তিন
তারানাথ আর স্বর্ণলতা ভোরের ঠাণ্ডাকে ভয় পান, তাই সী-বীচে যাননি। একটু রোদ উঠলে যাবেন। এক চক্কর ঘুরে আসবেন।
কিন্তু রোদ ওঠা অবধি অপেক্ষা করতে রাজি নয় অমিতা। অত দেরিতে গেলে একটাও রঙচঙে নকশা-কাটা ঝিনুক পাওয়া যাবে না।
ওটাই একমাত্র কারণ নয়।
ত্রিদিব হেসে বলেছিল, বাব্বা, ক’টা ঝিনুকের জন্যে এত! ও তো দেদার পাওয়া যায় ওদিকের দোকানগুলোয়।
এই নীরস প্র্যাকটিক্যাল লোকগুলোকে অমিতা কোনও দিনই বুঝতে পারেনি। ওরা হাতে ডিকশনারি নিয়ে বসে থাকে, ঝিনুক বললে শুধু ঝিনুকই বোঝে।
আমরা যখন কোনও কাজ করি, কেন করলাম জিগ্যেস করলে একটা কারণ দেখিয়ে দিই। কিন্তু সেটাই কি সব? আশেপাশে অনেকগুলো কারণ থাকে, তার মধ্যে একটা তুলে নিয়ে বলি : এই জন্যে। কিন্তু সেটাই সব নয়।
যেমন এই ভোরবেলায় সমুদ্রের পাড়ে ছুটে যাওয়ার বাসনার মধ্যে লুকিয়ে আছে ভোরের আলো হাওয়ায় ভিজে বালির ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার আনন্দ, চিড়বিড় চিড়বিড় করে ছুটে গিয়ে গর্তে লুকোনো লাল লাল কাঁকড়ার বাচ্চাগুলো, না ওঠা সূর্যের একটু একটু করে রং বদলানো, মেঘের ফাঁকে ফাঁকে ঝিলিক দেওয়া ঝকঝকে রুপোলি উঁকির ধীরে ধীরে সিঁদুর হয়ে যাওয়া, অর্ধবৃত্ত থেকে পূর্ণবৃত্ত হয়ে ওঠা, তারপর হঠাৎ কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সিঁদুর লাল কেমন সোনা হয়ে ওঠে, এ সবও কি ওকে টানে না! দু’-একজন নুলিয়ার আনাগোনা, দু’-একজনের নৌকো ভাসানো, অমিতার মতোই আরও অনেকের নুয়ে পড়ে ঝিনুক কুড়োনো, জলে পা ভেজানো, ঢেউ ফিরে যাওয়ার ভিজে বালির দৃশ্য, এ সমস্তই ওকে টানছিল। এবং এই সমস্ত কিছু নিয়ে একটা শান্ত স্তব্ধ পৃথিবীকে ও ছোট্ট একটা ঝিনুকের মধ্যে পুরে ফেলেছিল। তাই মুখে বললে, ঝিনুক কুড়োতে যাব।
ত্রিদিব ভাবল শুধুই ঝিনুক, ভেতরের অদৃশ্য মুক্তোটা দেখতে পেল না।
অমিতার মনের ভেতরটা বলে উঠল, মেজদিরে, এই লোকটার সঙ্গে তুই কি করে সারা জীবন কাটাবি? আছিস কি করে।
ওর মনের ভেতরে বোবা হয়ে থাকা মেজদি বলল, ও যে আমাকে একটা ঝিনুকের মধ্যেই বন্দি করে রেখে দিয়েছে। আমি তাই নিজেকে মুক্তো ভেবেই খুশি থাকার চেষ্টা করি।
এই সব সময়ে অমিতার বড় দুঃসহ লাগে।
মেজদি বললে, ব্রেকফাস্ট আসুক, তারপর না হয় যাওয়া যাবে।
তারপর সাবধান করে দিল, একা যাস নে, দিনকাল ভাল নয়।
আসলে তখনও একটু আবছা আবছা অন্ধকার ছিল বলেই সতর্ক করা। যদিও সেই আলোছায়ায় বেশ কয়েকটা সিল্যুট ছবি সমুদ্রের পারে দেখা দিয়েছে। চলমান।
এমনিতেই গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ। নিষেধের গণ্ডি তো মেয়েদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে, অমিতার মতো মেয়েদেরও। ‘ব্রেকফাস্ট আসুক, তারপর’ কথাটাও এক ধরনের বাধা। তার ওপর জুটেছে এই দিনকাল। আগে ট্রেনে বেড়ানো কি আনন্দের ছিল! জানালায় বসে বিশ্বদর্শন, রাতের ট্রেনে অন্ধকারের রূপ দেখা, অন্ধকারের টানেল পেরিয়ে মাঝে মাঝে ছোট-বড় স্টেশনের আলোর ঝলক; পানিপাঁড়ের ডাক, দু’-দশজন যাত্রীর ঠেলাঠেলি, চায় গরম। তার আস্বাদই আলাদা। আর এখন দিনকালের ভয়। রীতিমত একটা আতঙ্ককে সঙ্গে নিয়ে ওরা রাতের ট্রেনে এসেছে। চুরি ছিনতাই ডাকাতি, কি নেই। নতুন যাত্রী ওঠার আওয়াজ শুনলে ভয়। এমনকি কামরার অন্য যাত্রীদেরও সন্দেহের চোখে দেখা। সারা পৃথিবীটাই আজ এই রকম হয়ে গেছে, সহযাত্রীকেও কেউ বিশ্বাস করতে পারে না।
ব্রেকফাস্ট হতে হতে ভোর-সমুদ্রের চার্ম উবে গেল।
নিজের ওপরই প্রচণ্ড রাগ হল অমিতার। ওর অজান্তে একটা সকাল চুরি হয়ে যাওয়ার জন্যে।
অসীম বিরক্তি থেকে রাগ এবং সেটা মেজদি জামাইবাবু বাবা-মা সকলের মুখের ওপর সার্চলাইট ফেলতে ফেলতে নিজের মধ্যেই গুটিয়ে গিয়ে মুখ অন্ধকার।
—দিলি তো সব মাটি করে! মেজদিকে।
ত্রিদিব সাধাসাধি করার পরও: নাঃ, যাব না।
সামনের বারান্দার কার্নিসে দাঁড়িয়ে সামনের দৃশ্যটুকু, লোকজন দেখছিল ও।
হঠাৎ যেন চমকে উঠল। একটা চেনা মুখ, ফেলে আসা মুখ।
কখনও তার কাছে আসেনি, কখনও তার কাছে যায়নি। প্রায় অপরিচিতদের দলের মধ্যেই তার ঠাঁই ছিল। অথচ সেই মুহূর্তে তাকে মনে হল, কত চেনা, কত আপন।
সমুদ্রের পার থেকে বেড়িয়ে ফিরছে, রাস্তার দিকে উঠে আসছে। পাশের কোনও হোটেলের দিকে চলেছে।
বুকের ভেতর থেকে একটা চিৎকার বেরিয়ে আসতে চাইল। —অসিতেশ!
মুখ থেকে বেরিয়েছিল শুধু ছোট্ট একটি কথা।—আরে!
ব্যস্। দুদ্দাড় দুদ্দাড় করে সিঁড়ি ভেঙে ছুটে গেল অমিতা।
এক ছুটে রাস্তায়। ধরতেই হবে, এক্ষুনি। হয়তো হারিয়ে যাবে, এক্ষুনি হারিয়ে যাবে। এই হারিয়ে যাওয়া সকালটার মতোই।
পিছনে মেজদি-জামাইবাবু হকচকিয়ে গিয়ে বলে উঠেছিল। কি হল? কি হল?
ও কোনও জবাবই দেয়নি।
‘অসিতেশ’ বলে চিৎকার করে হাসতে হাসতে এগিয়ে গেল। কারণ অসিতেশ তখন ফিরে তাকিয়েছে।
হাসতে হাসতে এগিয়ে গেল, কিন্তু তখন, সেই মুহূর্তে, অমিতার সামনে একটা সমস্যা।
কফি হাউসের টেবিলে অসিতেশ ছিল আড্ডার উদ্বৃত্ত অংশ, যারা আপনা থেকেই একদিন পাশের টেবিল দখল করেছে। তাদের মুখ কোনও দিনই অমিতার নজর কাড়তে পারেনি। এমনকি একটু কাছের বন্ধু হিসাবেও নয়। অসিতেশ তো নয়ই। সমস্যা স্মৃতি হাতড়ে বের করা, ওকে ‘তুমি’ বলতাম না ‘আপনি’। নাকি ‘তুই’। না, রীতিমত বন্ধুত্ব না হলে কাউকে ‘তুই” বলেনি।
অত ভাবনাচিন্তার অবকাশ পেল না, তার আগেই দশ হাত দূর থেকে একমুখ হাসি ফুটিয়ে জিগ্যেস করল, তুমি কবে এলে?
কয়েক নিমেষের ব্যাপার, কিন্তু তার মধ্যেই অমিতার মনের মধ্যে সব তালগোল পাকিয়ে গেল। কারণ, ওকে দেখামাত্র অসিতেশের মুখ এমন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে যে, ওর মনে হল, এই মানুষটা যেন যুগ যুগ ধরে এই মুহূর্তটার জন্যে অপেক্ষা করেছিল।
অসিতেশের সারা মুখে তখন অবাক আনন্দ।
অমিতার বুকের ভেতরটা বলে উঠল, ওঃ, আই ওয়াজ ডাইং ফর ইউ।
ওর সমস্ত শরীর থেকে একটা খুশি উপচে পড়তে চাইছিল।
পরে অমিতা এই ব্যাপারটি নিয়ে অনেক ভেবেছে, তন্নতন্ন করে খুঁজেছে। কেন এমন হল। অপাঙক্তেয় একজন, দূরে সরিয়ে দেওয়া মানুষ, হঠাৎ এত আপন মনে হল কেন।
বি কে একদিন বলেছিলেন, প্রফেসর বি কে সিন্হা ক্লাস লেকচারের ফাঁকে বলেছিলেন, অ্যানালাইজ ইয়োর মাইন্ড অ্যান্ড ইউ উইল ফাইন্ড ইট।
কথাটা মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। তখন থেকেই নিজের মনকে ও কাটাছেঁড়া করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। যদিও জানে ওটা অত সহজ কাজ নয়।
পুরী বেড়াতে আসা কি তা হলে একটা অছিলা? একঘেয়েমি কাটানোর জন্যে, এক্সট্রা এনার্জি নিয়ে ফিরে গিয়ে আরও বেশি বেশি কাজ করে পাশের টেবিলের প্রৌঢ়টিকে খুশি করা।
আসলে কলেজ পার হয়ে এসেও ওর মন পড়ে আছে সেই নিঃস্বার্থ নির্ভেজাল আড্ডাটার মধ্যে। জীবনের সবচেয়ে সুখী অধ্যায়টা ওকে এখনও টানে। পায় না বলেই এত বোরড লাগে। অভিমান হয়। এক একসময় অভিমানে চোখে জল এসে যায়। ‘না রে, কাল হবে না, কাল ওর সঙ্গে নন্দনে যাবার কথা।’ ‘অশোক, তুই এ রকম হয়ে গেলি কেন বল তো, একটা দিন সময় করতে পারিস না?’ সকলের জন্যই একটা না একটা ম্যাগনেটিক পোল আছে, অমিতার কম্পাসে কোনও কাঁটাই নেই।
অসিতেশ, তুমি সেই ঝিনুক। হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া।
অমিতার মনে হল, ও যেন সেই হারানো জীবনটাই ফিরে পেয়েছে। সেই কলেজের করিডর, সেই বেঞ্চগুলো, বন্ধুদের মুখ, কফি হাউসের টেবিল, সেই আড্ডা হাসি আনন্দ।
অসিতেশের সঙ্গে দেখা হয়ে মনে হল, ওর মধ্যেই যেন ও সকলকে ফিরে পেয়েছে। কুহুকে, প্রণয়—প্রণয়বল্লভকে, মল্লিকাকে, অশোককে, সব সব। অসিতেশ একটা ঝিনুক হয়ে গেছে, যার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সবাই আছে, সব বন্ধু, সব আনন্দ। জামাইবাবু, আপনি বুঝবেন না, একটা ঝিনুক খুঁজতে যাওয়া মানে ভোরের হাওয়ায় সমুদ্র দেখা, সূর্যোদয় দেখা, ঢেউ ভেঙে ভেঙে নৌকোর এগিয়ে যাওয়া দেখা, আরও কত কি।
তেমনি, একজনকে পেয়ে আমার মনে হচ্ছে আমি সব্বাইকে ফিরে পেয়েছি, সেই হারানো দিনগুলোই।
ভাল লাগছিল, ভীষণ ভাল লাগছিল। কিন্তু মাথার মধ্যে একটা প্রশ্ন ঘুরছে। আমাকে দেখে অসিতেশের মুখ এত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল কেন। এখনও সে উজ্জ্বলতা ম্লান হয়নি। কই, আমি তো এর আগে কখনও কারও মুখ এমন উজ্জ্বল করতে পারিনি।
কলেজজীবনে ওকে অপাঙক্তেয় করে রাখার জন্যে একটু মায়াও হচ্ছিল।
কেমন অপ্রতিভ বিব্রতভাবে অসিতেশ বলল, আমাকে দেখে তুমি ওভাবে ছুটে আসবে আমি তো ভাবতেই পারছি না। কলেজে আমাকে তো পাত্তাই দিতে না।
—মিথ্যে কথা, আমাদের আড্ডাটা তোমারই পছন্দ হয়নি।
অসিতেশের বিব্রতভাব তখন অনেকটা কেটে গেছে। বললে, হয়ইনি তো। আমি তো যেতাম শুধু তোমার জন্যে।
সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার মাঝখানেই অট্টহাসে হেসে উঠেছিল অমিতা।
হাসছে আর বলছে, আমার জন্যে? আমি…আমার জন্যে?
হোটেলে ফিরে আসার পথে অমিতার মনে হয়েছিল, জামাইবাবুর কথাগুলো বোধহয় এভাবে উড়িয়ে দেওয়া চলে না। লোকটা কিছু কিছু ঠিক কথাই বলে, সমুদ্রের রংই নয়, মানুষেরও রং পাল্টে যায়। অসিতেশকে তো ওর দিব্যি ভাল লাগছে। বেশ পছন্দ করতে পারছে। ওর রংও তো বদলে গেল। এক এক ধরনের আলোয় এক এক রং। আলোটা কে ফেলল? অমিতা নিজেই?
অমিতা বুঝতে পারছিল না অসিতেশ যা বলছে তার মধ্যে সত্যি কিছু আছে, নাকি নিছক ওদের আড্ডায় বসা ইয়ার্কি ফাজলামি। ওর কখনও কখনও সন্দেহ হয়েছে ওর মধ্যে প্রেম ভালবাসার মতো সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোই হয়তো নেই। তা না হলে ও তেমন ভাবে কারও প্রেমে পড়তে পারল না কেন। না হয় ব্যর্থ হত, তা হলেও তো জানতে পারত বন্ধুবান্ধবরা এত প্রেম-প্রেম করে পাগল হয়, জিনিসটা আসলে কি! কারও সঙ্গ ভাল লাগা? সে তো অনেকের সঙ্গই ভাল লাগে, লাগত।
তখন আরও কম বয়েস, কাকে যেন জিগ্যেস করেছিল, হ্যাঁ রে, এত যে প্রেম-প্রেম বলিস, আসলে ব্যাপারটা কি বুঝিয়ে বল তো?
সে সায়েন্সের ছাত্রী, হেসে বলেছিল, ওটা হায়ার ম্যাথেমেটিক্স, স্টেপ বাই স্টেপ শিখতে হয়। তার পরই অবাক হয়ে বলেছিল, এতখানি বয়েস হল, তুই সত্যি জানিস না? প্রেম করিসনি এর আগে?
ও মাথা নেড়েছে।
তার পরই সেই বন্ধুটি, অরুণা কি? বলেছিল, বেঁচে গেছিস। বড় কষ্ট রে, বড় কষ্ট।
পরক্ষণেই বলেছে, তুই একে সুন্দরী, তার ওপর বড় ইনোসেন্ট মুখ তোর, কেউ এগোতে সাহস করে না।
ওকে কেউ সুন্দরী বললে অমিতার ভালই লাগে, মেয়ে-বন্ধুরা বললেও। সেই ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছে, আত্মীয়স্বজনদের মুখে। ঠিক পুরোপুরি বিশ্বাস হয় না। হলেও নিজেকে প্রশ্ন করেছে, কতখানি সুন্দর। পরমুহূর্তে ভেবেছে, হয়েই বা কি লাভ? স্কুলেই তো দু’-একটি মেয়েকে প্রেমে পড়তে, প্রেম করতে দেখেছে। কলেজেও, এমনকি পাড়ার একটা মেয়েকেও। পরে তাদের বিয়েও করেছে দু’-একজন। লিড হ্যাপিলি এভার আফটার। কই, এরা কেউই তো তেমন সুন্দরী ছিল না। যে ছেলেগুলোর প্রেমে পড়েছিল তারা, তারাই বা কি এমন দেখতে! অ্যারেঞ্জড ম্যারেজে তবু রূপের দাম আছে, যদিও তার জন্যে দেনাপাওনার অঙ্কটা কমে না। সাক্ষাৎ মেজদিই তার প্রমাণ। মেজদিরও অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। তবে চট করে হয়ে গিয়েছিল, সম্বন্ধটা এনেছিল মাসিমা। দেখে অসুখী বলে তো মনে হয় না। বাইরে থেকে দেখে কতটুকুই বা বোঝা যায়।
অসিতেশের কথাগুলো ওর বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল। নিছক প্রশংসা হিসাবেই নিয়েছিল। ওর বুকের ভেতরে রিমঝিম রিমঝিম করে ওঠেনি।
রিমঝিম রিমঝিম করে, দেখা না হলে পাঁজরের ভেতর ব্যথা, এই রকম কি সব বলে বোঝাতে চেয়েছিল অরুণা। হ্যাঁ, অরুণাই তো।
অসিতেশ ওকে ছাড়তে চাইছিল না। হাত দেখাল সামনের হোটেলটার দিকে। চলো চলো, আড্ডা দেওয়া যাবে। …কতকাল পরে দেখা।
‘কতকাল পরে দেখা’ শব্দ তিনটি যেন দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে এল। কথাগুলো যেন অমিতার বুকের মধ্যে বলা অনুচ্চারিত কথারই প্রতিধ্বনি। অথচ তা অসিতেশের উদ্দেশে বলা নয়। যেন সকলের উদ্দেশে বলা। কলেজের সব বন্ধু, আড্ডার সঙ্গীদের উদ্দেশে। অসিতেশকে পেয়ে ওর মনে হচ্ছিল সবাইকে পেয়ে গেছে।
—আমি তো একা, চলো না জমিয়ে আড্ডা দেব। বলে সপ্রশ্ন চোখে তাকিয়ে রইল ও অমিতার মুখের দিকে। একটু থেমে বললে, চলে চলো, আমার যে অনেক কথা বলার আছে।
অসিতেশকে ভাল লাগছিল অমিতার, ছাড়তে চাইছিল না। কত কি জানতে ইচ্ছে করছিল, অন্য সকলের কথা। ও হয়তো অনেকের খবর জানে। না জানলেও ক্ষতি নেই। পুরনো দিনের ঘটনাগুলো, কথাবার্তা রোমন্থন করতেও তো ভাল লাগে।
তবু ওই যে বলল, আমি তো একা, কিংবা বিষণ্ণ স্বরের ‘আমার যে অনেক কথা বলার আছে, সঙ্গে সঙ্গে অমিতা সচেতন আর সতর্ক হয়ে উঠল।
কফি হাউসের টেবিলে, সিনেমায় গিয়ে, নিছক উদ্দেশ্যহীন হাঁটাপথের আড্ডায় এমন কথা ছিল না যা নিজেও উচ্চারণ করেনি, অন্তত ফাজিল ছেলেগুলোর মুখে তো শুনতে হয়েছে। তবু কোনও দিন সচেতন হতে হয়নি, সতর্ক হতে হয়নি।
অমিতা এমন ভাব করল যেন শেষের কথাগুলো শুনতেই পায়নি, বুঝতেই পারেনি তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা চাপা ব্যথার স্বর। ও যে সতর্ক হয়ে উঠেছে তা যাতে অসিতেশ বুঝতে না পারে, সে ভাবেই হেসে উঠে বললে, আরে দূর, এখন চলো আমাদের হোটেলে, বাবা-মা দিদি-জামাইবাবু সব আছে, আলাপ করিয়ে দেব।
তারপর হাসতে হাসতে বললে, এমন দুদ্দাড় করে ছুটতে ছুটতে এলাম তোমাকে দেখতে পেয়ে, ওরা ভাবছে, কি না কি ঘটে গেছে।
ত্রিদিব বলেছিল, কোয়াইট হ্যান্ডসাম। তোমার পছন্দ আছে।
মেজদি বললে, চমৎকার ব্যবহার, দেখলি বাবা-মাকে প্রণাম করল, আজকাল কেউ করে না।
তারপর মেজদি হঠাৎ হেসে উঠে বললে, তোরা প্ল্যান করে এসেছিস নাকি রে!
ইস্। কি ব্যাকডেটেড। মুখে বললে, যেমন দেবা তেমনি দেবী।
অমিতা জানতেও পারল না, অসিতেশ চলে যাওয়ার পর তারানাথ আর স্বর্ণলতা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। অর্থাৎ, কিছু বুঝলে! কিন্তু মুখে কেউই কোনও কথা বললেন না। দু’জনেই এখন সাবধান হয়ে গেছেন। বোকামি না করে ফেলি।
তারানাথ অস্ফুটে বলেছিলেন, ছেলেটি বেশ ভাল রে।
স্বর্ণলতা যোগ করেছিলেন, ওকে আমার বেশ ভালই লেগেছে। কেমন একটা শান্ত শান্ত ভাব আছে, এ কালের ছেলেদের মতো চালাক-চালাক নয়।
অমিতার শুনতে ভাল লেগেছে। ওকে টেনে এনে সকলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার পিছনে কোনও উদ্দেশ্য ছিল না। না আনলেও চলত। স্রেফ এসে বললেই হত কলেজের এক বন্ধুও এসেছে, দেখা হয়ে গেল। তারপর তার সঙ্গে গিয়ে সী-বীচে বসে গল্পগুজব করতে কোনও বাধা ছিল না। কেউ কিছু মনে করত না। বড়জোর জামাইবাবু একটু রসিকতা করে আসল ব্যাপার কিছু আছে কি না জানতে চাইত। মেজদি তো বলেই বসল, প্ল্যান করে এসেছে কি না। ওরা বয়েসে অমিতার চেয়ে কতই বা বড়, এ কালেরই মানুষ, অথচ একটা ছেলে আর একটা মেয়েকে একসঙ্গে দেখলেই প্রেম ছাড়া কিছু ভেবে উঠতে পারে না।
বয়স্ক লোকরা ওদের সম্পর্কে কি ভাবে তা নিয়ে একদিন খুব হাসাহাসি হচ্ছিল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনের পাঁচিলে বসে। ওরা জনা পাঁচেক ছেলেমেয়ে ম্যাটিনিতে সিনেমা দেখে সন্ধেবেলায় ফুচকা খেতে এসে পাঁচিলে বসে বসে গল্প করছিল। দুটো মেয়ে আর তিনটে ছেলে যে পাশাপাশি বসে নির্দোষ গল্প করতে পারে এখনও অনেকে তা ভাবতেই পারে না। যেমন কেউ বিশ্বাসই করবে না ওদের কয়েকজন একবার কি একটা ব্যাপারে বাস পুড়িয়েছিল। দুটো মেয়েও ছিল তার মধ্যে। অমিতা সে দিন একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছে। ওর মধ্যেও যথেষ্ট উত্তেজনা ছিল, সাহস ছিল না। পরে অবশ্য ওদের অনুশোচনাও হয়েছিল, কাজটা ভাল করেনি।
পাঁচিলে বসে ওরা হাসাহাসি করছিল, মজার মজার কথা বলছিল, কে কাকে টেক্কা দিতে পারে, আর কোনও কোনও রসিকতায় এ ওকে ঠেলা মারছিল। সামনে দিয়ে যারা হেঁটে যাচ্ছিল ওদের দিকে কেমন অদ্ভুতভাবে তাকাতে তাকাতে চলেছিল। সেই তাকানোর মধ্যে নিশ্চয় অনেক কিছু ছিল। এ কাল সম্পর্কে জেলাসি, বা ওদের সম্পর্কে, পুরুষগুলোর চোখে চাপা কিংবা প্রকাশ্য লোভ, আর সবজান্তা ভাব, সব বুঝে গিয়েছি, বুঝি।
ওদের মধ্যে থেকে কে একজন বলে উঠল, এ রেস অব পাভার্টস।
অদিতিই হয়তো।
অলোক সঙ্গে সঙ্গে অদিতিকে একটা কনুইয়ের গুঁতো দিল, অদিতি চুলের মুঠি ধরল অলোকের।
অমিতাই একটা লোকের চোখে কৌতূহল দেখে সাবধান করেছিল, এই কি হচ্ছে, কি ভাবছে সবাই।
অদিতি বলে উঠল, ভাবুক না, আমার অত ছুঁইছুঁই বাতিক নেই।
অমিতার মনে পড়ল, ওরা তবু ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচিয়েই চলত। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল দিন কয়েক আগের কথা। মুকুলরা তিন-চার বন্ধু, দুটো ছেলে, টিভি দেখতে দেখতে হাসাহাসি করছে। অমিতা তখন পদার এপারে। কানে এল, একজন বলছে, অত গা বাঁচিয়ে চলার কি আছে রে, আমি কি মারুতি গাড়ি নাকি!
—সে আবার কি? একজন বলল।
—মারুতি যখন চলে, দেখিস না, বাস ট্যাক্সি ছুঁয়ে দেবে সেই ভয়েই তটস্থ।
হাসতে হাসতে মুকুল বলে উঠল, নীতাকে তাহলে এবার থেকে মারুতি বলে ডাকব। দেখিস না, মাথা নিচু করে আসে, ছেলে দেখলেই দূরে সরে যায়?
কথাগুলো শুনে সে দিন ভাল লাগেনি অমিতার।
.
অথচ তারানাথ আর স্বর্ণলতা?
তারানাথ নিজেই এক একসময় অবাক হয়ে যান। ভাবেন সময় কত কি বদলে দেয়। তারানাথ আর স্বর্ণলতাও কত বদলে গেছেন। দিনকাল বদলে যাচ্ছে, নিজেদের না বদলে ফেললে চলবে কেন। বড় মেয়েকে কত আগলে আগলে রেখেছিলেন, মেজো মেয়ে কল্পনার বেলায় কিছুটা ঢিলে দিয়েছিলেন, তবু একটা সতর্ক দৃষ্টি ছিল তার ওপর, আর অমিতার বেলায় রাতারাতি সব তো বদলে গেল, স্বাধীনতা না দিয়ে পারবেন কি করে। তার ওপর মেয়েটাও জেদি প্রকৃতির।
‘ও যদি নিজে বিয়ে করতে চায় করুক না’ এমনি একটা উদারতা তত দিনে মনের মধ্যে বাসা বেঁধেছে তারানাথের। অমিতাকে বলেছেন, শুধু বোকার মতো কিছু করে বসিস না।
শুধু সময় বদলে যাওয়াই কি উদারতার কারণ। নাকি অন্য কিছু। বড় মেয়ের বিয়ে কম উদ্বেগের ছিল না। কত জায়গায় ছোটাছুটি, কত আত্মীয়স্বজনকে ধরাধরি। তার ওপর সে দেখতেও মেজো আর ছোটর মতো সুশ্রী ছিল না। নাকটা একটু চাপা, গায়ের রংটাও। বিয়ে দিয়েও সে যে খুব একটা সুখী হয়েছে তাও নয়। মেজো মেয়ের বেলায় তেমন কাঠখড় পোড়াতে হয়নি ঠিকই, কিন্তু টাকা পয়সা কম খরচ হয়নি। নিজেই বিয়ে করলে এত উদ্বেগ থাকে না, এত ছোটাছুটি করতে হয় না। দায়িত্বও কম। বড় মেয়ে তো এখনও ওঁকেই দায়ী করে। যেন দেখেশুনে বিয়ে দেননি।
তাই ভেবেছিলেন, এত মেলামেশা করে, হয়তো নিজেই ঠিক করে ফেলবে। উনি নিশ্চিন্ত হবেন।
স্বর্ণলতার মনেও সে রকমই ধারণা ছিল।
কলেজে পড়ার সময় দু’-একজন ছেলেবন্ধুকে নিয়ে এসেছে, গল্প করেছে।
তারানাথ আর স্বর্ণলতা ধরে নিয়েছিলেন ওদের মধ্যে কোনও একজনকে অমিতার পছন্দ। কোনজন সেটাই বুঝতে পারতেন না।
নিজেদের পছন্দসই কোনও একজন সম্পর্কে বলেছেন, মন্দ কি।
স্বর্ণলতা হয়তো শুধরে দিয়েছেন, আরে বাবা ও নয়, দেখোনি তুই-তুই করে।
তারানাথ হেসে বলেছেন, তুই থেকে তুমি হতে কতক্ষণ। আর নয়তো ওসব আমাদের বোকা বানানো।
আসলে ওঁরা দু’জনেই চাইছিলেন কোনও একজনকে অমিতা নিজেই বিয়ে করুক। ওঁরা তা হলে নিশ্চিন্ত হতে পারেন।
একবার কার সম্বন্ধে স্বর্ণলতা বোধহয় প্রশ্নও করেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সে কি হাসি!
অথচ বিয়ের চেষ্টা করবেন কি না, জিগ্যেস করায় বলেছিল, ওসব নিয়ে তোমাদের মাথা ঘামাতে হবে না।
তার পর থেকে ওঁদের ধারণা হয়ে গেছে, এ কালের ছেলেমেয়েদের ওঁরা বুঝতেই পারেন না।
মেয়েকে কিছু জিগ্যেস করে আবার বোকা বনে যেতে রাজি নন।
সে জন্যে দু’জনেই শুধুই চোখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। একটা ক্ষীণ আশাও যে দেখা দিল না তা নয়।
তবে ওঁদের খুশি হয়ে ওঠার একটা কারণ ছিলই।
চাকরি পাওয়ার পর অমিতার মুখচোখে যে উচ্ছলতা দেখতে পেয়েছিলেন, দু’ দিনেই তা অন্তর্হিত হয়ে গেল। একা একা মেয়েটা চুপচাপ বসে থাকত। কি ভাবত কে জানে। কিংবা কিছুই হয়তো ভাবত না। লক্ষ করেছিলেন, আগের মতো গান শোনে না, গল্প করে না, বই পড়ে না। দেখে মনে হত কি এক দুশ্চিন্তায় ডুবে আছে।
সে জন্যেই পুরীতে বেড়াতে আসা। মেয়ের মন যদি ভাল হয়, আবার আগের মতো হাসতে পারে, গল্প করতে পারে।
পুরীতে এসে মনে হল অমিতা সত্যিই বদলে গেছে। হাসি রসিকতা হইচই আনন্দ। মেজো মেয়ে আর ত্রিদিবের সঙ্গে হাসাহাসি তর্ক রাগ অভিমান। টুকুকে নিয়ে খুনসুটি। মনে হল সমুদ্র কত মানুষকে বদলে দিতে পারে।
তারপর এই অসিতেশ।
যতক্ষণ ছিল লক্ষ করে দেখেছেন অমিতার বিবর্ণ মুখে কেমন একটা দীপ্তি। যেন ঠিক সেই কলেজের দিনগুলোয় ফিরে গেছে। হাসিঠাট্টা।
বিকেলে সী-বীচে বেড়াতে বেরিয়ে বললেন, তোর সেই বন্ধুটি গেল কোথায়?
ত্রিদিব বললে, যাও গিয়ে ডেকে নিয়ে এসো।
ডেকে আনতে হল না।
ওটুকু জায়গাতেই তো সকলের হাঁটাচলা।
তারানাথ আর স্বর্ণলতা বালির ওপর বসে পড়লেন, টুকুকে নিয়ে। ত্রিদিব আর কল্পনা আর অমিতা ঢেউভাঙা জলে পা ভিজিয়ে ভিজিয়ে হাঁটছিল।
দেখা হয়ে গেল। অসিতেশও ওদের সঙ্গে ধীর পায়ে হাঁটছিল। এক সময় অমিতার মনে হল মেজদি আর জামাইবাবু যেন দ্রুত পা চালিয়েছে। ওরা পিছিয়ে পড়ছে।
মনে মনে হাসল ও।
একটাই ভয় হচ্ছিল, ভালও লাগছিল। ভাল লাগছিল পুরনো দিনের কথা বলতে। যাদের সঙ্গে আর দেখাই হয় না তাদের কারও কারও খবর জানতে পারছিল। ওর কাছ থেকেও কারও কারও খবর পাচ্ছিল অসিতেশ।
কিন্তু ভয় হচ্ছিল অন্য একটা কারণে।
‘তোমাকে আমার যে অনেক কথা বলার আছে।’ দেখা হওয়ার পর হঠাৎ বলে ফেলেছিল অসিতেশ। সেই মুহূর্তে ও কথাটা এড়িয়ে গেছে। কথাটার মধ্যে একটা উদ্দেশ্য ছিল বলে সন্দেহ হয়েছে। সেটা যাতে বলতে না পারে, বলতে গেলে চট করে এড়িয়ে যেতে হবে অন্য কোনও কথা বলে।
ও যেন সত্যি সত্যি ওর প্রেমে না পড়ে যায়। কারণ অমিতার মনের মধ্যে যে তেমন কোনও দুর্বলতাই নেই, ওর সম্পর্কে। হাসিঠাট্টার মধ্যে ব্যাপারটা উড়িয়ে দিতে হবে, যদি সত্যি সত্যি বলে ফেলে।
একেবারে পাগল। নাকি নিছক রসিকতা। প্রেমট্রেমের কথা বলে জানতে চাইছে অমিতার মনেও ওর সম্পর্কে কোনও দুর্বলতা আছে কি না।
তুচ্ছ কথার মধ্যে ডুবে গেল দু’জনে। অথচ ওই তুচ্ছ কথাগুলো বলতে, কথাগুলো শুনতে ভালই লাগছিল অমিতার।
এক সময় ক্লান্ত হয়ে ওরা দু’জনেই বসে পড়ল, বালির ওপর। সামনাসামনি।
মুখোমুখি।
অমিতা কথা বলছিল অসিতেশের মুখের দিকে তাকিয়ে। অসিতেশ কথা বলছিল অমিতার মুখের দিকে তাকিয়ে।
হঠাৎ অমিতার কানে বাজল ত্রিদিবের কথাটা।—কোয়াইট হ্যান্ডসাম।
একটি মুহূর্ত! মুহূর্তের মধ্যে অসিতেশের মুখের দিকে তাকিয়ে ওর মনে হল, আরে সত্যি তো।
কোয়াইট হ্যান্ডসাম, কোয়াইট হ্যান্ডসাম। মন বলে উঠল।
এত দিন লক্ষ করিনি কেন? কলেজে পড়ার সময়, কফি হাউসের আড্ডায় কিংবা কলেজের করিডরে কোনও দিন কি ওর দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখিনি। পছন্দ অপছন্দ কিছুই তো করিনি ওকে। নিতান্তই ভিড়ের মধ্যে একটা মুখের মতো উপেক্ষা করেছি। কিংবা তাও করিনি। কিংবা ওই হ্যান্ডসাম বলেই ওকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম।
সেই সব দিনের কথা ভেবে অমিতার এখন অবাক লাগে।
এখন এই সাতচল্লিশ বছর বয়েসে ওর বুকের মধ্যে একটা চাপা ব্যথা। পাথরের মতো চেপে বসতে চাইছে।
ওর মেয়ে মুকুলের এখন সেই বয়েস। কলেজে পড়া যে বয়েসটা হারিয়ে যাওয়ার জন্যে ও একসময় ছটফট করেছে। সমস্ত জীবনটা নীরস মনে হত।
কলেজে যাওয়ার আগে মুকুলকে এত সাজগোজ করতে দেখে হঠাৎ কেমন যেন সন্দেহ হল। সেন্টের শিশি নিয়ে স্প্রে করতে দেখে।
অমিতা তো কোনও দিন সেন্ট মেখে কলেজে যায়নি। এত সাজগোজও করত না।
উঠতি বয়েসের মেয়েদের দিকে কোন মা একটু সতর্ক চোখ রাখে না। ও তো কোনও আপত্তি করেনি, কোনও বাধানিষেধের গণ্ডির মধ্যেও রাখেনি মুকুলকে।
শুধু ছোট্ট একটা কথা বলেছে : সমঝে চলিস।
ব্যস, দুম করে মুকুল বলে বসল, তুমিও তো ক্লাসমেটকে বিয়ে করেছিলে, খারাপ হয়েছে কিছু!
মুখটা কেমন ভোঁতা হয়ে গেল। কিছু বলতে পারল না।
শুধু মনে মনে বললে, খারাপ না ভাল আমি নিজেই তো জানি না। তুই আর জানবি কি করে, কত কষ্টে তোদের কাছ থেকে সব আড়াল করে রেখেছি।
