এসো আমার সঙ্গে – ১০

দশ

বিদেশ ভ্রমণের শখ তমালিকার বহু দিনের। ওর ফার্স্ট প্রেফারেন্স সুইজারল্যান্ড। তারপর কানাডা, তার পর নরওয়ে সুইডেন আর ডেনমার্ক। তার পরের তালিকাটা বেশ বড়—সেখানে তাসমানিয়া থেকে ওমান সব আছে। শুধু বাংলাদেশ বাদ আর বাদ চিন।

বাংলাদেশটাকে ঠিক বিদেশ বলে মনে হয় না। বিদেশ গিয়ে যদি গোয়ালঘর, ঢ্যাঁড়সের খেত কিংবা নেড়ি কুকুর চোখে পড়ে তা হলে শ্রদ্ধাটা নষ্ট হয়ে যায়। আর চিনে গিয়ে চপ-স্টিক দিয়ে নুড়লস খাওয়া তার পোষাবে না। তা ছাড়া চিনে বর্ণমালার হরফ দেখে খুব হতাশ তমালিকা। তার বদ্ধমূল ধারণা, যাদের বর্ণমালার লিপি এত বদখচ তাদের সৌন্দর্যবোধ অতি নিম্নমানের।

আজ থেকে মেক্সিকোও তালিকা থেকে বাদ গেল। আজ একটা মেক্সিকান রেসিপি বানিয়েছিলেন পিয়ালীর মা। নাম—লবস্টার আ লা পাবিসিয়েন। সেটা খাওয়ার পর মেজাজটা বিগড়ে গেছে। মুখটা বিস্বাদ। এই যদি মেক্সিকান খাবারের নমুনা হয় তা হলে সেখানে গিয়ে তাকে উপোস করে থাকতে হবে। অথচ মাসিমা না কি তিনদিন বিস্তর চেষ্টাচরিত্র করে জিনিসটা বানিয়েছেন।

পিয়ালীর যথারীতি আজও ভয়ঙ্কর পেটের যন্ত্রণা হচ্ছে, আর বাগে পেয়ে মাসিমা বেশ ঠেসে খাইয়ে দিয়েছেন তমালিকাকে। সমস্যা হল, তমালিকা যতক্ষণ খেয়েছে ঠায় সামনে বসে থেকেছেন মাসিমা। ফলে জিনিসটা জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দেওয়া কোনওভাবেই সম্ভব হয়নি, উপরন্তু বেশ হাসি হাসি মুখ করে খেতে হয়েছে তাকে।

চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আগাগোড়া বেশ তারিয়ে তারিয়ে নাটিকাটা উপভোগ করেছে পিয়ালী। তমালিকা ঠিক করেছে এর পর সে-ও শরীর খারাপের অজুহাত দেখাবে। পোড়া মাংস আর পচা আলুর মিশ্র একটা গন্ধ খাবারটায়। মাঝেমাঝেই ঢেকুর দিয়ে তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। এক্ষুনি বাড়ি গিয়ে কিছু একটা খাওয়া দরকার, তাতে যদি মুখটা একটু বদলায়।

বেশ জোরে সাইকেল চালাচ্ছিল তমালিকা। স্কুল মোড়ে গিয়ে দেখল মস্ত জ্যাম। একটা লরি আর একটা ম্যাটাডর মুখোমুখি ঢুকে রাস্তাটা ব্লক করে দিয়েছে। রাজ্যের সাইকেল, মোটর সাইকেল, রিকশা সবকিছু জড়িয়ে-মড়িয়ে একশা কাণ্ড।

সাইকেল থেকে নেমে পড়ল তমালিকা। মেজাজটা আরও খিঁচড়ে গেল। কোথাও সামান্য ফাঁকা জায়গা পেলেই কেউ না কেউ ঢূকে যাচ্ছে সেখানে। ফলে আরও পাকিয়ে উঠেছে জ্যামটা। স্কুলের সময় হয়ে গেছে—পিলপিল করে ছেলেমেয়েরা এসে যাচ্ছে; অধৈর্য হয়ে নাগাড়ে বেল বাজাচ্ছে তারা।

তমালিকা একটু অসহায়ভাবে এদিক-ওদিক তাকাল। যাওয়ার মতো সামান্য ফাঁকা জায়গা কোথাও নেই।

সামনেই একটা মোটর সাইকেল আরোহীর সঙ্গে একটা রিকশাওলার হাতাহাতি লেগে গেছে। হইচই, চিৎকার-চেঁচামেচি, অশ্রাব্য গালিগালাজ। রোদও ক্রমশ চড়ে উঠেছে। মুখে গলায় ফুটে উঠেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে চোখ পড়তেই চমকে উঠল তমালিকা। অরণ্য। নীল রঙের জিনসের ওপর ক্রিম কালারের টি-শার্ট। চোখে কালো সানগ্লাস। এত মানুষের ভিড়ের মধ্যেও ঠিক চোখে পড়বে। তমালিকা এক ঝলক দেখেই চোখ সরিয়ে নিল। অন্যদিকে তাকিয়েও বুঝতে পারল অরণ্য এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়িয়েছে।

আটকে গেছেন?

দ্রিম দ্রিম করে ড্রাম বেজে উঠল তমালিকার বুকের মধ্যে। কিন্তু মুখটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে শুধু বলল, হুঁ।

সানগ্লাসটা চোখ থেকে খুলে ফেলল অরণ্য। বলল, এ জ্যাম সহজে ছাড়বে না; কোথায় যাবেন?

বাড়ি।

ভিড়ের চাপে তমালিকার প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে অরণ্য। ঘামে কিছুটা ভিজে গেছে ওর টি-শার্ট। প্রচণ্ড পুরুষালি গন্ধ আসছে গা থেকে। বলল, কোথায় গিয়েছিলেন?

তমালিকা ভাবল যে বলবে, সেটা আপনার না জানলেও চলবে। কিন্তু ওই প্রবল পুরুষালি গন্ধ কিছুটা আচ্ছন্ন করে ফেলল তাকে। বলল, বন্ধুর বাড়ি।

অরণ্য বলল, মিছিমিছি এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করবেন না; আপনি এক কাজ করুন, চড়কডাঙা দিয়ে ঘুরে চলে যান।

জ্যামটার দিকে আর একবার অসহায়ভাবে তাকিয়ে তমালিকা বলল, আমি ওই রাস্তাটা ঠিক চিনি না।

খুব সোজা, অরণ্য বলল, এখান থেকে স্ট্রেট আপনি বাজারের মোড়ে চলে যান, তারপর বাঁদিকের রাস্তাটা ধরে একটু এগোলেই একটা পুরোনো মন্দির পাবেন—সেটা ফেলে রেখে…

তমালিকা বলে ওঠে, ওরে বাবা, জটিল ব্যাপার, ওভাবে আমি যেতে পারব না।

অরণ্য বলে, আচ্ছা চলুন, আমি যাচ্ছি।

হঠাৎ মোক্ষম সময়ে একটা ঢেকুর উঠল তমালিকার। মেক্সিকান পদটা তার অস্তিত্ব জানান দিল। অজান্তেই চোখ-মুখ কুঁচকে গেল। অরণ্য বলল, বাপরে, এখনও আমার ওপর ব্যাপক রেগে আছেন দেখছি।

তমালিকা বলল, না, না; রেগে থাকব কেন?

আমি সঙ্গে যাব শুনে যেভাবে চোখ-মুখ কোঁচকালেন!

তমালিকা একটু লজ্জা পেল। বলল, সে জন্যে নয়, আসলে আমার শরীরে একটা অস্বস্তি হচ্ছে—আচ্ছা চলুন।

অরণ্য বলল, আপনার সংকোচের কিছু নেই; আমার ওই দিকে একটা কাজ আছে, আমাকে যেতেই হত।

আরও একটা ঢেকুর উঠল তমালিকার। প্রাণপণ চেষ্টায় চোখ-মুখের বিকৃতি এড়াল এবার।

রোদ চশমাটা ফের পরে নিয়ে অরণ্য বলল, আসুন। তারপর বড় বড় পা ফেলে উলটোদিকে হাঁটতে শুরু করল।

সাইকেলটা ঘুরিয়ে তমালিকা অনুসরণ করে অরণ্যকে। ভিড় ছেড়ে একটু এগোতেই রাস্তার ধারে একটা চায়ের দোকান। দোকানের সামনে স্ট্যান্ড করে রাখা সাইকেলটার তালা খোলে অরণ্য।

মন্দির ছেড়ে আর একটু এগোতেই মস্ত একটা পুকুর। কালো জলে তিরতিরে স্রোত। গায়ে শ্যাওলা লাগা মস্ত বড় বড় মাছ ঘাই মারছে মাঝে মাঝে। পুকুরের পাড়ে কতগুলো নারকোল আর সুপুরি গাছ প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে। অরণ্য পা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল পুকুরের ধারে। পাশে এসে সাইকেল থেকে নেমে পড়ল তমালিকা। বলল, কী হল, দাঁড়ালেন কেন?

গভীর জলের দিকে তাকিয়ে অরণ্য বলল, অনেকক্ষণ সাইকেল চালাচ্ছি তো, পাগুলো ব্যথা করছে।

চারপাশে ঝিমঝিম করছে নির্জনতা। মাঝেমাঝে নির্জনতা চিরে টু-উ-ই, টু-উ-ই ডেকে উঠছে একটা পাখি। কাছেই কোথাও কাঠঠোকরা ঠক ঠক করে গাছের গুঁড়ি ঠোকরাচ্ছে, তমালিকা বলল, আপনার বোধহয় সাইকেল চালানো অভ্যেস নেই।

অরণ্য অবাক হয়ে তমালিকার দিকে তাকাল। বলল, কেন থাকবে না, দিনরাত তো সাইকেল নিয়েই ঘুরি!

তাহলে এইটুকুমাত্র চালিয়েই পা ব্যথা করছে!

অরণ্য বলল, ঠিকই তো, এক্ষুনি তো পা ব্যথা করা উচিত নয়; কিন্তু ঘটনা হল, করছে। কেন বলুন তো?

কী করে বলব, আমি তো ডাক্তার নই।

আপনি খুব বড় একজন ডাক্তার।

তমালিকা চোখ বড় বড় করে বলে, বলেন কী, আমি ডাক্তার!

ঠিকই বলছি, আপনি কোনও সাধারণ ডাক্তার নন, মস্ত একজন স্পেশালিস্ট।

কপালে চলে আসা চুলগুলো সরাতে সরাতে তমালিকা বলল, আপনার এই সানগ্লাসটা কোনও সাধারণ সানগ্লাস নয়, এর একটা ম্যাজিকাল পাওয়ার আছে।

কী রকম? একটু হেসে জিগ্যেস করল অরণ্য।

এটা চোখে দিলে রামকে শ্যাম বলে মনে হবে, সেই গণ্ডগোলটা আপনি আমার ক্ষেত্রেও করেছেন। আমি আপনার পরিচিত সেই ডাক্তার নই।

এক টানে সানগ্লাসটা খুলে ফেলে অরণ্য। বলে, না ঠিকই আছে, এটা চোখে দিয়ে যাকে দেখছিলাম তাকেই তো দেখছি।

কাকে দেখছেন?

নাম তমালিকা, হবি গানবাজনা, পেশায় মস্ত ডাক্তার।

তাই! তা আমার স্পেশালাইজেশনটা কীসের ওপর বলুন তো?

আপনি তিন-চারটে বিষয়ে স্পেশালিস্ট।

ওমা, সে তো হাতুড়েরা হয়। আমাদের পাড়ায় একজন ডাক্তার ছিল তার সাইনবোর্ডে চক্ষু, কর্ণ, দন্ত, চর্ম, শিশু এবং মস্তিষ্ক বিশেষজ্ঞ লেখা থাকত। নীচে ব্র্যাকেটের মধ্যে লেখা ছিল—এখানে গরু ছাগলেরও চিকিৎসা করা হয়। আমাকে তা হলে আপনি হাতুড়ে বলছেন!

ছি:, ছি:, তা কখনও বলতে পারি।

তাহলে মজা করছেন?

তাও নয়; একেবারে নির্জলা সত্য বলছি। ধরুন একজন পেশেন্ট—তার বুকটা সব সময় ভার হয়ে থাকে, ঠিকমতো খিদে হয় না, ঘুমের বারোটা বেজে গেছে, কেবলই অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে, কাজের দফারফা—এরকম অবস্থায় সেই পেশেন্ট যখনই আপনাকে দেখছে তার উপসর্গগুলো মুহূর্তে ভ্যানিশ। তাহলেই বুঝে দেখুন, আপনি কত বড় ডাক্তার।

তমালিকা একটু গম্ভীর স্বরে বলল, আমার এত কোয়ালিটি তো জানা ছিল না! তা পেশেন্টটি কে?

একটা সিগারেট ধরাল অরণ্য। বলল, জানার কি খুব আগ্রহ আছে?

ডেফিনিটলি।

কেন, ফিজ চাইবেন?

সে তো চাইতেই পারি।

রোগী কিন্তু খুবই দীনহীন মানুষ।

ঠিক আছে, সে না হয় অবস্থা বুঝে কিছু কনসিডার করব; কিন্তু ডাক্তারকে কিছু দক্ষিণা না দিলে রোগ পুরোপুরি সারে না— ফের রিল্যাপ্স করে।

তবুও অ্যামাউন্টটা যদি একটু বলেন।

ঠোঁট কামড়ে ভাবতে থাকে তমালিকা।

কদমগাছ থেকে একটা পাতা খসে পড়ল জলে। ঝপাস করে পড়ে ঠোঁটে মাছ নিয়ে উড়ে গেল একটা মাছরাঙা। মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত, তবু অরণ্যের মনে হচ্ছে অনন্ত সময়। একটা পাখি কদমগাছের ঘন পাতার আড়াল থেকে ডেকে উঠল ট্রি-রি-রি-ট্রি-রি-রি-রি…সেই দিকে তাকিয়ে তমালিকা বলল, আমাকে একটা গান শোনাতে হবে।

সর্বনাশ!

কেন? তমালিকা অরণ্যের দিকে তাকিয়ে বলল, পেশেন্ট কি গান একদম জানে না?

জানত, কিন্তু আজকাল গান গাইতে গেলেই স্লোগান বেরিয়ে পড়ে।

তা বললে তো হবে না; এটাই আমার ফিজ।

মুখে একটু বেচারা বেচারা ভাব ফুটিয়ে তুলে অরণ্য বলল, গণসঙ্গীত চলবে?

না, নেভার! শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীত। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও গণসঙ্গীত লিখেছেন।

অরণ্য চোখ বড় বড় করে তাকায়। বলে, তাই না কি!

হ্যাঁ মশাই, প্রচুর। যেমন ধরুন ‘আমরা সবাই রাজা’ বা ‘বাধা দিলে বাঁধবে লড়াই’ এগুলো তো পিওর গণসঙ্গীত।

অরণ্য বলল, তাই তো; খেয়াল করিনি।

কিন্তু এগুলো এখন চলবে না।

তাহলে, জনগণমন-টা গাইছি।

উুঁহু, ওটাও ক্যানসেল। ‘এসো নীপবনে ছায়াবীথি তলে’ গানটা কি পেশেন্ট জানে?

অরণ্য বলল, জানত এক সময়, কিন্তু বহুদিন আর অভ্যেস নেই।

ঠিক আছে, ডাক্তার ধরিয়ে দেবে—বলে কদমগাছটার দিকে তাকিয়ে গুনগুন করে উঠল তমালিকা।

এগারো

সকাল ন’টা নাগাদ কদমতলা বাসস্ট্যান্ডে নামল শুভম। চারদিকে গিজগিজে মানুষ। বাস, ট্যাক্সি, লরি, রিকশা ভ্যান—সব মিলে এক বিচ্ছিরি রকম হুটোপাটি। রাস্তার পাশে ভ্যাটভ্যাট করছে খোলা ড্রেন। সুধন্যকাকা মারা যাওয়ার পর কিছুদিন শিবপুরের বাড়িতে ছিল ওরা। তারপর বাড়িওলা ঝামেলা শুরু করল। মনে হয় কোনও প্রাোমোটারের নজরে পড়েছিল বাড়িটা। আজ জল বন্ধ তো কাল জানলার পাশে দুর্গন্ধময় আবর্জনা। বিরক্ত শুভম মাকে নিয়ে চলে এল কদমতলায়। এখানে ভাড়া একটু বেশি, কিন্তু বাড়িটা অনেক খোলামেলা। পরিবেশও মন্দ নয়।

কদমতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে কুচিল ঘোষ লেন হেঁটে মিনিটদশেক। রাস্তার ধার ঘেঁষে হাঁটছিল শুভম। বেলিলিয়াস রোডের মুখে দেখা হয়ে গেল সন্ধ্যাদির সঙ্গে। তাদের শিবপুর পাড়ার প্রতিবেশী। গোলগাল মিষ্টি চেহারা। সন্ধ্যাদি আর হাবুলদা দু’জনে মিলে একটা স্টেশনারি দোকান চালাত। ছোট্ট গাব্বু খুব আসত শুভমদের বাড়ি। শুভম লক্ষ করল খুব বিবর্ণ আর ক্লান্ত লাগছে সন্ধ্যাদিকে। সিঁথিটাও সাদা। তা হলে কি হাবুলদা…। সে জিগ্যেস করল, সন্ধ্যাদি এ দিকে কোথায়?

সন্ধ্যা বলল, আমার বোন এখানে থাকে; তোদের তিনটে বাড়ির পর—মাসিমার সঙ্গে তো মাঝেমাঝে দেখা হয়।

শুভম বলল, বাড়ির সব খবর কী?

সন্ধ্যা বলল, তোর দাদা তো হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়ে…তুই শুনিসনি কিচ্ছু?

শুভম একটু অপ্রস্তু হয়ে পড়ে। বলে, না শুনিনি তো কিছু— কত দিন হল?

এই তো বৈশাখ মাস এলে দু’বছর হবে।

তোমাদের দোকান? শুভম জিগ্যেস করল।

আমিই চালাচ্ছি এখন কোনও রকমে। গাব্বু তো এ বছর মাধ্যমিক দেবে; ও যত দিন না বড় হচ্ছে এভাবেই চালাতে হবে।

চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জলের ফোঁটা মুছে নিল সন্ধ্যা। বলল, যাস না একদিন সময় করে; গাব্বু তোর কথা খুব বলে। তুই না কি একটা হোম করেছিস?

শুভম বলল, হ্যাঁ, খুবই ছোটখাটো একটা।

কোথায় যেন?

জঙ্গলসুফি বলে একটা জায়গায়; যখন প্রথম জমিটা কিনেছিলাম তখন গ্রাম-গ্রাম ছিল জায়গাটা। এই ক’বছরে বেশ ডেভেলপ করেছে।

এই, আমার জানা একটা বাচ্চা আছে, বাবা-মা কেউ নেই— রাখবি বাচ্চাটাকে?

শুভম বলল, তা হলে তো হবে না সন্ধ্যাদি। আমার হোমটা একটু অন্য রকম—এখানে শুধু রেড লাইট এরিয়ার বাচ্চারাই থাকে; অন্য বাচ্চা এখানে রাখলে নানা প্রবলেম হবে। আমি তোমাকে অন্য হোমের সন্ধান দেব, তুমি যোগাযোগ কোরো।

বারতিনেক ডোর বেল টেপার পর ভেতর থেকে সুশীলার গলা পাওয়া গেল। শুভম বলল, মা আমি।

বেশ কিছুক্ষণ পর দরজা খুললেন সুশীলা। শুভম জিগ্যেস করল, কী করছিলে, এত দেরি!

সুশীলা বললেন, টিভি দেখতে দেখতে চোখ বুজে এসেছিল— এক বার শুলে আর উঠতে পারি না রে বাবা, গাঁটে গাঁটে ব্যথা।

শুভম দেখল, আরও একটু কুঁজো হয়ে গেছেন সুশীলা। হাত-পা কেমন ফোলা ফোলা। সুশীলার শরীর দ্রুত ভাঙছে। শুভম বহু বার বলেছে তার কাছে গিয়ে থাকতে, কিন্তু কিছুতেই যাবেন না সুশীলা।

ঘরে টিভি চলছিল। সুশীলা গিয়ে বন্ধ করে দিলেন। বললেন, একটা খবর দিয়ে আসবি তো!

জামা ছাড়তে ছাড়তে শুভম বলল, তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না; আমি হোটেল থেকে ভাত-তরকারি নিয়ে আসছি।

সুশীলা বললেন, বাড়ি এসে হোটেলের রান্না খাবি। আমি এখনও অতটা অকেজো হয়ে পড়িনি।

সে তো দেখতেই পাচ্ছি, পা টেনে টেনে চলছ! হাত পা ফোলা ফোলা।

সুশীলা বললেন, ও কিছু নয়, পায়ের দোষ আমার অনেক দিনের। শোন, ডাল তরকারি যা আছে দু’জনের হয়ে যাবে— দুটো ভাত চাপিয়ে দিতে আর কতক্ষণ! তুই বোস স্থির হয়ে; এত দিন পরে এলি; চেহারার কী দশা হয়েছে দেখেছিস?

শুভম হেসে বলল, তুমি প্রত্যেকবারই তো বলো চেহারা খারাপ হয়ে গেছে—এটা তোমার মনের ভুল।

না রে এবার সত্যি বড় রোগা হয়ে গেছিস, খাওয়া-দাওয়া করিস তো ঠিকমতো?

তা করি।

কে জানে বাবা; কেউ তো আর দেখবার নেই!

শুভম বলল, সেই জন্যেই তো তোমাকে বলি, আমার সঙ্গে চলো।

সুশীলা বলল, আমি আর কত দিন, তারপর তোর কী হবে!

মা, শেষ পর্যন্ত আমাদের কার ভাগ্যে কী আছে কেউ জানি না। আমার কি আর বিয়ের বয়েস আছে?

কেন থাকবে না। তোর কী এমন বয়েস বল—কত বুড়ো বয়েসে লোক বিয়ে করছে।

 সে যারা করছে করুক। আর বিয়ে করলে বউ ছেলেপুলেই যে শেষ পর্যন্ত দেখবে তারই বা ঠিক কী! সুধন্যকাকার কথাটাই একবার ভেবে দেখো না।

তার তো পরিবার মরে গেসল।

ছেলেরা তো ছিল।

তা ছিল; কিন্তু সবার বেলায় অমন হবে ভাবছিস কেন?

শুভম আর কথা বাড়াল না। লক্ষ করল, সুধন্যকাকার প্রসঙ্গ উঠতে একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন সুশীলা। দেওয়ালে টাঙানো সুধন্যকাকার ছবিটার দিকে চোখ চলে গেল শুভমের। একটা আধশুকনো মালা ঝুলছে, বোঝা যায় দু’তিন দিনের বেশি বাসি হয়নি। চকিতে শুভমের মনে পড়ে গেল দু’দিন আগেই সুধন্যকাকার মৃত্যুদিন ছিল।

ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা খবরের কাগজটা বের করে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল শুভম। কাগজে চোখ বোলাতে বোলাতে ঘুম নেমে এল চোখে।

হঠাৎ তন্দ্রা ছিঁড়ে গেল শুভমের। সুশীলা ডাকছে; চান করবি তো উঠে পড়, আমি ঠাকুরঘরে ঢুকছি।

ঘড়ি দেখল শুভম। বারোটা দশ। বাথরুমে ঢুকে পড়ল শুভম। শাওয়ার খুলে দিতেই ধুয়ে গেল ক্লান্তি।

খেতে বসে রীতিমতো চমকে উঠল শুভম। এর মধ্যেই এত কাণ্ড করে ফেলেছেন সুশীলা। একেবারে যাকে বলে পঞ্চব্যঞ্জন। শুভম বলল, মা কী দরকার ছিল এ সবের।

সুশীলা বললেন, দুটো তো মোটে তরকারি, আর ভাজাভুজি।

তুমি বসবে না?

তোর হয়ে যাক, তার পর বসব।

কিন্তু শুভমের পীড়াপীড়িতে বসতে হল সুশীলাকে।

সুশীলা বললেন, আজ থাকবি তো?

শুভম বলল, না মা, থাকার উপায় নেই; খেয়েদেয়েই বেরিয়ে পড়ব।

খেয়ে উঠেই কেউ যায়! বিকেলবেলা যাবি।

না গো, আজ একবার নীলমণি মিত্র স্ট্রিটে যেতে হবে— মা, তোমার চারুকে মনে আছে?

কোন চারু, রমলার মেয়ে?

হ্যাঁ, চারু ওর মেয়েকে আমার হোমে রাখতে চায়, ওর সঙ্গে দেখা করব একবার।

সুশীলা বলেন, আমার একবার খুব যেতে ইচ্ছে করে, কত দিন দেখিনি ওদের!

চলো একদিন, আমাকে তো মাঝেমধ্যে যেতে হয়। জবামাসি রেণুদি সবাই তোমার কথা বলে। রেণুদির মেয়ে আমাদের হোমে থাকে—এবার হায়ার সেকেন্ডারি দেবে।

ঘিঞ্জি গলিটায় যখন ঢুকল শুভম তখনও বিকেল ফুরিয়ে যায়নি। কিন্তু এর মধ্যেই জেগে উঠছে গলিটা। কয়েকজন মেয়ে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে গেছে রাস্তায় ধারে। দু’চারজন খদ্দেরও উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। বাতাসে কষা মাংসের গন্ধ, গাঁক গাঁক করে হিন্দি গান বাজছে। পাকা চুলের থপথপে একটা বুড়ি চিৎকার করে কারও মা-মাসি উদ্ধার করছে। শুভম কাছে গিয়ে দেখল পদ্মমাসি। ইদানীং চোখে বোধহয় ভালো দেখতে পায় না। চিনতে পারল না শুভমকে।

চায়ের দোকানে বসে ছিল দিলু। ভালো ঘুড়ি ওড়াত—ওর মাঞ্জা ছিল এ তল্লাটের সেরা। মাঞ্জার ভাগ সবাই জেনে যাবে বলে মাঞ্জা তৈরির সময় কাউকে থাকতে দিত না। কেমন যেন বয়েসের ছাপ পড়ে গেছে দিলুর চেহারায়। শুভমকে দেখে বেরিয়ে এল। বলল, কী রে, কেমন আছিস?

শুভম বলল, এই আছি এক রকম।

অনেক দিন পরে এলি।

হ্যাঁ, সময় পাই না; তুই কেমন আছিস?

ভালো নয় রে!

কেন, কী হল আবার?

মুখের কাঁচা-পাকা বিজবিজে দাড়ি চুলকোয় দিলু। বলে, বাজার খুব খারাপ। হামেশাই পুলিশের রেড হচ্ছে, কাস্টমার কমে যাচ্ছে দিন দিন। মা আজ মাসখানেক হল বিছানায় পড়ে; ওষুধ, ডাক্তার—একদম জেরবার হয়ে যাচ্ছি। একটা উপকার করবি শুভ?

কী, বল।

কিছু টাকা দিবি? একটু সামলেই শোধ দেব।

শুভম বলল, কত?

শ’খানেক হলে ভালো হয়।

অত টাকা তো হবে না, পঞ্চাশ হতে পারে।

পানপরাগের প্যাকেট পাকিয়ে দাঁত খুঁটতে খুঁটতে দিলু বলল, তাই দে।

শুভম জানে টাকাটা গেল। চারুর ঘরের দিকে এগোল সে। মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে পড়ল। ছোটখাটো একটা জটলা। গলা উত্তুঙ্গে তুলে চিৎকার করছে একটা মেয়ে। সঙ্গে বাছা বাছা গালাগালি। মেয়েটাকে ভালো করে দেখল শুভম। চিনতে পারল না। নতুন এসেছে মনে হয়। ভিড়ের মধ্যে চারুকে দেখল শুভম। জিগ্যেস করল, কী হয়েছে রে?

আর বলো কেন, রোজ অশান্তি! মহা হারামি মাগি! এখন গতর আছে, কাস্টমারের ঠেল আছে, গরমের চোটে অস্থির!

কী হয়েছে বলবি তো!

রিনা যখন কাস্টমার করতে বেরোচ্ছিল জবামাসির চুল না কি ওর গায়ে ঠেকে গেছে। জবামাসি বলছে, দেখিনি; আর রিনা বলছে জবামাসি ইচ্ছে করে ওর কাস্টমার মারার জন্যে চুল লাগিয়ে দিয়েছে। যাক গে, বাদ দাও—কখন এলে?

শুভম বলল, এই আসছি; তুই আজকে কাস্টমার করবি না?

না আজ শরীরটা ভালো নেই।

তোর মেয়ে কোথায়?

পড়তে গেছে।

কোথায়?

ওই তো, পাড়ায় এখন নাইট-ইস্কুল হচ্ছে।

শুভম বলল, তা হলে তো ভালোই; এখানে পড়াশুনো করুক না।

হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়িয়ে পড়ল চারু। বলল, না, শুভদা এখানে চারদিকে লোভানি ফাঁদ। এখানে থাকলে ওকে বাঁচাতে পারব না; তুমি নিয়ে যাও ওকে।

বারো

অবনী গুহর বাড়িতে দু’রকম কোয়ালিটির চা থাকে। এক নম্বর আর দু’ নম্বর। মিটিং থাকলে দু’নম্বর চা-টা হয়। খেতে অনেকটা বার্লির মতন, সঙ্গে একটু গুমো গন্ধ—সেটা ঢাকতেই বোধহয় ছোট এলাচ দেওয়া থাকে।

এক নম্বর চা-টা দু’একবার পেটে পড়েছে অরণ্যের। যেমন লিকার তেমন ফ্লেভার। অবনীর বাড়িতে একা এলে মাঝেমধ্যে জুটে যায়। অরণ্য একবার কত করে কিলো জিগ্যেস করেছিল অবনীকে। উত্তরে অবনী মোনালিসার মতো একটা রহস্যময় হাসি হেসেছিল।

অরণ্য লক্ষ করেছে মিটিং-এ লোকজনের প্রভূত উৎসাহ। সে পার্টি মিটিং হোক বা হরিসভা কমিটির, কিছু লোক গম্ভীর মুখে হাজির হয়। তাদের মধ্যে বেশির ভাগ সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক কিছু কথা বলে, অন্যের কথা না শুনেই চলে যায়। অরণ্যদের পার্টি মিটিং-এর অবস্থাটা অবশ্য এতটা করুণ নয়। মোটামুটি একটা ডিসিপ্লিন থাকে, কিছু কাজের কথাও হয়। কিন্তু তবুও পার্টি মিটিং-এ এলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢুলুনি আসে তার।

সন্ধে সাতটায় সময় দেওয়া ছিল। এখন সাড়ে সাতটা। অবনী গুহর বৈঠকখানা ভরতি। পঞ্চায়েত প্রধান পরেশ সামন্ত টানা বকবক করে যাচ্ছে—কমরেড, আমাদের উন্নয়নের কথা বেশি করে বলুন লোককে। চারদিকে ফ্লাই ওভারব্রিজ তৈরি হচ্ছে, গ্রামের রাস্তাঘাট ভালো হয়েছে, ইলেকট্রিসিটি এসেছে, চাষবাসের কত উন্নতি হয়েছে—এসব বলুন।

একেবারে কোণের দিকে বসেছিল কুকুরে পল্টু। এ অঞ্চলে তিনটে পল্টু আছে। একটা বেঁটে—সে গ্যাঁড়া পল্টু, একজন জুয়ার পেনসিলার—সে সাট্টা পল্টু, আর এই পল্টুর একটা বড় অ্যালসেশিয়ান কুকুর আছে—তাই সে কুকুরে পল্টু। কুকুরে পল্টু বলল, সানা পাড়ার রাস্তাটা এবার করতেই হবে, ওদের মনে হেভি ক্ষোভ।

অবনী বলল, সানা পাড়ার রাস্তা এখন হবে না। ওখান থেকে আমরা ক’টা ভোট পাব? খুব বেশি হলে বিশ-তিরিশটা। ওই ক’টা ভোটের জন্যে এখন রাস্তা করা যাবে না। ভোট বাড়লে দেখা যাবে।

পরেশ সামন্ত ফের শুরু করল—আপনারা শিক্ষার কথা বলবেন। এখন গ্রামে গ্রামে ইস্কুল, আমরাই গরিব মানুষের লেখাপড়া শেখার সুযোগ করে দিয়েছি।

বড় একটা হাই উঠল অরণ্যের। কিন্তু এখন ঘুমিয়ে পড়লে ক্যাচাল হয়ে যাবে। মনে মনে সে তমালিকার মুখটা চিন্তা করে। এটা করতে গিয়ে আজকাল অনেকটা সময় খরচ হয়ে যায়, কিন্তু দিব্যি কেটেও যায় সময়টা। তমালিকার মুখটার একটাই প্লাসপয়েন্ট —অনেকক্ষণ দেখলেও বোর হতে হয় না।

পরেশের ভ্যাজভ্যাজানির মাঝে ফার্স্ট রাউন্ড চা এসে গেল। ততক্ষণে তমালিকার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে দিয়েছে অরণ্য। তমালিকাকে বলল, তুমি একদম পাংচুয়াল নও।

একটু গম্ভীর হয়ে তমালিকা বলল, মেয়েদের কত রকম সমস্যা তুমি জানবে কী করে!

সমস্যা ছেলেদেরও আছে।

হয়তো আছে, কিন্তু মেয়েদের তুলনায় অনেক কম।

জানো, মাসমণি মনে হয় কিছু সন্দেহ করছে।

‘বিরোধীদের সন্দেহ আমরা টাকা চুরি করি। আপনারা বলবেন, চুরি করলে এত উন্নয়ন হচ্ছে কী করে। ওদের পার্টির ছন্নছাড়া অবস্থার কথা বলবেন। এক পার্টির যত জন নেতা, তত রকম মত, অন্য পার্টিতে দিদির ইচ্ছেই সব। তার মেজাজ-মর্জিতে দল চলে; একবার মন্ত্রিসভায় ঢুকছে আর-একবার বেরচ্ছে। দিনরাত শুধু সস্তা নাটক করে যাচ্ছে। না আছে কোনও ইকনমিক পলিসি না আছে কোনও শিক্ষানীতি।’

ভ্যাট খালি বাজে কথা!

সত্যি বলছি, এখন কোথাও বেরোলে হাজার প্রশ্ন করে। সেদিন দেরি হচ্ছিল বলে নিজেই খুঁজতে বেরিয়েছিল।

ঠিক আছে, জানতে চাইলে বলবে হোমে যাচ্ছি।

তমালিকা বলল, কিন্তু বেশি রাত করে আর ফেরা যাবে না— নদীয়ার মানতলায় যে ঘটনাটা ঘটল তাতে মাসিমণি খুব ভয় পেয়ে গেছে। খুব স্বাভাবিক, বলো—এতগুলো মেয়ের…ওগুলো মানুষ না পশু!

অরণ্য লক্ষ করল, তমালিকার মুখে গভীর বিষাদ। সে বলল, ওটা নিয়ে ভেবো না, আমাদের এই এলাকাটা অনেক সেফ।

‘আপনারা আইন-শৃঙ্খলার কথা বলবেন। আমাদের পার্টিতে চোর ডাকাত খুনি শেলটার পায় না। আমাদের রাজ্যে মেয়েরা অনেক নিরাপদ—দিনে রাতে যখন খুশি, যেখানে খুশি যেতে পারে।’

অরণ্য সোজা হয়ে বসল। বলল, একটা কথা বলব পরেশদা?

পরেশ মণ্ডল কথা থামিয়ে অরণ্যের দিকে তাকাল। বলতে বলতে বেশ মুড এসে গিয়েছিল। ধাক্কা খাওয়ায় একটু বিরক্ত। বলল, বলে ফেল।

অরণ্য গলাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে বলল, মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের এখন কিছু না বলাই ভালো।

পরেশ মণ্ডল গলায় একটু ঝাঁঝ এনে বলল, কেন বল তো, অসুবিধেটা কোথায়?

আমাদের এখানে মেয়েরা কি সত্যিই সেফ?

আলবাত সেফ! ধর্ষণের রেট এখানে সবচেয়ে কম। বিহার ইউপি রাজস্থানে অনেক বেশি রেপ হয়।

মানতলায় যে ঘটনা ঘটল তার পরেও তুমি বলবে…

মুহূর্তে থমথমে হয়ে গেল ঘরের পরিবেশ। ফস করে একটা সিগারেট ধরিয়ে ঘন ঘন টান দিল অবনী। তারপর বলল, ওটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা, সামান্য একটা ঘটনা নিয়ে একটা সিন্ধান্তে পৌঁছোনো যায় না।

‘সামান্য ঘটনা’ কথাটা কানে যেতেই অরণ্যের মেজাজটা বিগড়ে গেল। বলল, কতগুলো মেয়েকে স্কুলবাড়িতে টেনে নিয়ে গেল, সারারাত অত্যাচার করল, একটা পুলিশ সেদিন ওই রাস্তায় গেল না—এটাকে তুমি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলবে!

অবনী কেটে কেটে বলল, ওই রকম কেস বিহার ইউপি-তে হামেশাই হয়; এখানে তো মাত্র একটা।

তাহলে আমাদের মানদণ্ডটা কি বিহার আর ইউ পি? লোকে এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে; পার্টির লোক সরাসরি ইনভলভড—কী কৈফিয়ত দেব মানুষকে?

সিগারেটে বড় করে একটা টান দিল অবনী। তারপর বলল, বলবি, যে-ক’জন অ্যারেসটেড হয়েছে তাদের মধ্যে ওদের লোকও আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা ক্রিমিনালদের পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে, তাদের বিচার হবে, পানিশমেন্ট হবে—এটাই তো পরিচ্ছন্ন প্রশাসন। ব্যাস, আর কী চাই। আর একটা কথা মনে রাখবি কেসটা সদ্য হয়েছে তো, তাই মানতলা একটু কুটকুট করছে; কিছুদিন পরে দেখবি মানতলা কচুতলা সব হজম করে নিয়েছে পাবলিক।

অরণ্য চুপ করে গেল। তার পাশে বসে হাতের তালুতে খৈনি মাড়ছিল জানকী সর্দার। জানকী বিভাসের লোক। অরণ্যের ভূমিকা দেখে একটু উৎসাহিত। খৈনিটা মুখে পুরে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, আমার একটা কথা বলার আছে।

দৃষ্টিগুলো এখন জানকীর দিকে।

বলে ফেল। অবনী বলল।

লাহাপাড়ার ওই বুড়িটার জমি মেরে দেওয়াটা কি ঠিক হল? লোকে কিন্তু ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখছে না।

জঙ্গলসুফিতে মিছরি লাহার জমি নিয়ে হইচই হয়েছে খুব। মিছরি নি:সন্তান বিধবা। কিছুদিন আগে তার জমির ওপর রাতারাতি একটা ক্লাবঘর তৈরি হয়েছে। ক্লাবের ছেলেগুলো অবনীর পেটোয়া। বিভাস সাহা নখ-দাঁত বের করে বাধা দিয়েছিল। থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়াল ব্যাপারটা। আগেভাগেই বিকাশ চৌধুরীকে লাইন করে ফেলল অবনী। পুলিশ এসে শুধুমাত্র মিছরি লাহাকে দু’একটা মামুলি প্রশ্ন করে চলে গেল। সেই যে গেল আর এমুখো হল না।

এর পর বিভাস অন্য রাস্তা ধরল। মাঝেমাঝেই রাতে ক্লাবের দরজায় কেউ গু মাখিয়ে দিয়ে যেত। কিন্তু অবনীর চেলা-চামুণ্ডাদের মধ্যে মোদো-মাতাল আর গাঁজাখোরের অভাব ছিল না। মল-মূত্র তারা থোড়াই কেয়ার করে। সকালবেলা ধুয়েমুছে সাফ করে ফেলত ক্লাব-ঘরের দরজা। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই হতাশ হয়ে পড়ল বিভাসের দল। আজ সুযোগ বুঝে প্রসঙ্গটা তুলে ফেলল জানকী। জানকীর পাশে বসেছিল পিল্টু আর খোকা। তারাও খোঁচা দিল একটু। বলল, ঠিকই, বিধবার জমি; পার্টির খারাপ ইমেজ তৈরি হচ্ছে একটা।

ফের সিগারেটে ঘন ঘন ক’টা টান দেয় অবনী। চোখগুলো বোজা। বোধহয় মেপে নিচ্ছে অপনেন্টের ওজন। আর কেউ কিছু বলছে না দেখে সরাসরি জানকীর দিকে তাকিয়ে বলল, জমিটা কার ভোগে লাগছে?

জানকী একটু থতোমতো খেয়ে বলল, মানে!

মানে আবার কী; জমিটার ওপর কেউ পার্সনালি বাড়ি বানিয়েছে, না দোকান ঘর তুলেছে?

আমি তো তা বলিনি। কিন্তু অন্যের জমির ওপর ক্লাবঘর করাটা ঠিক হয়নি।

অবনী বলল, জমিটা বুড়ির কোন কাজে লাগছিল?

পিন্টু বলল, এখন না লাগলেও পরে তো লাগতেই পারে।

সে তো কোনও এক দিন মাসির গোঁফও গজাতে পারে। বুড়ির তিনকুলে কেউ নেই, কী হবে তার জমি? আর এ জন্যে —বুড়ি তো না খেতে পেয়ে মরছে না! তোমরা খামোখা এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন?

ভেতর বাড়ি থেকে সেকেন্ড রাউন্ড চা চলে এল। তমালিকার সঙ্গে কথা বলার মুডে ফার্স্ট রাউন্ডের চা-টা খেয়ে ফেলেছিল অরণ্য। অতটা গন্ধ-টন্ধ লাগেনি। এবার সজ্ঞানে ওই চা খাওয়ার রিস্ক নিল না সে।

চায়ের পর অবনী শুরু করল। বলল, ঊনত্রিশ তারিখের কথাটা সবার মাথায় আছে তো? মন্ত্রী আসবে কাঁটায় কাঁটায় সাতটা। আমরা কিন্তু চারটের সময় স্টার্ট করব। প্রচুর প্রাোগ্রাম। গান, আবৃত্তি, বক্তৃতা, নাচ সব থাকবে।

খোকা বলল, বক্তৃতা কে কে দেবে?

অবনী বলল, মন্ত্রী তো দেবেই— ওটা শেষে থাকবে। তার আগে রাঘবদা দেবে, বিকাশদা দেবে, পরেশদা দেবে আর আমি দেব।

খোকা ফুট কাটল—বিভাসদা কী দোষ করল?

একটু থমথমে গলায় অবনী বলল, পার্টিতে একটা ডিসিপ্লিন আছে, সবকিছু একটা নিয়ম মেনে হয়। তুই তো পার্টিতে নতুন নয়, তোর এগুলো জানা উচিত। এখানে বিভাস সাহাকে চান্স দিলে আরও অনেককে দিতে হয়।

কিন্তু তুমি যা লিস্ট দিলে তাদের অনেকের চেয়ে বিভাসদা ভালো বলতে পারে।

এই ইঙ্গিতটা পরিষ্কার অবনীর দিকে। ওই একটা জায়গায় মারাত্মক ঝাড় খেয়ে গেছে সে। স্টেজে উঠে মাইক ধরলে কেমন যেন সব তালগোল পাকিয়ে ফেলে। আলুর দরের কথা বলতে গিয়ে উচ্ছের দর বলে ফেলে। শিক্ষানীতি প্রসঙ্গে পাশের হার বলে যেটাকে উল্লেখ করে সেটা আসলে ফেলের হার।

একটু উত্তেজিত হয়ে পড়ে অবনী। গলাটা চড়ে যায়। বলে, শোন, দুটো কোটেশন ঝাড়লেই বক্তৃতা হয় না। আমাদের গরিব-গুর্বোদের পার্টি, সেইসব মানুষকে তাদের মতো করে বোঝাতে হয়।

উত্তেজনার চোটে উঠে দাঁড়ায় অবনী। দরজার দিকে পা বাড়ায়। মিটিং ছেড়ে চলে যাবে। কয়েকজন তাড়াতাড়ি ধরে বসিয়ে দিল অবনীকে।

অবনী বসল বটে কিন্তু ফোঁস ফোঁস করতে লাগল, সব বুঝি আমি—কে কাকে ওসকাচ্ছে, কে কলকাঠি নাড়ছে; আমাকে এত সহজে ডাউন করা যাবে না।

জানকীরা চুপ করে গেছে। পরেশ সামন্ত বলল, ছি:, ছি:, এখন নিজেদের মধ্যে ঝগড়ার সময়! এসব খবর লিক করে গেলে কী কেলেঙ্কারি হবে বল তো!

তরুণ রায় বলল, আমরা কিন্তু মেন পয়েন্ট থেকে সরে যাচ্ছি।

পরেশ সামন্ত বলল, সেই কথাই তো বলছি—ঊনত্রিশ তারিখের প্রাোগ্রামটা যাতে সাকসেসফুল হয় সেটা দেখতে হবে। মাঠ যেন একবারে ভরতি থাকে। দুটো কাগজ আর তিনটে টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার আসবে। সবাইকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোক বের করতে হবে। কেউ রাজি না হলে প্রথমে ভালো কথায় বোঝাবে, কাজ না হলে একটু মোলায়েম হুমকি দেবে কিন্তু বাড়াবাড়ি চলবে না। আমাদের পার্টির একটা কালচার আছে। তা ছাড়া অনেকগুলো অ্যাঙ্গেল থেকে ব্যাগড়া দেওয়ার চেষ্টা চলছে; কোনওরকম ঝামেলা না হয়। বিকাশ, তুই চারুদার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিস?

ঘরের দেওয়ালে পৃথিবী কাঁপানো এক বিপ্লবী নেতার ছবি। বিকাশ ছবিটার দিকে তাকিয়ে বোধহয় অন্য কথা ভাবছিল। বলল, কোন চারুদা।

চারুদা আর ক’টা আছে, বাস ইউনিয়ানের চারুদা।

বিকাশ বলল, চারুদা বলেছে বাসের জন্যে ভাবতে হবে না, রুট থেকে সব বাস তুলে নেবে।

এক নম্বর চায়ে লম্বা চুমুক দিল অরণ্য। মিটিং শেষ হয়ে গেছে একটু আগে। মেঝেতে পাতা শতরঞ্চিগুলো গুটিয়ে দলা পাকানো। ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে প্লাসটিকের কাপ। ঘরে অবনী আর পরেশ সামন্ত। দু’জনেই চুপচাপ চায়ে চুমুক দিচ্ছে। এক নম্বর চা-টা খেলেই মনটা সিগারেটের জন্যে ছোঁকছোঁক করে। উঠে দাঁড়াল অরণ্য। অবনী জিগ্যেস করল, কোথা যাবি।

বাথরুমে।

চিনিস তো? সোজা চলে যা, উঠোনের কোণে।

চায়ের মতো অবনীর বাথরুমও দুটো। একটা বারান্দার শেষ প্রান্তে, আর একটা উঠোনে। বারান্দার বাথরুমটা ঝকঝকে, টাইলস বসানো এবং সব রকমের গ্যাজেট সজ্জিত। অবনী বাইরের কাউকে ওটাতে ঢুকতে দেয় না, উঠোনেরটা দেখিয়ে দেয়।

অরণ্য বলল, আমি বাইরে যাচ্ছি।

বাইরে সিগারেট খেয়ে ফের ঘরে ঢুকল অরণ্য। অবনী আর পরেশ নীচু স্বরে কিছু একটা আলোচনা করছিল। অরণ্যকে দেখে চুপ করে গেল।

দেওয়ালে টাঙানো ইলেকট্রনিক্স ঘড়িটা বেজে উঠল টুংটাং করে। ন’টা। অরণ্যের হঠাৎ মনে পড়ল মা গুঁড়ো হলুদ আর পাঁচফোড়ন নিয়ে যেতে বলেছে। আর দেরি করলে দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। অবনীর দিকে তাকিয়ে বলল, কী বলবে, তাড়াতাড়ি বলো।

অবনী আড়চোখে তাকাল। কেন, খুব তাড়া আছে?

হ্যাঁ, একটু আছে।

কোথায় যাবি?

যাব আর কোথায়, মুদির দোকান থেকে ক’টা জিনিস নিতে হবে।

ধোঁয়ার একটা রিং ছেড়ে অবনী বলল, তুই দেখছি আজকাল খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিস!

অরণ্যের ভুরু দুটো কুঁচকে গেল। বলল, কেন বলো তো!

তোকে তো আজকাল পার্টির কাজে পাওয়াই যায় না।

কেন, কোন কাজে ডেকে আমাকে পাওনি?

সিগারেটটা শেষ করে একটা এঁটো চায়ের কাপে গুঁজে রাখল অবনী। তারপর ধীরে ধীরে সব ধোঁয়াটা ছেড়ে বলল, শবরী তোকে মিলেনিয়াম পার্কে যাওয়ার কথা বলেছিল, তুই রাজি হোসনি।

শবরীর সঙ্গে বেড়াতে যাওয়াটাও পার্টির কাজের মধ্যে পড়ে না কি! অরণ্যের গলাটা একটু রুক্ষ হয়ে গেল।

অবনী গম্ভীর গলায় বলল, কোনটা পার্টির কাজ আর কোনটা নয়, সেটা কি তুই ঠিক করবি?

তা হয়তো করব না, কিন্তু কারও সঙ্গে বেড়াতে যাওয়াটা যে পার্টির কাজের মধ্যে পড়ে না সেটুকু বোধ আমার আছে।

একটা মার্ডারারকে সেভ করার জন্যে আমি থানায় ইনফ্লুয়েন্স করছি— এটাও তাহলে পার্টির কাজ নয়। তুই কী বলিস?

অরণ্য চমকে উঠে অবনীর মুখের দিকে তাকায়। তাকিয়েই থাকে। একটাও কথা বলতে পারে না।

তেরো

তোমার কি মনে হয় বনধ-অবরোধ এসব করে কিছু লাভ হয়?

কিছু তো হয়ই; না হলে চারদিকে এত হচ্ছে কেন!

চারদিকে হচ্ছে বলেই সেটা যে কাজের জিনিস, তা কিন্তু জোর দিয়ে বলা যায় না। তাহলে তো বলতে হয় চারপাশে এত উগ্রপন্থী ক্রিয়াকলাপ সেটাও ভালো।

কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ তাও কি এত সহজে ডিসাইড করা যায়! এই যে নদীটা বয়ে যাচ্ছে—সেটা ভালো না মন্দ, এক কথায় বলবে কী করে? এই নদী মাটি ভিজিয়ে ফসল ফলাচ্ছে, আবার দুকূল ভাসিয়ে কত মানুষের আশ্রয় কেড়ে নিচ্ছে।

সূর্য অস্ত গেছে একটু আগে। শেষ বিকেলের মরা আলোয় নদীর জল ধূসর। কালচে সবুজ রঙের শ্যাওলা ভেসে যাচ্ছে স্রোতের টানে। দূরে কালো কালো ক’টা নৌকো অলস ভঙ্গিতে ভেসে ভেসে বালি তুলছে। পাড়ে বসে বালি দিয়ে ঘর বানাতে বানাতে তমালিকা বলল, কিন্তু মাথাটা যে ফাটল, খুব নিশ্চিতভাবেই বলা যায় এটা খারাপ ব্যাপার।

অরণ্যের মাথায় বেড় দেওয়া সাদা রঙের ফেট্টি। বাঁ রগে সাদার ওপর লালচে ছোপ। সিগারেটে একটা আলতো টান দিয়ে অরণ্য বলল, পথ অবরোধের সঙ্গে এটাকে এক করে ফেললে ভুল হবে। এটা সিম্পলি একটা অ্যাক্সিডেন্ট। বাথরুমে পড়ে বা রাস্তায় ধাক্কা লেগেও হতে পারত।

এক ঝটকায় বালির একটা ঢিপি ভেঙে দিয়ে তমালিকা বলল, ধ্যাত, তোমার খালি বাজে অজুহাত। এ বার পথ অবরোধ বা থানা ঘেরাও থাকলে হেলমেট পরে যেও।

অরণ্য হেসে ফেলল। বলল, পুলিশদের মতো?

ধাক্কাটা অল্পের ওপর দিয়ে গেছে, ফ্যাটাল কিছু হতে পারত।

তা পারত।

কে ইটটা ছুড়েছে, বুঝতে পেরেছ?

না, ধরতে পারলে তো তার…। অরণ্য একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল।

দু’দিন আগে পার্টি অফিসে বসেছিল অরণ্য। সদ্য পার্টিতে ঢোকা ইয়াং দুটো ছেলে টিভি দেখছিল। হঠাৎ সুখেন এসে খবর দিল কুসুমকুমারী গার্লস স্কুলের হেড মিস্ট্রেসকে মানিক মোদকের লোকজন ঘেরাও করেছে। সঙ্গে সঙ্গে ছেলে দুটোকে নিয়ে স্পটে ছুটে গেল অরণ্য। এসব ক্ষেত্রে পার্টির সিনিয়র লিডারদের জানানোই নিয়ম। কিন্তু ইচ্ছে করেই অবনী গুহ বা পরেশ মণ্ডলকে এড়িয়ে গেল সে।

 সে দিনের মিটিং-এর পর মনটা বিগড়ে গিয়েছিল। স্কুলে গিয়ে দেখল ব্যাপারটা বেশ পাকিয়ে উঠেছে। হেড মিস্ট্রেসকে চেয়ার ছেড়ে উঠতে দিচ্ছে না মানিক মোদকের ছেলেরা। হেডমিস্ট্রেসের উলটোদিকে বসে আছে বিশু।

বিশুকে দেখেই মেজাজটা আর একটু গরম হয়ে গেল অরণ্যের। আগে তাদের পার্টিতে ছিল। গুণের ছেলে। মদ সাট্টা বেলেল্লাপনা কিছু বাদ দেয় না। পরেশ মণ্ডলের সঙ্গে একবার ঝামেলা হয়। কলকাতায় দিদি তখন নতুন দল করেছে। তার পালে তখন জোর হাওয়া। ভাবখানা এই যে দিদি বিধানসভার দখল নিল বলে। বিশু ভিড়ে গেল সে দলে। কিছুদিন পরে সেখান থেকে ফের ভোল পালটে মানিক মোদকের খাতায় নাম লিখিয়েছে।

হেডমিস্ট্রেসের সামনে বসে টেবিল চাপড়াচ্ছিল বিশু— আপনারা সব পার্টির দালাল; ইস্কুলটা পার্টিবাজির জায়গা নয়।

মধ্যবয়সি হেডমিস্ট্রেস এই নভেম্বর মাসেও কুলকুল করে ঘামছেন। চোখ-মুখে অসহায় আর্তি। ঘনঘন ঢোক গিলছেন। বললেন, বিশুবাবু আপনি আসল ঘটনা না জেনে অহেতুক উত্তেজিত হচ্ছেন; আমি তো বলছি…

বিশু আরও একটু গলা চড়াল—আমার সব জানা আছে, আমি কোনও কথা শুনতে চাই না; ওই দিদিমণিকে আর আপনাকে ক্ষমা চাইতে হবে।

অরণ্যের খুব ইচ্ছে করছিল বিশুর কলার ধরে টেনে তুলে সাঁটিয়ে একটা চড় মারে। কিন্তু পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যেতে পারে বুঝে নিজেকে সামলে নিল। সে স্টাফরুমের দিকে এগোল। দরজার কাছে অল্পবয়সি একজন শিক্ষিকা দাঁড়িয়ে। চোখ-মুখে আতঙ্ক। অরণ্য জিগ্যেস করল, কী হয়েছে?

মেয়েটি একটু সন্দেহের চোখে অরণ্যকে দেখল। বোধহয় ভাবছে এ আবার কে! অরণ্য বলল, গার্লস স্কুলে কতগুলো রাফিয়ান এসে অসভ্যতা করছে—আপনারা এক্ষুনি থানায় ফোন করুন।

এবার মেয়েটির কিছুটা বিশ্বাস জন্মাল অরণ্যের ওপর। বলল, দেখুন, এরা একটা নন-ইস্যুকে…

অরণ্য বলল, ব্যাপারটা কী?

মেয়েটি সভয়ে একবার হেডমিস্ট্রেসের ঘরের দিকে তাকাল। তার পর গলা নামিয়ে বলল, কাল একটি মেয়ে স্কুল ইউনির্ফম পরে আসেনি; তো আমাদের একজন টিচার তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। আজ দেখুন না, এরা এসে বলছে মেয়েটিকে না কি প্রচণ্ড মারধর করা হয়েছে।

অরণ্য বলল, আপনারা ইমিডিয়েট থানায় ফোন করুন।

আরও কয়েকজন শিক্ষিকা এসে দাঁড়িয়েছে অরণ্যের সামনে। তাদের মধ্যে টুলার বোন শিপ্রাও আছে। স্কুল-লাইফে টুলার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব ছিল অরণ্যের। শিপ্রা বলল, থানার নাম্বার তো আমাদের কাছে নেই, তুমি একবার থানায় ইনফর্ম করো, দেখছ তো কী অসভ্যতা করছে।

পার্টির ছেলে দুটোকে ডাকল অরণ্য। বলল, তোরা এখানে থাক, আমি ঝট করে একটা ফোন করে আসছি।

দ্রুত পা চালিয়ে বাইরে এল অরণ্য। উলটোদিকেই একটা টেলিফোন বুথ। বুথে ঢুকে খেয়াল পড়ল টেলিফোন-ইনডেক্সটা বাড়িতে ফেলে এসেছে। থানার নাম্বারটাও স্মরণ করতে পারল না। নিরুপায় হয়ে অবনীর বাড়িতে ফোন করল। কাজের মেয়েটি মনে হয় ফোন ধরেছিল। ‘দাদাবাবু বাড়ি নেই’—বলে ঘটাং করে রিসিভার নামিয়ে রাখল। অবনীর মোবাইলে করে দেখল সুইচ অফ। বুথ থেকে বেরিয়ে খুব জোরে সাইকেল চালিয়ে অরণ্য থানায় চলে এল। ওসি নেই। মেজোবাবু চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছে। অরণ্যকে দেখে একগাল হাসল—আরে অরণ্যবাবু যে, কী খবর? হাঁপাচ্ছেন কেন?

অরণ্য বলল, এক্ষুনি চলুন।

কোথায়?

গার্লস স্কুলে।

খবরের কাগজে চোখ রেখেই মেজোবাবু জিগ্যেস করল, গার্লস স্কুলে আবার কী ঝামেলা পাকালেন?

আমি পাকাইনি; বিশু।

কোন বিশু? কী করেছে? মেজোবাবুর চোখ তখনও খবরের কাগজে।

বিশুকে চেনেন না? বিশ্বনাথ দাস-মানিক মোদকের চামচেগিরি করে; দলবল নিয়ে হেডমিস্ট্রেসকে ঘেরাও করেছে। তাড়াতাড়ি চলুন।

খবরের কাগজ থেকে চোখ তুলে সরাসরি অরণ্যের দিকে তাকাল মেজোবাবু। বলল, আপনাকে এখানে কে পাঠাল?

কে আবার পাঠাবে! বিরক্ত হয়ে অরণ্য বলল, আমি খবর পেয়ে গিয়ে দেখলুম বিশু দলবল নিয়ে অসভ্যতা করছে।

কেসটা কী? মেজোবাবু চায়ের কাপে লম্বা চুমুক দিল একটা।

সেটা পরে শুনবেন। গলাটা বেশ চড়ে গেল অরণ্যের, এখন তাড়াতাড়ি গিয়ে রেসকিউ করুন ভদ্রমহিলাকে।

প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল মেজোবাবু। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল, অরণ্যবাবু, আপনি রাজনীতি করা মানুষ; সামান্য ব্যাপারে এত টেনশড হলে চলে। চলুন, আমি যাচ্ছি।

স্কুলে এসে অরণ্য দেখল পরিস্থিতি আরও জটিল। ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে এসে মেয়েরা হইচই করছে মাঠে। বিশুর কিছু শাগরেদ চিৎকার করে স্লোগান দিচ্ছে। পার্টির ছেলে দুটো জড়সড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এককোণে।

আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল অরণ্য। পুলিশের টিকির দেখা নেই। অরণ্যের রাগ ক্রমশ চড়ছে। একটা ছেলে বলল, অরণ্যদা চলো কেটে পড়ি।

অরণ্য অবাক হয়ে বলল, এই অবস্থায় চলে যাব!

কী করার আছে বলো? আমাদের তো কেউ খবর দেয়নি, পুলিশও আসছে না; আমরা ফালতু ঝামেলায় জড়াব কেন?

অরণ্য বলল, এসে যখন পড়েছি, কিছু একটা করতেই হবে। আয় আমার সঙ্গে।

মোড়ের মাথায় হাবুদার চায়ের দোকান। কিছু ছেলে এখানে সব সময় গুলতানি করে। প্রত্যেকেই মার্কামারা ঝামেলা মাস্টার। অরণ্য গিয়ে বলল, তোদের চুড়ি পরে বসে থাকা উচিত; তোদের নাকের ডগায় কতগুলো ছেলে মহিলাদের অপমান করছে, আর তোরা…

মিনিট দশেকের মধ্যে বাঁশ, বেঞ্চ, টায়ার পড়ে গেল রাস্তার ওপর। পাবলিক রগড় খোঁজে, তারা নিয়ে নিল ব্যাপারটা। হইহই করে কোথা থেকে দলে দলে লোক এসে হাজির। গাড়িঘোড়া সব আটকে গেছে। একটা বাসের উইন্ডস্ক্রিনে ইট পড়ল। মিছরির মতো রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ল কাচের গুঁড়ো। চিৎকার-চেঁচামেচি, ছোটখাটো ধাক্কাধাক্কি। কে যে কোন দলে বোঝা যাচ্ছে না।

অরণ্য বুঝতে পারল, তার হাতের বাইরে চলে গেছে ব্যাপারটা। এই গুলতানের মধ্যে হঠাৎ একটা ইট এসে লাগল তার মাথায়। রক্তে ভিজে গেল মুখ-চোখ।

মাথাটা এখনও ভার হয়ে আছে। কিন্তু বাড়িতে কতক্ষণ আর শুয়ে বসে থাকা যায়! কেবলই মনে হচ্ছে তমালিকার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললে মাথাটা ছেড়ে যাবে। কিন্তু সমানে জ্যাঠামশাইগিরি করে যাচ্ছে তমালিকা।

অরণ্য বলল, তুমি কি ফিলজফি নিয়ে পড়াশোনা করেছ?

তমালিকা বলল, কেন বলো তো?

তোমার সব কথাতেই তো দেখছি দর্শনের ছোঁয়া।

তমালিকা ভুরু দুটো তোলে। বলে, কী রকম?

এই যে—এটা করে কী হবে, ওটাই বা করা কেন ইত্যাদি।

ওসব বলে কথা ঘুরিয়ে লাভ নেই। আমি শুধু এটা বুঝি তোমাদের পার্টির বহু কাজই একটা ছকে বাঁধা। কোনও এক দিন একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে হয়তো একটা সিন্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তোমরা আজও সেটাকে অন্ধভাবে ফলো করে যাও। স্থান কাল বদলে গেলেও তোমরা বদলাও না।

অরণ্য বলল, আসলে আমাদের পার্টির কতগুলো নির্দিষ্ট পলিসি আছে, তার বাইরে আমরা যেতে পারি না।

 সেই পলিসির একটা হল কথায় কথায় কেন্দ্র আর আমেরিকার মুণ্ডুপাত করা।

অরণ্য হেসে বলল, এগুলো হল পার্ট অব পলিটিকস।

আচ্ছা, তোমাদের পার্টির পলিসি মেকার কারা?

তারা সব পার্টির ওপরের দিকের লোক।

তারা এদেশীয় না বিদেশি?

মানে! অরণ্য একটু অবাক হল।

এমনিতে পলিটিক্যাল লিডারদের কথা শুনলে আমার তো আজকাল হাসি পায়। তারা বোধহয় মনে করে নিজেরাই একমাত্র বুদ্ধিমান, বাকি সব মানুষ গরু-গাধা। এভাবে মানুষকে দিনের পর দিন বোকা বানিয়ে…

দাঁড়াও, দাঁড়াও। অরণ্য বলে ওঠে, তোমাদের কি মনে হয়, মানুষ সত্যিই বোকা?

আদপেই নয়।

তাহলে, এই সব মূর্খ নেতা দিনের পর দিন ভোটে জেতে কী করে? আসলে নেতারা বোকা বানাতে চায়, আর মানুষও বোকা সেজে থাকতে ভালোবাসে। তাতে অনেক দায় এড়ানো যায়। পাবলিক জানে, হোয়্যার ইগনোরেন্স ইজ এ ব্লিস ইট ইজ ফোলি টু বি ওয়ইজ।

অরণ্যের নিখুঁত যুক্তিবাণে বিপর্যস্ত বোধ করে তমালিকা। সে বলে, কিন্তু নেতারা যে প্রচণ্ড অসৎ হয়ে পড়েছে সেটা তো স্বীকার করবে।

অরণ্য বলে, এটাও ঠিক নয়।

ঠিক নয়; কী বলছ তুমি! তমালিকা বেশ অবাক হয়ে বলে।

না, পুরোপুরি ঠিক নয়। একটু সিরিয়াস গলায় অরণ্য বলে, ভিসাস সারকেল কাকে বলে জান? না।

যেমন ধরো—ভারী শিল্প নেই বলেই ভারতবর্ষ গরিব, আবার ভারতবর্ষ গরিব বলেই এখানে ভারী শিল্প সম্ভব নয়। এক্ষেত্রেও ঠিক তেমনি—সাধারণ মানুষ সৎ নয় বলেই নেতারা অসৎ, আর নেতারা অসৎ বলেই সাধারণ মানুষ সৎ নয়। মানুষ সৎ হলে নেতারা কিছুতেই অসৎ থাকতে পারত না, এও এক ধরনের ভিসাস সারকেল। আমি রাজনীতি করি বলেই এ সত্যটা আমার কাছে জলের মতো স্বচ্ছ।

সে না হয় ভাবব, কিন্তু আমার প্রশ্নটার উত্তর পেলাম না।

কোন প্রশ্নটার?

ওই যে, তোমাদের নেতারা—ধরে নিলাম তারা আগমার্কা, নেহাতই পাবলিকের জন্যে কষ্ট করে একটু নষ্ট হয়েছে,—তারা কোন দেশি?

কেন বলো তো?

কোনও কোনও ইশ্যুতে তোমরা যেভাবে রাশিয়া বা চিনের কথায় নেচে ওঠো, তাতে মনে হয়…তমালিকার মুখে মৃদু হাসি।

অরণ্য এবার রেগে গেল। বলল, ওহ, মাথাটা ভার হয়েছিল, তুমি আরও ধরিয়ে দিলে।

তমালিকা মুখে কপট গাম্ভীর্য আনে। বলে, ঠিক আছে, আমি আর একটা কথাও বলব না।

মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয় তমালিকা। নদীর পাড় দিয়ে নেমে দুটো সাদা গরু চোঁ চোঁ করে জল খাচ্ছিল, সেদিকে তাকিয়ে থাকে।

অরণ্য বলল, এখন আর মৌনী হয়ে লাভ নেই। আমার মাথা অলরেডি প্রচণ্ড ধরে গেছে, এখন যাতে ছেড়ে যায় সেই চেষ্টা করো।

তমালিকা বলল, আমি অবাধ্য রুগির ট্রিটমেন্ট করি না। এখন ওঠো, হিম পড়ছে।

কখন যেন ঝুপ করে সন্ধে নেমে এসেছে, নৌকোগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না। কলকল করতে করতে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল একঝাঁক পাখি। সেদিকে তাকিয়ে অরণ্য বলল, ওষুধ না দিলে আমি উঠব না।

তমালিকা বলল, কী মুশকিল। বলছি তো কেস আমার হাতের বাইরে, আমি অন্য ডাক্তার রেফার করছি।

অরণ্য গোঁয়ারের মতো বলল, ওষুধ তোমার কাছেই আছে, তুমি দিচ্ছ না।

তমালিকা বলল, গান-টান আজ গাইতে পারব না; ঠান্ডা লেগেছে, গলার অবস্থা খারাপ।

 তা হলে আজ অন্য ওষুধ দাও—বলে এক ঝাটকায় তমালিকাকে টেনে নিল অরণ্য, তারপর ওর তপ্ত ঠোঁট দুটো বসিয়ে দিল তমালিকার ঈষৎ ফোলা ঠোঁটে।

একটু ছটফট করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল তমালিকা। অরণ্য ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলল, একদম নড়াচড়া কোরো না, আমার মাথায় কিন্তু ফের ব্লিডিং হতে পারে।

চোদ্দো

সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে একসঙ্গে তিনটে দু:সংবাদ পেল অরণ্য। এক—কোলাঘাটের বড় পিসিমা মারা গেছেন, দুই— ডাক্তার বলেছে বাবার বুকে পেসমেকার বসাতে হবে, আর তিন—অরণ্যের সঙ্গে দেখা করবে বলে শবরী বাইরের ঘরে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছে।

বড় পিসিমার বয়েস হয়েছিল, বিছানায় শয্যাশায়ী ছিল বহু দিন। মৃত্যুসংবাদের জন্যে তারা এক রকম প্রস্তুত ছিল বলা যায়। বাবারও হার্টের সমস্যা আজকের নয়, এত দিন ওষুধপত্র দিয়ে ঠেকিয়ে রেখেছিল ডাক্তার। কিন্তু তিন নম্বর সমস্যাটাই সবচেয়ে বিচলিত করল তাকে। এক্ষুনি শবরীর মুখোমুখি হতে হবে।

মহামায়া বলল, মেয়েটা অনেকক্ষণ বসে আছে।

অরণ্য জিগ্যেস করল, চা দিয়েছ?

দিতে গেসলাম, খাবে না বলল।

এতক্ষণ বসেছে যখন, আর একটু বসুক।

বাথরুমে যথেচ্ছ দেরি করল অরণ্য। ব্রাশ ঘষে ঘষে মাড়ি ছড়ে ফেলল, বেশ করে চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিল। কিন্তু শীতকালে কত আর জল ঘাঁটা যায়। বাথরুম থেকে বেরোতেই হল এবং বেরিয়ে যথারীতি হতাশ হল অরণ্য। শবরী একমনে পার্টির মুখপত্র ‘জনশক্তি’ পড়ছে।

অরণ্য একটু বোকার মতো হেসে বলল, কখন এলে?

প্রশ্নটার কোনও উত্তর দিল না শবরী। কাগজ থেকে মুখ তুলে বলল, কাল গেলে না?

কাল শরীরটা ভালো ছিল না। চা খাবে?

না।

তুমি খেলে আমি একটু খেতাম।

অত দরদ ভালো নয়; তুমি খেলে খেতে পারো। এখন তো তোমাকে দিব্যি সুস্থ দেখছি; কী হয়েছিল কাল?

একটু জ্বর জ্বর মতো, আর কী।

হাতের কাগজটা ভাঁজ করে ব্যাগে ঢোকাল শবরী। বলল, জ্বর নিয়ে হোমে যেতে পারলে সাইকেল চালিয়ে আর নাটক দেখতে যাওয়া গেল না।

কে বলল হোমে গিয়েছিলাম?

যেই বলুক, কথাটা মিথ্যে নয়। অন্তত আমাকে একটা খবর দিতে পারতে। রাস্তার ধারে একটা মেয়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা যে অত্যন্ত বিরক্তিকর, এটা তোমার বোঝা উচিত। রাজ্যের ছেলেরা তাকিয়ে দেখে, টিজ করে—খুব বাজে লাগে।

অরণ্য জানে শবরীর প্রথম কথাটা সত্যি হলেও দ্বিতীয়টা নয়। এই এলাকায় শবরীকে টিজ করার মতো ছেলে জন্মাতে বাকি। একটু চওড়া হেসে অরণ্য বলল, আসলে সুন্দরী ইয়াং মেয়েদের একা দেখলে ছেলেরা…

অরণ্যের কথার মাঝখানেই ঝেঁঝে উঠল শবরী—থাক, আর তেল দিতে হবে না। হোমে গিয়েছিলে কেন?

অরণ্য প্রথমে বলল, এমনি। বলেই মনে হল—এতে ক্যাচাল বাড়বে; তাড়াতাড়ি বলে উঠল, একটা জরুরি দরকার ছিল।

শবরী গোয়েন্দাদের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অরণ্যের দিকে তাকাল। আতঙ্কে চোখ বুজে ফেলল অরণ্য। শবরীর এই দৃষ্টিটাকে ও ভীষণ ভয় পায়। একেবারে বল্লমের মতো এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেওয়া দৃষ্টি। শবরীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা গোপন সৌন্দর্য আবিষ্কারের এক দু:সাধ্য চেষ্টায় সে রত। ওর ধারণা, শবরীর এই মূর্তি বেশিক্ষণ দেখলে ওর সেই সাধনা ধাক্কা খাবে।

শবরী বলল, ব্যাপারটা ক্লিয়ার করো তো; এক বার বলছ ‘এমনি’, আবার বলছ ‘জরুরি দরকার’। খামোখা তুমি চোখ বুজে আছ কেন?

শরীর খারাপ লাগছে। চোখ বুজে রেখেই অরণ্য বলল।

তোমার চোখ-মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে না শরীর খারাপ। তা বকের মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন?

অরণ্য জানে শবরী এখনও কূট চোখে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু কতক্ষণ আর চোখ বন্ধ করে রাখা যায়। ভয়ে ভয়ে চোখ খুলে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল অরণ্য।

তুমি কি আমার দিকে তাকাবে না? সন্ন্যাস টন্যাস নিয়েছ, না কি আমাকে আর ভালো লাগছে না?

অরণ্য মনে মনে বলল, সবই তো বোঝো কমরেড; তবে কেন এত দমন-পীড়ন! মুখে বলল, আজ বেশ কুয়াশা করেছে দেখছি।

শবরী বলল, সকাল থেকে আজেবাজে বকছ; তোমার শরীর নয়, মাথার চেক-আপ দরকার। শোনো, কাল ধর্মতলায় যাব মার্কেটিং করতে—কয়েকটা সোয়েটার, শাল কিনতে হবে। তুমি বারোটার সময় সিটিসি বাসস্ট্যান্ডে চলে যেও।

অরণ্য বলল, কাল তো আমি যেতে পারব না।

আমি জানতাম, তুমি পারবে না।

তোমার অজানা তো কিছুই নেই, তবে শুধু শুধু বললে কেন? বেশ বিরক্তির সঙ্গে বলল অরণ্য।

ঠিকই, এটা আমার মস্ত ভুল, শবরী উঠে দাঁড়িয়ে বলল, তোমাকে শুধু অপ্রস্তুত করা, কাঁড়ি কাঁড়ি মিথ্যে কথা বলতে হয়।

শবরীর দিকে সোজা তাকিয়ে অরণ্য বলল, কারণটা না শুনেই তুমি মনগড়া অভিযোগগুলো করে যাচ্ছ। বাবাকে কাল হাওড়ায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।

মুড অফ থাকলে চায়ের ভালো স্বাদ পাওয়া যায় না। তার ওপর ঠান্ডা হয়ে গেছে চা-টা। ওষুধ গেলার মতন কোনওরকমে গিলে কাপটা নামিয়ে রাখল অরণ্য। হঠাৎ চোখে পড়ল জানালায় একগোছা পোস্টার। খুলে দেখল জেলা সম্মেলনের পোস্টার। শবরী ফেলে গেছে। পোস্টারগুলো নিয়ে বেরিয়ে পড়ল অরণ্য। পার্টি অফিসে কাউকে দিয়ে দেবে। না হলে ওগুলোর সন্ধানে ফের হানা দিতে পারে শবরী। হয়তো এটা শবরীর একটা চাল। কাল পোস্টারগুলো নেওয়ার অজুহাতে অরণ্যদের বাড়ি আসবে, এসে অরণ্য কোথায় গেছে তার খোঁজখবর করবে।

নতুদার দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পেল কেউ একজন বলছে, অরণ্য আমাদের ত্যাগ করলি নাকি রে?

অরণ্য ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখল মধু। নেত্রীর দলের জানপাত করা কর্মী। এক সময় চোলাই-এর ঠেক চালাত। পুলিশ এসে ঠেক ভেঙে দেয়। দু’দিন লকআপে রেখে ভালো রকম সাইজ করেছিল মধুকে। অবনীই নাকি পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছিল। এখন চোস্তা-খদ্দরের পাঞ্জাবি পরে আর ভুলভাল বাংলায় তেড়ে বক্তৃতা দেয়। সাইকেল স্ট্যান্ড করে দোকানে ঢুকল অরণ্য। মধু বলল, চা খাবি?

অরণ্য বলল, না, এইমাত্র খেয়ে আসছি।

তুই কি আর আমাদের সঙ্গে ভাঁড়ে চা খাবি র‌্যা; লিডার হয়েছিস এখন।

অরণ্য বলল, আমাদের পার্টিতে অত সহজে লিডার হওয়া যায় না। এ কি তোমাদের পার্টি, যতগুলো ভোট পায় তার চেয়ে বেশি লিডার।

মধু হেসে বলে, সেটাই তো অরজিনাল গণতন্ত্র রে। তা তুই তো আজকাল বনধ অবরোধ করছিস শুনলুম, এদিকে তোদের মুখ্যমন্ত্রী বলছে এসব চলবে না। তুই মুখ্যমন্ত্রীকে পর্যন্ত পাত্তা দিচ্ছিস না…

অরণ্য বলল, মধুদা চা খাওয়াবে বলছিলে না?

মধু থতোমতো খেয়ে বলল, হ্যাঁ, খাবি?

ডিমভাজা খাওয়াবে একটা?

বাবা, কী ব্যাপার রে!

পকেট থেকে কিছু খসলে অনেক সময় পেট ঠান্ডা থাকে। তোমার পেট গরম হয়েছে মনে হয়; সকালবেলা ভুলভাল বকছ।।

নে ভাই, তোদেরই রাজত্ব; যা ইচ্ছে বলে নে। তবে ব্যাপার কী জানিস, জনগণের কাছ থেকে তোরা ক্রমশ সরে যাচ্ছিস।

অরণ্য একটু হেসে বলল, তাই? জানতাম না তো। যাক বলে বড্ড উপকার করলে, আমি ওপর মহলে কথাটা পৌঁছে দেব। তারপর গলাটা নামিয়ে একটু সতর্ক ভঙ্গিতে বলল, জনগণ তোমাকে কবে বলল গো কথাটা?

প্রথমে বুঝতে না পেরে একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মধু। তারপর রাগে ফেটে পড়ে, তোরা যতই টুপি দিস মানুষকে, সবাই জানে রিগিং ছাড়া তোরা জিততে পারবি না।

অরণ্য বলল, রিগিং তোমরা করো না?

মধু মুখ বেঁকিয়ে হাসল। বলল, আমরা রিগিং করব! পুলিশ তোদের, প্রশাসন তোদের…

অরণ্য দেখল পার্টি অফিসে হরি একা বসে টিভি দেখছে। বেশ ক’দিন পর পার্টি অফিসে এল অরণ্য। ঝকঝকে নতুন একটা কালার টিভি এসেছে। অরণ্যকে দেখে হরি বলল, এইমাত্র আমি তোমাদের বাড়ি যাব ভাবছিলাম।

কেন?

অবনীদা তোমাকে দেখা করতে বলেছে।

গার্লস স্কুলের ঘটনার দিন সন্ধেবেলা অবনী অরণ্যদের বাড়ি এসেছিল। মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে অরণ্য তখন বিছানায় শুয়ে। অবনী ক্ষোভ উগড়ে দিল, তুই ভেবেছিস কী বল তো!

অরণ্য অবাক! বলল, কেন?

কেন মানে! তোকে কে পাকামি করতে বলেছে?

অরণ্য বলল, পাকামির কী দেখলে?

অবনী বলল, হেডমিস্ট্রেস তোকে ডেকেছিল?

তা ডাকেনি; কিন্তু বিশু অসভ্যতা করছিল, থানা কোনও অ্যাকশন নিল না…

তাতে তোর কী! ওই মহিলা ডেনজারাস জিনিস! পরেশদার মেয়েটার ক’নম্বর কম ছিল বলে ক্লাসে তুলল না। আমি পার্সোনালি রিকোয়েস্ট করেছিলাম, কেয়ারই করল না—ওর এই রকম একটা ঝাড় পাওনা ছিল। তুই শুধু শুধু ডাইরি খেয়ে গেলি।

ডাইরি! অরণ্য অবাক হয়ে বলল।

হ্যাঁ, তোর নামে একটা ডাইরি হয়েছে থানায়, ভাঙচুর করার জন্যে। ওটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। আমি ম্যানেজ করে দিয়েছি।

বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেল অরণ্য। গোটা ব্যাপারটা তা হলে আগে থেকে ছকা!

তার পর থেকে আর অবনীর সঙ্গে দেখা করেনি অরণ্য।

হরিকে অরণ্য বলল, তোর সঙ্গে কখন দেখা হল?

এই তো সকালবেলা গিয়েছিলাম—অরণ্যদা তুমি তো সেদিন হেব্বি জমিয়ে দিয়েছিলে! টুলা বলছিল, অরণ্যদা বড় নেতা হবে, পাঁচ মিনিটের মধ্যে শ’য়ে শ’য়ে লোক জড়ো করে রাস্তা বন্ধ করে দিল।

প্রসঙ্গটা আর বাড়তে দিল না অরণ্য। বলল, তোর সঙ্গে অবনীদার আজ দেখা হবে?

চ্যানেল সার্ফ করতে করতে হরি বলল, চান্স কম; কেন বলো তো?

এই পোস্টারগুলো একটু পৌঁছে দেওয়ার ছিল।

হরি অরণ্যের দিকে তাকাল। বলল, তুমি দেখা করবে না?

আজ আমার সময় হবে না।

ফের টিভিতে মন দিল হরি। বলল, ঠিক আছে, রেখে যাও, আমি বাড়ি ফেরার সময় দিয়ে দেব।

পার্টি অফিস থেকে বেরিয়ে আসার সময় অরণ্য দেখল ফ্যাশন চ্যানেলে ডুবে গেছে হরি। টিভির পরদা জুড়ে প্রায় উলঙ্গ মেয়েদের ক্যাটওয়াক।

বাড়িতে গিয়ে অরণ্য দেখল বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে মোনে। পাশে ষণ্ডামার্কা চেহারার কালো রঙের এনফিল্ড বুলেট। অরণ্যকে দেখেই বলল, এই তো এসে গেছ; চলো।

অরণ্য বলল, কোথায়?

অবনীদা ডেকে পাঠাল।

বলিস, পরে দেখা করব।

আমাকে বলল, জরুরি দরকার। আরে বোসো না গাড়িতে; কতক্ষণ লাগবে?

অরণ্য বলল, ফিরব কী করে, পৌঁছে দিবি?

সিটে বসে কিক করতে করতে মোনে বলল, দেব রে বাবা, দেব, মোনে বেইমান নয়।

মোনে মোটর সাইকেলটা চালায় ভালো। প্রায় উড়ে এল অবনীর বাড়ি। বারান্দায় লাল গামছা পরে ঘষে ঘষে তেল মাখছিল অবনী। থাক থাক চর্বি নেচে নেচে উঠছে। অরণ্যকে দেখে গম্ভীর মুখে বলল, বোস।

অবনীর বৈঠকখানায় বসল অরণ্য। মোনে বলল, আমি একটু ঘুরে আসছি।

অরণ্য আতঙ্কিত গলায় বলল, তুই মনে হচ্ছে কেটে পড়লি।

মোনে জিভ কেটে বলল, কথা যখন দিয়েছি, ঠিক চলে আসব। অবনীদা এখন চানে ঢুকবে ওর চান জানো না তো, মেয়েছেলের বাড়া, এক ঘণ্টা কমসে কম।

এক ঘণ্টা নয়, প্রায় চল্লিশ মিনিট পরে এল অবনী। সাদা পাজামা পাঞ্জাবির ওপর তুঁতে রঙের একটা শাল চাপিয়েছে। আজ ভোঁতা ব্লেডে দাড়ি কামিয়েছে মনে হয়; ভালো পরিষ্কার হয়নি মুখটা। খুব গম্ভীর গলায় বলল, শবরী আজ এসেছিল আমার কাছে।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইল অবনী। বোধহয় অরণ্যের কাছ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া আশা করছিল। অরণ্যকে একেবারে নিশ্চুপ দেখে বলল, ও অনেকগুলো কথা বলল।

এবারেও অরণ্য নিরুত্তর। একটু অপেক্ষা করে বেশ বিরক্তির সঙ্গে অবনী বলল, তোর ব্যাপার কী বল তো।

অরণ্য খুব শান্তভাবে বলল, কী ব্যাপার জানতে চাও?

তুই নাকি ইদানীং শবরীকে অ্যাভয়েড করছিস?

তোমাকে কে বলেছে, শবরী?

যেই বলুক, কথাটা সত্যি না মিথ্যে সেটা বল। উত্তেজিতভাবে বলল অবনী।

অরণ্য বলল, অবনীদা, আমারও ব্যক্তিগত কাজ তো কিছু থাকতেই পারে।

অবনী মাথা নাড়ল। হ্যাঁ, থাকতেই পারে। কিন্তু তমালিকার সঙ্গে ঘোরাটাও কি তার মধ্যে পড়ছে?

ভেতরে ভেতরে চমকে উঠল অরণ্য। একটু রুক্ষভাবে বলল, আমি এটা নিয়ে কারও সঙ্গে কোনও আলোচনা করতে চাই না।

আমিও চাই না। কিন্তু একটা মেয়েকে ডিচ করলে আমি মেনে নেব না। যা করবি ভেবেচিন্তে কর।

ঠিক আছে। বলে দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল অরণ্য।

বাইরে এসে ধারেকাছে কোথাও মোনেকে দেখতে পেল না অরণ্য। বদলে যাঁকে দেখল তাঁকে ঠিক এই জায়গায় একেবারেই আশা করেনি সে। বলাইস্যার। এক উদভ্রান্তের মতো দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তায়। তাকিয়ে আছেন অবনীদার বাড়ির দিকে। এড়িয়ে চলে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল সে। এগিয়ে গিয়ে বলল, স্যার আপনি এখানে!

বলাইস্যার সেই ফ্যালফেলে দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, কে…?

স্যর আমি, অরণ্য।

ওহ অরণ্য! এই দেখো, চিনতে পারিনি, কেমন আছ?

ভালো। আপনি কেমন আছেন?

প্রশ্নটা করেই অরণ্য বুঝতে পারল ঠিক এই প্রশ্নটা করতে চায়নি সে। অসাবধানে বেরিয়ে এসেছে কথার পিঠে।

বলাইস্যার বললেন, আমি তো ভালোই আছি অরণ্য, শুধু চোখে আজকাল একটু কম দেখছি, মনে হয় ছানি আসছে…।

অরণ্য বলল, অপারেশন করিয়ে নিন না স্যার, ঠিক হয়ে যাবে।

বলছ? একটু সন্দিহান কণ্ঠে প্রশ্ন করেন বলাইস্যার।

অরণ্য জোর দিয়ে বলে, হ্যাঁ স্যার, এই তো, কিছুদিন আগে বাবার করালাম, এখন ভালো দেখতে পাচ্ছে।

কী যেন একটু চিন্তা করেন বলাই স্যার। নিজের মনে খানিক বিড় বিড় করেন। তারপর বলনে, তাহলে বলছ, দেখতে পাব?

হ্যাঁ স্যার। খুব উৎসাহের সঙ্গে অরণ্য বলে ওঠে, সামনের মাসেই আমাদের ক্যাম্প হবে, আমি ব্যবস্থা করে দেব’খন….।

কী ক্যাম্প, কোথায় হবে…?

‘পার্টি-অফিসে বলতে গিয়েও চুপ করে গেল অরণ্য।

বলাইস্যার ফের বললেন, কোথায় ক্যাম্প হবে অরণ্য?

অরণ্য বলল, জায়গাটা এখনও ঠিক হয়নি …..আপনি ভাববেন না, আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।

 সেই ভালো..। বলাইস্যার বললেন, দু’চার দিন আগে বোলো আমাকে, বাজার-হাট সব করে রাখতে হবে তো…এখন আমি চলি, বুঝলে…।

বলাইস্যার এগিয়ে গেলেন। অরণ্য এদিকে-ওদিকে তাকাল। মোনে কোথাও নেই। ব্যাটা কেটে পড়ল কিনা কে জানে! হঠাৎ অরণ্য দেখল বলাইস্যার ফের ফিরে আসছেন। কাছে এসে বললেন, তাহলে অপারেশনটা করিয়ে দিও কিন্তু…ভুলে যাবে না তো আবার…?

না স্যার, ভুলব কেন?

আজকাল সবাই খুব ভুলে যাচ্ছে…আর আমারও হয়েছে তাই, কিছু মনে থাকে না…এই দেখো না, তোমার জ্যাঠাইমা কী যেন একটা নিয়ে যেতে বলেছে; কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ছে না…। কী হতে পারে বলো তো অরণ্য?

প্রশ্ন শুনে খুব অবাক হয়ে গেল অরণ্য। তাকিয়ে রইল বলাই স্যারের দিকে।

স্যার বললেন, কিছু আন্দাজ করতে পারো তুমি?

অরণ্য অসহায়ভাবে ঘাড় নাড়ে শুধু।

একবার মনে হচ্ছে কাঁচা লঙ্কা, একবার মনে হচ্ছে গায়ে মাখা সাবান, আবার একবার মনে হচ্ছে ন্যাপথলিন….। ন্যাপথলিন-ই হবে, কী বলো…?

অরণ্য খুব নরম গলায় বলে, আজ অনেক বেলা হয়ে গেছে স্যার, চলুন আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই…যা কেনার কাল কিনবেন।

বলাইস্যার বিড়বিড় করেন, ন্যাপথলিন-ই হবে, বুঝলে, আজকাল বড় পোকার উৎপাত হয়েছে….সবকিছুতে পোকা, বুঝলে…।

অরণ্য বলে, ঠিক আছে, ন্যাপথলিন কাল কিনবেন, আজ চলুন…।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *