কালীগুণীন এবং ভস্মাসুরের শাপ

কালীগুণীন এবং ভস্মাসুরের শাপ

(পর্ব-১)

অবশেষে সেইদিন বিষ্ণুচরণ তার অবাধ্য, বাউন্ডুলে ভাইয়ের প্রতি হাড়ে হাড়ে চটে গেল। না, কোনও বিষয় সম্পত্তিগত মামলা মোকদ্দমা বা ঝগড়াঝাঁটির ব্যাপার নয়, বরং কারণটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। হিসেবী বিষ্ণুচরণ চাইতো যে তার ভাই তার বিষয়সম্পত্তির কিছু অংশ দেখাশুনা করুক, সংসারে সময় দিক, কিন্তু ভাগ্যের দোষে তার ভাইটির স্বভাবচরিত্র ছিল পুরোপুরি বিপ্রতীপ। নানান সংসর্গে দিনের পর দিন বাড়ির বাইরে রাত কাটানো থেকে শুরু করে সব সাংসারিক আচার অনুষ্ঠানেই সে অনুপস্থিত। উদাসীন।

এ নিয়ে বিষ্ণুচরণকে কথাও কম শুনতে হয়নি। এই উৎশৃঙ্খলকে শৃঙ্খল পরাবার মানসে বিষ্ণুচরণ ভাইকে একটি বিবাহ দিয়েচিল সকাল সকাল। তাতে ফল হলো এই যে বাড়িতে একজন সদস্য বৃদ্ধি পেলো, কিন্তু তাতে সেই বাহিরমুখো ভাইটির হুটপাট বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া রোধ করা গেল না।

আগামী কাল শীতলগঞ্জে বিষ্ণুচরণের শ্বশুরবাড়িতে পৌষকালীর পূজা। তাঁর বাড়ির সকলের নিমন্ত্রণ সেইখেনে। শ্বশুরমশায় বিশ্বনাথবাবু বারংবার সনির্বন্ধ অনুরোধ করেচেন যে বিষ্ণুচরণের গৃহের সক্কলকে নিয়ে তাঁর পূজায় আসতেই হবে। ভাতৃবধূ বর্তমানে রয়েচে তাঁর পিতৃগৃহে, কিন্তু বাকিদেরকে বিষ্ণু সেই মর্মে আদেশ দিয়ে রেখেচিল, অথচ দুপুরকালে যখন জুড়িগাড়ি প্রস্তুত হয়ে সবাই রওয়ানা দিতে যাচ্চে, সেইসময়ে একদল ছেলেছোকরা কাঁচুমাচু মুখে ছোটবাবুর ঘরে এসে কীসব যেন জানালো আর তৎক্ষণাৎ তাদের ছোটবাবু একবস্ত্রে তাদের সাথে হনহনিয়ে বেরিয়ে চলে গেল।

বিষ্ণুচরণ ক্রোধে হতবাক হয়ে প্রথমে কোনও কথাই কইতে পারল না, কিন্তু সম্বিৎ ফিরে পেয়েই রাগে ফেটে পড়ল। বিষ্ণুর স্ত্রী সূর্যমুখী স্বামীর ক্রোধ প্রশমিত করার জন্যে বললে—“আহা, তুমি খামোখা চটে যাচ্চ কেন গা। বাঁদরটা তো চিরকাল ঐরকমই। জানই তো। ও তো কয়ে গেল যে দিনকতকের মধ্যেই কাজ মিটিয়ে শীতলগঞ্জে হাজির হবে।”

— “হাজির হবে? হাজির হবে, তাই না? বড়ো ভাইয়ের কথার মূল্য যে বাউন্ডুলে হতভাগার কাছে এক কপর্দকের সমানও নয়, যে এত করে বলা সত্ত্বেও ঠিক ছন্নছাড়ার মতো বনের মোষ তাড়না করতে বেরিয়ে পড়ল, সে কিনা আপনিই হাজির হবে তোমার বাপের বাড়ি? ওসব ছেলেভুলানো বাক্যিতে তুমি সান্ত্বনা পেতে পারো সরযূ, আমি নয়। তোমার প্রশ্রয় পেয়েও ও অনেকখানি বেড়েছে, সেও আমি অবিদিত নই। লোকমুখে খবর পেয়েচি স্বদেশীদের সাথেও ওর মেলামেশা রয়েছে। আচ্ছা… এইবারে কাজ মিটিয়ে ফিরি। তারপর একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়চি।”

সূর্যমুখী শঙ্কিত হয়ে সহিসকে গাড়ি ছাড়বার আদেশ দিল।

গাড়ি ছড়ছড় শব্দে এগিয়ে চলল শীতলগঞ্জের পানে, তাদের ভাগ্যে কী ভয়ঙ্কর দুর্যোগ ওৎ পেতে রয়েচে তা না বুঝেই….।

*

শেতলগাঁয়ের পৌষের কালীপূজা বেশ বিখ্যাত। প্রাসাদের ছাতে রাখা তিনশত বৎসরের প্রাচীন লৌহ নির্মিত কামানের থেকে এখনও পূজা শুরুর সময়ে আনন্দের প্রতীক হিসেবে তিনবার গোলা বর্ষণ করা হয়, আর সেই তোপধ্বনি দিয়ে শুরু হয় মন্ত্রোচ্চারণ। বিশ্বনাথের বাড়িতে স্ত্রী জীবিত নেই, কিন্তু কেবলমাত্র কর্মচারীরা আর পরিচারকরা মিলেই ঘরে অন্ততঃ ত্রিশজনা লোক। এইবারে দুইখানি জুড়িতে চেপে এসে পৌঁছুলো বিষ্ণুরা ছয় সাতজন। সেই সঙ্গে অসংখ্য গাঁয়ের মানুষেরা। সকাল থেকে হৈচৈ আর কোলাহলের মধ্যে দিয়ে পূজার আয়োজন সম্পন্ন হয়ে এল।

রাত্তির তখন আন্দাজি প্রথম ভাগ শুরু হয়েচে। গোটা গাঁয়ের লোক রাত জেগে আনন্দে মেতে রয়েচে। পুরোহিত পূজায় বসবার প্রস্তুতি নিয়ে অষ্টোত্তর-শত প্রদীপে সবে আগুন দিয়েচে, এমন সময়ে ভিড়ের মধ্যে একটা বিশৃঙ্খলা লক্ষ্যিত হলো। উপস্থিত মানুষেরা যেন চঞ্চল হয়ে উঠে ভিড়ের থেকে সামান্য সরে দাঁড়ালো, আর ভিড় ঠেলে সুমুখে এসে দন্ডায়মান হলো এক ভয়ংকর হিংস্র দর্শন তান্ত্রিক।

কাপালিকের নাম চন্ড। দশাসই চেহারা। কপালে সিন্দুরের স্থূল রক্তবর্ণ ললাট টীকা, গলায় জ্বলজ্বলে লাল মটরদানার মালা, হস্তে একখানা ঊরুর হাড়, কানে কুন্ডল, ঝাঁকড়া চুল। একঝলক দেখলেই আতঙ্ক উপস্থিত হয়। অধিক সময় চেয়ে থাকা যায় না। চোখে খেলা করচে শয়তানি কুটিলতা। মুখ জুড়ে যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতি উদগ্র তাচ্ছিল্যের ভাব।

উপস্থিত সকলেই বিস্মিত হয়ে গিয়েচিল। বিশ্বনাথ তড়িঘড়ি নিজের আসন ত্যাগ করে কইলেন— “আজ্ঞা, আপনি…”

তান্ত্রিক ঘড়ঘড়ে কণ্ঠে উত্তর দিল— “আমি চন্ড তান্ত্রিক। আবার কাপালিকও বটে। বহু বৎসর বনে পাহাড়ে সাধনা করে বেড়িয়েচি। সঙ্গমে যাবার পথে আজ তোদের গাঁয়ে আশ্রয় নিয়েছি।”

— “আজ্ঞা, আমাদের গাঁ ধন্য হলো আপনার মতো মহৎ ব্যক্তির পদধূলিতে। দয়া করে আসন গ্রহন করুন।”

কাপালিক কিন্তু বসলো না। বিশ্বনাথের দিকে তীক্ষ্ণ চক্ষে চেয়ে সে বলল— “আমার ইচ্ছে এই যে আজকের এই মহামায়ার পূজা আমি নিজের হাতে করবো। এর জন্য যা যা আবশ্যক সেসব জোগাড় করে দিতে হবে তোদের।”

বিশ্বনাথ ধর্মভীরু মানুষ। সে গৃহ পুরোহিতের দিকে কাতর দৃষ্টিতে তাকাতেই পুরোহিত বিরক্ত হলো বটে, কিন্তু নিজের টিকিতে বাঁধা ফুলটি খুলে ফেলে, যজ্ঞাসন ত্যাগ করে বিরস মুখে চন্ডীমন্ডপের বাইরে এসে দাঁড়ালো। চন্ড পূজাস্থলে প্রবেশ করার জন্য পা বাড়াতে যাচ্চে, এমন সময়ে বিষ্ণুচরণ তাকে উদ্দেশ্য করে বলল—“দাঁড়ান ঠাকুর।”

তান্ত্রিক চন্ড রক্ত চক্ষে বিষ্ণুচরণের দিকে চেয়ে কইলো— “কে তুই পামর, আমাকে দাঁড়াতে বলিস! এত ধৃষ্টতা তোর?”

বিশ্বনাথ হাঁ হাঁ করে জামাতাকে নিবৃত্ত করতে যাচ্চিল, কিন্তু বিষ্ণু সেসব গ্রাহ্য না করে প্রত্যুত্তর করল— “আমরা ভবাণীর পূজার উদ্দেশ্যেই এখানে জড়ো হয়েচি। স্বভাবতই সকল রকম আয়োজনও যে প্রস্তুত রইবে তা তো আপনারও জানার কথা। তবে নূতন করে কী জোগাড় করার কথা কইচেন?”

চন্ড ভ্রুকুটি পাকিয়ে অট্টহাস্য করে বিশ্বনাথ আর বিষ্ণুর কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল—“বেশ ধরেচিস বটে। শোন তবে, আমি মনস্থ করেচি তোদের নামে একখানা অরিহন্তঃ যজ্ঞ করবো। শত্রুভয়, ব্যাধিভয় দূর হয়ে যাবে তোদের। এর জন্য আমার একখানি বিশেষ বস্তু আবশ্যক। তা তোদের জোগাড় করে দিতে হবে। তোরা হলি গিয়ে গাঁয়ের মাথা, তাই কিছু এমন কঠিন জিনিস নয় তোদের পক্ষে।”

বিষ্ণুচরণ তান্ত্রিকের চোখের থেকে চোখ না সরিয়ে ভাবলেশহীন মুখে শুধোলো— “কী সে জিনিস?”

চন্ড গলা আরও নামিয়ে বললে—“তিনটি তিন বৎসরের শিশু চাই আমার। ভবাণীর সুমুখে উৎসর্গ করবো তাদের গরম তাজা রক্ত। তোদের শ্রীবৃদ্ধি কেউ আটকাতে পারবে না আর। তোদের লোকবল রয়েচে। তাদের দিয়ে তিনটি বাচ্চা তুলে আনা কিচ্ছুটি অসম্ভব কাজ নয়। আর তা ছাড়াও…”

চন্ডর কথা শেষ হবার পূর্বেই বিষ্ণুর বলিষ্ঠ হাতের এক মোক্ষম আঘাতে তার মাথাটা বাম দিকে ঘুরে গেল। বিষ্ণু ক্রোধে চিৎকার করে বলল—“পামর আমি না তুই? হতভাগা ভন্ড জুয়াচোর কোথাকার। শীতলগঞ্জে এসে শিশুদের বলি দিবি তুই! এই কে আছিস, এই ভন্ড, লোভী তান্ত্রিকটাকে গাঁয়ের সীমার বাইরে বের করে দিয়ে আয়।”

কেউ কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই চন্ডতান্ত্রিক দুই হাতে বিষ্ণুর গলা টিপে ধরলো। কি অমানুষিক জোর তার দেহে। আট দশজন পুরুষমানুষ মিলে টেনেও তাকে ছাড়ানো যায় না। একটু পরে চন্ড যখন আপনিই হাত সরিয়ে নিলো, তখন দেখা গেল বিষ্ণু দস্তুরমতো হাঁপাচ্চে। তার গলায় রক্ত জমার কালশিটে দাগ পড়েছে। এইবার শান্তশিষ্ট বিশ্বনাথও উগ্র হয়ে উঠল। সে আদেশ প্রচার করল চন্ডকে এইমুহূর্তে দূর করে দেবার জন্য। তান্ত্রিক নিজেই বিদেয় হয়ে যাচ্ছিল। প্রাঙ্গণের মূল ফটক পার হবার আগে পিছনে ঘুরে বিষ্ণুর দিকে চেয়ে হিসহিসিয়ে বলল—“কাজটা ভালো করলি না তোরা। চন্ডকে চিনবার ক্ষমতা তোদের নাই। তবে এইবারে চিনবি। ছয় দিন। মাত্তর ছয় দিন তোর পরমায়ু। আজ অমাবস্যা। পঞ্চম রাতে তুই ব্যতীত বাকী সকলকে হত্যা করবে আমার অনুচরেরা। ষষ্ঠ রাতে আমি নিজে আসবো আর নিজের হাতে তোকে বিনাশ করবো। বড়ো ভয়ানক হবে তোর মৃত্যু। জ্বলে পুড়ে খাক্ হয়ে যাবে তোর আস্থ মজ্জা, পুড়ে ছাই হয়ে যাবে তোর শরীর। তৈরি হ। তুই আজ হতে ভস্মাসুরের শাপগ্রস্ত হলি।” চন্ড ফটক পেরিয়ে অন্ধকার পথে মিলিয়ে গেল।

*

বিষ্ণুচরণ চন্দ্রকে রাগের বশে যতগুলি অপবাদ দিয়েচিল তার সবকয়টিই যথার্থ সত্য ছিল, কিন্তু একটি বাদে। চন্ড ভন্ড সাধক নন। দ্রোণগিরি পর্বতে ঘোরতর অন্ধকারের সাধনায় সিদ্ধি পাবার পরে সে এক খুনী কাপালিককে নিজের গুরু বানায় এবং তার কাছে অতি ভয়ংকর সব কালো তামস বিদ্যা শিখে হয়ে হঠে অতিমাত্রায় দুর্দান্ত। এরপরে সেইখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় সুদূর নীলপর্বতের চূড়োয়। সেখানে একজন অতিবৃদ্ধ নাগা অঘোরীকে মৃত্যু পথ থেকে ফিরিয়ে এনে, সেবায় তুষ্ট করে শিখে ফেলে ভারতবর্ষের অতীব গুপ্ত এবং প্রায় বিলুপ্ত এক সর্বনাশা বিদ্যা ‘বজ্ৰ-সম্ভব’।

বজ্র-সম্ভব হলো সেই কয়েকটি বিদ্যের মধ্যে একটি, যেগুলির কালান্তক সংহারক শক্তির পরিচয় পেয়ে দেবগুরু বৃহস্পতি সেগুলি বিনষ্ট করে ফেলেন। পরবর্তীতে দৈত্যগুরু ভার্গব শুক্রাচার্য সেই বিদ্যের কিয়দংশ পুনরুদ্ধার করে শিখিয়ে দেন অসুরদের।

একটি বিশেষ প্রক্রিয়া সমাপণ করে যজ্ঞাহুতি দেবার পরেই যজ্ঞকারীর দেহে একখানি বজ্রের সমান তেজ প্রবেশ করে। সে সময়ে সেই ব্যক্তি যদি নিজের যে কোনও একটি হাত কোনও বস্তুর গায়ে স্পর্শ করে, তবে সেই বস্তু বা জীব বজ্রাঘাতের ন্যায় জ্বলে পুড়ে ভস্মে পরিণত হয়। পুনরায় এই শক্তি পেতে হলে আবার তিন দিন তিন রাত্রি ধরে নূতন যজ্ঞ করতে হয়। সেই ধ্বংসাত্মক কালবিদ্যা করায়ত্ত হয়েছিল চন্ডর।

তার গুরু ছিলেন সংযমী, জিতেন্দ্রিয় পুরুষ, কিন্তু চন্ড তা ছিল না। বিদ্যে শিখেই বজ্র প্রয়োগে প্রথমেই সেই নাগা গুরুকে ভস্ম করে ফেলে, কুটীল অভিসন্ধি নিয়ে শহরে নামে সে। এই বজ্র সম্ভব বিদ্যার অন্তিমভাগে প্রয়োজন হয় তিনটি শিশুর তাজা রক্তে স্নান করে একটি যজ্ঞের। সেই উদ্দেশ্যেই চন্ড পূজা করতে চেয়েচিল বিশ্বনাথের বাড়িতে, যদিও অন্যভাবেও সে তিনটি শিশু জোগাড় করতে পারতো ঠিকই।

অপমানিত হয়ে ক্রোধে, প্রতিহিংসায় উন্মত্তপ্রায় হয়ে উঠল চন্ড। অন্ধকারে গা মিশিয়ে একখানি যষ্টি হাতে সবার অলক্ষ্যে বিশ্বনাথের ভদ্রাসনের চতুর্দিকে একখানি রেখা কেটে দিল।

বাইরের একখানি গাছ বেয়ে উঠে বাড়ির বাইরের দিকের দেওয়ালে নিজের কপালের সিন্দুরের থেকে নিয়ে একটি ক্ষুদ্র নরমুন্ডের চিহ্ন এঁকে দিল। বাড়ির লাল রঙের সাথে সেই রক্তবর্ণ চিহ্ন একেবারে মিশে রইলো।

তারপর আরো দূরে গিয়ে পিছনের বাগানের একটি আম গাছের গুঁড়িতে কি একটি স্পর্শ করল, সাথে সাথে সেই বস্তুটি একখানা আম পাতার আকৃতি নিয়ে গুঁড়ির মধ্যে আটকে ঝুলে রইলো। বোঝার কোনও উপায়ই রইলো না যে ওখানি ওই গাছের পাতা নয়।

এইসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চন্ড মনে মনে পৈশাচিক হাস্য হেসে উঠল। তারপর নিঃশব্দে চলে গিয়ে গাঁয়ের থেকে চারটি ছোলা গুড় খাবার সংগ্রহ করে জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করে বজ্র-সম্ভবের পাশাপাশি সর্বনাশা তমায়ূধ যজ্ঞে আহুতি দিল।

তৃতীয়ার মধ্য রাত্রে দুটি যজ্ঞ সম্পূর্ণ হলো। চন্ডর শরীরে প্রবেশ করল গোটা একখানা বজ্রের তেজ এবং তমায়ুধ যজ্ঞবেদী হতে উঠে এল চার চারটি ভয়াল দর্শন পিশাচ। চন্ড এই বজ্রের শক্তি কেবলমাত্র শক্তি পরীক্ষা করবার জন্যে আহ্বান করেছিল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল একটা প্রাচীন সুবিশাল বটগাছের দিকে। সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দক্ষিণহস্ত তুলে স্পর্শ করল গাছের গুঁড়িতে।

কানফাটানো বজ্রের গর্জনের সাথে সাথে অতখানি বিশাল বটগাছখানা আগা থেকে গোড়া অবধি পুড়ে ভস্মে পরিণত হলো। একটি পাতাও আস্ত রইলো না, এমনকি বৃক্ষের ডালে ডালে যে দুই তিনখানা পাখির বাসা ছিল, সেগুলিও পাখি সমেত ছাই হয়ে গিয়েছে।

তুষ্ট চিত্তে এইবারে সে এগিয়ে এল অপর বেদী খানার দিকে। পিশাচগুলির চোখে চোখ রেখে কইলো–“তোরা কারা?”

উত্তর এল— “আমরা দাস।”

— “আমি কে?”

–“আমাদের প্রভু।”

–“তোরা কোথা থেকে এসেচিস?”

–“পাতালের বুক বিদীর্ণ করে।”

–“এখন কার কথা শুনবি?”

–“শুধুমাত্র আপনার।”

–“বেশ বেশ।”

চন্ড এইবারে পিশাচদের আজ্ঞা করল—“তোরা দুই দিন মাটির তলে লুকিয়ে থাকবি। পঞ্চমীর রাতে এ গাঁয়ের জমিদার বাড়িতে যাবি। সে বাড়ির বাইরে শীশ দন্ডী কেটে রেখেচি। দেখলেই চিনতে পারবি। সেথায় গিয়ে ঘূর্ণিঝড় তুলবি। একটি লোকের কণ্ঠনালীতে দেখবি আমার হাতের কালশিটে দাগ রয়েচে। তাকে বাদে বাকী সকল পুরুষমানুষকে ঝড়ে ভাসিয়ে আমার পায়ে এনে ফেলবি। ঠিক আমার পায়ের কাছে। তাদের আমি ঐ রাতেই বলি দেবো। আমি আশপাশেই থাকবো। আমার পদপ্রান্তে। তাদের ফেলে দিয়ে তোদের ছুটি। যাঃ, দূর হ।”

পিশাচগুলি খলখল করে হেসে উঠে বনের আঁধারে মিলিয়ে গেল। চন্ড প্রসন্নচিত্তে দ্বিতীয়বার বসলো সেই ঘোর অমোঘ বজ্র সম্ভব যজ্ঞে। এইবারের বজ্র বিষ্ণুচরণের জন্যে। গহণ বনের নীরবতাকে বিদীর্ণ করে পৈশাচিক হাসিতে মুখর হয়ে উঠল চন্ড তান্ত্রিক। বনের পাখিগুলি আতঙ্কে কলরব করে উঠল। তারা আভাস পেয়েচে এক আদিম মহা অমঙ্গলের, যে অমঙ্গল সহস্র সহস্র বৎসর পরে মুক্তি পেয়েচে নরলোকে।

*

এদিকে বিশ্বনাথের গৃহে এক ভয়ানক আশ্চর্য ঘটনায় গাঁয়ের পর গাঁ জুড়ে রীতিমত হৈচৈ পড়ে গেল। কালীপূজায় প্রায় আশি নব্বুই জন প্রজা জড়ো হয়েচিল, কিন্তু চন্ডের সঙ্গে বিষ্ণুর হাতাহাতি হবার উপক্রম হতেই গন্ডগোলের আশঙ্কা করে অনেকেই পূজা প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেচিল। অবশিষ্ট কর্মচারীগণ সহ বাইরের লোক মিলিয়ে মোটামুটি জনা ত্রিশেক লোক উপস্থিত ছিল। পূজা একরকম নিরানন্দভাবেই সমাপণ হয়ে গিয়েচিল। তোপের পেটে বারুদ ভরা হয়েচিল বটে, তবে তোপধ্বনি এই বৎসর আর করা হলো না। বিপদ দেখা দিল সকালে।

সকালের আলো ফোটার পর কর্মচারীরা মায়ের বিগ্রহ নিরঞ্জনের জন্য মূর্তি কাঁধে নিয়ে রওয়ানা হলো, আর এক মুহূর্তের পরেই ভয়ার্ত কোলাহল করতে করতে ফিরে এসে উঠানে আছাড় খেয়ে পড়ল। বিষ্ণুচরণ, বিশ্বনাথ আর সূর্যমুখী বিস্মিত হয়ে বেরিয়ে এসে কারণ জিজ্ঞেস করায় এস্টেটের নায়েব বৃদ্ধ হরিচরণ কাঁপা গলায় বললে– “হুজুর, আমরা মায়ের বিগ্রহ নিরঞ্জনের জন্য বড়োপুকুরে যাবো বলে বেরিয়েচি, হঠাৎ দেখি ফটকের সামনে রঘুয়া, বিশে আর মণিলাল কিসে যেন ধাক্কা লেগে উল্টে পড়ে গেল। আমরা তো ভেবে কূল পাইনে যে কিসে কী হলো! অথচ তারা বললে যে কিছু একটায় তারা ধাক্কা খেয়েচে।

একটু পরেই চার পাঁচজন লোক দেখি বাতাসের মধ্যে কি যেন হাতড়িয়ে চলেচে আর ভয়ে তাদের মুখ এই এতটুকু হয়ে গিয়েচে। তখন মূর্তি নামিয়ে আমি নিজে গিয়ে যা দেখলুম তা কেউ কক্ষনো বিশ্বাস করবে না হুজুর। এই বাড়ির বিশাল প্রাঙ্গণ, বাগান, পুকুর সমেত চতুর্দিকে কেউ যেন অদৃশ্য কাঁচের তৈয়ারী করা বেড়া বেঁধে দিয়েচে। বাইরে থেকে কেউ ঢুকতেও পারচে না, আর বেরুতেও পারছে না। সেই সর্বনাশা তান্ত্রিক আমাদেরকে ইঁদুরকলের মতো বেঁধে ফেলেচে কর্তামশায়। আমাদের সবকয়টি জীবনকে হরণ না করে তার তৃপ্তি হবে না।”

এইভাবে চার চারটি দিন অতিবাহিত হলো। আটকে পড়া প্রজারা আর কর্মীরা মহা আতঙ্কে আধমরা হয়ে পড়েছে। কারুর অন্নগ্রহণে রূচি নাই, নিদ্রায় ইচ্ছে নাই, কেবল আসন্ন নৃশংস মৃত্যুর জন্য অর্ধমৃতের মতো প্রহর গুণে চলেচে। নায়েব হরিচরণ বয়স্থ ব্যক্তি, সেও মনে মনে ভীত হলেও মুখে সকলকে প্রবোধ দিয়ে যেতে থাকলো, যদিও এক একটি দিন কাটার সঙ্গে সঙ্গে তার অন্তরাত্মাও শুকিয়ে উঠতে থাকলো।

শ্বশুর বিশ্বনাথ শয্যা নিয়েচেন। মাত্রাতিরিক্ত জ্বরব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে প্রলাপ বকচেন তিনি। বিষ্ণুচরণ মনে মনে এই দুর্যোগের জন্য নিজেকেই দায়ী করে বিমর্ষ হয়ে পড়েছিল।

পঞ্চম দিন যখন সূর্য অস্তাচলে যেতে বসেচে, সেই সময়ে চন্ড তান্ত্রিক আহ্বান করল সেই পিশাচদের। তারা সামনে এসে উপস্থিত হলে পর তাদের উদ্দেশ্যে চন্ড দাঁতে দাঁত চিবিয়ে কইলো—“সময় আসন্ন।”

তোরা রওয়ানা হ। ঐ বাড়িতে প্রবেশ করে ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিয়ে ঐ বাড়ির কর্তা, তার কন্যা আর জামাতা বাদে বাদবাকি সকলকে হাওয়ায় উড়িয়ে নিবি। ঐ তিন শয়তানকে আমি নিজের হাতে আগামীকাল বধ করবো। আমি বাড়ির আশেপাশেই থাকবো একটু পর। তোরা ঝড়ের সঙ্গে লোকগুলিকে তুলে নিয়ে আমার ঠিক পায়ের কাছে এনে ফেলবি। তারপর দূর হয়ে যাবি। এখন যা, কর্তব্য সম্পন্ন কর। নাহলে…

পিশাচ চারজন কথা শেষ না হতেই বিদ্যুৎবেগে প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণির রূপ নিয়ে আকাশ কালো করে ছুটে চলল বিশ্বনাথের মহলের দিকে।

তারা আকাশপথে মিলিয়ে না যাওয়া অবধি চন্ড সেদিকে কঠিন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো।

প্রতিশোধ চাই। এমন ভয়ঙ্কর বদলা, যা কেউ ভাবতেও পারবে না। চন্ড তান্ত্রিক ভন্ড না জুয়াচোর, তা আজ ভালো রূপে বুঝিয়ে দিতে হবে ঐ ক্ষুদ্রপ্রাণ মানুষগুলিকে।

ললাটে লাল চন্দনের টীকা এঁকে, কণ্ঠে রক্তপলের হার পরে, সেই মহা সর্বনাশা তান্ত্রিক একখানি যষ্টি হাতে পা বাড়ালো বিশ্বনাথের বাড়ির দিকে, মনের মধ্যে এক হিংস্র বধেচ্ছা নিয়ে।

*

আবছা সন্ধ্যায় জমিদার বাড়ির প্রাঙ্গণে বন্দি প্রজারা আর নায়েবমশায় মিলে ইতস্ততঃ অন্বেষণ করচিল কোনও ছিদ্রের, যা দিয়ে হয়তো বা এই অদৃশ্য প্রাচীর থেকে বেরুবার পথ পাওয়া যাবে। হঠাৎ পাইক রামশরণ ভয়ার্ত স্বরে চিৎকার করে বললে—“হা ঈশ্বর, ওইটে আবার কী!”

রামশরণের দৃষ্টি রয়েচে আকাশের পানে। সকলে সেই দিকে চেয়ে তাদের শরীর হিম হয়ে গেল। আকাশের সন্ধ্যার অন্ধকারের চেয়েও অনেক অনেক ঘন পুঞ্জীভূত একটা অন্ধকারের পিন্ড হু হু করে উড়ে আসচে এই দিকেই। কিছু ভালো করে হৃদয়ঙ্গম করে ওঠার পূর্বেই সেই আঁধার পুঞ্জ প্রলয়ঝড়ের আকার নিয়ে সজোরে ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের উপর।

মুহূর্তের মধ্যে যেন সৃষ্টির বিনাশ উপস্থিত হলো। ঘন ঘন বিদ্যুতের ঝলকানির সঙ্গে চতুর্দিক কালো নিকষ হয়ে উঠল, আর মানুষজন হাওয়ার তোড়ে আছাড়ি পিছাড়ি খেতে শুরু করল। কখনও তারা মাটি থেকে শূন্যে উঠে পড়ে, আবার কখনও জোর ঝাঁকুনিতে নীচে এসে পড়ে। অতোবড়ো প্রাসাদখানি যেন ভূকম্পন-আক্রান্ত হয়ে কাঁপচে, আর মরণ আর্তনাদ করতে থাকা লোকজন একটি প্রবল বায়ুর ঢেউয়ের অভিঘাতে মাটি দিয়ে যেন ছেঁচড়ে চলল, যেন কোনও বিশেষ জায়গায় তাদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্চে। প্রথমে ঝড়ের স্রোত ছিল উত্তুরদিকের পানে। এইবারে তা বয়ে চলল মূল ফটকের দিকে। সেই সঙ্গে খড়কুটার মতো অতজন মানুষের দল।

যখন চন্ড তান্ত্রিকের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা চলচিল, তখন নায়েব হরিচরণ সেইখেনে হাজির ছিল না। সে ছাতে গিয়েছিল কামানে বারুদ ঠাসতে কাজেই চন্ডকে সে দেখেনি। কেবলমাত্র বর্ণনা শুনেচে। বন্যার তোড়ের মুখে বিচালির ন্যায় ঘুরপাক খেতে খেতে হরিচরণ লক্ষ্য করল ফটকের সামনে অন্ধকারে মিশে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক দশাসই কাপালিকের ন্যায় মূর্তি। কপালে রক্তসিন্দুরের প্রশস্ত টিকা, গলায় লাল রূদ্রাক্ষের কণ্ঠমালা, মুখ বজ্রকঠিন। এই ভয়াবহ মারণ-ঝড় তারই ইশারায় তারই দিকেই চলেচে। মানুষগুলিকে শশকের পালের মতো তার পায়ের কাছে ফেলে রেখে সেই কালান্তক তুফান ক্ষুদ্র, আরও ক্ষুদ্র হতে হতে তার পায়ে গিয়ে বিলীন হয়ে গেল। হরিচরণ এর মধ্যেই ঠিক করে নিয়েচিল যে সবার প্রথমে সে নিজেই জীবন দেবে। তার বয়স হয়েচে। গাঁয়ের অল্পবয়সী ছেলেপুলেদের সে চোখের সামনে মরতে দেখতে পারবে না, তাই সে সবার অলক্ষ্যে একখানি বড়ো পাথর নিজের মুষ্টিতে তুলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েই ছুঁড়ে মারলো তান্ত্রিকের মাথা লক্ষ্য করে। পাথর লক্ষ্যভ্রষ্ট। হয়ে পাশের বৃক্ষে গিয়ে পড়ল। হরিচরণ মৃত্যু আসন্ন স্থির বুঝে নিয়ে। ইষ্টস্মরণ করে, বাকি সকলকে দুই হাতে আড়াল করে দাঁড়িয়ে তান্ত্রিকের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল—“আমাদের সর্বনাশ করতে প্রবৃত্ত। হয়ে উঠেচিস, কে তুই শয়তান! বল, কে তুই!”

জলদমন্ত্র স্বরে উত্তর এল—“ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া।”

হরিচরণ ধাঁধায় পড়ে বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েচিলো। হতভম্ব ভাবে বলল, — “রায়দীঘড়া? সুন্দরবনের রায়দীঘড়া? মানে… তার মানে আপনি কর্তামশায়ের জামাইয়ের গাঁয়ের…?”

— “আজ্ঞা হাঁ। আমি তাঁর ছোটো ভাই কালীপদ মুখুজ্জে।”

পরিচয় পেয়ে এবং কালীপদর অসামান্য ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করে প্রত্যেকটি মানুষ আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়েচিল। হরিচরণ কালীপদকে চন্ডর সমস্ত ঘটনা শোনানোর পর কইলো—“সেই হতভাগা শয়তান চন্ডই আজ আমাদের হত্যা করার জন্য এই ঝড় পাঠিয়েচিল, কিন্তু বাবা, তুমি মোক্ষম মুহূর্তে এসে পড়ায় তার ইচ্ছে সফল হতে পারল না। তোমাকে যে আমরা কী বলে…”

কালী তাদের থামিয়ে দিয়ে বলল—“না খুড়োমশায়, ঝড় কোথা? ও ঝড় নয়। আমিও দূর থেকে তাইই ভেবেচিলাম বটে, কিন্তু কাছে আসতে দেখলুম ঝড়ের ছদ্মবেশে বাতাসে ঘুরপাক খাচ্চে চার চারটি তৃণাবর্ত পিশাচ। এই তৃণাবর্ত পিশাচদের পাতালের অতল থেকে তন্ত্রের মাধ্যমে ডেকে আনা হয় সাধারণতঃ কাউকে ঝড়ের মাধ্যমে তুলে নিয়ে আসা, অথবা ঝড়ের প্রকোপে হত্যা করা জাতীয় মারণ উদ্যেশ্যের জন্য। এই অনিষ্টকর যজ্ঞ প্রক্রিয়ার নাম ‘তমায়ূধ যজ্ঞ’।

পিশাচগুলিকে সম্ভবত আপনাদের ঐ চন্ড কাপালিক আদেশ করেচিল যে তারা যেন আপনাদেরকে জীবন্ত অবস্থায় তার কাছে নিয়ে গিয়ে ফেলে। তারা যাচ্চিলও তাই, কিন্তু আমি সেই ঝড়ের মুখ ঘুরিয়ে নিজের দিকে নিয়ে এলাম, আর পিশাচগুলোকে আবার তাদের জগতে ফেরৎ পাঠিয়ে দিলাম।”

এই বলে উঠানে রাখা ভবাণীর বিগ্রহের দিকে তাকিয়ে যুক্তকরে প্রণাম করল।

.

(পর্ব-২)

এদিকে চন্ড কাপালিক বাড়ির উত্তরদিকের জঙ্গলে অপেক্ষা করচিল তার পিশাচদের আগমনের। ঝড়ও উঠেছিলো, কিন্তু সে ঝড় উত্তরদিকে এগোতে এগোতেও হঠাৎ কোথায় ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেল, আর তার অমন ভয়ঙ্কর পিশাচরাই বা কোথায় গেল, তার কোনও কূলকিনারা পেলো না। অবশেষে সে অনুমানে বুঝলো, নিশ্চিতরূপে কিছু একটা হয়েছে, যার জন্য তার প্রতিহিংসা অপূর্ণ থেকে গিয়েছে। কারুর কাছে তন্ত্রশক্তিতে তার পরাজয় এই প্রথম। ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে চন্ড এইবার সেই কাজ করল, যা করতে বাঘা বাঘা তান্ত্রিকেরাও দুইবার ভাবে।

তন্ত্রে সিদ্ধিলাভের সময়ে প্রতি তান্ত্রিকেরই একটি চতুর্বারণ বিদ্যা লাভ হয়। আমাদের ব্রহ্মাণ্ডকে দাঁতে করে ধারণ করে রেখেচে চারজন মহাকায় হস্তী বিরূপাক্ষ, মহাপাক্ষ, সৌমানাং আর ভদ্র। এই চার মহা শক্তিধর হস্তীর পূজা করে পাওয়া যায় চতুর্বারণ শক্তি, যে শক্তি হলো একাঘ্ন, অর্থাৎ জীবনে একবারই এই বিধ্বংসী শক্তির প্রয়োগ করা যায়। রাগে অন্ধ হয়ে চন্ড এই ভয়ানক মন্তর প্রয়োগ করে বসলো। তার মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের বেগ বেড়ে গেল। সূদুর নক্ষত্রলোক থেকে ধেয়ে আসতে লাগল সেই সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত।

*

বিষ্ণু, সূর্যমূখী আর বিশ্বনাথ ঘরের মধ্যেই আটকে পড়েচিল এবং যখন সকলে মিলে বাইরে থেকে মরণাহত আর্তনাদ করচিল, তখন তারা ঘরের মধ্যে অসহায় উন্মাদের মতো ছটফট করচিল। আচমকা তারা শুনতে পেলো, বাইরে থেকে আবার প্রবল কোলাহল আসচে, এবং এইবারের শব্দটি কোনওভাবেই ভয়ের বা আতঙ্কের নয়। এ কলরব আনন্দের।

লোক লস্কর মিলে হৈচৈ করে যখন গৃহের ভিতরে প্রবেশ করল, তখন সূর্যমুখী বিস্ময়চকিত কণ্ঠে বলল—“ঠাকুরপো!”

বিষ্ণুচরণও অবাক হয়ে হেসে কইলো– “আরে! এই হতভাগা কোত্থেকে উদয় হলো?”

বন্দি হয়ে থাকা লোকেরা এখন আর একজনও বন্দি নয়। কালীপদ ঘরের সীমানায় পা রাখা মাত্র সেই কাল-গন্ডী নিজের ক্ষমতা হারিয়েচে। তবুও একটি লোকও জমিদার বাড়ি ত্যাগ করে যেতে সম্মত হলো না। আজ পঞ্চমী। চন্ডর কথা অনুযায়ী তাদের বিপদ হয়তো কেটেচে, কিন্তু ষষ্ঠীর দিন, অর্থাৎ আগামীকাল তাদের মনিবদের উপর আক্রমণ হবেই হবে। হয়তো তাদের উপরেও পুনরায় আক্রমণ হতে পারে। চন্ডর মতো নিষ্ঠুর কাপালিকের পক্ষে তা অসম্ভব নয়। তবে কালীপদ আসায় তাদের মনোবল অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়েচে বৈকী।

সূর্যমুখী আশ্বস্ত কণ্ঠে বলল—“আমি মনে মনে নিশ্চয়ই জানতুম যে এই বিপদের সময়ে ঠাকুরপোকে আসতেই হবে। তোমার দাদা তোমাকে যতই বাউন্ডুলে আর ছন্নছাড়া বলুক, আমি তো জানি যে তুমি বিপদের কথা শুনলে কারুকে নিরাশ করে রিক্তহস্তে ফেরাতে পারো না।”

বিষ্ণুচরণ ভেতরের হাসি গোপন করে গম্ভীর মুখে চেয়ে রইলো। কালীপদ দাদার দিকে চেয়ে বলল—“কী দাদা, এইবার কথা রেখেচি, তুমি সন্তুষ্ট তো?”

বিষ্ণুচরণ ছদ্ম রাগ দেখিয়ে বললে—“যাঃ যাঃ, জ্যাঠামো করিসনে কালী। সাকুল্যে একখানা মাত্তর কথা রেখেচিস। তাতেই যেন কতোই কেতাখ করে ফেলেচেন তিনি।”

বাদবাকি লোকেরাও একযোগে কি যেন বলতে যাচ্চিল, এমন সময়ে কালীগুণীনের হাতের ইশারায় তারা তটস্থ হয়ে থেমে গেল।

কালীপদ অতি নিবিষ্টচিত্তে কান খাড়া করে কি যেন শুনচে। একটু পরেই ধাতস্থ হয়ে সে অস্ফুট স্বরে বললে—“সর্বনাশ। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। সে পাষন্ড নরাধম মনে হয় চতুর্বারণ মন্তর ব্যবহার করে বসে আছে।”

বিশ্বনাথ বাদে বাদবাকী প্রতিটি মানুষ কালীপদর সঙ্গে এক দৌড়ে বিশাল উন্মুক্ত ছাতে এসে দাঁড়ালো। দেখা গেল আকাশের পূব কোণার থেকে একটা লাল বর্ণের আলোকবিন্দু বিদ্যুতের গতিতে ধেয়ে আসচে, আর প্রতি মুহূর্তেই বড়ো হচ্চে। সেদিকে চেয়ে কালীগুণীন চাপা স্বরে বলে উঠল—

“মনে তোর বড়ো সাধ, পাবি বুঝি জিৎ।
ভবাণীর বরে আজ, কালী উপস্থিত।।”

বাড়ির কাছাকাছি সেই আলোটা এসে পড়া মাত্র গগনবিদারী বৃংহনের আওয়াজ কানে এল। শত শত রণহস্তী যেন যুদ্ধার্থে তেড়ে আসচে। উপস্থিত প্রতিটি ব্যক্তির মুখ শুষ্ক। সে দিকে একবার তাকিয়ে, কালীপদ বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে থাকলো-

“ওঁ হ্রী ক্রী রী চামুন্ডাঐ নমোঃ।
করৈঃ গজৈঃ বারণায়ঃ চঃ,
নিবারয়ঃ তে ত্রয়োঃ গুণম্,
হিনস্ অঃ চঃ প্রতিঘাত্যেঃ,
তদাৎ মহা আহবঃ কৃত্বাং।”

এই বলে নিজের দক্ষিণ হস্তটি প্রসারিত করে একখানা সজোরে ফুৎকার দিল তাতে।

এর পরেই পলকের মধ্যে যে কাণ্ডটা ঘটে গেল, তা সংসারবদ্ধ প্রাণীদের কাছে অতীব অবিশ্বাস্য ও স্বপ্নতুল্য।

আকাশ যেন সহসা দুই ভাগে চিরে গেল। একভাগ নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, অপর পার্শ্বে চোখধাঁধানো আলোর দ্যুতি। অন্ধকার অংশে পাগলের মতো মাথা নাড়চে একটি কৃষ্ণবর্ণ মহাহস্তী, আর আলোময় অংশে আস্ফালন করচে একটি তেজঃ নির্মিত প্রকাণ্ড সিংহ।

হঠাৎ একেক খানা মেঘের আকৃতি নিয়ে দু’পক্ষই সম্মুখ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আকাশে বিদ্যুতের চাবুক ঝলসে উঠতে থাকলো। বহুক্ষণ যুদ্ধ চলার পর সিংহ হঠাৎ দাঁত বসিয়ে দিল হাতীর পিছনের পায়ে। রক্ত জল করা গর্জন করতে করতে হাতী রূপী ঘন মেঘ অদৃশ্য হলো। সেই সঙ্গে সেই আলোকময় সিংহও। কালীপদর মুখের প্রতিটি শিরা উপশিরা তখনও অতিরিক্ত মানসিক শক্তি প্রয়োগের ফলে দপদপ করচে।

*

চন্ড পরপর পরাজিত হয়েও চঞ্চল হলো না। সে জানে, তার প্রতিপক্ষটি তন্ত্রেমন্ত্রে যতোই ক্ষমতাশালী হোন না কেন, বজ্র-সম্ভব বিদ্যাকে খণ্ড করার শক্তি তার নাই। স্বয়ং স্বয়ম্ভূ শিবেরও ছিল না, তাই তিনি বিষ্ণুর স্মরণাপন্ন হয়েচিলেন। কালীপদ তো কোন ছার। তার শরীরে যজ্ঞের প্রভাবে দৌড়াচ্চে গোটা একটি বজ্রের শক্তি। আগামীকাল তাতে পূর্ণাহুতি দিয়ে সে হাজির হবে বিষ্ণুচরণের সন্ধানে। যে যতোই চালাকি করুক, বিষ্ণুর শরীরকে স্পর্শ করার পূর্বে সে অপরাপর কোনও জাগতিক বস্তুকেই ছোঁবে না নিজের হাত দিয়ে। তাহলে সেই বজ্র ঐ বস্তুতেই সঞ্চালিত হবে। যদিও এটিও অতি গৃহ্য কথা। তার হাত অন্য কোনও বস্তুকে ছুঁয়ে ফেললে যে বজ্রের শক্তি বিনষ্ট হবে, এ কথা যতবড়ো তান্ত্রিকই হোন, তার জানার কথা নয়, কারণ এই বজ্র-সম্ভব বিদ্যা জানে এমন লোক আর্যাবর্তে আর কেউ নাই। তার উপরে চন্ডর আর একটি গোপন ক্ষমতা রয়েচে। নাগা গুরুদেবকে সন্তুষ্ট করে সে পেয়েচে ইচ্ছেমৃত্যুর বর। সত্যিকারের ভস্মাসুরের মতোই। পৃথিবীর কোনও দেহধারী অথবা অশরীরী কেউ চন্ডকে হত্যা করতে পারবে না। একমাত্র নিজের হাতেই নিজের মৃত্যু বশীভূত তার। চন্ড তান্ত্রিক নিজের যজ্ঞের কিছু সামগ্রী নিয়ে আত্মগোপন করল দূরে নদীর পারের বনে। কাল তার বদলা পূরণ হবে।

পরদিন উষা লগ্নে কালীপদ বলল—“আমি তো বৌদিমণির বাড়ি প্রথমবার এলুম। এদিকের কিছুই চিনিনে। চারদিকটা একবার ঘুরে ঘুরে দেখতে চাই। একজনকে সঙ্গে দরকার।”

বিষ্ণুচরণ বলল- “বেশ, চল আমি তোকে দেখিয়ে নিয়ে আসচি। কালীপদ দাদার দিকে একটুক্ষণ চেয়ে থেকে উত্তর দিলে— “তোমাকে দিয়ে হবে না, তার চাইতে বরং বৌদিমণিই চলুক। আসলে আমার একজন বুদ্ধিমান লোকের প্রয়োজন।”

বিষ্ণুচরণ কটমট করে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলে বলল—“বেশ, সরযূই যাক।”

*

কালীপদকে নানান স্থান চেনাতে চেনাতে সূৰ্য্যমুখী পথ চলচিল। কালীপদ বললে—“যাই বলো বৌদিমণি, তোমার বাড়িখানি যেন ছবির মতো আঁকা।”

— “সত্যি বলচো ঠাকুরপো? যাক, আমার বাপের বাড়ির দেশ তোমার মনে ধরেচে বলো? সত্যিই এ তালুক ছবির মতোই সুন্দর।”

কালীপদ একদিকে তাকাতে তাকাতে আনমনা ভাবে জবাব দিল— “ছবির মতো তো বটেই, তবে ব্যাপারটা হচ্চে ছবির উপরে আবার ছবি আঁকলে কে?”

সূর্যমুখী প্রথমটায় কালীর কথা ধরতে পারলো না, অবশেষে তার দৃষ্টি অনুধাবন করে দেখলো কালীপদ চেয়ে রয়েচে তাদেরই বাড়ির পিছন দিকের বকুল গাছের ঝুপসি ডালে ঢাকা দোতলার দেওয়ালের দিকে। সেইখেনে দেওয়ালের রঙের সঙ্গে প্রায় মেশানো অবস্থায় চিত্রিত রয়েছে একখানি নরমুন্ডের ছবি।

সূর্যমুখী হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে আর কালীগুণীন দুই। হাতের করতল পরস্পর ঘর্ষণ করতে করতে কি যেন একটা ফিসফিস করল, আর সেই ছবিতে দপ করে আগুন ধরে গেল। দুইজনে এগিয়ে। চলল ফুলের বাগানের দিকে। জমির প্রতিটি পদে পদে কালীপদ কি যেন খুঁজে চলেচে। আচমকা সে বৌদির দিকে চেয়ে কইলো—“আচ্ছা বৌদিমণি, যদি কেউ বলে যে তোমার মুন্ডুটা বেমালুম তোমার হাঁটুতে জুড়ে দেবে, সেইটে তুমি বিশ্বাস করবে?”

সরযূ প্রবলভাবে মাথা নেড়ে জানালো সে বিশ্বাস করবেই না।

–“কেন বিশ্বাস করবে না?”

সরযূ অবাক হয়ে বলল— “হাঁটুতে কি কারুর মুন্ডু রয় নাকি ঠাকুরপো?”

–“হয় হয়। আর যদি নাই হয় তবে ওইটে কী?”

এই বলে এগিয়ে গিয়ে তারা একখানি আমগাছের নীচে এসে দাঁড়ালো, আর কালীপদ গাছের গুঁড়ির একেবারে গোড়ার থেকে ছিঁড়ে আনলো একটা আমপাতা। গাছের একেবারে শিকড়ের এত কাছে কখনওই পাতা গজায় না। সেটাকে হাতের তালুতে মুঠো করে চেপে ধরতেই সেখানা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ধূলা হয়ে গেল। কালীপদ গম্ভীর স্বরে বললে—“বটে! নজরদারি বসানো হয়েচিল দেখচি!”

*

ঘুরতে ঘুরতে তারা বনের এক জায়গায় এসে দেখলো সেখানে কিছু জিনিস পড়ে আছে। এটি হলো চন্ডর পরিত্যাগ করে যাওয়া যজ্ঞাসন। কালীপদ সেই স্থানে ঘুরে দেখতে দেখতে বললে—“আমি ঠিকই আন্দাজ করেচিলাম। এ হতভাগা তমায়ূধ যজ্ঞে বসেচিল।”

যখন তারা ফিরবে ফিরবে করচে, এমন সময়ে সরযূ কইলো—“এঃ ঠাকুরপো, এ গাছখানা এভাবে আগাপাস্তলা পুড়লো কীভাবে?”

সেদিকে তাকিয়ে কালীপদর শরীর ঠান্ডা হয়ে এল। শুষ্ক কণ্ঠে শুধু বলল,—”সর্বনাশ! এ গাছের উপরে যে বজ্র-সম্ভবের পরীক্ষা হয়েচে। এ বিদ্যের কেবল নামই শুনেচি। এই শয়তান এই কালশক্তি পেলো কোথা থেকে! হা ভগবান!”

— “তবে এখন কী হবে ঠাকুরপো?”

–“জানিনে বৌদিমণি। সত্য সত্যই বুঝতে পারচি না। এই ভয়ংকর শক্তিকে মন্ত্র দিয়ে ঠেকিয়ে রাখার ক্ষমতা আমার তো দূর, দেবতাদেরও নাই। এ বড়ো ভয়ের কথা হলো দেখচি।”

যজ্ঞের ডেরার এক কোণে কিছু এঁটো মাটির সানকি পড়ে রয়েছে। তাতে বাসী ছোলা গুড় মাখা। কালীপদ সেসব উত্তমরূপে নীরিক্ষণ করে আস্তে আস্তে কইলো—“দেখো বৌদিমণি, শয়তানটা এই কয়দিনের খাবারের রসদ নিয়েই এসেচিল। তবে…

শেষের দুখানা পাত্রে কিন্তু ছোলা আর গুড়টা মাখা অবস্থায় নেই। আলাদা আলাদা রয়েচে। কিন্তু কেন? শেষের দিকে কি তার হাত দিয়ে মাখার কোনও বাধা ছিল?” কালী গভীর চিন্তায় ডুবে গেল।

দ্বিপ্রহরে বাড়ি ফিরে কালীপদ সরযূকে বললে—“বৌদিমণি, তোমাদের বাড়ি তো অনেক বড়ো। কোনও পরিত্যক্ত ঘরটর এমন নাই, যেখানে দাদাকে আজ লুকিয়ে রাখা যায়?”

সরযূ এইবারে স্বামীর দুর্ভাবনায় সত্যিই ভেঙে পড়চিল। সে কালীকে নিয়ে একতলার নাচমহলের দিকে চলল।

নাচগানের আসর এখন আর বসে না। নাচমহলের ঘরটি পরিত্যক্তই গোটা পড়ে রয়েচে। গোটা দেওয়ালে ঝুল কালি। ভাঙা দরজার মুখেও দুয়ার জুড়ে বহু যুগের সূক্ষ্ম মাকড়সার ফাঁদ। তার কবাট ভাঙা। জানালা ভাঙা। আসবাবপত্র সব ঘৃণ ধরেচে। কালীপদ শরীর থেকে ঝুল ঝাড়তে ঝাড়তে কইলো—“এই মহলটি যথার্থই গুপ্ত মহল। দাদাকে এইখানেই লুকাতে হবে। আর বৌদিমণি, আমার এই এতটা পরিমাণ চুন আর সুরকি চাই। আর একটা মাছ ধরার জাল চাই” এই বলে বিষ্ণুচরণ আর নায়েব হরিচরণকে তাদের করণীয় কর্তব্য বেশ করে বুঝিয়ে দিল। বিষ্ণু ভাঙা জানালা দিয়ে প্রবেশ করে লুকিয়ে রইলো নাচমহলের ঘরে, আর হরিচরণ চুন সুরকি কাদা করে মিশিয়ে চলে গেল ছাতে।

*

সূর্য্য পূর্বারির দিকচক্র রেখায় অস্ত গেলেন। গৃহের অভ্যন্তরে প্রতিটি মানুষ নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করে রয়েচে সেই মোক্ষম ক্ষণের। হঠাৎ দূর হতে কার পায়ের শব্দ কানে এল। যেন কোনও উন্মত্ত পশু এগিয়ে আসচে তার বধ্যকে বধ করার লোলুপ জিঘাংসায়। চন্ড গৃহের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করল।

ক্রোধে আর উত্তেজনায় তার দেহ হাপরের মতো ফুলচে। ময়লা হলুদ দাঁত অধরোষ্ঠের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেচে। মহলের ভিতরে পা রেখে তীক্ষ্ণ চক্ষে সে কালীপদকে কিছুক্ষণ পাশবিক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলো। তারপর কীসের যেন গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে এগিয়ে চলল মহলের পিছনের অংশে।

কালীগুণীন চন্ডকে দেখা মাত্র মনে মনে প্রমাদ গুণলো। দেহ লক্ষণই বলে দিচ্চে যে একে হত্যা একেবারে অসম্ভব। এ ইচ্ছেমৃত্যুর অধিকারী। কালীপদ অস্ফুটে একটি মন্ত্র পড়া মাত্র একটি বড়োসড়ো মৌমাছি উড়ে এসে ঠোকর মারলো চন্ডর মুখে। চন্ড অবিচল রইলো।

পুনরায় কালী আরেকটি মন্ত্রোচ্চারণ করা মাত্র ছাতের উপর থেকে চুন সুরকির একটি বড়ো চাঙড় ভেঙে পড়ল চন্ডর কাঁধে।

চন্ড নিজের চোখের একটি পলকও না ফেলে তাকিয়ে দেখলো কালীগুণীনের দিকে।

কালীপদর মুখ এবার শুষ্ক হলো। সে আশা করেচিল চন্ড হয়তো এই অতর্কিত আক্রমণের ফলে সেইগুলিকে আটকাতে নিজের হাত প্রয়োগ করবে, এবং সেগুলিকে ছোঁয়া মাত্র তার হাতের ভস্মগুণ বিনষ্ট হবে। কিন্তু চন্ড নির্বোধ নয়। সে কালীর চালাকি বুঝতে পেরেচে। চন্ড সেদিকে মন না দিয়ে হালকা আঘ্রাণ নিয়ে নিয়ে এসে দাঁড়ালো নাচমহলের দুয়ারের সামনে।

সরযূ হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। প্রতিটি লোক আসন্ন নির্মম নিয়তির কথা বুঝে গিয়ে এক বুক আশঙ্কা নিয়ে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে রইলো।

চন্ড শান্ত কণ্ঠে বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে কইলো– “ওরে পাষন্ড, তুই কি চাস যে আমি তোকে না পেয়ে এখানের সবকয়টি প্রাণীকে হত্যা করে যাই? যদি ভালো চাস তো বেরিয়ে আয়।”

কালীপদ এইবার অশ্রুবাষ্পরুদ্ধ স্বরে ধীরে ধীরে বলল—“দাদা, আর কোনও উপায় নাই। আর রক্ষা নাই। তোমার বদলে এই শয়তান এখানের সবকয়টি মানুষকে মেরে ফেলবে। তার চাইতে… তুমি ধরা দাও দাদা। তুমি ধরা দাও।”

বিষ্ণুচরণ নাচমহলের ভিতরের অন্ধকারের থেকে বেরিয়ে দুয়ারের সামনে এসে দাঁড়ালো। প্রজারা দুরুদুরু বুকে প্রহর গুণতে লাগল। প্রবেশদ্বারের ঠিক ভিতরে শিকার, আর ঠিক বাইরে দুই হাত মাত্র দূরত্বে দাঁড়িয়ে শিকারী। মধ্যে কোনও বাধা নাই, আড়াল নাই।

চন্ড কাপালিক রক্ত জল করা দৃষ্টিতে কালীপদর দিকে একবার তাকিয়ে নিলো। তার হিংস্র দাঁতগুলি বেরিয়ে এল, জ্বলন্ত চোখদুটি ছোটো হয়ে এল। নিজের ডানহাতটি তুলে এগিয়ে দিল বিষ্ণুর মাথাকে স্পর্শ করার জন্য।

প্রাসাদ কাঁপিয়ে যেন সহস্র সহস্র আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ হলো। মানবদেহধারী কালান্তক ভস্মাসুরের হাতের থেকে ছুটে বেরুলো চোখধাঁধানো বজ্রের শিখা। চোখের পলকে নাচমহলের প্রতিটি দেওয়ালে, প্রতিটি কোণায় একটি আগুনের প্রভা দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল, আর সেই চক্ষু অন্ধ করা আলোর মধ্যেও চন্ড দেখলো তার শত্রু বিষ্ণুচরণ অক্ষতদেহে দাঁড়িয়ে রয়েচে।

*

কালীপদ এইবারে কান্নার খোলস ছেড়ে হো হো করে হেসে উঠল, আর মুহূর্তের মধ্যে চন্ডর কাছে কালীর কুটিল চতুরতা ধরা পড়ে গেল।

নিজের দাদাকে কেঁদে কেঁদে সাক্ষাৎ মৃত্যুর সামনে উপস্থিত হতে বলা, এবং দুয়ারের ঠিক ওপারে বিষ্ণুর এসে দাঁড়িয়ে থাকা, সবই ছিল ধূর্ত কালীগুণীনের সাজানো। এমনকি এত ঘর থাকতে এই পরিত্যক্ত ঘরটি নির্বাচন করাও কালীপদরই চালাকি। বিষ্ণুচরণের মাথাকে স্পর্শ করার জন্য চন্ড হাত বাড়িয়েচিলো ঠিকই, কিন্তু ঠিক তার আগেই তার হাতে ঠেকে যায় প্রায় অদৃশ্য মাকড়সার ফাঁদ। শর্ত মতো সেগুলি জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। এই জন্যই কালীপদ তার দাদাকে দরজার বদলে জানালা দিয়ে নাচমহলে ঢুকিয়েচিল, যাতে মাকড়সার ফাঁদগুলি অক্ষত থাকে।

জঙ্গলে ঘুরবার সময়ে কালী দেখতে পেয়েচিলো যে শেষের ক’দিন চন্ড মাটির সানকি থেকে খাবার খেয়েচিলো চেটে চেটে, হাত না ঠেকিয়ে। তখনই সে বুঝতে পারে চন্ডর কাছে স্পর্শজনিত কোনও একটি অমোঘ শক্তি রয়েচে। এবং তা রয়েচে নিশ্চিতরূপে তার হাতেই।

এই একাঘ্নী, একঘাতী বজ্রের শক্তি বেরিয়ে যাবার পর চন্ড এখন সাধারণ একজন তান্ত্রিক। ঠিক সাধারণ নয়। সে ইচ্ছে মৃত্যুতে বলীয়ান। দেহবলে বা মন্ত্রবলে কালীপদ তার প্রাণহরণ করতে পারবে না। আবার সেও কালীকে মন্ত্রতন্ত্রে বধ করতে পারবে না। এখন ভরসা বাহুবল। এখন ভরসা লৌকিক কোনও হত্যা পন্থা

প্রচণ্ড ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে চন্ড তাড়া করল কালীপদকে। কালী ক্ষিপ্রবেগে ছুটে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। পিছনে পিছনে সেই ভয়ঙ্কর কাপালিক। বাইরে বেরুনো মাত্র একটি প্রজা চন্ডর দিকে মাছের জাল ছুঁড়ে মারলো। চন্ড সেই জালে আটকে পড়ল।

নায়েব হরিচরণ একটি মশাল হাতে চিৎকার করে কালীকে কইলো—“কালীপদ… শয়তানটা জালে আটকা পড়েছে। এই সুযোগে এই মশালখানা নিয়ে ছাতে যাও। এবার পূজায় কামান ডাকেনি। বারুদ ঠাসাই রয়েচে। এই শয়তানটাকে উড়িয়ে দাও।”

কালী সবে এগুতে যাচ্ছে, এমন সময়ে কাপালিক বলিষ্ঠ হাতের টানে জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে কালীপদর দিকে হাত তুললো। অদৃশ্য কোনও বাঁধনে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকা পড়ে মাটিতে পড়ে গেল কালী। বিদ্যুতের বেগে এক লাফে বিস্মিত হরিচরণের হাত থেকে মশালটা কেড়ে নিয়ে চন্ড দৌড় দিয়ে পৌঁছে গেল খোলা ছাতে।

কালী প্রাণপণে জাল ছেঁড়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারচে না। চন্ড সেই প্রাচীন গুরুভার কামানের মুখ ঘোরালো কালীর দিকে। সকলে হায়হায় করে কেঁদে উঠল। প্রতিহিংসায় জ্বলতে থাকা চোখে কালীপদকে একবার দেখে নিয়ে কামানের অনলবর্ষী পেটে মশাল ঠেকালো কাপালিক।

*

প্রচণ্ড শব্দে আর আলোয় ফেটে পড়ল চারিদিক। প্রজারা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করল কামান ডেকেচে সত্য, কিন্তু গোলা বর্ষণ হয়নি। বরং শতাব্দী প্রাচীন অগ্নিবর্ষী তোপখানির একাংশ নিজেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণে টুকরো হয়ে গিয়েচে। সেই সঙ্গে চন্ড তান্ত্রিকও। কামানের নলে হরিচরণের ঠেসে দেওয়া চুন সুরকির পিন্ড এই একবেলাতে বজ্রকঠিন হয়ে গিয়ে কামানের শ্বাসরোধ করেচে, ফলে সে নিজেই উড়ে গিয়েচে। ভগবানের আসন নিতে চাওয়া ভস্মাসুর নিজেই ভস্মীভূত হয়েচে মানুষের তৈরি বজ্রের হাতে। তাও আবার নিজেরই হাতে।

সমস্ত মানুষগুলি একজোট হয়ে কালীগুণীনকে কাঁধে তুলে হৈচৈ করে আনন্দে মেতে উঠল। কালী বলল- “বুঝলে বৌদিমণি, চন্ড ভেবেচিল আমি বোধহয় ওকে জালে আটকে মারার ফন্দী এঁটেচি, কিন্তু আমি জানতুম ওকে জাল দিয়ে আটকানোর চেষ্টা আর হাতীকে চুলের ফিতা দিয়ে বেঁধে রাখার চেষ্টা একই ব্যাপার। আমার আসল উদ্দেশ্য ছিল যাতে হরিচরণ মশায়ের মুখে কামানের কথা শুনে ও কামানের দিকেই দৌড়ায়, কারণ আমাকে এছাড়া ও হত্যাও করতে পারতো না। তোপের মুখে দুপুরেই চুনসুরকি ঠেসে দেওয়া হয়েছিল।”

বিষ্ণুচরণ ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে কইলো—“বেশ কাজ করেচিস। এইবার লক্ষ্মী ছেলের মতো বাড়ি চল। তোর শ্বশুর মহেন্দ্রবাবু পত্র লিখেচিলেন। দুই ভায়ে মিলে একবার নেত্রপাণি যাবো বৌমাকে আনতে।”

কালীপদ মাথা চুলকে বললে—“কেবল সেইটেই আপাতত হচ্চে না দাদা। আমাকে এইখান থেকে একবার হিজলপোঁতায় যেতে হবে। সেইখেনে বড়ো বিপদ। তোমরাই বরং বাড়ি রওয়ানা দাও। দূগ্গা দুগ্গা।” বিষ্ণুচরণ মুখুজ্জে ভাইয়ের দিকে কটমট করে তাকিয়ে কইলো—“তুই আর কোনওদিনই বদলাবিনে। চিরটাকাল একই রয়ে গেলি হতভাগা। একেবারে হদ্দ বাউন্ডুলে।”

সূৰ্য্যমুখী মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ফিক করে হেসে উঠল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *