পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩.২০

২০

শ্রীমা’র কাছে নবতখানায় বসে জপ করছে গোপালের মা। জপ সাঙ্গ করে প্রণাম করে উঠছে, ঠাকুরের সঙ্গে দেখা। ফিরছেন পঞ্চবটীর ধার থেকে, দেখা হতেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি এখনো এত জপ করো কেন?”

‘জপ করব না?’ বিহ্বলের মত তাকিয়ে রইল গোপালের মা। ‘আমার কি সব হয়েছে?”

‘সব হয়েছে।’

‘বলো কি?’ যেন ঠাকুর বললেও বিশ্বাস করা যায় না।

‘তোমার নিজের জন্যে সব হয়ে গেছে। তবে,’ নিজের শরীরের প্রতি ইশারা করলেন: ‘তবে যদি এই শরীরটা ভালো থাকবে বলে করতে চাও তো কোরো।’

তবে তাই হোক। আর নিজের জন্যে নয়। যা করব এবার থেকে সব তোমার, তোমার জন্য।

থলে-মালা গঙ্গায় ফেলে দিল গোপালের মা। হাতেই জপ করতে লাগল। তারপর কি ভেবে আবার একটা মালা নিলে। নিজের জন্যে নয়, গোপালের কল্যাণে মালা ফেরাই।

কিন্তু কই আগের মতন তো গোপাল দর্শন হয় না যখন-তখন। যখন দেখে রামকৃষ্ণ-মূর্তিই দেখে, কোথায় সেই বালকের বেশ! দু জানু আর এক হাত মাটিতে আরেক হাতে নবনীভিক্ষা। কোথায় সেই দুটি আহ্লাদবিহ্বল দৃষ্টি!

একদিন এসে কেঁদে পড়ল ঠাকুরের কাছে। ‘গোপাল, তুমি আমার এ কি করলে? আমার কি অপরাধ হল, কেন আমি আর তোমাকে আগের সেই গোপালমূর্তিতে দেখি না?’

‘সর্বক্ষণ ও রূপ দর্শন করলে কলিতে শরীর থাকে না।’

‘আমার শরীর দিয়ে কি হবে?”

না, তুমি বাৎসল্যরতির উদাহরণ, লোকহিতের জন্যে থাকো তুমি সংসারে। সংসার-বাসিনীরা বুঝুক শিশু সেবার মধ্যেই ঈশ্বরসেবা।

কার মুখখানি মনে পড়ে গা? সংসারে কাকে বেশি ভালোবাসো? একটি ভক্তমেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।

‘ছোট একটি ভাইপোকে।’

‘আহা, তবে তাকেই গোপাল ভেবে খাওয়াও পরাও, সেবা করো। তার মধ্যে গোপাল-রূপী ভগবানকে দেখ। মানুষ ভেবে করবে কেন? ভগবান ভেবে করবে। যেমন ভাব তেমন লাভ।

বলরাম বোসের বাড়িতে এসেছেন ঠাকুর। রথের সময়। বার-বাড়ির দোতলায় চক-মিলান বারান্দায় রথ টানবেন ঠাকুর। কীর্তন করবেন। কিন্তু, কত লোক এসেছে, সে কই?

‘ওগো সেই যে কামারহাটির বামুনের মেয়ে। যার কাছে গোপাল হাত পেতে খেতে চায়। সেদিন কি দেখে-শুনে প্রেমে উন্মাদ হয়ে আমার কাছে উপস্থিত। খাওয়াতে-দাওয়াতে একটু ঠাণ্ডা হল। কত থাকতে বললাম কিছুতে থাকলো না। যাবার সময়ও তেমনি উন্মাদ। গায়ের কাপড় মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। হুঁশ নেই। ওগো তাকে একবার আনতে পাঠাও না?’

কামারহাটিতে লোক পাঠালো বলরাম।

সন্ধ্যা হয়-হয় ঠাকুরের ভাবাবেশ হল। মরি মরি, বালগোপালের ভাব। হামা দিচ্ছেন দুই জানু আর এক হাতে। অন্য হাত সামনে বাড়িয়ে দিয়ে চেয়ে আছেন ঊর্ধ্বমুখে। মা যশোদা, ননী দে।

স্নেহগলিতা যশোদা শিশু কৃষ্ণকে স্তন্য দিচ্ছেন। হঠাৎ শিশু হাই তুলল। পুত্রের মুখবিবরে যশোদা দেখল স্থাবরজঙ্গম-জ্যোতিষ্ক-সমন্বিত সমগ্র বিশ্ব।

আরেক দিন। বলরাম এসে নালিশ করলে মা’র কাছে। মা, কৃষ্ণ মাটি খেয়েছে। না মা, খাইনি মাটি। বিশ্বাস হচ্ছে না? এই দেখাচ্ছি তবে হাঁ করে। এ কি স্বপ্ন না দেবমায়া? মুখবিবরে আবার সেই বিশ্বরূপ।

হোক মায়া, তবু সেই আমার একমাত্র আশ্রয়। যশোদা ভাবলেন মনে-মনে, এই আমি, এই আমার পতি, এই আমার পুত্র, এই গোপ-গোপী-গোধন সকল আমার এ কুমতি যার মায়াবশে হয়েছে সেই আমার পরমগতি, পরমমতি।

ঠাকুরেরও ভাবাবেশ হয়েছে, গাড়ি এসে দাঁড়াল দরজায়। কে এল? যার ভক্তির জোরে ঠাকুর এমন মূর্তি ধরলেন, সে–সেই গোপালের মা।

‘আমি কিন্তু বাপু ভাবে অমন কাঠ হয়ে যাওয়া ভালোবাসি না।’ গোপালের মা যেন অনুযোগ দিল। ‘আমার গোপাল হাসবে খেলবে বেড়াবে দৌড়বে-ও মা, এ যেন একেবারে কাঠ! আমার অমন গোপালে কাজ নেই।’ ঠাকুরের গা ঠেলতে লাগল গোপালের মা: ‘ও বাবা তুমি অমন হলে কেন।

এই মাতৃভাব বা সন্তানভাব-সাধনের শেষ কথা বা সহজ কথা। তুমি মা, আমি তোমার ছেলে।

আমি তোমার শরণাগত সন্তান। জীবত্ব বুঝি না, ঈশ্বরত্ব বুঝি না, কাকে বা বলে বন্ধন কাকে বা বলে মুক্তি। জ্ঞান-ভক্তিও বুদ্ধির বাইরে। বুঝি একমাত্র তোমাকে, মাকে। তুমি পুৰ্ণানন্দস্বরূপ মা আর আমি তোমার কোলে সদ্যজাত নগ্ন শিশু। তোমার কোলে যদি উঠতে পারি, তবে ঈশ্বরত্বও তৃণীকৃত।

তিনদিন পরে ঠাকুর ফিরছেন দক্ষিণেশ্বরে। ঠাকুরের নৌকোতে গোলাপ-মা, গোপালের মা আর একটি-দুটি ভক্ত-বালক। আশ্চর্য! গোপালের মা’র হাতে একটি পুঁটলি! কি করবে, বলরামের বাড়ির মেয়েরা বেঁধে দিয়েছে। খান দুই কাপড়, রাঁধবার জন্যে কিছু হাতা-খুন্তি।

পুঁটলি দেখে ঠাকুর মহাবিরক্ত। গোপালের মাকে সরাসরি কিছু বললেন না। বললেন গোলাপ মাকে কিন্তু গোপালের মাকে ঠেস দিয়ে। ‘যে ত্যাগী সেই ভগবানকে পায়। যে লোকের বাড়িতে খেয়ে-দেয়ে শুধু হাতে চলে আসে, সেই ভগবানের গায়ে বসতে পারে ঠেস দিয়ে।’ বলছেন আর বারে-বারে সেই পুঁটলির দিকে কটাক্ষ করছেন। গোপালের মা’র মনে হল পুঁটলিটা ফেলে দি গঙ্গাজলে। কিন্তু তাই বা কেন, দক্ষিণেশ্বরে পৌঁছে কাউকে বিলিয়ে দেব না হয়।

দক্ষিণেশ্বরে পৌঁছেই সোজা চলে গেল নবতে। শ্রীমাকে বললে, ‘ও বৌমা, গোপাল এ সব জিনিসের পুঁটলি দেখে রাগ করেছে। এখন উপায়? এ সব ভাবছি আর নিয়ে যাব না, এইখানেই বিলিয়ে দি কাউকে।

সান্ত্বনার প্রলেপ বুলোলেন শ্রীমা। বললেন, ‘বলুন গে উনি। তুমি শুনো না। তোমার দেবার তো কেউ নেই! তা তুমি কি করবে মা, দরকার বলেই তো এনেছ।’

বুকে জড়িয়ে গেল কথা শুনে। তবু মনে যখন উঠেছে, একখানা কাপড় দান করল। আরো কটি এটা-ওটা। ঠাকুরের জন্যে বাঁধল স্বহস্তে। কি জানি, নেবেন কি না। নেবেন বই কি, হাসিমুখে নেবেন। শ্রীমা ইঙ্গিত করেছেন নবত থেকে। না নিয়ে উপায় কি। গরিব মানুষ, চেয়ে ভিক্ষে করে আনেনি তো! আর যা পেয়েছে তার থেকে দান করে দিয়েছে অপরকে।

নরেনকে ডাকিয়ে এনেছেন ঠাকুর। আর সেই দিনই গোপালের মা’র আবির্ভাব।

এবার রগড় হবে মন্দ নয়। একজনের হাতে জ্ঞান-অসি আরেকজনের হাতে বিশ্বাসের পাহাড়—কেমন যুদ্ধ হবে না জানি! দুষ্টামি করে একটা কোঁদল বাধিয়ে দিই দুজনের মধ্যে।

‘কেমন তুমি গোপাল দেখ নরেনকে একটু বলো তো বুঝিয়ে।’

দর্শনের কথা কাউকে বলতে নেই এমনি শিখিয়ে দিয়েছিলেন ঠাকুর। তাই ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল গোপালের মা, ‘তাতে কিছু দোষ হবে না তো গোপাল?

‘না, তুমি বলো।’

তুমি বিশ্বাস করো না করো আমি বলি এবার নির্ভয়ে। আমার ভাবের কথা বলব ভালোবাসার কথা বলব, তাতে আমার লজ্জা কি। চাঁদের আলো যে ছড়িয়ে পড়ছে জলে-স্থলে পাহাড়ে-কাননে সে কি চাঁদের লজ্জা?

গোপাল আমার কোলে উঠে কাঁধে মাথা রেখে এসেছিল সারা পথ। কামারহাটি থেকে দক্ষিণেশ্বর। তার রাঙা টকটকে পা ঝুলছিল বুকের কাছটিতে। এসেই ঢুকে গেল ঠাকুরের শরীরে। আবার বেরিয়ে এল যাবার সময়। শুতে বালিশ না পেয়ে খুঁতখুঁত করেছে সারা রাত। কাঠ কুড়িয়ে আনল রাঁধবার সময়, আর খেতে বসে কি দস্যিপনা! ভাবে বিভোর হয়ে বলতে লাগল অঘোরমণি। তুমি যদি না মানো তো আমি কি করব! আমি যে দেখছি চোখের সামনে।

এ কি, নরেন কাঁদছে!

‘বাবা, তোমরা পণ্ডিত, বুদ্ধিমান, আমি দুঃখী কাঙালী, কিছুই জানি না, কিছুই বুঝি না।’ আকুল স্বরে বললে গোপালের মা, ‘তোমরা বলো, আমার এ সব তো মিথ্যে নয়?’

‘না মা, নরেন বললে ভক্তবিশ্বাসীর মতো, ‘তুমি যা দেখেছ সব সত্যি।’ ঝগড়াটা তাহলে লাগল না। ঠাকুর হাসতে লাগলেন।

২১

অধর সেনের বাড়িতে ঠাকুরের সঙ্গে বঙ্কিমের দেখা।

‘তুমি ডিপুটি।’ কথায়-কথায় বললেন একদিন অধরকে। তার শোভাবাজার বেনেটোলার বাড়ির উত্তরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ‘কিন্তু জেনো এ পদও ঈশ্বরের দয়ায় হয়েছে। তাঁকে ভুলো না।’ আবার একদিন দক্ষিণেশ্বরে, শিবের সিঁড়িতে বসে। ‘দেখ, তুমি এত বিদ্বান আবার ডিপুটি। তবু তুমি খাঁদিফাঁদির বশ। আমার কথা শোনো। এগিয়ে পড়ো। চন্দনকাঠের পরেও আরো ভালো জিনিস আছে। রূপোর খনি, সোনার খনি—তার পর হীরে-মানিক! শুধু এগিয়ে পড়ো—’

বয়স আটাশ-ঊনত্রিশ। বৃত্তি পেয়েছে এন্ট্রান্সে অষ্টম হয়ে। এফ-এতে চতুর্থ। কবিতার বই লিখেছে দুখানা, ‘মেনকা’ আর ‘ললিতাসুন্দরী। চব্বিশ বছর বয়সে প্রথম ডেপুটি হয়েই চট্টগ্রাম। সেখান থেকে বদলি হয়ে যশোর। যশোর থেকে সম্প্রতি কলকাতা। আর কলকাতায় পৌঁছেই সটান দক্ষিণেশ্বর।

তিনশো টাকা মাইনে। কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটির ভাইসচেয়ারম্যান হবার জন্যে দবখাস্ত করেছে। বড়-বড় লোকদের করছে অনেক ধরাধরি। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এবার তুমি যদি বলো একটু তোমার কালীকে।

অধরকে মনে করেন পরমাত্মীয়। মুখে বলেনও তাই অকপটে। তাই একটা সাধলেন কালীকে। বললেন, ‘মা, অনেক তোমার কাছে আনাগোনা করছে। যদি হয় তো হোক না।’ বলেই ছি-ছি করে উঠলেন: ‘মা, কি হীনবুদ্ধি। জ্ঞান-ভক্তি না চেয়ে চাচ্ছে কিনা টাকা-পয়সা।”

ধিক্কার দিয়ে উঠলেন অধরকে, ‘কেন হীনবুদ্ধি লোকগুলোর কাছে অত আনাগোনা করলে? কী হল? সাতকান্ড রামায়ণ, সীতা কার ভার্যে। আর বোলো না ঐ মল্লিকের কথা। আমার মাহেশ যাবার কথায় চলতি নৌকো বন্দোবস্ত করেছিল, আর বাড়িতে গেলেই হৃদুকে বলত, হৃদু গাড়ি রেখেছ?’

অধর হাসল। বললে, “সংসার করতে গেলে এ সব না করলে চলে কই? আপনি তো বারণ করেননি!’

কি অবস্থাই গেছে। ‘এই অবস্থার পর, ঠাকুর বললেন, ‘আমাকে মাইনে সই করাতে ডেকেছিল খাজাঞ্চি। যেমন ডাকে সবাইকে, অন্যান্য কর্মচারীকে। আমি বললাম, তা আমি পারবোনি। তোমার ইচ্ছে হয় আর কারুকে দিয়ে দাও।’

সংসারে থাকো কিন্তু ঈশ্বর-রস সরসীতে স্নান করো। কিন্তু যদি একবার যাও তলিয়ে আর উঠো না।

‘এই অবস্থা যেই হল, রকম-সকম দেখে মাকে বললাম, মা, এইখানেই মোড় ফিরিয়ে দে। সুধামুখীর রান্না, আর না আর না, খেয়ে পায় কান্না”

সবাই হেসে উঠল। সংসারসুধামুখীকে সবাই চেনে। বচনে অমৃত, ব্যঞ্জনে বিষ। আপাতরম্য কিন্তু পর্যন্তপরিতাপী। যাকে বলে দেখসিঁদুরে। রূপসুন্দর কিন্তু অসার।

‘যার কর্ম করছ তারই করো।’ বললেন আবার অধর সেনকে ‘লোকে পঞ্চাশ টাকা একশো টাকা মাইনে পায় না, তুমি তিনশো টাকা পাচ্ছ। ডিপুটি কি কম গা? ওদেশে দেখেছিলাম আমি ডিপুটি। নাম ঈশ্বর ঘোষাল। ছেলেবেলায় দেখেছিলাম। মাথায় তাজ—সব হাড় কাঁপে। বাঘে গরুতে জল খায় এক ঘাটে। শোনো। যার কর্ম করছ তারই করো। একজনের চাকরি করলেই মন খারাপ হয়ে যায়, আবার পাঁচজনের ” আমিও একজনের চাকরি করছি। একজনের দাসত্ব। সে মনিব সে উপরওয়ালার নাম ঈশ্বর।

‘শোনো!’ আবার বলছেন ঠাকুর: ‘আলো জ্বাললে বাদুলে পোকার অভাব হয় না। তাঁকে লাভ করতে চাইলে তিনিই সব যোগাড় করে দেন, কোনো অভাব রাখেন না। তিনি হৃদয়মধ্যে এলে সেবা করবার অনেক লোক এসে জোটে। তবে আপনি হাকিম, কি বলব! যা ভালো বোঝ তাই কোরো। আমি মূর্খ আর সবাইকে লক্ষ্য করে হাসিমুখে বললে অধর, ‘উনি আমাকে একজামিন করছেন।’

যেমন দেশে বাড়ি, কলকাতায় গিয়ে কর্ম করে, তেমনি সংসারকর্ম ভূমিতে কাজ করে যাও। আর ঈশ্বরের নাম করো। ঈশ্বরই কীর্তনীয় কথনীয় গণনীয় মননীয়। বর্ণনীয়, বন্দনীয়। ঈশ্বরই সর্বার্থনামচিন্তামণি। শুধু তাঁর নামসাধন করে যাও। পরমামৃতায়মান নামকীর্তন। ‘বিদ্যাবধূজীবনং।’ চিদ্বৃত্তি বিদ্যারূপে যে বধূ তার জীবনই শ্রীকৃষ্ণনামকীর্তন। নামসাধনে নিশ্চলা স্থিতিই নিষ্ঠা।

‘তাঁর নামবীজের খুব শক্তি।’ বললেন আবার অধরকে। নাশ করে অবিদ্যা। বীজ এত কোমল, অঙ্কুর এত কোমল, তবু শক্ত মাটি ভেদ করে। মাটি ফেটে যায়।

কণ্ঠপীঠে মঙ্গলস্বরূপ কৃষ্ণনাম প্রতিষ্ঠিত করো। স্ফুটং বট।’ শব্দ করে উচ্চারণ করো। সঙ্কেতে অর্থাৎ পুত্রাদির নামকরণে, পরিহাসে, স্তোভে বা নিরর্থক বাক্যে বা নৃত্যগীতে, বা অবহেলাক্রমে যে ভাবেই হোক নাম করলেই হল। ভুলেও যদি অগ্নিকণা গায়ে এসে পড়ে দগ্ধ করবেই। তেমনি হরিনাম যদি একবার উড়ে এসে মনে পড়ে পুড়ে যাবে সর্বপাপ। আসলে হরিনামও বহ্নিময়। দাহ আছে, আবার এমন মজা, মধুও আছে। যাকে বলে ‘তপ্ত ইক্ষু চর্বণ।’ রাখাও যায় না ফেলাও যায় না।

‘এই প্রেমের আস্বাদন

তপ্ত ইক্ষু চর্বণ

 মুখ জ্বলে না যায় ত্যজন।।‘

কিন্তু শুধু নাম করলে কি হবে? অনুরাগ চাই। নামের মধ্যে চাই সেই হৃদয়ের সুর। সেই স্পর্শ-আতুর পথিক হাওয়ার ব্যাকুলতা।

শুধু নাম করে যাচ্ছি তথচ বিলাস-লালসে মন রয়েছে অলস হয়ে, তাতে কী হবে?

‘হাতিকে নাইয়ে দিলে কি হবে, আবার ধূলোকাদা মেখে যে-কে-সেই। তবে হাতি-শালায় ঢোকবার আগে যদি কেউ ধূলো ঝেড়ে স্নান করিয়ে দেয়, তাহলে আর ভয় নেই, গা তখন থাকবে ঠিক পরিষ্কার।’

‘সেই যে এক পাপী গিয়েছিল গঙ্গাস্নানে। গঙ্গাস্নানে পাপ যায় শুনেছে, ব্যস, মনের সুখে ডুব দিচ্ছে জলে নেমে। কিন্তু জানে না পাপগুলো নদীর পাড়ে গাছের উপর গিয়ে বসেছে। যেই স্নান সেরে ফিরছে অমনি পুরোনো পাপগুলো গাছ থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল লোকটার ঘাড়ের উপর। স্নান করে দু পা আসতে-না-আসতেই একটু-আধটু হালকা হতে-না-হতেই আবার সেই গুরুভার। সেই “জগদ্দল পাষাণের শ্বাসরোধ।

‘তাই বলি নাম করো। আর সঙ্গে-সঙ্গে প্রার্থনা করো, হে ঈশ্বর, তোমার উপর যেন ভালোবাসা আসে। আর কিছু না। টাকা নয় মান নয় দেহের সুখ নয়, শুধু ভালোবাসা। এমন কখনো হতে পারে আমি তোমাকে ভালোবাসি আর তুমি আমাকে বাসো না?’

চণ্ডীর গান হয়ে গেল অধরের বাড়িতে। বলরামকে নেমন্তন্ন করতে ভুল হয়ে গিয়েছে। বলরামের বড় অভিমান, যাকে-তাকে বলে বেড়াচ্ছে। নালিশের মধ্যে রাগ তত নয় যত দুঃখ। চণ্ডীর গান দিল অধর, আমাদের বললে না। তা বলবে কেন, আমরা হলাম আজে-বাজে, হেঁজি-পেঁজি-

কথা কানে উঠল অধরের। ছুটে তক্ষুনি বলরামের বাড়ি গেল। যুক্ত করে অপরাধ স্বীকার করলে। মাপ করুন। ভুল হয়ে গিয়েছিল-

সেই কথাই হচ্ছিল ঠাকুরের সঙ্গে।

বলরাম বললে, ‘আমি জানতে পেরেছি যে অধরের দোষ নয়। দোষ রাখালের। রাখালের উপর ভার ছিল।’

‘রাখালের দোষ ধোরো না।’ মমতামাখানো মুখে বললেন ঠাকুর, গলা টিপলে ওর দুধ বেরোয় -‘

‘বলেন কি মশাই!’ ঝাঁজিয়ে উঠল বলরাম– চন্ডীর গান হল, আর ও নেমন্তন্ন করতে বেরিয়ে–

‘আসলে অধরই জানত না। অধরেরই খেয়াল ছিল না।’ ঠাকুর শান্তি জল ঢেলে দিলেন। ‘দেখ না সেদিন যদু মল্লিকের বাড়ি গিয়েছিল আমার সঙ্গে। দেখল সিংহবাহিনী। চলে আসবার সময় জিজ্ঞেস করলাম, সিংহবাহিনীর কাছে প্রণামী দিলে না? ও, দিতে হয় নাকি – সঙ্কুচিত হয়ে গেল—তা মশাই আমি তো জানি না, আমার তো খেয়াল নেই!’ ঠাকুর থামলেন। বলরামকে বিশেষ উদ্দেশ করে বললেন, ‘তা তোমাকে যদি না বলেই থাকে, তাতে দোষ কি? যেখানে হরিনাম সেখানে না বললেও যাওয়া যায়। নিমন্ত্রণের দরকার হয় না।’

নিমন্ত্রণ করি কাকে? অভিমানীকে। স্পর্ধিতবর্ধিতকে। পত্র দ্বারা নিমন্ত্রণ করলেও ত্রুটি ধরে। কিন্তু বিশ্বময় এত যে পত্র লিখে রেখেছেন ঈশ্বর, এ কি নিমন্ত্রণ? এ সরোদন আহবান। আয় আয়।

তুমি যাবে না ভেবেছ? যেতে পারো না সে আলাদা কথা। তোমার দেহের প্রতিটি রক্তকণা যাই-যাই করে উঠেছে।

গাছ কি নিমন্ত্রণ করে? তবু গাছের ছায়ায় গিয়ে বসি, পত্রমর্মরে হরিনাম শুনি। নদী কি নিমন্ত্রণ করে? তবু তার তীরে গিয়ে বসি, জলগুঞ্জনে হরিনাম শুনি। আকাশ কি নিমন্ত্রণ করে? তবু তার অন্ধকারের নিচে গিয়ে দাঁড়াই। তারায় তারায় শুনি দীপ্ত হরিনাম।

গৃহস্থের ঘরে হরিনাম হচ্ছে। পথচারী পথিক এসে দাঁড়াল বাড়ির আঙিনায়। কে আপনি? আমি রবাহূত। আমাকে গৃহস্বামী ডাকেনি, আমাকে হরিনাম ডেকে এনেছে।

যেখানেই হরিকথা সেখানেই আত্মীয়তা। যেখানেই হরিনাম সেখানেই সুখধাম।

নামসদৃশ জ্ঞান নেই, নামসদৃশ ব্রত নেই, নামসদৃশ ফল নেই, নামসদৃশ শান্তি নেই, নামসদৃশ আশ্রয় নেই। হে রসসারজ্ঞা রসনা, মধুরপ্রিয়া, যদি মধুস্বাদই করতে চাও নিরন্তর, নামপীযূষ পান করো।

‘প্রথমে একটু খাটনি!’ বললেন আবার অধরকে। ‘তার পরেই পেনসান।’

প্রথমে অভ্যাস তারপরেই অনুরাগ। প্রথমে দাগা বুলোনো পরে টেনে লেখা। প্রথমে দাঁড় টানা পরে তামাক খাওয়া। প্রথমে ছুটোছুটি পরে মা’র কোলে ঘুম। অনেক দিন পর এসেছেন অধরের বাড়িতে। কোনো ঠিক ছিল না হঠাৎ এসে পড়েছেন। ঠাকুরের পায়ের কাছে বসল এসে অধর। বললে, ‘কত দিন আসেননি। আমি আজ খুব ডেকেছিলাম আপনাকে। চোখ দিয়ে জল পড়েছিল-‘

‘বলো কি গো – মুখমণ্ডল প্রসন্ন হয়ে উঠল।

তাই তো এসেছি। ব্যাকুল হয়ে কাঁদলেই তো চলে আসি পথ চিনে। বিনা রেখার পথ ধরে যেমন বাতাস চলে আসে ফুলগন্ধের সংবাদ পেয়ে।

শুধু তুমি আমার জন্যে নয় আমিও তোমার জন্যে ব্যাকুল হই। কাঁদি। ঘুরে বেড়াই। অনেক দিন পর অধর এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। ‘কি গো এত দিন আসোনি কেন? ঠাকুরের কণ্ঠে যেন বেদনার কুয়াশা।

‘অনেক কাজ পড়ে গিয়েছিলাম। নানান মিটিং, ইস্কুল, অফিস—’

‘কচ্ছপের মতন থাকো। কচ্ছপ নিজে জলে চরে বেড়ায় কিন্তু মন রয়েছে আড়াতে। যেখানে তার ডিম রয়েছে সেখানে।’

‘অনেক দিন আমাদের বাড়িতে আসেননি।’ করজোড় করল অধর। বললে, ‘সেই যে গিয়েছিলেন বৈঠকখানা ঘর সুগন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন–এখন সব অন্ধকার।’

ভাবসাগর উথলে উঠল ঠাকুরের। ভাবসাগর মানে প্রেমসাগর। দাঁড়িয়ে পড়লেন। হাত দিয়ে অধর আর মাস্টারের মাথা ছুঁলেন, ছুঁলেন বক্ষদেশ। বললেন, ‘আমি তোমাদের নারায়ণ দেখছি। তোমরাই আমার আপনার লোক।’

শুধু তাই নয়, সেদিন অধরের জিভ ছুঁলেন ঠাকুর। জিভে কি লিখে দিলেন। সেই কি দীক্ষা হয়ে গেল অজানতে? মুখে বললেন, ‘তুমি যে নাম করেছিলে তাই ধ্যান কোরো।’

নামসদৃশ ধ্যান নেই।

সেই অধর সেনের বাড়িতে বঙ্কিম এসেছে। এসেছে ঠাকুরকে দেখতে। ঠাকুরের মতই যার মন্ত্র বন্দেমাতরম্।

“এই কি মা? হ্যাঁ, এই মা। চিনিলাম এই আমার জননী জন্মভূমি—এই মৃন্ময়ী মৃত্তিকারূপিণী অনন্তরত্নভূষিতা এক্ষণে কালগর্ভে নিহিতা। রত্নমণ্ডিত দশ ভুজ দশ দিক—দশ দিকে প্রসারিত। তাহাতে নানা আয়ুধরূপে নানা শক্তি শোভিত, পদ-তলে শত্রু বিমর্দিত-পদাশ্রিত বীরজন—কেশরী শত্রু নিপীড়নে নিযুক্ত। এ মূর্তি এখন দেখিব না, আজি দেখিব না, কাল দেখিব না, কালস্রোত পার না হইলে দেখিব না-কিন্তু এক দিন দেখিব—দিগ্‌ভুজা নানাপ্রহরণ-প্রহারিণী শত্রুমর্দিনী বীরেন্দ্র-পৃষ্ঠবিহারিণী, দক্ষিণে লক্ষ্মী ভাগ্যরূপিণী, বামে বাণী বিদ্যাবিজ্ঞানমূর্তীময়ী, সঙ্গে বলরূপী কার্তিকেয়, কার্যসিদ্ধিরূপী গণেশ-এই সুবৰ্ণময়ী বঙ্গপ্রতিমা–” ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে।

২২

মশায়, ইনিই বঙ্কিমবাবু। অধর সেন পরিচয় করিয়ে দিল। ‘ভারি পণ্ডিত, অনেক বই-টই লিখেছেন। দেখতে এসেছেন আপনাকে।

ঠাকুরের চেয়ে বছর দেড়েকের ছোট বঙ্কিম। তাকালেন একবার চোখ তুলে। সহাস্যে বললেন, ‘বঙ্কিম। তুমি আবার কার ভাবে বাঁকা গো।

আর মশায়, জুতোর চোটে। সাহেবের জুতোর চোটে বাঁকা।

তা কেন? আমি তোমাকে চিনেছি। ও কথা বোলো না। তুমি কৃষ্ণপ্রেমে বঙ্কিম। তুমি কৃষ্ণের ভক্ত। কৃষ্ণের ব্যাখ্যাতা। কৃষ্ণরসবিবেত্তা।

না গো, প্রেমে বঙ্কিম হয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীমতীর প্রেমে ত্রিভঙ্গ হযেছিলেন।’ বলে পুরুষ প্রকৃতির অভেদতত্ত্ব ব্যাখ্যা করলেন মধুর করে ‘শ্রীকৃষ্ণ পুরুষ শ্রীমতী শক্তি। যুগলমূর্তি’র মানে কি? মানে হচ্ছে, পুরুষ আর প্রকৃতি অভেদ। একটি বললেই আরেকটি। যেমন অগ্নি আর দাহিকা। অগ্নি ছাড়া দাহিকা নেই দাহিকা ছাড়া অগ্নি নেই। তাই যুগলমূর্তিতে শ্রীকৃষ্ণের দৃষ্টি শ্রীমতীর দিকে, শ্রীমতীর দৃষ্টি শ্রীকৃষ্ণের দিকে। বিদ্যুতের মত গৌরবর্ণ শ্ৰীমতীর ভাই নীলাম্বর পরেছেন, আর অঙ্গ সাজিয়েছেন নীলকান্ত মণি দিয়ে। আর শ্রীমতীর পায়ে নূপুর দেখে নূপুর পরেছেন শ্রীকৃষ্ণ।’

তন্মোহিতের মত শুনছে দুই ডেপুটি। বঙ্কিম আর অধর। নিজেদের মধ্যে ইংরিজিতে কি বলাবলি করছে।

‘কি গো, আপনারা ইংরিজিতে কি কথাবার্তা করছ –

‘এই কৃষ্ণরূপের ব্যাখ্যার কথা আলোচনা করছিলাম।’ বললে অধর।

‘সেই যে নাপিতের গল্প করলে। শোনো তবে। এক নাপিত কামাচ্ছে এক ভদ্রলোককে। কামাতে কামাতে কোথায় লাগিয়ে দিয়েছে, আর ভদ্রলোকটি অমনি বলে উঠেছে ড্যাম। ড্যাম-এর মানে জানে না নাপিত। ক্ষুর-টুর ফেলে রেখে, শীতকাল, তবু জামার আস্তিন গোটালো নাপিত, বললে, ড্যাম-এর মানে কি বলো। ভদ্রলোক বললে, আরে, তুই কামা না। ওর মানে এমন কিছু নয়, তবে লক্ষ্মী বাবা, একটু সাবধানে কামাস! নাপিত সে ছাড়বার নয়। বললে চোখ পাকিয়ে, ড্যাম মানে যদি ভালো হয় তবে আমি ড্যাম, আমার বাপ ড্যাম, আমার চৌদ্দপুরুষ ড্যাম। আর ড্যাম মানে যদি খারাপ হয় তবে তুমি ড্যাম, তোমার বাপ ড্যাম, তোমার চৌদ্দপুরুষ ড্যাম। শুধু ড্যাম নয়, ড্যাম ড্যাম ড্যাম ড্যা ড্যাম ড্যাম।’

কি মহানন্দে শিশুর মত বললেন সরল গল্পটা। আর বলবার এমন অপূর্ব কৌশল, দুই সহকর্মী হেসে উঠল উচ্চরোলে।

‘আচ্ছা মশাই, এমন সুন্দর আপনার কথা, আপনি প্রচার করেন না কেন?’ প্রশ্ন করল বঙ্কিম।

প্রচার? মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বক্তৃতা করব? না, খোল ঝুলিয়ে বেরব শোভাযাত্রায়? না কি ইনিয়ে-বিনিয়ে লিখব আত্মজীবনী?

‘প্রচার! ওগুলো অভিমানের কথা। যিনি চন্দ্রসূর্য সৃষ্টি করে এই জগৎ প্রকাশ করেছেন, তাঁর প্রচার তিনিই করবেন। মানুষ ক্ষুদ্র জীব, তার মধ্যে কি সে প্রচার করে!’

‘তবে তিনি যদি সাক্ষাৎকার হয়ে আদেশ দেন তাহলেই প্রচার সম্ভব। সে আদেশ সে চাপরাশ কজন পেয়েছে? নইলে, আদেশ হয়নি, তুমি বকে যাচ্ছ। যতক্ষণ বলছ লোকে বলবে আহা ইনি বেশ বলছেন। তুমিও থামলে, তারপর ভেঙে যাবে সভা, কোথাও কিছু নেই। আর বলবেই বা কদিন? ঐ দুদিন। দুদিনই লোক শুনবে তারপর ভুলে যাবে। ঐ একটা হুজুক আর কি।’

ঈশ্বরের প্রচার ঈশ্বর করবেন, তুমি নিজে প্রকাশিত হও। দেখ না তিনি নিজে কেমন প্রকাশিত হয়েছেন চতুর্দিকে, সূর্যে চন্দ্রে তৃণাঞ্চিত ধরিত্রীতে তারাঞ্চিত নিশীথিনীতে। তুমিও তেমনি প্রকাশিত হও। সমস্ত কিশলয়ে যে প্রার্থনা সেই প্রার্থনা তোমারও মধ্যে বিকশিত করো। তুমি যে মহৎ তুমি যে বৃহৎ তার প্রমাণ দাও জীবনে। অপরিমাণ রূপে বাঁচো। নিখিলের প্রতি প্রেমে নিখিলের প্রতি করুণায় প্রসারিত হও।

কার শক্তিতে তুমি প্রচার করবে? তিনি যদি না দুধের নিচে আগুনের জ্বাল দেন তবে তা কি করে ফুলবে?

‘যতক্ষণ দুধের নিচে আগুনের জ্বাল রয়েছে ততক্ষণ দুধটা ফোঁস করে ফুলে ওঠে। জ্বাল টেনে নাও, দুধও যেমন তেমনি। আচ্ছা, আপনি তো খুব পণ্ডিত, কত বই লিখেছ,’ বঙ্কিমকে সবিশেষ লক্ষ্য করলেন ঠাকুর। ‘আপনি কি বলো, কিছু কি সঙ্গে যাবে? পরকাল তো আছে?”

কথাটা উড়িয়ে দিল বঙ্কিম। ‘পরকাল? সে আবার কি?’

‘যতক্ষণ না জ্ঞান হয় ঈশ্বরলাভ হয় ততক্ষণ ফিরে আসতেই হবে সংসারে, নিস্তার নেই। জ্ঞানলাভ হলে ঈশ্বরদর্শন হলে তবে মুক্তি। সিদ্ধ ধান পুঁতলে আর গাছ হয় না। জ্ঞানাগ্নিতে কেউ যদি সিদ্ধ হয় তাকে নিয়ে আর খেলা হয় না সৃষ্টির।’ বঙ্কিম বললে, ‘তা মশাই আগাছাতেও তো গাছের কোনো কাজ হয় না।’

‘জ্ঞানী তা বলে আগাছা নয়। যে ঈশ্বরদর্শন করেছে, সে অমৃত ফল লাভ করেছে, আপনার লাউ-কুমড়ো ফল নয়। তার আর পুনর্জন্ম হয় না। কেশব সেনকে বলেছিলাম ঐ কথা। কেশব জিজ্ঞেস করলে, মশাই পরকাল কি আছে? আমি না-এদিক না-ওদিক বললাম। বললাম, কুমোররা হাঁড়ি শুকোতে দেয়, তার ভেতর পাকা হাঁড়িও আছে কাঁচা হাঁড়িও আছে। কখনো গরুটরু এলে হাঁড়ি মাড়িয়ে যায়। পাকা হাঁড়ি ভেঙে গেলে কুমোর সেগুলো ফেলে দেয়, কিন্তু কাঁচা হাঁড়ি ভেঙে গেলে সেগুলো ঘরে আনে, ঘরে এনে জল দিয়ে মেখে আবার চাকে দিয়ে নতুন হাঁড়ি করে, ছাড়ে না। তাই কেশবকে বললাম, যতক্ষণ কাঁচা থাকবে ছাড়বে না কুমোর। যতক্ষণ পাকা না হবে, জ্ঞান লাভ না হবে, ঈশ্বরদর্শন না হবে, আবার চাকে দেবে। পাক দিয়ে ঘুরিয়ে মারবে।’

একাগ্রগামিনী নদীর মত চলেছি। বক্রতায়-ঋজুতায়, উচ্চাবচ পথ ভেঙে-ভেঙে, নানা দেশের বিচিত্র ঘটনা ও কাহিনীর মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমি শরবৎ তন্ময়। আমার লক্ষ্য হচ্ছে সেই জলনিধি, সেই অপার অগাধ সেই সুদূর সুন্দর। আমি তো নিশ্চিন্ত হতে চাই না, উদ্বিগ্ন হতে চাই। আমি তো বিশ্রামের নই আমি প্ৰাণবেগ প্রাবল্যের। আমি তো সুখী হতে আসিনি বড় হতে এসেছি, বেগবিস্তীর্ণ হতে এসেছি। তাই আমি চলব, আমি থামব না। আমি যে অনন্তের সন্ধানী, সেই তো আমার অন্তহীন আনন্দ।

‘আচ্ছা, আপনি কি বলো, মানুষের কর্তব্য কি?”

‘আজ্ঞে তা যদি বলেন,’ বঙ্কিম বললে পরিহাস করে, ‘আহার নিদ্রা আর মৈথুন।’

‘এঃ। তুমি বড় ছ্যাঁচড়া।’ ঠাকুরের কণ্ঠস্বরে বিরক্তি ঝরে পড়ল। ‘যা রাতদিন করো তাই তোমার মুখে বেরুচ্ছে। লোকে যা খায় তার ঢেঁকুর ওঠে। মুলো খেলে মুলোর ঢেঁকুর ওঠে। ডাব খেলে ডাবের ঢেঁকুর ওঠে। কামকাঞ্চনের মধ্যে রয়েছ তাই ঐ কথাই বেরুচ্ছে মুখ দিয়ে। কেবল বিষয়চিন্তা করলে পাটোয়ারি স্বভাব হয়, কপট হয় মানুষ। আর ঈশ্বরচিন্তা করলে ঈশ্বর-সাক্ষাৎকার হলে ও কথা কেউ বলবে না।”

এক সাধুর কাছে এক রাজা এসেছে। সাধুকে প্রণাম করে রাজা বললে, আপনি পরম ত্যাগী। কে বললে? সাধু হাসতে হাসতে বললে, রাজা আপনিই যথার্থ ত্যাগী। আমি? রাজা তো বাক্যহীন। তা ছাড়া আবার কি! যে সব চেয়ে দামী জিনিস প্রিয় জিনিস ত্যাগ করে সেই তো বড় ত্যাগী। বললে সাধু, আমি তো কতগুলো তুচ্ছ জিনিস ত্যাগ করেছি, কামকাঞ্চন ভোগৈশ্বর্য। কিন্তু সব চেয়ে যা প্রিয় সব চেয়ে যা মূল্যবান সেই পরমাত্মাকে আপনি ত্যাগ করেছেন, আর তা কত অনায়াসে। তাই, সন্দেহ কি, আপনিই বড় ত্যাগী। বলুন, তাই নয়? শুধু পাণ্ডিত্য হলে কি হবে? যদি ঈশ্বরচিন্তা না থাকে? যদি বিবেকবৈরাগ্য না থাকে? চিল-শকুনি খুব উঁচুতে ওঠে কিন্তু নজর ভাগাড়ের দিকে। অনেক শাস্ত্র-পুঁথি পড়েছে পণ্ডিত। শোলোক ঝাড়তে পারে অফুরন্ত কিন্তু মেয়েমানুষে আসক্ত, টাকা মান সারবস্তু মনে করেছে, সে আবার পণ্ডিত কি? ঈশ্বরে মন না থাকলে আবার পণ্ডিত কি?’

পাণ্ডিত্যে আছে কি? শুধু শুষ্কতা, শুধু দাহ। যেখানে রাজত্ব করার কথা সেখানে এসে দাসত্ব করা। শুধু প্রেমহীন প্রাণহীন মাংসপিণ্ড। ঈশ্বর স্বয়ং যেখানে নত হয়ে এসেছেন আমার কাছে সেখানে কিসের আমার স্পর্ধা, কিসের ঔদ্ধত্য? পরম প্রাপ্তিটিই তো প্রণতিতে।

‘কেউ-কেউ মনে করে এরা পাগল, এরা বেহেড, কেবল ঈশ্বর-ঈশ্বর করে। আর আমরা কেমন স্যায়না, কেমন সুখভোগ করছি। কাকও মনে করে আমি বড় স্যায়না, কিন্তু আসলে কি খায়, কেবল উড়ুর-পুড়ুর করে। আবার দেখ এই হাঁস, দুধে-জলে মিশিয়ে দাও, জল ত্যাগ করে দুধ খাবে।’

সুখভোগ? যা বিষ হয়, তাই তো সংক্ষেপে বিষয়। তার মধ্যে আছে সুখের প্রতিশ্রুতি? সুখ যখন সত্যিই চাও বড়ো সুখটাই নাও না কেন, সেই আরো-র সুখ, সুখের চেয়ে অধিকতর যে সুখ। যা পেয়েছি কুড়িয়েছি ও জমিয়েছি তার চেয়েও যা আরো, যা পাইনি হারিয়েছি ও ফেলে দিয়েছি তার চেয়েও। সুখের বাজি জিতিয়ে দেবে বলে কত ঘোড়াই ধরলাম জীবনের ঘোড়দৌড়ের মাঠে। বিদ্যা আর যশ, পুত্র আর বিত্ত। কেউই পারল না বাজি মারতে, প্রত্যেকেই মার খেল! এবার ধরব এক কালো ঘোড়া, ডার্ক-হর্স। মনের গোপনে গভীর গুঞ্জনে এসে গেছে নতুন খবর! এবার নির্ঘাত বাজিমাৎ।

সে তীরবেগ তুরঙ্গমের নামই ঈশ্বর।

‘আরো দেখ এই হাঁসের গতি।’ বললেন আবার ঠাকুর: ‘এক দিকে সোজা চলে যাবে। তেমনি শুদ্ধভক্তের গতিও কেবল ঈশ্বরের দিকে। তার কাছে বিষয়রস তেতো মনে হয়, হরিপাদপদ্মের সুধা বই আর কিছু ভালো লাগে না।’ বিশেষ করে তাকালেন আবার বঙ্কিমের দিকে, কোমল স্বরে বললেন, ‘আপনি যেন কিছু মনে কোরো না।’ সরল সপ্রতিভের মত বঙ্কিম বললে, ‘আজ্ঞে মিষ্টি শুনতে আসিনি।’ কিন্তু বঙ্কিম জানে তার অন্তরের মধ্যে এর চেয়ে আর মিষ্টি নেই। শক্তিশালী ওষুধের নাম জানি না, খেতে খুব ঝাঁজালো, কিন্তু মধুরের মত কাজ করে আত্মগুণে, আরোগ্য এনে দেয়। তেমনি অর্থ জানি না মন্ত্রের উচ্চারণও হয়তো ঠিক হয় না, কিন্তু আত্মগুণে কাজ করে, এনে দেয় নৈরুজ্য। তেমনি তিরস্কারের মধ্য দিয়েই আসুক সেই নামের পুরস্কার।

ভক্ত ঈশ্বরের কাছে বিষয় চাইলেও ঈশ্বর তাকে তাঁর পাদপল্লবই উপহার দেন। হে প্রভু তোমাকে ত্যাগ করে স্বর্গ চাই না। ধ্রুবলোক চাই না! সার্বভৌম রসাধিপত্যও চাই না। চাই না যোগসিদ্ধি। চাই না অপুনর্ভব। ক্ষুধার্ত শিশু, বা অজাতপক্ষ বিহঙ্গ যেমন তার মা’র জন্যে উৎকণ্ঠিত, বিরহিণী স্ত্রী যেমন প্রবাসগত পতির জন্যে উৎকণ্ঠিত, হে মনোহর-অরবিন্দনেত্র, তোমাকে দেখবার জন্যে আমিও তেমনি উৎকণ্ঠিত হয়েছি।

‘কামিনী-কাঞ্চনই সংসার।’ বঙ্কিমকে লক্ষ্য করে বললেন আবার ঠাকুর: ‘এরই নাম মায়া। দেখতে দেয় না ঈশ্বরকে।’

মাথার উপরে ছাদ থাকলে কি সূর্যকে দেখা যায়? একটু একটু আলো এলে কি হবে? কামিনী-কাঞ্চনই ছাদ। ছাদ তুলে না ফেললে সূর্যকে দেখবে কি করে? সংসারী লোক যেন ঘরের মধ্যে বন্দী। আবছায়ার বাসিন্দে।

কামিনী-কাঞ্চনই মেঘ। সেও দেখতে দেয় না সূর্যকে। যতক্ষণ মায়ার ঘরে আছ, যতক্ষণ মায়া-মেঘ রয়েছে জ্ঞান-সূর্য কাজ করে না। মায়া-ঘর ছেড়ে বাইরে এসে দাঁড়াও। জ্ঞান-সূর্যে নাশ হবে অবিদ্যা। বন্ধ ঘরের অন্ধকার। বন্ধ ঘরের অন্ধকারও যা অহঙ্কারও তাই। হয়ে যাবে শুকনো তৃণের মত।

‘ঘরের মধ্যে আনলে আতস কাঁচে কাগজ পোড়ে না।’ বললেন ঠাকুর, ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালে রোদটি ঠিক কাঁচে পড়ে, তখন পুড়ে যায় কাগজ। আবার মেঘ চলে এলে কাজ হয় না আতস কাঁচে। মেঘটি সরে গেলে তবে হয়।’

সেই একজন এক কুকুর পুষেছে। দিন-রাত থাকে তাকে নিয়ে। কখনো কোলে করে কখনো বা মুখের পরে মুখ দিয়ে বসে থাকে। অত আদর করতে নেই, একজন এসে শাসিয়ে গেল, পশুর জাত, কোনদিন আদর ভুলে ফট করে কামড়ে দেবে তার ঠিক কি। সত্যিই তো। জোর করে নামিয়ে দিলে কোল থেকে। আর কক্ষনো কোলে নেব না। কুকুর তা শুনবে কেন? দৌড়ে এসে উঠতে চায় ব্যাকুল হয়ে। নামিয়ে দাও তো আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছুটে পালাও তো সেও ছোটে। তখন উপায় কি? প্রহার করো। কুকুরের মার আড়াই প্রহর। মার ভুলে গিয়ে আবার কোলের জন্যে হা-পিত্যেশ করে। অনেক কাল আদর করে কোলে তুলে নিয়েছ এখন তুমি নিরস্ত হলেও সে ছাড়বে কেন? আসতে চায় আসুক, আবার প্রহার করো। জর্জর করো। নির্জিত করো। আর সে আসবে না। পালিয়ে যাবে।

কামকেও অনেক প্রশ্রয় দিয়েছ। এবার তাকে উচ্ছিন্ন করো।

কি জানিস, তোদের এখন যৌবনের বন্যা এসেছে। তাই পাচ্ছিস না বাঁধ দিতে। বান যখন আসে তখন কি আর বাঁধ-টাঁধ মানে? বাঁধ ভেঙে জল ছুটতে থাকে উত্তাল হয়ে। ধান খেতের উপর এক বাঁশ-সমান জল দাঁড়িয়ে যায়। কামিনী-কাঞ্চন যদি মন থেকে গেল তবে আর বাকি কি রইল? তখন কেবল ব্রহ্মানন্দ।

কিন্তু তুমি কি কামিনী: তুমি জননী, তুমি জায়া, তুমি তনয়া, তুমি সহোদরা। তোমাকে ত্যাগ করব কি করে?

কামিনীকে ত্যাগ করো দামিনীকে নয়; ভোগিনীকে ত্যাগ করো, যোগিনীকে নয়। অবিদ্যাকে ত্যাগ করো, বিদ্যা-বিনোদিনীকে নয়।

‘দু-একটি ছেলে হলে স্ত্রীর সঙ্গে ভাই-ভগ্নীর মত থাকতে হয়, আর তার সঙ্গে কইতে হয় শুধু ঈশ্বরের কথা।’ বঙ্কিমকে বললেন আবার ঠাকুর: ‘তা হলেই দুজনের মন তাঁর দিকে যাবে আর স্ত্রী ধর্মের সহায় হবে।’

জগতের মা, সেই আদ্যাশক্তিই স্ত্রী হয়ে স্ত্রীরূপ ধরে রয়েছেন। সেই সৃজনী পালনী সংহরণী শক্তিই নেমে এসেছে সংসারে। প্রভাতে গায়ত্রী, অরুণরঞ্জিত আকাশে হংসারূঢ়া কুমারী, সৃষ্টি-উন্মুখী কোরক-আকারা। মধ্যাহ্নে শুক্লবর্ণা স্থিতিরূপিণী যুবতী, পদন্যাসবিলাসলক্ষ্মী। সায়াহ্নে কৃষ্ণবর্ণ। প্রলয়শংসিনী বৃদ্ধা, ঘোরকুটিল-আননা। এই তো সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়লক্ষণা ব্রহ্মশক্তি! সমস্ত জগতের আধারশক্তি। এই ব্রহ্মময়ী মহাশক্তিকেই তো বসিয়েছি সংসারে।

শক্তিযজ্ঞ না হতে পারলে শিব করবে কি শিব তো সামর্থ্যহীন স্পন্দনহীন। শক্তিযুক্ত হলেই সে পুরুষার্থ সম্পন্ন।

ঋক কখনো সাম ছাড়া আর সাম কখনো ঋকবিরহিত হয়ে থাকতে পারে না। ঋক স্ত্রী, সাম পুরুষ। ঋক ভূলোক, সাম স্বর্লোক।

বিবাহের মন্ত্রে বর বলছে বধূকে: ‘আমি অম, লক্ষ্মীশূন্য, তুমি লক্ষ্মী। আমি সামবেদ তুমি ঋকবেদ। আমি স্বর্গ তুমি ধরিত্রী।’

আসল কথা, সংযম করো। সত্তার কনকপদ্মটিকে উন্মোচিত করো। সংসারের ঊর্ধ্বে ও যে সংসার আছে তার খোঁজ নাও। দেহমঞ্চে ফোটাও এবার ঈশ্বররোমাঞ্চের ফল। আনন্দ পেতে এসেছ সংসারে নাও এই নিত্য-নতুনের আনন্দ। বিন্দু-বিন্দু নয়, থেকে-থেকে থেমে-থেমে নয়—চাই অপরিচ্ছিন্ন সুখ। একটানা বন্যা। সেই একটানা বন্যার নামই ঈশ্বর।

‘আর কাঞ্চন?” বললেন আবার ঠাকুর: ‘পঞ্চবটীর তলায় গঙ্গার ধারে বসে টাকা মাটি, মাটি টাকা, বলে ফেলে দিয়েছিলাম জলে।’

‘বলেন কি! টাকা মাটি?’ বঙ্কিম চমকে উঠল: ‘মশায়, চারটে পয়সা থাকলে গরিবকে দেওয়া যায়। টাকা যদি মাটি, তা হলে দয়া-পরোপকার হবে না?” ‘দয়া! পরোপকার!’ স্মিতহাস্যে বললেন ঠাকুর: ‘তোমার সাধ্য কি যে তুমি পরোপকার করো। দয়া ঈশ্বরের, মানুষে আবার কী দয়া করবে! দয়ালুর ভিতর যে দয়া দেখ সে তাঁরই দয়া। বাবা-মা’র মধ্যে যে স্নেহ দেখ সব তাঁর স্নেহ পরকে দয়া করবার আগে নিজেকে দয়া করো। ভাণ্ডারে বৈভব থেকেও নিজেকে বঞ্চিত করে রেখেছ। উড়িয়ে দিচ্ছ ফুরিয়ে ফেলছ নিজেকে। ক্ষয়ে যেতে বয়ে যেতে দিচ্ছ। সর্বাধিকারী হয়েও আছ সর্বহারার মত। নিজেকে কৃপা করো। আত্মকৃপার মত কৃপা নেই। নিজেই নিজের দিকে চেয়ে রয়েছ করণানেত্রে। নিজের দিকে তাকাও। নিজেকে বাঁচাও। নিজেকে তুলে ধরো।

‘ঈশ্বরকে ডাকবার আমার কী দরকার?’ অভিমান করে একদিন বলেছিল বিদ্যাসাগর।

‘দেখ না চেঙ্গিস খাঁকে। বিস্তর লুটপাট করে রাজ্যের লোককে বন্দী করলে। প্রায় এক লাখ। সেনাপতিরা প্রমাদ গুণল। বললে, মশাই, এদের এখন খাওয়াবে কে? সঙ্গে এদের রাখলেও বিপদ, ছেড়ে দিলেও বিপদ। এই হত্যাকাণ্ডটা তো ঈশ্বর স্বচক্ষে দেখলেন। কই একটা নিবারণ তো করলেন না। তা তিনি থাকেন থাকুন আমার তাতে দরকার কি। আমার তো কোনো উপকার নেই।’

ঠাকুর বললেন, ‘ঈশ্বরের কার্য কে বোঝে! কেনই বা সৃষ্টি করছেন, কেনই বা সংহার! আমি বলি আমার ও বোঝবার দরকার নেই। বাগানে আম খেতে এসেছি আম খেয়ে যাই। কত গাছ কত ডাল কত পাতা তার হিসেবে আমার কাজ কি। আমি চাই ভক্তি, আমি চাই ভালোবাসা। আমি চাই সম্পাদকে আস্বাদ করতে।’

গঙ্গাধর গাঙুলিকে—পরে যিনি অখণ্ডানন্দ–আসন শেখাচ্ছেন ঠাকুর। একেবারে ঝুঁকে বসতে নেই, আবার খুব টান হয়েও বসতে নেই। শেখাতে-শেখাতে এক সময় বলে উঠলেন, ‘শোন, তোকে বলে রাখি কানে-কানে, খিদের মুখে বাড়া ভাত পেলে খেয়ে ফেলবি। খিদের মুখে যেমন করেই খা, পেট ভরবে।’

তাই আসলে হচ্ছে আস্বাদ। আসলে হচ্ছে ভালোবাসা।

বঙ্কিমকে আবার বলছেন ঠাকুর, ‘সংসারী লোকের টাকার দরকার। সঞ্চয় দরকার। কেন না তার মাগ-ছেলে আছে, খাওয়াতে হবে। সঞ্চয় করবে না কে? কেবল পঞ্ছী অউর দরবেশ। পাখি আর সন্ন্যাসী। তেমনি কামিনীও সন্ন্যাসীর ত্যাজ্য। তার কামিনী গ্রহণ করা মানে থুতু ফেলে সেই থুতু খাওয়া।

আর তুমি সংসারী? কামিনী সম্বন্ধে তোমার সংযম, কাঞ্চন সম্বন্ধে তোমার অনাসক্তি। তোমার ত্যাগ নয়, পরিহার নয়, নিষেধ নয়, আরোপ নয়। তোমার শুধু একটু বেঁকিয়ে দেওয়া। কামের থেকে প্রেমে চলে আসা। আত্ম থেকে আত্মায়। বদ্ধ দেয়ালের দেশ থেকে উন্মুক্ত সমুদ্রে।

‘আচ্ছা, তুমি কি বলো?’ প্রশ্ন করলেন বঙ্কিমকে। ‘আগে সায়েন্স না আগে ঈশ্বর?”

‘বা, আগে পাঁচটা জানতে হবে বৈকি। এদিককার জ্ঞান না হলে ঈশ্বর জানব কেমন করে?”

‘তোমাদের ঐ এক কথা। আগে ঈশ্বর তারপর সৃষ্টি। আগে যদু মল্লিক তারপর তার ধন-দৌলত। ১-এর পর যদি পঞ্চাশটা শূন্য থাকে অনেক হয়ে যায়। ১-কে মুছে ফেল সব শূন্য। এককে নিয়েই অনেক। এক আগে তারপর অনেক। আগে ঈশ্বর তারপর জীবজগৎ।’ অন্তরঙ্গ দৃষ্টিতে দেখলেন বঙ্কিমকে: ‘আম খেতে এসেছ আম খেয়ে যাও।’

বঙ্কিম হাসল। ‘আম পাই কই?’

‘তাঁকে ব্যাকুল হয়ে প্রার্থনা করো। আন্তরিক হলে তিনি শুনবেনই শুনবেন। হয়তো অন্তত সৎসঙ্গ জুটিয়ে দিলেন—

‘কে, গুরু? তাঁর কথা বলবেন না। ভালো আমটি নিজে খেয়ে খারাপ আমটি আমায় দেবেন।

“তা কেন? যার যা পেটে সয়। সকলে কি পলুয়া-কালিয়া হজম করতে পারে?

যে দুর্বল যার পেটের অসুখ তার পথ্য মাছের ঝোল।’

ত্রৈলোক্য সান্যাল গান ধরল। ঠাকুর দাঁড়িয়ে পড়লেন। দাঁড়িয়েই সমাধিস্থ। সবাই ঘিরে ধরল। ভিড় ঠেলে বঙ্কিমও এল এগিয়ে। একদৃষ্টে দেখতে লাগল ঠাকুরকে। অচ্যুত চিন্তায় কখনো কাঁদছেন, কখনো হাসছেন, কখনো নাচছেন, গান করছেন, অলৌকিক কথা বলছেন, কখনো বা শ্রীহরির লীলাভিনয় করছেন, কখনো বা নিস্তরঙ্গ সমুদ্রের মত তৃষ্ণী হয়ে আছেন। কৃতকৃতার্থ ভক্তের কথা সেই যে পড়েছিল বঙ্কিম, এ যে তারই প্রতিমূর্তি।

কে এই পুরুষ? নাম টাকা মান বৈভব কিছু চায় না, শুধু প্রেমানন্দ চায়, যে প্রেম ঈশ্বর থেকে উৎসারিত। প্রেমানন্দই ভূমানন্দ। কিছু চাই না অথচ ভালোবাসি-এর নামই ভূমা। উদ্দেশ্য যা উপায়ও তাই। উদ্দেশ্য ভালোবাসা উপায়ও ভালোবাসা। ভালোবেসেই বিশ্বকে আপন করা। সেই বিশ্বানন্দই ব্রহ্মানন্দ।

অনিমেষ চোখে তাকিয়ে আছে বঙ্কিম। দেখছে ঠাকুরের নৃত্য। কীর্তনকদম্বস্ফুর্তি।

কীর্তনান্তে সকলকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন ঠাকুর। বললেন, ‘ভাগবৎ-ভক্ত- ভগবান জ্ঞানী-যোগী সকলের চরণে প্রণাম।’

বিগলিত হল বঙ্কিম। সন্ন্যাসের আসল কি অর্থ তা যেন বুঝল নতুন করে। শুধু স্ত্রী-পুত্র-পরিজন নয়, এই বিশ্বজগৎ আমার আত্মার বিস্তৃতি, সুতরাং আমারই আপনার লোক। তাই যদি হয় তবে এই অনন্ত আত্মীয়ের রাজ্যে শুধু পরিমিত পরিজন নিয়ে সুখী আছি কি করে? অঙ্গনকে পরিমুক্ত করো, প্রসারিত করো। এই প্রসারণই সন্ন্যাস। সন্ন্যাস সংসারের সঙ্কোচন নয়, সংসারের বিস্তৃতিই সন্ন্যাস। শ্রীরামকৃষ্ণ বিশ্বসংসারী, তাই আসল সন্ন্যাসী। সর্বত্যাগী হয়েও তাই সর্বগ্রাহী। ‘ভক্তি কেমন করে হয়?’ জিজ্ঞেস করল বঙ্কিম।

‘ব্যাকুলতায়। ছেলে যেমন মা’র জন্যে দিশেহারা হয়ে কাঁদে সেই ব্যাকুলতায়। উপরে ভাসলে কী হবে? ডুব দাও কান্নাসাগরে, তবেই পান্না উঠবে। গভীর জলের নিচে রত্ন, জলের উপর হাত-পা ছুঁড়লেই তো রত্ন ভেসে উঠবে না। রত্ন যে ভারী, জলে ভাসে না, তলিয়ে গিয়ে মাটির সঙ্গে ঠেকেছে। তাই ডোবো। তলিয়ে যাও।’ ‘কি করি! পেছনে যে শোলা বাঁধা।

‘কাল-পাশ কেটে যাবে, এ তো মাত্র শোলা। তাঁকে মনন করো, তাঁকে ডাকো, তাঁতে নিমজ্জিত হও! ডুব না দিলে কিছু হবে না। একটা গান শোনো।’ বলে গান

ধরলেন:

ডুব ডুব ডুব রূপসাগরে আমার মন,

তলাতল পাতাল খুঁজলে পাবি রে প্রেমরত্নধন।

ঘর ছেড়ে মাঠে এসো। ঘরের মধ্যে এক চিলতে আলো ছাদের ফাঁক দিয়ে আসছে। যে ঘরের মধ্যে আছে তার আলো-জ্ঞান ঐটুকু। যার ঘরের বেড়ায় অনেক ছ্যাঁদা, সে বেশি আলো দেখতে পায়। যে দরজা-জানলা খুলে দিয়েছে সে পায় আরো দেখতে। কিন্তু যে চলে আসতে পেরেছে মাঠে তার আলোয় আলো। আত্মবোধ থেকে চলে এসো বিশ্ববোধে।

কেউ-কেউ ডুব দিতে চায় না। বলে ঈশ্বর ঈশ্বর করে বাড়াবাড়ি করে শেষকালে কি পাগল হযে যাব?” নিবিড় স্নেহে তাকালেন বঙ্কিমের দিকে। ঈশ্বর এমন রস যাতে লোকে সুস্থ হয় স্নিগ্ধ হয় সুন্দর হয়। সে অমৃতের সাগরে ডুবলে মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করে –

ঠাকুরকে প্রণাম করল বঙ্কিম। বিদায় নিল। বললে, আমাকে যত আহাম্মক ঠাওরেছেন আমি হয়তো তত নই।’

ঠাকুর হাসলেন। ঠাকুরের কি বুঝতে বাকি আছে কোন উপাদান দিয়ে বঙ্কিম তৈরি। অন্তরগহনে রযেছে তার ভক্তির উৎস, অন্তঃসলিলা ভক্তির প্রবাহিনী।

আঠারো বছর বেদান্ত রগরাচ্ছি, তবু বন্ধু বলছিল এক সাধু দূরে মলের শব্দ শুনতে পেলে মনটা চঞ্চল হয়ে ওঠে। সংসার থেকে মন উচ্ছিন্ন করা কি সহজ কথা –

একটি প্রার্থনা আছে। বঙ্কিম বললে স্নিগ্ধমুখে, অনুগ্রহ করে যদি কুটিরে একবার পায়ের ধূলো দেন—

“তা বেশ তো। ঈশ্বরের ইচ্ছা।

কি ভাবছিল বঙ্কিম, ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে পড়েছে অন্যমনে। যাকে কেউ টানতে পারে না অথচ যে সকলকে টানে তারই আশ্চর্য শক্তির কথাই ভাবছিল হয়তো। গায়ের চাদর ফেলে এসেছে ভুলে। কে একজন কুড়িয়ে নিয়ে ছুটে তাকে পৌঁছে দিল চাদর। তবু সম্পূর্ণ খেয়াল নেই। দৃষ্টি নেই বেশবাসে।

কদিন পরে গিরিশ আর মাস্টারকে ডাকালেন ঠাকুর। বললেন, সেই যে বঙ্কিম বলে গেল তার বাড়িতে নিয়ে যাবে একদিন, কই এল না তো। যাও খোঁজ নিয়ে এস দেখি।

গিরিশ আর মাস্টার তখুনি রওনা হল। বঙ্কিম কত কথা বললে ঠাকুরের সম্বন্ধে, দিব্য আনন্দের কথা। যাকে না পেয়ে ও যেখান থেকে ব্যাহত হয়ে বাক্য ও মন যুগপৎ নিবর্তন করে তাই তো আনন্দ-পারাবার। বহু মেধা বা শাস্ত্র দ্বারা লভ্য নন, যাকে বরণ করেন একমাত্র তার দ্বারাই লভ্য। সেই অনির্বচনীয় কথা।

বললে, ‘যাব আরেকদিন। ডেকে নিয়ে আসব।

আর যাওয়া হয়নি বঙ্কিমের। যেতে হয় না, তিনিই আসেন নিজের থেকে। ডাকলে তো আসেনই, না ডাকলেও আসেন।

যেমন এসেছেন অধরের মৃত্যুশয্যার পাশে।

মানিকতলায় ডিস্টিলারি পরিদর্শন করতে গিয়েছিল অধর। গিয়েছিল ঘোড়ায় চড়ে। ফিরতি পথে শোভাবাজার স্ট্রিটে পড়ে গেল ঘোড়া থেকে। ভেঙে গেল বাঁ হাতের কব্জি। শুধু তাই নয়, ধনুষ্টঙ্কার হয়ে গেল। ঠাকুর যখন এলেন, কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছে অধরের। তবু চিনতে দেরি হল না। সমস্ত যন্ত্রণা আনন্দাশ্রুতে বিধৌত হতে লাগল। ঠাকুর কাছে বসে গায়ে হাত বুলুতে লাগলেন। মুখখানি ম্লান, চোখ দুটি করুণকোমল।

অধর চলে গেল অধরায়। মাত্র তখন তিরিশ বছর বয়স। একটা যেন তারা খসে পড়ল। ভবতারিণীর দুয়ার ধরে কাঁদতে বসলেন ঠাকুর। ‘মাগো, আমার কেন এত যন্ত্রণা? আমাকে ভক্তি দিয়ে রেখেছিস বলেই তো আমাকে এত সইতে হচ্ছে।’

২৩

প্রভু, কোন মুখে আমি সুখ চাইব তোমার কাছে, কোন লজ্জায়? যতবার দেহধারণ করে এসেছ একবারও সুখ পাওনি। রামরূপে এলে রাজপুত্র হয়ে, চীরবল্কল ধরে চলে গেলে বনবাসে। চন্দ্রের সঙ্গে  চিত্রা নক্ষত্রের মত সীতাও তোমার অনুগামিনী হল। বনে গিয়ে তোমার কত যন্ত্রণা, কত যুদ্ধ। তারপর সীতাকে যদি-বা উদ্ধার করলে, বসাতে পারলে না সংসারের সিংহাসনে। তাকে পাঠাতে হল নির্বাসনে প্রজানুরঞ্জনের তাগিদে। দগ্ধ হলে দুঃসহ মর্মজ্বালায়। সুখ পেলে না। কৃষ্ণরূপে জন্ম নিলে কারাগৃহে। নিজের মায়ের স্তন্য থেকে বঞ্চিত রইলে। রাজার ছেলে হয়ে মানুষ হলে গোপের ঘরে। সারাজীবন ধরেই যুদ্ধ আর দুষ্টদলন করতে হল, সুখ কাকে বলে শান্তি কাকে বলে জানতে পেলে না। শান্তিস্থাপনের চেষ্টা করলে আপ্রাণ, তবু দায়ী হলে কুরুক্ষেত্রের অশান্তির জন্যে। মাথা পেতে নিলে কত অভিশাপ। চোখের সামনে মরতে দেখলে আত্মীয়বৃন্দকে, শেষে অতর্কিত ব্যাধশরে প্রাণ দিলে। আর এখন রামকৃষ্ণরূপে ভুগছ দুরারোগ্য ব্যাধিতে। কোন লজ্জায় বলব আমি সুখ চাই, আমাকে সুখ দাও!

ঠাকুরের গা ঘেঁষে বসেছে দুর্গাচরণ। ওগো বসো বসো আমার গা ঘেঁষে। তোমার ঠাণ্ডা শরীর স্পর্শ করে আমার দগ্ধ শরীর শীতল হবে। দুর্গাচরণকে জড়িয়ে ধরলেন ঠাকুর। বললেন, ‘ডাক্তার কবরেজরা সব হার মেনেছে। তুমি জানো কিছ ঝাড়ফুঁক? কিছু করতে পারো উপকার?’

মুহূর্তে একটা উদ্দাম চিন্তা খেলে গেল মনের মধ্যে। বিদ্যুৎঝলকের মত। মুহূর্তেই সঙ্কল্পে দৃঢ়ীভূত হল। বললে, ‘পারি। আপনার কৃপায় সব পারি। আপনার কৃপায় রোগ সারাতে পারি আপনার।’

পারো?

অভিপ্রায় বুঝতে পারলেন ঠাকুর। দূর্গাচরণ নিজের শরীরে ঠাকুরের ব্যাধি টেনে নিতে চাইছে। সহসা তাকে দুই হাতে ঠেলে দিলেন জোর করে। বললেন, ‘তা তুমি পারো জানি, তুমি পারো রোগ সারাতে। কিন্তু সারিয়ে দরকার নেই। সরে যাও, সরে যাও এখান থেকে।”

প্রথম যখন দক্ষিণেশ্বরে আসে, আসে সুরেশ দত্তর সঙ্গে। শুধু নাম শুনেছে আর বেরিয়ে পড়েছে। কোথায় দক্ষিণেশ্বর? তাও জানে না। উত্তরে যাও। উত্তরে গেলেই উত্তর মিলবে। দেখবে সেখানেই বসে আছেন সুদক্ষিণ।

চলেছে পায়ে হেঁটে। চলেছে তো চলেইছে। শেষে একজনকে জিজ্ঞেস করলে। দক্ষিণেশ্বর কোথায় বলতে পারেন? সে কি মশাই? দক্ষিণেশ্বর যে ছাড়িয়ে এসেছেন।

দুপুর দুটোর সময় মন্দিরে এসে পৌঁছলেন দুজন। কাউকে চিনি না, কোথায় থাকেন সেই ত্রিদশকুলেশ, কাকে জিজ্ঞেস করি? একজন দাড়িওয়ালা লোকের সঙ্গে দেখা হল হঠাৎ। ইনিই বলতে পারবেন হয়তো।

‘হ্যাঁ মশাই, এখানে একজন সাধু থাকেন?”

দাড়িওলা লোক আর কেউ নয়, প্রতাপ হাজরা। বললে, ‘হ্যাঁ, একজন আছেন বটে, কিন্তু আজ তো এখানে নেই।’

নেই? বসে পড়ল দুজনে। কোথায় গিয়েছেন?

‘চন্দননগরে গিয়েছেন। কবে ফিরবেন কে জানে। তোমরা আরেকদিন এস।’

অবসন্ন পায়ে আবার ফিরে চলো কলকাতা। হৃতসর্বস্বের মতো ফিরে চলো। কিন্তু, ওমা, ঐ দেখ ঘরের মধ্য থেকে দরজার ফাঁক দিয়ে হাতছানি দিয়ে কে ডাকছে। আর কে! ঐ সেই অনন্তাত্মা মহোদধি। অমানীমানন্দ লোক স্বামী। প্রতাপ হাজরাকে উপেক্ষা করে সটান ঢুকল ঠাকুরের ঘরে। ছোট তক্তপোশটির উপর পা ছড়িয়ে বসে আছেন ঠাকুর।

বারো বছর ধরে ঠাকুরের ছায়ায় বাস করছে হাজরা, তবু চিনতে পারল না ঠাকুরকে। শুধু সাধারণ সত্য কথাটুকুও বলতে শিখল না। কি করে শিখবে, কি করে চিনবে তিনি যদি না কৃপা করেন! তাঁর হাতেই ফুট-কম্পাস, চেন-দড়ি, তিনি না ছেড়ে দিলে মাপবে কি দিয়ে?

হৃদয়ের সঙ্গে সেই একবার কালীঘাটে গিয়েছিলেন ঠাকুর। দেখলেন পূর্বের পুকুর-পাড়ে কচুবনের মধ্যে কালী কুমারীবেশে আর কতগুলো কুমারীর সঙ্গে ফড়িং-ধরার খেলা করছেন। দেখেই ঠাকুর মা-মা বলে ডেকে উঠলেন আর সমাধিস্থ হলেন। সমাধি ভঙ্গের পর মন্দিরে এসে দেখলেন যে শাড়ি পরে কুমারীবেশে খেলা করছিলেন কালী ঠিক সেই শাড়ীখানিই মূর্তির গায়ে জড়ানো। ওরে হৃদে, একেই যে তখন দেখলাম ছুটোছুটি করছে-

সব শুনে হৃদয় ক্ষেপে উঠল। বললে, ‘তখন বলোনি কেন? ছুটে গিয়ে ধরে ফেলতম মাকে।’

“তা কি হয় রে!’ ঠাকুর বললেন, ‘তিনি যদি কৃপা করে না ধরা দেন কে তাঁকে ধরে!

কে তাঁর দর্শন পায়!’

সুরেশ দত্ত প্রণাম করল করজোড়ে। কিন্তু দুর্গাচরণ আরো বেশি যায়। তার উর্জী ভক্তি। প্রসাদের সঙ্গে সে শালপাতার ঠোঙা পর্যন্ত খেয়ে ফেলে। ভূমিষ্ঠ প্রণাম করে সে গেল ঠাকুরের পদধূলি নিতে। তুমি হলে জ্বলন্ত আগুন, তোমাকে কি পা ছুঁতে দিতে পারি? ঠাকুর পা সরিয়ে নিলেন।

বললেন দুর্গাচরণকে, “সংসারই তোমার পীঠস্থান। সংসারেই থাকবে। থাকবে পাঁকাল মাছের মতো। পাঁকের মধ্যে ডুবে আছে কিন্তু গায়ে পাঁকের স্পর্শ লেশ নেই। তেমনি গৃহে থাকো কিন্তু তার ময়লা যেন না লাগে। থাকো জনকের মত। তোমাকে দেখে লোকে শিখুক কাকে বলে গৃহাশ্রমী।’

যে বিষয়ে যযাতি ভোগী সেই বিষয়েই জনক রাজর্ষি। যে অভিমানে দূর্যোধনের সর্বনাশ সেই অভিমানেই ধ্রুবের সত্যলোকে অধিষ্ঠান।

উপদেশ তো শুনলাম, মানব তা অক্ষরে-অক্ষরে, কিন্তু দুটি হাত ভরে যে পদস্পর্শ নিতে দিলে না এ দুঃখ আমি রাখব কোথায়? অন্তরের নির্জনে বসে কাঁদতে লাগল দুর্গাচরণ। শুনেছি তুমি বাঞ্ছাকল্পতরু, তুমি শুনবে না আমার এই বেদনার নিবেদন? আমি আগুন নই, আমি জল, আমি গলিত-স্খলিত অমল প্রেমাশ্রু। একবারটি স্পর্শ করতে দাও তোমাকে। শীতাংশু সুধা-সমুদ্রের দুটি ঢেউ, তোমার দুটি পাদপদ্ম।

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করত দুর্গাচরণ। একদিন দক্ষিণেশ্বরে চলে এসেছে একা-একা। তাকে দেখে ঠাকুর মা খুশি। উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘তুমি ডাক্তারি করো, দেখ দেখি আমার পায়ে কি হয়েছে?

দূর্গাচরণ বসে পড়ল পায়ের কাছে। তীক্ষ চোখে দেখতে লাগল পা দুখানি। স্পর্শ করা বারণ, চোখ দিয়েই পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। বললে কুণ্ঠিতের মত, ‘কই কোথাও তো দেখছি না কিছুই।’

ঠাকুর হাসলেন। বললেন, ‘ভালো করে দেখ না কি হয়েছে।’

এতক্ষণে বুঝল দুর্গাচরণ। পা দুখানি চেপে ধরল দুহাতে। মাথা লুটিয়ে দিল পায়ের উপর। অন্তর্যামী শুনেছেন অন্তরের ঈপ্সা। আগুনকে অশ্রু করেছেন। কিন্তু প্রভু, আরো প্রার্থনা আছে। ইচ্ছে করে তোমার সেবা করি। বেশ তো, ঠাকুর তাকে নানা ফরমাশ খাটাতে লাগলেন। ওরে তামাক সেজে দে, গামছা আর বটুয়া নিয়ে আয়, গাড়ুতে জল ভর, নিয়ে চল ঝাউতলায়। দূর্গাচরণ এক পায়ে খাড়া। ডাকলেই হল বললেই হল, যেখান থেকে পারি যেমন করে পারি সম্পন্ন করে দেব। তুমি যদি বলো নিয়ে আসব অকালের আমলকী।

একদিন বললেন হাওয়া করতে। পাখাখানি তুলে দিলেন দুর্গাচরণের হাতে। বললেন, আমি একটু ঘুমুই।

জ্যৈষ্ঠ মাস, ফুটি-ফাটা মাঠে কাঠ ফাটা রোদ। সমানে হাওয়া করছে দুর্গাচরণ। হাত ব্যথা করছে তবু ক্ষান্ত হচ্ছে না। পাখা বন্ধ করলেই যদি জেগে ওঠেন। আমার অসামর্থ্যের জন্যে প্রভুর বিশ্রামের ব্যাঘাত হবে? কখনো না। হাত ভেরে উঠল, তবু ছাড়ছে না পাখা। হাত ছিঁড়ে পড়ছে যন্ত্রণায়, তবু না। ওকি, ঠাকুর যে নিজেই হাত ধরে পাখা বন্ধ করে দিলেন। তবে কি ঠাকুর ঘুমোননি?

দূর্গাচরণ বলে, ‘ঠাকুরের ঘুম সাধারণ নিদ্রাবস্থা নয়। তিনি সর্বদাই জেগে রয়েছেন। আর সকলে ঘুমোয় কিন্তু ভগবানের চোখে ঘুম নেই।’

একদিন বললেন তাকে ঠাকুর, ‘ডাক্তার উকিল মোক্তার দালাল-এদের ঠিক-ঠিক ধর্ম’লাভ হওয়া কঠিন। এতটুকু ওষুধে যদি মন পড়ে থাকে তবে আর কি করে বিরাট বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধারণা হবে?”

এখন তবে উপায়?

উপায় সহজ। দুর্গাচরণ ওষুধের বাক্স আর চিকিৎসার বই ফেলে দিল গঙ্গায়। দ্বিধার কুশাঙ্কুরটিও বিদ্ধ করল না।

দেশে ফিরেছে দুর্গাচরণ। উন্মনা, উদাসীন। বাপ দীনদয়াল অত্যন্ত রুষ্ট হয়েছেন। বললেন, ‘ডাক্তারি যে ছেড়ে দিলি এখন করবি কি?’

‘আমি কে করবার! যা হয় ভগবান করবেন।’

‘তোর মুন্ডু করবেন। বুঝতে আর আমার বাকি নেই।’ দীনদয়াল বিরক্তিতে ঝাঁজিয়ে উঠলেন। এখন ন্যাংটা হয়ে চলবি আর ব্যাঙ ধরে খাবি।’

বাবার যখন তাই ইচ্ছে, তবে তাই হোক। পলকে পরনের কাপড় খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল দুর্গাচরণ। উঠোনের কোণে পড়ে ছিল একটা মরা ব্যাঙ, তাই তুলে এনে মুখে পুরলে। চিবোতে চিবোতে বললে, ‘আপনার আদেশই পালন করলাম। এখন কৃপা করে আমার একটি অনুরোধ রাখুন। সংসারের কথা আর ভাববেন না। এখন জপ করুন ইষ্টনাম।’

বাড়ির লাউগাছটির কাছে গরু বাঁধা। দড়িটা ছোট, তাই আকণ্ঠ চেষ্টা করেও গাছের নাগাল পাচ্ছে না গরু। ক্ষুধার্ত দুই চোখে লোলুপ কাতরতা। ও মা, খাবি, খেতে সাধ গিয়েছে? নে, খা, তৃপ্তি করে খা। দড়িটা খুলে দিল দুর্গাচরণ। মূহুর্তে গাছটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।

‘জিহ্বার সুখেচ্ছা হবে।’ এই বলে নিজে মিষ্টি বা নুন খায় না দুর্গাচরণ। কিন্তু পরকে খাওয়ায় সাধ্যমত। সে গরুই হোক আর পাখিই হোক। অতিথিই হোক বা ভিখিরিই হোক। তুমি প্রীত হও, তৃপ্ত হও। ইষ্ট ছাড়া আমার আর কিছু মিষ্ট নেই। অশ্রু ছাড়া আমার আর নেই কিছু লবণাক্ত।

কলকাতার বাসার আদ্ধেকটায় কীর্তিবাস থাকে। চালের ব্যবসা করে। কুঁড়ো জমে থাকে তার আড়তে। তাই দুর্গাচরণ কুড়িয়ে নিয়ে এসে গঙ্গাজল মাখিয়ে খায়। বলে, ‘যা হোক কিছু খেয়ে জীবনধারণ করলেই হল, ভালো-মন্দ বিচারের প্রয়োজন কি? শুধু আহার আর তার আস্বাদ নিয়েই থাকব, তবে কখনই বা ডাকব ভগবানকে, আর কখনই বা তাঁর মনন করব? কুঁড়ো খেয়ে দিব্যি হালকা আছি।’ কাউকে হঠাৎ নিন্দা করে ফেলেছে বা কার উপর রাগ দেখিয়েছে অমনি আত্মপীড়ন শুরু হয়ে গেল। আর নিন্দে করবি? রোষভাষ করবি? রাস্তা থেকে এক টুকরো পাথর কুড়িয়ে এনে ঘা মারতে লাগল কপালে। বল আর অবাধ্য হবি? মানবিনে শৃঙ্খলা? কপাল ফেটে রক্ত ঝরতে লাগল। সে ঘা শুকোতে এক মাস। হবে না? একশোবার হবে। যে যেমন পাজি তার তেমনি শাস্তি হওয়া দরকার। ‘অহং-শালাকে ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে তার মাথা ভেঙে দিয়েছেন নাগমশাই।’ বলছে গিরিশ ঘোষ। বলছে, ‘নরেনকে আর নাগমশাইকে বাঁধতে গিয়ে বড়ই বিপদে পড়েছেন মহামায়া। নরেনকে যত বাঁধেন সে ততই বড় হয়ে যায়, মায়ার দড়ি আর কুলোয় না। শেষে নরেন এত বড় হল যে মায়া হতাশ হয়ে ছেড়ে দিলেন। নাগমশাইকে যত বাঁধেন সে ততই সরু হয়। ক্রমে এত সরু হলেন যে মায়াজালের মধ্য দিয়ে গলে চলে গেলেন পালিয়ে। ধরতে পেলেন না মহামায়া।’

আমি ক্ষুদ্দুর, আমি শুদ্দুর—এই বুলিই নাগমশায়ের মুখে। তোমাদের মুখে ও কিসের কথা? বিষয়প্রসঙ্গ রাখো। রামকৃষ্ণের কথা কও। আর সব কথার ইতি আছে। ঈশ্বরকথার ইতি নেই।

২৪

ঢ্যামনা সাপে ধরলে মরে না কিন্তু জাত-সাপে কামড়ালে এক ডাক, দু ডাক, তার পরেই মরণ! বললেন গিরিশ ঘোষকে।

তোর যা খুশি তাই কর। আমি যখন তোর ভার নিয়েছি তোর জন্মমরণের মরণ হয়ে গিয়েছে।

আমি দেখেছি মা-কালীর গা থেকে এক কৃষ্ণবর্ণ শিশুর উদ্ভব হল, হাতে সুধাভাণ্ড ও পানপাত্র। দেখেছি পান করতে-করতে দিব্যানন্দে বিভোর সেই শিশু। সেই শিশুই এই গিরিশ। ভৈরবের অংশে জন্ম তাই মদ্যপানে অনুরাগ।

কি দয়া! আমার এই অপরাধকে অপরাধ বলেই ধরলেন না। গিরিশ ভাবছে তদ্‌গত হয়ে। যে অপরাধে বাপ পর্যন্ত ত্যাজ্যপুত্তর করে তাও তাঁর কাছে অকিঞ্চিৎ।

মঙ্গলমুলমুদ্রা শ্রীসুন্দরীর পূজারী আমি। তাঁর এক হাতে ভোগ আর এক হাতে মোক্ষ। তেমনি আবার বামে বামা দক্ষিণে মদপাত্র, মুখে জপসাধন মস্তকে শ্রীনাথ। আর হৃদয়ে? আনন্দ হৃদয়াম্বুজে।

ঠাকুরের অসুখ। বসে আছেন বিছানার উপর। মেঝের উপর মাদুর পাতা। ভক্তেরা রাত জাগে পালা করে। ঠাকুরের প্রায় ঘুম নেই। পাহারাদার ভক্তেরাও বিনিদ্র। লাটু আর মাস্টারের সঙ্গে গিরিশও চলে এল উপরে। মাদুরের উপর বসল।

ঘরের কোণের আলোটি গেল আড়াল হয়ে।

ওগো আলোটি কাছে আনো। আমি গিরিশকে একটু দেখি।

মাস্টার আলোটি কাছে এনে ধরল।

‘ভালো আছ?” গিরিশকে জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।

ভালো আছি কিনা জানি না কিন্তু তোমার এই দয়াভরা প্রশ্নটিতেই ভালো হয়ে গেলাম সর্বাঙ্গে। তোমার করুণা সর্ব সাধিনী।

‘ওরে একে তামাক খাওয়া। পান এনে দে।’ লাটুর প্রতি হুকুমজারি করলেন। লাটু পান-তামাক নিয়ে এল।

তাতে কি তৃপ্তি আছে?

কিছুক্ষণ পরে আবার উঠলেন চঞ্চল হয়ে, ‘ওরে কিছু জলখাবার এনে দে।’

‘পান-টান দিয়েছি।’ লাটু বললে, ‘দোকান থেকে আনতে গেছে জলখাবার।’

কে এক ভক্ত ক’গাছা ফুলের মালা নিয়ে এসেছে। গলায় পরলেন সেগুলো একে-একে। পরলেন না, আর কাউকে পরালেন? আর কাউকে পরালাম। হৃদয়মধ্যে যে হরি আছেন তাঁকে পরালাম।

দুগাছি মালা তুলে নিলেন গলা থেকে। গিরিশকে বললেন, ‘এগিয়ে এস।’ গিরিশ এগিয়ে আসতেই তার গলায় উপহার দিলেন।

‘ওরে জলখাবার কি এল?’ আবার উঠলেন অস্থির হয়ে।

অসুখ ঘুম নেই, এত যন্ত্রণার মধ্যেও এত মমতা! এত করুণা! মানুষ ভগবান নয় তো কে ভগবান!

সেইদিন তাই কথা হচ্ছিল বলরাম-মন্দিরে। ঠাকুর বললেন গিরিশকে, ‘তুমি একবার লরেনের সঙ্গে বিচার করে দেখ, সে কি বলে।’

‘দেখেছি। সে মানতে চায় না। বলে ঈশ্বর অনন্ত। যে অনন্ত তার আবার অংশ কি! তার অংশ হয় না।’

‘হয়।’ বললেন ঠাকুর, ‘ঈশ্বর ইচ্ছে করলে তাঁর সারবস্তু পাঠাতে পারেন মানুষের মধ্য দিয়ে। শুধু পারেন না পাঠান। এ তোমাদের উপমা দিয়ে কি বোঝাব? গরুর মধ্যে গরুর শিংটা যদি ছোঁও, গরুকেও ছোঁয়া হল। পা বা লেজ ছুঁলেও তাই। কিন্তু আমাদের পক্ষে গরুর সারবস্তু হচ্ছে দুধ। বাঁট দিয়ে সেই দুধ আসে। অবতার হচ্ছে গাভীর বাঁট।’ থামলেন ঠাকুর। আবার বললেন, ‘তেমনি প্রেমভক্তি শেখাবার জন্যে মানুষের দেহ ধারণ করে মাঝে মাঝে আসেন ঈশ্বর।’

পরশরতন শুনেছ এবার শোনো মানুষরতন। অবতারই হচ্ছে সেই মানুষরতন। ‘নরেন বলে, গিরিশ বললে, ‘ঈশ্বরের ধারণা কে করতে পারে? তিনি অন্তহীন।’

“হোন। তাঁকে ধারণা করা কি দরকার? তাঁকে একবার দেখতে পারলেই হল। তাঁর অবতারকে দেখা মানেই তাঁকে দেখা। যদি কেউ গঙ্গার কাছে গিয়ে গঙ্গাজল স্পর্শ করে আসে, সে বলে গঙ্গা দর্শনস্পর্শন করে এলাম। সব গঙ্গাটা হরিদ্বার থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত হাত দিয়ে ছুঁতে হয় না। তোমার পা-টা যদি ছুঁই তোমাকেই ছোঁয়া হল। তাই নয়? আগুন সব জায়গায় আছে তবে কাঠে বেশি।’

‘তাই যেখানে আগুন পাবো সেখানে আগুন পোয়াবো।’ গিরিশ বললে তৃপ্ত মুখে।

‘তেমনি ঈশ্বর যদি খোঁজো, মানুষে খুঁজবে-

রূপে-রূপে রূপ মিশায়ে আপনি নিরাকার।

“মানুষেই তেমনি তাঁর বেশি প্রকাশ, বিশেষ প্রকাশ। যে মানুষে দেখবে প্রেমভক্তি উথলে পড়ছে, ঈশ্বরের জন্যে যে পাগল, তাঁর প্রেমে মাতোয়ারা, সেই মানুষে নিশ্চয় জেনো তিনি অবতীর্ণ। যিনি তারণ করেন তিনিই অবতার।

‘কিন্তু নরেন্দ্র বলে তিনি অবাঙমনসগোচর’–

‘মনের গোচর নয় বটে কিন্তু শুদ্ধ মনের গোচর। বুদ্ধির গোচর নয় বটে শুদ্ধ বৃদ্ধির গোচর।’ বললেন ঠাকুর, ঋষিমুনিরা কি তাঁকে দেখেননি? তাঁরা চৈতন্যের দ্বারা চৈতন্যের সাক্ষাৎকার করেছিলেন।’

‘কিন্তু যাই বলুন, নরেন আমার কাছে তর্কে হেরে গেছে।

হেরে গেছে? ঠাকুর চমকে উঠলেন। অবতার-তত্ত্ব মানে না, নরেনের হেরে যাওয়াই তো উচিত একশো বার ত, তাঁর নরেন হারবে এ যেন সহ্যের বাইরে।

বললেন, ‘না, হারেনি। আমায় এসে বললে গিরিশ ঘোষের মানুষকে অবতার বলে এত বিশ্বাস, তার আমি কি বলব। অমন বিশ্বাসের উপর কিছু বলতে নেই। তাই ছেড়ে দিল তর্ক।’

নরেন মানে না, তবু নরেনকে ভালোবাসেন। নরেন তবে হেরে যাবে এ অসহনীয় লাগে। আর, এ কেমনধারা তর্ক? যে তর্কে স্বয়ং ঠাকুরকে বাতিল করে দিচ্ছে। আমি নস্যাৎ হই তো হব তবু নরেন জিতুক। আমাকে হারিয়ে ওর যে জিত সে তো আমারও জিত।

একদিন ও ঠিক বুঝবে। এমন অগাধ যার হৃদয় সে বুঝবে না? বুঝবে আমার অবতারতত্ত্বের মানে কি।

মানে হচ্ছে এই, সকলেই তাঁর অবতার, সকলেই তাঁর প্রতিচ্ছায়া। জীবে জীবে চেয়ে দেখ সবই যে তাঁর অবতার। তুই নতুন লীলা কি দেখাবি তাঁর নিত্যলীলা চমৎকার।” আমি নিয়ে এসেছি এই মহতী প্রতিশ্রুতি এই বৃহতী সম্ভাবনা। মানুষকে প্রমাণিত হতে হবে প্রকাশিত হয়ে। প্রকাশিত হবে সে কখন? যখন সে তার অন্তরের অমৃতময় অমিততেজ পুরুষকে উদ্ঘাটিত করতে পারবে, উন্মোচিত করতে পারবে। সেখানেই সে অবতার, ঈশ্বর সমান।

ঠিক বুঝবে একদিন নরেন। জীবকে শুধু, জীবজ্ঞানে সেবা করবে না, জীবকে শিব-জ্ঞানে পূজা করবে। সে পূজা ভালোবাসা। সে পূজা দুঃখমোচন, কলঙ্কমোচন! অপমানের অবহেলার উচ্ছেদ। সত্তাসীমার সম্প্রসার।

রাষ্ট্র হবে নতুন জীবনবেদ, নবতর সাম্যবাদ। শুধু পঙক্তি সমান নয় পাত্র সমান। শুধু ভোগের বস্তু সমান নয়, ভোগ করার ক্ষমতাও সমান। শুধু পরিবেশনে সমান নয় আস্বাদনেও সমান।

‘ওরে এল জলখাবার?’ আবার চঞ্চল হলেন ঠাকুর।

মাস্টার পাখা করছিলেন, বললেন, ‘আনতে গেছে। এই এল বলে।

কে না কে গিরিশ তাকে খাওয়াবার জন্যে ঠাকুরের এত ব্যাকুলতা- গিরিশ যেন এ করুণার পারাপার দেখছে না! বাঁধা-বরাদ্দ অনেক পেয়েছে সে, এ যে উপরি-পাওনা! উপরি-পাওনার শেষ নেই।

এসেছে খাবার। ফাগুর দোকানের গরম কচুরি, লুচি আর মিষ্টি। সেই বরানগরে ফাগুর দোকান।

ঠাকুর আগে প্রসাদ করে দিলেন। তারপর খাবারের থালা ধরে দিলেন গিরিশের হাতে। বললেন, ‘বেশ কচুরি। খাও।’

ভুখা কি দুহাতে খায়? তবু গিরিশের ইচ্ছে হল ঠাকুরকে খুশি করার জন্যে খায় সে গোগ্রাসে।

খাবার দিয়েছি, এবার জল দিতে হয়। ঐ তো আমার কুঁজো, ওখান থেকে গড়িয়ে দিলেই হবে। উঠে পড়লেন ঠাকুর। রুগ্ন, দুর্বল, পা টলছে, তবু এগিয়ে চললেন কুঁজোর দিকে। রুদ্ধ নিশ্বাসে চেয়ে রইল ভক্তেরা। গিরিশও স্তম্ভিত। বাধা দেবার কথা ওঠে না, সবাই দিব্যানন্দে বিনিশ্চল।

ঠিক জল গড়ালেন কুঁজো থেকে। বোশেখ মাস, গ্লাশ থেকে খানিকটা জল হাতে নিয়ে অনুভব করলেন যথেষ্ট ঠাণ্ডা কিনা। যতটা ভেবেছিলেন ততটা নয়। কিন্তু কি আর করা যায়। এর চেয়ে ঠাণ্ডা আর পাবেন কোথায়! অগত্যা তাই দিলেন এগিয়ে।

খাদ্য খেয়ে পেট ভরে, রসনার তৃপ্তি হয়। জল খেয়ে গলা ভেজে, বুক জুড়োয়। কিন্তু এ যে খাচ্ছে গিরিশ এ কি খাদ্যপানীয়? কোন ক্ষুধা কোন তৃষ্ণার নিবারণ হচ্ছে কে জানে?

খেতে-খেতে বললে গিরিশ, ‘দেবেনবাবু সংসার ত্যাগ করবেন।’

ঠাকুর যেন খুশি হলেন না। কথা বলতে কষ্ট হয়, তাই আঙুল দিয়ে ওষ্ঠাধর স্পর্শ করে ইশারায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘তার পরিবার-পরিজনের খাওয়া-দাওয়া হবে কি করে? চলবে কি করে সংসার?”

‘তা জানি না।’

এ সেই দেবেন মজুমদার। বলে দিয়েছিলেন ঠাকুর, তোমার বাড়ি যাব একদিন। এই ধরো সামনের রবিবার। দেখো, তোমার আয় কম, বেশি লোকজন ডেকো না। আর, বাড়িও তোমার সেই কোথায়। গাড়িভাড়াও দুর্মূল্য।

দেবেন্দ্র হাসল। বললে, ‘হলই বা আয় কম, ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ—’

কথা শুনে ঠাকুরের কি হাসি। যে করেই হোক আমার ঘি খাওয়া চাই। অন্যে ঠকুক আমি ঠকতে পারব না। খবর যখন পেয়েছি চেয়ে-চিন্তে চুরি করে আদায়-আস্বাদ করতেই হবে।

নিমু গোস্বামীর লেনে দেবেনের বাড়িতে এসেছেন ঠাকুর। বাড়ি পৌঁছেই বললেন, ‘আমার জন্যে খাবার কিছু কোরো না, অতি সামান্য, শরীর তত ভালো নয়।’ কুলপি-বরফ তৈরি করেছে দেবেন। তাই খেয়ে ঠাকুরের মহানন্দ। গান ধরেছেন ভাবোল্লাসে

  এসেছেন এক ভাবের ফকির-

ও সে হিন্দুর ঠাকুর, মুসলমানের পীর।

সকলের সকল। একলার একলা। কারুর ভাব আমি নষ্ট করিনে। যে নষ্ট-ভ্রষ্ট তারও না। শুধু একটু বেঁকিয়ে দিই। শুধু যে পাপী তাকে বলি মায়ের সন্তান বলে নিজেকে ভাবতে। যেথা খুশি সেথা যাও যাহা খুশি তাহা করো, শুধু, মাকে সঙ্গে নিয়ে যাও, মাকে সঙ্গে নিয়ে করো। যে মুহূর্তে মা তোমার সঙ্গে সে মুহুর্তে তুমি শুদ্ধ তোমার কর্ম শুদ্ধ তোমার চিন্তা শুদ্ধ। মা তোমাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাবে যা মঙ্গলের ক্ষেত্র, এমন কাজে প্রেরিত করবে যা সৌন্দর্যের কর্ম। পৃথিবীতে সর্বত্র মা-তে ওতপ্রোত হও। ভূ-তে থেকে মা-তে প্রসারণ, তারই নাম ভূমা।

‘রামবাবু আপনার কথা লিখেছেন বইয়ে।’ কে একজন বললে ঠাকুরকে। ‘সে আবার কি!

‘পরমহংসের ভক্তি—এই নিয়ে।’

‘তবে আর কি।’ ঠাকুর বললেন সহাস্যে, ‘এবার রামের খুব নাম হবে।’ গিরিশ টিপ্পনি কাটল। ‘সে বলে সে আপনার চেলা।’

‘আমার চেলাটেলা কেউ নেই।’ ঠাকুর বললেন বিগলিত হয়ে, ‘আমি রামের দাসানুদাস।’

আমি অণুর অণু, রেণুর রেণু। আমি তৃণের তৃণ, ধূলির ধূলি। ‘আমি’ খুঁজতে-খুঁজতে ‘তুমি’ এসে পড়ে। তুমি তুমি তুমি।

‘খুব কুলপি খেয়েছি।’ গাড়িতে উঠে বলছেন মাস্টারকে: ‘তুমি নিয়ে যেও আরো গোটা চার-পাঁচ—’বালকের মত আনন্দ করছেন।

ঠাকুরকে গাড়িতে তুলে দিয়ে ফিরল দেবেন। দেখল উঠোনে তক্তপোশের উপর কে একটা লোক ঘুমিয়ে আছে। কাছে গিয়ে ঠাহর করে দেখল পাড়ারই বাসিন্দে। ওঠো, ওঠো, ডাকল তাকে দেবেন। লোকটি উঠে বসে চোখ মুছতে-মুছতে বললে, ‘পরমহংসদেব কি এসেছেন?’ সবাই হেসে উঠল। এসেছেন কি মশাই, এসে চলে গেছেন। সর্বস্বান্তের মত তাকিয়ে রইল লোকটি। সেই কখন থেকে বসে আছে ঠাকুর দর্শনের আশায়। তখনো আসেননি, বসে থেকে-থেকে তাই একটু শুয়ে পড়েছিল, চৈত্র মাস, হাওয়া দিয়েছিল ঝিরঝির করে। এখন জেগে উঠে দেখে চলে গেছে সেই রাজকুমার।

মোহনিদ্রায় অস্ত গিয়েছে সে স্বর্ণলগ্ন। এখন কাঁদতে বসল অন্ধকারে। আমি ঘুমিয়ে পড়ি কিন্তু তোমার চোখে তো ঘুম নেই! তুমি আমাকে জাগালে না কেন? এবার তবে জাগাও, স্নিগ্ধ আলোকে না হোক, রুদ্র আলোকে। আনন্দে না হোক, হাহাকারে। আঁধার রাতের রাজা হয়েই তবে দেখা দাও। আমার ছিন্ন শয়ন ধূলায় টেনে তোমার জন্যে আঙিনা সাজাবো।

ঠাকুরের কেবল নরেন-নরেন। তাই নিয়ে অভিমান হয়েছে দেবেনের। সেবার স্টার থিয়েটারে বৃষকেতু নাটক দেখবার শেষে জমায়েত হয়েছে সকলে। নরেন, গিরিশ, আরো অনেকে। কিন্তু দেবেন আসেনি।

‘দেবেন আসেনি কেন?’ জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।

‘অভিমান করে আসেনি।’ বললে গিরিশ। বলে, আমাদের ভিতর তো ক্ষীরের পোর নেই, কলায়ের পোর। আমরা এসে কি করব?”

জলখাবার দিয়েছে ঠাকুরকে, তাই থেকে আবার নরেনকে দিচ্ছেন।

যতীন দেব কাছে ছিল, ঠাট্টা করে উঠল। ‘আমরা শালারা সব ভেসে এসেছি। শুধু নরেন খাও, নরেন খাও। আর কেউ জানে না খেতে।’

যতীনের থুতনি ধরে আদর করলেন ঠাকুর। বললেন, ‘সেখানে, দক্ষিণেশ্বরে যাস। সেখানে গিয়ে খাস।’

অবস্থা প্রায় অচল দেবেনের। জমিদারি সেরেস্তায় দিনে যা কাজ করে তাতে কুলোয় না, তাই মিনার্ভা থিয়েটারে ক্যাশিয়ারির চাকরি নিলে। শুধু ক্যাশিয়ারি নয়, থিয়েটারের এটা-ওটা ফরমাশ খাটো। সময়ে অসময়ে নটীদের ডেকে আনো তাদের বাড়ি থেকে। ক্রমে ক্রমে, কাজলের ঘরে কাজ করতে গিয়ে গায়ে দাগ লেগে গেল। অনুতাপে পুড়তে লাগল দেবেন।

নাগমশাই হঙ্কার দিয়ে উঠল-ভয় কি, গুরু আছেন সঙ্গে, ধুয়ে দেবেন।’ সেই কথাই বলছে দেবেন কৃতাঞ্জলি হয়ে। ‘জীবনে হীন কাজ করলে ভগবানের পথ থেকে যে জন্মের মত বিচ্যুত হবে এমন কোনো বিধি নেই। কত জঘন্য কাজ যে করেছি তবু করুণাময় ঠাকুর আমাকে ত্যাগ করেননি।’

তাই তো বললেন বিবেকানন্দ, একটানা উন্নতি প্রকৃত মহত্ত্বের পরিচায়ক নয়। প্রত্যুতপ্রতি পদস্খলনের পরে যে পুনরভ্যুত্থান তাই প্রকৃত মহত্ত্ব।

পুরোনো কথায় ফিরে এল গিরিশ। ঠাকুরকে লক্ষ্য করে বললে, ‘আচ্ছা মশাই, কোনটা ঠিক? কষ্টে সংসার ছাড়া, না, সংসারের কষ্টে তাকে ডাকা? ‘

‘যারা কষ্টের জন্যে সংসার ছাড়ে তারা হীন থাকের লোক। আমি তো সংসার ছাড়বার দলে নই। আমি লোকেদের বলি এ-ও করো ও-ও করো। সংসারও করো, ঈশ্বরকেও ডাক। সব ত্যাগ করতে বলি না। কেমন খাচ্ছ কচুরি?

‘ফাগুর দোকানের কচুরি। চমৎকার! খেতে-খেতে একমুখ হাসল গিরিশ। ‘হ্যাঁ, লুচি থাক, কচুরিই খাও। কচুরি রজোগুণের। কচুরিই খাও।’

খেতে-খেতে গিরিশ বললে, ‘আচ্ছা মশাই, মনটা এই বেশ উঁচু আছে, আবার নিচু হয় কেন?”

‘সংসারে থাকতে গেলেই ওরকম হয়। কখনো উঁচু, কখনো নিচু। কখনো ঈশ্বরচিন্তা হরিনাম করে, কখনো বা কামিনী কাঞ্চনে মন দিয়ে ফেলে। যেমন সাধারণ মাছি, কখনো সন্দেশে বসছে কখনো বা পচা ঘায়ে। কিন্তু মৌমাছি করে কি। মৌমাছি কেবল ফুলে বসে। ফুল ছাড়া আর কিছু তার খাবার নেই।’

দক্ষিণের ছোট ছাদটিতে হাত ধুতে গেল গিরিশ।

মনে পড়ল কতদিন বারাঙ্গনারা কাছে বসে খাইয়েছে। আজ ঠাকুর খাওয়ালেন।

‘ওগো অনেকগুলি কচুরি খেয়েছে গিরিশ।’ ব্যস্ত হয়ে মাস্টারকে বললেন, ‘বলে দাও বাড়িতে আজ আর কিছু না খায়।’

শুধু সুখ দেখেন না কল্যাণ দেখেন। দয়াসারসিন্ধু। কারুণ্যকল্পদ্রুম। শুধু খাওয়ান না, হজমের খবর নেন।

হাত-মুখ ধুয়ে পান চিবুতে চিবুতে গিরিশ আবার বসল ঠাকুরের কাছটিতে। ‘ঐ যে বলেছি পাঁকাল মাছের মত থাকো’

‘রাখুন মশায়, অতশত বুঝি না। মনে করলে সব্বাইকে আপনি ভালো করে দিতে পারেন—কেন করবেন না?’ গিরিশ রোক করে উঠল। ‘মলয়ের হাওয়া বইলে সব কাঠ চন্দন হয়।’

‘কে বললে হয়? সার না থাকলে হয় না চন্দন।’

‘অতশত বুঝি না মশাই—’আবার তম্বি করে উঠল গিরিশ।

‘আইনেই ও রকম আছে।’

‘আপনার সব বে-আইনি।’

‘তবে হ্যাঁ, তেমন ভক্তি যদি হয় আইন নাকচ হয়ে যায়। ভক্তি-নদী ওথলালে ডাঙায় এক-বাঁশ জল।’ বললেন ঠাকুর, ‘ভক্তি যদি উন্মাদ হয়, বেদবিধি মানে না। দূর্বা তোলে তো বাছে না। যা হাতে আসে তাই নেয়। তুলসী ছেঁড়ে না পড়-পড় করে ডাল ভাঙে।’

আল-বাঁধ, দরজা-চৌকাঠ উঠে যায়। গণ্ডি-চৌহদ্দির চিহ্ন থাকে না!

সেই মধুরভাবিনী পাগলির কথা উঠল। ঠাকুরকে মধুরভাবে ভজনা করে। একদিন দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে কাঁদছে অঝোরে। কি হল, কাঁদছিস কেন? জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর। পাগলি বললে, মাথা ব্যথা করছে–

‘সে পাগলি ধন্য।’ গিরিশ হুঙ্কার দিয়ে উঠল: ‘যে ভাবেই হোক আপনাকে অষ্ট প্রহর সে চিন্তা করছে। আর মশায়, আমি? আপনাকে চিন্তা করে আমি কি ছিলাম কি হয়েছি-‘

কী ছিলাম? অহঙ্কারী ছিলাম। দক্ষযজ্ঞে দক্ষের অভিনয় দেখে ঠাকুরই বলেছিলেন, দেখেছ, শালা যেন অংখারে মট-মট করছে। গয়াতে ব্রহ্মযোনি পাহাড়ে উঠতে গিয়েছি, পা পিছলে মরি আর কি। প্রাণভয়ে বলে ফেললাম, ভগবান রক্ষা করো। পরক্ষণেই বলে উঠলাম, থু, থু! যদি কখনো প্রেমে ডাকতে পারি ভগবানকে, তবেই ডাকবো, ভয়ে নয়। তাই তো প্রেমের ঠাকুর নেমে এলে। ডাকবার আগে নিজেই ডেকে নিলে। অলস ছিলাম। এখন সে আলস্য সমর্পণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরূপ প্রেমনির্ভর। পাপী ছিলাম। এখন কৃষ্ণ লোহা কান্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। যা ছিল সূরা তাই হয়েছে সুধা।

তুচ্ছকে আদর করিনি কোনোদিন। এখন অমানীমানদ হয়েছি। চারদিকে দেখতে পাচ্ছি এক মহারসের প্রকাশ। যা ছিল দণ্ডপলের, তাই এখন অখণ্ড কালের। দেখিনি এতদিন। আজ দেখতে পাচ্ছি। এই দেখতে পাওয়াটাই মুক্তি। সৃষ্টির মুক্তি নয়, দৃষ্টির মুক্তি। ‘আনন্দরূপমমৃতং যদ্বিভাতি।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *