্ণ হয়ে গেছে। বুকের মধ্যে একটা তুমুল ঝড়!
ভেঙে পড়া শরীর নিয়ে ও কোনওক্রমে বললে, চল চল, এখানে নয়। অন্য কোথাও দেখি।
বলেই বাড়ি ফিরে এসেছিল।
মুকুল বললে, তুমি যে অন্য কোথাও যাবে বললে।
ছেলে বললে, চলো না মা।
অমিতা তখন নিজের সঙ্গেই যুদ্ধ করে চলেছে, চোখ ছাপিয়ে যেন জল না এসে পড়ে। ছেলেমেয়েরা দেখতে পাবে।
কি কষ্ট, কি কষ্ট!
মুকুলের দিকে তাকাতে পারছে না, ছেলের দিকে তাকাতে পারছে না। নিজের ছেলেমেয়েদের কাছেও যে ও ছোট হয়ে গেছে।
বিছানায় লুটিয়ে পড়ে কাঁদারও উপায় নেই। ওরা দেখতে পাবে।
স্নানের ঘরে ঢুকে পড়ল অমিতা। শাওয়ার খুলে দিয়ে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল ও। শাওয়ারের জলের সঙ্গে জল মিশে গেল।
.
কারও কাছে বলার উপায় নেই। কেউ ওকে কোনও সান্ত্বনা দিতে পারবে না।
অমিতা এত দিন ভেবে এসেছে মনের দিক থেকে ও কত দিন আগেই অসিতেশকে খারিজ করে দিয়েছে। পুরনো দিনের সেই আবেগ সেই ভালবাসা কবেই যেন উবে গেছে। শরীরও শরীরকে টানে না।
সেই মানুষটার কাছ থেকে ও যে এত বড় একটা আঘাত পেতে পারে কোনও দিন ভাবেনি। কিন্তু আঘাত পেল কেন!
মাঝেমাঝেই ওর মনে হয়েছে অসিতেশের সঙ্গে এক ছাদের নীচে নিজেকে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। অসহ্য লেগেছে। ইচ্ছে হয় ছেড়ে চলে যেতে। মুকুল আর ছেলেকে নিয়ে একদিন হয়তো চলেই যাবে। না, এই বয়েসে ডিভোর্সের কথা ও ভাবতে পারে না। সাতচল্লিশ বছর বয়েসে কলেজে পড়া একটা মেয়ে আর একটা ছেলেকে নিয়ে নতুন ভাবে জীবন শুরু করার কথা ও কল্পনাও করতে পারে না। যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়ার একটাই উপায়, দূরে সরে গিয়ে পৃথকভাবে বাঁচার চেষ্টা করা। অথচ অসিতেশ হয়তো এ বয়েসে আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবে। অসিতেশ গর্ব করে বলত, আমি যা চাই তা আমি অর্জন করেছি। অমিতাকেও হয়তো। এই প্রথম বোধহয় ওই বিদ্যুৎ ঝলকের মতো দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটিই ওর কাছে উপযাচিকা হয়ে এগিয়ে এসেছে। তার স্বাদ অন্য। সে জন্যেই হয়তো অসিতেশ এত মুগ্ধ হয়েছে, মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সম্পর্কটা কত দিনের তা ও জানে না।
অমিতা লক্ষ করেনি, টেরও পায়নি যে, ওর পায়ের নীচে থেকে মাটি সরে গেছে।
ওর মধ্যে কোনও ঈর্ষা নেই, ক্রোধ নেই। শুধু দুর্বোধ্য এক অসহায়তা। আত্মধিক্কার।
ও নিজে সংসারের চাপে একটু একটু করে দূরে সরে এসেছিল বলেই কি একটু একটু করে দূরে সরে গেছে অসিতেশ? আসলে এই যে চাপা অমিল, পছন্দ অপছন্দের এই বিরাট ব্যবধান, অসিতেশের এই ইগো-সর্বস্ব অহঙ্কার, এ সবের পিছনে কি একটাই কারণ? অমিতাকেই অপছন্দ করা! অমিতার মনে হচ্ছিল এত বড় লজ্জা, এত বড় অপমান ও কোনও দিন পায়নি।
নিজেকেই দোষী মনে হচ্ছে। সংসারের দিকে তাকাতে গিয়ে, সংসারকেই আপন মনে করতে গিয়ে, ও নিজেকেই ভুলে গিয়েছিল। নিজের দিকে তাকাবার সময় পায়নি, ইচ্ছেও হয়নি। সেই চেহারাটা এখন কেমন হয়েছে তাও ভাল করে জানে না। ও শুধু ঘরটার দিকে তাকিয়েছে, মুকুল আর ছেলের চেহারার দিকে তাকিয়েছে, অসিতেশ সামান্য অসুস্থ হলে ব্যস্ত হয়েছে।
চলে যাব, চলে যাব, এই অপমান সহ্য করে থাকা যায় না।
পুরনো দিনের কোনও আচরণকেই এখন আর দুর্বোধ্য ঠেকছে না।
এভাবে হেরে যাওয়ার কথা কারও কাছে গিয়ে বলা যায় না।
তারানাথ আর স্বর্ণলতা এখন প্রকৃত বৃদ্ধ আর বৃদ্ধা। প্রথম প্রথম স্বর্ণলতার কাছে গিয়ে দু’-একটা অনুযোগ আভাসে ইঙ্গিতে জানাত।
স্বর্ণলতা সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, সংসার মানেই তো এই। মানিয়ে নিতে হয়।
মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টাই তো ও করে-এসেছে এতকাল। ও এখন আর ব্যক্তি হয়েও বেঁচে নেই, ব্যক্তিত্ব বলে সত্যি যদি কিছু থেকে থাকে তাও বিসর্জন দিয়ে এসেছে।
মাসতুতো বোন উমা একদিন বলেছিল, তুই বড্ড বেশি বুড়িয়ে যাচ্ছিস!
ও শুধু হেসেছে। বলেছে, সংসারই আমাকে বুড়িয়ে দিয়েছে।
উমা হেসেছিল, তোর আবার সংসার, অঢেল টাকা। আমার ও রকম হলে চেহারার চেকনাই দেখতিস।
ছেলেবেলায় ক্রমাগত চেহারার প্রশংসা শুনে এসেছে।
বিয়েবাড়িতে কে যেন ঠাট্টা করে বলেছিল, একদা সুন্দরী।
ও রসিকতা ভেবে শুনে শুধু হেসেছে।
এখন মনে হচ্ছে পুরুষের জগতে মেয়েদের মূল্য শুধু একটাই। যৌবন। মন বলে হয়তো আজ আর কিছুই নেই। সেই পুরনো দিনের নিবিড় বন্ধন কোথায় উবে গেছে। উবে যাচ্ছে।
দাদু দিদার বাড়িতে একটা বিগ্রহ ছিল। পুজো হত। একবার গিয়েছিল।
খাটের ওপর থুথুড়ে বুড়োবুড়ি দাদু দিদা সারাক্ষণ বসে গল্প করছে, হাসাহাসি, একে ওকে ঠাট্টা।
মেজদি ঠাট্টা করে বললে, তোমরা এই বুড়ো বয়েসে কি এত কথা বলো, কি এত ফুসফাস করো।
সবাই হেসে উঠেছিল ওর কথা শুনে।
আর দিদিমা বললে, ওরে ছুঁড়ি এখন বুঝবি না, এখন বুঝবি না। যৈবন চলে যাওয়ার পর দেখবি, আসল ভাব ভালবাসা তখনই।
শুনে ওরা আরও হেসে উঠেছিল। মনে হয়েছিল কি অবাস্তব কথা। এখন মনে হয় কি গভীর প্রশান্তি ছিল দুই বুড়োবুড়ির মুখে।
এই প্রশান্তি বোধহয় পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস থেকে জন্ম নেয়।
সেই বিশ্বাসটাই ভেঙে গেছে অমিতার। বুকে একটা প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিল। কিন্তু সেটা শুধুই ছিল সন্দেহ। তার ফলে বুকের মধ্যে জ্বালা। যেখানে ভালবাসা মরে গেছে সেখানেও এমন কেন হয়! তা হলে কি ভালবাসা মরে যায়নি, শুধুই অদৃশ্য হয়ে আছে।
বাড়ি ফেরার পথে সারা শরীর ঘেন্নায় রি-রি করে উঠেছে। এই মানুষটার সঙ্গে আমি কি করে একই বিছানায় শুয়ে এসেছি। প্রেম তা হলে শুধুই শরীর, তার ওপর ফুল বেলপাতা সাজিয়ে দিলেই পবিত্র প্রেম।
অমিতা স্বীকার করে অসিতেশের এক ধরনের গুণ ছিল, যা অমিতার নেই। উচ্চাশা কার না থাকে, কিন্তু বেশির ভাগ লোক শুধু তার স্বপ্ন দেখে। ভাগ্যের দোহাই দেয়। অসিতেশ লক্ষ্যবস্তুর দিকে তাকিয়ে দেখার আগে থেকেই নিজেকে তীরন্দাজ বানানোর চেষ্টা করত। কোম্পানি বদলে দু-এক ধাপ ওঠার আগেই ও নিজেকে যোগ্য করে তুলত। বাড়িতে যতক্ষণ থাকত কঠিন কঠিন বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকত। চাকরির পাশাপাশি ম্যানেজমেন্টে ভর্তি হল।
—আমরা বেঁচে আছি কি না তাও তো লক্ষ করবে। তির্যক ভঙ্গিতে একদিন মন্তব্য করেছিল, ওর হাতের বইটা টেনে সরিয়ে দিয়ে।
অমিতার সমস্ত শরীরের ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে চোখে চোখ রেখে অমিতার হাতের বইটা ফিরিয়ে নিয়ে বলেছিল, এ সবই তোমাদের জন্যে।
স্বামী উন্নতি করলে কার না ভাল লাগে, কিন্তু তার জন্যে গার্হস্থ্য জীবনটাই লুপ্ত হয়ে যাবে। প্রেম একদিন মরে যেতে পারে, যায়, কিন্তু তার পরও দাম্পত্যজীবন বলে কিছু থাকে।
উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে টাইয়ের ফাঁস গলায় চেপে বসে তা পুরুষরা জানে, অমিতা জানবে কি করে। সেটা বাড়ির লোকের ওপর চেপে বসলে আরও অস্বস্তি।
বেশ খানিকটা উঁচুতে উঠেই চলনবলনই বদলে যেতে শুরু করল অসিতেশের। ম্যানেজমেন্ট পড়ার সময়েই আয়ত্তে এনেছিল, উঠে পড়ে লাগল অমিতাকে, মুকুলকে, এমনকি টুটু তখন কত ছোট, তাকেও বদলে ফেলতে।
টেবলম্যানার্স শেখানোর নাম করে বড় বড় হোটেলে নিয়ে যেতে শুরু করল ওদের। প্রথম প্রথম ওদের বেশ মজাই লাগত। সরকারি ছা-পোষা অফিসারের মেয়ে অমিতা, কোন হোটেলের ক’টা স্টার খবরই রাখেনি, ওর হৃদয়ের গভীরে পরমাত্মীয় হয়ে টিকে ছিল কফি হাউসের উল্লাস, সস্তা চায়ের দোকানের কাটাকুটি খেলা কাঠের পালিশহীন টেবিল। যে সব দিকে কখনও লোভের চোখও পড়েনি, তার ভিতরে উঁকি দেওয়ার ইচ্ছে যে কখনও হয়নি তা নয়।
উপভোগ নিরানন্দ হয়ে ওঠে তার মধ্যে শিক্ষা ঢুকে পড়লে।
পার্টিতে জোরজবরদস্তি নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে অমিতাকে এটিকেট শেখাত প্রথম প্রথম। গাড়িতে ফেরার পথেও অমিতার ভুলভ্রান্তিগুলো বলত। তার কিছু কিছু যে ড্রাইভারের কানে যেত না এমন নয়।
অমিতার একটা কথাই মনে হত, আমরা সমান সমান ছিলাম, এক সঙ্গে বসে পরামর্শ করতাম, কেউ কাউকে ছোট ভাবতাম না। এখন আমি ক্রমশই ছোট হয়ে যাচ্ছি। হতে বাধ্য হচ্ছি, কারণ সংসার আমার ব্যক্তিত্ব ছিনিয়ে নিয়েছে। আমি শুধু বিশুদ্ধ মা হয়ে গিয়েছি।
একদিন একটা নামী রেস্টোরেন্টে গিয়েছে।
টেবিল ঘিরে ওরা। টুটু মাত্র পাঁচ বছরের।
স্যুপ দিয়ে গেছে।
টুটু প্রায়ই এটিকেট ফেটিকেটের ধার ধারত না। বকুনি কিংবা ধমক খেত।
সেদিন ইচ্ছে করেই, নাকি স্যুপের রঙিন চামচটা চোখে পড়েনি, সামনেই ছিল চামচদানি, তা থেকে একটা টেবল স্পুন তুলে নিয়ে স্যুপ খেতে শুরু করেছিল।
চাপা স্বরে ধমক দিল কিনা অমিতাকে, ও কেন লক্ষ রাখেনি।
টেবল স্পুন কেড়ে নিয়ে স্যুপের চামচ ধরিয়ে দিল টুটুকে।
অসিতেশের চোখের রাগ দেখে টুটু সেদিন ভাল করে খায়নি।
আর বাড়ি ফেরার পথে রেগে গিয়ে টুটুকে চিৎকার করে ধমক। একটা চড়ও কষিয়ে দিল তার গালে।
অমিতার মনে হয়েছিল, চড়টা ওর গালেই এসে পড়ল। এই লোকটা একদিন আমার ভালবাসা পাওয়ার জন্যে কি কাকুতি মিনতিই না করেছে।
অমিতার মুখ দিয়ে একটা কথাই বেরিয়েছিল। —তুমি কি মানুষ। টুটুকে কোলে টেনে নিয়ে গালে হাত বুলিয়ে আদর করেছিল। চুমু খেয়ে বলেছে, কিছু খেলি না কেন, রাগ করে? খিদে পাবে যে। সঙ্গে সঙ্গে টুটুর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু নামল।
ওর তখন মনে হচ্ছে, ওই বাচ্চা ছেলেটাকে ভালবেসে বুঝিয়েও বলা যেত। সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা কথাও বলতে ইচ্ছে হয়েছে অসিতেশকে, এটিকেট বা ম্যানার্স শুধু পার্টিতে, হোটেলে, বাইরের জগতে নয় নান্টুবাবু, বাড়ির মধ্যে, স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে নিয়ে যে সংসার তারও মধ্যে একটা এটিকেট আছে, যার নাম সভ্যতাভব্যতা।
‘তুমি কি মানুষ!’ এই কথাটা শোনার পর অমিতা ভেবেছিল অসিতেশ নিজের দোষ বুঝতে পারবে।
তার বদলে অসিতেশ বলে বসল, তোমাদের মানুষ করার জন্যেই আমাকে অমানুষ হয়ে উঠতে হয়।
অমিতা কথা বাড়ায়নি। ও তখন বিশুদ্ধ মা হয়ে গিয়ে চুপ করে থেকেছে।
.
রাগ দ্বেষ অনুশোচনা ছাপিয়ে অমিতার নিজেকে অসহায় লাগছিল। একটা দুর্বোধ্য ভয়। কোনটা আসল ভয় ও খুঁজে পাচ্ছিল না। মুকুল আর ছেলে জেনে গেছে কি না, দেখেছে কি না, মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারেনি। একদিন না একদিন জানতেই পারবে। যে দিন জানতে পারবে সে আরও লজ্জা। ওদের মুখের দিকে তাকাতেই পারবে না।
অসিতেশ কোথায় গিয়ে থামবে ও কিছুই জানে না। শুধু একটা কথাই বুঝেছে, অসিতেশের কাছে আজ আর কোনও মূল্য নেই ওর।
সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। সমাজ মানে বাবা-মা, মেজদি-জামাইবাবু, মাসতুতো বোন উমা, আরও কত লোক, ঠিক এই মুহূর্ত মনে পড়ছে না।
তার চেয়ে বড় ভয়— নিরাপত্তা। এই সাতচল্লিশ বছর বয়েসে আজ আর আমাকে কে নতুন করে চাকরি দেবে? কি অসীম বিশ্বাস নিয়ে সেই অভাব-অনটনের সময় নিজের সঞ্চয়ও দিয়ে দিয়েছিল ছোট্ট ফ্ল্যাটটা কেনার জন্যে। ‘ও তোমার নামে থাকলেও যা, আমার নামে থাকলেও তাই।
হঠাৎ আর্থিক দুশ্চিন্তাই বড় হয়ে দেখা দিল। ওটাই বড় কথা।
যে লোকটার সঙ্গে কথা বলতে গেলেও গা ঘিনঘিন করবে, তাকে ছেড়ে গিয়ে কোথায় দাঁড়াবে ও। ও আজ আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে গেছে।
এখন ওর কাছে শুধু একটা ক্ষীণ আশা। হয়তো ভুল দেখেছি, তেমন অন্তরঙ্গ ভাবে নয়। হয়তো রাত্তিরে বাড়ি ফিরে নিজেই বলবে। সঙ্গে কে ছিল, কেন ছিল।
যদি না বলে, তখন কি করবে ও? সেই বৃদ্ধ বাবা-মা’র কাছে গিয়ে দাঁড়াবে? সে তো আরও লজ্জা, এই বয়েসে। না, বাবা-মা শান্তিতে আছে। যা দুঃখ, তা ওই ছেলে ফেরেনি বলে, আসে না বলে। সে কুয়েত ছেড়ে এখন আমেরিকায়। বাবা গর্ব করে সকলকে বলে, স্টেটসে, বড় চাকরি। বলার সময় বুকটা নিশ্চয় জ্বলে যায়। বাবার ধারণা, বড়দি সুখী, মেজদি সুখী, অমিতা আরও সুখী। অমিতার চেয়েও অসহায় দুটি বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে ও লজ্জা আর অসম্মানের মধ্যে ফেলতে পারবে না। আঘাত দিতে পারবে না। বাবা জানুক, অমিতাও সুখী।
মাসতুতো বোন উমা একসময় ওর প্রাণের বন্ধু ছিল। এখনও আছে। কোনও একজনকে তো বলতে হবে, হাল্কা হতে হবে। ওকে ছাড়া আর কাকেই বা বলবে। ওকেই মাঝেমাঝে ছোটখাটো দুঃখগুলো বলে এসেছে।
উমা সব শুনে হেসে উঠে বললে, তুই কি রে! এইটুকুতেই তোর এত সন্দেহ?
কলেজে পড়ার সময় তোর তো কত ছেলেবন্ধু ছিল। কত গল্প করেছিস, আড্ডা দিয়েছিস, সিনেমা দেখেছিস। তোকে সন্দেহ রোগে ধরেছে, ওটা রোগ। বলে হেসে উঠেছে।
কিন্তু কি করে বোঝাবে ও উমাকে? ওই ছোট্ট একটা দৃশ্যই সব নয়। ওর সারা জীবনের অসন্তোষকে ওই ছোট্ট একটা দৃশ্য দিয়েই যে ব্যাখ্যা করা যায়।
অমিতার কান্না পেয়ে গেল। তুমি বাড়ি ফিরে সে দিন একটা মিথ্যে বানানো গল্প দিয়ে দৃশ্যটাকে ঢেকে দিলে না কেন। তা হলেও হয়তো সান্ত্বনা পেতাম। একটা মিথ্যেকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতাম। তুমি কিছুই বললে না, যেন কোথাও কিচ্ছু হয়নি, কোথাও কিচ্ছু ঘটে যায়নি। তুমি টেরই পেলে না, ছোট্ট ওই দৃশ্যটা ভূমিকম্পের মতো গোটা বাড়িটাকেই ধ্বংস করে দিয়েছে।
বিধ্বস্ত করে দিয়েছে অমিতাকেও।
