৭
আমরা এখন কী করব বুধোদা?
কী ব্যাপারে করার কথা বলছিস?
ওয়ারউলফ। নেকড়ে-মানুষ। কুকড়াঝোরায় যে ওয়ারউলফ রয়েছে এ ব্যাপারে তো আর সন্দেহ নেই? আমরা কি এখনই কলকাতায় ফিরে যাব? জানাব সবাইকে?
খেপেছিস? এই বলে বুধোদা আবার নিজের কাজে ডুবে গেল। কাজ বলতে—একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাসের নীচে ধরে কয়েকটা পুরনো ফাউন্টেন পেনকে আগাপাস্তলা পরীক্ষা করা।
কাল আমি অনেক রাত অবধি ঘুমোতে পারিনি, কিন্তু বুধোদার অদ্ভুত ক্ষমতা বলতে হবে, পুরনো চার্চ থেকে ফিরে আসার আধঘন্টার মধ্যে নিশ্চিন্তে নাক ডাকাতে শুরু করেছিল। এমনকি ওকে দেখে এও মনে হচ্ছিল যে, গত দুদিনে ওর মনের মধ্যে যে অস্থিরতা ছিল, নেকড়ে-মানুষকে স্বচক্ষে দেখার পরে সেটা যেন অনেকটা কমে গেছে।
আজ সকালে ও ঘুম থকে উঠেও পড়েছে অনেক তাড়াতাড়ি। আমি চোখ মেলার পর থেকেই দেখছি, ও জানলার পাশের চেয়ারটায় বসে একমনে ওই ফাউন্টেন পেনগুলোকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে যাচ্ছে। মনে হয় মেকারের নাম খুঁজে পাচ্ছে না।
আমাকে বিছানা ছেড়ে উঠতে দেখে এমন হাসি হাসি মুখে গুড-মর্নিং বলল, যেন কাল রাতে আমরা মরতে মরতে বেঁচে যাইনি। যেন সুবেশ তির্কের কবরের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসা নেকড়ের থাবার ছাপগুলো নিজেদের চোখে দেখিনি। আর সব কিছু যদি ভুলেও যায়, ও কেমন করে ভুলে যাচ্ছে ওই কচি বাচ্চাটার কান্নার আওয়াজ? আমি তো এক মুহূর্তের জন্যেও ভুলতে পারছি না।
থাকতে না পেরে আমি ওই কথাটা জিগ্যেস করলাম—আমরা এখন কী করব বুধোদা? আর তাতে ওর ওই এক লাইনের উত্তর—খেপেছিস?
এর পরেও যদি না খেপে যাই তাহলে কখন খেপব? রেগেমেগে টুথব্রাশে হেয়ার-জেল লাগিয়ে ডাইনিং-রুমের বেসিনের দিকে চলে যাচ্ছিলাম। বুধোদাই পিছন থেকে ডেকে ভুলটা শুধরে দিল। তারপর বলল, মুখ ধোয়া হয়ে গেলে ড্রেসটা চেঞ্জ করে নিস। ওয়ারউলফ ধরতে বেরোব।
আমি ঠিক করেছি, ওকে আর কোনো ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করব না। নিজে থেকে যেটুকু বলার বলবে। তাই মুখ ধুয়ে এসে দেয়ালের ব্র্যাকেট থেকে আমার ছ’পকেট ওলা কার্গো-প্যান্টটা নামিয়ে চেঞ্জরুমের দিকে এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ প্যান্টটার একটা পকেট থেকে ঝনাৎ করে মেঝের ওপরে কী যেন পড়ল। তাকিয়ে দেখি সেই মেটালের চাকতিটা, যেটা গাপ্পির পকেট থেকে নিয়ে নিজের পকেটে রেখেছিলাম। একটু খারাপ লাগল। সেদিন জিনিসটা ডাম্পিভাইয়ের হাতে ফিরিয়ে দিতে ভুলে গেলাম কেমন করে? তারপর ভাবলাম, দামি জিনিস তো কিছু নয়। আজ দিয়ে দিলেই হবে।
চাকতিটা গড়াতে গড়াতে গিয়ে একেবারে বুধোদার পায়ের কাছে কেতরে পড়ল। ও বোধহয় ভেবেছিল আমার পকেট থেকে কয়েন-টয়েন কিছু পড়ে গেছে, তাই ওটাকে হাতে তুলে নিয়ে ক্যাজুয়ালি আমাকে ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই ওর চোখ পড়ল আসল জিনিসটার ওপর আর সঙ্গে সঙ্গেই ভূত দেখার মতন লাফ মেরে উঠে দাঁড়াল। এক সেকেন্ডের জন্যেও ওটার দিক থেকে চোখ না সরিয়ে আমাকে জিগ্যেস করল, এটা তুই কোত্থেকে পেলি রুবিক?
আমি ওর রিঅ্যাকশন দেখে তো অবাক। আমতা আমতা করে বললাম গাপ্পির পকেট থেকে কিভাবে ওটাকে সরিয়ে রেখেছিলাম।
বুধোদা আরো পাঁচ সেকেন্ড পরে চাকতিটার দিক থেকে চোখ তুলে আমাকে বলল, ভগবান কেন সব সময় শেষ সমাধানটা তোর হাত দিয়েই পাঠায় বল তো রুবিক? আমি কী অপরাধ করেছি? এরপর থেকে তো আমি একা কোনো রহস্যের পেছনে দৌড়নোর সাহসই পাব না।
এটাও ওর এক ধরনের ইয়ার্কি কিনা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। তবু ওর বাড়িয়ে ধরা হাত থেকে চাকতিটা নিয়ে আরেকবার ভালো করে দেখলাম। জিনিসটার সাইজ আমাদের স্কুলের ব্যাজের মতন। এমনিতেই ম্যাড়মেড়ে রং, তার ওপরে সবুজ কলঙ্কের ছোপ পড়ে আরো বিচ্ছিরি হয়ে গেছে। সোনা বা রুপোর তৈরি নয় এটুকু নিশ্চিত। বোধহয় পেতল-টেতল হবে।
এইটা দিয়ে দ্যাখ—এই বলে বুধোদা ম্যাগনিফাইং-গ্লাসটা আমার হাতে ধরিয়ে দিল। সেটা দিয়ে দেখলাম, চাকতির ঠিক মাঝখানের ফুটোটার বাঁ-পাশে ইংরিজিতে ½ সংখ্যাটা এনগ্রেভ করা রয়েছে। আর ডানদিকে শুধু একটা সাল—১৮৯৯। কোনো দেশের নাম নেই। কোনো লোগো নেই। কাজেই এটা যে কয়েন নয় সেটা বোঝা যাচ্ছে। ম্যাগনিফাইং-গ্লাস আর মেটালের চাকতি, দুটোই বুধোদার হাতে ফেরত দিয়ে বললাম, হুঁ, দেখলাম। এবার বলো রহস্য সমাধানের কথা কী বলছিলে? এই চাকতিটা দিয়ে রহস্য সমাধান হবে?
বুধোদা চেয়ার থেকে চলে এল খাটে। বেশ গুছিয়ে বাবু হয়ে বসল। তারপর বলল, হবে কিরে? হয়ে গেছে। খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। মন দিয়ে শোন।
মনে কর, তুই এই কুকড়াঝোরাতেই বসে আছিস, কিন্তু টাইম-মেশিনে চড়ে পেছিয়ে গেছিস আরো প্রায় একশো পঁচিশ বছর। নারী-পুরুষ মিলিয়ে একহাজার চা-শ্রমিক বাগানে কাজ করছে। কাজ তো এক রকমের নয়। মাটি কাটা, গাছ বসানো, জল দেওয়া, গাছ ছাঁটা, পাতা তোলা থেকে শুরু করে সেই পাতা কারখানায় নিয়ে গিয়ে প্রসেসিং করা অবধি হাজার রকমের কাজ। কোনো লেবার পায় সারাদিনের কাজ, কেউ পায় আধবেলার, কেউ বারো আনা দিনের। সেই অনুযায়ী তাদের প্রতিদিন মজুরি মেলে। সেই মজুরিকে বলা হত ‘হাজরি’। পুরোদিন কাজ করলে ফুল হাজরি, অর্ধেক দিন কাজ করলে হাফ হাজরি, আবার দিনের বারো আনা কাজ করলে থ্রি কোয়ার্টার হাজরি। সাধারনত সপ্তাহের শেষে সাতদিনের কাজের হিসেব এক করে তাদের পেমেন্ট দেওয়া হত।
কিন্তু এক সপ্তাহের শেষে হাজরি মেটাতে গিয়ে বাগানের মালিকরা অনেকগুলো সমস্যায় পড়ল। প্রথমত, লেবাররা অত অঙ্ক জানে না। সাতদিনের মধ্যে কে কবে কত কাজ করেছে আর তার জন্যে কত পাওনা হয়, অত জটিল হিসেব তাদের মাথায় ঢুকত না। আর মাথায় ঢুকত না বলেই ভাবত মালিকরা তাদের ঠকিয়ে নিচ্ছে। সেই থেকে শুরু হত অশান্তি।
দিনের দিন হাজরি মিটিয়ে দিলে এই সমস্যার একটা সুরাহা হয়তো হত। কিন্তু তাতে দেখা দিত একটা নতুন সমস্যা। তখন তো কাগজের নোটের অত প্রচলন ছিল না। প্রতিদিন হাজারের ওপর কুলিকে কয়েন দিয়ে পাওনা মেটাতে গেলে যত কয়েন লাগবে তা জোগাড় করা ছিল অসম্ভব।
এই সমস্যার সমাধান করার জন্যে চা-বাগানের মালিকেরা ইন দা ইয়ার এইটটিন হান্ড্রেড অ্যান্ড সেভেনটি-টু একটা ইউনিক জিনিস চালু করল। তার নাম ”Tea garden token”।এইমাত্র যে জিনিসটা তোর পকেট থেকে মেঝের ওপর পড়ল, ওটা কুকড়াঝোরা চা বাগানের হাফ হাজরির টোকেন। দেখলি না মাঝখানে হাফের সাইন?
টোকেনগুলো তৈরি হত সস্তার মেটাল দিয়ে। বানাত অবশ্য কোনো না কোনো সরকারি টাঁকশাল। বানানো হত নানারকম শেপে। ধর, কোনো বাগান ফুল হাজরির জন্যে বানাল চৌকোনা, হাফ হাজরির জন্যে গোল আর থ্রি কোয়ার্টার হাজরির জন্যে তিনকোনা টোকেন। কুলিরা টাকা আনা পাইয়ের হিসেব না বুঝলেও, কোন হাজরির জন্যে কোন শেপের টোকেন সেটা সহজেই বুঝে নিত। দিনের শেষে হাতে গরম পেমেন্ট পেয়ে তারাও খুশি হত আর বাগান-মালিকও থাকত নিশ্চিন্ত।
আমি বুধোদার কথার স্রোতে বাধা দিয়ে বললাম, কিন্তু বুধোদা, টাকার বদলে টোকেন নিয়ে লাভটা কী হত? টোকেন দিয়ে তো আর কেনাকাটা করা যেত না।
বুধোদা বলল, কে বলল করা যেত না? প্রত্যেকটা বাগান ছিল এক একটা আলাদা আলাদা শহরের মতন। একটা বাগানকে ঘিরে যত দোকানদার, ধোপা, নাপিত, ডাক্তার-বদ্যি সকলেই পয়সার বদলে ওই টোকেন অ্যাকসেপ্ট করত। তারা জানত কোন টোকেনের দাম আসলে কত পয়সা। সেই অনুযায়ী তারা লেবারদের সেই দামের জিনিস দিয়ে দিত। আবার সপ্তাহের শেষে জমা হওয়া সমস্ত টোকেন বাগান-মালিককে ফেরত দিয়ে সত্যিকারের পয়সা নিয়ে নিত।
তবে এ ছাড়াও টোকেন চালু করার পেছনে মালিকদের একটা দারুন শয়তানি বুদ্ধি কাজ করেছিল। কী বল তো?
আমি মাথা চুলকোচ্ছি দেখে বুধোদা বলল, পারবি না। কারণ তুই অত শয়তান নোস। টোকেন দেখিয়ে বাগানের মধ্যে তুই অনেক কিছুই কিনতে পারবি, কিন্তু বাগান থেকে বেরিয়ে ট্রেনের টিকিট কাটতে পারবি? বাসের টিকিট কাটতে পারবি? আর না পারলে…
আমার মাথায় ততক্ষণে ব্যাপারটা ঢুকে গেছে। বললাম, না পারলে আমি বাগান থেকে পালাতেও পারব না, তাই তো?
গুড, ভেরি গুড।
আমি জিগ্যেস করলাম, এখন টি-গার্ডেন টোকেন চালু নেই তো?
উঁহু। অনেকদিন আগেই উঠে গেছে। যখন থেকে টাকা আনা পাইয়ের গন্ডগোলের হিসেব উঠে গেল তখন থেকে বাজারে আর খুচরোর অভাবও রইল না। হিসেবপত্রও অনেক সরল হয়ে গেল। সেটা এই ধর নাইনটিন ফিফটিজের প্রথম দিকে। ব্যাস টোকেনের দিনও ফুরোল। তার মানে পৃথিবীর ছোট্ট একটা কোণে, অল্প কিছু সময়ের জন্যে টি-গার্ডেন টোকেন নামে এই চাকতিগুলো চালু ছিল।
তারপর কী হল?
তারপর? ভাঙাচোরা গাড়ি যেমন লোহার দামে বিক্রি করে দেওয়া হয়, তেমনি লেবাররা যার কাছে যত টোকেন ছিল সব গলিয়ে ভেতরের মেটালটুকু বিক্রি করে দিল। টি-গার্ডেন টোকেন রয়ে গেল অল্প কয়েকজন চা-বাগানের সাহেবের লেখা স্মৃতিকথায় আর আরো অল্প দুয়েকজন অ্যান্টিক হান্টারের পার্সোনাল কালেকশনে।
বুধোদা! আমি খাট থেকে লাফিয়ে মেঝেতে নেমে দাঁড়ালাম। বুধোদার সামনে দাঁড়িয়ে জিগ্যেস করলাম, এই টোকেন এখন অ্যান্টিক?
বুধোদা গম্ভীর মুখে বলল, শুধু অ্যান্টিক নয়। ভীষণ দুষ্প্রাপ্য এবং সেইজন্যেই ভীষণ দুর্মূল্য এক অ্যান্টিক। এইরকম এক-একটা টোকেনের দাম এখন খুব কম করে তিরিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা। আমি বুধোদার হাত থেকে টোকেনটা নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরেয়ে দেখছিলাম। এত দুর্লভ এই সামান্য জিনিসটা! এত দাম এর! কিন্তু…। যে কথাটা বুঝতেই পারছিলাম না সেটাই বুধোদাকে জিগ্যেস করলাম। বুধোদা, গাপ্পির পকেটে টি-গার্ডেন টোকেন কোথা থেকে এল? তাহলে কি ডাম্পিভাইকে যতটা অনেস্ট মনে করেছিলাম ও অতটা অনেস্ট নয়? ও কি এই বাংলো থেকে টোকেনগুলো চুরি করে নিজের ঘরে রেখে দিয়েছে?
উঁহু। বুধোদা মাথা নাড়ল। সাহেবদের বাংলোয় কেন টোকেন থাকবে? জিনিসটা তো কাজে লাগত কুলিদের পেমেন্ট মেটানোর জন্যে।
তাহলে?
বুধোদা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই সামনের দরজায় দুমদাম ধাক্কা আর ডাম্পিভাইয়ের চিৎকার। স্যার স্যার! ভাইয়া ভাইয়া! জলদি দরবাজা খুলিয়ে স্যার।
