৩৫
অন্ধ বিশ্বাস? কেন নয়? প্রতিমুহূর্তে করছ না এই অন্ধ বিশ্বাস? অন্ধকারে কেউ নেই এ বিশ্বাসও তো অন্ধ বিশ্বাস।
রোগ দেখে ডাক্তার দিয়ে গেল ব্যবস্থাপত্র। পাঠালাম ডিসপেনসারিতে। অন্ধ বিশ্বাস, কম্পাউন্ডার ঠিক-ঠিক ওষুধ দেবে, বিষ দেবে না। নাপিতের খোলা ক্ষুরের কাছে গলা বাড়িয়ে দিয়েছে কামাবার জন্যে, অন্ধ বিশ্বাস গলার শিরাটি কাটবে না নাপিত। ট্যাক্সি চেপেছি, অন্ধ বিশ্বাস নিরাপদে নিয়ে যাবে পথ কাটিয়ে। সাহেব এসে বললে, উঠেছিলাম গৌরীশঙ্করে, প্রত্যক্ষও নেই অনুমানও নেই, অনায়াসে সত্য বলে মেনে নিলাম। অন্ধ বিশ্বাস ছাড়া আর কি।
আর-পাঁচজনকে দেখে, পাঁচটা কার্যকারণের ফল থেকেই এই অন্ধ বিশ্বাসের জন্ম।
তেমনি দেখি না পাঁচজন কি বলে ঈশ্বর সম্বন্ধে। পাঁচ দেশের পাঁচজন। পাঁচ যুগের পাঁচজন। তারা যদি বলে, হ্যাঁ, আছেন, তাঁকে দেখেছি, তবে মেনে নিতে আপত্তি কি। একটা সাহেবকে সত্যবাদী বলে মানতে পারি, একজন সাধুকে মানতে পারব না? বেশ তো, সাহেবের মধ্যেও তো সাধু আছে। দেখ না তাদের জিজ্ঞেস করে। বাপ ছেলেকে বর্ণপরিচয় শেখাচ্ছে। বলছে, ‘পড়ো অ—
ছেলে বললে, ‘কেন, অ বলব কেন? বলব, হ
‘না, অ-ই বলতে হয়। বলো, অ—’
‘বা, বুঝিয়ে দাও, কেন অ বলব? আমি বলব, দ—’
বলো, কী যুক্তি আছে বাপের? কেন ছেলে অ বলবে? কেন সে হ বা দ বলবে না? তখন অনন্যোপায় হয়ে বাপ বললেন, ‘সকলে অ বলেছে, তুমিও অমনি অ বলো–‘ যুক্তির সেরা যুক্তি। সকলে বলেছে। সুতরাং তুমিও বলো। তুমিও মানো। বর্ণপরিচয় যেমন অ থেকে শুরু, তেমনি জগৎপরিচয়ের আদিতে ঈশ্বর।
অ বলো। বলো আদ্যবর্ণ। তেমনি ঈশ্বর বলো। বলো আদিভূত।
কেন অবিশ্বাস করি? নিজেকে অহঙ্কারী ভাবি বলে। নিজে না দেখলে মানব কেন এই অভিমান থেকেই অবিশ্বাস। যেন চোখ সবই ঠিক দেখে। সিনেমা দেখে যে চোখের জল ফেলি সেও চোখ ঠিক-ঠিক দেখেছিল বলেই। তাই না? হায় রে অহঙ্কার!
কোনো বিষয়ে জানতে হলেই নিজেকে প্রথম জানতে হবে অজ্ঞ বলে। নিজের যদি এই অজ্ঞতাবোধ না থাকে তবে বিজ্ঞজনের সান্নিধ্য পাব কি করে? আমি জানি না উনি জানেন এই বিনয় এই অভিমানহীনতা না থাকলে কি করে জানতে পারব? ছেলে যদি মনে করে আমি বাপের চেয়ে বড় পণ্ডিত তবে অ-এর বদলে তাকে হ শিখে ফিরতে হয়। পড়তে হয় বিশালাক্ষীর দ-য়ে।
কিন্তু কোনোক্রমে যদি একবার বিশ্বাস হয় তবে কাটান-ছোড়ান নেই। নিশ্চয় নিষ্পত্তি করে যেতে হবে ষোলো আনা। ‘তুই হাসপাতালে এলি কেন?’ বললেন ঠাকুর। ‘বাড়িতে বসে চিকিৎসা করলেই পারতিস। কে তোকে ঢুকতে বলেছিল হাসপাতালে? যখন একবার ঢুকেছিস সম্পূর্ণ রোগমুক্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বড় ডাক্তার সার্টিফিকেট না দেওয়া পর্যন্ত রেহাই নেই।’
যখন একবার এসে পড়েছি বিশ্বাসের বন্দরে তখন আর ফিরে যাওয়া নয়। ব্যাকুলতার হাওয়ায় পাল তুলে দিয়ে ভক্তির স্রোতে চলে যাব ভাসতে ভাসতে।
ভক্তি? ভক্তি কি যে-সে কথা?
না হোক, তবু তোমার মমতা তো আছে, স্নেহপ্রীতি তো আছে। এ তোমার সহজাত। নিজের প্রতি মমতা। সন্তানের প্রতি স্নেহ। পত্নীর প্রতি প্রীতি। এ সব স্বাভাবিক প্রবৃত্তি নিম্নগামী। বাঁধ দিয়ে এ নিম্নগামী স্রোতকে ভিন্নগামী করে দাও। ঊর্ধ্বগামী করে দাও। প্রীতিও তরলতা ভক্তিও তরলতা। বাঁধের কাছটায় বাঁক ঘুরে প্রবলতর বেগে বয়ে যাবে জলস্রোত। প্রীতি ভক্তিতে উচ্ছসিত হবে। গাছের মূলটি ঊর্ধ্বমুখে। শাখাগুলি নতমুখ।
তোমার ভালোবাসার অঙ্কুরটি ঊর্ধ্বমুখ করে দাও। পরে বিতত শাখায় নত হয়ে জগজ্জনকে সে ছায়া দেবে, শান্তি দেবে।
‘তোমরা তো সংসারে থাকবে, তা একটু গোলাপী নেশা করে থাকো।’ ঠাকুর বললেন অশ্বিনী দত্তকে: ‘কাজকর্ম করছ অথচ নেশাটি লেগে আছে। তোমরা তো আর শুকদেবের মত হতে পারবে না যে ন্যাংটো-ভ্যাংটো হয়ে পড়ে থাকবে।’
দক্ষিণেশ্বরে এসেছে অশ্বিনী। সাধ পরমহংসকে দেখবে। কিন্তু কে পরমহংস? ‘আহা, দেখতে পাচ্ছেন না? ঐ যে তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে আছেন।’ কে একজন ঘরের মধ্যে দেখিয়ে দিল আঙুল দিয়ে।
ঐ তাকিয়ায় ঠেস দেবার নমুনা নাকি? তাকিয়ায় কি করে ঠেস দিয়ে বসতে হয় আমিরি চালে তাই জানে না। তবে নিশ্চয় উনিই পরমহংস হবেন।
একখানা কালোপেড়ে ধুতি পরনে, বসে আছেন পা দুখানি উঁচু করে, তাও দুহাত দিয়ে জড়িয়ে, আধা-চিত অবস্থায়। কেশব সেন তখন বেঁচে, এসেছে ঠাকুরের কাছে। ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করতে ঠাকুরও তেমনি প্রণাম করলেন। সমাধিস্থ হয়ে গেলেন। অশ্বিনী ভাবল এ আবার কোন ঢঙ!
সমাধিভঙ্গের পর কেশবকে বলছেন ঠাকুর, হ্যাঁ হে কেশব, তোমাদের কলকাতার বাবারা নাকি বলে ঈশ্বর নেই? সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন বাবু, এক পা ফেলে আরেক পা ফেলতেই উঃ, কি হল, বলে অজ্ঞান। ধরো ধরো, ডাক্তার ডাকো। ডাক্তার আসবার আগেই হয়ে গেছে! এই তো বীরত্ব! এরা বলেন ঈশ্বর নেই।
ভক্তি-নদীতে ডুব দিয়ে সচ্চিদানন্দ সাগরে গিয়ে পড়ব যাকে বলে সন্তরণে সিন্ধুগমন এ কি গৃহস্থের পক্ষে সম্ভব নয়? কি করে হবে। একবার ডুববে একবার উঠবে, একেবারে ডুবে যাবে কি করে। ঐ যা বলেছি গোলাপী নেশার বেশি হবে না।
‘কেন, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর?
‘আহা, দেবেন্দ্র, দেবেন্দ্র-‘ দেবেন্দ্রের উদ্দেশে প্রণাম করলেন ঠাকুর। বললেন, ‘তবে কি জানো, এক গৃহস্থের বাড়ি দুর্গোৎসব হত, পাঁঠাবলি হত উদয়াস্ত। কয়েক বছর ধরে বলির আর সে ধূমধাম নেই। কি ব্যাপার? একজন এসে জিজ্ঞেস করলে, আজকাল আর বলি নেই কেন? আর বলি। গৃহস্থ বললে, এখন দাঁত পড়ে গেছে যে। দেবেন্দ্রও এখন তাই ধ্যান-ধারণা করছে, তা করবেই তো। তা কিন্তু খুব মানুষ দেবেন্দ্র!
কীর্তন আরম্ভ হল। এবং তারপর যা ঘটল, অশ্বিনী তা কোনোদিন কল্পনায়ও আনেনি। ঠাকুর নাচতে শুরু করলেন। সঙ্গে কেশব। আব যারা যারা ছিল সকলে। মহাকাশে নক্ষত্রনর্তন। সূর্য ও নাচছে সঙ্গে-সঙ্গে গ্রহতারকারাও নাচছে।
নিজে নেচে আর সকলকেও নাচান, অশ্বিনীর সন্দেহ রইল না, এই পরমহংস।
কে এই আত্মদ যাঁর সত্তাতে সকলে সত্তাবান, যাঁর বলে সকলে বলী, যাঁর ছন্দে সকলে প্রাণনৃত্যময়!
বিনয়পূর্ণ প্রার্থনা পূঞ্জীভূত হয়ে উঠল মনের মধ্যে। অভিমান বিগলিত করো। প্রাণের মধ্যে পরমনৃত্যের ছন্দে ছন্দে অহঙ্কারের শৃঙ্খল চূর্ণ-চূর্ণ হয়ে যাক।
আরেক দিন গিয়েছে অশ্বিনী। সঙ্গে কটি যুবক-বন্ধু।
তাদের লক্ষ্য করে ঠাকুর বললেন, ‘এরা এসেছেন কেন?”
‘আপনাকে দেখতে।’ বললে অশ্বিনী।
‘আমাকে দেখবে কি গো! ঘুরে-ঘুরে বরং বিল্ডিং-টিল্ডিং দেখুন।
অশ্বিনী হাসল। ‘সে কি কথা! আপনাকে দেখতে এসেছে, ইট-বালি-চুন দেখবে কি!’
‘তবে বলতে চাও এরা চকমকির পাথর? ঠুকলে আগুন বেরবে? হাজার বছর জলে ফেলে রাখলেও আগুন-ছাড়া হবে না? হায়, আমাদের ঠুকলে আগুন বেরোয় কই?’
আবার হাসল অশ্বিনী। আপনি কি আচ্ছাদিত আগুন? আপনি দীপিত আগুন। যে ভাস্করের কাছে আরোগ্য আপনি সেই ভাস্কর। যে হুতাশনের কাছে ধন আপনি সেই হুতাশন। পরম-আয়ু, পরম-ধন-প্রদাতা।
আরো একদিন গিয়েছে। বালক ভাবে বললেন ঠাকুর, ‘ওগো সেই যে কাক খুললে ভস-ভস করে ওঠে, একটু টক একটু মিষ্টি, তার একটা এনে দিতে পারো?
অশ্বিনী বললে, ‘লেমোনেড? খাবেন?
আবদেরে গলায় বললেন, ‘আনো না একটা।’
একটা এনে দিল অশ্বিনী। ঠাকুর খেলেন আনন্দ করে।
অশ্বিনী জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, আপনার জাতিভেদ আছে?
‘কই আর আছে! কেশব সেনের বাড়ি চচ্চড়ি খেয়েছি।’
‘আচ্ছা, কেশববাবু কেমন লোক? ‘
‘ওগো সে যে দৈবী মানুষ। একটু থেমে আবার বললেন, ‘একটা লোক জগৎ মাতিয়ে দিল কত বড় শক্তি! তারপর আবার একটু থামলেন। বললেন, ‘কিন্তু জাতিভেদ জোর করে টেনে ছিঁড়তে চেয়ো না। ও আপনিই খসে যায়। যেমন নারকোল গাছের বালতো আপনি খসে পড়ে তেমনি। এই দেখ না, সেদিন একটা লম্বা দাড়িওলা লোক বরফ নিয়ে এসেছিল, এত বরফ ভালোবাসি অথচ ওর থেকে কিছুতেই খেতে ইচ্ছে হল না। আবার একটু পরে আরেকজন বরফ নিয়ে এল, ক্যাচড়মাচড় করে খেয়ে ফেললাম চিবিয়ে।’
‘আর ত্রৈলোক্যবাবু কেমন লোক? আবার জিজ্ঞেস করল অশ্বিনী।
‘ত্রৈলোক্য? আহা, বেশ লোক, বেড়ে গায়।
সেদিন দক্ষিণেশ্বরে ত্রৈলোক্য এসেছে ঠাকুরকে গান শোনাতে। মা’র গান ধরেছে ত্রৈলোক্য। ‘মা, তোমার কোলে নিয়ে অঞ্চলে ঢেকে আমায় বুকে করে রাখো।
প্রেমে কাঁদছেন ঠাকুর। বলছেন, ‘আহা, কি ভাব।
ত্রৈলোক্য আবার গাইলঃ
হরি আপনি নাচো আপনি গাও
আপনি বাজাও তালে তালে,
মানুষ তো সাক্ষীগোপাল
মিছে আমার-আমার বলে।
ঠাকুর বললেন গদগদ হয়ে: ‘আহা, তোমার কি গান! তোমার গান ঠিক-ঠিক। যে সমুদ্রে গিয়েছে সেই দেখতে পারে সমুদ্রের জল।’
গানশেষে ত্রৈলোক্য বললে, ‘আহা, ঈশ্বরের রচনা কি সুন্দর!’
‘দপ করে দেখিয়ে দেয়। হিসেব করে সুন্দরের বোধ আসে না।’ বললেন ঠাকুর, ‘সেই সেদিন শিবের মাথায় ফুল দিচ্ছি, হঠাৎ দেখিয়ে দিলে এই বিশ্বসৃষ্টি, এই বিরাট মূর্তিই শিব। তখন শিব গড়ে পুজো বন্ধ হল। ফুল তুলছি হঠাৎ দেখিয়ে দিলে যেন ফুলের গাছগুলিই একেকটি ফুলের তোড়া। সেই থেকে বন্ধ হল ফুল তোলা। মানুষকেও ঠিক সেইরকম দেখি। তিনিই যেন মানুষের শরীরটাকে নিয়ে হেলেদুলে বেড়াচ্ছেন—যেন ঢেউয়ের উপর একটা বালিশ ভাসছে, নড়ছে-চড়ছে, উঠছে-পড়ছে—’
আগের কথার জের টানল অশ্বিনী। প্রশ্ন করল: ‘আর শিবনাথবাবু কেমন লোক?”
‘বেশ লোক, তবে তর্ক করে যে।’ একটু থেমে বললেন: ‘শিবনাথকে দেখলে বড় আনন্দ হয়। গাঁজাখোরের স্বভাব, গাঁজাখোরকে দেখে ভারি খুশি। হয়তো তার সঙ্গে কোলাকুলি করে বসে।’
শিবনাথকেও সেদিন তাই বলেছিলেন মুখের উপর ‘তোমাকে দেখতে বড় ইচ্ছে করে। শুদ্ধাত্মাদের না দেখলে কি নিয়ে থাকব? শুদ্ধাত্মাদের বোধ হয় যেন পূর্বজন্মের বন্ধু।’
আলিপুরের চিড়িয়াখানায়ও গিয়েছিলেন ঠাকুর। সে কথা বলছেন শিবনাথকে। শিবনাথ জিজ্ঞেস করল, ‘কি দেখলেন সেখানে?’
‘আর কি দেখব! মায়ের বাহন দেখলাম।’
কেন শিবনাথকে চাই? নিজেই ব্যাখ্যা করছেন ঠাকুর, ‘যে অনেকদিন ঈশ্বরচিন্তা করে তার মধ্যে সার আছে। তার মধ্যে ঈশ্বরের শক্তি আছে। আবার যে ভালো গায় ভালো বাজায় তার মধ্যেও ঈশ্বরের শক্তি আছে। যার যতটুকু বিদ্যা তার ততটুকু বিভৃতি। এমন কি যে সুন্দর তার মধ্যেও ঈশ্বরের সার।’
ঈশ্বরই সংসারোত্তর মন্ত্র, তাই যার জিহ্বায় কৃষ্ণমন্ত্র তারই জন্মসাফল্য।
অচলানন্দের কথা উঠল। বরিশালে তার সঙ্গে দেখা হয়েছে অশ্বিনীর।
‘কেমন লাগল তাকে?’ জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।
‘চমৎকার।’
‘আচ্ছা বলো তো সে ভালো না আমি ভালো?’
কী সরল প্রশ্ন! অশ্বিনী বললে, ‘কার সঙ্গে কার তুলনা! সে হল গিয়ে পণ্ডিত, আর আপনি হচ্ছেন মজার লোক। তার কাছে শুধু বচন, আপনার কাছে শুধু মজা। হরেক রকম মজা, অফুরন্ত মজা–‘
কথাটি পেয়ে খুশি হলেন ঠাকুর। বললেন, ‘বেশ বলেছ, ঠিক বলেছ।’
মজার লোক। তুমি সর্বসুখনিলয়। তুমি আছ হাসে আর রাসে, আনন্দে আর বিনোদে। প্রশান্তবাহিতা তোমার স্থিতি। তুমি প্রাপ্তসমস্তভোগ৷ আপ্তসমস্তকাম। সুখ কি? আত্মার স্বরূপাবস্থাই সুখ। বিষয়ভোগে যে সুখ, সে সুখ কি বিষয়ে?
না। সে সুখ সুখময় আত্মায়। তিনি সুখ দিলেন বলে সুখের উপলব্ধি হল। ক্ষণকালের জন্যে চিত্তবৃত্তি নিরুদ্ধ হয়েছিল, ক্ষণকালের জন্যে চিত্তবৃত্তি আত্মাভিমুখী হয়েছিল, ক্ষণকালের জন্যে মরণযন্ত্রণা বা পরিবর্তন-যন্ত্রণা ছিল না—সেই হেতু। সুখের বিষয় বিষয় নয়, সুখের বিষয় আত্মা।
তাই খণ্ড সুখ ক্ষুদ্র সুখ নিয়ে কি হবে? যে সুখ বারে বারে মরে যায় সেই সুখের মূল্য কি। চাই অপরিচ্ছিন্ন সুখ। সেই অপরিচ্ছিন্ন সুখই তুমি।
‘তাঁকে পাবো কি করে?” সরাসরি প্রশ্ন করল অশ্বিনী ।
‘কাঁদতে-কাঁদতে কাদাটকু যখন ধুয়ে যাবে, তখন পাবে।’ বললেন ঠাকুর, ‘চুম্বক বরাবরই লোহাকে টানে। কিন্তু লোহার গায়ে যে কাদা মাখা। কাদা লেগে থাকতে কি করে লাগে চুম্বকের সঙ্গে! তাই কাদাটুকু ধুয়ে ফেল চোখের জলে।
ঠাকুর তক্তপোশের উপর উঠে এলেন। শুয়ে পড়লেন। বললেন, ‘হাওয়া কর দেখি।’ অশ্বিনী পাখা করতে লাগল।
‘বড্ড গরম গো। পাখাখানা একটু জলে ভিজিয়ে নাও না-‘
পরিহাস করল অশ্বিনী। ‘আপনারও শখ আছে দেখছি।’
“কেন থাকবে না, কেন থাকবে না জিজ্ঞেস করি?’
‘না, না, থাক, একশোবার থাক।’
কতক্ষণ পর ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, তুমি গিরিশ ঘোষকে চেনো?”
“কোন গিরিশ ঘোষ? থিয়েটার করে যে? দেখিনি কখনো। নাম শুনেছি।’
“আলাপ কোরো তার সঙ্গে। খুব ভালো লোক।’
শুনি মদ খায় নাকি?’
উদার শান্তিতে বললেন ঠাকুর, ‘তা খাক না, খাক না, কতদিন খাবে?
‘এখন ঠাকুরের কথায় যে আনন্দ পাই তার এক কণা যদি মদ-ভাঙ-গাঁজায় থাকত!
নিজের কথা বলছে সবাইকে গিরিশ: ‘আমি কত কি ঠাকুরকে বলতাম তিনি কিছুতেই বিরক্ত হতেন না। যখন মদ খেয়ে টং হয়ে যেতাম, বেশ্যাও দরজা খুলে দিতে সাহস পেত না, তখনো ঠাকুরের কাছে আশ্রয় পেতাম। সে অবস্থায়ও আদর করে ধরে নিয়ে যেতেন। লাটুকে বলতেন, ওরে দ্যাখ গাড়িতে কিছু আছে কিনা। এখানে খোঁয়ারি এলে তখন কোথায় পাব? তারপর আমার চোখের দিকে চেয়ে থাকতেন। চেয়ে থেকে আমার চোখের দৃষ্টি শাদা করে দিতেন। শেষে আপশোষ করতাম, আমার আস্ত বোতলের নেশাটা মাটি করে দিলে!’
আবার বলছে গিরিশ, ‘সকলকে ঠাকুর গত জীবনের কথা জিজ্ঞেস করতেন, আমাকে কখনো করেননি। একবার করলে হয়! সব মহাভারত তাঁকে বলে দিই। বললে সব তিনি নিশ্চয়ই শোনেন বসে বসে। মানা করেন না কিছুতেই। সাধে কি আর এঁকে এত মানি?”
‘আপনি আমার সব বিষয়ের গুরু।’ একদিন গিরিশ ঠাকুরকে বললে মুখের উপর। ‘এমন কি ফিচকেমিতেও।’
ঠাকুর বললেন, ‘না গো তা নয়। এখানে সংস্কার নেই। করে জানা আর পড়ে বা দেখে জানার ভেতর ঢের তফাত। করে জানলে সংস্কার পড়ে যায়। তা থেকে বেঁচে ওঠা ভারি শক্ত। পড়ে বা দেখে-শুনে জানাতে সেটা হয় না।’
এক রাজার এক গল্প আছে। ভারি স্ত্রৈণ সেই রাজা। একদিন রাজার এক বন্ধু তাকে এই নিয়ে খুব শ্লেষ করল। রাজা ভেবে দেখলেন, সত্যি, এবার থেকে চলতে হবে সামলে। অন্তঃপুরে এসে গম্ভীর হয়ে রইলেন, নিতান্ত দু-একটা দরকারি কথা ছাড়া কথাই কন না রানির সঙ্গে। খেতে বসেছেন রাজা, রানির পোষা বেড়াল রাজার পাতের কাছে ঘুরঘুর করছে। রাজা তাকে তাড়াতে চেষ্টা করছেন কিন্তু সে বারে-বারেই ফিরে আসছে। তখন রানি বলছে, ‘আগে ওকে অনেক আস্কারা দিয়েছ, এখন কি আর তাড়ানো সম্ভব?”
আগে অনেক আস্কারা দিলে পরে আর তাড়ানো যায় না। তাই রাশ রাখো নিজের কাছে।
বারাঙ্গনা ত্যাগ করা সহজ, কিন্তু তোমার বাসনার নটীকে কি করে ত্যাগ করবে? তবে উপায়?
আন্তরিক হও। অন্তরের নির্জনে বসে কাঁদো। অন্তরকে প্রক্ষালিত করো। অন্তর থেকে চাও ঈশ্বরকে।
‘ধ্যান করো।’ বলছেন ঠাকুর, ‘একাগ্র হও। ধ্যানে কত কি হয়তো দেখবে, কুকুর বেড়াল বাঁদর বেশ্যা লোচ্চা জুয়াচোব রাক্ষস পিশাচ দৈত্য দানব। ভয় পেয়ো না। ভেঙে দিও না ধ্যান। বহুরূপী ঈশ্বরের মূর্তি দেখছ মনে করে স্থির থেকো। কিন্তু যদি কোনো বাসনা এসে হাজির হয়, তখনি বুঝবে মহা বিঘ্ন এসে দাঁড়িয়েছে। তখন ধ্যান ভেঙে কাতরে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো, ভগবান, আমার এ বাসনা পূর্ণ কোরো না।’
তুমিই শুধু পূর্ণ হয়ে বিরাজ করো।
তারপর বলি তোদের এক চরম কথা। অশেষ আশ্বাস দিলেন ঠাকুর। ‘শোন, কলিতে মনের পাপ পাপ নয়।’
৩৬
ঈশ্বরই মরণাতীত সত্য।
ঈশ্বরকে মাথায় নিলে মানুষ কি ছোট হয়ে যায়, না, বড়ো হয়ে ওঠে। সবই তাঁর ইচ্ছা এই ভেবে কি মানুষ নিষ্ক্রিয় হয়, না, তাঁর ইচ্ছা প্রস্ফুটিত করি আমার জীবনে, আসে এই দুর্দম প্রেরণা? কাকে ধরে শোকে-দুঃখে নির্বিচল থাকি, বাধা-বিপত্তি উল্লঙ্ঘন করি, বৈমুখ্যে-বৈফল্যে সংগ্রহ করি নবতর সংগ্রামের তেজ! কে হতাশের আশা, নিঃস্বের সম্বল, চিবোৎকণ্ঠিতের শান্তি। কে সমস্ত বিবাদের মীমাংসা! সমস্ত অন্যায়ের সংশোধন!
কোথায় যাবে মানুষ? মায়ামূঢ় দিঙমূঢ় মানুষ। পথ চলতে-চলতে বিশ্রাম চায়। কোথায় সেই বিশ্রামায়তন! নিজের ঘরের চিন্তামণির সন্ধানে ঘর ছেড়ে বনে-বনে ঘোরে।
সন্ন্যাসী হয়েও বিশ্রাম চায়। কুটির বাঁধে, মঠ তোলে। নিজের বৃত্তি ছেড়ে এসে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে। নিজের পুত্র ছেড়ে এসে চেলা বানায়। এক মায়া ছেড়ে আরেক মায়ার বশে আসে। যা চায় কোথাও তাকে পায় না খুঁজেখুঁজে। সে মোহন মানুষ মনের মানুষ হয়ে মনের মধ্যেই বসবাস করছে। তাকে সেইখানেই খোঁজো বোঝো, সেইখানেই ধরো।
যে প্রশান্তসাগর খুঁজছ সে তোমার মনের ভূমণ্ডলে।
ঠাকুর বললেন, ‘গৃহীর অভিমান কুঁচ গাছের শিকড়, উপড়ে তোলা যায় সহজে। কিন্তু সন্ন্যাস অভিমান অশ্বত্থের মূল, কোনোক্রমে উৎপাটিত হয় না।’
প্রেমানন্দ স্বামী লিখছেন সাধুর এ-দোর ও দোর ঘোরা কি কম লাঞ্ছনা? সাধুগিরি হ্যাক-থু হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ধোঁকা কাটিয়ে দাও ঠাকুর, ধোঁকা কাটিয়ে দাও। আর না প্রভু, অনেক হয়েছে। সাধু হয়ে আবার ঘর-বাড়ি করে থাকা ঘোর বিড়ম্বনা, মহামায়ার বিষম প্যাঁচ।
যেখানেই আছ সেখানেই থাকো। দেহকে রথ, মনকে লাগাম, বুদ্ধিকে সারথি, ইন্দ্রিয়দের ঘোড়া ও বিষয়কে রাস্তা করো। আর জেনো আত্মাই হচ্ছে সেই রথের রথী।
জব্বলপুর থেকে এক ভদ্রলোক এসেছে। এম-এ পাশ পণ্ডিত। কাজেকাজেই ঘোরতর নাস্তিক। ঠাকুরের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিয়েছে। জীবনে অনেক অশান্তি, অনেক আঘাত, তবু মানবে না ঈশ্বরকে। ঈশ্বর যে আছে তার প্রমাণ কি।
‘তোমার কাছে প্রমাণ বলে যখন কিছু নেই, তখন নেই। কি আর করা! কিন্তু সামান্য তুমি একটু দয়া করতে পারো?” স্নিগ্ধ চোখে তাকালেন ঠাকুর।
‘কি, বলুন।’
‘এইটুকু অনুমান করতে পারো যে, যদি কেউ থাকে? কত কিছু রয়েছে তোমার চোখের বাইরে, তোমার জ্ঞান প্রমাণের বাইরে, তেমনি যদি ঈশ্বর বলে কেউ থাকে, এইটুকু মেনে নিতে পারো?
‘যদি কেউ থাকে?” ভদ্রলোক স্তব্ধ হয়ে ভাবলে কিছুক্ষণ। বললে, ‘বেশ এইটুকু আনতে পারি অনুমানে। তারপরে কী হবে?”
‘তারপরে তার কাছে প্রার্থনা করো।’ ঠাকুর শিখিয়ে দিলেন, ‘এইভাবে বলো, যদি ঈশ্বর বলে কেউ থাকো তো আমার কথা শোনো। আমার অশান্তি-আঘাত দূর করে দাও। তুমি যখন বলছ নেই তখন নেই। কিন্তু যদি কেউ থাকো, এইটুকু বলতে আপত্তি কি—’
ভদ্রলোক বললে, ‘না, এতে আর আপত্তি কি! আমি জানি ঘরে কেউ নেই। তবু ইতিমধ্যে যদি কেউ এসে থাকো, আমার কথা শোনো।’
‘হ্যাঁ, এমনি করেই করো প্রার্থনা। কদিন পর আবার এস আমার কাছে।
কদিন পর এল সেই ভদ্রলোক। ঠাকুরের পা ধরে কাঁদতে লাগল। বলল, ‘ঠাকুর, “যদি” আর নেই। “কেউ”-ও আর নেই। একমাত্র “আছেন,” তিনি আছেন, একজনই আছেন।’
‘লোকে ঈশ্বর মানবে না!’ বলছেন ঠাকুর, ‘যে মানুষ গলায় কাঁটা ফুটলে বেড়ালের পা ধরে, খেজুরগাছকে প্রণাম করে, তার আবার বড়াই, ঈশ্বর বিশ্বাস করবে না! কাপ্তেনকে তাই বললেন ঠাকুর, ‘তুমি পড়েই সব খারাপ করেছ। আর পোড়ো না।’ শব্দজাল না মহারণ্য। অনেক বাক্য নিয়ে মাথা ঘামিও না। জনককে বলেছিলেন যাজ্ঞবল্ক্য। ওতে লাভ আর কিছুই নেই, শুধু বাগিন্দ্রিয়ের ক্লান্তি।
আর নারদ কি বলছে? বলছে, কত তো পড়লাম, ঋগ্বেদ,যজুর্বেদ,সামবেদ,অথর্ববেদ। ইতিহাস,পুরাণ,ব্যকরণ,গণিত। দৈববিদ্যা,ভূবিদ্যা,তর্কশাস্ত্র,নীতিশাস্ত্র। নিরুক্ত, কল্প ছন্দ ভূততন্ত্র গারুড়তন্ত্র। ধনুর্বেদ, জ্যোতিষ নৃত্যগীতবাদ্য শিল্পবিজ্ঞান। কিন্তু কই, শান্তি কোথায়, সত্য কোথায়? শুধু কতগুলো শব্দের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছি।
সনৎকুমার উত্তর দিলেন: ‘যা কিছু অধ্যয়ন করেছ সব কতগুলি বুলি মাত্র।’
“শাস্ত্রের ভেতর কি ঈশ্বরকে পাওয়া যায়?’ বললেন ঠাকুর, ‘শাস্ত্র পড়ে “অস্তি” মাত্র বোঝা যায়। পাওয়া যায় একটু আভাসলেশ। বই হাজার পড়, মুখে হাজার শ্লোক আওড়াও, ব্যাকুল হয়ে তাঁতে ডুব না দিলে তাঁকে ধরতে পারবে না। পড়ার চেয়ে শোনা ভালো, শোনার চেয়ে ভালো হচ্ছে দেখা। কাশীর বিষয় পড়া, কাশীর বিষয় শোনা আর কাশী দেখা-অনেক অনেক তফাত। তাই বলি দেখবার জন্যে ডুব দাও। ডুব দেবার পর মনের অতলতলে তাঁকে দেখতে পাবে।’
চিঠির কথা আর চিঠি যে লিখেছে তার মুখের কথা-অনেক তফাত। শাস্ত্র হচ্ছে চিঠির কথা আর ঈশ্বরের বাণী হচ্ছে মুখের কথা। বললেন ঠাকুর, ‘আমি মা’র মুখের কথার সঙ্গে না মিললে শাস্ত্রের কথা লই না। বেদ-পুরাণ-তন্ত্রে কি আছে জানবার জন্যে হত্যে দিয়ে মাকে বলেছিলুম, আমি মুর্খ, তুমি আমায় জানিয়ে দাও ঐ সব শাস্ত্রে কি আছে। মা বললেন বেদান্তের সার ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যে। গীতার সার গীতা দশবার উচ্চারণ করলে যা হয়। অর্থাৎ ত্যাগী, ত্যাগী। যদি একবার ঈশ্বরের মুখের কথাটি শুনতে পাও দেখবে শাস্ত্র কোথায় কত নিচে তলিয়ে গেছে।’ তেমন-তেমন একটি মন্ত্র পেলে কি হবে শাস্ত্র দিয়ে?
‘কিবা মন্ত্ৰ দিলা গোঁসাই, কিবা তার বল
জপিতে জপিতে মন্ত্র করিল পাগল।’
শাস্ত্রপাঠ হয়নি কিন্তু সাধুসঙ্গ আছে। শুধু সাধুসঙ্গেই সর্বসিদ্ধি। আতরের দোকানে গেলে তুমি ইচ্ছে করো আর নাই-করো আতরের গন্ধ তোমার নাকে ঢুকবেই। একটা জীবন থেকে আরেকটা জীবনে তেমনি ভাবসংক্রমণ হবে, এক স্ফুলিঙ্গ থেকে আরেক বহ্নিকণা।
দ্বিজ প্রায়ই মাস্টারের সঙ্গে আসে। বয়স পনেরো-ষোলো। বাবা দ্বিতীয় পক্ষে বিয়ে করেছে, ছেলেকে দক্ষিণেশ্বরে যেতে দিতে নারাজ।
আরো দুটি ভাই আছে দ্বিজর। ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর ভায়েরাও আমাকে অবজ্ঞা করে?’
দ্বিজ চুপ করে রইল।
মাস্টার বললে, ‘সংসারে আর দু-চার ঠোক্কর খেলেই যাদের একটু-আধটু যা অবজ্ঞা আছে, চলে যাবে।’
‘বিমাতা তো আছে। ঘা তো খাচ্ছে মন্দ নয়।’ ঠাকুর একদৃষ্টে দেখছেন দ্বিজকে। বললেন, ‘এই ছোকরাই বা আসে কেন? অবশ্য আগেকার কিছু সংস্কার ছিল। তবে কি জানো? তাঁর ইচ্ছে। তাঁর হাঁ-তে জগতের সব হচ্ছে, তাঁর না-তে হওয়া বন্ধ হচ্ছে। মানুষের আশীর্বাদ করতে নেই কেন?’
‘মানুষের আশীর্বাদ করতে নেই?”
“না। কেননা মানুষের ইচ্ছায় কিছু হয় না। তাঁর ইচ্ছাতেই হয়-লয়।’
আবার দেখছেন দ্বিজকে। বলছেন, ‘যার জ্ঞান হয়েছে তার আবার নিন্দার ভয় কি! কামারের নেহাই, হাতুড়ির ঘা পড়ছে কত, কিছুতেই কিছু হয় না।’
দ্বিজ চলে গেলে আবার বলছেন তার কথা।
‘কি অবস্থা ছেলেটার। কেবল গা দোলায় আর আমার পানে তাকিয়ে থাকে। এ কি কম? সব মন কুড়িয়ে যদি আমাতে এল তা হলে তো সবই হল।’
সেদিন দ্বিজর সঙ্গে দ্বিজর বাপ এসেছে। আর ভাইয়েরাও। দ্বিজর বাপ হাইকোর্টের ওকালতি পাশ করে সদাগরী আফিসের ম্যানেজারি করছে।
‘আপনার ছেলে এখানে আসে, তাতে কিছু মনে কোরো না। আমি শুধু এইটুকু বলি চৈতন্যলাভের পর সংসারে গিয়ে থাকো। শুধু জলে দুধ রাখলে দুধ নষ্ট হয়ে যায়। মাখন তুলে জলের উপর রাখো, আর কোনো গোল নেই৷’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’ দ্বিজর বাপ সায় দিল।
“তুমি যে ছেলেকে বকো, তার মানে আমি বুঝেছি। তুমি ভয় দেখাও। তুমি ফোঁস করো। সেই ব্রহ্মচারী আর সাপের গল্প! জানো না?”
ঠাকুর গল্প ফাঁদলেন। রাখালেরা মাঠে গরু চরাচ্ছে। সেই মাঠে বিষধর এক সাপের বাসা। এক ব্রহ্মচারী একদিন যাচ্ছে ঐ মাঠ দিয়ে। রাখালেরা বললে, ঠাকুরমশাই যাবেন না ওদিকে। ওদিকে এক সর্বনেশে সাপ আছে ফণা তুলে। আমার ভয় নেই, আমি মন্ত্র জানি, বললে ব্রহ্মচারী। বলার সঙ্গে-সঙ্গেই সেই ফণা-মেলা সাপ তেড়ে এল ব্রহ্মচারীর দিকে। ব্রহ্মচারী মন্ত্র পড়ল। মন্ত্র পড়তেই কেঁচো হয়ে গেল সাপ। তুই কেন পরের হিংসে করে বেড়াস? ব্রহ্মচারী শাসালেন সাপকে। বললেন, আয় তোকে মন্ত্ৰ দি।
এই মন্ত্র জপ করলে তোর আর হিংসে থাকবে না। বলে চলে গেল ব্রহ্মচারী। সাপ মন্ত্র জপতে লাগল। তখন রাখালরা দেখলে, এ তো ভারি মজা, ঢেলা মারলেও সাপটা রাগে না। তখন একদিন একজন সাপটার ল্যাজ ধরে তাকে অনেক ঘুরপাক খাইয়ে আছড়ে ফেলে দিলে মাটির উপর। অচেতন হয়ে পড়ে রইল সাপ। রাখালেরা ভাবলে মরে গেছে। তাই মনে করে যে যার ঘরে ফিরে গেল। অনেক রাত্রে জ্ঞান ফিরে পেয়ে সাপ ঢুকল গিয়ে তার গর্তে। মার খেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে, এদিকে হিংসে করা বারণ, গর্ত’র বাইরে এসে খাবারের সন্ধান করে সাপ। কি আর খাবে। মাটিতে-পড়া ফল আর পাতা ছাড়া তার আর খাদ্য নেই। কিন্তু এ দিয়ে কি জীবনধারণ সম্ভব? একদিন এ মাঠ দিয়ে যাচ্ছে ফের ব্রহ্মচারী, ডাকলে সাপকে। ভক্তিভরে প্রণাম করে সাপ কাছে এল। কি রে কেমন আছিস? যেমন রেখেছেন। সে কি রে, এত রোগা হয়ে গেছিস কেন? লতা-পাতা খেয়ে কি করে আর মোটা হই? শুধু এইজন্যে? নিরামিষ খেলে কি রোগা হয়? দ্যাখ দেখি ভেবে আর কোনো কারণ আছে কিনা। আছে। সাপ তখন বললে রাখাল ছেলেদেব সেই আছড়ে মারার কথা। আমি যে অহিংসার মন্ত্র নিয়েছি, কাউকে যে কামড়াব না তা তারা কেমন করে জানবে? তুই কী অসম্ভব বোকা। ব্রহ্মচারী ধমকে উঠল। নিজেকে রক্ষা করতে জানিস না? আমি তোকে কামড়াতেই বারণ করেছি, ফোঁস করতে বারণ করিনি। তুই ফোঁস করে ওদের ভয় দেখালিনে কেন?
‘তুমিও তেমনি শুধু ফোঁস করো ছেলেকে, কামড়াও না নিশ্চয়ই।’
দ্বিজর বাপ হাসছে।
‘শোনো, ভালো ছেলে হওয়া বাপের পুণ্যের চিহ্ন।’ বললেন ঠাকুর, ‘যদি পুকুরে ভালো জল হয় সেটি পুকুরের মালিকের পুণ্যের চিহ্ন, তাই না?”
হুঁ দিয়ে যাচ্ছে দ্বিজর বাপ।
‘শোনো, এখানে এলে-গেলেই ছেলেরা জানতে পারবে বাপ আসলে কত বড় বস্তু। বাপ-মাকে ফাঁকি দিয়ে যে ধর্ম করবে তার ছাই হবে।’ পুরোনো কথা মনে পড়ে গেল ঠাকুরের: ‘আমি মা’র কথা ভেবে থাকতে পারলাম না বৃন্দাবনে। যেই মনে পড়ল মা দক্ষিণেশ্বরে কালীবাড়িতে আছেন, অমনি মন হুহু করে উঠল। বৃন্দাবন অন্ধকার দেখলাম। আমি বলি সংসারও করো আবার ভগবানে মন রাখো। সংসার ছাড়তে বলি না। এও করো ওও করো।’
দ্বিজর বাপ এতক্ষণে মুখ খুলল। বললে, ‘আমি বলি পড়াশোনা তো চাই। ছেলেদের সঙ্গে ইয়ারকি দিয়ে সময় না কাটায়। এখানে আসতে কি আর আমি বারণ করি?’
‘আর জোর করেই কি তুমি বারণ করতে পারবে? যার যা আছে তাই হবে।’
আবার হুঁ দিল দ্বিজর বাপ।
মাদুরের উপর বসেছেন সবাই। কথা বলছেন আর মাঝে-মাঝে দ্বিজর বাপের গায়ে হাত দিচ্ছেন ঠাকুর। দ্বিজর বাপের গরম লাগছে। নিজে হাতে করে তাকে পাখা করছেন ঠাকুর।
দ্বিজর দিদিমা ঠাকুরকে দেখতে এসেছেন অসুখ শুনে।
‘ইনি কে?’ জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর, ‘যিনি মানুষ করেছেন দ্বিজকে? আচ্ছা, দ্বিজ নাকি একতারা কিনেছে? সে আবার কেন?’
মাস্টার বললে, ‘ঠিক একতারা নয়, ওতে দুই তার আছে।’
‘কেন, কি দরকার? একে তো তার বাপ বিরুদ্ধে, তায় ফের জানাজানি করে লাভ কি? ওর পক্ষে গোপনে ডাকাই ভালো।’
গোপনে-গোপনে শয়নে স্বপনে যে তোমাকে ডাকছি জানতে দেব না কাউকে। হৃদয়ে তুমি যে তোমার রাঙা রাখীর ডোরটি বেঁধে দিয়েছ বাইরে থেকে কেউ তা জানতে পাবে না। তোমার সঙ্গে আমার প্রেম সংসার নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। সংসারকে ফাঁকি দেব, সিদ্ধ হব এই নিষিদ্ধ প্রেমে। তখন এই সংসারই হবে আমাদের মিলনমালঞ্চ। জলেস্থলে এত যে শোভা-সৌন্দর্য ছড়িয়ে রেখেছ এ আমাদেরই প্রেমের মুগ্ধ দৃষ্টি। ভুবনচরাচর আমাদেরই মহোৎসব-সভা।
অগাধজলসঞ্চারী রোহিত হও, গণ্ডুষজলে সফরী হয়ো না।
সেই রাজকুমারীর গল্পটি শোনো:
ভক্তিমতী রাজবালা, রামময়জীবিতা, কিন্তু তার রাজকুমার স্বামী ভুলেও রাম-নাম উচ্চারণ করবে না। তাতে রাজকুমারীর বড় দুঃখ। কত অনুরোধ স্বামীকে, একবার রাম-নাম বলো, স্বামী নিরুত্তর। স্বয়ং রামচন্দ্রের কাছে কাতর প্রার্থনা জানায় রাজকুমারী। স্বামীকে সুমতি দাও, তাঁর জিভে একবার তোমার নামময় প্রদীপটি জ্বেলে দাও। এমনিতে মলিন মুখ রাজকুমারীর, হঠাৎ সেদিন, বলা-কওয়া নেই, সকাল হতেই রাজকুমারী উৎফুল্ল। দেওয়ানকে খবর দিল, আজ নগরময় আনন্দোৎসব হবে, অগণন ব্রাহ্মণভোজন, অগণন ভিখারী-বিদায়। সত্বর সব ব্যবস্থা করুন। কারণ কি জানতে পাই? মিনতি করল দেওয়ান। আমার হুকুম। গম্ভীর হল রাজকুমারী। রাজকুমার বললে, এ কি সমারোহ। এত ঘটা-ছটা কিসের জন্যে? প্রথমে রাজকুমারী বলতে চায় না, শেষে অনেক সাধ্যসাধনার পর বললে, জানো আজ আমার কত বড় শুভদিন! কাল রাত্রে স্বপ্নে তুমি একবার রাম নাম করে ফেলেছ। এতদিন যে নাম শত অনুরোধেও উচ্চারণ করোনি, ঘুমঘোরে সে নাম তোমার মুখ থেকে স্খলিত হয়েছে। তাই এই উৎসবের আয়োজন। বিমূঢ়ের মত, হৃতসর্বম্বের মত তাকিয়ে রইল রাজকুমার। বেদনার্ত কণ্ঠে বললে, কি নাম রাম নাম। বলে ফেলেছি? মুখ থেকে বেরিয়ে গিয়েছে? রাজকুমার আর্তনাদ করে উঠল, যে ধন হৃদয়ের মধ্যে এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলাম তা বেরিয়ে গিয়েছে? বলতে-বলতেই মূর্ছিত হয়ে পড়ল। রাজকুমারী দেখল, নাম-পাখি উড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই স্বামীর দেহপিঞ্জর শূন্য! তাই যত্ন করে লুকিয়ে রাখো। শুধু সে দেখে আর তুমি দেখো।
আমার সকল জল্পনা তোমার নামজপ, আমার সকল শিল্পকর্ম তোমারই মুদ্রারচনা। আমার ভ্রমণ তোমাকে প্রদক্ষিণ, আমার ভোজন তোমাকে আহুতিদান। আমার শয়ন তোমাকে প্রণাম, তোমাকে আত্মসমর্পণই আমার অখিলসুখ। আমার সকল চেষ্টা তোমারই পূজাবিধি।
আমি স্বভাবতই কামাসক্ত, আমাকে আর প্রলুব্ধ কোরো না বর দিয়ে। কামাসক্তির ভয়েই তো তোমার কাছে আশ্রয় নিয়েছি। আমার মধ্যে সত্যিকার ভৃত্যের লক্ষণ আছে কিনা পরীক্ষা করে দেখবার জন্যেই তুমি আমাকে কামপ্রবৃত্ত করছ। নতুবা হে অখিলগুরু, তুমি করুণাময়, তোমার কেন এই কঠোরতা? যে তোমার কাছে বর চায় সে ভৃত্য নয়, সে বণিক। এই বাণিজ্যবুদ্ধি থেকে মুক্তি দাও আমাকে। আমি তোমার অকামসেবক তুমি আমার নিরভিপ্রায় প্রভু। হে সর্বকামদ, যদি নিতান্তই আমাকে বর দেবে তবে এই বর দাও যাতে কাম না অঙ্কুরিত হয় হৃদয়ে।
তোমার কথা অমৃতস্বরূপ। সন্তপ্তজনের প্রাণদাতা। সর্ব পাপনাশী। শ্রবণমঙ্গল। সর্বশ্রীবর্ধক। যাঁরা তোমার নাম কীর্তন করেন তাঁরা বহুদাতা।
তুমি বিশ্বমঙ্গল মহৌষধি।
৩৭
ঠাকুর অসুখে পড়লেন। গলায় ব্যথা।
‘বড় গরম পড়েছে।’ বললেন মাস্টারকে: ‘একটু একটু ববফ খেয়ো। মৃদু-মৃদু হাসল মাস্টার।
‘গরমে আমারো বাপু বড় কষ্ট হচ্ছে। তা বরফ খেয়েই বা বিশেষ লাভ কি। এই দেখ না, কুলপি বরফ বেশি একটু খাওয়া হয়েছিল, গলায় এখন বিচি হয়েছে।’
এই প্রথম সূত্রপাত অসুখের।
‘মাকে বলেছি, মা, ব্যথা ভালো করে দাও, আর কুলপি খাব না।’
‘শুধু কুলপি?’
‘না। আবার বলেছি, মা বরফও খাব না আর। যেকালে বলেছি একবার মাকে, আর খাব না কোনোদিন। জানো,’ সরলস্বভাব বালকের মত বললেন, ‘মাঝে-মাঝে এমন হঠাৎ ভুল হয়ে যায়। সেদিন বলেছিলাম মাছ খাব না রোববার, কিন্তু জানো, ভুলে খেয়ে ফেলেছি।’
মৃদু-মৃদু হাসল মাস্টার।
‘কিন্তু জানো,’ গম্ভীর হলেন ঠাকুর: ‘জেনে-শুনে হবার যো নেই।’
কলকাতা থেকে হঠাৎ একজন ভক্ত এসে উপস্থিত। সঙ্গে বরফ নিয়ে এসেছে ঠাকুরের জন্যে।
কৌতূহলী হয়ে তাকালেন মাস্টারের দিকে। ছেলেমানুষ যেমন করে তাকায় লোভালু চোখে। জিজ্ঞেস করলেন, ‘হ্যাঁগা, খাব কি?’
মাস্টার চুপ করে রইল।
‘হ্যাঁগা, বল না, খাব কি?’ আবার জিজ্ঞেস করলেন বালকের মত।
‘আজ্ঞে,’ মাস্টার বললে কুণ্ঠিত হয়ে, ‘মাকে জিজ্ঞেস করে নিন। যদি তিনি না করেন খাবেন না।’
খেলেন না ঠাকুর।
এমনি বালকস্বভাব। এমনি সর্ব বন্ধনহীন সর্বানন্দ।
স্টারে দক্ষযজ্ঞ দেখতে গিয়েছেন। সঙ্গে রামলাল। কিছু খেয়াল নেই, যে পথে মেয়েরা ঢোকে সেই পথে এসে পড়েছেন। এতটুকু পিছিয়ে যাবার চেষ্টা নেই। যে মেয়েটিকে কাছে পেলেন তাকেই ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওগো গিরিশকে একবার ডেকে দাও না।
গিরিশের নিমন্ত্রণেই এসেছেন। চৈতন্যলীলার পর এবার দক্ষযজ্ঞ। কৃষ্ণকীর্তনের পর শিববন্দনা। নবীননীরদশ্যামল কৃষ্ণ আর শঙ্কস্ফটিকসঙ্কাশ শিব।
কে এসে পড়েছেন নিভৃত প্রকোষ্ঠে জানে না হয়তো মেয়েটি। একচক্ষে তাকিয়ে রইল। পর্বতের মধ্যে মহামেরু নক্ষত্রের মধ্যে চন্দ্রমা, কে তুমি।
‘বলো গে দক্ষিণেশ্বর হতে সব এসেছে।’
পড়িমরি করে ছুটে এসেছে গিরিশ। ছুটে এসেই লুটিয়ে পড়ল পায়ের উপর। ‘ওঠো গো ওঠো। জামায় যে ময়লা লাগল।’
‘ময়লা লাগল, না, ময়লা গেল?’ মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললে উদ্দীপ্ত হয়ে, ‘সবাইকে ডাক। পায়ে লুটিয়ে পড়, লুটিয়ে পড়। মহা ভাগ্য তোদের, তিনি পথ ভুলে এসে পড়েছেন, ওরে, এমন সুযোগ আর পাবিনে–
কে কোথায় সাজগোজ করছিল, সব ফেলে রেখে ছুটে এল। প্রণাম করতে লাগল একে-একে।
এ কি সেই ভুবনভয়ভঙ্গ চতুর্বর্গবদান্য শিব নয়?
‘ওঠো ওঠো মায়েরা, আনন্দময়ীরা।’ মুক্তহস্তে ঠাকুর কৃপাবর্ষণ করতে লাগলেন, ‘নেচে গেয়ে অভিনয় করে সর্বজীবকে আনন্দ দিচ্ছ, নিত্য বসতি করো এই আনন্দে। যাও, এইবার সাজগোজ সেরে নামো গে—’
দক্ষ সেজেছে গিরিশ। হুঙ্কার দিয়ে লাফিয়ে পড়ল স্টেজে। বীরদর্পে ঘোষণা করল: ‘শিবনাম ঘুচাইব ধরাতল হতে।’
বালকের মত বিস্ময়বিহ্বল চোখে দেখছেন সব ঠাকুর। গিরিশের কথা শুনে লাফিয়ে উঠলেন ঠাকুর: ‘ওরে রামলাল, এ শালা আবার বলে কি রে–
বলে কিনা শিবনাম ঘোচাবে! এত দিন ধরে তবে ওকে শেখালাম কি!
‘ও কথা গিরিশ বলছে না, দক্ষ বলছে।’
‘গিরিশ বলছে না?’ যেন অবাক হলেন ঠাকুর।
‘না, ওটা দক্ষের কথা।’
গিরিশ আর দক্ষ যে আলাদা এ ভেদ ভুলে গিযেছেন। যে পোশাকেই এসে দাঁড়াক, যে অবস্থাতেই, গিরিশ সব সময়েই গিরিশ।
এই বালকস্বভাব। রাজার পার্টে বাপ অভিনয় করছে, মা’র কোলে বসে দেখছে তার ছোট ছেলে। মা, বাবা আবার কখন আসবে, কোন দৃশ্যে, এই শুধু তার জিজ্ঞাসা। রাজার আবির্ভাবের কথা নিয়ে সে মাথা ঘামায় না। নাটকে আছে বিদ্রোহী সেনাপতি রাজাকে হঠাৎ অস্ত্রাঘাত করে বসবে। সেই দৃশ্যে যেমনি সেনাপতি রাজাকে তলোয়ারের ঘা দিল ছোট ছেলে মা’র কোলে বসে কেঁদে উঠল, মা, বাবাকে মারলে। ওটা যে রাজার উপর আঘাত তা কে বোঝায় সেই ছেলেকে। তার চোখে রাজা নেই, শুধু তার বাবা। তেমনি ঠাকুরের চোখে দক্ষ নেই, শুধু গিরিশ। যে গিরিশ ভক্তভৈরব, সে শিবনাম উচ্চারণ করবে না’–
‘ভয় নেই, দক্ষ মানে গিরিশ আবার বলবে শিবনাম।
বলবে তো দেখিস। যেন আশ্বস্ত হলেন। দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন, বসলেন আবার চেয়ারে।
সেবার গিয়েছিলেন প্রহ্লাদ চরিত্র দেখতে। গিরিশকে বললেন, ‘বা, তুমি বেশ লিখেছ।
‘লিখেছি মাত্র। গিরিশ বললে বিনীত ভাবে, কিন্তু ধারণা কই–
ধারণা না হলে কি এত সব লেখা যায়? ভিতরে ভক্তি না থাকলে আঁকা যায় কি চালচিত্র?
প্রহ্লাদ পড়তে এসেছে পাঠশালায়। তাকে দেখে ঠাকুরের আহ্লাদ আর ধরে না। সস্নেহে তাকে ডেকে উঠলেন প্রহ্লাদ বলে। বলতে বলতে সমাধিস্থ।
হাতির পায়ের নিচে ফেলেছে প্রহ্লাদকে। ঠাকুর কাঁদতে শুরু করলেন। ফেলেছে অগ্নিকুণ্ডে। আবার কান্না। গোলোকে লক্ষ্মীনারায়ণ বসে আছেন প্রহ্লাদের প্রতীক্ষায়। ঠাকুর আবার সমাধিস্থ।
অসুরদের পুরোহিত শুক্রাচার্য। তার দুই ছেলে, ষণ্ড আব অমর্ক। প্রহ্লাদের দুই মাস্টার। অসুররাজ বিষ্ণুশত্রু হিরণ্যকশিপু ছেলের পড়াশোনা নিয়ে আর ভাবে না, যোগ্য হাতেই তাকে সমর্পণ করা হয়েছে। একদিন গৃহাগত ছেলেকে কোলে নিয়ে হিরণ্যকশিপু জিজ্ঞেস করলে, যা যা এত দিন শিখলে তার মধ্যে তোমার সবচেয়ে কী ভালো মনে হল? প্রহ্লাদ বললে, বাবা, এই অন্ধকূপ সংসার ত্যাগ করে বনে গিয়ে শ্রীহরির আশ্রয় গ্রহণ করার কথাটিই সবচেয়ে ভালো, সবচেয়ে সুখময় মনে হয়েছে।
কোল থেকে নামিয়ে দিল ছেলেকে। গুরুরা টেনে নিয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে, প্রহ্লাদ, এ তুমি নিজের থেকে বললে, না, আর কেউ তোমাকে শিখিয়ে দিয়েছে?
আর কেউ শিখিয়ে দিয়েছে। স্মিতহাস্যে বললে প্রহ্লাদ। যিনি শিখিয়ে দিয়েছেন, যাঁর আকর্ষণে আমার এই মতি হয়েছে, তিনিই শ্রীহরি শ্রীবিষ্ণু। তর্জন-গর্জন দণ্ড-বেত্র বহু শাসন-পীড়ন শুরু করল মাস্টাররা। নতুন করে শেখাল সব জাগতিক কর্মকাণ্ডের কথা। আবার নিয়ে এল বাপের কাছে। এইবার বলো সর্বোত্তম কী তুমি শিখে এলে? পিতাকে বন্দনা করে প্রহ্লাদ বললে, নবলক্ষণা শিখে এসেছি। নবলক্ষণা? হ্যাঁ, শ্রবণ কীর্তন স্মরণ পাদসেবন অৰ্চন বন্দন দাস্য সখ্য আত্মনিবেদন। এই নবলক্ষণা ভক্তি বিষ্ণুকে অর্পণ করাই সর্বোত্তম শিক্ষা।
এবার দৈত্যরাজ ক্ষেপে গেল মাস্টারদের উপর। এই মারে তো সেই মারে। ষণ্ড-অমর্ক বলে, প্রভু এই শিক্ষা আমরা দিইনি। আর কেউও দেয়নি। এ বুদ্ধি ওর স্বভাবজ। প্রহ্লাদও সায় দিল, বললে, বাবা, সাধ্য নেই বিষয়াসক্ত স্বয়ংবদ্ধ জীব শ্রীকৃষ্ণে মতি জন্মায়। এ মতির দাতা তিনিই।
মাটিতে ছুঁড়ে ফেলল ছেলেকে। সবলে লাথি মারল হিরণ্যকশিপু। অসুরদের বললে, শিগগির একে বধ করো। মাত্র পাঁচ বছরের শিশু এ কিনা আমার পরমশত্রু বিষ্ণুর সেবক। দুষ্ট অঙ্গের মতন এ পরিত্যাজ্য। তীক্ষ শূলে প্রহ্লাদকে বিদ্ধ করল অসুরেরা। উপবাস করিয়ে রাখো। সাপ দিয়ে দংশন করাও। হাতির পায়ের নিচে ফেল। ফেল তপ্ত কটাহে। পর্বতশৃঙ্গ থেকে নিক্ষেপ করো। পরব্রহ্মে সমাহিত প্রহ্লাদকে কে স্পর্শ করে! সব চেষ্টা নিষ্ফল হল। মহা ভাবনায় পড়ল হিরণ্যকশিপু।
প্রভু, আপনি ত্রিজগৎবিজয়ী, বললে ষণ্ড-অমর্ক, ছোট একটা ছেলের জন্যে কেন ভাবছেন? পিতা শুক্রাচার্য শিগগিরই ফিরে আসছেন, যতদিন না আসেন ততদিন আমাদের কাছে ওকে পাশবদ্ধ করে রেখে যান, দেখি আরেকবার চেষ্টা করে।
দেখ। যারা খেলা করে বেড়ায় সে সব ছেলেদের দলে ভিড়িয়ে দাও৷
আবার শুরু হল নতুন প্রয়াসের পরিচ্ছেদ। পড়াশোনা যখন বন্ধ থাকে তখন দল পাকিয়ে আসে সব সমবয়সীরা। হেলাফেলার খেলায় ডাক দেয়।
প্রহ্লাদ বললে, মনুষ্যজন্ম দুর্লভ। মনুষ্যজন্মেই পুরুষার্থ সাধন। কিন্তু মনুষ্যজন্মও নশ্বর, অধ্রুব। সুতরাং বাল্যেই ভাগবত ধর্মের আচরণ করবে।
এ আবার কেমনতরো কথা।
হ্যাঁ, বিষ্ণুই সর্বভূতের আশ্রয়, সকলের প্রিয়, সকলের বান্ধব স্বরূপ। আয়ু বড়জোর একশো বছর। তার আদ্ধেক যাচ্ছে ঘুমে। কুড়ি বছর অনর্থক ক্রীড়ায়। কুড়ি বছর জরাজনিত অক্ষমতায়। বাকি সময় যাচ্ছে স্ত্রী-পুত্র-বিষয়ভোগের আসক্তিতে। ত্রিতাপে জর্জরিত হয়ে। কেশকার কীট যেমন নিজের জালে বদ্ধ তেমনি। কামিনীর ক্রীড়ামৃগ, সন্তানের শৃঙ্খলরজ্জু। হে দৈত্যবালকগণ, মুকুন্দশরণাগতি ও তাঁর পদসেবাই এই ক্লেশক্লেদ থেকে মুক্তি আর মঙ্গলের উপায়।
প্রহ্লাদ এত কথা জানলে কি করে? বলাবলি করতে লাগল ছেলেরা।
যতদিন মাতৃগর্ভে ছিলাম নারদ আমাকে ভক্তিতত্ত্ব উপদেশ দিয়েছেন। সেই স্মৃতি ত্যাগ করেনি আমাকে। হে বয়স্যগণ, আমার বাক্যে শ্রদ্ধা করো, বালকেরও ভাগবতী মতি জন্মাতে পারে। বয়স বা বিকার দেহের, আত্মার নয়। খনি খুঁড়ে যেমন সোনা, তেমনি এই দেহক্ষেত্রেই আত্মযোগের দ্বারা ব্রহ্মত্বলাভ৷
‘প্রহ্লাদচরিত্র’ প্লে হবার পর ‘বিবাহবিভ্রাট’ হবে। গিরিশ ঠাকুরকে বলছে শুনে যেতে।
‘না, প্রহ্লাদের পর আবার ওসব কি! গোপাল উড়ের দলকে তাই বলেছিলাম, শেষে কিছু ঈশ্বরীয় কথা বোলো। বেশ ভগবানের কথা হচ্ছিল, শেষে কিনা বিবাহবিভ্রাট, সংসারের কথা। কি লাভ হল? যা ছিলাম তাই হলাম।’
‘থাক তবে। কিন্তু কেমন দেখলেন প্রহ্লাদচরিত্র?’
‘দেখলাম তিনিই সব হয়েছেন। মেয়েরা আনন্দময়ী মা, এমনকি গোলোকে যারা রাখাল সেজেছে তারাও সাক্ষাৎ নারায়ণ। ঈশ্বরদর্শনের লক্ষণ কি? একটি লক্ষণ আনন্দ। নিঃসঙ্কোচ আনন্দ। যেমন সমুদ্র। উপরে হিল্লোলকল্লোল, নিচে স্থির জল গভীর জল। কখনো বালকের ভাব। আঁট নেই, যেমন কাপড় বগলে করে বেড়ায়। কখনো পৌগণ্ড ভাব, ফস্টিনস্টি করে। কখনো যুবার ভাব, যখন কর্ম করে, লোকশিক্ষা দেয় তখন সিংহতুল্য।’
ঈশ্বর নিজেই যে বালক। তাই তো বালক ভাবটি এত মধুর! এত আত্মীয়!
ছোট তক্তপোশের উপর মুখখানি চুন করে বসে আছেন। ব্যথা বেড়েছে। গলায় কে ডাক্তারি প্রলেপের পোঁচ দিয়েছে। চারদিকে ভক্তদের কড়া নিষেধ। যেন মুক্ত হরিণকে বেঁধেছে দড়ি দিয়ে। রুগ্ন ছেলেটির মুখের মতই মুখখানি করুণ।
সব চেয়ে কঠিন কথা, কথা বলা যাবে না।
‘কথা একেবারে বন্ধ করলে চলে কি করে?” প্রতিবাদ করছেন ঠাকুর: ‘কত লোক কত দূর থেকে আসছে, একটা কথাও শুনে যাবে না?’
‘কি দরকার! আপনাকে দেখলেই আনন্দ।’ কে একজন ভক্ত বললে।
‘তুই বললেই হল? দেখেই সব, কথায় কিছু নেই? তোর তো দেখে আনন্দ, কিন্তু আমার আনন্দ যে বলে।
মাগো, যত সব এঁদো, রোথো লোক আনবি, এক সের দুধে পাঁচ সের জল, আমি কত আর ফুঁ দিয়ে জ্বাল ঠেলব? আমার চোখ গেল, হাড় মাস মাটি হল, আমাকে রেহাই দে। অত আমি করতে পারব না। আমার কী দায় পড়েছে! তোর শখ থাকে তুই করগে যা। বেছে বেছে সব ভালো লোক আনতে পারিস না, যাদের দু-এক কথা বললেই হবে। এ যে একেবারে বাজে লোকের ভিড় লাগিয়ে দিয়েছিস। লোকের ভিড়ে আমার নাইবার খাবার সময় নেই। এই তো একটা মাত্র ফুটো ঢাক, রাতদিন বাজালে কদিন আর টিঁকবে বল?
গলা দিয়ে রক্ত বেরুল ঠাকুরের।
একটি ভক্ত মেয়ে চলেছে ঠাকুরের কাছে। ওগো, তোর হাত দিয়ে যদি একট দুধ পাঠাই নিয়ে যাবি ঠাকুরের জন্যে? শুধোলে তাকে তার প্রতিবেশিনী।
দক্ষিণেশ্বরে আবার দুধের অভাব! ঠাকুরের জন্যে কত বরাদ্দ দুধ, কত-বা নৈবেদ্য-নিবেদন। নিতে রাজী হয় না ভক্ত মেয়ে।
শুধু এক ঘটি দুধ! নিয়ে যা। ঠাকুরকে খাইয়ে আয়৷
হাতে করে ঘটি বয়ে যেতে পারব না বাপু। অনেকটা রাস্তা।
অনুনয় শুনল না। খালি হাতেই গেল দক্ষিণেশ্বর। দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে শুনল দুধ-ভাত ছাড়া আর কিছু মুখে উঠছে না ঠাকুরের। আর এমন দুর্দৈব, আজ সব ভক্তকে মেলাবার জন্যেই তো ঠাকুরের অসুখ। এক সুতোয় গাঁথবার জন্যে। এক মন্ত্রে উজ্জীবিত করার জন্যে।
সে মন্ত্রটি কি?
সে মন্ত্র সেবা।
ওরে শুধু আমার সেবা নয়, সমস্ত মানুষের সেবা। শিবজ্ঞানে জীবসেবা। ওরে মানুষের মৈত্রী, মানুষের কল্যাণ। মানুষের চেয়ে বড় সত্য আর কিছু নেই। মহাভারতে ভীষ্মের কথা মনে কর, ন মানুষাৎ শ্রেষ্ঠতরং হি কিঞ্চিৎ।
হরি, আমাকে বিনামূল্যে পার করে দাও। এই বিনামূল্যটিই প্রেম। আর, পার হতে চাওয়া সমস্ত অহঙ্কারের বিচ্ছেদ উত্তীর্ণ হয়ে মানুষের মৈত্রীতে প্রসারিত হওয়া। ওরে মানুষের মধ্যেই এই ঠাকুর। পরমপুরুষ ব্রহ্মবিদ। প্রেমই ব্রহ্মবিহার। তুই ধর্ম দিতে যাস নেবে না, আদর্শের সঙ্গে আদর্শের সঙ্ঘাত হবে। কিন্তু মৈত্রী দিতে যাস নেবে পাত্র পরিপূর্ণ করে। মিত্রের অনুরাগপূর্ণ দৃষ্টিতে সকলকে দেখ, সকলেও সেই সাহ্লাদদৃষ্টিটি প্রত্যর্পণ করবে।
আমরা ভদ্র শুনব, ভদ্র দেখব, ভদ্রে প্রেরিত হব। আমাদের চিন্তা কল্যাণ, দর্শন কল্যাণ, কর্মও কল্যাণ।
মানবসেবাই মাধবসেবা।
.
৷৷ তৃতীয় খণ্ড সমাপ্ত ৷৷
তৃতীয় খণ্ড লিখতে নিম্নলিখিত পুস্তকাবলীর উপর নির্ভর করেছি
স্বামী সারদানন্দকৃত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ
শ্রীম-কথিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত
অক্ষয়কুমার সেন প্রণীত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-পুঁথি
উদ্বোধন-প্রকাশিত শ্রীশ্রীমায়ের কথা
ব্রহ্মচারী অক্ষয়চৈতন্যকৃত শ্রীশ্রীসারদা দেবী
শ্রীমহেন্দ্রনাথ দত্ত লিখিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ অনুধ্যান
বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল প্রণীত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলামৃত
স্বামী জগদীশ্বরানন্দকৃত নবযুগের মহাপুরুষ
শ্রীচন্দ্রশেখর চট্টোপাধ্যায় রচিত শ্রীশ্রীলাটু মহারাজের স্মৃতিকথা
উদ্বোধন-প্রকাশিত স্বামী ব্রহ্মানন্দ
শ্রীকমলকৃষ্ণ মিত্র প্রণীত শ্রীরামকৃষ্ণ ও অন্তরঙ্গ প্রসঙ্গ
লক্ষ্মীদেবী ও যোগীন্দ্রমোহিনী বিশ্বাসকৃত শ্রীরামকৃষ্ণস্মৃতি
শ্রীপ্রমথনাথ বসু রচিত স্বামী বিবেকানন্দ
বিবেকানন্দের পত্রাবলী
স্বামী ওঙ্কারেশ্বরানন্দকৃত প্রেমানন্দ জীবনচরিত
শিবনাথ শাস্ত্রী লিখিত আত্মচরিত
শিবনাথ শাস্ত্রী লিখিত মেন আই হ্যাভ সিন
স্বামী গম্ভীরানন্দ রচিত শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তমালিকা
অশ্বিনীকুমার দত্ত লিখিত ভক্তিযোগ
শ্রীকুমুদবন্ধু সেন প্রণীত গিরিশচন্দ্র ও নাট্যসাহিত্য
Life of Sri Ramakrishna (Advaita Ashrama)
শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র সেনগুপ্তকৃত শ্ৰীশ্ৰীলক্ষীমণি দেবী
শ্রীচিরঞ্জীব শর্মা লিখিত কেশবচরিত
