অ্যান্টিক আতঙ্ক
কুকড়াঝোরার নেকড়েমানুষ
খুনি ম্যাজিক

অ্যান্টিক আতঙ্ক – ৩

তিন

ঘণ্টাখানেক চলবার পর আমরা হাইওয়ে ছেড়ে জঙ্গলের নুড়িপাথরের রাস্তায় ঢুকে পড়লাম। সঙ্গে সঙ্গেই কে যেন আকাশের হাজার-ওয়াটের রোদ্দুরটার ওপরে একটা শ্যাওলারঙের ল্যাম্পশেড পরিয়ে দিল। আকাশছোঁয়া শাল মহুয়ার গাছের নীচ দিয়ে একটা সবুজ সুড়ঙ্গের মতন এঁকেবেঁকে চলল রাস্তা। জঙ্গলের সেই খুব পরিচিত সোঁদা সোঁদা, বুনো বুনো গন্ধটা নাকে এসে ঝাপটা মারল আর চারিদিকের মাইল-মাইল নৈঃশব্দকে চতুর্গুণ বাড়িয়ে দিয়ে একটা মাত্র কাঠঠোকরা কোন গাছের ডালে বসে যেন শব্দ তুলতে শুরু করল ঠক ঠক, ঠক ঠক।

আরও ঘণ্টাখানেক চলার পরে হঠাৎই জঙ্গল ভেদ করে আমরা একটা সরু কিন্তু খরস্রোতা নদীর ধারে এসে পৌঁছলাম। গাড়িটাকে একটা বড় চিকরাশি গাছের নীচে পার্ক করে রেখে রঘুদা ডানদিকের দরজা খুলে লাফ মেরে নেমে পড়ল। বলল, ব্যস, গাড়ির দৌড় এই অবধিই। এই নদীটার নাম টুরা। আমরা এটাকে পেরোব বোল্ডার থেকে বোল্ডারে লাফ মেরে। গাড়ি তো ওইভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে পেরোতে পারবে না। চলে এসো বোধিসত্ত্ব! রুবিক, আয়।

আমরা তিনজনেই পিঠে রাকস্যাক ঝুলিয়ে নিলাম। ওর মধ্যেই রইল অন্তত দুটোদিন কাটাবার মতন খাবারদাবার আর পোশাকআশাক। বুধোদার রাকস্যাকের মধ্যে যে রিভলবার আছে সেটা জানি। আর রঘুদা ওর চিরসঙ্গী কোবরেজি ওষুধের ঝোলাটাকে আমাদের চোখের সামনেই চেপেচুপে ওর স্যাকের ভেতরে ঢুকিয়ে নিল।

হাঁটা শুরু করেই রঘুদা বলল, একটা কথা আগেই বলে দিই। লোহুরঙে বিদ্যুৎ আছে। কিন্তু পাহাড়ে ঘেরা বলেই কিনা জানি না, মোবাইলের টাওয়ার পাওয়া যায় না। নেটের কানেকশনও নেই।

নদীর উল্টোদিকে একসারি বড় গাছ দেয়ালের মতন দাঁড়িয়ে ছিল। ওই দেয়ালটা পেরোতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল লোহুরঙ গ্রাম। একটা গাছে ছাওয়া ছোট টিলার পায়ের কাছে তিরিশ চল্লিশটা পাতার কুটির।

কুটিরগুলোর চেহারা আমাদের বাংলার চেনা কুঁড়েঘরের মতন নয়। এখানে ইট, কাঠ, খড়, মাটির কোনো গল্প নেই। শুধু শুকনো পাতা দিয়ে গড়া টোপরের মতন কিছু স্ট্রাকচার। একদিকে একটা ফাঁক, সেটাই ঢোকার দরজা। জানলা বলতেও কিছু নেই। রঘুদা বলল, এগুলোই নাকি বীরহোরদের ট্র্যাডিশনাল ঘরের নমুনা—হয়তো কুড়িহাজার বছরেও যা এতটুকু পালটায়নি।

গ্রামের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম ঠিকই। কিন্তু ওই টিলাটার দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। টিলাটা বড়জোর সাত-আটশো ফিট উঁচু হবে। এমনিতে পুরোটা সবুজ ঘাস আর এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে থাকা গাছে ছাওয়া। শুধু চূড়া থেকে মাঝামাঝি অবধি একটা বড়সড় ফুটবল মাঠের সাইজের জমির ওপরের নরম মাটির স্তর ধসে ধুয়ে গেছে। বেরিয়ে এসেছে নীচের কাঁকর আর পাথর। আর সেই কাঁকর পাথরের সে কী রং! এত লাল যে কোনো পাথর হতে পারে তা আমি জানতাম না। মনে হচ্ছে যেন বলিদানের থকথকে তাজা রক্তে ভেসে যাচ্ছে পুরো ন্যাড়া জমিটা। রঘুদা ঠিকই বলেছিল, জমিটার আকৃতি ঠিক মানুষের জিভের মতন। ওপরটা চ্যাটালো। দুটো প্রান্ত নীচের দিকে গোল হয়ে মিশে গেছে। কাজেই দূর থেকে মনে হচ্ছে একটা বিশাল রক্তমাখা জিভ টিলার মাথা থেকে ঝুলে পড়েছে।

চোখ কুঁচকে কিছুক্ষণ টিলার মাথার দিকে তাকিয়ে থেকে বুধোদা হঠাৎ বলল, আচ্ছা, ওই জিভের মতন জায়গাটার একেবারে ডগায়, মানে ধস-টা যেখানে শুরু হয়েছে, ওখানে গাছপালার ফাঁক দিয়ে মাঝে-মাঝে রোদের রিফ্লেকশন দেখতে পাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে। ওই যে, চুড়োটার একটু নীচে।

রঘুদা বলল, ঠিকই দেখেছ। ওটাই হচ্ছে ডাইনি-বাংলো। বীরহোরদের কুঁড়ের মতন পাতার তৈরি নয়। একদম ইট, কাঠ, পাথরের তৈরি সলিড ব্রিটিশ আমলের বাংলো। বাংলো ঘিরে যে টানা বারান্দা সেটা পুরোটাই কাচের জানলা দিয়ে ঢাকা। তুমি যেটা দেখছ, সেটা ওই কাচের জানলার ওপরে আলোর ঝলক। আমি আগের বারেই কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দেখে এসেছিলাম। চলো, এবার তো আমাদের ওখানে যেতেই হবে। তখন সবকিছুই আরও ভালো করে দেখবে।

একটু পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম লোহুরং গ্রামের ঘরগুলোর কাছাকাছি। সঙ্গে-সঙ্গেই সাত-আটটা বাঘের মতন কুকুর কোথা থেকে যেন উদয় হয়ে তারস্বরে চিৎকার করতে-করতে আমাদের ঘিরে ধরল। ভাগ্যিস তাদের চিৎকারে তাদের মালিকেরাও সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এল। তাই সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম। আমাদের ঘিরে ধরল অন্তত জনা কুড়ি নারীপুরুষ। ছেলে-বুড়ো সবারই পোশাক, রঘুদা শঙ্কু পাহানের পোশাকের যে ডেসক্রিপশন দিয়েছিল, সেইরকম। মেয়েরা পরেছিল একধরনের মোটা কাপড়ের সাদা শাড়ি। ছেলে মেয়ে সকলেরই গলায় কানে নানারকমের পাথর আর পেতলের রঙচঙে গয়না শোভা পাচ্ছিল। এত শীতেও কারুর গায়ে ছেঁড়া কাঁথা ছাড়া অন্য কোনো গরমজামা দেখলাম না।

ওদের মধ্যে থেকেই একজন যুবক যেভাবে দৌড়ে এসে রঘুদার হাতদুটো জড়িয়ে ধরল, তাতে সন্দেহ রইল না যে এই সেই শঙ্কু পাহান। শঙ্কুর পেছনেই একটা ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে একটা মেয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ওই নিশ্চয় শঙ্কুর বউ আর ওর কোলের বাচ্চা মেয়েটা টুসাই—যাকে রঘুদা সারিয়ে তুলেছে।

শঙ্কু আর অন্যান্য কয়েকজন বৃদ্ধ, যাঁরা নিশ্চয় গাঁয়ের মোড়লই হবেন, তাদের সঙ্গে রঘুদা অনেকক্ষণ অবোধ্য ভাষায় কী যেন আলোচনা করল। তারপর আমার আর বুধোদার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, এনারা কিছুতেই আমাদের ডাইনি-বাংলোয় যেতে দিচ্ছিলেন না, বুঝেছ। কোনোরকমে একগাদা মিথ্যে কথা বলে রাজি করালাম। বললাম, তুমি হচ্ছ ডাইনিদের অন্ধ ভক্ত। যেখানেই ডাইনির খবর পাও সেখানেই তাদের পায়ে মাথা ছোঁয়াতে যাও।

বুধোদা তাই শুনে দুটো হাত আকাশের দিকে তুলে, ডাইনি বাংলোর দিকে তাকিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠল,—’বম মহাদেব ধুস্তুরস্বামী, দস্তুরমতো প্রস্তুত আমি।’

বীরহোরদের মধ্যে কেউ বাংলা জানে না, পরশুরামের ধুস্তুরীমায়া গল্পটাও পড়েনি। তাই তারা সেই ভয়ঙ্কর ভক্তির প্রকাশ দেখে প্যান্টশার্ট পরা নবীন সাধকের কাছ থেকে একটু দূরে হটে গেল আর আমি হাসি চাপবার জন্যে প্রাণপণে লগারিদমের ফর্মুলা আওড়াতে লাগলাম।

যাই হোক, মোদ্দা কথা হচ্ছে সেদিন, চব্বিশে জানুয়ারি বেলা এগারোটার সময় আমরা তিনজন লোহুরঙের ডাইনি-বাংলোর বন্ধ দরজায় কড়া নাড়লাম। দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন একজন শ্বেতাঙ্গিনী মহিলা, যাঁর বয়স ষাটের বেশ কিছুটা ওপরে।

ছোটখাটো ঘরোয়া চেহারা। একটা ফুলছাপ গাউন পরে আছেন। কাঁধের ওপর দিয়ে ঝোলানো রয়েছে হালকা উলের চাদর। পিঠের ওপর লুটিয়ে পড়া চুলগুলো এককালে নিশ্চয় পুরোপুরি সোনালি ছিল, এখন অনেক জায়গায় বয়সের ধূসর ছোপ ধরেছে। ওনার ভারী দুই চোখের পাতা কিছুটা নেমে এসে চোখের সাদা অংশকে ঢেকে রেখেছিল আর সেইজন্যেই মনে হচ্ছিল উনি যেন একটা স্বপ্নের ঘোরে ডুবে রয়েছেন। চোখের তারা ঘন কালো। মোটকথা আমাদের কল্পনার ডাইনির সঙ্গে কোথাওই কোনো মিল পেলাম না।

আমাদের মতন তিনজন অপরিচিতকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভদ্রমহিলা স্বাভাবিকভাবেই অবাক হলেন। অবাক গলাতেই প্রশ্ন করলেন—ইয়েস, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?

বুধোদা সঙ্গে-সঙ্গেই অমায়িক হেসে করমর্দনের জন্যে মহিলার দিকে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল এবং নিজের পরিচয় দিল—বোধিসত্ত্ব মজুমদার। অ্যান্টিক হান্টার। তারপর মহারাজা কালেকশনস-এর লোগো ছাপানো ভিজিটিং কার্ডটা ওনার দিকে বাড়িয়ে ধরল। মহিলা হাত বাড়িয়ে কার্ডটা নিলেন এবং চোখের কাছে ধরে পুরোটাই পড়লেন। খেয়াল করলাম, ওনার মুখে গভীর আগ্রহ ফুটে উঠল। উনি মুখ তুলে ইংরিজিতেই বললেন, আসুন জেন্টলমেন, ভেতরে আসুন।

আমরা বারান্দার লাগোয়া প্রথম ঘরটাতে বসলাম। পুরো বাংলোটাই যেমন কাঠের দেয়াল, টিনের ছাদ দিয়ে বানানো, এই ঘরটাও তার ব্যতিক্রম নয়। মেঝেয় পুরু কার্পেট। দেয়ালে শম্বরের শিং আর চিতাবাঘের ছাল। এক কোণে পাথরের ফায়ারপ্লেস। সব মিলিয়ে টিপিকাল সাহেবি বাংলো। তবে সবকিছুর ওপরেই সময়ের পুরু সর পড়েছে। একশো বছর সময়টা তো কম নয়।

মেমসাহেব আমাদের বসিয়ে রেখে লাগোয়া কিচেনে ঢুকলেন। তারপর সেখান থেকে তিনটে কাটগ্লাসের পাত্রে কমলালেবুর সরবত নিয়ে এসে আমাদের সামনে সেন্টার-টেবলের ওপরে নামিয়ে রাখলেন। বুধোদা ওর গ্লাসটা হাতে তুলে নিয়ে একটু ঘোরাতেই সেটার ভেতর দিয়ে হাজারটা কমলা আলোর রশ্মি প্রতিসরিত হল। রত্নপাথরের মতন ঝলমল করে উঠল গোটা পাত্রটাই। বুধোদা মুগ্ধগলায় বলে উঠল— হ্যাম্পশায়ার। প্রোব্যাবলি উনিশশো দশ কিংবা কুড়ির মেক।

বুধোদার কথার পিঠে-পিঠেই আমাদের সবাইকে যাকে বলে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দিয়ে সেই মেমসাহেব বিশুদ্ধ হিন্দিতে মন্তব্য করলেন—সাব্বাশ! কেয়া জানকারি হ্যায় ভাইসাব!

আবারও উনি প্রশংসার সুরে বলে উঠলেন—আপকা আন্দাজ বিলকুল সহি হ্যায়। ইয়ে ডিকান্টার হ্যাম্পশায়ারমেই বনা হুয়া হ্যায়। হ্যাম্পশায়ার, ব্রিটেন।

তারপরেই আমাদের তিনজনের হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি ছোট্ট করে কপাল চাপড়ালেন। হিন্দিতেই বললেন, দেখেছ? নিজের পরিচয়টা যদি ভদ্রলোকের মতন প্রথমেই দিয়ে রাখতাম তাহলে আপনারা এতটা অবাক হতেন না। আমি টিমোথি। মিস টিমোথি হেবার্ড সায়গল। বাবার নাম লেট প্যারিমোহন সায়গল। আমাদের দেশ পাঞ্জাবের লুধিয়ানায়। উনিশশো-চল্লিশ সালে আমার বাবা প্যারিসে ছবি আঁকা শিখতে গিয়েছিলেন। ওখানেই বিয়ে করেছিলেন এক ব্রিটিশ নার্স, লিজা হেবার্ডকে। আমি সবদিক থেকেই মায়ের চেহারা পেয়েছি। বুঝতেই পারছেন হিন্দিটা বাবার কাছ থেকেই শিখেছিলাম।

আপনার পূর্বপুরুষেরা কোন পেশার লোক ছিলেন মিস সায়গল? বুধোদা প্রশ্ন করল।

মিস সায়গলকে দেখে মনে হল, উনি কথা বলতে পেরে খুশিই হচ্ছেন। গড়গড় করে বলে চললেন—আমার দাদু লেট জানকীনাথ সায়গল ছিলেন টিম্বার-মার্চেন্ট এবং সিভিল কন্ট্রাকটর। জামসেদপুর থেকে তিনি কোটি-কোটি টাকার ব্যাবসা চালাতেন, বেশিরভাগ লেনদেনটাই ছিল টাটা স্টিল প্ল্যান্টের সঙ্গে। লোহুরঙে এই প্রপার্টিটা আসলে ছিল দাদুর কারখানা।

কারখানা? কিসের কারখানা?

আমার তো অত টেকনিক্যাল-নলেজ নেই, তাই সঠিক বলতে পারব না। তবে শুনেছি বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিতে একরকমের লেদার, মানে চামড়ার ফিল্টার লাগে। চামড়ায় যে খুব সূক্ষ্ন ছিদ্রগুলো থাকে সেগুলোই ছাকনির কাজ করে। ঠিকঠাক মাপে এই ফিল্টার বানানো মুখের কথা নয়। একশো বছর আগে সব লেদার-ফিল্টারই জার্মানি থেকে তৈরি করিয়ে আনতে হত, অথচ তার কাঁচামাল, মানে চামড়া যেত ইন্ডিয়া থেকে। দাদু দেখলেন, যদি জিনিসটা এখানেই তৈরি করিয়ে নিতে পারেন তাহলে দাম পড়বে অর্ধেক। হিসেবে ভুল ছিল না। লোহুরঙের কারখানায় তৈরি হওয়া ফিল্টার তো একসময়ে উনি রাশিয়ায় এক্সপোর্ট অবধি করেছিলেন।

দাদু যে পরিমাণ সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন তাতে বাবার আর কিছু করার প্রয়োজন ছিল না। তিনি ছিলেন শিল্পী মানুষ। ব্যবসা জিনিসটা ধাতে সইত না। বাবা তাই সারাজীবন নিজের নানান শখ নিয়ে মেতেছিলেন। সবচেয়ে বড় শখ তো ছিল পেন্টিং। তাছাড়া ফোটোগ্রাফির শখ ছিল। শিকারের শখ ছিল। নানা ধরনের বিদেশি গাড়ি কিনতেন আবার কিছুদিন চালিয়ে বিক্রিও করে দিতেন। একেবারে প্রিন্সের মতন লাইফ-স্টাইল ছিল আমার বাবার।

জানতে পারলাম, অল্প বয়সে আপনি তিনবছর এখানে কাটিয়ে গিয়েছিলেন। কেন জানতে পারি কি? বুধোদা খুব বিনয়ী ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল।

মিস সায়গলের মুখটা ম্লান হয়ে গেল। উনি বললেন, খুব হ্যাপি ফ্যামিলি ছিল আমাদের, জানেন মিস্টার মজুমদার! কিন্তু হঠাৎ মাত্র তিনদিনের জ্বরে মা মারা গেলেন। তারপরেই বাবার মাথাটা গোলমাল হয়ে গেল। আমাদের সাসেক্সের ওই বাড়িতে মায়ের শূন্যতা উনি সহ্য করতে পারছিলেন না। তাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে উনি এই লোহুরঙের বাংলোয় চলে আসেন। এখানেই পেছনের বাগানে নিজের স্টুডিও বানিয়ে নেন। সারাদিন বাড়ির থেকে সম্পূর্ণ ডিট্যাচড সেই স্টুডিওর মধ্যে দরজা বন্ধ করে ছবি আঁকতেন। মাঝে-মাঝে বন্দুক আর ক্যামেরা নিয়ে জঙ্গলে যেতেন। কখনো খরগোশ টরগোশের মতন ছোটখাটো জন্তু শিকার করে আনতেন ঠিকই তবে বেশিরভাগ সময়েই শিকারের বদলে ক্যামেরায় ছবি নিয়েই ফিরতেন।

ভদ্রমহিলার গলার স্বর আর বলার ভঙ্গি এত সুন্দর যে, আমরা তিনজনেই ওনার কিশোরীবেলার দুঃখের কাহিনির মধ্যে মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম। ডাইনি-টাইনির ব্যাপারে ওনাকে জড়িয়ে যে কিছু ভেবেছিলাম সেটা ভেবেই তখন লজ্জা লাগছিল।

রঘুদা জিগ্যেস করল, আপনার সময় কাটত কীভাবে?

আমার একজন গভার্নেস ছিলেন। তার নাম ছিল শিবানী রায়। আপনাদের মতনই বাঙালি, কলকাতায় বাড়ি ছিল। শিবানীদিদি খুব ভালোবাসতেন আমাকে।

শিবানী রায়ের কথা বলতে গিয়ে মিস সায়গলের মুখে বিষাদের ছায়া পড়ল। হয়তো অনেক পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে গিয়েছিল।

কিছুক্ষণ আমরা সকলেই চুপ করে বসে রইলাম। তারপরে বুধোদা জিগ্যেস করল, তিনবছর বাদে ফিরে গেলেন কেন? কোথায় ফিরলেন?

মিস টিমোথি সায়গল দুদিকে মাথা নাড়লেন। বললেন সেটাও একটা বিটার মেমরি। মনে রাখতে চাই না। তবু এতবছর পরেও আমাকে হন্ট করে বেড়ায়। আমার গভর্নেস, সেই শিবানী রায় মারা গিয়েছিলেন। ন্যাচারাল ডেথ। তখন এদিকে জাঙ্গল-ম্যালেরিয়ায় বহু লোক মারা যেত। শিবানী রায়ের বাড়ির লোকেরা ব্যাপারটা বুঝেছিলেন, তারা কিছু বলেননি। কিন্তু ওই নীচের গ্রামের লোকেরা আমাকে…ভাবতে পারেন…আমাকে ডাইনি বলে দেগে দিয়েছিল। কয়েকদিনের মধ্যেই অবস্থা এমন হল যে, আমি আর বাবা ভয় পেয়ে গেলাম—ওরা হয়তো সুযোগ পেলে আমাকে আগুনে পুড়িয়ে কিংবা পাথর ছুড়ে মেরে ফেলত। আমরা তখন আবার ইংল্যান্ডেই পালালাম।

তারপর?

তিনবছর আগে বাবা মারা গেলেন, অ্যাট দা এজ অফ নাইনটি। ইতিমধ্যে আমরা খুব গরিব হয়ে গিয়েছিলাম। দাদুর রেখে যাওয়া টাকা, তা সে যতই বেশি হোক না কেন, একসময় তো ফুরোত। ফুরিয়েও গিয়েছিল। তাই সাসেক্সের বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে ডাউন-টাউনের একটা ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করলাম। বাড়ি বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছিলাম তাই দিয়ে কোনোরকমে আমার চলছিল।

এইসময়েই একটা ঘটনা ঘটল।

সেই পঞ্চাশবছর আগে লোহুরঙে থাকার সময়ে বাবা কিছু লাইফ-স্টাডি করেছিলেন। তেলরঙ দিয়ে এঁকেছিলেন এখানকার জঙ্গলের ছোট ছোট জীবজন্তুর ছবি। সেরকম একটা ছবি আমার কাছে এতবছর এমনিই পড়েছিল। সেটা ছিল একটা মনগুজের ছবি। আপনারা মনগুজ-কে কী বলেন?

বেজি।—রঘুদা জলদি উত্তর দিল।

হ্যাঁ, সেই বেজির ছবিটা আমার এক আর্ট লাভার বন্ধুর চোখে পড়ে যায়। তিনি ছবিটা অকল্পনীয় দাম দিয়ে কিনে নেন। উনিই বলেছিলেন ওটা নাকি অমূল্য, ওরকম জীবন্ত ছবি পৃথিবীতে নাকি আর দুটি নেই।

কিন্তু আমি জানতাম, রয়েছে। রয়েছে এই লোহুরঙের বাংলোয়, বাবার তালাবন্ধ স্টুডিওর মধ্যে।

আমি ওগুলো নেবার জন্যেই আবার পঞ্চাশ বছর বাদে ফিরে এলাম। থ্যাঙ্ক গড, আমি খুঁজেও পেয়েছি বাবার সেই ছবিগুলো। এত বছরেও সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়নি। এবার হয়তো আমি ওগুলো বিক্রি করে বাকি জীবনটা একটু স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে কাটাতে পারব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *