এসো আমার সঙ্গে – ১

এক

ফটফটে জ্যোৎস্নায় কাউকে কালো পোশাক পরতে দেখলে মাথায় খুন চড়ে যায় অরণ্যের। নির্ভেজাল স্টুপিড মনে হয় লোকটাকে। হতভাগা জানে না চাঁদের আলোয় সাদা রং ছাড়া কিছু পরতে নেই। অরণ্য নিশ্চিত হয়ে যায় এ ব্যাটা চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খায়, সামান্য মেঘ করলে বা বৃষ্টি এলেই বাস-ট্রেনের জানলার শাটার ফেলে দেয় আর বসন্তের সন্ধেবেলা যখন বিউটিফুল একটা হাওয়া দেয় আর আমবউলের গন্ধে চারপাশ মাত হয়ে থাকে, তখন লুঙ্গি পরে খাটে বসে পা নাচাতে নাচাতে টিভি সিরিয়াল দেখে।

চিন্ময়ের পরনে কালো জিনসের প্যান্ট আর কালো টি-র্শাট। দু’পাশে ধানের খেত, আর মাঝখানের সাদা আল-রাস্তা ধুয়ে যাচ্ছে জ্যোৎস্নায়।

এই অঞ্চলে এখন চাষের জমি বাড়ন্ত। বিদ্যাসাগর সেতুটা হওয়ার পর কলকাতা শহর হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছে এখানে। বদলে গেছে এলাকার ভূগোল; মানুষের চলনবলন। জমির দাম তুড়িলাফ মারছে। চাষের জমিতে ফ্লাই-অ্যাশ ঢেলে ফেলে রাখছে কিছুদিন; তারপর ময়দানবের মতো প্রমোটাররা হাঁকিয়ে ফেলছে ঝকঝকে ফ্ল্যাটবাড়ি।

ক’বছর আগেও গ্রামে জালের মতো ছড়িয়ে ছিল মাটির রাস্তা। এখন সেগুলোর ওপর হয় লাল বাঁকুড়া-মাটি নয় কালো পিচের আস্তর।

জ্যোৎস্নায় সাদা মাটির রাস্তা দিয়ে হাঁটলে অরণ্যের অতীত-ভবিষ্যৎ মুছে যায়। চারপাশে জেগে ওঠে আদিম পৃথিবী। তাই পাড়ার ভেতর দিয়ে শর্ট-কাট রাস্তায় না গিয়ে এই আলপথ ধরেছে। কিন্তু পেতনির মতো কালো পোশাক পরে জ্যোৎস্না, মেঠো পথ, অরণ্যময় পৃথিবী সবকিছু চটকে দিয়েছে চিন্ময়। খুন সম্ভব নয়, নিদেনপক্ষে ছেলেটাকে একটা চড় কষাতে পারলে মনটা একটু শান্ত হয়। অরণ্য ডাকল, চিন্ময়।

চলতে চলতেই চিন্ময় বলল, হুঁ, কী বলছ?

তোর আর অন্য জামা নেই?

চিন্ময় একটু অবাক হয়,—হ্যাঁ আছে তো। কেন?

অরণ্য বলে, না এমনি বলছিলাম, তোকে সব সময় দেখি কালো ড্রেস পরে ঘুরিস।

আমার দুটো জিনসের প্যান্ট, দুটোই কালো; আর জামা বা গেঞ্জি আমি একটু ডিপ কালারের পরি, কাচাকুচির ঝামেলা কমে যায়।

অরণ্য বলে, এ বার একটা সাদা জামা-প্যান্ট কিনে ফেল। রাতে পরবি। রাত্তিরে কালো পোশাক পরলে পেট গরম হয়।

থমকে দাঁড়াল চিন্ময়। বলল, দূর, ফালতু কথা।

হ্যাঁ রে, অমিতদা বলছিল।

কোন অমিতদা?

লোকাল কমিটির অমিতদা—ও নাকি চিনের কোন একটা ম্যাগাজিনে পড়েছে; গবেষণা করে বের করেছে চিনা বিজ্ঞানীরা।

চিন্ময় একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে অরণ্যের দিকে। কথাটা বিশ্বাস করবে কি না ঠিক করতে পারছে না। আসলে ছেলেটা একটু সরল প্রকৃতির, সোজাসাপটা বললে মাথামোটা। পার্টির কাজে ভূতের মতো পরিশ্রম করে—পোস্টার মারে, ঝান্ডা টাঙায়, মিটিং মিছিলে লোক টানে, ইলেকশনের সময় খুচরো ঝামেলা লাগলে আস্তিন গুটিয়ে তেড়ে যায়।

চিন্ময়ের কাছে পার্টির দাদাদের কথা বাপ-মা’র চেয়ে বেশি। একেবারে নির্ভেজাল পার্টিজান ছেলে। কিন্তু অরণ্য জানে, পার্টি করে চিন্ময় কোনও দিন চাকরি বাগাতে পারবে না, এমনকী হোলটাইমার হওয়াও ওর বরাতে নেই। ওর খামতির লিস্টটাও খুব ছোট নয়। মাইক্রোফোনের সামনে তোতলায়, নিকারাগুয়ার প্রেসিডেন্টের নাম ভুলে যায় কিংবা পার্টির কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তই যে সঠিক সেটা নিখুঁত যুক্তিজাল বিছিয়ে প্রমাণ করতে পারে না। চিন্ময়ের বড়জোর আকাঙ্ক্ষা রাস্তার ধারে সরকারি জমিতে একটা পানগুমটি দেবে। সেই জন্যেই জান-কবুল করে লেগে আছে।

পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল অরণ্য। সময় নষ্ট না করে চিন্ময় হাত বাড়িয়ে দিল প্যাকেটটার দিকে।

আলের ওপর দাঁড়িয়ে দুজনে সিগারেট টানে। অরণ্য চিন্ময়ের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়াল। ওর কালো পোশাকটা আর চোখকে জ্বালাতন করছে না। কিন্তু গামবাটটা কানস্ট্যান্ট বকে যাচ্ছে—মোহনবাগানের ব্যারেটোকে ছেড়ে দেওয়া উচিত হয়নি, সৌরভের মতো ক্যাপ্টেন ইন্ডিয়া আর পাবে না, দাম যেভাবে বাড়ছে পিঁয়াজ খাওয়া ছেড়ে দিতে হবে—এই সব হাবিজাবি কথা। অরণ্য ‘হুঁ’ ‘হাঁ’ দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ লাইন বদলে চিন্ময় বলল, অরণ্যদা, তুমি ঝিংকিকে চেনো?

সিগারেটে একটা বড় টান দিয়েছিল অরণ্য; ধোঁয়াটা তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিয়ে বলল, কোন ঝিংকি?

সরকার বাড়ির ঝিংকি?

অরণ্য বলে, চিনি হয়তো, এই মুহূর্তে নামটা ঠিক…কার মেয়ে বল তো?

ওর বাবার নাম হারাধন সরকার, বড়বাজারের মশলার দালাল।

দেখতে কেমন?

বেঁটেখাটো, মাথায় টাক আছে।

সে কী রে, শেষ পর্যন্ত টেকো মেয়ে তোর নজরে পড়ল?

যা: শালা, ঝিংকির টাক হতে যাবে কেন! আমি ভাবলুম ওর বাবার কথা বলছ। ঝিংকিকে হেভি দেখতে। চোখগুলো টানা-টানা, গায়ের রং ফিট ফরসা।

অরণ্যের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল। বলল, তা ঝিংকি কী বলছে, পার্টিতে আসতে চায়?

না, না।

তাহলে, চাকরি চায়?

না, না।

লোন-টোন বের করে দিতে বলছে?

না, না।

কী ‘না’ ‘না’ করছিস তখন থেকে! তবে তোকে বিয়ে করতে চায় না কি—ঝেড়ে কাশ না বাপ!

হঠাৎ যেন একটু লজ্জা পেয়ে গেল চিন্ময়। সিগারেটে ছোট একটা টান দিয়ে বলল, তেমন কিছু নয়; সে দিন ওদের বাড়ির দেওয়ালে লিখছিলুম—তেষ্টা পেয়েছিল, জল চাইলুম; দিল। সঙ্গে দুটো দানাদার। মেয়েটাকে আগে দেখেছিলুম, সে দিন আলাপ হল; বেশ মিশুকে মেয়ে, অনেক কথা বলল…

সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে ধোঁয়াটা ভেতরে কিছুক্ষণ ধরে রাখল অরণ্য। তার পর ধোঁয়া ছেড়ে বলল, বেশ রসাল ছিল, না শুকনো?

কী, ঝিংকির কথাগুলো?

দূর শালা, দানাদারগুলো।

ক্যাবলার মতো দাঁত বের করে একটু হাসল চিন্ময়। তারপর বলল, তুমি না মাইরি খালি ইয়ার্কি করো। শোনো না—রাতের দিকে কখন ফ্রি থাকো বলো তো; যাব একদিন; অনেক কথা আছে তোমার সঙ্গে।

সিগারেটটা ধানখেতে ছুড়ে ফেলে দেয় অরণ্য। তাড়া দেয় চিন্ময়কে। বলে, চল এবার, দেরি হয়ে যাবে।

এবার চিন্ময়কে পেছনে ফেলে আগে আগে চলল অরণ্য। অক্টোবরের শেষ; বাতাসে হিম ভাব। কোনও বাতিকগ্রস্ত চাষি, যে চাষ না করলে হাঁফিয়ে উঠবে, সে পক্ষীশাবকের মতো আগলে রেখেছে এই জমিটুকু। খুব শিগগিরি এটাও হয়তো গায়েব হয়ে যাবে। মায়াভরে জমিটার দিয়ে তাকাল অরণ্য। ধানগাছে শিষ এসে গেছে। বেশ গর্বিত ভঙ্গিতে মাথা উঁচিয়ে হিম মাখছে গাছগুলো।

পেছন থেকে চিন্ময় জিগ্যেস করে, ক’টা বাজে বলো তো?

খুব প্রয়োজন ছাড়া অরণ্য ঘড়ি পরে না। কেমন যেন একটা বন্ধন বলে মনে হয়—মনে হয় অলক্ষে কেউ একজন তর্জনী উঁচিয়ে সবসময় কিছু একটা নির্দেশ দিচ্ছে। একটু যেন পরাধীন লাগে নিজেকে। বাড়িতে পুরোনো মডেলের একটা এইচ এম টি ঘড়ি আছে, খুব দরকারে সেটা পকেটে রেখে দেয়। চলতে চলতেই অরণ্য বলল, আমার কাছে ঘড়ি নেই; তুই পরিসনি কেন?

আমারটার শালা ব্যাটারি শেষ।

অটোমেটিক ঘড়ি পরিস কেন?

কাঁটাওয়ালা ঘড়ি এখন দাদুরা পরে; ব্যাটারি দেওয়া ঘড়িই এখন চলছে—দম দেওয়ার ঝামেলা নেই।

ঝামেলার জন্যে, না কি কাঁটাওলা ঘড়ি দেখতে জানিস না?

কেন জানব না!

বল তো ছোট কাঁটাটা তিন আর চারের মাঝখানে আর বড় কাঁটাটা…

অরণ্যের কথা শেষ হওয়ার আগেই চিন্ময় বেশ জোরে বলে ওঠে, তোমার না শালা সবেতে ইয়ার্কি! তাড়াতাড়ি পা চালাও—এরকম পোয়াতি মেয়েছেলের মতো হাঁটলে মিটিং শেষ হয়ে যাবে। অবনীদা পই পই করে বলে দিয়েছে….

চিন্ময়কে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে অরণ্য বলে, অবনীদা নিজে ক’টা মিটিঙে ঠিক সময়ে ঢোকে রে?

অবনীদার কথা আলাদা—হেভি ব্যস্ত; শুনছি আরও বড় পোস্ট পাবে।

তা হলে তো আর কথা নেই—আগে আধ ঘণ্টা লেট করত, এ বার এক ঘণ্টা হয়ে গেল।

হঠাৎ চিন্ময় বলে ওঠে, অবনীদা সে দিন অর্চনের কথা বলছিল।

কী বলছিল? ভেতরে ভেতরে কঠিন হয়ে পড়ে অরণ্য।

বলছিল, পুলিশের ওপর মহল থেকে আবার না কি চাপ আসছে; অবনীদা ঠেকিয়ে রেখেছে কোনওরকমে।

কবে বলল?

এই তো, কবে যেন—তিন-চার দিন আগে। কোথা দিয়ে যে কী হয়ে গেল—না হলে অর্চনের মতো ভালো ছেলে….

হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল অরণ্য।

চিন্ময় একটু অবাক হয়ে বলল, কী হল, দাঁড়ালে যে!

অরণ্য বলল, এত সব বলল অবনীদা?

হ্যাঁ, বলল তো!

চাঁদের আলোয় অরণ্য সোজা তাকাল চিন্ময়ের দিকে। একটু যেন ধক করে জ্বলে উঠল চোখ দুটো। খুব আস্তে করে কেটে কেটে বলল, অর্চন কিন্তু মার্ডারটা করেনি; আমি সিওর।

দুই

পৃথিবীতে ছানা জিনিসটাকে সবচেয়ে অপছন্দ করে তমালিকা, আর পছন্দ করে ফাঁকা রাস্তায় সাইকেল চালাতে। মন খারাপ বা টেনশন হলে ফাঁকা রাস্তায় সাইকেল চালায় তমালিকা। চোখেমুখে হাওয়ার ঝাপটা লাগে, মনের ন্যাতানো ভাবটা উবে যায়; শরীরটা বেশ হালকা লাগে।

তমালিকা জানে সে সুন্দর। একটু লম্বাটে মুখের গড়ন, টানা-টানা চোখ, পাতলা নাক। কালবৈশাখীর ঝেঁপে আসা মেঘের মতো চুলের ঢাল। কাঠচাঁপা রঙের উজ্জ্বল ত্বক; এমনকী চিবুকের তিলটাও মারাত্মক নিখুঁত জায়গায়।

তমালিকার মায়ের চেহারা নেহাতই চলনসই। মাজা মাজা গায়ের রং, সাদামাঠা চোখ-নাক। তমালিকার বাবা নাকি রূপবান পুরুষ ছিলেন।

তমালিকা মাঝেমাঝে ভাবে বাবার সঙ্গে বেশ এক বার দেখা হয়! কী করবে তখন সে? খুব রাগ দেখাবে, না কি অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নেবে? বাবার জন্যে তার বুকের কোথাও একটা টলটলে জায়গা আছে। ছোট্ট একটা ঢিল পড়লেই সেটা চলকে ওঠে।

তমালিকার দু’বছর বয়েস থেকে বাবা নিরুদ্দেশ। খুব আবছা স্মৃতিতেও বাবার ছবি ওর মনে ধরা পড়ে না। কেউ যখন তমালিকাকে সুন্দর বলে তখন ওর বাবার কথা মনে পড়ে যায়।

মা পারতপক্ষে বাবার কথা তুলত না। মা ছিল নিরাবেগ এক রোবট—হাসে না, কাঁদে না, এমনকী কঠিন শীতল দৃষ্টি ছাড়া রাগের কোনও বহি:প্রকাশ নেই। সকালে টিউশনি, দুপুরে একটা কিন্ডারগার্টেনে পড়ানো, বিকেলে ফের টিউশনি—সবই নিয়ম মেনে যন্ত্রের মতো।

মা তমালিকাকে কোনওদিন মারেনি, আবার হামলে আদরও করেনি। স্কুলে বন্ধুরা যখন তাদের মায়ের গল্প করত—মা কেমন করে আদর করে, আবার রেগে গিয়ে চুলের ঝুঁটি নেড়ে দেয় তখন বুকের মধ্যে কোথাও যেন একটা সূচিমুখ দংশন টের পেত তমালিকা। মনে হত, কেন বাবা চলে গেল। আর বাবা চলে গেছে বলেই মা এই রকম। একদিন মাকে জিগ্যেস করেছিল, মা বাবার কোনও ছবি নেই?

মা বলেছিল, কেন?

না, এমনি। তমালিকা মৃদুস্বরে বলল।

কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল মা। তারপর বলল, বাবাকে তোর দেখতে ইচ্ছে করে?

হ্যাঁ, করে তো।

কিন্তু তার তো তোকে দেখতে ইচ্ছে করে না! ধাতব-কঠিন হয়ে উঠেছিল মায়ের কন্ঠস্বর।

আজ সকালে ছানা খাওয়া নিয়ে মাসিমণির সঙ্গে এক চোট হয়ে গেছে। রেওয়াজে বসেছিল তমালিকা। দেখল, মাসিমণি প্লেটে করে বড় একটা সাদা মণ্ড রেখে গেল সামনে। দেখেই গা-টা গুলিয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি রেওয়াজটা শেষ করে উঠে পড়ে তমালিকা। ড্রেস চেঞ্জ করে। প্রতিমা এসে দেখে ছানায় পিঁপড়ে লেগেছে। গম্ভীর মুখে বলল, তোমার ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলবে?

ফ্যাস ফ্যাস করে বডি-স্প্রে লাগাতে লাগাতে তমালিকা বলল, ব্যাপার আবার কী! আমি এখন একটু পিয়ালীদের বাড়ি যাব।

কিন্তু ছানাটার কী হবে?

ওড়নাটা ঠিক করতে করতে তমালিকা বলল, তা আমি কী জানি!

তুমি খাবে না?

না।

তা হলে নষ্ট হবে জিনিসটা?

নষ্ট হবে কেন, তুমি খেয়ে নাও না।

আর তুমি কী খাবে, আমার মাথা?

তা খেতেই পারি; কিন্তু একটু শ্যাম্পু করে নিও, বড্ড তেলচিটে গন্ধ তোমার মাথায়।

কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তমালিকার দিকে তাকিয়ে থাকল প্রতিমা। তারপর বলল, তোমার দুধে গ্যাস হয়, ছানা মুখে রোচে না, চেহারাটা একবার আয়নায় দেখেছ? তুমি কি আমাকে একটুও শান্তি দেবে না?

বলতে বলতে গলাটা ধরে আসে প্রতিমার।

তমালিকা আর দাঁড়ায়নি। তাড়াতাড়ি সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল।

মেন রোড ছেড়ে এই ফাঁকা মাঠটার দিকে চলে এসেছে তমালিকা। পিয়ালীদের বাড়ি যাওয়ার আগে মনটাকে একটু ঝরঝরে করে নিতে হবে। ছোটবেলায় যখন জঙ্গলসুফি বেড়াতে আসত তখন একদম অন্য রকম ছিল জায়গাটা। খুব শান্ত—চারপাশে উধাও মাঠ আর নিবিড় গাছপালা। রোদ-হাওয়ার কেমন দাপাদাপি। এই ক’বছরে কত বদল হয়েছে—চারদিকে বাড়ির জঙ্গল আর গিজগিজে লোক। কারখানাও হয়েছে কয়েকটা। দক্ষিণ দিকের এই মাঠটুকুই শুধু ফাঁকা—কিছু চাষবাস হয়।

এখন সকালের দিকে একটু ঠান্ডা ভাব থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোদ্দুরের ঝাঁঝ বাড়ছে। অল্প ঘাম হচ্ছে তমালিকার। ক’টা বাজল কে জানে! তাড়াহুড়োতে ঘড়িটা পরতে ভুলে গেছে।

পিয়ালীদের উঠোনে সাইকেল স্ট্যান্ড করল তমালিকা। দাঁড়ের চন্দনাটা ডেকে উঠল, ‘কে এল’ ‘কে এল’।

পিয়ালীদের বাড়িটা খুব পুরোনো। একটু প্রাচীন ধাঁচের। উঁচু বুক সমান রক, জানলা দরজার মাথায় গোল খিলান, জানলায় মোটা মোটা লোহার গরাদ। হাজার লোকের ভিড়ের মধ্যে অভিজাত মানুষ যেমন নজর টানে-বাড়িটাও তেমনি।

পিয়ালীর মা রান্নাঘরে ছিলেন। বেরিয়ে এলেন। হাতে একটা পত্রিকা, ঘামে-ভেজা চুল লেপ্টে আছে কপালে। একটু হেসে বললেন, কী রে, অনেক দিন পর; কেমন আছিস?

ভালো; পিয়ালী কোথায় মাসিমা?

ওপরে, শুয়ে আছে বোধহয়।

বাবা, এখনও শুয়ে আছে!

ওর কথা আর বলিস না; সময় পেলেই ঘুমিয়ে নেয়। কোথাও যাওয়ার কথা আছে নাকি রে?

তমালিকা বলল, অরুণোদয় হোমে একজন ড্রয়িং টিচার লাগবে; আমি শুভমদাকে পিয়ালীর কথা বলেছি। শুভমদা ওকে নিয়ে যেতে বলেছেন।

দেখ, ভুলে গেছে বোধহয়—যা ভুলোমন—শোন, তুই একটু বসে যাবি, নতুন একটা রেসিপি বানিয়েছি, তোকে টেস্ট করাব।

তমালিকা বলে, কী নাম?

পমফ্রে বন ফাম। সুন্দর নয় নামটা?

আপনি পেলেন কোথায়?

এই তো এটাতে দিয়েছে। হাতের পত্রিকাটা দেখাল পিয়ালীর মা। মোট বারোটা রেসিপি দিয়েছে, আজ পাঁচ নম্বরটা করছি।

আপনার রান্না করতে খুব ভালো লাগে, না মাসিমা?

খুব। আমার ডাইরিতে অনেকগুলো রেসিপি লেখা আছে। আগে তো জঙ্গলসুফিতে সব জোগাড়গুলো পাওয়া যেত না—তোর মেসোমশাই কলকাতায় গেলে আনাতাম। এখন তো এখানেই সবকিছু পাওয়া যায়।

তমালিকা বারান্দায় ঢুকতেই শুনতে পেল গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের গম্ভীর ঘণ্টাধ্বনি। ঘড়িটার দিকে তাকাল তমালিকা। দশটা। লঘু পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল ওপর তলায়।

মেহগনি কাঠের বিশাল পালঙ্কে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে পিয়ালী। পাশে ছড়ানো ড্রয়িং পেপার আর স্কেচ পেন। মাঝারি গতিতে ঘুরছে সিলিং ফ্যান, টেবিলের ওপর বসানো ক্যাসেট প্লেয়ার সেতারের মৃদু আমেজ ছড়িয়ে দিচ্ছে বাতাসে।

তমালিকা ধাক্কা দিল পিয়ালীকে, কী রে শুয়ে আছিস, যাবি না?

মুখের চাদর সরিয়ে পিয়ালী বলে, কোথায়?

বা রে! তোর সঙ্গে ফাইনাল কথা হয়ে গেল—শুভমদার সঙ্গে দেখা করবি!

এই রে; আজ যাব বলেছিলাম না—একেবারে ভুলে গেছি; ক’টা বাজে রে?

এগারোটা বেজে গেছে।

বিছানা ছেড়ে হুড়মুড় করে উঠে পড়ে পিয়ালী। বলে, ওরে বাবা, এগারোটা! চল, চল।

পিয়ালীর মা ঘরে ঢোকেন। হাতে দুটো ধূমায়িত প্টে। পিয়ালী বলল, মা আমি এখন খাব না।

সে কী রে, আনলাম যে!

তুমি দুটোই তমালিকাকে দিয়ে দাও।

তমালিকা বলে ওঠে, আমি কি বকরাক্ষস না কি!

পিয়ালীর মা বলেন, তুই খাবি না কেন?

পিয়ালী বলে, শরীরটা ভালো নয়।

কী হয়েছে? পিয়ালীকে খুঁটিয়ে লক্ষ করতে করতে পিয়ালীর মা বললেন।

স্টম্যাক আপসেট।

তবে যে সকালবেলা অতটা ঘুগনি খেলি!

তার পরেই তো হল। মুখটা বিকৃত করে পিয়ালী।

বুঝেছি; আমি নতুন কিছু করলেই তোর শরীর খারাপ হয়। ঠিক আছে, তোকে খেতে হবে না, আমার রান্না খাওয়ার অনেক লোক আছে। তমালিকাকে একটা প্টে দিয়ে গজগজ করতে করতে চলে গেলেন পিয়ালীর মা।

পিয়ালীর মা বেরিয়ে যেতেই পিয়ালী বলল, মারব থাপ্পড়।

কাকে, মাসিমাকে?

তোকে । টেবিল ক্লকটার দিয়ে তাকিয়ে পিয়ালী বলল, সবে দশটা পাঁচ, আমাকে বললি এগারোটা।

পিয়ালীকে সঙ্গে নিয়ে অরুণোদয়ে এল তমালিকা। দেখল অফিসের সামনে একটা ছোটখাটো জটলা। পাঁচ-সাত জন ছেলে অফিস-রুমের দরজার সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে। শুভমদার গলা পাওয়া গেল ভেতর থেকে। পিয়ালী বলল, কী ব্যাপার রে, এত লোক?

তমালিকা বলল, ঠিক বুঝতে পারছি না।

আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি, তুই দেখে আয়।

তমালিকা অফিস রুমের দিকে এগোতেই ছেলেগুলো সরে যাওয়ার পথ করে দিল। দু’একজন নির্লজ্জের মতো মাপছিল তমালিকাকে। ঘরে ঢুকে তমালিকা দেখল শুভমদার সামনে একটা ছেলে বসে আছে। জিনসের প্যান্ট, ক্রিম কালারের পাঞ্জাবি। মুখে চাপদাড়ি, একমাথা এলোমেলো চুল। টেবিলের ওপর রাখা শান্তিনিকেতনি ব্যাগ ঘেঁটে কিছু একটা খুঁজছে ছেলেটি। তমালিকাকে দেখে শুভম বলে ওঠে, এই যে এসে গেছ; তোমার কথাই হচ্ছিল।

তমালিকার চোখে কিছুটা বিস্ময়। সে একবার শুভমের দিকে আর একবার ছেলেটির দিকে তাকাল। তমালিকাকে এক ঝলক দেখে নিয়ে ফের ব্যাগ ঘাঁটতে লাগল ছেলেটি। শুভম বলল, অরণ্যবাবু আপনি তমালিকাকে ব্যাপারটা বলুন; ও-ই আমাদের হোমের কালচারাল দিকটা দেখাশোনা করে।

ছেলেটি সোজা তমালিকার দিকে তাকাল। বলল, নমস্কার, আমার নাম অরণ্য, একটা বিশেষ দরকারে আপনাদের কাছে এসেছি।

সংবাদ পাঠকের মতো গমগমে কণ্ঠস্বর ছেলেটির। উচ্চারণও বেশ পরিশীলিত। তমালিকা বলল, বলুন কী দরকার।

টোয়েন্টি নাইনথ নভেম্বর স্কুলমাঠে একটা কালচারাল ফাংশন হবে। মিনিস্টার আসবেন। হোমের বাচ্চাদের একটা ‘কোরাস সঙ’ প্রাোগ্রামের মধ্যে রেখেছি। আপনি তো শুনলাম ওদের গান শেখান, বাচ্চাগুলোকে একটু তৈরি করে দেবেন।

তমালিকা বলল, কাদের অনুষ্ঠান, অকেশন কী—কিছুই জানলাম না!

স্কুলমাঠে মিনিস্টার আসছেন স্টেডিয়ামের শিলান্যাস করতে; তা ছাড়া ডিএম, এমএলএ, জেলা পরিষদের সভাধিপতি সবাই থাকবেন—আপনাদের হোমের একটা পাবলিসিটিও হয়ে যাবে।

ছেলেটির বাচন ভঙ্গিতে একটু কর্তৃত্বের সুর। মনে মনে বিরক্ত হয় তমালিকা। বলে, হোমের পাবলিসিটিটা বড় কথা নয়, ওরা এতজন মানুষের সামনে পারফর্ম করবে সেটাই বড় কথা— এক্সপোজারটা ভীষণ দরকার ওদের।

ও কে, ডিসিশন তাহলে ফাইনাল।

সেই একই টোন। এমনভাবে কথা বলছে তমালিকা যেন ওর সাবঅর্ডিনেট। পাত্তা না দেওয়ার ভঙ্গি করে তমালিকা বলল, এক্ষুনি অতটা বলতে পারছি না—ভীষণ কম সময়….

একটা তো মাত্র গান, কত সময় লাগবে?

যারা গানের জগতের মানুষ নয় তাদের ওটা মনে হয়, একটা গানের মর্মে প্রবেশ করে সেটা গাইতে সময় লাগে, বিশেষ করে এরা সব নতুন শিখছে।

এতটা কঠিন জবাব বোধহয় ছেলেটি আশা করেনি। একটু থমথমে গলায় বলল, সে দিন গাইলে আলটিমেটলি ওদেরই উপকার হয়—না হলে আর কী করা যাবে।

তমালিকা বলে, হবে না তো বলিনি, আমি চেষ্টা করব; একটা গান কিছুটা তোলা আছে…দেখি, যদি ওটা এর মধ্যে…

তমালিকাকে মাঝপথে থামিয়ে দিল অরণ্য, কী গান তুলেছেন?

একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত।

ওটা বাদ দিন, গানটা আমি সিলেক্ট করে দেব।

তমালিকা ভুরু কোঁচকায়। বলে, আপনি গানটা না শুনেই বাতিল করছেন কেন?

তমালিকার মুখের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল অরণ্য। হাতে একটা পেপার ওয়েট নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, ওই স্টেজে রবীন্দ্রসঙ্গীত চলবে না।

কেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত চলবে না কেন?

পেপার ওয়েটটা গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে অরণ্য বলল, ওই দিন একটা গণসঙ্গীত গাইতে হবে।

গণসঙ্গীত! বেশ জোরেই বলে ওঠে তমালিকা; ওরা শুধু শুধু গণসঙ্গীত গাইতে যাবে কেন!

ইনফ্যাক্ট গানের সিলেকশন হয়ে গেছে।

গলার জোরটা বজায় রেখেই তমালিকা বলল, সিলেকশন হয়ে গেছে মানে! কারা করেছে?

গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘের জঙ্গলসুফি শাখা।

তারা সিলেকশন করেছে বলেই ওদের গাইতে হবে—এ কেমন কথা!

পেপার ওয়েটটা ঠক করে টেবিলের ওপর রেখে উঠে দাঁড়াল অরণ্য। ব্যাগটা নিয়ে কাঁধে ঝোলাল। তারপর বলল, দেখুন, শুভমদার সঙ্গে এ ব্যাপারে আমার ডিটেল কথাবার্তা হয়ে গেছে; আপনার কোনও আপত্তি থাকলে ওঁর সঙ্গে আলোচনা করে নেবেন।

ঘর থেকে বেরিয়ে গেল অরণ্য। বাইরে দাঁড়ানো ছেলেগুলো অনুসরণ করল ওকে। হোমের দুটো বাচ্চা মাঠে প্লাসটিকের বল নিয়ে খেলছিল। একজনের গাল টিপে একটু আদর করে দিল অরণ্য।

তিন

নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে শুভমের ভালো লাগে। নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয়। জীবনের অপ্রাপ্তি আর বেদনাগুলো হুল ফোটায় না। আকাশের দিকে তাকিয়ে চন্দ্র সূর্য গ্রহ নক্ষত্রের ব্যাপ্তি কল্পনা করে। মনে হয়, ছোট্ট গ্রহের ক্ষুদ্র মানুষ—তার সুখ-দু:খ—সেই সব নিয়ে টানাপোড়েন—সত্যিই অর্থহীন বিলাসিতা। শুভম তখন পাখিদের ওড়াউড়ি দেখে, পাতায় পাতায় ফড়িংয়ের নাচ দেখে, ফুলে ফুলে পরাগ সঞ্চারে ব্যস্ত প্রজাপতি দেখে।

হেমন্তের বিকেল। এই সময় সূর্যটা দুপুরের পর অস্তে যাওয়ার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিকেলটা ছোট হয়ে যায়। বাতাসে হিমের ছোঁয়া লাগে।

হোমের সামনে মস্ত লনটায় বাচ্চারা খেলছে। এরা তবু একটা পরিচ্ছন্ন পরিবেশ পাচ্ছে। শুভম ছেলেবেলায় তাও পায়নি। সকালে তার ঘুম ভাঙত অশ্লীল গালাগালি শুনে, আর রাতে ঘুমোতে যেত মাতালদের হইহল্লা আর বোমার শব্দের মধ্যে। এ সবের মধ্যেই বড় হচ্ছিল শুভম। দিনরাত খেলে বেড়াত, মারামারি করত বন্ধুদের সঙ্গে, ঝগড়ার সময় তার মুখেও গালাগালির ফোয়ারা ছুটত। স্কুলে ভরতি হয়েছিল, কিন্তু ওই পর্যন্তই। বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বিশেষ ছিল না। এইভাবে আরও কিছুদিন চললে সে ঠিক মস্তানিতে হাত পাকাত বা চলে যেত অপরাধজগতে।

ঠিক সেই সময় মায়ের প্রেমে পড়লেন সুধন্যকাকা। মায়ের তখন মধ্যবয়েস। সুধন্যকাকার ষাট ছুঁই ছুঁই। স্ত্রী মারা গেছেন, ছেলেরাও বিয়ে-থা করে আলাদা। খুব নি:সঙ্গ ছিলেন মানুষটা। শুভমকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। সকাল-সন্ধে পড়াতে বসাতেন শুভমকে।

কিছুদিন পর পুরোনো পাড়া থেকে তাদের নিয়ে চলে এলেন। ঘর ভাড়া নিলেন শিবপুরে। শুভম ভরতি হল ভালো স্কুলে। বাইরের জগৎটা কেমন, ধীরে ধীরে জানছিল শুভম।

হঠাৎ একদিন বাথরুমে হার্ট অ্যাটাক হল সুধন্যকাকার। শুভম তখন হায়ার সেকেন্ডারি দিয়েছে। সুধন্যকাকাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়টুকুও পাওয়া যায়নি। শুভমই মুখাগ্নি করেছিল। সেই রকম বলে গিয়েছিলেন সুধন্যকাকা।

পরে খবর পেয়ে সুধন্যকাকার ছেলেরা এসে কিছু চেঁচামেচি করেছিল। কারণও ছিল। ভালো চাকরি করতেন সুধন্যকাকা। রিটায়ারমেন্টের পর টাকাকড়ি যা পেয়েছিলেন, তা মন্দ নয়। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মায়ের নাম ছিল। বেশ কিছু ক্যাশ সার্টিফিকেট কিনেছিলেন শুভমের নামে।

বিএসসি পাশের পর নানা জায়গায় কম্পিটিটিভ পরীক্ষা দিচ্ছিল শুভম। সেই ভাবেই এক দিন ব্যাঙ্কে চাকরিটা পেয়ে গেল।

সুধন্যকাকা মারা যাওয়ার পর খুব নি:সঙ্গ হয়ে গিয়েছিল মা। বয়সও হচ্ছিল মায়ের। বিয়ের জন্যে তাগাদা দিচ্ছিল শুভমকে। শুভম জানত এ বারই শুরু হবে সমস্যা।

কলেজ-লাইফে কয়েক জন বান্ধবী ছিল শুভমের। তাদের মধ্যে শ্যামলী একটু বেশি ঘনিষ্ঠ। দু’একবার ওরা গ্রুপ থেকে আলাদা হয়ে নন্দনে ফিল্ম বা অ্যাকাডেমিতে নাটকও দেখেছে। ফরসা ছিপছিপে চেহারার শ্যামলীর ওপর একটু দুর্বলতা ছিল শুভমের। কিন্তু ভেসে যায়নি সে। অতি কষ্টে রাশ টেনে রেখেছিল। সে জানত শ্যামলী নির্জলা সত্যটা মেনে নিতে পারবে না। শ্যামলীও কি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েনি? না হলে বলবে কেন, মাকে তোর কথা বলেছিলাম।

শুভম বলল, কী বলছিলি।

কী আবার, এমনিই বলছিলাম—তুই পড়াশোনায় কত ভালো, ফার্স্ট ইয়ারে স্ট্যান্ড করেছিস, অথচ অহংকার নেই একটুও—এই সব।

আর কী বললি?

আর…আর বললাম তুই লাজুক, হইহই এড়িয়ে চলিস।

আর?

আর…গ্র্যাজুয়েশন কমপ্টি করেই চাকরির পরীক্ষার বসবি।

আর?

আর কী বলব! রাগ দেখায় শ্যামলী।

আর কিছু বলার নেই আমার সম্বন্ধে?

এর পর বলতে হয়, তোকে তোর বাবার কথা জিগ্যেস করলে এড়িয়ে যাস, আর কথা বলতে বলতে মাঝেমাঝেই ক্যাবলার মতো অন্যমনস্ক হয়ে পড়িস।

শুভম হাসে। বলে, এসব শুনে তোর মা কী বললেন?

তোকে একদিন আমাদের বাড়ি নিয়ে যেতে বলেছে।

আমার সবকিছু জানলে আর যেতে বলবেন না।

শ্যামলী একটু অবাক হয়। বলে, কেন তুই কি ডাকাত না খুনে?

তার চেয়েও ভয়ংকর।

তা শুনি একটু—তুই কতটা ডেঞ্জারাস।

আজ থাক; অন্য একদিন বলব।

দুদিন পরে আবার ধরল শ্যামলী। বলল কী রে, কবে যাবি আমাদের বাড়ি?

যাব একদিন সময় করে। শুভম এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।

তুই এত অহংকারী জানতাম না।

শুভম বলল, তুই মিছিমিছি আমার ওপর রাগ করছিস। আমার সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানিস না।

তুই না বললে জানব কী করে! থমথমে মুখে বলল শ্যামলী।

কিছুক্ষণ ভাবল শুভম। বলে দেবে শ্যামলীকে? না কি আপাতত চাপা থাকবে তার জন্ম-ইতিহাস? শুভম বুঝতে পারছিল ওদের সম্পর্কটা একটা বাঁকের মুখে। এর পর শ্যামলীর কাছ থেকে ফিরে আসতে হলে আরও বেদনাদায়ক হবে। কোনও একদিন সত্য প্রকাশিত হবেই। তার চেয়ে বিচ্ছেদ হলে এখনই হোক—সেটা অনেক সহনীয় হবে। মন শক্ত করে সিন্ধান্তটা নিয়েই ফেলল শুভম। সোজা তাকাল শ্যামলীর দিকে। বলল, তুই কি আমার বাবার পরিচয় জানিস?

না, কী করে জানব?

আমিও জানি না। প্রায় দম বন্ধ করে বলে ফেলেছিল শুভম।

মানে! বড় বড় চোখে তাকিয়ে বেশ জোরেই বলল শ্যামলী।

চেপে রাখা নিশ্বাসটা ধীরে ধীরে ফেলল শুভম। বলল, হ্যাঁ আমার জন্ম রেড-লাইট এরিয়ায়; আমার মা…

ঠোঁট কামড়ে চোখ বুজল শ্যামলী। তার পরেও বেশ কিছুক্ষণ বসেছিল শুভমের পাশে। শুভম দেখল দু’ফোঁটা জল ঝড়ে পড়ল ওর চোখ থেকে। শুভম জানে ওই চোখের জলের কোনও অর্থ নেই। দু’ফোঁটা জল থেকে কোনও সিন্ধান্তে পৌঁছোনো যায় না।

পর দিন থেকে শ্যামলী খুব সহজভাবেই মিশেছিল শুভমের সঙ্গে। কিন্তু শুভমকে আর কোনও দিন ওদের বাড়ি যেতে বলেনি।

মায়ের কথা রাখতে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল শুভম। বেশ কিছু যোগাযোগও হয়েছিল। তেমনই হওয়ার কথা। তার চাকরিটা মন্দ নয়। কিন্তু শুভম প্রত্যেককেই অকপটে জানিয়ে দিয়েছিল তার জন্ম-বৃত্তান্ত। ব্যস! আর আগ্রহ দেখায়নি কেউ।

শ্যামলী পর্বটা নিতান্তই তুচ্ছ ঘটনা। একটা জীবনে অমন কত ঘটে! আজকাল খুব মামুলি কারণেও বহু সম্পর্ক দানা বাঁধে না। সংসারে বিধবা পিসি বা চিরকুমারী দিদি আছে জেনে অনেক মেয়ে পিছিয়ে আসে।

শুভমদের ব্র্যাঞ্চে একটা অল্পবয়সি মেয়ে জয়েন করেছিল। তার দাবিই ছিল শাশুড়িহীন সংসার। মা-মরা ছেলে ফার্স্ট প্রেফারেন্স। শ্বশুর চলতে পারে; কিন্তু সংসারে শাশুড়ি থাকলে স্বাধীনতার বারোটা বেজে যায়। সেই হিসেবে শ্যামলীকে দোষ দেওয়া যায় না। তবু আজও অভিমানের একটা মৃদু তরঙ্গ ধাক্কা দেয় বুকের মধ্যে।

তার পরেও মা দু’একবার বিয়ের প্রসঙ্গ তোলে। মায়ের ইচ্ছে ছিল তাদের পুরোনো পাড়ার কোনও মেয়েকে বিয়ে করুক শুভম। নিষিদ্ধপল্লিতে সাধারণত সেটাই হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গেই বিয়ে হয় সেখানকার মেয়েদের। কিন্তু শুভম একটা জিনিস বুঝেছিল, ওই পরিবেশে বড় হওয়া কোনও মেয়ের সঙ্গে সে আর মানিয়ে নিতে পারবে না। তাছাড়া তত দিনে মনস্থির করে ফেলেছে শুভম। চিন্তা ছিল চাকরি আর টাকাকড়ি নিয়ে। সুধন্যকাকার রেখে যাওয়া টাকা কিছু আছে। সুদে-আসলে সেটা কম নয়। সুধন্যকাকার ছেলেরা গালমন্দ করে চলে যাওয়ার পর টাকাটা নিয়ে একটা মৃদু অপরাধবোধে ভুগত শুভম। টাকাটা সৎকাজে লাগানোর সন্ধানে ছিল। কিন্তু একটা হোম গড়ে তোলার পক্ষে সেটা যথেষ্ট নয়। সেই সময় তাদের চাকরিতে একটা সংকট দেখা দিল; আর সেটাই শুভমের মুশকিল আসান। কর্তৃপক্ষ তাদের কয়েকজনকে নোটিশ ধরাল—হয় বদলি হও, নয় স্বেচ্ছা অবসর নাও। বদলি মানে কাশ্মীর বা আসামের কোনও জঙ্গল এলাকা। শুভম দ্বিতীয় বার চিন্তা করেনি। ভি আর এস নেওয়াতে একটা ভালো অঙ্কের টাকা পেয়ে যায় সে।

একটা বল ছিটকে এল শুভমের দিকে। বলটা ধরে ছুড়ে দিল সে। কয়েক জন হইহই করতে করতে ছুটে এল, আঙ্কল, খেলবে আমাদের সঙ্গে?

শুভম হাসল। বলল, আমি কোন দলে?

দু’দলই চিৎকার করে বলল, তুমি আমাদের আঙ্কল, তুমি আমাদের।

বড় ভালো লাগে শুভমের। জীবনে বহুবার শুনতে হয়েছে, তুমি আমাদের নও।

বাচ্চাগুলোর সঙ্গে কিছুক্ষণ ছোটাছুটি করল শুভম। একটু পরে বীণা এসে তাকে ডাকল। খেলা ছেড়ে মাঠের বাইরে এল শুভম। বীণা বলল, আজ রাতে কী হবে?

শুভম বলল, রুটি-তরকারি—যেমন হয়।

পদ্মার আজ কামাই; আমি একা হাতে অত রুটি বেলতে পারব না।

তা হলে ভাত বসিয়ে দাও।

ভাত বসালে আবার ডাল করতে হয়—কিন্তু ডাল যা আছে তাতে কুলোবে না।

ঘড়ি দেখল শুভম। বেল দেওয়ার সময় প্রায় হয়ে এসেছে। বীণাকে বলল, ঠিক আছে, তুমি ভাত চাপাও, আমি দোকান থেকে ডাল এনে দিচ্ছি। আর পদ্মাকে এত কামাই করতে বারণ করে দিও।

বীণা বলল, আমি বললে শুনবে? আপনি বলবেন।

তনুজা আর পাপড়ি ছুটতে ছুটতে আসে শুভমের কাছে। বলে, আঙ্কল, বীণামাসিকে বলে দাও না—আমরা আজ রুটি বেলব।

শুভম বলল, কিন্তু তোদের পড়াশোনার কী হবে? টেস্ট পরীক্ষা তো এসে গেল।

সে এখন দেরি আছে।

কবে থেকে?

নভেম্বর থার্ড উইক।

তাহলে আর দেরি কোথায়?

পাপড়ি বলল, ও আমরা ঠিক ম্যানেজ করে নেব। একদিন তো, কিছু ক্ষতি হবে না; তুমি পারমিশন দাও।

চার

টেনশন হলে এখন ভুঁড়িতে হাত বুলোয় অবনী গুহ। আগে যখন মাথায় চুল ছিল তখন চুলের মুঠি চেপে ধরত। সেই অত্যাচারেই বোধহয় চুলগুলো সব গেছে। এখন চাঁদিভরা চকচকে টাক সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত করতে পারে। ইন্দ্রলুপ্তি দু’দিক দিয়ে মেরে দিয়েছে অবনীকে। তার বয়েসটা দশ বছর বাড়িয়ে দিয়েছে আর হাইটটা কমিয়ে দিয়েছে দু’ইঞ্চি। এমনিতে উচ্চতা নিয়ে বরাবরই একটু মন:কষ্ট ছিল অবনীর; তার বৃদ্ধি পাঁচ ফুট এক ইঞ্চিতে গিয়ে একেবারে নট-নড়ন-চড়ন। ঝাঁকড়া চুল কিছুটা ঘাটতি ম্যানেজ করত। ইদানীং উচ্চতা বলার সময় সে দু’ইঞ্চি চুল মিশিয়ে বলে পাঁচ তিন।

ভুঁড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে অবনী বলে, বুঝলি অরণ্য, মানুষের যখন খারাপ সময় আসে তখন রাস্তার কুকুর-ছাগলগুলো পর্যন্ত তাকে ইগনোর করে; ব্যাঙেও লাথি মারে…

কার সময় খারাপ, কে কুকুর, কে ছাগল—সম্যক ধারণা না করেই অরণ্য বলে, ঠিকই তো।

তবে জানবি, জমানা বদল হবেই।

সে তো বটেই।

ক্যান ইউ ইমাজিন, বিভাস সাহা— যাকে শালা হাত ধরে পার্টিতে নিয়ে এলাম—সে আজ আমাকে পেছন থেকে ছুরি মারার চেষ্টা করছে!

এতক্ষণে কালপ্রিটকে চিনতে পারল অরণ্য। বলল, খুব অন্যায়।

শুধু অন্যায়! এদের ধরে ধরে শুট করে দেওয়া উচিত।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ বিভাস করেছে কি না জানে না অরণ্য; তবে এটুকু জানে আজকাল ভীষণ বাতিকগ্রস্ত হয়ে পড়েছে অবনীদা। সব সময় সন্দেহ ওর বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র চলছে। এইসব ভেবে ভেবে অবনীদা মনে হয় প্রেসার চড়িয়ে ফেলেছে। না হলে এই নভেম্বর সকালে মাথার ওপর পাখা ঘুরবে কেন? গায়ের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিল অরণ্য। মনটা অনেকক্ষণ সিগারেটের জন্যে সুলসুল করছে। অবনীদার সামনে ধরাতে পারছে না।

অবনী নিজে ফস করে একটা সিগারেট ধরাল। সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধে এ বার আঁকুপাঁকু করে ওঠে অরণ্যের ভেতরটা। অবনীর দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে সে উলটো দিকের দেওয়াল-আলমারির দিকে তাকাল। বঙ্কিম রচনাবলি, শিশুর যত্ন, তার পাশে রামকৃষ্ণ স্মৃতি। নীচের সেল্ফে কয়েকটা শো-পিস আর পোর্সেলিনের কাপ-প্টে। আলমারির মাথায় অল্প বয়েসের অবনী গুহ। ফিনফিনে গোঁফ, একমাথা ঝাঁকড়া চুল।

একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে অবনী বলল, আসলে লিডারশিপ জিনিসটা অত সস্তা নয়…

আরও বোধহয় কিছু বলতে যাচ্ছিল অবনী। কিন্তু ভেতর বাড়িতে একটা মহিলাকণ্ঠ উত্তুঙ্গে ঠিকে-ঝি-এর চোদ্দো গুষ্টি উদ্ধার করছে, বয়স্ক কেউ একজন কাশতে কাশতে চায়ের তাগাদা দিচ্ছে অনেকক্ষণ। অবনী ভেতরে গিয়ে কিছু বলল বোধহয়। চেঁচামেচিটা একটু কমল।

এই ফাঁকে টুক করে ফ্যানের সুইচটা অফ করে দিল অরণ্য। অবনী ফিরে এসে বলল, আমি সিওর, নেতা হওয়ার এলিমেন্ট বিভাসের মধ্যে নেই।

টেবিলের ওপর থেকে খবরের কাগজটা তুলে নিয়ে অরণ্য বলল, তুমি ফর নাথিং চিন্তা করছ, বিভাস সাবোতাজ করলেও কিছু যায় আসে না; কিন্তু শুনছি মানিক মোদক মন্ত্রীকে কালো পতাকা দেখাবে। সেটা যদি হয়, তবে ব্যাপারটা কিন্তু একটু এমব্যারাসিং হবে।

অবনী তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল। বলল, আরে মোদক কোনও ফ্যাক্টরই নয়, ওর সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে।

মোদক তো বেশ ছিল; হঠাৎ এমন বাগড়া দেওয়ার ধান্দা কেন?

আসলে, পার্টি ভেঙে যাওয়ার পর মানিক একটু চাপে আছে। সেদিন ফোন করেছিল, বলল—দাদা, এমনিতেই আমাদের পার্টিকে আপনাদের বি-টিম বলছে লোকে; মন্ত্রী আসবে, বক্তৃতা করবে, চলে যাবে—এর মধ্যে যদি একটু হুটোপাটি না করি তো পাবলিক ছাল খেঁচে নেবে। আমরা কিন্তু ওই দিন একটু গণ্ডগোল করব।

কাগজ থেকে চোখ সরাল অরণ্য। বলল, তা হলে তো মুশকিলের কথা, তুমি পুলিশকে এই ব্যাপারটা একটু ইনফর্ম করে রাখো।

মাথার টাকে একবার হাত বোলাল অবনী। বলল, এই বুদ্ধি নিয়ে তুই পার্টি করবি!

মনে মনে বিরক্ত হল অরণ্য। গান্ডুটা নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভাবে। বিরক্তিটা চেপে বলল, কেন?

এই সব সামান্য ব্যাপারে পুলিশকে ইনফর্ম করলে পুলিশ ছিঁচকাঁদুনে ভাববে। আমি আসল জায়গায় পুলটিস লাগিয়ে দিয়েছি—বলে রহস্য একটা হাসি ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে রাখে অবনী।

অরণ্য বলে, ক্যাডার লাগাচ্ছ?

ধুর! তুই যেমন! স্কুল মোড়ে কালো পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে মোদকের দল। আর মন্ত্রী ওই রাস্তায় ঢুকবেই না, মন্ত্রীর কনভয় বাঁধের রাস্তা দিয়ে মাঠে ঢুকবে। কিছুক্ষণ ওয়েট করে মন্ত্রীর দেখা না পেয়ে ফিরে যাবে মোদক—ওর সঙ্গে এরকম কথা হয়ে আছে আমার।

অরণ্য এবার সত্যিই বিস্মিত হয়। বলে, মোদক রাজি হয়েছে!

এমনিতে আর হয়েছে! কালীতলার মোড় থেকে ঘোষল পাড়া পর্যন্ত রাস্তায় ইট পাতা হবে; ইটটা মোদকের ভাটা থেকে নিতে হবে এবার। কিন্তু বিভাস যদি বিকাশ চৌধুরীর কাছে চুকলি কাটে, আমি কিন্তু বিভাসকে….

বিভাসকে কী করবে বলার আগেই অবনীর পকেটে মোবাইল টুং টাং করে বেজে ওঠে। কানে ফোন লাগিয়ে কাঠি বরফের মতো গলে গলে যাচ্ছে অবনী—হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিকই তো; না, না আপনি ভাববেন না—সাকসেসফুল হবেই, আমি খুবই কনসাস আছি, ছেলেদেরও সেই রকমই বলে রেখেছি—ঠিক আছে—হ্যাঁ, হ্যাঁ, নো প্রবলেম—আ-আচ্ছা, রাখছি—ঠিক আছে—হ্যাঁ, হ্যাঁ, নো প্রবলেম—আ-আচ্ছা, রাখছি তাহলে।

মোবাইলটা পকেটে ঢোকায় অবনী; মুখে আত্মপ্রসাদের হাসি। অরণ্য কিছু জিগ্যেস করছে না দেখে নিজেই বলল, রাঘবদা।

কোন রাঘবদা?

জেলা কমিটির রাঘবদা। মিটিংয়ের খোঁজখবর নিচ্ছিল। রাঘবদা কথা দিয়েছে পরের বার আমাকে জেলা কমিটিতে নিয়ে যাবে।

অরণ্য একটু উৎসাহ দেখাবার চেষ্টা করে। বলে, বাহ, এ তো দারুন খবর!

একটু লাজুক হাসল অবনী। মুখে বলল, দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী হয়।

তিনটে আলু পচা বেরিয়েছে। ভেতর বাড়িতে এখন আলুওলার শ্রাদ্ধ চলছে। দু’একবার ‘শালা’ শব্দটাও কানে এল। অবনীর বোধহয় একটু অস্বস্তি হচ্ছে। বলল, এই লেবার ক্লাসটা সবচেয়ে করাপটেড বুঝলি—এদের নিয়ে কিছু হওয়া মুশকিল। হ্যাঁ, আসল খবর বল—তোর ওদিকের খবর কী?

কোনদিকের?

ওই হোমের ব্যাপারটা।

গিয়েছিলাম।

কী কথা হল বলবি তো!

সব ঠিক আছে, শুধু…। অরণ্য একটু থামল।

অবনী একটু অধৈর্য হয়ে বলল, প্রবলেমটা কী বলবি তো!

অরণ্য বলে, হোমের গানের টিচারটা গণসঙ্গীতে একটু আপত্তি করছে, তবে ও আমি ম্যানেজ করে নেব।

অবনী সোজা হয়ে বসল। বেশ উত্তেজিত। বলল, গণসঙ্গীতে আপত্তি! ওই পার্টির সাপোর্টার না কি? বেশি বেগড়বাঁই করলে সাইজ করে দে। কী নাম ছেলেটার?

ছেলে নয়, একটা বাচ্চা মেয়ে।

মেয়েছেলে! চোখ মুখ কুঁচকে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে অবনী।

অরণ্য বলে, হ্যাঁ, ওই মেয়েটাই হোমের গান-টান শেখায়।

বয়েস কত হবে?

অরণ্য মৃদু হাসে; বলে, বয়েস কী করে বলব! মেয়েদের বয়েস বোঝা যায় না কি!

আনম্যারেড?

সেটাও বলা মুশকিল, আজকাল ম্যারেড-আনম্যারেডও তফাত করা যায় না।

ঠিক আছে, চল এক দিন, হোমে যাই—গিয়ে মেয়েটার সঙ্গে কথা বলি।

মনে মনে হাসে অরণ্য। বলে, আর যাওয়ার দরকার নেই; প্রথমে একটু আপত্তি করেছিল, এখন রাজি হয়ে গেছে।

যা: শালা! তবে যে বললি গণসঙ্গীত গাইতে চাইছে না!

না, না প্রথম দিকে কিছু প্রশ্ন তুলেছিল—তারপর আমি মগজ ধোলাই করে দিয়েছি।

ঠিক আছে, দেখিস, মিনিস্টারের সামনে প্রেসটিজ না পাংচার হয়—মেয়েটা সে দিন আসবে তো?

অরণ্য বলে, আসবে বোধহয়।

এলে আলাপ করিয়ে দিস তো?

অরণ্য অন্যমনস্কভাবে বলে, আচ্ছা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *