এসো আমার সঙ্গে – ১৫

পনেরো

এই লাল কার্ডিগানটা পরলে তোকে খুব সুন্দর দেখায়।

তাপসী লাজুক হাসে। বলে, যাহ, কী যে বলো! তোমাকেও খুব সুন্দর দেখতে।

চারপাশে ঝলমলে শীতের রোদ। ঘাসের ডগা থেকে দ্রুত উবে যাচ্ছে শিশির বিন্দু। আজ রবিবার। স্কুল নেই; পড়াশোনারও ছুটি। হোমের মাঠে ব্যাট-বল নিয়ে দাপাদাপি করছে বাচ্চারা। তনুজা আর পল্লব ব্যাডমিন্টন খেলছে এক কোণে। রোগা শ্যামবর্ণ একটি মেয়ের হাত ধরে তমালিকার কাছে নিয়ে এল পাপড়ি। বলল, আন্টি, এ ডলি, কাল এসেছে।

মেয়েটি লজ্জায় চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। হাওয়াই চটির ডগা মাটিতে ঘষছে।

তমালিকা বলল, ডলি, বন্ধুদের ভালো লাগছে তোমার?

ডলি ঘাড় নেড়ে জানাল ভালো লাগছে।

কোন ক্লাসে পড়ো তুমি?

মেয়েটি মাথা নীচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। পাশ থেকে পাপড়ি বলল, ও ক্লাস এইটে পড়ে; আঙ্কেল ওকে এখানে ভরতি করে দেবে বলেছে। আর একজন এসেছে—রাকেশ; দাঁড়াও আনছি তাকে।

দৌড়ে চলে গেল পাপড়ি। তাপসী তমালিকাকে বলল, চলো না আন্টি, ওই দিকে থেকে একটু ঘুরে আসি।

তমালিকা মনে মনে হাসল। তাপসী এখন তমালিকাকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে শ্যামলের গল্প ফেঁদে বসবে। একেবারে জড়িয়ে গেছে মেয়েটা। অরণ্যকে দিয়ে খোঁজ নিয়েছে তমালিকা। ছেলেটা খারাপ নয়। বদ মতলব নেই বলেই মনে হচ্ছে। তবে মানুষের মন! তাই তাপসীর জন্যে একটা উদবেগ কাজ করে তমালিকার মনে।

হাঁটতে হাঁটতে গেটের বাইরে চলে এল দু’জনে। তমালিকা বলল, লেখাপড়া করছিস মন দিয়ে, না কি দিনরাত শুধু…

তাপসী বলল, মন দিয়েই করছিলাম, ক’দিন ভালো হচ্ছে না।

কেন, কী হল আবার?

ও দিল্লি গেছে, ফোন করবে বলেছিল; কিন্তু করেনি।

দিল্লি গেছে কেন?

ওর রিলেটিভের বাড়ি।

কোথায় ফোন করার কথা?

অফিসে। দুপুর দুটোর সময়; ওই সময় কেউ থাকে না। আমি রোজ বসে থাকি, কিন্তু ফোন তো আসছে না।

শুভমদা যে দেখা করতে বলেছিল, করেছে?

দিল্লি থেকে ফিরেই করবে বলেছে। আমার খুব টেনশন হচ্ছে আন্টি।

তমালিকা তাপসীর দিকে তাকাল। বলল, কেন?

মনে হচ্ছে যদি কোনও বিপদ-আপদ হয়; আবার মনে হচ্ছে ওখানেই চাকরিবাকরি পেয়ে গেল, আর ফিরল না।

তমালিকা দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, এই তো বলিস খুব ভালো ছেলে…

হ্যাঁ তো, কিন্তু তবুও যেন কেমন ভয় ভয় করছে।

আজেবাজে চিন্তা ছেড়ে লেখাপড়ায় মন দে; আর শ্যামল ফিরলেই শুভমদার সঙ্গে দেখা করতে বলবি।

হঠাৎ ‘আন্টি’ ‘আন্টি’ ডাক শুনে পিছন ফিরে তাকাল তমালিকা। দেখল, পাপড়ি একটা বাচ্চা ছেলের হাত ধরে নিয়ে আসছে। ফরসা টুকটুকে ছেলেটা। বড়জোর পাঁচ-ছ’বছর বয়েস হবে। তমালিকা গাল টিপে আদর করে দিল। বলল, কী নাম তোমার?

বাচ্চাটা অবাক হয়ে তমালিকাকে দেখে। পাপড়ি বলে, নাম বলে দাও তোমার।

রাকেত! বলেই মুখ ঘুরিয়ে নিল।

রাকেশ! বাহ, কী মিষ্টি নাম! চুলগুলো একটু ঘেঁটে দিল তমালিকা; বলল, তোমার ভালো লাগছে এখানে?

মাথা নেড়ে রাকেশ জানিয়ে দিল—না।

পাপড়ি বলল, আরও একজনের এখানে আর ভালো লাগছে না, জানো আন্টি?

তমালিকা অবাক হয়ে পাপড়ির দিকে তাকাল। বলল, কার ভালো লাগছে না, কেন?

তার মন চলে গেছে দিল্লিতে।

চড় তুলে পাপড়ির দিকে ছুটে গেল তাপসী। হি হি করে হাসতে হাসতে ছুটল পাপড়ি।

সকাল থেকে অফিসে বসে টানা কাজ করছে শুভম। কিন্তু মাঝেমাঝেই অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। স্মৃতি এসে ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে কোথাও। কোন অতলে সামান্য আলোড়ন।

কাল চারু এসেছিল। ওর মেয়েকে দিয়ে গেছে। হোমের পরিবেশ দেখে খুব খুশি। চারুর সঙ্গে ছিল একজন মহিলা আর একটা বাচ্চা ছেলে। সেই মহিলা হঠাৎ জিগ্যেস করল, চিনতে পারছ শুভমদা?

শুভমের খুব চেনা লাগছিল। কিন্তু কিছুতেই স্মরণে আসছে না। শুভম অসহায়ভাবে মাথা নাড়ল।

আমি চামেলি।

সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারল শুভম। কল্পনামাসির মেয়ে। শুভমের সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ত। ক্লাস ফাইভ-সিক্স পর্যন্ত পড়ে স্কুল ছেড়ে দেয়। খুব বন্ধুত্ব ছিল শুভমের সঙ্গে। রজতকাকু ছিল ওর মায়ের বাঁধাবাবু। রজতকাকু সপ্তায় তিন-চার দিন আসত। খুব দামি-দামি খেলনা, জামা আনত চামেলির জন্যে।

শুভম একদিন বলেছিল, তোর কাকু তোকে খুব ভালোবাসে, না রে চামেলি?

চামেলি বলল, এমনি-এমনি বাসে না কি! কাকুকে সব খবর দিতে হয়।

কী খবর দিস?

কাকু না থাকলে মা ঘরে লোক বসায় কি না, মা পাড়ায় কারও সঙ্গে বেশি গল্প করে কি না—এইসব—

খবর দিলেই তোর কাকু এত সব জিনিস দেয়?

চামেলি বলল, হ্যাঁ, তুই যেন আবার মা-কে বলে দিস না —মা তা হলে আমাকে আস্ত রাখবে না।

খেলার সময় চামেলি সব সময় শুভমের দলে থাকতে চাইত। ভালো খাবার জিনিস কিছু পেলে দিত শুভমকে।

একদিন সুন্দর একটা দম দেওয়া গাড়ি শুভমকে দিয়ে দিল, তারপর অন্ধকার সিঁড়ির নীচে শুভমের গালে একটা চুমু খেয়ে বলল, বড় হলে তোকে আমি বিয়ে করব।

কিছুদিন পরেই পাড়া ছেড়ে চলে গেল চামেলি। হাবড়ায় ওর মাসি থাকে, নিয়ে গেল চামেলিকে। শুভম যখন ক্লাস নাইন-টেনে পড়ে একদিন শুনল চামেলির বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেটার মুদির দোকান, অবস্থা বেশ ভালো; সব জেনেশুনেই বিয়ে করেছে চামেলিকে।

তার পর শুভমরাও চলে এল শিবপুরে। আজ আবার এত দিন পরে দেখা।

শুভম বলল, তুই চামেলি! সত্যি চিনতে পারিনি।

চামেলিকে আর ‘কেমন আছিস’ জিগ্যেস করল না শুভম। ওর চেহারা দেখেই যা বোঝার বুঝে গিয়েছিল। বলল, কল্পনামাসি কেমন আছে?

মায়ের শরীর ভালো নেই। একটা চোখে একদম দেখতে পায় না, অন্য চোখেও আবছা দেখে।

আর রজতকাকু?

চামেলি বলল, ওর জন্যেই তো আমাদের এই দশা। ছেলেরা তাড়িয়ে দিয়েছিল বাড়ি থেকে। মায়ের কাছেই শেষের দিকে থাকত। খুব জ্বালিয়েছে মাকে। কাকুর কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিজের রোজগার নেই, আবার মা কাস্টমার করলে অশান্তি। লোকে কি মুখ দেখে টাকা দেবে! তার পর রোগে ধরল; চিকিৎসা করাতে করাতেই মা ফতুর।

শুভম লক্ষ করল, সে চামেলিকে তুই-তোকারি করে বললেও চামেলি তাকে ‘তুমি’ করে বলছে। এত দিনের অদর্শন, তার ওপর সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য—সেই জন্যেই বোধহয় সহজ হতে পারছে না চামেলি।

শুভম বলল, আমি তোদের ওখানে তো মাঝেমাঝে যাই, তবু তোর সঙ্গে একবারও দেখা হয়নি।

চামেলি বলল, আমি আর পুরোনো পাড়ায় থাকি না। বাড়িউলি মাসি বড্ড ঝামেলা করল; এখন ফটিক ঘোষ লেনে ঘর নিয়েছি।

ছেলেটাকে রেখে গেছে চামেলি। বড্ড বাচ্চা। চামেলি চলে যাওয়ার পর টানা কেঁদেছে। রাতে কিছু খায়নি। আজ সকালেও কাঁদছিল। হোমের বড় মেয়েগুলো সব সময় সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে।

অফিস থেকে বেরিয়ে এল শুভম। রোদ-ধোওয়া ফাঁকা মাঠের মাঝখানে তিনটে স্টাম্প পোঁতা। এক কোণে গোল হয়ে বসে তমালিকা, পাপড়ি, তাপসী আর তনুজা। পিয়ালী আঁকা শেখাতে এসে গেছে মনে হয়। হলঘর থেকে হইচই ভেসে আসছে।

দূরে অরণ্যকে সাইকেল চালিয়ে আসতে দেখল শুভম। ছেলেটা হোমের সঙ্গে খুব জড়িয়ে গেছে। আজ একটা বড় ডোনারকে আনার কথা। ভদ্রলোক মুম্বাইয়ে থাকেন। সফটওয়্যারের ব্যবসা আছে। অরণ্যের কাছ থেকে হোমের কথা শুনে খুব ইন্টারেস্টড। নিজে এসে একবার দেখতে চান। অরণ্যকে একা আসতে দেখে একটু হতাশ হল শুভম।

অফিস-রুমের সামনে এসে মাটিতে পা ঠেকিয়ে দাঁড়াল অরণ্য। শুভম বলল, কী সমাচার?

অরণ্য বলল, ভালো মন্দ মিশ্র।

কীরকম?

মন্দটা আগে বলে নিই। তারকদা আপাতত আসতে পারছেন না। ওর কোম্পানিতে কী একটা গণ্ডগোল হয়েছে, আজ ভোরের ফ্লাইটে হঠাৎ মুম্বাই চলে গেছেন। তবে গোবিন্দ নাগ বলে একজনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ভদ্রলোক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির হাইফাই অফিসার। উনি একটা কম্পিউটার দেবেন বলেছেন। এটা শুভ সংবাদ হিসেবে ধরা যায়।

শুভম বলল, কম্পিউটার তো খুবই দরকার, তুমি যত তাড়াতাড়া পারো ব্যবস্থা করো।

হলঘর থেকে দৌড়ে এল পুলক আর নীলু। অরণ্যকে দেখে দৌড়ে গেল তার কাছে। পুলক বলল, জানো তো আঙ্কেল, আজ একটা মজা হয়েছে।

কী মজা হয়েছে? অরণ্য জিগ্যেস করল।

রাজা একটা লোক এঁকেছে, তার মাথায় দুটো শিং আর পেছনে একটা ল্যাজ। একটা পুলিশ গুলি করছে লোকটাকে। ও বলছে লোকটা ওর কাকু। ওর কাকুটা না খুব পাজি ছিল, খালি মারত ওকে।

ষোলো

রূপচর্চায় কোনও দিনই তেমন মন ছিল না তমালিকার। সামান্য সাজগোজ করত এবং তাতেই যেন ফুলে ফুলে ভরে উঠত মেয়েটা। কিন্তু ইদানীং একটু সাজ-সচেতন হয়েছে তমালিকা। কোথাও বেরনোর আগে অনেকক্ষণ সময় নিচ্ছে ড্রেসিংটেবিলের সামনে।

প্রতিমা ভাবতে বসে। তা হলে কি অসিতের সন্দেহটাই ঠিক। সেটা হলে তো সর্বনাশ। মা-মরা মেয়েটাকে বুক পেতে আগলে রেখেছে প্রতিমা আর অসিত। ক’দিন আগে অসিত সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে বলল, তমালিকা কোথায়?

প্রতিমা বলল, হোমে গেছে মনে হয়।

কখন বেরিয়েছে?

বিকেলবেলা। প্রতিমা বলল।

অসিত গম্ভীর হয়ে বলল, মেয়ের গতিবিধির দিকে একটু নজর দাও।

প্রতিমা একটু অবাক হল। বলল, কেন কী হল আবার!

একটু আগে বিপুলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল; বিপুল বলল, তমালিকাকে নাকি আজকাল একটা ছেলের সঙ্গে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে।

প্রতিমা আঁতকে উঠল। বলল, সর্বনাশ, কে ছেলে?

অরণ্য না কী যেন নাম ছেলেটার। পার্টির লিডার। অবনী গুহর নাম শুনেছ তো, বড় নেতা; সেই অবনীর না কি ডানহাত।

প্রতিমা আশ্বস্ত হল। বলল, ওহ, অরণ্য! তার কথা তো বলছিল একদিন। ছেলেটা নাকি ওদের হোমে নানা ভাবে হেল্প করে।

হেল্প করে ভালো কথা, কিন্তু সেজন্যে তার সঙ্গে নদীর ধারে বা দক্ষিণের মাঠে ঘুরতে হবে কেন?

প্রতিমা বলল, ও মা, তাই না কি? সে কথা তো বলেনি!

অসিত একটু ক্ষুব্ধ হয়। বলে, মেয়ে কবে তোমায় সব বলবে সেই আশায় বসে থাকো। এবার মেয়েকে চোখে চোখে রাখবে আর কখন কোথায় যায় জিগ্যেস করবে।

তার পর থেকে খুব টানাপোড়েনের মধ্যে আছে প্রতিমা। যখনই সুযোগ পাচ্ছে খুঁটিয়ে লক্ষ করছে তমালিকাকে। আরও সুন্দর হয়ে উঠেছে মেয়েটা। সেটা শুধু রূপটানের জন্যে নয়, শরীর থেকে একটা আভা ফুটে বেরচ্ছে। মাঝেমাঝে খুব অন্যমনস্ক থাকে মেয়েটা। লক্ষণগুলো ভালো নয়। এসব যত দেখছে তত শঙ্কিত হয়ে পড়ছে সে। রোজই ভাবে তমালিকাকে জিগ্যেস করবে অরণ্যের বিষয়ে। কিন্তু ঠিক যেন সাহসে কুলোচ্ছে না। যা গম্ভীর থাকে। অসিতকে বলেছিল জিগ্যেস করতে। অসিত বলল, সেটা ঠিক হবে না, তুমি জিগ্যেস করো।

শেষে দু’জনে আলোচনা করে একটা উপায় বের করেছে। সেই জন্যেই মনে মনে প্রস্তুত হয়ে বারান্দায় বসে আছে প্রতিমা। কিন্তু মেয়ে সাজছে তো সাজছেই। বারান্দায় বসে একটা গল্পের বই নিয়ে নাড়াচাড়া করছে প্রতিমা। দু’একবার পড়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কিছু মাথায় ঢুকছে না। রাজ্যের আজেবাজে চিন্তা ঝেঁপে আসছে। মেয়েটা যদি কোনও খারাপ ছেলের পাল্লায় পড়ে! মেয়ে ছাড়া তো আর কেউ নেই প্রতিমার। নিজেদের তো হল না। এক সময় দত্তক নেওয়ার ভাবনাচিন্তা করেছিল। তমালিকা আসার পর সে চিন্তায় ছেদ পড়ে।

দিদি শেষ সময়ে খাতায় লিখেছিল, তমালিকাকে তোর কাছে রাখিস। দিদির চোখের ভাষা দেখে বুঝতে পারত প্রতিমার কাছে মেয়েকে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছে। সেই তমালিকা কবে যেন এত বড় হয়ে গেল!

গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ঘর থেকে বারান্দায় এল তমালিকা। আড়চোখে একবার দেখে নেয় প্রতিমা। সত্যি, মেয়েটা সাজলে মুনি-ঋষিদেরও টলিয়ে দিতে পারে। মেরুন রঙের সালোয়ার-কামিজের ওপর ঘি রঙের ওড়না। ফুরিয়ে আসা বিকেলের আলোয় একটা মায়াবী রূপ নিয়েছে মেয়েটা। চোখমুখ থেকে দ্রুত আবেশের রেশটুকু মুছে ফেলল প্রতিমা। গলাটা একটু গম্ভীর করে বলল, শোনো, এ দিকে এসো।

থমকে দাঁড়াল তমালিকা। ভেতরে ভেতরে একটু শিউরে উঠল। মাসিমণি ‘তুমি’ করে বলছে, তারপর গলাটাও গম্ভীর। কিছু একটা গড়বড় হয়েছে মনে হয়। তমালিকা এগিয়ে গেল। বলল, কী বলছ?

পাশের চেয়ারটা দেখায় প্রতিমা, বোসো এখানে।

বাধ্য মেয়ের মতো বসে পড়ল তমালিকা। কিন্তু মনে মনে প্রমাদ গুনল। পাঁচটার সময় পার্কে দাঁড়াবার কথা অরণ্যের। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে; তার ওপর প্রতিমার ভাবভঙ্গি সুবিধের নয়। খুব সহজে ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না।

প্রতিমা বলল, কোথায় বেরচ্ছ এখন?

তমালিকা বলল, হোমের দিকে যাব একবার।

এই সন্ধেবেলা হোমে গিয়ে কী করবে তুমি; গানের ক্লাস তো সকালে।

এর মধ্যে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়েছে তমালিকা। বলল, বাচ্চাগুলো আমাকে খুব ভালোবাসে, তাই সময় পেলে চলে যাই।

তোমাকে একটা দরকারি কথা বলার আছে।

বলো। প্রতিমার দিকে তাকাল তমালিকা।

তোমার মেসোমশাইয়ের এক কলিগ তার ছেলের জন্যে মেয়ে খুঁজছেন। ছেলেটি ভালো চাকরি করে। আমরা তাঁকে আসতে বলব ভাবছি।

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল তমালিকা। তারপর বলল, আমার এক্ষুনি বিয়ে করার ইচ্ছে নেই।

প্রতিমা বলল, আবার কবে করবি! বিয়ে করার এটাই ঠিক সময়।

এখন এত তাড়াতাড়ি কেউ বিয়ে করে না।

তাড়াতাড়ি কোথায়! প্রতিমা বলল, তোর মায়ের, আমার কত বছর বয়েসে বিয়ে হয়েছিল জানিস?

সে তো শুনি, দিদার দশ বছর বয়েসে বিয়ে হয়েছিল।

প্রতিমা একটু রেগে গেল। বলল, এভাবে চলতে থাকলে তো এক সময় দেখব সবাই বুড়ি বয়েসে বিয়ে করছে।

তমালিকা হেসে ফেলল, মন্দ কী; বাঁধানো দাঁত নিয়ে, চুলে কলপ লাগিয়ে বিয়ে করবে মানুষ।

তুমি তোমার মেয়ের ব্যাপারে অমন ভাবনাচিন্তা কোরো, কিন্তু আমাদের অত দেরি করার ইচ্ছে নেই।

আমারও ঠিক অতটা দেরি করার ইচ্ছে নেই। কিন্তু চাকরির চেষ্টা করছি; একটা কিছু পেলে তার পর তোমরা ভাবনা-চিন্তা কোরো।

প্রতিমা অবাক হল। বলল, ওমা! তবে যে বলেছিলি, চাকরি-বাকরি করবি না, গান নিয়ে থাকবি!

সেরকমই তো ভেবেছিলাম, কিন্তু এখন দেখছি মেয়েদের সেল্ফ-সাফিসিয়েন্ট হওয়াটা খুব দরকার।

তমালিকা তেমন নিপুণ অভিনেত্রী নয়। কথাগুলোর পিছনে বিশ্বাসের অভাবটা ফুটে উঠছিল। আর সেটাই ধরা পড়ে গেল প্রতিমার কানে। এবার সরাসরি প্রশ্ন করল প্রতিমা, সত্যি কথা বল তো; তোর কি কাউকে পছন্দ করা আছে?

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল তমালিকা। তারপর বলল, হঠাৎ এমন কথা বলছ কেন?

 তোর মতিগতি আমার ভালো ঠেকছে না।

তমালিকা বলল, যদি পছন্দ করে থাকি, তোমরা কি মেনে নেবে না?

 সেটা এক কথায় কী করে বলব; অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করছে।

তোমার কী মনে হয়, আমার চয়েজ রং চয়েজ হবে? আমার ওপর এতটুকু বিশ্বাস নেই!

প্রতিমা বলল, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন নয়; তুই এখনও ছেলেমানুষ; ভয়টা তো সেই জন্যেই।

তমালিকা বিস্ময়ের ভান করে বড় বড় চোখে তাকায়। বলে, তবে এই ছেলেমানুষটার বিয়ে দিয়ে দেবে বলছ!

রাগ দেখাতে গিয়েও হেসে ফেলল প্রতিমা। বলল, বড্ড পাকা হয়েছিস! এই তো সে দিনও আমি পাশে না শুলে ঘুমোতে পারতিস না। এত কথা শিখলি কোথা থেকে বল তো?

জানো না এখন কথা শেখানোর কোর্স চালু হয়েছে?

প্রতিমা বলল, ও সব ইয়ার্কি ছাড়, আসল কথাটা তুই এড়িয়ে যাচ্ছিস। তোর মেসোমশাই খুব চিন্তা করছে। আমাকে বকাবকিও করেছে। আমি নাকি তোর ওপর ঠিক নজর রাখছি না। এখন বল তো ছেলেটা কে, কী করে।

ছেলেটার নাম জানতে চাও?

নাম, বাবার নাম, পেশা সব জানতে চাই।

নাম জেনে কী হবে! সেই বিখ্যাত প্রবচনটা শোনোনি— হোয়াটস ইন এ নেম—নামে কী আসে যায়!

আবার ফাজলামি!

আসলে ওর নামটা খুব বিচ্ছিরি। পেশা জনসেবা আর স্বপ্ন বিপ্লব ঘটানো।

প্রতিমা বলল, হুঁ, বুঝেছি, পার্টি করে। এ বার নামটা বল।

পাঁচুগোপাল পুরকাইত। ডাকনাম অবশ্য একটা আছে, সেটা কিছুটা স্মার্ট।

ফের শুরু করলি! রেগে ওঠে প্রতিমা।

না গো সত্যি বলছি, মুখটা একটু সিরিয়াস করে তমালিকা বলল, ওর ডাকনামটা স্মার্ট আছে—চাকু পেঁচো। পাঁচুগোপাাল থেকে পেঁচো আর কথায় কথায় ছুরি চালায় বলে চাকু। ওদের দলে অ্যাকশনে যারা থাকে তাদের এই রকমই সব নাম হয়, যেমন—পেটো বাপি, মেশিন দিলীপ, ভোজালি স্বপন…

চুপ করে যায় প্রতিমা। চোখ দুটো ছল ছল করে ওঠে। বলে, ঠিক আছে, তোকে আর কিছু জিগ্যেস করব না। তুই যা ভালো বুঝিস কর।

প্রতিমাকে জড়িয়ে ধরল তমালিকা। গালে গাল ঠেকাল। বলল, রাগ করছ কেন, তোমাদের তো বলতামই।

পার্কে গিয়ে তমালিকা দেখল ধারেকাছে অরণ্যের চিহ্ন নেই। এই রকমই একটা আশঙ্কা করেছিল সে। বড্ড ধৈর্য কম ছেলেটার। কোথাও একটু দাঁড়াতে হলেই গায়ে জ্বর। বলে, মিছিলে হেঁটে হেঁটে অভ্যেস খারাপ হয়ে গেছে, তাই দাঁড়াতে পারি না।

তবু পার্কের চারদিকে আর একবার ভালো করে চোখ বোলাল তমালিকা। সন্ধে হয়ে গেছে একটু আগে। পোস্টের মাথায় মাথায় আলোগুলো জ্বলছে। শীতের পোশাক পরে হাঁটাহাঁটি করছে স্বাস্থ্যবাতিক মানুষজন। এদের মাঝে কোথাও অরণ্য নেই। অথচ এখন ভীষণ দরকার অরণ্যকে। এত বড় খবরটা ওকে না দিতে পারা পর্যন্ত স্বস্তি নেই।

দ্রুত সাইকেল চালিয়ে পিয়ালীদের বাড়ি এল তমালিকা। যথারীতি মায়ের সঙ্গে খিটিমিটি লেগেছে পিয়ালীর। ‘এই মন তোমার আমার’ সিরিয়ালটা অত্যন্ত সাসপেন্সের জায়গায় চলে গেছে। নায়িকা চন্দ্রাণী বিষ খেয়ে হাসপাতালে। তার কী হবে তাই নিয়ে পিয়ালী বেশ উদবিগ্ন। এ দিকে আবার অন্য চ্যানেলে আলুর খোসা দিয়ে খাসির মাংসের একটা দুর্দান্ত পদ শেখানো হচ্ছে।

তমালিকাকে দেখে পিয়ালীর মা বলে ওঠেন, কী ব্যাপার রে, আর আসিস না?

তমালিকা বলল, একদম সময় পাচ্ছি না মাসিমা।

সময় পাচ্ছিস না, না কি বন্ধুর সঙ্গে হোমেই দেখা হয়ে যাচ্ছে বলে মাসিমার কথা আর মনে পড়ে না!

তমালিকা একটু লজ্জা পেল। বলল, না, তা কেন! আসলে বি-টিভির একটা কম্পিটিশনের জন্যে অডিশন দিয়েছিলাম, পাস করেছি। সেটার জন্যে খুব ব্যস্ত।

ও মা, তাই না কি। খুব ভালো, কোন অনুষ্ঠান রে?

ভালোবেসে গান গাই।

ও, মিস রুমকি যেটা পরিচালনা করে; কবে দেখাবে রে?

দাঁড়াও, আগে রেকর্ডিং হোক, দেরি আছে এখন।

নিজের ঘরে ঢুকেই পিয়ালী বলল, কী ব্যাপার বল তো, তোকে আজ এত খুশি-খুশি লাগছে।

তমালিকা চোখে মুখে রহস্যের ভঙ্গি করে বলল, তুই গেস কর।

তোর অরণ্যদেব চাকরি পেয়েছে।

নো, হল না। মাথা নাড়ে তমালিকা।

ইলেকশনে লড়ার টিকিট পেয়েছে?

দূর, তোর ইমাজিনেশন-পাওয়ার খুব পুওর।

তবে আর কী হবে! তা হলে নিশ্চয়ই অরণ্যদেবের সঙ্গে বেশি করে মুখমিষ্টি হয়েছে আজ।

মারব থাপ্পড়। মাসিমণির কাছে আজ কনফেস করে ফেললাম। মাসিমণি অরণ্যকে একদিন বাড়িতে নিয়ে যেতে বলেছে।

ব্যস! পাকা দেখা কমপ্টি। নাও, এবার লাগিয়ে দাও বিসমিল্লা।

ওহ, তুই এখনও প্রিমিটিভ রয়ে গেলি। একটা রিলেশন গ্রো করল মানেই বিয়ের চিন্তা।

তা তুই কীসের ধান্দায় প্রেম করিস রে? কমিউনিজমে দীক্ষা নিবি বলে?

যদি নিইও—খারাপ জিনিস তো নয়। ওরাই তো গরিব-দু:খীদের কথা ভাবে, তাদের জন্যে লড়াই করে।

মুখটা একটু বিকৃত করে পিয়ালী বলল, বাব্বা:, প্রেমের কী মহিমা রে! এবার তো দেখছি প্রেমে পড়লে সাপ নেউলের সঙ্গে কোলাকুলি করবে।

*

বিছানায় চুপ করে শুয়ে আছে তমালিকা। রাত বাড়ছে কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। মনটা এখন অনেক ভারমুক্ত। চাপা একটা মনোকষ্ট ছিল তার। মাসিমণি-মেসোমশাই কীভাবে নেবে ব্যাপারটা। কিছুতেই ওদের কষ্ট দিতে চায় না তমালিকা। রোজ ভাবত প্রসঙ্গটা তুলবে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে আসত। ওরা যদি আঘাত পায়, অরাজি থাকে, তখন তো উভয় সঙ্কটে পড়বে সে।

মাসিমণির কাছে সে কিছুই গোপন করে না; কিন্তু অরণ্যের কথাটা, কেন কে জানে, কিছুতেই বলতে পারেনি। আজ অরণ্যকে খবরটা দেওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু কিছুতেই যোগাযোগ করা গেল না। বাবুর একটু গোসা হবে। যাক, গুড নিউজটা পেলে গোমড়া মুখে ঠিক হাসি ফুটবে। কীভাবে বলবে কথাটা। দেখা হলে প্রথমেই বলে দেবে। না, নদীর ধারে বিকেলে বেড়াতে গিয়ে বলবে। নিশ্চয়ই একটু দুষ্টুমি করবে অরণ্য। ধ্যাত, খালি আজেবাজে চিন্তা! এবার ঘুমোতে হবে। না হলে, কাল ভোরবেলা উঠে রেওয়াজে বসতে পারবে না।

আরও কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে উঠে পড়ল তমালিকা। আলো জ্বালল। একটা পত্রিকা নিয়ে পড়ার চেষ্টা করল একটু। ভালো লাগল না। ফোনটা টেনে নিল। অরণ্যের সঙ্গে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে। কিন্তু ওদের তো ফোন নেই। খুব রাগ হল তমালিকার। কেন, ফোন নেয়নি কেন! তাহলে কেমন কথা বলতে পারত।

অন্যমনস্ক হয়ে বাটন টিপল তমালিকা। রিং হচ্ছে। কয়েকটা রিঙের পর কেউ একজন রিসিভার তুলল।

হ্যালো!

গলায় ঘুম জড়িয়ে আছে পিয়ালীর।

কী রে, কী করছিলি? তমালিকা বলল।

কে বলছেন?

ঘুমের ঘোরে তমালিকার গলা চিনতে পারেনি পিয়ালী। তমালিকা বলল, তোর শ্বশুর।

ও তুই! কী হল আবার; এখন ক’টা বাজে?

ঘুমোচ্ছিলি না কি?

এর মধ্যেই বোধহয় ঘড়ি দেখে নিয়েছে পিয়ালী। বলল, বারোটা দশ। যে-কোনও সুস্থ মানুষই এখন ঘুমোবে।

তমালিকা বলল, এই রে, বারোটা বেজে গেছে, খেয়াল করিনি!

শুধু ঘড়িতে নয়, বারোটা তোরও বেজে গেছে।

তমালিকা বলল, বাবা, রাগ করছিস কেন! ঠিক আছে, রেখে দিচ্ছি।

আর ন্যাকামি করতে হবে না। ঘুমটা তো চটকে দিলি, কী বলবি তাড়াতাড়ি বল।

তমালিকা বলল, কী যেন একটা বলব ভাবছিলাম, তুই গণ্ডগোল করে দিলি।

গণ্ডগোল আমি করিনি, গণ্ডগোলের পাণ্ডা ওই অরণ্যদেব। ছবিটবি আছে?

কার?

অরণ্যদেবের। যদি থাকে, তাহলে সামনে রেখে পদ্মাসনে বসে ধ্যান কর; দেখবি, গাছের ডাল বেয়ে এসে ছাদ ফুঁড়ে ঘরে ঢুকছে।

হি হি করে হাসল তমালিকা। বলল, ঘুম আসছে না রে, তাই ভাবলাম…

পিয়ালীকে একটু জ্বালাতন করি; তাই তো? তোর এখন মনের মধ্যে এরকম বেয়াড়া ভাব দেখা দেবে। মাঝরাতে ছাদে উঠে নাচতে ইচ্ছে করবে, চুল এলো করে পাগলিদের মতো হি হি করে হাসতে ইচ্ছে করবে—শুধু একটাই রিকোয়েস্ট। সব কিছুই করবি সুস্থ মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটিয়ে।

তমালিকা বলল, ঠিক আছে বাবা, ঘুমো তুই…

হঠাৎ পিয়ালী একটু সিরিয়াস গলায় বলল, তোকে একটা কথা বলার আছে; আমি আজই শুনলাম কথাটা।

বলে ফ্যাল।

তোরা পরস্পরের কাছে অকপট তো?

মানে!

মানে, ফ্র্যাঙ্ক তো?

অকপট মানে ফ্র্যাঙ্ক সেটা আমি জানি। কিন্তু তোর বক্তব্য বুঝতে পারছি না।

অরণ্য নিশ্চয়ই সব কথা তোকে বলে।

তা তো জানি না।

সে কী রে, কেমন প্রেম তোদের! প্রেম করলে তো সব বলা উচিত।

তাই তো, ঠিক বলেছিস। কাল থেকে ওকে বলব, কী দিয়ে ভাত খেয়েছে, কবার ঢেকুর তুলেছে বা ক’টা মেয়ের দিকে আড়চোখে দেখেছে সব যেন বলে দেয়।

পিয়ালী বলল, ইয়ার্কি ছাড়। এটা সিরিয়াস ব্যাপার। তুই কি জানিস ওর আর একটা মেয়ের সঙ্গে অ্যাফেয়ার আছে?

ওমা তাই; জানি না তো! কে বলল তোকে? তমালিকা বিস্ময়ের ভান করল।

মা বলছিল। মা-কে বোধহয় বাবা বলেছে। মেয়েটাও না কি পার্টি করে।

তমালিকা হেসে বলল, জানি, অরণ্য আমাকে আগেই বলেছে। তবে ও চ্যাপ্টার ক্লোসড—শুধু পলিটিক্যাল বাধ্যবাধকতার জন্যে কিছু রিলেশন রাখতে হয় শবরীর সঙ্গে।

ফোন রেখে বাইরে এল তমালিকা। বেশ শীত পড়েছে। ঠান্ডা জ্যোৎস্নায় ভিজে যাচ্ছে গাছপালা। চারদিকে কুয়াশার হালকা চাদর। একটা পেঁচা এসে বসল সামনের ঝাঁকড়া আমগাছে। অরণ্য এখন কী করছে? ঘুমোচ্ছে নিশ্চয়ই।

জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া চরাচর দেখতে দেখতে হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ে যায় তমালিকার। বাবা এখন কোথায়? বেঁচে আছে কী? কে জানে! তার বড্ড দেখতে ইচ্ছে করছে বাবাকে।

চোখের জলে ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায় তমালিকার চারপাশ।

সতেরো

গলা পর্যন্ত লেপ ঢাকা দিয়ে গল্পের বই পড়ছিল অরণ্য। পথের পাঁচালী। অনেক দিন আগে একবার পড়েছিল। এক সময় গোগ্রাসে গল্পের বই পড়ত অরণ্য। বাড়িতে আর কিছুর প্রাচুর্য না থাক, গল্পের বইয়ের অভাব ছিল না। আলমারি ভরতি রবীন্দ্রনাথ বিভূতিভূষণ তারাশঙ্কর মানিক।

কলেজ জীবনে কয়েকটা গল্প কবিতা লিখে ফেলেছিল অরণ্য। দু’একটা ছাপাও হয়েছিল কলেজ ম্যাগাজিনে। তার পর না লিখলেও পড়ার অভ্যেসটা ছিল। পার্টি করতে গিয়ে সেটাও গেল।

পার্টির মধ্যে যারা সাহিত্যসংস্কৃতির লোক বলে মান্য হয় তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছে অরণ্য। এরা রবীন্দ্র বিভূতি তারাশঙ্করের ধার ধারে না। এদের কাছে একমেবাদ্বিতীয়ম কবি ও সাহিত্যিক সুকান্ত ভট্টাচার্য। সুকান্তর কবিতাও অরণ্যের ভালো লাগে, বেশ শক্তিশালী কবি বলে মনে হয়, কিন্তু তার জন্যে অন্যদের নামে নাক সেঁটকাতে হবে কেন!

পড়তে পড়তে একেবারে বুঁদ হয়ে গেল অরণ্য। মনে হচ্ছে যেন আত্মজীবনী পড়ছে। কুড়ি-পঁচিশ বছর আগেকার জঙ্গলসুফিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছোট্ট অরণ্য। সেই পথ-ঘাট, নদী, বাঁশবন। সেই যাত্রাপালা। এক দীনহীন বালকের দৈনন্দিন জীবন। তার মুগ্ধতাবোধের কাহিনি। কোথাও শোষণের মেকি গল্প নেই, কোথাও দারিদ্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার জেহাদ নেই, শুধু প্রবহমান জীবনের অনাড়ম্বর কথকতা। তবু অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরেছে অরণ্যকে।

দাদা তোর সঙ্গে একটা কথা ছিল।

অরণ্য বই থেকে চোখ সরিয়ে দরজার দিকে তাকাল। অর্চন দাঁড়িয়ে আছে। অরণ্য বইটা বন্ধ করে বলল, বল।

ঘরে ঢুকে তক্তপোশের পাশে চেয়ারে বসল অর্চন। অর্চনকে আপামস্তক লক্ষ করল অরণ্য। যৌবনের সেই চনমনে ভাবটাই আর নেই। চোখগুলো অস্বাভাবিক চঞ্চল। একটা অজানা আশঙ্কায় যেন সব সময় শঙ্কিত। আসলে জাত খুনিদের ধাতই আলাদা। তার জন্যে অন্যরকম মানসিক গড়ন দরকার। ছাপোষা স্কুলশিক্ষকের ছেলের পক্ষে ‘খুনি’ বদনাম বহন করাও খুব কঠিন। অরণ্য ফের বলল, বল কী বলবি।

অর্চন বলল, একটা চাকরির যোগাযোগ হয়েছে।

চাকরি! বিছানায় সোজা হয়ে বসে অরণ্য বলল, কী চাকরি?

অর্চন বলল, নবকে মনে আছে তোর? পার্বতীপুরে বাড়ি, আমার সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ত, দু’একবার এসেছে আমাদের বাড়ি। ও এখন কলকাতায় একটা সেন্ট কোম্পানিতে চাকরি করে। ওকে সেন্ট নিয়ে অফিসে অফিসে সেল করতে হয়। মাইনে প্লাস কমিশন। ভালোই রোজগার হয় বলল। ওদের কোম্পানিতে কয়েকটা ছেলে নেবে। নব বলছিল, ওর সঙ্গে বসের ভালো ফিল্ড আছে; ও বললে আমাকে নিয়ে নেবে।

অরণ্য বলল, প্রাইভেট কোম্পানিতে সেলসের চাকরি; ধকল খুব, সামলাতে পারবি?

অর্চন বলল, হ্যাঁ পারব।

অফিসটা কোথায় কোম্পানির?

সল্টলেকে; তবে কাজ করতে হবে মেনলি ডালহৌসি অফিস পাড়ায়।

অরণ্য বলল, সল্টলেকে তো তুই এখান থেকে যাতায়াত করতে পারবি না।

না, মেসে থাকতে হবে। নব বলেছে, ওর মেসেই সিট খালি আছে, ব্যবস্থা করে দেবে।

মাইনে কত দেবে; মেসে থেকে পোষাতে পারবি?

আপাতত হাজার দুয়েক প্লাস কমিশন; টি এ থেকেও কিছু থাকে।

অরণ্য বলল, মেসের চার্জ দিয়ে কত আর হাতে থাকবে। তা ছাড়া বাইরে থাকলে বাড়তি একটা খরচ আছে। এখানে যদি তুই মন দিয়ে কিছু একটা করিস সেটা ওর থেকে খারাপ কিছু হবে না।

চুপ করে বসে রইল অর্চন। আসলে সে এই এলাকা ছেড়ে দূরে থাকতে চাইছে। পুলিশ এখনও তাকে অ্যারেস্ট করেনি ঠিকই কিন্তু এখানকার সব মানুষের চোখে সে খুনি। কেউ যখন অর্চনের দিকে তাকায় সে তার দৃষ্টিতে লেগে-থাকা ঘেন্নাটুকু পড়ে নিতে পারে। অথচ সেদিন সমস্ত ঘটনাটাই তার হাতের বাইরে ছিল।

রমেশ সাহা কানুর সঙ্গে কাজে নেমেছিল। রমেশটা ছিল শেয়ালের মতো ধূর্ত। অতিরিক্ত লোভের জন্যে লাইনের নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করত না। একটা মালের বখরা নিয়ে কানুর সঙ্গে লেগেছিল। কানু ঠিক করল ভালোমতো কড়কে দেবে রমেশকে। চ্যাঙাব্যাঙা করে পিটিয়ে একটা হাত বা পা খোঁড়া করে দেওয়া হবে।

সুযোগটাও ভালো পাওয়া গেল। মেদিনীপুরে কানুর হয়ে কাজ করে রতন। রতনের ওপর দায়িত্ব দিল রমেশকে সাইজ করার। অর্চন কেবল চিনিয়ে দেবে। কিন্তু কেলো করে দিল বিশু। সেদিন ঠিক জুটে গেল রমেশের সঙ্গে। অবশ্য তাদেরও হোমওয়ার্কে খামতি ছিল। রমেশ যে হালে সঙ্গে মেশিন রাখছে সেটা তারা জানত না।

বিশুকে দেখে অর্চন সে দিনের মতো অপারেশন মুলতুবি রাখতে বলেছিল। কিন্তু রতনটা গোঁয়ার। ভেবেছিল দুটোকেই কায়দা করতে পারবে। রতন সবেমাত্র পেছন থেকে জামার কলারটা ধরেছে, রমেশ এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে পকেটে হাত ঢোকাল। সঙ্গে সঙ্গে যা বোঝার বুঝে গেল রতনের অভিজ্ঞ চোখ। এক মুহূর্ত দেরি করেনি সে। মেশিন বের করে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে চালিয়ে দিল রতন।

বিশুটা বিকট ডাক ছেড়ে টাট্টু ঘোড়ার মতো দৌড়োল। বিশুর হাতে ছিল তিন সেলের টর্চ। আলোটা এক বারই পড়েছিল অর্চনের মুখে। অতটুকু সময়ে হয়তো চিনতে পারত না। কিন্তু ভয় পেয়ে গেল অর্চন আর চাপের মাথায় মোক্ষম ভুলটা করে বসল। বিশুকে পালাতে দেখে চিৎকার করে বলল, এটাকে ঝাড় রতন তাড়াতাড়ি। একটু দেরি করে ফেলেছিল রতন। নিশানাটা ফসকে গেল। কাঁধে গুলি খেয়ে চিৎকার করতে করতে পালাল বিশু এবং মাঝখান থেকে অর্চনের গলাটাও চিনে নিল।

অরণ্য বলল, কোম্পানিটার নাম কী?

অর্চন বলল, নব বলেছিল, কিন্তু ভুলে গেছি।

আসলে বড় কোম্পানিতে সেলসের কাজে কিছু প্রসপেক্ট থাকে, কিন্তু ছোট কোম্পানিতে কোনও ভবিষ্যৎ নেই। কিছুদিন পরে হয় কোম্পানি উঠে যায় আর নয়তো মাইনে বাড়াবার সময় হলেই পুরোনো লোক ছাঁটাই করে নতুন ছেলে নেয়।

অর্চন বলল, খুব ছোট কোম্পানি নয়।

খুব বড়ও নয়, বড় কোম্পানি এভাবে সেন্ট বিক্রি করবে না।

তাহলে কি যাব না বলছিস?

সেটা ভেবে দেখ। নবকে একবার আমার সঙ্গে দেখা করতে বলিস।

অর্চন বলল, আসলে আমি কিছুদিন এই এলাকার বাইরে থাকতে চাইছি।

সেটা বুঝতে পেরেছি। ঠিক আছে, লেগে পড়; তারপর দেখা যাবে।

বইটা ফের খোলে অরণ্য। অর্চন বসেই থাকে। বসে বসে একটু উশখুশ করে; তারপর বলে, একটা প্রবলেম হয়েছে।

কী প্রবলেম? অর্চনের দিকে তাকাল অরণ্য।

নব বলছিল, প্রথমে চার হাজার টাকা কশান মানি লাগবে। ওটা রিফান্ডেবল; চাকরি ছেড়ে দিলে ফেরত পাওয়া যাবে।

অরণ্য বলল, চার হাজার টাকা!

সবটা দিতে হবে না। আমার কাছে কুড়িয়ে বাড়িয়ে হাজারখানেক হব।

কিন্তু তিন-ই বা আমি এখন পাব কোথায়?

তোর কথা বলছি না; তুই বাবাকে একটু বল না।

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে অরণ্য। দৃষ্টি বইয়ের দিকে। বুঝতে পারে অর্চন ব্যাকুল প্রত্যাশায় তার মুখের দিকে তাকিয়ে। বলে, তুইও তো বাবাকে বলতে পারিস।

আসলে বাবাকে বলতে কেমন যেন লাগছে। পেশমেকারের দাম তো শুনছি অনেক, সামনে এত বড় একটা খরচের ধাক্কা, তাছাড়া আগে তো দু’একবার টাকা নিয়ে নষ্ট করে ফেলেছি…

 কিন্তু এবারেও যে টাকাগুলো কাজে লাগবে তার ঠিক কী! তখন তো বাবা আমাকে দোষ দেবে।

অর্চন বলল, বিশ্বাস কর, এবার আমি কাজটা মন দিয়ে করব; আর তাছাড়া টাকাটা তো ফেরত পাওয়া যাবে।

অরণ্য বলল, অমন কত রিফান্ডেবল টাকা কত কোম্পানি মেরে দেয়! ঠিক আছে, বলছিস যখন, আমি বাবাকে বলে দেখব, আর তুই অবশ্যই নবকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলিস।

চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল অর্চন। দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এল। বলল, তোর সঙ্গে কি অবনীদার কোনও ঝামেলা-টামেলা হয়েছে?

কেন বল তো? অরণ্য ভুরু কুঁচকে অর্চনের দিকে তাকাল।

আজ বাজারে দেখা হয়েছিল, ইনডাইরেক্টলি তোর নামে কিছু কথা বলল।

কী বলল?

প্রথমে দু’একটা মামুলি কথার পর জিগ্যেস করল, পুলিশ আর এর মধ্যে এসেছিল কি না। তারপর বেশ ক্ষোভের সঙ্গে বলল, কী জানিস তো, তোদের জন্যে আমাদের অনেক রিস্ক নিয়ে কাজ করতে হয়, পরে সবাই সেটা মনে রাখে না। অনেকে আবার পার্টির থেকে নিজেকে বড় বলে মনে করে।—আমার কেমন যেন মনে হল তোকে মিন করে কথাগুলো বলছে।

অরণ্যের মুখটা থমথমে হয়ে যায়। একটু চিন্তিতভাবে বলে, তখন আর কেউ ছিল অবনীদার সঙ্গে?

অর্চন বলল, না, একাই ছিল।

আঠারো

এই কাজটা ও মন দিয়ে করবে বলছিস?

সেটা বলা মুশকিল। তবে নতুন জায়গায় নতুন কাজ তো, ভালো লেগে গেলেও যেতে পারে।

আমার কিন্তু খুব সুবিধের মনে হচ্ছে না। দুটো একটা নয়, এতগুলো টাকা, মার গেলে বড্ড লাগবে।

কিন্তু কী আর করা যাবে বলো; এখানে ও কিছু করতে পারবে না, আমি সিওর। শুয়ে বসে থেকে আরও খারাপ হয়ে যাবে।

নাক দিয়ে গড়িয়ে পড়া কাঁচা জলটুকু রুমাল দিয়ে মুছে তারাচরণ বললেন, দেখ, যা ভালো বুঝিস কর।

ক্রমশ জাঁকিয়ে বসছে শীতটা। উত্তুরে হাওয়া জামা-কাপড় ফুঁড়ে কামড় দিচ্ছে শরীরে। একটা দুটো করে খসে পড়ছে বয়স্ক পাতা। মাজা থালার মতো ঝকঝকে আকাশ রোদ ঢালছে। মাদুর পেতে উঠোনে বসে তারাচরণ। চোখ দুটো আর নাকটা বাদে সমস্ত শরীরটা মোড়া।

রবিবার বাজার যাওয়ার নামে গায়ে জ্বর আসে অরণ্যের। রবিবার মানেই বাজারে খ্যাপাটে ভিড়। ব্যাপক ঠেলাঠেলি আর কনুইয়ের গুঁতো হজম করতে হয়। কিন্তু সকালে অর্চন কোথাও একটা গেছে, এখনও ফেরার নাম নেই।

অরণ্য বলল, দেখি, আর একটু ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে। নবর সঙ্গে কথা বলি একবার।

মহামায়া বাজারের ব্যাগটা অরণ্যের হাতে দিয়ে বলল, এত করে বলছে যখন, মনে হয় একটু মতি হয়েছে।

অরণ্য বলল, কিন্তু জোচ্চোরের পাল্লায় পড়ল কি না সেটা তো দেখতে হবে।

আর কোনও কথা না বলে রান্নাঘরে চলে গেল মহামায়া। তারাচরণ বললেন, নলেনগুড়ের সন্দেশ একটু নিয়ে নিস তো; অবশ্য গুড় আর কেউ দেয় না—সব রং আর সেন্ট, নিস তবু একটু সময়ের জিনিস।

তোমার সুগার বেড়েছে না! তুমি মিষ্টি খাবে!

প্রায় ঠান্ডা হয়ে আসা চায়ের তলানিটুকু মুখে ঢেলে দিয়ে তারাচরণ বললেন, অত ধরাকরা আর ভালো লাগে না; কিছু হবে না দুটো সন্দেশ খেলে।

টিনের শেড দেওয়া বাঁধানো একটা বাজার আছে জঙ্গলসুফিতে। রবিবার চাতাল উপচে পড়ে রাস্তায় চলে আসে বাজারটা। কিছু ব্যাপারি পসরা নিয়ে বসে পড়ে রাস্তার দুপাশে। তবে একটা ব্যাপার ভারী ভালো লাগে অরণ্যের। এই সময় রঙের হুড়োহুড়ি লেগে যায় বাজারে। চারদিকে রঙবেরঙের টাটকা শাকসবজি ঝলমল করে।

যতটা সম্ভব গা বাঁচিয়ে কেনাকাটা সেরে ফেলল অরণ্য। বাজারটা ফেলে রেখে একটু গেলেই চামুণ্ডামাতা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। সে দিকেই যাচ্ছিল অরণ্য। পাশে এসে মোটর সাইকেলের ব্রেক কষল মোনে। বলল, অরণ্যদা তোমাদেরই খুঁজছি, তোমাদের বাড়ি গিয়েছিলাম। বাড়িতে বলল, বাজারে এসেছ।

অরণ্য বলল, হঠাৎ আমাকে?

অবনীদা এক্ষুনি একবার যেতে বলল।

আমাকে! কপালে ভাঁজ পড়ল অরণ্যের।

হ্যাঁ রে বাবা তোমাকে।

কেন?

ওই বাচ্চাদের পোলিও খাওয়ানো নিয়ে কী সব ঝামেলা হয়েছে সর্দার পাড়ায়…

বেশ কয়েক দিন অবনীর সঙ্গে দেখা করেনি অরণ্য। অবনীও আর ডেকে পাঠায়নি। এর মধ্যে শবরীর সঙ্গে একদিন দেখা হয়েছিল রাস্তায়। পরীক্ষা হলের গার্ডের মতো গম্ভীর মুখ করে চলে যাচ্ছিল শবরী। অরণ্যই জিগ্যেস করল, কোথায় যাচ্ছ?

একটা অত্যন্ত বিষাক্ত হাসি হেসে শবরী বলল, তোমার টেনশনের কোনও কারণ নেই; তোমার কাছে যাচ্ছি না। তোমার নতুন প্রেমিকার খবর কী?

অরণ্য বলল, তোমার শুনে কাজ নেই, মিছিমিছি টেনশন বাড়বে।

শবরী বলল, তুমি খুব নির্লজ্জ।

তোমার থেকেও! সপাটে বলল অরণ্য।

শবরী আর দাঁড়ায়নি; দ্রুত চলে গিয়েছিল।

অরণ্য মোনেকে বলল, ঠিক আছে চল; বাজারটা পৌঁছে দিয়েই আমি যাচ্ছি।

স*

অবনীর বাড়ি পৌঁছে অরণ্য দেখল বেশ কয়েক জন ইতিমধ্যেই জুটেছে। সবাই বেশ উত্তেজিত। থমথমে মুখ করে বসে আছে অবনী। হেলথ সেন্টারের কর্মী মদন দাসও আছে।

কী হয়েছে? ঘরে ঢুকেই জিগ্যেস করল অরণ্য।

অবনী বলল, সর্দার পাড়া পোলিও বয়কট করেছে; বলছে ওদের পাড়ার না কি ডেভেলপমেন্ট হয়নি, তাই বাচ্চাদের পোলিও খাওয়াবে না।

ঝন্টু বলল, শোনো অবনীদা, আমাদের মাথাব্যথা করে লাভ নেই। মদনদা, তুমি আর একবার গিয়ে বোঝাও, তা কাজ হলে ভালো, না হলে ওদের ছেলেমেয়েরা গাদায় যাবে।

মদন দাস বলল, ব্যাপারটা কিন্তু অত সরল না। একটা বাচ্চাও যদি বাদ পড়ে তবে সব বাচ্চা আনসেফ হয়ে যাবে।

অবনী বলল তা ছাড়া অনেক প্রবলেম আছে। খবরের কাগজ আর টিভি যদি একটু গন্ধ পায় তো একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তখন আমাদের নাম-টাম বেরিয়ে গেলেই কেলো হয়ে যাবে একেবারে।

অরণ্য বলল, এখানে বসে আলোচনা করলে তো প্রবলেম সলভ হবে না; চলো, সবাই মিলে গিয়ে দেখি কনভিন্স করাতে পারি কি না।

অবনী বলল, একটু ওয়েট কর, ওখানে মব ফিউরিয়াস হয়ে থাকতে পারে। ভুলু সর্দারকে খবর দিয়েছি, সে ও-পাড়ার নাড়ি-নক্ষত্র জানে—ও আসুক আগে…

সর্দার পাড়ায় কিছু মাতাল সাপোর্টার ছিল অরণ্যের পার্টির। টনটনে জ্ঞানবান মাতাল তারা। তাদের কাজই ছিল মদ খেয়ে গ্রামের কিছু বিশিষ্ট মানুষের বাড়ির সামনে গালমন্দ করা। ভুলু সর্দারের মাধ্যমে লোকগুলোকে তোল্লাই দিত অবনী।

ভুলু চলে এল তিন মিনিটের মধ্যে। মুখটা কাঁচুমাচু করে ঘরে ঢুকতেই অবনী ধমকাল, কী রে ভুলু, কেমন কাজ করিস; এত বড় একটা ঘোঁট পাকিয়েছে—কালও তোর সঙ্গে পার্টি অফিসে দেখা হল, কিছু তো বললি না!

ভুলু বলল, বিশ্বাস করো অবনীদা, তলে তলে এত কাণ্ড আমি একটুও বুঝতে পারিনি।

অবনী বলল, কোন পার্টি ওসকাচ্ছে জানিস?

ভুলু বলে, না, না, এর মধ্যে পার্টি-ফার্টি নেই; শালারা নিজেরাই মাথা মেরেছে। আমাদের পাড়ায় ক’পিস আছে একেবারে ঘোড়েল মাল।

নন্দ বলল, চলো, সবাই গিয়ে বোঝাই ওদের।

ভুলু বলল, তোমরা যাও, আমি বরং থেকে যাই। আমাকে দেখলে ওই হারামির বাচ্চারা বেশি গালাগালি দেবে।

সর্দার পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়েছিল দলটা। কিছু একটা আলোচনা করছিল চাপা গলায়। অবনী দলবল নিয়ে যেতেই চুপ করে গেল।

অবনী বলল, রঘু, কী হয়েছে আমাকে বল।

মাথায় ঝাঁকড়া চুল, কালো পেটানো চেহারার রঘু গুড়াকু দিয়ে দাঁত মাজছিল। বলল, কই, কিছু হয়নি তো!

অ, তা ভালো, অবনী বলল, বলছিলাম কী, তোর ছেলেটাকে পোলিও-র ওষুধ খাইয়েছিস তো?

রঘু একটু ইতস্তত করে। তার পর বলে, সোনাকা তুমি বলো না।

সনাতন সর্দার একটা বিড়ি ধরিয়ে খক খক করে কাশল। তার পর বলল, আমরা পোলিও খাওয়াবুনি।

অবনী বলল, কেন, পোলিও খাওয়াবে না কেন?

সনাতন বলল, আমরা বয়কট করিছি।

সে তো বুঝলুম, কিন্তু বয়কট কেন?

গরমেন আমাদের কী দেছে যে, আমরা পোলিও খাওয়াব! আমার পাড়ায় রাস্তা হলুনি, টিউকল হলুনি, আমরা পোলিও খাওয়াতে যাব কেন বলো দিকি?

তার পর বিস্তর বাবা বাছা বলে, গায়ে হাত বুলিয়ে, গাদা গাদা মিথ্যে কথা বলে, কেন্দ্রের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে ঘন্টাখানেকের মধ্যে বিদ্রোহীদের ম্যানেজ করে ফেলল অবনী।

অরণ্য বুঝল তার আর এখানে করণীয় কিছু নেই। সর্দার পাড়া থেকে শর্ট-কাট একটা রাস্তা হোমে চলে গেছে। রাস্তা চোখে পড়তে হঠাৎ-ই তীব্র একটা ইচ্ছা জেগে উঠল অরণ্যের। তমালিকার এখন হোমে থাকার প্রবল সম্ভাবনা। কাল সারাদিন দেখা হয়নি। খুব টানছে তমালিকা।

সাইকেলে উঠে পড়ল অরণ্য। পেছন থেকে অবনী ডাকল, কোথায় যাচ্ছিস?

অরণ্য বলল, একটু কাজ আছে।

কী কাজ?

মেজাজটা খিঁচড়ে গেল অরণ্যের। এই দাদাগিরিটা অসহ্য। প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু মুডটা বিগড়ে দিয়েছে অবনী। অরণ্য স্পষ্ট করে বলল, আমি একবার হোমে যাব।

অরণ্য-তমালিকার সম্পর্কের ব্যাপারটা বেশ চাউর হয়ে গেছে। সবাই তাকাল অরণ্যের দিকে। অবনীর চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ। কিন্তু খুব দ্রুত বিরক্তিটা গিলে ফেলে বেশ মোলায়েম করে বলল, তোর সঙ্গে একটু পার্সোনাল কথা আছে।

অরণ্য কাটাতে চাইল। বলল, ঠিক আছে, আমি পরে তোমার সঙ্গে দেখা করে নেব।

অবনীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। একটু যেন শ্লেষ ফুটে উঠল কন্ঠস্বরে। বলল, তুই কি আর দেখা করবি? আজ নেহাত খবর পাঠালাম তাই। আমাদের তো ভুলেই গেছিস!

অরণ্য জানে, এ সব কথার জবাব দেওয়া অর্থহীন। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তার পর বলল, ঠিক আছে, বলো কী বলবে।

এখানে হবে না; তুই আমার বাড়ি চল।

নিজেই নিজেকে ‘গান্ডু’ বলে গালাগালি দিল অরণ্য। প্রায় এক ঘণ্টা হল অবনীর বৈঠকখানায় বসে আছে সে, কিন্তু এর মধ্যে এক বারও কথা বলার ফুরসত পায়নি। রবিবার হাজার একটা ঝামেলা অবনীর। একজন র‌্যাশন কার্ডের আর্জি নিয়ে এল, একজন একগুচ্ছ দলিল-দস্তাবেজ খুলে বসল। সে চলে যেতে মাঝবয়সি একটা লোক ইনিয়ে বিনিয়ে নাকি-কান্না শুরু করেছে। লোকটার চোখগুলো লাল, চুলগুলো উশকোখুশকো; মুখ থেকে মৃদু চোলাইয়ের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

অবনী বলল, কী মুশকিল, তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, আমি এখানে কী করতে পারি!

লোকটা বলল, আপনি গিয়ে ওকে একটু দাবড়ে আসুন।

অবনী বলল, দাবড়ানি তো তুমিও দিতে পারো, কেমন পুরুষমানুষ তুমি, নিজের বউকে টাইট দিতে পারো না।

লোকটা আঁতকে ওঠে, ওরে বাপরে, ওকে চেনেন না, ডাকাত মেয়েছেলে, হাতের কাছে হাতা খুন্তি যা পায় চালিয়ে দেয়।

অবনী একটু হেসে ফেলল। বলল, খেয়েছে না কি দু’চার ঘা?

তবে আর বলছি কী! এই দেখুন এখনও দাগ আছে। লোকটা জামা তুলে পিঠের দাগ দেখায়।

অবনী বলে, ঠিক আছে, তুমি যাও এখন, আমি পরে গিয়ে তোমার বউকে বকে দিয়ে আসব।

ঠিক যাবেন তো? আমি জ্ঞান হয়ে তক আপনাদের ভোট দিই, আমার বউ কিন্তু দেয় না।

লোকটা চলে যেতেই অবনী বলল, আর ভালো লাগে না বুঝলি, কী পাপেই যে পলিটিকস করতে হচ্ছে।

অরণ্য ব্যাজার মুখে বলল, আমাকে কী বলবে বলছিলে।

আরে এত ব্যস্ত হচ্ছিস কেন? চা খাবি?

না, চা খাব না।

অবনী ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে। ভালো করে লক্ষ করে অরণ্যকে। বোধহয় ভেবেছিল অরণ্য খুব আগ্রহ দেখাবে। কিন্তু অরণ্যকে নির্বিকারভাবে বসে থাকতে দেখে বলল, বিকাশদা আমাকে ফোন করেছিল। পার্টি তোর ব্যাপারে খুব বিরক্ত, ক্ষুদ্ধও বলতে পারিস। তুই আজকাল নানা জায়গায় পার্টির সমালোচনা করছিস। সে দিন মিটিং-এ সবার সামনেই মানতলার রেপ কেসটা নিয়ে তর্ক করলি—সব খবরই ওখানে পৌঁছে গেছে। তার পর পার্টি শবরীর ব্যাপারটাও ভালো ভাবে নেয়নি। শবরী পার্টির অমন ডেডিকেটেড কর্মী—তার ওপর বিকাশদা ওকে বোনের মতো…

অরণ্য বলে ওঠে, এ ব্যাপারটায় আমার কিছু করার নেই।

কেন নেই? অবনী প্রশ্ন করল।

অরণ্য বলল, সব তো এক্সপ্লেন করা যায় না, শুধু শবরীর ব্যাপারে এটুকু বলতে পারি এই ধরনের রিলেশন জোর করে হয় না।

 অবনী মৃদু হাসে। বলে, জানি, কিন্তু একভাবে লেগে থাকলে একদিন দেখবি একটা সফটনেস তৈরি হয়েছে।

অরণ্য বলল, এ কি হোমিওপ্যাথি ট্রিটমেন্ট না কি—ধৈর্য ধরে ওষুধ খেয়ে যাব; ওয়ান ফাইন মর্নিং দেখব কাজ শুরু হয়েছে। স্যরি, আমাকে মাফ করো অবনীদা, এই ব্যাপারটায় আমার কিছু করার নেই। আর শবরীর সঙ্গে একটু ঘোরাঘুরি করেছি, দু’একটা সিনেমা দেখেছি—এই পর্যন্ত। ওর কাছে আমি তো কোনওদিন কিছু কমিট করিনি।

ঠিক কথা, কিন্তু তোকে অব দ্য রের্কড বলছি—বিকাশ চৌধুরী সিরিয়াসলি নিয়েছে ব্যাপারটা। এর পর যত দূর শুনেছি, ও অর্চনের ব্যাপারে পুলিশের ওপর থেকে হাত গুটিয়ে নেবে।

ভেতরে খুব জোরে একটা ধাক্কা খেল অরণ্য। কিন্তু নিজেকে প্রাণপণ চেষ্টায় শান্ত রাখল। তার পর প্রায় বিনা ভূমিকায় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল রাস্তায়।

উনিশ

সূর্যটা হেলে গেছে পশ্চিম দিকে। এখনও কমলা রং না লাগলেও রোদের ঝাঁঝটুকু উধাও। তমালিকা আর অরণ্য নদীর পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা চলে এসেছে। ভীষণ অস্থির দেখাচ্ছে অরণ্যকে। রুক্ষ চুল, খসখসে হাত-পা, ক্লান্ত চোখ-মুখ—দেখেই বোঝা যায় দুপুরে চান খাওয়া হয়নি।

অবনীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলোমেলো ঘুরেছে অনেকক্ষণ। একবার বাড়ি ঢুকেছিল। ঢুকেই ‘অর্চন’ ‘অর্চন’ বলে চিৎকার শুরু করে। অর্চন খেয়েদেয়ে শুয়েছিল। চিৎকার শুনে উঠে পড়ল। বেচারা এমনিতেই সব সময় সিঁটিয়ে থাকে; তার পর ওইরকম উত্তেজিত হাঁকডাক শুনে জড়সড়ো হয়ে গেল।

অর্চনকে ভালো করে আপাদমস্তক দেখল অরণ্য। অর্চন অবাক হয়ে বলল, কিছু বলবি? অরণ্য মাথা নাড়ে। তারাচরণ আর মহামায়া হাঁ-করে অরণ্যকে দেখে। অরণ্য বুঝতে পারে একটু অস্বাভাবিক হয়ে গেছে তার আচরণ। কিছুটা লজ্জিত হয়ে পড়ে সে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। রাস্তায় পা দিয়ে ফের ফিরে যায়। অর্চনকে বলে, ক’দিন একটু সাবধানে থাক। বাড়ি থেকে বেশি বেরোনোর দরকার নেই।

তারপর অরণ্য হোমে গিয়েছিল এক বার। ভেবেছিল শুভমের সঙ্গে আলোচনা করবে। কিন্তু হোমে গিয়ে দেখল শুভম নেই। কলকাতায় গেছে। তার পর ফোন করে ডেকে এনেছে তমালিকাকে।

তমালিকা বলল, এভাবে উদভ্রান্তের মতো হেঁটে লাভ নেই, চলো কোথাও একটু বসি।

দাঁড়িয়ে পড়ল অরণ্য।

এখানে নদীতে জল খুব কম। নদীর বুকে বালির চর। তার মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে বইছে ক্ষীণ স্রোত। পাড়ে বড় বড় কৃষ্ণচূড়া, খিরিশগাছ। মোটা একটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসল অরণ্য। সিগারেট বের করে ধরাল।

তমালিকা বলল, আর সিগারেট খেও না; এটা নিয়ে চারটে হল। এত টেনশনের কী আছে।

অরণ্য বলল, তুমি এদের চেনো না; আমি এদের সঙ্গে বহু দিন ওঠাবসা করেছি, আমি জানি এরা কী জিনিস।

বুঝলাম; কিন্তু টেনশন করে লাভ নেই, ঠান্ডা মাথায় একটা ওয়ে-আউট বের করতে হবে।

অরণ্য বলল, জানো অর্চন ছোটবেলায় খুব ভালোবাসত আমায়, রাতে আমার কাছে না শুলে ঘুম হত না ওর।

অরণ্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে তমালিকা।

একবার আমি মামার বাড়ি গিয়ে ক’দিন ছিলাম। ও প্রথম দিন রাতেই এত কান্নাকাটি করেছিল যে পর দিনই বাবা ওকে মামার বাড়ি দিয়ে আসে।

তমালিকা একটু বিহ্বল হয়ে পড়ে। কী ভাবে অরণ্যকে শান্ত করবে ভেবে পায় না।

অরণ্য বলে, এই সে দিন পর্যন্ত একটু ভালো কিছু খাওয়ার জিনিস পেলেই আমাকে দিত। আসলে ও এরকম ছিল না—শুধু কিছু বদ সঙ্গে পড়ে…তমালিকা আমি সিওর, মার্ডার ও করেনি, ইনফ্যাক্ট, ও জানতই না সে দিন মার্ডার হবে।

তমালিকা বলল, থাক, ও সব কথা ছাড়ো এখন।

আধখাওয়া সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিল অরণ্য। বলল, আমার তো কিছু মাথায় আসছে না। আসলে দোষটা আমার। আমি যদি প্রথমেই শবরীর ব্যাপারে আমার মতটা ক্লিয়ার জানিয়ে দিতাম তা হলে মনে হয় এত জট পাকাত না। সত্যি বলতে কী, খুব সামান্য হলেও আমার দিক থেকে একটা ইনডালজেন্স ছিলই। আর সেটাকেই শবরী বড় করে নিয়েছে।

তমালিকা বলল, তুমি বড্ড আজেবাজে চিন্তা করছ। তোমার জায়গায় অন্য যে কেউ হলে ওই সিচুয়েশনে এ রকমই করত।

অরণ্য বলল, হয়তো।

তাহলে! প্রবলেমটা তোমাকে ফেস করতেই হত; শুধু তখন পাশ কাটিয়ে গেছ বলে এখন করতে হচ্ছে। শুভমদাকে বলেছ?

অরণ্য মাথা নাড়ল, না, শুভমদা কলকাতায়।

একটু থেমে তমালিকা বলে, তোমার কি মনে হয় আজকালের মধ্যেই পুলিশ অর্চনদাকে অ্যারেস্ট করতে পারে?

অরণ্য বলে, ঠিক বুঝতে পারছি না।

তুমি আজই অর্চনদাকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দাও। শুভমদা ফিরুক, আমি মেসোমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলি। তারপর ভেবেচিন্তে একটা সিন্ধান্ত নেওয়া যাবে।

কোথায় পাঠাব?

দূরে কোথাও। বাইরে তোমাদের কোনও আত্মীয়-স্বজন নেই?

অরণ্য একটু চিন্তা করে। তার পর বলে, আছে, তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ খুব ক্ষীণ হয়ে এসেছে; এখন হঠাৎ অর্চন গেলে তারা কীভাবে নেবে কে জানে!

তমালিকা বলল, ক্রাইসিসের সময় অত ভাবতে গেলে হয় না।

অরণ্য বলে, ঠিক আছে, বাবা-মার সঙ্গে কথা বলে দেখি…

তমালিকা একটু সতর্ক গলায় বলল, আর একটা কাজ করতে হবে, ক’দিন আমাদের দেখাসাক্ষাৎ বন্ধ রাখতে হবে।

অরণ্য সোজা হয়ে বসল। বলল, সে কী! কেন? এ তো ইমপসিবল।

তমালিকা শান্ত গলায় বলল, ইমপসিবল বললে তো হবে না—এটা করতেই হবে।

কত দিন? অরণ্য জিগ্যেস করল।

সেটা এক্ষুনি বলা যাবে না; আর একটা কাজ তোমাকে করতে হবে, শবরীর সঙ্গে যোগাযোগটা রাখতে হবে।

খেপেছ তুমি! প্রায় চিৎকার করে অরণ্য বলে ওঠে, একবার লাইটলি নিয়ে কেঁচে-গণ্ডুষ করে ফেলেছি; তার পর আবার! শবরীর কামড় কচ্ছপের মতো, এক বার ধরলে সহজে ছাড়বে না।

তমালিকা বলে, ঠিক আছে, অতটা করতে হবে না। তবে কয়েকটা দিন ওদের ঠেকিয়ে রাখতে হবে—এর মধ্যে নতুন করে ওদের খোঁচানো যাবে না। মেসোমশাইয়ের এক বন্ধু চেন্নাইয়ে থাকেন, সেখানে খুব বড় বিজনেস; মেসোমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলে দেখি—দু’চার বছর গা ঢাকা দিয়ে থাকলে ব্যাপারটা থিতিয়ে যাবে।

অরণ্য বলল, কী জানি; এরা এত সহজে ছাড়বে বলে মনে হয় না।

তমালিকা বলল, আপাতত তো অর্চনদাকে সেভ করা যাবে; তার পর চার-পাঁচ বছর পর অনেক কিছুই হতে পারে; এরা যে তখনও পাওয়ারে থাকবে তারই বা ঠিক কী?

ফের একটা সিগারেট ধরাল অরণ্য। বলল, তার চেয়ে বিকাশ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করে ওকে রিকোয়েস্ট করি, আমার অসহায়তার কথা বুঝিয়ে বলি।

সারেন্ডার করবে তুমি! নেভার, কক্ষনো নয়। এটা তো এক রকম দয়া ভিক্ষের মতো হয়ে যাবে।

মনে মনে লজ্জিত হয়ে পড়ল অরণ্য। আর কিছু ভাবতে ভালো লাগছে না। তমালিকা যত সহজ করে দেখছে সমস্যটা তত সরল নয়। অনেকগুলো ‘যদি’, ‘কিন্তু’-র ওপর অর্চনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। কিন্তু আর উপায়ই বা কী?

হাতের ওপর একটা আলতো স্পর্শ পায় অরণ্য। চোখ বুজেই থাকে সে। গাছের পাতার মতো ফিশফিশ করে তমালিকা বলে, চোখ খোলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *