এসো আমার সঙ্গে – ৫

পাঁচ

শীতের এখনও কোথায় কী, সকালসন্ধে কেবল একটু শিরশিরে ভাব, তবু এর মধ্যেই মোজা আর মাংকি ক্যাপের বর্মের মধ্যে ঢুকে গেছেন তারাচরণ। ইদানীং শীত যেন রে রে করে তেড়ে আসে; আঢাকা জায়গা পেলেই আঁচড়ে-কামড়ে দেয়। খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায়, কিন্তু চাপাচুপি দিয়ে শুয়েই থাকেন বিছানায়। আজকাল একটা নতুন উপদ্রব হয়েছে, পেচ্ছাপের বেগ মোটে চাপতে পারছেন না। শীতের রাতে পেচ্ছাপ পেলে ওঠা বড় জ্বালাতনের কাজ। ভাবছেন, ঘরে একটা মাটির সরা রেখে দেবেন।

সকালে রোদ পিঠ করে উঠোনে বসে মুড়ি খাচ্ছেন তারাচরণ। হেঁকে চায়ের কথা বলেছেন একটু আগে; দেরি দেখে ফের হাঁক দিলেন। মুশকিল হল, মহামায়ার কানটা একেবারেই গেছে। আজকাল কথা এত কম বলে যে আনকা লোক বোবা ভাববে। তিনবার ডাকলে একবার সাড়া দেয়, তাও ‘হুঁ’ ‘হ্যাঁ’-এর বেশি নয়। হুকুম করলে কাজটা করে দেয় কিন্তু সেও বড় নি:সাড়ে। এই যে, একটু আগে চায়ের কথা বলেছেন তারাচরণ—একটা ‘দিচ্ছি’ বা ‘একটু দেরি হবে’ গোছের কিছু একটা বললে বোঝা যেত যে, কথাটা কানে গেছে। এখন টানাপোড়েনে থাকতে হবে তারাচরণকে।

আরও কিছুক্ষণ দেখলেন তারাচরণ, তারপর চায়ের আশা ছেড়েই দিলেন।

দুটো শালিক অনেকক্ষণ তিড়িক তিড়িক নাচছে তারাচরণের পাশে। ক’দানা মুড়ি ছুড়ে দিলেন পাখিগুলোর দিকে। শুকনো মুড়ি গলা দিয়ে নামতে চায় না। কড়াইশুঁটির সময় হয়ে গেছে। মুড়ির সঙ্গে কচি কড়াইশুঁটি হলে বেশ লাগে।

সাইকেল নিয়ে বেরোচ্ছে অরণ্য। তারাচরণ বললেন, হ্যাঁ রে, বাজারে কড়াইশুঁটি ওঠেনি?

টায়ারের হাওয়া পরখ করতে করতে অরণ্য বলল, উঠেছে; তবে ভালো নয়—স্টোরের মাল, দামও চড়া।

তারাচরণ বললেন, তবে আর কী হবে; তার চেয়ে ফুলকপি পেলে নিয়ে নিস বরং।

অরণ্য বলে, আমি তো এখন বাজারে যাচ্ছি না।

তবে আজ কে যাবে, ছোট না কি?

এ কথাটার কোনও উত্তর দিল না অরণ্য। চুপচাপ একটা কাপড়ের টুকরো দিয়ে সাইকেল মুছতে লাগল।

আর একবার জিগ্যেস করবেন কি না ভাবতে লাগলেন তারাচরণ। বড় ছেলে বরাবরই গম্ভীর প্রকৃতির, হালে আরও গম্ভীর হয়ে গেছে। চাকরিবাকরি পায়নি বলেই বোধহয়। এ জন্যে একটা মৃদু অপরাধবোধ কাজ করে তারাচরণের। বিএ পাশ করে কম্পিউটার কোর্সে ভরতি হতে চেয়েছিল অরণ্য। তখন সদ্য রিটায়ার করেছেন তারাচরণ। প্রাইমারি স্কুলে চাকরি, সংসারের টাল সামলাতে গিয়ে সঞ্চয় প্রায় কিছুই করতে পারেননি। পিএফ বাবদ যেটুকু পেয়েছিলেন সেটা পোস্টঅফিসে ফেলে দিয়েছিলেন। ছিটেফোঁটা সুদ আর গুটিকতক টিউশনি সম্বল করে কোনওরকমে কুঁজো হয়ে সংসার টানছেন তারাচরণ। অরণ্যকে বললেন, কিছুদিন সবুর কর, পেনশনটা বেরোলে দিতে পারব। তখনও বোঝেননি মাস্টারদের পেনশন বের করতে হলে জুতোর সুখতলা আর গায়ের চামড়া দুটোই বেশ পুরু হওয়া দরকার।

পেনশন পেলেন ঠিক সাত বছরের মাথায়। তত দিনে গাদাগাদা অ্যাপ্লিকেশন পাঠিয়ে, খিটকেল জিকে. মুখস্থ করে আর দু’বেলা গবেট ছাত্রদের টিউশন পড়িয়ে হতোদ্যম অরণ্য সদ্য পার্টি লাইনে ঢুকেছে। পার্টির দাদারা হয়তো চাকরির টোপ দিয়েছিল তখন। তারাচরণ বলেছিলেন, তুই যে কম্পিউটার শিখবি বলেছিলিস, তা শেখ না।

অরণ্য অবাক দৃষ্টিতে তাকায়, কবে!

সেই যে, আমার রিটায়ারমেন্টের পর, তখন একটু অসুবিধে ছিল…

অরণ্যের ঠোঁটের কোণে একটা হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। বলল, নাহ, আমার জন্যে কিছু করতে হবে না, বরং অর্চনের জন্যে ভাবো।

অর্চন সত্যিই ভাবিয়ে তুলেছিল। পড়াশোনা কোনও দিনই মন দিয়ে করেনি; হায়ার সেকেন্ডারিতে ব্যাক পেয়ে ছেড়ে দিল। বরাবরই অস্থিরমতি, কোনও কিছু নিয়ে লেগে থাকা ধাতে নেই। জঙ্গলসুফিতে তখন টাকা উড়ছে; জাল নোট, সোনার বিস্কুট, বিদেশি ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্র সব পৌঁছে গেছে। সন্ধের পর অনেক অচেনা মুখ দেখা যায় এলাকায়। কানু ছিল এ লাইনের ওস্তাদ লোক; কানুকে ঘিরেই পাকিয়ে উঠেছিল দলটা। বেশ বড় দল। বাইরের কিছু ছেলেও ছিল।

অর্চন ভিড়ে গেল সেই দলে। বেশির ভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকত, অনেক রাত করে ফিরত। কী করে, কোথায় যায়— প্রশ্ন করলে এড়িয়ে যেত। এ দিকে পরনে দামি জামা-প্যান্ট; মোবাইল ফোন নিল, ঝকঝকে একটা মোটর সাইকেল কিনে ফেলল এক দিন।

অবনীদা অরণ্যকে ডেকে বললেন, তোর ভাইটার দিকে নজর রাখ; আমাদের কাছে যা রিপোর্ট আছে ভালো নয়; যে কোনও দিন ফেঁসে যেতে পারে।

অরণ্য অর্চনকে সাবধান করেছিল। শুনে অর্চন বাঁকা হাসল। বলল, তোর দাদাদের বল, একটা চাকরিবাকরি জোগাড় করে দিক, লাইন ছেড়ে দেব।

অরণ্য বলল, চাকরি কি এত সস্তা! কত ভালো ছেলে…

তা হলে কাউকে মাথা ঘামাতে হবে না; আমি আমারটা বুঝে নেব।

সে তুই বুঝে নে, কিন্তু ফেঁসে গেলে কী হবে ভেবেছিস?

এত সহজে ফাঁসব না। আমাদের অনেক ওপর মহলে পুজো-টুজো দেওয়া হয়; তোর অনেক দাদাও পুজো পায় আমাদের কাছ থেকে—জানিস কি?

ওভাবে হবে না বুঝতে পেরে অরণ্য অন্য তাস ফেলার চেষ্টা করল। বলল, তুই কোন পরিবারের ছেলে সেটা ভুলে যাস না— বাবার একটা সম্মান আছে…

বাবার সম্মান! খুব বিদ্রুপের সঙ্গে বলল অর্চন, বাবার এত ছাত্র তো বড় বড় পোস্টে রয়েছে, কেউ একটা চাকরি করে দিয়েছে তোকে বা আমাকে? রণজিৎ বসুকে তো বাবা ফ্রি-তে পড়িয়েছিল। আমি দেখা করতে গেলাম, ঝাড়া দু’ঘণ্টা বসিয়ে রাখল।

কোনও ভাবেই অর্চনকে বোঝানো যাবে না বুঝে সে দিন চুপ করে গিয়েছিল অরণ্য। তারাচরণের পেনশন বের হওয়ার পর অর্চনকে জেরক্স আর টেলিফোন বুথ করার প্রস্তাব দেওয়া হল। অর্চনের হাতে তখন দেদার পয়সা। বলল, জেরক্স আর ফোন-বুথ এখন মোড়ে মোড়ে—এসব করে আর ফায়দা নেই।

কিছু দিনের মধ্যেই জড়িয়ে পড়ল অর্চন। একদিন রাতে বাড়ি ফেরার সময় খুন হল রমেশ সাহা। জঙ্গলসুফি শ্মশান এলাকাটা এখনও বেশ নির্জন। এক পাশে ফাঁকা মাঠ, অন্য দিকে বড় বড় দেবদারু, নিম, খিরিশ গাছের জঙ্গল। রাতে দোকান বন্ধ করে ফিরছিল রমেশ; সঙ্গে ছিল বিশু। রোজ এই সময় একা ফেরে রমেশ, সে দিন কীভাবে যেন বিশুটা জুটে গিয়েছিল। দু’জনকেই টার্গেট করেছিল। বরাতজোরে বিশুটা বেঁচে যায়। কাঁধে গুলি খেয়ে চিৎকার করতে করতে ছোটে।

পর দিন জঙ্গলসুফিতে বেশ হইচই হল। রমেশ সাহা লোক খুব সুবিধের ছিল না; ঝানু সুদখোর, চোলাই মদের ভাটি চালাত। শোনা যায়, স্মাগলিং-এও হাত দিয়েছিল শেষের দিকে। তবে অরণ্যদের পার্টিকে ভালো চাঁদা দিত রমেশ। অন্য পার্টিগুলোকেও কিছু দিত নিশ্চয়ই। না হলে অত শান্তিতে কারবার করতে পারত না।

কিন্তু রমেশ সাহা খুনের সঙ্গে জড়িয়ে গেল অর্চনের নাম। বিশু নাকি একজনকে চিনতে পেরেছে। সে অর্চন।

অবনী ডেকে পাঠায় অরণ্যকে। বলল, শুনেছিস তো সব?

অরণ্য বলল, হ্যাঁ।

অর্চন এখন কোথায়?

বাড়িতে নেই।

কোথায় গেছে?

অরণ্য জানত অর্চন কোথায়। সে দিন একটু বেশি রাত করে ফিরেছিল অর্চন। চোখগুলো লাল। সঙ্গে একটা ছেলে। খুব উত্তেজিত আর অস্থির ছিল ওরা। একটু পরেই দু’জনে বেরিয়ে পড়ল। যাওয়ার সময় অরণ্যকে বলল, দাদা, একটা ফালতু ঝামেলায় জড়িয়ে গেছি। আমি এখন এই রতনদের বাড়ি যাচ্ছি মেদিনীপুরে—তুই কাউকে কিছু বলবি না। মনে হচ্ছে, কিছু দিন থাকতে হবে, বাবা-মাকে বুঝিয়ে বলিস একটু।

আর দাঁড়ায়নি অর্চন। প্রায় ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে গিয়েছিল।

অরণ্য অবনীকে বলল, আমার সঙ্গে তো দেখাই হয়নি— কাল কখন ফিরেছে জানি না, আজ সকালে উঠে দেখি নেই।

অবনী একটু গলা নামিয়ে বলল, অর্চন কি ইনভলভড, কী মনে হয় তোর?

অরণ্য খুব জোরের সঙ্গে মাথা নাড়ল—ইম্পসিবল, হতেই পারে না—অর্চন আর যাই করুক…

ঠিক আছে, অবনী বলল, কিন্তু ডাইরি যখন হয়েছে তখন কিছু দিন গা ঢাকা দিয়ে থাকুক, আমি রাঘবদা, বিকাশদার সঙ্গে কথা বলছি—আমি না বলা পর্যন্ত যেন এ দিকে না আসে। আর অর্চন কখন কোথায় থাকছে সেটা জেনে নিস।

অরণ্য বলল, ঠিক আছে।

আর শোন, মার্ডারটাকে ইস্যু করে আমরা একটা স্ট্রিট কর্নার করছি; এটাকে সমাজবিরোধীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব বলে চালাতে হবে। তোর ওদিকে থাকার দরকার নেই—বুঝতেই পারছিস…

ঠিক আছে। অরণ্য মাথা নাড়ে।

এই ব্যাপারটায় অরণ্য অবনীর কাছে কৃতজ্ঞ। সেই সময় খুব সাহায্য করেছিল অবনী। অনেক দিন পর বিরোধী পার্টিগুলো একটা ইস্যু পেয়ে বেশ লাফালাফি করেছিল। মানিক মোদক লোকদেখানি চেঁচাল। নেত্রীর নতুন দল। তাদের উৎসাহও একটু বেশি। থানায় ডেপুটেশন দিল, পথ অবরোধ করল, দু’একটা বাসের কাচটাচও ভেঙেছিল।

পরিস্থিতি একটু থিতিয়ে যেতে বাড়ি ফিরল অর্চন। পুলিশ কিন্তু অর্চনের গায়ে হাত দেয়নি।

প্রথম প্রথম দু’একবার পুলিশ হানা দিয়েছিল অর্চনের খোঁজে। কিন্তু আগেই খবর পেয়ে গিয়েছিল অরণ্য। অবনীই দিয়েছিল খবরটা। তখন কয়েক দিনের জন্যে গা ঢাকা দিত অর্চন।

এখনও মাঝেমাঝে বিরোধীরা মিটিং বা ষ্ট্রিট কর্নার করলে এই প্রসঙ্গটা তোলে। পুলিশ-সমাজবিরোধীদের আঁতাতের কথা বলে, অরণ্যদের পার্টি মস্তানে ভরে গেছে বলে চিৎকার করে। অরণ্য জানে আর কিছু দিন পর এরাও পুলিশের মতো উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে।

অরণ্য সাইকেল মুছতে মুছতে টের পায় তারাচরণ উশখুশ করছে। কিছু বলবে মনে হয়। আজকাল বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলতে খুব একটা উৎসাহ বোধ করে না অরণ্য। সে আরও মন দিয়ে সাইকেল মুছতে থাকে।

মুড়ি চিবোতে চিবোতে তারাচরণ বললেন, অর্চন বাজারে গেলে ফুলকপি আনতে বলিস।

অরণ্য জানে ফুলকপিটা ভণিতা, আসল কথাটা এখনও পাড়েননি তারাচরণ। সে ড্রপারে করে সাইকেলের চেনে মবিল দিতে দিতে বলে, ঠিক আছে, বলে দেব।

 ছোট একবাটি মুড়ি, তাও শেষ হচ্ছে না। কচি কড়াইশুঁটি থাকলে এগুলো কখন উঠে যেত। এক কোষ মুড়ি গালে ফেলে এক বার আড়চোখে অরণ্যকে দেখে নিলেন তারাচরণ; তারপর বললেন, অর্চনকে বাইরে পাঠিয়ে দিলে কেমন হয়?

সাইকেল থেকে চোখ সরিয়ে তারাচরণের দিকে তাকাল অরণ্য; চোখে-মুখে স্পষ্ট বিস্ময়; বলল, বাইরে পাঠাবে, কোথায়?

এই ধর বাংলার বাইরে কোথাও—অন্য প্রভিন্সে তো শুনতে পাই কাজের নানা সুযোগ আছে।

কাজের সুযোগ এখানেও কম নেই, অরণ্য গম্ভীর গলায় বলল, কাজের ইচ্ছেটাই বড় কথা।

তারাচরণ বললেন, আসলে এত বড় একটা বদনাম রটে গেল তো ওর নামে—এখানে ঠিক খাপ খাওয়াতে পারছে না; তার ওপর ভয় তো একটা সব সময় আছে…

অরণ্য চুপ করে গেল। সাইকেল মোছা তেলকালি লাগা কাপড়টা সিট কভারের নীচে গুঁজে রাখল। কল পাম্প করে হাত ধুতে ধুতে দেখল অর্চন বাড়িতে ঢুকছে। অরণ্য বলল, আজ তোকে বাজারে যেতে হবে।

অর্চন দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, ঠিক আছে, যাচ্ছি।

বাবার কাছ থেকে জেনে নিবি কী কী আনতে হবে।

অর্চন বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ে। মার্ডার কেসটায় জড়িয়ে যাওয়ার পর আমূল বদলে গেছে অর্চন। সেই উদ্ধত বেপরোয়া ভঙ্গিটা আর নেই। সব সময় কেমন যেন সন্ত্রস্ত ভাব। বেশির ভাগ সময় বাড়ির মধ্যেই থাকে। পুরোনো লাইন ছেড়ে দিয়েছে। সেটা নিয়েও কম সমস্যা হয়নি। লাইনের অন্য লোকজন বিস্তর বাধা দিয়েছিল। বার বার অর্চনকে ডাকত। এমনকী কানু নিজেও এক দিন চলে এল অর্চনের কাছে। বাড়িতে ঢোকেনি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কথা বলল। সেদিন সত্যিই ধ্বস্ত লাগছিল অর্চনকে। সন্ধেবেলা অরণ্য ওকে ধরল, কী বলছিল রে কানু?

মাথা হেঁট করে অর্চন বলল, আবার কাজ করতে বলছে।

তুই কী বললি?

অর্চন রগ দু’টো চেপে ধরল। বলল, আমি তো ওদের অনেক বারই বলেছি কাজ করব না। আসলে ওদের ভয় আমি যদি কিছু ফাঁস করে দিই।

তুই বলছিস না কেন, তোর মাথার ওপর একটা খাঁড়া ঝুলছে।

তাও বলেছি; কানুদা বলল, এ লাইনে ওই রকম পাঁচ-সাতটা কেস নিয়েও কত লোক কাজ করে।

অরণ্য বলল, ঠিক আছে, তুই চুপচাপ থাক, আমি অবনীদাকে বলছি।

অবনীদাকে আর বলতে হয়নি। দু’দিন পরেই খিদিরপুরে খুন হল কানু। তার পরে দলটাও ভেঙে গেল।

কিন্তু তার পর আবার অন্য সমস্যা। অর্চনটা বরাবরই অলস প্রকৃতির। পরিশ্রম করে উপার্জনের কথা চিন্তা করতে পারে না। সব সময় সহজে রোজগারের উপায় খোঁজে। তার ওপর ঘটনাটা ঘটার পর কেমন যেন গুটিয়ে থাকে সব সময়।

নতুন কিছু করে কোনও ভাবেই জমাতে পারছে না। কিছু দিন দোকানে দোকানে চানাচুর বিস্কুট সাপ্লাই করত। লাভ হচ্ছে না বলে ছেড়ে দিল। তার পর আশপাশের স্কুলগুলোতে খাতা রেজিস্টার চক ডাস্টার ব্ল্যাকবোর্ড এই সব সাপ্লাই দিত। অরণ্যই যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেটাও পোষাচ্ছে না বলে ছেড়ে দিল।

সাইকেলের স্ট্যান্ড তুলল অরণ্য। সকাল থেকে মনটা এলোমেলো। এই সময় এক বার পার্টি অফিসে ঢুঁ মারে। আজ ভালো লাগছে না। নতুদার চায়ের দোকানে যাবে ঠিক করল। ওখানে কিছুক্ষণ আড্ডা দিলে মনটা ফুরফুরে হয়ে যাবে।

ছয়

নতুদার দোকানে যাবে বলে বেরিয়েছিল অরণ্য দুর্গাতলার মোড়ে এসে মনটা টলে গেল। নতুদার দোকান এখন জমজম করছে। এই সময় জঙ্গলসুফির কিছু শুকনো আঁতেল গম্ভীর মুখে খবরের কাগজ পড়ে আর গলা ফাটায়। গলফ থেকে গজল, যে-কোনও বিষয়েই তাদের অগাধ জ্ঞান। অরণ্যের ছোটবেলার কিছু বন্ধুবান্ধবও থাকে। ওরা অরণ্যকে ঠারেঠোরে কথা শোনায়। অরণ্যদের পার্টি দুর্নীতিতে ডুবে আছে, ভোটে রিগিং করে এত বছর ক্ষমতা ধরে রেখেছে—ইত্যাদি। অরণ্য আগে তুমুল তর্ক করত; ইদানীং এ সব শুনলে হাই ওঠে।

দুর্গাতলার মোড় থেকে ডান দিকের রাস্তা ধরল অরণ্য। বাঁকুড়া-মাটির সরু-রাস্তা। দু’পাশে বনসৃজন প্রকল্পের লাগানো বাবলা গাছ। সুড়ঙ্গের মতো মনে হচ্ছে রাস্তাটাকে। দূরে তাকালে কেমন যেন রহস্যের হাতছানি।

হোমের সামনে পৌঁছে পা ঠেকিয়ে দাঁড়াল অরণ্য। ঝকঝকে রোদে ধুয়ে যাচ্ছে সাদা বাড়িটা। একটা ঘরে চিৎকার করে পড়ছে কয়েকজন। পাঞ্জাবির পকেট থেকে চিরুনি বের করে চুলটা আঁচড়ে নিল অরণ্য। তাড়াহুড়োয় রংচটা পাঞ্জাবিটা পরেই চলে এসেছে। প্যান্টটাতেও ইস্তিরি পড়েনি বহু দিন। কালই অবশ্য ছেঁটে-ছুঁটে দাড়িটার একটু ভদ্রস্থ চেহারা দিয়েছে।

হঠাৎ নিজের মনেই একটু হেসে ফেলল অরণ্য। সে কি একটু আত্ম-সচেতন হয়ে পড়েছে? সেই মেয়েটার জন্যে না কি? সন্দেহ নেই, মেয়েটা চাবুক মেয়ে। এই বয়সের গড়পড়তা মেয়েদের মতো ন্যাকা নয়; চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে।

গেট দিয়ে ঢুকে সাইকেলটা স্ট্যান্ড করল অরণ্য। অফিসের দরজাটা বন্ধ। একটু হতাশ হল। ভাবল ফিরে যাবে। এখানে সে এলই বা কেন? কোনও কংক্রিট কারণ তো নেই। মেয়েটার টানে কি? ধুস! ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয় চিন্তাটা। কিন্তু বেয়াড়া চোখ দুটো চারদিকে কী যেন খুঁজছে। সেদিন এমন সময়েই কি এসেছিল অরণ্য? মনে মনে চিন্তা করে। আবার হেসে ফেলে সে। বাচ্চা একটা মেয়ের জন্যে বড় বেশি চিন্তা করছে।

লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেল অরণ্য। এসেছে যখন শুভম দত্তর সঙ্গে দেখা করে যাবে। ভারী ইন্টারেস্টিং মানুষটা। কথাবার্তায় অগাধ আত্মবিশ্বাস, অথচ কোথাও কোনও উগ্রতা নেই। নিজের মুখে বলেন, আমি যৌনকর্মীর সন্তান।

যে ঘরটা থেকে পড়াশোনার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে সে দিকে গেল অরণ্য। টেবিলে একটা গ্লোব রেখে ছাত্রদের পড়াচ্ছেন শুভম দত্ত। গ্লোব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন আমেরিকা, ইংল্যান্ড, সুইডেন, জাপান, চিন, মালেশিয়ার অবস্থান। সামনে বসে হাঁ-করে গিলছে কয়েকজন ছেলেমেয়ে। ওদের চোখে-মুখে অগাধ বিস্ময়। একজন জিগ্যেস করল, আংকল, দেশগুলো কি অনেক দূরে? শুভম দত্ত বললেন, আজকের পৃথিবীতে তো দূর বলে কিছু নেই।

একটা রোগা লম্বা ছেলে বলল, ওই সব দেশের ছেলেদের সঙ্গে আমার ভাব করতে খুব ইচ্ছে করে।

বড় হলে নিশ্চয়ই বন্ধুত্ব করবে; কিন্তু তার জন্যে ভালো করে লেখাপড়া শিখতে হবে।

অরণ্য দরজার সামনে দাঁড়াতে দু’একজন তার দিকে তাকাল। ঘুরে দাঁড়ালেন শুভম দত্ত। মুখে মৃদু একটা হাসি ফুটল। বলল, আরে, অরণ্যবাবু যে!

অরণ্য বলল, পড়াচ্ছেন?

ওই আর কী; এরা ধরল, ভূগোল পড়বে।

ফাংশনটার কথা মনে আছে তো? খুব বেশি সময় নেই কিন্তু; গানটা যেন ভালোভাবে গাওয়া হয়।

শুভম একটু চুপ করে থাকল। তারপর বলল, অফিসে চলুন, কথা বলছি।

অফিস-রুমের দরজা খুলতে দেখা গেল ভেতরে একটা বাচ্চা মেয়ে মেঝেয় বসে আঁকছে। ফরসা রং, বড় বড় দু’টো চোখ, একমাথা ঝাঁকড়া চুল। ওরা ঢুকতেই আঁকা বন্ধ করে দিল। শুভম বলল, কী হল অনু, থামলে কেন, কী আঁকছিলে?

অনু মুখ নীচু করে বলল, আগে শেষ হোক, তারপর সবাইকে দেখাব।

বা: বেশ, তাই দেখিও। তুমি এখন একটু পড়ার ঘরে গিয়ে আঁকো।

একটু অভিমানী গলায় অনু বলল, তাই তো আঁকছিলাম; ববি আর বিল্টুটা এমন দুষ্টু না, খালি বাজে বাজে কথা বলছে।

শুভম বলে, তাই! কী বলছে ওরা?

বলছে, তোর নদীটা দেখে মনে হচ্ছে হেলে সাপ, আর চাঁদটা একদম পরোটা হয়ে গেছে।

ওমা, তাই না কি! খুব অন্যায়; আমি ওদের ব’কে দেব। তুমি তা হলে ডাইনিং হলে চলে যাও, ওখানে এখন কেউ নেই।

আর্ট পেপার, রং-তুলি নিয়ে গুটি গুটি করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় মেয়েটা। শুভম বলে, এই মেয়েটা মাস-ছ’য়েক হল এসেছে; ভীষণ সুন্দর আঁকে।

অরণ্য বলল, আগে কোথায় থাকত? সেখানে আঁকা-টাঁকা শিখত না কি?

আগে থাকত উত্তর কলকাতার একটা নিষিদ্ধ পল্লিতে। ওর মা দিয়ে গেছে। ওর মায়েরও নাকি ছোটবেলায় খুব আঁকার শখ ছিল। তার মুখ থেকে নন্দলাল বসু, পিকাসো নামগুলো শুনে আমি চমকে উঠেছিলাম।

একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে অরণ্য। সত্যিই কত গভীর আর বিচিত্র হতে পারে মানুষের সমস্যা! আবার কেউ কেউ চায়ের চিনির হেরফের বা টিভি ভলিউমের বাড়া-কমা নিয়ে তুলকালাম বাধিয়ে ফেলে। তারা হয়তো কোনওদিন বুঝতে পারবে না কত কঠিন অবস্থায় বেঁচে আছে কিছু মানুষ। বাস্তবে ফেরে অরণ্য। বলে, হ্যাঁ, কী বলবেন বলছিলেন?

শুভম বলে, ওই দিন ফাংশনে আমাদের ছেলেমেয়েরা পার্টিসিপেট অবশ্যই করবে, কিন্তু গানটা কতটা উতরোবে বলা মুশকিল।

অরণ্য বলল, কেন, এত দিন তো সময় পেলেন। এর মধ্যেও হল না!

আসলে হয়েছে কী—তমালিকা এই প্রাোগ্রামটা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে; আমি পড়ে গেছি ডিলেমার মধ্যে, আপনারা আমাকে নানাভাবে হেল্প করেন, আবার তমালিকাও হোমের জন্যে অনেক কিছু করে—ওর হেল্পটাও ভীষণ দরকার, ফলে বুঝতেই পারছেন…

অরণ্য থমথমে গলায় বলল, ও তাহলে গানটা শেখাবে না?

শুভম বলল, আমি অনেক বুঝিয়েছি, কিন্তু কিছুতেই রাজি নয়। ও ভলানটারিলি সার্ভিস দেয়—আমি তো ওকে বাধ্য করতে পারি না, তা হলে হয়তো ছেড়েই দেবে, তখন আবার অন্য সমস্যায় পড়ব।

তা হলে কি বাচ্চারা গানটা রিডিং পড়ে চলে আসবে?

না, না, তা কেন; আমি আর একজনকে ধরে এনেছি—তবে সেই মেয়েটি তো নতুন, কতটা কী গড়েপিটে নিতে পারবে ঠিক বুঝতে পারছি না।

অরণ্য বুঝতে পারে একটা প্রচণ্ড আক্রোশ দপদপ করছে মাথার মধ্যে। বলে, আচ্ছা অডাসিটি তো! একদিন একটা গণসঙ্গীত গাইলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত! মেয়েটাকে কখন পাওয়া যাবে বলুন তো, আমি একটু কথা বলব।

শুভম বলল, সে আপনি ওর সঙ্গে কথা বলতেই পারেন—কিন্তু কী দরকার; শুধু শুধু তিক্ততা বাড়বে। আসলে এই বয়েসটাই এই রকম, একটু অবস্টিনেসি থাকেই।

অরণ্য চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। বলল, ঠিক আছে, বাচ্চাগুলোকে যতটা সম্ভব তৈরি করে দিতে বলুন। আসলে কী জানেন, এরা হচ্ছে এঁচোড়ে পাকা—পাকামি করে লোকের নজর টানতে চায়।

শুভম বলল, মেয়েটা কিন্তু ঠিক সেই টাইপ নয়—সেদিন কেন যে মাথা গরম করে ফেলল, কী জানি।

অরণ্য বলল, মেয়েটি কিন্তু অহংকারীও আছে। তবে ক্ষতি তো ওর হবে না, হবে বাচ্চাগুলোর; মন্ত্রীর সামনে পারর্ফম করার গুরুত্বই আলাদা। বলা যায় না, মন্ত্রীর নজরে একবার পড়ে গেলে আপনার হোমের ভবিষ্যৎ নিয়ে আর ভাবতে হত না।

শুভম মাথা নাড়ে—ঠিকই।

আসলে মেয়েটি বোধহয় আমাদের অ্যান্টি পার্টির সাপোর্টার; ওর বাবার নামটা কী বলুন তো? বাড়ি কোথায়?

একটু চুপ করে থাকে শুভম। তারপর বলে, আসলে তমালিকা এখানে ওর এক রিলেটিভের বাড়ি থাকে; মেয়েটার জীবনটা খুব করুণ…

একটা সিগারেট ঠোঁটে লাগিয়েছিল অরণ্য। সিগারেটটা ফের হাতে নিয়ে বলল, তাই না কি, দেখে তো কিছু বোঝা যায় না। স্ট্রেঞ্জ!

খ্যাঁচড়ানো মুড নিয়ে নতুদার চায়ের দোকানে ঢুকে অরণ্য দেখল অতীন সেন বেঞ্চে বসে মন দিয়ে কাগজ পড়ছে। ডান হাতে চায়ের ভাঁড়। বেলা হয়ে গেছে, তাই নতুদার দোকানে ভিড়টাও পাতলা। অচেনা দু’টো ফিরিওয়ালা পাঁউরুটি চিবোতে চিবোতে জিনিসপত্রের আগুনদর দিয়ে আলোচনা করছে। আড়চোখে অরণ্যকে দেখে অতীন সেন অযাচিতভাবে ফিরিওলাদের আলোচনায় ঢুকে পড়ে। কাগজ পড়তে পড়তেই মন্তব্য ছোড়ে—বাজারদর সব কন্ট্রোলে থাকবে যদি কিছু নেতাকে ধরে পিটুনি দিতে পারো। সেটা পারবে কি?

মুফতে এমন ভদ্দরলোক সাপোর্টার পেয়ে লোক দুটো বেশ উৎসাহিত। বলে, তা যা বলেছেন।

একটা চায়ের অর্ডার দিয়ে বেঞ্চে বসল অরণ্য। অতীন সেন কাগজ থেকে চোখ তুলে অরণ্যের দিকে তাকাল। দৃষ্টিতে করুণা আর তাচ্ছিল্য। অতীন সেন কোন দলের সমর্থক ঠিক বোঝা যায় না; নতুদার দোকানে বসে সব পার্টিরই ছাদ্দ করে। যে-কোনও উদ্যোগের মধ্যেই ধান্দা খুঁজে পায়, যে-কোনও মতবাদকেই নস্যাৎ করে দেয়, অথচ সঠিক পথ কোনটা, তা আজ পর্যন্ত বলে দেয়নি।

অতীন সেন পা নাচাতে নাচাতে বলল, কী ব্যাপার মিস্টার পলিটিশিয়ান, কেমন আছ?

অরণ্য তেতো মুখে বলল, একটু আগে পর্যন্ত ভালো ছিলাম, এখন নেই।

কেন ব্রাদার, ভালো নেই কেন? তোমাদেরই তো এখন বাজার।

এই যে সকালবেলায় তোমার মুখ দেখতে হল, এখন সারাদিন ভালোয় ভালোয় কাটলে হয়।

খোঁচাটা গায়ে মাখল না অতীন সেন। বলল, ফালতু টেনশন করিস না, বরং একটা লটারির টিকিট কাট। পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র মানুষের মুখ দেখেছিস, ফার্স্ট প্রাইজ তোর বাঁধা।

অরণ্য বলে, টাকাটা দাও।

কীসের টাকা?

লটারির টিকিট কাটব; প্রাইজ পেলেই টাকাটা দিয়ে দেব তোমায়।

চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে ভাঁড়টা ফেলে দিল অতীন সেন। বলল, তোদের সেই উঞ্ছবৃত্তি আর গেল না; চারদিক থেকে এত পয়সা কামাচ্ছিস, তবু…

কীভাবে চারদিক থেকে কামাচ্ছি একটু বলবে।

সেটা কি আর প্রমাণ রেখে করছিস? তুই বল, তোদের নেতাদের এত ঠাঁটবাট হয় কী করে? প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার, অথচ তিনতলা মোজাইক করা বাড়ি, মোবাইল ফোন, হপ্তায় দু’দিন খাসির মাংস খাচ্ছে—তুই বল, হাউ পসিবল?

সপ্তায় দু’দিন খাসির মাংস খায় তুমি জানলে কী করে? তোমাকে নেমন্তন্ন করে নাকি?

আমাকে নেমন্তন্ন করবে কেন, আমি কি তোদের পেয়ারের লোক?

তুমি কি তবে খাসির মাংসের দোকান দিয়েছ, না কি রাঁধুনির চাকরি নিয়েছ?

এই তো তোদের দোষ; নগ্ন সত্য সহ্য করতে পারিস না। আসলে এত দিন পাওয়ারে থেকে তোদের ক্রিটিসিজম সহ্য করার ক্ষমতাটা একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। ইমিডিয়েট কিছু দিন তোদের পাওয়ারের বাইরে থাকা দরকার।

অরণ্য চায়ে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, একদম ন্যায্য কথা বলেছ, আমাদের পার্টির সবাই মনেপ্রাণে এটা বিশ্বাস করি। কিন্তু আমাদের কেউ সরাতে না পারলে কী করব বলো? এ তো ফুটবল খেলা নয় যে, সেমসাইড গোল করে দেব। তা তুমি একটা কাজ করো না, সামনের ইলেকশনে আমাদের হটাবার একটা ব্যবস্থা করো—গণতন্ত্র তো তোমাকে সেই ক্ষমতা দিয়েছে।

অতীন সেন বলল, তুই তো জানিস, এই ছ্যাবলামির গণতন্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই; আমি ভোট দিতে যাই না।

গণতন্ত্রে বিশ্বাস নেই বলে যাও না, না কি রোদ্দুরে লাইনে দাঁড়াবার ভয়ে যাও না?

মুখটা একটু থমথমে হয়ে গেল অতীন সেনের। হাতের কাগজটা ভাঁজ করে বেঞ্চে আছড়ে ফেলে দিয়ে বলল, তোরা জেগে ঘুমাচ্ছিস, তবে জেনে রাখ, ইতিহাস তোদের ক্ষমা করবে না।

অরণ্য হাসতে হাসতে বলল, সে তখন দেখা যাবে, আপাতত তুমি ক্ষমা করে দাও, তা হলেই হবে।

সাত

আপনি কি অ্যান্টি কমিউনিস্ট?

কেন বলুন তো?

না, আপনি গণসঙ্গীতের ওপর এত খাপ্পা!

আপনার ধারণাটা ভুল, আমি গণসঙ্গীতের ওপর মোটেই খাপ্পা নই, বরং অ্যাডমায়ারার বলতে পারেন।

তাহলে গাইতে রাজি হলেন না কেন?

তার কিছু কারণ তো অবশ্যই আছে।

সেই জন্যেই তো বলছি; গণসঙ্গীত জিনিসটা কিন্তু অচ্ছুত কিছু নয়, গেয়ে একবার দেখতে পারতেন। তার পর নিতান্ত গা ঘিনঘিন করলে একটু গোবর খেয়ে গঙ্গাজলে কুলকুচো করে নিলেই হত।

রাগ দেখাতে গিয়েও হেসে ফেলল তমালিকা। অরণ্যের দিকে তাকাল। তার চোখে-মুখেও সামান্য কৌতুকের ছোঁয়া। তমালিকা বলল, আমার তো মনে হয় আপনি নিজে অ্যান্টি কমিউনিস্ট।

অরণ্য আঁতকে উঠে কানে আঙুল চাপা দিয়ে বলল, তোবা, তোবা, শোনাও পাপ! আমি আজীবন একটা কমিউনিস্ট কানট্রির স্বপ্ন দেখি, যেটা হবে আমার কৈশোরের লীলাক্ষেত্র, যৌবনের উপবন আর বার্ধক্যের বারাণসী।

তমালিকা বলল, আমি জানি আপনি কোন দেশের স্বপ্ন দেখেন, তবে আপনার স্বপ্নটার একটু কারেকশন দরকার; ওই দেশটা হবে তোলাবাজদের উপবন আর প্রাোমোটারদের লীলাক্ষেত্র।

আপনি কি সি আই এ-র এজেন্ট?

এখনও পর্যন্ত হইনি, কিন্তু প্রবল ইচ্ছা আছে। কীভাবে হওয়া যায় বলুন তো?

আমার জানা নেই, তবে সন্ধান পেলে আপনাকে অবশ্যই জানাব। কিন্তু তার আগে বলুন আমাকে অ্যান্টি-কমিউনিস্ট ঠাওরালেন কেন?

ওই যে, একটু আগে আপনি গণসঙ্গীত নিয়ে মশকরা করলেন।

কখন? অরণ্য সত্যিই অবাক হল এবার।

এই তো বললেন, গণসঙ্গীত গেয়ে গোবর খেয়ে নিলে গা-ঘিনঘিনে ভাব কেটে যাবে—তার মানে আপনিও গণসঙ্গীতকে খুব গুরুত্ব দেন না এবং বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাও নেই। সেই জন্যেই এটাকে নিয়ে মশকরা করছেন। আপনি হয় অ্যান্টি কমিউনিস্ট, আর নয়তো ছদ্ম কমিউনিস্ট।

অরণ্য তাড়াহুড়ো করে বলে, সত্যি বলছি, অন গড, আই অ্যাম হাইলি রেসপেক্টফুল টু গণসঙ্গীত; এ একেবারে আমার প্রাণের জিনিস। এবং আমি মনেপ্রাণে কমিউনিস্ট।

বাবা, তাই না কি! কেমন কমিউনিস্ট আপনি! ঈশ্বরের নাম নিচ্ছেন?

অরণ্য একটু সিরিয়াস হওয়ার ভান করল। বলল, দেখুন, একেবারে নির্ভেজাল খাঁটি কমিউনিস্ট বলে কিছু হয় না। আর হলেও জানবেন তারা গুড ফর নাথিং। সোনায় যেমন খাদ মেশালে তবে গয়না হয়, তেমনি যে কমিউনিস্টের মধ্যে কিছুটা ভেজাল আছে, সে-ই হচ্ছে প্রকৃত মানুষ।

আচ্ছা, মাপকাঠিটা কী?

কীসের মাপকাঠি?

ভেজালের। মানে, কতটা ভেজাল থাকলে প্রকৃত মানুষ হয় তার মাপটা কেমন এবং সেটা কে ঠিক করে?

অ্যাকচুয়ালি, সেটা তো…

দেশ এবং যুগের প্রেক্ষিতে বদলে যায়, তাই তো? মাঝপথেই বলে উঠল তমালিকা।

এগজ্যাক্টলি।

হুঁ, বোঝা গেল?

কী বোঝা গেল?

সামান্য ভেজাল সহযোগে আপনি একজন খাঁটি মানুষ।

এই তো, বুঝতে পেরেছেন দেখছি। ফিচেল একটা হাসি হেসে বলল অরণ্য।

আর একটা জিনিস বোঝা গেল।

বলে ফেলুন তাড়াতাড়ি।

লোকে কত নির্লজ্জভাবে নিজের ঢাক নিজে পেটাতে পারে।

ছোট একটা হাই তুলে অরণ্য বলল, কী করব বলুন, আমার ঢাক যদি আর কেউ পিটিয়ে না দেয় তো কাজটা আমাকেই করতে হয়।

আপনার ঢাক আপনি না-ফাঁসা পর্যন্ত বাজিয়ে যান, কিন্তু আমাকে কেন ডাকলেন তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন।

জঙ্গলসুফি সুকান্ত পার্কে একটা সিমেন্টের বেঞ্চে বসে আছে অরণ্য। সামনে দাঁড়িয়ে তমালিকা। এক দিকে দু’জনের সাইকেল দুটো বেশ শান্তিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। দুপুরবেলা পার্কে লোকজন বিশেষ নেই। উলটো দিকে একটা র‌্যাগ-পিকার মাথায় বস্তা দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমচ্ছে। সামনে গড়াচ্ছে মদের খালি বোতল, মাটির ভাঁড় আর এঁটো শালপাতার টুকরো। দূরে এক কোণে গোল হয়ে বসে তাস খেলছে একদল লোক।

বেঞ্চের একপাশে একটু সরে গিয়ে অরণ্য বলল, দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন না এখানে।

একটু বিরক্তি ফুটে উঠল তমালিকার গলায়। বলল, এখানে দাঁড়িয়েও আপনার কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি, যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন।

আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? মাথা গরম করলে আমার কথা বুঝতে পারবেন না।

আপনার কথা বোঝার তেমন আগ্রহ আমার আপাতত নেই, আমার কাজ আছে—চললাম।

এভাবে যাবেন না, অ্যাকসিডেন্ট হবে।

মানে! তমালিকা একটু বিস্মিত হয়ে জিগ্যেস করে।

গরম মেজাজ নিয়ে সাইকেল চালালে অ্যাকসিডেন্ট হবে।

না হবে না, কারণ সাইকেল আমি ভালোই চালাতে পারি। তমালিকা বেশ জোরের সঙ্গে বলল।

সে জানি, তবে বড্ড জোরে চালান।

তাই নাকি! আপনি জানলেন কী করে?

সে দিন আপনাকে দেখলাম বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছেন প্রচণ্ড জোরে সাইকেল চালিয়ে।

কবে বলুন তো?

বোধহয় শুক্রবার।

ও হ্যাঁ, সেদিন একটু লেট করে ফেলেছিলাম।

কোথায় যাচ্ছিলেন?

আপনার কৌতূহলটা একটু অতিরিক্ত রকমের বেশি।

ও সরি, আমি ক্যাজুয়ালি জিগ্যেস করেছিলাম, আপনার গোপন কোনও অভিসার-টভিসার থাকলে বলার দরকার নেই।

আপনার কৌতূহল শুধু বেশি নয়, আপনার পরিমিতিবোধ অত্যন্ত কম। আমি আপনাকে বলতে বাধ্য নই, কিন্তু তবুও বলছি, সেদিন কলকাতায় যাচ্ছিলাম গান শিখতে। কোনও অপরিচিত মেয়ের সঙ্গে ভবিষ্যতে আর এভাবে কথা বলবেন না।

দক্ষ রাজনীতিকের মতো আক্রমণটা পাশ কাটিয়ে গেল অরণ্য। বলল, আপনি আমার একেবারেই অপরিচিত নন। সেদিন তো জমাটি আলাপ ছিল শুভমদার হোমে। তাছাড়া বহু দিন আগে থেকেই আমি আপনাকে চিনি। আমাকে ছাত্র সংগঠনের কাজে রানিবালা কলেজে প্রায়ই যেতে হত, সেখানে আপনাকে দেখেছি।

তমালিকা বলল, হোমওয়ার্ক এত দুর্বল হলে ভালো নেতা হওয়া যায় না—আমি আদৌ রানিবালা কলেজে পড়িনি, কলেজ-ইউনিভারসিটির পড়াশুনো কলকাতায় হস্টেলে থেকে করেছি।

মিসফায়ার হয়ে গেছে বুঝতে পারে অরণ্য। খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। বলে, ও, তা হলে আপনার মতো দেখতে অন্য কাউকে দেখেছি…

তাহলে আপনি এখন কার সঙ্গে কথা বলতে চান ঠিক করে বলুন—আমার সঙ্গে, না রানিবালা কলেজে পড়া আমার মতো দেখতে মেয়েটার সঙ্গে?

অরণ্য বলে, অবশ্যই আপনার সঙ্গে।

তা হলে দেরি না করে প্রযোজনটা বলে ফেলুন, নেতাদের কাজকর্ম না থাকতে পারে, কিন্তু আপামর জনসাধারণকে কিছু কাজ করতেই হয়।

আমি তো বলতেই যাচ্ছি, আপনিই মাঝখান থেকে অন্য প্রসঙ্গ এনে ফেলছেন। যাক, গণসঙ্গীত নিয়ে যা বলছিলাম সেটা আগে বলি—আপনি যদি গণসঙ্গীত মন দিয়ে শোনেন, দেখবেন শ্রমজীবী মানুষ, খাঁটি মানুষের কথা এখানে বলা আছে।

ঠিক বুঝলাম না।

না বোঝার কিছু নেই, সিম্পল। এই ধরুন চাষি, কামার, কুমোর, জেলে, কলকারখানার মজুর—এরাই তো রিয়েল হিউম্যান বিয়িং। এদের স্বপ্নের কথা, বঞ্চনার কথা, লড়াইয়ের কথা নিয়েই গণসঙ্গীত।

তমালিকা বলল, আচ্ছা কিছু মনে করবেন না, আপনার বাবা কী করেন?

অরণ্য বেশ অবাক হয়ে তমালিকার দিকে তাকাল। বলল, কেন বলুন তো?

বলুন না, দরকার আছে।

স্কুল টিচার ছিলেন, রিটায়ার করেছেন। অরণ্যের চোখেমুখে তখনও বিস্ময়।

আমার বাবা একটা প্রাইভেট ফার্মের টাইপিস্ট ছিলেন।

আরও একটু অবাক হল অরণ্য। বলল, তাতে কী হল?

তমালিকার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। বলল, আপনি বলতে চান, আপনার বাবা আমার বাবা, এরা প্রকৃত মানুষ নন।

আমি কি সে কথা বললাম?

সরাসরি হয়তো বলেননি, কিন্তু যা বলেছেন তার মানে করলে মোটের ওপর এ রকমই দাঁড়ায় যে, মুটে-মজুররাই খাঁটি মানুষ, অন্যরা নয়।

অরণ্যের চোখ-মুখ একটু সিরিয়াস হয়ে যায়। আচ্ছা ফাজিল মেয়ে তো! কথার প্যাঁচে ফেলতে ওস্তাদ। এই হচ্ছে সেই প্রজাতির মেয়ে ডেভিলস স্ক্রিপচার যাদের ঠোঁটের ডগায়। অরণ্য ঠিক করল তমালিকাকে খুব সহজে ছাড়বে না। বলল, দেখুন, একজন শিক্ষক বা ব্যাঙ্ক-কেরানি আট-দশ হাজার টাকা মাইনে পায়— মানে তিনশো টাকা রোজ। ছুটি-ছাটা ধরলে ওটা পাঁচশো হবে। ঘন্টা পাঁচ-ছয় ডিউটি করে তারা। অথচ এমন বহু লেবার আছে যারা দিনে আট-দশ ঘন্টা কাজ করে মাত্র পঞ্চাশ-ষাট টাকা পায়। একজন সেনসিবল মানুষ হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, এটা একটা মস্ত ইনজাস্টিস।

বুঝলাম, কিন্তু এটার জন্যে তো ওই শিক্ষক বা কেরানি দায়ী নয়।

হয়তো ডিরেক্টলি নয়, কিন্তু আমরা কেউই পুরোপুরি দায় এড়াতে পারি না। আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু ডিউটি আছে।

তমালিকা বলল, গণসঙ্গীত গাওয়া সেই ডিউটিগুলোর মধ্যে একটা— তাই তো?

অরণ্য হেসে ফেলল। বলল, ধরুন তাই। তবে সবাইকে শ্রমিকদরদি হতে হবে এমন কোনও কথা নেই; তা ছাড়া পুঁজিবাদীদেরও তো কিছু বন্ধু দরকার।

তমালিকা গম্ভীর গলায় বলল, শুনুন, আমি আর যা-ই হই না কেন পুঁজিবাদী নই। আমার প্রবলেমটা না শুনেই আপনি আমাকে দোষ দিচ্ছেন।

সেটা শুনব বলেই তো আপনাকে ডেকেছি; আপনি বলছেন কোথায়।

প্রথমত, আমি মেনলি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখি, গণসঙ্গীত কোনওদিন গাইনি। যে-গান নিজে কোনওদিন গাইনি সেটা রাতারাতি তুলে অন্যদের কতটা শেখাতে পারব, সে ব্যাপারে আমার নিজেরই সন্দেহ ছিল। তা ছাড়া সে দিন আপনার বলার ভঙ্গিটা আমার ভালো লাগেনি, মনে হল যেন হুকুম করছেন।

সো সরি! আসলে আমি ঠিক ওভাবে বলতে চাইনি। জানেনই তো, দিনরাত হাটে-বাজারে নানা রকম মানুষের মোকাবিলা করতে হয়, সব সময় ভয়েসের টোন-টিউনিং ঠিক থাকে না। প্লিজ ভুলে যান ব্যাপারটা।

তমালিকা বলে, আমি ভুলে গেছি, এত সামান্য ব্যাপার আমি বেশি দিন মনে রাখি না।

তা হলে যাচ্ছেন তো?

কোথায়?

মিটিং-এ। মিনিস্টার যেদিন…

আমি যাব কেন? আমার তো কোনও পাবলিসিটির দরকার নেই।

ওহ, আপনার সঙ্গে কথা বলা মুশকিল। এদিকে বলছেন সামান্য ব্যাপার মনে রাখেননি, আবার কবে ক্যাজুয়ালি কী বলেছি সেটা ধরে বসে আছেন।

ও, তা হলে হোমের পাবলিসিটির ব্যাপারটা সেদিন ক্যাজুয়ালি বলেছিলেন।

যা: বাবা! আপনি তো দেখছি মহা ঝগড়ুটে মেয়ে।

লজিককে যদি আপনার ঝগড়া মনে হয় তো তাই।

তবে আপনি জেদি খুব।

হয়তো। এটা আমি আমার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছি।

আপনার মা তো….

মারা গেছেন; ক্যানসার হয়েছিল। আমার বাবা…

জানি; নিরুদ্দেশ।

তখন আমার মাত্র দু’বছর বয়েস। তারপর থেকে মা একা একা সবকিছু সামলেছেন। আমার এক জেঠু থাকেন দিল্লিতে—বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তিনি একটু এড়িয়েই চলতেন আমাদের, পাছে দায়িত্ব নিতে হয়। মায়ের তখন শেষ অবস্থা, পাড়া-প্রতিবেশী অনেকে বলেছিল জেঠুকে খবর দিতে— মা রাজি হননি। শেষের দিকে মা কথা বলতে পারতেন না, লিখে সব কথা জানাতেন। সেই খাতাটা এখনও আমার কাছে আছে; তাতে সবচেয়ে বেশি বার যে-কথাটা লেখা আছে সেটা হল— দিল্লিতে খবর দিবি না। ফলে বুঝতেই পারছেন।

তাস খেলায় কিছু গণ্ডগোল হয়েছে মনে হয়। জোর চিৎকার করছে খেলুড়েরা। চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেছে কাগজকুড়ুনি ছেলেটার। উঠে বসে এদিকে-ওদিকে তাকাচ্ছে। দাড়িতে একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে অরণ্য বলল, ও কে, আর ঝগড়া নয়। আমরা বন্ধু হয়ে গেলাম।

পার্কের ঝাঁকড়া বকুল গাছটায় এই অসময়ে একটানা ডেকে চলেছে একটা কোকিল। চুপচাপ সে দিকে তাকিয়ে থাকে তমালিকা।

তমালিকা কোনও কথা বলছে না দেখে অরণ্য বলে, আপনি শান্তি প্রস্তাব মানছেন তো?

আমি তো যুদ্ধ ঘোষণা করিনি। আমার সঙ্গে কারও কোনও বিরোধ নেই।

তাহলে ওই দিন আসছেন?

কেন, আমাকে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার চান্স করে দেবেন না কি?

অরণ্য সোজা হয়ে বসল। বলল, আপনি গাইবেন? আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি।

কিন্তু তাতে আপনাদের স্টেজ অপবিত্র হয়ে যাবে না? তখন হয়তো হোয়াং হো বা ভল্গা নদীর জল এনে ছিটিয়ে দিতে হবে।

ওহ, আপনি দেখছি বুশের মতো যুদ্ধবাজ, পায়ে পা তুলে ঝগড়া করেন। আপনি হয়তো জানেন না, রবীন্দ্রনাথকে আমরা গ্রহণ করেছি; নতুন করে মূল্যায়ণ করা হচ্ছে ওঁর।

চোখে-মুখে একটা বিস্ময়ের ভঙ্গি ফুটিয়ে তুলে তমালিকা বলে, কী ভাগ্য!

কার?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। প্রকৃত সমঝদারেরা এবার তাঁর দিকে কৃপাদৃষ্টি দিয়েছেন। এটাই ওঁর অ্যাসিড টেস্ট। আমার কী মনে হয় জানেন?

কী?

পদক চোর খুব বুঝদার মানুষ। সে জানে আসল জায়গা থেকে স্বীকৃতি না পেয়েই রবীন্দ্রনাথ নোবেল প্রাইজ পেয়ে গিয়েছিলেন; এই নোবেলে খাদ আছে—সেই জন্যেই সে সরিয়ে ফেলেছে পদকটা।

অরণ্য বুঝতে পারে এ বড় শক্ত ঘাঁটি। একটু অসাবধান হলেই একেবারে শুইয়ে দিচ্ছে। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে লাগায় অরণ্য। কিন্তু দেশলাই বের করতে গিয়ে মুশকিলে পড়ে। খুঁজে পাচ্ছে না দেশলাইটা। এ পকেট-সে পকেট হাতড়ায়। বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দেওয়া এখন খুব দরকার। অথচ মোক্ষম সময়ে দেশলাইটা বিট্রে করল। নিজেকে আস্ত একটা স্টুপিড বলে মনে হয় তখন।

আট

সকাল থেকে মুডটা ড্যাম্প হয়ে আছে অরণ্যের। আজ ইভনিং শোয়ে তাকে একটা সিনেমা দেখতে হবে। দেবদাস। শ্রীদুর্গা টকিজে চলছে। ঐশ্বর‌্যা রাই তার ফেভারিট নায়িকা আর দেবদাস তো রীতিমতো হিট ছবি। সমস্যা হল সিনেমাটা দেখতে হবে শবরীর সঙ্গে।

অরণ্যের মনে একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব আছে, সে যে-কোনও জিনিসের মধ্যে সৌন্দর্য খুঁজে নিতে পারে। ন্যুব্জ বৃদ্ধা, স্থূলকায়া রমণী, বলিরেখা অঙ্কিত বৃদ্ধ, কাঁচা ড্রেন, কানা বেগুন কিংবা অস্থিচর্মসার উট—সবকিছুর মধ্যে নিহিত সৌন্দর্যটুকু তার চোখে ধরা পড়ে। কেবল শবরীর বেলায় সে পুরোপুরি ডিফিটেড। শবরীর উঁচু দাঁত বা চাপা নাক কোনও সমস্যাই নয়। তার নান্দনিকবোধ এত ঠুনকো নয় যে এই সব তুচ্ছ কারণে শবরীকে কুৎসিত মনে হবে। তবে কি ওর চোখের খর দৃষ্টি বা পুরুষ মানুষের মতো ভাবভঙ্গি ধাক্কা দিচ্ছে? অরণ্য তলিয়ে দেখেছে, তাও নয়। উপরন্তু শবরীর ইতিবাচক দিকও কিছু কম নয়। প্রথমেই বলতে হয় শরীরটার কথা। আঁটোসাঁটো ভরন্ত একটা শরীর আছে শবরীর। ওর শরীরের চমৎকার বাঁধুনি যে-কোনও পুরুষ মানুষকে টলিয়ে দিতে পারে। ইন ফ্যাক্ট, এই মধ্য তিরিশেও যে দু’চারজন একরোখা প্রেমিক নাছোড়বান্দার মতো ওর পেছনে ঘুরঘুর করে, তার অন্যতম কারণ ওই আগুনে শরীর।

এই শবরীর সঙ্গে অরণ্যের একটা প্রণয়ঘটিত সম্পর্ক আছে। বেশ কিছুদিন ধরে ঘুষঘুষে জ্বরের মতো ব্যাপারটা চলছে। পার্টির লোকজন সবাই জানে একদিন অরণ্য আর শবরীর বিয়ে হবে। এ জন্যে কয়েকজন ক্যাডার অরণ্যকে ঈর্ষাও করে; কারণ শবরীর আর একটা প্লাস পয়েন্ট ওর চাকরি। একটি প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা করে সে। এসব বাদ দিলেও আরও একটা ব্যাপার থাকে—শবরী বিকাশ চৌধুরীর খুবই স্নেহধন্যা। ওর বায়োডেটায় এটা কোহিনুরের মতো জ্বলজ্বল করে।

ওদের প্রেমে অবনীই ঘটকালি করেছে। প্রেমে সাধারণত ঘটক-টটকের বালাই থাকে না, কিন্তু অরণ্য-শবরীর সম্পর্কটা ঘটক ছাড়া ঠিক জমত না। একদিন অবনী পার্টি অফিসে অরণ্যকে ডেকে বলল, এই হচ্ছে শবরী, আমাদের মহিলা সমিতির নেত্রী; খুবই ডেডিকেটেড—বুঝলি তো।

শবরী হাত তুলে নমস্কার করল। পার্টির মিটিং বা সম্মেলনে আগে শবরীকে দেখেছে অরণ্য। দায়সারাভাবে হাত দুটো বুকের কাছে জড়ো করে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনাকে তো চিনি।

শবরী বলল, আমিও আপনাকে চিনি, রসিদপুর স্কুলে সম্মেলনের দিন ঠিক আপনার পেছনে বসেছিলাম; মনে নেই আপনার?

চেষ্টা করেও অরণ্য মনে করতে পারল না। তবু বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে, আমার ঠিক পেছনেই আপনি বসেছিলেন।

ঠিক পেছনে নয়, একটা রো পরে।

ওই আর কী। অরণ্য ক্যাবলার মতো একটু হাসে।

অবনী বলল, জানিস তো, জঙ্গলসুফির মহিলা সমিতির সংগঠন অত্যন্ত উইক। লোকাল কমিটি থেকে শবরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এখানকার সংগঠনকে চাঙ্গা করে তোলার। এখন তোকে একটা কাজ করতে হবে অরণ্য। ওর তো এলাকাটা খুব ভালো চেনা নেই—তুই একটু ওর সঙ্গে থাকিস।

অরণ্য কাটাবার চেষ্টা করল, না, মানে আমি ঠিক…

আরে ফালতু হেজিটেট করছিস। অবনী বলল, সঙ্গে থাকবি, কয়েকটা বাড়িতে গিয়ে ইনট্রোডিউস করিয়ে দিবি। ব্যস, তারপর বাকি যা করার ও-ই করবে।

তারপর থেকে নিয়মিত জঙ্গলসুফিতে আসে শবরী। অরণ্যকে অনেক সময় ওর সঙ্গে থাকতে হয়। অরণ্য লক্ষ করেছে, মেয়েটা একটু বেশি বকবক করে; আর অপরিসীম কৌতূহল। একা পেলেই অরণ্যকে প্রশ্নবাণে অতিষ্ঠ করে তোলে। বাড়িতে কে কে আছে, ভাড়া বাড়িতে থাকে না নিজেদের বাড়ি, অরণ্য ভবিষ্যতে কী করবে বলে ভাবছে ইত্যাদি। কিছুদিন পর থেকেই শবরী দু’একটা ইঙ্গিত দিতে শুরু করল। একদিন বলল, নীল জামাটা পরলে আপনাকে দারুণ হ্যান্ডসাম দেখায়।

পর দিন থেকে নীল জামা পরা বন্ধ করল অরণ্য।

কয়েক দিন পর শবরী বলল, আপনি সেই নীল জামাটা আর পরেন না কেন?

অরণ্য বলল, জামাটা হারিয়ে গেছে।

শবরী বলল, ওমা, জামা হারায় কী করে!

অরণ্য বলল, হারানোর কি কোনও গ্রামার আছে শবরীদেবী?

শবরী রাগ দেখায়—আপনি কিন্তু ভীষণ প্রাচীনপন্থী, এখনও ‘আপনি-আজ্ঞে’ ছাড়তে পারলেন না, তাও আবার শবরীদেবী। কেন, শুধু ‘শবরী’ বলে ডাকতে পারেন না?

অরণ্য মাথা চুলকোয়। বলে, আসলে ছেলেবেলার অভ্যেস তো, গুরুজনদের ‘আপনি-আজ্ঞে’ করে বলি।

আমি আপনার গুরুজন না কি, শবরী বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলে, আমি বয়েসে আপনার থেকে ছোটই হব।

অরণ্য বলে, সে তো বটেই।

তাহলে, এবার থেকে কিন্তু ‘তুমি’ বলতে হবে।

অরণ্য বলে, এভাবে দুম করে হবে না, ধীরে ধীরে অভ্যেস হয়ে যাবে।

কিছুদিন পরে বমাল ধরা পড়ল অরণ্য। সে বিডিও অফিসে গিয়েছিল; সেখানে শবরীর মুখোমুখি। শবরী বলল, এই তো নীল জামাটা পরেছেন। তবে যে সেদিন বললেন হারিয়ে গেছে।

অরণ্য স্মার্টলি বলল, গেছেই তো।

তা হলে এটা?

বেপরোয়া হেসে অরণ্য বলল, এটা আমার ভাইয়ের জামা; দুজনে একই লংক্লথ থেকে করিয়েছিলাম তো।

আর একদিন শবরী বলল, এমন ঝুমসি দাড়ি রেখেছেন কেন বলুন তো? আমি একদম দাড়ি সহ্য করতে পারি না।

অরণ্য দাড়ি চুলকোতে চুলকোতে বলে, আমিও সহ্য করতে পারি না।

তবে রেখেছেন কেন, কেটে ফেলুন।

আসলে আমার স্কিনে একটু প্রবলেম আছে, দাড়ি কাটলেই র‌্যাশ বেরোয়।

শবরী বলল, তা হলে ডাক্তার দেখাচ্ছেন না কেন? আমার সঙ্গে বড় একজন স্কিন স্পেশালিস্টের জানাশোনা আছে; চলুন একদিন আপনাকে দেখিয়ে দেব।

এই রকম চোর-পুলিশ খেলা চলছিল। একদিন অবনী অরণ্যকে ধরল। বলল, তোর কথা শবরী বলছিল।

অরণ্য একটু ঘাবড়ে গেল। বলল, কেন, আমি তো ওর সঙ্গে যথেষ্ট কো-অপারেট করছি!

না, না, সেসব ঠিক আছে; তোর খুবই সুখ্যাতি করছিল। বলল, তোর মতো সিনসিয়ার ভালো ছেলে হয় না।

অ! ধাতস্থ হল অরণ্য।

তারপর আরও দু’একটা হাবিজাবি কথার পর অবনী বলল, আসলে হয়েছে কী জানিস, শবরী তোর পার্সোনালিটিতে রীতিমতো চার্মড। কিন্তু লাজুক মেয়ে তো, মুখ ফুটে কিছু…

বিপদ ঘনিয়ে আসছে দেখে অরণ্য মনেমনে শঙ্কিত হয়। বলে, আসলে আমার কাজ ও অনেক ইজি করে দিয়েছে। ও তো খুবই অভিজ্ঞ, দিদির মতো আমাকে গাইড করে।

অবনী হেসে ফেলল। বলল, দিদি কী রে! দেখো কাণ্ড!

কেন, প্রবলেমটা কোথায়?

দূর, তোর কবে বুদ্ধিসুদ্ধি হবে! ও তো ফেঁসে গেছে রে। বলল, তুইও না কি ইন্টারেস্টেড।

অরণ্য বেশ জোরেই বলে উঠল, বাজে কথা, একদম বাজে কথা। আমার কোনও টান নেই। চলো, তোমার সামনে আমি ওর সঙ্গে কথা বলব।

অবনী বলে, মাথা গরম করছিস কেন? একসঙ্গে কাজ করতে গেলে অমন একটু-আধটু হতেই পারে।

আমার কিছু হয়নি। কেটে কেটে বলল অরণ্য।

অবনী বলল, তুই কি অন্য কোথাও ফেঁসে বসে আছিস নাকি?

না, না, আমার কোথাও কিছু নেই।

তাহলে তোর এত আপত্তি কেন, অবনী বিস্মিত হয়ে বলল, শবরী তো মেয়ে হিসেবে খারাপ নয়! সরকারি চাকরি করে, এমন চমৎকার ফিগার; জানিস তো, ওর হাই কানেকশন। বিকাশ চৌধুরী নিজের হাতে ওকে তৈরি করেছে। বিয়ে তো শেষ পর্যন্ত একটা মেয়েছেলেকেই করবি, না কি? তা পার্টির মেয়েকে করলে তো সব দিক থেকেই ভালো।

‘হাই কানেকশন’ আর ‘বিকাশ চৌধুরী’ কথা দুটো মাথার মধ্যে বসে গেল অরণ্যের। অর্চন তখন ফেঁসে গেছে। অরণ্য বেশ জানত, অবনী যতই ত্রাতার ভূমিকা নিচ্ছে বলে দাবি করুক আসল লোক বিকাশ চৌধুরী। বিকাশ চৌধুরী দাপুটে এম এল এ। চিফ মিনিস্টারের সঙ্গে না কি বেশ ভালো র‌্যাপো আছে। নেক্সট ইলেকশনে জিতলে মিনিস্ট্রিতে ঢুকবে।

তারপর থেকে স্টান্সটা একটু বদলে ফেলল অরণ্য। শবরীর কাছ থেকে আভাস ইঙ্গিত পেলে এমনভাবে হাসত বা উত্তর দিত যার অনেকগুলো অর্থ হয়।

আজকাল পার্টির কাজ ছাড়াও অরণ্যকে বাড়তি সময় দিতে হচ্ছে। শবরীর সঙ্গে মাঝেমধ্যে সিনেমা দেখা, মার্কেটিং-এ যাওয়া, রেস্তোরাঁয় খাওয়া—মেনে নিতে হচ্ছে। পাঁচন-খাওয়া মুখ করে চালিয়ে যাচ্ছে অরণ্য এবং আশায় আছে, একদিন শবরীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য সে আর্কিমিডিসের মতো হঠাৎ আবিষ্কার করে ‘ইউরেকা’, ‘ইউরেকা’ বলে চিৎকার জুড়ে দেবে।

জঙ্গলসুফি হাইস্কুল মোড়ে দাঁড়িয়ে বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে অরণ্য। স্কুল বিল্ডিং-এর দেওয়ালে হোয়াইট ওয়াশ করা হয়ে গেছে একসপ্তা। গড়িমসি করে লেখা হয়ে ওঠেনি। কাল জোর ঝাড় দিয়েছে অবনী। বলল, কবে আর লিখবি—অনুষ্ঠান মিটে গেলে? তোর যদি সময় না থাকে তো বলে দে, আমি অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছি।

চেক চেক লুঙ্গির ওপর নস্যি রঙের একটা গেঞ্জি পরে নারকোল মালায় রং গুলছে চিন্ময়। উলোঝুলো একটা পাগল রাস্তার ধারে একমনে মাটির ভাঁড় আর প্লাস্টিকের কাপ নিয়ে সাজাচ্ছে। সাদা-নেভিব্লু স্কুল ইউনিফর্ম পরা দুটো ছেলে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে দেওয়াল লিখন দেখছে। ড্যাম্প মেজাজ শুকনো করতে সিগারেটের জুড়ি নেই। পকেট থেকে সিগারেট বের করে অরণ্য। চিন্ময় আড়চোখে দেখে বলে, একস্ট্রা আছে নাকি গুরু একটা?

অরণ্য একটা মৃদু ধমক দিতে গিয়েও থমকে গেল। বলাই স্যার আসছেন। নোংরা ধুতি-পাঞ্জাবি, অতি শীর্ণ চেহারা, চিমসে যাওয়া চোখমুখ। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে পড়াতেন স্যার, সেই হিসেবে অরণ্যের মাস্টারমশাই। অরণ্য তাড়াতাড়ি পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল সিগারেটের প্যাকেটটা।

চিন্ময় বলল, কী হল গুরু, না থাকলে দিতে হবে না; দুটান দিও, তাহলেই হবে…।

অরণ্য ইশারায় বলাইস্যারকে দেখাল।

চিন্ময় ফিসফিস করে বলল, সত্যি স্যাড ব্যাপার, মালটা মনে হচ্ছে শেষ পর্যন্ত পাগলই হয়ে যাবে।

অরণ্য দেখল, নিজের মনে বিড়বিড় করছেন বলাই স্যার। স্যারের ছেলে তীর্থঙ্কর একসময় ছিল অবনীর ডান-হাত। লকলকে যুবক। প্রচণ্ড পরিশ্রমী, বক্তৃতা দিত অদ্ভুত ভালো। জঙ্গলসুফিতে পার্টির কোমরের জোর একার চেষ্টায় অনেকটা এনে দিয়েছিল সে।

তীর্থ তখন ইয়াং জেনারেশনের আইডল। কত মেয়ে তীর্থদার জন্যে পাগল। তীর্থ সেসব পাত্তা দিত না। পার্টি তখনও পাওয়ারে আসেনি; সবাই নিশ্চিত ছিল পাওয়ারে এলে তীর্থ অনেক ওপরে উঠবে। কিন্তু তার আগেই খুন হয়ে গেল তীর্থ। কেষ্ট, রাধু আর শ্যামলালকে স্পটে দেখা গিয়েছিল। মানিক মোদক ইনফ্লুয়েন্স করে চাপা দেয় ব্যাপারটা।

সেই সময় অবনী নাকি শপথ নিয়েছিল পার্টি পাওয়ারে এলে এর একটা বিহিত করবেই। সাতাত্তরে পার্টি পাওয়ারে এল। বলাই স্যার খুব আশা করেছিলেন, ছেলের খুনিরা এবার শাস্তি পাবে। কিন্তু কেষ্ট রাধুরা তে’রাত্তির পোয়াতে না পোয়াতে দলবদল করল। তারা এখন অবনীর সঙ্গে। কেষ্ট জঙ্গলসুফি ব্লক অফিসে চাকরি করে, রাধু রাতারাতি পেটমোটা হয়ে যাওয়া প্রাোমোটার। পার্টি অফিসের দোতলাটা ও-ই করে দিয়েছে।

বলাইস্যার বহুদিন আশায় থেকে যখন বুঝলেন অবনী শপথ ভুলে গেছে, তখন মানিক মোদকের দলে যোগ দিলেন। এই আশায়, আবার কোনওদিন দান ওলটালে কেষ্ট রাধুরা শাস্তি পাবে। নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! মানিক মোদক, যে কিনা শেলটার দিয়েছিল তাঁর ছেলের খুনিদের, সেই মানিক মোদকের সঙ্গে একই শ্লোগানে গলা মেলাতেন বলাইস্যার। চিরকালের নির্বিরোধী বলাই স্যার সভা সমাবেশে যেতেন, মিছিলে হাঁটতেন। ধীরে ধীরে আরও রোগা হয়ে গেলেন বলাইস্যার। কাঠি কাঠি রোগা হাত তুলে শ্লোগান দিতেন, গলার শির ফুলে উঠত; বড় করুণ লাগত স্যারকে। কিন্তু দান আর ওলটাল না; অবনীর পার্টি দিন দিন আরও শক্ত হয়ে গেড়ে বসল। একটার পর একটা নির্বাচন যায়, আরও বিপুল মার্জিনে জেতে অবনীর দল, আরও কুঁজো হয়ে পড়েন বলাই স্যার। ইদানীং একটু যেন এলোমেলো হয়ে গেছেন; কথাবার্তা খুব কম বলেন, রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে থাকেন উদভ্রান্তের মতো।

কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে পড়েছেন বলাইস্যার। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন দেয়ালের দিকে। একটু অস্বস্তি বোধ করতে থাকে অরণ্য। কেন কে জানে, আজকাল বলাইস্যারকে দেখলে কেমন যেন একটু অপরাধবোধ হয় অরণ্যর। সে ঘাড় শক্ত করে তাকিয়ে থাকে দেওয়ালের দিকে। এখনও দেওয়াল সাদা। একটু পরেই অক্ষর ফুটে উঠবে। অরণ্য খুব করে চাইছে তার আগেই এখান থেকে চলে যাক বলাইস্যার।

চিন্ময় ফিসফিস করে বলল, কী দশা দেখেছ মালটার।

অরণ্য কড়া চোখের চাউনিতে ধমক দিল একটা। তারপর আড়চোখে তাকিয়ে দেখল, স্যার তার দিকেই তাকিয়ে আছেন। অস্বস্তিটা আরও বাড়তে থাকে অরণ্যর।

পাগলটা হঠাৎ একটা মাটির ভাঁড় ছুড়ে দেয় এদিকে। বলাইস্যার একবার তাকান পাগলটার দিকে, তারপর হাঁটতে থাকেন ফের।

একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে অরণ্য। বলাইস্যার মোড়ের মাথায় অদৃশ্য হয়ে যেতে সিগারেটটা বের করে ধরায়। তারপর বলাইস্যারের চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার জন্যে একটু হালকা গলায় চিন্ময়কে বলে, তোর সেই চুমকির কী সংবাদ রে?

রং গুলতে গুলতে থেমে গেল চিন্ময়। বলল, কে চুমকি?

সেই যে রে, সরকার বাড়ির মেয়েটা, যে তোকে দানাদার খাইয়েছিল।

চুমকি নয় তো, ঝিংকি।

ওই হল—তা কত দূর এগোলি?

চিন্ময় একটু লজ্জা পায়। বলে, এক দিন রূপছবি হলে গ্যাঁড়াকল দেখতে গেসলুম আর এক দিন নিরালায় খেলুম।

বাহ, গুড! ভালো প্রাোগ্রেস। হাতটাত ধরেছিস?

একদিন ধরেছিলাম।

আরিব্বাস, তুই তো বস লোক আছিস রে।

চিন্ময় কাঁচুমাচু মুখ করে বলে, কিন্তু হাতটা ধরতে গিয়েই তো শালা ফেঁসে গেলুম।

কেন চড় মারল?

না, না। হাতটা ধরে কী বলব ঠিক করতে না পেরে বললুম তোমার আঙুলগুলো কী সুন্দর। তখন শালা বলল কিনা আংটি পরলে আরও সুন্দর দেখায়, আমার আংটিটা হারিয়ে গেছে, একটা আংটি করিয়ে দিও তো।

দিয়েছিস না কি?

না এখনও দিইনি। দর করেছিলুম, সোনার আংটির শালা বহুত দাম।

অরণ্য বলল, তোর কি এই বয়েসে সুইসাইড করার ইচ্ছে আছে?

চিন্ময় অবাক হয়ে বলল, সুইসাইড! খামোখা সুইসাইড করতে যাব কেন? এখনও বিয়েই করলুম না…

তাহলে আর ও রাস্তা মাড়াস না। কিছুদিন পরে হয় তোকে সুইসাইড করতে হবে, আর নয়তো তোবড়ানো বাটি হাতে ট্রেনে ট্রেনে ভিক্ষে করতে হবে।

চিন্ময় পাংশু মুখ করে রং গুলতে থাকে। হঠাং রংটা দেখে চমকে ওঠে অরণ্য। বলে, সর্বনাশ, সবুজ রং তোকে কে আনতে বলল?

চিন্ময় বলল, আমি ব্লু চেয়েছিলাম, পরেশদা শালা সবুজ দিয়ে দিয়েছে।

অরণ্য খিঁচিয়ে ওঠে, তুই গুলে ফেললি কেন? ফেরত দিয়ে দিতাম।

আবার কে ফেরত দেয়, গুলেছি যখন মেরে দাও।

মেরে দাও! মুখ ভেঙচে অরণ্য বলে, আমাদের লেখায় সবুজ রং দেখলে অবনীদা খচে ফায়ার হয়ে যাবে।

তাহলে শুধু লাল রং দিয়ে লিখে দাও।

এই জন্যেই তোকে গান্ডু বলি। এক কালারে লেখা হয়, শেড দেব কীসে?

চিন্ময় মাথা নাড়ে, তাই তো, ঠিক কথা। কী হবে এখন?

অরণ্য বলে, একটা কাজ কর; সবুজের সঙ্গে লাল মিশিয়ে দে, নতুন একটা কালার পাওয়া যাবে।

সবুজের মধ্যে লাল রং ঢেলে তুলি দিয়ে নাড়তে থকে চিন্ময়—নাড়তে নাড়তে মিটমিট করে হাসে। অরণ্য বলে, হাসছিস কেন?

লাল আর সবুজ কেমন মিশে যাচ্ছে দেখো!

অরণ্য বলে, তাই তো দেখছি।

ঠিক যেন আমাদের অবনীদা আর মানিক মোদক।

তোকে কে বলল?

গট-আপ কেস চাপা থাকে না গুরু; এবার রাস্তার ইট আসছে মোদক-ভাটা থেকে—এদিকে বিভাসদা তো হেবি খচে গেছে। শুনছি বিকাশ চৌধুরীর কানে তুলেছে কথাটা।

অরণ্য বলল, জেলায় মুখ শোঁকাশুঁকি চলছে, কলকাতায় চলছে, আর অবনীদা করলেই দোষ!

দেশটাই শালা পচে গেছে; সবাই শালা ধান্দায় চলে।

অরণ্য বলে, নেতা থেকে শুরু করে তোর ঝিংকি পর্যন্ত— কী বলিস?

চিন্ময় একটু করুণ হাসে। তার পর রঙের মালাটার দিকে তাকিয়ে বলে, দেখ মাইরি, একদম নতুন কালার হয়ে গেছে।

*

‘সম্মেলন’—এর ময়ে ময়েটা অরণ্য যখন বেশ কায়দা করে পাকাচ্ছে চিন্ময় বলল, ওই দেখো গুরু, আসছে।

লেখা থেকে চোখ না সরিয়ে অরণ্য বলল, কে?

তোমার ইয়ে।

ঝট করে রাস্তার দিকে একবার তাকিয়ে অরণ্য দেখল শবরী সেদিকেই আসছে। দাঁতে দাঁত চেপে অরণ্য বলল, ওর গায়ে লেখা আছে না কি রে গান্ডু আমার ইয়ে।

চিন্ময় দাঁত বের করে হেসে বলে, সবাই তো তাই জানে বস।

সবাই কারা?

নেতারা জানে, ক্যাডাররা জানে, এমনকী পার্টির ঝান্ডাগুলো পর্যন্ত জানে শবরীদির সঙ্গে তোমার আছে।

অরণ্যর খুব ইচ্ছে করছিল চিন্ময়ের পিছনে একটা লাথি কষাতে। কিন্তু শবরী কাছাকাছি চলে এসেছে। ইচ্ছেটাকে দমন করল অরণ্য। শবরী হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকল।

ইদানীং বেশ সাজগোজ করে শবরী। আজও খুব চড়া একটা শাড়ি পরেছে; পুরু ঠোঁটে গরগরে লিপস্টিক। রং-তুলিটা চিন্ময়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেল অরণ্য।

দেওয়ালের লেখাটা দেখতে দেখতে শবরী বলল, তোমার কত দেরি?

দেরি আছে; কেন? অরণ্যের চোখে জিজ্ঞাসা।

এক বার দেউলপুরে যাব; একটু চলো না আমার সঙ্গে।

অরণ্য বলল, এখন কী করে যাব? আজকে শেষ করতেই হবে, আর সময় নেই।

মুখটা একটু থোম্বা করে শবরী বলল, থাক তাহলে; বিকেলবেলা কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে যাবে। তুমি বড্ড দেরি করো।

অরণ্য ঘাড় নাড়ল। আড়চোখে চিন্ময়ের দিকে তাকিয়ে দেখল রাসকেলটা হাঁ-করে তাদের কথা গিলছে।

শবরী ফের বলল, আমি এখন আসছি; কোথায় দাঁড়াবে মনে আছে তো?

অরণ্য পেছন ফিরে হাঁটতে হাঁটতে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে আছে।

আর এক বার শুনে যাও, প্লি-ই-জ। একটু আদুরে গলায় ডাকল শবরী।

বিরক্তি ফুটে উঠল অরণ্যের মুখে। এগিয়ে গিয়ে বলল, কী হল আবার?

আজ কিন্তু আমরা রেস্টুরেন্টে খেয়ে ফিরব; তুমি বাড়িতে বলে যেও।

চিন্ময়ের হাত থেকে রং তুলি নিয়ে দেওয়ালের সামনে দাঁড়াল অরণ্য। চিন্ময়টা শয়তানের মতো মিটমিট করে হাসছে। পাগলটা এখনও বসে আছে সংসার সাজিয়ে। হাঁ, করে অরণ্যকে দেখছে।

নয়

তমালিকা হোমের গেট দিয়ে ঢুকতেই তাপসী ছুটে এল, আন্টি, তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে।

প্রথমে ঠিক ছিল সপ্তায় তিন দিন আসবে তমালিকা। সোম, বুধ আর শুক্র। কিন্তু ক্রমশ হোমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে সে। এখন সময় পেলেই চলে আসে। সকালে একটা টিউশনি ধরেছিল। বাচ্চা একটা মেয়েকে বাড়ি গিয়ে গান শেখাত। বেশি দূরে নয়; বাগানগোড়ে। মাসতিনেক গিয়েছিল তমালিকা। বাচ্চাটির মা চাকরি করে কলকাতায়। সকালবেলা বেরিয়ে যায়। কিছুদিন পর থেকেই ভদ্রমহিলার স্বামী বড় বেশি কেয়ার নিতে শুরু করল তমালিকার। একদিন সরাসরি প্রস্তাব দিল। চলুন না একটা নাটক-টাটক দেখে আসি।

পর দিন থেকে আর যায়নি তমালিকা।

হোমে এলে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয় তমালিকার। কত অভাব, অসংখ্য সমস্যা, তবু এ সবের মধ্যেই কোথাও একটা বয়ে যায় আনন্দের স্রোত। সবাই এত ‘আন্টি’ ‘আন্টি’ করে যে, তমালিকার মনে হয় সে ওদেরই একজন।

তার আর একটা আকর্ষণ শুভমদা। মানুষটিকে যত দেখছে তত অবাক হয়ে যাচ্ছে। সব সময় শান্ত সমাহিত। বাইরে কত রটনা শুভমদাকে নিয়ে, কত কুৎসা। সেসব হেলায় উপেক্ষা করেন শুভমদা। সবাইকে খুব স্পষ্ট দ্বিধাহীন গলায় বলেন, আমার বাবার পরিচয় আমি জানি না। একটা মোবাইল নিয়েছেন শুভমদা। এক দিন মোবাইলে ফোন করে তমালিকা শিউরে উঠেছিল; শুভমদা কলার টিউন পছন্দ করেছেন ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ গানটা।

তমালিকা তাপসীকে বলল, কী কথা?

এখানে বলা যাবে না, একটু আলাদা বলতে হবে।

চারপাশ দেখে তমালিকা বলল, তোর বন্ধুরা কোথায়?

তনুজা পড়ছে আর পাপড়ি প্র্যাক্টিক্যাল খাতায় সাইন করাতে স্যারের বাড়ি গেছে।

তোর পড়াশোনা নেই? সামনে টেস্ট!

উত্তর না দিয়ে মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে থাকে তাপসী। এই মেয়েটি অনেক দিন হোমে আছে। ওর মায়ের বাবু ওর মা-কে বিয়ে করে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেছে। তার বাড়ির লোকজনও ওর মা-কে মেনে নিয়েছে, কিন্তু তাপসীকে নিতে রাজি হয়নি। মা এসে মাঝেমাঝে দেখে যায় ওকে।

তমালিকা আপাদমস্তক লক্ষ করল তাপসীকে। মেয়েটাকে ভারী মিষ্টি দেখতে হয়েছে। লম্বায় প্রায় তমালিকার মাথায়। পরনে একটা সাধারণ ছিটের সালোয়ার; মুখে এতটুকু প্রসাধন নেই। তবু সেসব দীনতা হেলায় তুচ্ছ করে লাবণ্য উপচে পড়ছে। তমালিকা ফের বলল, কী রে, চুপ করে আছিস কেন?

তাপসী খুব মৃদু স্বরে বলে, ভালো লাগছে না পড়তে—সেই জন্যেই তো তোমাকে খুঁজছি।

তমালিকা বলল, ঠিক আছে, পার্কে যাই চল; তুই শুভমদার কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে আয়।

বিকেলবেলা জমজম করছে পার্কটা। দোলনা ঘিরে বাচ্চাদের ভিড়; স্লিপে চড়ে হড়কে নামছে একদল ছেলেমেয়ে। ধারে ধারে গোল হয়ে বসে গল্পগুজব করছে মায়েরা। একপাশে ক্রিকেট খেলছে একদল ছেলে।

একটা ফাঁকা বেঞ্চে পাশাপাশি বসল তমালিকা আর তাপসী। তমালিকা বলল, বল কী বলবি।

 বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে তাপসী। তার পর নখ খুঁটতে খুঁটতে বলে, আমি একটা অন্যায় করে ফেলেছি।

তমালিকা বলল, সে তো বুঝতেই পারছি।

আবার চুপ করে বসে একমনে নখ খোঁটে তাপসী। তমালিকা তাড়া দেয়, কী হল বল!

চারপাশ একবার ভালো করে দেখে নিল তাপসী। তার পর বলল, একটা ছেলে…।

এটুকু বলেই চুপ করে গেল। তমালিকা বলল, বুঝতে পেরেছি। কী নাম ছেলেটার?

শ্যামল। খুব মৃদু স্বরে বলল তাপসী।

বাড়ি কোথায়, কী করে?

দেউলপুরে বাড়ি।

কী করে?

টিউশনি করে আর এলআইসি-এর এজেন্ট। তুমি বিশ্বাস করো আন্টি, আমি প্রথমে রাজি হইনি; কিন্তু সব সময় ফলো করত— বন্ধুদের হাত দিয়ে চিঠি দিত…

আর তুইও সোনামুখ করে চিঠিগুলো নিয়ে নিতিস। তমালিকা একটু কঠিন স্বরে বলল।

না গো, সত্যি বলছি, আমি প্রথম প্রথম নিতে চাইতাম না।

তমালিকা বলল, তখন আমাকে বলিসনি কেন?

তাপসী চুপ করে থাকে। দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে চোখ থেকে।

তমালিকা বলে, ছেলেটা তোর মায়ের কথা জানে?

তাপসী মাথা নাড়ে,—হ্যাঁ।

শুনে কী বলল?

বলেছে এসব ও পরোয়া করে না।

প্রথম অমন সব ছেলেই বলে। ওর বাড়ির লোকজন জানে?

কী?

তোর মায়ের কথা।

তাপসী মাথা নাড়ল, জানি না।

খানিকক্ষণ গুম হয়ে বসে থাকল তমালিকা। পাশে চুপচাপ বসে তাপসী। মাঝেমাঝে নাক টানছে। সামনে দিয়ে ছেলের বউয়ের নিন্দে করতে করতে হেঁটে গেল দুটো বুড়ো। তমালিকা বলল, শেষ পর্যন্ত থাকবে তো; না কি ঘোর কেটে গেলে দু’দিন পর কেটে পড়বে?

তাপসী বলে ওঠে, না, না, ও সে রকম নয়।

ওহ, এর মধ্যেই তো একেবারে গলে পড়েছিস দেখছি! শুভমদা জানেন?

না, আঙ্কেলকে কিছু বলিনি।

বলিসনি কেন?

আমার খুব ভয় করছে। তুমি এখন আঙ্কেলকে কিছু বোলো না।

তমালিকা বলল, তা বললে তো হয় না, ব্যাপারটা শুভমদারও জানা দরকার—ঠিক আছে, তোকে বেশি ভাবতে হবে না; তুই পড়াশোনায় মন দে, সামনে পরীক্ষা।

দু’জনে চুপ করে বসে থাকে। দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে দিনটা। একটু একটু করে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে পার্কটা। হিম নামছে, বেশ ঠান্ডা ভাব বাতাসে। হঠাৎ চমকে উঠল তমালিকা—এই বেঞ্চটাতেই সেদিন বসেছিল অরণ্য আর ওই সামনেটায় দাঁড়িয়েছিল সে নিজে।

হোমে যখন ঢুকল তখন বেল পড়ে গেছে। ডাইনিং হলে খেতে বসেছে সবাই। বালতি হাতে পরিবেশন করছে শুভম আর তনুজা। ওরা ঢুকতেই শুভম বলল, এত দেরি কেন তমালিকা, আমার চিন্তা হচ্ছিল।

তমালিকা মৃদু হেসে এড়িয়ে গেল প্রশ্নটা। বলল, আজ মেনু কী?

বীণা বলল, রুটি আর আলু-কপির তরকারি।

তমালিকা বলল, কী কপি।

শুভম বলল, ফুলকপি; চালতাতলার একজন চাষি কুড়িটা ফুলকপি পাঠিয়ে দিয়েছে।

পাপড়ি বলল, আজ তুমি আমাদের সঙ্গে খেয়ে নাও।

তমালিকা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। বলল, না, না, আমি এখুনি বাড়ি চলে যাব।

শুভম বলে, টিফিন করে তার পর যাবে।

সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে, আন্টি, আজ তুমি আমাদের সঙ্গে খাবে…

একটু হেসে একপাশে বসে পড়ল তমালিকা। শুভম বলল, আজ অরণ্য বলে সেই ছেলেটা এসেছিল।

নামটা কানে যেতেই বুকের মধ্যে কোথাও যেন জলপ্রপাত আছড়ে পড়ার শব্দ শুনতে পেল তমালিকা। কানে বেজে উঠল সেই গমগমে ভরাট কন্ঠস্বর। তমালিকা বলল, কেন?

গানের প্রস্তুতি কেমন চলছে দেখতে এসেছিল। তোমার খোঁজও করছিল।

তমালিকার বুকের মধ্যে কী ভীষণ তোলপাড়! মাথা হেঁট করে খাওয়ার ভান করছে। মুখ তুলতে ভয় করছে তার। মনে হচ্ছে, তার মুখ দেখেই সবাই বুঝে যাবে। মুখ না তুলেই সে বলল, আমার খোঁজ করছিল! কেন, হঠাৎ?

তা তো জানি না; মনে হয় এমনিই। সে দিন তুমি অমন ফার্মলি প্রটেস্ট করেছিলে তো, তাই মনে আছে তোমার কথা।

এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা নিশ্বাসটা ধীরে ধীরে ফেলল তমালিকা।

হঠাৎ দেখল এক কোণে সুদীপ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তমালিকা বলল, সুদীপ কাঁদছে কেন?

তনুজা বলল, ওর মা এসেছিল, চলে গেছে।

তমালিকা উঠে গিয়ে সুদীপের পাশে বসে, এ মা, এখানে তো মায়েরা থাকে না। দেখ আর কেউ কাঁদেনি।

সুদীপ বলে, আমার ভালো লাগছে না। মায়ের কাছে যাব।

তমালিকা সুদীপের পিঠে হাত বোলায়। বলে, কাঁদলে কিন্তু সবাই বোকা বলবে।

সুদীপ তমালিকার বুকে মাথা গুঁজে দেয় আর কান্নায় ফুলে ফুলে ওঠে।

মনের মধ্যে বিষণ্ণতার একটা প্রলেপ পড়ে তমালিকার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *