ছয়
এরকম হাতের মুঠোর মতন বড় বড় তারা শুধু কোনো পাহাড়ি রাত্রির আকাশেই দেখা যায়। এরকম তারা দেখেছিলাম মেঘালয়ের ভ্যালি-অফ- ডেথ-এ। এরকম তারা দেখেছিলাম কুকড়াঝোরা টি-এস্টেটের সমাধিক্ষেত্রের ভেতরে দাঁড়িয়ে। আর আজ সেই একইরকম তারাভরা আকাশ দেখছি লোহুরঙের ডাইনি বাংলোর বাগানে দাঁড়িয়ে।
বুধোদা কিছুতেই কোনো কথা শুনল না। কিছুক্ষণ আগে ও একাই টানেলের মধ্যে ঢুকে পড়ল। ও বলেছিল, বিপদ যদি আসে তাহলে সেটা স্টুডিও-ঘরের বাইরে থেকেই আসবে, ভেতর থেকে নয়। কারণ, ভেতরে কেউ নেই। আর বাইরে থেকে ওই ঘরে ঢুকবার দুটিই মাত্র রাস্তা—এক, ডাইনি-বাংলোর বাগানের দিকে শাটার ফেলা মূল-দরজা। আর দুই, ওই টানেল। কাজেই ও রঘুদাকে দিয়ে গেছে টানেলের মুখ আগলাবার ভার আর আমাকে বাগানের দিকের দরজার।
হ্যাঁ, টানেলটা যে আসলে স্টুডিও-ঘরের মেঝের নীচের জলের ট্যাঙ্ক থেকেই বেরিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ‘টানেল’ বলছি ঠিকই, কিন্তু ওটা আসলে জল বেরোনোর একটা মোটা পাইপ ছাড়া আর কিছুই নয়। ওই পাইপ ধরে উঠে গেলে স্টুডিও-ঘরের জলের ট্যাঙ্কে পৌঁছে যাওয়া যায় আর সেখান থেকে শরীরটাকে চাড় দিয়ে ঘরের মেঝেয় তুলে ফেলা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। বুধোদা এখন সেইভাবেই স্টুডিও-ঘরে ঢুকবার চেষ্টা করছে।
ওর কাজটা সহজ হবে না। একটু ভাবলেই বোঝা যায়, পাইপটা ট্যাঙ্কে মেশার আগে কোথাও একটা বড়সড় ভালব থাকবে; তা না হলে তো সারাক্ষণই পাইপ দিয়ে জল বেরিয়ে যেত। তা তো আর হচ্ছে না। তবে সেই ভালব সরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ার কোনো ব্যবস্থাও নিশ্চয়ই রয়েছে। ভিসুক সেটা জানত। ওই পথেই ও স্টুডিও-ঘরের ভেতর থেকে কাচের জন্তুদের মৃতদেহ চুরি করতে গিয়েছিল।
ভিসুক যদি পেরে থাকে তাহলে বুধোদাও পারবে। এটাই ছিল বুধোদার যুক্তি। তবে একটা বাড়তি প্রোটেকশন বুধোদা নিয়েছিল। টানেলে ঢোকার আগেই ওর নর্মাল জিন্স আর উলেন সোয়েটারের ওপরে ওয়াটারপ্রূফ জ্যাকেট আর প্যান্ট গলিয়ে নিয়েছিল। ও নিজেই বলেছিল, এই মাঘমাসের ঠান্ডায় ট্যাঙ্ক ভর্তি ঝোরার বরফজল গায়ে লাগিয়ে নিউমোনিয়া বাঁধাবার কোনো ইচ্ছেই ওর নেই।
যাই হোক, আপাতত আমরা তিনজনে কেউই কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। রঘুদা বসে আছে টানেলের মুখ আগলিয়ে। বুধোদা টানেলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসছে স্টুডিও-ঘরের দিকে আর আমি ডাইনি-বাংলোর বাগানের রাস্তা ধরে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে যাচ্ছি স্টুডিও-ঘরের দরজাটার দিকে।
গুঁড়ি মেরে এগোতে হচ্ছে মিস সায়গলের ভয়ে। কে জানে, উনি কোথাও থেকে বাগানের দিকে নজর রেখেছেন কিনা। যদিও সেটা খুব কঠিন কাজ। কারণ, এখন আমার সেলফোনে সময় দেখাচ্ছে রাত তিনটে বেজে বাইশ মিনিট। এইসময়ে নজরদারি চালাতে গেলে মিস সায়গলকে সারারাতই জেগে থাকতে হয়। তা কি উনি থাকবেন?
না, মিস সায়গল নন। কিন্তু অন্য একজন জেগে আছে। সে আমাকে দেখেও ফেলেছে।
ডাইনি-বাংলোর ছাদে দুদিক থেকে দুটো চালা উঠে গিয়ে ঠিক যেখানটাতে প্রণামের ভঙ্গিতে মিশেছে সেই মেশার জায়গাটার নীচেই একটা ছোট্ট জানলা আর সেই জানলার পাল্লা খুলে যে দাঁড়িয়ে রয়েছে, এত দূর থেকে তার মুখ দেখতে না পেলেও, চিনতে অসুবিধে হচ্ছে না। দীপা।
দীপা আমাকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। আমি জানলার নীচে একটা গাছের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালাম। কথা বলা অসম্ভব, কারণ, দীপা যে-জানলায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার হাইট মাটি থেকে অন্তত পঁচিশ ফিট। কথা বলতে গেলে চেঁচিয়ে বলতে হবে আর এই নিস্তব্ধ রাতে সেই শব্দ যে মিস সায়গলকে ডেকে আনবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
কাজেই ইশারাতেই আমাদের কথাবার্তা চলল। দীপা একটা হাতের কব্জি অন্য হাতের কব্জির ওপরে ক্রশ করে রেখে ইশারায় আমাকে বোঝাল যে, ও বন্দি। আমি হাঁ করে মুখে গাল পোরার ভঙ্গি করে জানতে চাইলাম, খেয়েছ কিছু? ও বুড়ো আঙুল নেড়ে কাচকলা দ্যাখালো।
মিস সায়গল ভয়ঙ্কর চটেছেন দেখছি। নাহলে ফেবারিট নাতনিকে এইভাবে শাস্তি দিতেন না। কী করা যায়?
ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে গেল আমার ব্যাকপ্যাকের মধ্যে একটা কাজুবাদামের প্যাকেট রয়েছে। পাহাড়ে যেতে গেলে সঙ্গে কিছু ড্রাই ফুড সবসময়েই রেখে দিতে হয়, সেই হিসেবেই ওটাকে রাখা।
আমি একটু পিছিয়ে গিয়ে স্কাই ক্যাচ তোলার কায়দায় প্যাকেটটাকে নিখুঁত ভাবে দীপার জানলা দিয়ে গলিয়ে দিলাম। দীপা চেষ্টা করেও ক্যাচটা ধরতে পারল না। তবে তাতে অসুবিধে নেই। পরে ঘরের মেঝে থেকে কুড়িয়ে নেবে নিশ্চয়ই। ওর মুখের খুশির হাসি এতদূর থেকেও বুঝতে অসুবিধে হল না আমার।
কিন্তু তারপরে দীপা যে-ইশারাটা করল, সেটা বুঝতে আমার বেশ সময় লাগল। ও নিজের দু-গালে হাত বুলিয়ে কী যেন জিগ্যেস করছিল। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম, ও দাড়িওলা বুধোদার কথা জিগ্যেস করছে। আমি আঙুল দিয়ে স্টুডিওঘরের দিকে দেখাতেই দীপা কয়েক মুহূর্ত পাথরের স্ট্যাচুর মতন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর থেকেই শুধু প্রবলবেগে দু-দিকে মাথা নাড়ছে আর হাতজোড় করে আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করছে, যেন বুধোদাকে ওখান থেকে ফিরিয়ে আনি।
কী আর করব? প্রায় দৌড়তে দৌড়তেই গিয়ে দাঁড়ালাম স্টুডিওঘরের তালাবন্ধ শাটারের সামনে। খুঁজেপেতে দেখলাম, দুটো লোহার পাতের মাঝখানে মর্চে ধরে সরু একটা ফাটল তৈরি হয়েছে। সেখানে চোখ লাগিয়ে দেখলাম, মোক্ষম সময়ে এসেছি।
ঠিক তখনই বুধোদা মেঝেয় বসানো একটা ম্যানহোলের ঢাকনা তুলে ঘরের মেঝেতে উঠে এল। তারপর পিঠ থেকে নাইলনের ওয়াটার-প্রূফ ব্যাগটা বার করে তার মধ্যে জ্যাকেট আর প্যান্টটা ভাঁজ করে ঢুকিয়ে রাখল। তারপর ওই ব্যাগ থেকেই একটা জোরালো এল ই ডি টর্চ বার করে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে যখন দেখছে তখনই আমি একটা নুড়িপাথর দিয়ে লোহার শাটারের ওপর কয়েকবার আস্তে ঠোকা মারলাম। বুধোদা চমকে দরজার দিকে তাকাল। আমি ফিসফিস করে ডাকলাম, বুধোদা…বুধোদা!
বুধোদা দরজার কাছে এগিয়ে এসে ফাটলটায় চোখ রাখল। বিরক্তসুরে বলল, কী হয়েছে?
দীপা তোমাকে ফিরে যেতে বলছে।
বুধোদার দাঁতের কিড়মিড়ানি স্পষ্ট শুনতে পেলাম। রাগে গরগর করতে করতে বলল, ইয়ার্কি মারছিস নাকি তোরা? কেন, ফিরে যেতে বলছে কেন?
আমি শুকনো গলায় বললাম, সেটা কেমন করে জানব? ওকে তো মিস সায়গল অ্যাটিকে আটকে রেখেছেন। অত দূর থেকে কথা বলতে পারছি না। শুধু ইশারায় দেখাচ্ছে তোমাকে যেন ফিরিয়ে নিয়ে যাই।
বুধোদা বলল, তাই হয় নাকি? এতদূর এগিয়ে এসে ফেরা যায়? শোন রুবিক। তোকে কিছুই করতে হবে না। তুই এই দরজার সামনে বসে থাক। বাংলোর দিকে আর যাবারও দরকার নেই, দীপার সঙ্গে কথা বলবারও দরকার নেই। আমি ঘরটায় কী আছে দেখে নিয়েই বেরিয়ে যাচ্ছি। পনেরো মিনিটের বেশি সময় লাগবে না।
বলেই বুধোদা আবার এমন একটা কর্নারের দিকে চলে গেল যেদিকটায় আমার চোখ পৌঁছচ্ছিল না।
জীবনে এই প্রথমবার বোধহয় আমি বুধোদার কথা অমান্য করলাম। আমি ফিরে গেলাম যেখানে দীপা অপেক্ষা করছে।
আমায় দেখতে পেয়েই দীপা আবার খাঁচায় বন্দি পাখির মতন ছটফট করে উঠল। আমি ঘাড় নেড়ে বোঝালাম বুধোদা রাজি হল না। তারপর ওকে ইশারায় দেখালাম, ও যা ভাবছে, তা একটা কাগজে লিখে নীচে ফেলে দিতে। ও করুণমুখে ঘাড় নাড়ল। তার মানে ওই ঘরে কাগজ কলম কিছুই নেই।
কিছুক্ষণ দুজনেই দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
দীপা দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে, ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবছিল। হঠাৎ এক দৌড়ে চলে গেল ঘরের ভেতরে। একমিনিট কেটে গেল, দু-মিনিট। ও কি আর ফিরবে না?
না, ফিরল। ওর হাতে একটা ছোট বই রয়েছে। ও বইটা তুলে আমাকে ইশারা করল জানলার নীচে এসে দাঁড়াতে। আমি জানলার নীচে গিয়ে দাঁড়াতেই ও বইটা হাত থেকে ছেড়ে দিল। আমিও সেটাকে ক্যাচ লুফে নিলাম।
বইটার মলাটে সেলফোনের আলো ফেলেই চমকে উঠলাম। এ যে আমার খুব চেনা বই। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই বাবার হাতে এই বইটাকে ঘুরতে দেখছি। বাবার গলায় শুনে শুনে নিজে পড়তে শেখারও আগে এই বইয়ের অনেক কবিতা আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।
রবি ঠাকুরের ক্ষণিকা।
কিন্তু এই বই নিয়ে এখন আমি কী করব? চোখ তুলে দীপার দিকে তাকালাম। ও হাওয়ায় হাত ঘুরিয়ে পরপর দুটো চার আঁকল। আর কিছু বলবার সময় পেল না। কারণ, আমি নীচ থেকেই দেখতে পেলাম, ওর পেছনে অন্ধকার ঘরে একটা হলুদ আলোর আভা ছড়িয়ে পড়ছে। তার মানে মিস সায়গল দেখতে আসছেন দীপা কী করছে।
দীপা মুহূর্তের মধ্যে জানলা থেকে সরে গেল আর আমিও হাতের মধ্যে ক্ষণিকা বইটা নিয়ে ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে দিয়ে চলে গেলাম বাগানের পেছনদিকটায়, যেখানে বাংলো থেকে আমার ওপরে নজর রাখা যাবে না। তারপর মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে রেখেই ক্ষণিকার পাতা ওলটাতে শুরু করলাম।
মলাটের পরের পাতাতেই গোটা গোটা হাতের লেখায় লেখা—শ্রীমতি শিবানী রায়। দেখেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। মনে হল, কতবছর আগে একজন আদ্যোপান্ত বাঙালি মহিলা অচেনা পরিবেশে, অচেনা লোকজনের মধ্যে থাকতে এসেছিলেন এরকম কয়েকটা বইকে সম্বল করে। হয়তো ছোটনাগপুর মালভূমির এই রুক্ষ পাহাড়ে ঘেরা বাংলোয়, ওই অ্যাটিকের ঘরে বসে, তিনি এই বইটা থেকেই পড়তেন—
মনে পড়ে সেই আষাঢ়ে
ছেলেবেলা
নালার জলে ভাসিয়েছিলেম
পাতার ভেলা।
বৃষ্টি পড়ে দিবস-রাতি,
ছিল না কেউ খেলার সাথি,
একলা বসে পেতেছিলেম
সাধের খেলা।
নালার জলে ভাসিয়েছিলেম
পাতার ভেলা।।
আর পড়তে পড়তে তার চোখ বেয়ে জল গড়াত। তার মনে পড়ে যেত কতদূরে বাগবাজারের একটা জলজমা রাস্তার ধারে বসে তার পাঁচ বছরের খুকিটি হয়তো সেই মুহূর্তেই রাস্তার জমা জলে কাগজের নৌকো ভাসাচ্ছে।
তিনি আর তার মেয়ের কাছে ফিরতেই পারলেন না। এখানেই কোথায় কোন নদীর বালির নীচে কাচের শরীর নিয়ে শুয়ে রইলেন কে জানে!
কাচের শরীর। শব্দদুটো এক মুহূর্তে কবিতার জগৎ থেকে আমাকে ঘাড় ধরে এক ঠান্ডা হিম মৃত্যুর দেশে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল। আমি কেঁপে উঠলাম। হঠাৎই মনে হল, সময় নেই। আর একটুও সময় নেই। দীপা হাওয়ায় পরপর দুটো চার এঁকেছিল। আমি তাই তাড়াতাড়ি পাতা উল্টে পৌঁছে গেলাম ক্ষণিকার ৪৪ নম্বর পাতায়। এই পাতাতেই কি দীপা কোনোভাবে লিখে পাঠিয়েছে বুধোদাকে নিয়ে ওর চিন্তার কারণ?
না তো! ৪৪ আর ৪৫ নম্বর পাতা জুড়ে তো শুধু আমার আরেকটা চেনা কবিতা—বোঝাপড়া।
এটা কিছুই অপূর্ব নয়,
ঘটনা সামান্য খুবই—
শঙ্কা যেথায় করে না কেউ
সেইখানে হয় জাহাজডুবি।
মনেরে তাই কহ যে,
ভালো মন্দ যাহাই আসুক
সত্যেরে লও সহজে।।
কিন্তু এছাড়া আর একটা পেনসিলের আঁচড়ও নেই দুটো পাতার কোনোটায়। তাহলে কি দীপা ইংরিজিতে এইট্টি-এইট বুঝিয়েছিল? দ্রুত পাতা উলটে চলে আসি অষ্টআশি নম্বর পাতায়। উঁহু, সেখানেও তো শুধু পাতাভর্তি ছাপা অক্ষরে আরো একটা প্রিয় কবিতা—’আমি ছেড়েই দিতে রাজি আছি সুসভ্যতার আলোক, আমি চাই না হতে নববঙ্গে নবযুগের চালক। আমি নাই বা গেলেম বিলাত, নাই বা পেলেম রাজার খিলাত, যদি পরজন্মে পাই রে হতে ব্রজের রাখাল-বালক…’
আমি বইটা হাতে নিয়েই উঠে গেলাম স্টুডিও-ঘরের লোহার শাটারের সামনে। সেই ভাঙা ফাটলটায় চোখ লাগিয়ে দেখলাম বুধোদা কী করছে? না, এখনো অবধি তো কোনোরকম বিপদের বি-ও দেখা যাচ্ছে না। বুধোদা কোথা থেকে যেন দুটো প্রমাণ সাইজের ক্যানভাসে আঁকা ছবি খুঁজে বার করেছে। সেই দুটোকে মেঝের ওপরে পেতে, পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসে, মন দিয়ে কী যেন দেখছে।
ওকে পেছনদিক থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম। ওর শরীরেই ছবিদুটো আড়াল হয়ে ছিল। একটু বাদে বুধোদা ছবিদুটোকে ওখানেই ফেলে রেখে উঠে দাঁড়াল। ওরই হাতের টর্চলাইট থেকে কিছুটা আলো ছিটকে ওর মুখে গিয়ে পড়েছিল। সেই আলোয় দেখতে পেলাম ওর কপালে অনেকগুলো ভাঁজ। বুধোদা কিছু একটা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করছে। কীসের চিন্তা?
বুধোদা হঠাৎ একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে মেঝেয় পেতে রাখা ছবিদুটোর ওপরে আলো ফেলল। যেন আরেকবার দেখে নিতে চাইল, যা দেখেছে তা সত্যি কিনা।
এতদূর থেকে ভালো দেখতে পেলাম না। তবে মনে হল দুটো মানুষের মাথা থেকে পা পর্যন্ত সম্পূর্ণ পোর্ট্রেট মেঝের ওপর পড়ে রয়েছে। এরপরেই বুধোদা টর্চ নিভিয়ে দিল। মনে হল ও পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে ঘরের মাঝখানে ওই লোহার প্ল্যাটফর্মটার দিকে। আমিও ঘরের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে আবার ক্ষণিকার চুয়াল্লিশ নম্বর পাতা খুললাম।
কিছুই কি আর নেই ওখানে? সপ্তদ্বীপা কি শুধু শুধু এতটা রিস্ক নিয়ে এতটা রাত অবধি জেগে ছিল? আমি আরেকবার খুব খোলা মন নিয়ে আমার সামনে খুলে রাখা পাতাদুটোর দিকে তাকালাম।
না, রয়েছে তো! এত বেশি স্পষ্টভাবে রয়েছে যে, এর আগে দেখতে পাইনি। ছাপা অক্ষর নয়, হাতে লেখা নয়। রয়েছে একটা ফুল। অনেকেই যেমন বইয়ের ভাঁজে ঠাকুরের ফুল রেখে দেয় তেমনই একটা শুকনো নীল অপরাজিতা ফুল চুয়াল্লিশ আর পঁয়তাল্লিশ নম্বর পাতার ভাঁজে গোঁজা রয়েছে। হয়তো পঞ্চাশ বছর আগে শিবানী রায় নিজেই বইয়ের পাতার ভাঁজে ফুলটাকে রেখে দিয়েছিলেন। বছরের পর বছর ওইভাবে থাকতে থাকতে ফুলটা হয়ে গেছে বিবর্ণ, প্রায় সাদা। অপরাজিতার নীল-রং পাপড়িগুলোকে ছেড়ে বইয়ের পাতায় ছড়িয়ে পড়েছে। পাতার ওপরে আঁকা হয়ে গেছে নিখুঁত এক নীল অপরাজিতা।
হঠাৎ আমার মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ চমকাল। হঠাৎই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল ডাইনি-বাংলোর ছবি আর কাচের মৃতদেহের রহস্য, তাদের সম্পর্ক। আমি শাটারের ভাঙা টুকরোর মধ্যে দিয়ে একবার কেবল ভেতরে তাকিয়ে দেখলাম, বুধোদা লোহার প্ল্যাটফর্মটার ওপরে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে আর সেই ভারী পাথরের স্ল্যাবটা আস্তে আস্তে নেমে আসছে বুধোদার শরীরের দিকে।
আমি বইটাকে কোনোরকমে আমার ব্যাকপ্যাকের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে, জীবনের সেরা হার্ডল রেস শুরু করলাম। দৌড়ের মধ্যেই টপকে গেলাম বাগানের বেড়া। তারপর সেই রক্তলাল ধসের জায়গাটা ধরে কখনো দৌড়ে কখনো গড়িয়ে নীচে নামতে-নামতেই ডাক দিলাম—রঘুদা। গেট রেডি। আমাদের স্টুডিও ঘরে ঢুকতে হবে। বুধোদা মারা যাচ্ছে। অপরাজিতা ফুলের মতন চাপা পড়ে যাচ্ছে বুধোদা।
রঘুদা আমাকে আগে থেকে চিনত বলেই নিশ্চয় আমাকে পাগল ভাবল না। বরং আমি টানেলের মুখে পৌঁছবার সঙ্গে সঙ্গেই ও নিজের ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে তুলে নিয়ে আমার হাত ধরে টানেলের মধ্যে ঢুকে পড়ল।
টানেলের মধ্যে ঢুকেই বুঝতে পারলাম, এই টানেল আর আগের মতন নেই। মৃত টানেল যেন কোনো মন্ত্রের উচ্চারণে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আমাদের পা ভিজিয়ে দিয়ে বইতে শুরু করেছে ঠান্ডা হিম জলস্রোত। মুহূর্তে মুহূর্তে সেই জলের লেভেল বেড়ে উঠছে। প্রথমে যা ছিল হাঁটুজল, কিছুক্ষণের মধ্যেই তা আমাদের বুক অবধি উঠে এল। তার সঙ্গে শুরু হল থরথর করে কাঁপুনি। কোথাও লুকিয়ে-রাখা একটা বিশাল মেশিন চালু হয়ে গিয়েছিল আর তার দাপটে ভিত-সমেত পুরো স্টুডিও-ঘরটাই থরথর করে কাঁপছিল। ভিত মানে এই টানেল, যেটার মধ্যে দিয়ে আমি আর রঘুদা কোনোরকমে উঠে চলেছি স্টুডিও-ঘরের মেঝের ম্যানহোলের দিকে।
জানি না ঠিক কতক্ষণ লেগেছিল আমাদের ওই দুশো-মিটারের টানেলটুকু পেরোতে। তখন তো মনে হয়েছিল অনন্তকাল। আমাদের সামনে কোনো ভালবের বাধা ছিল না। জলকে বেরোনোর রাস্তা করে দেওয়ার জন্যে ভালব তখন আপনা থেকেই খুলে গিয়েছিল। সেইজন্যে কিছুটা সময় বেঁচেছিল। যাই হোক, ম্যানহোলের মধ্যে থেকে হাতের ভরে স্টুডিও-ঘরের মেঝেয় উঠে এসেই দেখলাম এক অদ্ভুত দৃশ্য।
দেখলাম, বুধোদা আগের মতোই চিৎ হয়ে শুয়ে রয়েছে। সেই স্বচ্ছ পাথরের ভারী ব্লকটা একইভাবে মসৃণগতিতে নেমে আসছে। এখন সেটার সঙ্গে বুধোদার শরীরের ব্যবধান বড়জোর তিন-ফুট। কিন্তু এই সবকিছুর সঙ্গে যোগ হয়েছে একটা আলো। হ্যাঁ। তীব্র সবুজ চোখ-ধাঁধানো একটা আলো ছাদের ওই স্কাইলাইট থেকে নেমে এসে ধুইয়ে দিচ্ছে বুধোদার পুরো শরীর। যেন এক আশ্চর্য সার্জিকাল টেবিলের ওপরে শুয়ে রয়েছে বুধোদা। ওর রক্তহীন মুখ সবুজ আলোয় সবুজ হয়ে গেছে।
বুধোদা কি আর বেঁচে নেই? বুধোদা কি মারা গেছে?
আমি সমস্ত গোপনীয়তার চিন্তায় গুলি মেরে প্রাণপণে চিৎকার করে উঠলাম—বুধোদাআআ! তারপরে ওই স্ল্যাবের নীচে কাঁধ ঢুকিয়ে প্রাণপণে চাড় মেরে ওটাকে ওপরের দিকে ওঠাবার চেষ্টা শুরু করলাম। আমার দেখাদেখি রঘুদাও একইভাবে কাঁধ দিয়ে ভারী স্ল্যাবটার অধোগতি আটকাবার চেষ্টা শুরু করল, কিন্তু বৃথা। কয়েক সেকেন্ড কাটতেই বুঝতে পারলাম, আমরা কিছুই করতে পারছি না। ওই ভারী স্ল্যাব যেমন নামছিল তেমনই নামছে। এখন ওটার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটা পোড়া গন্ধ। নতুন রং করা কোনো টিনের পাতকে আগুনের ওপর ধরলে যেমন রং-পোড়ার ঝাঁঝালো গন্ধ ওঠে, সেরকম গন্ধ।
আতঙ্কিত হয়ে দেখলাম, বুধোদার গলা আর মুখের চামড়া থেকে ধোঁয়া উঠছে। আমার গলা কান্না আর রাগে বুজে গিয়েছিল। তবু ওই অবস্থাতেই আবার চিৎকার করে উঠলাম—বুধোদাআআ! যেন আমি চেঁচিয়ে গলা ফাটালেই বুধোদা নেমে আসবে ওই লোহার মৃত্যুশয্যা থেকে।
না, বুধোদা নেমে এলো না ঠিকই। কিন্তু আমার ওই চিৎকারে ওর চোখের পাতাদুটো কাঁপতে কাঁপতে হঠাৎ খুলে গেল। দাঁতের ওপর শক্ত হয়ে বসল দাঁত। মনে হচ্ছিল বুধোদা শরীরের শেষ শক্তি আর চেতনার শেষ বিন্দুটুকু জড়ো করে কী একটা করার চেষ্টা করছে।
কী করার চেষ্টা করছে বুধোদা?
না, কিছু করার চেষ্টা করছে না। কিছু বলবার চেষ্টা করছে। ওর ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে খুব অস্ফুটে দুটো শব্দ বেরিয়ে এল—রুবিক, রুবিক!
স্ল্যাবটার চাপে আমার কাঁধের হাড়গুলো বোধহয় গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল। চোখ তুলে দেখলাম, রঘুদার মুখ ঘামে ভেসে যাচ্ছে। ওর মুখেও যন্ত্রণার ছাপ। খুব বেশি হলে আর দশ কি বারো-সেকেন্ড আমরা এই পাথরের ওজনকে ধরে রাখতে পারবো। তারপর আমাদের তিনজনকেই একসঙ্গে পিষে দিয়ে এই বিরাট ওজন নেমে আসবে লোহার বিছানার ওপরে। তার ফলে কী হবে আমি আর ভাবতে পারছিলাম না। কিন্তু আপাতত বুধোদা আবার একটা কিছু বলছে।
কী বলছ বুধোদা? আমি চিৎকার করে বললাম।
রুবিইইইক! জড়ানো গলায় বুধোদা আমাকে ডাকলো। আমি আরেকটু নিচু হয়ে কানটা বুধোদার মুখের কাছে নিয়ে গেলাম।
রুবিক! জিজো…বকলশ…মানে, মানে, ট্যানড লেদার…। সবুজ আলোকে আটকায়…।
বুধোদার চোখদুটো আবার বুজে গেল।
মাথার মধ্যে ফের বিদ্যুৎ খেলে গেল। এক সন্ধেয় দু-বার। বুধোদা ঠিক বলেছে। কোনো সন্দেহ নেই। ট্যানড লেদার জিনিসটা নিশ্চয়ই ওই অদ্ভুত সবুজ আলোকে প্রতিহত করে। আটকে দেয় তার রং শুষে নেওয়ার কাজ।
আমি জানি, বুধোদার মাথায় কোথা থেকে এই চিন্তাটা এসেছে। জিজোর মৃতদেহ থেকে। সেই পোষা কুকুরটার গলায় নিশ্চয় চামড়ার কলার পরানো ছিল। সেইজন্যেই ওর পুরোদস্তুর কাচের মূর্তির গলায় কাচের বদলে লোমের ব্যান্ড। ওই জায়গাটুকুতে সবুজ আলো থাবা বসাতে পারেনি।
আমি কোনোরকমে লোহার প্লাটফর্মের নীচে জড়ো করে রাখা মোটা চামড়ার চাদরগুলোর মধ্যে থেকে একটাকে পা দিয়ে টেনে বার করলাম। পায়ের আউট-স্টেপের একটা জোরালো লাথিতে সেটাকে উড়িয়ে দিলাম হাওয়ায়। তারপর হাওয়াতেই সেটাকে বাঁ-হাতে ক্যাচ লুফে নিয়ে পেতে দিলাম বুধোদার পুরো শরীরের ওপরে।
সঙ্গে সঙ্গে দুটো অদ্ভুত কাণ্ড হল। পাথরের স্ল্যাবটা দ্রুতগতিতে উঠে গিয়ে লোহার চালের গায়ে আটকে গেল। নিভে গেল স্কাইলাইটের অলৌকিক সবুজ আলো। আর এতক্ষণ ধরে যে মেশিন চলার শব্দে ঘরটা থরথর করে কাঁপছিল সেটাও বন্ধ হয়ে গেল।
অন্তহীন নৈঃশব্দ্যের মধ্যে তখন শুধু মেঝের নীচের খালি ট্যাঙ্কের ভেতর তিরতির করে ঝোরার জল পড়ার শব্দ। আবছা অন্ধকারের মধ্যে আমি আর রঘুদা চুপ করে দাঁড়িয়ে তাই শুনছিলাম। আমাদের বুকের থেকে একটা পাথর নেমে গেছে, কারণ জলের শব্দ ছাড়াও আরো একটা শব্দ তখন বেশ পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিলাম। সেটা হল বুধোদার স্বাভাবিক নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। পোড়া গন্ধটাও আর পাচ্ছিলাম না।
একটু বাদে বাগানের দিকের দরজাটায় চাবি ঘোরানোর আওয়াজ পেলাম। দরজা খুলে গেল। সৌর লন্ঠনের সাদা আলোয় ভরে উঠল ঘর। আলো নিয়ে আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছিলেন মিস সায়গল, কিন্তু এক দৌড়ে তাঁকে অনেকটা পেছনে ফেলে বুধোদার মুখের ওপরে ঝুঁকে পড়ল সপ্তদ্বীপা। ঠিক তখনই বুধোদা চোখ খুলে তাকাল। মাথাটা দুদিকে দুবার ঝাঁকিয়েই আস্তে আস্তে পা ঘুরিয়ে নেমে পড়ল লোহার প্ল্যাটফর্ম থেকে।
দীপা দুহাত দিয়ে চোখ থেকে যেটা মুছছিল, সেটাকেই নিশ্চয় ওর বাংলার টিচার রঞ্জনা-ম্যাম ‘আনন্দাশ্রু’ বলে থাকেন। ওই অবস্থাতেই আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি খুব ভালো চিৎকার করতে পারো রুবিকদা! ভাগ্যিস চেঁচিয়েছিলে। না-হলে মোতিদিদা তো জানতেই পারতেন না, এমন বিপদ হয়ে গেছে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন? তুমি ওনাকে বলোনি, আমরা যে এদিকে এসেছি?
ও বলল, না। আমি ভেবেছিলাম, তোমরা রহস্য-টহস্য উদ্ধার করে ঠিকঠাক বেরিয়ে আসতে পারবে। বিশেষ করে যখন জীবন্ত ছবি আর মৃত পুতুলের সম্পর্কটা তোমাকে বুঝিয়েই দিয়েছি।
ওর পাশে পাশে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বললাম—আমাকে …ইয়ে…আমাদের আগে ওই ছবি আর মূর্তির রিলেশনের কথাটা বললে না কেন?
কেমন করে বলব? আমি নিজেই তো ব্যাপারটা ধরতে পারলাম আজ সন্ধেবেলায়, যখন মোতিদিদা অলটারের যিশুমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন—আরো একটা ছবি আমার গ্যালারিতে জমা হল প্রভু। ভিসুক পাহানের ছবি। নিজে হাতে পাহাড় থেকে গড়িয়ে ফেললাম ভিসুকের মতন একটা গরিব লোকের ডেডবডি। এ পাপ আমি কোথায় রাখব?…এরপর আর কিছু বুঝতে বাকি থাকে, বলো?
তারপর দীপা হঠাৎ আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, আচ্ছা রুবিকদা, তুমি বইয়ের মধ্যে ফুলের ব্যাপারটা ধরতে পেরেছিলে তো?
আমি বললাম, মাল্যবান মিত্র অত বোকা নয়।
