কালীগুণীন এবং পিশাচের নখ
পায়ের কাছে ফটিক নদীর জল ছলাৎ ছলাৎ করে আছড়ে পড়ছে। বেলা অনেকখানি গড়িয়ে গেলেও সূর্যের মুখ আজ সকাল থেকেই আঁধার। আকাশে ঘন কালো মেঘ আর শীতল শিরশিরে বাতাস বইচে। ওপারের স্থলভাগটুকু ঘন কুয়াশার মধ্য দিয়ে হঠাৎ হঠাৎ একপলক সাদা ধুঁয়ার মতো চোখে পড়চো আশপাশে দু’চারটে ছোট ছোট মেটে বাখারির দোকান। একটা বাঁশের বেঞ্চিতে কয়েকজন মাঝি বসে পা দোলাচ্চে। একজন বলিষ্ঠ মাঝি এগিয়ে এসে শুধালো— “বাবুরা যাবেন ক’নে? পানসি লিবেন?”
বাসুদেব কবিরাজ এতক্ষণ আমাদের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল, এখন সামনে এসে কথা কইলো—“আমরা একজনের খোঁজ করতে এসেচি বাবাসকল। সে যে ঠিক কোনখানে রয়েচে তা জানিনে, তবে এদিগড়ে কোনও একটা নাকি দ্বীপ রয়েচে শুনেচি। সেইখানেই সে রয়েচে এ একেবারে নিশ্চিত। সেই দ্বীপেই যাবো আমরা।”
বাকি মাঝিরাও এতক্ষণ আলগোছে আমাদের কথা শুনচিলো, এইবার তারা মৃদু হেসে বললে— “একটা দ্বীপ কি বলছেন কর্তা, পুরা তল্লাটটাই গো হাজারখানা দ্বীপ রয়েচে। মানের দ্বীপ, বকের দ্বীপ, খাগড়া দ্বীপ, হুলোর দ্বীপ, নাম না কইলে কেমন করে বুঝি?”
বাসু কবরেজ তড়িঘড়ি পিরাণের জেব থেকে একখানা ভাঁজ করা কাগজ খুলে ধরে বললে— “এই যে, এই ছবিটুকু রয়েচে আমার কাছে। এ থেকে কি তোমরা…”।
কাগজে একটা ছবি আঁকা রয়েচে। চারদিকে জলবেষ্টিত একটা বাটির মতো উচ্চ স্থান, তার এক কোণায় বিরাট একখানা পাথরের লম্বাটে প্রাসাদের মতো ছবি, তার দরজা জানালা কিছু নাই। যে মাঝিটি এতক্ষণ কথা কইচিলো, সে কাগজখানা হাতে নিয়ে একবার ঘাড় কাত করে ছবিখানা দেখলো, তারপরেই বিদ্যুৎপৃষ্ট হবার মতো কাগজটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আতঙ্কে কয়েক পা পিছিয়ে এল। তার কিছু পূর্বের সেই শান্ত মূর্তি পরিবর্তিত হয়ে উঠেচে। বাকি মাঝিরা, মায় দোকানীরা অবধি বেরিয়ে এসে উৎসুক হয়ে চিৎকার করলে– “কি হটে ওঠি? গাঙ নু উঠিকি আসলো কেনি হো?”
মাঝি কাঁপা গলা সংযত করে কইলো—“মানচেচ্চা! তানে নাও খুঁজেটে মানচেচ্চা যাবো বলিকি।”
বাকি লোকগুলো ভীষণ বিব্রত হয়ে লম্বা পা ফেলে চলে গেল এদিক ওদিক, দোকানীরা গতিক বুঝে দোকানের চাঁচারির ঝাঁপ ফেলে দিলে। চোখের পলকে জায়গাটা জনশূন্য হয়ে গেল। আমরা যখন সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে নিজেদের মধ্যে চাওয়া-চাওয়ি করচি, তখন চোখে পড়ল একজন বৃদ্ধ মাঝি তখনও দাঁড়িয়ে রয়েচে ফটিক নদীর পাড়ে। তার বয়স তার শরীর দেখলেই আঁচ করা যায়। ধবধবে শ্বেতবর্ণ কেশ, মুখের চামড়া ঝুলে পড়েছে, সাদা ভ্রু যুগল আর চক্ষুজোড়া সংসারের সকল রিপু থেকে নিস্পন্দ, নির্লিপ্ত। বৃদ্ধের নাম মন্দা। মন্দা পাটনী। মন্দা খুব ধীর অথচ বলিষ্ঠ পায়ে আমাদের সুমুখে এগিয়ে এসে মুখ খুলল- “আমার নাম মন্দা মাঝি। তোমরা মানচেচ্চা টাপুতে কেন যেতে চাইচো বাবু? ওদিক পানে কোনও জীয়ন্ত মনিষ্যি পা রাখে না। আমিও রাখব না। আমি তোমাদের শেষ গাঁ চড়ুইপোড়া অব্দি ছেড়ে দেব। সেইখেন থেকে নৌকা নিয়ে যেতে হয় মানচেচ্চায়। কেউ যাবে না যদিও, তবে টাকাকড়ি থাকলে নৌকা কিনে নিয়ে নিজেরা যেতে পারো। বাকি ঈশ্বরের ইচ্ছা। গাঁয়ের শেষ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে দরিয়ার পানে চেয়ে থাকলে খুব আবছা, অস্পষ্টভাবে ধুঁয়ার মতো সেই দ্বীপ ঠাহর হবে।”
কালীপদ মুখুজ্জে মাঝির নামটা শুনে একবার ভ্রু তুলে চাইলো। এর কারণ আমার জানা। মুখুজ্জেমশায় বৌঠানকে একান্তে এই নামে সম্বোধন করে থাকে। এতক্ষণ অবধি কালীপদ একটাও কথা কয়নি, এইবার ধীরে ধীরে শুধালো—”বাদাবনের দ্বীপ, গাঁ থেকে কিছু হাতিয়ার কিনে নিয়ে যাওয়া ভালো।”
মন্দা পাটনী মুখুজ্জেমশায়কে কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করে বললে— “হাতিয়ারের দরকার পড়বে না কর্তা। ওখানে বড়মিঞা বা অন্য পশু ভয়ে পা রাখে না। আর…”
— “আর?”
–“আর যারা থাকে, তাদেরকে অস্ত্র দিয়ে মারা চলে না।”
কালীপদ একটু মৌন থেকে কইলো—“এত ভয়াবহ যে স্থান, যার নাম শুনলে অবধি লোকজন দৌড়ে পালায়, সেইখানে তুমি যেতে রাজি হলে কীসের জন্য পাটনী?”
মন্দা একচিলতে বিষণ্ণ হাসি হেসে কালীপদর কথার প্রত্যুত্তরে বলল—“আপনি যে সাহসে ঐ মরণের দুয়ারে পা রাখতে রাজি হয়েচেন, আমিও সেটুকু জোরেই রাজি। তবে আমি তো আর মানচেচ্চায় পা রাখচি নে। চড়ুইপোড়া অবধি….”
মুখুজ্জেমশায় ভীষণ অবাক হয়ে মন্দার চোখের পানে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললে—“তাই তো! এতক্ষণ লক্ষ্য করিনি আমি। তুমিও একজন গুণীন বটে। দীক্ষা কার বরাবর, অঘোরী না কাপালিক?”
মন্দা নিজের কণ্ঠায় হাত ছুঁয়ে কইলো— “না। ভৈরব। নাম তাঁর সদা পাগলা। আমি গৃহী গুণীন। পানকৌড়ির জঙ্গলে যেথায়…”
কালীপদ সসম্ভ্রমে বললে— “আমিও গৃহী। আমি বিলক্ষণ নাম শুনেচি সদানন্দ পাগলার। কি আশ্চর্য, তুমি তাঁর শিষ্য?”
–“আজ্ঞা।”
আমরা নৌকায় উঠলাম। তীব্র কুয়াশায় নৌযানের সওয়ারী হলে মনে এক বিচিত্র বিষাদ উপস্থিত হয়। মনে হয় পাতালের কোন অচিন নদী দিয়ে অনন্তকাল ধরে যেন ভেসেই চলেচি। চারপাশে চলমান, দৃশ্যমান কিছু অবলম্বন না থাকলে সময়ের হিসাবও যেন থমকে যায়। একরাশ গরল বাষ্পের মধ্যে দিয়ে যেন অদেখা নিয়তির পানে এগিয়েই চলেচি। অবশেষে কতক্ষণ কেটেচে খেয়াল নাই, আমরা চড়ুইপোড়া গাঁয়ের বাঁওড়ে এসে ঠেকলাম। দেখলাম নদীর কাছেই মন্দা মাঝির কুঁড়েঘর। মন্দা সেই ঘরে ঢোকার পূর্বে একবার পিছন ঘুরে মুখুজ্জেমশায়কে শুধালে— “ঠাকুর, মানচেচ্চা মানে জানেন? আপনাদের ভাষায় যারে কয় শয়তানের দ্বীপ। আমার দীক্ষাদাতা একবার পা রেখেচিলেন এই গাঁয়ে। তিনি হাজার রকম আঁকিবুকি কেটে, ঐ অভিশপ্ত দ্বীপের দিকে কিছুকাল নির্নিমেষ চেয়ে থেকে কয়েচিলেন— ‘হ্যারে হতভাগা, এ তোদের কেমন গাঁ? গোটা তল্লাটে মড়া পোড়ার গন্ধ উড়ে বেড়াচ্চে, রোদের তেজ এত কম, মাটিতে মশানের গন্ধ, এসব তো ভালো কথা নয় মোটে’।
তারপর গুরুদেব সাগরের ওপারের আবছায়ার দিকে তাকিয়ে কইলেন— ‘কী ভয়ানক! এ কি! ঐ দ্বীপে যে রাশি রাশি শয়তানের দল লুকিয়ে রয়েছে। বড় ভয়ঙ্কর শয়তান তারা। সাক্ষাৎ কাঁচাখেগো অপদেবতা। কক্ষণও মনের ভুলেও ওদিকপানে পা রাখিসনে কেউ।”
মন্দা একটু থেমে বলল—“আমার ব্যাটা সুশীল আজ এক বচ্ছর আগে মাছ ধরতে, কিন্তু বরাতে শনি, ঝড়ে তার নৌকা গিয়ে পড়ল ঐ শয়তানের দুর্যোগের মুহূর্তে নৌকা করে গিয়ে পড়েচিলো ঐ নরককুন্ডে। সে গিয়েচিলো দ্বীপে। অনেক দূর থেকে তার অন্যান্য সাঙ্গপাঙ্গরা দেখেচে, আমার ব্যাটা দ্বীপের ডাঙায় ওঠা মাত্তর একটা পাহাড়ের মতো বিকটাকার কালো জন্তু তার দিকে দৌড়ে এল। সাক্ষাৎ শমনের মতো চেহারা তার, আকাশে গিয়ে ঠেকেচে তার লেজ। সেইদিকে তাকানো মাত্র আমার ছেলে প্রাণপণে দৌড়ে ঐ অভিশপ্ত জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে পড়ল। আর তাকে কখনও দেখা গেল না। আমার বিদ্যার সেরা সারটুকু দিয়েও তো আমার ব্যাটারে বাঁচাতে পারলাম না ঠাকুর। যাক সে কথা, আপনারা ভালো থাকবেন কর্তা।”
রসময় টাকার পুঁটলি বের করতেই মন্দা কঠিন কণ্ঠে কইলো—“থাকুক কর্তা, ও পয়সায় আমার দরকার নাই। আপনারা যদি বা ফিরতে পারেন কোনওগতিকে, তখন পারানির পয়সা নেব’খন। কেমন?”
মন্দা চোখ মুছে ঘরে ঢুকে দোর দিয়ে দিলো। তার বাড়ির চারধারে খাগড়ার বেড়া, উঠানে তার তন্ত্র জীবনের ধূলা পড়া হাঁড়িকাঠ, কিছু পাথরের গোল গোল বেড় দেওয়া ছয়হাতি নকশা, সম্ভবতঃ কোনও তন্ত্রাচারের অনুসঙ্গ হবে, তবে সবই ধূলি মলিন। কুয়াশার আস্তরণ তখনও দশদিক ঘিরে রয়েচে। আমি মুখুজ্জেমশায়ের দিকে চেয়ে দেখলুম সে ভ্রুকুটি করে মাটির দিকে চেয়ে রয়েচে। আমি সভয়ে শুধালাম— “কী দেখচেন মুখুজ্জেমশায়?”
কালীপদ সুপ্তোত্থিতের ন্যায় সম্বিত ফিরে পেয়ে ধীরে ধীরে বললে— “মাটি।”
আমি নিজের অজান্তেই দুই পা পিছিয়ে গিয়ে বললাম—“মাটি? কেন? কী রয়েচে মাটিতে?”
— “মশানের গন্ধ। সদানন্দ ঠাকুর সত্যবচন কয়েচেন, গোটা চড়ুইপোড়া গ্রামেই একটা বধ্যভূমির মতো কাঁচা রক্তের ঘ্রাণ রয়েচে। এখন সূর্যের তেজটা ঠাহর হচ্চে না বটে, কিন্তু খুব কাছাকাছি কোনও হত্যাভূমি থাকলে এমন গন্ধ ছড়ায়। স্থানলক্ষণ বলে একটা বিদ্যে রয়েচে ডাক্তার। আরও একটা কথা। মাঝি কইলো সে তার বিদ্যের সারটুকু দিয়ে ছেলেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেচে, কিন্তু যদি সত্যিই তাই হয়, তবে বড়ো ভয়ঙ্কর বিপদ আমাদের সামনে।” কবিরাজ মশায় এতক্ষণ সবকিছু শুনচিলো, এক্ষণে কাঁপা গলায় কইলো- কেন ঠাকুর? মাঝি পারেনি বলে আমাদের কী বিপদ?”
–“বিপদ বড়ো ভয়ানক। শোনো কবিরাজ, একজন গুণীন তার বিদ্যালাভের শেষে একটি বিশেষ একঘাতী শক্তি পায়। একটি মন্ত্র বাণ। তার নাম চতুর্বারণ বাণ। চারখানি ভয়ঙ্কর শক্তিশালী মহাশক্তি হস্তীর রূপ নিয়ে আমাদের ব্রহ্মাণ্ডকে নিজেদের দাঁতে ধারণ করে রেখেচে। তাঁদের নাম বিরূপাক্ষ, মহাপাক্ষ, সৌমানাং আর ভদ্র। এই চার মহা বলশালী হস্তী ভর করেন এই মন্তরে। এই একঘাতী চতুর্বারণ বাণ দ্বারা যে কোনও একটি অসম্ভব শক্তিধর শত্রুকে ঘায়েল করা চলে। এই বাণের আঘাতকে অমিত শক্তির আধার কোনও শত্রুও প্রতিহত করতে পারে না। দেবরাজ ইন্দ্র প্রদত্ত এই বাণ মহাবীর কর্ণ তিতিবিরক্ত হয়ে ব্যবহার করেচিলেন অর্জুনকে হত্যার জন্য, যে বাণ ধরাশায়ী করেচিলো অর্জুনকে আড়াল করে রাখা অতিকায় ঘটাৎকচকে। আমিও এই অস্ত্রের প্রয়োগ করে ফেলেচি চন্ড ভস্মাসুরকে বধের সময়ে, তারই পাঠানো চতুর্বারণকে প্রতিহত করে গিয়ে। এখন কথা হচ্চে, মন্দা মাঝিও কিন্তু দীক্ষা শেষে সব মন্ত্রের সার রূপে পাওয়া এই বাণ ব্যবহার করেচে সন্তানের রক্ষার্থে, কিন্তু! কিন্তু মহা আশ্চর্য কথা হলো, তা বিফল হয়েচে। চতুর্বারণ বিফল হয়েচে! এর অর্থ, আমাদের সম্মুখীন হতে হবে এমন একটি বা একাধিক শয়তানের, যাদের শক্তি আমাদের কল্পনার অতীত। যে ঘটৎকচের শুধুমাত্র দেহের চাপেই লক্ষ লক্ষ কৌরব পিষ্ট হয়ে রণক্ষেত্রে মিশে গিয়েচিলো, তার থেকেও অনেক অনেক ভয়ঙ্কর ঐ দ্বীপের দানোরা। কিন্তু তারা কারা?”
আমার মুখ থেকে আর বাক্যস্ফূরণ হলো না। রাশি রাশি দানব! মশানের গন্ধ! শয়তানের দ্বীপ! আকাশছোঁয়া বিকট জন্তু! চারদিকের এই বিপদসংকুল নির্বান্ধব ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে আমার কিছুদিন আগের একটা জনবহুল দিনের কথা মনে পড়ে গেল ভীষণভাবে।
*
হপ্তাখানেক আগের কথা
কলকাতার নেবুতলার বাড়ির দুইতলার জানালায় বসে একখানা বই পড়চিলাম, হঠাৎ বাইরের গাড়ি-ঘোড়ার অসহ্য কোলাহল আর লোকজনের কলতানে বিরক্ত হয়ে বই বন্ধ করলুম। লাউডস্পিকারের চিৎকার আর বাজাড়ুদের কলরবের মধ্যে কোনও কিছুতে মনঃসংযোগ করা শঙ্করেরও অসাধ্য। মনে মনে শাপ-শাপান্ত করে ভাবলাম, এত চিৎকার, কোলাহল আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে বাঁচাই বিড়ম্বনা। তার চাইতে বরং কোনও কুয়াশা ঘেরা নির্জন দ্বীপের বিজন প্রান্তরে গিয়ে বাস করা অনেক মিষ্ট, অনেক শান্তির। আমার ভাগ্য যে আমার জন্য ঠিক তেমনই কিছুর আয়োজন করে রেখেচে, সেইটেই কেবল তখন বুঝিনি।
পঞ্জিকার হিসেবে এখন গ্রীষ্ম ঋতু চলচে, কিন্তু এটুকু পড়েই যদি তোমরা পটভূমি হিসেবে দাউদাউ করা আকাশ অথবা ফ্যাকাশে বর্ণের বৈকালিক মেঘ দেখতে উঁকিঝুঁকি মারো, তবে নিরাশ হবে ষোল আনা। মাসখানেক হল প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় মানুষজন বড়ো নাকাল হচ্চে। মানুষের বিরক্তি এখন হাস্যপরিহাসে রূপান্তরিত হয়েচে। এই হয়তো রাস্তায় নামলুম ঘন নীল আকাশে ধপধপে রোদ্দুর দেখে, ফেরার সময়ে আকাশ কালো করা বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে প্রকৃতিকে গাল দিতে দিতে ফিরলুম। প্রচণ্ড গ্রীষ্মকালীন দাবদাহে সবেমাত্তর হয়তো উর্ধ্বাঙ্গ আদুড় করে একটু শুয়েচি, ঘুম ভাঙলো ভীষণ তীব্র শীতের কামড়ে। বাদলার শীত নয়, ঘোর মাঘ মাসের ন্যায় তার কামড়। সেই সময়ে হাসি বা কান্না কিছুই পায় না, কেবল করুণা হয় নিজের প্রতি। চায়ের দোকানে, পাড়ার আড্ডায় কিম্বা শহর কলকাতার অলিতে গলিতে কান পাতলেই আবহাওয়ার শ্রাদ্ধের আয়োজন অথবা চটুল পরিহাস। কেউ বলে, পৃথিবীর দিকে এক ভয়ঙ্কর উল্কা নাকি হু হু করে ধেয়ে আসচে যার ফলশ্রুতিতে এই অবস্থান্তর। কেউ কয়, অনাচারে অনাচারে দেবতারা একেবারে ক্ষেপে উঠেচে, ফলে তাদের অভিশাপ বর্ষিত হচ্চে এইভাবে, আর শহরের হাওয়া-আপিস বলল, এ হল দুরন্ত দুর্দান্ত অবোধ্য প্রকৃতির অজ্ঞাত খেয়াল। এর অধিক সন্তুষ্টিজনক সদুত্তর আর পাওয়া গেল না। গড়পড়তা আমিও বাকিদের ব্যতিক্রম ছিলুম না, কিন্তু আমি তখনও ছাই জানতাম যে আর মাত্র কয়েকটা দিন পরেই এই প্রশ্নের উত্তর দাঁত নখ বিছিয়ে আমার জন্য লোলুপ হয়ে অপেক্ষা করচে। আমার ভ্রমটা ভেঙেচিলো আরো কয়েকটা দিন পরে। নির্জন সেই মৃত্যু উপত্যকায় কাটানো ঐ ভয়ঙ্কর নারকীয় কটা দিনের কথা মনে পড়লে আজ এই কলকাতার বুকে বসেও আমার হৃৎকম্প উপস্থিত হয়, নাড়ীর গতি চঞ্চল হয়। সেই শয়তানের দ্বীপের গুপ্তকথা কারুকে বলা কওয়া আমার নিষেধ ছিল কঠোরভাবে, কিন্তু… আজ হয়তো বলা চলে। যাক সে কথা।
এই অস্বাভাবিক বিরক্তিকর পরিস্থিতিতে আমার মন মেজাজ বাকিদের মতোই চূড়ান্ত বিক্ষিপ্ত এবং অসুখী হয়ে উঠেচিলো, তায় হাতে রয়েচে লম্বা কর্মবিরতি, অতঃপর সাত পাঁচ না ভেবে একখানা পত্র লিখে পরের হপ্তায় গিয়ে উঠলুম সেই বাড়িতে, যে বাড়ির লোকেরা আমার রক্তের কেউ না হলেও আত্মীয়ের অধিক। সেই দিনটা ছিল পবিত্র শবেবরাত উৎসবের ছুটি। মুখুজ্জেমশায় গৃহেই ছিল, আমাকে দেখে সম্ভাষণ করার বদলে মুচকি হেসে চুপ করে রইল। আমি প্রশ্ন করলাম— “এ কি ব্যবহার ঠাকুর? কথা কইচেন না যে বড়?”
মুখুজ্জেমশায় ইশারায় গলা দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলে যে তার গলায় ঠাণ্ডা লেগেচে, তাই বেশি কথা বলায় বাধা। যা আবহাওয়া চলচে, আমিও সে কথাই বিশ্বাস করতে যাচ্চিলাম, কিন্তু চায়ের সরঞ্জাম বারান্দায় সাজিয়ে পরিবেশন করার সময়ে বৌঠানের স্বভাবসুলভ কৌতুকের হাসি আমার কাছে সব ষড়যন্ত্র ফাঁস করে তুলল। আমি অভিমানী মুখ করে কইলুম— “ভালো মুখুজ্জেমশায়, বেশ ভালো। আপনি কোনও গল্প না বলতে মনস্থ করেন তো সে আপনার অভিরুচি, আমি জোর করতে চাইনে, কিন্তু দোহাই অমন পালা অভিনয় করবেন না। আমার মনটা ভালো নাই বলেই…”
কালীপদ একবার কটমট করে হাস্যরতা বৌঠানের দিকে চেয়ে কইলো— “তোমাকে আমার বড় ভয় ডাক্তার। নাহ, লোক তুমি ভালোই, কিন্তু বড্ড বেশি কৌতূহল। অত আর বকতে পারিনে এখন। পাছে আবার প্রশ্ন আরম্ভ করো, তাই মূক হয়ে রয়েছি।”
অন্য সময়ে মুখুজ্জেমশায় স্বয়ং পরিবেশন করে বটে, কিন্তু আজ আমি নিজেই রূপার ঢাকনি খুলে দুটি পেয়ালায় চা ঢেলে তাতে ক্ষীরের ন্যায় জমাট উষ্ণ দুগ্ধ আর লাল শর্করা মিশিয়ে নেড়েচেড়ে একটা পিরিচে বসিয়ে এগিয়ে দিলুম। কালীপদ পেয়ালা তুলে নিয়ে একখানা পরিতৃপ্তির চুমুক দিয়ে বললে— “আঃ। ডাক্তার আজ মহা খাপ্পা হয়েচো বোধ হচ্চে?”
আমি নিস্পৃহভাবেই উত্তর দিলুম— “নাহ দাদা, রাগ কীসের। আমি যা জানিনে, যা বুঝিনে, তাই যাতে জানতে বুঝতে পারি সেইজন্যই এত বিরক্ত করি বৈ তো নয়। জীবনে চলার পথে হাজারখানেক ঝকমারি আর অপশক্তির সঙ্গে নিজের অজান্তেই লড়তে লড়তে, যুঝতে যুঝতে চলতে হয় আমাদের। তাই টুকিটাকি দু’চারটে কথা, উপদেশ যদি পেয়ে থাকি তবে অন্ততঃ অপশক্তি আর বিপরীত শক্তিগুলোকে চিনে নিয়ে এড়িয়ে চলতে পারি। তুমি বলতে চাও না সে তোমার অভিরুচি, তাতে আমার জোর চলে না। তবে একটা কথা, পরমন্তপ হংসিনী সিংহ তান্ত্রিকও যদি এমনটাই মনোভাব পোষণ করতেন, তবে কালীপদ মুখুজ্জে কালীগুণীন হতো কি?”
আড়চক্ষে তাকিয়ে বুঝলাম তীর পুরোপুরি নিশানায় না বিধলেও কাছাকাছি বিদ্ধ হয়েচে বটে। কালীপদ চায়ের পেয়ালা চৌপাইতে নামিয়ে রেখে চোখ তুলে চেয়ে মুখ খুলল— “দাঁড়াও দাঁড়াও, তুমি বিপরীত শক্তিকে দূরে রাখা বলতে কী বোঝাতে চাইলে?”
— “বিপরীত শক্তি বলতে অপশক্তির কথা কইলুম, অর্থাৎ যে ক্ষমতাগুলো আমাদের চিরাচরিত শুভ শক্তির বিপ্রতীপ, যে শক্তিগুলি আমাদের জগৎ সংসারের সৃষ্টিবিরোধী।”
মুখুজ্জে স্থির চক্ষে বললে- “তুমি তো কলকাতার মানুষ, বলো তো বিজলীবাতির কয়খানা তার থাকে?”
আমি যোগসূত্রের মাথামুন্ড না বুঝে উত্তর দিলাম- “দেখেছি যতটুকু, দুইখানি তার থাকে। মিস্ত্রিরা বলে ওর একখানা গরম তার, একখানা শীতল তার। এর বেশি বলতে পারি না।”
— “হুমম। বিজলীর কারিগরেরা যথার্থ বলেচে। দু’খানি তার ছাড়া বাতি জ্বলে না, নারী পুরুষ উভয় ব্যতিরেকে জীব সৃষ্টি হয় না, দুইরকম শক্তি ছাড়া বাজ পড়ে না, এমনকি দিন এবং রাতের সামঞ্জস্য ছাড়া জীবকুলের রক্ষা হয় না। বৈপরীত্যই হলো সৃষ্টির একেবারে আদি তত্ত্ব। ঘাত এবং প্রতিঘাত, ধ্বংস এবং সৃষ্টির এই ভয়ঙ্কর দুর্বোধ্য খেলা ছাড়া চরাচর সৃষ্টি হতো কী?”
—“তার অর্থ এই বিশ্বসংসারটা জুড়ে একটা দুইমুখো খেলা চলচে? তার অর্থ এইসকল বিপরীত শক্তি আমাদের পক্ষে ক্ষতিকর নয়?”
কালীপদ ইতিবাচক সায় দিয়ে কইলো—“চলচে তো বটেই। তবে কি জানো, সামঞ্জস্য আর সমতাই হল সৃষ্টি পালনের গোড়ার কথা। এর একটি কম বেশি হয়ে পড়লেই কিন্তু প্রাণের গাড়ি খানাখন্দে কাৎ হয়ে পড়বে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত শুভ শক্তি নেবার ক্ষমতাও কিন্তু আমাদের থাকে না, তাই বাসুদেবের বিশ্বজনীন রূপ দেখে মহাবীর অর্জুনও হতচৈতন্য হয়ে পড়েচিলেন, কিন্তু ততোটা হানিকর অবশ্য নয়। কিন্তু… অশুভ শক্তি যদি নিজের প্রাবল্য বিস্তার করে, তবে কিন্তু ঘোর সর্বনাশ উপস্থিত হয়।”
— “বাহ। এ যে নূতন তত্ত্ব শুনলাম দাদা। শুভশক্তিও যে অতিরিক্ত হলে আমাদের পরিপাকের ক্ষমতা থাকে না এ কথাটা ভেবে দেখিনি। মানুষ তবে এই দুই মহাশক্তির মাঝে ঝুলতে থাকা কীট মাত্র?”
কালীপদ একটু ভেবে ধীরে ধীরে বললে- “তাও ঠিক নয় ডাক্তার। মানুষের নিজস্ব একটা বিরাট শক্তি রয়েচে, কিন্তু আমরা সেই ক্ষমতাকে চিনে। উঠতে পারি নে। প্রতিটি প্রাণীর শরীরেই একধরনের জ্যোতির্বলয় উৎপন্ন হয়, যে বলয়ের ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া কিন্তু বিশাল। যেমন ধরো, পাশাপাশি দুইখানি দালান বাড়ি রয়েছে। একটিতে মানুষ বাস করে, অপরটি জনশূন্য। একবছর, দুইবচ্ছর, তিনবছর পরে দেখবে মানুষ বাস করা বাড়িটি প্রায় অবিকৃত রয়েচে, কিন্তু অপর বাড়িটি ফাটল ধরে, জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
কিন্তু কেন? আমরা কি বচ্ছর বচ্ছর বাড়ি মেরামত করি? রঙ করাই? কক্ষণও নয়। আসলে জড় বস্তুর উপরেও মানুষের ঐ জ্যোতির্বলয় প্রতিক্রিয়া করে, যার ফলে একটা শুভকর শক্তি তাকে অবিকৃত রাখে, আর পাশের বেওয়ারিশান বাড়িটি ধ্বসতে থাকে। তুমি এই কেদারাটা বাগানে রেখে আসো, আর তারপর রোজ একবার করে তাতে গিয়ে বসো, দেখবে যেমন কেদারা তেমনি আছে, কিন্তু বসা ছেড়ে দাও, কয়েকদিনের মধ্যেই ঐ কেদারাকে আগাছা আর রাজ্যের লতাপাতা এসে দখল করবে। আসলে মানুষের কোথাও থাকার প্রভাবটা আমরা ধরতে না পারলেও, মানুষ না থাকার প্রভাবটা পুরোদমে অনুভব করতে পারি। অন্ততঃ তাঁরা পারে।”
আমি একটু পিঠটা সোজা করে বসেচি দেখে কালীপদ বলে উঠল—“উঁহু, উঁহু, অত নড়েচড়ে বসবার কিচ্ছু নাই। তাঁরা কারা সে আমিও বলতে পারি না।”
— “আচ্ছা বলতে হবে না, কিন্তু এটুকু তো জানতে পারি যে দেবতাদের সঙ্গে নিরন্তর অশুভ শক্তির এই সংঘাত কেন হয়?”
কালী এইবার কড়া চোখে তাকিয়ে বলল—“এইবার বুঝেচো আমি কেন গলায় বেদনা বলচিলাম? তুমি একটার উত্তর দিলেই আর একটি সওয়াল সাজিয়ে ফেলো। শোনো, আমার এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় যেটুকু উপলব্ধি করেচি তাতে দেবতাগণ এবং অপদেবতার দল মোটেই আলাদা নন, বরং অভিন্ন। সঠিক পদ্ধতিতে, সঠিক রীতির অনুসারে আহ্বান করলে যিনি পরম শুভকর দেবতা, তিনিই বিধিতে ভুলত্রুটি হলে হয়ে ওঠেন সর্বনাশা দানব।”
আমি এইবার সত্যিই আঁতকে উঠলুম।
— “বলেন কি দাদা! তবে সঠিক মন্ত্র উচ্চারণ না করলেই প্রমাদ?’ _কালীপদ এইবার হোঃহোঃ করে হেসে কইলো—“তাহলে তোমার ধারণা হচ্চে শুধুমাত্র মন্তরের জন্য দেবতারা আসেন? না ডাক্তার না, এত সহজ নয়। বিরাট একটা শক্তিকে ডাকলে পরে তাঁকে ধারণ করার ক্ষমতাও তো রাখতে হয় যথাযথ। দেবতার বর যতখানি মঙ্গলদায়ী, দেবতার গ্রাস ততোধিক উগ্র। যেমন অলকানন্দাকে গঙ্গা রূপে ডেকেচিলেন ভগীরথ, কিন্তু তাঁর ভয়ঙ্কর বিনাশ শক্তিকে ধারণ করেচিলেন মহেশ স্বয়ং। শুধু মন্তর উত্তর নয়, যে কোনও বস্তু, যার মধ্যে অণু পরমাণুগুলি বিশৃঙ্খল অবস্থায় নয় বরং সুসজ্জিত অবস্থায় রয়েচে, তার মধ্যে ভগবান বসবাস করেন। ভালো সুর, ভালো গন্ধ, ভালো চিন্তা, পরিচ্ছন্ন স্থান ইত্যাদি। পবিত্র মন হল সবচেয়ে বড়ো তীর্থস্থান ডাক্তার। পবিত্র মনের ডাকে ভগবান সাড়া দেন। তাঁর সৃষ্ট তালের সঙ্গে আমাদের মনের তার টুকু মিলে গেলেই ইষ্ট লাভ হয়।”
আমি অভিভূত হয়ে পড়লাম।
–“দাদা, ভগবানের কি নির্দিষ্ট কোনও ছন্দ বা শব্দ আছে তবে?”
কালীপদ আমার আগ্রহের বহর দেখে মিটিমিটি রহস্যের হাসি হেসে উত্তর করল— “আছে বৈকি। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড যখন ভয়ঙ্কর বিষ্ফোরণের সময় সৃষ্টি হয় তখন তার শব্দ কেমন হয়েচিলো জানো?”
আমার মুখ থেকে বাক্য নিঃসৃত হলো না।
–“সৃষ্টির শুরুর শব্দ! কেমন শব্দ দাদা?”
কালীপদ ভাবে বিভোর হয়ে গম্ভীর স্বরে বললে—“ওঁমমম। এই ওঁম শব্দটিই হল ব্রহ্মাণ্ডের আদি শব্দ। এঁর মধ্যেই সৃষ্টি স্থিতি আর মহাপ্রলয় ঘুমিয়ে রয়েচেন। এই শব্দের অভিঘাতেই গ্রহ নক্ষত্র বিষ্ফোরণের মধ্যে দিয়ে ছিটকে গিয়েচিলো। মন্তরে বলে—
‘অ’ কারায়ঃ বিষ্ণুরুদ্দিষ্টং
‘উ’ কারস্থঃ মহেশ্বরঃ।।
‘ম’ কারায়ঃ স্থিতঃ ব্রহ্মাঃ
প্রণোবস্তঃ ত্রৈয়াত্মকং।।
এই অ উ আর ম মিলেই ওঁ। অ কার অর্থ নিরাকার সর্বভূত বা সময়। উ অর্থ উদক বা জল। ম অর্থে মান্দঃ বা আগুন। এই তিনে মিলে ‘প্রণব’ বা ত্রিদেবের সৃষ্টি।
মহানক্ষত্রের শরীরের তেজরাশি যখন প্রচণ্ড বেগে টুকরো টুকরো হয়ে ছিটকে গিয়েচিলো, তখন এই শব্দই ধ্বনিত হয়েচিলো গোটা ছায়াপথে। সেই শব্দ কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। সে শব্দ এখনও গুমরে চলেছে জগৎ সংসার জুড়ে। মহাজগতে বাতাস নাই, তাই একে শব্দ বলা যদিও ভুল, বরং বলতে পারো এক অলৌকিক অনুরণন, যে রণন ওঁ উচ্চারণের সময়ে আমাদের নাভিমূল থেকে মাথার তালু অবধি কম্পিত হয়। সেই মহাজাগতিক মূল শব্দের সঙ্গে আমাদের শব্দ মিলে গেলেই ইষ্ট লাভ হয়।”
আমি বিস্মিতভাবে শুধালাম— “সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে এই মিলে যাবার চিন্তাধারার কথা আমাদের হিন্দু শাস্তরে রয়েচে?”
— “ইসলামী শাস্ত্রেও রয়েচে ডাক্তার। বলা হয়, এই আজকের পবিত্র শবেবরাত এর দিন পরম শক্তিমান আল্লাহ একটি নির্দিষ্ট সময়ে ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন, কিন্তু সেই মুহূর্তটা দিনের যে কোনও সময়েই হতে পারে, তাই এই দিনটিতে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সারাদিন ধরেই উপাসনা করে যেতে হয়, যাতে করুণাময় আল্লাহর সেই বিশেষ সময়ের সঙ্গে উপাসনাকারীর সময় মিলে যায়। কিন্তু আর প্রশ্ন নয়। এখন যদি আমার সঙ্গে গাঙে যেতে চাও তো চলো, নেয়ে এসেচো কি?”
–“আমি নেয়ে এসেচি। তুমি চলো তো সঙ্গে যাই।”
কালীপদ রসুইঘর থেকে একখানা ছোট অথচ ভারী পেতলের বাটিতে নিমপাতা ডুবানো সর্ষের তেল একখামচা তুলে নিয়ে নাকে কানে দিতে দিতে কইলো— “চলো তবে”।
*
মুখুজ্জেবাড়িতে এই স্নানপর্বের পরেই আসে রাজকীয় মধ্যাহ্ন আহারের আয়োজন। বৌঠানের হাতের রাঁধা ব্যঞ্জনের অমন দেবভোগ্য স্বাদ আমি আর কখনও পাইনি কোথাও, তাই বড়ো উৎফুল্ল মনেই আহারে বসলাম। কাঁসার বগিথালা জুড়ে বর্ধমানের রায়না গ্রামের গোবিন্দভোগ চাউলের মনকাড়া সুবাসিত খিচুড়ি, ছোট বাটিতে কড়াপাকের খাঁটি গব্যঘৃত, তাতে দুইখানি ঝাল কাঁচালঙ্কা ডুবানো, আধ হাত পরিমাণ দীর্ঘ বেগুনভাজা, বাঁধাকপির ঘন্ট, একটা রেকাবীতে ঝাল ঝাল বড়া ভাজা এবং শেষ পাতে লাল দৈ। আহারান্তে কালীপদ একবার স্ত্রীর কক্ষে উকি মেরে এসে বলল—“তোমার বৌঠানের সাজার মেয়াদ এখনও উত্তীর্ণ হয়নি দেখচি।”
আমি বিস্মিত হয়ে শুধালাম—“সাজা? কীসের সাজার মেয়াদ?”
কালীপদ একটু হেসে কইলো—“অত্যন্ত সুমিষ্ট সাজা। তোমার বৌঠান তোমার জন্য পান সাজতে বসেছে।”
লবঙ্গের খিলি আঁটা পান মুখে পুরে মুখুজ্জেবাড়ির প্রকাণ্ড হাতে এসে বসলাম আমি, কানাই সর্দার আর কানাইয়ের ‘কর্তাবাবা’। বিকেলের সূর্য বহু দূরের গাঁয়ের পিছনে অস্ত যাবার আয়োজন করচেন। ফিরফিরে মিঠে বাতাস বইচে প্রশস্ত ছাত জুড়ে। মুখুজ্জেমশায় চুপচাপ লবঙ্গ চর্বণ করে চলেচে দেখে আমি বললাম— “মুখুজ্জেমশায়, আমার একটা সাধ রয়েচে মনে মনে।”
কালীপদ আড়চক্ষে একবার আমার মনোভাবটা আঁচ করে কথা কইলো— “মানুষ মাত্রই কিছু না কিছু সাধ থাকে, তা আর বিচিত্র কি? আর সাধগুলো সকলের মনেই থাকে। নূতন কিছু নয়।”
এইরূপ নিরুৎসুক কথাবার্তার কারণ আমি খুবই বুঝলাম, কিন্তু পাছে কথাবার্তা এইখানেই সমাপ্ত হয়ে পড়ে, তাই আবার বললাম—“আমার জীবনের পরম সাধ আমি অন্ততঃ একটি ঘটনায় আপনার সঙ্গে সঙ্গে থাকবো। আপনার রহস্যভেদের চাক্ষুষ সাক্ষী হবো, তা যতই বিপদ আসুক। আপনার জীবনটা তো আর দশটা বাঙালির মতো গড়পড়তা জীবন নয়, বরং অদ্ভুত এবং রহস্যের একটা আকর বিশেষ। আজ এই বয়সে এসে আপনারও নিশ্চয়ই কোনও না কোনও সাধ অপূর্ণ রয়ে গিয়েচে। সত্য নয় দাদা?”
কালীপদ একটু সময় নিশ্চুপ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে- “তোমার সাথে আমার আলাপটাই তো ঘটনাবহুল ভায়া। আর কী সাক্ষী হবে। আরও একটা কথা, কারুর জীবনই কিন্তু কম রহস্যময় বা কম বৈচিত্র্যের নয়। প্রতিটি মানুষ তার জীবনচক্রে অগণিত প্রশ্ন, অগণিত সমস্যা আর রহস্যের সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে রয়। টিঁকে রয়। তাদের লড়াইটা সবসময় ফলাও করে ছাপা হয় না বটে, কিন্তু তা বলে সেই জীবন সংগ্রামের কৃতিত্ব কিছু খাটো নয়। টিঁকে থাকতে গেলে লড়াই করতে হবে নিরন্তর। প্রাগৈতিহাসিক বিকটদর্শন জীবেরা অমিত শক্তির অধিকারী হয়েও লড়াই করতে পারেনি বলে হারিয়ে গিয়েচে, কিন্তু ক্ষুদ্র তেলাপোকা লড়াই করতে পেরেচে বলেই আজও ঘরে-দোরে ঘুরঘুর করচে।
সাধ বা ইচ্ছে জিনিসটা আমার জীবনে অতি স্বল্প ডাক্তার, কিন্তু একটা সাধ আমার সত্য সত্যই অপূর্ণ রয়েচে আজও। আমার তন্ত্রশিক্ষা, মন্ত্রশিক্ষা যখন প্রায় শেষের দিকে, তখন আমার গুরুদেব একদিন একটা অদ্ভুত কথা কয়েচিলেন। তেমন আশ্চর্য কথা আমি কারুর মুখে শুনিনি। গুরুদেব বললেন, একদিন অবসর হলে আমাকে মহাশূন্যের বাসিন্দা কিছু মহা শক্তিধর জন্তুদের কথা বলবেন। আমি ভারী বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেচিলাম—‘গুরুদেব, তবে কী মহাজাগতিক কোনও প্রাণীর বা জন্তুর অস্তিত্ব সত্যিই রয়েচে?’
উত্তরে গুরুদেব বললেন— ‘আছে রে হতভাগা। তাঁদের অস্তিত্ব না থাকলে যে আমাদের অস্তিত্বও সংকটে পড়তো।’
কিন্তু সে কথা, সে শিক্ষা আর আমার শুনে ওঠা হয়নি ভায়া। কারা সেই অদ্ভুত জীবরা, কেন তাদের ব্যতীত আমাদের অস্তিত্ব সঙ্কট হবে, সেই গুপ্ত কথা আমার কাছে গুপ্তই রয়ে গেল। সে আফশোস আমার আজও যায়নি। ভবাণীর চরণে সবসময় প্রার্থনা করি, সেই না বলা আশ্চর্য কথা যদি একবারটি জানতে পারতুম।”
কথাটা শেষ করে আর একবার মুখুজ্জেমশায়ের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনলাম।
আমি বিস্ফারিত কণ্ঠে কইলাম—“আপনার গুরুদেব একজন মহাতেজস্বী অঘোরী। তিনি যখন বলেচেন তখন নিশ্চয়ই তেমন কিছু রয়েচে।”
কালীপদর স্বরে দৃঢ় প্রত্যয়ের ভাব ধ্বনিত হল—“আলবৎ রয়েচে ডাক্তার। আমার গুরুর বাক্য সাক্ষাৎ বেদবাক্য, তা নড়চড় হবার পথ নাই। তাঁর চিন্তা, তাঁর ভাবনা আমাদের মতো সরল পথে প্রবাহিত হতো না। খুব সহজ সরল জিনিসকেও উনি অন্য দৃষ্টিতে দেখতে পেতেন। জ্বর হলে আমাদের শরীর থরথর করে কাঁপে তা আমরা সকলেই জানি, কিন্তু যদি প্রশ্ন করি কেন কাঁপে? উত্তর দিতে পারবে?”
আমার মুখ থেকে কালীপদরই উচ্চারিত কথাটা পুনরাবৃত্ত হলো— “কেন কাঁপে?”
— “কাঁপে কারণ আমাদের শরীর বৈপরীত্য ধর্মে বিশ্বাসী। বললুম না একটু আগেই? যখন জ্বরের মধ্যে শরীরের তাপমাত্রা হুহু করে পরিবর্তিত হয়, তখন শরীর নিজেকে ঝাঁকুনি দিয়ে, পরিশ্রম করিয়ে তাপমাত্রা সহনশীল করার চেষ্টা করে। ঠান্ডার মধ্যে থাকলে শরীর স্বাভাবিক বৈপরীত্যের নিয়মেই উষ্ণ হয়ে ওঠে। সেই উষ্ণতা বহুক্ষণ স্থায়ী হলে সহজে ঠান্ডা হতে চায় না। এইটাই জ্বর। ফলস্বরূপ গায়ে একখানা মোটা কম্বল চাপিয়ে গরমের মধ্যে অনেকক্ষণ শুয়ে থাকলে শরীর নিজেকে শীতল করা আরম্ভ করে। তখন ঘাম দিয়ে জ্বর নামে। সবটাই ঐ পরা আর অপরা শক্তির খেলা। তাই বলচি, আমার গুরুর কথা খাঁটি সত্য। যাক সে কথা।”
আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। কালীপদ মুখুজ্জের কাছে তাঁর গুরুর স্থান সাক্ষাৎ পরমব্রহ্মের স্বরূপ, তা আমি বিলক্ষণ জানি। আজ ইচ্ছেপূরণের পবিত্র উৎসবের দিনে আমি ব্রাহ্মণের সন্তান, মনে মনে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে কইলাম— “তুমি ঈশ্বর, আল্লাহ, যীশু যেই হও, তোমার অমোঘ আর দুর্লঙ্ঘণীয় নির্দেশ ছাড়া গাছের একটি পাতাও বাতাসে নড়ে না। তুমি এই নিষ্পাপ নিঃস্বার্থ যোগীর একমাত্র ইচ্ছে পূরণ করো।”
আমার মাথা ছুঁয়ে বহুদূর থেকে ভেসে আসা সান্ধ্য দক্ষিণা বাতাস সান্ত্বনা দিয়ে গেল।
*
কানাই কিছু সময় আমাদের সঙ্গে চুপচাপ বসে থেকে তারপর নিজের পাকা বাঁশের সড়কিতে পরম যত্ন ভরে তেল মাখাচ্চিলো, সড়কির ধাতব ফলা এই প্রায়ান্ধকার পরিবেশেও ঝকঝক করচে, এমন সময়ে বাড়ির অন্দর হতে ভরাট শঙ্খের আওয়াজ ভেসে আসতেই আমরা তিনজনে উঠে দাঁড়ালাম নীচে নামার জন্য। সিঁড়ি দিয়ে নামতে যাচ্চি, এমন সময়ে চোখে পড়ল বড়োকর্তা হনহন না, তাই আজ তাঁকে সিঁড়ি ভাঙতে দেখে কালীপদ এগিয়ে গিয়ে শুধালো- করে উপরে উঠে আসচে। বড়োকর্তা পায়ের বেদনায় সচরাচর ছাতে ওঠে–“এ কি দাদা যে! দরকার নাকি? আমাদের ডাকলেই তো…”
বিষ্ণুপদ মুখুজ্জে হাতের ইশারায় তাকে নিরস্ত করে কইলো–-“না না, ঠিক আছে। নীচে বৈঠকে অনন্ত কবিরাজী ফার্মের মালিক রসময় কবিরাজ এসে বসে রয়েচে। তাড়াতাড়ি আয়।”
কালীপদ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে কইলো—“সে কি! অসময়ে কবিরাজ কেন? কারও অসুখ করেচে নাকি?”
বিষ্ণু মুখুজ্জে মাথা নেড়ে বললে—“অসময় নয়, রসময় কবিরাজ। কেন? কবিরাজ বাড়িতে এলেই কি অসুখ হতে হয় নাকি? তুমি যদি কোনও ডাক্তারের সঙ্গে বসে কথা কইচো মানেই তুমি রোগী?”
এইবার আমি হেসে ফেললাম। কথাটা আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলা। অনন্ত ফার্মের নাম আমি বিলক্ষণ শুনেচি। আমার নেবুতলার বাড়ি থেকে অতি সামান্য পথ।
কালীপদ একটু অবাক সুরে দাদাকে বললে— “সে তো বটেই, কিন্তু এতবড় একজন মানুষ হঠাৎ এই ভর সাঁঝবেলার সময়ে, মানে…”
বিষ্ণু সিঁড়ির লোহার বেড়া ধরে নামতে নামতে উত্তর দিলো— “আমিও তো সেই ভাবচি, এতবড় একজন মানুষের তোর মতো বাউন্ডুলের কাছে কীসের দরকার?”
*
বৈঠকে প্রবেশ করে চোখে পড়ল গদি আঁটা ঢাউস কৌচে একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব সুঠাম ব্যক্তি উপবেশন করে রয়েচেন। তাকে রেকাবীতে চা দেওয়া হয়েচে কিন্তু তিনি স্পর্শ করেননি। মুখ দেখে মালুম হয় কোনও কারণবশতঃ মানুষটি ভীষণ উদ্বেগের মধ্যে রয়েচে। কালীপদকে দেখেই ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল। বিষ্ণুপদর সঙ্গে কালীপদর সাযুজ্য অনেক, তাই আমাদের দুইজনের মধ্যে কালীগুণীন কোনজন, তা আঁচ করতে বিশেষ কষ্ট হয়নি তার।
কালী প্রতিনমস্কার করে অতিথিকে বসতে বলল। প্রথমে রসময় কবিরাজ বসলো, তারপর বিষ্ণুপদ, শেষে আমরা। কালীপদ জিজ্ঞাসু নয়নে রসময়ের দিকে তাকাতেই কোনও ভণিতা ছাড়াই কবিরাজ কথা শুরু করল। মানুষ সহ বহু প্রাণীদের মুখের ভাবভঙ্গির একটা নিজস্ব ভাষা থাকে। কবিরাজের মুখের অভিব্যক্তি এবং ব্যগ্রতা দেখে কেন জানি আমার বুকটা ছাঁৎ করে উঠল। বোধ হলো মানুষটা বহুদূর থেকে মুখুজ্জেমশায়ের কাছে কোনও ভয়ানক অশুভ বার্তা বহন করে নিয়ে এসেচে।
সে শুষ্ক মুখে বলতে আরম্ভ করল—“নমস্কার মুখুজ্জেমশায়। আমার নাম রসময় কবিরাজ। বাপ অনন্ত কবিরাজ। নিবাস কলকাতার ক্যাম্পবেল হাসপাতালের পাশে। আমার বাপের তৈরি অনন্ত কবিরাজী ফার্ম এই মুহূর্তে কলকাতা শহরের সবচাইতে জনপ্রিয় ফার্ম। তিনি গত হয়েচেন আজ দশ বচ্ছর, বর্তমানে আমি আর আমার ভাই মণি আধা আধা মালিক। ভাই বিলেত থেকে ফার্মেসির বিদ্যা পাঠ করে এসেচে। এ ছাড়াও নানান প্রাচীন পুঁথি, শাস্ত্রর সম্বন্ধে তার গভীর জ্ঞান। মণি বলে, প্রাচীনকালের বহু পুঁথিতে নাকি এমন সব আশ্চর্য গাছপালার উল্লেখ রয়েচে, যার সিংহভাগ আজ হয় বিলুপ্ত না হয় লোকচক্ষুর অন্তরালে। এইসব পুঁথি পড়ে মণি অসংখ্য ভেষজের আমদানি করেচে। তার সংগ্রহে যত কেতাব রয়েচে, তা আপনি কল্পনা করতে পারবেন না।
ঔষধ তৈরির দায়িত্ব তার আর বিপণনের দায় আমার। এক সংসার, এক হেঁসেল, ন্যায্য সংসার খরচা বাদ দিয়ে মুনাফা আধাআধি। মণি কখনও টাকাকড়ির ব্যাপারে তত্ত্বতলাশ করে না, সে দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত। আমার স্ত্রী তুষারবালা আর বৌমা, অর্থাৎ মণির স্ত্রী লীলাবতী, দুইজনেই ক্যাম্পবেল থেকেই ডাক্তারি পাস দিয়েচে, বর্তমানে পারিবারিক ব্যবসায়ে ভেষজ বিভাগের দেখাশোনা করেন। মণি দেশ বিদেশের নানান দুর্গম স্থানে গিয়ে গিয়ে বিভিন্ন ভেষজ সংগ্রহ করে নিয়ে আসে, আর সেসব ভেষজ দ্বারা যে সকল ঔষধ প্রস্তুত হয় সেগুলির কারণেই অনন্ত কবিরাজী ফার্ম এখন চিকিৎসা ব্যবসায়ের মগডালে। রসকপূরের নাম শুনেচেন? কিম্বা লবঙ্গহিঙ্গুলী? গেঁটে বাত, ডায়ারিয়া রোগ আর মচকানোর বেদনার মহৌষধ। সে জিনিস আমরাই তৈরি করে থাকি।”
কালীপদ মৃদু মাথা নেড়ে বললে— “রসকপূরের নাম শুনেচি। সাধু সন্ন্যাসীদের বহু আঘাটায় ঘুরতে হয়, আহার্য পানীয় গ্রহণ করতে হয় বলে অনেকে ঐ দ্রব্য ঝোলায় রাখেন।”
এতক্ষণ নিজের পরিবারের আর ফার্মের কথা বলার সময় রসময় কবিরাজের মুখে যে আলোর আভাস দেখা দিয়েচিলো, তা সম্পূর্ণ তিরোহিত হয়ে উদ্বিগ্নভাব ধারণ করল।
— “মুখুজ্জেমশায়, আমি আপনার কাছে এসেচি একটি মহা বিপদে পড়ে। কলকাতার মুখুজ্জেবাড়ির বিজয় মুখুজ্জের কাছে আমি আপনার কথা শুনি।” কালীপদ একটু ইতস্ততঃ করে শুধালো— “মাপ করবেন, অনধিকার চর্চা করচি, বিজয় মুখুজ্জের স্ত্রীর নামটি কী?”
–“আজ্ঞে, মালা দেবী।”
কালীপদ আড়চক্ষে একবার আমার দিকে চাইলো। আমার ঠোঁটেও একচিলতে হাসি খেলে গেল। মনে পড়ল আপাই রাক্ষসীর সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা, যে ঘটনায় মুখুজ্জেমশায়ের সঙ্গে আমার আলাপ। রসময় বলতে থাকলো— “ফার্মের অনেক কর্মচারী রয়েচে যাদের আমরা নাউকি বলি। এদের কাজ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে ভেষজের খোঁজখবর নিয়ে আমাদের অবগত করা। এ ছাড়াও কিন্তু মণির বহু লোকজনের সাথে পরিচিতি ছিল, যারা আমাদের বেতনভোগী না হয়েও কিছু টাকার বিনিময়ে নানান গাছপালার সুলুক সন্ধান দেয়। আসল কথায় আসি, মাস চারেক পূর্বে এই সুন্দরবনের বাদা অঞ্চলের এক নাউকি খবর দেয় ওদিকের বাদা তল্লাটে একটা দ্বীপের মতো জায়গায় নাকি বিরাট আকারের পেট মোটা কলসের ন্যায় ফুলের সন্ধান পেয়েচে। তার মাথার দিকে অজস্র হীরার কুচির মতো বিন্দু জ্বলজ্বল করে। এই খবর পেয়ে মণি একেবারে আত্মহারা হয়ে ওঠে। হারিয়ে যাওয়া বহু ভেষজশাস্ত্রের পুঁথিতে এই ধরনের একরকম গাছের উল্লেখ রয়েচে। কলসপত্রী গাছের এক দানবীয় সংস্করণ বলতে পারেন। শাস্ত্রে এর পোষাকি নাম সিংহপত্রী। একে দেখতে অনেকখানি কেশর যুক্ত সিংহের মতো। এই আশ্চর্য উদ্ভিদের সম্পর্কে হাজার হাজার বৎসর আগের পুঁথিতে কি বলা হয়েছে শুনবেন?
।। মৃতা, মৃয়তাং, মৃতসম্ভবাঃ,
প্রাণপশ্যেঃ যথাঃ সম্ভবেঃ।।
।।সর্ববেঃ রোগং সমুন্নাশিতাং
কেশরীপর্ণাৎ নিশাহপেঃ।।
এই কেশরীপর্ণই হচ্চে সিংহপত্রী গাছ। তার গায়ে জমা শিশির জল পান করলে মৃতপ্রায় জীবও প্রাণ রক্ষা পায়। একবার ভাবুন, এই উদ্ভিদ করায়ত্ত হলে কত মুমূর্ষু মানুষ জীবন লাভ করবে। মণি এই গাছের খবর পেয়ে তাই উৎফুল্ল হয়ে উঠল। আমাদের বলল ঐখানে যাবার আগে তাকে কিছু পড়াশুনা করতে হবে। আমরা কখনওই মণিকে জিজ্ঞাসা করতুম না যে সে কোথায় যাচ্চে, কবে ফিরবে, কারণ যতবারই সে বাড়ি ফিরেচে ততোবারই নিয়ে এসেচে আশ্চর্যজনক সব ঔষধি লতাপাতা, গুল্ম অথবা উদ্ভিদ।
তো, দুটো রাত্তির জেগে পড়াশোনা করে তৃতীয় দিন দুপুরে তার স্যুটকেস, খাতা আর জিনিসপত্তর নিয়ে রওয়ানা দিলো ঐ খবর পাওয়া দ্বীপ বরাবর। সঙ্গে গেল মণির খাস ভৃত্য ফাগুরাম, দুইজন নাউকি রাসবিহারী আর বসন্ত। বসন্তের আসল নাম অনন্ত, কিন্তু বড়ো মালিকের নামে নাম হওয়ায় সে নিজেই নিজেকে বসন্ত বলে ডাকতে বলতো। সে আমাদের ছেলেবেলা থেকেই প্রায় বহাল রয়েচে। অত্যন্ত প্রভুভক্ত এবং সৎ।”
এতক্ষণ একনাগাড়ে কথা বলে রসময় একটু থামতেই বিষ্ণুপদ ভ্রু কুতি করে শুধালো—“মাপ করবেন কবিরাজমশায়, আপনি যা বললেন তা তো চার মাস পূর্বের কথা। সমস্যাটি কি আপনার ভাই মণিকে নিয়েই?”
কবিরাজ বিষণ্ণ কণ্ঠে প্রত্যুত্তরে জানালো—“হাঁ ঠাকুর। মণিকে আজ চার মাস হল খুঁজে পাওয়া যায়নি। ভাই রওয়ানা দেবার পর ছয় দিনের মাথায় একখানা পত্র পেয়েচিলাম। কারুকে দিয়ে হয়তো সদরে পাঠিয়ে ডাকে ফেলেচিলো। তাতে সে অত্যন্ত হর্ষ সহকারে জানিয়েচে যে নাউকির কথা কালীগুণীন এবং পিশাচের নখ মিথ্যা নয়। বহু নৌযাত্রী স্বচক্ষে দূরের দ্বীপের ঐ সিংহপত্রী দানবাকৃতির গাছের কিছুটা দেখেচে। ঠিকঠাক সুযোগ পেলে খুব শীঘ্রই মণিরা ঐ দ্বীপে গিয়ে উঠবে।”
কথার মাঝে কালীপদ একটু বাধা দিলো।
— “মাঝপথে কথা কইচি কবরেজমশায়, আপনার ভাই যথেষ্ট লোকবল নিয়েই গিয়েচিলো, চিঠির বক্তব্য শুনে বোধ হচ্চে তারা ঐ দ্বীপের কাছাকাছি কোনও দ্বীপে আশ্রয় নিয়েচিলো, কিন্তু ‘ঠিকঠাক সুযোগ পেলে’ বলতে কী বোঝাতে চেয়েচিলো সে? অসুবিধা কি ছিল সেইখানে যাবার? দুর্যোগ? দুর্গম পথ? নাকি অন্য কিছু?”
কবিরাজ করুণ দৃষ্টিতে কালীর দিকে তাকিয়ে বললে— “সম্ভবতঃ অন্য কিছু ঠাকুর। এই পত্রের ঠিক এক হপ্তা বাদেই আরেকখানা চিঠি এল এবং সেই চিঠি পড়ে আমার হৃৎকম্প আরম্ভ হলো। তাতে সে লিখেচে দাদা, এর পরে আর চিঠি লিখতে পারবো কিনা জানিনে। ঐ দ্বীপের থেকে সিংহপত্রী নিয়ে আসা অসম্ভবের নামান্তর। এইখানে আসার পর থেকেই দ্বীপটির সম্পর্কে গাঁয়ের লোকেদের তীব্র ভীতি আর আতঙ্ক লক্ষ্য করেচি আমরা, কিন্তু ভীত হইনি। আমি জীবনে বহু দুর্গম থেকে অতি দুর্গম স্থানে গিয়েও গাছগাছড়া তুলে এনেচি। কিন্তু আমি নিজের চক্ষে যা দেখলাম তাতে আমি হতবাক, হতবুদ্ধি। গতকাল মধ্যরাতে আবশ্যকতা পড়ায় আমি তাঁবুর পিছনের পুকুরে গিয়েচিলাম। হঠাৎ সাগরের ওই পারে দ্বীপটার দিকে চোখ পড়াতে বিদ্যুদাহতের ন্যায় হয়ে পড়লাম। দ্বীপের বিশাল বিশাল গাছের জঙ্গল ভেদ করে আরও অনেক বড়ো একটা অতিকায় প্রাণী! ঠিক করে তাকিয়ে দেখলাম প্রাণী নয়, কোনও প্রাণীর লেজ। যার লেজ আকাশ ছুঁয়েচে তার শরীরের আকৃতি সহজেই অনুমেয়। মাঝরাতের ঘুটঘুটে আঁধারে সাগরের আকাশ ফিকে আলো ছড়ায়। সেই আলোতেও আমার দেখার ভুল হয়নি নিশ্চিত। এ কি কোনও রক্তমাংসের জীব? নাকি গাঁয়ের লোকের কথাই সত্য, যে ঐ দ্বীপে অসংখ্য শয়তান লুকিয়ে রয়েচে! লোকে কয় ঐ সিংহপত্রী গাছখানাও কিন্তু সবসময় চোখে পড়ে না। হঠাৎ হঠাৎই দৃশ্যমান হয় যেন।
কিন্তু যাই হোক, এই অমৃয়ের আকরের সন্ধান যখন পেয়েচি, তখন না নিলে ফিরব না। কাল আমরা অতি সন্তর্পণে নৌকা নিয়ে যাত্রা করবো। ফিরতে বিলম্ব হতে পারে।
—”আপনার মণি।”
কথা শেষ করে রসময় কবিরাজ এতক্ষণের উদ্বেগ আর সংযত ভাবকে বিসর্জন দিয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল।
কালীপদই শুধু নয়, আমি, বড়োকর্তা আর আড়ালে চুপটি করে কথা শুনতে থাকা বৌঠানও হতভম্ব হয়ে পড়ল এমন অবাস্তব আখ্যান শুনে। এই যুগে, এখনও যখন গাঁ ঘরের মেয়েদের পাঠশালায় পাঠালে লোকে বিদ্রূপ করে বলে—‘মেয়ে কি তোমার জজ মেজেষ্টারি করবে? আপিস করবে?’ সেই সময়ে এই পরিবারের দুইজন বধূই ডাক্তার, তখন এই পরিবারের আভিজাত্য এবং মননশীলতা নিয়ে প্রশ্নই ওঠে না। যেভাবে গুছিয়ে কথাবার্তা উপস্থাপিত হলো, এর পর রসময় কবিরাজের মানসিক অসংলগ্নতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা অসম্ভব। কিন্তু এ কীসের ঘটনা বলল মানুষটা? এ যে ভারী আশ্চর্য কথা! কালীপদ কিন্তু আমাদের মতো এতখানি আবেগরুদ্ধ হয়ে পড়েনি। বিস্মিত তো নয়ই। সে তার জীবনে এত এত ভয়ঙ্কর এবং অকল্পনীয় ঘটনা দেখেচে যে, এই ক্ষুদ্র বাক্যে বিস্মিত হওয়ার অবকাশ তার নাই। কালীপদ একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে কইলো—“আপনার দুঃখে আমি দুঃখিত কবরেজমশায়, কিন্তু এই ক্ষেত্রে মনে হয় আমি আপনার কোনও কাজের কাজী হয়ে উঠব না। নিখোঁজ মানুষের সন্ধান করা সরকার বাহাদুরের দায়। দারোগার দায়িত্ব। আপনি চৌকিতে খবর দিন। আমার বিশ্বাস, তাঁরা ঠিক….”
রসময় কাতর কণ্ঠে মাঝপথেই বলে উঠল— “মুখুজ্জেমশায়! আমি কি দারোগার দপ্তরে না জানিয়ে বসে রয়েচি? কলকাতার পুলিশ মহলে আমার যথেষ্ট প্রতিপত্তি রয়েচে, তাঁদের সায়েবরা অনেকেই আমাদের ঔষধির গুণমুগ্ধ ঐ দ্বীপের গ্রাহক, কিন্তু বিশ্বাস করুন তাঁরা কোনও কূলকিনারা পাচ্চে না।
আশপাশে তাঁরা অনুসন্ধান করেও বিশেষ ফল পায়নি, কারণ লালপাগড়ির দেখা পেলেই গাঁয়ের লোকজন মুখে কুলুপ আঁটে। চারজন না পাঁচজন পুলিশ কর্মচারী মিলে নৌকাযোগে ঐ দ্বীপের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেচিলো বলে শুনেচি, কিন্তু কোনও এক দুর্যোগে তাঁদের নৌকা লোকজন সমেত ঘূর্ণির মতো তলিয়ে গিয়েচে।”
কথায় একটু বিরতি নিয়েই কবিরাজ নিজের ঝোলা থেকে সামনের চৌপাইতে রাখা মোমদানীর পাশে কিছু জিনিস নামিয়ে রেখে বলল— “আপনার যা যা দরকার হতে পারে সেসব বস্তু আমি নিয়েই এসেচি। সিংহপত্রী ফুলের ছবি এঁকে এনেচি, নাউকিদের নাম ধামের তালিকা, মণি সেই রাতে যে বইখানা পড়চিলো সেইটে, মণির একখানা ফটোগ্রাপ, তার আমাকে লেখা চিঠি দু’খানিও এনেচি। আমাকে কৃপা করুন ঠাকুর। আমি বড়ো আশা নিয়ে এসেচি।” রসময় আবার চোখ মুছলো।
কালীপদ কিন্তু টললো না। সে বিরস স্বরে কইলো– “আমি পাষাণ নই কবিরাজ, কিন্তু আমার তিক্ত অভিজ্ঞতায় বলচি, পুলিশ দারোগার হাতে যে মামলা বা অনুসন্ধানের দায়িত্ব উঠেচে তাতে নাক গলানোর প্রচেষ্টা করা বোকামির নামান্তর, তাতে অশেষ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিশেষতঃ আপনি দারোগাকে এড়িয়ে একজন সামান্য গুণীনের কাছে এসেচেন এ কথা চাউর হলে বিশেষ লজ্জায় পড়বেন। পুলিশ যদি বা নিজের খাতা থেকে রুজু করা নালিশ তুলে নিতো, তবে ভেবে দেখতুম কিন্তু এমতাবস্থায় দেশের আইনবশেই আমি অপারগ কবিরাজমশায়। মাপ করবেন।”
কালীপদর স্বরে একটা অস্বাভাবিক দৃঢ়তা ছিল, যার ফলে রসময় নিজের অনুরোধ আর দ্বিতীয়বার করতে সাহস পেলো না। কবিরাজ উঠে দাঁড়ালো, সঙ্গে আমরাও। চৌপাইতে কাগজপত্তরগুলো ছড়িয়ে রয়েচে। রসময় একবার শেষ অনুরোধ করবে বলে কালীর দিকে চেয়ে দেখলে, সে বিষণ্ণভাবে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রয়েচে। দোরের সামনে এসে বিষ্ণুপদ হাতজোড় করে গাঢ় স্বরে বলল—“আমাদের ক্ষমা করবেন কবিরাজমশায়। আমার ভাই কিন্তু কক্ষণও কারুকে ফেরায় না, কিন্তু বুঝতেই পারচেন দেশের আইন। দেশের নিজস্ব শাসন বিধি বলবৎ রয়েচে, তাই, যদি থানা পুলিশের ব্যাপার না হতো তবে হয়তো বা…”
কবিরাজ বিষ্ণুর হাতদুটো ধরে অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে উত্তর দিলো—“জানি জমিদারমশায়। জানি। সে কথা আমি বেশ জানি। আমার কপালের ফের ঠাকুর। কারুর দোষ কি? আসি কর্তা।
বাইরে দুই ঘোড়ার একখানা ব্যক্তিগত গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েচে। গাড়োয়ান নীচে নেমে গাড়ির দুইপাশের আর কৌচের ভিতরের চৌকো লণ্ঠনে আলো জ্বেলে শিকলি দিয়ে ঝুলিয়ে দিলো। রসময় গাড়িতে উপবেশন করে আমাদের দিকে কাতর চক্ষে চাইলো। গাড়োয়ান নিজের চাবুক দিয়ে ঘোড়াদের কষাঘাত করতে যাচ্চে, এমন সময় কালীপদর গম্ভীর স্বর শুনতে পেলাম— “হেই রোকো”।
গাড়োয়ান চাবুক সরিয়ে নিল।
*
রসময় কবিরাজ তড়িঘড়ি দোর খুলে পা-দানীতে পা রেখে নেমে দাঁড়াল। তখন তার যে মুখের ভাব দেখেছিলুম তা আমার আজও বিস্মরণ হয়নি। অথৈ দুর্দান্ত সলিলে নিমজ্জিত মরণপথযাত্রী যেমন আকাশকে ডাঙা ভেবে হাত বাড়িয়ে ধরতে চায়, কবিরাজের চোখেমুখেও অবিকল তেমনই কাকুতির ভাষা। কালীপদ ধীর গতিতে গাড়ির কাছে এগিয়ে এসে মন্দ্রস্বরে কইলো- “কবিরাজমশায়, আপনি কি বাড়িতে বলে এসেচেন যে আপনার গৃহ প্রত্যাবর্তনের কিছুদিন বিলম্ব হতে পারে?”
— “আজ্ঞা ঠাকুর, আমি ভিতর বাড়িতে কয়ে রেখেচি যে আমি মণির সন্ধান না নিয়ে ফিরচি নে।”
–“বেশ। কিছুক্ষণ বিলম্ব করুন। আপনার গাড়িতেই আমরা যাত্রা করবো। কিছু আবশ্যক জিনিসপত্তর গুছিয়ে নিই।”
রসময় অত্যন্ত বিস্মিত এবং আপ্লুত হয়ে রুদ্ধশ্বাস কণ্ঠে বললে—“আমি আপনার আজকের ঋণ কোনও কালে শুধতে পারবো না ঠাকুর, শুধু একটাই কথা জানতে চাই, আপনার ক্ষণিক পূর্বের মনোভাব এক লহমায় পরিবর্তন করলেন কীসের হেতু?”
কালীপদ ডান হাতে মণিময় কবিরাজের শেষ পঠিত বইখানা তুলে ধরে উত্তর দিলে— “এইটা দেখার পর”।
এইবার রসময়ের হয়ে হতভম্ব বিষ্ণুপদই সওয়াল করল—“কেন রে কালী? কী এমন বই ওখানা?”
–“বই নয় দাদা, পুঁথি। এর নাম গুপ্তপুরাণ। আমাদের যাবৎ মহাকাব্য, বেদ, বেদান্ত, বেদাঙ্গ, আঠারো পুরাণ, শাস্ত্র, কাহন, গাথা, মঙ্গলকাব্য আর চরিত নিয়ে প্রায় সহস্রাধিক ঘটনাবলীর প্রকৃত রূপের বর্ণনা রয়েচে এই দুষ্প্রাপ্য পুঁথিতে। এর রচয়িতা স্বয়ং পবনদেব। পবন একমাত্র দেবতা যিনি সকল স্থানে অবলীলায় বিচরণ করতে পারেন, এবং বিশেষ বিশেষ কিছু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তিনি সেই ঘটনাক্রমগুলি লিপিবদ্ধ করেচেন এই পুঁথিতে, যে ঘটনাগুলির অধিকাংশই আমাদের কাছে কিছুটা হাতবদল হয়ে প্রকাশ পেয়েচে। আমার গুরুদেব নিয়মিত পাঠ করাতেন আমাদের এই অমূল্য নিধি। এটিও কোনও যথার্থ পুঁথির অবিকৃত নকল। সবচাইতে বড়ো কথা কি জানেন দাদা? কাঠ পেনসিলের মার্কা দেখে বুঝলাম, এই সুবৃহৎ কেতাবের ঠিক যে পাতাগুলি ওনার ভাই পাঠ করেচিলেন যাত্রার অনতিপূর্বে, সেইটেই আমার কাছে সর্বাধিক চমকপ্রদ কথা।”
আমি হতবুদ্ধি হয়ে শুধালাম—“কেন! কী আছে সেই লেখায়?”
কালীপদ নিজের কণ্ঠস্বর আত্মস্থ করে প্রত্যুত্তরে বলল—“তাতে লেখা রয়েচে এক ভয়ঙ্কর অধ্যায়ের কথা, যে কথা মানুষের রচিত কোনও গাথায় প্রকাশ পায়নি, কারণ এই ভয়ঙ্কর ইতিহাস মানুষ জাতির গায়ে থাবা বসায়নি। এ ঘটনা পিশাচ জগতের এক অতি নৃশংস ইতিহাস। সে কথা সময়মতো বলবো’খন, কিন্তু এখন আমাদের যত শীঘ্র সম্ভব রওয়ানা হতে হবে। এক চুল সময় নষ্ট করা চলবে না।”
আমি পকেট থেকে সদ্য কেনা নিকেলের ট্যাকঘড়িটার ঢাকনি খুলে সেটা সদরের আলোর দিকে ফিরিয়ে বললাম—“সময়ের নড়চড় হবে না মুখুজ্জেমশায়, সময়ের যন্ত্র আমার সঙ্গে রয়েচে। একদম হাল ফ্যাশনের দুরস্ত জিনিস।”
কালীপদ একটুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে বললে— “তোমার মতে ঘড়ি জিনিসটা আধুনিক, তাইতো ডাক্তার?”
আমি বিব্রত হয়ে বললাম—“না, মানে ঠিক তা নয়। ঘড়ি কথাটার অর্থ তো সূর্য। সেই অর্থে সূর্যঘড়ি জিনিসটা মিশরীয় এবং নেবুকাডনেসার এর সেই রহস্যময় দেশ ব্যাবিলনের প্রজারাই আবিষ্কার করেচেন, কিন্তু এই যে যন্ত্রপাতি দেওয়া ঘড়ি, এ তো আধুনিক আবিষ্কার বটেই।”
কালীপদ একটু শুষ্ক হেসে ঘরের পানে চলতে চলতে একবার বইখানার দিকে দৃষ্টিপাত করে কইলো– “ব্যাবিলন প্রদেশের সেই মানুষেরা কেবল ঘড়ি নয়, হরেক রকম ফাঁদও তৈরি করতে জানতো। ঘড়ি আবিষ্কারের বিষয়ে তোমার কথা ঠিক হলেই মঙ্গল ডাক্তার, কিন্তু ঘড়ি জিনিসটা যদি তারও সহস্র সহস্র বচ্ছর আগে আবিষ্কৃত হয়ে থাকে, তবে সম্ভবত একটা ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়তে চলেচি আমরা।”
আমি গুপ্তপুরাণ পুঁথিটার দিকে একবার সভয়ে তাকিয়ে বাক্যস্ফুরণ করার আগেই ইতস্ততঃ করে কালীপদ বললে— “আর একটা কথা বলি ভায়া। তোমার উদ্দেশ্য আমি বেশ বুঝতে পারচি, কিন্তু তা হবার নয়। এই বিপদের মুখে আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারবো না। আমি আর্তকে ফিরিয়ে দিয়ে গুরুবাক্য লঙ্ঘন করতে পারি নে, কিন্তু পরের ছেলেকে বিপাকে ফেলবো কোন মুখে? আমি, কানাই আর কবিরাজ যাব। তুমি রায়দীঘড়ায় থাকলে থাকো, আর নয়তো ইচ্ছা মতো কলকাতায় বেরিয়ে পড়োখন।”
আমি চক্ষে অন্ধকার দেখলাম। এ কি! এ আমার বহু দিনের সাধ যে একটিবার অন্ততঃ মুখুজ্জেমশায়ের সঙ্গে কোনও একটা রহস্যভেদের সাক্ষী হবো, কিন্তু বিধি যদি সুযোগ দিলেন তো তীরে এসে বুঝি তরী ডোবে। আমি আশাহত হয়ে ধপ করে আসনের উপরে বসে পড়ে বললাম—“কিন্তু দাদা!”
–“না ডাক্তার। তুমি যাচ্চো না।”
আমি মরিয়া হয়ে কইলাম—“দাদা, এ আমার অদম্য সাধ। এ সাধে আমাকে বঞ্চিত করা তোমার ধর্ম হয় কি? আমি না হয় পরের ছেলে, কিন্তু আজ যদি আমি সত্যিই তোমার নিজের রক্তের ভাই হতুম, তবে কি বিপদের ভয়ে বিমুখ করতে আমাকে?”
শালবনের গায়ে বেড়ালের নিষ্ফল থাবা দেওয়ার ন্যায় কালীপদর মধ্যেও এতখানি আবেগের কথা কোন আঁচড় অবধি কাটলো না। সে নির্বিকার কঠোর মুখে বসে রইল। উত্তরটা তার শারীরি ভাষায় অত্যন্ত স্পষ্ট। আমি মনমরা হয়ে যখন মাথাটা নীচু করে বসে রয়েছি, হঠাৎ বৌঠানের একটা রুক্ষ বাক্যে বিস্মিত হয়ে পড়লাম। বৌঠান দ্বিতীয় প্রস্থের চা সাজিয়ে বৈঠকে প্রবেশ করল। চা নামিয়ে রেখে তাঁর বটঠাকুরের সুমুখে ঘোমটাটা আরও একটু টেনে নিয়ে বিরক্ত স্বরে আমার প্রতি বলল—“দেখো ঠাকুরপো, তোমাকে আমরা যথেষ্ট স্নেহ করে থাকি। উনিও করেন। কিন্তু এর চেয়ে বেশি মাখামাখি করার চেষ্টা না করাই ভালো। উনি যখন তোমার সঙ্গৎ পছন্দ করচেন না, তখন নিশ্চিত কোনও কারণ রয়েচে। আর সবসময় এই রক্তের সম্পর্ক অথবা ভাই ভাই নিয়ে কথা বলবে না। বটঠাকুর উপস্থিত রয়েচেন, আমার বাচালতা শোভা পায় না। সহোদর হলে উনি কি করতেন, কি করতেন না সে প্রশ্ন থাক, বাস্তবে তুমি কিন্তু ওঁর ভাই নও, তাই এইভাবে ওঁকে বিব্রত করো না কখনও আর।”
শুধু আমিই নই, বৌঠানের এরূপ আকস্মিক কর্কশ বাক্যে বৈঠকের প্রতিটি মানুষ হতচকিত হয়ে পড়ল। কালীপদ বিমূঢ় নয়নে স্ত্রীর দিকে মুখ তুলে চাইলো। আমার চক্ষে জল এসে পড়েচিলো। আমি মুখ তুলে বৌঠানের ঘোমটাবদ্ধ মুখের পানে চাইতেই দ্বিতীয়বার অবাক হলাম। দেখলুম বৌঠান নিজের স্বামীর অলক্ষ্যে তার প্রতি ইঙ্গিত করে আমাকে একটা মুখভঙ্গি করচে। আমার মনের পাষাণ মুহূর্তের মধ্যে লঘু হয়ে গেল। আমি ইঙ্গিতটা আত্মস্থ করে খুব করুণ স্বরে কইলাম—“বৌঠান সত্য কথাই বলেচে দাদা। আমার যাওয়া হতে পারে না।”
বৌঠান অন্দরে চলে গেলে পর কালীপদ অসোয়াস্তি পূর্ণ কণ্ঠে বলল- “ডাক্তার, তুমি ওঁর কথায় আঘাত পেও না। আমি বিরক্ত হচ্চি ভেবেই হয়তো… তুমিও তো ছেলেমানুষের মতো মিছিমিছি… যা হোক, তোমায় আমি নিজের সহোদর ব্যতীত অন্য নজরে কখনও ভাবিনি। যদি চাও তবে দুই চারটে পোষাক গুছিয়ে নাও প্যাটরায়। এসেচো যখন নিশ্চয়ই দু’খানা পোষাক বাড়তি নিয়েই এসেচো। বেশি সময় নাই। শীঘ্র করো।”
বৌঠানকে সহস্র ধন্যবাদ জানিয়ে দু’চারখানা জরুরি জিনিসপত্র ভরে নিলাম কথায় বলে— “ভবের ভ্রুকুটি ভবাণীই বোঝেন”। আমি মনে মনে আমার তোরঙ্গে। রাতের তৈরি তিনজনের মতো কিছু খাদ্যদ্রব্য আর মাটির সরায় জল এঁটে রসময় কবিরাজের গাড়িতে চেপে বসলাম আমি, কবিরাজ, কানাই সর্দার আর কালীপদ মুখুজ্জে। গাড়োয়ান মিলে মোট পাঁচজন পুরুষ। মুখুজ্জেবাড়ির বৈঠক থেকে দেড় মানুষ সমান ভিক্টোরিয়া ক্লক এর মিঠে অথচ সুগম্ভীর ঢং ঢং ঢং ঘণ্টাধ্বনি ভেসে এল। কালীপদ একবার আমার দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে কইলো—“ঘড়ি”।
গাড়ির চাকা ছড় ছড় শব্দে গড়াতে শুরু করল দক্ষিণ-পূবের বড়ো সড়কের দিকে। কালীপদ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো দুইতলার আবছা বাতি জ্বলা শয়নকক্ষের জানালার গরাদ ধরে মন্দাকিনী দাঁড়িয়ে যাত্রাপথের দিকে চেয়ে রয়েছে। মুখুজ্জেমশায় একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে মুখ ঘুরিয়ে গাড়োয়ানকে বলল— “ঘোড়া জলদি হাঁকাও।”
*
নাউকির পথনির্দেশ মতো আমরা খুঁজে খুঁজে এসে পড়েচি মোটামুটি সঠিক স্থানেই। ভোর থেকে সকাল গড়িয়ে এসেচে, কিন্তু আজকের আকাশের রূপ দেখে বেলা আঁচ করা অসম্ভব। সমগ্র রাত্তির একনাগাড়ে দৌড়ে ঘোড়াগুলি বেদম হয়ে পড়েচে, তাদের কষাঘাত করে আর থামাতে হয়নি, তারা স্বচ্ছ নদীর জলের গন্ধ পেয়ে আপনিই দাঁড়িয়ে পড়েছে। জলের যে স্বতন্ত্র কোনও গন্ধ থাকে, তা পশুরা ঠিক উপলব্ধি করতে পারে। তারা আকণ্ঠ জল পান করলে পর আমরা গাড়িকে গাড়োয়ান সমেত বিদেয় করে দিয়ে পদব্রজে এসে দাঁড়ালাম সেই প্রশস্ত এবং মূলতঃ বর্ষণপুষ্ট নদীর তীরে। নদীর নাম স্ফটিকছড়ি। স্থানীয় লোকে কয় ফটিক নদী। রসময় কবিরাজ নাউকির পথসন্ধান অনুসারে ওপারে যাবার জন্য একখানা নৌকার সন্ধান করচিলো। তার পরে ঠিক কি ঘটলো তা আমি একদম শুরুতেই বলেচি।
মন্দা মাঝি সরোষে ঘরের দোর বন্ধ করার পর কালীপদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি যেন চিন্তা করল, তারপর জনবসতির মূল দিকটা আন্দাজ করে আমরা এগোতে থাকলাম চড়ুইপোঁতার মেঠো পথ ধরে। বেশ কিছুটা চলার পরে যখন বাড়িঘরগুলোর কাছাকাছি চলে এসেচি, তখন অনেকটা দূরে সাগরের গর্জন কানে এসে বিঁধলো। আমার মনে একটা অদ্ভুত বিজাতীয় অনুভূতি জন্ম নিল। এই সেই সাগরপার, যেখানে দাঁড়িয়ে মণিময় কবিরাজ সেই রহস্যময় দ্বীপ নিরীক্ষণ করেচে চার মাস আগে। সেই ভয়ঙ্কর সৈকত, যে শেষ ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে বহু দূরের দানোর দ্বীপ নীরিক্ষা করা যায়।
অতি সামান্য কিছু টাকাকড়ির বিনিময়ে আমরা অস্থায়ী আশ্রয় পেলাম গাঁয়ের মধ্যবর্তী ক্ষুদ্র বাজারের মুদী আছিরুদ্দীর একটা চালাঘরে। সামান্য টাকার বিনিময়ে কথাটা এইজন্যই বললাম, কারণ মুদী আমাদের থেকে টাকার কথা শুনেই তওবা কেটেচিলো। পরে রসময় কবিরাজ দুইবেলা চারজনের খাবারের বিনিময়ে সামান্য কিছু অর্থ তাকে ধরে দেয়। নিজেদের তোরঙ্গ, বাক্স রেখে একটু হাত মুখ ধুয়ে, আছিরুদ্দীর দেওয়া ভেটুক ফুলের খৈ আর সাদা পিঁয়াজ কুচি খেয়ে দাওয়ায় এসে বসলাম। শহরের থেকে লোকজন এসেচে খবর পেয়ে বেশ কিছু স্থানীয় গাঁয়ের লোকজন দেখা করতে এল। কানাই আর মুখুজ্জেমশায় বাদাবনের ভাষা জানে, তারাই কথা বলতে থাকলো টুকিটাকি। আমরা বুঝতে পারলেও কইতে অপারগ।
কয়েকটি ছোট বাচ্চা ছেলেমেয়ে আমাদের দিকে জুলজুল করে চেয়ে রয়েচে দেখে হাতছানি দিয়ে ডাকলুম। তাদের কুণ্ঠা এবং ভীতি একেবারেই নাই, তারা যেন পরিষ্কার বুঝতে পারচে যে তারা নয়, আমরাই এ গাঁয়ে আশ্রয়প্রার্থী। একটি বচ্ছর বারোর ছেলে আমাকে উৎফুল্ল হয়ে শুধালো—“বাবু তোরা তো শহরের লোক, তোরা কি পাখি মারতে যাবি? বন্দুক ফোটাবি? এখন অনেক পাখি গাঙে।”
আমি হেসে ফেললাম। বুঝলাম এই ক্ষুদ্র মানবকণাদের শিকার এবং বন্দুকে ভীষণ আগ্রহ। আমি কইলাম—“তোমাদের বুঝি বন্দুক ফোটানো দেখতে খুব মজা লাগে?”
বাচ্চারা সমস্বরে জানালো—“হুঁ”
–“শহরের লোকেরা সবাই বন্দুক ফোটায় না, বুঝেছো?”
ছেলেদের দল মনে হয় কথাটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারল না। প্রথম ছেলেটি আবার মুখ খুলল— “ক’দিন আগে পাহারাওলার দল এসেচিলো, তাদের অনেক বন্দুক ছিল। তারা দরিয়ায় নৌকাডুবিতে মরেচে। তারও আগে যে বাবুরা এল, তাদের বন্দুক ছিল। সুন্দর মতো এক বাবু সারাদিন বন্দুক চোখে দিয়ে বসে থাকতো দরিয়ার পাড়ে। তাকেই খুঁজতে পাহারাওলারা এসেচিলো। তাই না রে সুকু?”
সুকু নামের মেয়েটি সায় দিলো। আমি বিস্মিত হয়ে রসময়ের পানে চেয়ে বললাম—“সুন্দর বাবু বলতে মনে হয় আপনার ভাই মণির কথাই বলচে এরা। ছবিতে তো দেখলুম তাকে। কিন্তু বন্দুক নিশানা করে সারাদিন কেউ বসে থাকবে কেন?”
রসময় ইতস্ততঃ করে উত্তর দিলে— “সে তো আমিও ঠিক কইতে পারিনে ডাক্তার। তার কোনও বন্দুক তো দেখিনি এদ্দিন। আমি নিজেও অবাক হচ্চি।” কালীপদ কথা থামিয়ে একদিকে তাকিয়ে ছিল, এখন একটু হেসে রসময়কে কইলো—“সমুদ্দুরের জলের কোন জীবকে কেউ বন্দুক দিয়ে শিকার করে না কবিরাজ। সারাদিন চোখ দিয়ে বসেও থাকে না। উনি হয়তো কাচের চোঙ দিয়ে দ্বীপটা দেখার চেষ্টা করতেন।”
রসময় হাঁ হাঁ করে উঠল— “ঠিক বলেচেন ঠাকুর। একখানা পেতলের কাচের চোঙ ছিল বটে তার। তাই হবে।”
*
দুপুর নাগাদ যখন কাছে পিঠে বেরুবার আয়োজন করচি, হঠাৎ যেন প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাম। বাইরে এসে দেখি আকাশ পুরোদমে কলুষ মুক্ত হয়ে তীব্র রৌদ্র বিকিরণ করতে আরম্ভ করেচে। সকালের সেই বাদলা আবহাওয়া একেবারেই শূন্য, তার বদলে ভরা গ্রীষ্মকালীন দাবদাহে যেন জ্বলে যাচ্চে চারদিক। কালীপদ একটু তাড়া দিয়ে কইলো— “যত শীঘ্র সম্ভব দরিয়ার পাড়ে চলো। বেশিক্ষণ এভাবে রৌদ্র থাকলে জলভাগ বাষ্পে ঝাপসা হয়ে উঠবে।”
আমরা বনের ভিতর দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম চড়ুইপোড়ার একেবারে দক্ষিণ ভূ-ভাগে। লোনা জলের বাষ্প এসে লাগচে চোখেমুখে, কয়েকখানা নারিকেল গাছের জঙ্গলের রুক্ষ ছায়া ব্যতীত চারপাশে বালি একেবারে তেতে উঠেচে। সামান্য একটু কালো মেঘের পুঞ্জ অনেক দূরের দিগন্তে জমেচে বটে, কিন্তু তা থেকে শীতলতা পাবার বিন্দুমাত্র আশা নাই। কালীপদ সমুদ্রের দিকে খর দৃষ্টি মেলে দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েচে। আমরা সেই প্রকাণ্ড জলরাশির প্রতিটি কোণায় কোণায় নজর মেলে চোখ ফেরাতে থাকলাম, কিন্তু শয়তানের দ্বীপ কেন কোনও ডাঙারই চিহ্নমাত্র চোখে পড়ল না। রসরাজ হতাশ হয়ে কইলো—“ঠাকুর, মনে হয় আজকের দিনটা সে আপদকে আর দেখা সম্ভব নয়। জলের ধোঁয়ার আড়ালে সে গা ঢাকা দিয়েচে।”
কালীপদ নিরুত্তাপ স্বরে জবাবে বললে— “আপনি সমুদ্রে কতবার এসেচেন?”
“আজ্ঞা, এই নিয়ে দুইবার। কেন ঠাকুর?”
“তাই আপনি সাগরের ছলচাতুরি ধরতে পারেননি।”
আমরা বিস্মিত হয়ে কালীপদর নির্দেশ করা আঙুলের দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে বুঝলাম দিগন্তের কাছে যাকে আমরা এতক্ষণ মেঘ বলে ভ্রম করে এসেচি, ঐটেই সেই ভয়ংকর নরখাদক দ্বীপের চূড়ো। উনুনের ফুটন্ত জলের ধুয়ার মধ্যে দিয়ে দেখলে পৃথিবীটা যেমন দোদুল্যমান মনে হয়, তেমনি সাগরের জলের উদ্বায়ী বাষ্পের মধ্যে দিয়ে এই দ্বীপটাকেও আমার তাই মনে হল। এতক্ষণ চোখ সয়ে গিয়ে খুব আবছা আবছা কিছু জঙ্গল আর টিপিও লক্ষ্য করলাম। শয়তানের আস্তানা এবং চড়ুইপোড়ার সংলগ্ন প্রতিটি মানুষের চূড়ান্ত ত্রাস সেই মানচেচ্চা দ্বীপ! যার নাম শুনলে অবধি লোকে ভীষণ আতঙ্কে কান চাপা দেয়! কারা লুকিয়ে রয়েচে ওই ঘোর আদিম বনের মধ্যে? তারা কি চাইলে সাঁতরে এইখানে চলে আসতে পারে না?
আমার চিন্তার আবেশ ছিন্ন হলো কালীপদর কথায়।— “ডাক্তার, ফাঁদ কাকে বলে জানা আছে তোমার?”
হঠাৎ এইরকম একটা প্রশ্নে চমকে উঠলাম।
— “হ্যাঁ, তা জানি দাদা। কোনও প্রাণীকে আটক করার উপকরণকে ফাঁদ বলে। হঠাৎ এ প্রশ্ন?”
— “হঠাৎ বলে কোনও কিছুই হয় না জগতে। সবকিছুতেই পারম্পর্য বর্তমান। কিছুটা সঠিক বলেচো তুমি, কিন্তু শুধু আটক করতে জানলেই তা ফাঁদ হয় না। অতর্কিতে এবং অজ্ঞাতসারে বন্দি বানানোই ফাঁদের লক্ষ্য। যে ফাঁদকে ফাঁদ বলে বোঝা যায়, তার কোনও সার্থকতা নাই। সাপের মারণশক্তি বড়ো ভয়াবহ, কিন্তু সে ফাঁদ পাততে শেখেনি, অপরদিকে মাকড়জীবির দৈহিক বল অত্যন্ত লঘু, কিন্তু সে জাল বিছাতে জানে। তাই সাপের শিকারের থেকে মাকড়সার শিকারের সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। আমার মন বলছে, ঐ সর্বনাশা দ্বীপে আমাদের জন্য অজস্র ফাঁদ পাতা রয়েচে, কিন্তু সে ফাঁদের উদ্দেশ্য এবং কার্যপ্রণালী ঠিকঠাক বুঝে না উঠলেই জীবনের সূতায় টান পড়বে ডাক্তার।”
কমুখে কিছু না বললেও আমার বুকে ভয়ের একটা পাথর চেপে বসলো। ক্ষণস্থায়ী আবেগ আর উৎসাহের বশে মুখুজ্জেমশায়ের সঙ্গে আসার জেদ করেচি বটে, কিন্তু তা গাধার পিঠের বোঝার ন্যায় জগদ্দল। কোনও উপকারিতা নাই কিন্তু বোঝা আছে ষোলআনা। মনে মনে অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে মরমে মরে রইলাম, কিন্তু কালীপদর পরবর্তী কথায় নিজের আত্মমানি অনেকটা লাঘব হলো। কালীপদ একট তাকিয়ে বলল—“তোমার মনোভাব উপরি উপরি ঠাহর করতে পারচি, কিন্তু তুমি আসায় ভালোই হল একদিকে। আমি তো ওইপারের জগৎটাকে সামান্য বুঝি, কিন্তু এপারের জগতে রোগবালাই বলেও তো একটা কথা রয়েচে। নতুন বিভূঁইতে যদি কোনও রোগের খপ্পরে পড়ি, তবেই তো চিত্তির। আমার সঙ্গে একে ডাক্তার, তায় কবিরাজ রয়েচেন। আমার কীসের ভয়?” এই বলে হোঃ হোঃ করে হেসে উঠল।
রসময়ের সামনে তার ভাইকে নিয়ে এই উদ্বেগের পরিস্থিতিতে হাসাটা শিষ্টতা হবে কিনা ভাবচি, এমন সময় দেখি কবিরাজও মুচকি হাসচে। আমাদের গুরুগম্ভীর ভাবটা কেটে মনটা লঘু হয়ে গেল।
*
বৈকালে আমরা মুদীর দেওয়া ঘরখানায় বসে বসে ডাবের জলের শরবৎ পান করচিলাম। আমি গেলাসটা রাখতে বাইরে বেরিয়ে দেখি কালীপদ দাওয়ার সামনের ক্ষুদ্র মাটিতে উবু হয়ে বসে একখানা কাঠি দিয়ে ষড়ভুজাকৃতির একটা নকশা তৈরি করে কী যেন করচে। পাশাপাশি সকালের ঐ বালক বালিকাদের দল অত্যন্ত উৎসুক মুখে দাঁড়িয়ে রয়েচে। তাদের কারুর হাতে একখানা সূতো বাঁধা ব্যাঙ, কারুর হাতে কৌটাবন্দি ফড়িং। তারা বয়স্ক মানুষের একটা ছেলেমানুষি খেলা পেয়ে ভারী আমোদ পেয়েচে। তারা কালীপদকে ইতিমধ্যেই তুইতোকারি সম্বোধন করচে এবং মুখুজ্জেমশায়ও নির্বিকার চিত্তে তাদের প্রত্যুত্তর করে চলেচে। আমার মনটা ভারী খুশি হয়ে উঠল অকারণেই। আমরা যে একটা অতি গূঢ় এবং বিপজ্জনক কাজে লিপ্ত হতে এসেচি, সে দুশ্চিন্তা আমি প্রায় বিস্মৃত হয়ে পড়লাম।
কাজের কথা টের পেলাম সাঁঝ পড়লে পর। কালীপদর সঙ্গে বেশ কিছু গাঁয়ের বয়স্থ লোকজন দেখা করতে এল মুদীর বাড়িতে। নিজের নিজের দাদু ঠাকুর্দার হাত ধরে ছেলেপিলের দলও এসেচে। লোকগুলোর কথাবার্তা শুনে বোধ হলো তারা অকারণে আসেনি, কালীপদ তাদের এই সময়ে আসতে কয়ে রেখেচিলো। সারাদিনটা প্রায় অলস এবং পরিকল্পনাহীনভাবে অতিবাহন করার ফলে জীবনের গতি যেন উদ্দেশ্যহীন এবং মন্থর হয়ে পড়েচিলো, এক্ষণে কালীপদর কথাবার্তা শুনে সেই গতি একলাফে পারদ ছাপিয়ে সবেগে ধাবিত হতে আরম্ভ করল। কালীপদ তাদের দিকে চেয়ে বললে- “আমরা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পাড়ি দেব। আঁধার থাকে থাকুক কিন্তু আজ রাতেই আমাদের নৌকা রওয়ানা হবে। আমি আর কানাই দাঁড় হাল ধরতে জানি। এই নিন নৌকার মূল্য। নৌকা আমি কিনে নিলাম।”
একজন বৃদ্ধ স্থির চক্ষে চেয়ে কইলো—“তোমরা বাছা দাঁড় সামাল দিতে পারবে হয়তো, কিন্তু সেটুকুই তো সব নয়। এতদিন ওই অপয়া টাপুর নামোচ্চারণ অবধি করতাম না আমরা, কিন্তু আজ তোমাকে নৌকা অবধি দিচ্চি। কপালে কি রয়েচে ঈশ্বর জানেন, কিন্তু তুমি যে কাজে এসেচো তাতে মুখ ফিরিয়ে থাকলে মরার পরে উপরে মুখ দেখাবো কোন লাজে? কিন্তু একজন শক্তপোক্ত চেনা মানুষ সঙ্গে নিলে কিছুটা ভালো হতো। তোমার সঙ্গের এই লোকটির চেহারা লেঠেলদের মতো হলেও সে দেহবল ঐ তল্লাটে কদ্দুর কাজে লাগবে? ওখানে যারা ওৎ পেতে রয়েচে তারা সব কাঁচাখেগো দানো।”
কালীপদ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল— “বেশ বুঝেচি আপনারা যা বলতে চাইচেন, কিন্তু তেমন লোক পাই কোথা যে জীবনের মায়া ত্যাগ করে ঐ দরিয়ার দানোর মুখে যেতে চাইবে?”
বৃদ্ধরা একটু মুখ চাওয়াচাওই করে বললে—“তেমনটি একজনই রয়েছে এই চড়ুইপোড়ায়, কিছু এলেমও রয়েচে তার, কিন্তু সে কিছুতেই
কিছুতেই যাবে না। কালীপদ উদাস স্বরে জবাব দিল— “জানি। তার নৌকাতেই আমরা এই গাঁয়ে এসেচিলাম। তার ছেলের ঘটনাটাও শুনেচি। কিন্তু…”
কথার মাঝেই দুয়ারের কাছে হঠাৎ মন্দা মাঝি একখানা মোটা যষ্টি হাতে হনহন করে উপস্থিত হয়ে কালীপদর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল–“তোমার এত বড় সাহস তুমি আমার ভিটা থেকে মাটি তুলে নিয়ে এসেচো? কী করেচো মাটি দিয়ে তুমি? বলো, কী করেচো? আমি মন্দা গুণীন। আমার সঙ্গে ধৃষ্টতা? ক্ষতি আর কী করবে আমার তুমি? আমার জীবনে বিশেষ কিছু বাকি নাই আর। তবে তোমাকে এর জবাব দিতেই হবে আজ।”
মন্দা মাঝি ভীষণ ক্রোধে এগিয়ে আসচে দেখে কানাই নিজের লাঠিগাছটা হাতে তুলে তার দিকে এগিয়ে দাঁড়ানো মাত্র প্রচণ্ড ক্রোধে মন্দা নিজের বাম হাতটা তুলে ধরলো কানাইয়ের দিকে আর সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল করলাম কানাই পাথরের ন্যায় নিশ্চল হয়ে গেল। তার চোখের মণিটাও যেন নড়চে না। মন্দা এইবার বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে রাগের স্বরে শুধালো—“এর কথায় তোদের মধ্যে কে গিয়ে মাটি এনেচিস আমার ভিটে থেকে? শীঘ্র বল।”
বাচ্চারা সমস্বরে কেঁদে উঠে বললে—“আমরা সবাই মিলেই গিয়েচিলাম আনতে। তারপর ফড়িং, ব্যাঙ আর ঘুঘুরে পোকা ধরে এনে এই বাবুকে দিয়েচি।”
মন্দা মাঝি এসে থেকেই হিংস্রভাবে তেড়ে উঠচিলো। বাচ্চাদের কথা কানে প্রবিষ্ট হওয়া মাত্র তার হাত থেকে লাঠিটা পড়ে গেল মাটির উঠানে। কিছুক্ষণ হতবুদ্ধি হয়ে চেয়ে থেকে মন্দা ক্লিষ্ট কন্ঠে শুধালো—“কী করেচেন আপনি মাটি দিয়ে ঠাকুর? ফড়িং, ব্যাঙ কিসে লেগেচে আপনার?”
কালীপদ বিষণ্ণ মনে একটু হেসে কানাইয়ের মাথায় হাত রাখলো। সাথে সাথে কানাইয়ের জড়াবস্থা কেটে গেল। মন্দা একবার অবাক হয়ে তাকিয়ে ঘটনাটা হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করল। তার বেঁধে দেওয়া ইড়াপাশের বাঁধনকে বিনা মন্ত্রে কালীপদ অবলীলায় মুক্ত করে দিল। তার বিস্ফারিত চোখের দিকে চেয়ে কালীপদ আবার কইলো—“আমি কোনও হীন উদ্দেশ্যে তোমার ভিটের মাটি তুলিনি মাঝি। তুলেচি ষটচক্রে বসবো বলে।”
— “ষটচক্রে বসেচেন আপনি! কিন্তু কার জন্য?”
–“তোমার ছেলের জন্য। তার পরিণতি সম্পর্কে জানার জন্য।” বৃদ্ধ মাঝির চোখে জল লক্ষ্য করলাম।
— “তার মৃত্যুর কথা জেনে আর কী হবে ঠাকুর? সে পূর্ণবয়স্ক সক্ষম পুরুষ। দেহের শক্তিও ছিল অসীম। কিন্তু সামান্য দেহবলে কি আর রাক্ষসের দলকে রোখা চলে? মৃত ছেলেকে তো আর ফেরত পাব না। জানার চেষ্টা যে আমি করিনি তা নয়, কিন্তু ষটচক্রে কোনও ফল দর্শায়নি।”
কালীপদর কণ্ঠস্বর এইবার একটু দৃঢ় হলো— “মৃত ব্যক্তি সংসারে ফেরৎ আসে না, সে কথা স্থির, কিন্তু তোমার পুত্র মারা যায়নি মাঝি। কোনও অজানা উপায়ে সে এবং আমরা যার সন্ধানে এসেচি, এই দুইজন জীবিত রয়েচে এখনও। ঐ দ্বীপে তারা এখনও শ্বাস নিচ্চে।”
এইবার শুধু মন্দা বা রসময় নয়, উপস্থিত প্রত্যেকে ভীষণ চমকে উঠল। রসময় আনন্দে কেঁদে ফেলল। মন্দা কালীপদকে ধরে বাতুলের ন্যায় ঝাঁকুনি দিয়ে চিৎকার করে উঠল—“আপনি তামাশা করচেন না তো ঠাকুর? সে বেঁচে রয়েচে? সত্যি বেঁচে রয়েচে? কিন্তু আমি তার স্থান উদ্দেশ্য করে ষটচক্রে বসেচিলাম যে, তার কোনও ফলাফল দর্শায়নি কেন?”
কালীপদ তাকে দাওয়ায় বসিয়ে কইলো “ফল দেখতে পাওনি একটা ছোট্ট ভুলের কারণে। ষটচক্র প্রক্রিয়া কাজ করে নির্দিষ্ট ভূমির বর্তমান অবস্থান অনুসারে। তুমি চক্র বসিয়েচিলে এই গাঁয়ের ভূখণ্ড বরাবর, ঠিক? প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগে অনেকখানি তাও সত্য। একটা জিনিস আমরা কিন্তু বারবার ভুলে যাই যে এই পৃথিবী কিন্তু একখানা প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের মতো ভয়ঙ্কর বেগে পাক খেয়ে চলেচে নিরন্তর। পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে আমরা সেই বিকট বেগের আভাস অবধি পাইনে, কিন্তু সেই রাক্ষুসে বেগ ঝড়ের মতো বয়েই চলেচে নিঃশব্দে। সেই কারণেই ষটচক্র আরম্ভ থেকে শেষ হবার মধ্যে পৃথিবীর অবস্থান অনেকখানি পালটে যায়। সেইটুকু তাল না রাখতে পারলে ফলাফল অভ্রান্ত হবার সম্ভাবনা নাই। তোমার গণনা বিন্দু দ্বীপ বরাবর হয়নি কোনওবারেই। এইবার ভেবে দেখো, তুমি কি আমাদের সঙ্গে যাবে? তুমি গেলে আমি মনে কিছুটা বাড়তি শক্তি পাই।”
মন্দার আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে কোনও স্বর নির্গত হলো না। সে নিঃশব্দে কালীপদর হাতদুটো ধরে নিজের কপালে স্পর্শ করল। আনন্দে দেখলাম মুখুজ্জেমশায়ের চোখদুটিও ঝকঝক করচে।
*
আমার ট্যাঁকঘড়িতে উঁকি মেরে দেখলাম মধ্যরাত্তির হতে আর সামান্য বিলম্ব রয়েচে। রাতের সমুদ্রের একটা আলাদা রূপ রয়েচে, তার সাথে দিনের সমুদ্রের দৃশ্যর একেবারেই সাদৃশ্য নাই। দিনের সমুদ্র আশাদাত্রী, জীবনের আকর, রত্নাকর। সে নিজের বিপুল জীবনীশক্তির ভাঁড়ারকে উন্মুক্ত করে রেখেচে মানুষের জন্য। কিন্তু রাতের সমুদ্রের রূপ বড়ো ভয়াবহ। দৃষ্টির একেবারে শেষ প্রান্ত অবধি একফোঁটা আলোর রেখা নাই, ঘোর অন্ধকার জলের রাশির উপরে দাঁতের পাটির মতো সাদা সাদা ঢেউয়ের দল যেন আগন্তুকের উপস্থিতিকে ব্যঙ্গ করে হেসে চলেচে। মাথার উপরের আকাশটাও যেন কোনও বিপদের আভাস পেয়ে অনেকটা উপরে ঠেলে উঠে গিয়েচে, সে রাতের দরিয়ার থেকে দূরে থাকতে চায়। সৈকতের বুকে প্রহরীর ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা গাছপালাগুলো হাওয়ায় শনশন করে আমাদের এগোতে নিষেধ করচে। মহামুনি অগস্ত্য যখন বাতাপী আর ইল্বলের ছলনায় প্রবেশ করতে চলেচিলেন তখনও শুনেচি গাছপালা তাঁর পথ রুদ্ধ করেচিলো। অগস্ত্য তাদের আশা দিয়ে বলেন যে তাঁকে নিয়ে কোনও চিন্তা নাই। কালীপদর কি সেই ক্ষমতা রয়েচে? সে কি নিশ্চিত নিজের প্রত্যাবর্তন নিয়ে? নাকি এই যাত্রাই আমাদের পৃথিবীর সঙ্গে সব সম্পর্ক মুছে ফেলবে?
আকাশ কুসুম আশঙ্কার কল্পনায় যতি পড়ল মন্দা মাঝির হাঁকে। এই বাদাবনের যত দ্বীপ, তার থেকে অনেক বেশি রয়েচে ছোট বড় খাঁড়ি। মাঝে মাঝে মাত্র দশ কুড়ি বিঘে পরিমাণ জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এতগুলি খাঁড়ি আড়ালে আবডালে প্রবাহিত হয় যে সব খাঁড়ির নামকরণ করা সম্ভব হয় না। ব্রিটিশ সরকার সোঁদরবনের মূল ভূখণ্ডকে অসংখ্য তালুক বা ব্লকে নথিভুক্ত করলেও খাঁড়ির হিসেব বোধকরি বাঘ ছাড়া কারুর কাছেই নাই। দক্ষিণ দিকের একটা প্রশস্ত খাঁড়ির পথ ধরে মন্দার নৌকা সাগরে পা রাখলো। একটু চড়ার দিক থেকে আমরা পোশাক গুটিয়ে নৌকার ছইতে ঢুকে পড়লাম। দুইপাশে জানালাওয়ালা ছই। কালীপদ আর কানাই বসলো সামনের গলুইতে। মন্দাকে গুরু বলে মানা কিছু মুসলমান নৌচালক আর ধীবর সামাল সামাল রব তুলে নৌকা ঠেলতে আরম্ভ করল জলের দিকে। মুদী আছিরুদ্দি বুকে হাত রেখে দরিয়ার পাঁচ পীরকে স্মরণ করে অস্ফুট কণ্ঠে বললে- “বদ বদর বদর”। নৌকা মন্দার প্রাচীন অথচ বলিষ্ঠ হাতের টানে ঢেউ কেটে এগোতে আরম্ভ করল। পাড়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের হাতের মশালের আলোগুলি এখন ক্ষুদ্র আলোকবিন্দুতে পরিণত হয়েচে। ছইয়ের ভিতরে আর গলুইতে একখানা করে টেমির মিটমিট করা আলো বাদ দিলে আমরা যেন নরকের অন্ধকার কালস্রোতে ভেসে চলেচি। অপর পারে আমাদের জন্য কোনও কুটিল নিয়তি যে হাঁ করে রয়েচে তা কিন্তু তখনও আমরা টের পাইনি। এখন সে কথা ভাবলেও আমার দুঃস্বপ্নের মতো বোধ হয়।
*
হাতে এখন সুদীর্ঘ সময়। সারা রাত্রি নৌকা ভাসালে ভোরের দিকে ঐ দ্বীপে গিয়ে ঠেকবো, অন্ততঃ মন্দা মাঝির হিসেব তেমনটাই। এই অখণ্ড অবসরে আমি ছইয়ের পর্দা তুলে মুখুজ্জেমশায়কে শুধালাম—“দাদা, গুপ্তপুরাণের ঐ ঘটনাটা বললে না তো, ঐ যে কি পিশাচের কথা।”
মন্দা মাঝির ওষ্ঠাধরে একচিলতে হাসি দেখলাম। কালীপদ নির্বিকার চিত্তে আমার আগ্রহকে অগ্রাহ্য করতে যাবে, এমন সময়ে রসময় কবিরাজ হাত জোড় করে কইলো– “ঠাকুর, আমিও জানতে চাই এ কথা। মণি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এই মরণের দুয়ারে আসবার আগে ঐ ঘটনার কথা পড়চিলো কেন? এ আমার জানা দরকার বটে। তার মনে তখন কী এমন প্রশ্ন উঠেচিলো যার উত্তর সে ঐ পুঁথিতে সন্ধান করেচিলো?”
কালী একটু কি ভেবে মুখ খুলল—“পুঁথি নয়, পুঁথির নকল। আর মাপ করবেন কবিরাজমশায়, আপনি আপনার ভাইয়ের সম্বন্ধে এইভাবে পড়েচিলো, করেচিলো ধরনের কথা কইবেন না, আমি আগেই বলেচি তারা জীবিত রয়েচে। গুপ্ত পুরাণের সে ঘটনা আমার কাছে এক অসম্ভব রহস্যময় আখ্যান বলে মনে হয়। খুব ছোট করে ঘটনাটা বলচি শুনুন— এই ঘটনা কোনও ভাবেই ঐতিহাসিক হয়, কারণ যে সময়কালে এটা ঘটেচিলো তখন ইতিহাসের জন্ম নিতে ঢের বিলম্ব রয়েচে। সৃষ্টিতে বহু ধরনের সত্বা বা যোনীর উল্লেখ রয়েচে, তার মধ্যে এক নৃশংস এবং হিংস্র যোনীর নাম পিশাচ। এই পিশাচ জগতের তৎকালীন দলপতির নাম ছিল বিদর্ভ। বিদর্ভের নব্বুইটি পুত্র ছিল যারা পিশাচ জগতের বিভিন্ন ভাগের দায়িত্ব রক্ষা করতো, কিন্তু তাতে বিদর্ভের মনে শান্তি ছিল না, কারণ তার প্রয়োজন ছিল এমন একটি উত্তরসূরীর যে হিংস্রতা এবং কুটিলতায় হবে অপরাজেয়। এই উগ্র বাসনায় বিদর্ভ পিশাচ যজ্ঞে আহুতি দান করলেন। এই যজ্ঞের মূল কারিগর যিনি, বিদর্ভের পরম বন্ধু সেই ব্রহ্মানন্দ পিশাচকে নিয়েই এতগুলো কথা বলতে বসা।
ব্রহ্মানন্দ পিশাচ ঠিক পিশাচ ছিলেন না। দেবাংশে জন্ম তার, কিন্তু সৃষ্টির বিরোধী এক ভীষণ অপরাধের কারণে তাকে নির্বাসিত করা হয় পিশাচ সাম্রাজ্যে। তো, এই ব্রহ্মানন্দর সাথে দেখা করতে বিদর্ভ এলেন হাড়জ্বলা পাহাড়ের চূড়ায়, ব্রহ্মানন্দর গৃহে। বন্ধুর বাসনা অবগত হয়ে ব্রহ্মানন্দ তাকে আশ্বাস দিলেন যে এক চন্দ্রের সময়কালের মধ্যে তিনি নানান মারণ শক্তিকে একত্রিত করে বিদর্ভকে এক পুত্রসন্তান উপহার দেবেন। পুরাণে অস্পষ্টভাবে সেই বিধির কিছুটা উল্লেখও পাওয়া যায়, শুনবে?
ব্রহ্মানন্দ বিদর্ভের নিয়োগ করা পিশাচদের দ্বারা এক বিশালাকার চাকা তৈরি করান। পুরাণে সেই চাকার নামোল্লেখ রয়েচে কালচক্র নামে। সেই কালচক্রে সমপরিমাণে মোট বারো খানা ঘর কাটা।”
আমি উত্তেজনায় এগিয়ে বসে কালীপদর হাত আঁকড়ে ধরে চাপা কণ্ঠে বলে উঠলাম- “কালচক্র! অর্থাৎ ঘড়ি! তাই তুমি গত পরশু আমার ট্যাকঘড়ি দেখে ঘড়ি আবিষ্কারের কথাখানা বললে? কি আশ্চর্য! এও কি সম্ভব?”
— “সম্ভাবনা আর অসম্ভাব্যতা নিয়েই বিশ্ব চরাচর ঘুরে চলেচে ভায়া। আত্মা দেহ ছাড়ার পরে যখন পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায়, তখন সেই বায়বীয় অ-পদার্থের পক্ষে অবিকৃত থাকাটা হল শাস্ত্রমতে অসম্ভব, কিন্তু মধ্যে মধ্যে সেই আত্মা পূর্ণ অবিকৃত রূপে জাতিস্মর হয়ে পুনর্জন্ম নেয়, এটা হল বাস্তব।”
আমি শ্বাস রুদ্ধ করে বললাম—“তারপর?”
— “তারপর সেই কালচক্রই বলো আর সুপ্রাচীন ঘড়িই বলো, সেইটের দ্বারা কোনও এক আশ্চর্য পন্থায় ব্রহ্মানন্দ মগ্ন হলেন এক অত্যাশ্চর্য পরীক্ষায়, এবং তার ফলস্বরূপ জগত সংসারের সমস্ত হিংসা, ক্রোধ, কাঠিন্য, নৃশংসতা আর লোভের সারবস্তুর খণ্ড খণ্ড অংশ নিয়ে জন্ম নিল এক ভয়ঙ্করদর্শন পিশাচ। বিদর্ভ তার নাম রাখলেন খণ্ডদেহী। তার জন্ম মাত্র পিশাচ সাম্রাজ্যে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় উঠেচিলো, যা দেখে বিদর্ভ অত্যন্ত হর্ষ বোধ করলেন। এতদিনে তার যোগ্য উত্তরাধিকারী এসেচে। খণ্ডদেহীর জন্মের ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যে সে পূর্ণবয়স লাভ করল। পিশাচরাজ বিদর্ভ নিজেও অত্যন্ত খল, হিংস্র এবং কোপন স্বভাবের পিশাচ ছিলেন, কিন্তু ঠিক তার মনোবাঞ্ছা অনুযায়ী তার পুত্র খণ্ডদেহী যে অশুভ শক্তিতে বিদর্ভেরও সহস্রগুণ অধিক, তার প্রমাণ পাওয়া গেল, যখন ঠিক একটি মাসের মাথায় অতি সামান্য কারণে সে তার নব্বইজন ভাই এবং বাপ বিদর্ভকে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলল। পিশাচেরা স্বভাবতই অত্যন্ত দুর্দম কিন্তু খণ্ডদেহীর ভয়ঙ্করতা তাদেরকেও হাড় কাঁপিয়ে তুললো।
বিদর্ভকে ভক্ষণ করে খণ্ডদেহী রাজা হয়ে বসলো। তার চণ্ডালের ন্যায় স্বভাব এবং যথেচ্ছ উৎপীড়নের ফলে দলে দলে পিশাচেরা হয় মরতে আরম্ভ করল, নাহয় সাম্রাজ্য ছেড়ে আত্মগোপন করে রইল। তার তান্ডব যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেচে, তখন একদিন গুপ্ত দূত মারফৎ তার কানে এল যে তার অত্যাচারের কথা অবগত হয়ে তারই সৃষ্টিকর্তা পিশাচ ব্রহ্মানন্দ অতি সঙ্গোপনে তাকে নিধন করার যজ্ঞ আরম্ভ করেচে। খবর শুনে খণ্ডদেহীর ঠোঁটে কুটিল হাসি খেলে গেল। তার পিতার কিছু খাস অনুচর, যারা বিদর্ভের আদেশে খণ্ডদেহীর জন্মের সময়ে ব্রহ্মানন্দর ফরমায়েশ খেটেচে, অর্থাৎ যারা হাড়জ্বলা পাহাড়ের অন্ধিসন্ধি চেনে, তাদের ডেকে ব্রহ্মানন্দকে জীবিত বন্দি করে আনার হুকুম দিল।
ব্রহ্মানন্দ নিজের পরীক্ষাগারে তন্ময় হয়ে কালচক্রের সামনে বসেচিলো। তার ধারণা ছিল এই গোপন বধ যজ্ঞের কথা খণ্ডদেহীর কানে পৌঁছায়নি। হঠাৎ চারজন বিকটদর্শন পিশাচ তার ঘরে ঢুকে পড়ল। ব্রহ্মানন্দ তড়িঘড়ি নিজের কালচক্রকে একখানা কাঠের তোরঙ্গে পুরে তাতে কুলুপ আঁটতে যাবেন, আচমকা তার মাথায় মুগুরের আঘাত নামলো। তারপর কালচক্রের প্রক্রিয়া জানার জন্য অকথ্য প্রহারে তার নাক, কান, হাতের আঙুল থেঁতলে, সূচাগ্র শস্ত্র দ্বারা হাত পায়ের নখ উপড়ে দিয়েও যখন একটি শব্দও জানা গেল না, তখন কালচক্র সমেত তাকে ঐ কাঠের তোরঙ্গে বন্দি করে নিয়ে আসা হল খণ্ডদেহীর সভাস্থলে।
উপরিভাগ উন্মুক্ত সেই সভার মেঝেতে একটা আসনে ব্রহ্মানন্দকে বসিয়ে তার পিছনে চারজন সশস্ত্র রক্ষী প্রহরায় রইল। যে তোরঙ্গে ব্রহ্মানন্দকে ধরে আনা হয়েচে, খণ্ডদেহী তার ভিতর থেকে বের করে আনলো কালচক্রের চাকতিটা। এই যন্ত্রের বর্ণনায় পবনদেব বলেচেন—‘ইহার দ্বাদশ কক্ষের স্তরে স্তরে স্বয়ং মহাকাল প্রচ্ছন্ন রূপে অবস্থান করছেন। কেহ ইহাকে বশ করিবার পন্থা জানিলে সাক্ষাৎ সময়চক্র তাঁহার করতলগত হয়। ইহা ঘাতসহ তথা সুকঠিন বজ্রযান পাষাণ দ্বারা নির্মিত।”
আমি মাঝপথে কালীপদকে থামিয়ে কইলাম—“বজ্রযান আবার কী ধরনের পাথর দাদা?”
কালীপদ কথায় বাধা পড়ায় কিঞ্চিৎ রুষ্ট হয়ে উত্তর দিল—“আমি পিশাচ নই, তাই বজ্রযান পাথর কী বস্তু আমার জানা নাই, আর এই কালচক্রের প্রকৃত স্বরূপও আমি ধরতে পারিনি, তবে বারোখানা সমান ঘর কেটে কাল নিয়ন্ত্রণ করার যন্ত্র ঘড়ি ছাড়া আর কিছু হতে পারে কি? যা হোক, এবার সংক্ষিপ্ত করে বলচি, ব্রহ্মানন্দ যতই নিজের আবিষ্কারের খুঁটিনাটি পদ্ধতি লুকানোর চেষ্টা করুন, বিদর্ভের দল পরিবর্তন করা পিশাচেরা কিন্তু এর কার্যকারিতা সম্পর্কে অনেকখানিই জ্ঞাত। তারা বললে যে একমাত্র ব্রহ্মানন্দ ঐ কালচক্রকে স্পর্শ করলে তবেই নাকি ঐ যন্ত্রের থেকে অতি ভয়ঙ্কর কিছু জীব প্রকট হয়। সেই সাক্ষাৎ সর্বনাশা এবং প্রলয়ংকর জানোয়ারের পাল তাদের সুমুখে দেব, দানব, মানুষ সহ যাকেই পাবে তাকে তীব্র জিঘাংসায় ছিঁড়ে ফেলবে। তাদের দ্বারাই খণ্ডদেহীর বিনাশের ষড়যন্ত্র করেচে শয়তান ব্রহ্মানন্দ। সব কথা শুনে খণ্ডদেহী সেই চক্রকে ব্রহ্মানন্দর সামনে ধরে শয়তানি হাসি হেসে বললে—“এই চক্রকে স্পর্শ কর।”
অনিচ্ছুক ব্রহ্মানন্দকে বহু যাতনা দিয়েও যখন কিছুতেই আজ্ঞা পালন করানো গেল না, তখন চারজন রক্ষীকে ইঙ্গিত করে বাকিদের নিয়ে পিশাচরাজ লুকিয়ে পড়ল সংলগ্ন মহলে। রক্ষী চারজন আঘাতে আঘাতে মৃতপ্রায় ব্রহ্মানন্দকে চেপে ধরে তার হাতে ছুঁয়ে দিল তার ভয়ানক সেই আবিষ্কারকে। মুহূর্তে যেন চারপাশের পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে গেল, চারপাশের বাতাস প্রখর জান্তব গন্ধে ভরে উঠল এবং ধুঁয়ার কুন্ডলী থেকে আবির্ভূত হল এক বিকটদর্শন সিংহ। তার চিৎকার আর আস্ফালনে প্রাসাদ কাঁপতে আরম্ভ করল। খণ্ডদেহীর মতো কুটিল শ্রেষ্ঠ পিশাচ অবধি সেই সিংহের বিক্রম দেখে আঁতকে উঠল। সিংহ নিজের করাল দাঁতের মধ্যে চারজন রক্ষীকে পুরে ব্রহ্মানন্দর উপরে যেই ঝাঁপিয়ে পড়ল, ক্লিষ্ট ব্রহ্মানন্দ অতি কষ্টে নিজের একটা হাত তুলে তার শরীরে স্পর্শ মাত্র আকাশে একটা কানফাটানো শ্বেতশুভ্র বজ্রের রেখা এপার ওপার ছুটে চলে গেল, আর সেই সিংহ ভীষণ চিৎকার করে চোখের পলক ফেলার পূর্বেই বাতাসে উত্থিত একটা প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে শূন্যে মিলিয়ে গেল।
মোটের উপর খণ্ডদেহী বুঝতে পারলো যে এই বিভীষণ জানোয়ারেরা তাদের সৃষ্টিকারীর ছোঁয়ায় যেমন জীবন পায়, তেমনি তাদের বিনাশও সেই একই ছোঁয়ায়। এরপর নিজের বিনাশ চিরকালের মতো রুখতে খণ্ডদেহী ব্রহ্মানন্দকে নৃশংসভাবে হত্যা করে ভক্ষণ করে এবং সেই সময় নির্ধারক মারণচক্রকে ঐ কাঠের তোরঙ্গে রেখে, শেকল বেঁধে রেখে আসে ক্ষীরোদ সমুদ্রের গভীর অতলে। এর পর বহু বৎসর ধরে খণ্ডদেহীর প্রবল অত্যাচারে পিশাচের দল অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। তার ভয়ঙ্কর শক্তিকে প্রতিহত করা ছিল দেবতার অসাধ্য। একদিন ক্ষীরোদ সাগরের পার্শ্ববর্তী সন্দ্বীপ ভূখণ্ডের সমুদ্রের তীরে এক বালিকা আনমনে শিবপূজা করচিলো, খণ্ডদেহী সেই অসামান্যা সুন্দরী বালিকাকে অপহরণের মানসে নিজের পিশাচের দল নিয়ে উপস্থিত হয় এবং পূজায় বিঘ্ন ঘটায় বিরক্ত হয়ে সেই বালিকা নাকি প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করে সেই দুর্দমনীয় পিশাচের মুন্ড কেটে হত্যা করেন। ধারণা করা হয় তিনিই শ্রীভগবতী মহামায়া। আবার অপর একটি ধারায় বলা হয় তিনি নাকি স্বয়ং ধরিত্রীর সংহারক রূপ। গুপ্ত পুরাণের এই অধ্যায়ে এইটুকু ঘটনাই বর্ণিত রয়েচে এবং সেই অধ্যায়টুকুই মণিময় যাত্রা করার অনতিপুর্বে পাঠ করেচিলো। কিন্তু কেন? শুনেচি আপনার ভাই শাস্ত্রজ্ঞ পন্ডিত মানুষ। তার কাছে কি নাউকিদের থেকে প্রাপ্ত সন্ধানের মধ্যে এমন কোনও খবর ছিল যার সঙ্গে এ ঘটনার যোগসূত্র রয়েচে?”
*
আমি ভিতরে শুয়ে শুয়ে কালীপদর বর্ণিত ঘটনাটা স্মরণ করচিলাম আর অজান্তেই নিজের ডানহাতটা বারবার বুকপকেটের ঘড়িতে গিয়ে ঠেকচিলো। কি আশ্চর্য! সেই যুগে ঘড়ি? মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসায় রাত্রি জাগরণ আমার কাছে নূতন কিছু নয়, কিন্তু আজকের চাপা উত্তেজনা আর আসন্ন পরিস্থিতির অলীক কল্পনায় শরীর বুঝি অচিরেই বিবশ হয়ে নিদ্রিত হয়ে পড়েচিলো। কতক্ষণ ঘুমিয়েচি ঠিক বোধগম্য হয়নি, হঠাৎ কিছু একটা কারণে ঘুমটা ঝটতি ভেঙে গেল। কোনও শব্দ হয়নি, কেউ ডাকেনি, অথচ ঘুমটা ভেঙেচে এবং আমার একার নয়, তাকিয়ে দেখলাম রসময় কবিরাজও ধড়মড় করে উঠে বসেচে। অতি অল্প বাতির আলোয় ঘড়ির দিকে চেয়ে বুঝলাম ভোর হতে আর সামান্য বিলম্ব রয়েচে, জানালার বাইরের সমুদ্রের বুকে খুবই ক্ষীণ আলোর আভা দেখা দিচ্চে, যাকে আলো না বলে আঁধারের ঝাপসা রূপ বললেই সঙ্গত হয়। আমি ছইয়ের পর্দার ভিতর থেকে মাথা বাড়িয়ে কালীপদকে উদ্দেশ্য করে কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাবো, আচমকা কালীপদ আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে তর্জনী স্পর্শ করে অস্ফুট স্বরে বলল- “শশশশ।” তার আচরণের মধ্যে এমন এক সতর্কতা আর বিপদের ইঙ্গিত প্রকট ছিল যে আমার শরীর যেন ভয়ে কেঁপে উঠল। দেখলাম গলুইয়ের উপরে তারা তিনজনে বসে ডানদিকে অনেক দূরে কিছু একটা লক্ষ্য করচে। বাইরের বাতিটা আগেই নিভিয়ে দেওয়া হয়েচে। আমাদের কাঙ্ক্ষিত শয়তানের দ্বীপ একেবারে সামনেই তিন চার রশি মাত্র দূরত্বে আঁধারের পিণ্ডের ন্যায় অপেক্ষা করচে, কিন্তু সেইদিকে না তাকিয়ে এরা ডানদিকে কি দেখচে? কি রয়েচে ওইদিকে?
আমি মাথা ঢুকিয়ে নিয়ে ছইয়ের ভিতরের জানালায় চোখ মেলে দিলাম অকূল পাথারের বক্ষে। চোখের নজরসীমা যে দিগন্তে গিয়ে শেষ হয়, সেই শেষ প্রান্তে আবছা মতো একখানা দ্বীপ নজরে এল। রসময় আমার দেখাদেখি একই গবাক্ষে চোখ রেখেচে। সে ক্ষীণস্বরে কইলো—“ডাক্তার, ওখানা বুঝি আর একখানা দ্বীপ? তখন হয়তো চোখে পড়েনি আমাদের, তাই না?” আমি বাম পাশে তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে ফিসফিস করে বললুম—“তাই সম্ভব, কারণ আমরা সামনের এই রাক্ষুসে দ্বীপের দিকেই মনোযোগ দিয়েচিলাম। ডাঁয়ে বাঁয়ে দেখিনি।”
রসময় কিন্তু উত্তরে সন্তুষ্ট হলো না। সে জানালাতে নজর বহাল রেখেই বলল— “আমরা না হয় দেখিনি, কিন্তু মন্দা তো এই মাটির লোক। সেও এত অবাক হয়ে ওটার দিকে দেখচে কেন? তারপর ধরো, এতখানি পথে কোথাও জল এমন উত্তাল হয়নি, কিন্তু এখন জলের ঢেউ দশগুণ বেড়ে গিয়েচে।”
কথাটা তো ভুল নয়। সত্যিই নৌকাটা যেন দুলুনিতে নড়ছে। এই দুলুনিতেই বোধহয় আমাদের ঘুম ভেঙেচে। আমি রসময়কে প্রবোধ দিলাম— “অসম্ভব তো নয়, ডাঙার কাছাকাছি এলে জল একটু ছাপিয়ে ওঠে বৈকি। আর অতদূরের একটা ছোট্ট ভূ-ভাগকে নিয়ে আমাদের অত উতলা হবার হয়তো কারণ নাই।”
কবিরাজ উদ্বিগ্ন স্বরে বললে — “অতদূরের বলতে কতদূরের? নজর চলচে না ঠিকই কিন্তু একটু দেখো তো, ওটাকে অনেক বড়ো লাগচে না হঠাৎ?”
আমি চমকে উঠে জানালায় আবার মুখ ফেরাতেই বুকের রক্ত সঞ্চালন দ্রুতগতিতে বইতে আরম্ভ করল। রসময় চশমা ছাড়া ভুল দেখেনি, অন্ততঃ একটু আগেও আমি ওটাকে যে আকারে দেখেচিলাম, তার থেকে সেটা অনেক অনেক বড়ো হয়ে উঠেচে। ভুল বললাম! বড়ো হয়নি। আকৃতি তার অবিকৃতই আছে কিন্তু এ কি! ওটা প্রচণ্ড বেগে পলকে পলকে আমাদের দিকেই ধেয়ে আসচে যে! মুহূর্তে মুহূর্তে তার চেহারা আরও স্পষ্ট হচ্চে। একটা নিটোল মসৃণ ছাতার মতো তার অবয়ব। ঠিক যেন… ঠিক যেন….।
সঠিক উপমাটা মনে পড়বো পড়বো করে পড়ার আগেই কালীপদর কণ্ঠে “সামাল” চিৎকারের সাথে একটা তীব্র ধাক্কায় নৌকোতেই হুমড়ি খেয়ে পড়লাম আমরা। হাঁচোড়পাঁচড় করে বাইরে বেরিয়ে আসতেই দেখলাম আমাদের নৌকা এই সর্বনাশা দ্বীপকে স্পর্শ করেচে ভীষণ বেগে। কানাই বিদ্যুৎগতিতে ছইয়ের ভিতরে ঢুকে আমাদের বাক্স পেটরা বগলদাবা করে, হতভম্ব আমাদের প্রায় ঠেলেই নামিয়ে দিল নৌকা থেকে, আর বাক্সগুলো মাটিতে ফেলেই তারা তিনজনে মিলে প্রবল আকর্ষণে নৌকাটাকে তুলে ফেলল ডাঙার উপর। অনেকটা পিছিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে একটা দানবাকৃতির অতিকায় কালো পাহাড় সমুদ্রের জল কেটে নক্ষত্রের বেগে চলে গেল দূরের দিকে। তার লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়েচে দেখে ভীষণ আক্রোশে জলে ডুব দিল সেটা, আর সেই ডুব দেবার কৌশল দেখেই এতক্ষণে আমার বোধ হলো যে ওটা আর যাই হোক, জড় বস্তু হতেই পারে না। যে উপমাটা তখন মনে পড়েও পড়েনি, এখন সেই কথাটাই শুষ্ক কণ্ঠে আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল— “কাছিম!”
*
আমার আর কবিরাজমশায়ের মাথায় একেবারে তালগোল লেগে গিয়েছিলো। একটা কাছিম, তার আকৃতি এমন পাহাড়ের মতো দানবীয় হতে পারে তা আমাদের কল্পনার অতীত। কী হিংস্র তার প্রকৃতি, কী তীব্র জিঘাংসা তার আমাদের প্রতি। একদম চুলচেরা সময়ে আমাদের নৌকাখানা তটে না ঠেকলে হয়তো ঢেউয়ের আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে জলে ভেসে যেত আমাদের মৃতদেহ সমেত। কালীপদ, মন্দা আর কানাইয়ের অতি সতর্ক নজরদারির জন্যই মৃত্যুর প্রথম ছোবল এড়ানো গিয়েচে। কালীপদ একেবারে সঠিক বলেচিলো যে এই মশানভূমিতে আমাদের জন্য পায়ে পায়ে মরণফাঁদ বিছিয়ে রয়েচে এবং সে ফাঁদের সার্থকতা রয়েচে তার নিজের হিংস্র স্বরূপকে লুকিয়ে রাখার মধ্যেই। নৌকাটাকে একস্থানে শক্ত করে কাছি বন্ধ করে আমরা পা বাড়ালাম অজানা দ্বীপের শরীরের অভ্যন্তরে।
ভোরের আলো ফুটেচে কিছুটা। মানচেচ্চা টাপুর ভূপ্রাকৃতিক রূপ আমাদের সামনে একটু একটু করে ফুটে উঠচে। দ্বীপটাকে একটা ঘন নিবিড় বন বললেও ভুল হয় না। এক-একটা গাছের কাণ্ড এতটাই স্থূল যে আমরা পাঁচজন পুরুষ মিলেও তাকে বেড় দিতে পারব না। সৃষ্টির শুরুর সেই আদিম সব উদ্ভিদ যেন এই বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডে যুগযুগান্ত ধরে অপেক্ষা করে আছে। দ্বীপের মাটি কিছুটা পাথুরে, কিছুটা লোনামাটিতে আবৃত। একেকখানা সামান্য লতাগুল্মের পাতাগুলিও যেন পশুর চামড়ার ন্যায় মোটা। সবকিছুই যেন একটা অতিপ্রাকৃত কাঠিন্যের মোড়কে নিজেদের ঢেকে রেখেচে। কালীপদ চলেচে সবার সামনে আর মন্দা সকলের পিছনে, মধ্যে আমরা তিনজন। আমি নীচু কণ্ঠে কানাইকে বললাম—“সর্দার, এই যে আলো ফুটে উঠচে তাতে আমরা দৃষ্টি পাচ্ছি বটে, কিন্তু আমাদের জন্য ওৎ পেতে থাকা শত্রুরাও কিন্তু দৃষ্টি পাবে।”
কানাই উদাস স্বরে বলল—“সে আপদ নাই ডাক্তারবাবু, আমাদের শত্রুরদের আমাদেরকে দেখার জন্য আলোর দরকার আছে বলে মনে হয় না।” কথাটা সত্য সন্দেহ নাই। চলতে চলতে একটা জায়গায় এসে গাছপালার ফাঁকে কিছুটা সমুদ্রের অংশ চোখে পড়ল এবং সভয়ে দেখলাম দুইখানি পাহাড় প্রমাণ দীর্ঘ মাছ নিজেদের পলকবিহীন চক্ষু মেলে আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েচে। মাছ যে এমন ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করতে পারে তা চোখে না দেখলে কক্ষণও বিশ্বাস করতুম না।
আমরা লতাপাতা ভেদ করে চলতে চলতে বেশ কিছুটা উপরে এসে পড়েচি। এইখান থেকে গাছপালা এড়িয়ে সমুদ্র নজরে পড়চে না ঠিকই, কিন্তু তার গর্জনের আওয়াজ আসচে অনেকখানি নীচের দিক থেকে। এতখানি চড়াই ভাঙতে গিয়ে হাঁপ ধরে গিয়েচিলো। উপরে তাকিয়ে দেখলাম কালীপদর গতিও পরিশ্রমের ফলে কিছুটা শ্লথ হয়ে এসেচে, তার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস জোরে জোরে পড়ছে। আমাদের সঙ্গে জল, খাদ্য এবং আনুষঙ্গিক একরাশ বোঝা রয়েচে, ফলে সেগুলি সমেতে চড়াই ভাঙা বিস্তর কষ্টসাধ্য কাজ। আমি আর কবিরাজ একটু জিরান দেওয়ার জন্য মুখ খুলতে যাব, হঠাৎ মন্দা একদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলে উঠল— “ঠাকুর, ওইটে কী?”
কালীপদ চকিতে চোখ তুলে আরও উপরের দিকে চাইলো।
আমরা হকচকিত হয়ে নজর তুলেই যা দেখলাম তাতে প্রথমেই মনে হল অনেকটা উপরের একটা স্থানে যেন অজস্র গাছের সারি পরস্পরের গায়ে নিবিড় হয়ে দাঁড়িয়ে একটা বেড়া রচনা করেচে, কিন্তু একটু পরেই বুঝলাম দন্ডায়মান বস্তুগুলো ঠিক জীবন্ত গাছ নয় বরং অসংখ্য পাথুরে স্তম্ভের ন্যায় সারি সারি বস্তু দিয়ে গড়া একটা অতিকায় প্রাসাদের মতো কিছু। কী আশ্চর্য! এই জনশূন্য স্থানে এমন দৈত্যাকার প্রাসাদ গড়েচিলো কারা? তার গায়ে জমে থাকা হাজার হাজার বৎসরের শ্যাওলা আর ছত্রাকের বহর দেখে আন্দাজ হয় এই মহল যুগ যুগ ধরে পরিত্যক্তই পড়ে রয়েচে, কিন্তু কারা এর সৃষ্টিকারী? মানুষ হওয়া একপ্রকার অসম্ভব, কারণ এই অলুক্ষুণে টাপুর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়া সম্ভবত আমরা তৃতীয় দল। তার মধ্যে পুলিশের দল তো দ্বীপে পৌঁছুতেই পারেনি।
কালীপদ পাথরের মহলের বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের ডান হাতের তালু দিয়ে বাতাসে কয়েকখানা আঁচড় কাটলো আর তারপর শূন্যে বোলানো হাতের একটা আঙুল নিয়ে জিভে স্পর্শ করল। আমরা কিছুই বুঝলাম না। মন্দা উৎকণ্ঠিত ভাবে শুধালো—“দিব্যভূতাঃ?”
কালী গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলে— “নাস্তিঃ দর্শে।”
মন্দা একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে কইলো—“তবে প্রবেশ করা যাক।” আমরা আগাছার স্তুপ কাটিয়ে, একটা মস্তবড় ভাঙা ফোকর আবিষ্কার করে প্রায়ন্ধকার যে জায়গাটায় প্রবেশ করলাম সেটাকে মহল বা প্রাসাদ না বলে আয়তাকার এবং সুগঠিত একটা দানবাকৃতির ঘর বললে ঠিক হয়। একটাই ঘর, কিন্তু তার আড় প্রায় সত্তর আশি হাত, বহরে কম করে চল্লিশ হাত মতো ব্যাপ্ত। দেওয়াল থেকে ছাত অবধি কালো কালো শ্যাওলার ছাতা পড়ে গিয়েচে। মেঝের মাঝখানে অনেকখানি স্থানে একটা বড়োসড়ো গোলাকৃতি দাগ রয়েচে। সেই স্থানটুকুতে কোনও অজ্ঞাত কারণে আজও আবর্জনা বা সামুদ্রিক শ্যাওলা দখল নেয়নি। তার পাশে ধূসর রঙের অদ্ভুত দর্শন একখানা জিনিস পড়ে আছে। সেটা পাথরের অথবা কোনও ধাতুর কিনা তা এক নজরে বোঝা যায় না। সেই পদার্থটির আকার অনেকটা প্রায় একহাত লম্বা নৌকা বা ডোঙার ন্যায়। আমরা যখন বাইরের বিপদের কথা একপ্রকার বিস্মৃত হয়ে ঘরটা ঘুরে ঘুরে দেখচি, তখন কালীপদর গলা শুনলাম—“আশ্চর্য কথা বটে কবিরাজমশায়, বড়ো অদ্ভুত কথা। একেই গাছপালাগুলো দেখে ভ্রম হচ্চে যে এই তল্লাটটা যেন প্রাগৈতিহাসিক যুগের পরে আর সময়ের সমুদ্রে সাঁতার কাটেনি, সেইখানেই থমকে দাঁড়িয়ে আছে, তাই হিসাব মতে আমাদের অদেখা নরঘাতক শত্রুরা যে আকারে দৈত্যের মতোই হবে তা সকালের কাছিম আর মাছগুলোর চেহারাতেই মালুম হয়, কিন্তু এই এত ক্ষুদ্রাকার নৌকায় পাড়ি জমাতো কারা? তেমন ক্ষুদ্র আকৃতির কোনও জীবের আগমন ঘটেচিলো এই দ্বীপে? কথা আরও আছে, এই যে এতবড় ঘরখানি, তার কিন্তু কোনও প্রবেশদ্বার নাই। আমরা যে অংশটা দিয়ে ভিতরে এসেচি সেইটে একটা নিরেট কী? এ ছাড়াও কথা আছে। এই একহাত পরিমাণ অদ্ভূত নৌকাগুলোর যদি দেওয়ালের ভাঙা অংশ, কিন্তু একটা ঘরের একটাও দ্বার না থাকার যুক্তি সত্যিই কোনও সওয়ারী থেকে থাকে, তবে নিঃসন্দেহে তাদের আকৃতি আমাদের আঙুলের চাইতে বড়ো নয়, কিন্তু তাদের জন্য এত বিরাট মহলের আবশ্যকতা কীসের?”
কালীপদ কথা বলতে বলতে নৌকার মতো পাথরের টুকরোটা তুলে নিয়ে ঝোলায় ভরে বললে — “এইটে জিম্মায় থাক, পরে ভাবনাচিন্তা করা যাবে। এখন এগোতে হবে।”
খুব সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলে ফেলে দ্বীপের অনেকখানি পথ অতিক্রম করে আমরা বেশ অনেকখানি উঠে এসেচি। পুরো পথে মাঝেমধ্যেই একটা দাগ আমাদের চোখে পড়েছে। খুব ভারী কোনও জিনিসকে যেন ঘষটে নিয়ে যাওয়া হয়েচে অনেকটা পথ জুড়ে। সমুদ্রতীরের অপেক্ষাকৃত রুক্ষ পিচ্ছিল জমি এখন ঘোর অন্ধকার মহাবনে পরিণত হয়েচে। এত ঘন জঙ্গল না থাকলে মোটামুটি আন্দাজ করা যেত দ্বীপের কেন্দ্রবিন্দু আর কতটা দূরে, কিন্তু এ পরিস্থিতিতে শুধু চলা ছাড়া আর গত্যন্তর কী? মাঝে একবার বৃষ্টি এসেচিলো বলে আছাড় খেতে খেতে একখানা পাথুরে গুহার মতো অংশে আশ্রয় নিয়েচিলাম, নাহলে প্রাণ হারাতে হতো। সে বৃষ্টির এক-একটি বিন্দু যেন এক-একখানি সুতীক্ষ্ণ ছোরার ফলা। চামড়া বিদ্ধ করে সে বারিধারা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিতে চায়। সৃষ্টির আরম্ভে যে মহাবৃষ্টিতে পৃথিবীর বুক ফালা হয়ে যেত, এ যেন সেই বৃষ্টি। আমরা ভয় পেয়ে কালীপদর পানে চাইতে সে শুষ্ক মুখে বলল—“কথায় আছে, বামুন বাদল বান/ দক্ষিণা পেলেই যান। আমাদেরও কিছু দক্ষিণা দিতে হবে।”
মন্দা ইশারা বুঝে গুহার একটু বাইরের দিকে এসে আকাশের পানে তাকিয়ে তর্জনী তুললো। কালীপদ তার পিছনে দাঁড়িয়ে একখণ্ড পাথর তুলে গুহার প্রাচীরে ঘষে ঘষে একটা ব্যাঙের আকৃতির ছবি আঁকলো। দুইজনে মিলে মন্তর পড়তে পড়তে থলের থেকে দিয়াশলাই বের করে তার জ্বলন্ত শলাকাটি আরতি করার ন্যায় সেই ছবির চতুর্দিকে ঘোরাতে আরম্ভ করল। দশ বারোখানা শলাকা খরচ করার পর আচমকা এক ধাক্কায় বৃষ্টির দমক স্তব্ধ হয়ে গেল। একটু অপেক্ষা করে আমরা বাইরে বেরিয়ে পুনরায় চলতে আরম্ভ করলাম। পিছনের কালীপদর অঙ্কিত চিত্রখানা আদিম গুহায় আদিম মানুষের আঁকা গুহাচিত্রের মতো চিরকালের জন্য লোকচক্ষুর আড়ালে পড়ে রইল।
কানাই এইবার আমাদের সামনে সামনে জঙ্গল কাটতে কাটতে এগিয়ে চলেচিলো, হঠাৎ একখানা বড়ো ঝোপে অস্ত্রাঘাত করার পরেই চমকে দুই পা পিছিয়ে এল। কালীপদ জিজ্ঞাসু নেত্রে তার দিকে চাইতেই কানাই বলে উঠল— “কর্তাবাবা, একটা লাশ! মানুষের!”
কথাটা শোনা মাত্র রসময় আর মন্দা পাগলের মতো ছুটে গেল ঝোপের ওপারে। সত্যি সত্যিই একটা মানুষের ছিন্নভিন্ন, বিকৃত মৃতদেহ পড়ে রয়েচে। টাটকা নয়, বেশ কয়েক মাসের হবে হয়তো। তার উপরে লতাপাতা গজিয়ে গিয়েচে। মন্দা সেই প্রায় বিকৃত মুখের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেললো। রসময় ধীরে ধীরে বললে—“মুখ দেখে মনে হচ্চে এই লোকটা আমাদের সুন্দরবনের একজন নাউকি। বেঘোরে মারা পড়েছে। কিন্তু মারলো কে?”
উত্তরটা মুখে দেবার আবশ্যকতা ছিল না, কারণ দেহের আশপাশের মাটিতে একধরণের বিরাট বিরাট পায়ের ছাপ রয়েচে। লোকটা মরেচে নির্ঘাত কয়েক মাস হলো, কিন্তু পায়ের ছাপ তখনকার হলেও পুরোপুরি মুছে যায়নি, এমনই তার গভীরতা। একটা সাধারণ বাঘের আকৃতি যদি দুখানি বুনো হাতীর থেকেও আরও অনেকটা বড়ো হয়, তবে তার পদাঘাতে এইরকম বিকটাকার ছাপ পড়লেও পড়তে পারে হয়তো। আমার পদক্ষেপ নিজের অবচেতনেই ভীষণ সতর্ক হয়ে উঠল। বাঘটা কাছাকাছি কোথাও লুকিয়ে নেই তো? যদি তেমন একটা করাল বিভীষিকা আচমকা সামনে লাফিয়ে এসে দাঁড়ায়, তবে দুই গুণীন মিলে তাকে রুখতে পারবে কি আদৌ? আমার গলা শুষ্ক হয়ে এসেচিলো, তাও কোনওমতে শুধালাম—“বাঘটা আশপাশে কোথাও লুকিয়ে নাই তো?” কালীপদ চোখ না তুলেই উত্তর দিলো— “বাঘ কোথাওই নাই ডাক্তার। কখনও ছিল না। এইটা কখনও বাঘের ছাপ নয়।”
মন্দা আর কানাইও ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিল। কালীপদ আবার কইলো— “বাঘের থাবা এইরকম হয় না কখনও, কিন্তু থাবাটা বিড়াল গোত্রেরই কোনও ভয়ঙ্কর আকারের জন্তুর। সম্ভবত সিংহ জাতীয়। সুন্দরবনে সিংহ কখনও চোখে দেখিনি, কিন্তু এখানকার কথা আলাদা, বুঝলে?”
আরও কিছুটা সময় নিরীক্ষণের পর কালীপদ নিঃশ্বাস ফেলে বলল— “নাহ, এটা সিংহ না হয়ে যায় না বুঝলে মাঝি। আরও না জানি কত শয়তান অপেক্ষা করচে সামনে। তোমার গুরুদেব কখনও ভুল বলার মানুষ নন। উনি যথার্থ বলেচেন। এই মশানভূমিতে আরও রাশি রাশি শয়তানের দল ওৎ পেতে রয়েচে আমাদের জন্য। তবে আমার একটা বিষয়ে ভারী অসোয়াস্তি হচ্চে।”
মন্দা বিস্মিতভাবে শুধালো—“অসোয়াস্তি? কীসের উদ্বেগ ঠাকুর?”
কালীপদ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে কইলো—“বলতে পারি নে, তবে আমাদের চিন্তাভাবনার মধ্যে কিছু একটা ফাঁক থেকে যাচ্চে মাঝি। আমাদের চোখের সামনেই কী একটা যেন ঘটচে, কী একটা যেন চলচে, একটু হাতড়ালেই ধরা পড়বো পড়বো করেও সেই কথাটা কিছুতেই ধরতে পারচি না। যা হোক, সে পরে অবসরে ভাবা যাবে, এখন এগিয়ে চলো। এখনও অবধি কোনও জানোয়ারের সাক্ষাৎ আমরা ডাঙায় উঠে পাইনি, কিন্তু পাব না এ কথা বলা চলে কি?”
*
উত্তল ঢালু জমি বেয়ে আরও প্রায় অনেকখানি উজিয়ে এসেচি আমরা। দুই জায়গায় স্বাদু জলের দু’খানি উৎসকুণ্ড চোখে পড়েছে, বেশ কিছু ফলের গাছও রয়েচে যদিও সেগুলি আহারযোগ্য কিনা জানা নাই, তবে কালীপদর ধারণা এর মধ্যে কিছু ফল খাওয়া চলে এবং তার সাহায্যেই হয়তো মণিলাল এবং মন্দার ছেলে এখনও নিজেদের জীবন রাখতে পেরেচে। মাঝে একটা ঘটনা ঘটেচে। একটা স্থানে বেশ কিছুটা এলাকা জুড়ে অসম্ভব পাথরের স্তুপ থাকায় সেইখানে জঙ্গল একটু অবিন্যস্ত হয়েছিল, ফলে সেই অংশটুকু থেকে ঝাপসাভাবে দরিয়ার কিছুটা দেখা যায়। আমি চলতে চলতে বেদম হয়ে একটা পাথরের উপরে বসতেই মনে হল অনেক দূর থেকে কী যেন একটা বিশাল ছায়ার মতো জিনিস সাঁৎ করে সরে গেল। আমি এমনিতেই আতঙ্কিত হয়েই ছিলাম, তদুপরি এমন ঘটনায় আমি লাফিয়ে উঠে কিছুটা পিছিয়ে এলাম। হয়তো আমার মনের ভ্রম বলে উড়িয়ে দিতাম কিন্তু কালীপদর দিকে তাকাতেই বুঝলাম তারাও কিছু একটা টের পেয়েছে নিশ্চয়ই। মন্দা আর কানাই দুটো গাছে চড়ে অন্যান্য গাছগুলোর মগডালের পানে নজর রাখলো। কোনও বড়ো মাপের জন্তু যদি বনে চলাচল করে, তবে উঁচু গাছের উপর থেকে জঙ্গলের বাকি অংশের গাছের নড়াচড়া দেখলে বোঝা যায়, কিন্তু তারা নেমে এসে বলল কোত্থাও কিছু নাই। দুরুদুরু বক্ষে আবার যখন এগোতে আরম্ভ করেছি, আচমকা কালীপদর গলা পেলাম—“দাঁড়াও, কিন্তু খবরদার কেউ পিছনে তাকাবে না।”
আমার হাঁটু দুটো রীতিমতো কাঁপচে। পিছনে কী রয়েচে? সিংহ?
আবার কালীপদর কণ্ঠ শুনলাম—“শোনো, আমাদের পিছনে কেউ একটা আমাদের দিকে দেখচে। আমি টের পাচ্চি বেশ, কিন্তু সে রয়েচে সম্ভবত দরিয়ার বুকে। ডাঙায় উঠে আক্রমণ করা নিশ্চয়ই তার সাধ্যের বাইরে, নচেৎ এতক্ষণ সে ধেয়ে আসতো। আমরা তাকে দেখতে চাইলেই সে আত্মগোপন করবে বুঝতে পারচি, তাই আমি ঘুরতে বলা মাত্র বিদ্যুৎবেগে পিছনে ঘুরেই সাগরের দিকে নজর ফেরাবে। তাকে দেখাটাও দরকার।”
কালীপদ ইঙ্গিত দেওয়া মাত্র যথাসম্ভব শীঘ্র পিছু ঘুরে তাকালাম। কতোখানি দূরের জলে পরিষ্কার নজর চলে না, কিন্তু তাতেই যা ঠাহর হলো তাতে আমাদের মাথা ঘুরে যাবার উপক্রম! এতক্ষণে আমরা যেসব দানবগুলোকে দেখেচি সেগুলির তবু যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা চলে। কিন্তু এই জন্তুটা কী! একটা ভয়ঙ্কর আকারের জীব জল থেকে তার বিরাট বিরাট দু’খানি ঢেলার মতো চক্ষু মেলে হিমশীতল দৃষ্টিতে আমাদের দিকে চেয়ে রয়েচে। ঠিক হাতী নয়, কারণ প্রাণীটার মাথাটা দেহের সঙ্গে অস্বাভাবিক রকমের বিসদৃশ, মাথার উপরে একটা প্রকাণ্ড লকলকে হাতের মতো শুঁড়, মুখের দুইপাশে দুইখানি হিংস্র দাঁত ঠেলে বেরিয়েচে, কিন্তু সেইসাথে শ্যাওলাধরা গায়ে চাকা চাকা দাগ! এমন কদাকার প্রাণী অতি দুঃস্বপ্নেও কেউ কল্পনা করতে চায় না! কিন্তু এই বর্ণনাটুকু যা দিচ্চি, তা কিন্তু মাত্র এক ঝলক দেখার বর্ণনা মাত্র, কারণ আমরা পিছনে ঘুরতেই এক পলকে অত বড় জীবটা হুড়ুম করে জলে ডুব দিল। সেই ধাক্কায় জলে যেন একটা ঘূর্ণি তৈরি হল, আর তখন দেখলাম জীবটার পিছনে একটা পর্বতাকার কুম্ভীরের ন্যায় লেজ। কালীপদ অথবা কানাইয়ের এসব দেখা অভ্যাস থাকতে পারে, কিন্তু আমার শরীর ভীষণ এক আতঙ্কে সম্পূর্ণ বিবশ হয়ে পড়ল। এক পা নড়ার আর সাধ্য নাই। আমি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয়েচি দেখে আমার মনের অবস্থা অনুমান করে কালীপদ আমার কাঁধটা শক্ত করে ঝাঁকিয়ে প্রশান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে কইলো- “ভয় নাই ডাক্তার। আমি, রায়দীঘড়ার কালীপদ মুখুজ্জে তোমার সঙ্গে আছি তোমাকে রক্ষা করার জন্য। অন্ততপক্ষে আমি বেঁচে থাকতে তোমার জীবন বিনষ্ট হবে না।”
কালীপদর মুখের এই একটা আশ্বাসের ভঙ্গিতে বোধকরি মরা মানুষও উঠে বসে, আর আমি কোন লাটবেলাট? আমার মনটা কিছুটা হালকা হয়ে এল, শরীরের শক্তি যেন কোনও এক মন্ত্রবলে আবার শরীরে প্রবেশ করল। আমি হাসিমুখে কালীপদর হাতে একটু চাপ দিয়ে আবার চলতে শুরু করলাম।
*
এইবার এমন একটা স্থানে এসে দাঁড়ালাম, যেখানে দাঁড়িয়ে পুরো দ্বীপটাকেই প্রায় ছবির মতো দেখা চলে। এইখানে বিস্তৃত এলাকা জুড়ে প্রস্তরময় ভূমি। মাঝারি আকারের কতকগুলি কঠিন পাথরের টিলা, তার গোড়ায় কয়েকখানা গুহার মতো মুখ। একটা অতি ক্ষুদ্র ঝোরা তার ক্ষীণ জলধারা নিয়ে বয়ে চলেচে। এইদিকটা গাছপালা শূন্য। মন্দা চারদিকে তাকিয়ে কইলো– “ঠাকুর, এতক্ষণে বুঝি আমরা মানচেচ্চার একেবারে চূড়োয় এসে পড়েছি।”
কালীপদ কইলো—“তাই মনে হচ্চে, তবে এইদিকটা একবার ছুঁড়ে দেখা দরকার।”
রসময় এতক্ষণ পরিশ্রমে নির্বাক হয়ে রয়েচিলো। এইবার ধীরে ধীরে বলল—“কিন্তু ঠাকুর, এইসব গুহাগুলি ঐ ভয়ঙ্কর শয়তানদের বাসস্থান হতে বাধা কী? হয়তো এইখানেই পশুগুলো ঘাপটি মেরে লুকিয়ে রয়েছে।”
মন্দা মাঝি মাথা নেড়ে বললে—“আমার তা মনে হয় না। প্রথমত, এইটা বেশ লক্ষ্য করেচি যে এই শয়তানরা কখনও দলে ঘোরাফেরা করে না। একটি জানোয়ারের বিচরণকালে দ্বিতীয় জন্তুটাকে চোখে পড়ে না। হয়তো একটাই শয়তান ভেক বদল করে শিকার ধরে। আর দ্বিতীয় কথা, এই গুহার যা সঙ্কীর্ণ প্রবেশপথ, তাতে কোনও দৈত্যাকার জীব এইখানে লুকাতে পারবে না।”
কালী নীচু সুরে বললে— “তোমার কথা অভ্রান্ত বলেই আমার মনে হচ্ছে মাঝি, কিন্তু একটা কথা বারবার কেন বিস্মৃত হচ্চো তোমরা, এরা কিন্তু কখনওই কোনও সাধারণ পশু নয়, এরা নিঃসন্দেহে মায়াবী। আমরা তাদের আসল স্বরূপটা একেবারেই জানিনে। যদি তারা খুব ছোট আকৃতিতে লুকিয়ে থাকতে সক্ষম হয়, তবে কিন্তু ঘোর বিপদ। ঐ ছোট ছোট পাথুরে নৌকাগুলো দেখে খুব ক্ষুদ্র জীবের থাকার সম্ভাবনাও তো হেলাফেলা করা যায় না। যায় কি? তবে কথা হলো, তাদের লুকানোর দরকারই বা কীসের?”
কথা বলতে বলতেই কালীপদ খর চক্ষে চারদিকে নজর ফেরাল। গুহা অনেকগুলিই রয়েচে, কিন্তু কালীপদ অনেক বেছে বেছে একটা গুহা খুঁজে দেখার সিদ্ধান্ত নিল। গুহাটা ঐ ঝোরার পাশের টিলায় মুখব্যাদ্যান করে দাঁড়িয়ে রয়েচে। তার মুখে দুই চারটি পাথর এমনভাবে বসানো রয়েচে যে প্রবেশপথটা একনজরে ঠাহর হয় না। আমরা অতি লঘুপদে একটুও শব্দ না করে গুহায় প্রবেশ করলাম। ভিতরে একেবারে ঘুটঘুটে আঁধার, নজর চলা দায়। ভিতরের বাতাসে একটা চাপা বুনো গন্ধ। কানাই নিজের হাতের সড়কিটা বজ্রমুষ্টিতে চেপে ধরলো। রায়দীঘড়ার সুবিখ্যাত লাঠিয়াল নিজের শাণিত অস্ত্রের ফলার ধার পরীক্ষা না করে শত্রুকে জমি ছাড়বে না। এতক্ষণ আঁধারে থেকে চোখ কিছুটা সয়ে এসেচিল, আরও কিছুটা এগিয়ে এইবার অপেক্ষাকৃত চ স্থানটাতে পা রাখতেই হঠাৎ মনে হলো মুখুজ্জেমশায়ের অনুমান একেবারে অভ্রান্ত। আমাদের সেই সামান্য পায়ের শব্দ পেয়ে অন্ধকারের মধ্যেও আরও অন্ধকার একটা ছায়ামূর্তি যেন একটা বিরাট লাফে বামদিকে সরে গেল। আমার হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল ভয়ে। মনে হল সবটাই একটা ষড়যন্ত্র! কেউ যেন আমাদের অবাধে গুহায় প্রবেশ করতে দিয়ে বাইরে বেরোনোর পথ অবরোধ করতে চাইচে। কানাইয়ের চোয়াল কঠিন হয়ে উঠল। সড়কিটা বাগিয়ে ধরতে যেতেই কালীপদ তাকে গায়ে হাত ঠেকিয়ে নিরস্ত করে, দুই পা এগিয়ে গিয়ে ভরাট স্বরে বলে উঠল—“বেরিয়ে এসো মণিময়। আমরা মানুষ। ভয় নাই।”
আমাদের হতবুদ্ধি করে দিয়ে পাথরের ওপাশ থেকে বেরিয়ে এল এক শীর্ণকায় মানুষ। এই প্রায়ান্ধকার গুহায় তাকে প্রেতমূর্তির ন্যায় মনে হচ্চে। আমরা গুহার মুখে আলোর মধ্যে এসে একটু বসলাম। মণিময় কবিরাজ পূর্ণবয়স্ক জোয়ান পুরুষ, কিন্তু দাদার বুকে মুখ রেখে সে অঝোরে যেভাবে কেঁদে চলেচে তাতে তাকে শিশু বলে মনে হলো আমার। মন্দা মাঝির ছেলেকেও ঐ গুহাতে পাওয়া গেল। সেই কিন্তু প্রথম গুহাটায় লুকিয়ে ছিল, পরবর্তীতে মণি এসে সেইখানে প্রাণভয়ে আশ্রয় নেয়। বুনো ফল আর বিস্বাদ জল খেয়ে তারা কোনও মতে জীবন রক্ষা করেচে অদ্যবধি। তাদের উদ্ধার পাবার আশা ছিল প্রায় শূন্য, ফলে একরাশ হতাশা আর নৈরাশ্যের মধ্যে আপনজনের দেখা পেয়ে তাদের বাঁধ ভেঙে গিয়েচে। আমাদের দেওয়া পানীয় জল এক নিঃশ্বাসে নিঃশেষ করে মণি ভাঙা গলায় কালীকে শুধালো- “আপনাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার পরিসীমা আমি ভাষায় বোঝাতে পারিনে মহাশয়। আপনি আমার জীবনদাতা। কিন্তু এত অজস্র গুহার মধ্যে আপনি আমাদের এই গুহাটাই কেমন করে অনুমান করলেন? শয়তানগুলো অবধি যে গুহার সন্ধান পায়নি, আপনি এক লহমায় কেমন করে বের করলেন?” রসময় স্নেহের সুরে বললে— “মণি, উনি কালীপদ মুখুজ্জে। ব্রাহ্মণ। ওঁকে প্রণাম করো।”
মণিময় প্রণাম করতে যেতেই কালীপদ তড়িঘড়ি তার হাত ধরে ফেলে বলল—“খবরদার পা ছোঁবে না। আমি পা ছুঁয়ে প্রণাম গ্রহণ করিনে সহজে। গুরুর নিষেধ রয়েচে। আর জাতের পরিচিতিটুকু কিন্তু কখনও শ্রদ্ধার মাপকাঠি হতে পারে না। সম্মানের মাপ হয় মানুষের কর্মে। আমি গায়ত্রীর কারণে পৈতা ধারণ করি বটে কিন্তু তন্ত্র শিক্ষালাভের সময় নিজের পূর্ব পরিচয়, জাত্যাভিমান, বংশ পরিচয় সব ঘুচিয়ে দিয়ে একজন নিখাদ মানুষ হয়ে দীক্ষা নিতে হয়। পৈতাও ত্যাগ করতে হয়। এইটেই সর্বকালের বিধি। যাই হোক, আমি এতগুলো গুহার মধ্যে এই গুহাটা বেছে নিয়েচি, কারণ একমাত্তর এইটাতেই মানুষের মতো কোনও বুদ্ধিমান জীবের ছাপ রয়েচে। কোনও পণ্ড যতই শক্তিশালী হোক, গুহার মুখে দোর দেবার বুদ্ধি তাদের নাই। দুয়ার জিনিসটে তৈরি করতে উচ্চমানের বুদ্ধি দরকার।”
মন্দার পুত্র সুশীল তার পাথর সাজানো গুহাদ্বারের দিকে তাকিয়ে লজ্জিত ভাবে হাসলো।
মণি বলল— “আপনারা না এলে আমাদের এই দ্বীপেই সমাধি হতো মুখুজ্জেমশায়। যে ফুলের সন্ধানে এইখানে আসা তা আমি খুঁজে পাইনি। আমাদের রসদ, মালপত্র, বাক্সপেটি সমস্ত সাগরের পাড়ে হারিয়ে গিয়েচে। জল না হয় পাশাপাশি রয়েচে কিন্তু এতদিন ধরে খেয়ে খেয়ে কাছাকাছি গাছের ফল প্রায় শেষ হয়ে এসেচে। অধিক দূরে যেতে সাহস হয় না। কখন পিঠে মৃত্যুর থাবা এসে পড়বে কে বলতে পারে।”
মাঝপথে কথা থামিয়ে কালীপদ বললে—“তোমাদের সঙ্গে কোনও পাত্র তো নাই, তোমরা ঝোরা থেকে জল সংগ্রহ করো কী উপায়ে?”
মণি গুহার ভিতর থেকে আমাদের দেখা সেই নৌকার মতো একটা পাত্র এনে কইলো—“আমরা দ্বীপে পা রাখতেই একটা বিকটাকৃতি ষাঁড় আমাদের আক্রমণ করে। তার আকার দেখে আমার হাতীর চেয়েও বড়ো মনে হলো। সেই ভয়াবহ জন্তুটা ঝাঁপিয়ে পড়েচিলো আমার পরিচারক ফাগুর ওপরে। আমরা কিছুটা পথ দৌড়ে ওঠার পর পিছনে তাকিয়ে দেখলুম সেইটা আমাদের তাড়া করে আসচে। সেই হুড়োহুড়ির মধ্যে যখন দরিয়ার পাড়ে মালপত্র খোয়া গেল তখন দৌড়াতে দৌড়াতে একটা বিশাল ঘরের মতো দেখে তাতে চারা পড়ি আমি আর আমার দুইজন নাউকি রাসবিহারী আর বসন্ত। তার ভালে নাম অনন্ত কিন্তু আমরা একটা কারণে বসন্ত ডাকি।”
কালীপদ মাথা নেড়ে কইলো—“সে কথা শুনেচি। তারপর?”
“তারপর? তারপর সেই ঘরে একটা ফোকর দিয়ে ঢুকে পড়লাম। সর্বনাশা দানবটা হয়তো আমাদের দেখতে পায়নি। সে ফিরে গেল। আমি সেইখান থেকেই এইটা তুলে এনেচি জল আনার জন্য, না হলে ঝোরায় বারংবার গিয়ে জল পান করতে গেলে বেঘোরে মরতে হতো।”
আমি মণিময়ের বুদ্ধি এবং দূরদর্শীতার পরিচয় পেয়ে চমৎকৃত হলাম। আদাড়ে বাদাড়ে ভেষজের সন্ধান করতে করতেই হয়তো তার বাস্তবজ্ঞান অতিশয় প্রখরতা প্রাপ্ত হয়েচে। রসময় প্রশ্ন করল— “মণি, তোমার সঙ্গে তো দুইজন ছিল। একজন নাউকির দশা আমরা পথে দেখেই এসেচি। সেই বোধহয় বসন্ত, নয়? তার কী হলো?
মণির চক্ষে এইবার ভয়ের ছাপ পড়ল।
— “হ্যাঁ দাদা, সেই বসন্ত। বাড়ি পীরখালি। তারপর আমরা ঝোপঝাড় ভেঙে এগোতে এগোতে কিছুটা দূরে গাছপালায় আচ্ছন্ন একটা শুকনো ঘাসে ছাওয়া অনেকটা উচ্চ ঢিবি চোখে পড়ল। জঙ্গলে ছায়ায় পথ হারাচ্চি বলে উঁচু ঢিবিতে উঠে দিক নির্ধারণ করবো বলে কোনও রকমে তার চূড়োয় উঠলাম। চূড়ান্ত মানসিক চাপে তখনও আমরা ধরতে পারিনি যে এই জনবর্জিত দ্বীপে যেখানে গাছপালা, আগাছা যতই থাকুক, কোথাও একফোঁটা ঘাস নাই, সেখানে এই ঘাসের ঢিবি এল কোথা থেকে? টের পেলাম একটু পরেই। খুব কাছাকাছি একখানা ভীষণ নিনাদে বজ্র পড়ার মতো শব্দের সঙ্গে আমরা অত উঁচু থেকে ছিটকে পড়লাম নীচের আগাছার ঝোপে। আমার পায়ে এত আঘাত লেগেচিলো যে আর এক পা এগোতে শক্তি ছিল না, কিন্তু পালাতে আমাদের হতোই কারণ ততক্ষণে আমরা যেটাকে ঘাসের ঢিবি ভেবে ফাঁদে পা দিয়েচি, সেই ঢিবি তার আসল রূপ পরিগ্রহ করে উঠে দাঁড়িয়েচে। রাসবিহারী পাগলের মতো চিৎকার করে বলল—‘দাদাবাবু পালাও! সিংহ!” আমরা শরীরটাকে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে পালাতে আরম্ভ করলাম। রাসু আমার পাশেই ছিল, কিন্তু বসন্ত ছিটকে পড়েচিল অনেকটা দূরে। হয়তো আমার পরমায়ু ছিল বলেই সিংহটা আমাদের উপর দিয়ে একটা ধূসর পাহাড়ের মতো ধেয়ে গিয়ে মুখে পুরলো বেচারা বসন্তকে। আমাদের তখন অপেক্ষা করার অবকাশ ছিল না। ঝোপঝাড় ভেঙে পাগলের ন্যায় ছুটে আমরা এসে পড়লাম পাথুরে টিলার মাঝখানে। জঙ্গলের পথে দৌড়াতে মাঝখানে অনেকখানি সময়ই অতিক্রান্ত হয়েচে কিন্তু সেই দুর্দান্ত শ্বাপদ আমাদের আর তাড়া করে আসেনি। দম হারিয়ে মাটিতে বসে পড়ার পর আমাদের শরীরে আর একবিন্দু শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। বিপদ আপদ বিস্মৃত হয়ে কতক্ষণ পড়েচিলাম খেয়াল নাই, সম্বিৎ ফিরলো একটা মৃদু ভূকম্পনে। পাথরে ছাওয়া এলাকাটা যেন একটু একটু কাঁপচে। ধীরে ধীরে সেই কাঁপুনি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্চে, সঙ্গে কানে আসচে পাথরে পাথরে ঠোকাঠুকির মতো খট্ খট্ খট্ শব্দ। কিছু একটা বিপদের আশঙ্কা করে যেই মাত্র অতি কষ্ট হলেও উঠে দাঁড়াতে যাব, হঠাৎ যা চোখে পড়ল তাতে আমার শ্বাসক্রিয়া রুদ্ধ হবার জো হলো।
প্রস্তুরময় উঁচু উঁচু টিলার মাথা ছাড়িয়েও যেন আরও উঁচু একটা কালো পাহাড় মাথা তুলেচে আকাশে, তার দুইখানি চোখ দেহের থেকে বাইরে ঠেলে বেরিয়ে এসেচে। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিছন থেকে কে যেন আমাদের চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টেনে এই গুহার মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। ঘাড় ঘুরিয়ে চমকে দেখলাম আমাদেরই মতো একজন জীবন্ত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। আমরা বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেচিলাম। এই সুশীল আমাদের গুহারাষ্ট্রে ঢুকিয়ে নিয়ে পাথরের চাঁই বসিয়ে দ্বার রোধ করে দিল। সেই দ্বারের একেবারে উপরের দিকে সামান্য ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ল এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য, যা দেখার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না! টিলার ওপার থেকে বেরিয়ে আসচে একখানা প্রকাণ্ড সামুদ্রিক কাঁকড়া। তার এক-একখানা দাঁড়ার আকার শালগাছের গুঁড়ির চাইতে আরও মোটা, এবং সামনের বজ্রদাঁড়া দুটির সাহায্যে সে হেসে খেলে আমাদের গুহা সমেত টিলাটাকে পিষে ধূলা করে দিতে পারে চোখের নিমিষে। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য, সে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করল না। পাথর কঠিন জমির ওপরে নিজের ততোধিক পাথুরে শরীর নিয়ে সে বেরিয়ে চলে গেল ঐ ডানদিকের বনের ভিতর।”
মণিময় একটু শ্বাস নিয়ে আবার অনেকটা মিষ্টি জল পান করল বুক ভরে কালীপদ একটুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে শুধালো— “আর রাসবিহারী? সে নাই কেন? তার কী হয়েচিলো?”
–“বলচি ঠাকুর। তার যা হয়েচিলো সে কথা সবচাইতে আশ্চর্যজনক ঘটনা। এতক্ষণ যারা আক্রমণ বা হানা দিয়েচে তারা সবাই পশু, কিন্তু রাসুকে যে হত্যা করেচে সে যে কী ধরনের জীব তা আমরা ধরতে পারিনি। একদিন সুশীলের ভয়ানক জ্বর এল। তাকে নিজের কামিজ ছিঁড়ে জলসেক দিচ্চি আমি, তাই দেখে রাসু গেল ফল জোগাড় করতে। অন্যান্য সময়ে আমরা একসাথে যাই, কিন্তু এখন ভাবি ঐদিন একসাথে গেলে কি কেউই ফিরতাম? কিছু সময় পরেই ওপাশের বনে একটা হুটোপুটির শব্দ আর রাসুর ভয়ার্ত আর্তনাদ কানে আসামাত্র আমরা ধড়মড়িয়ে উঠে গুহার মুখে এইখানেই এসে উঁকি দিয়ে দেখি কোথাও কেউ নাই, শুধু রাসবিহারী একাই হাহাকার চিৎকার করতে করতে পাগলের মতো দৌড়ে আসচে এইদিকেই। আমি তড়িঘড়ি গুহামুখের পাথরগুলো সরাতে যাব, হঠাৎ সুশীল জ্বর বিধ্বস্ত ক্লিষ্ট স্বরে বলল—‘দোর খুলো না। পিছনের জঙ্গলে কিছু একটা আছে। গাছের আড়ালে লুকিয়ে রয়েচে সে।’
আমি হতভম্ব হয়ে সরে এলাম। কাজটা অত্যন্ত গর্হিত হয়েচিলো সন্দেহ নাই কিন্তু আপৎকালে ন্যায়ধর্ম কবেই বা কাজে এসেচে বলুন ঠাকুর? আত্মরক্ষাই প্রত্যেকের প্রথম অধিকার। রাসু যখন দৌড়াতে দৌড়াতে আমাদের কাছাকাছি প্রায় চলে এসেচে, হঠাৎ দূরের বনটা যেন প্রচণ্ড ঝড়ে ভীষণভাবে কেঁপে উঠল, আর জঙ্গলের থেকে তিন লাফে যে জিনিসটা এসে দাঁড়ালো তার পিছনে, তাকে দেখে আমাদের মাথায় গোল লেগে গেল। প্রায় চল্লিশ হাত উঁচু একটা কুচকুচে কালো ঘোড়া, তার বিশাল পুচ্ছ ঝড়ের মতো বাতাসে ঝাপটা খাচ্চে, কিন্তু তার থেকেও আশ্চর্য তার সামনের অংশটুকু। ঘোড়াটার মাথার জায়গায় অবিকল একটা বনমানুষের মতো দশাসই জন্তুর মুখ ঠেলে, বেরিয়েচে, দুইপাশে আমাদের মতোই দুইখানি বলিষ্ঠ হাত, সেই হাতে প্রায় তালগাছের কাণ্ডের মতো একটা সুদীর্ঘ দণ্ডের মতো বস্তু ধরা রয়েছে। আমি নানান দেশের বহু কেতাব পড়েচি ঠাকুর, এই জন্তুটাকে দেখে আমার প্রথমেই যার কথা মনে পড়ল তার কাছাকাছি উল্লেখ আমি গ্রীক দেশের কতিপয় সাহিত্যের মধ্যে পেয়েচি। তাদের সেন্টর বলা হয়। এরা অর্ধেকটা মানুষ, অর্ধেক ঘোটকাকৃতি এক সুদক্ষ যোদ্ধা জাতি, কিন্তু তারা গ্রীকদের কল্পলৌকিক প্রাণী, তাদের বাস্তবে কোনও অস্তিত্ব নাই, অথচ সেই একই জীব আমার সামনে তার ভয়ংকর শরীর মেলে সশরীরে দাঁড়িয়ে রয়েচে। আমি থাকতে না পেরে সুশীলের উপরে ঢলে পড়লাম আর বাইরে রাসুর একটা মর্মভেদী চিৎকার কানে এসেই স্তব্ধ হয়ে গেল। বহুক্ষণ পর কিছুটা ধাতস্থ হয়ে পাথর সরিয়ে দেখি সেই গ্রীক লোককথার দানবাকৃতির জন্তুটা অদৃশ্য হয়েচে আর রাসবিহারীর থেঁতলে চৌচির হয়ে যাওয়া মৃতদেহ কাদার পিণ্ডের ন্যায় ছড়িয়ে রয়েচে এই আমাদের সামনের এই জায়গাটায়। তার মাথাটা খুঁজলে এখনও পাথরের খাঁজে পাওয়া যাবে হয়তো। তার পর থেকে খুব সন্তর্পণে আমরা অনেকবার ফল তুলে এনেচি, জলও ধরেচি, কিন্তু দূর থেকে কিছু আওয়াজ পেলেই রুদ্ধশ্বাসে গুহায় ঢুকে দোর দিয়েচি। কত দিন অভুক্ত থেকেচি। আজ জানিনে কপালে বিধাতাপুরুষ কী লিখে দিয়েচে, কিন্তু এই অভিশপ্ত দ্বীপ থেকে জীবন্ত বেরুতে পারব কিনা তিনিই জানেন।”
সব কথা শুনে কালীপদর ভ্রুকুটি কুটিল হয়ে রইল। এই ভ্রুকুটির অর্থ আমি আর কানাই বিলক্ষণ জানি। তার মনের গহীনে এখন নানান তথ্যগুলি একটা কল্পনার সুতায় গাঁথা হয়ে চলেচে। জানি না শেষ অবধি কী পরিণতি হবে আমাদের। কালী একসময় চিন্তার জাল ছিঁড়ে কইলো—“দেখো মণিময়, তুমি যে গ্রীক সেন্টর যোদ্ধাদের উদাহরণ দিলে সেই লোককথা আমিও বিলক্ষণ শুনেচি, কিন্তু আমাদের দেশেও কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীত একটা আকৃতির উদাহরণ রয়েচে। আমরা চারখানা বেদের নাম জানি। ঋকবেদ হলো শাস্ত্র বিষয়ক, সামবেদ হচ্চে গানের আধার, যজুর্বেদে ক্রিয়াকর্মের যাবতীয় মন্ত্র …লিপিবদ্ধ রয়েচে আর অথর্ব বেদে রয়েচে কালোবিদ্যা এবং অন্ধকারের চর্চা। কিন্তু হিসেব মতো এর বাইরেও কিন্তু একখানা পঞ্চম বেদ আছে। তাকে দুই পুত্র এই চিকিৎসা বিদ্যার রক্ষক। তাঁদের অশ্বিনী কুমার বলা হয়। সূর্যের সঙ্গে ঘোটকীর রূপধারী সংজ্ঞার মিলনে জন্ম নেন এই দুই চিকিৎসক দেবতা। তাঁদের ক্ষেত্রে উলটো, অর্থাৎ দেহ মানুষের কিন্তু মুন্ড ঘোটকের।
যা হোক, একটা কথা বলি, তোমাদের মালপত্র ছিটকে গিয়েচিলো সাগরের পাড়ে, অর্থাৎ তোমাদের সঙ্গে ভারী মালপত্র কিছুই ছিল না, অথচ আমরা প্রায়ই পথ জুড়ে একটা ওজনদার বস্তুর ঘষটানির দাগ দেখতে দেখতে এসেচি। তোমরা এইখানে আসার সময়ে কিছু একটা ভারী জিনিস ঠেলে নিয়ে এসেচো এই গুহায়। সেই কথাটা যে কোনও কারণেই হোক আমাদের কইতে দ্বিধা হয়েচে তোমার, তবে একটা কথা বলি, তোমাদের এই ভুলের জন্যই সম্ভবত এই বিপদ মাথা তুলেচে। যদিও এই শয়তানের মারণভূমিতে পা রাখায় এই বিপদ ঘটতোই, কিন্তু তারা সব কাজ ছেড়ে তোমাদেরই নিজেদের একমাত্র লক্ষ্য ও ভক্ষ্য করে নিয়েচে, তার কারণ যতদূর সম্ভব ঐ জিনিসটাই।”
মণিময় হতবাক হয়ে কালীপদর হাতদুটো ধরে বলে উঠল— “আশ্চর্য নজর আপনার। হ্যাঁ, এনেচি আমরা একটা জিনিস ওই সাগরের পাড়ের মহল থেকে এবং এই অপরাধবোধেই আমি সেটার কথা গোপন রাখচিলাম। কিন্তু আপনি কি আন্দাজ করতে পেরেচেন কী সেই জিনিস?
— “কিছুটা পারি। তুমি ঘর ছাড়ার আগে যে পুঁথিটা পড়েচিলে সেই পুঁথি আমারও পড়া মণি, এবং তার থেকেই বলতে পারি তুমি যেইটা নিয়ে এসেচো সেটা একটা অতিকায় ঘড়ির মতো জিনিস। ঠিক?”
মণিময় একটা অস্ফুট হর্ষধ্বনি করে উঠল।
— “ঠিক মুখুজ্জেমশায় ঠিক! একদম যথার্থ বলেচেন! আমি গুপ্ত পুরাণে এর উল্লেখ পেয়েচি, তাই সত্যি সত্যি সেই মহাপ্রাচীন দিব্য বস্তু হাতের সামনে পেয়ে বেহাত হতে দিইনি আর। আসুন আপনাকে দেখাই সেটা।”
কালীপদ একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মণিময়ের চোখের দিকে তাকিয়ে কইলো—“হুমম, চলো।”
আমাদের সঙ্গে মোম জমানো সলিতা দেওয়া কৌটা ছিল, সেটাতে আগুন জ্বেলে আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম দ্বিতীয়বার। পিছনে একটা শব্দ শুনে বুঝলাম সুশীল পাথরের দোরটা টেনে দিল। ভিতরে ঐটুকু অগ্নিবিন্দুতে সবটুকু আঁধার দূর হবার নয় কিন্তু একটু সময় পরেই চোখ সয়ে এল এবং সঙ্গে সঙ্গে আমার দৃষ্টি আটকে গেল সামনে রাখা একটা দুই মানুষ প্রমাণ গোলাকার স্থূল চাকতিতে। আমার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। যদি পুরাণ সত্য হয়, যদি
লোককথা যথাযথ হয়, তবে আমার সামনে যে অভূতপূর্ব বস্তুটি রাখা রয়েছে তার স্রষ্টা একজন পিশাচ! লক্ষ লক্ষ বৎসর আগের এক হারিয়ে যাওয়া উপাখ্যান!
গোলাকৃতি ঘড়িটার আকার অনেকটা খুব মোটা গাছের গুঁড়ির কাটা চাকতির মতো। তার বেধ প্রায় তিন হাত, ব্যস আন্দাজ সাত আট হাত। অপূর্ব নিখুঁত কারুকাজ সম্বলিত এক অসাধারণ শৈল্পিক নিদর্শন। ঘড়িটার পুরো ক্ষেত্রফলটা জুড়ে আধুনিক ঘড়ির মতোই সমপরিমাণ এবং সমকৌণিক বারোখানা ঘর কাটা, প্রতিটি ঘরের সংখ্যার স্থানে কয়েকটি দূর্বোধ্য আঁকিবুকি, হয়তো এইগুলিই পিশাচ জগতে সংখ্যার পরিচায়ক। এই ঘড়ির সাহায্যেই কোনও অকল্পনীয় উপায়ে খণ্ডদেহীর জন্ম এবং বধের ষড়যন্ত্র জড়িত ছিল। আমার দেহটা অজান্তেই একবার শিউরে উঠল। আমরা যখন তন্ময় হয়ে সেই আশ্চর্য কালচক্রের পানে চেয়ে রয়েচি তখন একবার কালীপদর গলা শুনলাম— “আশ্চর্য বটে! ঘড়ি রয়েচে, অথচ ঘড়ির কাঁটা নাই কেন? এ ঘড়িতে সময় মাপা যাবে কী করে? অথচ গুপ্ত পুরাণে একে পরিষ্কারভাবে কালচক্র বা কাল পরিমাপক যন্ত্র বলে সম্বোধন করা হয়েচে, ফলে সে কথা মিথ্যা হবার নয়। ভাবিয়ে তুললে দেখচি।”
ভিতর থেকে বাইরের দিকে বেরিয়ে এলাম আমরা। আমি লম্বা সুড়ঙ্গটার ওই মাথায়, অর্থাৎ বাইরে বেরুবার মুখটার দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। গুহার বাইরের একমাত্র মুখটা কেউ যেন একটা কালো পাথর দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে রুদ্ধ করে দিয়েচে মনে হলো। বাইরের একবিন্দু অংশও চোখে পড়চে না ফাঁক দিয়ে। আমি চিৎকার করে উঠলাম। মন্দা ব্যস্ত হয়ে বললে- “আরে ডাক্তার কী হয়েচে?”
আমি আমার ধারণার কথা বলতেই সুশীল হেসে বলল—“গুহার মুখ কেউ আটকায়নি ঠাকুর, বাইরে সন্ধ্যার আঁধার নেমেছে।”
আমরা মুক্ত বাতাসের জন্য গুহার মুখে এসে বসলাম। পাথরের দরজার উপর দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম আকাশে অজস্র নক্ষত্র উঁকি মারচে। আলোটা সুড়ঙ্গের একেবারে ও মাথায় রাখা হয়েচে, ফলে আমরা খুব সামান্য আলো পেলেও বাইরে থেকে তা দৃষ্টিগোচর হবে না। আমরা নিজেদের দরকারী জিনিসপত্র দুটো থলিতে গুছিয়ে নিলাম। একখানা পুঁটুলি থাকবে কানাইয়ের পিঠে আর অপরটি কালীপদর সঙ্গে। অপ্রয়োজনীয় বাক্স পেটরা সব এই গুহাতেই পড়ে থাক, সঙ্গে ভার যতটা কম হয় ততো মঙ্গল। ভোরের আলো ফুটলে খুব নিঃসাড়ে জঙ্গলের পথ ধরতে হবে আমাদের। যতো শীঘ্র সম্ভব এই অভিশপ্ত মানচেচ্চা দ্বীপের থেকে পালিয়ে যাওয়া দরকার। আবার কখন কোন শয়তান এসে হানা দেয় তার ঠিক কী?
আমরা নানান কথাবার্তা কইচি, হঠাৎ বৃষ্টি নামল। সেই বৃষ্টি, যে বৃষ্টি নিজের সঙ্গে তীক্ষ্ণ ছোরার ফলা নিয়ে ঝরে পড়ে, কিন্তু এখন কালীপদ বা মন্দা মাঝির কোনও উদ্যোগ দেখলুম না বৃষ্টি তাড়ানোর। কালীপদর মুখে এক অদ্ভুত বৈরাগ্য দেখতে পেলাম আমি। এই প্রথমবার কোনও সমস্যার সমাধান না করেই তস্করের ন্যায় লুকিয়ে পালিয়ে যাবে সে। এই মহা রহস্যের সমাধান হয়তো আর কোনও দিনই হবে না, আর কখনও কোনও মানুষ হয়তো এই দ্বীপে পা রাখবে না, ফলে এই অজানা ধাঁধা আর কোনও দিন জানা হবে না কারুর। কালীপদর এই বিষাদ এবং বিষণ্ণতা দেখে আমার মনটা ভারী হয়ে এল। কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টির বেগ কোনও কাঙ্ক্ষিত শিকার না পেয়ে বিফল মনোরথ হয়ে উধাও হল। আকাশ পুরোদস্তুর পরিষ্কার হয়ে এতক্ষণে রাতের ফটফটে আকাশে চাঁদ ফুটে উঠল। কালীপদ তেমন কোনও বাক্যালাপ করচে না, রসময় নীচু স্বরে ভাইয়ের সঙ্গে কথা কইচে, কানাই আর মন্দা প্রাচীরে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে আর সুশীল তার সংগ্রহের শেষ কয়েকটি বুনো ফল ছয় সাতটি ভাগে ভাগ করচে। এই আঁধারে সময়টাও ঠিক বোঝা যাচ্চিলো না যে রাত কাটতে আর কতটা বিলম্ব রয়েচে। চাঁদ এবং নক্ষত্র দেখে সময় বোঝার এলেম আমার নাই। আমি পা ছড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সুড়ঙ্গের ওমাথা থেকে জ্বলন্ত মোমের কৌটাটা এনে আবার আমাদের বসার স্থানে রেখে পকেট থেকে ট্যাকঘড়িটা বের করে সময়টা দেখতে যাব, হঠাৎ সুশীল বিদ্যুৎ গতিতে নীচু হয়ে এক ফুৎকারে মোমের শিখাটা নিভিয়ে দিল। আমি বিস্মিত হয়ে কিছু শুধানোর আগেই সুশীল খুব চাপা গলায় বলল—“শশসসস্। ওপাশের বনে কিছু একটা এসেচে।”
আবছা আলোতেও বেশ টের পেলাম এতক্ষণ এলিয়ে থাকা প্রতিটি মানুষ টানটান হয়ে বসেচে। আমি পাথর কপাটের ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, চাঁদটাকে হঠাৎ যেন আর দেখা যাচ্চে না। এক মুহূর্তেই ভুলটা ভাঙলো। চাঁদ নিজের স্থানেই রয়েচে কিন্তু জঙ্গলের আরও অনেক উঁচুতে একটা লিকলিকে লম্বা হাতের মতো কী যেন নড়চে। সেটা কোনও পশুর হাত অথবা গলা নাকি লেজ, তা ঠিকঠাক ধরা গেল না। আশ্চর্যের কথা এই যে আমার আর নতুন করে ভয় লাগল না এইবার। একেই বোধহয় সহাবস্থান প্রতিক্রিয়া বলা হয়। সারাদিন ধরে এত ভয়ের বস্তুর সাথে মোকাবেলা করে ভয়টা সয়ে গিয়েচে। একটু পরে সেটাকে আর দেখা গেল না। আমাদের জলের পাত্র প্রায় শূন্য হয়ে আসচিল দেখে কানাই এক দৌড়ে গিয়ে জল আনতে চেয়েচিলো কিন্তু কালীপদ মাথা নেড়ে তাকে এখনই বেরুতে নিষেধ করল। দানবটা যে আমাদেরকে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে লক্ষ্য রেখেচে তার প্রমাণ পেলাম একটু পরেই।
প্রায় দুই ঘণ্টা মতো কেটে যাবার পরে আবার তার দেখা পাওয়া গেল। সে কোথাও যায়নি, বনের গাছপালার মধ্যে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে আমাদের বেরুনোর অপেক্ষায়। কানাই এক মুহূর্তের জন্য বেরুলেও আজ সে আর ফিরতো না। যত সময় যায়, থেকে থেকে তার চলার শব্দ পাওয়া যায়। সে সর্বনাশা জীব যেন আমাদের এক পলকের জন্যও জীবিত মানুষ এই দ্বীপ থেকে পালানোর জন্য উদগ্রীব অথচ এক অদেখা দরিয়া দ্বীপের দানো তার দাঁত নখ বিছিয়ে আমাদের শিকার করার জন্য খাপ পেতে রয়েচে। তাকে অগ্রাহ্য করে বাইরে পা রাখা মানে মর্মান্তিক মৃত্যু, আর তার নজর এড়িয়ে পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করাটাই পাগলামির নামান্তর। এইটেই কি ফাঁদ? এই ফাঁদের কথাই কি কালীপদ বলেচিলো সেদিন? এমন এক জাল, যাতে পা দিলেই মরণ আবার পা দেওয়াটাও নিশ্চিত। হা নিয়তি।
ঐ রাতে আঁধার ঘেরা সেই মৃত্যু উপত্যকায় যেটুকু সময় কাটিয়েচিলাম ওইটুকু সময় আমি কখনও ভুলবো না। সময়ের কোনও হিসাব নাই, কোনও কিছু করার নাই, কিছু দেখার নাই, এক অনন্ত নিষ্কর্ম জীবন। এর চাইতে বোধকরি নরকবাস ঢের শ্রেয়। সুশীল আর মণি এতগুলো দিন এইভাবে কাটিয়ে পাগল কেন হয়ে যায়নি তাই আশ্চর্য বটে। সময় যেন নিজের প্রবাহ স্তব্ধ করে রেখেচে এই দ্বীপে। পুরাকালের পিশাচের তৈরি ঘড়ি রয়েচে গুহায়, কিন্তু তাতে সময়ের পরিমাপ করা চলে না। আমি নিজের মনে মনেই দুঃখ আর বিষাদে হেসে বললাম—“হোক পৌরাণিক, এর চাইতে আমার ক্ষুদ্র ট্যাকঘড়ি ঢের ভালো।”
সবাই একসাথে আমার মুখের দিকে চাইলো। কথাগুলো মনে মনে বলতে গিয়ে কখন যেন অজ্ঞাতসারে মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে পড়েচে। সুশীল বিস্মিত মুখে কইলো— “ট্যাকঘড়ি? সে আবার কী?”
আমি লজ্জিত হয়ে বললাম—“ও কিছু নয়, আমি মনে মনে আকাশকুসুম চিন্তা করচিলাম। মুখ ফসকে বাইরে চলে এসেচে।”
সুশীল আর মন্দা মাঝি পরম আগ্রহ ভরে আমার ঘড়িটা নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে অবাক হয়ে বলল—“কী জিনিস বানিয়েচে সায়েবরা। শেকল দেওয়া ঘড়ি? এ কি রূপার তৈরি?”
কালীপদ বিরস স্বরে বললে—“না, ওইটে বিদেশী নিকেলের তৈরি। কিন্তু তুমি কী এত চিন্তা করচিলে ডাক্তার? দুশ্চিন্তা? ভয়?”
–“দুশ্চিন্তা ঠিক নয়। আসলে একটা দিনের কথা হঠাৎ মনে পড়ল আমার। তোমার বাড়িতে আসার ক’দিন আগে একদিন ঘরে বসে বই পড়ছি, তখন চূড়ান্ত কোলাহলে আর মোটরগাড়ির শব্দে বিরক্ত হয়ে প্রার্থনা করেচিলুম এই কোলাহলের চেয়ে কোনও নির্জন দ্বীপে গিয়ে যদি বাস করতাম তো শান্তি হতো। এখন সেই শখ আমার ঘুচে গিয়েচে দাদা। হট্টগোল হোক আর চেঁচামেচি হোক, মানুষই মানুষের বাঁচার রসদ এ আমি বেশ উপলব্ধি করেচি। কোনও জায়গা যেমনটিই হোক, মানুষ না থাকলে মন টেঁকে না। তারপর সেই হট্টগোল আর খামখেয়ালি আবহাওয়ার উপর বিরক্ত হয়ে এসে পড়লুম রায়দীঘড়ায় এবং সেইখান থেকে এই এখানে। তুমি যথার্থই বলেচিলে, মানুষ না থাকলে সেই স্থানকে, বাড়িঘরকে কালরাক্ষসে গিলে নেয়। আমাদের নিয়তি বোধহয় সব সাজিয়েই রাখে, তাই নয় দাদা?”
কালীপদ কোনও উত্তর না দিয়ে প্রাচীরের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।
মন্দা কইলো–-“আবহাওয়ার উপর বিরক্ত হওয়া তো স্বাভাবিক ডাক্তারবাবু, আমাদের এদিগড়েও ওই একই ঝঞ্ঝা চলচে কয়েক মাস যাবৎ। সকালে বাদলা তো বিকেলে গ্রীষ্ম, দুপুরে ফটফটে আকাশ তো রাতে পৌষের হিম, তোমাদের কলকাতাতেও তাই?”
— “হ্যাঁ মাঝি, কলকাতাতেও তাই। লোকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ থেকে গালি পাড়া কিছুই বাদ রাখেনি আর। পথে বেরুতে গেলে ছাতি নিয়ে বেরুবো নাকি আলোয়ান, তাই বোঝা দুষ্কর। ঋতু আর মাসের হিসেব গুলিয়ে গিয়েচে। সকালে একেক বেলায় যেন একেকটা মাস অতিবাহিত হয়ে চলেচে আর কী। এক হপ্তা না হতেই পুরা বচ্ছরের স্বাদ পাচ্চি, এই কী কম মজার?”
মন্দাও হেসে কী একটা যেন বলতে যাচ্চিল, হঠাৎ কালীপদ আমার দিকে ঘুরে পাগলের মতো আমার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠল— “কী বললে ডাক্তার? কী বললে বলো? একেক বেলায় একেক মাস? এক হপ্তা না হতেই পুরো বছর? তাই তো! ঠিক তো!”
আমার বুকটা ধড়াস করে লাফিয়ে উঠল। যেখানে বাইরে একখানা অজানা দানব ওৎ পেতে রয়েচে বুঝে আমরা জোরে কথা অবধি বলচিনে কেউ কিন্তু তার চোখের দিকে চেয়ে আমি আর কানাই আনন্দে অধীর হয়ে উঠলাম। সেখানে আমি কালীপদর এই আকস্মিক পাগলামিতে হতভম্ব হয়েছি যথেষ্ট রায়দীঘড়ার কালীপদ মুখুজ্জের এই প্রখর দৃষ্টি আমরা বিলক্ষণ চিনি। সে কোনও একটা আলোর রেখা নিশ্চয়ই খুঁজে পেয়েচে এই অকূল আঁধারে। আমি উত্তেজিত কাঁপা গলায় কইলাম—“হ্যাঁ মুখুজ্জেমশায়, আমি তাইই বলেচি, কিন্তু কেন শুধোচ্চেন দাদা?”
কালীপদ নিজের বাম হাতের তালুতে ডান হাতের ঘুষি মেরে এইবার মন্দা মাঝির দিকে তাকিয়ে অধীর হয়ে বলে উঠল—“তাই তো ভাবি আমি মাঝি, পৃথিবীতে সাপ, হাতী, বাঘ, হায়নার মতো হিংস্র প্রাণীরা থাকতে এই দ্বীপের শয়তানটা বুনো ষাঁড়, সামুদ্রিক কাঁকড়া অথবা মাছের রূপ ধরে কেন? হিংস্র রূপ যে সে ধরতে পারে না তা তো নয়, সে তো সিংহ হয়েও দেখা দিয়েচে আগে। আসলে এরা আলাদা আলাদা নয়, বরং একটিই নরকের প্রাণী নানান ভেক বদলে হাজির হয়, সেইজন্য একসাথে দুই ধরনের প্রাণী কখনও আক্রমণ করে না। এদের একটিকে হত্যা করলে আর কখনও পরেরটি ফিরে আসতে পারবে না। তার আগে তুমি বলো মাঝি, তোমার গুরু সদানন্দ পাগলা চড়ুইপোড়ায় এসে ঠিক কী কথা কয়েচিলেন এই দ্বীপের ব্যাপারে?”
মাঝি বিব্রত হয়ে কইলো—“সে তো বলেচি আগেই ঠাকুর, তিনি বলেচিলেন ওই দ্বীপে রাশি রাশি শয়তানের দল ঘুমিয়ে রয়েচে।”
–“আবার বলচি মাঝি, খুব সঠিকভাবে স্মরণ করো। গুরুবাক্যে প্রমাদ ঘটাতে নাই।”
কালীপদর দৃঢ় সুরে মন্দা বিস্মিত হয়ে কিছু সময় অতীতের স্মৃতিচারণ করে ধীরে ধীরে বললে—“হাঁ, তাঁর বাক্য অনুযায়ী বললে তিনি বলেচিলেন ওই দ্বীপে দলে দলে, রাশিতে রাশিতে শয়তানের দল ঘুমিয়ে রয়েছে।”
কালীপদ লাফিয়ে উঠে উন্মত্তের ন্যায় চিৎকার করে বলল— “তবে তাই বলো মন্দা, তাই বলো। এইবার আমার হারিয়ে যাওয়া সূতাগুলো জোড়া লেগেচে। আমি গতকাল থেকেই ভেবে সারা হচ্চি, কোথায় যেন কী একটা চোখের সামনেই ঘটচে কিন্তু ঠিক ধরতে পারচি না। তোমাদের পাওয়া ওই গোলাকার বস্তুটা ঘড়ি নয় মণিময়।”
মণিময় অবিশ্বাসের কণ্ঠে বলল—“কিন্তু ঠাকুর, পুরাণে পরিষ্কার বলা রয়েচে যে ওখানা একটা কালচক্র, অর্থাৎ সময় নির্ণায়ক চক্র!”
— “পুরাণ নিঃসন্দেহে অভ্রান্ত, কিন্তু সময় মাপার জন্য বারোখানা ভাগ করে কেবলমাত্র ঘড়িই তৈরি হয় না মণি। ঐখানেই ভুল। ঐ গোলকটা হা একটা আদিম রাশিচক্র। বারোখানা মাসের অভিন্ন আধার, যার এক-একটি মাসের ধারক এক-একটি বস্তু অথবা জীব। সিংহ, ষাঁড়, হস্তীমুখো কুমীর, মাছ, কাঁকড়া আর কচ্ছপের মতো আলাদা আলাদা প্রাণীদের ঐ একমাত্র যোগসূত্র। তুমি যে বিরাটাকার কলসপত্রী উদ্ভিদের সন্ধান পেয়ে এইখানে এসেচিলে, ঐটে সম্ভবত কুম্ভরাশির প্রকাশ ছিল। তোমার নাউকি দেখতে ভুল করেচিল।”
আমার ললাটে উত্তেজনায় স্বেদবিন্দু দেখা দিল। বললাম— “তবে কি সুশীল বা মণিময়ের দ্বীপে পা রাখাতেই তারা জেগে উঠেচে?”
–“কিছুটা তাই বটে। তারা এই বিচ্ছিন্ন রাজ্যে নিজেদের মতো সুপ্ত অবস্থায় ছিল, কিন্তু সুশীল এইখানে এসে ওঠার পরে তারা জেগে উঠেচে শিকারের হিংস্র লিপ্সায়, আর মণিময় ঐ কালচক্রকে নিজের করায়ত্ত করতেই তারা নিজেদের পূর্ণ মারণশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েচে সবকিছু তছনচ করে দেবার লালসায়। তারা মহিষাসুরের ন্যায় ক্ষণে ক্ষণে রূপ ধারণ করে ছিঁড়ে ফেলতে চেয়েচে তাদের শত্রুদের টুটি। তাদের ঘন ঘন রূপ বদল প্রভাব বিস্তার করেচে যোজন যোজন দূরের জলবায়ুতে। একটির থেকে আরেকটি জীবে রূপান্তরিত হবার সাথে সাথে একেকটি করে মাস পরিবর্তন হয়েচে লাফিয়ে লাফিয়ে।”
রসময় কবিরাজ শুষ্ক মুখে শুধালো—“ঠিক কথা। এই তবে আবহাওয়ার পাগলামির আসল রহস্য?”
— “রহস্য আরও কিঞ্চিৎ বাকি রয়েচে কবিরাজ। যে পাথরের মহলকে আমরা বিরাট আকারের প্রাসাদ মনে করে অবাক হয়েছি, তা আদতে পাথরের নয়, অতি প্রাচীনকালের কাঠের তৈরি একখানা তোরঙ্গ মাত্র। সেই তোরস যার মধ্যে পিশাচ ব্রহ্মানন্দকে ভক্ষণ করার পর তাঁর তৈরি কালচক্রকে সমাধি দেওয়া হয়েচিলো ক্ষীরোদ সাগরের তলে। সেই তোরঙ্গ কোনও ভূপ্রাকৃতিক কারণে এসে পড়েচে এই জনবর্জিত ভূখণ্ডে। সেইজন্যই অতবড় মহলের কোনও দুয়ার নাই।”
আমাদের মুখ থেকে কোনও বাক্য নিঃসৃত হলো না। এই অদ্ভুত উপাখ্যানের একেবারে মুখোমুখি বসে এক অপরিসীম ঘোর এসে নাগপাশের মতো আমাদের গ্রাস করে অবসন্ন করে ফেললো।
*
আরও বেশ অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়েচে ইতিমধ্যে। বাইরের আকাশে খুব ক্ষীণ আলোর আভা ফুটে উঠেচে। আমাদের পলায়নের আশা উত্তরোত্তর শূন্য হয়ে আসচে। দুই চারবার পাথরের দোর সরানোর চেষ্টা করতেই স্পষ্ট টের পেয়েচি বনের সেই রাক্ষুসে প্রহরী নড়েচড়ে উঠেচে আক্রমণের জন্য, অথচ আমাদের আহার্য সমেত পানীয় জল অবধি নিঃশেষ হয়ে পড়েছে। এহেন অবস্থায় আমরা গুহারন্ধ্রে লুকিয়ে থেকে ঐ অদেখা আততায়ীর হাত থেকে হয়তো নিজেদের রক্ষা করতে পারব, কিন্তু তারপর বরণ করে নিতে হবে এক জালবদ্ধ ইন্দুরের ন্যায় মর্মান্তিক মরণকে। আকাশ পাতাল ভেবে যখন কূল পাওয়া যাচ্চে না, সেই মুহূর্তে কালীপদ আমাদের পলায়নের একখানা উপায় উদ্ভাবন করল, কিন্তু সে উপায় শোনার পর আমি স্থির করলাম এর চাইতে এই দ্বীপে আমার তুচ্ছ প্রাণের তুচ্ছ মৃত্যু অনেক শ্রেয়। কালীপদ ভাঙা স্বরে মণিময় আর সুশীলকে শুধালো—“তোমরা তো স্বচক্ষে ঐ শয়তানের আক্রমণ প্রত্যক্ষ করেচো, আমি জানতে চাই ঐ কালান্তক যম কাউকে আক্রমণ করার পর তাকে বিনষ্ট অথবা মৃত্যু সুনিশ্চিত করতে ঠিক কতখানি সময় ব্যয় করে? ভালো করে স্মরণ করে বলবে।”
মণিময় একটু ভেবে উত্তর দিল— “একেবারে মেপে তো বলতে পারিনে, কিন্তু বসন্ত নাউকির সময় আমার দৌড়ানোর আন্দাজি হিসেবে ধরলে একটা মানুষের ষাট সত্তর পা ফেলতে যেটুকু সময় লাগে ততটা।”
কালীপদ প্রত্যুত্তরে কইলো— “বেশ। তার মানে পালিয়ে যাবার পক্ষে বেশ কিছুটা সময়। শোনো, আমি এইখান থেকে পালানোর একটা উপায় হয়তো বের করতে পারব, কিন্তু শর্ত এই যে কোনও দিকে না তাকিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে হবে।”
আমরা উৎফুল্ল হয়ে নিজেদের সম্মতি জানালাম কিন্তু সামান্য সময় পরেই সেই আনন্দ সম্পূর্ণরূপে তিরোহিত হয়ে পড়ল। কালীপদর নির্দেশে মন্দা মাঝি দুয়ারের ফোকরে চোখ লাগিয়ে বসে রইল বনের পানে, আর কালীপদ স্বয়ং আমাদের নিয়ে গুহার ভিতরে কালচক্রের সামনে এসে বসলো। তারপর একখানা ছোট্ট পাথরের টুকরো দিয়ে গুহার মেঝের উপরে একটা ত্রিভুজ আঁকলো। সেই ত্রিভুজের অভ্যন্তরে আরও একখানা চতুর্ভুজ এবং চৌকোণা সেই ঘরের পেটে একটা গোলক এঁকে বিড়বিড় করে কী সব মন্তর পড়ে আমাদের অবাক করে দিয়ে নিজের পৈতা নিজের হাতে খুলে ফেললো। আরও কিছু মন্ত্র পড়ার পরে উঠে দাঁড়িয়ে আমার আর কানাইয়ের দিকে তাকিয়ে আত্মগতভাবে বললে— “শোনো, আমাদের কাছে এখন পালানোর একটাই পথ খোলা রয়েচে। সেইটেই আমি কাজে লাগাতে চলেচি। এতদিন তোমরা অথবা এরা যে সমস্ত শত্রুদের দেখেচো, আজ তার থেকে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর এক শত্রু আমাদের জন্য অপেক্ষা করে রয়েচে বাইরে। আমার গুরু এই মহাশূন্যের জীবদের কথাই বলতে চেয়েচিলেন আমাকে, তা আজ বুঝতে পারচি। আজ আমাদের যুদ্ধ হবে বারোখানা রাশির মধ্যে সবচাইতে ক্রুর, কুটিল এবং খলস্বভাব রাশির সঙ্গে, যে বনের ভিতর থেকে নিরন্তর আমাদের লক্ষ্য রাখচে।”
আমাদের বসতে বলে কালীপদ গুহার মুখে মন্দা মাঝির কাছে চলে গেল।
*
আমরা যখন চূড়ান্ত দুর্ভাবনার মধ্যে সময় কাটাচ্চি, তখন মন্দা এসে ভিতরে ঢুকে কইলো—“ঠাকুর নিজে দোরের কাছে লক্ষ্য রাখতে গিয়েচেন। তিনি আমাকে বললেন তোমাদের নিয়ে দোরের কাছে যেতে। এখনই বোধ করি পালানোর উপায় হবে কিছু। আমরা উঠে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে এগোতে শুরু করলুম। আমরা সরে আসতেই মেঝেতে কালীপদর আঁকা ছবিটার উপরে মোমের বাতির আলো এসে পড়ল, আর সেই ছবি দেখামাত্র মন্দা ভীষণ জোরে চিৎকার করে উঠল— “এ কী! কী সর্বনাশ! হা ঈশ্বর!”
আমি উৎকণ্ঠিত হয়ে আবার ঢুকে পড়ে বললাম—“ওখানা মুখুজ্জেমশায় এখুনি এঁকেচেন, কিন্তু… কিন্তু ওইটা কী জিনিস মাঝি?
মন্দা হাহাকার করে উত্তর দিলে—“এ ছবি যে ব্রহ্মসমাধি ক্ষেত্রর! যখন সাধক তার নিজের আত্মাকে গুরুর চরণে আহুতি দেন তখন এই চক্রে তিনি তাঁর দেহত্যাগ করেন! ঠাকুর নিজের হাতে এই চক্র আঁকলেন? হা ভগবান। এইজন্যই তিনি আমাকে দুয়ারে নজর রাখার নাম করে দূরে ঠেলে দিয়েচিলেন! আমি থাকলে যে তখনই ধরে ফেলতুম।”
তার কথা শেষ না হতেই আমি আর কানাই বিদ্যুতের বেগে দৌড়ে গুহার মুখে এসে যা দেখলাম তাতে আমার চেতনা বিলুপ্ত হবার জোগাড় হলো। গুহার মুখের পাথরের আবরণ উন্মুক্ত। কালীপদ গিয়ে পড়েচে গুহার থেকে অনেকটা দূরে খোলা স্থানে। তার মুখ ওইপারের জঙ্গলে, আর দূরের বনের গাছপালাকে দলিত মথিত করে ধেয়ে আসচে কোনও একটা বিপুলদেহী জানোয়ার।
আমাদের চিন্তা করার সব শক্তি লোপ পেয়েচে ইতিমধ্যে। শরীরের ভিতরে যা বাকি রয়েচে তা হল নিখাদ সহজাত প্রবৃত্তি। সেই টানে সাড়া দিয়ে সমস্ত মৃত্যু ভয়কে তুচ্ছ জ্ঞান করে আমি আর কানাই দৌড়াতে আরম্ভ করলাম কালীপদর দিকে। মরি তো একত্রে মরবো কিন্তু এই নিষ্কলুষ নিরহঙ্কার সাধকের জীবনের বিনিময়ে যদি জীবন পেতে হয় তবে শত ধিক সেই প্রাণে। কিন্তু সেই অবধি আমাদের পৌঁছানো আর হলো না। বন ভেদ করে যে চলমান বিভীষিকা এসে দাঁড়ালো আমাদের সামনে, তাকে দেখতে গিয়ে পাথরে হোঁচট খেয়ে আছাড় খেয়ে পড়লাম আমরা, আর আমার মুখ থেকে অস্ফুট আতঙ্কে একবার ধ্বনিত হলো—“বৃশ্চিক!”
*
আমাদের থেকে মাত্র হাত পঞ্চাশেক দূরত্বে দাড়িয়ে রয়েচে এক রাক্ষুসে কাঁকড়াবিছে! তার লেজের মতো হুলটা বনের গাছগুলোর মাথা ভেদ করে আরও ঠেলে উঠেচে, তার মসৃণ তৈলাক্ত দেহে ভোরের আভা পড়ে ঝকঝাক করচে, তার হিংস্র নীলাভ চোখের মণিতে নিশ্চিত মৃত্যুর হিমশীতল ছোঁয়া, আর তার করাল উগ্র মারণদাঁড়ার মাঝে তার চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রয়েচে রায়দীঘড়ার নির্ভীক ব্রাহ্মণ, যে নিজের মহা মূল্যবান প্রাণের বিনিময়ে আমাদের সবার জীবন কিনে নিতে মনস্থ করে ফেলেচে।
অষ্টপদী কুটিল প্রাণীটা খড়মড় শব্দে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে নিজের দৈত্যাকার দাঁড়া দুটি বিভক্ত করতেই কালীপদ স্বেচ্ছায় তার মাঝখানে ঢুকে পড়ে আমাদের পানে না তাকিয়েই চাপা স্বরে আদেশ করল—“পালা তোরা কানাই। পালাও ডাক্তার। একটা কথা জেনো, তোমার বৌঠান যাই বলুক, আমি কখনও তোমাকে নিজের ভাইয়ের থেকে কম ভাবিনি কোনওদিন। কথাটা মনে রেখো।”
আমি হাউহাউ করে কেঁদে উঠলাম। দানব কাঁকড়াবিছে অসহায় শিকারকে একেবারে করায়ত্তে পেয়ে নিজের বলিষ্ঠ দাঁড়া দু’খানি সজোরে চেপে দিল তার নিরস্ত্র শত্রুর উপরে। কালীপদ সেই প্রবল শক্তিধর দাঁড়ায় পিষ্ট হয়ে যাবার আগে শেষ চেষ্টা হিসেবে সর্বশক্তি দিয়ে নিজের দু’খানা হাত দুপাশে ছড়িয়ে সেই প্রচণ্ড আঘাত একবারের জন্য প্রতিহত করতে চাইলো। আকাশের এপার থেকে ওপার চিরে একখানা বজ্রের ঝলক ছুটে চলে গেল। আমি নিজের অশ্রুরুদ্ধ চোখ তুলে দেখলাম প্রভুভক্ত কানাই সর্দার নিজের সদ্য ভেঙে যাওয়া পা নিয়ে বুকে ঘষে এগিয়ে যাচ্চে তার প্রভুর দিকে। কালীপদ দুইপাশে হাত ছড়িয়ে তখনও দাঁড়িয়ে রয়েচে এবং তার দুই হাতে ধরা রয়েচে আমাদের কুড়িয়ে পাওয়া সেই দু’খানা ছোটো নৌকার মতো পাত্র, আর সেই সঙ্গে বাতাসের একটা বিভীষণ ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্চে সেই প্রকাণ্ড দেহধারী হিংস্র কৃষ্ণবর্ণ বৃশ্চিক।
আমি সেদিকে তাকিয়ে নিঃসাড়ে অচৈতন্য হয়ে ঢলে পড়লাম।
*
পরে শুনেচিলাম আমার জন্য বাকিদের বহুক্ষণ বিলম্ব করতে হয়েচিলো ঐ দ্বীপে। আমার যখন সাড় ফিরলো তখন কালীপদ গুহাপার্শ্বস্থ ঝোরার জলে স্নান সমাপণ করে পৈতা ধারণ করচে। শুনলাম, দানবটা নিকেশ হবার সঙ্গে সঙ্গে আর এক মুহূর্ত সময় ব্যয় না করে মন্দা মাঝি প্রবল আক্রোশে নিজের পরণের বস্ত্রখানা সিক্ত করে কালীপদর আঁকা ঐ ব্রহ্মসমাধি ক্ষেত্রটিকে পৃথিবীর থেকে নিশ্চিহ্ন করতে করতে শিশুদের মতো কেঁদে উঠেচিলো। কালীপদ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে কইলো– “আর ভয় নাই ডাক্তার। এইবার নিশ্চিন্তে ফেরার পালা।”
আমার বিস্ময়ের ঘোর তখনও দূর হয়নি দেখে সস্নেহে আমার দিকে চেয়ে বলল—“বোকা কোথাকার। এখনও বোঝোনি? ঐ দু’খানা জিনিসকে আমরা নৌকার মতো আকৃতি দেখে ধোঁকা খেয়েচিলাম বটে, কিন্তু পরে আমি তার যথার্থ স্বরূপটা আন্দাজ করতে পেরেচিলাম। ওগুলো হলো পিশাচের নখ। ওর অমোঘ ছোঁয়াতেই ঐ শয়তানের বধ হয়েচে। ব্রহ্মানন্দ পিশাচকে যখন হাত পা থেঁতলে তোরঙ্গে বন্দি করে খণ্ডদেহীর সভায় নিয়ে যাওয়া হয়েচিলো, তখনই সম্ভবত তার দুইখানা থেঁতলানো নখ খুলে পড়ে যায় ওর ভিতরে। কেউ নজর করেনি আর সেদিকে। ঐ তোরঙ্গখানা যখন কোনও ভূমিকম্প বা ঐরকম কোনও দুর্যোগের কারণে এই দ্বীপে এসে পড়ে, তখনই মনে হয় ঐ কালচক্রের সঙ্গে নখের স্পর্শ ঘটেচিলো, যার ফলস্বরূপ দানবগুলো উন্মুক্ত হয়ে দ্বীপে বেরিয়ে এসেচিলো। এই ঘটনাটা কাকতালীয় বলে মানতে মন চায় না জানো ডাক্তার। সৃষ্টির আদিকাল থেকেই অশুভ শক্তিদের নাশের জন্য কোনও না কোনও একটা ফাঁক কিন্তু স্বয়ং প্রকৃতি রেখেই দেন। আজকের ঘটনাও তাইই প্রমাণ করে। নিজের তৈরি ঐ শয়তানদের বধোপায় কিন্তু ব্রহ্মানন্দ লুকিয়ে রেখেচিলেন নিজের শরীরের স্পর্শের মধ্যেই। সেই স্পর্শ আজ কত হাজার হাজার বৎসর অতিক্রম করেও তাঁরই একটা ক্ষুদ্র দেহাংশের মধ্যে সুপ্ত হয়ে ঘুমিয়ে রয়েচিলো। একে প্রকৃতির রচিত একটা ফাঁদ ছাড় আর কিছু বলা চলে কি? তবে আমি কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম না ও ব্যাপারে, তাই সত্যি সত্যিই মনে প্রাণে চেয়েচি যাতে আমাকে হত্যা করার অবসরে তোমরা পালাতে পারো। সেই কারণে নিজের আত্মব্রহ্মের সমাধি নিজেই গড়ে রেখেচিলাম, যেইটার উপরে ঐ, ঐ দেখো মন্দা মাঝি এখনও হাত পা ছুঁড়চে। গুরুদেব যে মহাকাশের অসম্ভব শক্তিধর জীবদের কথা কয়েচিলেন, এই জন্তুগুলি হলো ঐ জীবদের প্রতিচ্ছবি মাত্র। আসল রাশিচক্রের ধারকেরা যেমন জগৎ সংসারের কালস্রোতকে পালন করেন, এই জীবরা ঠিক তার বিপরীত। বৈপরীত্যই সংসারের ধর্ম। যা হোক, তোমার’ বা কবিরাজের পুঁটুলিতে যদি কিছু ওষুধপত্তর থাকে তো কানাইকে দিও। বেচারির একখানা পা ফুলে রয়েচে। এইবার যাত্রার সময় হলো। সূর্য মাথায় উঠতে চলল।”
আমাদের নৌকাখানা যথাস্থানে বাঁধা ছিল। বিকেল হবার কিঞ্চিৎ পূর্বে আমরা দরিয়ার জলে ভেসে পড়লাম। কালীপদ যথারীতি আবার নিজের স্বমূর্তি ধারণ করেচে। আমি কৌতূহলের বশে কী একটা প্রশ্ন করায় কালীপদ বললে—“আহঃ ডাক্তার, তোমার বড়ো বেশি কৌতূহল সব কথায়। আমার গলাটা ক’দিন একটু বেদনা হচ্চে। এখন বেশি কথা কইতে পারচি নে।”
পরের দিন চড়ুইপোড়ার সবকয়টি মানুষ ভিড় করে সুশীলকে স্বচক্ষে দেখতে এল। আমরা মন্দার নৌকাতে ফটিকছড়ি নদী পেরিয়ে অপর পাড়ে এসে উঠলাম। মন্দা বিদায় নিয়ে ফিরতে যাচ্ছে, হঠাৎ রসময় থলির থেকে একমুঠা টাকা বের করে বললে—“কী হে মাঝি, বড়ো যে বলেচিলে আমরা ফিরে এলে তখন পারানির পয়সা নেবে? তো, এখন নেওয়া চলে তো?” আমরা সবাই উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলাম। মন্দা টাকাগুলি হাসিমুখে গ্রহণ করে কইলো—“তা, একরকম চলে বৈকি।”
কালীপদ মন্দা মাঝিকে সুদৃঢ় আলিঙ্গন করে বলল—“অনেক ধন্যবাদ তোমাকে মাঝি।”
মন্দা চোখের জল মুছে এই প্রথম কালীপদর ব্রাহ্মণ এবং ভূস্বামীর পরিচয় দূরে সরিয়ে তার মাথায় সস্নেহে হাত রেখে বললে—“তোমাকেও বাছা।”
