পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
।। তৃতীয় খণ্ড ।।
“অগ্নিতত্ত্ব কাঠে বেশি। ঈশ্বরতত্ত্ব যদি খোঁজো মানুষে খুঁজবে। মানুষলীলা কেন? এর ভিতর তাঁর কথা শুনতে পাওয়া যায়। এর ভিতর তাঁর বিলাস, এর ভিতর তিনি রসাস্বাদন করেন। মানুষের ভিতর নারায়ণ। দেহটি আবরণ, যেন লণ্ঠনের ভিতর আলো জ্বলছে। অথবা শার্সির ভিতর বহুমূল্য জিনিস দেখছি। যেন বলছে, আমি মানুষের ভিতর রইচি, তুমি মানুষ নিয়ে আনন্দ কর। প্রতিমাতে তাঁর আবির্ভাব হয় আর মানুষে হবে না? মানুষের ভিতর যখন ঈশ্বরদর্শন হবে তখনই পূর্ণ জ্ঞান হবে। তিনিই এক এক রূপে বেড়াচ্ছেন। কখনও সাধুরূপে কখনও ছলরূপে—কোথাও বা খলরূপে।” শ্রীরামকৃষ্ণ
“স্তব কথামৃতং তপ্তজীবনং কবিভিরীড়িতং কল্মষাপহম্।
শ্রবণমঙ্গলং শ্রীমদাততং ভুবি গৃণন্তি ভূরিদা জনাঃ॥”
“তোমার কথা অমৃততুল্য। সন্তপ্তজনের জীবন-দান করে, কবিকুলদ্বারা উচ্চারিত হয়ে সমস্ত পাপ বিনাশ করে, শুনতেই এ মধুমঙ্গল। দিকে দিকে ব্যাপ্ত হয়ে বিধান করে সকলশ্রী। যাঁরা পৃথিবীতে এ কীর্তন করেন তাঁরাই বহুদাতা।”—শ্ৰীমদ্ভাগৰত
।। ওঁ ভগবতে শ্রীরামকৃষ্ণায় নমঃ ।।
.
ভূমিকা
শুধু কথা আর কথা। ঈশ্বর অশেষ বলে তাঁর বিষয়ে কথাও অন্তহীন। ‘শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে?” শেষ কথা বলা যায় না বলেই এত কথা, এত কান্না। ঈশ্বর যে অনির্বচনীয়, অবাঙমনসগোচর, সেটুকু বোঝাবার জন্যেও বা কত কথার আড়ম্বর। যে কাঁদে কথাই তার একমাত্র উপায়। তার একমাত্র আনন্দ।
‘শব্দজালং মহারণ্যং।’ কিন্তু মহারণ্যকে বোঝাবার জন্যেও চাই শব্দজাল। সব শাস্ত্র-পুরাণ বেদবেদান্ত ঘুরে এসেই বলা যায় ঈশ্বর আরো দূরে। পাঁজি পড়ে নিলেই বলা যায় বিশ আড়া জল লেখা থাকলেও পড়ে না এক ফোঁটা। তাই বলে কথাকে একেবারে ফেলে দেবে কি করে? ‘যতো বাচো নিবর্তন্তে—’ বাক্য প্রকাশ করতে চাইবে, তবেই না সে আসবে ফিরে-ফিরে। ঠাকুর বললেন, ভক্ত ভালো, বিদ্বান ভক্ত আরো ভালো। যেন হাতির দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো।
শিল্পী যেমন তার প্রতিমাকে সুন্দর করে নানা লাবণ্যসম্ভারে তেমনি ঈশ্বর-প্রসঙ্গকেও সুন্দর করি বাক্যের প্রসাধনে, ভাবের রূপৈশ্বর্যে। আর এ বাক্য যত গাঁথি তত মাতি। যত ভজি তত মজি। আর-সব কথা ক্লান্ত করে ঈশ্বরকথা করে না। আর সব অন্বেষণ অবসাদ আনে ঈশ্বরসন্ধান অনির্বেয়। যত পান তত পিপাসা, যত পথ তত পাথেয়। কাজলের ঘরে গেলে যেমন কালি লাগে আতরের ঘরে এলে তেমনি সুগন্ধ। সাধু সঙ্গ দুর্লভ হয় সৎকথাকে সুলভ করি।
জপ-তপ ধ্যান-জ্ঞান অনেক শুনেছি, যাই বলো, ভালোবাসার মত কিছু নয়। বৃন্দাবনে গোপীদের অনেক জ্ঞানের কথা বলতে এসেছিল উদ্ধব। কৃষ্ণ মথুরায় গেছেন বলে তোমরা বিরহে ব্যাকুল কেন? কৃষ্ণ তো সর্বাত্মক, তোমাদের সঙ্গে তো তাঁর বিয়োগ নেই। তিনি মথুরায় আছেন বৃন্দাবনে নেই এ তো হতে পারে না। আমরা অতশত বুঝি না জ্ঞানের কথা। আমরা যাকে সাক্ষাৎ সাজিয়েছি গুজিয়েছি খাইয়েছি পরিয়েছি তাকে ধ্যান করে পেতে যাব কোন দুঃখে? যে মন দিয়ে ধ্যান করব সে মন কি আর আমাদের আছে? আমরা কাঁদছি, আমাদের সেই ভালোবাসার ধনকে এনে দাও। তোমাদের কান্নাই হরিগুণগান। বললে উদ্ধব। তোমাদের হরিকথাগীত লোক-ত্রয় পবিত্র করুক।
তাই হরিকথা বলে যাই প্রাণ ভরে। যদি ডাক-নাম ধরে ডাকতে ডাকতে মনে অনুরাগের রঙ লাগে। যদি বজ্রসার নিষ্ঠার থেকে চলে আসে বিগলিত ভক্তি। পবিত্রতার পরিপূর্ণতা।
৬ই ফাল্গুন ১৩৬১
অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত






Leave a Reply