কালীগুণীন আর করালদংষ্ট্রা রহস্য

কালীগুণীন আর করালদংষ্ট্রা রহস্য

প্রথম ঘটনাটা যেদিন ঘটে সে সময়ে সুন্দরবনের লালসাঁকো গাঁয়ের উপর দিয়ে যে রেলপথটা সোজাসুজি দেবনগর, শিবনগরে গিয়ে ঠেকেচে, সেইটে সারাইয়ের কাজ চলচে। চতুর্দিকে লোক-লস্কর, কুলী-কামীন, নজরদার আর সায়েবদের হৈ চৈ-তে কান পাতা দায়। জঙ্গল কেটে, গাছ উপড়ে গুঁড়ি আনা হয়েচে। মাটির আল তৈয়ারী করে ঠকাস্ ঠকাস্ রবে লোহার খুঁটি পোঁতার শব্দ, কাঠের গুঁড়ি চেরাইয়ের একটানা বিরক্তিকর ধ্বনি, সে এক দক্ষযজ্ঞের উপক্রম হয়েচে। সন্ধ্যার পর যখন কাজের বেগ স্তিমিত হয়ে আসে, চিৎকার চেঁচামেচি যখন কমে আসে, তখন আশপাশের নীরবতায় অভ্যস্ত পল্লীবাসীরা একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। তা, গতকাল এই সারাইয়ের মহাযজ্ঞ সমাপ্ত হয়েছে, আজ সকাল থেকে রেলগাড়ি চলাও আরম্ভ হয়েচে একটি দুটি। আজ কেবল লালসাঁকোর উপরে দড়িতে বেঁধে লোহার চাদর চড়ানোর কাজ চলচে সাঁকোর আচ্ছাদন হিসেবে।

সেইদিনও তখন সন্ধ্যা হবো হবো করছে, লোকজনের গলার হাঁকডাক ক্রমশঃ হ্রস্ব হয়ে এসে প্রকৃতি যখন প্রকৃতির কোলেই ঢলে পড়চে, গাঁয়ের লোকেরা দাওয়ায় শীতলপাটি পেতে গল্পগুজব করার আয়োজন করচে, আচমকা একটি ভয়ঙ্কর কানফাটানো বিস্ফোরণে চারদিকের গাঁ গুলি ভীষণভাবে কেঁপে উঠল। হতবাক হয়ে শব্দের উৎস অনুমান করে লোকজন দল বেঁধে আলো হাতে দ্রুতপদে রেলপথের দিকে এগোতে এগোতে শুনতে পেলো সেইখানে ইতিমধ্যেই ভয়ার্ত কোলাহল শুরু হয়ে গিয়েচে। ঝোপ জংলা পেরিয়ে রেলপথের ধারে এসে প্রতিটি মানুষ যা দেখলো, তাতে বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে গেল।

নূতন বসানো রেলপথের একটা বিরাট অংশ প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণের আঘাতে উড়ে গিয়েছে। বুটিগুলি ছিটকে গিয়ে পড়েছে প্রায় একশো হাত দূরে, মজবুত লৌহনির্মিত পাতিগুলি দুমড়ে মুচড়ে দলা পাকিয়ে গিয়েছে, কোথাও কোথাও লোহা গলে গিয়ে বিকৃত আকার ধারণ করে জমাট বেঁধে সায়োচে। সন্ধ্যাবেলার রেলগাড়িটা লাগাম করে একটু আগে দাঁড়িয়ে পড়েছে, অনেকগুলি কুলী মারা পড়েছে এবং উত্তেজিত যাত্রীরা গাড়ির থেকে নেমে শঙ্কাপূর্ণ দৃষ্টিতে ব্যাপারখানা বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু এমন ভয়ানক বিস্ফোরণের কোনও হেতু কিছুতেই কেউ অনুমান করতে পারল না। ধন্ধে পাড়ে বাওরা ব্রেল আপিসের বাবুরা ছিন্নভিন্ন শবগুলি চালান করে দিল সদর চিকিৎসালয়ে। পারের দিন বিলিতি ডাক্তারবাবুরা মৃতদেহগুলি নীরিক্ষা করে কপালে ভাঁজ কোলে বসে রইলেন। জানা গেল, প্রতিটি মৃত হতভাগ্য মরার অনতিপূর্বে ভীষণ বজ্রাঘাতের শিকার হয়েছে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা কোমর বেঁধে সাক্ষী দিলে যে ঐ সময়ে আকাশ আচম্বিতে মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল বটে, কিন্তু কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়েনি এবং ঐ বিস্ফোরণে আর যাই হোক কোনও ভাবেই বজানল ছিল না, অনুপরি বজ্রের অভিঘাতে রেলের লোহা গালে বাবার কথা, মাটি ছিন্নভিন্ন হয়ে বাবার কথা কক্ষনো কেউ শোনেনি। রহস্য কিন্তু অসমাপ্তই রয়ে গেল।

*

দেবনগর গাঁখানা হুতাইচন্ডী নদীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, অর্থাৎ সাগরের এক্কেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েচে। ঘটনাটা কইবার পূর্বে এই গাঁয়ের ইতিহাসটা সামান্য কওয়া আবশ্যক। এই গ্রামখানি যারা পত্তন করেচিলেন সেই মুরুব্বীরা কিন্তু কেউই ঠিক এই সোঁদরবনের কোলের ছেলে যাকে বলে, তা নয়। এদের আদি বাসস্থান কাশী বিশ্বনাথের নিকটে ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সেইখান থেকে আর দশটা উপজাতির মতোই কোনও কারণে একদল মানুষ এই সমুদ্রের পীঠস্থানে এসে জঙ্গল কেটে বসত গড়েন। এদের গায়ের রঙ যেমন পরিষ্কার, তেমনি দীর্ঘ উচ্চতা বিশিষ্ট দেহাবয়ব। বহু জনজাতি যেমন নিজেদের সূর্যের সন্তান, চন্দ্রের সন্তান বলে পরিচয় দান করেন, তেমনি এদের পূর্বসূরীরাও ধারণা করতেন তারা কোনও দেবতার সন্তান। এই ধারণা কেমন করে জন্মাল তার অনুসন্ধান করা বৃদ্ধা, এমন ধারণা পৃথিবীর প্রতিটি কোণায় কোণায় মানবগোষ্ঠীর মধ্যে পূর্বেও ছিল, এখনও রয়েছে, কিন্তু এই ধারণার বশবর্তী হয়েই এই গাঁয়ের লোকেরা কক্ষনো নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ প্রশ্রয় দিত না। কামার, কুমার, মেথর, মুচী, শাঁখারী, চাষী, সকলেই মিলে মিশে থাকতো। এদের পূর্বপুরুষেরা এই গ্রাম প্রতিষ্ঠা করে নাম রাখেন দেবনগর। সমুদ্দুরের পাশে একখানা বিরাট জঙ্গলে ঘেরা পাথুরে টিলার গায়ে তৈয়ারী করেন বিশাল শিবমন্দির। উচ্চতায় কম করে ত্রিশ হস্ত। ভিতরে বিশ হস্ত উচ্চ ভগবান মহাদেবের বিগ্রহ, যিনি বংশানুক্রমিকভাবে পূজিত হয়ে আসচেন। পাশেই প্রায় মন্দিরের মতোই উঁচু এবং মন্দিরের আদলেই গড়া নাটমন্দির। ঝোপে জঙ্গলে আকীর্ণ হয়ে তার প্রবেশ পথ গিয়েছে রুদ্ধ হয়ে। এটি সুদীর্ঘ কাল প্রয়োজন হয়নি, তাই সংস্কারের অভাবে বৃক্ষে এবং লতাপাতায় আচ্ছন্ন হয়ে নির্বাণের অপেক্ষায় দিন গণনা করে চলেচে।

বিক্রম কলু বংশ পরম্পরায় মজুর খাটে। তার বাপ একাদশী কলু বাপ পিতেমোর তেলের ঘানি ছেড়ে গাঁয়ের আশপাশেই জন মজুরি খেটে এসেচে এ যাবৎ কিন্তু তার ছেলের বয়স কম, উৎসাহও চতুর্গুণ, তাই সদরের সতীনাথ ঠিকেদারের দল যখন সৌরাষ্ট্রের মোহনদাস গান্ধীর সবরমতী আশ্রমের নিকট মাটি খোঁড়ার কাজ পেলো, তখন একাদশী ছেলেকে ততো বাধা দিল না, বিক্রম কলু শাবলচির কাজ নিয়ে চলে গেল গুজরাত রাজ্যে। তার যাত্রার কালে একাদশী কলু মহাদেবের কাছে পূজা দিয়ে, তাবিজে কবচে আচ্ছাদিত করে পুত্রকে কইলো— “যাও বাপ, দূগ্গা দুগ্গা বলে বেরিয়ে পড়ো।”

প্রভাতের লোনা বাতাস ঝাউয়ের গাছগুলির মাথায় মাথায় শনশন করে ফিসফিসিয়ে কইলো—“যাস না… ওরে যাস নাআআআ…”

সবরমতী নদীর তীরে চিনিকলের পাশে ঐ কারখানার আয়তন বৃদ্ধির জন্য কিছু জমির প্রয়োজন, তাই নদীর পাড়ে প্রশস্ত অংশে মাটি খুঁড়ে জমি তৈয়ারী হচ্চে। একেবারে ভোরবেলায় কাজ আরম্ভ হয়। দ্বিপ্রহরে সামান্য বিরতি, ফের সাঁঝবেলা অবধি খননের কাজ। যদিও বর্তমানে কয়দিন কাজ একটু শীঘ্র শীঘ্র শেষ হচ্চে, কারণ এই বিশাল গভীর গর্ত এখন এতটাই গভীর হয়ে গিয়েচে যে এর নীচে বিকেল হলেই আঁধার নেমে আসে। একত্রে প্রায় দুই শতাধিক মজুর কাজ করে চলেচে। বিক্রম কলু খনন স্থানের ঈশান কোণে কাজ করে। আজ দুই মাস যাবৎ এই একঘেয়ে কার্যে ব্যাপ্ত থেকে লোকজন যৎপরোনাস্তি বিরক্ত হয়ে পড়েছে, তবে কাজ শেষের মুখে প্রায়। আর বড়জোর দুইদিন হলেই খনন মজুরদের কর্তব্য শেষ হয়ে রাজমিস্ত্রি দলের কাজ আরম্ভ হবে। বিশাল পরিখার ন্যায় সেই গর্তের নীচে দাঁড়িয়ে বিকেলের আকাশটাকে দেখে মাথার উপর একখানা ঝুলন্ত ফিকে ছাই রঙের চাদর বলে মনে হচ্চে। মজুরেরা সবাই হৈ চৈ করে উপরে ওঠা শুরু করেচে, কেরানী বাবুরা উপরে চাদর পেতে দৈনিক মজুরির টাকাপয়সা বুঝিয়ে দিতে বসেচে। বিক্রম একটু জিরিয়ে নেবার জন্য শাবলখানা মাটিতে রেখে কোমরের বাঁধা গামছা খুলে কপালের ঘাম মুছে মাটিতে বসতে যাবে, ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল ভীষণ উজ্জ্বল কয়েকটা বিন্দু। এই প্রায় আসন্ন আঁধারে যেন কয়েকখানা অত্যুজ্জ্বল হীরকের কুচি মাটিতে প্রোথিত হয়ে রয়েচে।

প্রতিটি মজুরের এই সময় বড্ড তাড়াহুড়ো থাকে। হয়তো অপর কারুর চোখেও পড়ে থাকবে, কিন্তু এটি কয়লার খনি নয় বলেই কেউ হয়তো ঐটের দিকে ফিরেও তাকায়নি। বিক্রম গামছাখানা শাবলের পাশে রেখে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় এগিয়ে গেল আলোক বিন্দুর পানে। দুটো আঙুল দিয়ে একটিকে চেপে ধরা মাত্র বিক্রমের মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। মুহূর্তে তার মনে হলো এইটে যেন সম্পূর্ণ অচেনা একটি স্থান। চারিদিকে বিশাল বিশাল গাছের সারি, খড়ের ছাউনি দেওয়া বাড়ি, তার নীচে একটি ক্ষুদ্র শিশু শুয়ে শুয়ে কেঁদে চলেচে। আবছা ছায়াপথের মতো ময়ূরের দল ঘুরে বেড়াচ্চে ইতিউতি, একজন গৃহবধূ গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে উদাস নয়নে সামনে চেয়ে রয়েচে। হঠাৎ সেই শিশু বয়স্থ মানুষের ন্যায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হেঁটে এসে দাঁড়ালো বিক্রমের একেবারে সামনে। তার চোখ থেকে আগুন ঝরে পড়ছে যেন, তার মুখের ভঙ্গিতে মৃত্যুর ইঙ্গিত, সেই শিশু মুখ নেড়ে কি যেন বলতে চাইচে অথচ কিছুতেই কিছু শোনা যাচ্চে না। হতবাক অবস্থাতেও সতর্ক ভাবে কান পাতলো বিক্রম, আর কানে এল—“বাছা, তুমি কি অসুস্থ বোধ করচো?”

চমকে উঠে বিক্রম কলু লক্ষ্য করল তাকে ঘিরে স্বয়ং সতীনাথ ঠিকেদার এবং তার চারদিকে আট দশজন মজুর দাঁড়িয়ে পড়েছে। বিক্রমের ঘোলাটে চোখের দিকে তাকিয়ে সতীনাথ পুনরায়ঃ শুধোলো—“বলি ও কলুর পো, শরীর খারাপ লাগচে কি?”

হাতের চকচকে দ্রব্যটি সকলের অলক্ষ্যে মুঠোয় ভরে নিয়ে বিক্রম শশব্যস্ত হয়ে কইলো—“আজ্ঞা না না টিকাদার সায়েব, এই একটু আনমনা হয়ে পড়েচিলেম বৈ তো নয়।”

*

রাতে দ্বিতীয় প্রহরে তখন খেটে খাওয়া মানুষগুলো সকলেই গভীর নিদ্রায় মগ্ন হয়ে রয়েচে, কেবল বিক্রম কলু কায়িক শ্রমে কাতর হওয়া সত্ত্বেও বিনিদ্র চক্ষে জেগে শুয়ে রয়েচে। তার বুকের উপর রাখা দক্ষিণ হস্তের তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলির মাঝে ধরা রয়েচে সেই চকচকে বস্তুটা। ভালোভাবে পরীক্ষা করে সে দেখেচে এইটে কখনওই হীরা নয়, কোনও মূল্যবান পাথরও না হওয়াই সম্ভব, কিন্তু বড়ো অদ্ভুত দর্শন একটি জিনিস। আয়তনে একখানা নারকেলি কুলের দানার অধিক নয়, কিন্তু গোল নয়, বরং ঈষৎ লম্বাটে আর সামান্য এবড়োখেবড়ো। একপাশ ঘষা সমতল মতো, অপরপার্শ্ব একটু ছুঁচলো এবং সরুপানা। ঠিক যেন একখানা বড়োসড়ো মানুষের দাঁত। স্বয়ংপ্রভ আলোকে ঝলমলে হয়ে রয়েছে।

তাঁবুর বাইরে আগুন জ্বলচে, তার দ্যুতিতে তাঁবুর বস্ত্র নির্মিত দেওয়াল আলোকিত হয়ে ভিতরটাকে কিঞ্চিৎ আলোকিত করে রেখেচে, কিন্তু সেই আলোতেও এই আশ্চর্য বস্তুটির প্রভা ম্লান হয়নি। নদীর মাটির ওই স্থানে বহুযুগের মধ্যেও হয়তো খননের কাজ হয়নি, কিন্তু তবে এত বৎসর পরেও মাটি চাপা পড়া কোনও দ্রব্যের এতখানি ঔজ্জ্বল্য কেমন করে বজায় রয়েচে? কীসের তৈরি এখানা? এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মাথাটা একটু বাম দিকে এলিয়ে দিতেই দারুণ আতঙ্কে বিক্রম কলুর হৃৎপিণ্ড ধড়াস্ করে উঠল।

বাইরের আগুনের কাঁপতে থাকা শিখার আলোতে তাঁবুর গাত্রে এক অদ্ভুত ছায়া পড়েছে। বিরাট ঝাঁকড়া মাথা, উন্নত স্কন্ধদেশ, প্রকাণ্ড আকৃতির কোনও একটা জীব তাঁবুতে ঢোকার জন্য ফাঁক খুঁজচে। বিক্রমের রক্ত শীতল হয়ে এল। এই প্রদেশের কিছু অঞ্চলে সিংহ বাস করে বলে জনশ্রুতি শুনেচিল সে। তবে কি কোনও নরখাদক সিংহ তার শিকার খুঁজতে বের হয়েচে? ভীষণ ভয়ে কণ্ঠস্বর দলা পাকিয়ে এলেও মনের জোরে গোঙানির মতো করে চিৎকার করে উঠল—”সিংহ!” আর প্রায় তক্ষুণি তার নজরে এল, ঝাঁকড়া মুণ্ড এবং দীর্ঘ লেজ থাকা সত্ত্বেও সেই প্রাণীটি যেন দুই পায়ে দাঁড়িয়ে রয়েচে। বিক্রম চেতনা হারিয়ে ঢলে পড়ল।

সকালে ঘুম ভেঙে বিক্রম আবিষ্কার করলে যে তার রাতের চিৎকার কেউ শুনতে পায়নি। সকলেই স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম করে চলেচে। রাতের ঘন আঁধারে যাকে বিভীষিকা বলে ভ্রম হয়, দিনের উজ্জ্বল আলোকে তাকেই স্বচ্ছন্দে অবহেলা করা চলে। কিছু সময় পর বিক্রমের স্পষ্টতই মনে হলো, রাতের ঘটনাটি তার উদভ্রান্ত চিত্তের কষ্ট কল্পনা মাত্র। বেলা নয়টা নাগাদ যখন ব্যস্ততা একেবারে তুঙ্গে, যখন দলবদ্ধ হয়ে কুলী মজুরের দল নদীর পাড়ে যাবার প্রস্তুতি নিচ্চে, হঠাৎ রতনলাল মিশ্র (ইনিও শাবলচি) কইলো—“কলু ভাই, তুমি কখনও সিংহ দেখেচ?”

প্রশ্নটা নিতান্তই সাধারণ, কিন্তু শব্দগুলি বিক্রমের শিরায় শিরায় যেন কাঁপুনি ধরিয়ে দিলে। শুষ্ক কণ্ঠে সে শুধোলো—“না, আমি মানে, সেভাবে কখনও সামনা-সামনি….”

–“সামনা-সামনি না হোক, দূরের থেকে?”

বিক্রম ঠোঁট চেটে আমতা আমতা করে কইলো—“কেন মিশ্রাজী? হঠাৎ এই সওয়াল করলে যে বড়ো?”

রতন আনমনাভাবে উত্তর দিল— “না, ঠিক এমনই নয়, হয়েচে কি জানো, কালকে রাত্তিরে কীসের যেন একটা শব্দে ঘুমটা হঠাৎ ছুটে গিয়েচিল। ধুত্তোর বলে একখানা বিড়ি ধরাবার জন্য তাঁবুর বাইরেটায় এসেচি, তখনই চোখের ভুলই হবে হয়তো বা, একখানা বিরাট বড়ো কী যেন ঐ আগুনটার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েচে মনে হল। এই বড়ো মুণ্ডু, টিকটিকির মতো পানসে গায়ের রঙ, চোখগুলো আগুনের মতোই জ্বলচে। ইতিউতি কি যেন ঠাহর করে চলেচে সেটা। আমার হাত থেকে ম্যাচবাতি খসে পড়ল, কপালে হাত ঠেকিয়ে আরও ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলুম, সেই বিকট জন্তুটা তোমাদের তাঁবুটার বাইরে একটু সময় ঘুরঘুর করল, তারপরেই কার যেন একটা চাপা চিৎকার কানে এল, তক্ষুনি দেখি সেই শয়তানটা তাঁবুর ভিতর ঢুকে পড়েচে। আমার হাত পা শেতল হয়ে এল, আমি এক দৌড়ে কানাৎ এর ভিতরে ঢুকে, দরজা বেঁধে মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লুম। কান খাড়া রাখা সত্বেও আর কোনও শব্দ যখন এল না, তখন বুঝলাম ও আমার মনের ভ্রান্তি। বাঘ সিংগি এলে কি কাউরে না কামড়ে পালায়?”

বিক্রমের সারাটা দিন কাজে মন বসলো না। তাহলে কি চোখের ভুল নয়? সত্যিই কিছু একটা এসেচিল বাইরে? রতন না হয় ভুল দেখেচে, কিন্তু যে জায়গাটার কথা সে উল্লেখ করল, সেইটে তো মিলে গিয়েচে। সে নিজেও তো ঐ স্থানেই ছায়াটা দেখেচিল। তাছাড়া আরেকটি ব্যাপার। বাঘ সিংহ ভয়ঙ্কর জানোয়ার বটে, কিন্তু আগুনের এক্কেবারে গায়ে গায়ে তারা কদাপি আসে না। এ তাবে কেমন পশু, যা আগুনকেও ডরায় না? পশুই তো ঠিক?

দিন ঘুরে আবার একটা রাত্তির এল। আগের দিনের আজগুবি ঘটনাটাকে বিক্রম মনের বল প্রয়োগ করে একপ্রকার উড়িয়েই দিয়েছে, কিন্তু এইবারে আজকের ঘটনাটার সাক্ষী এতগুলি লোক রইলো, যে তাকে আর উড়িয়ে দেওয়া সম্ভবপর হল না। রাতে যথারীতি সকলেই নিদ্রাচ্ছন্ন। গোটা দিবারাত্র জাগরণের পর বিক্রমের চক্ষেও গভীর নিদ্রা। আচমকা একটা হৈহৈ আওয়াজে সবকয়টি তাবুর মজুরেরা ঘুম ভেঙে চমকে উঠল। বাইরের অঙ্গনে ঠিকেদার সায়েব সকলকে জড়ো করে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর যে মর্মটুকু উদ্ধার করা গেল, তা হল—তিন নম্বর কানাং, অর্থাৎ বিক্রমদের তাঁবুতে একেবারে পশ্চিমে শাসন করেছিল কানাই হাঁড়ি আর সুদামা হাঁড়ি। এরা দুই সহোদর। দুজনেই জলবরদারের কাজ করে। রাত যখন মাঝামাঝি পৌঁচেছে, হঠাৎ সুদামার মনে হল তার ঠিক মুখের উপরে কীসের যেন উষ্ণ বাতাস এসে লাগছে। চকিতে চোখ খুলেই বিস্ময়ে কাঠ হয়ে সে দেখলো, একখানা বিকট সিংহের মতো মুণ্ড বিশিষ্ট কী একটা তাকে তীব্রভাবে শুঁকে চলেচে। হলদে রঙের জেলার মতো চক্ষু ধকধক করে জ্বলচে। প্রচণ্ড আতঙ্কে গলা থেকে শব্দ না বেরুলোও হাতড়ে হাতড়ে নিজের ডান হাতটি দিয়ে সে পাশে শয়নরত ভাইকে একখানা চিমটি কাটলো। কানাই বিরক্ত হয়ে চোখ মেলে ঐ অপার্থিব দৃশ্য দেখেই ভয়ানক একটা চিত্কার করেই লাফিয়ে বাকিদের গায়ে গিয়ে পড়ল। ধড়মড়িয়ে চার পাঁচজন লাফিয়ে উঠেই লক্ষ্য করল, একটা অদ্ভুত আকারের জীব তাঁবুর থেকে এক লাফে বেরিয়ে চলে গেল। ভীষণ ত্রাসে প্রতিটি মানুষ কলরব করতে করতে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। ঠিকেদার বাবু নিজের তাঁবুর হ্যারিকেন বাতিখানা নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান চিহ্নিত স্থানে গিয়ে দেখলো তিন নম্বরী শাবলচি তাঁবুর বাইরে বিরাট মাপের কতকগুলি জান্তব পায়ের ছাপ।

*

শাবলচি দলের প্রয়োজন ইতিমধ্যেই ফুরিয়ে গিয়েছিল এই দুইদিনে। পরদিবসে দলের বাইশজন নিজের নিজের টাকাকড়ি গণনা করে বুঝে নিয়ে গৃহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। বিক্রম যে রেলের গাড়িতে চাপলো, সেই গাড়িতে তার দলের কেউই যাচ্ছে না। যে কয়দিন এই যন্ত্রদানবের পেটের ভিতরে অতিবাহিত হল, প্রায় প্রতিটি রাতেই সহযাত্রীরা মহা হাঙ্গামা বাধিয়ে তুললো। রাতে নাকি কোনও একটা ভয়ালদর্শন জন্তু রেলের গাড়ির কুঠুরিতে উঠে আসচে, গোটা গাড়িময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। একজন বিধবা বৃদ্ধা সপরিবারে দেশের বাড়ি যাত্রা করচিল। গাড়ির কাঠের মেঝেতে চাদর পেতে তারা শয়ন করেচিল। সকলের শোবার আগে কোম্পানীর লোকেরা এসে লণ্ঠনের তেল, সলতে বদলে, কুঁজায় জল ভরে দিয়ে গিয়েছে। বৃদ্ধার মধ্য রাত্তিরে জল পিপাসা পাওয়াতে সে ঘুম জড়ানো চোখে উঠে বসেই দেখে একখানা ভয়ঙ্কর আকৃতির প্রাণী ধীর লয়ে হেঁটে হেঁটে কুঠুরির অপর পার্শ্বে চলে যাচ্চে। বুড়ি ভয়ানক ভয় পেয়ে আর্তনাদ করে ওঠা মাত্র জন্তুটা এক লাফে ফিরে এসে বৃদ্ধার গালে প্রবল চপেটাঘাত করে, লাফ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। অনেক যাত্রী শব্দ শুনে জেগে উঠে স্বচক্ষে এই অলীক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করল। বৃদ্ধার গালের থেকে ঘাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে তাজা রক্তের ধারা। গালে গভীর নখের ক্ষত। চেঁচামেচি শুনে গাড়ি বেঁধে রেল কর্মচারী আর রক্ষীরা ছুটে এসে দেখলো বুড়ির বিকার উঠেচে। প্রভাতের সামান্য পূর্বে অসহায় বৃদ্ধার প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গেল।

গাড়ি বদলে লালসাঁকো ইষ্টিশনে নেমে বাড়ি ফেরার পর গাঁয়ের লোকেরা খবর পেয়ে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বাড়ি বয়ে দেখা করতে এল। একাদশী কলু সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে সম্ভাব্য অসম্ভাব্য অনেক রকম গপ্পো ফেঁদে শোনালো, তার পুত্র যে কতো বড়ো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে লিপ্ত ছিল তাও শোনাতে ভুললো না। নগেন মুৎসুদ্দি শুধোলো—“তা দেখো, ছেলে তো তোমার একার নয়, আমাদের গাঁয়েরও। বাইরের দশটা দেশ দেখে আসবে, দশটা মানষির সাথে মিশবে, তাই তো বড়ো কথা, টাকাকড়িই তো জীবনের সব নয়। ও হ্যাঁ, কথায় মনে পড়ল বটে, তা ওইখেনে টাকাপয়সা কেমনপেলো টেলো ছেলে আমাদের?”

একাদশী গর্বিত ভাবে কইলো–“তা ভালোই পেয়েচে টেয়েচে খুড়ো। বেশ কিছু টাকা এনেচে। সে অনেকই হবে। তোমাদেরকে একদিন পেট পুরে খাওয়াবো খন।”

এই কথায় রুষ্ট হয়ে নগেন কইলো—“সারাটা জীবন তো লোকের বেগার খাটলে বাছা, এইবার একটু জিরানের বয়সে এসেচো। ছেলে উপার্জন যা করচে তাই একটু বাড়িয়ে গুছিয়ে রাখো, একটু সুখে থাকো। ভূতভোজন করিয়ে সেগুলা উড়াবে কেন? দরকারে আমরা কিছু কিছু দেবো, সে টাকায় একত্রে খাওয়া দাওয়া হবে’খন। ও ভাবনা তোমার নয়।” যে সময়ের কথা বলচি, সে সময়ে পাড়াগাঁয়ের লোকগুলির হৃদয় আজকের মতো সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়েনি। তারা স্বার্থ স্বার্থ করে আরশুলা, ইন্দুরের ন্যায় জীবনধারণ করতো না। যাক সে কথা।

*

বিক্রম কিন্তু বাপের অনুরোধ সত্ত্বেও কিছুতেই পড়শিদের সঙ্গে দেখা করেনি। চাট্টিখানি মুখে দিয়ে শয্যায় গিয়ে দোর দিয়েচে। যত বেলা পড়ে গিয়ে রাত্র ঘনিয়ে আসচে, ততোই তার মন অজানা আশঙ্কাতে ছটফট করে চলেচে। একাদশী কিন্তু এতশত বোঝেনি। তার খটকা লাগল, তবে কি আমার অতিরঞ্জিত গল্পগুলি ওর মনে বিরক্তির সঞ্চার করচে? তবে কি আমি যা বললুম সব মিছে? টাকাপয়সা কিছুই তেমন উপার্জন হয়নি? না হয়েচে তো না হয়েচে, বললেই তো পারে। বাপের কাছে নুকোচুরি কি? একটা অসোয়াস্তি এবং কিছুটা ঔৎসুক্যের বশবর্তী হয়ে ছেলের অজান্তে তার টিনের তোরঙ্গ চাবি ঘুরিয়ে খুলে ফেলল একাদশী। ডালার অভ্যন্তরে সেইখান থেকে খরিদ করা সুগন্ধি পাউডর, একটুকরো শৌখিন সাবান, এসেন্স, বেশ কিছু টাকাপয়সা রয়েচে। দেখা শেষ হলে সেটি বন্ধ করে তোরঙ্গে কুলুপ এঁটে শুয়ে পড়ল সে।

সকালে একাদশী নিজের উঠানে দাঁড়িয়ে দাঁতন করচে, তখনই নজরে এল গাঁয়ের সুবোধ চাটুজ্যে, হরিধন মালী, সুবল কামার আর দুই তিনজন হস্তদত্ত হয়ে কোথা যেন চলেচে। একাদশী দাঁতন নামিয়ে হাঁক পাড়লে, “পেন্নাম ঠাকুর, চললা কোন ঠাঁই?”

সুবোধ চাটুজ্যে উদভ্রান্ত স্বরে জবাব দিলে—“ও একাদশী, চল না বাবা দুই পা। কাছারি হয়ে চৌকি হয়ে আসি’খন।”

একাদশীর ভ্রু কুঞ্চিত হল।

–“চৌকি? দারোগার কাছে নাকি? কী হয়েছে কী?”

–“আর কস’নে কলুর পো, শিব শিব শিব, গাঁয়ে অপদেবতা ঢুকেচে বাছা। বিজয় মালাকারের ছেলে, বড়োটা, কাল বেঘোরে মারা পড়েছে। শরীরটাকে নিয়ে যেন কামড়া-কামড়ি করেচে কোনও সাক্ষাৎ শয়তান। সে চোখে সয় না। দারোগারে খপর দিতে যাচ্চি। চল না বাছা। আমার যে আর পা সরে না।”

একাদশী তড়িঘড়ি নিমকাঠিটা ছুঁড়ে ফেলে, মুখে জল দিয়ে বলল—“এই যাই ঠাকুর, কামিজটে চাপিয়ে এই এলুম। কিন্তু অপদেবতা মেরেচে তা বুঝচে কীসে তারা? কেউ দেখেচে?”

“দেখেচে বৈকি বাপ, স্পষ্ট দেখেচে।”

একাদশী বিস্মিত হয়ে শুধোলো—“কী দেখেচে?”

চাটুজ্যে ইতস্ততঃ করে বলল—“বলি, সিংহ দেখেচিস তুই কখনও?” একাদশী দুইদিকে মাথা নাড়ার সাথে সাথে টের পেলো যে তার পুত্র সবার আড়ালে ভিতরের জানালার ফোকরে এসে পাগলের মতো দাঁড়িয়েচে।

দলবল নিয়ে চৌকিতে গিয়ে পৌঁছুলো তারা। দশাসই চেহারার দারোগা চৌপাইয়ের পুরোটা জুড়ে বসে রয়েচে। দলটি ভিতরে প্রবেশ করতে দারোগা উঠে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে কইলো—“প্রণাম চাটুজ্যে মশায়, বসুন বসুন, সকাল সকাল এই অধমের কাছে আপনারা…. কী হারিয়েচে?”

সব কথা শুনে দারোগার হাসি অন্তর্হিত হল। একজন হাবিলদারের উদ্দেশ্যে হাঁক দিলে- “রামাঃ, জিন নিকাল আবহি।”

ঘোড়ায় জিন চড়িয়ে দারোগা খুটখুট করে চলল, সঙ্গে হেঁটে বাকিরা। গাঁয়ে এসে সব দেখে খাতায় তোলা হল। শোনা গেল রাতে বেশ কয়েকজনেরই একটি অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েচে। কেউ কেউ গৃহের বাইরে কারুর নড়াচড়ার শব্দ পেয়েচে, কেউ বা দূরের আবছায়াতে আরও আবছা একখানা অবয়ব দেখেচে, যার মুণ্ডুখানা অনেকটা দুগ্গা ঠাকুরের সিংহের মতোই, কিন্তু সোজা দাঁড়ানো। দারোগা ধোঁয়াশায় পড়ে কিছুই বুঝতে পারল না।

দ্বিপ্রহরে বাড়িতে ফিরে শ্রান্ত একাদশী পুত্রের পাশে এসে বসলো। বিক্রম জিজ্ঞাসু চক্ষে পিতার পানে চাইলো। একাদশী ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল— “তোমার কী হয়েচে বাপ? কী লুকোচ্চো তুমি আমার কাছে? তুমি নিশ্চিত কিছু জানো এ ব্যাপারে, তাই নয়?”

বিক্রম চোখ লুকিয়ে কইলো—“কোন ব্যাপারে?”

— “যা যা সকালে তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে শুনচিলে, সে বিষয়ে।”

বিক্রম এইবার হাউহাউ করে কেঁদে উঠে বলে উঠল— “আমি কিচ্ছুটি জানিনে বাবা, বিশ্বেস করো। কাজের ওইখেনে থাকার সময়ই এই উৎপাত আরম্ভ হয়েচিল। আমাকেই সকলে দোষী ঠাউরাবে বলেই কইনি কারুকে। আমি… আমি ছায়ার মতো তাকে দেখেচি।”

–“কাকে দেখেচো?”

–“যার কথা সকলে কইচে, সেই সিংহের মতো দেখতে….”

–“কীভাবে, কোথায় দেখেচো?’

–“সেইদিন তাঁবুতে শুয়েচিলাম। সবাই ঘুমুচ্চিল…”

–“সবাই বলতে? তুমি ঘুমাওনি?”

–“নাহ”

— “কারণ?”

–“আমি বিকেলের কথা ভাবচিলাম।”

— “কোন কথা? বিকেলে কী হয়েছিল?”

বিক্রম তখন চকচকে বড়ো পুঁতির মতো বস্তুটির কথা, যেটি সে নানান ঘটনায় ইতিমধ্যেই ভুলেই গিয়েচিল, সেইটির কথা পিতাকে খুলে বলল। শুনে একাদশীর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। বিক্রম একখানা পুঁটুলির থেকে সেখানা বের করে বাপের সুমুখে রাখলো। একাদশী চমকে উঠে কইলো— “একি! কারোর দাঁত নাকি এ-খানা?”

*

সন্ধ্যার মুখে হুতাই নদীর পাড়ের ভূখণ্ডে একাদশী গাঁয়ের চারজন মাতব্বরকে ডেকে আনলো। এই বিস্তীর্ণ ফাঁকা জমিটি কারুর মালিকানায় নাই। মিঠে নদীর বাতাসের কারণে এই স্থানে গ্রামের নারী পুরুষেরা গ্রীষ্মকালীন বৈকালে জমায়েত হয়। প্রবালচন্দ্র মালাকার গাঁয়ের বড়ো ফুলের ব্যবসায়ী, অনলমোহন চক্কোত্তি এই দেবনগরের প্রধান পুরোহিত, শ্রীরূপচন্দ্র ধর বহু জমিজিরেতের মালিক এবং বড়ো মানুষ, সেইসাথে হট্টগ্রামের জমিদারির নায়েবের সহকারীর কাজও সামলান তিনি। সঙ্গে একাদশী আর তার পুত্র। একাদশী সমস্ত কথা এই কয়জনের সামনে খুলে কইলো এবং নিদান চেয়ে বলল—“এইবার তোমরাই বলো ভায়া, আপনিও বলুন ঠাকুরমশায়, এর কি বিহিত করা আবশ্যক।”

চক্কোত্তি চিন্তিত স্বরে বললে—“কি বলি বাছা তা ভগবানই জানেন। আমার এবং তোমাদের সবাইকার সন্দেহটাই মনে হচ্চে সত্য। এতখানি বয়স হল, এমন অলুক্ষুণে জিনিস আমি কস্মিনকালেও চক্ষে দেখিনি। দেখলেও গা কাঁপে। দাঁতের মতোই তো দেখতে, কিন্তু দেখো একবার, কেমন আলোর মতো ঠিকরাচ্চে গা থেকে। না না, এসব ভালো লক্ষণ নয় হে। ও আপদ বিদেয় করো। হয় ভাসিয়ে দাও, নয় নষ্ট করে ফেলো গে।”

নানান আলোচনা হবার পর অবশেষে ঐ সর্বনাশা দাঁতখানা নষ্ট করাই স্থির হল। বিক্রম কইলো—“আমি যখন এখানা হাতে করে এনেচি, তখন আমিই এটাকে বিনষ্ট করবো। আপনারা এইখেনেই একটু দাঁড়ান।” এই বলে বিক্রম এগিয়ে গেল নদীর পাড়ের প্রস্তরময় বালুবেলার পানে। একখানা প্রশস্ত_উপলখণ্ডের উপর দাঁতটিকে স্থাপিত করে ডান হাতে আরেকখানি ভারী পাথর নিয়ে সজোরে মারলো এক ঘা। দাঁত ভাঙলো না। বিক্রম উন্মাদের ন্যায় ক্ষিপ্র হস্তে আঘাতের পর আঘাত করে চলল। দাঁতের প্রভা পূর্বের চাইতে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেচে। প্রবালচন্দ্র উদ্বিগ্ন হয়ে একাদশীকে বলে উঠল— “ওহে কলু ভায়া, এই হতভাগা আপদটারে হয়তো এইভাবে ভাঙা যাবে না। ছেলেটা তোমার পাগল হয়েই উঠল যে। এক কাজ করো, আপদটাকে ধরে নদীর জলেই এক্কেবারে….

বুমমমমমম…

এক শ্রবণশক্তি বিকল করে দেওয়া ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের শব্দে উপস্থিত প্রতিটি ব্যক্তি ভয়ানক চমকে উঠে অপলক দৃষ্টিতে দেখলো নদীর তীরে, যেইখেনে বিক্রম পাথর ঠুকচিল, সেই স্থানটি আর নাই। কোনও এক ভীষণ তেজী বিস্ফোরণের ফলস্বরূপ সম্পূর্ণরূপে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েচে সেই ভূখণ্ড। বিক্রমের অবিন্যস্ত মৃতদেহ ছিটকে এসে পড়েচে তাদের থেকে হাত দশ বারো ব্যবধানে, গভীর গর্ত হয়ে যাওয়া পাড়ের অংশে হুহু করে নদীর জল ঢুকচে। তীরের ঝোপঝাড়গুলি পুড়ে ভস্ম হয়ে গিয়েচে। একাদশী এক প্রচণ্ড আর্তনাদ করে চেতনা হারিয়ে নদীপাড়ের নরম মাটিতে ঢলে পড়ল।

নদীর জল ছিটিয়ে সংজ্ঞা ফেরানোর কিছুকালের মধ্যেই পুত্রহীন বাপ বুক চাপড়ে বিলাপ করা শুরু করল। বাকিদের চোখেও জল গড়িয়ে পড়চে। সকলে মিলে অসহায় বাপকে ধরাধরি করে গাঁয়ের পথে আসচে, হঠাৎ একটি দৃশ্য চোখে পড়ে তারা কাষ্ঠের ন্যায় স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে পড়ল।

তছনছ হয়ে যাওয়া মাটির স্তুপের কাছে আবির্ভাব ঘটেচে এক দীর্ঘদেহী ছায়ামূর্তির। অত্যন্ত দীর্ঘ চেহারা, বলিষ্ঠ দেহসৌষ্ঠব, উন্নত গ্রীবা, সন্ধ্যাকালের চাঁদের আলোকেও বুঝতে পারা যায় তার চোখ ভয়াবহ ক্রোধে যেন জ্বলে চলেচে। অসম্ভব তেজ ছিটকে বেরুচ্চে সেই ক্রোধাগ্নিতে জ্বলতে থাকা দেহের থেকে। একটু সময় এদিকে ওদিকে চোখ বুলিয়ে সোজাসুজি এইদিকেই চাইলো সে। তার ধ্বকধ্বকে চাহনির দিকে তাকিয়ে বুকের রক্ত জল হয়ে যায় বুঝি। তার গলার স্বর শুনলে মনে হয় স্বয়ং কালরূপী মহামৃত্যুই বুঝি ছন্দে ছন্দে নিজের অমোঘ, অলঙ্ঘনীয় নিয়তির বিচার শোনাচ্চে। মূর্তিটা ক্রুদ্ধ অথচ সংহত কণ্ঠে বলে উঠল—“আমার এতদিনের ঘুমিয়ে থাকা প্রতিশোধ স্পৃহা আজ ফের পুনর্জন্ম লাভ করেচে। আমার মহান পিতাকে তোরা পুনর্বার অপবিত্র, অবমাননা করার মহা প্রমাদ করেচিস। আমাকে বিনা দোষে অনাথ করেচিস। তোদের গায়ের বিশ্রী কটূ গন্ধ আমার সহ্য হচ্চে না।

স্বয়ং মহাকালের সৃষ্ট অগ্নির তেজ যদিও বা কোনওদিন শূন্য হয়ে আসে, কিন্তু আমার সৃষ্ট এই অভিশাপের উগ্র অনলচক্র ভর্তি হয়ে থাকবে আমার অভিসম্পাতের তেজে। একদিন না একদিন এই পাপের ফল শিরোধার্য করে নিতেই হবে তোদের।

মৃত্যুর মালা কিন্তু ফুলের ন্যায় কোমল হয় না। সর্বনাশা মরণের সুতায় গাঁথা এই দুর্দান্ত, প্রবল মালা কার শিয়রে কখন ঝুলচে তা কেউ জানবে না। জেনে রাখ, মৃত্যু তোদের পানে ছোবল বাগিয়ে বসে রয়েচে।

শোন শয়তান পশুর দল, তোদের পরিবারকে আমি শাপ দিইনে, কারণ তাদের কোনও কলুষ, কোনও দোষ আমি দেখিনে। আমার বিচারে এই দুর্বুদ্ধির জন্য তোদের পরিবার নয়, তোরাই একা দোষী। কলুষিত করেচিস তোরা ইতিহাসের এক মহান অধ্যায়কে। আচমকাই জীবনের সুতায় টান পড়বে আর শমন ঝাঁপিয়ে পড়বে তোদের জীবন বিনষ্ট করতে।

মৃত্যুর রূপ যে কতোখানি উদগ্র হতে পারে তা তোরা জানিস নে পাপিষ্ঠ। তোদের নিকেশের জন্য আমার অভিশাপ এমন উগ্র, বিশ্রী রূপ ধরবে, যার মোকাবেলা করার শক্তি কারুর নাই। বিপদ তোদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়চে শয়তান। আমি এক্ষণে প্রতিজ্ঞা বশে চলে যাচ্চি, কিন্তু আমার হয়ে প্রতিজ্ঞা পূরণ করবে আমার কালান্তক রাক্ষস। সে আমার আজ্ঞা মতো তোদের সকলকেই হত্যা করবে। ভয়ঙ্কর মরণের জন্য দিন গোণা আরম্ভ কর। তৈরি হ।”

এই ভয়ঙ্কর অভিশাপ উচ্চারণ করে সেই অতিকায় ছায়ামূর্তি অপসৃত হলো। তার অপসারণের পরপরই সেই একই ভূমিতে অপর একটি বিভীষণ রাক্ষসের ন্যায় শরীর এসে দাঁড়ালো। শরীর আতঙ্কে বিবশ হয়ে এলেও চারটি ক্ষুদ্র মানুষ প্রাণভয়ে গ্রামের পানে দৌড়ানো শুরু করল। সেইদিকে তাকিয়ে কাল-সিংহের ন্যায় মুখবিশিষ্ট কদাকার রাক্ষসটা অপার্থিব সুরে হেসে উঠল। তার তাড়া নাই। প্রভুর আদেশে আদিষ্ট হয়ে একে একে সবকয়টি লক্ষ্যকেই বিদ্ধ করবে সে।

*

ঠিক পরের দিনের কথা। সেই অপার্থিব মূর্তি কিন্তু নিজের প্রতিশ্রুতি রাখেনি। সে কয়েচিল যে এই উদ্দিষ্ট কয়জনার পরিবারের প্রতি কোনও আক্রমণ হবে না, কিন্তু ভুল। সেদিন চক্কোত্তি মশায়ের গৃহের পিছনের বাগান থেকে নারিকেল পাড়া হচ্চিল। গাছে দড়ি বেঁধে উঠেচে চক্কোত্তির ছোটো ছেলে বিধু, আর তার বাপ একটু তফাৎ থেকে তাকে নির্দেশ দিচ্চে, গুটিকতক লোক জড়ো হয়েচে চাট্টিখানি নারিকেল পাবার আশায়। একখানা বড়োসড়ো সোনালী ডাবের গায়ে কোপ বসালো বিধু। প্রবল আঘাতে ডাবখানা বৃত্তচ্যুত হয়ে হাতে এসে গেল। গাছের গোড়ায় একটা ফাঁকা স্থান দেখে সেটিকে নীচের দিকে ছুঁড়ে ফেলবার সময় বিধুভূষণ হঠাৎ লক্ষ্য করল ডাবের গায়ে একটা কি যেন জ্বলজ্বল করচে জোনাকি পোকার মতো, কিন্তু এখন সেসব দেখার উপযোগী মুহূর্ত নয়। পরে ছাড়ানোর সময়ে দেখা যাবে’খন। বিধু ডাবটিকে হাতের মুঠায় ধরে ছুঁড়ে দিল নীচের দিকে। যারা ডাবের জলের ভাগ পাবার লিপ্সায় মনোযোগ সহকারে মগডালের দিকে চেয়েচিল, তারা অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে দেখলো ছুঁড়ে দেওয়া ডাবটি মাটিতে নির্দিষ্ট স্থানে ভূপাতিত না হয়ে কোনও এক অত্যাশ্চর্য মন্তরে বাতাসে ভেসে, গাছটিকে একবার চক্কর দিয়ে সোজা ধেয়ে এল চক্কোত্তি মশায়ের দিকে। শুষ্ক, পরিষ্কার আকাশে ভীষণ মেঘ মুহূর্তের মধ্যে ঘনিয়ে এল, বিদ্যুৎ গর্জন করে উঠল। প্রৌঢ় বামুন এই অশরীরী ঘটনা দিনের আলোয় প্রত্যক্ষ করে ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে ঘরের দিকে দৌড় দিল আর সেই ডাবখানি ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্রের ন্যায় নির্ভুল লক্ষ্যে ছুটে এসে আছড়ে পড়ল ব্রাহ্মণের ব্রহ্মতালুর উপরে।

কানফাটানো একটা শব্দ আর সেইসঙ্গে ভীষণ রকম আন্দোলন উত্থিত হয়ে চারদিক একেবারে কেঁপে উঠল। দূরে উপস্থিত লোকজন মাটিতে ছিটকে পড়া অবস্থাতেই সভয়ে দেখলো নারিকেলের গাছ আর নাই। গাছ উপড়ে গিয়ে বহুদূরে ছিটকে পড়েচে। অমন সরস বৃক্ষের যাবতীয় রস অন্তর্হিত হয়ে পোড়া কাষ্ঠে পরিণত হয়েচে। ব্রাহ্মণ সম্পূর্ণ দগ্ধ হয়ে ঝলসে গিয়ে ভয়ানক মুখব্যদ্যান করে মরে রয়েচে।

গ্রামে একটা ভীষণ গোলমাল বেঁধে গেল। গতকাল রাত্তিরের নদীর চড়ার ঘটনাটি বাইরের কেউই প্রত্যক্ষ করেনি, কাজেই সকলের মনেই এই ধারণা জন্মাল যে, আগেরদিন যে একটি নরহত্যা হয়েচিল, তা নিশ্চয়ই কোনও যাদুকরের কাজ। নচেৎ সিংহের মতো মুণ্ডু আবার কোনও মানুষের হয় নাকি? আর নারিকেলই বা কোন মন্ত্রবলে বাতাসে উড়তে পারে? এ নির্ঘাৎ কোনও দুষ্ট বাজিকরের কীর্তি। দারোগা এসে পুনর্বার ভ্রুকুটি করল, কিন্তু স্বভাবতই রহস্যের দ্বারোদ্ঘাটন হল না।

দুইদিন তফাৎ দিয়ে ফুল ব্যবসায়ী প্রবালচন্দ্র মালাকার মরলো আরও শোচনীয়ভাবে। প্রবালের নিজস্ব বিরাট ফুলের উদ্যানের পাশে তার শখের মিঠেপানের বরজ। সেদিন লোকজন নিয়ে পুষ্প চয়ন করা সাঙ্গ হলে পর তারা তামুক খেয়ে একটু জিরেন দিতে বসলো মাটির উপর। প্রবাল ততক্ষণ পানের পাতা তোলার জন্য বরজে ঢুকলো। সঙ্গে তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা নীলু। বাকি অধীনস্থ কর্মচারীরা পোষাক অপরিষ্কার হবার দরুণ বরজে প্রবেশ করলে না, কারণ বরজে সামান্য পরিচ্ছন্নতার অভাব ঘটলেই পানের গাছ মরতে থাকে। প্রবাল ভাইকে নিয়ে প্রবেশ করে কইলো—“নীলু, তুই ওই মটকার দিক থেকে তুলতে থাক, আমি এই বাতার দিকের বড়ো পাতাগুলো তুলি। একেবারে কচি পাতা ছিঁড়িসনে যেন। বেশ করে দেখে তুলবি।”

ঘাড় নেড়ে নীলু পাতা তুলতে আরম্ভ করল। কিছুক্ষণ তোলার পর সেইদিকের বড়ো পাতা শেষ হয়ে এল। অন্যান্য অংশের পাতা তোলা হবে কিনা জিজ্ঞাসা করার জন্য ঘাড় ঘোরাতেই প্রচণ্ড একটা ভয়ে নীলুর মেরুদণ্ড শীতল হয়ে এল। তার দাদা হতবিহ্বল হয়ে উপরের মটকার দিকে তাকিয়ে রয়েচে। পানের লতাগুলি জট পাকিয়ে, মোটা আরও মোটা হয়ে একটা স্থূল আকৃতির ভীষণ দর্শন সর্পের রূপ পরিগ্রহ করচে। বাইরে থেকে বরজের পাঠকাটির প্রাচীরের ভিতরে দিনের আলোক প্রবেশ করচিল, এক্ষণে তা অন্ধকার হয়ে এল। বাইরে বসে থাকা মানুষগুলো বিস্ময়ে রুদ্ধশ্বাস হয়ে দেখলো আকাশ অন্ধ মেঘের চাদরে হঠাৎ ঢাকা পড়েচে। আকাশ জুড়ে ভীষণ শব্দে বাজ পড়চে। প্রবাল অবচেতনেই একটু একটু করে পিছু হঠতে হঠতে বরজের প্রাচীর গাত্রে পিঠ ঠেকে গেল। সেই ভয়াল সর্পের দেহে ততোক্ষণে চিত্রবিচিত্র আঁকিবুকি দেখা দিয়েচে। জ্বলন্ত পুঁতির মতো দু’খানি হিংস্র চোখ নির্নিমেষ দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েচে শিকারের দিকে। মাথাটা সামান্য নীচে নামিয়ে সেই কালসর্প নিজের মুখগহ্বর প্রকাশ করল। নীলু কম্পিতদেহে চেয়ে দেখলে, সাপের বিষাক্ত দাঁতের পিছনে কি একখানা ভীষণ জ্বলজ্বলে ক্ষুদ্র জিনিস দেখা যাচ্চে। এক মুহূর্ত সময় ব্যয় না করে নীলু প্রবলবেগে দৌড়ে বাইরে এসে পড়ে চিৎকার করে উঠল—“শীগগির এসো তোমরা… দাদাকে সাপে…”

কথাটুকু অসমাপ্ত থাকা অবস্থাতেই পৃথিবী কাঁপানো একখানা বিস্ফোরণের সঙ্গে গোটা বরজখানি আগুনের গোলার মতো টুকরো টুকরো হয়ে বাতাসে লাফিয়ে উঠল। আশপাশের ফুলের ঝোপগুলিতে আগুন ধরে গেল। আহত নীলুর হতভাগ্য দাদার শবদেহ খুঁজে পাওয়া গেল প্রায় পঁচিশ হাত দূরের পচা ডোবার ধারে। দেহে রক্তমাংসের বিশেষ আর অবশিষ্ট নাই, বজ্রাঘাতের ন্যায় পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েচে প্রতিটি অস্থিপঞ্জর। ছেলেমানুষ নীলুকে কিছুতেই মৃতদেহ দেখতে দেওয়া হল না। এইবার দারোগাকে কেউই আর খবর দিলো না, কিন্তু দারোগা লোকমুখাৎ সংবাদ পেয়ে বিমর্ষ মুখে নিজের কর্তব্য সেরে চলে গেল।

দেবনগরের প্রজারা মিলে পাশের গাঁয়ে জমিদারের নিকট দরবার করল, গাঁয়ে নিষ্ঠা ভরে পূজার্চনার ব্যবস্থা করল, প্রতিটি গৃহের দ্বারে দ্বারে অপদেবতার কুনজর মোচনের আশায় চিত্রিত হল ঠাকুর দেবতার নাম, কিন্তু ভবি এত সহজে ভোলার ছিল না। মৃত্যুর এই বুভুক্ষু হানা কিন্তু কিছুমাত্র প্রশমিত হল না। কয়েকটি দিন আশঙ্কায় এবং ভয়ে ভয়ে অতিবাহিত হল।

একাদশী জোয়ান পুত্রের মৃত্যু শোকে ভেঙে পড়েচিল, কিন্তু পেটের ক্ষুধা বড়ো বালাই। সেই আদিম তাড়নায় এবং নিদারুণ শোক ভুলে থাকার জন্যেও বটে, সে ভিড়ে গেল রেললাইন পাতার জন মজুরদের দলে। একাদশী সায়েবের তাঁবুতে ধর্ণা দিয়ে গাঁতিদারের কাজে বহাল হল। সেদিন লালপুল সাঁকোতে চাদর চড়াবার কাজ চলচে। লৌহনির্মিত স্থূল রশির মাধ্যমে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড লোহার পাত ঠেলে এনে সেতুর মাথায় তোলা হচ্চে, তারপর সেইগুলিতে ছিদ্র করে কীলক দিয়ে সেতুর মাথায় ছাউনি দেওয়া হবে। দড়িতে বাঁধা লোহার পাতগুলি প্রায় ত্রিশজন বলশালী লোক বাতাসে ভাসিয়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্চে সাঁকোর উপরে, আর গাঁতিদারের দল, যারা গাঁইতি দিয়ে সেগুলি খাপে খাপে সাজাবে, তারা লাইনের পার্শ্ববর্তী ভূমিতে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা কইচে। আজ আর তাদের কাজ নাই আপাততঃ।

কুলীর দল যখন পরিশ্রমের কাজ করে তখন তাদের দেখেচো? দেখলে বুঝবে, নিজের হাড়ভাঙা পরিশ্রমকে নস্যাৎ করে উড়িয়ে দিতে তারা সমস্বরে, নানান সুরে দেহাতি গান গায়। গানের মধ্যে ভুলে থেকে এরা নিত্যদিন নিজেকে ঠকিয়ে চলে, যাতে নিজেকে সুখী মনে হয়, কষ্ট মাথা না তুলতে পারে। যাই হোক, যে কথা বলচিলাম, বিকেলের মুখে দড়িতে চাদর চড়ানো হল। কুলীরা বুকে শ্বাস ভরে নিয়ে ‘ভাইরে ভাই, আউর থোড়া, চলতে যাও রে, ভাইরে ভাই’ সুর করে সেই ভাসমান চাদরকে ঠেলে ঠেলে প্রায় সাঁকো অবধি নিয়ে চলে গিয়েচে, হঠাৎ তাদের গান একসাথে বন্ধ হয়ে গেল। তার স্থানে শোনা গেল একটি ভয় মিশ্রিত কোলাহল। সায়েবের দল, মায় উপস্থিত সবকয়টি মজুর সেইদিকে তাকিয়ে দেখলো, কুলীর দলটা ভয়ের দৃষ্টিতে লোহার দড়িখানার দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখচে। হঠাৎ হঠাৎ একসাথে তারা লোহার পাতটিকে আঁকড়ে ধরে টানচে, কিন্তু পর মুহূর্তেই ঐ দানবাকৃতির লৌহখণ্ড হিঁচড়ে উল্টোদিকে এগিয়ে আসচে। ঠিক যেন কেউ দড়িটিকে ধরে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে চলেচে।

ইংরাজ দুইজন সায়েব বন্দুক বাগিয়ে কুলীদের উদ্দেশ্যে ধমকে উঠল–“এইয়ো শূয়ার, তুমরা কি পাগলামি করিতেছো? আবহি উসকো নীচে উতারো।”

কুলীরা হৈ হৈ করে প্রত্যুত্তরে জানালো—“নীচে রাখা যাচ্চে না সায়েব, দড়ি ধরে কেউ টানচে। আমাদের হাত ছিঁড়ে পড়চে সায়েব…।”

ইংরাজ কর্তা এহেন অবাস্তব গাঁজাখুরি অজুহাতের উত্তরে একটা বড়ো রকমের জবাব দিতে যাচ্চিল, কিন্তু তার মুখের জবাব আর নিঃসৃত হবার অবকাশ লাভ করল না। সকলের সব সন্দেহকে নিরসন করে দিয়ে দড়িতে ভীষণ বেগে এক অমানুষিক টান পড়ল আর কুলীকামিনের দলটা টিলার থেকে ছিটকে নীচে গড়িয়ে পড়ল।

ঐ পাহাড় প্রমাণ ওজনের দড়ি, যাকে বয়ে আনতে কুড়িজন বলিষ্ঠ লোকের প্রয়োজন, সেই দড়িকে অদৃশ্য কোনও এক হাত যেন নিতান্ত হেলায় এক ভয়ানক হেঁচকা দিল। কুলীরা ছিটকে যেতেই ঐ রাক্ষুসে লোহার বিশাল পাতটি দড়িতে ভর করে ধেয়ে আসতে থাকলো বাতাস কেটে। ততোক্ষণে একটি চারকক্ষের রেলগাড়ি এসে পড়েচে লালসাঁকোর কাছাকাছি। বড়োসায়েব প্রাণপণে লাইনে উঠে বন্দুক ছুঁড়লো উপর দিকে। সায়েবকে দেখে এবং গুলির শব্দে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল। এদিকে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সকলেই প্রাণভয়ে দৌড়াতে শুরু করল নিরাপদ দূরত্বে, কিন্তু একাদশী নড়লো না। জীবন রক্ষার জন্য সে ততো ব্যগ্র নয়। লৌহদানব উড়ে আসার মুহূর্তে কোথাও থেকে বিভীষণ কৃষ্ণবর্ণ মেঘের রাশি এসে আকাশ আচ্ছাদিত করে ফেলল। কোনও এক ভীষণ ভয়ের মুখোমুখি হয়েই যেন গুরুগুরু নিনাদে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল। সেই সময়ে হঠাৎ তার চোখে পড়ল পাতের সুমুখে একটা ভীষণ উজ্জ্বল কী যেন চকচক করচে। সেই দাঁত! তবে কি!…”

কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই ভয়ঙ্কর অভিঘাতে তছনছ হয়ে গেল চতুর্দিক। বহু লোকের দগ্ধাবশেষ পড়ে রয়েচে, লোহার এবং কাঠের খুঁটিগুলি উড়ে গিয়েচে বহু দূরে। এই ঘটনার কথাই তোমাদের একেবারে শুরুতে কয়েচিলাম। মনে পড়েচে?

*

এইবারের ঘটনাটা কিন্তু মুখে মুখে বহুদূর অবধি চাউর হয়ে গেল। একেই স্বয়ং রেল সায়েবদের সামনে ঘটনাটা ঘটেচে, তায় অনেকগুলি লোক মারা পড়েছে, তারপরে ধরো বাকি মজুরেরা তো আর ঐ অঞ্চলেরই মানুষ নয়, তারা বহু দূরের গাঁ থেকে এসেচে, ফলে বাড়ি ফিরে ফলাও করে আজকের ঘটনা তারা যে শোনাবে তা বলাই বাহুল্য। সদর চিকিৎসালয়ের ডাক্তারবাবুরাও মৃতদেহ পরীক্ষার অস্বাভাবিক ফল নিয়ে চিন্তায় পড়ল। মোট কথা ব্যাপারটা চাপা রইলো না।

আর একটি কথা, এতদিন কিন্তু আক্রমণগুলি বেছে বেছে একজন একজন করেই হয়েচিল, ফলস্বরূপ হয়তো কিছু অন্যান্য মানুষেরও জীবন নষ্ট হয়েছে, কিন্তু শিকারীর মূল লক্ষ্য ছিল একক। এইবার তার ব্যতিক্রম ঘটলো। একসঙ্গে একঝাঁক নরহত্যার লিপ্সায় মেতে উঠল সেই নরসিংহ রাক্ষস।

তো যা বলচিলাম তাই বলি, রেলের কর্তারা শ্রীরূপচন্দ্র ধরকে কিছুটা চিনতো। নায়েবি অথবা মোকদ্দমার ক্ষেত্রে তার থেকে পরামর্শও নিতো। অসম্ভব করিতকর্মা এবং শ্রুতিধর হিসেবে তার জুড়ি ছিল না। বড়কর্তা স্বভাবতই থেমে যাওয়া রেলগাড়ির অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা যাত্রীদের নিয়ে পড়েচিল মহা আতান্তরে। যুবা বা সমর্থ যাত্রীরা লাইন ধরে রওয়ানা দিয়েচিল গন্তব্যের উদ্দেশ্যে, কিন্তু বয়স্থ দুর্বল যাত্রীদের একটা সুব্যবস্থা না করলে রেল কোম্পানীর বদনামের সীমা পরিসীমা রইতো না। এতক্ষণে শ্রীরূপকে দেখতে পেয়ে তারা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। সায়েবদের আদেশে বিপাকে পড়া বয়স্ক এবং অসুস্থ যাত্রীদের নিয়ে সে দুইখানি গোরুর গাড়ি সহযোগে যাত্রা করল স্বীয় গ্রামের উদ্দেশ্যে। কাল লাইন মেরামত হলে পর এঁদের নিয়ে পুনরায়ঃ গাড়ি রওয়ানা হবে।

ইষ্টিশান থেকে দেবনগর গাঁয়ে প্রবিষ্ট হবার পথটা আন্দাজ পায়ে হাঁটলে আধা ঘণ্টার পথ। তার দুই মুখ উন্মুক্ত থাকলেও মধ্যিখানের পুরা অংশটি গিয়েচে বিশবাঁওড়ের চরের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। এইখেনে নাকি পূর্বে একখানা বিরাট তালাও ছিল, কিন্তু বর্তমানে তা মজে গিয়ে তালাওয়ের উপরে জঙ্গল গজিয়ে বসেচে। গাড়িগুলি বনে প্রবেশ করবার আগেই একটি ঘোর কৃষ্ণবর্ণ ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়ালো সেই মজে যাওয়া পুষ্করিণীর মধ্যস্থলে। তার দেহ অতি দীর্ঘ, গোটা শরীরে ঘোটকের কেশরের ন্যায় রোম, মুখখানি হিং সিংহের আকৃতির, তা থেকে ধারালো দংশপঞ্জী উঁকি মারচে। বাতাসে নিজের ক্ষুরধার নখর যুক্ত বীভৎস হাতখানা মেলে ধরতেই তার থাবার মধ্যে দেখা দিলো একটি দাঁতের মতো দেখতে চোখ ধাঁধানো বস্তু। সেটিকে হাতে শক্ত করে ধরে, অস্ফুট স্বরে কিছু একটা বিড়বিড় করে সেটিকে পুঁতে ফেললো নরম পাতায় আচ্ছাদিত পথের মধ্যে। সেই পথে, যেইখান দিয়ে গোরুর গাড়িগুলি আসতে চলেচে।

প্রথম গো-যানের সম্মুখভাগে বসেচিল শ্রীরূপ। যাত্রীদের সঙ্গে কিঞ্চিৎ আলাপ করতে করতে, দুই চারিটি কথা কইতে কইতে চলেচে সে। গাড়ি দুটির আড়ার থেকে ঝুলচে দুইটি নিভু নিভু তেলের লণ্ঠন, নিকষ আঁধারের স্বল্প সুরাহা হিসেবে। গাড়ি যখন জঙ্গলের প্রায় মাঝামাঝি ইস্তক এসে পড়েচে, সহসা বিকেলের আচমকা থেমে যাওয়া সেই ঝড়টা যেন ফুঁসে উঠল ফের। ঘোর অন্ধকারেও ছইয়ের ভিতর থেকে বেশ টের পেলো সকলে, যে বাইরে মহা দুর্যোগ ঘনিয়ে এসেচে। শ্রীরূপ মনে মনে প্রমাদ গুণলো। এ কেমন দুর্যোগ, যা খেয়াল খুশি মতো আসে, মিলিয়েও যায়, আবার পলক ফেলতে না ফেলতেই চারদিক ছেয়ে ফেলে? তার চাইতেও বড়ো কথা, যদি তার মনের আশঙ্কাই সত্য হয়, তবে দুই গাড়ি অসহায় মানুষও মারা পড়বে আজ ভয়ঙ্কর নরসিংহের কোপানলে। সেই কাল রাক্ষসের ক্ষুধা কি এতগুলো নরহত্যা করেও মেটেনি? ক্ষণেক মাত্র ভেবে অবশেষে নিজের কর্তব্য নিরূপণ করে শ্রীরূপ থেমে যাওয়া দুই গাড়ির মাঝে এসে দাঁড়িয়ে একবার মাত্র গলা খাঁকারি দিয়ে মনের দুর্বলতাটুকু ঝেড়ে ফেলে কইলো—“আমার বাক্য মন দিয়ে শুনুন, এই ভর সন্ধ্যায় যেভাবে ঝড় জল নামচে তাতে গাড়ির উপরে গাছ ভেঙে পড়া বিচিত্র নয়, পথেও নানান আপদ থাকতে পারে, কাজেই আপনারা এই মুহূর্তে নেমে পড়ে কোনও নিরাপদ আশ্রয়ে, নিদেনপক্ষে কোনও শক্তপোক্ত গাছের তলে আশ্রয় নিন। ঝড় কমলে গাড়োয়ান গিয়ে আপনাদেরকে গাঁয়ে পৌঁছে দিয়ে আসবে। বিলম্ব করার অর্থ বিপদ। শীঘ্র শীঘ্র আপনারা নেমে পড়ুন।”

ভয়ার্ত অশক্ত যাত্রীর দল ভীরু পিঁপড়ার ন্যায় এইদিক ওইদিকে ছড়িয়ে পড়ে যে যার লুক্কায়িত হয়ে পড়ল। শ্রীরূপ নারায়ণ স্মরণ করে আকাশের দিকে চেয়ে রইলো। ঐ কালান্তক রাক্ষস কিন্তু মরণফাঁদ পেতে দূরে চলে যায়নি। একখানা বৃক্ষের নিম্নস্থলে ওৎ পেতে বসেচিল। শিকার ফসকে যায় দেখে ক্রুদ্ধ গর্জন করে মাটির থেকে ঐ মারণ বস্তুখানি তুলে নিয়ে একখানি ভয়ানক ফুৎকার দিল। জ্বলন্ত পিন্ডখানি জ্যা-মুক্ত শরের মতো ছুটে চলল শিকারের পানে। শ্রীরূপ আকাশের দিকে চেয়েচিল, আচমকা ঝলসে ওঠা বজ্রের আলোয় তার চোখে পড়ল আকাশের থেকে একখানা অতীব উজ্জ্বল কিছু মরিয়া হয়ে ছুটে আসচে তার দিকে, কিন্তু আরও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল, সেই দিব্য গোলককে ঘিরে চোখে পড়চে একখানা অদ্ভুত মূর্তি। তার চারিখানি মুন্ড, মস্তকোপরি মেঘের তুল্য জটা। ঝলসাতে থাকা বিদ্যুৎ চমকে বারংবার তাকে চোখে পড়চে এবং দূরত্ব ক্রমশ কমে আসচে। যখন সেই প্রকাণ্ড মুখ প্রায় কাছাকাছি চলে এসেচে, ঝড়ের তান্ডব প্রায় প্রলয়ের আকার নিয়েচে, অসহায় মৃত্যুযাত্রী শ্রীরূপ কাঁপতে কাঁপতে ইষ্টস্মরণ করচে, হঠাৎ কানে এল—“কী সর্বনাশ!”

শ্রীরূপ অতি ক্লেশে ডানদিকে ঘুরে অবাক হয়ে দেখলো, একজন বৃদ্ধ যাত্রী তখনও দুই গাড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েচে। বাকী যাত্রীগণের ন্যায় এ লুকিয়ে পড়েনি। শ্রীরূপ ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত হয়ে শুধোলো— “একী! কে আপনি!” চমকাতে থাকা বজ্রের মতোই গুরুগম্ভীর স্বরে প্রত্যুত্তর এল— “ব্রাহ্মণ নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া গাঁ।”

বলতে বলতেই কালীপদ দৌড়ে এসে শ্রীরূপকে নিজের বলিষ্ঠ বাহুযুগল দিয়ে বেষ্টিত করে উপরের দিকে চেয়ে অপার বিস্ময়ে নিজেই যেন অবিশ্বাসের সুরে বিড়বিড় করে বললে-

“ওঁ প্রিয়তাং পুন্ডরীকাক্ষ, সর্বযজ্ঞেশ্বরো হরি/
তস্মিন তুষ্টে জগত্তুষ্টং, প্রীণিতে প্রীণিতাম জগত/
অ কারায় বিষ্ণুরুদ্দিষ্ট/ উ কারস্থ মহেশ্বরাঃ/
ম কারায় স্থিতয়েঃ ব্রহ্মাঃ/ প্রণোবস্তঃ ত্ৰিয়াত্মক্‌

গাছের মগডাল থেকে আরও অনেকখানি উপরে ধেয়ে আসা বস্তুটায় একখানা প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটলো আর তারপরই প্রকৃতি পূর্ববৎ প্রশান্ত হয়ে এল। কালীপদ কম্পিত শরীরে কর্দমাক্ত মাটিতে বসে বলে উঠল—“হা ঈশ্বর! এও কি সত্য?”

শ্রীরূপও ক্লিষ্ট দেহে অবসন্ন হয়ে তার পাশে বসে পড়ে শুধোলো—“কী ঠাকুর? কী সত্য?”

কালীপদ একটিবার তার জিজ্ঞাসু চক্ষের পানে চেয়ে স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে বিস্ময়াকুল কণ্ঠে কইলো— “মহা বিপদ! মহা প্রলয়! সৃষ্টি বুঝি রসাতলে যাবার সময় হল আজ। এই ভয়াবহ শক্তি তোমার মতো সাধারণ, নগণ্য মানবের উপরে প্রয়োগ করল কে? পেলো কোথা?”

–“কোন শক্তি? এই যে আকাশ থেকে নক্ষত্রবেগে ধাবিত হয়ে আসচিল, সেইটে? বাবাঠাকুর, কী নাম এই শক্তির?”

— “নাম? এ সেই শক্তি, যাঁর নাম শ্রবণ মাত্র দেবতা, অসুর, যক্ষ, রক্ষ, দানব, মানব হাত জোড় করে কাঁপতে থাকে। সেই শক্তি, যা পূর্ণ তেজে আত্মপ্রকাশ করলে চরাচর রসাতলে যায় চোখের পলকে।”

শ্রীরূপ কিছুসময় হতবাক হয়ে থেকে ভয়ে ভয়ে বললে—“এর নাম কী!” কালীগুণীন তার চোখে চোখ রেখে শুষ্ক স্বরে জবাব দিলো—“ব্রহ্মাস্ত্র! যাঁর অগ্রভাগে স্বয়ং চতুরানন ব্রহ্মা বিরাজ করেন।”

*

ঝড় থামার পর যাত্রীদল আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে রাজী হল না। তারা আড়ালে লুকিয়ে এইসব ভয়ানক দৃশ্য আগাগোড়া দেখেচে, কাজেই তাদের নিয়ে ঠাসাঠাসি করে একখানা গো-গাড়ি ফিরে গেল শূন্য ইস্টিশানে, আর অপর গাড়িতে করে শ্রীরূপ আর কালীগুণীন এসে হাজির হল দেবনগর গাঁয়ে। গাঁয়ে প্রবেশের মুখে কালীপদ নাসিকা কুঞ্চিত করে বলে উঠল—“এহ্, বড্ড খারাপ গন্ধ। গোটা গাঁয়ে যেন কোনও অপদেবতা ঘুরে বেরিয়েচে।”

প্রভাতে শ্রীরূপের প্রশস্ত অঙ্গনে বসে কালীপদ যৎকিঞ্চিৎ জলযোগ করতে করতে তার থেকে সমস্ত বিষয় জানলো। পূর্বেই কয়েচি যে শ্রীরূপ শ্রুতিধর হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করেচিল। সে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাবতীয় ঘটনার ইতিবৃত্ত কালীপদকে অবগত করালো। ঘটনার পরম্পরা এতই বিস্তৃত যে কালী একখানা সেরেস্তার কাগজে প্রয়োজনীয় সূত্রগুলি লিখে নিলো। বেলা সামান্য বাড়লে পর বাড়ির পিছনে খিড়কির পুকুরে পা নিমজ্জিত করে বসে বসে কালীপদ গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেল।

পুরাণে বর্ণিত সকল প্রকার আয়ুধের মধ্যে সর্বাধিক সর্বনাশা আয়ুধ এই ব্রহ্মাস্ত্র। এটি কোনও নির্দিষ্ট অস্ত্র নয়। এ এক বিশেষ প্রকারের শক্তিপুঞ্জ, যে শক্তিকে যে কোনও বস্তুর মধ্যেই চালনা করা যায় এবং সেই বস্তুটি এক প্রলয়ঙ্করী হাতিয়ারে পরিণত হয়। এক অমোঘ অথচ একঘাতী অস্ত্র, যা শত্রুকে নিজে নিজেই সন্ধান করে তাকে তছনছ করে দিয়ে আসে। এর আগায় যোদ্ধারূপে বিরাজ করেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মদেব। এই অস্ত্রের বর্ণনা সে তার গুরু হংসী তান্ত্রিকের কাছে শুনেচে। গুরু এই বলতেন—“ওরে, ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ আলাদা নয়। এরা সময়ের তিনটি রূপ। কোনও বস্তুর জন্মকাল, অস্তিত্বকাল এবং বিকাশকাল তো থাকতেই হয়। এরাই সেই তিন রূপে তিনজন। এঁদের একজনকে নিবারণ করতে হলে তিন রূপেরই স্তব করতে হয়। আজ আকাশে বজ্রঝলকের আলোয় ক্রুদ্ধ ব্রহ্মার মারণরূপ দেখে কালীপদ কিছুটা অবিশ্বাস বশতঃই প্রণবাত্মক মন্তরের সাহায্য নিয়েচিল। ফল মিলেচে। কিন্তু প্রশ্ন এখনও বাকি।

বিক্রম নামের ছেলেটি নাকি কয়েচিল, সে যখন চকচকে দ্রব্যটি চয়ন করে, তখন আশপাশে তেমন বেশ কয়টি একই রকম জিনিস পড়েচিল। পরে সকলে দেখেচেন যে সেইটে একটা বড়োসড়ো মানুষের দাঁত বিশেষ। এইখানেই খটকা। প্রথম কথা, ঐ স্থানে খননকার্য হয়েচে নাকি বহু বহু যুগ পরে, কাজেই কোনও মানুষের দাঁত অতো দিন বিনষ্ট না হয়ে কেমন করে থাকলো? কোন মায়াবলে?

দ্বিতীয় কথা, ঐ স্থানে আরও খনন হয়েচিল, কিন্তু কোনও কঙ্কাল পাওয়া যায়নি। কেন? যে মানুষের দাঁত থাকবে, তার কঙ্কাল যাবে কোথা? কঙ্কাল বিনষ্ট হলে নিশ্চয়ই দাঁতও লুপ্ত হয়ে যাবে। তবে? না থাকলো করোটি, না একখানা হাড়গোড়, কেবল দাঁত? আশ্চর্য! হাড়গুলো কি অন্যত্র কোথাও সরিয়ে ফেলা হয়েচিল? কোন কোন পরিস্থিতিতে এমনটা কেউ করতে পারে? এমনই একটা কোনও ঘটনা যেন ঘটেচিল একবার? বড়ো শোনা শোনা মনে হচ্চে।

ভাবনার কিনারা হল না। কালীপদর ভ্রুকুটি কুটিল হয়েই থাকলো। অভিশাপের শেষ নিশানা শ্রীরূপ। কিন্তু তাকে হত্যা করেই কি ঐ অভিশাপ নিরস্ত হবে? শাপদাতা তার কথা রাখেনি। প্রতিজ্ঞা করা সত্ত্বেও নিরীহ পরিবারের লোকজন অথবা অন্যান্য মানুষও মারা পড়েছে। তবে ঐ নির্দোষকে হত্যা না করার মতো মিছে কথাগুলি তার বলার কি আবশ্যকতা ছিল? নাকি কোনও বিশেষ কারণে তাকে ঠিক ঐ কথাগুলি বলতেই হতো? কী সেই কারণ? এর জবাবের জন্য কার দ্বারস্থ হতে হবে? কেবলমাত্র শ্রীরূপের প্রাণরক্ষার্থেই নয়, বরং এই ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্রের প্রকোপ নিবারণের জন্যই কালীপদ অধীর হয়ে পড়ল।

পঞ্চতত্ত্ব আত্মকং কৃষ্ণাঃ ভক্ত রূপ স্বরুপম্।।
ভক্তাঃ অবতারং ভক্তাঃ অক্ষং নমামি ভক্তঃ শক্তিণাম…

পুকুরের ধারে নির্জনে যোগাসনে ধ্যানে তন্ময় হয়ে গেল কালীপদ। আত্মারা বহুবিধ জ্ঞানের অধিকারী হন। তেমনি কোনও শুভকর পূণ্যাত্মা যদি তার ডাকে সাড়া দেন, তবে জবাব মিললেও মিলতে পারে। একনিষ্ঠ চিত্তে, মন প্রাণ জ্ঞান ধ্যান একত্র করে কালীপদ আবাহন আরম্ভ করল। কতক্ষণ এইরূপে কেটে গিয়েচে তার হিসাব নাই, সহসা বহু দূরে প্রেত লোকের ওপারে একখানা দীর্ঘ ছায়ামূর্তি দৃষ্টিগোচর হল। প্রতি বার আবাহনের সাথে সাথে এগিয়ে আসচে হু হু করে। ইনি আদৌ কোনও শুভকর বিদেহী তো? মূর্তিটি একরাশ উজ্জ্বল স্নিগ্ধ আলোর বলয়ে ঢেকে রয়েচে, তা দেখে কালীর মনে একটু ভরসা হল, ইনি কোনও পূণ্যবান আত্মাই বটে। সেই মূর্তি হাত দশেক ব্যবধানে এসে স্থির হলে পর তার সূক্ষ্ম শরীর থেকে আলোকমণ্ডল ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হল, আর কালীপদ বিস্ময়ে আপ্লুত হয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠল— “গুরুদেব!”

কালীপদ আনন্দাশ্রু মুছে নিয়ে ভক্তি ভরে কইলো—“প্রণাম গুরুদেব। অধমের প্রণাম স্বীকার করুন। বড়ো বিপদে পড়েই পঞ্চতত্ত্বের স্মরণ নিয়েচি আজ। আমার সৌভাগ্য সেই আবাহনকে ধন্য করে আপনি স্বয়ং আবির্ভূত হয়েচেন।”

অঘোরী হংসী তান্ত্রিক স্নেহপূর্ণ স্বরে বললে— “ভয় নাই কালীপদ। ভবাণীর চরণে আস্থা রাখ, সব বিপদের নিবারণ হবে।”

— “কিন্তু গুরুদেব, আমি যে আঁধারে পথ দেখতে পাচ্চিনে। এই মহা চরাচরঘাতী অস্ত্রকে আমি নিবারণ করবো কী পন্থায়?”

হংসী হেসে কইলো—“হলে তোমা হতেই হবে বাছা। তুমিই পারবে। আমি এখন মুক্ত পুরুষ। বিশ্ব সংসারের ভালোটি মন্দটিতে আমার অস্তিত্ব কোথাও নাই বাছা। এর নিবারণ বা প্রশমণ আমার দ্বারা আর সম্ভব না, কিন্তু একেবারে রিক্ত হস্তে তোকে ফেরাবো নে। আমার হাতে তৈয়ারী করা হাতিয়ার তুই। আমি কেবলমাত্র প্রদীপ জ্বেলে যাচ্চি, পথ তোমাকেই চিনে নিতে হবে। এই রহস্যকে চেনার উপায় যা বলি স্মরণ রাখ…

ঢাল, তলোয়ার, ধনুক, গদা,
অস্ত্র যে বিস্তর,
এঁদের সবার মাথায় থাকেন,
প্রজাপতির শর।।
তেজের রাশি মুখ লুকালো
অঙ্গেতে নিঃসাড়ে,
যুদ্ধ বাধলে তবেই তাকে,
চিনবে হাড়ে হাড়ে।।

কালীপদ খুব ভালোভাবে বুঝতো যে তার গুরুর বলা শ্লোক কিন্তু কিছু সাধারণ শ্লোক নয়। ছড়া কাটা তাঁর অভ্যাস। তবে আপাইয়ের ঘটনার সময়েই কালী বুঝেচে, এই ছড়াতেই লুকিয়ে রয়েচে বহু কাঙ্খিত চাবিকাঠি। কালী উৎসুক হয়ে বললে— “রহস্য চিনলেই কি সমাধান পাবো গুরুদেব? যদি তা না হয়, তবে এর কোনও উপায় বলে দিয়ে যান।”

হংসী পুনর্বার কইলো– “তোমার ডাকে সাড়া দিয়েই আমি এসেচি, কিন্তু অধিকক্ষণ আমি রইতে পারিনে আর। উপায় শোন….

অস্ত্র যেথা ঝনঝনালো
বাজনা বাঁধা সুরে,
ভুজঙ্গিণী তাকিয়ে থাকে
বাঘের দিকে ঘুরে,
জোৎস্না যেথা যাচ্চে ভেসে
খরস্রোতার অঙ্গে,
গরল যেথায় সখ্য পাতায়
অমৃতেরই সঙ্গে,
রয়েচে শাসন তারই হাতে
এইটুক থাক জানা,
আবারও সেই রুদ্রাক্ষের
সামনে যাওয়া মানা।”

জলের অটুট প্রতিচ্ছবিতে নুড়ি নিক্ষেপ করলে ছবি যেমন সহস্র তরঙ্গভঙ্গে বিচূর্ণ হয়ে পড়ে, তেমনই বাতাসের আন্দোলনে হংসী তান্ত্রিকের বিদেহী আত্মা মিলিয়ে গেল।

*

দ্বিপ্রহরে বাড়ির পুরুষেরা যখন আহারে বসচে, তখনও কালীপদর মুখ রহোস্যোদ্ধারের আশায় চিন্তামগ্ন। প্রথম ভাগটুকুর অর্থ কালীপদ পূর্বেই আঁচ করেচিল। প্রজাপতির শর অর্থ ব্রহ্মার আয়ুধ, মানে ব্রহ্মাস্ত্র। কিন্তু তা আচমকা এক শ্রমিকের হাতে এসে ঠেকলো কোথা হতে? শ্রীরূপের বৃদ্ধা ঠাকুরমা যখন কালীপদর পাতে অন্ন ব্যঞ্জন পরিবেশন করচে, তখন বৃদ্ধা ভক্তিভরে কইলো— “ঠাকুর, বামুনের পাতের প্রসাদ পাই তো ভাগ্য।”

কালীপদ শশব্যস্ত হয়ে কইলো—“সে কি! আপনি অবধি আহার গ্রহণ করেননি এখনও? কেন?”

বৃদ্ধা অবাক হয়ে বললে— “সে কি ঠাকুর! পুরুষদের আহারের পূর্বেই খাবো এমন মতি যেন না হয়। পুরুষদের আগে আহার করলে আচার বিচার যে আর রইলো না বাবা।”

কালীপদ একটু বিষণ্ণ হেসে বলল—“এমন কথা কোন শাস্তরে লেখে মা? পুরুষ নয়, কন্যেরাই ঘরের লক্ষ্মী। তাঁরা দশ দিকে দশ রূপে আমাদের ঘিরে রেখে রক্ষা করেন, লালন করেন, প্রশ্রয় দেন বলেই আমরা পুরুষেরা নিজেদের একটা বড়োসড়ো কিছু ভাবতে পারি। কিন্তু হিসেব করে দেখো মা মানুষ ব্যতীত অপরাপর সমস্ত জীবকুলের মধ্যে কিন্তু নারীই প্রধানা।”

বৃদ্ধা এমন কথা আগে কখনও শোনেনি। সে বুঝলও না। চোখের জল মুছে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললে— “আমি এতশত বুঝিনে বাবা ঠাকুর, মুখ্যু মেয়ে মানুষ বৈ তো নয়, তবে এতকাল বক্ষের পিঞ্জরের ন্যায় এই সংসারকে আগলে রেখেচি ঠাকুর। আজ যেন তা ভরাডুবি না হয়। তোমরা দেবতা বামুন, তোমাদের আশীর্বাদে সংসার না বাঁচে তো বাঁচে কেমনে? দয়া করো বাপ আমার। চেয়ে দেখো একটিবার ঠাকুর আমার নাতির পানে। চিন্তায় চিন্তায় না খেয়ে খেয়ে বাছার আমার শরীরে হাড়গুলি কেবল রয়ে গিয়েচে। এমন হলে যে বাছা আমার….” কথা শেষ হবার পূর্বেই বুড়ি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।

কালীপদ অসহায় শঙ্কিত বৃদ্ধাকে সান্ত্বনা দেবার জন্য উপযুক্ত বাক্য খুঁজে পাচ্চিল না, আদৌ তার দ্বারা এই দেবতার অসাধ্য ভয়ঙ্কর অস্ত্রকে পরাস্ত করা সম্ভবপর কি না তাও সে জানে না, কিন্তু এই শেষ কথাগুলি তার শ্রবণযন্ত্রের মধ্যে তীক্ষ্ণ শলাকার ন্যায় প্রবেশ করামাত্র কালীপদ অন্নপাত্র থেকে একটিমাত্র দানা মুখে দিয়েই সটান উঠে দাঁড়িয়ে বিস্মিতভাবে কইলো—“তাই তো!”

শ্রীরূপ খাওয়া ফেলে উঠতে দেখে হাঁ হাঁ করে বলে উঠল—“আরে একি ঠাকুর! খাওয়া ছেড়ে উঠলেন কেন আজ্ঞে? কোনও ত্রুটি কি…” কালীপদ তাকে আশ্বস্ত করে উত্তর দিল—“না না বাবা, আতিথেয়তায় বিচ্যুতি নাই। আমি এতক্ষণে সব বুঝতে পেরেচি।”

–“কী বুঝেছেন বাবাঠাকুর?”

কালী ধীর কণ্ঠে জবাব দিল— “এই প্রলয়কারী ভয়াবহ শক্তি কেমন করে মানুষের হস্তগত হল এত যুগ পর, তার একটা সম্ভাব্য সূত্র পেয়েচি হয়তো। আমি এখন যা বলচি, তার পুরাটাই আমার অনুমান, কিন্তু নেহাৎ খাপছাড়া অনুমান নয়। পুরাটা বুঝতে চাইলে আগে একখানা বহু প্রাচীন ঘটনা তোমাদের জানতে হবে। যদিও এ আখ্যান তোমরা বহুবার হয়তো শুনেচো। শোনো তবে…

পুরাকালে এক মহাযুদ্ধে দেবতারা যখন সমস্ত অসুরকুলকে পরাস্ত করে স্বর্গরাজ্যকে স্থায়ী সুরক্ষিত বিবেচনা করলেন, তখন তাঁরা যথারীতি আমোদ প্রমোদ বিলাস ব্যাসনে নিজেদের ভাসিয়ে দিলেন। নিজেদের ভয়ঙ্কর অস্ত্রশস্ত্রগুলির প্রয়োজন তখন তাদের ফুরিয়েচে, কাজেই সেগুলি তারা গচ্ছিত রাখলেন সবরমতী নদীর তীরে অবস্থিত মহামুনী মহর্ষি দধীচির তপোবনে। বহু যুগ গত হলে পর মহর্ষি একদিন লক্ষ্য করলেন, এমন পরাক্রমশালী হাতিয়ারগুলি যত্নের অভাবে বিনষ্ট হতে বসেচে। মহান যে কোনও অস্ত্রের দ্রব্য গুণের চেয়ে তার তেজোগুণ অধিক মূল্যবান। মহর্ষি সেই তেজরাশিকে রক্ষা করার জন্য সমস্ত অস্ত্র সমষ্টির তেজপুঞ্জকে জলে দ্রবীভূত করে তা আপনিই পান করে নিলেন। সেই ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্রের মহাশক্তি তাঁর শরীরের প্রতিটি অস্থিতে অস্থিতে সংহত হয়ে প্রচ্ছন্ন রূপে ঘুমিয়ে রইলো।

সব কিছু নিরুপদ্রব ভাবেই চলচিল, এমন সময়ে আচম্বিতে মহা পরাক্রমশালী বৃত্রাসুর স্বর্গরাজ্যের প্রতি আক্রমণ করে বসলো। তার ভয়ানক বিক্রমে আর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেবতারা অমরাবতী ছেড়ে লুকিয়ে রইলেন বনে জঙ্গলে। একসময় তাদের স্মরণ হল সেইসব আয়ুধের কথা। তারা দল বেঁধে দধীচির আশ্রমে গিয়ে নিজেদের গচ্ছিত দ্রব্য ফেরৎ চাইলেন। দধীচি পড়ল মহা ধর্ম সঙ্কটে। দধীচির সহধর্মিণী কিন্তু মহা ক্রুদ্ধ হলেন দেবতাদের প্রতি। তিনি স্বামীকে কোনও রূপ সহায়তা না করতে অনুরোধ করে সবরমতীতে স্নান করতে গেলেন। দধীচি কিন্তু নিজের কর্তব্য স্থির করে ফেলেচিলেন। যজ্ঞাসনে বসে মহানির্বাণ মন্ত্রের জপ করে নিজের পার্থিব দেহ ত্যাগ করলেন সেই মহা তেজস্বী, হিতকারী মুনী। পরবর্তীতে আজও কোনও মহান আত্মত্যাগকে দধীচির দেহত্যাগের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

দেবতারা দধীচির করোটি, মেরুদণ্ড সমেত প্রতিটি হাড় মৃতদেহ থেকে ছাড়িয়ে নিলেন এবং পরবর্তীতে সেই তেজস্ক্রিয় অস্থি হতে তৈয়ারী হলো ভয়ানক সব অস্ত্রশস্ত্র। মেরুদণ্ড সমেত বক্ষপিঞ্জরের হাড় দিয়ে গঠিত হলো বজ্র যা দিয়ে পরে বৃত্রাসুর হত হয়েচিল, বাম হাতের হাড় দিয়ে পরিঘ, নারাচ, জাঠা, দক্ষিণ হাতের হাড়ে ষটচক্র, বেড়াপাক, তোমর, কন্টক, বাম পায়ের হাড়ে ঐষিক, একাঘ্নী, শতঘ্নী, ডান পায়ের থেকে ত্বাষ্ট্র, ব্রহ্মশির, করোটি থেকে নারায়ণী, পশুপাত, বায়ব্য, বৈষ্ণবাস্ত্র আর অতি ভয়ঙ্কর ব্রহ্মাস্ত্র প্রভৃতি মারাত্মক শক্তিগুলির পুনরুদ্ধার হল। দেহের প্রতিটি অস্থিখণ্ড একেকটি বিধ্বংসী মারণাস্ত্রের রূপ নিলো। কিন্তু…

দধীচির করোটি ছাড়িয়ে নেবার সময়ে তার দাঁতগুলি সম্ভবত দেবতাদের চোখ এড়িয়ে যায়, অথবা দাঁতকে তারা অস্থি মধ্যে গণ্য করেননি। ফলে দৈব ব্রহ্মাস্ত্রের একাংশের তেজে ভরপুর হয়ে সেগুলি লোকচক্ষুর অন্তরালে পড়ে রয়। এইটি সম্পূর্ণ আমার অনুমান বটে, কিন্তু পরিস্থিতি এই অনুমানকে সমর্থন করচে।

মহামুণীর স্ত্রী স্নানান্তে ফিরে এসে দেখেন তার স্বামীর চামড়া, কেশ এবং দেহাবশেষ পড়ে রয়েচে অনাদরে। তিনি ভীষণ শোকে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফিরে আত্মঘাতিনী হতে যাওয়ার সময় বুঝতে পারেন যে তিনি সন্তান সম্ভবা। তিনি একটি পিপুলবনে পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন দেহত্যাগ করেন। সেই শিশু গাছতলায় পড়ে কাঁদতে থাকে। পিপুলগাছেরা সন্তান হিসেবে তাঁর নাম হয় পিপ্পলাদ। পিপুল গাছেরা স্বর্গের অমৃত এনে সেই সন্তানকে নিজের দেহের রস পান করিয়ে মানুষ করেন। পিপুলের পিপ্পলাদকে পান করায়। বড়ো হয়ে পিতার মৃত্যুর রহস্য জানতে পেরে ভীষণ ক্রোধে সে মহাদেবের তপস্যা শুরু করল।

মহাদেব তপস্যা শেষে আবির্ভূত হয়ে প্রার্থনা পূরণ করতে চাইলে পিপ্পলাদ দেবতাদের ধ্বংস করার মানসে এক ভয়ঙ্কর রাক্ষস প্রার্থনা করে। মহাদেবের তৃতীয় নয়ন হতে নির্গত প্রলয়ঙ্কর অগ্নি রাশি হতে জন্ম নেয় এক বিকট রাক্ষস বিকটাসুর। পিপ্পলাদ যে মুহূর্তে তাকে আদেশ দিল— ‘তুমি সব দেবতাদের ধরে ভক্ষণ করো’, তৎক্ষণাৎ বিকটাসুর পিপ্পলাদ’কেই ধরে গালে পুরতে গেল। তার শরীরের অমৃতের ঘ্রাণে রাক্ষস তাঁকেও দেবতা ভেবেচে। প্রাণভয়ে পিপ্পলাদ মহাদেবের স্মরণাপন্ন হল। বিকটাসুর মহাদেবের কাছে ঘেঁষলো না। পর মহাদেবে বিকটাসুরকে আদেশ দেন— ‘তুমি এই ঋষি পুত্রকে কিছু অনিষ্ট করবে না।’

এবং তিনি দেবতাদের পিতা স্বরূপ গণ্য সূর্যদেবকে কইলেন তাঁর সঙ্গে কাশীতে এসে বাস করতে। মহাদেবের সান্নিধ্যে থাকলে বিকটাসুর তাঁদের কোনও রূপ হানি করতে পারবে না। পিতার ঠিকানাই পুত্রের ঠিকানা রূপে গণ্য হয়, কাজেই বাকি দেবতারাও প্রকারান্তরে শিবের সহানুচর হলেন। পিপ্পলাদের অসুর সুবিধা না করতে পেরে নিরস্ত হল।

এই হারিয়ে যাওয়া দধীচির দাঁত ব্রহ্মাস্ত্রের একাংশের অটুট তেজ নিয়ে হাতে পড়ল বিক্রম কলুর। ফুরিয়ে আসা প্রতিশোধের অধ্যায় আবার জেগে উঠল। তোমাদের যিনি শাপ দিয়েচিলেন, তিনিই পিপ্পলাদ। তোমাদের মুখেই শুনেচি তোমাদের পূর্বপুরুষেরা কাশীর অধিবাসী ছিলেন। সম্ভবত সূর্যের কাশীবাসের সময় তাঁরই তেজে জন্ম নেয় তোমাদের পূর্বসূরীরা, ফলে তোমাদের মধ্যেও দৈবাংশ রয়ে গিয়েচে, যার আঘ্রাণ ঐ বিকটাসুরকে টেনে এনেচে এই গাঁয়ে।

কিন্তু এতে কোথাও তো বিকটাসুরের বধোপায় উল্লেখ নাই। আমার গুরু যা বলেচেন তাই বা সম্ভব হবে কী রূপে? অস্ত্রের শব্দ আর বাজনার আওয়াজ কোথায় একত্রে শোনা যায়? অমৃত আর বিষ কোথায় পাওয়া যায়? এমন কোন জঙ্গল রয়েচে যেখানে সাপেরা বাঘের দিকে তাকিয়ে রয়? নদীর মধ্যে চাঁদ কোথায় থাকে? কোন রুদ্রাক্ষে এই রাক্ষস ভয় পায়? আরও একটা কি যেন প্রশ্ন রয়ে গিয়েচে এই পৌরাণিক ঘটনায়। কীসের একটা জবাব যেন বাকি রয়ে গিয়েচে। সেটি কী? কিছুতেই মনে পড়চে না।”

*

অপরাহ্ন হতে তখনও কিছু সময় বাকি। কালীপদ চিবুকে হাত স্থাপিত করে দাওয়ায় বসে রয়েচে। বাড়ির ক’জন মানুষ উঠানে এসে বসেচে। সামনের পথ দিয়ে একটি অল্প বয়সী ছেলে হেঁটে যাচ্চে। কালীপদ আনমনে তার দিকেই শূন্য চক্ষে চেয়েচিল। শ্রীরূপ হেঁকে জিজ্ঞাসা করল—“কে ও তারাপদ নাকি! তোদের না আজ কলকেতায় কুটুমের বিয়েতে যাবার কথা? যাসনি নাকি?”

ছেলেটি উত্তর দিলে— “না খুড়ো, আমার যাওয়া হল না কাজ গতিকে। বাবা মারা গিয়েচে একটু আগে।”

শ্রীরূপ লাফ দিয়ে উঠে চিৎকার করে উঠল— “এ কি সব্বোনেশে কথা তোর? আবার নাকি সেই রাক্ষস…”

কালীপদও কিছু অবাক হল। ছেলেটির তো এখনও পিতৃবিয়োগের কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্চে না। তবে? তারাপদ বিস্মিত হয়ে বললে- “কী হয়েচে খুড়ো? অমন করচো কেন?”

–“অমন করচি মানে? কখন মারা গেল তোর বাপ? সকালেই তো….”

তারাপদ দুই কানে হাত ঠেকিয়ে অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে বললে— “মাপ করবেন খুড়ো, শুনতে ভুল হয়েচে আপনার। আমি বললুম যে আমি বিয়েতে যাইনি কিন্তু বাবা, মা রা গিয়েচে।”

শ্রীরূপ হাঁপ ছেড়ে কইলো— “হতভাগা ছেলে, তাই বল না কেন এমন ভাবে বললি… শুনলেন তো মুখুজ্জে মশায়?”

শ্রীরূপ তাকিয়ে দেখলো কালীপদ সটান উঠেই এক দৌড়ে ঘরে গিয়ে ঢুকলো। যখন বেরিয়ে এল, তখন তার হাতে শ্রীরূপেরই লিখে দেওয়া সেই কাগজ, যার মধ্যে ঐ অভিশাপের কথা অক্ষরে অক্ষরে লেখা রয়েচে। কালীপদ তার স্থানে স্থানে খাগের কলম চালিয়ে শ্রীরূপের হস্তে বর্পণ করে কইলো— “এইবার বুঝেচি। এই হল ঐ রাক্ষসের পাওয়া দেশ, যার মাধ্যমে পিপ্পলাদ বলার ছলে, শব্দের কারুকার্যে তোমাদের পরিচয় এবং বধের পদ্ধতি আদিষ্ট করে গিয়েচিল। এইবার তোমার পালা। শ্রীরূপ কাঁপা হাতে কাগজখানি তুলে দেখলো কালীগুণীন এখানে ওখানে কালি দিয়ে মার্কা তৈয়ারী করেচে, ফলে সেটি দাঁড়িয়েচে নিম্নরূপ…

–“আমার এতদিনের ঘুমিয়ে থাকা প্রতিশোধ স্পৃহা আজ ফের পুনর্জন্ম লাভ করেচে। আমার মহান পিতাকে তোরা পুনর্বার অপবিত্র, অবমাননা করার মহা প্রমাদ করেচিস। আমাকে বিনা দোষে অনাথ করেচিস। তোদের গায়ের বিশ্রী কটূ গন্ধ আমার সহ্য হচ্চে না।

স্বয়ং মহাকালের সৃষ্ট অগ্নির তেজ যদিও বা কোনওদিন শূন্য হয়ে আসে, কিন্তু আমার সৃষ্ট এই অভিশাপের উগ্র (অনল চক্র ভর্তি) হয়ে থাকবে আমার অভিসম্পাতের তেজে। একদিন না একদিন এই পাপের (ফল শিরোধার্য) করে নিতেই হবে তোদের।

মৃত্যুর মালা কিন্তু ফুলের ন্যায় কোমল হয় না। সর্বনাশা মরণের সুতায় গাঁথা এই দুর্দান্ত, (প্রবল মালা কার) শিয়রে কখন ঝুলচে তা কেউ জানবে না। জেনে রাখ, মৃত্যু তোদের (পানে ছোবল বাগিয়ে) বসে রয়েছে। শোন শয়তান পশুর দল, তোদের পরিবারকে আমি শাপ দিইনে, কারণ _তাদের কোনও কলুষ, কোনও দোষ আমি দেখিনে। আমার বিচারে এই দুর্বুদ্ধির জন্য তোদের পরিবার নয়, তোরাই (একা দোষী কলু) ষিত করেচিস তোরা ইতিহাসের এক মহান অধ্যায়কে। আচমকাই জীবনের (সুতায় টান পড়বে) আর শমন ঝাঁপিয়ে পড়বে তোদের জীবন বিনষ্ট করতে।

মৃত্যুর রূপ যে কতোখানি উদগ্র হতে পারে তা তোরা জানিস নে পাপিষ্ঠ। তোদের নিকেশের জন্য আমার অভিশাপ এমন উগ্র, বি (শ্রী রূপ ধর)বে, যার মোকাবেলা করার শক্তি কারুর নাই। বিপদ তোদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়চে শয়তান। আমি এক্ষণে প্রতিজ্ঞা বশে চলে যাচ্চি, কিন্তু আমার হয়ে প্রতিজ্ঞা পূরণ করবে আমার কালান্তক রাক্ষস। সে আমার আজ্ঞা মতো তোদের সকলকেই হত্যা করবে। ভয়ঙ্কর মরণের জন্য দিন গোণা আরম্ভ কর। তৈরি হ।”

শ্রীরূপ ভীষণ আতঙ্কে অবশ হয়ে পড়ল। প্রতিটি আক্রান্তর নাম এবং মৃত্যুর পদ্ধতি কয়ে গিয়েচে সেই শয়তান। সে শুষ্ক স্বরে অসহায়ে ভাবে বললে— “তবে উপায় ঠাকুর?”

কালীপদ জবাব দিল না। অস্থির হয়ে শ্রীরূপকে কইলো—“বাছা তোমাদের গাঁয়ে ভালো ঘরামি বা জনাকয়েক মজুর পাওয়া যাবে? এক্ষুণি?”

কালীপদর তলব পেয়ে মুহূর্তের মধ্যে উপস্থিত হল গ্রামের সুমন্ত ঘরামি আর তার দলবল। যা যা করতে হবে কালীপদ সব বুঝিয়ে দিয়ে, তার হাতে একখানা মশাল আর দিয়াশলাই দিয়ে কইলো— “সাবধান বাবা, কাকপক্ষীতেও যেন টের না পায়। সকলে একসাথে যেও না। ভিন্ন ভিন্নভাবে বেরিয়ে ওইখেনে মিলিত হবে।”

মাথা নেড়ে সুমন্ত ঘরামির দল সেইভাবে বেরিয়ে পড়ল।

*

শৃগালের পালের ডাক শুনে বোঝা গেল রাত প্রায় মধ্যপথে এসে পড়েছে। গোটা গৃহের প্রতিটি মানুষ নিঃশ্বাস বন্ধ করে জেগে রয়েচে।

আজকের রাত্রি কেবল রাত্রি নয়, কালরাত্রি। কারুর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্চে না। রাত্রি যখন মাঝে এসে স্থির হল, সহসা বাইরে একটি পদশব্দ উত্থিত হল। প্রত্যেকটি লোক উৎকর্ণ হয়ে শুনলো, কেউ একজন বাইরের দোরে এসে দাঁড়িয়েচে এবং দরজার কুন্ডল ধরে পাগলের ন্যায় নাড়চে। উপরের তলা থেকে একটি ছোটো ছেলে দৌড়ে এসে খবর দিল, বাইরে সুমস্ত ঘরামি দৌড়াতে দৌড়াতে এল, যেন কিছু দেখে ভয় পেয়েচে!

সুমস্ত ঘরামি কালীপদর শেখানো কোনও কাজে গিয়েচিল। সে এসেছে শুনে শ্রীরূপ দ্বার উন্মুক্ত করতে যেতেই কালীপদ ব্যাঘ্রের ন্যায় থাবা দিয়ে তার কাঁধ চেপে ধরে বললে— “শীঘ্র বাড়ির পেছনের খিড়কির দ্বার খোলো, এখুনি বেরুতে হবে।”

লোকেরা হতভম্ব হয়ে বললে—“কেন? ‘

কালীগুণীন শ্বাস টেনে উত্তর দিল—“সুমন্ত ঘরামি নয়, সাক্ষাৎ বিপদ মানুষের রূপ নিয়ে তোমার দরজায় কড়া নাড়চে।”

কালীপদ শ্রীরূপকে নিয়ে তড়িঘড়ি বেরুতে বেরুতে ফিসফিসিয়ে করে বলল— “শীগগির নাটমন্দিরের দিকে দৌড়াও, ওই স্থান মানুষের চলাচলের অগম্য হয়ে রয়েচে, আমি সুমন্তকে দিয়ে প্রবেশপথ সামান্য পরিষ্কার করিয়ে রেখেচি।”

দুইজনে প্রাণপণে ছুটতে ছুটতেই কালী বিড়বিড় করে বলতে থাকলো- “ওঁ আস্তিকস্য মুণীমাতাঃ, বাসুকী ভগিনীস্তথাঃ, জরৎকারু মুণীঃ পত্নী, মা মনসাঃ নমহস্ততেঃ…”

তারা দৌড়াতে দৌড়াতেই বিলক্ষণ টের পেলে যে তাদের থেকে বেশ কিছুটা দূরে বেশ বলশালী কিছু একটা ধেয়ে আসচে। কালীপদর মন্তরের জন্য তাকে কিছুটা বাধার সম্মুখীন হতে হচ্চে বলে নাগাল পাচ্চে না, কিন্তু সে আসচে। কালো কালো সাপের মতো ছায়া তার গতিপথ রোধ করচে, কিন্তু বাধা ঠেলে, গ্রন্থি কেটে সে আসচে। তার গুরুভার পা জোড়া মাটিতে কম্পন তুলেচে। শৃগালের দল অমঙ্গলের আভাস পেয়ে পরিত্রাহি চিৎকার করচে। শ্রীরূপ মূল মন্দিরকে সামনে রেখে দক্ষিণে নাটমন্দিরের সম্মুখে তাকিয়ে একটু অবাক হয়ে কালীপদর দিকে তাকালো। কালী তার হাত ধরে টেনে নাটমন্দিরের আগাছা সরিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল। সত্যিই প্রবেশের পথ লোক লাগিয়ে কিছুটা সাফ করা রয়েচে। সামান্য সময়ের ব্যবধানে নাটমন্দিরের সুমুখে এসে দাঁড়ালো এক ভয়ঙ্কর দর্শন রাক্ষস মূর্তি। তার মাথা হিংস্র সিংহের ন্যায় ভয়ানক, দেহ দীর্ঘ এবং কালো কুচকুচে কেশে আবৃত। দাঁতের সূচাগ্রভাগ চন্দ্রলোকে ঝকঝক করচে। বাতাসে গন্ধ শুঁকে সেই ভয়াল প্রেতাত্মা সটান দৌড়ে ঢুকে পড়ল নাটমন্দিরের ভিতরে। তার প্রেত চক্ষুর আবছা আলোয় নিকষ আঁধারেও দেখতে পেলো, তার শিকার এবং কালীপদ এক কোণে অন্ধকারে মিশে আত্মগোপন করবার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করচে। হিংস্র একটা জান্তব গর্জন করে সেই রাক্ষস দুইখানি মানবমূর্তির দিকে পা বাড়াতেই কালীপদ দিয়াশলাই ঠুকে মশালে স্পর্শ করল। সামান্য মশালের ক্ষীণ আলোতে অতোবড়ো স্থাপত্যের আঁধার পুরা দূর হল না বটে, কিন্তু সেই সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত ভীষণ অবাক হয়ে চেয়ে দেখলো তার সামনে তার দিকে চেয়ে রয়েচে প্রায় বিশ হস্ত উচ্চ পাথরের মহাদেবের বিগ্রহ!

কালীপদর সব মনে পড়ে গিয়েচে। দধীচির কাহিনির যে প্রশ্ন সে ধরতে পারচিল না, তা হল, মহাদেবের সামনে থাকলে বিকটাসুর দেবতাদের আক্রমণ করতে পারে না কেন? কারণ তার সৃষ্টি যে মহাকালের চক্ষু হতে, সেই রুদ্রাক্ষ, অর্থাৎ শিবের চক্ষুর সামনে সে দ্বিতীয় বার আসতে পারতো না। মহাদেবের বিগ্রহই সেই স্থান যেইখেনে দেহের অমৃত আর কণ্ঠের বিষ সহাবস্থান করে, কালরূপী মহাব্যাঘ্রের দিকে নাগরাজ শঙ্খচূড় চেয়ে রয়, ত্রিশূলে যেখানে ডম্বরু বাঁধা থাকে, মহাস্রোতা গঙ্গা যেখানে চন্দ্রদেবের পার্শ্বে অবস্থান করেন। কালীপদ সুমন্ত ঘরামিকে ডেকে গোপনে বলেচিল— “শোনো বাছা, এক দুরূহ কার্যে তোমাদের নিযুক্ত করতে চলেচি। দুইটি মাত্র প্রহরের মধ্যে তোমাদের একখানা কাজ করতে হবে। গাছপালা, জঙ্গল কেটে মন্দিরের গায়ে এমনভাবে সাজিয়ে দেবে, যাতে সেটিকে নাটমন্দির মনে হয়। আর নাটমন্দিরের আগাছা কেটে ঘষে মেজে পরিষ্কার করে রাখবে, যাতে সেটিকে দেখে মূল মন্দির ভ্রম হয়। এই অসুর কখনও মন্দিরে প্রবেশ করবেই না, কিন্তু তোমাদের মুন্সীয়ানা যেন তাকে রাতের আবছায়াতে ভ্রান্ত হতে বাধ্য করে।”

সুমন্ত ঘরামির দল কথা রেখেচে। তাড়াহুড়োয় এবং ধূর্ত কালীপদর মুখে নাটমন্দিরের কথা শুনে সে ফাঁদে পা দিয়েচে। বিকটাসুর ভয়ানক চিৎকার করে পলায়নোদ্যত হওয়া মাত্র মন্দিরের গর্ভ চোখ ধাঁধানো আলোয় আলোয় ভরে গেল। মাটি, আকাশ গুরুগুরু করে ডেকে উঠল। মহাদেবের সুপ্রাচীন প্রস্তর বিগ্রহের পাথরের কপাল-চক্ষু খুলে গেল। ভীষণ শব্দের সঙ্গে আগুনের রেখা ছুটে এসে বিকটাসুরের উপরে ঠিকরে পড়ল। একটু আর্তনাদের শব্দ অবধি পাবার পূর্বেই সেই করালদংষ্ট্রা রাক্ষসের অতো বড়ো দেহখানি একমুষ্টি ভস্মে পরিণত হল। মন্দির আবার আঁধারে ডুবে গেল।

*

মন্দির থেকে বেরিয়ে কালীপদ এবং শ্রীরূপ ধীর, নিশ্চিন্ত পদক্ষেপে হেঁটে হেঁটে গৃহাভিমুখে চলেচে। একটু তফাতে ঘরামির দল। ভোরের আলো ফুটবো ফুটবো করচে। রাতের যবনিকা অতি ধীর লয়ে মুছে যাচ্চে। শ্রীরূপ আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে বলল—“আমি ভূত প্রেত গুণীনে বিশ্বেস করতুম না ঠাকুর। কিন্তু আজ বুঝেচি, তন্ত্র মিথ্যা নয়। আপনার মতো পরোপকারী এবং শক্তিধর মন্ত্রবিদ যদ্দিন ভূ-ভারতে রইবে, তদ্দিন মানুষের বিশ্বাসও অটুট থাকবে। অসাধারণ ক্ষমতা তো আপনার রয়েচেই, কিন্তু তার থেকেও অদ্ভুত আপনার কূটবুদ্ধি। এ কথায় মন্দ ভাববেন না ঠাকুর।”

কালীপদ হাত নেড়ে কইলো—“আরে না না, অমন কিছু নয়। বিদ্যে আমার খুদকুঁড়ো বৈ তো নয়, আর বুদ্ধি? তুমি জানো না বাবা, আমি কিন্তু প্রত্যেক বারেই সমাধান পেয়েচি মানুষের সহজ সরল কথার মধ্যে দিয়েই। ভগবান মানুষের মধ্যেই বসত করেন, তাই মানুষের রূপেই তিনি তার কর্তা হয়ে সমাধানের পথ বাতলে দেন। আমিই বা কে, তুমিই বা কে? ভবাণী শক্তি দিয়েচেন বলেই আমি সামান্য মানুষ হয়েও দেবতার অসাধ্য এই বিধ্বংসী শক্তিকে শেষ অবধি…”

শ্রীরূপ হেসে কইলো- “ছু-মন্তর করে দিয়েচেন।”

পিছন থেকে সুমন্ত ঘরামি শশব্যস্তে এসে শুধোলো—“আজ্ঞা, ডাকলেন কেন কৰ্তা?”

আবার সেই শোনার ভুল। কালীপদ এবং শ্রীরূপ একসাথে হোঃ হোঃ করে হেসে উঠল। গর্ভগৃহের অন্দরে প্রশান্ত শিবমূর্তির ঠোঁটেও বুঝি একচিলতে হাসি খেলে গিয়েই পূর্ববৎ হয়ে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *