কালীগুণীন এবং পঞ্চবাণ রহস্য
বুভুক্ষু প্রেতাত্মার ন্যায় হাঁ করা তিনমহলা বাড়িটার থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেও অনন্তর মনে কিন্তু একটা খটকা লেগেই থাকলো। এতক্ষণ ধরে বাড়ির মধ্যে যা যা কথাবার্তা হল, তার মধ্যে কোথাও যেন কিছু একটা ভয়ানক ফাঁক রয়েচে। তাদের রাজপুতানার সিংহ বংশের ইতিহাসের সুতোটার দুই দিকের দুইখানা উজ্জ্বল প্রান্ত চর্মচক্ষে দেখা গেলেও সূতার মাঝখানের একটা বড়োসড়ো ভাগ কিন্তু সময়ের অন্ধকারে ডুব মেরেচে। ঐ আঁধারমাখা জায়গাটাতেই ভীষণ গন্ডগোল। ঐখানেই কিছু একটা ভয়ঙ্কর ধাঁধা ওৎ পেতে রয়েছে। মহলের অন্দরে মরণশয্যায় শায়িত বৃদ্ধ মানুষটি কিছু একটা নিশ্চিতভাবে গোপন করছে। সেটা অজ্ঞানতার কারণে নাকি কোনও একটা ভয়ে, সেইটে ঠিক ধরা যাচ্ছে না।
কিছুটা সন্দেহের দোলাচলের মধ্যেই মূল ফটকের থেকে বেরিয়ে কিছু দূর এসে একটা ঝাঁকড়া অশ্বত্থ বৃক্ষের তলে এসে স্থির হল অনন্ত। ঠিক হাত পচিশেক সামনেই ঘোর কৃষ্ণবর্ণ পাষাণের তৈরি একখানা দেউল। সুবা উড়িষ্যার নিয়ম মেনেই তার গঠনশৈলীতে অজস্র কারুকার্য আর স্তরবিন্যাস, মূল দোরের কাছে সিংহ, হাতী প্রভৃতি শিল্পকার্য। মন্দিরের খাঁজে খাঁজে অজস্র পায়রার দল উকিঝুকি দিচ্ছে। মন্দিরের ঠিক পিছনেই স্বয়ং মহেন্দ্রগিরি পাহাড়টা ক্ষিপ্ত নেকড়ের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইচে দেবালয়ের চূড়োয়, কিন্তু কারুর একটা ভয়ে সেই সাহস পাচ্চে না। হঠাৎ করে সেইদিকে একনজর চাইলে বুকটা ধড়াস্ করে ওঠে। এই মন্দিরটার কথাই তবে বুড়া এতক্ষণ বলচিলো। সিংহ বংশের কোনও এক সঙ্গতিসম্পন্ন শাখার হাতে এর হস্তান্তর না করা ইস্তক বুড়ার প্রাণবায়ু আটকে রয়েচে দেহে, এবং সেই উদ্দেশ্যেই তার কুসুমপুরা গাঁয়ের ঠিকানায় পত্র লিখে এই বিনীত তলব, অথচ এখন যখন অনন্ত বহু ক্লেশ স্বীকার করে এসেই পড়েছে, তখন বৃদ্ধ অর্ধেক কথা গুপ্ত রাখতে চাইচে। এ কেমন আচরণ?
আচ্ছা, কী আছে এর ভিতরে? মন্দিরের ফটকের থেকে শুরু হয়ে ভিতর অবধি পরপর কতকগুলি প্রস্তরনির্মিত চৌকোণা নীচু বেদী, তাতে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে একটি করে চরণচিহ্ন। সেগুলিতে ভক্তরা ফুল, মালা আর সুগন্ধি দিয়ে অর্চনা করেছে। এ এক নূতন কথা বটে। ঠিক যেন, বহু বহু যুগ পূর্বে কোনও এক বলশালী দেহধারী জীব অথবা মনুষ্য ঐ বেদীগুলিতে পা ফেলে ফেলে এই মন্দিরের ভিতরে প্রবিষ্ট হয়েচিলো, কিন্তু সে আর বেরোয়নি। অথবা তার পায়ের ছাপের উপরে ঐ বেদীগুলি পরবর্তীতে তৈরি।
মন্দিরের সামনে এসে একটুক্ষণ স্থিতু হতেই অনন্ত হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারলো যে রহস্যের এখানেই শেষ নয়। আরও কিছু কারণ রয়েছে। এত বড়ো একটা মন্দির, এত দেহাতি লোকজন তার ভিতরে পূজার নিমিত্ত যাতায়াত করছে, কিন্তু কি অদ্ভুতভাবে নীরব তারা। একটা শঙ্খ বা ঘণ্টার ধ্বনিও কানে আসচে না। ভারতবর্ষের এরকম একটা মন্দিরে ঘণ্টা না থাকাটা বিচিত্র বটে। কেউ যেন এদের কথাবার্তা বলায়, কোনও শব্দ করায় অবধি। রোক লাগিয়ে রেখেচে, এমনকি যাতে ভুলক্রমেও কথা না বেরিয়ে পড়ে, তার জন্য সকলেই মুখে একখানা করে কাপড়ের টুকরো বেঁধে ভিতরে ঢুকছে। অনন্ত ভ্রু কুঞ্চিত করেই বলল—“এ তো ভারী আপদ। এতগুলি মানুষ, এতবড় দেউল, কিন্তু কি অদ্ভুত চুপচাপ এরা, তাই না?”
অনন্তর পরিচারক সুকো ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে হাঁ করে সামনের দিকে চেয়ে দেখচিলো। সে ধীরে ধীরে বললে—“ঠিক বলেচেন মেজোকর্তা, আমিও তাই দেখেই অবাক হচ্চি, কিন্তু এ মুলুকে তো আমরা কখনও আসিনি আগে, তাই হতে পারে এইরকমই ধারা এই দিককার।”
অনন্ত এই জবাবে তুষ্ট না হয়ে বলল—“না। ব্যাপার শুধু সেটুকুই হলে আমি অবাক হতুম না হতভাগা। লক্ষ্য করে দেখ, চূড়োয় বসা পাখিগুলো থেকে শুরু করে প্রাঙ্গণে ইতিউতি ঘোরাফেরা করা কুকুরগুলো অবধি কেমন নিশ্চুপ! মনুষ্যেতর প্রাণীরা শুনেচি প্রকৃতির অনেক না বলা কথাও শুনতে পায়। লোকগুলো চুপ বটে অথচ তারা কিন্তু মূক নয়, মন্দির প্রাঙ্গণের বাইরে এসে তো দেখচি দিব্য কথাবার্তা বলচে, মন্দিরের ভিতরে কথা বলায় বাধা কীসের? কে আছে গর্ভগৃহের ভিতরে? অত বিরাট পায়ের ছাপ কার? বুড়া একটু আগে কোন দেবতার নামটা যেন বলল? কীসের মন্দির?
*
যে সময়টার কথা আজকে বলছি সেটা আজ থেকে বহু বৎসর পূর্বের কথা। তোমাদের বৎসরটা বলতে ভীষণ ইচ্ছে করচে বটে, কিন্তু মুশকিল হল এই ঘটনার সঙ্গে শহর কলকাতার এমন একখানা ফৌজদারি কেস্ ডায়েরি জড়িত রয়েচে, যে ঘটনার কথা আমি আমার এক বন্ধুর স্বার্থে গোপন রাখতে বাধ্য হয়েচি। বছরটা এমনিতেই রাজনৈতিকভাবে মহা দুরন্ত, ফলতঃ সেই বছরটা তোমাদের আন্দাজ করে নিতে হচ্চে।
যদ্দুর স্মরণ হয় সেদিনটা ছিল সাতাশে কার্তিক, শুক্কুরবারের বিকেলবেলা। হৈমন্তী কালীপূজা শেষ হবার পর থেকেই হিমেল ভাবটা আসব আসব করেও ভাদ্রবধূর ন্যায় ইতস্ততঃ করে চলেচে। বিকেলটুকু একটা হালকা হিমেলভাব যে নাই তা নয়, কিন্তু খাঁটি প্রাক শীত এ নয়। সন্ধ্যার একেবারে প্রাক্কালে বাগবাজারের গঙ্গার বুকে ঝিরিঝিরি বাতাস চলেচে আর সেই তালে _কতকগুলি খড় বোঝাই গাধাবোট চোখের সামনে দিয়ে ঢিমে গতিতে ভেসে ভেসে দখিনের দিকে এগিয়ে চলেচে। নদীপাড়ের অগণিত মন্দিরে মন্দিরে সন্ধ্যারতির তোড়জোড় আরম্ভ হচ্চে। আজ পূর্ণিমা তিথি। গঙ্গার বুক ঝলমলিয়ে ঘোলাটে হলদে পূর্ণশশী উঁকি মারচে। শুক্কুর থেকে রবিবারটুকু আমি রোগী দেখিনে। এই তিনটি দিনে সাধ মিটিয়ে নিজের মতো করে অতিবাহিত করি। আশপাশের চাতাল একেবারে শূন্য নয়। কিছু লোক ইতস্ততঃ বসে বসে কলকাতা শহরের নকশাল আন্দোলন এবং পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করে চলেচে। নকশাল আন্দোলনের প্রভাব এই সময়ের রাজনৈতিক চাপান উতোরের একটি বিশেষ বিষয় হয়ে উঠেচে। এ সকল কচকচি থেকে মনটা ফিরিয়ে নিয়ে, ঠোঙার বাদাম চিবুতে চিবুতে গঙ্গাবক্ষের নির্মল জলের দিকে চেয়ে হঠাৎ একটা কূট প্রশ্ন মাথায় সেঁধুলো।
আচ্ছা, যে কোনও প্রাকৃতিক নদ-নদী, পুকুর অথবা অপরাপর জলাশয়ের জল ঘটি-বাটিতে বন্দি করে রেখে দিলে তাতে পোকা লেগে যায়, কিন্তু গঙ্গার জলে কখনও পোকা ধরে না কেন? পুরাণে বলে স্বয়ং পঞ্চাননের পাঁচ মুখে নিজের স্তুতি শ্রবণ করে নারায়ণ নাকি গলে জল হয়েচিলেন, ফলে সেই মহাপবিত্র জল খোদ ব্রহ্মা তাঁর কমন্ডলুতে ধরে রাখেন যুগ যুগ ধরে, পরে ভগীরথের জন্য সেই বিপুল জলধারাকে মুক্ত করে দেন নদী রূপে, যে জলধারা স্বর্গ থেকে ভীষণ গর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়ে কৈলাসপতির জটায়, এবং তৎপশ্চাৎ সেই জলরাশি ভগীরথকে অনুসরণ করে করে স্বর্গের অলকানন্দা থেকে মর্ত্যের গঙ্গা হয়ে সাগরের সঙ্গে মিলিত হয়ে পাতালে ভোগবতী রূপে প্রবিষ্ট হন। গঙ্গা ব্রহ্মার কমন্ডলুতে থাকাকালীন তাতে পোকা লাগার সম্ভাবনা শূন্য, কিন্তু আমি কখনও আমার সামনের এই গঙ্গার জলকে কলুষিত হতে দেখিনি। এর কারণ কী?
ভেবে ভেবে উত্তর খুঁজতে গেলে এই সুন্দর সন্ধ্যাখানা মাটি হতো, ফলে আমি অপেক্ষাকৃত সহজ এবং অমোঘ পন্থাটাই অবলম্বন করে ডান দিকে মাথা ঘুরিয়ে যথাসম্ভব নিরাসক্ত কণ্ঠে কইলাম—“আচ্ছা, গঙ্গার জলে পোকা লাগে না কেন?”
পাশে বসা মুখুজ্জেমশায় ততোধিক নিরুৎসুক স্বরে উত্তর দিলে—“কারণ রয়েছে।”
এত স্বল্পবাক জবাবে আমার কেন কারুরই সন্তুষ্টি জন্মানোর কথা নয়, কিন্তু এক্ষেত্রে অধিক প্রশ্নে গাজন পন্ড। আমি উপর নীচে ঘাড় নেড়ে বললাম— “ও আচ্ছা বুঝেচি, কোনও দৈবী কারণ-টারণ আছে নিশ্চয়ই। হবেও বা, পতিতপাবনী গঙ্গার জলে কী কখনও ইয়ে…”
ঔষধ ধরেচে। মুখুজ্জেমশায় কটমট করে তাকিয়ে মুখ খুললো— “সব কিছুতেই বাস্তব কার্য্যকারণ না খুঁজেই একটা দৈব কারণ সন্ধান করাটা মানুষের অভ্যাসে দাঁড়িয়েচে। মকরবাহিনী গঙ্গার অজস্র গুণকীর্তন বর্ণিত রয়েচে শাস্তরে। আমি সামান্য মানুষ, আমার পক্ষে এতটা বোঝা সম্ভব নয়, কিন্তু জলে পোকা না ধরার আরও একটা মোক্ষম বিজ্ঞানসম্মত যুক্তিও কিন্তু আছে। গঙ্গার গতিপথটা স্মরণ করো ডাক্তার, অর্ধেক হিমালয় পর্বতমালাকে ধুয়ে, কোটি কোটি ঔষধি ভেষজকে বিধৌত বিগলিত করে, তবেই এই নদী মাটিতে পা রেখেচে, ফলতঃ এই জলে তীব্র ঔষধিগুণ থাকাটাই তো স্বাভাবিক, তাই নয়? সম্ভবত সেই কারণেই এঁর জল চিরকাল নিষ্কলুষ থাকতে পারে। নদীর বুকে এত জলজ জীব মরচে, এত মৃতদেহ বুকে ধারণ করেও এই জলে পোকা না লাগার এইটাই একটা লৌকিক ব্যাখ্যা।”
আমি মনে মনে লজ্জিত হয়ে কইলাম— “ঠিক দাদা, ঠিকই বলেচো হয়তো।”
মুখুজ্জেমশায় একটু হেসে শুধালো—“তাহলে উত্তরে খুশি তো?” আমি মাথা দোলালাম দেখে কালীপদ ফের কইলো– “কিন্তু আমি খুশি নই ডাক্তার। একটা কথা আমাকে ভারী ভাবায় জানো? এই যে এতটা পথ ভগীরথের পিছু পিছু নদীটা ধাবিত হল, সেটা কীসের টানে? একটা এতবড় নদীর প্রকাণ্ড জলোচ্ছ্বাস যদি ভগীরথের পিছনে পিছনে গিয়েই থাকে, _তাহলেও তাদের মাঝখানে নিশ্চয়ই অনেকখানি দূরত্ব ছিল। গঙ্গা চলতে চলতে নাকি জহ্নু মুণীর যজ্ঞের সমিধ ভাসিয়ে দিয়েচিলেন বলে মুণী গঙ্গাকে নিজের শরীরে বন্দি করে ফেলেন। পরে ভগীরথের অনুনয়ে খুশি হয়ে গঙ্গাকে নিজের ঊরু চিরে মুক্তি দেন। তাই গঙ্গার অপর নাম জাহ্নবী। তো, গঙ্গা যে জহ্নুর যজ্ঞের কাঠকুটো ভাসিয়ে নিলেন, কিন্তু ভগীরথ তো গঙ্গার সামনে সামনে ছিলেন। তিনি সেসব উপকরণ নিজের পায়ে মাড়িয়ে যাননি। কেন? তাছাড়াও পদ্ম মুণী গঙ্গাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে অন্যত্র নিয়ে ঢুকে পড়েচিলেন এবং অনেক পরে ভগীরথ তা জানতে পেরে পতিতপাবনীকে ফেরৎ নিয়ে যান। তার অর্থ, ভগীরথের থেকে গঙ্গার দূরত্ব ছিল বহু দূরের। এতটাই দূরে যে দুইজন দুইজনকে দেখা ছিল অসম্ভব। তবে কোন সঙ্কেত লক্ষ্য করে এত বড়ো নদীটা এগোচ্চিলো ভারত জুড়ে?”
আমি নিস্পন্দ, নিষ্পলক হয়ে ভাবচিলাম। বটেই তো! উত্তর দিতে ইতস্ততঃ করচি দেখে কালীপদ নিজেই অনেকটা আত্মগত হয়ে কথা কইলো—“এর একটা সমাধান কিন্তু আমি ভেবেচি। কতটা সঠিক জানিনে, কিন্তু একেবারে বেঠিক বোধহয় নয়।”
আমি বিস্মিত সুরে শুধালাম— “তবে গঙ্গা কি চিহ্ন দেখে এগিয়েচিলো দাদা?”
–“উঁহু। দেখে নয়, শুনে। শব্দ শুনে। বিশেষ এক সঙ্কেতের ধ্বনি, যে ধ্বনি শুনে গঙ্গা তাঁর দিক নির্ণয় করেচিলো। ভগীরথের হাতে একখানা শঙ্খ ছিল জানো তো? সেইটে কোনও সাধারণ জিনিস কিনা বলা যায় না, তবে ঐখানার শব্দ লক্ষ্য করেই এত বড়ো নদীটা ধাবিত হয়েচিলো।”
আমি মৃদু প্রতিবাদ করে বললুম— “কিন্তু মুখুজ্জেমশায়, জল কি কানে শুনতে পায়?”
কালীপদ একটু হেসে বললে—“না, তা পায় না, কিন্তু জলের মধ্যে এমন কেউই কি ছিল না, যে সাঁতার এবং শ্রবণ উভয়েই দক্ষ? কখনও ভেবেচো যে গঙ্গার বাহন যে মকর, তাঁর দেহটা কুমিরের মতো হলেও মুন্ডর স্থানে কালীগুণীন এবং পঞ্চবাণ রহস্য হাতীর মাথার উপর দুইখানা বিরাট বিরাট কান কেন রয়েচে? যা হোক, এ সবই বৃথা তর্ক। ও সময়ে না ছিলে তুমি, না ছিলেম আমি। এখন উঠে পড়া যাক। ঘাটে বোধহয় সন্ধ্যারতি করবেন এঁরা।” এই বলে ধুতিটা ঝেড়ে নিয়ে উঠে পড়ে রাজপথের দিকে পা বাড়াল কালীপদ।
*
আমি মুখুজ্জেমশায়কে বহুবার বহুরূপে সনির্বন্ধ অনুরোধ করার পরে অবশেষে এই দুইদিন পূর্বে তিনি সস্ত্রীক এসে উঠেচেন আমার নেবুতলার বসতবাটীতে। রায়দীঘড়া এস্টেটের নায়েবমশাই নাকি কানাই সর্দারকে সঙ্গে নিয়ে দেওয়ানি কাগজপত্তরের কী একটা কাজে কেল্লাঘাটার আপিসে গিয়েচে গতকাল। তাঁরা আগামীকাল সকালে এসে আমার গৃহে আহার করে আবার তালুকে যাত্রা করবেন। গতকাল বৌঠানকে আমরা শেয়ালদা ইস্টিশান, কালীঘাট, সাহেব কালীবাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে এসেচি। আমার বসতবাটীতে এসে ইস্তক বৌঠানের আরেকখানি সুবিধা হয়েচে, মাথায় ঘোমটা না দিয়েই ঘরময় ঘুরে বেড়াতে পারচে অবাধে এবং আমাদের সামনে চায়ের জোগাড়যন্তর নামিয়ে রেখে তিনি আজ আমার হেঁসেল অধিগ্রহণ করে নানাবিধ চর্ব্য ও চোষ্যের আয়োজনে মগ্ন হয়েচেন। আমি অতিথিকে পাকশালায় প্রবেশ করতে দিতে ধর্মতঃ কিঞ্চিৎ বিব্রত হয়ে আপত্তি জানিয়েচিলাম, উত্তরে বৌঠান শুধুমাত্র বলেচিলো— “বেশ, ঠাকুরপো যখন বলচে তখন রাঁধব না। তেমন তেমন কিছু তো রাঁধতুম না, ঐ চাট্টিখানি গরম নুচি, কয়টা ভাজাভুজি আর নারকেল হিঙ দেওয়া ছোলার ডাল। তা, সে আর একদিন হবে’ খন।”
এই কথার পরে আর আমার আপীল বৌঠানের আদালতে ধোপে টেকেনি। চা পান করতে করতে বৈঠকের ঘরে রেডিও চালিয়ে গান শুনচিলাম, কালীপদ পেয়ালা থেকে পিরিচে চা ঢেলে সশব্দে পান করচে দেখে বুঝলাম তার মেজাজ আজ বিলক্ষণ শরীফ। কালীপদ একবার সেখানার দিকে চেয়ে কইলো— “এইটে এখনও সচল রয়েচে ডাক্তার? তোমার সঙ্গে সাতশিমূলিয়ায় যখন আমার প্রথম পরিচয় হয়, তখনও তোমার তোরঙ্গে এই রেডিওখানাই নিয়ে গিয়েচিলে মনে পড়ছে।”
আমি গর্বের সঙ্গে কইলাম—“হাঁ দাদা, সেইটেই। ঐ ঘটনার সময়ে ঐ একবার ছাড়া আজ অবধি যন্তরটা বিগড়োয়নি আজও।”
রাত্তিরে কিন্তু নৈশভোজের সময়ে আমরা তিনজন নই, আরও অতিথি নিমন্ত্রিত ছিলেন। আমার কতিপয় বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে ডাক্তার শরৎ চক্কোত্তি, দারোগা সুবল নারায়ণ এবং খণ্ডঘোষের জমিদারবাবু শ্রীযুক্ত চন্দ্রনাথ রায় আমার বৈঠকের কক্ষ আলোকিত করচেন। চন্দ্রনাথ ঠিক আমার মিত্র স্থানীয় নন, উনি বয়সে বোধকরি কালীপদর বড়োই হবেন, কিন্তু আমার সঙ্গে মেলামেশা করেন বন্ধুভাবাপন্ন হয়েই। বাকীদের সঙ্গে তাঁর ততো পরিচয় নাই। শরৎ ঘরে ঢুকতেই মুখুজ্জেমশায়ের দিকে চেয়ে বিস্ময়ে বলে উঠল- “ঠাকুর, আপনি!”
কালীপদ মৃদু হেসে স্বস্তিবচন কয়ে বললে— “ভালো আছো তো ডাক্তার?”
— “সব কুশল ঠাকুর। আপনার শরীর বেশ সুস্থ তো?”
কালী আবার সামান্য হেসে বললে— “সুস্থ না থাকে কোন হতভাগার সাধ্যি? তিন তিনজন ডাক্তার যখন এক বাড়িতে রয়েচেন…
আমি অবাক হয়ে বললাম—“আজ্ঞা দাদা, তিনজন?”
কালীপদ উপর নীচে মাথা নেড়ে একটু আড় নজরে রান্নাঘরের পানে ইঙ্গিত করল। উপস্থিত সকলে মুখ টিপে হেসে উঠল। বৌঠান এসে মেঝেতে আসন পেতে আহার্য্য পরিবেশন করে গেল। চন্দ্রনাথকে দেখে তাঁর মাথায় আবার ঘোমটা ফিরে এসেচে। কলকাতায় পা রেখে ইস্তক বৌঠানের বিস্তর অসুবিধা হয়ে চলেচে। গতকাল মুখুজ্জেমশায়ের সঙ্গে বাজার ভ্রমণ সেরে এসে চোখ কপালে তুলে শুধালো— “মা গো, এই জায়গায় মানুষ রইতে পারে? লাউয়ের শাক, কুমড়া, কচু মায় শাকের আঁটি অবধি পয়সা দিয়ে কিনতে হয়? বড়ো বড়ো পেটফুলো ভিনদেশি মাছ, তার দাম আকাশ ছোঁয়া। এর থেকে তেঁতুল আর লঙ্কা দিয়ে মেখে আমাদের পুকুরের পাকা রুই ঢের। ভালো। আবার পয়সা নিয়ে বাজার বাড়িতে পৌঁছে দেবার জন্য ঝুড়ি মাথায় লোকজন ঘুরচে। শহরের বাজার ঐ যা দিয়ে ঘর বোঁটাই, তাই। এই এত নামডাক শুনি, তা ঠাকুরপো, কলকাতার পেটে পেটে এত?”
কলকাতার পেটে যে কত, তা বৌঠানকে বোঝানো বিড়ম্বনা বিশেষ। আমি গতকাল মেঝের বদলে খাবার টেবিলে খাদ্যবস্তু পরিবেশন করতে অনুরোধ করায় বৌঠান সরু চক্ষে চেয়ে বলল—“কলকাতায় থেকে থেকে ঠাকুরপোর স্বভাব চরিত্তিরে সাহেবি হাওয়া লেগেচে। বানরের ন্যায় আধা ঝুলন্ত অবস্থায় বসে না খেলে বুঝি পরিপাক হয় না? ওরা গাছের ডালে ওভাবে ঝুলে ফলপাকুড় খেয়ে থাকে বলে মানুষও অমন সৃষ্টিছাড়া ভাবে ভোজনে বসবে?” এ কথা শোনার পর অতি কষ্টে উচ্চহাস্য সংবরণ করে দ্বিতীয়বার আর টেবিলে খাবার দিতে বলিনি।
চন্দ্রনাথের দেখলুম আসনে বসে খাওয়ার দিব্য অভ্যাস রয়েচে। আমার আর শরতেরও তদ্রুপ, কিন্তু থানা ফেরৎ সুবলের কিঞ্চিৎ অসোয়াস্তি হলেও বৌঠানের ভয়ে কিছু কইলো না। লুচি চিবুতে চিবুতে টুকটাক গল্পগাছা চলচে। চন্দ্রনাথ আর মুখুজ্জেমশায়ের মধ্যে রায়ত-পরচা, খতিয়ান আর কৌন্সিলের দন্ডবিধি নিয়ে গম্ভীর কথাবার্তা বিনিময় হচ্চে। কালীপদর পরিচয়টা শুনে অবধি সুবল কেমন যেন ইতস্ততঃ করচিলো প্রথম থেকেই কিন্তু সে ইতস্ততঃভাব ঠিক অবজ্ঞার নয়। এক্ষণে কালীপদর চন্দ্রনাথের সাথে কথা কইতে কইতে আচমকা মুখ ঘুরিয়ে শুধালো— “কিছু বলবেন দারোগা সাহেব?”
_সুবলের দারোগাসুলভ গাম্ভীর্য তিরোহিত হয়ে একটু সঙ্কোচের ভাব দেখা দিল। সে মুখ তুলে বলল—“আপনি আমার বয়োঃজ্যেষ্ঠ, তাই দয়া করে আমাকে তুমি করে বলুন মুখুজ্জেমশায়। আমি আসলে একটা ব্যাপার একটু জানতে চাইচি… মানে আপনি যখন এই কাজের কাজী, তাই…”
কালীপদ এইবার হোঃ হোঃ করে হেসে উঠে কইলো— “তুমি যখন ডাক্তারের বন্ধু, তখন আমারও স্নেহের পাত্র বৈকি। যা জানার, যা শুধাবার নিঃসঙ্কোচে বলো।”
কালীপদর প্রাণখোলা হাসিতে সুবলের সঙ্কোচ কেটে গিয়েচিলো। সে একটু কাষ্ঠ হাসি হেসে যে প্রশ্নখানা ছুঁড়লো, তাতে আমরা আহার বন্ধ করে তার মুখের দিকে চাইলাম।
—“আচ্ছা মুখুজ্জেমশায়, আপনি তো শুনেচি একজন তান্ত্রিক। তো আপনাদের তন্ত্রের কোনও বিধিতে নরবলির বিধান কি রয়েচে? মানে, নরবলির সহায়তায় কি কোনও অভীষ্ট লাভ করা সম্ভব?”
কালীপদ হাতের লুচি মুখের সামনে থেকে নামিয়ে পাতে রেখে একটুক্ষণ থেমে গম্ভীর স্বরে বলল— “শুনতে খুব অবিশ্বাস্য হলেও তন্ত্রে দীক্ষা লাভ করতে বা তন্ত্রোক্ত উপচার সমাধা করতে কিন্তু নরবলির কোনও আবশ্যকতা একেবারেই নাই। অন্যান্য মতে কী বিধি আমি জানিনে, কিন্তু নরবলি আমার গুরুদেবের মতে মহা পাতকের কাজ। এমন কোনও বিধান আমার জানা নাই। পূজাতে যে পশু বলির বিধান দেখতে পাও, সে হল নিজের মনের শয়তান পশুকে বলি দেওয়া, নিজের মনের অন্ধকার পশুবৃত্তিগুলিকে প্রতীকি স্বরূপ একখানা চালকুমড়া, কুমড়া অথবা ইক্ষুদন্ডের উপরে ন্যস্ত করে, তাকে দ্বিখণ্ডিত করে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া। সেই ত্যাগের মনোবল বা ক্ষমতা যাদের নাই, আমার বোধহয় তেমন মানুষেরাই প্রাণীবলির বিধানের সূত্রপাত করেছে।”
সুবল চোখ নামিয়ে উদাস স্বরে কইলো– “আমারও তেমনটাই বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে জানেন, কিন্তু আপনাদের প্রক্রিয়াতে তো শোনা কথা যে মৃতদেহের দরকার হয়। এই নরবলির মাধ্যমে কি কারুর বিপদ আপদ কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব আদৌ?”
আমি একবার মুখুজ্জেমশায়ের কঠিন মুখভাবের দিকে তাকিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে উঠলুম— “আরে হতভাগা, তোর হয়েচে কী? নরবলির আসামীকে গ্রেপ্তার করে এসেচিস বুঝি? এই খাবার সময়ে ওসব নোংরা কথা কইতে আছে? কীসের বিপদ কাটবে? তোর কি কোনও বিপদ আপদ ঘটেচে?”
সুবল উত্তর দেবার পূর্বেই কালী সরু চক্ষে তার দিকে নজর করে বলে উঠল—”না ডাক্তার, বিপদ দারোগাবাবুর হয়েচে বলে বোধ হচ্চে না। শাস্ত্রে কয়,– ‘সিংহের মাথে যদি পড়ে পূর্ণ চাঁদা / দেবগণ উচ্চে রবে, রাক্ষস পায় বাধা।’ ওঁর বিপদ সহজে আসবে না। আর মৃতদেহ মানেই কি নরবলি আবশ্যক? এই দুইজন ডাক্তারের বা তোমাদের পেশাতেও মড়া কেটে দেখতে হয়, তোমরা কি নরবলি দাও? আমার মনে হয় তুমি বোধকরি কোনও কথা ঠিক খুলে কইতে পারচো না।”
আমরা কিছু বলার আগেই সুবল হাঁ হাঁ করে উঠল— “কী আশ্চর্য! আপনি কেমন করে জানলেন ঠাকুর আমার রাশি তিথি মায় গণ অবধি? আমি সত্যিই সিংহ রাশিতে পূর্ণিমার জাতক। দেব গণ। বড়ো আশ্চর্য কথা তো!”
কালীপদ তাকে হাতের ইঙ্গিতে থামিয়ে শুধালো— “এখানে বাইরের বা অপরিচিত কেউই নেই দারোগাবাবু। তুমি স্বচ্ছন্দে কোনও সমস্যা থাকলে বলতে পারো যদি আপত্তি না থাকে, তবে এইটে আগে সেরে নেওয়া যাক।”
*
আটটা নাগাদ আহার সমাধা হলে পর আমরা বৈঠক ছেড়ে বাইরের দাওয়ায় গিয়ে শেতলপাটি বিছিয়ে বসলুম। বর্তমানে শহরের এই রোয়াক বা দাওয়ায় বসে গপ্পো করার কৃষ্টি বিলুপ্তপ্রায়, কিন্তু এর মজা বড়ো বেশি ছিল তখন। বাইরে দিয়ে হাজারো লোক চলেচে, কথা বলতে বলতে গৃহস্থ ঘরে ফিরছে, টানা রিকশা ঘন্টি বাজিয়ে ছুটে চলেচে, আর তার মুখোমুখি বসে নিজের লোকেদের সঙ্গে আমরা কথাবার্তা কইচি, এই আনন্দ ঘরের ভিতরে নাই। বাইরে শীতের বদলে চমৎকার বাসন্তী হাওয়া বইচে অকালে। ফুরফুরে সেই পরিবেশে বসে একবার হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে সুবল মুখ খুললো—“কী বলে শুরু করি ঠিক বুঝতে পারচি না ঠাকুরমশায়। এইরকম ঘটনা আমার থানায় আগে ঘটেনি। তবে বলি ব্যাপারটা। আমাদের এই কয়দিন নাওয়া খাওয়া মাথায় উঠেচে কাজের চাপে। ঐ সামনে যে দেখলেন একখানা বিরাট সেতু তৈয়ারির জন্য মাপজোক হচ্চে, এঁটের নাম রাখা হবে শিয়ালদহ উড়ালপুল। কবে তা তৈরি হবে জানিনে। যেমন হুকুমের বহর আর কী। নীচে না রয়েচে নদী, না রয়েচে খাল, অথচ শুকনো রাস্তার উপরেই একখানা আস্ত সেতু বানানো হবে। তো, এই বিরাট কর্মযজ্ঞের জন্য শিয়ালদহ থেকে আর্মানি ঘাটের ট্রামলাইন উপড়ে ফেলে সেটাকে বৌবাজার দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্চে। শোনা কথা, ভবিষ্যতে নাকি এঁটের উপর দিয়েও ট্রামের লাইন পাতা হবে। দৈর্ঘ্য নেহাৎ মন্দ হবে না, এইদিকে কাঠপট্টি থেকে আরম্ভ করে ঐদিকে শুনেচি স্যার নীলরতনের হাসপাতালের সামনে গিয়ে মাথা নোয়াবে। এই টালমাটালে রাতভিতে চোরের দল এসে লোহা, কাঠ, তার চুরি করতে চায় আর তাই আমাদের পালা করে সাইকেল নিয়ে টহল দিতে হচ্চে। তো, গত পরশু, অর্থাৎ এগারোই নভেম্বর তারিখে ভোরবেলায় আমি আর হাবিলদার কিষণ রাও সাইকেল নিয়ে থানায় ফিরচি, হঠাৎ দেখি একজন লোক উশকোখুশকো চেহারায় বৌবাজারের রাজপথ দিয়ে একখানা থলি হাতে নিয়ে চলেচে। আমার সন্দেহ হতে তাকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই লোকটা নানান রকম অসংলগ্ন কথাবার্তা কইতে আরম্ভ করল। কখনও বলে সে নাকি খুব বড়ো ঘরের ছেলে, কখনও বলে দক্ষিণের কুসুমপুরা গাঁ থেকে এইখেনে ভালো তান্ত্রিকের সন্ধানে এসেচে, আবার বলে উড়িষ্যা থেকে নাকি কী সব মূর্তিটুর্তি বয়ে নিয়ে এসেচে কবে। একটানা ডিউটিতে আমার মাথা এমনিতেই খাপ্পা হয়েই ছিল, তায় এইসব ঝকমারি সহ্য না হওয়ায় আস্তে করে পেটে বসিয়ে দিলুম একখানা রুলের বাড়ি। আমার ধ্রুব বিশ্বাস আমি ততো জোরে আঘাত করিনি, কিন্তু ঐ আঘাতেই সে লোক বেহুঁশ হয়ে পথে পড়ে গেল। আমি একটু ঘাবড়ে গিয়ে একটা টানা রিকশা দাঁড় করিয়ে তাকে তুলে নিয়ে এলাম পুলিশ চৌকিতে। আমাদের ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বললে লোকটা নাকি ভীষণ রকমের দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েচে, নাড়ির গতি অতি দ্রুত এবং কম করে হলেও তিনটি দিন সে কিছুই তেমন আহার করেনি।
তার জ্ঞান ফিরলে পর আমি নিজে একটা টাকা দিয়ে ‘দেবেন ঠাকুরের দোকান থেকে পরোটা, তরকারি আর জিলিপি এনে তাকে খাইয়ে জল দিলাম। বিনা বাক্যে পুরোটা নিঃশেষ করে আমার মুখের পানে তাকিয়ে রইল সে। সেই ফাঁকে আমি কয়েকটা কথা কইলাম তার সাথে— লোকটার নাম বলল অনন্ত সিংহ। কুসুমপুরা গাঁয়ে বাড়ি। তার থলির মধ্যে কতকগুলি আদ্যিকালের ভারী ভারী পূজার উপচার, ঘণ্টা, পেতলের মুখবন্ধ ঘট, তাম্রপত্র, শাঁখদানী, চন্দনবাটি, আরও কিছু টুকিটাকি জিনিসপত্তর ছিল। সে বললে ওগুলি নাকি কলকাতায় এনেচে কোনও তান্ত্রিককে দিয়ে পরীক্ষা করাবে বলে। তাদের পরিবারে নাকি কী সব মারাত্মক বিপদ চলচে, লোকজন মরচে, কিন্তু সেসব নিয়ে আমি উৎসুক নই, কেউ মরে থাকলে তা সামলাবে দক্ষিণের থানাগুলো, আমার ঝক্কি নাই। জিনিসগুলো কোনও মন্দিরের চুরির হতেই পারে কিন্তু সমস্যা হল যতক্ষণ না ঐরকম কিছুর চুরি যাবার নালিশ রুজু হচ্চে ততোক্ষণ একে চোর বলা চলে না। আমি কড়া মেজাজেই শুধালাম যে তুমি কলকাতায় কোন তান্ত্রিকের কাছে এসেচিলে? কী মতলবে এসেচিলে?
উত্তরে অনন্ত মাথামুন্ড, আবোল-তাবোল যা বললে, তাই শুনে আমার বিষম খাবার জো।
কথাগুলি অসংলগ্ন হলেও ভয়ঙ্কর। পেনাল কোডে দন্ডনীয়। হতভাগা বলে কিনা, কোনও মন্দির থেকে ওর বাড়িতে কী একটা সুপ্রাচীন ঠাকুরের মূর্তি এনে জুটিয়েচে, কোনও এক কাপালিক এসে হানা দিচ্চে, বাড়িতে লোকজন বেঘোরে মড়কের মতো মরে চলেচে, আর তার নিদান হিসেবে গাঁয়ের কোনও এক পুরোহিত নাকি স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে অনন্তকে কয়েচে তার ভদ্রাসনের উঠানে নাকি একটা নরবলি হবে এবং তবেই এই আপদ কাটবে। কথা আরও রয়েচে যে তান্ত্রিক ঐ নরমেধ যজ্ঞ সম্পন্ন করবে, তাকে নাকি এই কলকাতা শহরেই পাওয়া যাবে। এইটে শোনার পর পর অনন্ত উন্মাদের ন্যায় বেরিয়ে এসে ঠেলে উঠেচে এই শহরে এবং তন্নতন্ন করে হাজারো কাপালিক, সাধু আর তান্ত্রিকের সন্ধান করে চলেচে, কিন্তু কথাবার্তা কয়ে তাদের প্রতি অনাস্থা জন্মানোয় ভগ্নদূত হয়ে ফিরে চলেচে কুসুমপুরাতে।
এইবার বলি, লোকটাকে কিন্তু আমি অনেকগুলি কারণে গ্রেপ্তার করতে পারি। বাড়িতে পরপর নরহত্যার কথা ফৌজদারিভাবে গোপন করা, প্রাচীন মূর্তি পাচার, নরবলিতে পরোক্ষ ইন্ধন জোগানো এবং পুরনো আমলের মূল্যবান মন্দিরের জিনিসপত্তর নিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করা। কিন্তু আমি কোনওটাই করচি নে তার একমাত্র কারণ সেই লোক আমাকে পালটা শাসিয়ে চলেচে যে আমি বিনা জিজ্ঞাসাবাদে তাকে প্রহার করেচি কোন আইনে? বুঝুন অবস্থাটা। এইবার কী করি ভেবে আমি সারা। এমনিতেই এই উপদ্রুত সময়ে সকলে পুলিশের উপরেই খড়গহস্ত হয়ে রয়েচে, তায় যদি আবার…।”
আমি রাস্তার বাতির জ্যোতিতে কালীপদর মুখের দিকে একবার চেয়ে দেখলাম সেখানে বিশেষ কোনও উৎসাহ উঁকি দিচ্চে না। দেখা দিলে আমি ঠিক বুঝতুম। যখন মুখুজ্জেমশায়ের মনে বিদ্যুৎ খেলে, তখন তার চোখদুটি প্রখর হয়ে ওঠে এবং দুই হাতের আঙুলগুলো পরস্পর বদ্ধ হয়ে ওঠে। এখন সেসব বালাই নাই। কালী কেবলমাত্র একটা দায়সারা গোছের নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। দোরের কাছে আবছা চুড়ির ঝনৎকার কানে এল। কালীপদ উঠে গিয়ে ভিতর থেকে চারখানা খিলি দেওয়া পান এনে আমার হাতে দিল। সে নিজে পান খায় না, চাট্টি মৌরী চিবুতে চিবুতে পথের পানে দৃষ্টি মেলে বসে রইল। সুবল অথবা আমরা যে তার মনোভাব বুঝিনি তা নয়, সুবলও যে উৎসাহ নিয়ে কথাবার্তা আরম্ভ করেচিলো, তা স্তিমিত হয়ে এসেচে। আমার অবস্থা দাঁড়ালো শ্যাম রাখি না কুল রাখি। আমি একটু লজ্জিত মুখে সুবলকে কইলাম—“এই সকল আইনি কচকচি আর আমরা কি তোর থেকে ভালো বুঝব? তোর যেটুকু জানার ছিল, মুখুজ্জেমশায় তার উত্তর তো দিয়েই দিয়েচে। এর বাইরে আর আমাদের কী বলবার থাকতে পারে। এইবার যা করার দারোগা করবে।” এই বলে একটু হেসে পরিস্থিতি লঘু করার চেষ্টা করলাম।
সুবল কিন্তু সে হাসিতে টললো না। নিজের মনে বিড়বিড় করে বলল- “দারোগার কী আর রাজাগজাদের সঙ্গে বেশি কথা কওয়া শোভা পায়? তাদের মেজাজ মর্জিই আলাদা, কথা বলা দায়।”
কালীপদ বিরস স্বরে উত্তর দিল— “মাপ করো দারোগাবাবু, আমি জমিদার পরিবারের সন্তান বটে কিন্তু কস্মিনকালেও রাজা নই, তাই তোমার এই বক্রোক্তি আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না।”
আমি কিছু বলতে যাবার পূর্বেই সুবল হাতজোড় করে শশব্যস্ত হয়ে বলে উঠল—”ছিঃ ছিঃ ঠাকুর, আমি আপনাকে কথাগুলো বলিনি। আপনি ব্রাহ্মণ, তায় বয়োজ্যেষ্ঠ, সুতরাং…”
— “তাও একটা ভ্রান্তি মাত্র। অভ্যাস বশে নিজেরে ব্রাহ্মণ বলি বটে, কিন্তু তন্ত্রে দীক্ষার প্রথম শর্ত হল নিজের পূর্ব পরিচিতি ঘুচিয়ে দিয়ে, উপবীত ত্যাগ করে, তবেই দীক্ষা নেওয়া চলে। ফলে, আমি গৃহী হয়ে যজ্ঞোপবীত পুনর্বার ধারণ করেচি বটে, কিন্তু ব্রাহ্মণ পরিচয়ের থেকে আমার গুরুর পরিচয়ই আমার ব্রহ্ম। কেউ শুধুমাত্র বামুন বলে পা ছুঁতে এলে আমি সচরাচর ছুঁতে দিইনে। যাই হোক, তুমি তবে রাজা কাকে কইলে?”
সুবল উত্তর দিলে— “আজ্ঞা, ঐ অনন্ত সিংহকে। সে হতভাগা নিজেকে কোন এক রাজ পরিবারের বংশোদ্ভূত বলে কইচিলো যেন।”
শরৎ অবাক হয়ে শুধালো— “রাজা? কোন্ রাজা? কোন্ পরিবার? বাঙ্গালা প্রদেশের রাজা?”
— “সেইটে এক্ষণে ঠিক স্মরণ হচ্চে না রে। না, বাঙ্গালা নয়, রাজপুতানার কোনও এক রাজার কথা বলল সে। মনে পড়লে বলব’খন। কালকে তাকে হেড আপিসে চালান করে দিই। তারা ঠিক কথা আদায় করে নেবে।”
আরও কিছুক্ষণ রাজনীতি আর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে নানান আলোচনা করে নয়টা নাগাদ সকলে গাত্রোত্থান করল। তাদের কিছুটা এগিয়ে দিতে আমি আর মুখুজ্জেমশায় গলি পেরিয়ে ইস্টিশানের দিকে হেঁটে এলাম। রেলপ্রাসাদের ঠিক সামনেটা এ মাথা ও মাথা জুড়ে হড়হুড় ঘড়ঘড় শব্দে কলকব্জা দিয়ে সেতুর জন্য জরিপের কাজ চলচে। সুবল এখান থেকে থানাতেই যাবে। চন্দ্রনাথের গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েচে বড়ো রাস্তার উপরে। চন্দ্রনাথের বাড়ি পাঁচসায়রের কাছে। সে শরৎকে ডেকে বললে— “চলো, তোমাকে তোমার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আমি বেরিয়ে যাই।”
শরৎ হেসে কইলো– “না না চন্দ্রনাথবাবু, আমি আজ বড়শে বেহালার বাড়িতে যাচ্চিনে। আমিও এই নেবুতলাতেই একখানা ছোট বাড়ি খরিদ করেচি। ওইখানেই থাকব আজ। আপনার বাড়ি তো সেই পাঁচসায়র। অনেক দূর। আপনি রওয়ানা দিন।”
চন্দ্রনাথ স্মিত হেসে গাড়ির দোর খুললো। সুবল দুই পা এগিয়ে গিয়েচিলো সবে, এখন আবার আমাদের কথা শুনে কিছু একটা মনে পড়ায় পিছিয়ে এসে কালীপদকে কইলো– “আচ্ছা ঠাকুর, ভগবান পঞ্চশর কোন্ ঠাকুরকে বলা হয়?”
কালীপদ গলাটা একটু খাঁকারি দিয়ে বলল— “ভগবান পঞ্চশর হল কাম বা মদনদেবের আরেকটি নাম। ভগবান নয়, দেবতা। কামদেবের বহু নাম, কাম, অনঙ্গ, অতনু, পুষ্পধন্যা, পুষ্পশর, পঞ্চশর, মদন, রতিনাথ, বসন্তনাথ, মকরধ্বজ, মনসৃজ, মন্মথ, কন্দর্প, আরও অনেক আছে, ক’টা বলি?”
সুবল ভ্রু তুলে শুধালো— “বাব্বাঃ। উনি কীসের দেবতা?”
আমি ধড়মড় করে কয়েকটা পা ফেলে সেতুর জরিপকার্য্য দেখার জন্য এগিয়ে গেলাম। পিছন থেকে কালীপদর নীচু স্বর শুনলাম— “পঞ্চশর হলেন কামনার অধিষ্ঠাতা দেবতা। ওনার তূনীরে পাঁচখানা ফুলের তৈরি বাণ রয়, যে বাণের আঘাতে দেহধারী বা বিদেহী জীবেরা কামনায় জর্জর হয়। বাণগুলির নাম যদ্দুর স্মরণ হয়, শোষনারম্ভ, তাপনারম্ভ, স্তম্ভনচেতক, উন্মাদনী আর সম্মোহনী। ওনার বাণের আঘাতে স্বয়ং ব্রহ্মা আর মহাদেব অবধি…” সুবল তড়িঘড়ি প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বললে— “হাঁ ঠাকুর, বুঝেছি বুঝেছি।”
–“কিন্তু দারোগা, তোমার মাথায় হঠাৎ এই প্রশ্ন এল কেন?”
— “এল, কারণ ঐ অনন্ত সিংহ নামের লোকটা উড়িষ্যার মন্দির থেকে যে মূর্তিটা নিয়ে আসার গপ্পো ফাঁদচিলো, তাকে নাকি ওখানকার স্থানীয় লোকেরা ভগবান পঞ্চশর বলে ডাকে। সেই মন্দিরে নাকি মুখে কাপড় বেঁধে ঢুকতে হয়, আরও কত কী।”
কালীপদ একটা নিঃশ্বাস ফেলে কইলো–-“বুঝেচি, তুমি লোকটাকে নিয়ে বিব্রতও বটে, আবার উৎসুকও বটে, কিন্তু আমার এসব বিষয়ে জ্ঞানবুদ্ধি অতি সীমিত, ফলে ঔৎসুক্যও কম। দেখো ফৌজদারি উপায়ে যদি পেটের কথা উগরাতে পারো। তবে আমার মনে হচ্চে লোকটি হয় ভীষণ ধুরন্ধর, আর নয়তো ঐ অল্প বয়সেই তার ভীমরতি ধরেচে, নচেৎ এতগুলো অযৌক্তিক কথাবার্তা সে অন্ততঃ একজন দারোগার সুমুখে ফাঁস করতো না।”
সুবল হেসে রাত্রিকালীন অভিবাদন জানিয়ে বিদায় চাইলো। কালীপদও হাসিমুখে কইলো—“আমাদের গাঁয়ে তো এসব রাত্তিরের অভিবাদনের চল নাই, এসব সাহেবদের নিয়ম। আমরা জানি সারাদিন ভালো কাজ করলে রাত্তিরটা আপনিই শুভ হয়, তার আর শুভেচ্ছা কীসের? সাবধানে যেও।”
সুবল তার উত্তর না দিয়ে আনমনাভাবে আমার উদ্দেশ্যে বললে— “মুখুজ্জেমশায়ের ভীমরতির কথায় স্মরণ হল বুঝলি, ঐ অনন্ত সিংহ রাজপুতানার যে রাজার বংশধর, তাঁর নাম রাণা ভীমসিংহ।”
কালীপদ মুখুজ্জে নেবুতলায় ফেরার জন্য পা বাড়িয়েচিলো, সুবলের কথাটা কানে যেতেই তড়িদাহত মৃগের ন্যায় ঘুরে দাঁড়িয়ে অবিশ্বাসের সুরে অস্ফুটভাবে বলে উঠল— “কার নাম বললে? ভীমসিংহ? মহারাণা ভীমসিংহ? তাঁর বংশধর? কুসুমপুরা গাঁ? হা ঈশ্বর!”
আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম কালীপদর চোখে বিদ্যুৎ, আর তার দুই হাতের আঙুলগুলি পরস্পর সবেগে আবদ্ধ।
*
হতবাক সুবলও কিছু কম হয়নি। শরৎ ততক্ষণে চন্দ্রনাথকে বিদেয় করে পাশে এসে দাঁড়িয়ে কিছু একটা আঁচ করে আমাকে ভ্রু ভঙ্গি করল। আমি নিঃশব্দে চোখের পাতাদুটি একবার মুদ্রিত করে তাকে ইশারা করতেই শরৎ নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সুবল শুধালো— “ব্যাপার কী ঠাকুর? আপনি চেনেন বুঝি তাদের? সেই লোক কি সত্য কথা বলেচে তবে? আমি তো…।”
কালীপদ আপনমনে বিড়বিড় করে বলল— “সে কথা তো তার সাথে কথা না কয়ে বলতে পারিনে, তবে ঐ গাঁয়ের নাম এক আধবার শুনেচি আমি। একবার তাঁর সাথে কথা বলা যায় কি?”
— “স্বচ্ছন্দে। সে আমার চৌকিতেই প্রহরাধীন রয়েচে। যাবে কোথা? কিন্তু এখন হয়তো সে…।”
— “না না, সে আবশ্যকতা নাই, আমরা কাল সকালেই সাক্ষাৎ করব। তুমি এঁর পুলিশচৌকি বেশ চেনো তো ডাক্তার?”
আমি ঘাড় নেড়ে কইলাম— “বিলক্ষণ। এই তো কাছেই, জজকোর্ট পেরিয়ে একটুখানি পথ।”
*
প্রভাতে নিদ্রাভঙ্গ হতে লক্ষ্য করলুম বৌঠান কিছু দ্রুত হস্তে কাজকর্ম সেরে রাখচে। কাজ বলতে, আমার নিদ্রা ভঙ্গের আগে আগেই সকালের জলখাবার তৈরি করা সমাধা করে এখন বাক্স পেটরা গোছগাছ চলেচে। স্বামীর ডিবেতে কয়েকদিনের মতো লবঙ্গ আর শুষ্ক আমলকী ভরে দিয়ে, তাঁর ক্ষারে কাচা ধপধপে কামিজ, ধুতিবস্ত্র আর কাঁধের উড়ানি শয্যাপ্রান্তে ভাঁজ করে রেখে, এখন মুখুজ্জেমশায়ের বার্ণিশ করা জুতাজোড়া নিজের বসনাঞ্চল দিয়ে সাফসুতরো করে গুছিয়ে রাখচে। আমি দাঁতন করতে করতে সেই কর্মব্যস্ততা লক্ষ্য করে হঠাৎ একটা কথা মাথায় এল। আমরা রেসের মাঠে বিজেতা ঘোড়ার তারিফ করি, বাজি ধরি, কিন্তু যে লোকটা তার পিঠে সওয়ার হয়ে চালনা করল তাকে বাহবা দিইনে। রাঁধা উত্তম হলে রাঁধুনির প্রশংসা করি, কিন্তু যে যোগ্য জোগাড়ি তার কুটোবাটার জোগান দিল তার কথা মুখেই আনিনে। কালীপদ মুখুজ্জের অজস্র কীর্তি আমি স্বহস্তে লিখে গিয়েছি, কিন্তু যে বৌঠান মুখুজ্জেমশায়ের প্রতিটি পদক্ষেপের পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে যত্ন নিয়ে চলেচে তাঁর কথা তেমন একটা স্থান পায়নি আমার খাতায়। এই যে বৌঠান বসে বসে নিজের মূল্যবান শাড়ির প্রান্তভাগ দিয়ে স্বামীর জুতা পরিষ্কার করচে, তাঁকে তো কেউ বলে দেয়নি তা করতে। শাড়ির বদলে জীর্ণ বস্ত্রখণ্ড দিয়ে কাজটা করলে কী তফাৎ হতো? অথচ একজন যথেষ্ট সম্পন্ন জমিদার গিন্নী কিন্তু অনায়াসেই নিজের দাসদাসীকে দিয়ে সে কাজ নির্বাহ করতে পারেন। বৌঠান ভূস্বামীর গৃহেই জন্ম নিয়ে, যৎপরোনাস্তি সম্পদের মধ্যে বড়ো হয়ে, পুনরায় ছোট মুখুজ্জের বিবাহিতা স্ত্রী হয়ে বড়োঘরেই এসে পড়েচে। সে কেন এমন নিম্নবর্গীয় গৃহকর্ম করে সুখ খোঁজে? কালীপদর পরিবার বরাবরই স্ত্রী জাতির বিলক্ষণ সম্মান এবং স্বতন্ত্রতার পৃষ্ঠপোষক, এ আমি নিজে সাক্ষী, ফলে এ থেকেই বোঝা যায় বৌঠানের এই কাজ তার স্বেচ্ছাকৃতই বটে। কিন্তু কেন? একবার এইরকম একটা কথা মুখুজ্জেমশায়কে জিজ্ঞাসা করায় সে মুচকি হেসে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েচিলো, আর বৌঠানকে তেমন কথা শুধাতে আমার লজ্জা হয়। আমি কলপাড়ের দিক থেকে দোরের দিকে এগিয়ে দেখলাম বৌঠান রাস্তা দিয়ে চলা কয়েকজন মেয়ে মানুষের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কী যেন দেখচে। বললাম— “কী বৌঠান, এত তাড়াহুড়ো করে কী করচো? কী দেখচো?”
— “আচ্ছা ঠাকুরপো, তোমাদের শহরের মেয়েছেলেরা কলসী বয় না, তাই না?”
আমি আতান্তরে পড়ে বললুম—“কলসী? মানে জল আনার কথা কইচো? শহরে তো ঘরে ঘরে নলের জোগাড় রয়েচে। একখানা বিশাল উঁচু লোহার ট্যাঙ্কি, যার মধ্যে পঞ্চাশটা হাতী ধরে যায়, সেই ট্যাঙ্কির থেকে জল আসে। দাদার জমিদারীর আয় বৎসর গেলে বড়ো জোর তিন লক্ষ টাকা, আর ঔ টালার ট্যাঙ্কি তৈরিতে আজ থেকে প্রায় পঞ্চান্ন বছর আগেও লেগেচিলো পাঁচ লক্ষাধিক টাকা। সেই শহরের মেয়েরা কী আর কলসী তুলবে বৌঠান?”
–“বুঝলাম। সেই জন্যই এদিগড়ের মেয়েদের কোমরের গঠন অমন স্থূল প্রকৃতির হয়ে পড়ে। কলসী তোলার গুণ আছে ঠাকুরপো। তাতে কাঁখ সচল থাকে, গড়ন জন্মে, শরীর থাকে ঝরঝরে।”
— “আচ্ছা বুঝলুম। তো এত হুড়োহুড়ি করে সব গোছগাছ করচো যে বড়ো?”
একটু হাসির সঙ্গে উত্তর এল— “আর বলো কেন ডাক্তার ঠাকুরপো, আমাদের দু’জনার কলকাতার পেটে আর স্থান সংকুলান হলো কৈ? আজই রেলগাড়িতে চেপে রওয়ানা হতে হবে গাঁয়ে। উনি আমাকে বাড়িতে যাত্রা করিয়ে কোথাও যেন বেরুবেন ক’দিনের জন্য।”
কথাগুলো বলার পর গলাটা একটু নামিয়ে আবার বললে—“উনি মানে, তোমরা। শুনচি তোমাকেও নিয়ে যাবেন উনি। একটু খেয়াল রেখো তোমার দাদার। ঠান্ডায় শরীরটে একটু দুব্বল হয়েচে ক’দিন।”
কথা মন্দ নয়। আমি খেয়াল রাখব রায়দীঘড়ার ডাকসাইটে কালীপদ মুখুজ্জের! চিকিৎসক সুলভ গাম্ভীর্য নিয়ে বৌঠানকে যথাসম্ভব আশ্বস্ত করলুম। আসন্ন কিছু একটা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা যে আমার হতে চলেচে সে বিষয়ে আমি মনে মনে অত্যন্ত উত্তেজিত হয়েই ছিলুম। দেওয়াল ঘড়িতে সাতটা বাজলে পর মুখুজ্জেমশায় টহল দিয়ে ঘরে ঢুকলো। হাতে একখানা বসন্তমালতী আর ঘন নীল কাচের আফগান স্নো এর শিশি। কাঁধের চাদরটা বৈঠকের দেওয়াল দানীতে ঝোলাতে গিয়েও আনমনে কী একটা যেন মনে করে কইলো– “যাই, ওঁকেই দিয়ে আসি গে। রাখুক গুছিয়ে।”
চাদর নিয়ে কক্ষে প্রবেশের পর কালীপদর নীচু কণ্ঠে কিছু কথার উত্তরে বৌঠানকে বলতে শুনলাম— “ছিঃ ছিঃ, একটুও না। কলকাতার চাইতে আমার দেশ পাড়াগাঁই ভালো। ওসব নিয়ে মিছিমিছি একটুও ভাবনা করো না। ঠাকুরপোর বাড়ি তো রইলই, অবসরে আসব’খন।”
বেলা সামান্য বাড়লে পর বাড়ির দাওয়ার গায়ে একখানা ভাড়ার মোটরগাড়ি এসে থামলো। আমরা দোরের সামনে এসে দাঁড়িয়েচি। কালীপদ তার শ্বেতশুভ্র ধুতি কামিজে সজ্জিত, আর বৌঠানের সামনে একখানা টিনের বাক্স। গাড়ির থেকে কানাই আর নায়েব রঘুবীর সামন্ত নেমে এসে সস্ত্রীক কালীপদর সামনে হাতজোড় করে কইলো—“প্রণাম কর্তাবাবা, প্রণাম মা ঠাকরুণ, সব কুশল তো?”
উত্তরে বৌঠানই সপ্রতিভভাবে প্রথম মুখ খুললো— “সব কুশল নায়েবমশায়, আপনারা ভালো আছেন তো? এস্টেটের কাজকর্ম মিটে গিয়েচে?”
— “হাঁ মা, আপনাদের আশীর্বাদে।”
–“বেশ। শুনুন নায়েবমশায়, আমরা কিন্তু এখুনি এখুনি যাত্রা করব, তাহলে বেলা থাকতেই রায়দীঘড়া পৌঁছে যাব, পরে বারবেলা হয়ে পড়লে আবার ঝঞ্ঝাট। ইস্টিশান বোধকরি এইখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। মাঝেমধ্যে রেলগাড়ির বাঁশি শোনা যায়। যেটুকু তাতে যাওয়া চলে চলুক, তারপর এক্কাগাড়ি নেওয়া যাবে’খন। ভাড়া মিটিয়ে মোটরগাড়ি বিদেয় করে দিন। শুধু এই তোরঙ্গখানা একটু কষ্ট করে বইতে হচ্চে কানাইকে।”
রঘুবীর কানাইয়ের দিকে চেয়ে স্মিত মুখে কইলো—“কষ্ট কী মা? এ আমাদের সৌভাগ্য।” এই বলে নিজেই বাক্সখানা হাতে তুলে নিল। আমি কানাইকে বললুম— “সর্দার, আবার দেখা হবে। আজ তো তোমাদের দুটো ভালো মন্দ কিছুই খাওয়াতে পারলুম না।” কানাই পদমর্যাদায় আমার সমান না হলেও তার সঙ্গে আমার ঠাট্টা চলে।
সে হেসে বললে— “তার আর আশ্চর্য্যি কী ডাক্তারবাবু, কলকেতার লোক শুনেচি খেতে দেবে, কিন্তু ঠাঁই দেবে না, আর কলকাতার নিন্দে শুনলে একেবারে সাতকাণ্ড রামায়ণ শুনিয়ে দেবে মুখের উপরে।”
আমি এই ঠোঁটকাটা রসিকতায় সজোরে হেসে উঠে কানাইকে সামান্য অপ্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে কইলাম—“বটে? হাঁ রে কানাই, তুই বলতে পারবি সবকয়টা খন্ডের নাম? আমি তো শুনেচি রামায়ণে নাকি পনেরো কুড়িখানা খণ্ড রয়েচে?”
কানাই একবার কালীপদর দিকে চেয়ে ধীরে ধীরে কইলো– “না ডাক্তারবাবু, সাকুল্যে সাতটাই।
আদিকাণ্ডে রামের জন্ম, বিবাহ সীতার/ অযোধ্যায় বনবাস, ত্যাজি রাজ্যভার / অরণ্য কাণ্ডেতে সীতা হরিল রাবণ / কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ডেতে হয় সুগ্রীব মিলন / সুন্দরা কাণ্ডে হয় সাগর বন্ধন / লঙ্কাকাণ্ডে উভয়ের মহারণ / উত্তরা কাণ্ডেতে ছয় কাণ্ডের পরিশেষ / সীতাদেবী করিলেন পাতাল প্রবেশ।”
আমি অকৃত্রিম বিস্ময়ে একটু ঘুরে মুখুজ্জেমশায়ের দিকে চেয়ে শুধালাম–“এই কেঠো, নীরস লেঠেলটাকে কী তুমি শেষমেশ কবি বানিয়ে ছাড়চো নাকি দাদা?”
কালীপদ সে হাস্যপরিহাসে যোগ দিলে না। বৌঠান গলায় আঁচল দিয়ে স্বামীকে প্রণাম করল। আমরা সামনের মুখের গলি অবধি গিয়ে দাঁড়ালাম। কানাই আর নায়েব তাদের মা ঠাকরুণকে আগলে নিয়ে চলেচে। চোখের সামনে থেকে বড়ো রাস্তায় পড়বার আগের মুহূর্তে বৌঠান একবার পিছনে ফিরে কালীপদর দিকে তাকিয়ে একটুখানি হাসলো। এসব আজ বহুদিন আগের কথা, কিন্তু আমার মাতৃতুল্য বৌঠানের সে হাসির স্মৃতি এই সন্তানকে আজও কাঁদায় বুঝি। সে হাসি কালির বাঁধা অক্ষরে প্রকাশ করি আমার সাধ্যি কী? সে হাসিতে অভিমান, বিষাদ, আশীর্বাদ, প্রেম সব যেন পরতে পরতে ধরা রয়েচে। যিনি যথার্থ কারুকে ভালোবেসেচেন তিনিই এ হাসির মর্মার্থ বুঝি উপলব্ধি করতে পারেন। নিজের প্রাণাধিক মানুষটিকে নিজের আঁচল ছাড়িয়ে অজানা বিপদের মধ্যে যেতে দেখার কষ্ট যে কেমন হয়, তা ঐ একটি হাসিতে ফুটে বেরুচ্চে। এখন এই বয়সে এসে আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, বৌঠান হয়তো কালীপদকে শুধুমাত্র নিজের স্বামী হিসেবেই নয়, সম্ভবত নিজের প্রাণের অর্ধেক হিসেবেও আজন্ম গ্রহণ করেচিলো, এবং সেই বিরাট শক্তি এবং ভরসার বলেই সে কালীপদর পায়ের সোনার বেড়ি না হয়ে হাতের ইস্পাততুল্য তরোবারি হয়ে উঠেচিলো, যে হাতিয়ার ব্যতীত কালীপদ কখনও যশস্বী কালীগুণীন হয়ে উঠতে পারত না। যাক সেসব কথা।
*
কানাইদের আনা মোটরগাড়ির ভাড়া মিটিয়ে দেবার পরে সেটা বড়ো রাস্তায় এসে দাঁড়াল দেখে আমরা সেই গাড়িটাই আবার ভাড়া করে পৌঁছালুম সুবলের চৌকিতে। পথ তেমন অধিক নয়, কিন্তু মুখুজ্জেমশায়ের শরীরটে কয়দিন যাবৎ তেমন জুৎসই নয় বলেই মোটর নিয়েচি। সুবল ফটকের সামনেই একটা কাঠের চেয়ারে বসে চারমিনারে টান দিচ্চে, হঠাৎ মোটরের জানালায় মুখুজ্জেমশায়কে দেখতে পেয়ে ভুক্তাবশেষ অনলযষ্টিকে ছুঁড়ে ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে এগিয়ে এল। আমি গাড়ি থেকে নেমে টাকা বের করে চালককে এগিয়ে দিতেই সে নোট ক’খানা গ্রহণ করতে কিঞ্চিৎ ইতস্ততঃ করতে লাগলো। তার মনোভাব সহজেই অনুমেয়। যা হোক, ভাড়া মিটিয়ে আমরা ঢুকে পড়লাম সান্ত্রীমহল পেরিয়ে একেবারে ফাটকের সামনে। সুবল কিন্তু ফাটকের দিকে গেল না, তার বদলে গারদশ্রেণী পার করে সান্ত্রীদের থাকা খাওয়ার একখানা বড়ো কক্ষে এসে থামলো। কারণটা অবশ্য সহজেই অনুমেয়, যে মানুষটাকে কালীপদ মুখুজ্জে নিজে এসে দেখতে চেয়েচে, কথা কইতে চেয়েচে, তাকে ফাটকের অন্তরালে রেখে কথা বলালে আমার অতিথির মানহানি হয়।
ঘরে সান্ত্রী রয়েচে মোটে দুইজনা, তারা আচমকা সুবলকে কক্ষে ঢুকতে দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। সুবল হাতের ইঙ্গিতে তাদের ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে যাবার প্রচ্ছন্ন হুকুম জারী করা মাত্র তারা তটস্থ হয়ে নিজ নিজ ভাঁজ করা উর্দি এবং হাতিয়ার তুলে নিয়ে কক্ষান্তরে চলে গেল। ঘরের মাঝখানে চৌকিতে একজন মধ্যবয়স্থ ব্যক্তি বসে রয়েচে। বসা অবস্থাতেও বোঝা যায় তার দৈর্ঘ্য কালীপদর থেকে সামান্যই কম হবে। চেহারায় আভিজাত্যের সুপ্ত ছাপ থাকলেও বর্তমানে অবিন্যস্ত মাথার চুল এবং বিক্ষিপ্ত চাউনি দেখে তার মানসিক দুশ্চিন্তার কতক কতক আভাস পাওয়া যায়। তার শয্যাপ্রান্তে একখানা মাঝারি মাপের পুঁটুলি। সুবলকে দেখে সে একটুও প্রসন্ন হয়নি বোঝাই যাচ্চে, কিন্তু সেইসঙ্গে আমাদের দেখে সামান্য অবাকও হয়েচে বুঝলুম। সুবল মুখ খুললো— “এই যে মশায়, এঁনারা আপনার সঙ্গে কিছু কথা কইতে এসেচেন।”
আমি খেয়াল করলাম সুবল ইতিমধ্যেই অনন্তকে আপনি করে ডাকা আরম্ভ করেচে। কালীপদর কথাতেই হোক বা অন্য কিছুতে, তার প্রতি সুবলের মন একটু ভিজেছে। অনন্ত কিন্তু সৌজন্য দেখিয়ে চৌকি ছেড়ে উঠে দাঁড়াল না, সে বসে বসেই বিড়বিড় করে উত্তর করলে –”দেখা করতে এসেচে? কেন? কী চায় এরা?”
সুবল আবার রেগে উঠতে যাচ্চিলো, কিন্তু কালীপদর মুখের দিকে চেয়ে শুধু সুবল নয়, আমিও বিস্মিত হয়ে পড়লাম!
মুখুজ্জেমশায় অনন্তর মুখের দিকে নির্নিমেষে চেয়ে রয়েচে, তাঁর চোখের কোলে অশ্রু চকচক করচে, মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। চোখের জল মুছে, শয্যার এক কোণে উপবেশন করে কালীপদই প্রথম কথা কইলো— “তুমি আমার চাইতে বয়সে কনিষ্ঠ, তাই তোমাকে নাম ধরেই ডাকচি, যদিও বংশ ধরলে তুমিই আমার চাইতে বড়ো। তুমি মহারাণা ভীমসিংহের বংশের সন্তান তো?”
নিশ্চুপ অনন্ত এইবার মুখ ঘুরিয়ে পূর্ণ দৃষ্টিতে চাইলো। বোধকরি এই কয়টা দিন শুধু অবহেলা আর সন্দেহ ভোগ করে করে আজকের এই স্নেহের দুইটা বাণী তার কর্ণে সুধাসিঞ্চন করচে। অনন্ত ভাঙা স্বরে শুধালো—“হাঁ আমরা রাজপুতানার ক্ষত্রিয়বংশ বটে, কিন্তু আপনি কি আমাদের চেনেন?”
কালী প্রসন্ন সুরে উত্তর করল—“হাঁ বাবা, তোমরা আমার গুরুবংশ হচ্চো।”
— “গুরুবংশ? অর্থাৎ?”
— “অর্থাৎ আমার দীক্ষা যে গুরুর বরাবর, তিনি তোমার বংশেরই একজন সন্তান। মহারাণা ভীমসিংহের বংশের যে শাখা কুসুমপুরা তালুকে থাকেন, সেই কুলের একজন কুলতিলক হলেন আমার দীক্ষাগুরু। তাঁর মুখে আমি কখনও কখনও শুনেচি কুসুমপুরার নামটা।”
অনন্ত বিস্ময়ে ভ্রু কুঞ্চিত করে প্রশ্ন করলে—“কুসুমপুরার সিংহবাড়ির সন্তান? কী নাম তাঁর?”
কালীপদ দক্ষিণ হস্ত নিজের ললাটে স্পর্শ করে সগর্বে সশ্রদ্ধ কণ্ঠে কইলো—“অঘোরীশ্রেষ্ঠ তান্ত্রিক হংসিনী সিংহ।”
অনন্ত নামটা স্মরণ করতে পেরেচে বলে বোধ হল না। কিছুক্ষণ নামটা জিভের আগায় নানান ভাবে উচ্চারণ করে, কিছুক্ষণ নিস্তেজ বসে থেকে, আচমকা চৌকি ছেড়ে লাফিয়ে উঠে অবিশ্বাসের সুরে কয়ে উঠল- “সে কী! কী বলচেন? এ যে অসম্ভব কথা! ঐ নামে একজন ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি ছিলেন আমার পূর্বতন ষষ্ঠ পুরুষ। বাড়ির মেজো সন্তান। কুললতিকায় পড়েছি আমি তাঁর কথা। ঠাকুরদাদার মুখে গল্পও শুনেচি তাঁর। তিনি নাকি খুব কম বয়সেই গৃহত্যাগী হন, কিন্তু আপনার বয়স কত? তাঁরই বা বয়স কত এখন? আপনি কেমন করে তাঁকে জীবিত দেখবেন? আপনিও বা কে বলুন তো? আপনার নামটা শুধানো হয়নি আমার।”
ক্ষুদ্র মতি বালকের আধো আধো বাক্যে তার পরিজন যেমন অনাবিল হাসি হাসে, কালীপদও অনন্তর প্রশ্নে তেমনটিই হেসে কইলো—“ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে, নিবাস রায়দীঘড়া গাঁ। সন্তানকে কখনও মায়ের আর গুরুর বয়সের হিসেব রাখতে দেখেচো অনন্ত? তিনি পিশাচসিদ্ধ মহাযোগী, তাঁর বয়সের হিসেব-নিকেশ স্বয়ং মহাকালের খাতায় হয়তো লেখা থাকবে, কিন্তু আমাদের মতো গড়পড়তা মানুষের হিসেবে সে খতিয়ান মেলে কি? যাক সে কথা।”
অনন্ত একটু সমীহের নজরে চেয়ে ইতস্ততঃ করে শুধালো—“হাঁ, তা বটে, কিন্তু একটা কথা, তিনি কি এখনও…”
অনন্তর কথা শেষ করতে না দিয়ে কালী জবাব দিল—“মানুষকে মুছে ফেলার যে চারটি প্রক্রিয়া, অর্থাৎ হনন, বধ, জড়ত্ব অথবা বিলুপ্তি, তাঁর ক্ষেত্রে কোনওটিই ঘটেনি। এক পিশাচসিদ্ধের ক্ষেত্রে একমাত্র মহাকাল ব্যতীত সে ক্ষমতা কারুর সম্ভবে না অনন্ত, কিন্তু তবুও তিনি আমাদের মরজগতে আর বিদ্যমান নাই। নিজের অজান্তেই তাঁর শক্তির অপপ্রয়োগ ঘটেছিলো বলে সেই নির্লোভ, নিষ্ঠাবান যোগী নিজেকে লুকিয়ে ফেলেচিলেন অন্য কোনও এক জগতের অন্তরালে। গুরুর শ্রাদ্ধকার্য্যে শিষ্যের অধিকার রয়, কিন্তু আমি তাঁর পারলৌকিক ক্রিয়া করতে পারিনি এই কারণেই। যাক ওসব কথা। দারোগার মুখে জ্ঞাত হলাম যে তোমার পরিবারে কিছু একটা দুর্যোগ এসে পড়েছে। ঝাপসা ঝাপসা কতকগুলি কথা, যেগুলি তুমি এনাকে বলেচো, সেসব শুনেছি আমি। কিন্তু একটা কথা আমার মনে হয়, এই ঘোর বিপর্যয়ের মধ্যে পরিবারকে ছেড়ে আসাটা তোমার অনুচিত কার্য্য হয়েচে বাছা। তোমার গৃহে ফিরে গিয়ে তার মোকাবেলা করা উচিত।”
অনন্ত একটা দীর্ঘ শ্বাস মোচন করে অস্ফুট কণ্ঠে বলল—“মোকাবেলা? প্রতিদ্বন্দ্বীতা? কার সাথে ঠাকুর? শত্রুরকে চোখে দেখা গেলে তবে তো মোকাবেলা হবে। আপনি সব কথা জানেন না বলেই বলচেন তেমন কথা।”
— “হাঁ। জানিনে তা সত্য, কিন্তু যাত্রা পথে জেনে নেওয়ার আর সমিস্যে কী বলো? বাকি কথা তখনই হবে।”
অনন্ত হাঁ করে চেয়ে কাষ্ঠ কণ্ঠে শুধালো— “যাত্রা পথ? মানে?”
— “মানে, আমি তোমার সঙ্গে কুসুমপুরা যাচ্চি। এ আমার পরম সুহৃদ, পেশায় নামকরা চিকিৎসক। এও সঙ্গে যাচ্চে। দেখা যাক কোনও কাজে লাগতে পারি কী না।”
অনন্ত মাথা নীচু করল। বুঝলাম তার চক্ষে জল এসেচে।
— “কিন্তু ঠাকুর, কী বিপদ, কী ঘটেচে কিছু না জেনেই মরণকূয়ায় ঝাঁপ দিতে ব্রতী হয়েচেন? বাড়িতে ব্রহ্মহত্যার দায় নিয়ে মরতে হবে আমাকে? আমাকে বাঁচানো কারুর সাধ্যি না। মরতে আমাকে হবেই। আপনি না বললেও আমি বাড়িতে ফিরে যেতুম। যা হবার সেখানেই হোক। ঐ শয়তান আমাকে খুঁজে খুঁজে কলকাতাতেও হানা দিয়েচে। পরশু রাত্তিরে কলকাতার অন্ধকার গলিতে তাকে দেখেচি আমি। এই বিভূঁইতে আমি মরতে চাই না। তাই আমার অনুরোধ, আপনি ব্রাহ্মণ মানুষ, বিপদের ভয়াবহতা না মেপেই আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেবেন না। তাতে উভয়েই বিনষ্ট হব।”
কালী উঠে দাঁড়িয়ে অনন্তর কাঁধে হাত রেখে স্মিত স্বরে বললে- “বিপদের কথা শুনে, তার গভীরতা মেপে, তবে নিজের গুরুবংশ রক্ষায় পা বাড়াব, এত হীন আমি নই অনন্ত। তন্ত্রের জগৎ হলো একটা বিকট করালদর্শন সমুদ্র বিশেষ। তার এক আধ ফোঁটা জলবিন্দু কেউ কেউ পায় আমার মতো। আমার তন্ত্র বিষয়ে বিদ্যে অধিক নাই, কিন্তু যেটুকু বুদ্ধি আর শুদ্ধি রয়েচে, সবটুকুই গুরুর থেকে প্রাপ্ত। যাঁর মাথায় গুরুর হাত আর ভবাণীর চরণ রয়েচে, সে হাসিমুখে বীজানন্দ রাক্ষসের সুমুখেও নিরস্ত্র দাঁড়িয়ে থাকতে পারে বাছা। সেই শক্তিতেই তো দেবর্ষি নারদ নিরস্ত্র হয়েও একের পর এক দানবের মুখে গিয়ে দাঁড়িয়েচে। আজ যা বেলা পড়ে আসচে, তাতে আজ আর রেলগাড়ি পাওয়া দুষ্কর। তোমার মোটঘাট বেঁধে তৈরি রেখো। কাল সকালে যাত্রা করা যাবে। আমি সুবলকে সব বলে রাখব।”
অনন্ত শুধালো— “সুবল কে?”
কালীপদ ইশারায় দারোগার দিকে দেখিয়ে, তারপর বলল—“আর হ্যাঁ, প্রথমে ভেবেচিলাম তোমাকে আজ রাত্তিরটুকু আমাদের সঙ্গেই এর বাড়িতে থাকতে বলবো, কিন্তু মনে হচ্চে রাতটুকু তোমার এইখানে থাকাই শ্রেয়। কে তোমার সন্ধানে সন্ধানে ফিরে বেড়াচ্চে জানিনে, তবে পুলিশ চৌকির ভিতরে তোমার থাকাটা হয়তো সে কোনও মতেই আঁচ করতে পারবে না আশা করি। বাকি কথা কাল রেলযাত্রার সময়ে হবে, কেমন?”
পুরাতন বেলিয়াঘাটা ইস্টিশান এখন নাম বদলে শিয়ালদহ দক্ষিণ ইস্টিশানে পরিণত হয়েচে। এই রেলপথে এখনও বেশিদূর অবধি রেললাইন পাতা হয়ে ওঠেনি, ফলে তালুক সুন্দরবনের কোনও গাঁয়ে যেতে গেলে লক্ষ্মীকান্তপুর নামের একটা ইস্টিশান অবধি রেলগাড়িতে চেপে গিয়ে তারপর গ্রামে গিয়ে আবার টমটম, এক্কা বা নিদেনপক্ষে গো-যান ভাড়া নিতে হয়। সে এক মহা হাঙ্গামের কথা। একজন সান্ত্রীকে টিকিট খরিদ করে রাখার জন্য একটা টাকা দিয়ে আমরা এসে পড়লাম বড়ো রাস্তায়। পথে বিকেলের বিকিকিনি নিয়ে দোকানীরা বসে পড়েচে। তীক্ষ্ণচঞ্চু টেম্পো গাড়ির দল ঘাড় নাড়তে নাড়তে চলেচে। পথের দুইধারে জনপ্রিয় ইউসুফ আর শায়রা বানো অভিনীত ছায়াছবি “সাগিনা মাহাতো”র বিজ্ঞাপন পড়েচে, শেয়ালদা প্রেক্ষাগৃহের বাইরে ছায়াছবির সংক্ষিপ্ত গল্প লেখা গেজেট বিক্রয় হচ্চে। আমার বড়ো সাধ ছিল মুখুজ্জেমশায়দের সঙ্গে নিয়ে ছবিখানা দেখতে যাব, কিন্তু… থাক, পরে কখনও হবে।
পরদিন সকালে প্রাতঃভ্রমণ করতে করতে একবার থানায় গিয়েচিলাম। সুবল বাড়ি গিয়েচে, থানায় ফিরবে দশটা নাগাদ। সান্ত্রী আমাদের হাতে রেলকোম্পানীর মোহর দেওয়া কার্ডবোর্ডের তিনখানা টিকিট আর একটা সিকি ফেরৎ দিয়ে জানাল, বেলা এগারোটায় গাড়ি ছাড়বে। অন্যান্য দিনে সকালে ও একটা গাড়ি চলে, কিন্তু আজ ছুটির দিন, তাই রবিবারে শুধুমাত্র এই একটাই গাড়ি। আমরা অনন্তকে তৈরি থাকতে বলতে গিয়ে তার হাবভাব দেখে বুঝলুম সে সারা রাত্তির দুই চোখের পাতা এক করেনি।
*
আমরা আধঘণ্টা পূর্বেই ইস্টিশানে এসে পড়লাম। দলে দলে লোকজন মোটঘাট নিয়ে বসে রয়েচে। কালীপদ মাথার উপরে আর সুমুখে একটু ইতিউতি চেয়ে কয়জন লোকের সামনে গিয়ে কইলো—“একটু জল দিতে পারো বাছা? পিপাসা পেয়েচে।”
তাদের মধ্যে একটি ছেলে একখানা মাঝারি ঘটি বের করে শুধালো— “পানি রয়েচে কর্তা, কিন্তু আমরা মোছলমান। দ্যাশ পূব পাকিস্তান। আপনি কি আমাদের পানি… মানে…. আপনি”
কালীপদ হেসে বললে— “হাঁ বাপু, আমি ব্রাহ্মণই বটে, সত্যকারের ব্রাহ্মণ। তাই নিশ্চিন্তে দাও। জল দান করা মহা পূণ্যের কর্ম। তা সে কুরুক্ষেত্র হোক কিম্বা কারবালার প্রান্ত। একটা দেশ যখন নিজেকে স্বাধীন করার জন্য আপ্রাণ লড়াইতে নামে, তখন এইসব জাতপাতের বিভাজন সৈনিককে শুধুই পরাস্ত করে বাছা। বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের কথা শুনেচি বিস্তর। তাঁর যুদ্ধ যেন বিফলে না যায়, সে দায়িত্ব তোমাদের নিতে হবে। আশীর্বাদ করি তোমরা খুব শীঘ্রই স্বাধীন হবে।”
জলের ঘটিটা হাতে নিয়ে কালীপদ আমার দিকে ফিরে শুধালো―“আচ্ছা ডাক্তার, পানি ও জল, দুই শব্দ মিলেই তো পানীয় জল হয়, তাই না?” আমি হাসিমুখে নিজের চোখ দিয়ে নীরবে সম্মতি জানালাম। কালীপদ ঘটি থেকে কিছুটা জল ঢকঢক করে পান করে আরও একটু জল হাতে নিয়ে বসে থাকা লোকগুলোর গায়ে হঠাৎ ছিটিয়ে দিল। তারপর ঘটিটা ফেরৎ দিয়ে চলতে শুরু করল। বসে থাকা লোকগুলোও কম বিস্মিত হয়নি। অনন্ত আশ্চর্য হয়ে বললে— “ও কী করলেন ঠাকুর?”
কালীপদ গম্ভীর কণ্ঠে বলল— “দন্ডী দিলুম। নয়তো বিপদ ঘটতো।”
ঠিক এগারোটায় রেলগাড়ির প্রথম ঘণ্টা পড়ল। আমরা তখন গাড়িতে মালপত্তর ওঠাচ্চি। দ্বিতীয় ঘণ্টা পড়ল ঠিক পাঁচ মিনিট পরে। হঠাৎ বাইরে একটা হুড়মুড় শব্দ পেয়ে আমি আর অনন্ত তড়িঘড়ি মুখ বাড়িয়ে দেখি ভয়ানক কাণ্ড! মাথার উপরের টিনের বিশাল চালাখানা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েচে নীচে, আর যে দলটার থেকে মুখুজ্জেমশায় জল পান করল একটু আগে, তাদের মাথার উপর টিনের একটা ধারালো অংশ হিংস্রভাবে ঝুলচে, কিন্তু কোনও অদৃশ্য কিছুতে বাধা পেয়ে তাদের মাথায় পড়তে পারেনি। আমরা ভিতরে কালীপদর দিকে তাকিয়ে দেখলুম সে নির্বিকার দাঁড়িয়ে রয়েচে। আমরাও অগত্যা তার পাশে এসে স্থিতু হলাম।
শেষের ঘণ্টা পড়তেই সেই সহস্ৰচক্র মহাসর্প নিজের অলস কুণ্ডলী ত্যাগ করে, যাবতীয় ক্ষোভ ফোঁসস ফোঁসস শব্দে উদগার করে দিয়ে ধাবিত হল। শক্তিশালী কানাডা স্টার ইঞ্জিন ভারতে ঢুকেচে পরেই রেলগাড়ির যেন পাখনা লেগে গিয়েচে। আমাদের কামরায় তেমন বেশি লোকজন নাই। আমরা পাটাতনের মেঝেতে মাঝামাঝি স্থানে শতরঞ্জি বিছিয়ে বসলুম। ছারপোকার ঔষধ মিশ্রিত ছোবড়ার গদি দেওয়া কীটদষ্ট আসনের চাইতে এই ঢের ভালো। দোরের দিকে বসলে বাতাস আসে বটে, কিন্তু কয়লার ধোঁয়ায় পোশাক নষ্ট হয়। মাঝে মাঝে উষ্ণ কয়লার গুঁড়াও বেবাক চোখে এসে পড়ে। গাড়ি যখন পূর্ণ গতি বিস্তার করল, তখন কালীপদ জিজ্ঞাসু নেত্রে অনন্তর পানে চাইলো। অনন্ত চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে কথা বলতে আরম্ভ করল। রাক্ষুসে ইঞ্জিনের ‘কু’ ডাকে, আর লৌহচক্রের ঘর্ঘরধ্বনি পেরিয়ে সে কথা বাকি যাত্রীদের কারুর কানেই পৌঁছায়নি। সে বৃত্তান্ত হতভম্ব হয়ে শুনেচিলাম কেবল আমরা দুইজন। ঐ সময়ের সবটুকু ঘটনা পরস্পর প্রশ্নোত্তরের মধ্যে দিয়ে পড়তে পড়তে তোমাদের কিঞ্চিৎ বিরক্তির উদ্রেক হতেও পারে, কিন্তু এই ইতিহাসটুকু না জানলে হলপ করে বলতে পারি, মুখুজ্জেমশায় কখনও এই পঞ্চবাণ নামক ভয়ঙ্কর মৃত্যুবাণের ছোবল থেকে অনন্ত সিংহকে রক্ষা করতে পারত না। অনন্ত সিংহের সেই অতি আশ্চর্য কথা আমি তার নিজের জবানিতেই তোমাদের শোনাব—
“মুখুজ্জেমশায়, আমি সব কথার মধ্যে কোনটি আগে বলি, আর কোনটি পরে, তা ঠিক করে উঠতে পারচিনে। ঘটনাক্রমানুসারে আমি সব বলে যাচ্চি আপনাকে। ঘটনা ততো প্রাচীন নয়, এই গেল বর্ষার সময়ে, অর্থাৎ চার সাড়ে চার মাস পূর্বে আমার বাড়িতে উড়িষ্যা প্রদেশ থেকে একখানা চিঠি আসে। খোলা চিঠি নয়, লেফাফায় মুড়ে রীতিমতো ডাকখাতায় পাঠানো চিঠি। তো সেই চিঠি পেয়ে…”
কালীপদ সামান্য বাধা দিয়ে বললে — “আমাদের যাত্রা শেষ হতে যথেষ্ট বিলম্ব রয়েচে অনন্ত। তুমি তড়িঘড়ি করতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনও কথা বাদ দিয়ে বসো না। চিঠির আগে তোমার পরিবারের সম্পর্কে কিছু জানা আবশ্যক।”
অনন্ত লজ্জিত হয়ে উত্তর দিল— “ঠিকই তো। ঠাকুর, আমরা চার ভাই। আমি, অনন্ত সিংহ, এই পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান। বিবাহ করার তিন বছর পরেই স্ত্রী গত হন। দ্বিতীয় দারগ্রহণ করিনি। সন্তানাদিও নাই।
আমার জ্যেষ্ঠ হলেন শ্রী হেমন্ত সিংহ। তাঁর একটি করে পুত্র আর কন্যা। দিগন্ত আর নারায়ণী। ভাইঝি নারায়ণীর বিবাহ হয়েচে হালিশহরের রামতনু সিংহের পুত্র কেশবচন্দ্রের সাথে। সে ছোকরা মহা বজ্জাত। মদ খেয়ে, জুয়ো খেলে সর্বস্ব খুইয়ে এখন মধ্যে মধ্যে দাদার কাছে আসে টাকার জন্য। তবে মেয়েটির মুখের পানে চেয়ে কষ্ট হয়। বড়দার সংসার সুখের নয়। আমার বৌদিদি, অর্থাৎ নারায়ণীর মা একবার দাদার সঙ্গে মতোন্তর হওয়ায় সোজা গিয়ে উঠল তাঁর পিত্রালয়ে। সেই যাওয়াই শেষ। এখন সে বেঁচে আছে কিনা খোঁজ নিইনে আর, কিন্তু সে আর সংসারে ফিরে আসেনি। দাদার ছেলেমেয়ে দুটি মানুষ হলো বাড়ির ঝি হরিমতীর কাছে।
সেজো, অর্থাৎ আমার পরের ভাইয়ের নাম কৃতান্ত সিংহ। সে কিছুদিন আগে অবধি…”
কালীপদ মুখ তুলে প্রশ্ন করল— “দাঁড়াও। নারায়ণীর কথা তো শুনলাম, ভ্রাতুষ্পুত্র দিগন্তর কথা কিছুমাত্র বললে না? তবু তাড়াহুড়ো করচো ফের?”
অনন্ত মুখ নামিয়ে বিমর্ষ সুরে কইলো– “তাড়াহুড়ো নয় ঠাকুর, ইচ্ছে করেই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েচি। দিগন্ত যে আর নাই। যে সর্বনাশা অভিশাপ আমার গৃহে থাবা দিয়ে বসেচে, তারই বলি হয়েচে তরতাজা ছেলেটা। বেঘোরে মারা পড়েচে। সেসব বলচি পরে। আমার ঘর উজাড় হতে চলেচে ঠাকুর।”
কালী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে— “তারপর!”
— “আমার পরের ভাইয়ের নাম কৃতান্ত সিংহ। সে এতদিন অবধি আমাদের বহু অনুনয় বিনয় সত্বেও বিবাহ করেনি। কৃতান্ত অত্যন্ত ধার্মিক এবং সাত্যিক প্রকৃতির মানুষ, কিন্তু একাধারে মহা বলশালী, রীতিমতো মুগুর ভাঁজতো নিত্যদিন। রোজ ভোরে উঠে নিজের হাতে আমাদের ভদ্রাসনে প্রতিষ্ঠিত কালীমন্দিরের দোর খুলে, ধূনা দিয়ে, তবে জলগ্রহণ করত। মন্দিরের প্রভাতী জাগরণের সময়ে তার উদাত্ত ভক্তিভরা কণ্ঠের ‘জয় মা’ ধ্বনি শুনে এই সুদীর্ঘকাল আমাদের দিনের শুরু হয়েচে। আমার সেই ভাইও আর নাই ঠাকুর। আমি নিঃস্ব, রিক্ত হয়ে পড়ে রয়েচি। বিবাহের বিষয়ে আমাদের অনুনয়ে কর্ণপাত না করলেও মাঝখানে একটা ঘটনা ঘটেচিলো। কৃতান্ত তার এক বন্ধুর ভগ্নীর বিবাহে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েচিলো শ্রীরামপুরের কাগজকলের পাড়ায়। সেথা পণের হিসেবে কিছু ঊনিশ বিশ হওয়ার কারণে পাত্রের পিতা ছাদনা থেকে বর নিয়ে উঠে যায়। এদিকে কন্যা লগ্নভ্রষ্টা হবার অপমানে কুয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়তে যেতে ভাই তার পথরোধ করে। প্রথমে বরকর্তার নাকে নিজের দেহের মানানসই একটি মুষ্টাঘাত আর তৎপশ্চাৎ বন্ধুর ভগ্নী শশীমুখীকে বিবাহ করে পরদিন এসে ওঠে কুসুমপুরায়। আমরা বিস্তারিত সংবাদ অবগত হয়ে মহা আনন্দে শীঘ্র শীঘ্র আচার বিধির আয়োজন করি। আমার বৌমা শশীমুখী, মেয়েটি ভারী লক্ষ্মীমন্ত ঠাকুর, কৃতান্ত যাওয়ার পর বাছার কষ্ট যে চোখে দেখতে পারিনে আর। চোখের সামনে নিজের স্বামীকে ওই নৃশংসভাবে…”
অনন্ত একটু থামলো। কালীপদও একটু চুপ করে চিবুকে হাত দিয়ে বসে রইল। রেলগাড়িতে আধা পথ আন্দাজ অতিক্রম করেচি আমরা। আরও কিছু সময় বাকী। একটা ইস্টিশানে গাড়িটা ইঞ্জিনে জল ভরার জন্য থামলো। কালীপদ এতক্ষণে ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা করল— “আমি যথেষ্ট বুঝতে পেরেচি বাছা আমাদের এসব কষ্টের কথা বলতে তোমার মধ্যে কতখানি বিষণ্ণতা ভর করচে, কিন্তু সবটুকু না জানলে আমিই বা কোন আঁধারে হাতড়ে সারা হই? একটা কথা বলো, তোমার ঘরে এখনও অবধি কতগুলি অপমৃত্যু ঘটেচে?” অনন্ত ভাঙা স্বরে কইলো— “এখনও অবধি তিনটি। আপনাদের দুইটি ঘটনার আভাস দিয়েচি। পরেরটির শিকার আমার কনিষ্ঠ ভাই সুমন্ত সিংহের জোয়ান ছেলে জয়ন্ত। আমাকে নিয়ে হয়তো বা আরও দুটি পূর্ণ হবে এবং তখনই একমাত্র এই মরণলীলা হয়তো বা সমাপ্ত হবে।”
এইবার আমি অবাক হয়ে শুধালাম— “কেন? পাঁচটিই কেন?”
কালীপদ আমার দিকে অপ্রসন্ন দৃষ্টিতে চাইলো।
অনন্ত বললে— “বলচি সব। ধৈর্য্য ধরে শ্রবণ করুন। পারিবারিক পরিচয়টুকু ঠাকুর চাইলেন বলে কইলাম। এইবার আসল ঘটনাটা বলি। গেল বর্ষায় আমাদের এস্টেট বরাবর উড়িষ্যা থেকে একখানা রেজিস্টারি করা মুখবন্ধ চিঠি এসেচিলো। আমি তার লেফাফায় পাঞ্জা ছেপৎ দেখে বুঝলুম সেখানা এসেচে ওই রাজ্যের গজপতি নামক একটি পার্বত্য স্থান হতে। দাদাকে সেইটে দেখাতে দাদা বললে যে আমাদের বংশের অনেকগুলি শাখাপ্রশাখা যেমন দেশের বহু তল্লাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েচে, তেমনই একটি শাখা ঐ গজপতি অঞ্চলে বাস করেন। চিঠিটার প্রেরক ছিলেন লক্ষ্মণ সিংহ নামক একজন। তিনি কাতর এবং সনির্বন্ধ অনুনয় জানিয়েচেন যে ওই দিককার বংশে তিনিই একমাত্র অবশিষ্ট রয়েচেন এখনও। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়েও বেঁচে রয়েচেন। কিন্তু তাঁর আয়ু ফুরিয়ে এসেচে। তাই দয়া করে যদি কুসুমপুরা হতে সিংহ বংশের কোনও বংশধর একটিবার গজপতিতে গিয়ে উপস্থিত হয়, তবে তাঁর মরণ এবং পরলৌকিক ক্রিয়াটুকু শান্তির হয়।
চিঠি পড়ে পড়লুম ফাঁপরে। একেই তো সেই লোককে আমরা চিনিনে, কিন্তু সিংহ পরিবারের লোক তাতে সন্দেহ নাই। সাত পুরুষের নির্ভুল উল্লেখ থেকে শুরু করে এমন বহু কথাই তাতে ছিল যে কোনও ভাবেই তা বাইরের লোক জানতে পারে না। কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। বুড়া লক্ষ্মণ সিংহ মৃতপ্রায় তা তো বোঝা গেল, কিন্তু ঠিক কতদিন তার আয়ু তা কেমন করে জানি? হয়তো হপ্তা দুই বা তারও অধিক সময় লাগতে পারে। বাকি ভাইয়েরা সকলেই গৃহী সংসারী, ফলে সেই দায়িত্ব এসে ন্যস্ত হল আমারই উপরে। অসময়ে আত্মীয়ের জন্য এটুকু তো স্বীকার করতেই হয়। যা হোক, আমি এস্টেটের একখানা চৌঘুড়ি, গাড়োয়ান মাণিকলাল আর একজন চাকর সুকোকে নিয়ে রওয়ানা দিলাম উড়িষ্যার গজপতি জেলার মহেন্দ্রগিরির সিংহবাড়ির উদ্দেশ্যে।
সুকো জন্ম থেকেই এ বাড়িতে। দাদার ছেলেমেয়েদের দেখাশুনো করতো ঐ যে হরিমতীর কথা বললুম, তারই ছেলে এই সুকো। বয়স ঐ সতেরোর কাছাকাছি। হরিমতীর আর তার স্বামী পরাণ, উভয়েই এই বাড়িতে কাজ করত। এই পরাণ ছিল বড়ো চন্ডাল প্রকৃতির মানুষ। রাগলে হিতাহিত কাণ্ডজ্ঞান থাকতো না। একবার সামান্য কী কারণে হরিমতীর উপরে মহা খাপ্পা হয়ে তাকে ত্যাগ করে সিংহবাড়ির কাজ ছেড়ে চলে গেল। তখন রীতিমতো সন্তানসম্ভবা অসহায়া হরিমতী কেঁদে পড়ল আমাদের কাছে। সেই থেকে তারা এই বাড়িতেই রয়েচে। তাদের আমরা আর কখনও বেতনভোগী বলে মনে করিনি
সুকো ভূমিষ্ঠ হয়েচে সিংহবাড়িতেই। বড়দা স্বয়ং তার নামকরণ করে মুখে মধু দান করেচেন। ছেলেটি বয়সে কম হলে হয় কী, তার দেহে বিলক্ষণ বল এবং অত্যন্ত বিশ্বাসী। কৃতান্তর কাছে সে রীতিমতো কসরত শিক্ষা করত। এই কারণেই তাকে সঙ্গে নেওয়া।
আমরা যেদিন মহেন্দ্রগিরি পাহাড়ের পাদদেশের ঠিকানায় পৌঁছালুম, তখন দীর্ঘ যাত্রার অবসাদে শরীর অবসন্ন। অত বড় পাহাড়খানা যেন তিনমহলা বাড়িটা আর তার আশপাশের উপরে মৃগলোলুপ ব্যাঘ্রের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েচে। একজন চাকর বাড়ির ফটকে এসে ঘোড়াদের জল দিয়ে আমাকে যৎপরোনাস্তি খেলোয়াৎ পূর্বক উপরিতলে নিয়ে গেল। গাড়োয়ান চারখানা অশ্বের আহারের বন্দোবস্ত করতে শুরু করল পর আমি আর সুকো উঠলাম দ্বিতলের কক্ষে। বিরাট কক্ষের মাঝে একখানা প্রকাণ্ড পালঙ্ক বসানো। ফিকে হয়ে আসা দেওয়ালের পরকলা চিত্র, ঝাড়লণ্ঠন, আর পুরু পারস্য দেশের ফরাস এই বাড়ির অতীতগর্বের সাক্ষ্য দিচ্চে নীরবে। পালঙ্কে একজন শীর্ণকায় বৃদ্ধ শায়িত। সুকো আমার সঙ্গেই কক্ষে প্রবেশ করতে যাচ্চিলো, কিন্তু আমি তাকে দোরে থামিয়েই ভিতরে ঢুকলাম। হয়তো বৃদ্ধ রাজপুত মরণের পূর্বে কিছু আবেগের কথা কইবে, সে সময়ে পরিচারকের উপস্থিতি অশোভন বটে।
সে কক্ষে উপবেশন করার যোগ্য অপরাপর কোনও বস্তু না থাকায় আমি সঙ্কুচিতভাবে তাঁর পার্শ্বেই বসলাম। আমাকে দেখে বৃদ্ধর মুখে শীর্ণ হাসি দেখা দিলো। ভগ্ন কণ্ঠে কইলো—‘বলবন্তের মুখখানি যেন কেটে বসানো তোমার মুখে। কতকাল তাদের কারুকে দেখেনি এই পোড়া চক্ষু। সে আছে কেমন?’
আমি সঙ্কুচিতভাবে জানালাম যে বাবা মহাশয় গত হয়েচেন বহু বৎসর আগেই। সে কথা শুনে তার মুখে কিছুটা ঔদাসীন্য ব্যতীত অপর কোনও ভাব প্রকট হল না। বোধকরি বহু বহু প্রিয়জনের মরণ চোখের সামনে দেখে দেখে বুড়ার বুক পাথর হয়ে পড়েছে। ভালোমন্দ দুই চারটে কথার পরে বুড়ো আসল কথায় এল— ‘শোনো বাছা, তোমাদের কাউকে যে আমি আসতে লিখেচিলাম মহেন্দ্রগিরিতে, তার কারণ কেবলমাত্র আমার পারলৌকিক সৎকর্ম নয়। আরও একটা কারণ রয়েচে। সেইটের জন্যই…
মহলে প্রবেশের পূর্বে আট দশ রশি দূরে ঠিক পাহাড়ের পায়ে একখানা মন্দির দেখেচো তো? অনেক লোকজন পূজা দেয়, মানত করে ওখানে। সকলকে পূজার অধিকার দিলেও ঐ মন্দির কিন্তু বাইরের লোকেদের জন্য নয়। ওইটে আমাদের প্রতিষ্ঠিত এবং সংস্কারের কাজও এস্টেটের অর্থকড়িতেই হয়ে থাকে। ঐ মন্দিরের ভার কারুর উপরে না দিয়ে আমি যেতে পারচি নে মায়া কাটিয়ে। ভগবান রুষ্ট হবেন।’
বুড়ার কথার ভঙ্গিতে আমার একটু খটকা লাগলো। শুধুমাত্র ভক্তি নয়, ঐ মন্দিরে কিছু একটা ভয়ের জিনিস রয়েচে, যার চিন্তায় বৃদ্ধ সর্বদা চিন্তিত হয়ে থাকচে। আমি বিব্রত হয়ে বললুম— ‘কিন্তু আমার পক্ষে কুসুমপুরা ছেড়ে এই পাহাড় জঙ্গলে এসে মন্দির দেখভাল করা কী করে সম্ভব? একখানা দেউল বাইরে দেখেচি বটে। আপনাদের অধীনস্থ মন্দির ওইটে?’
–‘মন্দির আমাদের অধীনস্থ নয়, আমরাই তাঁর অধীনস্থ বটে। তোমাকে এই পাহাড় জঙ্গলের ভূমিতে বসবাস করার অনুরোধ আমি করব না, তবে মন্দিরের বিগ্রহের নিত্য পূজার্চনার ভার তোমাদেরকেই গ্রহণ করতে হবে বাছা। দেবতার বিগ্রহ, তার পূজার ব্যবহার্য্য উপকরণাদি, এইসব তোমাকে বয়ে নিয়ে যেতে হবে বাঙ্গালা প্রদেশে, তোমাদের কুসুমপুরার ভদ্রাসনে। সেইখানে দেবতার মন্দির গড়ে তাঁকে স্থাপনা করতে হবে। এ ভার তোমাকে নিতেই হবে বাছা, নচেৎ আমার জীবন নির্গত হবে না।’
আমি একটু আগুপিছু ভেবে বললুম—‘সে ব্যবস্থা হয়তো করা যেতে পারে। আচ্ছা, এইটে কোন দেবতার দেউল?’
বৃদ্ধ প্রথমেই কোনও উত্তর করল না। কিয়ৎক্ষণ পরে একচিলতে বিষণ্ণ হাসি হেসে কইলো—“দেবতার কী জাত হয় বাছা যে কোন দেবতা না জেনে তাঁকে নিয়ে যেতে পারবে না?’
আমি উত্তরে কইলাম— ‘সে কথা বলিনি, তবে কোন দেবতা না জেনে তার স্থাপনা করব কেমন করে? বিধি বিধান তো আলাদা আলাদা।’
— “বেশ। তবে শোনো, এই মন্দিরে ভগবান পঞ্চশর অধিষ্ঠিত রয়েচেন। পঞ্চশর দেবতার নাম শুনেচো তো? যিনি মহাদেবের কোপানলে ভস্মীভূত হয়েচিলেন।’
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। এতগুলি কথা বলার পরে আরও কী একটা যেন বলবো বলবো করেও বুড়ো থেমে গিয়ে বললে- ‘আমার দেহে আর বিশেষ শক্তি বাকি নাই। তুমি গিয়ে ঐ মন্দিরটে ঘুরে আসো। বাকি কথা রাতে হবে। আজ রাতে বলাই শ্রেয়ঃ, কারণ ভগবান যখন আমাকে আজ গুরুদায়িত্ব হতে মুক্তি দিলেন, তখন আমার প্রাণ শীঘ্রই নির্গত হবে।” আমি তাকে নিশ্চিত্ত করে বললাম—‘বেশ, আমরা গিয়ে সেই স্থানে ঘুরে আসচি। আপনি বিশ্রাম নিন।’
–‘আমরা? আমরা কারা?’
–‘আমি আর আমার পরিচারক।’
— “বেশ, যাও। গাঁয়ের লোকজনকে বলা রয়েচে সব। তোমরা বিগ্রহ নিয়ে গেলেও কেউ বাধা দেবে না। তাড়াতাড়ি ফিরো।’ কথা কয়টা বলে, বৃদ্ধ একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে শয্যায় শরীরটা এলিয়ে দিল।”
*
অনন্তর কথা শুনতে শুনতে তন্ময় হয়ে পড়েচিলাম। সম্বিৎ ফিরতে রুদ্ধশ্বাসে শুধালাম—“তারপর!”
— “ডাক্তারবাবু, এতক্ষণ অবধি কিছু কিছু সন্দেহের অবকাশ থাকলেও বড়োসড়ো কিছু ঘটেনি। ঘটলো এর পর। আমরা মুখে কাপড় বাঁধিনি বটে, কিন্তু একপ্রকার নির্বাক হয়েই প্রবেশ করলাম মন্দিরের ভিতর দিকে। ভিতরের প্রাচীরগাত্রে অতিরিক্ত কোনও শোভা নাই। গড়পড়তা পাষাণের কুলুঙ্গি, চিত্র আর দেওয়াল। দুইটি কক্ষ পার করে তৃতীয় কক্ষে একটা প্রস্তুর বিগ্রহ বসানো রয়েচে। বিশেষ ভয় উদ্রেককারী কোনও মূর্তি নয়, তবে অতি নিখুঁত পারিপাট্য এবং শৈল্পিক নৈপুণ্যের কারণে মূর্তিকে জীবন্ত বলে ভ্রম হয়। তার চক্ষুদ্বয় অতি কোমল আর প্রশান্ত, সে চক্ষুদ্বয় হতে পরম করুণা ঝরে পড়ছে। উচ্চতায় এই মুখুজ্জেমশায়ের চাইতেও হাত চারেক দীর্ঘ। বিগ্রহের ডানদিকের স্কন্ধে একখানা বাণপূর্ণ তূণীর, তাতে পাঁচখানি বাণ। বাম হস্তে সুদীর্ঘ ধনুক, আর দক্ষিণ হস্তে একখানা ধ্বজার মতো দন্ড। দন্ডের উপরিভাগে নিশানের ন্যায় কিছু একটা উড়চে। দন্ডের উপরে নিশান উড়চে বলচি বটে, তবে সেইটেও কিন্তু বস্ত্রনির্মিত নয়, বরং আগাগোড়া পাথরের গড়া, যদিও সেই নিশানে কীসের চিত্র অঙ্কিত ছিল তা এখন আর ঠাহর হয় না। ধনুক আর বাণগুলিও তাই। একসময়ে হয়তো পাষাণ কেটে নিখুঁতভাবেই তৈরি হয়েচিলো, কিন্তু এখন সুদীর্ঘ কালের প্রভাবে কিছু কিছু ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, আবার কিয়দংশ বহু যুগের ধুলাবালি জমে স্থূলতা প্রাপ্ত হয়েচে।”
রেলগাড়ি একটা ইস্টিশানে এসে ঠেকলো। শালকাঠের খুঁটি দেওয়া কাঠের দীর্ঘ মাচায় লোকজন ওঠানামা করচে। লক্ষ্মীকান্তপুর আসতে আর বিশেষ বাকি নাই। মুখুজ্জেমশায় বাইরের দিকে একবার চেয়ে বললে — “বাছা, মূর্তিখানা যদি পঞ্চশর অর্থাৎ কামদেবের হয় তবে হাতে ধ্বজা থাকাটাই বরং স্বাভাবিক। জানো তো কামদেবের অপর নাম মকরধ্বজ? ওনার এক হাতে ধ্বজ আর অপর হস্তে ফুলের ধনুর্বাণ রয়। কিন্তু অনন্ত, এইবার তোমাকে একটু সংক্ষিপ্তভাবে সবটুকু কইতে হবে বাছা। লক্ষ্মীপুর আর বিশেষ বিলম্ব নাই। তোমার বাড়িতে ঢোকার আগেই আমার সবটুকু জেনে রাখা জরুরি।”
অনন্ত একটু থেমে, সবটুকু স্মরণ করে আবার স্মৃতির স্রোতে বয়ে গেল— “আমরা মন্দির থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে মহেন্দ্রগিরি পাহাড়খানা ঘুরে ঘুরে দেখচিলাম। প্রথম দর্শনে যেমন চমকে উঠেচিলাম, ততোটা ভয়াবহ কিছু নাই এতে। বহু লোকজনের বসতি রয়েচে স্থানে স্থানে, গো শালা, চাষবাস সবই বর্তমান। দিব্যি কয়েকখানা গাঁ রয়েচে তার পরতে পরতে। তো, আমরা যখন এইসব ঘুরে ঘুরে দেখচি, হঠাৎ শুনলাম আমার নাম করে কয়েকজন চিৎকার করে চলেচে। আমি অবাক হয়ে হস্তদন্ত হয়ে দুই পা এগিয়ে দেখি তিনজন লোক আমাদের উদ্দেশ্যে চেঁচামেচি করে খুঁজে চলেচে। এরা মহলের চাকর, কোনও বিশেষ কারণে আমাদের জরুরি তলব হয়েছে বুঝি। সঙ্গে করে আমার গাড়োয়ানকেও নিয়ে এসেচে। পাহাড়ি বাঁক থেকে অবতরণ করে দেখলুম গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েচে। গাড়িখানা দেখলেই সিংহ পরিবারের এই শাখাটির প্রতিষ্ঠা মালুম হয়। একদম হাল ফ্যাশনের বিটেল গাড়ি। উপরে চামড়ার ছাউনি দেওয়া। এ গাড়ি আমাদেরও কেনার ক্ষমতা নাই ঠাকুর, কম করে দশটি হাজার টাকা দাম হবেই। সে গাড়িতে চেপে দেখলুম ওই তরফের চাকরগুলোর মুখ থমথমে, তাদের চোখের কোলে অশ্রু। মনে মনে ভাবলুম, তবে বুঝি বুড়ো মরেই গেল। আমার গাড়োয়ান আমার সাথে এক আসনে বসে লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে গুটিয়েচিলো, আমি অগত্যা তাকেই শুধালাম- “হ্যাঁ রে মাণকে, ব্যাপার কী?’
মাণিক খুব নীচু স্বরে জবাব দিলে—‘ব্যাপার সঙীন মেজোকর্তা। বাঘের পিছনে ফেউ লেগেচে। গেলেই সব জানতে পারবেন ঐ বাড়ির বুড়োকর্তার থেকে।’
আমি আবার চিন্তায় পড়লাম। বুড়ো তবে বেঁচেই রয়েচে। তাহলে কী এমন ঘটলো?
জবাবটা পেলাম মহলে ঢুকে। চাকররা আমাকে আবার পৌঁছে দিল বৃদ্ধের সেই শয়নকক্ষে। বুড়ো মানুষটার শরীর থেকে আসন্ন মরণের লক্ষণ সম্পূর্ণ তিরোহিত হয়ে একটা ভীষণ উত্তেজনা চেপে বসেচে। জালনিবদ্ধ মাছ যেমন খাবি খেতে খেতে মরণের প্রাক্কালে হঠাৎ পূর্ণ শক্তিতে আলোড়ন তোলে, বৃদ্ধের চাহনি দেখে আমার ঠিক সেই উপমাই মনে পড়ল। আমি পালঙ্কে বসে শুধালাম— ‘কী হয়েচে আপনার?’
বুড়া হাঁপাতে হাঁপাতে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল—‘মহা বিপদ উপস্থিত হয়েচে বাছা। বিরাট সর্বনাশ। আমার হাতে সময় অতি অল্প, তাই কম কথায় বুঝিয়ে দিচ্চি। আমাদের বংশের অজস্র শাখাপ্রশাখা রয়েচে দেশজুড়ে, কিন্তু মূল বংশ বলতে যা বোঝায়, তা একমাত্র মহেনগিরির আমরা এবং কুসুমপুরার তোমরা। ভগবান পঞ্চশরের পূজার অধিকার একমাত্র আমরা ব্যতীত কারুর নাই। আমাদের অথবা এই দুই বংশের একজনও বংশপ্রদীপ যতদিন বেঁচে রয়েচে, ততোদিন অবধি বিগ্রহের অধিকার অপর কেউ লাভ করবে না। বলপূর্বক তা করলেও, যে উদ্দেশ্যে করবে সেই ইষ্ট কখনও লাভ হবে না তার। তাই ও আসচে সব শেষ করে দিতে।’
আমি হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—‘কিন্তু কর্তা, বিগ্রহের আবার অধিকার কীসের? যে কেউ চাইলেই পূজা করতে পারে তাঁর। আর তাছাড়া…’
–‘আমার কথা সবটুকু শোনো বাবা। অধিকার এবং কাড়াকাড়ি এই বিগ্রহের জন্য নয়, বরং তার ভিতরে যে ভয়ঙ্কর শক্তি যুগ যুগান্ত ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে, সবার নজর থেকে বাঁচিয়ে, অতি সঙ্গোপনে লুকিয়ে রেখেচেন আমাদের পূর্ব পুরুষেরা, কাজিয়া সেই শক্তির দখল নিয়েই। খেয়াল করোনি, ওই মন্দিরে কেউ কথা কয় না, পাখি ডাকে না? দেখোনি তোমরা? ওখানে শব্দ করা নিষিদ্ধ। এর বিষয়ে কোনও প্রাচীন পুঁথিতেই কোনও উল্লেখ পাওয়া যায় না কিন্তু যুগ যুগ ধরে এইরকম প্রবাদ আর সংস্কার চলে এসেচে মহেনগিরির লোককথায়। আমি আমার এই সুদীর্ঘ জীবনটা নিয়োগ করেচি এই রহস্যের গোড়া খুঁজতে। শেষে আমার এই ধারণাই জন্মায় যে ভারতবর্ষের বহু বহু ধর্মক্ষেত্র নিয়ে যেমন সম্ভাব্য অসম্ভাব্য লোককথা চলে এসেচে, তেমনি এইটাও তার মধ্যে একটা।’ এই অবধি বলে বৃদ্ধ বয়সের ভারে শ্রান্ত হয়ে একটু থামলো।
আমি যে উসখুসভাব আর অশ্রদ্ধার মনোভাব নিয়ে এই মন্দিরের ইতিহাস শুনতে বসেচিলুম সেই অবজ্ঞা ততক্ষণে আমার সম্পূর্ণ তিরোহিত হয়েচে। আমি উদগ্রীব হয়ে বললাম—‘একটা অবাস্তব লোককথা নিয়ে তবে এতখানি চিন্তিত হবার কি আবশ্যকতা রয়েচে কৰ্তা?’
বুড়ার মুখে একবার একটা সতর্কতা দেখা দিল। সে আবার মুখ খুললো, তবে এইবার আরও চাপা স্বরে—‘কারণ আছে অনন্ত। কারণ আমি মাত্র মাস চারেক পূর্বেই একটা অদ্ভুত সমাপতনের ফলে বুঝতে পেরেচি যে আমি এতদিন যে কাহিনিকে মিথ্যা ভেবে এসেচি, অলীক মনে করে এসেচি, তা আসলে এক বিন্দু অসত্য নয়, ভ্রান্ত নয়, অতিরঞ্জিত নয় অনন্ত! ঐ মন্দিরে সত্যি সত্যিই একটা ভয় লুকিয়ে রয়েচে। একটা বিকট আর অমোঘ শক্তি, যার উল্লেখ স্বয়ং রামায়ণ মহাকাব্যে বহুবার পড়েছি, কিন্তু তাকে অতবড় বিধ্বংসী শক্তি বলে কখনও মনেই আসেনি, সেই মহাশক্তি সবার চোখের অন্তরালে পড়ে রয়েচে এইখানে।’
রেলগাড়ি প্রায় জনশূন্য হয়ে এসেচে। কালীপদ চিবুকে হাত স্থাপন করে গভীর মনোযোগ সহকারে প্রতিটি শব্দ মনের ভিতরে গেঁথে চলেচে। অনন্ত সিংহের কথার মধ্যে বুঝি ওই বৃদ্ধের বলা কথাগুলিরই প্রতিফলন হচ্চিলো, ফলে শেষের কথাগুলো শোনার সময়ে অজান্তেই আমার শরীর যেন শিউরে উঠল। অনন্ত চতুর্দিকে আরও একবার চেয়ে নিয়ে বৃদ্ধের কথাগুলি আবার বলতে শুরু করল—‘আমি এই কয় মাস যাবৎ নিজের সর্বশক্তি দিয়ে এবং অর্থবলে প্রহরী নিয়োগ করে মন্দিরকে রক্ষা করে চলেচি। কেন জানো? কারণ ভগবান পঞ্চশরের রহস্য একমাত্র আমিই নয়, আরও একজন সম্ভবত জেনে ফেলেচে। তাকে নিয়েই ভয় অনন্ত। এই বিগ্রহ কবে থেকে আমাদের বংশের পূজা নিয়ে আসচেন আমি জানিনে, তবে যতদিন আমাদের পরিবার জীবিত রয়েচে, ততোদিন জবরদস্তি করে হস্তগত করলেও ঐ বিনাশকারী শক্তির প্রয়োগ ঐ শয়তান করতে পারবে না। তাই ঐ শয়তান বরাবর চেষ্টা করবে আমাদের সর্বনাশ করার।’
আমি শুষ্ক কণ্ঠে শুধালাম — ‘শয়তান? কোন শয়তান?”
— “তার নাম রুদ্রাক্ষ। কাপালিক রুদ্রাক্ষ। সর্বনাশা নরহস্তা তান্ত্রিক রুদ্রাক্ষ। সে আমাদের বংশের তৃতীয় শাখার বংশোদ্ভূত। পারিবারিক সূত্রে এই মন্দিরের লোককথা সেও শুনেচে হয়তো। এই অবধি আপদ ছিল না, কিন্তু তন্ত্র এবং অপশক্তির সহায়তায় সেও মনে হয় রহস্যভেদ করে ফেলেচে পঞ্চশরের। তাই সে বহুবার পূর্ণশক্তির প্রয়োগ করে আক্রমণ করেচে আমাদের উপর। শক্তির দখল নেবার লালসায় সে আমার পরিবারের একে একে নিধন করেচে অকাতরে, এবং এই শেষ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেচে একটা সুবিধার দিন দেখে বধ করবে বলে, এবং সেইদিনই সম্পূর্ণ নিষ্কন্টক হয়ে সে ঐ শক্তির দখল নেবে। কিন্তু ভাগ্যের তামাশা দেখো, সে জানতো না যে আমার আরেকটি বংশলতা সুদূর বাঙ্গালায় টিঁকে রয়েচে। আজ তুমি এসেচো, সে খবর নির্ঘাত তার কাছে পৌঁছে যাবে সকালের আগেই। সে নিষ্ফল আক্রোশে কালকেই তার থাবা মারবে। তার আগেই তোমাকে ভগবানকে নিয়ে পালাতে হবে বাছা। দোহাই তোমার, অমত করো না। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে পালিয়ে যাও।’
আমি রাজপুত ক্ষত্রিয়, কিন্তু এসব কথা জেনে আমার হাত পা অসাড় হয়ে এল। আমি আকুলভাবে বললাম—‘কিন্তু কর্তা, আপনাকে সে মারবে কেমন করে? আপনি প্রহরী নিয়োগ করে নজরবন্দি থাকুন, বাড়ির ভিতরে থাকুন, তবে সে আপনার নাগাল পাবে কী প্রকারে?’
বৃদ্ধ বিষণ্ণ সুরে কইলো- ‘প্রহরীর সাধ্যি নাই তাকে রুখতে পারে বাছা। তুমি রুদ্রাক্ষকে বিন্দুমাত্র জানো না। তার ক্ষমতা কোনও পিশাচের চাইতে লঘু নয়। সে আমাকে আড়ালে থেকে বাণ মারচে অনন্ত। তিলে তিলে আমার শরীরকে বিকল করে দিচ্চে সে। তবে তোমাদের কুসুমপুরার তরফকে কিন্তু রুদ্রাক্ষ অত সহজে তন্ত্র মন্ত্র করে বধ করতে পারবে না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত।’
— ‘কেন? সেই তান্ত্রিক যদি অতখানি দানবীয় শক্তি ধরে, তবে আমাদের বধ করতে তার আটকাবে কীসে?’
এইবার এতক্ষণ পরে বুড়ার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখে সামান্য তৃপ্তির আভা এসে পড়ল— ‘সে তার পিশাচ শক্তির বলে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না তার একমাত্র কারণ কুসুমপুরার বংশেরই একজন বংশধর, তোমাদের পূর্বপুরুষ। তার পূণ্যবলের প্রভাব রুদ্রাক্ষের হীন শক্তিকে পরাস্ত করতে পারে। রুদ্রাক্ষ যদি আমাদের এই মহেনগিরির সমান হয়, তবে তোমাদের ঐ মানুষটা একাই গোটা হিমালয়ের তুল্য। সে এতদিনে জীবিত থাকবে না, কিন্তু তাঁর প্রভাব তো রইবেই। ফলে সে তোমাদের চেনা ছকে হত্যা করতে পারবে না, কিন্তু….
সে মরিয়া হয়ে একটা না একটা বধোপায় কিন্তু খুঁজে বার করবেই। যতদিন ঐ পন্থা সে উদ্ভাবন না করচে, ততোদিন বিপদ নাই, কিন্তু সতর্ক থেকো বাছা। সে নরপশুটা কিন্তু আড়ালে থেকে তোমাদের দেখে নিজের জিভ চাটবে এবং সামান্য ছেদ পেলেই কিছু একটা উপায় করে ঝাঁপিয়ে পড়বে সিংহবাড়িতে।’
আমি বিস্ফারিত হয়ে বললাম—‘আমার বংশের কার কথা বলচেন?’
— “সিংহ কুলের কুলতিলক সে। নাম হংসিণী। তোমার পূর্বপুরুষ বাছা”।”
অনন্তর বাক্য সমাপ্ত না হতেই কালীপদ নিজের জোড়হস্ত কপালে ঠেকালো। তার মুখের জ্যোতি যেন শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েচে। আমি চিকিৎসা ব্যবসায়ের সূত্রে নেহাত কম জায়গায় ঘুরিনি, মানুষও কম দেখিনি। গুরুশিষ্য অনেক দেখেচি, কিন্তু সেসব নেহাতই কেজো এবং সহবতের সম্পর্ক। কালীপদর মতো এমন কোনও শিষ্যকে আমি দেখিনি, যাঁর সামনে তাঁর গুরুর উল্লেখমাত্র চোখে জল আসে। আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে রইলুম।
*
কামরার অবশিষ্ট লোকজনের মোটঘাট আর পিঠে বওয়া জলের কুঁজো সামলাবার তৎপরতায় বুঝলাম যান্ত্রিক সর্প আবার বিবরে প্রবেশ করতে চলেচে। আমরাও আমাদের লটবহর নিয়ে নেমে পড়লাম। ইস্টিশান থেকে মাইলের পর মাইল কেবল শোভাময় গ্রামের সারি আর অজস্র জলাশয়। বাইরে কতকগুলি টাঙ্গা, টমটম আর গো-যান যাত্রীর জন্য আশায় আশায় চেয়ে রয়েচে। একটু তফাতে দেখলুম একখানা এক ঘোড়ার টাঙ্গা দাঁড়িয়ে রয়েচে বটের ছায়ায়। কালীপদ বলল—“ঐ গাড়িখানা বেশ ছায়ায় রয়েচে। রোদে তাতেনি। যদিও এই মরশুমে রোদটা মন্দ লাগে না। চলো, ওইটেই ভাড়া নিই।”
টাঙ্গার মালিক গাড়ির ভিতরেই ছইয়ের ছায়ায় বসে বসে পান চিবুচ্ছে। অনন্ত গাড়ির ভাড়া জিজ্ঞাসা করতে সলজ্জ মুখে বললে—“বাবুদের নে’যাব সে তো আমার সৌভাগ্যি, কিন্তু বাবু আমার তো দুপুরের খাওয়া দাওয়া হয় নাই। সবে খাতি বসচিলেম। তো, আমি চাট্টি খেয়ে নিয়ে তারপর না হয়…’
অনন্ত বিরক্ত হয়ে কইলো—“থাক বাছা, আমাদের তাড়া রয়েচে। আমরা অন্যত্র দেখচি।” এই বলে হনহন করে হাঁটা দিলে। কালীপদ সস্নেহে ঘোড়াটাকে আদর করচিলো, অনন্তর কথা শুনে ঘোড়াটার মাথায় দুইবার আদরের চাপড় মেরে আমাদের সঙ্গ নিল। আমি তাকিয়ে দেখলুম, বোধহয় স্নেহের স্পর্শ পেয়ে ঘোড়াটা যতদূর চোখ যায় মুখুজ্জেমশায়ের দিকেই চেয়ে রয়েছে।
অগত্যা আমরা টাঙ্গা ছেড়ে একখানা ছাউনি দেওয়া গোরুর গাড়িতে আরোহন করলাম। মালপত্তরগুলি গাড়োয়ানের পিছনের পরিসরে রাখলুম, যাতে আমাদের থেকে তার কিছুটা তফাৎ রয়। গাড়োয়ান হুররর হুররর চটকা শব্দ করে গাড়ি ছেড়ে দিল। এখন দ্বিপ্রহর। ঘোড়া গাড়িতে গেলে শীঘ্র যাওয়া যেত, কিন্তু এই গাড়িতে কুসুমপুরা পৌঁছাতে আন্দাজ বিকেল হয়ে যাবে, সুতরাং হাতে কিছু সময় রয়েচে। আমি ফিসফিস করে অনন্তকে কইলাম— “তারপর কী হল?”
অনন্ত কী একটা চিন্তার মধ্যে ছিল। তার গৃহ যতই এগিয়ে আসচে, ততোই তার মুখ থেকে স্বস্তির ভাব অন্তর্হিত হচ্চে। আমার কথায় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললে— “কদ্দুর যেন বলেচিলাম ডাক্তারবাবু?”
— “বুড়ো লোকটা মুখুজ্জেমশায়ের গুরুদেবের নাম বলল।”
— “হাঁ, মনে পড়েচে। এইবার একটু সংক্ষিপ্ত করেই বলচি। রাতে নৈশভোজের পরপরই বৃদ্ধ আবার বসে বসে নানান কথা বলচে, হঠাৎ করে সে বুকে হাত চেপে পক্ষাঘাতগ্রস্তের ন্যায় মাটিতে আছড়ে পড়ল। আমরা হাঁ হাঁ করে তাকে সামলাতে যাব, এমন সময়ে বুড়া যে কথাখানা বলল তা শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। সে আড়ষ্ট, বিকৃত কণ্ঠে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল—‘পালাও তোমরা। সে শয়তান ইতিমধ্যেই জানতে পেরে গিয়েচে তোমাদের কথা। আমাকে বাণ মারচে সে এখন। উঃ, বড়ো জ্বালা। তোমরা পালাও। ভগবানের রক্ষা করো। আঃ, জ্বলে গেলাম। একটু জল…’
বুড়োকর্তার নির্দেশে আমি, সুকো আর আমার গাড়োয়ান ভিতরে ভিতরে তৈরি হয়েই ছিলাম। এইবার চূড়ান্ত আদেশ লাভ করে, মহেনগিরির পরতে পরতে থাকা গ্রামগুলি যখন ঘুমিয়ে পড়েচে, তখন আমরা চোরের মতো বেরিয়ে পড়লাম মন্দিরের পানে। বৃদ্ধের নিযুক্ত বেতনভোগী দ্বারীরা মন্দিরেই মোতায়েন ছিল। তাদের নির্দেশ দেওয়াই ছিল, তারা যেন মূর্তি তো বটেই, সেই সঙ্গে দেবালয়ের দৈনন্দিন ব্যবহারের খুঁটিনাটি, ইতর ভদ্র যাবতীয় উপচার, সমস্তই যেন তুলে দেয় আমার গাড়িতে। বৃদ্ধ বোধকরি চেয়েচিলো যাতে ঐ শয়তান রুদ্রাক্ষ হানা দেবার পরে শূন্য, রিক্ত একখানা দেউল দেখতে পায়। নিঃস্ব মন্দিরের দেওয়ালগুলি অবধি যেন তাকে দেখে হাস্য করে। আঁধার মাখা রাতে তারা আমার গাড়িতে তুলে দিল সেই রহস্যময় বিগ্রহ। তার হাতের পাষাণনির্মিত ধ্বজা এবং তৃণীরের পাথুরে বাণগুলি মূর্তি থেকে খুলে, কাপড়ে মুড়িয়ে রেখে দেওয়া হল গাড়িতে। আর তার সঙ্গে তোলা হল যাবতীয় পূজার সামগ্রী। সর্পমুখী পেতলের ভারী ঘণ্টা, গুরুভার কাঁসর, প্রকাণ্ড একখানা যজ্ঞের কুন্ড, মন্দিরের সবকয়টি দ্বারের গোটা পাঁচেক ঢাকনি দেওয়া পাথরের দ্বারঘট, রূপার ঝালর, পাথরের পুষ্পপত্র, অর্থাৎ যা যা এই পঞ্চশর দেবতার নিত্য পূজায় ব্যবহার হয়। বিগ্রহটা দাঁড়ানো অবস্থায় নেওয়া যেতে পারে না, ফলে সেটাকে শুইয়ে দেওয়া হল। বৃদ্ধ বলেচিলো মন্দিরে ভগবান পঞ্চশরের পূজারী উপস্থিত থাকবেন। তার নাম ঝড়েন্দ্র বেহেরা, চলতি নাম ঝড়ু। সে বংশপরম্পরায় পঞ্চশর ভগবানের পূজার বিশেষ বিধি জানে, তাকেও যেন আমরা অবিলম্বে সঙ্গে করে নিয়ে যাই। এখানে থাকলে তার বিষম বিপদ। আমরা দ্বারীদের কাছে গিয়ে শুনলাম সেই পুরোহিত তখনও এসে পৌঁছাতে পারেনি। ভোরের আলো ফোটা অবধি কখনও অপেক্ষা করা শুভকর নয়, ফলে কিছু সময় অপেক্ষা করে আমরা গাড়ি হাঁকিয়ে দিলাম। মহেনগিরি পার করে যখন জঙ্গুলে পথে গাড়ি উঠচে, দেখি কয়েকজন দুর্বৃত্তের মতো চেহারার দশাসই লোক একখানা ভারী থলি নিয়ে কোথাও যেন যাচ্চে। গাড়ির ঠুনঠুন শব্দ পেয়ে আর লোকজন দেখে তারা থলিটা ফেলে উর্দ্ধশ্বাসে বনের ভিতরে দৌড়ে পালিয়ে গেল। সুকোর সাহস বরাবরই অধিক। সে এক লাফে গাড়ি থেকে নেমে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে একটু নিরীক্ষণ করে বললে—“মেজোকর্তা, থলির মধ্যে মনে হয় মানুষ রয়েছে।”
আমি আর মাণকে তড়িঘড়ি নেমে দৌড়ে যেতে গিয়েও আমি থমকে গেলাম। গাড়ির মধ্যে বিগ্রহকে একা রেখে তিনজনের চলে যাওয়া সমীচীন নয়। মাণকে আর সুকো মিলে দড়ির গিঁট খুলতেই দেখা গেল ভিতরে একজন শীর্ণকায় ব্রাহ্মণ অচেতন হয়ে রয়েছে। তার কপালে আঘাতের দাগ, তা থেকে রক্ত ঝরচে তখনও। গলায় পৈতা আর ললাটে চন্দন। তাকে জলপাত্র হতে জল ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরানো মাত্র আমাদের দেখে সে সিঁটিয়ে গেল ভয়ে। তার চোখ থেকে এখনও আতঙ্ক দূর হয়নি। আমাদের পরিচয় পেয়ে তখনই সে মুখ খুললো। এই ব্রাহ্মণই পঞ্চশরের পূজারী ঝড়ু। সে মন্দিরের দিকে আসার পথেই একদল লোক তাকে ঘিরে ধরে লাঠির বাড়ি মারতে শুরু করে। অচেতন হবার পূর্বে সে এইটুকুই শুনেচে যে মহেনগিরির বুড়োকর্তা নাকি মারা গিয়েচে রাতেই। তারপর আর কিছু মনে নাই। গাড়িতে ভগবানের বিগ্রহকে শায়িত অবস্থায় দেখে তার পা জড়িয়ে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ। তাকে গাড়িতে তুলে আমরা রওয়ানা হলাম।
অনন্ত পরের কথা আরম্ভ করার পূর্বেই বাইরে একটা হট্টগোল শুনে ছইয়ের ভিতর থেকে উঁকি মেরে দেখি, যে টাঙ্গাটায় অনন্ত উঠতে যাচ্চিলো সেইটের ঘোড়াটা কেন যেন ক্ষেপে উঠে বলগা ছিঁড়ে দৌড় দিয়েচে, আর তার মালিক মাটিতে দাঁড়িয়ে তাদের শাপশাপান্ত করচে। আমরা কালীপদর দিকে একটু চেয়ে দেখলাম সে একটু একটু হাসচে। ঠিক যেন ঐ ঘোড়াটার সঙ্গে মুখুজ্জেমশায়ের ইতিমধ্যেই কোনও একটা ষড়যন্ত্র হয়ে গিয়েচে।
কালীপদ অনন্তর বিস্মিত দৃষ্টির দিকে চেয়ে বললে—“আমার মন বলচে, এই ঘোড়াগাড়িতে হয়তো তোমার ঐ রুদ্রাক্ষ নামক কাপালিকটি সওয়ার রয়েচে। ঠিক জানিনে। ভয়ের কোনও কারণ আপাতত নাই। গাড়িটাকে সব যাত্রীর থেকে বাঁচিয়ে, আগে থেকেই ‘ঘাট’ করে রাখা হয়েচিলো আমাদের পশ্চাদ্ধাবন করার জন্যেই, এবং সেইটে কিন্তু করেচে ওই শয়তান অথবা তার লোকজন। আমাদের আগে আগে সে কোনও প্রকারে ফিরে এসেচে এইখানে। তাই তো ভাবি, হতভাগা গাড়োয়ানটা এদিকে বললে যে আহারে বসবে তক্ষুনি, কিন্তু ওদিকে খাবার আগেই নাকি দিব্যি দেখি পান চিবুচ্চে। এমনধারা অনাচ্ছিষ্টি কারবার আমি কস্মিনকালেও শুনিনি। ভারী আশ্চর্য বটে।”
দুই পাশে বড়ো বড়ো গাছে আচ্ছাদিত মেঠো পথ ধরে গো শকট চলেচে আপনমনে। প্রাক শীতের ঝিরঝিরে বাতাসে পাতাগুলি তিরতির করে কেঁপে কেঁপে মর্মর শব্দ তুলেচে। কোনও কোনও পুকুরের ঘাটে মেয়েমানুষেরা আধ হাত ঘোমটা টেনে দুপুরের সকড়ি ভোজ্যপাত্র মেজে চলেচে, আর ঘোমটার ফাঁক দিয়ে গাড়ির দিকে এক আধবার নিরাসক্ত নয়নে তাকাচ্চে। কালীপদই কথার স্রোতে ফিরে এল—“আচ্ছা অনন্ত, সেই বিগ্রহ আনার পর তোমাদের ভদ্রাসনে তাঁর প্রতিষ্ঠা হয়েচে সেটুকু তো বিলক্ষণ বুঝতে পেরেচি। এতক্ষণ যা কইলে তা হল উড়িষ্যার গজপতি মুলুকের বৃত্তান্ত, কিন্তু তোমাদের বাড়িতে কী বিপদ ঘটলো সেটুকু কম কথায় বলে ফেলো। আর হ্যাঁ, ঐ যে মহেন্দ্রগিরি পাহাড়ের কথা কইলে তুমি, সেইটের নাম আমি কোথাও যেন শুনেচি আগেও। কি একটা যেন হয়েচিলো ঐ পাহাড়ে, ঠিক স্মরণ হচ্চে না। বয়স বাড়ছে তো।”
“আমরা ঐ পঞ্চশরের বিগ্রহ নিয়ে কুসুমপুরায় বাড়িতে পৌঁছালাম। পথে কোনও বাধা বিপত্তি আসেনি। বাড়ির এয়োস্ত্রীরা শাঁক বাজিয়ে, উলু দিয়ে দেবতাকে গৃহে তুললো। আমাদের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত কালীমন্দির রয়েছে। তার পাশেই একখানা মন্দির তুলে পঞ্চশরকে স্থাপিত করলাম। ঝড়েন্দ্র পুরোহিত আমাদের সঙ্গেই এয়েচিলো, তাকে মন্দির লাগোয়া একখানা ঘর বন্দোবস্তে দেওয়া হল। প্রথম ক’দিন কিন্তু নিয়মমাফিক নিত্যপূজা করলেও তাকে দেখে মনে হতো চেনা পরিবেশ থেকে এই বিপর্যয়ে পড়ে তার জীবনীশক্তি নিঃশেষ হয়ে এসেচে। মাঝে মাঝে অতীতের এবং গজপতিতে ঐ বৃদ্ধের কথা ভেবে সে মরিয়া হয়ে উঠতো। আমাদের বলতো- ‘আচ্ছা এমন কোনও উপায় নাই, যাতে ঐ নরহস্তা কাপালিককে বধ না হোক অন্ততঃ কয়েন করানো যায়? বাঙ্গালার পুলিশ তো শুনেচি যথেষ্ট উপযুক্ত। তাকে গজপতির সিংহ পরিবারের হত্যাবৃত্তান্ত খুলে বললে তারা শাসন করবে না? আমি সাক্ষ্য দান করব দরকারে। ঐ শয়তান কাপালিক তোমাদের পরিবারকে হয়তো এখনই এখনই ছুঁতে পারবে না, কিন্তু আমার মন বলচে সে আশপাশেই ঘাপটি মেরে রয়েচে সুযোগের সন্ধানে। ফাঁক এবং উপায় পেলেই সে আঘাত হানবে। তোমাদের বংশের ঐ পুণ্যাত্মার কথা আমি মহেনগিরিতে থাকতে ওঁনার মুখে শুনেচি। তাঁর প্রভাবে হয়তো রুদ্রাক্ষ তোমাদের সরাসরি মন্ত্রাঘাত করতে পারচে না, কিন্তু এমন কোনও পন্থা সে বের করবে, যে প্রভাব এতটাই অমোঘ যে ঐ পুণ্যপ্রভাবও সেই আক্রমণকে প্রতিহত করতে পারবে না। আর সেই রাজপুতের কলঙ্ক তোমাদের ছাড়লেও আমাকে রেয়াৎ করবে না।”
পুরোহিতের মুখ দেখে আমাদের মনে হতো না যে তার নিজেকে নিয়ে একটুও মৃত্যু ভয় রয়েছে, বরং নিজের প্রভুর বধকারীকে চরম শাস্তি দিতে সে নিষ্ফল আক্রোশে ছটফট করতো, কিন্তু সেই মনের ভাব তার প্রশান্ত চরিত্রকে ভেদ করে খুব কমই বাইরে প্রকাশ পেতো। ঝড়ু পুরোহিত আমাদের সঙ্গেই আহার করত, আমাদের সঙ্গে কথাবার্তা কইতো শান্তভাবেই, কিন্তু আমরা বুঝতুম সবই। আমাদের আর কী করার রয়েছে? ইতিমধ্যে কিছু ঘটনা ঘটে গিয়েচিলো আমাদের পরিবারে, কিন্তু সেসব শোনাতে গেলে…
কালীপদ শুধালো—“কুসুমপুরা আর কতটা পথ।”
–“আজ্ঞা, এই সামনের বিলটা পেরোলে পরে দুই ক্রোশটাক পথ।”
—“বেশ, তবে সময় রয়েচে বেশ কিছু। তোমার ভয় নাই, আমরা বির হচ্চি নে। যতটুকু এবং যেমন যেমন ঘটেচে তার পুরোটা না শুনলে নিতান্তই আহাম্মুকি হতে পারে অনন্ত। একজন পুরোদস্তুর নরলোলুপ শয়তানের মুখোমুখি পড়তে চলেচি আমরা যাকে আমি কখনও সামনা-সামনি দেখিনি, তার ক্ষমতার অনুমান আমার নাই, তাই তার চালচলনটুকু আর শয়তানির বর্ণনা শুনেই তার শক্তি এবং সর্বোপরি দুর্বলতা আঁচ করতে হবে আমাকে। তুমি কম কথায় সবটাই বলো।”
“আমার এক বন্ধু আছেন সদরে। তার নাম বিনোদ। সে বিদেশী ফর্ম পদার্থবিজ্ঞানীর পদে কর্মরত। বিনোদ একদিন আমার মুখে এই বিগ্রহের কথা শুনে আমার বাড়িতে এসে উপস্থিত হল। সে বহু পুরাতন বন্ধু নিয়ে নাড়াঘাঁি করেচে, ফলে এই বহু প্রাচীন মূর্তির গল্প শুনে সে ব্যাপারখানা একবার স্বচক্ষে যাচাই করতে এসেচে। মূর্তিকে তো ঘরে বয়ে আনা সম্ভব নয়, তাই পঞ্চশরের পূজার উপকরণগুলোর মধ্যে কিছু কিছু তুলে আনলাম পুরোহিতের অগোচরে। সে তখন নাইতে গিয়েচিলো পুকুরে। আমি নিঃশব্দে পাশে বসে রয়েছি আর বিনোদ তন্ময় হয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিনিসগুলি পরীক্ষা করছে। পেতলের পঞ্চপ্রদীপে খোদাই করা নকশা দেখে সে কইলো যে সত্যিই এগুলি বহু যুগ পূর্বের কারিগরের তৈরি। সে সিন্দুরের পাত্র খুলে দেখলো, পাথরের দ্বারঘাটের ঢাকনি খুলে পরীক্ষা করল, এরপর যখন ভারী পুষ্পপত্রখানা তুলে পরীক্ষা করতে যাচ্ছে, হঠাৎ দোরের একেবারে সামনে বিকট হিজে ধরে ‘জয় ভদ্রকালী’ হুঙ্কার শুনে গোটা শরীর কেঁপে উঠল, আর সেই সঙ্গে কোথায় যেন একটা লাঠি ঠোকার মতো ‘খটাস’ করে শব্দ কানে এল। তাকিয়ে দেখি আমার শয়নকক্ষের দুয়ারের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে রয়েচে একজন ভীষণ দর্শন কাপালিক! তার পরণে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ আলখাল্লা, কপালে সিন্দুর, গলায় অজস্র রঙের পুঁতির মালা। তার চোখের চাহনির দিকে একটিবার তাকালেই বুকের রক্ত জল হয়ে আসে! সেই জলজ্যান্ত অপদেবতা আমাদের দিকে তাকিয়ে নিজের ডান হাতটা তোলা মাত্তর আমি আর বিনোদ ছিটকে দেওয়ালে গিয়ে পড়লুম। আমার ততোধিক আঘাত না লাগলেও বিনোদ ভীষণভাবে আহত হয়ে পড়ল। আমাকে ততোখানি ক্ষতিগ্রস্ত না হতে দেখে ঐ শয়তান নিষ্ফল আক্রোশে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে চলে গেল।
ঘটনাটা এতই দ্রুত ঘটলো যে আমরা তাকে পিছু করার সুযোগই পেলুম না। পেলেও বিশেষ লাভ হতো না। পরে শুনলাম ঐ দানব ইতিপূর্বে আমার দাদা এবং ভাইদের ঘরেও গিয়ে ঐভাবে আক্রমণ করার চেষ্টা করেচিলো, কিন্তু পরিবারের কেউই তেমন আহত হয়নি। সে যাবার সময়ে সুকোর প্রতিও নিজের শক্তি প্রয়োগ করেচে, কিন্তু তারও সামান্য আঘাত লেগেচে। এই অপ্রত্যাশিত রক্ষা যে কেবলমাত্র আমাদের ঐ পূর্বপুরুষ, অর্থাৎ আপনার গুরুদেবের পূণ্যবলেই হয়েচে তা নিয়ে দ্বিমত ছিল না। সে হয়তো নিজের শক্তি পরীক্ষা করতে এসেচে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েও সে এত সহজে নিস্কৃতি দেবে না। গজপতির বৃদ্ধের কথাই হয়তো সত্য। রুদ্রাক্ষ এখন অপেক্ষায় থাকবে এমন কোনও অমোঘ শক্তির, যাকে নিবারণ করা কোনও সাধকের অসাধ্য। কিন্তু সেইটে কী? তার সেই অমোঘ পন্থাটা জেনে ফেলার আগেই আমাদের সাবধান হতে হবে। কিন্তু তখনও বুঝিনি ঠাকুর যে ঐ রাক্ষস আমাদের চাইতে বুদ্ধিতে শতগুণ এগিয়ে রয়েছে।
পুরোহিত ঝড়ু ফিরে এসে আমাদের এই কথা শুনতে পেয়েই ক্রোধে জ্বলে উঠল। তার চক্ষে দেখলুম যেন প্রতিহিংসার আগুন জ্বলচে, কিন্তু তার ক্ষমতা যতটুকু আমাদেরও ততোটুকুই।
ইতিমধ্যে বড়দার মেয়ে নারায়ণী একদিন বাড়িতে এসে কেঁদে পড়ল। তার স্বামী, ঐ লম্পট ছেলেটি তাকে বাপের থেকে কিছু টাকাকড়ি নিয়ে যেতে বলেচে। বড়দা এই কথা শুনে নারায়ণীকে ঐ স্বামীর ত্রিসীমানায় যেতে নিষেধ করে দিলে। পরদিন ঘুম ভেঙে আরেক প্রস্থ অবাক হবার পালা। বাড়ির কালীমন্দিরের বিগ্রহের সমস্ত গয়না চুরি গিয়েচে। ঝড়ু পুরোহিত পাশের মন্দিরেই শয়ন করে, ফলে বড়দা প্রথমেই তাকে ডেকে শুধালো সে কিছু দেখেচে শুনেচে কি না। উত্তরে ঝড়ু কিছুটা গম্ভীর হয়ে বললে সে কিছু জানে না, অথচ তার হাবভাব দেখে আমাদের সন্দেহ হল যে সে নিশ্চয়ই কিছু গোপন করচে।
খবরটা পাওয়া গেল কিছুটা পরেই। আমার ভাইপো, অর্থাৎ বড়দার ছেলে দিগন্ত এসে আমাকে বললে—‘ চোরের সন্ধান পাওয়া গিয়েচে মেজোকাকা। পুরোহিতমশায় সবটাই দেখেচে, কিন্তু বাবার ভয়ে খুলে বলেনি।’
আমি হতভম্ব হয়ে বললুম— ‘সেকি! কে চুরি করেচে?”
দিগন্ত কইলো— ‘ঠাকুরমশায় আমার ঘরে একটু আগে এসে বললে যে সে চোরকে দেখেচে, কিন্তু বড়কর্তার যা উগ্র মেজাজ, তাতে একটা খুনোখুনির ভয়ে সে অস্বীকার করেছে।’
আমি শুধালাম— ‘কে চুরি করেচে ঠাকুর? আপনি নাম বলুন।’
সে বললে— ‘নিজের বোনের নাম শুনতে তোমার কষ্ট হবে না বাছা?” আমি দিকভ্রান্ত হয়ে অবিশ্বাসের সুরে কইলাম— ‘নারায়ণী? সে চুরি করেচে?’
কথাটা বলা মাত্র কোথা থেকে যেন আবারও লাঠি ঠোকার মতো খটাস করে শব্দ কানে এল। আমরা দুইজন ধড়মড়িয়ে দেখতে গেলুম যে কেউ আড়ি পেতে আমাদের কথাবার্তা শুনচে কি না, কিন্তু কেউ নাই!
দিগন্তের কথা শুনে আমি অবাক হয়ে বললাম—‘হাঁ রে, ঐ শব্দ আমিও সেইদিন শুনেচি। কিন্তু ঠাকুরমশায়ের এই কথা কিন্তু তোর বাপকে কওয়া দরকার।’
দিগন্তও আমার কথায় সায় দিল পরে আমরা গিয়ে দাদাকে সব বললাম, এবং দাদা নারায়ণীর পালঙ্কের তলা থেকে একটা পুঁটুলিতে সেইসব গয়নার সন্ধান পেলো। সে বোধকরি স্বামীর দাবী মেটানোর জন্যই…. দাদা নারায়ণীকে কিছু টাকা দিয়ে বিদেয় করে দিলে। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।
এই চুরির ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই আবার চোর পড়ল সিংহবাড়িতে। আমার ভ্রাতুষ্পুত্র জয়ন্ত রোজকার মতোই রাতে উঠেছিল একটু ‘বাইরে’ যাবার দরকার পড়ায়। সে যখন গাড়ু হাতে করে নীচে নামতে যাচ্চে, এমন সময়ে তার চোখে পড়ল একটা ছায়ামূর্তি খুব ধীর পায়ে পঞ্চশর মন্দিরের দিকে এগোচ্চে। মন্দিরের জাফরির দেওয়ালের ওপারে তেলের বাতিতে তার চোখে পড়ল ভিতরে পুরোহিত অঘোরে ঘুমাচ্চে। এই দৃশ্য দেখেই জয়ন্ত ‘চোর চোর’ বলে চেঁচিয়ে ওঠা মাত্র আবার সেই খটাস করে শব্দ। যেন অনেকটা দূরে লাঠি হাতে কেউ শক্ত মাটিতে ঠুকলো। চিৎকার আর শব্দে ঝড়েন্দ্র এক লাফে জেগে উঠেই ক্ষিপ্র বেগে নিজের পাশে রাখা ভারী কাঁসার জামবাটি ছুঁড়ে মারলো পলায়মান ছায়াকে লক্ষ্য করে, কিন্তু চোর ততক্ষণে উধাও। পরপর দুটো হানাতে আমাদের রাতের নিদ্রা সম্পূর্ণ উবে গেল।
লাঠি ঠোকার মতো জোরালো শব্দটা বারংবার কোথা থেকে উৎপন্ন হয়? কেউ কী লাঠি নিয়ে অদৃশ্য থেকে ঘোরাফেরা করে? তার উদ্দেশ্য কী? কেন হয়? হাজারো প্রশ্ন ভিড় করে এলেও জবাবের ভাঁড়ার শূন্য। এমনকি কৃতান্ত একদিন সকালে রোজকার মতো দেবীকে আহ্বান করে মন্দিরের দরজা খুলতে যাবে, হঠাৎ ঐ শব্দ। কৃতান্ত বড়ো ডাকাবুকো ছেলে। সে তন্নতন্ন করে খুঁজেও ঐ শব্দের উৎস খুঁজে পেলো না।
পরেরদিন হলো সত্যিকারের চুরি। দুঃসাহসিক চুরি। মধ্যরাতে ঝড়েন্দ্রর চিৎকার শুনে আমরা ধড়মড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি কয়েকজন লোক ছুটে পালিয়ে গেল আমাদের বাড়ির থেকে। একখানা চোরকে পুরোহিত পা চেপে ধরে আটকে দিয়েচে। সে প্রাণপণে দুই হাতে বৃদ্ধকে আঘাত করে চলেচে কিন্তু ঝড়ু সেই অবস্থাতেই চিৎকার করে লোক ডেকে চলেচে। আমরা পৌঁছানোর আগেই সে বৃদ্ধের মাথায় কঠিন আঘাত করে ছুটে অদৃশ্য হয়ে গেল। মন্দিরে ঢুকে আমাদের মাথায় বাজ পড়ল। চোরেরা মূর্তিটাকে হয়তো নড়ানোর চেষ্টা করেও পারেনি। তারা টুকিটাকি পূজার ঘটি বাটি প্রদীপ থালা তো চুরি করেচেই, কিন্তু এ কী? ভগবান পঞ্চশরের পিঠে রাখা তুণীরের মধ্যে একটাও বাণ অবশিষ্ট নাই! চোরে নিঃশেষে সবকয়টা বাণ তুলে নিয়ে গিয়েছে! সেদিকে তাকিয়ে পুরোহিত মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে অস্ফুট কন্ঠে বললে—‘সর্বনাশ হয়েচে কর্তা! ওই বাণের শুনেচি অনেক শক্তি। এ জিনিস ওই শয়তানের হাতে পড়লে সব তছনছ হয়ে পড়বে।’
এই অবধি অপেক্ষাকৃত ঠিক ছিল, কিন্তু ঠাকুর, এর পরেই বুঝতে পারলাম যে ঝড়ু পুরোহিতের অনুমান এবং আশঙ্কা একবিন্দু মিথ্যা ছিল না। বাড়িতে চোরের হানা দেওয়া নিত্য ঘটনায় দাঁড়িয়েচিলো। এই চুরির পরেরদিনও বাড়িতে আমরা সবাই খেতে বসেচি রাত্তিরে, হঠাৎ একটা কিছু অসাবধানতাবশত পড়ে যাবার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে দেখলুম একটা কালো ছায়ামূর্তি সাঁৎ করে পালিয়ে গেল। আমি, বড়দা আর ঝড়ু খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি উপরে বড়দা আর কৃতান্তর ঘরের দোর খোলা। আমরা তাকে ধাওয়া করার উৎসাহ আর কিছুতেই পেলাম না। ঝড়ু সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ, সে একবার ভোজনের আসন ছেড়ে উঠে পড়লে আর দ্বিতীয়বার বসতে পারে না। সেই রাতে বৃদ্ধ অনাহারেই রইল। মন্দিরে যাবার মুখে আমি তাকে এগিয়ে দিতে গেলুম। সে মন্দিরকক্ষে প্রবেশের মুখে একটু থমকে বিষণ্ণ মুখে আমাকে বললে— ‘আমার একটা সন্দেহ হয় মেজোবাবু। বাইরের দিকে নজর করে লাভ নাই, আমার মনে হয় আপনার পরিবারেই কেউ একজন রয়েচে যে ঘরের সব খবর বাইরে বয়ে নিয়ে যাচ্চে। সেই বিশ্বাসহন্তাকে খুঁজে বের করুন। আপনাদের বাঙলা মুলুকে একটা প্রবাদ আছে না, দুষ্ট গরুর চেয়ে…’
আমি দাঁতে দাঁত চেপে কইলাম—‘শূন্য গোহাল অনেক ভালো। ঝড়েন্দ্র সশব্দে মন্দিরের দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভিতর থেকে তিক্ত বিরক্তির স্বরে কইলো— ‘হাঁ, তাই। বাকিটুকু আপনারা বুঝে নিন। খোলাখুলি এসব কইতে আমার বাধচে বাছা।’ বৃদ্ধ ঠিক কার দিকে ইঙ্গিতটা করল তা ধরতে পারলাম না। জাফরির ভিতর দিয়ে দেখলাম অভুক্ত বৃদ্ধ এক ঘটি জল মাত্র পান করে শুয়ে পড়ল। বাকি কথা একটু বিলম্বে বলচি ঠাকুর। ঐ আমাদের বাড়ি এসে গিয়েচে। অনন্তর কণ্ঠে কিছুটা ভীতি লক্ষ্য করলাম।
চুনের রঙে রাঙানো ধপধপে সাদা রঙের দুই তলা প্রকাণ্ড বাড়ি। একেকটি তলে অন্ততঃ গোটা পনেরো কক্ষ। অনেকটা মুখুজ্জেমশায়দের মহলের মতোই। আঙিনায় দুইখানি মন্দির। একটি বহু প্রাচীন, অপরটি নূতন। এই তবে ভগবান পঞ্চশরের দেউল!
বাড়িতে চাকর বাকর মিলিয়ে লোকজন ততো বেশি নাই। যারাও আছে, তারাও কিছু একটা ভয় এবং শোকে থমথমে হয়ে আছে। মুখুজ্জেমশায় উঠানে দাঁড়িয়ে এক খাবলা মাটি তুলে নিয়ে তার ঘ্রাণ নিয়ে বলল—“নাহ ডাক্তার, এ বাড়িতে মৃত্যু একেবারে থাবা দিয়ে বসেচে। কতটা কী করতে পারব জানিনে।”
সন্ধ্যার মুখে সামান্য জলযোগ করে দুই তলায় হেমন্ত সিংহের কক্ষে বসলাম আমরা। ঘরে আমি আর কালীপদ ছাড়া রয়েচে অনন্ত, হেমন্ত, সুকো আর পূজারী ঝড়ু। পুজারীর বয়স আন্দাজি ষাটের উপরেই। শীর্ণ দেহ, প্রশান্ত চক্ষু, পরণে ধুতি আর নামাবলী। বড়োকর্তা হেমন্ত সিংহের মুখে যে আশ্চর্য হত্যাকাণ্ডের বিবরণ শুনলাম এর থেকে বেশি অদ্ভুত এবং বিস্ময়কর কথা আর হয় না। এমনটি কেউ কক্ষণও শুনেচে কিনা জানিনে আমি।
*
শেষ যেইদিন চোর পড়েচিলো সিংহবাড়িতে, তার চার কি পাঁচ দিন পরের সন্ধ্যাবেলাটা প্রথমবারের জন্য বুঝিয়ে দিলো যে সিংহবাড়িতে সুদূর নরকের থেকে মৃত্যুর হিংস্র থাবা এসে চেপে বসেচে। সেইটা ছিল এই বাড়ির প্রথম নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সন্ধ্যাবেলায় বাড়ির মেয়ে মানুষেরা ঘরে পূজা দিচ্চে, দুই মন্দিরে বাতি জ্বেলে কৃতান্ত আর পূজারী ঝড়ু আরতি করচে, আর বাড়ির বাকি পুরুষেরা দুইতলার সুপ্রশস্ত বারান্দায় বসে গল্পগাছা করচে, হঠাৎ বাড়ির একতলার পূজার ঘরে হৈচৈ আর চোর চোর শব্দ শুনে সবাই ধড়মড়িয়ে লাফিয়ে উঠল, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল একটা দশাসই মানুষ হাতে কিছু একটা পোঁটলা নিয়ে দৌড়ে পালাচ্চে। হেমন্ত সিংহ বিদ্যুৎবেগে নিজের শয়নঘরের থেকে দুইনলা বন্দুক নিয়ে এসে দেখলো ভাগ্য আজ সহায় হয়েচে। চোরটা দেউড়ি পেরিয়ে পালানোর সময়ে পা মচকে দূরের ঝোপটার কাছে পড়ে গিয়েচে আর ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে এগোচ্চে। হেমন্ত একবার বন্দুক ছুঁড়লো। গুলি লক্ষ্যভেদ করেচে কিনা বোঝা গেল না। হেমন্ত যখন দ্বিতীয় গুলি ছোঁড়ার জন্য তাক করেচে, তখনই কৃতান্ত আর ঝড়ু মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাপারটা আন্দাজ করে ফেললো। ঝড়ু চিৎকার করে বারান্দায় দাঁড়ানো জয়ন্তর উদ্দেশ্যে বললে — “কী? কী হয়েচে জয়ন্তবাবু?”
জয়ন্ত চিৎকার করে বললে—“ঠাকুরমশাই, চোর পড়েচে, চোর।” হেমন্ত কালবিলম্ব না করে দ্বিতীয় গুলী ছুঁড়লো। ঝোপের কাছে থাকা সেই চোর যে মোটেই সাধারণ তস্কর নয়, বরং সাক্ষাৎ মরণের দূত, তা বোঝা গেল এইবার। তার অট্টহাসির সঙ্গে হঠাৎ চারদিকটা যেন বাজ পড়ার মতো চোখ ধাঁধানো আলোয় ভরে গেল, আর সেই আলোর মধ্যেই আলোর চেয়েও তীব্র একখানা রেখা যেন ছুটে চলে গেল! সবার দৃষ্টি ফিরলে পর দেখা গেল বাইরের ঐ চোররূপী শয়তান অদৃশ্য হয়েচে এবং জয়ন্তর মৃতদেহ ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে দোতলার বারান্দায়! তার কণ্ঠকে এপার ওপার ছিদ্র করে যেন একটা গর্ত তৈরি হয়েচে। সুমন্ত সিংহ পুত্রের এই অবস্থা দেখে অচেতন হয়ে ঢলে পড়ল, মেয়েরা আর্তনাদ করে উঠল। কৃতান্ত আর বৃদ্ধ পূজারী ঝোপের দিকে দৌড়েচিলো, কিন্তু চোখ ধাঁধানো আলোয় তাদের গতিরোধ হয়ে পড়েচিলো। আততায়ীর কোনও হদিস পাওয়া গেল না।
তরতাজা জোয়ান ছেলের অপঘাতে গোটা বাড়িটা থমথমে হয়ে পড়ল। কারুর নাওয়া খাওয়া নাই, আনন্দ নাই, সুখ নাই। সুমন্ত সিংহ থেকে থেকে জ্ঞান হারাচ্চে। একটা শোকের পাথর চেপে বসে রইল। উপায়ান্তর না দেখে দারোগাকে খবর পাঠানো হল। দারোগারা চায়ই সম্পন্ন বাড়িগুলিকে ফৌজদারি নিয়ে জড়াতে। দারোগা এসে মৃতদেহ পরীক্ষা তো করলই সঙ্গে নারায়ণীর চৌর্যবৃত্তি নিয়ে একটা মহা হাঙ্গামা আরম্ভ করলে পর হেমন্ত আর কৃতান্ত মিলে তাকে ষোড়শোপচারে তুষ্ট করে বিদেয় করলে। তবে এটুকু হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেল যে রুদ্রাক্ষ কাপালিক কিন্তু হংসিণী সিংহের পূণ্যপ্রভাবকে লঙ্ঘন করে কোনও একটা অমোঘ মারণকৌশল আবিষ্কার করে ফেলেচে। সে কৌশল যে কী, তা আঁচ করাও কঠিন নয়। যে পাঁচটি বাণ চুরি গিয়েচে, ঐ বাণে অবশ্যই কোনও এক অমোঘ একঘাতী শক্তি রয়েচে যাকে প্রতিহত করা যায় না। ঝড়েন্দ্র পুরোহিত কিন্তু বাণগুলি বেহাত হবার পরপরই ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়েচিলো। সে নির্ঘাত ঐ অস্ত্রের সম্পর্কে কিছু কিছু ভাসা ভাসা কথা শুনেচে আগেই। বাকি চারখানা বাণ কখন কাকে এসে আঘাত হানবে সেই অপেক্ষায় সকলে ভীত হয়ে পড়ল।
তৃতীয় দিনে খুব যৎসামান্য আচারবিধির সঙ্গে জয়ের পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে গেল। পরের হপ্তায় দুর্গোৎসব। সিংহবাড়িতে যুগ যুগ ধরে দোল আর দুর্গোৎসব পালিত হয়। একটা বুনিয়াদী বাড়ির নিয়ম খুব মন্দায় না পড়লে স্থগিত হয় না। এ বাড়িতে আশপাশের চারখানা গাঁয়ের লোকে পূজা দেয়, ফলে প্রতিবাসীরা এমতাবস্থায় এসে যথাসম্ভব স্বল্প উদ্যোগে পূজার ভার গ্রহণ করল। যে ভিটেতে তন্ত্রমতে পূজা হয়ে আসে, সে বাড়ির পূজা কোনও পরিস্থিতেই স্থগিত করা চলে না। অশৌচ হলেও নয়।
দেখতে দেখতে পূজার দিন এসে পড়ল। গোহালঘরের পাশে চন্ডীমন্ডপে আগেই প্রতিমা গড়া হয়ে গিয়েচে, জয়ন্তর অপঘাতের দুইদিন পূর্বে চক্ষুদানও সম্পন্ন হয়েচে। মূল পূজারম্ভের প্রভাতে নিরানন্দ ভাবেই হেমন্ত নবপত্রিকাকে স্নান করিয়ে স্থাপন করলে। সুমন্ত সিংহ আর ছোটবধূ ঘৃণায় আর পূজায় বসতে চাইলো না। বাড়ির বাকি নারীপুরুষ বিমর্ষ মুখে পুষ্পাঞ্জলি দিতে উপস্থিত হল। বাইরে বহু প্রজারা অপেক্ষমান, সিংহ বাড়ির লোকেদের অঞ্জলি আরম্ভ হবে, সাতবার ছাতের ক্ষুদ্র কামান ডাকবে, তারপর আপামর জনসাধারণ এসে পূজা দেবে।
হেমন্ত সিংহ প্রথমে একক পূজা দান করে সুকোকে নিয়ে ছাতের কামান ফোটাতে গেল। বাড়ির বাকিরা অঞ্জলি দিচ্চে। আকাশের দিকে মুখ করে ক্ষুদ্র কামান ডাকলো। একবার, দুইবার, তিনবার আর চতুর্থবারের সঙ্গে সঙ্গে সিংহবাড়ি তথা সমস্ত অপেক্ষারত মানুষগুলোকে চমকে দিয়ে গোটা আঙিনাটা ঐ দিনদুপুরে ঢেকে গেল একটা ভয়ঙ্কর আলোর স্রোতে। লোকজন শুধু দেখলো একটা তীব্র চোখ ধাঁধানো আলোর রেখা যেন চক্রাকারে ছুটে গেল। দুর্গাদালানের থেকে ভেসে আসা চিৎকার শুনে সকলে পড়িমড়ি সেদিকে দৌড়ে গিয়ে দেখলো হেমন্তর পুত্র দিগন্ত সিংহ দালানে ঢলে পড়ে রয়েচে। তার কণ্ঠ ছিন্নভিন্ন। মুণ্ডটা একদিকে ঝুলচে। হেমন্ত মাটিতে আছড়ে পড়ল।
লোকজন ভীষণ ভীত হয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করল। কী ভয়ঙ্কর মৃত্যু! ও কীসের আলো, যা এই সকালেও গোটা এলাকাকে অন্ধ করে দেয়? কামানের গোলায় আঘাত আসেনি তো? লোকেরা এই প্রশ্ন তুললে পর ঝড়ু পুজারী তাদের কথা নস্যাৎ করে কইলো—“বাবাসকল, বড়োকর্তার কামানের গোলা ছিটকে দালানে ঢোকা অসম্ভব, কারণ দালানের ভিতরভাগ ছাতের থেকে দেখা চলে না, আর গোলা সবসময় সরল পথে চলে। তোমরা অযথা দোষারোপ করো কেন বাছা? কোনও বাপ নিজের সোমত্ত ছেলেকে হত্যা করে? তোমরা পারবে?” বুদ্ধের অকাট্য বাক্যে সে যাত্রা লোকজন নিরস্ত হল।
তবে? তবে উত্তর একটাই। নির্ঘাত এ বাড়িতে নৃশংস কোনও অপদেবতার ছায়া পড়েছে! রহস্য রহস্যই রয়ে গেল। সেই সঙ্গে এটাও পরিষ্কার বোঝা যাচ্চিলো যে ঐ রুদ্রাক্ষ রাক্ষসটা এ বাড়িকে নজরবন্দি করে রেখেচে। কোথাও পালিয়েও পরিত্রাণ নাই, আর বাড়িঘর, জমিজিরেত ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে খাবে কী? খুব বাধ্য হয়েই এই নরককুন্ডে আবদ্ধ থাকতে হল সিংহ পরিবারকে। ইতিমধ্যে একদিন ভোরে ঝড়ুর গোঙানি শুনে কৃতান্ত ছুটে গিয়ে পাশের মন্দিরে দেখে বৃদ্ধ একা একাই ছটফট করচে, যেন কেউ অদৃশ্য আঘাত করচে তাকে। এর পরপর বুড়ার শরীরে পক্ষাঘাতের লক্ষণ ফুটে উঠল। তার ঠোঁট কিছুটা বেঁকে গিয়েচে। বৃদ্ধ অস্ফুট স্বরে বললে—“ঐ নরখাদক শয়তান আমার প্রভুর মতো আমাকেও বাণ মারচে। আমি আর বাঁচব না।”
হপ্তা তিনেক পরে, ঠিক কালীপূজার রাত্তিরে শয়তানের তৃতীয় থাবা এসে পড়ল। দুর্গামন্ডপে ঐরকম একখানা ভীষণ হত্যাকাণ্ডের পর পর যে আর কোনও পূজাতেই কারুর উৎসাহ থাকে না, তা কওয়াটাই অধিক। কেবলমাত্র তন্ত্রাচারে অর্পিত পূজা বলেই দায়ে পড়ে নিয়মরক্ষা। এ বাড়ির চণ্ডীপূজা, ছাগবলি থেকে আরম্ভ করে যাবতীয় সরঞ্জাম কৃতান্ত সিংহ নিজের হাতেই প্রতিবার করে থাকে। এইবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি বটে, কিন্তু ভয়ে বাইরের কেউ পূজায় আসেননি, বাড়ির মেয়ে পুরুষেরাও তফাতে বসে বসে কথা বলচে। পূজায় কেউ এগিয়ে আসেনি। মায়ের কাছে বলি দেওয়ার জন্য একখানা ছাগকে যুপকাষ্ঠে বন্দি করে কৃতান্ত যখন উঠে দাঁড়াল তখন নিয়ম রক্ষার্থে বাকিরা উঠানে এসে উপস্থিত হল। তখনও কিন্তু কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি এই সবল, তরতাজা কৃতান্ত, যে কিনা দৈহিক বলে অদম্য, তাকে মৃত্যু অলক্ষ্যে লক্ষ্য করে হেসে চলেচে।
ছাগলটা তারস্বরে ডেকে চলেচে। কৃতান্ত শাণ দেওয়া খাঁড়াটা মাথার উপর তুলে বিড়বিড় করে মন্তর পড়ে ঘোর নিনাদে ‘জয় মা ভবাণী’ বলে হাতের খাঁড়াটা সবেগে নামালো পশুটার উপরে। আবার! আবার সেই জ্বলন্ত হুতাশনের ন্যায় আলোকচ্ছটা ঘিরে ফেলল চারদিক, আর সেই দুর্ভেদ্য আস্তরণ সরলে পর দেখা গেল কৃতান্তর ধড় আর মুণ্ড আলাদা হয়ে বেদীতে পড়ে রয়েচে। কৃতান্তর সদ্য বিবাহিত নববধূ সেই দৃশ্য দেখে মূক হয়ে গেল। সে কাঁদলো না, সে বিলাপ করলে না, শুধু অনন্তকালের জন্য বাকশক্তি হারিয়ে জড়বৎ হয়ে পড়ল।
হেমন্ত সিংহ ধুতির খুঁট দিয়ে চোখ মুছে কইলো—“সত্য বলচি ঠাকুর, এর পর আর আমাদের কারুর বাঁচার ইচ্ছা নাই। জীবনে অভিরুচি নাই। কুসুমপুরার একজন বামুন, সে মধ্যে মধ্যে দেবতার ভরে পড়ে, সে ভাবাবিষ্ট হয়ে অনন্তকে কেন যেন কয়েচিল যে সিংহবাড়িতে কলকাতা থেকে আসা কোনও তান্ত্রিকের হাতে একখানা নরবলি হবে এবং তবেই এ বাড়ি মৃত্যুর গ্রহণমুক্ত হবে। তাই অনন্ত কলকাতা গিয়ে তন্নতন্ন করে তেমন একজন তান্ত্রিক বা কাপালিক খুঁজে বেড়িয়েচে। আমি বেশ জানি মুখুজ্জেমশায়, পাঁচখানা বাণে নিয়তি আমাদের নাম লিখে দিয়েছে। তিনটির রক্ত পান করেচে সে। আমাদের তিন ভায়ের মধ্যে আর দুইজন মরবে। এই প্রার্থনা করি যেন এই আপদ চক্ষে আর নিজের লোকের রক্ত না দেখতে হয়।”
কালীপদর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার চোখেও জল এসেচে। হেমন্ত সিংহ যে কথাগুলো নিজের হৃদয়ের অন্তঃস্থলকে নিঙড়েই বলচে তা শোনামাত্র বোঝা যায়। কালীপদ ক্লিষ্ট কণ্ঠে বললে, “আপনাকে স্তোকবাক্যে ভোলাব না, আপনি আমার গুরুবংশ। আমার অমন শক্তিধর গুরুদেবের প্রভাব কাটিয়ে যখন ঐ শয়তান আরও বড়ো কোনও ঘাতক পন্থা বের করেছে, তখন এই মহা শক্তিধর শয়তানের বিরুদ্ধে কতদূর কী করতে পারি জানিনে, কিন্তু চেষ্টা করতে দোষ কোথা? কিছু না পারি শুরুর ভিটেতে মরতে তো পারব।”
এইটুকু বলে কী একটা স্মরণ করে কালীপদ পূজারীর উদ্দেশ্যে শুধালো– “আচ্ছা ঠাকুর, আপনি তো ভগবান পঞ্চশরের দীর্ঘদিনের সেবায়েত আর পূজারী। আপনার সততা আর বিশ্বস্ততা নিয়ে বিন্দুমাত্র সওয়াল ওঠে না, কারণ গজপতিতে আপনার প্রভু, আপনার যজমান আপনাকে সন্দেহাতীতভাবে চিনতেন বলেই ভগবান পঞ্চশরের সঙ্গে আপনাকে পাঠিয়েচে কুসুমপুরায়। আপনিও যে আসন্ন বিপদাশঙ্কা জানতেন না তা নয়, কিন্তু নিজের প্রাণভয় তুচ্ছ করে আপনি এই ভিটেতে আঁকড়ে পড়ে আছেন। পালিয়ে যাননি। আপনি একটা কথা খুব ভালোভাবে স্মরণ করে বলুন তো, উড়িষ্যা থেকে যখন এই বিগ্রহকে নিয়ে আসা হয়, তখন আপনাকে যারা মারধর করে অপহরণের চেষ্টা করচিলো তাদের দেখতে কেমন ছিল? কোনও কথাবার্তা বা অন্যান্য লক্ষণ, যা শুনে আপনার কোনও ধারণা হয়েছে?”
বৃদ্ধর উপরের ঠোঁটখানা অর্ধেক বক্র হয়ে গিয়েছে রাক্ষুসে মন্ত্রের অভিঘাতে। সে ধীরে ধীরে কইলো—“আমি যখন কর্তাবাবার আদেশ পেয়ে মন্দিরের দিকে আসচি, তখন পিছন থেকে অতর্কিতে চারজন লোক আমার মাথায় লাঠির আঘাত করে। প্রচণ্ড আঘাতে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। তারপর এদের মুখে শুনলুম তারা নাকি আমাকে থলিতে ভরে জঙ্গল দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। ইতিমধ্যে এরা এসে পড়ায় শয়তানগুলো পালিয়ে যায়। সম্ভবত তারা ভেবেচিলো যে গাড়ির মধ্যে অনেক লোকজন রয়েচে হয়তো
কালীপদ একটু ভেবে আবার বলল- “পিছনের থেকে আঘাত করেচিলো সম্ভবত এই জন্যই যাতে আপনি তাদের দেখতে না পান, তাই তো? আর হয়েছেও তাই। আচ্ছা অনন্ত, তোমরা কী লোকগুলোকে পরিষ্কার দেখেছিলে। অনন্ত আর সুকো ভেবে জবাব দিলে- “আজ্ঞা না ঠাকুর। তারা অনেক দূরে ছিল তো বটেই, তায় আঁধার ছিল। গাড়ির লণ্ঠনে আর কতটুকু পথ ঠাহর হয়? তবে আমরা দেখলাম কয়েকটা লোক তড়িঘড়ি দৌড়ে পালিয়ে গেল। ঠাকুরমশাই যথাযথ বলেচে, তারা নিশ্চয়ই ভেবেচে আমরা সংখ্যায় অধিক।”
কালীগুণীন আত্মগত সুরে অনেকটা অনন্তর কথারই প্রতিধ্বনি করল— “তারা ভেবেচে আমরা সংখ্যায় অধিক। সংখ্যায় অধিক। অর্থাৎ তাদের থেকে তোমাদের লোকবল অধিক। অর্থাৎ পাঁচ ছয় জনও হতে পারে….”
কথার তাল কাটলো একটা গোঙানির শব্দে। ঝড়েন্দ্র পূজারী হঠাৎ কিছু একটা যেন মনে পড়ায় কালীপদকে সেই কথা বলতে যাচ্চিলো, হঠাৎ তার শরীরটা থরথর করে কেঁপে উঠল, ঘাড় কাত হয়ে পড়ল, চোখ উলটে গিয়েচে তার। সকলে ত্রস্ত হয়ে উঠে তাকে চেপে ধরলে পর বিকৃত স্বরে পুরোহিত বলতে থাকলো—“আবার… আবার বাণ মারচে ঐ শয়তান… আঃ, জ্বলে পুড়ে গেলাম…।”
কালীপদ বিদ্যুৎবেগে উঠে ঝড়ুর কপালে তর্জনী স্পর্শ করে বলে উঠল— “হা ঈশ্বর! একে সত্যিই বাণ মেরেচে কেউ!”
বেশ কিছুক্ষণ ছটফট করে অবশেষে একটু শান্ত হল বৃদ্ধ। তার শরীরের সমস্ত শক্তি কেউ যেন নিঙড়ে নিয়েচে। সবাই ধরাধরি করে নিয়ে গিয়ে বুড়াকে পঞ্চশরের মন্দিরে শয্যা পেতে শুইয়ে দিয়ে এল। মূল ভদ্রাসনে প্রবেশের পূর্বে আমি তাকিয়ে দেখলাম কালীপদর ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হয়ে রয়েচে আর সে বিড়বিড় করে বলচে—“আমার সামনে, আমার উপস্থিতিতে বাণ মারলো। এত ক্ষমতা তার? এই ভিটেতে সে বাণমন্তর কাজ করল কেমন করে? কোন রন্ধ্রে প্রবেশ করল সে?”
রাতে আমি মুখুজ্জেমশায়ের সঙ্গে এক কক্ষে শয়ন করেচিলাম। আমার সারাদিনের মানসিক আর দৈহিক অবসাদে নিদ্রাকর্ষণ হয়ে এসেচিলো প্রায়। কালীপদ নানান চিন্তায় দুই চোখের পল্লব এক করেনি। আনমনে চিন্তা করতে করতে হঠাৎ সুপ্তোত্থিতের ন্যায় ধড়মড় করে উঠে আমাকে ধাক্কা দিয়ে তুললো কালীপদ। আমি ভীষণ চমকে উঠে জড়ানো কণ্ঠে হাঁ হাঁ করে বলে উঠলাম—“কী হয়েচে দাদা! কী হয়েছে!”
মুখুজ্জেমশায় নীচু স্বরে কইলো—“ডাক্তার, এইখান থেকে সদরটা শুনেচি গাড়িতে এক ঘণ্টাটাকের পথ। তুমি কাল সকালে আমার কিছু পূজার ফরমায়েশি জিনিসপত্তর আনবার অছিলায় এ বাড়ির গাড়োয়ান মাণিকলালের গাড়ি নিয়ে সদরে যাবে। সেখানে ডাক আপিস থেকে একখানা ট্রাঙ্ককল করবে কলকাতায় সুবলের পুলিশ চৌকিতে। তাকে আমার নাম করে বলবে যে কোনও উপায়ে যেন উড়িষ্যার গজপতি জেলার পুলিশচৌকির সাথে যোগাযোগ করে একটা ব্যাপার যেন আমাকে জানায়। জানাটা খুব দরকার। তুমি ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করবে আপিসে। তার উত্তর নিয়ে তবে আসবে। ঘুমুলে নাকি? আর হাঁ, যাবার সময়ে অনন্তর থেকে একখানা টাকা অর্ডারি করার লাল লেফাফা হাতে করে বেশ দেখাতে দেখাতে নিয়ে যেও কেমন? সকলে ভাববে… বুঝলে কিনা?”
*
সকালে দোতলার বারান্দায় বেরিয়ে দেখলাম দুই ভাইয়ে ধরাধরি করে ঝড়ু পূজারীকে চৌপাইতে এনে বসিয়েচে। তার দেহ বিলক্ষণ দুর্বল আর খুব নীচু কণ্ঠে আপনমনে বিড়বিড় করচে— “কী যেন একটা বলার ছিল আমার? কী যেন বলতে যাচ্চিলাম গতকাল?”
বুঝতে পারলাম রুদ্রাক্ষ কাপালিকের মন্ত্র এই বৃদ্ধের শুধু শরীরেই নয়, মনের উপরেও বিস্তর আঁচড় কেটেচে। একটু পরে কিঞ্চিৎ জলযোগ করে আমি বেশ হেঁকে হেঁকেই অনন্তর কাছ থেকে একখানা লেফাফা চেয়ে, তাতে প্রকাশ্যে কয়েকখানা নোট রেখে মাণিকলালকে নিয়ে রওয়ানা দিলাম সদরের ডাকঘরে।
দুপুরটা কালীপদ ঘুরে ঘুরে গোটা সিংহবাড়িটা খুঁটিয়ে দেখলো। পঞ্চশরের মন্দির, কালী মন্দির, পিছনের চন্ডীমন্ডপ, মন্ডপের একেবারে লাগোয়া গোহালঘর, এমনকি পরিচারকদের বাসস্থান অবধি। ভগবান পঞ্চশর শূন্য তূণীর পিঠে নিয়ে ধ্বজ দন্ড হাতে দন্ডায়মান। বিগ্রহের সূক্ষ্ম থেকে অতিসূক্ষ্ম কারুকাজ এতটাই নিখুঁত যে ভাস্করকে শত কুর্ণিশ করতে ইচ্ছা হয়। উচ্চতায় অন্ততঃ আট নয় হাতের কাছাকাছি, মুখে প্রশান্ত ভাব, চক্ষু স্নিগ্ধ, চেহারা বলিষ্ঠ। এই তবে ভগবান পঞ্চশর, অর্থাৎ কন্দর্প! আমার মনে মনে একটা কথা ঘুরঘুর করচিলো। কামদেব পঞ্চশরের যে পাঁচখানা বাণ চুরি গিয়েচে, শাস্ত্রমতে সেগুলির কার্যকারিতা তো দেহের উন্মাদনা সৃষ্টির ক্ষেত্রে। ঐ কাপালিক কামনা উন্মাদনার বাণ দিয়ে কী উপায়ে নরবধ করচে? আবার অন্য কোনও অভাবনীয় উপায়ই যদি সে উদ্ভাবন করবে, তবে বিশেষ করে এই বাণগুলিই তার চুরি করার কী আবশ্যকতা ছিল? কাপালিক রুদ্রাক্ষর কুটিল মনের চোরা গলিতে যে কোন হিংস্র অভিসন্ধি লুকিয়ে রয়েচে তা ধরা আমার কর্ম নয়। বোধকরি মুখুজ্জেমশায়ও একবিন্দু থই পাচ্চে না, সে ললাটে ভাঁজ ফেলে আকাশ পাতাল ভেবে চলেচে, আপনমনে বিড়বিড় করচে আর বাতাসে আঙুল দিয়ে আঁক কেটে কেটে কী যেন মেলানোর চেষ্টা করচে, আবার সব ছেড়ে দিয়ে বিষণ্ণ মুখে বলচে– “ধুত্তোর, তাও তো মিলচে না। উঁহু, ধরা যাচ্চে না।”
হেমন্ত সিংহ তো বটেই, কালীপদর নিস্তেজ আচরণ লক্ষ্য করে অনন্তও সামান্য যেন নিরাশ হয়ে পড়েছে। কালী একবার মূর্তিটা দেখিয়ে অনন্তকে কইলো— “আচ্ছা অনন্ত, একটা কথা বলতে পারো? এই ডান কাঁধের তূণীরটাকে ধরে রাখার জন্য ডান কাঁধ থেকে বাম কাঁকাল অবধি একখানা ফিতার মতো পট্টি নেমে এসেচে বিগ্রহের বুকের উপর দিয়ে, কিন্তু বামদিকের কাঁধের থেকেও অবিকল একখানা পট্টি নেমেচে ডানদিকের কোমর অবধি। ঐটে কেন রয়েচে? ওদিকে তো কোনও অস্ত্র দেখচি না?”
*
দুপুরে যখন আহারে বসেচি, অনন্ত একটু ইতস্ততঃ করে শুধালো— “আচ্ছা ঠাকুর, এক মাথা ঝাঁকড়া জটা চুল, বিরাট বলিষ্ঠ দেহ, কানে হাড়ের কুন্ডল আর পায়ে মোটা তামার রুলি পরিহিত কারুর কথা বললে আপনার কারুর কথা মনে আসে?”
কালীপদ চমকে উঠে বললে — “সেকি! হঠাৎ এই কথা কেন?”
— “না, এমনিই শুধাচ্চি।”
কালীপদ দুই হাত জোড়া করে কইলো– “হাঁ বাছা, মনে আসে। তিনি আমার গুরুদেব। তার শালগাছের ন্যায় বিরাট শালপ্রাংশু দেহাবয়ব, স্ফুরিত বিদ্যুদ্দামের ন্যায় কেশের জটা, চক্ষে জ্যোতি আর ঠোঁটে একচিলতে নির্ভীক হাসি। কিন্তু তাঁকে তুমি… মানে তাঁর কোনও ছবিটবি তো থাকার কথা নয়।”
অনন্ত একটা নিঃশ্বাস ফেলে কইলো—“নাহ, এমনিই কইলুম।”
দেখলাম কালীপদ অন্নপাত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করে চলেচে। ঝড়ু পূজারী কিষ্ট স্বরে কইলো—“কষ্ট পেওনা বাছা, দুশ্চিন্তা করো না। অন্ন দেবতার সমতুল্য, তাকে অবজ্ঞা করো না। আহারান্তে যা করার করো। উপোসী হাতী ইন্দুরের নামান্তর।”
কালীপদ করুণ চক্ষে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের দিকে চেয়ে বিষণ্ণভাবে অন্ন মুখে তুললো, তবে তার মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে যে সম্ভাব্য অসম্ভাব্য চিন্তাজালের বিরাট ঝড় উঠেচে তা বুঝতে পারলাম আহার পরবর্তী বিশ্রামের কালে। উপরে উঠে আমি দুইতলার ঘরটায় ঢুকে জানালার কপাটগুলো উন্মুক্ত করে দিলাম। বাইরে বিস্তৃত জমি জুড়ে সতেজ, সবুজ ফুলকপি ফুটে রয়েচে। গ্রামান্তরের শীতল মিঠা বাতাস অচিন আঙুরক্ষেতের সুগন্ধ বয়ে নিয়ে এসে চারদিক বিধৌত করচে। কৃষিকাজ বরাবরই কালীপদর বিশেষ পছন্দের। আমি মুখুজ্জেমশায়ের অশান্ত চিত্তকে কিঞ্চিৎ শান্ত করার উদ্দেশ্যে তাকে কইলাম- “দাদা, বাইরে কী চমৎকার কপির চাষ হয়েচে দেখেচো একবার?”
কালীপদ পালঙ্কে বসে একখানা লবঙ্গ চর্বণ করতে করতে উত্তর দিল— “না, দেখিনি। আমার এইখান থেকে বাইরে অবধি দৃষ্টি চলে না। আচ্ছা ডাক্তার, এই যে পালঙ্কে আমরা বসে রয়েছি, সেইটে কী আমাদের দৃষ্টির আড়ালে রয়েচে?”
আমি থতমত খেয়ে কইলাম— “সে কী কথা! তা কেন? দিব্যি সামনেই তো রয়েছে।”
“আর ঐ জানালা, দুয়ার, চৌপাই, কলমদানী? ঐগুলি?”
রুদ্রাক্ষ কাপালিকের চিন্তাভাবনা যে অত্যন্ত বক্র এবং প্রচ্ছন্ন, তা বুঝতে কারুর বাকি ছিল না, কিন্তু তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কালীপদর ভাবনার জাল যে কতদূর ডানা মেলেচে তা এইবার কিছুটা বুঝলাম। উত্তর দিলাম—“না মুখুজ্জেমশায়, ঐ জিনিসগুলিও কোনওটিই দৃষ্টির আড়ালে বলা চলে না।”
–“তবে দৃষ্টির আড়ালে কোন কোন জিনিসকে বলা যাবে?”
—“অনেক কিছুই, যেমন জানলার বাইরের দৃশ্য, মানুষজন, গাছপালা, অর্থাৎ যে বস্তুগুলো নজরে পড়ে না।”
— “আমারও তাই ধারণা ডাক্তার। সবারই তাইই ধারণা। তবে ভাবচি, ঐ বাণগুলিই যদি মূল শক্তি হয়ে থাকে, তবে গজপতির ঐ বৃদ্ধ এই কথা কেন কয়েচিলো অনন্তকে যে ঐ মহাশক্তি যুগ যুগ ধরে সকলের চোখের আড়ালে লুকিয়ে রয়েচে? বাণগুলি তো কিছু লুক্কায়িত অবস্থায় ছিল না। চোখ মেললেই তাকে দেখা চলতো বেশ। এমন তো নয় যে ওই চৌর্যবৃত্তি কেবলমাত্র আমাদের চোখে ধূলা দেওয়ার জন্য ঘটানো হয়েচে? আসল শক্তি মন্দিরেই কোথাও ঘাপটি মেরে ছিল। পরে ঐ শয়তান তা ছলে হরণ করে। কিম্বা আগে ঐ মহাস্ত্র হস্তগত করে তারপর বাণগুলি চুরি করে।”
— “সে কী? কিন্তু আসল মারণাস্ত্র তার হাতে একবার চলে গেলে সে তারপর আবার বাণের অজুহাতে চোখে ধুলো দিতে চাইবে কেন? লোককে ভুল বুঝিয়ে তার কী এমন লাভ?”
কালীপদর কণ্ঠে বিষণ্ণতা দূর হয়ে এইবার দৃঢ়তা প্রকাশ পেলো—“লাভ আছে ভায়া। এই কাজ মানুষ তখনই করবে, যদি কোনও ভাবে ঐ শক্তির একটা অংশ এই বাড়িতে, আমাদের হাতেই থেকে যায়। সেই জিনিসটাকে যাতে কেউ মারণাস্ত্র বলে ভাবতে না পারে, যাতে অকিঞ্চিৎকর দ্রব্য ভেবে কোণায় পড়ে থাকে, যাতে সবার নজর বাণের দিকেই নিবদ্ধ হয়, সেই জন্যই এই ধোঁকার দরকার ছিল ঐ শয়তানের। অনুমান করে বলচি বটে কিন্তু আমার মন বলচে পুরোটা অনুমান নয়। সেই শক্তি কী হতে পারে বলো তো? বিগ্রহের হাতের ধ্বজাটাকে প্রথমে সন্দেহ হয় বটে, কিন্তু ওইটেও তো একেবারেই লুকানো অবস্থায় নাই, ফলে সেটা হতেই পারে না। অন্য কিছু।
আরও একটা জিনিস খটকা লাগচে। বিগ্রহের কাঁধের তৃণীরের বন্ধনী ফিতার যৌক্তিকতা তো বুঝেচি, কিন্তু অপরদিকের আরেকটি আড়াআড়ি সূতার মতো ওইটে কী? পৈতা নয় তো? ওইটে সত্যিই কামদেবের মূর্তি তো ভায়া? হাতে ধনুক, পিঠে তূণীর, রীতিমতো যোদ্ধাবেশ, অথচ অপর হাতে নিশান। এইভাবে ধ্বজাধারী হয়ে কী কেউ যুদ্ধ করে? কোনও রাজা বা নিদেনপক্ষে একজন যোদ্ধা যদি নিশান বহন করে, তবে তাতেও তো একটা চিহ্ন বা রাজ্যের নিদর্শন থাকবে! কী বলো? কিন্তু পাথর কুঁদে তৈরি করা ঐ ধ্বজার গায়ে সূক্ষ্মতম কোনও চিহ্নই নাই। তারপর ধরো ঐ মহেন্দ্রগিরি পাহাড়টা। সেটা কিন্তু আজকের নয় ডাক্তার, সেই রামায়ণের যুগেও এর উল্লেখ আছে। সেইখানে কী যেন হয়েচিলো? কী যেন শুনেচিলাম? …..
আমি কইলাম—“কিন্তু দাদা, শুধু ঐ শয়তানটার চালাকি আর অভিসন্ধি ধরে ফেলে কী লাভ আছে, যদি না তাকে রুখতে পারা যায়? সে রাক্ষস সামনে আসে না, কোনও প্রত্যক্ষ আক্রমণ করে না, কেবল ইন্দ্রজিৎ এর মতো চোরাগোপ্তা হানা দেয় আর অস্ত্র নিক্ষেপ করে। তাকে শায়েস্তা করার উপায় কী?”
—“শায়েস্তা করার আমি তুমি কে? তবে একটা কথা, ঐ রুদ্রাক্ষ নরপশুটা যে কিন্তু রোজ রোজ হানা দেয় তাও তো নয়। দুর্গাসপ্তমী তিথির পরে ফের হানা দিয়েচিলো শ্যামাপূজার রাত্তিরে। পরের বাড়িতে এতদিন প্রতীক্ষা করে বসে থাকা যায় কী? কোনও কারণে সে মাসখানেক আক্রমণ না ও তো করতে পারে। সবচাইতে বড়ো বিপদের কথা হল, সেই চোখ ধাঁধানো মারণাস্ত্র ঠিক কোন্ উপায়ে নিজের শিকারকে বেছে নেয় সেটুকু না ধরতে পারলে এই মৃত্যুর সংহারলীলা বন্ধ করা যাবে না।”
আমি এইদিকটা যে ভাবিনি তা নয়। এই নরককুন্ডে বসে বসে দিনপাত করতে আমারও একটা অসোয়াস্তি হচ্চিলো। আমি উত্তরে বললুম—“কথাটা তো যথার্থ, কিন্তু আমাদের হিসেব মতো সে তো আর চলবে না, হানাও দেবে না। তবে উপায় কী?”
“উপায়টা সুন্দরবনের ভাষায় বললে বুঝবে কী ডাক্তার?”
— “সেই তোমাদের খাওটো যাওটো আসিটি করিটি ভাষা। যা হোক, শুনি আগে।”
— “খাওটো যাওটো নয় হে, এটাকে জঙ্গলের আদিম ভাষা বলতে পারো, আর জানো তো জঙ্গলের ভাষা কখনওই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। বাদাবনের গাঁয়ে একটা চলতি কথা রয়েচে— মৌতাহ তরুর ঝাঁকাড় তাহে/মৌয়ারি ছুটেটে দশেরো বাহে।”
–“মানে?”
–“মানে, মৌলীরা যখন মৌ সংগ্রহ করতে বনে ঢোকে এবং চাকের ভিতরে থাকা মৌমাছির সংখ্যা বা অবস্থান কিছুতেই আন্দাজ করতে পারে না, তখন তারা গাছে মৃদু মৃদু ঝাঁকানি দিয়ে লুকিয়ে পড়ে। মৌমাছি সেটাকে আক্রমণ না ভেবে ঝড়ের আগমন বলে ভুল করে এবং দশদিকে উড়ে পালিয়ে যায়। যদি ফাঁদ বলে বুঝতো, তবে শত্রুর সন্ধান করত।”
— “বুঝলাম, কিন্তু তাতে আমাদের কী? কী করতে চাইচো?”
কালীপদ গম্ভীর কণ্ঠে কইলো—“মৌচাকের গাছটায় একটা ঝাঁকুনি দিতে হবে আজই। সবুরে শুধু মেওয়াই ফলে না ডাক্তার, অনেক সময়ে সুযোগও হারায়।”
আমি উত্তেজিত হয়ে রুদ্ধকণ্ঠে শুধালাম—“কিন্তু তাতে তোমার কোনও বিপদ নাই তো?”
— “আছে বৈকি। বিলক্ষণ আছে। প্রথম কোপটা তো আমার ঘাড়েই পড়া উচিত। যদি তা না হয়, তবে শিকার হবে এ বাড়ির যে কোনও একজন বংশধর। এদের বিলুপ্ত করতে পারলেই পঞ্চশরের সম্পূর্ণ অধিকার বর্তাবে ঐ কাপালিকের হাতে, কারণ সেও সিংহ বংশেরই তৃতীয় শাখার রক্ত। তবে একটা কথা, এই ভয়াবহ মারণশক্তি হাতে আসার পরেও যখন সে এই বংশকে বিনষ্ট করে বিগ্রহের দৈব অধিকার চাইচে, তখন বুঝতে হবে পঞ্চশরের কাছে আরও কোনও এক বা একাধিক মহাশক্তি রয়েছে। শয়তানটা নিজেও সম্ভবত সেটার ব্যাপারে পরিষ্কার ভাবে জানে না, শুধু লোককথা মারফৎ তার অস্তিত্বটুকু শুনেচে নিশ্চয়ই। আমি তার ধানক্ষেতে নিড়েন দিতে এসেচি। সে কী আমাকে ছেড়ে দেবে অমনিই?”
এই কথা শুনে আমার মুখ শুকিয়ে এল। কলকাতা ছেড়ে আসার সময়ে বৌঠানের বিষাদরুদ্ধ করুণ হাসিখানা মনে ভেসে উঠল। কালীপদর অবর্তমানে সেই সতীলক্ষ্মী যে আর একটিও সূর্য্য দেখবে না, তা স্থির, আবার এই একগুঁয়ে জেদি মানুষটি যে এই নরসংহারক রাক্ষসটার শেষ না দেখে পলাতক হবে না, তাও একপ্রকার স্থির। আমি মহা সংকটে পড়ে ভগ্ন স্বরে বললাম- “তুমি কিছু একটা স্থির করেচো যখন কারুর কথায় কর্ণপাত করবে না জানি, তবে নিজের গুরুদক্ষিণা পরিশোধ করতে গিয়ে নিজের জীবন বিনষ্ট কারো না এটুকুই আর্জি। তোমার অনেক কথা শোনা আমার বাকি রয়েছে, আমারও বহু কথা বলা বাকি আছে, সেসব কথা কখনও আমি তোমাকে বলিনি দাদা। কখনও বলিনি।” অবরুদ্ধ কান্না এসে আমার কণ্ঠ রোধ করল।
কালীপদ ভাবলেশহীন মুখে আমার কাঁধে হাত রেখে বললে- “তুমি নিপাত যাও ডাক্তার। এমন করে কাঁদতে হয় পুরুষের? রাক্কুসীর আঁচলে যে নিজের সবকিছু বেঁধে রেখেচে, তার জীবনমৃত্যুর হিসেব ঐ মুন্ডমালীই রাখে। গুরুর ভিটেতে যে মরাও পূণ্য ডাক্তার। সে সুখে আমায় বঞ্চিত করা কী তোমার কর্তব্য হয়?”
আমি রাগে মুখুজ্জেমশায়ের হাত সরিয়ে দিয়ে বললাম—“তোমার সুখ তোমার থাক। আমার বুঝে কাজ নাই। আমি তোমাকে নিয়ে আবার কলকাতায় যাব, আবার গঙ্গার ঘাটে বসবো, আবার মাঝপথে থেমে যাওয়া গল্প শুনবো।”
কালীগুণীন এইবার হেসে ফেলে কইলো—“গপ্পো? আমার কথা তোমার গপ্পো বলে মনে হল তবে বলো? কোন গপ্পো মাঝপথে রয়ে গিয়েছে?”
আমিও কিঞ্চিৎ হেসে চোখের জল মুছে মুখটা একটু নামিয়ে বললুম- “ঐ যে, গঙ্গার গল্প বলচিলে সেদিন। ভগীরথের সঙ্গে গঙ্গা কীভাবে পৃথিবীতে এসেচিলেন। ভুলে গেলে এরই মধ্যে?”
বহুক্ষণ কোনও সঙ্গত প্রত্যুত্তর না পেয়ে আমি অবাক হয়ে মুখ তুলে তাকালাম আর সঙ্গে সঙ্গে শয্যা থেকে এক লাফে উঠে দাঁড়ালাম। তার কারণ এই নয় যে আমি কালীপদর কথা শুনে বিশেষ কিছু পন্থা আবিষ্কার করতে পেরেচি, বরং তার থেকেও শতগুণ আনন্দের বস্তু আমার চোখে পড়েচে ততক্ষণে। কালীপদর চক্ষুদ্বয় সরু হয়ে এসেচে, চিবুক কঠিন হয়ে এসেচে, আর তার আঙুলগুলি পরস্পরের সঙ্গে কামড়ে রয়েচে!
আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে চিৎকার করে উঠতে গিয়েও নিজেকে সংযত করে নীচু সুরে বললাম—“কিছু বুঝতে পেরেচো দাদা?”
— “পেরেচি ডাক্তার। এইবার মনে হয় সবটুকু ধরতে পেরেচি। কী ভয়ঙ্কর! কী নির্মম! কতখানি সুকৌশলে পুরো হত্যাকাণ্ডের রচনা করেচে ঐ শয়তান! তোমাকে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাই ভায়া। তুমি না থাকলে, আর গঙ্গার কথাটা না বললে আমার সাধ্যি কী ধরতে পারি? কী আশ্চর্য! এই ব্যাপারটা তবে নিছক কবির কল্পনা নয়!”
— “কবির কল্পনা? কোন কবি?’
কালীপদ চিবিয়ে চিবিয়ে উত্তরে বললে- “কবির কবি, আদি কবি। রামায়ণের স্রষ্টা, স্বয়ং মহাঋষি বাল্মীকি। রামায়ণের একটা ক্ষুদ্র পরিসরে একেবারে হুবহু এইরকম একখানা হত্যাকাণ্ডের কথা লেখা রয়েচে। সে ঘটনাকে আমরা পাঠ করেও সামান্য ঘটনা মনে করে এড়িয়ে যাই, কিন্তু একটা মারণাস্ত্রের কী বিপুল প্রয়োগ কৌশল যে সেই ছত্রে আত্মগোপন করে রয়েচে, সে কথা বোধকরি একমাত্র মহর্ষি বাল্মীকিই জানতেন।”
*
শয়নকক্ষ থেকে যখন বাইরে এলাম, তখন ভরা বিকেলবেলা। কালীপদ অনন্তকে আড়ালে ডেকে বললে—“আচ্ছা অনন্ত, একটা ব্যাপার কিন্তু আমাদের সবার চোখ এড়িয়ে ডুব মেরেচে। ভালো করে স্মরণ করে বলবে বাছা। তুমি যখন তোমার বন্ধু বিনয়কে ঘরে বসে ঐ পঞ্চশরের টুকিটাকি জিনিসগুলো দেখাচ্চিলে তখনই তো রুদ্রাক্ষ এসে হানা দিয়েচিলো সশরীরে? তোমাদের আঘাত না করতে পেরে সে আপদ বেরিয়ে যায় আরও কুটিল অভিসন্ধি নিয়ে, কিন্তু যে জিনিসগুলি বন্ধুকে দেখাচ্চিলে, সেগুলির কী হল?”
অনন্ত বললে—“আজ্ঞা, বিনয় নয়, তার নাম বিনোদবিহারী। রুদ্রাক্ষের অকস্মাৎ উপস্থিতিতে আর মন্ত্রাঘাতে আমরা ছিটকে পড়েচিলাম। বিনোদের আঘাত গুরুতর ছিল, কারণ সে আমাদের বংশের নয়, ফলে তার ক্ষেত্রে বংশগত রক্ষাকবচ কাজ করেনি। আমি মুহূর্তের মধ্যে উঠে দাঁড়ানো মাত্র কাপালিকটা নিজের ক্ষমতা ব্যর্থ হতে দেখে নিষ্ফল আক্রোশে দ্রুতপদে বেরিয়ে যায়।”
— “তারপর? ঐ জিনিসগুলি কী হল?”
— “ঠাকুর, আমি যে ঐ দ্রব্যগুলি বিনোদকে দেখাতে এনেচিলাম সে খবর কেউই জানতো না, ফলে কেউ খোঁজও নেয়নি। আমি ওগুলা দেরাজের ভিতরেই তুলে রেখেচিলাম পরে সুযোগ মতো মন্দিরে রেখে আসব বলে, কিন্তু যখন দেখলাম মন্দিরেও চোর পড়েছে, তখন আর রাখতে ভরসা হল না। কিছু স্মৃতি তো বেঁচে থাক। তারপর যেইদিন আবার চোর পড়ল সেদিন ঘরে ঢুকে দেখি দেরাজ খোলা পড়ে রয়েচে, দেরাজের ভিতরে যা যা ছিল তার কিচ্ছুটি আর নাই।”
কালীপদর মরিয়া কণ্ঠে একরাশ হতাশা ঝরে পড়ল— “হা ঈশ্বর! তবে তো আমার অনুমান সম্পূর্ণ ভুল! অনেক কষ্টে ছিন্ন সূতাটা জোড়া দিয়েচিলাম, সেও বুঝি থাকে না আর। নাহ্, আর উপায় নাই।”
অনন্ত নখ খুঁটতে খুঁটতে অপরাধীর ন্যায় বললে- “আমি মানচি ঠাকুর, ঐ জিনিসগুলি আমার দেরাজে রাখা উচিত ছিল না। যে রাতে ওগুলো দেরাজে রেখে শুয়েচিলাম, সেই রাত্তিরে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখি আমি। দেখলাম, একজন দীর্ঘকায় পুরুষ, মাথায় জটা, কানে হাড়ের কুন্ডল, সে আমাকে ভর্ৎসনা করচে। তার কণ্ঠস্বর কিছুতেই আমি শুনতে পাচ্চিনে কিন্তু ইঙ্গিতে সে কী বলচে তা পরিষ্কার। ঐ পূজার জিনিসগুলি ওভাবে খোলাখুলি রেখে দিলে যে বিপদ শিয়রে, সেই কথাই সে বলচে। কী ভয়ানক বজ্রের মতো তার পায়ের শব্দ, কী আশ্চর্য জ্যোতি তার দেহে। আমি ভোরের মুখে ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে দেরাজ থেকে ওগুলো স্থানান্তরিত করে ফেলি। ওগুলা এখন আমার শয়নকক্ষের পুলিপাখার ভিতরে রয়েচে। ঐ মানুষটা ঐখানেই রাখতে বলেচিলো আমাকে।”
কালীপদ দু হাতে মুখ আবৃত করে শিশুদের মতো কেঁদে ফেললো। আমি তার পিঠে হাত রাখলাম। কালীপদ যখন মুখ তুললো, তখন তার চক্ষে আলো ঠিকরে বেরুচ্চে।
*
— “দেখেচো ডাক্তার, এই পাথরের তৈরি দ্বারঘটটা কতখানি মজবুত?”
আমিও খুব সাবধানে সেখানা নেড়েচেড়ে দেখচিলাম। তার মুখে পাথরের ঢাকনি দেওয়া। ঢাকনির আঁটুনি এতই প্রবল যে খুব শক্তি দ্বারা তা ফাঁক করা যায় মাত্র, আবার ছেড়ে দিলেই সজোরে অবরুদ্ধ হয়ে যায়। আমি ভয়ে ভয়ে সেটা আবার শয্যার উপরে রেখে দিয়ে বললুম— “হাঁ দাদা, দেখেচি। কিন্তু ও কীসের ঘট?”
কালীপদ অবিচলিত সুরে উত্তর দিলে—“কীসের তা জানিনে, তবে দ্বারঘট হবার সম্ভাবনা একেবারে শূন্য। অনন্ত তো সাকুল্যে পাঁচখানা এমন ঘট পেয়েচিলো মন্দিরে। দ্বারঘট কি কখনও বেজোড় হয় ডাক্তার? আমাদের চোখ, কান, হাতের ন্যায় দ্বারঘটও জুড়িতে থাকে। এখানে কিন্তু পাঁচটি ছিল। এই ঘটেই রয়েচে সেই মহা বিধ্বংসী মহামারী শক্তি, যার মধ্যে চারটি কাপালিক রুদ্রাক্ষ হস্তগত করেচিলো, এবং তিনটির প্রয়োগ ইতিমধ্যেই সে করেছে।”
অনন্ত ভীষণ অবাক হয়ে বললে—“কিন্তু এর মধ্যে কী শক্তি রয়েছে ঠাকুর?”
— “বলচি। অস্ত্র কাকে বলে সেইটা আমাদের জানা আছে সবারই। এইবার কথা হল, পুরাণে বা লোককথায় যে সকল অস্ত্রের নাম আমরা শুনি, যেমন পাশুপাত, বায়ব্য, ব্রহ্মশির, ব্রহ্মাস্ত্র, ঐষিক, এগুলি কোনওটিই কিন্তু ঠিক নির্দিষ্ট একটি অস্ত্রের নাম নয়। এগুলি এক-একটি বিশেষ বিদ্যা বা গুণ, যেগুলি আরোপ করা মাত্র একটি সাধারণ অস্ত্রও প্রলয়ংকরী রূপ পরিগ্রহ করে। তুমি যদি পাশুপাতের গুণটুকু একখানা সাধারণ পাটকেলের মধ্যেও আরোপিত করো, তবে ওই একটা পাটকেলের আঘাতেই হয়তো গোটা কলকাতা, সোঁদরবন, ঢাকা, খুলনা চোখের নিমিষে ছাই হয়ে যেতে পারে। তোমরা প্রথম থেকেই কোনও প্রচলিত অস্ত্রের খোঁজ করে ভুল করেচো। একই ভুল আমিও করেচি। আদতে যে সন্ধান নিয়ে এত বখেরা, তা আদপে কোনও অস্ত্রই নয়, একটা বিশেষ ক্ষমতা মাত্র। তাকে এই ঘটির ভিতরে যুগ যুগান্ত ধরে ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায়।”
অনন্ত উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বারান্দার একখানা কেদারায় বসে পড়ল। আমার অবস্থাও তথৈবচ, তবু আমি কম্পিত কণ্ঠে শুধালাম—“কী আশ্চর্য কথা! কিন্তু এই ঘটির মধ্যে কোন্ শক্তি লুকিয়ে রয়েচে দাদা? আমরা নাম শুনেচি তার?”
কালীপদ একবার চারদিকটা দেখে নিয়ে বললে — “বিলক্ষণ শুনেচো ডাক্তার। রামায়ণে এর উল্লেখ রয়েচে। মহারাজা দশরথ এই বিদ্যের, এই বাণের প্রয়োগ জানতেন।”
অনন্ত অস্ফুটভাবে বলল—“অযোধ্যা নরেশ দশরথ? কোন্ বিদ্যে? কোন্ বাণ?”
কালীপদ মনের মধ্যে অনেকখানি শক্তি সঞ্চয় করে নিয়ে প্রত্যুত্তর করল- “শব্দভেদী বাণ! সেই শব্দভেদী বাণ, যার নিক্ষেপে ভুলবশতঃ ঋষিকুমার শ্রবণের জীবন বিনষ্ট হয়। মৃগ ভ্রমে ঋষিপুত্রের কণ্ঠ ভেদ করে ঐ মহাবাণ। দশরথ শ্রবণকুমারকে দেখতে পাননি, অর্থাৎ দুইজনের অবস্থান সরলপথে ছিল না, তথাপি তার নিক্ষিপ্ত বাণ কেমন করে গিয়ে বিধলো তার শরীরে? বাণ তো সরল পথে চলে। তবে ঐ মহাস্ত্র নিশ্চিতভাবে নিজের শিকারকে নিজেই খুঁজে নিতে জানে, এবং সেটা একমাত্র নির্ভুল শব্দ শুনে, ঠিক যে ভাবে স্বয়ং মকরবাহিনী গঙ্গা পৃথিবীতে এসেচিলেন। দশরথের বাণ শ্রবণকুমারকে চিনত না, কিন্তু সে জল পান করার শব্দটি চিনত। এই অস্ত্রের ব্যাপারে কেউ পরিষ্কার না জানলেও একটা জনশ্রুতি তো যুগ যুগ ধরে থেকেই যায়, সেই কারণেই সম্ভবত গজপতির প্রজারা পঞ্চশরের মন্দিরে প্রচলিত সংস্কারবশতঃ মুখে কাপড় বেঁধে প্রবেশ করতো, যাতে একবিন্দু কথা না বেরোয় মুখ থেকে, আর মন্দিরের ভিতরে যে অজানা বস্তু তাদের কথা শুনতে পাবে বলে এই ভয়, সে হল এই পাথুরে ঘট। একখানা ঝুলি দাও, এইখানা আর চোখের আড়াল করা মোটে সুবুদ্ধি নয়।
অনন্তর বলা প্রতিটি ঘটনা আমার মনে গাঁথা রয়েচে, এবং তাকে চুলচেরা ভাবে আন্দোলিত করে এই পদ্ধতির একটা প্রয়োগ কৌশল হয়তো আমি ধরলেও ধরতে পেরেচি। যে অদ্ভুত কৌশলে সিংহবাড়ির বংশধরদের বিনাশ করা হচ্চে, সেই পদ্ধতিটা হচ্চে… থাক, পরে বলবো’খন, লোক আসচে।” হেমন্ত, ঝড়ু আর সুকো এসে আমাদের কইলো—“কী ঠাকুর, কোথাও বেরুচ্চেন নাকি আপনারা?”
কালীপদ মাথা নেড়ে বললে—“না, বেরুচ্চি নে, তবে একটা কথা ভাবচি…”
–“কী কথা? বলুন না।”
কালীপদ সোজাসুজি হেমন্তর চোখের দিকে চেয়ে বলল—“আমি কী ভাবচি, কী করচি, সে কথা আপনাকে বলতে আমি বাধ্য নই, আর ইচ্ছুকও নই। আমি এঁদের সঙ্গে আলোচনা করে নেব।”
কালীপদর আচরণে অপমানিত বোধ করে হেমন্ত কড়া স্বরে বললে— “ঠাকুর, আপনি বামুন বটে, কিন্তু আপনি আমাকে এ ভাবে অবমাননা করার সাহস পেলেন কোথা হতে?”
–“অবমাননা তার হয় কর্তা, যার মান রয়। আপনি একজন নীচ প্রকৃতির চরিত্রহীন ব্যক্তি। আপনার মান রক্ষার দায় আমাতে বর্তায় না।”
অনন্ত উঠে দাঁড়িয়ে হতভম্ব হয়ে বলে উঠল—“এসব আপনি কী বলচেন ঠাকুর! আমার দেবতুল্য দাদাকে আপনি…!”
কালী হেসে বলল—“বটে? দেবতুল্য বৈকি। কখনও ভেবেচো যে সিংহবাড়ির রক্ত গায়ে না থাকার কারণে তোমার বন্ধু বিনোদবিহারী ঐ শয়তানের মন্ত্রাঘাতে অসুস্থ হয়ে পড়লেও এ বাড়ির চাকর, এই সুকোর কিচ্ছুটি হয়নি কেন? তার উপরে মন্ত্রের প্রভাব খাটেনি কেন? ভেবেচো কখনও যে তোমাদের পরিবারের নামের ধারার সাথে নাম মিলিয়ে তোমার দেবতুল্য দাদা এর নাম সুকান্ত রেখেচে কেন? তোমার বৌঠান গৃহত্যাগী হয়েচিলেন কেন? ভেবেচো কখনও?”
অনন্তর সেই কেদারায় এইবার হেমন্ত সিংহ দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল। অনন্ত আর সুকো ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে চেয়ে রইল।
কালীপদ সেদিকে দৃকপাত না করে আবার বললে—“হেমন্তের চরিত্র নিয়ে আমার কিছু এসে যায় না, সেই নিয়ে কথা কইতেও আমার অভিরুচি নাই। কাজের কথা বলি শোনো, আমি অনেক ভেবে ঐ রাক্ষসের হাত থেকে সাময়িক রক্ষা পাবার একটা পথ বের করেচি। আগামীকাল থেকে এই পরিবারের প্রত্যেকে, এই সুকোও অবধি মুখে একখানা কাপড় বেঁধে রাখবে, ঠিক যেমন পঞ্চশরের মন্দিরের পূজার্থীরা করতো। মনের ভুলেও শয়নে স্বপনে একটাও বাক্য উচ্চারণ করবে না। এইভাবে একপ্রকার মূকের মতো হয়ে থাকাটা হয়তো ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক, কিন্তু বাঁচতে গেলে এইটাই একমাত্র পথ। কাল সকাল থেকে তোমরা এই আজ্ঞা পালন করবে। আমি মন্তর পড়ে মুখবন্ধ তৈরি করে দেব। আজকে সন্ধ্যা হয়ে পড়েছে, এখন আর সম্ভব নয়, কিন্তু কাল থেকে সিংহবাড়ির সকলে আর বিশেষ জরুরি দরকার ছাড়া একটাও শব্দ উচ্চারণ করবে না।”
হেমন্ত তখনও কাঁদচিলো। সে মাথা নাড়িয়ে কালীপদর বন্দোবস্তে সম্মতি জানিয়ে ধীরে ধীরে উঠে ঘরে চলে গেল। অনন্ত বিষণ্ণ মুখে বারান্দার প্রাচীরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে একটা ন্যায় অন্যায়, বাস্তব অবাস্তবের ঝড় চলচে তা আমি বেশ উপলব্ধি করলাম। আরও দেখলাম দুইতলা থেকে নীচে নামতে থাকা বৃদ্ধ বামুনের দৃষ্টিতে হেমন্তের কুকর্মের জন্য একরাশ ঘৃণা জমে রয়েচে। অনন্ত মনের রুদ্ধ বাষ্প দমন করে বলে উঠল— “ঠাকুর, যা হবার তা হয়েছে, যা ভবিতব্য তাও ঘটবে জানি, শুধু একটাই উত্তর চাই। এত শ্রমের বিনিময়ে যাঁকে এনে প্রতিষ্ঠা করেচি, যাঁর জন্য আমার পরিবারের মাথায় মরণের খাঁড়া ঝুলচে, সেই ভগবান পঞ্চশর আসলে কে? তিনি কামদেব তো বটে?”
নাহ অনন্ত। উনি কামদেব নন। আসল পঞ্চশর দেবতা বহু ক্ষেত্রে আরাধ্য হলেও রাজপুত পরিবারে তাঁর পূজার চল রয়েচে বলে কখনও শুনিনি, থাকলে রাজপুতেরা মোগলদের প্রতি বাহুবল দেখাতে পারতো কী? পঞ্চশর নামটা রতিপতি কামদেবেরই বটে, কিন্তু তুমি যাঁর বিগ্রহ বয়ে এনেচো, উনি তা নন। পিঠের পাঁচখানা বাণের কারণে হয়তো লোকেরা ঐ নামখানা দিয়েচিলো। পূজা করতে গেলে আরাধ্যের একটা নামের দরকার হয়।”
— “হাঁ, কিন্তু নাম দেবার কী আবশ্যকতা? তাঁর আসল নামেই তো ডাকা চলতো?”
— “তা চলতো, কিন্তু চলার জন্য তো নামটাও জানাটা দরকার। ওনার আসল নামটা, আসল স্বরূপটা সম্ভবত কেউই ধরতে পারেনি।”
অনন্ত হতবুদ্ধি হয়ে কইলো—“আপনি পেরেচেন?”
— “হয়তো পেরেচি অনন্ত। ওনার কাঁধের পৈতাই সে পরিচয় দিয়েচে।”
এবার অনন্ত আকুল ভাবে শুধালো— “কে মুখুজ্জেমশায়? কে উনি? কাকে বয়ে এনেচি আমি ঘরে?”
— “এখন সে কথা বলা সমীচীন নয় বাছা। এই দুটো দিন অন্ততঃ নয়।”
— “আপনাকে আপনার গুরুর দোহাই, তেত্রিশ দেবদেবীর দোহাই ঠাকুর, আমাকে আঁধারে রাখবেন না। এ কোনও অপদেবতা নয় তো? অন্য দিনে নয়, পায়ে পড়ি, আজই বলুন ঠাকুর।”
কালীপদ মাথাটা নীচু করে উত্তরে বললে— “উঁহু। পরশু।”
এই বলে হনহন করে ঘরে ঢুকে পড়ল। অনন্ত নিরাশার দোলাচল বুকে নিয়ে চলে গেল পরে আমি ঘরে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে বললুম— “ছেলেটা বড্ড শঙ্কায় রয়েচে দাদা। ওকে বললে কী ক্ষতি হতো?”
কালীপদ অন্য দিকে তাকিয়ে বললে—“হতভাগা এমন দিব্য করালে যে উত্তর না দিয়েও উপায় ছিল না।”
আমি ভারী আশ্চর্য হয়ে কইলাম—“সেকি! কখন উত্তর দিলে?” কালীপদর মুখে সামান্য হাসির রেখা দেখে আমি বিরক্ত হয়ে আবার কিছু বলতে যাব, এমন সময়ে কালীপদর ভরাট স্বর শুনলাম—“ডাক্তার, কোনও মূর্তি যদি কোনও মন্দিরে স্থাপিত হয়, তবে কখনও শুনেচো যে সেই মূর্তি নিজে হেঁটে হেঁটে মন্দিরে ঢোকে? কিন্তু গজপতির মন্দিরে এই বিগ্রহের বিরাট বিরাট চরণচিহ্ন ছিল। সেগুলি একমুখী, অর্থাৎ যে ঢুকেচে সে আর বেরোয়নি কখনও। ঐ মূর্তি আদৌ মূর্তি নয়, ওইটেই আসল শরীরের প্রস্তরীভূত রূপ। কালের প্রভাবে তাতে কিছু ক্ষয় ধরেচে কিন্তু লয় হয়নি। সে নিজের সমস্ত অস্ত্র শস্ত্র নিয়েই মন্দিরে এসেচিলো। হাতে অস্ত্র, দেহে যোদ্ধা অথচ কাঁধে উপবীত, মুখে ব্রহ্ম এবং ক্ষাত্রতেজের যুগপৎ বাঁধন। চিনতে পারলে? উনি নিজের শেষ জীবনটা মহেন্দ্রগিরি পাহাড়েই অতিবাহিত করেচিলেন।”
একটু থেমে, আমার হতবিহ্বল চোখের দিকে একবার তাকিয়ে কালীপদর কণ্ঠ ভেসে এল—“উনিই দ্রোণাচার্য আর মহাবীর কর্ণের অস্ত্রগুরু, সাক্ষাৎ শ্রীহরির খণ্ড অবতার পরশুরাম, যিনি একুশবার পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয় করেচেন। শেষ জীবনে নিজের উগ্র তেজ পরিত্যাগ করে একাকী সাধনায় জীবন অতিবাহন করে, শেষে হয়তো নিঃসঙ্গ হয়ে নিজের মহানির্বাণ নিজেই বেছে নিয়ে মহাসমাধিতে দেহত্যাগ করেন। সেই শরীর পাথুরে রূপ নিয়ে দাঁড়িয়েচিলো মহেনগিরির মন্দিরের গর্ভে।”
আমি কপালের রগ টিপে বসে পড়লাম।
*
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে রাত্তির পা রাখলো পৃথিবীর বুকে। আন্দাজ সাড়ে আটটা নাগাদ নীচের খাবার ঘর থেকে খাবারের হাঁক এল। সুকো অত্যন্ত আড়ষ্ট হয়েচিলো বিকেলের পর থেকেই, কালীপদ তাকে ডেকে স্নেহের বাক্য বলে স্বাভাবিক করে আনলো।
খাবার ঘরে ঢুকে সুকোর মুখে শুনতে পেলাম, ঝড়ু পূজারী আজ থেকে হেমন্তের সঙ্গে এক পঙক্তিতে আহার করতে অস্বীকার করেচে। হেমন্ত বিমর্ষ মুখে বসে রয়েচে। কালীপদ গিয়ে তার পাশে উপবেশন করতে হেমন্ত মুখ তুলে ক্লিষ্ট স্বরে কইলো—“আপনি তো বামুন। আমার সাথে এক সারিতে বসে আহার্য গ্রহণ করলে আপনার জাতি যাবে না ঠাকুর?”
কালীপদ শ্বাস ফেলে বললে—“আমার জাত এত ঠুনকো নয় সিংহমশায় যে ঠোকাঠুকি লাগলেই গুঁড়িয়ে যাবে। আপনার আচরণে আমার ক্রোধ হয়নি, হয়েচে আপনি কথা গোপন করেচেন বলে। আমি সিংহ বংশকে রক্ষা করতে লিপ্ত জেনেও আপনি সুকান্তের আসল পরিচয় আমাকে জানাননি। গোপনে, একান্তেও তো জানাতে পারতেন। এই মুহূর্তে ভেবে দেখুন, ঐ একটি ছাড়া আপনাদের রক্তের আর কে বংশের বাতি রইল? আমার গুরুর দেহে যে রক্ত বইতো, আপনার আর এর দেহেও তাই। তবে ঘৃণা কী? মানুষে মানুষে কি ঘৃণার সম্পর্ক হয়? আপনার এই আহাম্মুকির জন্য ছেলেটা মারা পড়তে পারতো, কারণ ওকে আমি রুদ্রাক্ষের শিকারের যোগ্য বলেই ধরিনি এই কদিন।”
সুকান্ত আমাদের ডেকে দিয়ে জড়োসড়ো হয়ে দুয়ারে দাঁড়িয়েচিলো, কালীপদ তাকে আদেশের সুরে পাশে খাওয়াতে বসালো। অনন্ত সুকোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল—“হতভাগা ছেলে, ওভাবে কেউ ঘাড় গুঁজে খাবার নাড়াচাড়া করে নাকি?”
সুকান্ত তার মেজোকর্তার বুকে মুখ লুকালো।
নৈশাহার প্রায় সমাধা হয়ে এসেচে। সিংহবাড়ির মেয়েমানুষেরা পরপুরুষের সুমুখে সচরাচর আসেন না। রাঁধুনি ঠাকুর একখানা ভিন্ন কাংস্যপাত্রে পূজারী বামুনের ভাত বেড়ে রাখচে, আমাদের খাওয়া সমাপ্ত হলে দ্বিতীয় পঙক্তিতে সে বাকি পরিজনদের সঙ্গে খেতে বসবে, আচমকা ঝড়ু পুরোহিতের একটা তীব্র চিৎকারে আমরা তো বটেই, চাকর বাকরের দল এমনকি সুমন্ত সিংহ আর তার স্ত্রী অবধি দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এল, এবং এসে যা চোখে পড়ল তার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না! পঞ্চশরের মন্দিরের ভিতর থেকে ঝড়ু চিৎকার করে চলেচে। মন্দিরের ঠিক দোরের সামনে একখানা বিরাট বড়ো সাপ কুলচক্র বিস্তার করে হিংস্রভাবে বৃদ্ধকে দংশন করতে চাইচে। বৃদ্ধ মন্দিরের ভিতরে থাকা কতকগুলি মোটা ঢাকের কাঠির মতো দন্ড হাতের সামনে পেয়ে তাই ছুঁড়ে ছুঁড়েই তাকে তাড়ানোর নিষ্ফল চেষ্টা করে চলেচে!
হেমন্ত হতভম্ব হয়ে আর্তনাদ করে উঠল— “এ কী! সাপ এল কোথা থেকে! কী সর্বনাশ!”
অনন্তও চিৎকার করে উঠল— “সর্বনাশ! এ যে বিষধর সাপ!”
হেমন্ত মুহূর্তে দৌড়ে নিজের দো নলা বন্দুক আনতে গেল। ঝড়ু কাঠি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সভয়ে কয়েক পা সরে গিয়ে কইলো—“অনন্ত, এই সাপ কখনও হঠাৎ করে উদয় হয়নি। কক্ষণও নয়। আমি এটাকে আগেও দেখেচি এ বাড়িতে। ঐ দুর্গাদালানের পাশের খড় ছাওয়া ঘরটায়, যেখানে গরু থাকে।” অনন্ত হতবাক হয়ে বললে—“কী সর্বনাশা কথা! যেখানে গোরু থাকে? অর্থাৎ গোহা…।”
অনন্তর মুখের বাক্য নিঃসৃত হবার অবকাশ পেলো না। তার কথা অর্ধোচ্চারিত থাকতেই কালীপদ বলিষ্ঠ হাতে তার মুখটা পিছন থেকে সবেগে চেপে ধরলো। পলকের মধ্যে গোটা এলাকাটা ধাঁধিয়ে দিয়ে একটা অপার্থিব আলোর জাল আমাদের চক্ষু অন্ধ করে ফেললো, আর সেই আলোর সমুদ্রের মধ্যে থেকে একটা আরও জ্বলজ্বলে আলোর রেখা দৌড়ে এসে অনন্ত আর কালীপদর চারদিক দিয়ে কয়েকবার চরকির ন্যায় ঘুরপাক খেয়ে, অনেকটা যেন দিকভ্রান্ত মৎস্যলোলুপ মাছরাঙা পক্ষীর ন্যায় শূন্য জলে ছোঁ মেরে, অজানা উদ্দেশ্যে ছিটকে বেরিয়ে গেল।
চারদিকের ধূমজাল নিবৃত হলে পর তাকিয়ে দেখলাম অনন্ত সিংহ আতঙ্কে শুষ্ক বাঁশপাতার মতো কাঁপচে, আর কালীপদ শূন্যে কার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাচ্চে। আমরা ছুটে এলাম অনন্তর পাশে। ঝড়েন্দ্র পুরোহিতের সামনের ঐ দংশনোদ্যত বিরাটাকার সাপটাও বুঝি আলোর সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়েছে। বৃদ্ধ বিস্মিত হয়ে ছুটে এসে কালীপদর হাতদুটো ধরে কইলো—“কী আশ্চর্য! তুমি যে অসাধ্য সাধন করলে বাছা!”
কালীপদ সামান্য হেসে, কোনও উত্তর না দিয়ে এগিয়ে গেল পঞ্চশর মন্দিরের দোরগোড়ায়। নীচু হয়ে মাটি থেকে পূজারীর নিক্ষেপ করা ঐ সাপ তাড়ানোর ছোট লাঠিগুলির মধ্যে একখানা তুলে নিয়ে বললে—“ডাক্তার, এই লাঠিগুলি কখনও দেখেচো আগে? সুকৌশলে এইগুলি কোনওভাবে মন্দিরের ভিতরে লুকিয়ে রাখা হয়েচিলো। দেখতে ঢাক বাজানোর মোটা কাঠির মতো দেখতে হলেও এইগুলি এককালে ভয়ঙ্কর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এগুলিকে পাবড়া বলে। ঠ্যাঙারে ডাকাতেরা এই লাঠি ছুঁড়ে পথিকের পা ভেঙে দিয়ে ডাকাতি করতো।”
বৃদ্ধ বামুন ভীষণ বিস্মিত হয়ে কইলো–“পাবড়ার নাম শুনেচি আমি। এই কি সেই ভয়ানক অস্ত্র? এই অপবিত্র খুনী হাতিয়ার মন্দিরে রাখলে কে?” কালীপদ এইবারও কোনও উত্তর দিল না। উত্তরের বদলে তার বলিষ্ঠ হাতের একটা প্রবল চপেটাঘাত সশব্দে গিয়ে পড়ল বামুনের গালে। বৃদ্ধ ছিটকে শান বাঁধানো মেঝেতে উপুড় হয়ে ছিটকে পড়ল, আর… আর যখন সে সামলে নিয়ে মুখ ঘোরালো, তখন তার এতদিনের নিরীহ মুখোশ খসে পড়েছে। তার চোখ হয়ে উঠেচে হিংস্র। কালীপদ তার দিকে চেয়ে ঘৃণাভরা কণ্ঠে বললে— “ব্রাহ্মণ জাতের কলঙ্ক তুই। পাষন্ড ধূর্ত জোচ্চোর তুই। রুদ্রাক্ষ কাপালিক তোকে নিজের চর হিসেবে এ বাড়িতে পাঠিয়েচিলো, তাই না? তুই তো গজপতির মন্দিরের পূজারী নোস। আমি কলকাতা হয়ে গজপতির থানায় খবর নিয়েচি, আসল পুরোহিতের মৃতদেহ তোরা চলে আসার তিনদিন পরে উদ্ধার হয় জঙ্গল থেকে। মহেনগিরির লোকেরা তাকে পূজারী বলে সনাক্ত করেছে।”
বৃদ্ধ চিৎকার করে কইলো—“সর্বৈব মিথ্যা কথা। আমিই পঞ্চশরের পূজারী। আমাকে বেহুঁশ করে মেরে ফেলতে নিয়ে যাচ্চিলো শয়তানগুলো।” কালীপদ শান্ত স্বরে বললে—“বৃদ্ধের গায়ে বারবার আঘাত করতে আমার রুচি হয় না। তোমার কথা অনুযায়ী যখন ঐ শয়তানেরা তোমাকে পিছন থেকে আঘাত করে অচেতন করে ফেললো এবং তুমি তাদের দেখতেই পেলে না, তখন কেমন করে সেদিন বললে যে ওরা চারজন ছিল? অনন্তরা তো তাদের সঠিক গুণতি জানতো না? আমি সেদিনই তোমার অসংলগ্ন কথাটা ধরে ফেলেচিলাম।”
ঝড়ু কথা বলতে বলতে হঠাৎ দৌড়ে মন্দিরে ঢুকেই দোর দিতে যাচ্চে, কালীপদর পদাঘাতে দোরের কপাট দড়াম শব্দে খুলে গেল। ঝড়ু উপায়ান্তর না দেখে শ্রান্ত হয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে দেবালয়ের মেঝেতে বসে পড়ল। কালীপদ আড়চক্ষে সেদিকে একবার তাকিয়ে মন্দিরের দোরে হাত ছুঁয়ে প্রণাম করে পদাঘাতের পাপ স্খালন করে নিয়ে বললে—“নিন হেমন্তবাবু, এই আপনার পরিবারের গৌণ হত্যাকারী। দিনের পর দিন আপনাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠে মেঘনাদের মতো আড়ালে থেকে আপনাদের নিকেশ করে গিয়েচে। যদিও আসল বুদ্ধিটুকু ঐ রুদ্রাক্ষের, কিন্তু পৃথিবীর মধ্যে যদি সবচাইতে বড়ো কিছু পাপ থেকে থাকে, তবে তা হলো বিশ্বাসভঙ্গ করা, মানুষের সরল আস্থা চৌচির করে দেওয়া। তাই নরঘাতী কাপালিকের চেয়ে এই রাক্ষস অনেক বেশি নরাধম।”
হেমন্ত দাঁতে দাঁত চেপে একবার ঘরের দাওয়ার দিকে তাকাতে কালীপদ কইলো— “না হেমন্ত বাবু, একে এক গুলীতে নিষ্কৃতি দেওয়া মূর্খামি হবে। এর ব্যবস্থা পরে করচি।”
হেমন্ত রুদ্ধশ্বাসে কোনওমতে শুধালো—“কিন্তু মুখুজ্জেমশায়, এই শয়তান বড়ো চতুর। এ কি নিজের মুখে নিজের সব পাপ কাজ স্বীকার করবে?’
“এর স্বীকারোক্তির মুখাপেক্ষী আমি নই। আমি কতক কতক ধরতে পেরেচি বোধহয়। শব্দভেদী বাণ বা বিদ্যে প্রয়োগ করার মূল শর্ত হল ঐ শক্তির আধার পাথরের ঘটগুলিতে নিজের শত্রুর কোনও একটা বা একাধিক শব্দকে বন্দি করা, এবং দ্বিতীয় শর্ত হল ঐ শব্দবন্দি শক্তিকে কোনও একটি অস্ত্রের মধ্যে প্রয়োগ করা। শব্দকে বন্দি করা কিছু আধুনিক পদ্ধতি নয় আদৌ। আমি আগেও বলেচি, বহুযুগ আগেও কিন্তু আবু হোসেনের সিমসিম গুহার দরজা তাঁর প্রভুর কণ্ঠস্বর দিয়েই উন্মুক্ত হতো।
এই হতভাগা বৃদ্ধ নানান কথার ছলে আপনাদের দিয়ে বিশেষ কিছু কথা বলিয়ে নিয়েচিলো, আর প্রতিবার ঐ কথাগুলি বলার পরেই শব্দবন্দি হয়ে গিয়ে পাথরের ঘটের ঢাকনি সশব্দে এঁটে গিয়েচে। ঐ শব্দকেই তোমরা লাঠি ঠোকার শব্দ ভেবে ভুল করেচো অনন্ত। প্রথমে জয়ন্ত যখন মন্দিরের এই জায়গাটায় একটা ছায়ামূর্তিকে দেখে চোর চোর বলে চেঁচিয়ে উঠেচিলো, তখনই প্রথম খটাস করে শব্দটা পাওয়া গিয়েচিলো। তখন তোমরা তার মুখে শুনে বুঝতেও পারোনি যে জয়ন্তর মৃত্যু বাক্য ঐ ঘটের ভিতরে বন্দি হয়ে গিয়েচে। চোরের ব্যাপারটা সবটাই সাজানো ধোঁকা মাত্র। পরে যখন ঝোপের কাছে ছায়ামূর্তিকে দেখে তোমরা চেঁচামেচি করচো আর হেমন্ত বন্দুক ছুঁড়ছে, তখন কিন্তু হেমন্তের বন্দুকের ভিতরে যে গুলীগুলো ভরা ছিল, কিম্বা অন্যান্য যেসব টোটা তার দেরাজে রাখা থাকতো সেগুলিতে এই শয়তান মন্তরের শক্তি মিশিয়ে রেখে দিয়েচিলো তোমাদের অলক্ষ্যে। গুলী ছোঁড়ার সময়ে তোমরা অনেক লোক বারান্দায় ছিলে, কিন্তু এই পাষন্ড সরাসরি জয়ন্তকে লক্ষ্য করেই বললে — ‘কী হয়েচে জয়ন্ত?’
উত্তরে জয়ন্ত যাঁহাতক ‘চোর” শব্দটা উচ্চারণ করেচে, সঙ্গে সঙ্গে শব্দভেদী শক্তিতে বলীয়ান ঐ গুলী দিক পরিবর্তন করে সরাসরি জয়ন্তর কণ্ঠ বিদ্ধ করেচে। আমি প্রথম থেকেই খটকায় ছিলুম যে সবকয়টি আক্রমণের লক্ষ্য শিকারের কণ্ঠনালীতেই কেন হয়? কী হে ভন্ড পূজারী, সঠিক বলচি তো? ভুল হলে শুধরে দিও।”
উত্তরে বৃদ্ধ কটমট করে চাইলো। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে কালীপদ বলে চলল—“এই ভয়ঙ্কর শব্দভেদী বিদ্যে হয়তো একমাত্র কোনও অস্ত্রের মধ্যেই কার্যকর হয়, তাই সাধারণ জিনিসপত্তরের বদলে এক-একবার এক-একটা অস্ত্রকেই ঐ মারণশক্তি দ্বারা নিষিক্ত করেচে ঝড়েন্দ্র পুরোহিত। দ্বিতীয় বারের কথা বলি। আপনার কন্যা নারায়ণী অভাবী বটে, কিন্তু সে ভগবতীর গহনা চুরি করেনি। করেচে এই দানবটা, আর সেগুলি পুঁটুলি করে লুকিয়ে রেখেচে নারায়ণীর খাটের তলে।”
হেমন্ত অস্ফুট স্বরে ভাঙা গলায় শুধালো—“আমার নারায়ণী চুরি করেনি ঠাকুর? আমার বুক থেকে পাথর নামলো আজ। কিন্তু এই বুড়া চুরি করেচিলো কেন?”
–“করেচে, তার কারণ নারায়ণীর নামটুকু নিয়ে একটা আলোড়ন দরকার ছিল তার। দেবেন্দ্রকে দিয়ে আলোচনা করার নাম করে নারায়ণীর নামটুকু শব্দবন্ধ করিয়ে নেয় ঝড়ু। এরপর যখন আপনি পরপর সাতবার কামান দাগচেন, এবং ভিতরে দুর্গাদেবীর পুষ্পাঞ্জলি চলচে, তখনই দেবেন্দ্রর কণ্ঠনালী ছিন্ন হয় কামানের শব্দসন্ধানী গোলায়, কারণ দুর্গাপূজার অঞ্জলিতে বহুবার বহুরকমে ঐ নারায়ণী শব্দটা উচ্চারণ করতে হয় আমাদের। বাপের হাতে বধ হল ছেলে।”
ঝড়ুর দিকে তাকিয়ে হেমন্তর চোখে আগুনের ফুলকি ঠিকরে বেরুতে লাগলো।
— “তৃতীয় ক্ষেত্রেও তাই। কৃতান্ত সিংহ যখন রোজকার মতো কালীমন্দিরের দ্বার উন্মোচিত করার সময় ‘জয় মা’ বলেচে, তখনই তো ওই খটাস করে শব্দটা শুনেচিলো, তাইতো? পাশের মন্দির থেকে ঘাপটি মেরে ঐ শব্দটা বন্দি করেচে এই হতভাগা। পরে যখন ছাগবলি দেবার সময়ে কৃতান্ত খাঁড়া উদ্যত করে ঐ একই কথাটা বলেচে, তখনই মন্তরে আবিষ্ট ঐ খাঁড়া এক কোপে তার ধারকের মুন্ড ছিন্ন করেচে।
এই আজকে ছিল চতুর্থ আক্রমণের দিন। তোমাকে সেদিন দুষ্ট গরুর প্রবাদ বাক্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে তোমারই মুখ থেকে গোহালের কথা টেনে আনে বৃদ্ধ। আজ যখন তোমাকে ঐ সাপের ভড়ং দেখিয়ে গোহালের কথা বলাতে চাইচিলো, তখন ওর ছুঁড়তে থাকা পাবড়ার মধ্যে যে কোনও একটি আচমকা মরণের দূত হয়ে তোমার কণ্ঠ লক্ষ্য করে ছুটে এসেচিলো, কিন্তু শব্দটা অর্ধপথেই থেমে যাওয়াতে সে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
যেহেতু পাঁচখানি শক্তির মধ্যে একখানা ঝড়ু হস্তগত করতে পারেনি, সেহেতু আজকের এই চতুর্থ বাণটিই ছিল ওর অন্তিম আঘাত। পঞ্চমটি অনন্তর হাতে রয়েচে ঐ যে। এরপর বাকিদের হয়তো আবার কোনও নূতন উপায়ে হত্যা করতো রুদ্রাক্ষ। তোমাদের বংশের এই শাখার সবকয়টি পুরুষকে হত্যা করতে পারলেই…” কালীপদ আরও কিছু কথা বলতে যাচ্চিলো, আচমকা এমন একটা ভীষণ বিপর্যয় ঘটে গেল যার ফলে কালীপদর হাতে আসা পাশাখেলার জেতা বাজি তার হাতের থেকে সম্পূর্ণরূপে ছিটকে বেরিয়ে গেল।
বৃদ্ধ পুরোহিত এতক্ষণ যেভাবে নতমস্তকে বসেচিলো, তাতে অনন্ত একবারও আঁচ করতে পারেনি যে সে একটা মরণ কামড়ের অপেক্ষায় বসে রয়েছে ওৎ পেতে, আর সেই অসতর্কতাই কাল হয়ে দাঁড়াল। কালীপদর অলক্ষ্যে বৃদ্ধ এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে বলিষ্ঠ আঘাতে অনন্তকে ধরাশায়ী করে তার হাতের থেকে ছিনিয়ে নিল ঐ পঞ্চম মহাশক্তির আধার পাথরের ঘটিটা, আর কালীপদ বিস্ময় কাটিয়ে তার দিকে ধেয়ে আসা মাত্র পাষণ্ড বৃদ্ধ এক আছাড়ে মন্দিরের মেঝেতে চৌচির করে ফেললো ঐ সুপ্রাচীন আধার।
মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল একরকম অদ্ভুত দর্শন তরলের মতো দ্রব্য। তার রঙ অনেকটা নীলচে হরিৎ বর্ণ, তার গা থেকে আলো ফুটে বেরুচ্চে, ধুঁয়া নির্গত হচ্চে। বুড়া প্রবল আত্মতৃপ্তিতে হিংস্রভাবে হেসে উঠল। কালীপদ ক্ষোভে, হতাশায় সেই দুর্মূল্য আরকের দিকে করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে, চারদিকে একবার অসহায় নজরপাত করে, যাতে এই মহাশক্তি একেবারে বিফলে নষ্ট না হয়, তাই বিগ্রহের হাতের গুরুভার ধ্বজাটাকে নামিয়ে এনে রাখলো আরকটুকুর উপরে। পাথরের ধ্বজদন্ড শুষে নিল তরলটুকু, আর তখনই মন্দিরের বাইরে একটা আকাশ কাঁপানো নিনাদ শুনে সকলে পিছনে ঘুরে দেখলো সিংহবাড়ির চাতালে আবির্ভূত হয়েচে এক ভয়ঙ্কর মূর্তির। তার পরণে রক্তাম্বর, কণ্ঠে অজস্র রুদ্রাক্ষ, হাতে একখানা ক্ষুরধার ত্রিশূল আর দুই চোখে মৃত্যুর আমন্ত্রণ! অনন্ত আর হেমন্ত কম্পিত কণ্ঠে ফিসফিস করে বললে- “রুদ্রাক্ষ!”
কালীপদ মনে মনে প্রমাদ গুণে গুরুদেবকে স্মরণ করল।
*
হেমন্ত সিংহ একপলক ঐ বিভীষণ মূর্তির দিকে চেয়ে দেউড়ির দিকে রাখা দো নলা বন্দুকের দিকে দৌড়াতে যাচ্চিলো, রুদ্রাক্ষ কাপালিক সেদিকে তাকিয়ে নিজের হাত তুললো। হেমন্ত দশ হাত ভূমি থেকে উঠে গিয়ে সশব্দে মাটিতে আছড়ে পড়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। রুদ্রাক্ষ ভারী পদক্ষেপ ফেলে এগিয়ে এল পঞ্চশরের মন্দিরের একেবারে সামনে। কালীপদ অতি কষ্টে পাথুরে ধ্বজার দন্ডটি হাতে তুলে রুখে দাঁড়ালো মন্দিরের দুয়ার। কাপালিক সেদিকে তাকিয়ে অট্টহাসি হেসে উঠল। তার হাসি সাধারণ মানুষের হাসি নয়! সে হাসি কানে শুনলে হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে আসে, সে হাসি যেন সাপের ছোবলের চাইতেও বিষধর, বজ্রপাতের চাইতেও জ্বালাময় আর শৃগাল কুক্কুরের সম্মিলিত করুণ কান্নার চেয়েও বহুগুণ অশুভ।
কাপালিক হাস্য সংবরণ করে বক্রোক্তির কণ্ঠে কইলো—“তুই সামান্য একজন মানুষ হয়ে, খুদকুঁড়ো কয়েকখানা মন্তর রপ্ত করে ভেবেচিলি অঘোরীর মোকাবেলা করতে পারবি?”
কালীগুণীন শিউরে উঠল। এ তবে সাধারণ তান্ত্রিক বা কাপালিক নয়! পিশাচ বিদ্যায় সিদ্ধ একজন পরিপূর্ণ অঘোরী এই শয়তান? তার গুরুদেবও অঘোরী ছিলেন, কিন্তু কী অসম্ভব প্রভেদ দুইজনায়! তার অর্জিত সারা জীবনের বিদ্যে দিয়েও একজন অঘোরীকে পরাস্ত করা অসম্ভব। রুদ্রাক্ষ আবার বললে—“তোর চাতুর্য্য দেখে আমি অবাক হয়েচি। ঠিক ঠিক আমার পদক্ষেপগুলোই অবিকল ধরে ফেলেচিস তুই। ভেবেচিলাম এই শয়তানের ঝাড়গুলোকে ছাড়া আর কারুকে বধ করতে হবে না, কিন্তু তোকে তো জীবিত ছাড়া চলে না। তোকে মরতে হবে।”
শয়তানটা দুই পা এগিয়ে সামনে আসা মাত্র কালীপদ হাতের পাথরের নিশানটা কষ্ট করে তুলে আঘাত করল তাকে। আমরা হতবাক হয়ে দেখলাম, কর্পূর যেমন বাতাসে উদ্বায়ী হয়ে উবে যায়, রুদ্রাক্ষ সেইরূপে বাতাসে মিলিয়ে গেল। কালীপদর হাতের নিশানদন্ডে ঐ মহাশক্তি মিশে থাকা সত্ত্বেও একটা অতি সাধারণ লাঠির মতোই সেখানা মাটিতে আছড়ে পড়ল। হঠাৎ কালীপদর পিঠে যেন অদৃশ্য একখানা অস্ত্রের আঘাত এসে পড়ল, তার আঘাতে কালী ছিটকে পড়ে গেল চাতালে। তার পিঠে তিনখানা আঘাতের দাগ। চোখে দেখা না গেলেও হাড়ে হাড়ে টের পেলাম যে নরহস্তা পিশাচটা তার হাতের শূল দ্বারা শত্রুকে আঘাত করেচে। পূর্ণ আঘাত নয়, বরং তিলে তিলে শত্রুকে পিঞ্জরাবদ্ধ মূষিকের ন্যায় খুঁচিয়ে মারতে চায় সেই রক্তলোলুপ।
কালীপদ অসহায়ের ন্যায় উঠে দাঁড়িয়ে শূন্য বাতাসে এদিক ওদিক অনুমানের উপরেই হাতের দন্ডটা ঘোরাতে থাকলো সজোরে, কিন্তু সে আঘাত বারংবার বিফল হয়ে যেন আমাদেরই বিদ্রূপ করতে থাকলো নিঃশব্দে। আবার কাঁধের কাছে একটা শূলের আঘাত নামলো। আমি হতচকিত হয়ে তার দিকে দৌড়াতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম কালীপদ ব্যতীত আমাদের সকলের চতুঃষ্পার্শ্বে কে যেন একটা অদেখা গন্ডী কেটে দিয়েচে। তাকে লঙ্ঘন করে এক পা-ও এগোনো চলে না। পরপর কয়েকবার শূলাঘাতে নিঃশক্তি হয়ে কালীপদ হাতের নিশানদণ্ডে কোনওমতে ভর করে মন্দিরের থামে পিঠ রেখে দাঁড়ালো। তার শুভ্র পোষাকে অজস্র রক্তের ধারা, তার চক্ষু জলে ভেসে যাচ্চে। শত্রুকে একেবারে কর্মক্ষমতা হীন লক্ষ্য করে অনেকখানি দূরের কোনও অদেখা স্থান হতে অদৃশ্য রুদ্রাক্ষর কণ্ঠ ভেসে এল—“তোর চাতুর্য্য অধিক বটে, কিন্তু বিপৎকালে সে বুদ্ধি তোর কাজে আসেনি। এই মহাবাণের প্রয়োগের মূল দুইখানি শর্তই লঙ্ঘন করেচিস তুই। প্রথমতঃ এই শক্তি একমাত্র কোনও প্রচলিত অস্ত্রশস্ত্র ব্যাতিরেকে অপরাপর কোনও কিছুতেই প্রয়োগ করা যায় না, আর দ্বিতীয়, এই বাণের নিক্ষেপের পূর্বে শত্রুর কণ্ঠস্বর তাকে চিনিয়ে দিতে হয়। আমার পাঠানো এই বিশ্বস্ত বৃদ্ধ পাথরের ঘটিটা ভগ্ন করে সেই প্রক্রিয়ার পথ চিরতরে বন্ধ করেচে, ফলে তোর হাতের এই দন্ড আমার কিছুমাত্র হানি করতে পারচে না। সম্ভবও নয়। এইবার তোর মরণের পালা।”
কালীপদ শেষ শক্তিটুকু সঞ্চিত করে দন্ডখানা বাগিয়ে ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কয়েক পা এগিয়ে এসে ভাঙা স্বরে বলে উঠল—“শোন রে নরাধম পাষণ্ড, আমি আমার শরীরের শেষ রক্তবিন্দু থাকা অবধি তোর কাছে মাথা নত করব না। আমার হেরে যাওয়ার অর্থ আমার গুরুর নামে, আমার ভবাণীর নামে কালি দেওয়া। তোকে কীভাবে, কেমন করে হারাব তা আমি জানিনে, কিন্তু আমি মা ভবাণীর নামে শপথ করচি, আমার দেহে জীবন থাকতে তোকে জিততে দেব না। অঘোরী হলেও তোর মতো নরপশুর কোনও সৎ ইষ্টদেবতা না থাকাই সম্ভব, যদি থেকে থাকে তবে তার স্মরণ নে। আমিও আমার ইষ্টের স্মরণ নিচ্চি। দেখি কার জিৎ হয়।”
ক্রুদ্ধ এবং অদৃশ্য রুদ্রাক্ষের প্রচণ্ড তেজে চারপাশে যেন একটা ঝড় উঠল, আর সেই আন্দোলিত বাতাসের স্রোতের ভিতর থেকে শোনা গেল হিংস্র কণ্ঠস্বর—“তোকে এখনই বধ করে আমি প্রমাণ করচি কার ইষ্টের জোর অধিক।” এই বলেই রুদ্রাক্ষের সামান্য বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ার শব্দের পরেই তার কান ফাটানো চিৎকার শোনা গেল— “জয় ভদ্রকালী।”
রুদ্রাক্ষের কণ্ঠে তার ইষ্টের নাম উচ্চারণ মাত্র কালীপদ হাতের দন্ডটা নিতান্তই লক্ষ্যহীন ভাবে ছুঁড়ে দিল সামনের দিকে, কিন্তু….
কিন্তু পাথরের দন্ড প্রমাণ করল যে সে একবিন্দুও লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার বস্তু নয়! গোটা চাতালটা একটা চোখ অন্ধ করা আলোয় ধাঁধিয়ে গেল, একটা আলোর রেখা চকিতে ছুটে বেরিয়ে গেল কালীমন্দিরের দিকে, এবং আলো কমলে পর আমরা সবিস্ময়ে দেখলাম, মন্দিরের সোপানের উপরে ছড়িয়ে পড়ে রয়েচে রুদ্রাক্ষ কাপালিক।
ভুল বললাম। রুদ্রাক্ষ নয়, পড়ে রয়েচে তার ধড়টুকু, আর বিচ্ছিন্ন হিংস্র মুণ্ডটা ছিটকে গিয়ে পড়েচে ভবাণীর বিগ্রহের পায়ের কাছে, যে চরণতলে সকল অসুরের মুণ্ড হেলায় স্থান পায়। কালীপদ মাটিতে বসে পড়ল। অনন্ত দৌড়ে এসে তার মাথা কোলে তুলে নিয়ে পাগলের মতো বলে উঠল— “কিন্তু ঠাকুর! এ যে অসম্ভব! ঐ শয়তানের কণ্ঠস্বর কীভাবে আপনি…”
— “হাঁ অনন্ত, তার কণ্ঠস্বরও ভগবতীর কৃপায় বন্দি ছিল ঐ পঞ্চম বাণে। যেদিন তুমি বিনোদবিহারীর সঙ্গে ঐ পাথরের ঘটিটা খুলেচিলে, তখনই ঐ রাক্ষসটা এসে উপস্থিত হয়েচিলো তোমার দুয়ারে আর তার উচ্চারিত ইষ্টনামের হুঙ্কার শোনার পরেই ঘটির ঢাকনি সশব্দে বন্ধ হয়ে গিয়েচিলো। মনে পড়ে? অত্যাচারী যতই বলশালী হোক, নিয়তি তার জীবনরেখায় ঠিক একখানা ফাটল রেখে দেয়, এ আমি বরাবর দেখেচি বাছা।”
অনন্ত কেঁদে উঠে বললে — “হাঁ ঠাকুর, পড়ে। কিন্তু এই সামান্য পাথরের নিশানদন্ডে অস্ত্রের গুণ কেমন করে এল? এইটে তো ঠিক অস্ত্রের মধ্যে পড়ে না!”
কালীপদ ম্লান হেসে কইলো—“গুণ আসবে কী বলচো অনন্ত, বহু অস্ত্রের সেরা অস্ত্র হলো ঐ দন্ড। ওখানা কোনও ধ্বজা বা নিশান হয় বাছা। বহু যুগের আস্তরণ জমে জমে অমন নিশানের মতো দেখতে হলেও, ঐটে কী জানো?”
— “কী ঠাকুর?”
–“ঐটেই হল স্বয়ং বিষ্ণু অবতার পরশুরামের বিশ্ববিজয়ী কুঠার বা পরশু। ঐ দিয়েই একুশবার পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয় করেচেন তিনি, ঐ দিয়েই সমস্তপঞ্চক হ্রদকে রক্তে ভরেচেন তিনি। দন্ডের একদিকে নিশানের মতো দেখতে যেটুকু আমরা দেখেচি, ঐটেই হলো তাঁর সর্বনাশা কুঠারের ফলাটুকু। ভবাণীর কৃপা ছাড়া এতগুলি সমাপতন সম্ভব নয় অনন্ত। তাঁর বিগ্রহকে আবার গজপতিতেই স্থাপন করার বন্দোবস্ত করো।”
কথার ব্যস্ততার অবসরে একটি মানুষও বৃদ্ধ পূজারীর পানে লক্ষ্য করেনি। সে খুব নিঃসাড়ে একটু একটু তফাৎ যেতে যেতে আচমকা ঘুরে দৌড় দিল সদর ফটকের দিকে। উপস্থিত সকলে হায় হায় করে উঠে তার পিছু পিছু দৌড়াতে যাবে, হঠাৎ সদরের দিক থেকে তীক্ষ্ণ, হিংস্র নারীকণ্ঠে ‘জয় মা’ শব্দের সঙ্গে সঙ্গে পুরোহিতের একটা ক্ষীণ আর্তনাদ পাওয়া গেল। সকলে ছুটে গিয়ে দেখলে, মাটিতে বিশ্বাসঘাতক পুরোহিতের ছিন্ন মস্তক আর দেহ পড়ে রয়েচে। পাশে পড়ে আছে সিংহবাড়ির বলির খাঁড়াটা, যে খাঁড়ায় কৃতান্তর বধ হয়েচিলো। একটা শ্বেতশুভ্র বসন পরিহিতা নারীমূর্তি সাঁৎ করে বাঁ দিকের খিড়কির দোরের দিকে মিলিয়ে গেল। হেমন্ত সেদিকে একবার চেয়ে কিছুক্ষণ দোটানায় পড়ে, তারপর দুইতলায় দাঁড়িয়ে থাকা সুমন্ত সিংহের স্ত্রীর দিকে চেয়ে সন্দেহের সুরে কইলো—“মা, একটিবার দেখো তো সেজো বৌমা কোথা?”
সুমন্তর স্ত্রী একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ভিতরে কৃতান্তর কক্ষের পালঙ্কে সদ্য এসে বসা রক্তমাখা থান পরিহিত শশীমুখীর দিকে চেয়ে অম্লান স্বরে ঘোমটাটা টেনে বললে— “তার শরীরটে খারাপ বটঠাকুর। সে ঘরে ঘুমুচ্চে।”
কালীপদ দূর থেকে একবার আমার চোখের পানে চেয়ে মৃদু হাসলো।
*
মুখুজ্জেমশায়কে নিয়ে আমি রায়দীঘড়ার বদলে কলকাতায় আমার বাসাতেই তুললাম। রায়দীঘড়ায় বড়ো মুখুজ্জেমশায়কে ‘তার’ করে কানাইকে দিয়ে বৌঠানকে আনিয়েচি। পুরোপুরি ক্ষত নিরাময় না হওয়া অবধি এখন কয়েকটা দিন একটু আমার চিকিৎসায় থাকাই ভালো।
মন্দাকিনী নিভৃতে কালীপদর পাশে পালঙ্কে তার হাতখানা ধরে বসেচিলো। কালীপদ একটা শ্বাস ফেলে বললে— “বুঝলে মন্দা, যখন ঐ রাক্ষস আমাকে শূলের এক-একখানা আঘাত করে চলেচিলো, তখন প্রতিটা আঘাতের সঙ্গে আমার চোখে তোমার মুখটাই ভেসে উঠচিলো। মনে হচ্চিলো, আরও একবার যেন জীবন্ত অবস্থায় তোমায় দেখতে পাই।”
মন্দাকিনীর গাল বেয়ে কয়েক বিন্দু তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে হাতটা ধরে বললে— “বলতে হবে না। তা আমি বেশ জানি, খুব জানি।”
কালীপদ একটু হেসে কইলো— “কী প্রকারে জানা গেল? আমি তো কখনও বলিনি।”
মন্দাকিনী অশ্রু বাঁধ মানলো না। আমি দোরের সামনে এসে দাঁড়িয়েচি, তা লক্ষ্য না করেই সে কেঁদে উঠে স্বামীর বুকে মাথা রেখে বলল—“আমি শুনতে পাচ্চি যে।”
আমি স্মিত হেসে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। আমি ডাক্তার। আমাকে নিত্য হৃদপিণ্ড নিয়ে কাজ করতে হয়, কিন্তু হৃদযন্ত্রের ধুকপুকানির শব্দ ছাড়াও যে তার ভিতরে আরও সহস্র সহস্র শব্দ বন্দি হয়ে রয়েচে, তা আমাদের চিকিৎসা শাস্ত্রে শেখায় না। সেই শব্দ নিজের জোরেই দুইখানি মানুষকে সবেগে বেঁধে রাখতে সক্ষম। প্রকৃতির সমস্ত শব্দবন্দির খেলা কিন্তু মন্দ উদ্দেশ্যে হয় না।
