পঁচিশ
রাতে ভালো ঘুম হয়নি শুভমের। মাথায় নানা চিন্তা; তার সঙ্গে অর্চনের অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। সকালে উঠে অফিস রুমটাকে ঠিকঠাক করছিল শুভম। বেশ কিছু কাগজপত্র পাচ্ছে না। হঠাৎ তাপসী একটা ছেলেকে নিয়ে এল। শ্যামল। কাল রাতে ফিরেছে দিল্লি থেকে। এই প্রথম ছেলেটাকে দেখল শুভম। শ্যামবর্ণের ওপর খুব সাদামাটা চেহারা। চোখ দুটো কেবল অসম্ভব উজ্জ্বল। দিল্লিতে একটা কাজের ব্যবস্থা হয়েছে ওর। কিন্তু সেটল করতে অন্তত বছরখানেক লাগবে। তারপর নিয়ে যাবে তাপসীকে।
তাপসীর মা এসেছে মেয়েকে নিয়ে যেতে। আবারও প্রবল কান্নাকাটি শুরু করল মেয়েটা।
শুভম কথা বলল শ্যামলের সঙ্গে। ছেলেটা মুখচোরা লাজুক। ওরও মত, তাপসী আপাতত মায়ের কাছে থাকুক; কোনও অসুবিধে নেই তাতে।
শুভম বিশেষত্বহীন চেহারার ছেলেটাকে দেখছিল। ভালো লাগছিল ছেলেটাকে। পরে ছেলেটা কথা রাখবে কি না কে জানে! কিন্তু ওর বলার মধ্যে বেশ একটা বিশ্বাস আছে; ভেতরের সততাটা দেখতে পাচ্ছিল শুভম।
গত কয়েকদিন খুব হতাশার মধ্যে কেটেছে। শ্যামলের কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হল, এইসব ছোটখাটো ঘটনাগুলোর জন্যেই তো বেঁচে থাকা।
একটু পরেই চামেলি এল। এসেই হাউমাউ শুরু করল, কী হয়েছিল গো—কারা এমন কাণ্ড করল—।
শুভম বলল, সে অনেক কথা; পরে শুনবি?
চামেলি বলল, সবাই চলে গেলে তুমি কী করবে?
শুভম অন্যমনস্কভাবে বলে, আমি আর কী করব, দেখি কী করা যায়—
কোথায় থাকবে?
শুভম বলে, কোথায় আর যাব, এখানেই থাকব।
এখানে! বেশ ভয়ের সঙ্গে চামেলি বলে, কিন্তু তোমাকে যদি মারে?
শুভম মৃদু হেসে বলে, না, না, মারবে কেন?
চামেলি বলে, সেদিন তো মেরেছে!
ও কিছু নয়—সামান্য ধাক্কাধাক্কি—।
চামেলি হঠাৎ শুভমের কবজির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে, এটা কী করে হল?
ক’দিন আগে বাগান পরিষ্কার করতে গিয়ে কবজির কাছে একটু কেটে গিয়েছিল শুভমের। সেই ক্ষতটা এখনও শুকোয়নি। শুভম বলে, না রে, এটা বাগান করতে গিয়ে হয়েছে।
না, তুমি মিথ্যে বলছ। তোমাকে মেরেছে ওরা। চামেলি বেশ জোরের সঙ্গে বলল।
চামেলির এই উদবেগটুকু ভারী ভালো লাগে শুভমের। অনেকদিন পর কেউ তার জন্যে সত্যিই এতটা উদবিগ্ন হল।
ক্ষণিকের জন্যে মনে হল, সত্যিই যদি লোকগুলোর আঘাতে এই ক্ষতটা হত—বেশ হত তাহলে।
চামেলি বলল, কী দিয়ে মেরেছে গো; অনেকটা কেটে গেছে তো—।
এবার আর প্রতিবাদ করল না শুভম। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। একদৃষ্টে দেখছিল চামেলিকে।
চামেলি যেন একটু লজ্জা পেয়ে গেল, বলল, ওষুদ-বিসুদ লাগিয়েছ কিছু?
শুভম মৃদু হেসে বলল, লাগিয়েছি।
ধীরে ধীরে বাইরে এল শুভম। আকাশে ঘন মেঘ। ওই মেঘের ওপরেই নীল আকাশ। কিছু কিছু পাখি আছে, যাদের মেঘ দেখলে আনন্দ হয়। হঠাৎ বহুদিন আগে কলেজের সেই শ্যামলীর কথা মনে পড়ে গেল শুভমের। সেদিন কেঁদেছিল শ্যামলী।
দু-চার ফোঁটা বৃষ্টি পড়ল শুভমের গায়ে। শুভম আকাশের দিকে তাকাল। আরও ঘন হয়ে জমছে মেঘ। মনে হচ্ছে খুব বৃষ্টি হবে আজ।
ছাব্বিশ
অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমোল অরণ্য। নিশ্চিন্ত ঘুম। কাল শুতে রাত হয়েছিল। পথের পাঁচালী বইটা শেষ করে তবে শুতে যায় সে। কেবলই মনে হচ্ছিল সকালেই যদি পুলিশ আসে, আর সময় পাওয়া যাবে না। কাল শুভম তাকে অনেকবার অনুরোধ করেছে; তবু সে পুলিন মিত্রর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। কী হবে নতুন পার্টিতে ঢুকে। সেখানে আরও অবনী গুহ বিকাশ চৌধুরী। আত্মবিশ্বাসহীন সদা কুণ্ঠিত অর্চন তার চোখ খুলে দিয়েছে। সব সত্যের ভেতর আর একটা সত্য থাকে। অনেক কঠোর সত্যবাদীই সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এই সার সত্যটাকে বোধহয় গুটিকতক লোক আজীবন খোঁজে।
কাল ফেরার সময় তমালিকাদের বাড়ি গিয়েছিল অরণ্য। তমালিকার জ্বর। মাথায় হাত বুলিয়ে দিল অরণ্য। তমালিকা বলল, কী হবে এখন?
কী হবে তা কি অরণ্যও জানে? অবনীদা প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিল; চিৎকার করেছিল, তোকে আমি ছাড়ব না—। এদিকে অর্চনও চলে আসছে। দুজনকেই পেয়ে যাবে অবনীদা; খুব আহ্লাদ হবে নিশ্চয়ই।
তমালিকা বলল, কী হবে, বললে না তো!
মনে হচ্ছে ছেলে; তবে আমার পছন্দ মেয়ে, যাকে দেখতে হবে তোমার মতো।
তমালিকা দুর্বল হাতে চিমটি কাটে অরণ্যর গায়ে। বলে, খালি ইয়ার্কি; আমি এদিকে মাসিমণিকে কী বলব ভেবে পাচ্ছি না—।
বেশ তৃপ্তি করে সকালের চা-টা খেল অরণ্য। বাইরে বৃষ্টি নেমেছে। একটা জানলা খুলে, গাছপালার ওপর বৃষ্টি দেখছিল সে।
হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। নিশ্চয়ই পুলিশ। অবশ্য অর্চনও হতে পারে।
খুব শান্তভাবে দরজা খুলল অরণ্য। খুলেই একটু অবাক হয়ে গেল সে। বলাই স্যার। স্যার ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে দরজায় সামনে।
অরণ্য বলল, স্যার আপনি।
এই যে, তোমার ছাতাটা দিতে এলুম।
অরণ্য ব্যস্ত হল, আপনি এলেন কেন স্যার; আমি সময় করে নিয়ে আসতাম।
না বাবা, বর্ষায় ছাতা মানুষের খুব দরকার হয়।
অরণ্য বলাই স্যারকে ভেতর আসতে বলল অনেক করে, কিন্তু কিছুতেই রাজি হলেন না স্যার। অরণ্য দেখল, স্যারের কাছে ছাতাও নেই। সে বলল, স্যার ছাতা দিলে আপনি যাবেন কী করে, বৃষ্টি পড়ছে যে এখন!
বলাই স্যার খুব চিন্তা করে বললেন, ও তাই তো।
অরণ্য বলল, আপনি বরং ছাতাটা নিয়ে যান, আমি পরে গিয়ে নিয়ে আসব।
কিন্তু বলাই স্যার কিছুতেই রাজি নন। কেবল মাথা নেড়ে বলেন, এসব দামি জিনিস আমার রাখতে ভয় করে অরণ্য, যদি হারিয়ে যায়—।
অরণ্য একটু হেসে বলে, দামি কোথায় স্যার, খুবই সস্তা ছাতা; ঠিক আছে চলুন, আমি আপনাকে বাড়িতে পৌঁছে দিই। তারপর আমি ছাতা নিয়ে চলে আসব।
অনেকক্ষণ চিন্তা করে বলাই স্যর বলেন, সেই ভালো, তোমার তো খুব বুদ্ধি দেখছি—।
একটু এগোতেই বৃষ্টি শুরু হল জোরে। সঙ্গে প্রচণ্ড ঝোড়ো বাতাস। বলাই স্যার বললেন, অরণ্য তুমি ফিরে যাও; আমি ঠিক চলে যাব।
অরণ্য শক্ত করে ধরল ছাতাটা। বলল, চলুন না স্যার, আমার তো এখন কিছু করার নেই।
ছাতায় ছোট-ছোট দু-তিনটে ফুটো। ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে ভেতরে। দমকা হাওয়ায় মাঝে মাঝে টলে যাচ্ছে ছাতা।
বলাইস্যার বললেন, দেখেছ অরণ্য, খুব বড় একটা ঝড় উঠেছে…।
অরণ্য বলে, হ্যাঁ স্যার, তাই তো দেখছি।
হোক হোক; ঝড় হোক, বৃষ্টি হোক…সব ওলোট পালোট হয়ে যাক…তারপর যা হওয়ার হবে! আমার আর ভয় কী বলো…?
অরণ্য তাকাল বলাই স্যারের দিকে।
তোমার কি ভয় করছে অরণ্য?
অরণ্য মাথা নেড়ে বলল, না তো স্যার।
ঠিক বলছ তো…?
হ্যাঁ, স্যার, ঠিক।
ঝড়বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে দুজনে এগোয় খানিক। হঠাৎ অরণ্য বলে, স্যার বৃষ্টিতে ভিজবেন একটু…?
বলাই স্যার অবাক হয়ে অরণ্যর দিকে তাকায়। বলে, বৃষ্টিতে…?
হ্যাঁ স্যার, জোর বৃষ্টিতে ভিজতে কিন্তু দারুণ লাগে।
বলাই স্যার বলেন, তা অবশ্য ঠিক…আমি আগে কত বৃষ্টিতে ভিজেছি…।
চলুন স্যার, ভিজি তা হলে…।
অরণ্য ছাতাটা হঠাৎ উঁচু করে ছুড়ে দেয় হাওয়ায়। কিছুটা ওপরে উঠে, ফের আছড়ে নেমে আসে মাটিতে। তারপর জলকাদার মধ্যে ডিগবাজি খেতে খেতে এগিয়ে যায় ছাতাটা।
দুজন মানুষ ছাতাটা দেখে একবার। তারপর প্রবল হাওয়া আর হাপুস বৃষ্টির মধ্যে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে থাকে তারা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকে।
***
