কুড়ি
অরণ্য বাড়ি ফিরে দেখল অর্চন নেই। অন্যদিন সন্ধের মধ্যে ফিরে যায়। আজই দেরি করছে। মহামায়া বলল, ‘একটু আসছি’ বলে বিকেলবেলা বেরিয়েছে। সাতটা বেজে যাওয়ার পর টেনশন শুরু হল অরণ্যের। রাস্তা থেকেই পুলিশ ওকে তুলে নিয়ে গেল না কি?
সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল অরণ্য। চৌমাথার মোড়ে চলে এল। খুব সতর্ক ভাবে চারপাশের পরিস্থিতি লক্ষ করল। কোথাও অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পেল না।
জঙ্গলসুফি ছোট জায়গা। গা থেকে এখনও গ্রাম-গন্ধ যায়নি। সামান্য কোনও ঘটনা ঘটলেই বেশ আলোড়ন হয়, উত্তেজনায় টগবগ করে মানুষজন। সেরকম কিছু ঘটলে অবশই অরণ্যের চোখে ধরা পড়ত। তবুও নিশ্চিত হতে পারছে না অরণ্য। নতুদার দোকানে চলে আসে সে। দোকানটা এলাকার গেজেট। যে কোনও ঘটনা অন্তত পাঁচ-সাত ব্যাখ্যাসমেত চলে আসে এখানে।
নতুদার দোকানে দেবু বিপ্লব বাপ্পা শান্তি ঘন হয়ে বসে কিছু একটা আলোচনা করছিল। অরণ্যকে দেখেই চুপ করে গেল। বিপ্লব এক সময় অরণ্যের সঙ্গে পার্টি করত। পার্টি করেই মাস্টারিটা বাগিয়ে নিয়েছে। চাকরি পাওয়ার পর এখন একটু আলগোছে লেগে আছে পার্টির সঙ্গে। সারা বছর বাবুর টিকি দেখা যায় না; ভোটের দিন পার্টি-ক্যাম্পে এসে বসে আর দেখা হলেই জ্ঞানগর্ভ বাণী ছাড়ে। এমন একটা ভাব দেখায় যেন পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞান ওর নখদর্পণে, যে কোনও বড় পজিশনে ও যেতে পারে—নেহাত তেমন গা দেয় না তাই। অরণ্যকে দেখে বলল কী রে, কী খবর?
অরণ্য বলল, এই চলছে।
কিছু হল-টল তোর?
নাহ।
এখন তো চারদিকে প্রচুর লোক নিচ্ছে; সিরিয়াসলি পড়াশোনা করে পরীক্ষা দে, হয়ে যাবে।
অরণ্য বেরিয়ে পড়ল দোকান থেকে। সোজা বাড়ি চলে এল। এসে দেখল অর্চন খেতে বসেছে। অরণ্য বলল, অর্চন তোর এখানে আর থাকা যাবে না।
অর্চন ভ্যাবলার মতো বড় বড় চোখ করে তাকাল। বলল, কেন?
যে কোনও সময় পুলিশ তোকে তুলতে পারে।
মুহূর্তে রক্তশূন্য হয়ে গেল অর্চনের মুখ। বলল, কে বলল?
সে অনেক ব্যাপার; পরে বলব তোকে।
মহামায়া বলল, তোর পার্টির লোক কিছু করতে পারবে না?
অরণ্য চুপ করে থাকে। খাওয়া বন্ধ করে বসে আছে অর্চন। বালবের হলুদ আলোয় ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে মহামায়া আর অর্চনকে। বেশিক্ষণ তকিয়ে থাকতে পারল না অরণ্য। মুখ ঘুরিয়ে নিল। বলল, খেয়ে নিয়ে আমার ঘরে আয়।
বাঁকুড়ার সোনামুখীতে অরণ্যের ছোটমাসি থাকেন। কিছু দিন আগেই মাসতুতো দাদা অনিরুদ্ধ আর বউদি জঙ্গলসুফিতে বেড়াতে এসেছিল। অরণ্য বলল, সপ্তাখানেক ওখানে থাক, তত দিনে মনে হয় একটা ব্যবস্থা করতে পারব।
সারারাত প্রায় জেগেই কাটাল অরণ্য। শেষ রাতে উঠতে হবে। চার মাইল দূরে হাইওয়েতে অর্চনকে বাসে তুলে দিয়ে ফিরতে হবে ভোর হওয়ার আগেই। মাঝেমধ্যে একটু তন্দ্রা এলেও একটু খুট-খাট শব্দে চমকে উঠল অরণ্য।
শেষ রাতে অর্চনকে সাইকেলের ক্যারিয়ারে চাপিয়ে বেরিয়ে পড়ল অরণ্য। শীতটা জাঁকিয়ে পড়েছে। কুয়াশায় চারপাশ ঝাপসা। টুপটাপ শিশির পড়ছে গাছের পাতা থেকে।
তমালিকাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ চোখে পড়ল গেটের কাছে দশ-বারো জন লোক দাঁড়িয়ে। কেমন যেন সন্দেহজনক ভাবভঙ্গি। লোকগুলোকে খুব চেনা-চেনা লাগছে অরণ্যের। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ছে না কোথায় দেখেছে। অরণ্য দাঁড়িয়ে পড়ল। একজন এগিয়ে এসে খুব শান্ত অথচ কঠিন গলায় বলল, দাঁড়ালে কেন, চলে যাও। লোকটার মুখ মাঙ্কি ক্যাপ আর মাফলারে ঢাকা; হাতে একটা রিভলভার। অরণ্য জিগ্যেস করল, তোমরা এখানে কী করছ?
একটা অশ্রাব্য গলাগালি দিল লোকটা। বলল, ফালতু কথায় কাজ নেই; ভাগো এখান থেকে, না হলে ফিনিশ করে দেব।
অরণ্য দেখল তমালিকাদের দরজায় দমাদম লাথি পড়ছে। মোটা একটা গাছের গুঁড়ির ধাক্কায় মড়াৎ করে ভেঙে গেল দরজাটা। লোকগুলো হুড়মুড় করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে টেনে বের করে আনল তমালিকাকে। তমালিকা হাত-পা ছুড়ে চিৎকার করছে। একজন ওর ওড়নাটা একটানে ছিনিয়ে নিল। এতক্ষণে অরণ্য ধরতে পেরেছে ব্যাপারটা। ওরা যেভাবে তমালিকাকে টানাটানি করছে বোঝাই যাচ্ছে উদ্দেশ্য খুব খারাপ। অরণ্য দৌড়ে যেতে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দুটো লোক এসে চেপে ধরল তাকে। অরণ্য প্রাণপণে নিজেকে ছাড়াতে চাইল। কিন্তু লোক দুটো প্রচণ্ড শক্তিশালী।
তমালিকাকে বাড়ির পেছনে টেনে নিয়ে গেছে। সেখান থেকে গোঙানির শব্দ আসছে। অরণ্যের চকিতে মনে পড়ে গেল এই লোকগুলোকেই টিভি-তে খবরের কাগজে দেখেছে সে। মানতলার রেপ কেসের আসামি ওঁরা। রিভলভার হাতে লোকটা সামনে দাঁড়িয়ে হো হো করে হাসছে। লোকটা এক ঝটকায় মাঙ্কি ক্যাপটা খুলে ফেলল। চমকে উঠল অরণ্য। বিকাশ চৌধুরী। অর্চনকে দেখতে পাচ্ছে না অরণ্য। সে চিৎকার করল, অর্চন, অর্চন। একটা লোক প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল তাকে।
ধাক্কা খেয়ে চমকে উঠল অরণ্য। অর্চন পাশে দাঁড়িয়ে। বলল, কী রে, গোঁ গোঁ করে শব্দ করছিস কেন?
জামা-প্যান্ট পরে অর্চন রেডি। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল অরণ্য। পাঁচ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল অর্চনকে নিয়ে।
অর্চনকে বাসে তুলে দিয়ে অরণ্য যখন নতুদার দোকানে এল তখন সবেমাত্র উনুনে জল চাপিয়েছে নতুদা। অরণ্যকে দেখে একটু অবাক হল। বলল, এত সকালে কোথায় গিয়েছিলে?
অরণ্য বলল, যাইনি কোথাও; ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল; মায়ের শরীরটা খারাপ, মাকে আর ডাকাডাকি করিনি। ভাবলাম তোমার কাছে চা-টা খেয়ে যাই।
এখনও খবরের কাগজ আসেনি। একটা দুটো করে লোক জমছে দোকানে। এই সময় বেশির ভাগ খদ্দেরই লেবার ক্লাসের। এখানে চা-টা খেয়ে যে যার কাজে চলে যায়।
চা খেতে খেতেই কাগজ এল। হেডলাইনগুলোয় একবার চোখ বুলিয়ে নিল অরণ্য। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করা হবে; বিখ্যাত ক্রিকেটার বলেছেন, টাকার জন্যে ক্রিকেট খেলি না, দেশ আমার কাছে সবচেয়ে আগে। নীচের দিকে খরাক্লিষ্ট ইথিওপিয়ার মতো অস্থিচর্মসার মানুষের ছবি। পশ্চিমবঙ্গের বুকেই না কি এরকম গ্রাম পাওয়া গেছে যেখানে মানুষ না খেতে পেয়ে মরছে।
চা খেতে খেতে অরণ্য বুঝতে পারল মাথাটা এখন অনেক হালকা। বিপদ পুরোপুরি কাটেনি, কিন্তু প্রবল স্নায়ুর চাপ অনেকটা কমে গেছে। চা খেয়ে হোমের পথ ধরল অরণ্য।
গেট দিয়ে ঢুকেই অরণ্য দেখল, অধীর আর সুহাস লনের ঘাস ছাঁটছে। দু’জনেরই অত্যন্ত ম্রিয়মাণ চেহারা। অরণ্য বুঝতে পারল কোনও কারণে শাস্তি হয়েছে ওদের। গম্ভীর মুখে এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে শুভম।
অরণ্য ইশারায় জিগ্যেস করল কী ব্যাপার। শুভম একটু সরে গেল অরণ্যকে নিয়ে। তার পর যা শুনল তাতে যথেষ্ট অবাক হয়ে গেল সে।
আগের দিন শুভমের অনুপস্থিতিতে ওরা দুজনে মারামারি করেছে। প্রথমে একটা টেনিস বল নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়; কথা কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি, সেই সঙ্গে অশ্লীল সব গলাগালি। বীণা আর পদ্মা থামাতে গিয়েছিল, তাদের পর্যন্ত গালাগালি করেছে, ঠেলে ফেলে দিয়েছে।
শুভম বলল, অ্যাডলেসেন্ট পিরিয়ডে ছেলেগুলোকে নিয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, ভীষণ ভায়োলেন্ট হয়ে উঠছে…
অরণ্য বলল, কিন্তু এই পরিবেশে মানুষ হয়েও এমন অশ্লীল কথা বলছে কেন?
শুভম বলল, আসলে ওরা মনে হয় প্রথম জীবনের স্মৃতিটাকে ঠিক ভুলতে পারছে না; ভাবছি একটা সাইকিয়াট্রিস্ট রাখব! তার পর বলল, অর্চনকে কোথায় পাঠাবে কিছু ঠিক করলে?
অরণ্য একটু অবাক হল। বলল, আপনি শুনেছেন?
হ্যাঁ, তমালিকা আমায় ভোরবেলা ফোন করেছিল।
অরণ্য বলল, আপাতত সোনামুখীতে পাঠিয়ে দিয়েছি; কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হবে বুঝতে পারছি না…
শুভম বলল, তুমি মনে হয়, একটু বেশি ওরিড হয়ে পড়েছ; হয়তো তোমাকে চাপে রাখার জন্যে বলেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল কিছুই করল না।
একুশ
শুভমের অনুমান যে ভ্রান্ত ছিল বোঝা গেল সেদিন রাতে। রাত আটটা নাগাদ পুলিশের রুলের ঘা পড়ল অরণ্যদের বাড়ির দরজায়। একজন এসআই দুজন কনস্টেবল নিয়ে এসেছিল। মধ্যবয়সি এস আই অরণ্যের পরিচিত। যথেষ্ট ভালো ব্যবহার করল সবার সঙ্গে। অরণ্যকে পর্যন্ত আপনি আজ্ঞে করে কথা বলছিল। বলল, অরণ্যবাবু, আপনি তো জানেন, আমাদের হাত-পা বাঁধা। ওপর থেকে চাপ আসছে; ভাইকে বলুন সারেন্ডার করতে।
অরণ্য বলল, কিন্তু ওকে তো ফালতু জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
সেটা প্রমাণ সাপেক্ষ; কিন্তু ডাইরিতে নাম যখন আছে আমাদের অ্যারেস্ট করতেই হবে। তার চেয়ে সারেন্ডার করতে বলুন আর ভালো উকিল দিন একটা; কোথায় পাঠালেন ভাইকে?
অরণ্য চুপ করে থাকল।
এসআই বলল, দেখুন সব অফিসার সমান নয়। এর পর যে আসবে সে হয়তো খুব রাফ ব্যবহার করবে। এমনকী আমাকেও যদি আবার আসতে হয় আমি হয়তো টাফ ব্যবহার করে ফেলব।
এটা প্রচ্ছন্ন হুমকি। তবু অনড় থাকল অরণ্য।
পর দিন বাজার সেরে ফেরার পথে নতুদার দোকানে ঢুকল অরণ্য। চায়ে সবেমাত্র চুমুক দিয়েছে দেখল ঝড়ের মতো একটা পুলিশ জিপ চলে গেল রাস্তা দিয়ে। ভুরুটা কুঁচকে উঠল অরণ্যের। তিন চুমুকে চা-টা শেষ করে বাড়ি চলে এল। অরণ্যকে দেখেই হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল মহামায়া। তারাচরণ পাথরের মূর্তির মতো বসে। রান্নাঘরে ডাল-তরকারি কিছু একটা পুড়ে গেছে বোধহয়; চারদিকে পোড়া গন্ধ।
অরণ্যের আশঙ্কাই সত্যি। তাদের বাড়িতেই এসেছিল পুলিশ। অরণ্য ছুটল শুভমের কাছে। শুভম অরণ্যকে দেখেই বুঝল সমস্যা গুরুতর। বলল, কী হল, এত ওরিড লাগছে কেন?
অরণ্য ভেঙে পড়া গলায় বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে শুভমদা; পুলিশ এসেছিল বাড়িতে।
কখন?
একটু আগে। আমি বাড়ি ছিলাম না; বাবাকে টানাটানি করে জিপে তুলতে যাচ্ছিল, মা ভয় পেয়ে সোনামুখীর ঠিকানা বলে দিয়েছে।
শুভম বলল, কী করতে চাইছ এখন?
ইমিডিয়েট অর্চনকে ওখান থেকে সরিয়ে দিতে হবে।
তার পর কোথায় পাঠাবে, ভেবেছ কিছু?
অরণ্যকে বেশ অসহায় দেখায়। বলে, বর্ধমানে আমাদের এক রিলেটিভ থাকে, কিন্তু বহু দিন তো যোগাযোগ নেই…কিন্তু অর্চনকে আগে ওখান থেকে সরিয়ে দেওয়া দরকার।
শুভম বলল, সোনামুখীর বাড়িতে ফোন আছে?
আছে।
পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে অরণ্যের হাতে দিল শুভম। বলল, ফোন করো।
ভোলটেজ ভীষণ কম। টিভির লাইট জ্বলছে না। চল্লিশ ওয়াটের ফ্যাকাসে আলোয় সামনের চেয়ারে বসে থাকা পুলিন মিত্রর দিকে, একটু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অরণ্য। শুভমদার ফোন থেকে ফোন করে অর্চনকে সোনামুখী থেকে সরিয়ে দিয়েছে সে। কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। একটু টেনশন থেকেই গেছে। তার ওপর হঠাৎ বাড়িতে পুলিন মিত্র।
পুলিন মিত্রকে লোকে পুলিশ মিত্র বলে ডাকে। মিত্র জমি-জায়গা আর বাড়ির দালাল, কিন্তু এস পি থেকে শুরু করে হোমগার্ড পর্যন্ত পুলিশ বাহিনীর সর্বত্র তার অবাধ যাতায়াত। দিদি নতুন দল খোলার পর সে বেশ উৎসাহ নিয়ে লাফ দিয়েছিল। কিন্তু বুদ্ধিমান লোক, এখন নিজের প্রতিভাকে অন্য কাজে লাগাচ্ছে। ছোটখাটো মারপিট, অবৈধ প্রণয়, গৃহবিবাদ—এই সব কেস টেক আপ করে থানায় নিয়ে গিয়ে ফেলে। আপস-রফা হয়ে গেলে পার্টির কাছ থেকে কিছু দক্ষিণা নেয়। সব পার্টিতেই এইরকম দু’চার পিস থাকে, কিন্তু মিত্রর কাছে তারা নিলে গেম খাবে।
মিত্রর একটা মহৎ গুণ কখনও রেগে যায় না। এখন যেমন দু’মিনিটের মধ্যে বিড়িটা তিন বার নিভে গেল, অন্য কেউ হলে ‘দুত্তোর’ বলে টান মেরে ফেলে দিত। মিত্র কিন্তু তৃতীয় বারের মতো ধরিয়ে বলল, বিড়ি বড় অভিমানী বুঝলেন, ঘন ঘন চুমু না দিলে রাগ করে।
মিত্রকে অবাক হয়ে দেখছিল অরণ্য। হাতে অত্যন্ত দামি মোবাইল সেট, চোখে রিমলেস চশমা, পরনে নামি কোম্পানির স্যুট, এ দিকে মুখে বিড়ি। ব্যাপারটাকে ঠিক মেলাতে পারছে না সে। যেমন বুঝতে পারছে না রাত এগারোটার সময় হঠাৎ তার বাড়িতে উদয় হয়েছে কেন। তবে লোকটা যে অত্যন্ত চতুর এবং বাকপটু তাতে সন্দেহ নেই।
অরণ্যের ঘরের চারদিকে দ্রুত একবার চোখ বোলাল মিত্র। বইভরতি আলমারিটা দেখতে দেখতে বলল, আপনার মতো কালচারড একজন মানুষ কী করে অবনী গুহর সঙ্গে এত দিন থাকলেন, সেটাই ভাবছি।
মিত্রকে আর একটু বুঝে নেওয়ার চেষ্টায় অরণ্য বলল, পার্টিতে ভালোমন্দ সব রকম মানুষই থাকে; আপনি রাজনীতি করা মানুষ এটা জানেন নিশ্চয়।
ঠিকই। তবে অবনী একটা সাংঘাতিক মাল; পার্সোনাল ইন্টারেস্টের জন্যে নিজের বাপ-মাকে পর্যন্ত বেচে দিতে পারে। আর তেমনই বিকাশ চৌধুরী…
ছাড়ুন ও সব কথা। বলল অরণ্য।
মিত্র বোধহয় বুঝতে পারল অরণ্য ভ্যানতারা পছন্দ করে না। সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এল—আপনি এখন কী করবেন ভাবছেন?
কোন ব্যাপারে? মিত্রকে একটু খেলাল অরণ্য।
আপনার পার্টিই তো আপনাকে বাঁশ দিল, এই রকম হিউমিলিয়েশনের পরও আপনি কিছু ভাববেন না?
আপনি কী ভাবতে বলেন? মিত্রর কোর্টেই বলটা ঠেলে দিল অরণ্য।
বিড়িটা ফের নিভে গেছে মিত্রের। এবার আর ওটার পেছনে পণ্ডশ্রম না করে বলল, করার তো অনেক কিছুই আছে, সবটা ডিপেন্ড করছে আপনার ওপর।
যেমন?
যেমন ধরুন, আপনি আমাদের পার্টিতে চলে আসতে পারেন।
তাতে আমার কী লাভ হবে? অরণ্য প্রশ্ন করল।
নেক্সট ইলেকশনে আমরা পাওয়ারে আসছিই। তখন আপনার ভাইয়ের কেসটা দেখব, আর যত দিন পর্যন্ত না হয় তত দিন পুলিশ যাতে আপনাকে বা আপনার পরিবারের লোকেদের হ্যারাস না করে সেই ব্যবস্থা করব।
এভাবে দল ছাড়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
অরণ্যবাবু, আপনি এত দিন পলিটিক্স করছেন, এটুকু জানেন না, রাজনীতিতে অসম্ভব বলে কিছু নেই।
সে যারা ভাবে, তারা ভাবে। আমি এ কথা বিশ্বাস করি না।
একটু হাসল মিত্র। বলল, ধরুন পার্টি আপনাকে বের করে দিল; তখন?
অরণ্য বলল, সে রকম কোনও খবর আছে না কি?
কংক্রিট কোনও খবর নেই, কিন্তু ঘটনা যেদিকে গড়াচ্ছে আমার মনে হয় এটা অনিবার্য।
একটু চিন্তিত মুখে অরণ্য বলল, ঠিক আছে, করুক আগে, তার পর দেখা যাবে।
মিত্র বলল, তখন আমাদের পার্টিতে আসাটা আপনার পক্ষে একটু অস্বস্তিকর হবে। আমরা আপনাকে নিয়ে নেব—সেটা সমস্যা নয়, কিন্তু লোকে বলবে ঘাড় ধাক্কা খেয়ে ভোল পালটাল। তার চেয়ে এখন এলে আপনি একটা বিপ্লবী ইমেজ পেয়ে যাবেন।
অরণ্য বেশ বিরক্তির সঙ্গে বলল, আমি এক্ষুনি অতটা ভাবতে রাজি নই, ছাড়ুন।
নতুন একটা বিড়ি ধরিয়েছে মিত্র। এবং প্রায় তিন মিনিট কোনও বেয়াড়াপনা ছাড়াই সেটা দিব্যি জ্বলছে। একটা ছোট টান দিয়ে মিত্র বলল, আপনার অন্য অপশনও আছে, আপনি ভেবে দেখতে পারেন।
ঠোঁটে একটা সিগারেট নিয়ে ধরাতে যাচ্ছিল অরণ্য। ফের সেটা হাতে নিয়ে বলল, কীরকম?
আপনাকে দল ছাড়তে হবে না; দলে থেকেই আপনি আমাদের হেল্প করতে পারেন।
অরণ্যের হাতের সিগারেট হাতে থেকে গেল। বলল, সেটা কী করে সম্ভব?
খুব ইজি। ধরুন ভোটের সময় আপনি পুরোপুরি অ্যালুফ হয়ে গেলেন। তার পর পার্টির মধ্যে যাদের ওপর আপনার ইনফ্লুয়েন্স আছে তাদেরও ইনঅ্যাকটিভ করে দিলেন।
ইমপসিবল। একটু জোরেই বলে উঠল অরণ্য।
মিত্র মৃদু হাসল। বলল, আপনি কালচারড মানুষ; আপনি নিশ্চয়ই জানেন ‘অসম্ভব’ শব্দটা কাদের অভিধানে থাকে। খবর রাখেন কী যে, বিকাশ চৌধুরী এবার ডেফিনিটলি হারছে। আপনাদের পার্টির ওপর মহল থেকে একেবারে গ্রাসরুট লেভেল পর্যন্ত একটা লবি এ বার ওর এগেনস্টে। তারা আমাদের জিতিয়ে দেবে।
অরণ্য হাঁ-করে মিত্রর দিকে তাকিয়ে থাকে।
মিত্র বলল, অবাক হলেন তো? আরও একটু বলি, এদের মধ্যে এমন অনেকে আছে যাদের আপনি ভালো করে চেনেন।
সিগারেটটা আর ধরানো হল না অরণ্যের। হাতে নিয়ে বসেই থাকল।
বিড়িতে একটা টান দিয়ে মিত্র বলল, তাড়াহুড়োর কিছু নেই; ধীরেসুস্থে ভেবে আমাকে জানাবেন।
বাইশ
পরদিন রাত দশটা নাগাদ হোমে ফোনটা এল।
হ্যালো, শুভমদা, আমি অর্চন বলছি।
শুভম চারপাশে চকিতে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে চাপা গলায় বলল, কোথা থেকে বলছ?
আমি এখন বর্ধমানে।
সেফ আছ তো? শুভম জিগ্যেস করল।
হ্যাঁ, দাদার ফোন পেয়েই আমি সোনামুখী থেকে পালিয়েছিলাম। রাতটা বর্ধমান স্টেশনে কাটাই; তারপর এখানে এক পুরোনো বন্ধুর বাড়ি উঠেছি…।
বর্ধমানের কোন জায়গা এটা?
বর্ধমান স্টেশন থেকে একটু ভেতরের দিকে, বাসে করে আধ ঘন্টার মতো লাগে। বাড়ির খবর কী?
শুভম বলল, ভালো।
কোনও ঝামেলা-টামেলা হয়নি তো?
না।
দাদা কখন হোমে আসবে? দাদার সঙ্গে একটু কথা বলতাম।
শুভম বলল, যেখানে আছ সেখানে কি কোনও ফোন আছে?
না; আমি বুথ থেকে বলছি।
ঠিক আছে, কাল সকাল দশটার সময় কোরো, আমি অরণ্যকে খবর দেব।
সকাল দশটার সময় অর্চনের ফোন আসার কথা। সাড়ে ন’টা থেকে ফোনের সামনে বসে আছে অরণ্য। প্রায় এগারোটা বাজে, কিন্তু ফোন আসার নাম নেই।
অস্থির হয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি শুরু করল অরণ্য। এর মধ্যে বারদুয়েক রিসিভার তুলে দেখে নিয়েছে ফোন ঠিক আছে কি না।
শুভম বলল, ল্যান্ডলাইনে না পেলে আমার মোবাইল নাম্বার জানে, সেখানে করবে?
অরণ্য বলল, আপনার মোবাইল অন করা আছে তো?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। এই তো একটু আগেই একটা ফোন এল।
অরণ্য বলল, কী হল বলুন তো; পুলিশ কি খোঁজ পেয়ে গেল?
শুভম বলল, ঠিক বুঝতে পারছি না।
এমনিতে পুলিশের সন্ধান পাওয়ার কথা নয়, কিন্তু এই নতুন ডেরাটা অনিরুদ্ধদা জেনে থাকলে মুশকিল—পুলিশ চাপ দিয়ে বের করে নেবে। অনিরুদ্ধদা জানে কি না, কিছু বলেছে আপনাকে?
না, আমার সঙ্গে অত ডিটেলে…
শুভমের কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোনটা ঝনঝন করে বেজে উঠল। প্রায় দৌড়ে গিয়ে রিসিভার তুলে নিল অরণ্য।
অর্চনের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই অরণ্য দেখতে পেল তমালিকা আসছে।
অরণ্য ফোনটা ছাড়তেই তমালিকা জিগ্যেস করল, কী বলল অর্চনদা?
এমনিতে ভালো আছে, তবে খুব টেনসড।
যাদের বাড়ি আছে সে কেমন বন্ধু ওর?
এই ছেলেটি এক সময় কানুর দলে ছিল; এখন লাইন ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা-ট্যাবসা করে।
যাক, তাহলে আপাতত কিছু দিন নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে। একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল তমালিকা।
দরজা দিয়ে বাইরে মাঠের দিকে তাকিয়েছিল অরণ্য। এগারোটা বেজে গেছে, কিন্তু রোদ ওঠেনি। মেঘ করেছে। চারদিকে পাঁশুটে আলো। মাঠের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্কভাবে অরণ্য বলল, না, খুব বেশি দিন ওখানে থাকা যাবে না।
শুভম বলল, কেন?
প্রথমত, বহু দিন তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই; তার পর ছেলেটি না কি খুশি নয় অর্চন সেখানে যাওয়ায়। কোয়াইট ন্যাচারাল, সে কেন এ সব ঝামেলায় নিজেকে জড়াবে।
শুভম বলল, ঠিক আছে, এর পর ফোন করলে ওকে ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে বোলো।
কিন্তু ওকে রাখবই বা কোথায়? অরণ্য চিন্তিত মুখে বলল।
শুভম বলল, ও আমার মায়ের কাছে থাকতে পারে।
আপনার মা তো হাওড়ায় থাকে?
হ্যাঁ; পুলিশ ওখানে পৌঁছোবে না, ওদের কল্পনাশক্তি অত বিস্তৃত নয়।
অরণ্য বলল, না শুভমদা; ঠিক হবে না, আপনি ঝামেলায় জড়িয়ে যেতে পারেন।
কিচ্ছু জড়াব না; তা ছাড়া তুমি যখন বলছ অর্চনকে ফাঁসানো হয়েছে, আমি সেটাই বিশ্বাস করছি। এটুকু আমি তোমার জন্যে করতেই পারি।
তমালিকা বলল, ক’টা দিনের তো ব্যাপার! মেসোমশাই বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল; ভদ্রলোক এখন বাইরে গেছেন; দিন পনেরো পর ফিরবেন, তার পর ওখানেই একটা ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারে।
হোম থেকে বেরিয়ে তমালিকা বলল, তুমি এখন কোথায় যাবে?
অরণ্য বলল, বাজারে।
আমাদের বাড়ি যাওয়ার সময় হবে তোমার?
বেশ জোরে হাওয়া দিচ্ছে। হাতের চেটোয় হাওয়া আড়াল করে একটা সিগারেট ধরিয়ে অরণ্য বলল, কেন?
কত দিন তোমার সঙ্গে কথা বলা হয়নি।
তুমিই তো যোগাযোগ রাখতে নিষেধ করেছিলে!
করেছিলাম ঠিকই, কিন্তু এখন দেখছি কোনও দরকার নেই। ওরা নখদাঁত বের করে ফেলেছে।
আমি জানতাম, এরকরই কিছু একটা হবে…
তমালিকা বলল, তুমি টেনশন কোরো না তো।
অরণ্য মলিন হাসল। বলল, বেঙ্গল পুলিশ কি চেন্নাই পৌঁছতে পারে না?
অবশ্যই পারে। কিন্তু সামনে ইলেকশন; আমার মনে হয় তখন তোমার অবনীদা বা বিকাশ চৌধুরী অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তার পর শবরীর একটা বিয়ে’থা হয়ে গেলে সে-ও উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। ও এখন যেটা করছে নেহাতই প্রতিহিংসার বশে করছে।
চুপচাপ সিগারেট টানতে থাকে অরণ্য। আর কিছু করার নেই। দু’এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ল গায়ে; মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল অরণ্য। ঘন মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ।
তমালিকা বলল, সাইকেলে ওঠো; বৃষ্টি এসে যাবে এক্ষুনি।
গেটে তালা ঝুলতে দেখে একটু অবাক হয়ে গেল অরণ্য। তমলিকা বলল, মাসিমণি বন্ধুর বাড়ি গেছে, সন্ধেবেলা ফিরবে।
ভেতরে ঢোকার পর বাড়িটা অম্ভব নির্জন লাগল অরণ্যের। বলল, বাড়িতে তুমি একা!
একটা অত্যন্ত রহস্যময় হাসি হাসল তমালিকা, বলল একা কোথায়, তুমি তো আছ।
তোমার মাসিমণি কি আমার ভরসায় তোমাকে রেখে গেছেন? যদি দিয়ে থাকেন তো এটা তাঁর মস্ত ভুল।
কেন?
এই রকম বৃষ্টির দিনে ফাঁকা বাড়িতে যে-কোনও মানুষের মধ্যে বজ্জাতির ইচ্ছে প্রবল হয়ে ওঠে; বিশেষ করে চোখের সামনে সুন্দরী কেউ থাকলে।
সেটা দমন করার একটা উপায় আছে; তমালিকা বলল।
কী?
চোখ বন্ধ করে হাত দু’টো ওপরে তুলে গৌড়-নিতাই হয়ে বসে থাক।
হাত দু’টো তুলে একবার চোখ বন্ধ করেই সঙ্গে সঙ্গে খুলে ফেলল অরণ্য। বলল, আমার চোখ দু’টো বড় বেয়াড়া। কিছুতেই বন্ধ থাকতে চাইছে না।
তমালিকা বলল, রুমাল বেঁধে নাও।
আমার কাছে রুমাল নেই, তোমারটা দিয়ে বেঁধে দাও।
হাতে রুমাল নিয়ে অরণ্যের সামনে দাঁড়াল তমালিকা। অবণ্য চোখ বুজল। তমালিকার শরীর থেকে হলকা এসে লাগছে অরণ্যের চোখেমুখে, তমালিকা রুমাল দিয়ে বেঁধে দিচ্ছে তার চোখ দুটো। একটা মাতাল করা গন্ধ আসছে রুমালটা থেকে। তমালিকার গরম নিশ্বাস পড়ছে তার চোখেমুখে। ক্রমশ গরম হয়ে উঠছে তার কান দুটো। সে বুঝতে পারল, তার পায়ের নীচে ভূমিক্ষয় শুরু হয়েছে।
অরণ্য ধীরে ধীরে হাত দুটো রাখল তমালিকার কাঁধে, তার পর সামান্য আকর্ষণেই তমালিকা ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ল অরণ্যের বুকে।
বাইরে তখন অঝোর বৃষ্টি নেমেছে।
তেইশ
চুপ করে বসে আছে অরণ্য। আলো জ্বালেনি। চারপাশে নিকষ অন্ধকার। তারাচরণ আর মহামায়া পাশের ঘরে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে ঝুপঝুপ করে। আরও তীব্র হয়েছে শীতের কামড়। অর্চন আপাতত কদমতলায় শুভমের মায়ের কাছে। কিন্তু সারাদিন বাড়ির মধ্যে থেকে অস্থির হয়ে পড়েছে সে। ফোন করে কেবলই জিগ্যেস করছে, তার কাজের যোগাযোগ কত দূর এগোল।
খটখট করে কড়া নাড়ার শব্দ হল দরজায়।
অরণ্য দরজা খুলে দেখল পুলিন মিত্র। বলল, একটু কথা ছিল আপনার সঙ্গে।
আসুন। অরণ্য দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াল।
ভিজে রেনকোটটা বাইরে রেখে ঘরে ঢুকল মিত্র। চেয়ারে বসে দামি ব্র্যান্ডের একটা সিগারেট ধরাল। অরণ্যের দিকে বাড়িয়ে দিল একটা। অরণ্য আর কৌতূহল দমন করতে পারল না। জিগ্যেস করল, আপনি তো বিড়ি খান, আজ হঠাৎ সিগারেট!
মোলায়েম করে মুখের ধোঁয়াটা ছেড়ে মিত্র বলল, বড়বাবু আর মেজোবাবুর জন্যে দু’প্যাকেট কিনেছিলাম; থানায় গিয়ে দেখলাম মেজোবাবু নেই। এটা তাই আমার ভোগে গেল।
অরণ্য বলল, চা খাবেন?
না থাক। একটা দরকারি খবর আপনাকে দিতে এসেছি, এক্ষুনি চলে যাব।
কী? মিত্রর মুখের দিকে তাকাল অরণ্য।
অবনী আপনার ভাইকে না পেয়ে আপনাকে ফাঁসাবে বলে ঠিক করেছে।
আমাকে! অরণ্য বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকল।
আপনার নামে একটা ডাইরি ছিল; সেই যে একবার রাস্তা অবরোধ করেছিলেন গার্লস স্কুলের ঝামেলা নিয়ে—সেটাকেই খুঁচিয়ে তুলছে ওরা। দু’একদিনের মধ্যেই হয়তো পুলিশ তুলবে আপনাকে।
আপনি জানলেন কী করে? অরণ্য জিগ্যেস করল।
থানাই আমার একরকম ঘরবাড়ি বলতে পারেন। এসব খবর পেতে আমার অসুবিধে হয় না।
আপনি সিওর?
সেন্ট পারসেন্ট।
বাইরে প্রবল বৃষ্টি। অফিসে বসে কাজ করছিল শুভম। অরণ্যকে দেখে চমকে উঠল। ভিজে একেবারে চুপচুপে; সারা শরীর দিয়ে জল গড়াচ্ছে; কাদায় মাখামাখি প্যান্ট।
শুভম বলল, কী হল, এই অবস্থা…
অরণ্য বলল, ব্যাপার গুরুতর।
লঘু ব্যাপারের আশা জীবন থেকে ছেঁটে ফেলো; কিন্তু ছাতা নাওনি কেন এই বৃষ্টিতে…?
নিয়েছিলাম; দিয়ে দিয়েছি একজনকে।
কাকে? জিগ্যেস করল শুভম।
বলাই স্যারকে।
খুব অবাক হয়ে গেল শুভম। বলল, বলাই স্যারকে কোথায় পেলে?
অরণ্য বলল, আসার সময় দেখি রাস্তার ধারে একটা খাদের মধ্যে স্যার দাঁড়িয়ে। কোমর পর্যন্ত জল। অন্ধকারে প্রথমে দেখতে পাইনি। কে একজন খুব সরু গলায় ডাকছে। কাছে গিয়ে দেখি—স্যার। বললেন, পড়ে গেছি, কিন্তু মাটি এত পিচ্ছিল যে উঠতে পারছি না। স্যারকে ধরে তুললাম। স্যার তখন একটা অদ্ভুত কথা বললেন।
অরণ্য থামল। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। বৃষ্টির জলে ভিজে চেপ্টে গেছে।
শুভম খুব কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে অরণ্যর দিকে।
স্যার বললেন, তুমি বাঁচালে অরণ্য; আজ না হলে ডুবেই মরতাম; জল বাড়ছিল একটু একটু করে, আর আমার ভয় হচ্ছিল খুব, মনে হচ্ছে সাঁতার ভুলে গেছি—কিছুতেই মনে পড়ছে না কী করে সাঁতার দিতে হয়—
শুভম বলল, তুমি যাচ্ছিলে কোথায়?
এখানেই। অরণ্য ভিজে প্যাকেট থেকে খুব সাবধানে সিগারেট বের করতে করতে বলল, মিত্র এসেছিল আমার বাড়ি, একটু আগে, বলল, পুলিশ নাকি আমাকে তুলতে পারে—।
শুভম একটু আঁতকে উঠে বলল, সে কী কেন!
চব্বিশ
অফিস রুমের মাঝখানে শুভম একা দাঁড়িয়ে। একটু অন্যমনস্ক দৃষ্টি বুলিয়ে দেখছে চারদিক—ওলটানো টেবিল, ছেঁড়া কাগজপত্র, ফাইল, ঘরের এককোণে ফোনের রিসিভার, অন্য কোণে আছড়ানো ক্রেডেল, ফ্যানের ব্লেডগুলো দোমড়ানো, মনে হচ্ছে, অতিকায় কোনও পশু তাণ্ডব চালিয়েছে ঘরে।
শুভমের চেহারাও ঝড়-বিধ্বস্ত মানুষের মতো। সে শক্ত মনের মানুষ। কিন্তু সেই কাঠিন্যেও কোথাও যেন ফাটল ধরেছে। চোখে-মুখে প্রবল হতাশা।
আগের দিন একদল লোক তাণ্ডব চালিয়েছে হোমে। অভিযোগ—নারী পাচার চক্রের সঙ্গে না কি যোগসাজশ আছে হোমের। শুভম দালাল। যথেচ্ছ ভাঙচুর চালায় লোকগুলো। বড় মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে কদর্য অঙ্গভঙ্গি করছিল, গলাগালি দিচ্ছিল।
অশ্লীল গালাগালির মধ্যেই শৈশব-কৈশোর কেটেছে শুভমের। কিন্তু সেগুলো ছিল অন্যরকম। নিষিদ্ধ পেশায় যুক্ত একদল মানুষ, অশিক্ষিত মানুষ, উঠতে বসতে উচ্চারণ করত শব্দগুলো— নিতান্ত গা-সওয়া ব্যাপার সেসব। কিন্তু সেই একই শব্দ যখন ঝকঝকে জামাকাপড় পরা, ভদ্র চেহারার একদল লোক বলছিল, তখন মনে হচ্ছিল, শব্দগুলোর ভেতর তীব্র বিষ। কোনও বেশ্যার মুরোদ নেই এত বিষ ঢালার।
ছেলেমেয়েগুলোকে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছে শুভম। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়, আন্দাজ করা যাচ্ছে না কিছুই। অনেকেই এসে নিয়ে গেছে বাচ্চাদের। এখনও পাঁচজন আছে। এরা যতক্ষণ আছে চিন্তামুক্ত হতে পারছে না সে। বিশেষ করে তাপসী। বড় হয়েছে, দেখতেও সুন্দর; সেদিন থেকে কেমন যেন সিঁটিয়ে আছে। আতঙ্কগ্রস্ত চোখমুখ।
খুব ধীর পায়ে তাপসী ঘরে ঢোকে। শুভমের সামনে দাঁড়ায়। শুভম বলে, তোর মা আজই এসে যাবে।
একটু মৃদু গলায় তাপসী বলে, আঙ্কেল!
বল।
আঙ্কেল, আমি বাড়ি যাব না।
বাড়ি যাবি না মানে! শুভম অবাক হয়ে তাপসীর মুখের দিকে তাকায়।
আমি এখানেই থাকব।
শুভম একটু জোরে বলে ওঠে, পাগল হলি নাকি, এই অবস্থায় এখানে…!
জোরে মাথা নাড়ে তাপসী—না, যাব না।
কেন?
তাপসী চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ওড়নার খুঁট আঙুলে জড়ায়।
শুভম বলে, তোর মায়ের কাছে, ওই পরিবেশে থাকতে প্রবলেম হবে ঠিকই; কিন্তু এখানে বিপদ আরও বেশি।
তাপসী মৃদু গলায় বলে, সে জন্যে নয়…।
শুভম বলে, কী জন্যে তা হলে!
তাপসী একবার চোখ তুলে তাকায়। ছল ছল করছে চোখ দুটো। ফের নীচের দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলে, শ্যামল…!
শ্যামলের কী হয়েছে?
ও তো এখনও ফিরল না।
কবে আসবে বলেছে?
সেটাই তো বুঝতে পারছি না। ছ’দিন আগে লাস্ট ফোন করেছিল; বলল—যাচ্ছি; তারপর আর খবর নেই।
শুভম গম্ভীর গলায় বলে; হুঁ!
তাপসী জল মোছে চোখের; নাক টানে শব্দ করে।
শুভম বলে, কিন্তু তুই এখানে থেকে কী করবি?
তাপসী বলে, ও যদি ফিরে আমাকে না দেখতে পায়…?
শুভম বলে, আগে ফিরুক তো!
ফিরবেই আঙ্কেল ও।
একটু করুণ হেসে শুভম বলে, ঠিক আছে, আমি তো রইলাম, তাকে বুঝিয়ে বলব।
চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে তাপসী। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখ মোছে।
দরজা দিয়ে একবার বাইরে তাকাল শুভম। দেখল, অরণ্য আসছে। একটু উদভ্রান্তের মত চেহারা। ছেলেটা বেশ ভেঙে পড়েছে, নিজেকে অপরাধী ভাবছে। কেবল বলছে, আমার জন্যেই আপনার ভোগান্তি শুভমদা…।
অরণ্য ঘরে ঢুকতেই শুভম একটু ধমক দেয়, কী ব্যাপার, তুমি কি চান খাওয়া ত্যাগ করেছ!
অরণ্য একটু মলিন হেসে বলে, কেন?
চেহারা দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।
অরণ্য বলে, আমি রাজনীতি করি; দু’চার দিন অনিয়ম আমাকে কায়দা করতে পারে না।
কিন্তু তোমাকে কেমন যেন অন্যরকম দেখাচ্ছে।
একটু অন্যমনস্কভাবে অরণ্য বলে, হুঁ।
আবার কিছু ঘটল না কি?
একটু চুপ করে থাকে অরণ্য। তারপর বলে, হ্যাঁ। তবে ঘটনা না দুর্ঘটনা ঠিক বুঝতে পারছি না।
শুভম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
অরণ্য বলে, একটু বাইরে চলুন; কথা আছে।
শুভম বোঝে, তাপসীর সামনে বলতে চাইছে না অরণ্য। তাই বাইরে এল সে। মাঠের মাঝখানে দাঁড়াল দুজন। ঘন মেঘ আকাশে। আলো কমে আসছে। এখান থেকে হোমের ঘরগুলো কেমন অন্ধকার দেখাচ্ছে। অন্যদিন এতক্ষণ হই-হল্লায় গমগম করে ঘরগুলো।
শুভম অরণ্যর দিকে তাকিয়ে বলল, কী হয়েছে?
অরণ্য সিগারেট ধরাল একটা। বলল, মনে হচ্ছে আমি বাবা হতে যাচ্ছি।
খবরটা বেশ অপ্রত্যাশিত। কিন্তু নিষিদ্ধ পল্লীতে বেড়ে ওঠা শুভম আশ্চর্য রকম প্রতিক্রিয়াহীন রইল। খুব ধীর গলায় জিগ্যেস করল, সিওর?
তমালিকা তো তেমনই বলল।
আকাশের দিকে একবার তাকাল শুভম। ছাইরঙের আকাশে কালো কালো কতগুলো পাখি ওড়াউড়ি করছে। তারপর হঠাৎই প্রচণ্ড জোরে অরণ্যর কাঁধে চাপড় মেরে বলল, কনগ্র্যাচুলেশন! দারুণ খবর! একেই বলে, ধ্বংসের মধ্যে সৃষ্টি।
আরও একটা খবর আছে কিন্তু।
বলে ফেলো; তাড়াতাড়ি বলো…।
অবনীদা আবার যোগাযোগ করেছিল।
তাই নাকি। শুভম মজার ভঙ্গিতে বলে, কী বলে সে?
বাবা-বাছা করে অনেক বোঝাল; আমার সামনে নাকি ব্রাইট ফিউচার—গোঁয়ার্তুমি করে নষ্ট না করে ফেলি—আপনি লোক ভালো না, মেয়েছেলের দালাল—আপনার সঙ্গে যোগাযোগ যেন না রাখি; আর লাস্ট, বাট নট দি লিস্ট—শবরীর সঙ্গে ভাব করে নিই—ও নাকি খুব ভেঙে পড়েছে—রোগা হয়ে গেছে—ইত্যাদি।
শুভম বলে, তুমি কী বললে?
বললাম, শবরী আমার বিরহে রোগা হয়নি, ওর সম্ভবত জটিল কোনও স্ত্রী রোগ হয়েছে, একটা গাইনি দেখিয়ে নিক। আর আমি মেয়েদের ধান্দাতেই হোমে যাই।
একটু করুণ হেসে শুভম বলে, কী দরকার ওদের চটিয়ে! তার চেয়ে বলতেই পারতে, এই বদ লোকটার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে না।
আর শবরীর ব্যাপারটা…?
শুভম বেশ চিন্তিত গলায় বলে, তা অবশ্য ঠিক; কিন্তু কিছু তো একটা করা দরকার; আমার মনে হয় তুমি মিত্রর প্রস্তাবটা ভেবে দেখো একবার।
অরণ্য বলে, কিন্তু মিত্র আমাকে কতটা প্রটেকশান দিতে পারবে সেটাই ভাবছি।
কিছুটা হলেও তো পারবে; না হলে তোমাকে একা দাঁড়িয়ে মার খেতে হবে।
সিগারেটে একটা টান দিয়ে ফেলে দেয় অরণ্য। তারপর বলে, তমালিকার কথাটাও ভাবছি; পুলিশ আমাকে তুলে নিয়ে গেলে ওর কী অবস্থা যে হবে! তারপর আমার বাবার শরীর খুব খারাপ, হার্টে প্রবলেম…।
শুভম বলে, সেক্ষেত্রে লড়াই করার একটা প্ল্যাটফর্ম পাবে তুমি। মিত্রর নাম্বার আছে তোমার কাছে?
আছে।
তাহলে এখনই যোগাযোগ করো।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে অরণ্য। অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। কিছুদিন আগে যে ঘটনাটা ঘটেছে সেটাই ভাবছে। বেশ ক’দিনের অদর্শন, স্নায়ুর ওপর অবিরাম চাপ, মেঘলা আকাশ, ঝিরঝিরে বৃষ্টি—সবকিছু বেসামাল করে দিল দুজনকে, পৃথিবী মুছে গেল চারপাশ থেকে। আজ গিয়েছিল তমালিকাদের বাড়ি, তমালিকাই দিল সংবাদটা; শুনে কিছুক্ষণের জন্য কেমন যেন নিজেকে ভারহীন, বোধহীন মনে হচ্ছিল। ভয় নেই, চিন্তা নেই, লজ্জা নেই—অপলক দেখছিল তমালিকাকে। মনে হল আরও দেখতে সুন্দর হয়েছে তমালিকা। তখনই তমালিকা হঠাৎ লজ্জায় চোখ নামিয়ে বলল, কী দেখছ হাঁদার মতো!
শুভম তাড়া দেয়, কী ভাবছ, আর দেরি ঠিক হবে না কিন্তু।
অরণ্য শুভমের হাত থেকে নিল মোবাইলটা। তখনই বেজে উঠল মোবাইল। ফের সে শুভমকে ফিরিয়ে দিল ফোনটা।
শুভম দু’একটা কথা বলেই অরণ্যর হাতে রিসিভার দিয়ে বলল, অর্চন।
মোবাইলটা কানে ধরে অরণ্য সতর্ক গলায় বলল, হ্যালো।
দাদা আমি বলছি।
কী ব্যাপার, হঠ্যাৎ এখন।
আমি কাল বাড়ি যাচ্ছি।
অরণ্য একটু জোরে বলে উঠল, কেন?
এভাবে আমি আর থাকতে পারছি না—দিনরাত চোরের মতো—দিনের পর দিন—।
অরণ্য বোঝাবার চেষ্টা করে, আর তো ক’টা দিন মাত্র, তারপর চেন্নাই চলে গেলে, অনেকটা সেফ হয়ে যাবি।
অনেকটা হব, পুরোপুরি তো হব না।
তা হয়তো হবি না, তবে…
অর্চন মাঝপথে বলে ওঠে, আমি একটা জিনিস ভেবে দেখলাম, আমি তো সত্যিই একটা মার্ডারার।
কী যা তা বলছিস! চিৎকার করে ওঠে অরণ্য।
ঠিকই বলছি। অর্চন বলল, ব্যাপারটা অন্যদিক দিয়ে ভেবে দেখ; রমেশ সাহাকে খুন করতে চাইনি, কিন্তু সে খুন হয়ে গেল। আমি কিন্তু বিশুকে খুন করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ভাগ্য জোরে সে বেঁচে গেল।
তাহলে তুই খুনি হলি কী করে?
খুন তো আমি একজনকে করতে চেয়েছিলাম। আমার কথাতেই রতন গুলিটা চালিয়েছিল; গুলিটা দু’তিন ইঞ্চি তফাতে লাগলেই কিন্তু সেই লোকটা খুন হয়ে যেত।
পাগলামি করিস না! অরণ্য একটু ধমকে ওঠে।
খুব শান্ত গলায় অর্চন বলল, তুই যাই বলিস না কেন, আমার এমনটাই মনে হচ্ছে—তা ছাড়া এই জীবন আমার একদম ভালো লাগছে না; আমার জন্য এতগুলো মানুষ সমস্যায় পড়েছে।
ঠান্ডা মাথায় ভাব। অরণ্য কিছুটা অনুরোধের সুরে বলে, হঠকারী কিছু করে বসিস না।
অর্চন শান্ত এবং গম্ভীর গলায় বলে, আমার যা ভাবার ভাবা হয়ে গেছে, কালই আমি বাড়ি চলে যাচ্ছি; তারপর যা হওয়ার হবে।
ফোনটা কেটে হতবাক হয়ে বসে রইল অরণ্য। সে ভালো বুঝতে পারছে অর্চনকে নিরস্ত করা যাবে না। ওর কথাবার্তার ধরনটাই বদলে গেছে। প্রত্যেকটা কথার পেছনে গভীর প্রত্যয়; এ সেই ভিতু, খোলসে আত্মগোপন করে থাকা অর্চন নয়।
শুভম অবাক হয়ে অরণ্যর কথাগুলো শুনছিল। সে জিগ্যেস করল, কী বলছে অর্চন।
ও কাল এখানে চলে আসবে বলছে।
সে কী! কেন? আঁতকে ওঠে শুভম।
