কালীগুণীন এবং দানবের মণি
আজকে তোমাদের এমন একখানা ঘটনা শোনাতে চলেচি, যে কথা তোমাদের কারুরই বিশ্বাস হবে না। হবার কথাও নয়। গোটা গাঁ জুড়ে সেবার যে মারণ উপদ্রব শুরু হয়েচিল, এবং তার থেকে উদ্ধার পাবার সময়ে যে অলৌকিক আশ্চর্য ঘটনার সাক্ষী পাঁচটা গাঁয়ের লোক হয়েচিল, তা বোধকরি রূপকথাকেও হার মানায়। তা, সেই কথাই আজ তোমাদের শোনাবো। চুপটি করে শোনো।
এই ভয়ংকর বিপদটা যে গাঁয়ের উপর ঠিক কোনদিক থেকে এল এবং কেনই বা এল তা কেউ অনেক চেষ্টার পরেও বুঝতেই পারলে না। না কোনও অপঘাত, না কোনও আপদ, না কিচ্ছু। আততায়ীর সম্বন্ধেও সম্পূর্ণ ধোঁয়াশাই রয়ে গেল। মৃত মানুষগুলির পরিবারের কেউ কেউ বলে ভয়ানক একখানা কালো বাদুড় তারা দেখেচে, কেউ বা কয় সেটা ভীষণ দেখতে একটা দৈত্যবিশেষ, আবার কেউ বলে ওসব কিছু নয়, স্রেফ একটা হাড়কাঁপানো হাওয়া টের পাওয়া গিয়েচিল মাত্তর, কিন্তু সে যেই হোক, এমন কোন জন্তু বা জানোয়ার হতে পারে যে একখানা গায়েগতরে জোয়ান মদ্দ লোককে একরাত্তিরে একেবারে শুকনো কাঠের মতো ছিবড়া করে দিয়ে অমন নৃশংস ভাবে হত্যা করতে পারে? তাই নয়, মানুষগুলোর মরার আগে যেন কোনও ভয়ঙ্কর কিছু দেখে ভয় পেয়ে তাদের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে গিয়েচিল এবং চক্ষুদ্বয় আতঙ্কে ঠিকরে বেরিয়ে এসেচিল। তাছাড়া পরপর এলোপাতাড়ি নরহত্যার মতো এত বড়ো মারণযজ্ঞের পিছনে একটা কারণ অথবা উদ্দেশ্যও তো থাকতে হবে!
বুড়া থেকে যুবা, জবাব নাই কারুর কাছেই।
হত্যাকারী উড়তে পারে কিনা কারুর জানা নাই, তবে দেখা গিয়েচে নরমেধের অকুস্থলে ছাড়া অপর কোত্থাও কোনও পায়ের ছাপ থাকে না। কেবল বধ্যভূমির খুব নিকটে একজোড়া বাঘের মতো অথচ বাঘের তুলনায় পাঁচগুণ বড়ো থাবার ছাপ পাওয়া গিয়েচে প্রতিবারই। শুষ্ক মাটির উপরে এমন গভীর ছাপ পড়ার অর্থ জানোয়ারটি অত্যন্ত গুরুভার দেহের অধিকারী। অজ্ঞাত জীবটার নরহত্যার পদ্ধতিগুলিও আলাদা আলাদা এবং অতীব ভয়াবহ। তার পুরোটা তোমাদের শুনিয়ে একেবারেই কাজ নাই। সে কথায় পরে আসচি না হয়।
সোনাঝুরি গাঁয়ের জমিদার পাল পরিবারের খ্যাতি কেবল তাঁদের বৈভবের জন্যই নয়। এই পরিবারের ছোটো ছেলে কেতু পাল নামজাদা কবরেজ। বড়ো নিরঞ্জন পাল হল পট শিল্পী। গোলমাল কেবল মেজো ভাই সনাতন পালকে নিয়ে। সনাতন বাস্তবিকই একটু খ্যাপাটে গোছের মানুষ। কোনও কাজেই তার অধিক দিন মন বসে না। কখনও কলকেতার শিয়ালদহ ইস্টিশানের কাছে রিপন কলেজে ইতিহাসের শিক্ষক মার্শাল সাহেবের অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে কাজ করল, তো কখনও ইংরাজবাহাদুরের অধীনে মাটি খনন ও জরিপের কাজ নিয়ে মুলুকে মুলুকে ঘুরে বেড়ালো। কিন্তু হলে কি হয়, তার জাত-ব্যবসায়, অর্থাৎ প্রতিমা শিল্পে সনাতন পালের জুড়িদার পাওয়া কঠিন। তার মতো বিগ্রহের চোখ মুখ, হাতের আঙুল, দেহের সৌষ্ঠব আর কেউ আনতেই পারতো না, তাই ন’মাসে ছ’মাসে গৃহে ফিরলেই লোকজন হাজার আবদার নিয়ে এসে প্রতিমার বায়না দিয়ে যেতো। সনাতন কইতো—“মূর্তির আসল গুণ হল আঙুল, চোয়াল, চোখ আর নাক। এইগুলি যথাযথ ভাবে গড়তে পারলে মূর্তির শোভাই পাল্টে যায়।”
গুণী লোক খ্যাপাটে হলেও নিজগুণে কদর পায়। সনাতন বায়না অনুযায়ী বিগ্রহ গড়ে দিয়েই আবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তো নূতন খেয়ালে। কিন্তু তার হৃদয়খানি ছিল উদার এবং বাৎসল্য গুণ বিশিষ্ট।
তাঁর এক প্রজা রহিম শেখ কার্যোপলক্ষ্যে কলিকাতায় গিয়ে ঠগ ও তস্করের হাতে সর্বস্ব হারিয়ে মরতে বসেচিল। লোকমুখে খবর পেয়ে সনাতন তৎক্ষণাৎ শ’দুয়েক টাকা দিয়ে নিজের গোমস্তাকে পাঠিয়ে তাকে উদ্ধার করে আনে। সে টাকা কৃতজ্ঞ রহিম ধীরে ধীরে পরিশোধ করে দিতে চাইলেও সনাতন আর ফেরৎ নেয়নি।
তারপর ধরো, সেবার জষ্টির শেষের থেকে ভাদ্দরের শুরুর হপ্তা অবধি সুন্দরবন এলাকায় তাঁবু ফেলেচিল স্বয়ং জিলা ম্যাজিস্ট্রেট ম্যাক্সোয়েল সায়েব এবং একদল ভূ-বিজ্ঞানী। সায়েবের তত্ত্বাবধানে বাদা অঞ্চলের মানচিত্র তৈরির কর্ম চলেচে নিখুঁতভাবে। ভূ-বিজ্ঞানীরা আগুনের তাপ ভরা বেলুনে চেপে আকাশপথে গাঁ, জঙ্গল, নদী, নালা, ক্ষেতখামার, বন, মহাবন, সবকিছুর ছবি আঁকচিলেন। তা, সোনাঝুরি গাঁয়ের উপর দিয়ে ওড়ার সময়ে এক গোরা সায়েবের বেলুন কীভাবে যেন ফুটো হয়ে যায়, এবং আছড়ে পড়ে গাঁয়ের মাটিতেই। সায়েব ভয়ানক আহত হন, কিন্তু সনাতনের সাতদিনের অক্লান্ত সেবাতে সে যাত্রা তাঁর প্রাণরক্ষা হয়। অত্যন্ত খুশি হয়ে সায়েব তাকে ইচ্ছে মতো অর্থ পুরস্কার চেয়ে নিতে বলেন, কিন্তু সনাতন হাসতে হাসতে অর্থ অথবা অন্য পুরস্কারের বদলে ফুটো বেলুনখানাই চেয়ে নেয় গাঁয়ে স্মৃতি করে রাখবে বলে। সায়েব হো হো করে হেসে তক্ষুনি সেখানা উপহার দেন এই ক্ষ্যাপা জমিদার সনাতনকে। পরে এই সায়েব নিজের তাঁবুতে ফিরে এই নির্লোভ অথচ সুশাসক এই মানুষটির গল্প সক্কলকে শুনিয়েচিলেন।
গাঁয়ে একটি ঘরে রাণীবালা নামের এক রূপসী বিধবা তার দুই কন্যাকে নিয়ে বাস করতো। এই রাণীবালার পূর্ব জীবনের একটি ইতিহাস ছিল। রাণীর বিবাহ হয় কাঁকড়াঝোরার বিমল পরামাণিকের সঙ্গে, কিন্তু বিবাহের তৃতীয় বৎসরেই স্বামী হারায় সে। বাপের ভিটেতে ফিরে এসে কিছুদিন থাকাকালীন পাশের তালুকের হরিধন তোপদার রাণীকে তার দুই কন্যা সহ বিধবাবিবাহ করে এবং ঠিক নয় মাসের মাথায় সর্পাঘাতে জীবন হারায়। এই অবধি প্রতিবাসীরা কিচ্ছু বলেনি, কিন্তু তৃতীয়বার যখন গাঁয়েরই ছেলে বিনয় তার প্রেমাকাঙ্খী হয়ে পড়ে এবং একদিনের বৃষ্টিতে ভিজে প্রবল জ্বরে প্রাণ হারায়, তখন গাঁয়ের লোকজন একেবারে ক্ষেপে উঠল। তারা ঠিক করল যে এই রাণী আসলে এক বিষকন্যা। এর উপরে কোনও অপদেবতার কুনজর রয়েচে এবং একে বাঁচিয়ে রাখলে এই ডাকিনীর কূহকে আরও অনেক পুরুষের প্রাণ নষ্ট হবে। লোকজন দল বেঁধে যখন রাণীকে তার দুই কন্যা সমেত পিটিয়ে মারতে যাচ্চে, তখন সনাতন উপস্থিত হয়ে তাদের নিরস্ত করে। সনাতনকে সকলে সত্য সত্যই ভালোবাসতো, তাই তার কথার উপরে কেউ আর কথা কইলো না। রাণীকে তারা ছেড়ে দিলো বটে, কিন্তু একঘরে করে রাখলো। রাণীবালাকে কেউ প্রকাশ্যে বিষকন্যা বললে সনাতন বড়ো বিরক্ত হতো। সে কইতো— “ঈশ্বরের সৃজন করা কোনও প্রাণীকে এইভাবে হীন করতে নেই। ছোট করতে নেই। ওরা অসহায় কিন্তু বড়ো বিশ্বস্ত।”
সরলমনা সনাতন যতই বিশ্বস্ততার দোহাই দিক, গাঁয়ের এক আধজন কিন্তু এ নিয়ে আড়ালে ব্যঙ্গ রসিকতা করতে ছাড়তো না। আবার কেউ কেউ প্রতিবাদ করে বলতো—“নাহ্, মেজোকুমার যখন দিব্যি প্রাণে বেঁচে রয়েচে, তখন বুঝতে হবে যে ওদের মধ্যে আদৌ ওসব…।”
যাক সে কথা, কি যেন বলচিলাম, —
তা, একদিন এই সনাতন সারা রাত্তির ধরে বায়নার ঠাকুর গড়বে বলে নিজের নদীপাড়ের কারখানাতেই রাতে রয়ে গিয়েচিল। সনাতনের কারখানার আশপাশে গায়ে গায়ে অনেকগুলি প্রতিমা গড়ার কারখানা। সবকটিতেই পুরোদমে কাজ চলচে। সামনেই বিশ্বকর্মা এবং দূর্গাপূজা, তাই এই দুই মাসে ভীষণ ব্যস্ততা থাকে কুমারটুলিগুলিতে। সনাতন কুমার হলেও জমিদার তো বটে, এবং সেই সঙ্গে একটু আধটু পাগলামিও তার রয়েচে, তাই তার কারখানাকে কারখানা বললে সে ক্ষেপে যেত। তাতে নাকি তার মর্যাদার হানি ঘটে। বিদেশীদের নকল করে সে কইতো ইস্টুডিও। ভীষণ শৌখিন এই মানুষটা কারখানার প্রতিটি কোণা একেবারে ঝকঝকে করে রাখতো। দামি দামি সরঞ্জাম, মূল্যবান রং, প্রভৃতি দিয়ে সে তার ইস্টুডিও চালাতো।
যে দিনের কথা বলচি, সেদিন ভোর বেলায় সনাতন বাড়ি ফিরেই শয্যায় শুয়ে পড়ল। স্ত্রী নয়নতারা লক্ষ্য করলে যে এক রাত্তিরেই স্বামীর চোখের কোলে কালি পড়েচে, চুল উস্কোখুস্কো, দৃষ্টি বিহ্বল। নয়নতারা ভাবলে রাতের পর রাত জেগে ঠাকুর গড়ার ফলেই অমন হয়েচে বুঝি বা। সে এও ঠিক করলে যে কাল বটঠাকুরকে দিয়ে স্বামীকে বকুনি খাওয়াবে, যাতে এভাবে রাত না জাগে। কিন্তু সেসব কিছুই হল না। সবার দৃষ্টির অলক্ষ্যে বসে স্বয়ং নিয়তি তার স্বামীটিকে নিয়ে এক ভয়ঙ্কর জাল রচনা করে চলেচিল। সনাতনের ঠিক কী হয়েচে তার মর্মান্তিক আভাস পাওয়া গেল দিনকতকের মধ্যেই।
*****
সে দিনের পর থেকে সনাতন সবসময়ই কেমন যেন আনমনা হয়ে থাকে। খায় দায়, নিয়ম করে কারখানাতেও যায়, মূর্তিও তৈয়ারী করে, কিন্তু সর্বদাই যেন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। অধিক কথা কয় না, হাসে না, এমনকি নয়নতারার সাথে অবধি আগের মতো হাসি ঠাট্টা করে না। এই সেদিনও স্ত্রীকে উসখুশ করে কি একটা বলব বলব করেও বলল না।
এই পরিস্থিতিতে একদিন সনাতন নিজের কারখানায় মূর্তি গড়চে, হঠাৎ বাইরের কাঠের কপাটে কড়া নাড়ার শব্দ শোনা গেল। এ সময়ে সাধারণত কেউই আসে না এইখেনে। সনাতন একটু অবাক হয়েই দরজা খুলে দিলো এবং চমকে উঠল। দরজা পেরিয়ে ঘরে এসে ঢুকেচে এক ভীষণ দর্শন পুরুষ। পরণে কাপালিকের ন্যায় বসন, কপালে ভস্ম মাখা, হাতে একখানি মানুষের অস্থি, দৃষ্টি অতি ভয়ানক। সেই ব্যক্তি সনাতনের দিকে একটু সময় চেয়ে থেকে নিজের দক্ষিণ হস্ত প্রসারিত করল কিছু চাইবার ভঙ্গিতে। সনাতনের রক্ত জল হয়ে গেল। সে পরিষ্কার বুঝতে পারচে কাপালিক তার কাছে কী চাইচে। সে অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে কাঁপতে থাকলো। কাপালিক তা লক্ষ্য করে গম্ভীর কণ্ঠে বললে— “শোন রে পাপিষ্ঠ, যে মণির সন্ধান তুই দৈবাৎ পেয়েচিস, সেই মণি আমি বৎসরের পর বৎসর উন্মাদের ন্যায় খুঁজে বেড়িয়েচি। তার সন্ধানে সন্ধানে আমি প্রাচীন পুরাণের গ্রন্থের যেখানেই ওটির উল্লেখ রয়েচে, সেখানেই ছুটে গিয়েচি। অবশেষে অনেক হিসেব নিকেশ করে এই তল্লাটে ডেরা ফেলেচিলাম, কিন্তু তোর কপাল যে তুই আমার আগে সেখানা হাতে পেয়েচিস। আমার চর সর্বত্র, তাই তুইও লুকাতে পারিসনি। তবে তোর সাধ্য নাই ও মণি রক্ষা করার। আমি কাপালিক চিত্রক। আমার ক্ষমতা যে ঠিক কতখানি তার সম্বন্ধে তোর মতো ক্ষুদ্র সংসারী মানবকণার কোনও ধারণাই নাই। তোকে ঠিক তিনটি দিন সময় দিয়ে যাচ্চি। তৃতীয়দিন মধ্যরাত্রে আমি আসবো। সেইদিন যদি ওই মণি আমার হাতে না পাই তবে তোর সংসারের সঙ্গে সঙ্গে তোর গোটা তালুককে আমি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিয়ে যাবো। ওই জিনিসখানা হাতে পেলে আমি গোটা বিশ্বের অধিপতি হব।
আরও শোন, এই মণির আসল মালিক এটি খুঁজতে বেরিয়েচিল। আমি তাকে বন্দি বানিয়ে নিজের ডেরায় আটক করে রেখেচি। ঠিক তিনটি দিন। স্মরণ রাখিস।”—এই বলে চিত্রক বেরিয়ে গেল।
সনাতন ভয়ে, চিত্তবিকারে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়ল। চিত্রক কে, কতটুকু তার শক্তি, তা সনাতন জানে না, কিন্তু মণিখানা পাবার কয়েক দিনের মধ্যেই এই কাপালিক তার সন্ধান পেয়ে গিয়েচে, এ কথা তো অসত্য নয়! অমন নৃশংস চাহনি, অমন হিংস্র স্বর কোনও সাধারণ মানুষের হতেই পারে না। আর তাছাড়া, এই মণিটির মালিককে বন্দি বানিয়েচে এই পাষণ্ড কাপালিক? এও কি সম্ভব? যদি তা সত্য হয় তবে এইবার সনাতনের পালা।
সনাতন দোটানায় পড়ে ছটফট করতে লাগল। দিন কয়েক আগে সে দৈবাৎ এই মণিটি আবিষ্কার করে অদ্ভুতভাবেই, এবং আরও দৈবাৎ সে এই মণির আশ্চর্য গুণও জেনে ফেলেচে, আর সেই কারণেই সে বেশ জানে এই দিব্য বস্তু শয়তানের হাতে পড়লে পরিণতি হবে অতি মারাত্মক। তার এবং তার পরিবারের জীবন যায় যাক, কিন্তু এত বড়ো প্রমাদ সে কিছুতেই ঘটতে দেবে না। আজকের মধ্যেই কোনও গুপ্তস্থানে অথবা কোনও বিশ্বস্ত কারুর কাছে এটি লুকিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু কার কাছে? চিন্তা করতে করতে হঠাৎ তার মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ খেলে গেল। হয়েচে! উপায় হয়েচে! যোগ্য বিশ্বস্ত ব্যক্তি এবং স্থান পাওয়া গিয়েচে।
পরদিন মহা মূল্যবান মণিখানা লুকিয়ে ফেলে সনাতন গৃহে ফিরলো।
*****
পরদিবসে মূর্তি গড়ার সময়ে চোখ পড়ল বেড়ালটার উপরে। এমনিতে পটুয়াপাড়াতে বেড়ালের কিছু কমতি নাই। ডাঁই করা খড়, বিচুলি, মাটি আর কাগজ, কাপড়ের স্তুপের মধ্যে হাজারে হাজারে ইন্দুরের বাসা হয়, এবং তাদের খেয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করবার জন্য বাসা বাঁধে অসংখ্য বেড়ালের দল। কিন্তু এই বেড়ালটা যেন একটু আলাদা। জুলজুল করে চেয়ে চেয়ে মূর্তি গড়া দেখে, সনাতনের পায়ে পায়ে ঘোরে, এমনকি কদিনের মধ্যেই সে খেয়াল করল বেড়ালটা তার পিছু পিছু বাড়িতেও হাজির হয়েচে। সনাতন পশু পাখিকে বড়ো স্নেহ করতো, তাই সে বেড়ালটাকে তাড়াল না, এবং দু-তিনদিনের মধ্যেই ওটার উপস্থিতি সম্পূর্ণ ভুলে গেল। তিনদিন কেটে চতুর্থদিনের মাথায় সনাতন নিশ্চিত হলো যে ঐ কাপালিক আর আসবে না সম্ভবতঃ। এলেও সনাতন না বললে মণিখানার সন্ধান সে কোনওমতেই পাবে না। মন যতই আশ্বাস পাক, কিন্তু সনাতনের সবসময়ই মনে হতো যে কোথাও থেকে যেন একজোড়া চোখ তাকে প্রতিনিয়ত লক্ষ্য করে চলেচে।
*****
কাকভোরে চিত্রক কাপালিক নিদ্রা থেকে উঠেই দেখলো পায়ের কাছে তার পাঠানো বেড়ালটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে শুধোলো—“কী খবর এনেচিস ভূমলা? মণির হদিশ পেয়েচিস?”
ভূমলা মানুষের কণ্ঠে জবাব দিলো—“এখনও পাইনি মালিক। সে হতভাগা কোথায় যে লুকিয়েচে বুঝতেই পারচি নে! তন্নতন্ন করে খুঁজেছি।”
চিত্রক ক্রোধে দাঁতে দাঁত ঘষে কইলো, “যত্তোসব অপদার্থের দল। তিনটি দিন একসাথে থেকেও খোঁজ পেলিনে মূর্খ? দূর হ আমার সুমুখ থেকে।”
–“তিনদিন সময় দিন মালিক। আমি ঠিক বের করে নেবো।”
চিত্রক বিরক্ত মুখে বললে- “না না না। তিনদিন নয়। মাত্র একটি দিন সময় দিলাম। যদি আজও খোঁজ না পাওয়া যায়, তবে সনাতনকে এমন ভীষণ শাস্তি দেবো যে ও বেঁচে মরে রইবে। মন দিয়ে শোন, এইভাবে আর লুকিয়ে লুকিয়ে মণি খোঁজা সম্ভব নয়। এই একদিনের মধ্যে খুঁজে পেলে উত্তম, নয়তো পরের দিন যে কোনও উপায়ে তুই নিজের মুখের লালা ওর খাবারে বা পানীয়ে মিশিয়ে দিবি যে ভাবেই হোক। তারপর যা করার আমি করবো। তোর লালা ওর শরীরে প্রবেশ মাত্তর আমি কুন্ডকপশ্য যজ্ঞে বসবো, আর তারপর? হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। তারপর তুই যত ইচ্ছে মণি খুঁজে বেড়াতে পারবি হতভাগা। মনে রাখবি মণিটি কিন্তু অদৃশ্য মণি। তুই চোখে দেখতেই পাবি নে, ফলে নিজের থেকে খুঁজেও পাবিনে। তাই সনাতনের প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য কর। তবেই সন্ধান মিলবে। না হলে কবেই আমি হত্যা করতুম ওকে। তবে ও যাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, তারা নিশ্চিতরূপে কিছু জানতে পারে। আমি তাদের কাছে খবর নেবো। বলতে পারে তো ভালো, নয়তো অমনিই মেরে রেখে আসবো’খন। এখন দূর হঃ।”
“যে আজ্ঞা মালিক”–ভূমলা প্রস্থান করল।
*****
একদিন সময় অতিবাহিত হয়ে গেল, কিন্তু ভূমলা সনাতনের কোনও কাজে কর্মে মণির টিকিটিরও সন্ধান পেলো না। পরদিবস সকাল থেকেই চিত্রকের আজ্ঞা মতো সে ফাঁক খুঁজতে আরম্ভ করল সনাতনের খাদ্যে বা পানীয়ে নিজের মুখের লালা মিশ্রিত করবার, কিন্তু কিছুতেই সুযোগ হল না। নয়নতারা স্বহস্তে অন্নপাত্র সাজিয়ে হাতপাখা নিয়ে স্বামীকে আহার করায়, স্বহস্তে জল গড়িয়ে দেয়, এর মাঝে কোনও সুযোগ নাই সেসবে মুখ দেবার। আবার সনাতনের নিদ্রার সময়ে নিঃসাড়ে গিয়ে তার ঠোঁট চেটে আসারও তেমন সুবিধা নাই, কারণ এখন সে আর কারখানায় শয়ন করে না এবং নয়ন স্বামীর সাথে শয্যাগ্রহণের পূর্বে দোর এঁটে শোয়। ভূমলা তক্কে তক্কে ঘুরতে লাগল।
একদিন সনাতন কারখানায় বসে নিজ হস্তে বিগ্রহের পোশাক সেলাই করচিল। কাপড়চোপড়, রাঙতা, সূঁচ সূতা নিয়ে সদ্য বসেচে, এমন সময়ে কি যেন হুড়মুড়িয়ে পতনের শব্দ হলো। সনাতন ধড়মড় করে উঠে গিয়ে দেখে কে যেন তার কারখানার সরঞ্জামগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়েচে। সন্দিগ্ধ চিত্তে সেগুলি যথাস্থানে রেখে সনাতন আবার কাজ নিয়ে বসলো। বেশ কিছুটা সময় পার হয়েচে, হঠাৎ তার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো, কেউ যেন তার জিভটা ধরে টানচে। সামান্য পরেই হাতে পায়েও একই রকম করতে থাকলো, সঙ্গে বুকের বাম দিকটায় প্রচণ্ডভাবে বেদনা হতে শুরু করল। বিদ্যুৎবেগে উঠে দাঁড়িয়ে পড়া মাত্র সনাতন বুঝতে পারলে যে সে পক্ষাঘাতের শিকার হয়েচে। জিভ অসাড় হয়ে আসচে, হাত পা বেঁকে যাচ্চে, বুকটা ফেটে যাচ্চে, কিন্তু ঐ অবস্থাতেও সে এঁকেবেঁকে দৌড়াতে শুরু করলে গৃহের পানে, এবং সেই সঙ্গে পটুয়াপাড়ার বাকি কারিগরেরাও তাদের প্রিয় মেজোকুমারের সেই অবস্থা দেখে পিছনে পিছনে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে দল বেঁধে চলতে থাকলো।
বাড়ির দাওয়ার কাছে এসে সনাতন আছাড় খেয়ে পড়ে গেল। নয়নতারা এবং বাড়ির প্রতিটি মানুষ হায় হায় করে বেরিয়ে এসে তাকে তুলতে গেল। বড়োকুমার কাঁদতে কাঁদতে বলল—“তনু, ভাই আমার, কী হয়েচে কী তোর? হা ঈশ্বর, তোর গা এমন ঠান্ডা হয়েচে কেন? কথা কইচিস না কেন তুই ভাই?”
সনাতন বহু ক্লেশে হাঁপাতে হাঁপাতে, জড়ানো কণ্ঠে উপস্থিত প্রজাগণ এবং পরিবারের উদ্যেশ্যে কেবল এইটুকুই বললে—“বিষকন্যার বড়োমেয়ে… পৌষপার্বণ।”
তারপরেই গোঁ গোঁ করে অচেতন হয়ে পড়ল। ছোটকুমার নিজে বিখ্যাত কবরেজ, সে এসে দাদার নাড়ী পরীক্ষা করে বিস্মিত স্বরে সকলকে জানালে “মেজোকুমার কোনও কারণে হঠাৎ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু আরও আশ্চর্য কথা এই যে, তার নাড়ীর গতি, হৃদস্পন্দন, এমনকি নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের গতিও সম্পূর্ণ পালটে গিয়েচে। এমনটি আমি এতদিনের চিকিচ্ছে জীবনে কোনও রোগীর ক্ষেত্রে কক্ষণো দেখিনি।”
*****
পরদিবসে প্রভাতেই মেজোকুমারের সম্বিৎ ফিরলো দেখে বাড়ির এবং তালুকের প্রতিটি মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো, কিন্তু স্ত্রী নয়নতারা প্রথম টের পেলো স্বামীর পরিবর্তনটা।
সনাতনের খাওয়া দাওয়া বদলে গিয়েচে, কারুর সঙ্গে কোনও কথা কয় না, আর সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হলো সে সারাদিনই এখানে ওখানে কী যেন হাতড়াতে থাকে, যেন সে অসুস্থ হবার পূর্বে কিছু একটা কোথাও রেখেচিল, কিন্তু অসুস্থতার পরে স্থানটি ভুলে গিয়েচে, এবং তন্নতন্ন করে তার হদিশ করে চলেচে। দিন দুই পরে নয়ন তার ঠাকুরপো’কে ব্যাপারটা জানালে, কিন্তু তারা কইলো—“না না বৌদিমণি, ও তোমার ভ্রান্তি বৈ তো নয়। দাদার উপর যে শারীরিক ক্লেশ গিয়েচে, তারই ফলে সামান্য বাতুলতা দেখা দিয়েচে। অমন ঢের চিকিচ্ছে আমি করেচি। সদর থেকে সায়েব ডাক্তার আনাচ্চি’খন। দেখবে, একদাগ ওষুধেই রোগ পালিয়ে যাবে।”
চিকিৎসাশাস্ত্রে অজ্ঞ পল্লীবধূ ভাবলে যে হয়তো হবেও বা তাই। মনকে সান্ত্বনা দিলো যে মানুষটাকে ভূতেও পায়নি, বায়ুর রোগেও ধরেনি, কেবল শারীরিক অসোয়াস্তির জন্যই অমনটি করচে।
রোজই প্রায় দশ বারোজন রায়ত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কুমারকে দেখতে আসে। তা সেইদিন দ্বিপ্রহরে দুইজন প্রজার সঙ্গে মেজোকুমারকে দেখতে এল গাঁয়ের বৃদ্ধ মাঝি শক্তিনাথ, এবং শয়নকক্ষে পা দেওয়া মাত্তর সে শিউরে উঠল। তীক্ষ্ণ চক্ষে শায়িত সনাতনের দিকে চেয়ে সে অস্ফুটস্বরে কইলো— “তবে যে তোরা বললি মেজোকুমারের অসুখ করেচে? অসুখ-বিসুখ কোথা? এ যে বড়ো সর্বনাশটাই উপস্থিত হয়েচে। হা ঈশ্বর।” জাতে পাটনী হলেও এই জ্ঞানবৃদ্ধকে জমিদারবাড়ি সহ প্রতিটি মানুষ যারপরনাই মান্য করতো। বড়োকুমার নিরঞ্জন অবাক হয়ে শুধোলো “তবে? অসুখ নয়? তবে কী হয়েচে তনুর?”
শক্তিনাথ জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল—“অসুখ নয়, অসুখ নয়, মেজোকুমারকে কিছুতে ধরেচে। এই লক্ষণ আমি কিছু কিছু বুঝি। ঘরে ঢোকা ইস্তক এখনও অবধি সেই ভেবেই আমি সারা হচ্চি।”
— “হা ভগবান! এ আপনি কী বলচেন খুড়োমশায়! তবে! তবে এর বিহিত কী? নিদান কী?”
শক্তি কিছুটা সময় চুপ করে থেকে বলল—“আমার দুইটি কথা যদি শোনো তবে হয়তো মেজোকুমারের প্রাণ নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচলেও বাঁচতে পারে। বাকিটা ঈশ্বরের হাতে।
প্রথম কথা হলো— কেবলমাত্র নিজের পরিবারের লোক ব্যতীত কারুকে কুমারের কাছে আসতে দেওয়া চলবে না। একখানা বেড়ালকে বাইরে ঘুরঘুর করতে দেখচি, তাকেও তাড়াতে হবে। এই কক্ষে আজ থেকে কুলুপ দিতে হবে।
আর দ্বিতীয় কথাটি হলো— রায়দীঘড়ার কালীপদ মুখুজ্জেকে একখানা খবর পাঠাতে হবে। তার দাদা বিষ্ণুচরণকে আমার নাম করে পত্র দাও। আজই।
*****
সন্ধ্যার মুখে কাপালিক চিত্রক জঙ্গলের থেকে দুইখানা মরা সাপ আর কতক কাঠকুটো নিয়ে নদীর পাড়ে জঙ্গলে আবৃত টিলাটার উপরে, নিজের ডেরায় প্রবেশ করল। তার ডেরাটি কিন্তু আর দশজন গড়পড়তা তান্ত্রিকের বা কাপালিকের মতো নয়। আচমকা চোখ পড়লে হৃৎপিণ্ড ধড়াস করে ওঠে।
মূল গুহার বাইরেটায় দক্ষিণদিকে সারি সারি নরমুন্ড কাঠের খুঁটির আগায় গাঁথানো রয়েচে এবং সেগুলি বেশিদিনের বাসী নয়। একটি বৃক্ষের গুঁড়ির কাছে এয়োস্ত্রীর যতো সামগ্রী, সিন্দুরপাত্র, শঙ্খবলয়, প্রবাল বলয়, লালপেড়ে শাড়ি ইত্যাদি ডাঁই করে রাখা আছে। গোটাকতক মৃত হরিণ দড়ি-পা করে ঝোলানো রয়েচে পাশের জামগাছের শাখায়। তাদের মাথায় সিন্দুরের টিকা। এগুলি চিত্রকের যজ্ঞের উপাচার। গুহার বাম দিকে ঝিমুচ্চে একখানা সাদা রঙের হাতী। তার কপালেও রক্তবর্ণ তিলক কাটা। সবশেষে গুহার একেবারে পিছনের দিকে এক স্থানে চক্রাকারে আগুন জ্বলচে, এবং সেই অনলচক্রের মধ্যস্থলে বসে রয়েচেন একজন পুরুষ। দশাসই চেহারা এবং একনজরেই বোঝা যায় যে তাঁর দেহে বিলক্ষণ বল রয়েচে, কিন্তু কোনওক্রমে চিত্রক তাঁকে ঐ হুতাশনের বেড়ার মধ্যে আটকে রেখে দিয়েচে। চিত্রক সেই আগুনের গন্ডীর সামনে এসে তাঁর উদ্যেশ্যে ব্যঙ্গপূর্ণ স্বরে কইলো—“কী আচার্য? আজ আর বেরুবার চেষ্টা করোনি তো? করেও সুবিধা হবে না ততো। যে গন্ডীতে তোমাকে আমি বেঁধেচি, তা ভাঙার সাধ্যি তোমার নাই। মণির সন্ধান আমি দুই একদিনের মধ্যেই পেয়ে যাচ্চি। ততোদিন শান্তভাবে আমার অতিথি হয়েই থাকলে না হয়। একবার মুক্তি পেলে তুমি আমাকে বধ করার চেষ্টা বিলক্ষণ করবে, তাই মণি আমার হস্তগত না হওয়া অবধি তোমাকে বন্দি হয়েই রইতে হবে। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ।”
বন্দির ঘৃণামিশ্রিত দৃষ্টিকে অবজ্ঞা করে কাপালিক হাসতে হাসতে গুহায় প্রবেশ করল।
.
সনাতনের সাথে যতগুলি সম্ভাব্য মানুষের ঘনিষ্ঠতা ছিল তাদের কারুর কাছেই মণিটির হদিশ না পেয়ে এই ক’দিনে এক এক করে তাদের পৈশাচিকভাবে হত্যা করা শুরু করেচে সে। রক্ত শুষে খেয়ে শুষ্ক কাঠের ন্যায় মড়াগুলির মাথাগুলি কেটে এনেচে। গাঁয়ের লোকেদের মধ্যে প্রচণ্ড আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বাকিদের মধ্যে সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে যে দুইজন মানুষ, তাদের একজনের নাম সনাতন নিজেই করেচে। বিষকন্যা বলে পরিচিত রাণীবালার বড়োমেয়ে ললনা, আর দ্বিতীয়জন স্বয়ং নয়নতারা। আজ একজনের প্রাণ হরণ করবে চিত্রক।
গুহায় প্রবিষ্ট হয়ে কাপালিক একখানা স্ফটিকের গোলক বার করে অস্ফুটে কী যেন বলে উঠল, আর গোলকের মধ্যে পরিষ্কার দেখা গেল রাণীবালার মেয়ে ললনাকে। চিত্রক সরু চোখে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বজ্রগম্ভীর স্বরে চিৎকার করে বলল—“লামাআআআআ।”
সহসা চিত্রকের সামনে বাতাসে ভেসে থাকা অবস্থায় দেখা দিলো এক অতি ভয়ংকর দর্শন প্রেতমূর্তি। মুখমণ্ডল কঙ্কালসার। ধারালো দাঁতের সারি মশালদন্ডের স্বল্প আলোকেও চকচক করচে। প্রকাণ্ড আকারের দেহ। পায়ের আকৃতি অবিকল বাঘের ন্যায়, কিন্তু তুলনায় অনেকখানি বড়ো। তার অগ্রভাগে বাঁকানো নখের সারি।
লামা একজন ডুঙরি পিশাচ। যে সকল মানুষেরা বহু মানুষের সমবেত হিংস্র আক্রমণে চরম যন্ত্রণা পেয়ে মৃত্যুবরণ করে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ দোষ পেলে ডুঙরি পিশাচে পরিণত হয় এবং এই প্রেতযোনী থেকে মুক্তিলাভের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকে। এরা ভয়াবহ হিংস্র এবং নৃশংস হয়। এদেরকে প্রেতলোকের আতঙ্ক বলা হয়ে থাকে। গুপ্ততন্ত্রের শ্লোকে এদের বর্ণনায় বলা হয়েচে— “ডোঙ্গর তথা ডুঙ্গরি পিশাচ হইলো সকল পিশাচকূলের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সহিংস। ইহাদের দেহাবয়ব প্রতি ক্ষেত্রেই জান্তব স্বরূপ হইয়া থাকে। ইহাদের দর্শনমাত্র নিশ্চিত মরণ প্রমাদ উপস্থিত হয়। ইহাদের গতিবিধি জলে স্থলে অন্তরীক্ষেঃ সর্বত্র অবাধ।”
চিত্রক এই লামাকে মন্ত্রপ্রভাবে বশ করে নিজের অধীনে আনে, এবং নিজের বাহন রূপে নিযুক্ত করে। একমাত্র চিত্রক ব্যতীত ত্রিভূবনের অপর কেউ তার পিঠে চাপতে সমর্থ নয়। অপরাপর কেউ মনের ভুলেও সেই চেষ্টা করলে এই হিংস্র পিশাচ তাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে তৎক্ষণাৎ।
প্রভুর আদেশে মাথা নীচু করে দাঁড়ানো মাত্র চিত্রক এক লাফে তার পিঠে চেপে বসে আদেশ দিলো—“নদীর বাঁধ।”
*****
ললনাময়ী সাঁঝের মুখে নদীর ঘাটে জল ভরতে গিয়েচিল। আর সবার জল নেবার সময়ে তারা জল নিতে পারে না। এমনিতেই তাদের মায়ের বড়ো দুর্নাম, তায় আবার মেজোকুমার অসুস্থতার ঘোরে তাদের নাম করা বড়ো উৎপাত উপস্থিত হয়েচে। হাজারো জবাবদিহি করতে হয়েচে। এইভাবে চললে গাঁয়ের বাসা ওঠাতে হবে এইবার।
মাথা নীচু করে সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে গৃহের দিকে এগুতে গিয়ে চোখ তুলতেই মনে হলো বাঁদিকের ঝোপটার কিছুটা উপর থেকে সাঁৎ করে কি যেন একটা কালো ছায়ামূর্তি সরে গেল। ললনার শরীর ভয়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। একলা মেয়েমানুষ এই সন্ধ্যাকালে জল আনতে এসেচে, কোনও দুষ্ট লোক দুষ্ট মতলবে লুকিয়ে থাকতে পারে। কিম্বা …
কিম্বা যদি লোক না হয়?
ললনা হাঁচোড়পাঁচোড় করে ভারী কলসী নিয়ে দৌড়াতে আরম্ভ করল। ছুটতে ছুটতে যখন সরু ঝোপদুটোর মাঝখান দিয়ে বেরুলেই গাঁয়ের মুখ দেখা দেবে, ঠিক তখনই আকাশ থেকে নেমে এসে চলার পথ রুদ্ধ করে দাঁড়ালো এক সুবিশাল কৃষ্ণবর্ণ ছায়া। ললনা প্রচণ্ড আতঙ্কগ্রস্ত হলেও প্রথমে আলো আঁধারের হেতু লামার আসল স্বরূপের পুরোটা বুঝতে পারেনি। যখন অন্ধকার চোখে সয়ে এল, তখনই ভয়ানক বুকফাটা চিৎকার করে ললনা মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ে গেল। তার দিকে ক্রুদ্ধ নয়নে তাকিয়ে চিত্ৰক শুধোলো—“সনাতনের মণি কোথা?”
কিছু সময়ের মধ্যেই কাপালিক বেশ বুঝতে পারলে যে এই মেয়ে মণির ব্যাপারে কিচ্ছু জানে না। ক্ষোভ মিশ্রিত জিঘাংসায় সে লামার দিকে চাইলো। প্রভুর ইঙ্গিত বুঝে লামা পিশাচ মুহূর্তের মধ্যে অতি দুর্দান্ত এক নারকীয় রূপ ধরলো। সেদিকে তাকানো মাত্র ললনার হৃদপিণ্ড একবার সজোরে লাফিয়ে উঠেই নিজের ক্রিয়া চিরদিনের জন্য বন্ধ করল। পিশাচ এগিয়ে এসে নিজের বাঘনখ ললনার মৃতদেহের উদরে বিঁধিয়ে দিয়ে সজোরে এক টান মারলো। শব ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ল।
রাণীবালার প্রতি যতই বিরাগ থাকুক, তার কন্যার এই অপঘাতে কিন্তু প্রজারা যুগপৎ আতঙ্কিত এবং ব্যথিত হয়ে পড়ল। তার মা বারে বারে জ্ঞান হারায়, আবার চৈতন্য হলেই মেয়ের নাম করে চিৎকার করে মাথা খুঁড়তে থাকে।
*****
সেইদিন মধ্যাহ্নে কারুর মুখে অন্নজল রুচলো না। এক ভীষণ অমঙ্গল থাবা বসিয়েচে গ্রামে। হয়তো এই আহারই শেষ আহার, এই মনে করে প্রত্যেকে অর্ধমৃত হয়ে পড়ল। বিকেলেও অবধি কেউ গৃহের বাইরে বেরুলো না।
সন্ধ্যা হয়ে এসেচে। চিত্রক এতদিন যাবৎ একের পর এক সম্ভাব্য স্থলে ঐ দিব্য মণিকে খুঁজে বেড়িয়েচে, একের পর এক নরহত্যা করেছে, কিন্তু ফল রয়ে গিয়েচে অধরাই। শয়তান সনাতন যে কার নিকট সেটি লুকিয়ে রেখেচে তা কোনও বাষ্পমাত্র চোখে পড়ছে না।
বেশ! নাই বা গেল পাওয়া, তবে আজ মরতে হবে সনাতনের বৌকে, আর কাল মারবো খোদ সনাতনকে। মণির পাত্তা ঠিক আজ নয় কাল বেরিয়ে পড়বে, কিন্তু এই গাঁয়ের কাউকে সে জীবিত ছাড়বে না।
সন্ধ্যা নেমে গিয়েচে। এইবেলা নয়নতারাকে মারার বড়ো সুযোগ। সে সাঁঝপিদ্দিম জ্বালতে উঠানে আসে এই সময়ে। কাপালিক স্ফটিকের গোলকটি বার করে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়া মাত্র গোলকের গায়ে জমিদারবাড়ির আবছা চিত্র ফুটে উঠল, কিন্তু এ কী!
স্ফটিকের ছবি একদম কিচ্ছুটি বোঝা যাচ্চে না। শুধু জমিদারগৃহের ছাতের ন্যাড়া চিলেকোঠার উপরে একটা তীব্র আলোর পিন্ড দেখা যাচ্চে। সেটি নড়াচড়া করচে। সেই বিচ্ছুরিত চোখধাঁধানো আলোতে বাকি কিচ্ছুটি নজর করা যাচ্চে না।
আশ্চর্য! এমন কি জিনিস এ জগতে রয়েচে যার স্বরূপ এই দিব্য গোলকেও ধরা পড়চে না? এমন তো হবার কথা নয়! বেশ কথা। নাই বা গেল দেখা, কিন্তু তাতে ঘরের লোকেদের প্রাণহানি করতে আমার আটকাবে না। কাপালিক ভীষণ রাগে চিৎকার করে উঠল—”লামাআআআআ।”
পিশাচকূলের বিভীষিকা, প্রেতলোকের সর্বাপেক্ষা কুটিল ও ভয়াবহ সত্বা ডুঙরি পিশাচ লামা তার প্রভুর নির্দেশে দাঁত কিড়মিড় করে ছুটে চলল জমিদারবাড়ির সর্বনাশ ও সবংশে নির্বংশ করার পৈশাচিক অভিপ্রায়ে।
রাত পোহালেই ভাদ্দরের সংক্রান্তি। অন্যান্যবার এই দিনে পটুয়াপাড়ায় ধুমধাম করে বিশ্বকর্মা পূজা অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু এইবার একটি লোকের মনেও স্ফূর্তি নাই। চাপা ভয়ের আবহে কোনওগতিকে নিয়মরক্ষার জন্য দায়সারা ভাবে পূজা হবে কাল। বৃদ্ধ পটুয়া শিবশঙ্কর পাল দূরসম্পর্কের আত্মীয় হয় পালবাড়ির। সে জমিদার বাড়িতে এসেচিল মেজোকুমারের কারখানায় তারা দায়িত্ব নিয়ে পূজা করবে কিনা তা জানতে। আলোচনা শেষে সন্ধ্যাবেলার মুখে শিবশঙ্কর গৃহে প্রত্যাবর্তন করার জন্য জমিদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে পথ চলচিল। বাবলাতলা পেরিয়ে কসাড় ঝোপের কাছাকাছি আসতেই তার মনে হলো দূরের আঁধারের মধ্যে পথ জুড়ে যেন আরেকটা আঁধারের পিণ্ড দাঁড়িয়ে রয়েচে।
বৃদ্ধ ক্ষীণ দৃষ্টিতে পরিষ্কার বুঝতে পারলো না। ভালো করে দেখবার জন্য একটু কাছে এগুতেই তার বুক ধড়াস করে উঠল। আঁধার নয়, তার চাইতেও নিকষ একখানি ভয়ঙ্কর অবয়ব দাঁড়িয়ে রয়েচে পথ আটকে। বিরাট দীর্ঘাকার হাত-পা, চক্ষে ধিকিধিকি আগুন জ্বলচে, দাঁতের সারি এই অন্ধকারেও ঝকঝক করচে। প্রেতসুলভ ঘড়ঘড়ে কর্কশ স্বরে লামা বৃদ্ধকে শুধোলো— “তুই কে? জমিদারদের কে হোস?”
সাক্ষাৎ শমনকে সামনে দেখে বৃদ্ধ বুঝলে যে তার দিন আজ আসন্ন। আজ তার পালা। পালানোর চেষ্টা বিফল জেনেও এক বুক নিঃশ্বাস টেনে শিবশঙ্কর ভীষণ গতিতে দৌড় লাগালো নদীর দিকে। সন্ধ্যার মুখে এক আধটা নৌকোটা, ডিঙিটা নদী দিয়ে আসে যায়। তার কাউকে দেখতে পেলেও হয়। পিছনে পিছনে অট্টহাস্য করতে করতে বাতাসে ভেসে চলল লামা। আজ তার মারণযজ্ঞের দিনে প্রথম শিকার পেয়েচে সে।
একটানা এতক্ষণ দৌড়ে শিবশঙ্কর চোখে অন্ধকার দেখতে লাগল। আর এক পাও বুঝি বা চলা যায় না। এভাবে পালিয়ে ঐ সাক্ষাৎ যমের হাত হতে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না। সে ক্ষিপ্রবেগে পিছন পিছন এসে পড়েছে। অবসাদের তাড়নায় নদীপাড়ের খড়িবনের ঝোপ সরিয়ে তার ভিতরে গা ঢাকা দিয়ে কামারের হাপরের ন্যায় হাঁপাতে লাগল বৃদ্ধ।
মুহূর্তের মধ্যে সেই ভয়াল দর্শন পিশাচ এসে উপস্থিত হলো বনের সামনে। চতুর্দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে কান ফাটানো ‘আউউউ’ গর্জন করে উঠল, কিন্তু কুটিল পিশাচের মায়ায় সেই শব্দ তার দিক থেকে না এসে জঙ্গলের অপরদিকের থেকে ধ্বনিত হতে থাকলো। লামা বাতাসে নাক তুলে ঘ্রাণ নিতে লাগল।
হ্যাঁ, তার শয়তানি সফল হয়েচে। অপরদিক থেকে গর্জনের আওয়াজ পেয়ে মূর্খ বৃদ্ধ দিক ভুল করে এইদিকেই হুড়মুড় করে পালিয়ে আসচে। মানুষের তাজা রক্তের আঘ্রাণ প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্চে। লামা ঝোপঝাড় ভেঙে উন্মত্ত হস্তীর মতো অগ্রসর হতে হতে তীব্র জিঘাংসায় পাগলের মতো চিৎকার করতে শুরু করল—“আজ তোর পরিত্রাণ নাই মূর্খ মানুষ। আমাকে তুই চিনিস নে। কতক্ষণ লুকিয়ে রইবি আমার থাবা থেকে? আমি যে তোর গন্ধ পাচ্চি। শুনতে পাচ্চি তোর হৃৎপিণ্ডের বিশ্রী শব্দ। কালকের সূর্যের মুখ তুই আর দেখবি নে। আমার হাত থেকে তোকে তোর ইষ্টও বাঁচাতে আসবে না আজ। কারুর সাধ্য নাই লামা পিশাচের সুমুখে এসে দাঁড়ায়। আমার প্রভুর আজ্ঞায় আজ জমিদার বংশে বাতি দেবার মতো কাউকে রাখবো না আমি। ছিন্নভিন্ন করে তাদের রক্ত পান করবো আজ। আমি কেবলমাত্র একজনেরই অধীন, আর তাঁর নাম….”
–“ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া।”
হঠাৎ অচেনা বজ্রগম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে লামার অবাক হবার পূর্বেই আচমকা ঝোপ ভেদ করে একখানি দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ মূর্তি বেরিয়ে এসে পিশাচের কণ্ঠনালী বজ্র আঁটুনিতে টিপে ধরলো আর লামার হিংস্র আগুনের ভাঁটার মতো চোখে চোখ রেখে নিষ্ঠুর চাহনিতে চেয়ে রইলো। লামা সবিস্ময়ে অনুভব করলে যে সেই সামান্য জীবিত মানুষটার সামনে তার মতো অমন ভয়ানক বলশালী ডুঙরি পিশাচ, যাকে প্রেতজগতের আতঙ্ক বলা হয়, সে নিতান্তই হীনবল হয়ে পড়েছে। তার হাত পা শিথিল হয়ে আসচে। ধীরে ধীরে লামা বনের মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
*****
লামাকে চালিত করে চিত্রক বসলো নিজের মৃত দীক্ষাগুরু বজ্রপাণির ধ্যানে। কিছু সময়ে ধ্যানবিভোর থাকার পর পাথর ঠুকে একখানি পিদিম জ্বালিয়ে কাপালিক শূন্যের উদ্দেশ্যে সসম্মানে প্রশ্ন করল—“গুরুদেব কি এসেচেন?”
বজ্রপাণির কণ্ঠস্বর শোনা গেল—“বল চিত্রকূট, স্মরণ করলি কীসের কারণ?”
চিত্রক বললে— “গুরুদেব, যে বস্তু আমি খুঁজে চলেচি তা আমি কবে পাবো? এত কাছাকাছি এসে আমার যে আর বিলম্ব সইচে না প্রভু।” বজ্রপাণি বিষণ্ণভাবে সামান্য হেসে উত্তর দিলে— “ঐ মণি খুব শীঘ্রই তোর আরও অনেক বেশি কাছাকাছি, তোর হাতের মুঠায় আসবে, কিন্তু তাকে ভোগ করার কপাল তোর বিধিতে নাই। মণির আসল প্রাপককে তুই অন্যায়ভাবে নিজের বন্দি বানিয়েচিস, কিন্তু শোন পাপিষ্ঠ, ঐ মহাতেজস্বী মণি ফেরৎ যাবে তার যথার্থ মালিকের কাছেই।”
— “সে কী! কিন্তু প্রভু! আমার এত বৎসরের শ্রম, এত সন্ধান, এই সবের ফল কি শূন্য? এখানা না পেলে যে বাঁচার কোনও অর্থই থাকবে না আমার।”
বজ্রপাণি পুনরায় স্মিতহাস্যে প্রত্যুত্তরে বললে—“বাঁচার অর্থের প্রশ্ন এখন না তোলাই শ্রেয়ঃ চিত্রকূট, কারণ তোর জীবনের আর বিশেষ বাকি নাই। তোকে বধ করার মানুষ গাঁয়ে পা রেখেচে আজ সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে। তার হাতেই তোর অন্ত।”
চিত্রক এইবার হিংস্র স্বরে শুধোলো “মানুষ! সামান্য একজন মানুষের হাতে মরবে কাপালিক শ্রেষ্ঠ চিত্রকূট? তা অসম্ভব। মন্ত্রতন্ত্রে, বলে, ছলে, আমার সমকক্ষ কেহই নাই। আমাকে তার নামখানি একবার বলুন। আমার যাবার প্রয়োজন অবধি হবে না। আমার পিশাচ লামাই তাকে নিশ্চিহ্ন করে রেখে আসবে’খন। সে অমিত শক্তির অধিকারী। তার সঙ্গে পাল্লা নেবার ক্ষমতা কারুর নাই। এতক্ষণে সে সনাতনের বাড়িতে হয়তো নরমেধ যজ্ঞ শুরু করেও দিয়েচে।”
গুরু বজ্রপাণি সামান্য হেসে বললে—“বটে? বেশ তো, ঐ স্ফটিকের দর্পণে তোর ঐ অপরাজেয় পিশাচকে একটিবার দেখা দেখি, সে এখন কী করছে?”
সন্তুষ্ট চিত্তে চিত্রক জোড়াসনে বসে সম্মুখে গোলকদর্পণটি স্থাপন করে লামার নাম করে ডাক দিলো। একবার দিলো, দুইবার দিলো, তারপর পাগলের মতো ডাকতেই থাকলো, কিন্তু গোলকে কারুর প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠল না। পিশাচটা যেন সম্পূর্ণভাবে ত্রিভুবনের থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েচে।
বজ্রপাণির স্বর হাসতে হাসতে মিলিয়ে গেল। প্রচণ্ড ক্রোধে চিত্রক দাঁতে দাঁত চেপে রইলো। তার নাসাগ্রভাগ প্রসারিত সঙ্কুচিত হতে থাকলো। কাল সংক্রান্তি। শাস্ত্রমতে কোনও শুভ কার্যে হাত দিতে নাই ঐ দিন। পরের দিন পয়লা আশ্বিন পড়া মাত্র সে সনাতনকে সহ সমস্ত প্রজাদের বধ করে একশো রাজার ধন মণিটি যে কোনও উপায়ে ছিনিয়ে নিয়ে আসবে।
*****
শিবশঙ্করকে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে তার সঙ্গে সনাতনের গৃহের পানে চলচিল কালীপদ। শিবশঙ্করের প্রশ্নের উত্তরে কালী কইলো—“আমি আপনাদের পত্রখানা পেয়েচি, এবং আজ বৈকালের ফেরিতে শক্তিনাথ পাটনীর নৌকাতেই গাঁয়ে নেমেচি। তিনি আমার দাদার বিশেষ পরিচিত। সন্ধ্যার মুখে সনাতনের বাড়িতে ঢুকে তাদের ছাতের ন্যাড়া চিলেকোঠায় উঠে বসেচিলাম, যদি কিছু দেখতে পাওয়া যায় এই উদ্যেশ্যে, আর তখনই দেখলুম আপনি বেরিয়ে যাচ্ছেন আর আপনার পিছনে পিছনে একটা যেন আবছা কালো ছায়া ভেসে ভেসে চলেচে। জহুরীকে জহর চেনাতে হয় না। আমি ঠিকই বুঝেচিলাম যে ওই ছায়াখানি কায়া হতে অধিক সময় নেবে না, তাই ক্ষিপ্রবেগে ছাতের থেকে নেমে আপনাদের পিছু পিছু চলতে চলতে বামদিকে ঘেঁষে কসাড় বনে ঢুকে পড়ি, যেখানে আপনি লুকালেন একটু পরেই। বাকিটা আপনার সামনেই ঘটেচে।”
রাত্তিরে সনাতনকে একনজর দেখে কালীপদ তার বাড়ির লোকজনকে বলল—“আমি বহু দূর থেকে এসেচি। পথশ্রমে অবসন্ন হয়ে পড়েছি। আজ সকাল সকাল শুয়ে পড়ি, কাল প্রভাতে সব বেশ করে শুনবো খন।”
গৃহস্থের বাড়ির সব কাজ সম্পন্ন হলে পর ধীরে ধীরে বাড়ি নিঝুম হয়ে গেল। প্রতিটি পরিজন যখন নিদ্রায় মগ্ন, সে সময়ে অতি সঙ্গোপনে, লঘু পদে, দরজার আগল খুলে বাইরে বেরিয়ে এল সনাতন। অন্ধকারে দ্রুতবেগে পথ চলতে চলতে পৌঁছে গেল পটুয়াপাড়ার কাছাকাছি। সেইখেনে আঁধারে মাখা নিস্তব্ধ কারখানাগুলির অলিগলির মধ্যে হারিয়ে গেল সে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে কালীপদ দেখলে যে সনাতন তার নিজের কক্ষেই শুয়ে রয়েচে। উত্তমরূপে তাকে নিরীক্ষার পরে বাইরে এসে বাড়ির বাকিদের প্রশ্ন করল—”বর্তমানে সনাতনের ক্ষুধা কেমন?”
*****
নয়নতারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—“কোথায় আর খাওয়া ঠাকুর। উনি সারা দিনমানে কখনও দুই চামচ গরম দুধ, কখনও বা এই এত্তোটুকু রুটি দাঁতে কাটেন। এমন চললে শরীর যে আর বয় না ঠাকুর। তার উপরে শক্তিখুড়ো বলে গিয়েচেন যাতে অলুক্ষুণে বেড়ালটা ওঁর আশপাশেও না যায়, কিন্তু একটু আনমনা হলেই হতভাগা কোথা থেকে এসে হাজির হয়, আর ওঁর দিকে চেয়ে বিশ্রীভাবে শব্দ করতে থাকে। যেইদিন উনি প্রথম অসুখে পড়েন এবং জড়িয়ে জড়িয়ে কথা কইচিলেন, সেদিনও বেড়ালটা পায়ে পায়ে ঘুরচিল। আমি প্রথমে ভেবেচিলাম হয়তো মন ভুলান্তে কাঁচা সুপুরি চিবিয়ে বসে রয়েচে, তাই অমন করচে, কিন্ত ঠাকুরপো বলল পক্ষাঘাত।”
— “কাঁচা সুপুরি খেয়েচে ভাবলে কেন?”
— “আজ্ঞা ঠাকুর, কাঁচা সুপুরি চিবুলে জিভ আড়ষ্ট হয়ে থাকে অনেকক্ষণ, তাই আর কি। তখন তো বুঝিনি এ রোগ।”
— “হুমম। আমি একবার সনাতনের কারখানাটা দেখতে চাই।”
নিরঞ্জন বলল— “চলুন না কেন ঠাকুরমশায়, আমিও একটিবার সেইখেনেই যাবো। আজ ভাদ্রের সংক্রান্তি। প্রতিবৎসর আজকের তিথিতে কতো ধুমধাম করে গাঁয়ে, কারখানায় বিশ্বকর্মা পূজা করতুম আমরা। এই বৎসর ভয়ের কারণে সব বন্ধ। নিয়মরক্ষার জন্যই কেবল কারখানায় গিয়ে দেবতাকে আজ দুটো ফুল জল তো দিতেই হয়।”
নিরঞ্জনের সঙ্গে কালীপদ নদীর পাড়ের পটুয়াপাড়ায় এসে হাজির হলো। সবারই মোটামুটি সকাল সকাল পূজা সারা হয়ে গিয়েচে নমঃ নমঃ করে। কারখানায় প্রবেশের মুখে কালীপদর চোখে পড়ল কতকগুলি রুগ্ন, হাড় জিরজিরে বিড়ালের দিকে। সেগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের মনেই সে বলে উঠল—“তাই তো, ভারী আশ্চর্য!”
সনাতনের ‘ইস্টুডিও’তে প্রবেশ করে কালীপদ সত্যিই বিস্মিত হয়ে গেল। সনাতনের হাতের অসাধারণ যাদু প্রতিটি বিগ্রহের মধ্যে বিদ্যমান। অদ্ভুত সুন্দর তাদের গঠনশৈলী, অপূর্ব তাদের সজ্জা, আর ততোখানিই সুন্দর কারখানার পরিচ্ছন্নতা। নিরঞ্জন ভাইয়েরই তৈরি একখানি প্রতিমাকে ফুল বাতাসা দিয়ে, কালীপদকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চতুর্দিক দেখাতে লাগল।
গড়পড়তা আর দশটা প্রতিমা গড়ার শিল্পগৃহের চেয়ে সনাতনের কারখানা অনেক সুসজ্জিত এবং রুচি সম্পন্ন। মূল্যবান বিলিতি রঙের কৌটা, বিদ্যুৎপাখা, আসবাবপত্র। শিল্পকার্যে ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলি, যেমন হাতুড়ি, ছেনি, বুরুশ, চিমটা, বিচুলি কাটা বঁটি, মায় তেপায়ার আস্তরণটি অবধি ঝকঝকে পেতলের তৈরি। এক পাশে একটি বাটিতে নারিকেলের তেল, তেল-রঙ, ঝাড়ন, কাপড়ের টুকরা, প্রভৃতি পরিপাটি সাজানো রয়েচে। কালীপদর নজর পড়ল মেঝেতে ডাঁই করে রাখা রাঙতা আর পোশাকগুলির দিকে। সম্ভবতঃ এগুলো দিয়ে ঠাকুরের বসন নির্মাণের কাজ চলচিল। এদিকে ওদিকে চেয়ে কালীপদ নীচু হয়ে একখানি সূঁচ তুলে নিলো হাতে। তাতে সুতা পরানো। চিন্তিত মুখে কালী বলল—“বুঝলে হে নিরঞ্জন, এতখানি শৌখিন, এত গুছানো মানুষটার ইস্টুডিওতে যখন এই বস্তুগুলো এভাবে ছড়িয়ে এলমেলো ভাবে পড়ে রয়েচে, তখন নিশ্চিতরূপে এই কাজ করবার সময়েই মেজোকুমারের প্রথম শরীর অসুস্থ হয়।”
এই বলে হাতের সূঁচ সুতাটির দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বলল—“কিম্বা আমি যা আশঙ্কা করচি তাই হয়েছে।”
দ্বিপ্রহরে ঘরে ফিরে পুনরায় সকলে সনাতনের পাশে বসলো। বাইরের জানালা দিয়ে চোখে পড়ল বড়ো পাকুড় গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে সেই অপয়া বেড়ালটা সনাতনের দিকে তাকিয়ে ফুঁসচে। কুমারকে পরীক্ষা করে কালীপদ তার রোগটা কিছুই ধরতে পারলো না। বিষণ্ণভাবে সে নয়নতারাকে বলল— “দেখো মা, আমি কবরেজ নই, গুণীন। রোগের কিছুই আমি বুঝি নে। আবার এও বুঝচি যে সনাতনের রোগের মধ্যে অতিপ্রাকৃত কোনওকিছুর ছিটেফোঁটাও নাই। তবে বায়ুবিকারে এমনটি হওয়া সম্ভব। আমার মতে বলে, এর কপালে করঞ্জ বাটা মাখিয়ে আধ প্রহর রাখতে পারলে মনোবিকার সেরে যাবে। কিন্তু তা করতে গেলে কপালে ভীষণ জ্বলুনি হয় বলে রোগীরা বড়ো ছটফট করে। আধপ্রহরের জন্য যদি এর হাত দুটি বেঁধে রাখতে পারো, তবে আমি জড়িবুটি তৈয়ারী করতে বসি।”
কেতু পাল দাদার হাত বেঁধে দিলো। সনাতন কোনও প্রকার বাধা দিলে না। এইবার কালীপদ জানালা দিয়ে করঞ্জবাটার পুরোটাই ফেলে দিয়ে ঝোলা থেকে বের করল একখণ্ড অস্থি, একখানা নেবু আর সিন্দুরপাত্র, এবং এইগুলি বাইরে বের করা মাত্র এতক্ষণ চুপ করে থাকা সনাতন ভয়ানক চিৎকার আরম্ভ করল। কালীপদ অস্থিটি দিয়ে নির্দয়ভাবে সনাতনকে ঘা কতক বসিয়ে দিতেই সে নেতিয়ে পড়ল। তারপর মন্তর বাঁধা পাতিনেবুটা তার কপালে ঠেকাতেই সনাতনের প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল।
*****
বাড়ির প্রত্যেকে একযোগে হায় হায় করে কেঁদে উঠল। নয়নতারা ডুকরে উঠে বলল— “ঠাকুরমশায়, এ কী সব্বনাশ হলো? ওঁ যে মরে গেল ঠাকুর! এ আপনি কী করলেন!”
কালীপদ মৃতদেহের স্থানে স্থানে কয়েকটি সূতা বেঁধে দিয়ে কক্ষের বাইরে এসে দাওয়ায় বসে কইলো—“সনাতনের দেহটাকে মেরেচি বটে, তবে তার ভিতরের জীবাত্মাটি তোমার স্বামীর ছিল না। সনাতন আগেই দেহ ছেড়ে গিয়েচে। তোমার স্বামীর শরীরে কেউ একখানা মৃত বেড়ালের প্রেতাত্মাকে প্রতিস্থাপন করে রেখেচিল। কুম্ভকপশ্য নামক একরকম তন্ত্রবিধি রয়েচে, যার দ্বারা আত্মার প্রতিস্থাপন করা যায়। এর জন্য যার শরীরে প্রবেশ করতে হবে, তার দেহে নিজের মুখের লালা প্রবেশ করাতে হয় বলে শুনেচি। আমি কালকে রাত্তিরে হঠাৎ দেখি সনাতন পা টিপে টিপে বাইরে বেরুচ্চে। তাই দেখে আমি ঘুমের ভাণ করে পড়ে ছিলুম এবং পরমুহূর্তেই বেরিয়ে পটুয়াপাড়া অবধি ওর পিছু ধরি। দেখি, ওই আঁধারেও তার চলাফেরা ভীষণ সাবলীল, আর তার চোখদুটো যেন বেড়ালের মতোই জ্বলচে। কিছু সময়ের মধ্যেই সনাতন কি যেন চিবুতে চিবুতে পরিতৃপ্ত মুখে বেরিয়ে এসে বাড়ির দিকে যাত্রা করে।
সকালে কারখানায় ঢোকার মুখে যখন দেখলাম যে ইন্দুরের পীঠস্থান বলে পরিচিত পটুয়ামহলে থেকেও ওখানকার বেড়ালগুলি বড়ো নির্জীব, তখনই আমার মনে হয় যে তাদের সকলের খাবারগুলো কেউ নিশ্চয়ই একাই খেয়ে নিচ্চে, এবং সেইটি সনাতন ছাড়া অপর কেউ নয়।
তুমি যেহেতু নিজের হাতে আগলে আগলে স্বামীকে খাওয়াতে, তাই খাবারে নিজের লালা মেশাতে তাকে দশবার ভাবতে হয়েচে, কিন্তু সুযোগ এল তখন, যখন সনাতন ঠাকুরের পোষাক সেলাই করতে বসলো। সেলাইয়ের ঠিক আগের মুহূর্তটায় নিশ্চয়ই সেই শয়তান কোনও উপায়ে সনাতনকে উঠতে বাধ্য করেচিল, এবং ওঠা মাত্র সে সম্ভবতঃ সুতার অগ্রভাগে নিজের জিভ বুলিয়ে নেয়। সেই সুতা সূঁচটিতে পরাবার সময়ে সনাতন চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী সুতার ডগাটি জিভ দিয়ে চেটে নেয় এবং তৎক্ষণাৎ তার নিজের আত্মাটির শরীর ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।
সেই কথা বুঝতে পেরে সে অতি কষ্টে বাড়ি অবধি চলে আসে এবং সেই অমূল্য রত্নের হদিশ দিয়ে যায় সকলকে। সে রত্নের কথা আমরা কেবল গল্পকথায় মা, ঠাকুমাদের মুখেই শুনেচি। আমাদের তন্ত্রজগতে গুপ্তপুরাণ নামের একখানি শাস্তর রয়েচে। পৌরাণিক যুগে ঘটা বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনার যথাযথ কার্যকারণ দেওয়া রয়েছে তাতে। সেই গুপ্তপুরাণ বলচে, বহু সহস্র বৎসর পূর্বে দানবকুলের শ্রেষ্ঠ দানবের নাম ছিল ময়। এই ময়দানব ছিলেন দশানন রাবণের শ্বশুর অর্থাৎ রাণী মন্দোদরীর পিতা। কারিগরি বিদ্যায় সুনিপুণ এই ময়দানব রাবণের আজ্ঞায়, দেবকারিগর বিশ্বকর্মার সঙ্গে অমৃত নিয়ে যখন খগরাজ গরুড়ের বিষম যুদ্ধ হচ্চে, সেই ফাঁকে তাঁর বুকের মণিটি চুরি করেন এবং তার প্রভাবে সোনার লঙ্কা গড়ে দেন।
এই মণিটি বিশ্বকর্মার হাতে গড়া, কিন্তু এর প্রভাব বুঝে বিশ্বকর্মা একে লুকিয়ে রাখেন নিজের বুকে। এই মণিই হলো আমাদের যুগে যুগে গল্পে শোনা পরশমণি, যার ছোঁয়াতে লোহা সোনায় পরিণত হয়। এটি একটি অদৃশ্য বস্তু। কেবল স্পর্শ করে বোঝা যায়। বিশ্বকর্মা যখনই টের পান এই চৌর্যবৃত্তির কথা, তৎক্ষণাৎ তিনি ময়দানবকে আক্রমণ করেন এবং ভীষণ যুদ্ধ চলাকালীন মণিটি ছিটকে পড়ে যায় নরলোকের দিকে। সামান্য সময় পরেই সে কথা লক্ষ্য করা মাত্র বিশ্বকর্মা এবং ময়, দুইজনেই হাত তুলে মণিটির উদ্যেশ্যে বলেন “তিষ্ঠঃ”
মণি পৃথিবীতে পড়ার সামান্য আগেই অন্তরীক্ষে স্থির হয়ে যায়। অদৃশ্য হবার কারণে, বহু সন্ধানেও আর দেব দানব তার হদিশ পায়নি।
এইবারে আমি বাকিটা বলচি পুরাটাই আমার অনুমানের ভিত্তিতে, কিন্তু নিছক দায়সারা অনুমান নয়। তোমাদের মুখেই শুনলাম যে একবার এক গোরা সায়েবের বেলুন নাকি কিসে ধাক্কা খেয়ে ছিদ্র হয়ে পড়ে গিয়েচিল এবং সনাতন সেই বেলুনখানা চেয়ে নেয় খেয়াল বশে। সম্ভবতঃ এই বেলুনখানার মধ্যেই আটকে ছিল সেই সাত রাজার ধন মণি, যেটির সন্ধান সনাতন পেয়েচিল।
প্রথমে অদৃশ্য কোনও বস্তু হাতে ঠেকায় সে ভয়ানক আশ্চর্য হয় এবং ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে সেটিকে লোহার তেপায়ার উপরে রাখে। তৎক্ষণাৎ সেটি সুবর্ণে পরিণত হয়। এরপর পাগলের মতো সে যত লোহার সরঞ্জাম হাতের সামনে পায়, তাতেই পাথরের গুণ পরীক্ষা করতে থাকে।
আমার কারখানায় ঢুকেই এইটাই খটকা লাগে। হাতুড়ি, ছেনি পেতলের হয় তা মানা যায়, কিন্তু গোটা বাঙলাপ্রদেশে পেতলের বঁটি আমি কস্মিনকালেও শুনিনি। তাতে ধার থাকে না। তাছাড়াও কারখানার এক কোণায় নারিকেল তেলের বাটি এবং জংধরা একখানা কাপড়ের টুকরো ছিল, অর্থাৎ কিছুদিন আগে অবধি সনাতনের যন্ত্রপাতিগুলি লোহারই ছিল, আর সেগুলিকে ঐ কাপড় দিয়েই পরিষ্কার করা হতো।
সবচাইতে বড়ো কথা, সে অসুস্থতার সময়ে সেই মানুষটাকে বিষকন্যা কেন বলল, যাকে তোমরা অবধি বিষকন্যা বললে সে নিজেই ক্ষেপে উঠতো? তোমরা ভুলে গিয়েচ, কিন্তু আমি ভুলিনি, যে ঐ সময়ে সনাতনের পক্ষাঘাতের লক্ষণ দেখা দিয়েচিল। এই রোগের প্রথম লক্ষণটিই হলো জিভের আড়ষ্টতা। আমি একখানি কাঁচা সুপুরি নিজের মুখে চিবিয়ে, তারপর বিভিন্নভাবে ওর বলা কথাগুলো বিড়বিড় করে দেখলাম। সনাতন তোমাদেরকে বেঁকে যাওয়া বিকৃত জিভ নিয়ে বিষকন্যার বড়োমেয়ে, বা পৌষপার্বণ বলেনি বাবাসকল। সে যা বলেচে তা হলো— “বিশ্বকর্মার বর্মে- পরশপাথর।”
আমি কারখানায় গিয়ে দেখলাম বিশ্বকর্মার বিগ্রহে যে ঝুটা রত্নখচিত বক্ষত্রাণটি লাগানো রয়েচে, তার মধ্যস্থলের একটি রত্নের জায়গা ফাঁকা। সনাতনের মতো নিখুঁত শিল্পীর পক্ষে এমন ছেলেমানুষি ভ্রান্তি খাপ খায় না। আমি একখানা পাটকাটি দিয়ে সেইখেনে স্পর্শ করতেই বুঝলাম সেই জায়গাটি একেবারেই খালি নয়। সেখানে কিছু একটা রয়েচে, যা চর্মচক্ষে দৃশ্যমান নয়। আমি একটা ঝাড়নে করে সেটাকে টান দিতেই খুলে এল। তারপর সেটিকে নিয়ে দেওয়ালের একটা কীলকে ছোঁয়ানো মাত্রই সেটা কাঁচা সোনার রঙ ধারণ করল। তারপর করলাম আরেকটি পরীক্ষা, যেটি আমি নিজের আগ্রহের বশেই করেচি এর ক্ষমতা যাচাইয়ের জন্যে। কারখানার সেই মরিচা পরিষ্কারের কাপড়খণ্ডে অতি সূক্ষ্ম লোহার গুঁড়া লেগেচিলো। আমি পাথরখানা তাতে ঠেকানো মাত্র দেখলাম সেইগুলিও সোনা হয়ে গেল। তার অর্থ, এই পাথর অতি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম লৌহকণাকেও ঠিক ঠিক চিনতে পারে এবং তার রূপ বদলে সোনা করে দিতে পারে। এই হলো সেই পৌরাণিক পাথর।”
কালীপদ একখানি বুরুশ কাপড়ের ঝাড়ন বের করে সেটির ভাঁজ খুললো। লোকজন একেবারে ঝুঁকে পড়ল তার উপর। কিচ্ছুটি দেখা গেল না বটে, কিন্তু ঝাড়নের মাঝখানটা যেন একটু বসা মতো, এবং তার ওজন দেখে স্পষ্ট অনুমান করা যায় যে তার উপরে কিছু একটা ভারী দ্রব্য রয়েচে। একটু জল পান করে কালীপদ পুনরায়ঃ মুখ খুললো— “আমি সূঁচ সুতাটি ঐভাবে পড়ে থাকতে দেখেই অনুমান করলুম যে সনাতনের উপরে নির্ঘাৎ কুম্ভকপশ্যের প্রয়োগ হয়েচে, তাই আমি করঞ্জের প্রলেপ দেওয়ার অছিলায় তার হাত পা বেঁধে ফেলতে বলেচিলাম, নচেৎ সে আমাদের আঁচড় কামড় দিয়ে বড়ো বিব্রত করে তুলতো। ঐ শয়তান ভালোই জানতো যে করঞ্জের সামান্য প্রলেপে টুকটাক বায়ুবিকার দূর হয় বটে কিন্তু তার কিছুই হবে না, তাই সে বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করেনি হাত বাঁধার সময়ে, কিন্তু যখনই আমি অস্থি এবং নেবু বার করলুম, তক্ষুনি হতভাগা উপলব্ধি করল যে সে আমার ফাঁদে পা দিয়েচে।
তবে সবচাইতে বড়ো কথা হলো এইসব কে করাচ্চে? মূল চক্রীটি কে? পিশাচ পাঠিয়ে নরহত্যা করতো কে? অবশ্যই কেউ একজন রয়েচে এবং সে বিলক্ষণ মহা শক্তিধর। আমার দাদার বন্ধু শক্তিপদ পাটনী আমাকে বলেচিল যে নদীর পশ্চিমের দিকের জঙ্গল ঘেঁষা টিলার উপরে কোনও এক তান্ত্রিকের ডেরা পড়েচে মাসখানেক হলো। সেইখেনে একবার দল বেঁধে যেতে হবে কালকেই। সে আক্রমণ করার পূর্বেই আমাদের আক্রমণ করতে হবে।
আমি সনাতনের মৃতদেহকে আট প্রহরের জন্য বেঁধে রেখেচি। এই সময়ের মধ্যে সনাতনের আত্মাকে তার দেহে প্রবিষ্ট না করাতে পারলে সব বৃথা। সে আর বাঁচবে না।”
এই কথাটা শুনে শুধু পালবাড়ির সদস্যরাই নয়, গোটা গ্রামের মানুষরা হতভম্ব হয়ে শুধোলো—“তবে! তবে কি মেজোকুমার বেঁচে রয়েচে এখনও?”
— “হাঁ বাপ। এখনও সে বেঁচে রয়েচে। কুন্ডকপশ্যের মাধ্যমে মানুষকে বধ করা হয় না, জীবাত্মার দেহান্তর ঘটে মাত্তর।”
নয়নতারা উন্মাদিনীর মতো কালীগুণীনের পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে অশ্রুভেজা স্বরে শুধোলো—“ঠাকুর…. একটিবার বলুন… কোথায় তিনি?”
কালীপদ গম্ভীর কণ্ঠে ডাকলো—“সনাতননন….”
উপস্থিত ভিড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে এক লাফে কালীপদর কোলে এসে বসলো সেই অপয়া বেড়ালটা। এতদিনের অবজ্ঞার পর সামান্য স্নেহ পেয়ে তার চোখের কোল বেয়ে জল ঝরে পড়ছে।
তার দিকে স্নেহের চক্ষে চেয়ে কালীপদ বলল—“এই যুদ্ধে তোমাকে আমার আবশ্যক হবে হয়তো। কালকে কে বিজয়ী হবে আর কে পরাস্ত, তা এখনই জানিনে, তবে চেষ্টা একটা করতেই হবে। তোমাকে সময় সুযোগ মতো একটা সাহসের কাজ করতে হবে। আমি তোমাকে শিখিয়ে দেবো পরে সে সব।”
*****
পরদিন কারখানার সবকয়টি লোক একেবারে সকাল সকাল ঠাকুরের দধিকর্মা ভোগ সেরে, পূজা দিয়ে, দলবল নিয়ে কালীপদর সাথে রওয়ানা হলো পশ্চিমের জঙ্গলের টিলার দিকে। গতকাল রাতেই সনাতনের কারখানায় দুইজন প্রহরী বসানো হয়েচে, যাতে ওই বিপুল পরিমাণ সোনার রাশি বেহাতে না পড়ে।
টিলায় উঠতে উঠতে সকলে ভীষণ অবাক হয়ে দেখতে লাগল যে গাছে গাছে নরমুন্ড ঝুলচে, স্থানে স্থানে পশুপাখির অস্থি ছড়িয়ে রয়েচে, কোনও কোনও বৃক্ষের গায়ে রক্তবর্ণ সুতার প্যাঁচ দেওয়া রয়েচে। এমনকি এই এতখানি বড়ো পাহাড়ের মতো টিলাটায় একটা পাখি অবধি চোখে পড়চে না। কালীপদ সেসব লক্ষণগুলোর দিকে নজর করে ভ্রু কুঞ্চিত করে পথ চলচিল। সে নিজেই একজন অঘোরী তান্ত্রিকের শিষ্য হবার সুবাদে ভালোই বুঝতে পারচিল যে, টিলার উপরে যে শয়তান তাদের সামনে পড়তে চলেচে, সে নিজেও একজন ভীষণ শক্তিশালী অঘোরী। তার সঙ্গে সমানে সমানে পাল্লা নেবার ক্ষমতা কালীপদর আদৌ রয়েচে কিনা, তা সে নিজেই জানে না। যদি শয়তানটা বিজয়ী হয়, তবে এই এতগুলি মানুষকে সে কখনোই ছাড়বে না। দুশ্চিন্তায় পথ চলতে লাগল সে।
একদম চূড়ার সামান্য আগে একটা বিশাল বিবর। সেই অবধি পৌঁছে সকলে চমকে উঠল। গুহার সুমুখে জোড়াসনে বসে রয়েচে এক ভয়ালদর্শন কাপালিক। তার হাতে একখানি রক্তবর্ণ গাছের শাখার টুকরো। সেটির ডগায় একখানি জ্যান্ত চড়াই পাখি এবং গোড়ার দিকে একটি ক্ষুদ্র হাড়ের খণ্ড বাঁধা আছে। সেটির দিকে তাকিয়ে কালীপদর বুক ধড়াস করে উঠল। এ যে স্তম্ভন বাণ মারার যজ্ঞ! কার সর্বনাশ করতে বসেচে এই পাষণ্ড!
চিত্রক মুখ তুলে তাকাল। তার চাহনি ভাবলেশহীন, যেন এদের আসার জন্যই প্রতীক্ষায় ছিল সে। একটু শ্লেষের সঙ্গে হেসে কালীর উদ্দেশ্যে সে মুখ খুলল— “আয়, আয়, তোদের জন্যই অপেক্ষা করচিলাম আমি। ভালোই হল আমাকে আর কষ্ট করে পরশমণির তল্লাশি করতে হল না। পাকা ফলটির মতো সে আপনিই এসে ধরা দিলো। আমার গুরুর মুখে তোর সম্বন্ধে অনেক শুনলাম গত পরশু। তখন থেকেই তোর নাকটা সবার সামনে মাটিতে ঘষে দেবার ইচ্ছে হচ্চিল। সে আশা আজ সফল হবে। কার শক্তি বেশি, কার কম, সেসব পরীক্ষা হবার আগে তোদের একটি ভারী মজার জিনিস দেখাতে চাই।”
এই অবধি বলে, চিত্রক একখানি খড়ের চালা দুইহাতে সরিয়ে দিলো এবং দেখা গেল তার পিছনে একজন দশাসই চেহারার মানুষ ঘোর লাগা অবস্থায় ঝিমিয়ে বসে রয়েচে। সঠিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, তাকে মন্ত্রবলে নিস্তেজ করে রাখা হয়েছে। প্রজারা ব্যাপারখানা কিছুই বুঝতে পারল না, কিন্তু কালীপদ ভীষণ চমকে উঠে বিহ্বল স্বরে বলে উঠল— “এ কী! হা ঈশ্বর!”
*****
চিত্রক এইবার হাস্য পরিত্যাগ করে কঠিন গলায় কালীপদর দিকে চেয়ে বলল—“আমি একজন সাগ্নিক অঘোরী। বহু তন্ত্রের পাঠ অন্তে কুহকের বিদ্যায় পারদর্শী হই। আজ ভয়ানক কুহকের ফাঁদে আমি একে বন্দি করেচি। এইবার কেবল স্তম্ভনের হাড় ক’খানা এই আগুনে নিক্ষেপ করলেই আমার এই বন্দি চিরকালের মতো নিজের বিচারবুদ্ধি হারিয়ে নির্বোধ জড়পুত্তলিকায় পরিণত হবে। নিক্ষেপ করি?”
কালীপদ এইবার হাত জোড় করে মাটিতে বসে পড়ে চিত্রকের উদ্দেশ্যে কাতর কণ্ঠে কইলো—“দোহাই আপনার, এই অনর্থ করবেন না। আপনি যা আদেশ করবেন, আমি তাইই করবো। আপনাকে আপনার ইষ্ট অভিষ্টের দোহাই।”
চিত্রক আবার পরিতৃপ্তির হাসি হেসে উঠল। — “আমার ইষ্ট কেউ নাই, তবে অভীষ্ট রয়েচে। ঐ পরশমণির খোঁজে আমি বহু বৎসর ব্যয় করেচি। সেইটে আমার চাই।”
— “আমি দিচ্চি, এক্ষুনি দিচ্চি, এই নিন।”
— “উঁ হু। এইভাবে নয়। একখানা গাছের পাতায় মুড়ে ঐ সামনেটায় রাখ। ঐ মণি অদৃশ্য তা আমি বিলক্ষণ জানি। ছুঁড়ে দিলে আর খুঁজে পাব না।”
কালীপদ একখানা বড়ো বটপত্রের উপরে মণিখানা রেখে তা বটের বেদীতে স্থাপন করল। বটপাতার অবস্থিতি দেখেই বোঝা যাচ্চে যে তার উপরে কিছু একটা রাখা আছে। লোভে চিত্রকের চক্ষু চকচক করে ঝিকিয়ে উঠল। সে মণির দিকে দুই পা এগিয়ে এসেচে। কাপালিককে কেউ আর কোনও বাধা দিতে পারবে না বুঝে নিয়ে নিষ্ফল আক্রোশে বেড়ালরূপী সনাতন তার সমস্ত শক্তি একত্রিত করে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাপালিকের ডান হাতের তালু আঁচড়ে-কামড়ে ঝুলে পড়ল। আচমকা আক্রমণে চমকে উঠলেও পরমুহূর্তেই চিত্রক ভয়ানক গর্জন করে সজোরে এক ঝাড়া দিলো। বেড়াল কুড়ি হাত দূরে ছিটকে পড়ে চেতনা হারালো। চোখের সামনে এতদিনের কাঙ্ক্ষিত বস্তুর দেখা পেয়ে চিত্রক হাতের বেদনা অগ্রাহ্য করে পাতাটির উপর ঝুঁকে ঐ দিব্যতেজাঃ মণিটি হাতে তুলে নিয়ে আকাশ বিদারী অট্টহাসি হেসে উঠল।
চিত্রক পরশমণিটি হস্তগত করে কালীপদকে বলল—“যাঃ, আজ আনন্দের দিনে তোকে ক্ষমা করে দিলাম। চলে যা চোখের সামনে থেকে। দূর হঃ।”
এই বলে গুহায় ফেরার জন্য অগ্রসর হতেই চিত্রকের মনে হল তার মাথাটা যেন দুলে উঠল। এক মুহূর্তের মধ্যে চিত্রকের বুকে অসম্ভব যন্ত্রণা হতে শুরু করল। মাথার শিরা ধমনীগুলি যেন ফেটে যেতে চাইচে। নিঃশ্বাস স্তব্ধ হয়ে আসচে। অসহ্য মরণযন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে চিত্রক নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলে যে বেড়ালের দংশনের স্থানে হাত এখনও রক্তে ভেসে যাচ্চে ঠিকই, কিন্তু রক্তের রঙ কাঁচা সোনার মতো উজ্জ্বল।
পরশপাথরের গুণে ধীরে ধীরে চিত্রকের শরীরের রক্তে উপস্থিত সমস্ত লৌহ কণিকা সোনায় পরিণত হয়ে তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া রোধ করে দিল। এই প্রথমবার ধূর্ত কাপালিক বুঝতে পারল যে তার প্রতিপক্ষ তার চাইতেও অনেকগুণ ধূর্ত। বেড়ালের এই অতর্কিত আক্রমণও সেই ধূর্ততারই অঙ্গ। সমগ্র বিশ্বের অধীশ্বর হতে চাওয়া লোভী কাপালিক একটা মরণ হিক্কা তুলে চিরতরে নির্বাক হয়ে গেল।
*****
কালীপদর অনুরোধে সে ব্যতীত বাকি প্রত্যেকে গাঁয়ে নেমে গেল। সনাতন নিজের দেহ ফিরে পেয়েচে। সকলে মিলে মহা আনন্দে চিৎকার করতে করতে পূজার বিসর্জনে মেতে উঠল।
তারা যখন হৈ হৈ করতে করতে নদীর ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দিচ্চে, তখন দুইজন টিলার উপরে নীরবে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করচিল। কালীপদ এবং সেই বন্দি। কালীপদর চোখে জল।
অপরজন স্নেহার্দ্র স্বরে বললেন– “কালীপদ, আমার যাবার সময় আসন্ন। ঐ দেখো, আমার বিগ্রহের বিসর্জন হয়ে গিয়েচে। তোমাকে আমি কোনওদিন ভুলব না। তোমার জন্যই আমার মণি আমি ফেরৎ পেয়েছি। এইবার তবে বিদায় দাও। তুমি বিদায় না দিলে আমি যেতে পারছি না বাছা।”
কালীপদ কাঁদচিল। দেবকারিগর শিল্পাচার্য বিশ্বকর্মার কথায় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে, চোখের কোল থেকে জলটুকু মুছে নিয়ে হাত জোড় করে কইলো— “গচ্ছঃ, গচ্ছঃ, গচ্ছঃ।”
