৫
এই সেই বীর-বিদ্রোহী ভক্তপ্রবর কেশবচন্দ্র।
কেশবের সমস্ত ধর্ম সাধনার মূলে হচ্ছে তার মা, সারদাসুন্দরী। কেশব প্রাচীন ধর্ম-কর্ম মানছে না এই তাঁর বিষম চিন্তা। অভিভাবকরা ঠিক করেছেন কুলগুরুর মন্ত্র দিতে হবে তাকে। দিন ঠিক হয়েছে। গুরুদেব উপস্থিত। সব উপকরণ সাজিয়ে মা বসে আছেন। অভ্যাগত-নিমন্ত্রিতের ভিড় বাড়ছে। কিন্তু যাকে উপলক্ষ্য করে এই আয়োজন তার দেখা নেই। কেশব চলে এসেছে দেবেন ঠাকুরের আশ্রয়ে। বলে পাঠিয়েছে পৌত্তলিক গুরুমন্ত্র আমি নেব না।
বাড়ির আর সবাই ঘোরতর বিরক্ত, পারে তো ছিঁড়ে খায় কেশবকে, কিন্তু সারদা-সুন্দরী নিজের দুঃখকে ছেলের সত্যের চেয়ে বড় করে দেখতে পেলেন না। ছেলে যদি সত্যভ্রষ্ট হয় সে দুঃখ যে দ্বিগুণ হয়ে বাজবে।
ব্রাহ্মসমাজের কখানা বই মা’র হাতে দিয়ে গেল কেশব। বললে, পড়ে দেখ।
সুন্দর-সুন্দর কথা। কেশব ব্রহ্মজ্ঞানী হবে, গুরুর থেকে মন্ত্র নেবে না-কি এর তাৎপর্য ভালো বুঝতে পারেননি সারদা। কোথায় সে ব্রাহ্মসমাজ কে জানে। কিন্তু এ বইয়ে যা লেখা আছে তা যদি ওদের ধর্ম হয় তো মন্দ কি। গুরুঠাকুরকে দেখালেন বই। বললেন, ‘কেশব কি ধর্ম পেয়েছে দেখুন।
ঠাকুর পড়লেন যত্ন করে। বললেন, ‘এ তো খুব ভালো ধর্ম। তুমি ভেবো না, তোমার কেশব যে পথ ধরেছে তাতেই তার মঙ্গল হবে।’
সুন্দর অক্ষরে মাকে কটি প্রার্থনা লিখে দিল কেশব। রোজ তাই পড়েন সারদা-সুন্দরী। নির্মল একটা তৃপ্তির স্পর্শে অন্তর-বাহির জুড়িয়ে যায়। হরিমোহন সেন, কেশবের জ্যাঠামশাই, একদিন দেখে ফেললেন। কী পড়ছ দেখি?
নাটক-নভেল কিছু নয়। ঈশ্বরের কথা। ঈশ্বরকে প্রার্থনা।
‘কে লিখে দিয়েছে? কার হাতের লেখা?’ গর্জে উঠলেন হরিমোহন। চোখ নত করলেন সারদাসুন্দরী। কথা কইলেন না।
‘বুঝতে পেরেছি কার। কেশবের।’ বলেই হরিমোহন কাগজ কখানা ছিঁড়ে ফেললেন টুকরো-টুকরো করে।
ছেলেকে গিয়ে আবার ধরলেন সারদাসুন্দরী। বললেন, ‘আমাকে আরেকবার লিখে দে।’ কেশব বললে, ‘লিখে লাভ নেই, আবার ছিঁড়ে ফেলবে।’
বিশ বছরের ছেলে, বিজ্ঞ অভিভাবকদের কথা রাখে না, এ অসহ্য। কিন্তু যে হরিমন্ত্র দিয়ে জগজ্জনকে নববিধানে দীক্ষিত করতে এসেছে, তার কাছে কিসের গুরুমন্ত্র! যে নিজে জগদ্গুরু তার কাছে আবার কিসের গুরুজন!
হিন্দু পরিবারে থেকে গুরুমন্ত্রে দীক্ষা না নেওয়া গুরুতর পরীক্ষা। কি হল জানবার জন্যে ছেলে সত্যেনকে পাঠিয়ে দিলেন দেবেন ঠাকুর। সত্যেন গিয়ে খবর দিল, জিতেছে কেশব। দেবেন ঠাকুর লাফিয়ে উঠলেন।
বক্তৃতা করে ফিরতে লাগল কেশব। একেকটা বক্তৃতা তিন-চার ঘণ্টা ধরে। যতক্ষণ স্বর-ভঙ্গ না হয় ততক্ষণ উচ্চগ্রামে বলে যাও হরিনাম। অগ্রসর হও, ডাইনে-বাঁয়ে কোনো দিকে না তাকিয়ে দৃঢ়পায়ে এগিয়ে যাও।
যিনি আমাদের আলোক আর শক্তি, পিতা আর বন্ধু, তাঁর দিকে স্থির চোখে ভিখারীর দৃষ্টিতে চেয়ে থাকো। তিনি তোমার অন্তরে দেবেন জ্ঞান হৃদয়ে প্রেম আত্মায় পবিত্রতা আর দুহাত ভরে দেবেন শৌর্যে আর সাহসে। এগিয়ে যাও।
‘হ্যাঁ গা, ছেলেকে একটু দাবতে পারো না?” বললে কে এক হিতৈষিণী। ‘রাত্রে ঘুমোয় না, মারা যাবে যে।
ছেলে আমার অসাধ্যসাধন করবে। গর্ব না করে প্রার্থনা করেন সারদাসুন্দরী। ছেলে-বেলা থেকেই সে অস্থির হয়ে ছুটোছুটি করছে। ছেলেবেলা থেকেই গরদের চেলি পরে নাকে তিলক গায়ে ছাপ এঁকে গলায় মালা দিয়ে ভক্ত সাজতে সে ভালোবাসে। সে যে একটা কাণ্ড-কারখানা করবে এ আর বিচিত্র কি।
দেবেন ঠাকুরের সঙ্গে সিংহল গেলেন কেশব সেন। আর কিছুর জন্যে নয়, জাহাজে চড়া ম্লেচ্ছাচার—এ কুসংস্কার অমান্য করবার জন্যে। কলুটোলা সেনপরিবারে এ এক নিদারুণ ঘটনা। কিন্তু কেশব ছাড়া আর কার হবে এ দুঃসাহস!
সারদাসুন্দরী ভয় পেলেন পরিণাম ভেবে। আর কেশবের বালিকা বধূ কান্নার রোল তুললে। সমুদ্রের ঢেউয়ে সে কান্না আর শোনা গেল না।
দিগ্বিজয় করে ফিরল কেশব। খৃষ্টানির সংস্পর্শে যত কুরীতি-দুর্নীতি এসেছিল সমাজে তার বিরুদ্ধে লড়তে লাগল। লড়তে লাগল যত অন্ধ সংস্কার ও যত বন্ধ দরজার বিরুদ্ধে। মেয়েদের অবরোধ ঘুচে গেল, নতুন ব্রাহ্মিকার সাজে পরদার বাইরে আসতে লাগল একে-একে। ব্রাহ্মণ যুবকেরা ছিঁড়ে ফেলল পৈতে। দেবেন ঠাকুরও উপবীত ত্যাগ করলেন।
এ দিকে রণে ভঙ্গ দিতে লাগল পাদরিরা। যে খৃষ্টধর্ম তারা প্রচার করছে, সেটা যে মেকি তাই বাইবেল দেখিয়ে প্রমাণ করল কেশব। পাদরির উপর পাদরিগিরি চালালো। কেশবের সভায় লোক ধরে না, আর পাদরির সভায় ঠনঠন।
ব্রাহ্মসমাজের প্রধান আচার্য পদে বরণ করা হবে কেশবকে। সেই উপলক্ষ্যে দেবেন ঠাকুরের জোড়াসাঁকোর বাড়িতে বিরাট উৎসব। পত্রপুষ্প-পতাকা আর দীপমালার শোভা। সে শোভার সভাপতি কেশব!
কেশব ঠিক করল স্ত্রীকে নিয়ে যাবে সে সভায়। মা’র কাছে অনুমতি চাইল আগের রাত্রে। বীর-বিপ্লবীর মা সারদাসুন্দরী, অনুমতি দিলেন। স্ত্রী তো শয্যাসঙ্গিনী নয়, স্ত্রী সহধর্মিনী। স্বামীর সঙ্গে-সঙ্গে যাবে ঠিক সীতার মত।
কিন্তু বাড়ির আর সবাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। মেয়ের দল ধমকালো সারদাসুন্দরীকে। ‘বউকে সেতখানার মধ্যে বন্ধ করে রাখো। নইলে জাত-কুল সব যাবে।’ সে কথা কানে নিলেন না মা। কিন্তু গৃহস্বামী হরিমোহনের আদেশ আরো দুর্দান্ত। ফটকের দরজায় তালা লাগিয়ে দাও। সর্বক্ষণ মোতায়েন রাখো দারোয়ান। স্ত্রীর ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল কেশব। বললে, ‘হয় আমার সঙ্গে চলো, নয় পরিবারের গুরুজনদের সঙ্গে থাকো। এই শুভমুহূর্তে–দ্বিধা করবার দেরি করবার সময় নেই।’
পঞ্চদশী কিশোরী বধূ স্বামীর সহগামিনী হল।
পরিচিত প্রাচীন চাকর, সেও পর্যন্ত শাসন করে উঠল: ‘আরে, তুমি ভদ্রলোকের মেয়ে তুমি কোথা যাও?”
বন্ধ ফটকের কাছে এসে দাঁড়াল দুজনে। স্ত্রীকে পাশে পেয়ে কেশবের শক্তি দ্বিগুণ দুর্জয় হয়ে উঠল। রূঢ় ধমক দিল দারোয়ানকে: ‘খোলো দরজা।’ সম্মূঢ়ের মত দরজা খুলে দিল দারোয়ান। বাড়ির কাছেই পালকির আড্ডা। একটা পালকি ভাড়া করে স্ত্রীকে বসিয়ে দিলে। নিজে চলল পায়ে হেঁটে।
শুধু বন্ধনমোচনেই নয় যোগসাধনের সহধর্মিনী। নৈনিতালের নির্জন পৰ্বতে সস্ত্রীক শিলাসনে বসে ধ্যান করছে কেশব। কেশবের পরনে ব্যাঘ্রচর্ম, আর স্ত্রীর পরনে গৈরিক। মহাদেবের পাশে অপর্ণা।
উৎসবগৃহে বিচিত্র আমিষ-ভোজ্যের আয়োজন হয়েছে। অশাস্ত্রীয় মাংস। কেশব ইংরিজি শিখে ব্রহ্মজ্ঞানী হয়েছে, আহারব্যাপারে নিশ্চয়ই তার কুসংস্কার নেই। কিন্তু যে আমিষবস্তুই কাছে আনে কেশব বলে, খাই না। ক্ষুব্ধ হলেন দেবেন ঠাকুর। কিন্তু উপায় কি! বাড়ির ভিতর রুগীর জন্যে তৈরি কিছু নিরামিষ রান্না ছিল তাই দেওয়া হল কেশবকে। তাতেই কেশবের অখণ্ড তৃপ্তি। তার তো আহার নয়, তার আহুতি। সে যে কর্মজ্ঞানমার্গ থেকে চলে আসবে ভক্তিমার্গে। সে তো শুধু ভাঙবার জন্যে নয়, বাঁধবার জন্যে নয়, কাঁদবার জন্যে।
ব্রাহ্মসমাজে খোল করতাল ঢোকাল কেশব। নিন্দা কুৎসা উপহাস করতে লাগল সকলে। কিন্তু স্বদেশের ধর্ম প্রকৃতির নিগূঢ় মর্মটি ঠিক বুঝতে পেরেছে কেশব।
হরিপ্রেমে মত্ত হয়ে নৃত্য করতে হবে, ভক্তিকে প্রগাঢ় করতে হবে ভালোবাসায়। ছাড়তে যেমন বিদ্রোহী ধরতেও তেমনি। কীর্তনরসে কঠোর ব্রাহ্মধর্মকে রসসিঞ্চিত করলেন। আগে ছিলেন যীশু খৃষ্ট এখন ‘প্রমত্ত মাতঙ্গ শ্রীগৌরাঙ্গ।’
হেসেছে কেঁদেছে নেচেছে! জগজ্জনকে মাতিয়ে দিয়েছে। ঈশ্বরনেশায় বিভোর করেছে! হায় হায় সে-কেশবের এই দশা! কোথায় সেই কনককান্তি, সেই বিদ্যুৎ-উন্মেষ-দৃষ্টি! সেই বাগবজ্রে বংশীধ্বনি!
দল—দলই ওকে দ’লে দিয়েছে। লাট করে ফেলেছে। ভগবানে যোগ করতে গিয়ে ও দলের সঙ্গে যোগ দিলে! ওরে যোগ মানে সমষ্টিকরণ নয়, ইষ্টিকরণ। যোগাড় করা বা যোগান দেওয়া নয়, শুধু ভগবানে মনোযোগ।
ওরে, আমি উলুবনে মুক্তো ছড়াই না।’ নব্যবাঙলার মাতব্বর ছোকরাদের বলছেন ঠাকুর: ‘কালে সব বুঝতে পারবি। ওই যে কথায় আছে না—যাঁরে ধ্যানে না পায় মনি, তাকে ঝাঁটায় ঝেঁটোয় নন্দরানি। তো শালারা আমাকে লাট করে ফেললি। আমাকে সেই এক বুঝেছিল কেশব সেন।’
কেশব সেন বলেছিল বলরামকে, ‘তোমরা বুঝতে পারছ না উনি কে। তাই অত ঘাঁটা-ঘাঁটি করছ। ওঁকে মখমলে মুড়ে ভালো একটি গেলাসকেসের মধ্যে রাখবে, দু-চারটি ফুল দেবে, আর দূর হতে প্রণাম করবে—’
তাতে আবার একজন রাগ করল। ঠাকুরকে উদ্দেশ্য করে বললে, ‘আমরা তো আর কেশববাবু নই যে তাঁর মত আপনাকে দেখব। না হয় কাল থেকে আপনাকে আর বিরক্ত করতে আসব না।’
ঠাকুর হেসে বললেন, ‘বা গো সখী! ঠোঁটের আগায় রাগটুকুও আছে।’
কেশব দেয়াল ধরে-ধরে টলতে টলতে আসছে। দাঁড়াতে পারছে না। কখন ইতিমধ্যে কৌচ ছেড়ে নিচে নেমে বসেছেন ঠাকুর। কেশবও তাঁর পায়ের কাছটিতে বসে পড়ল। ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করল অনেকক্ষণ ধরে।
ঠাকুরের ভাবাবস্থা। মা’র সঙ্গে কি কথা কইছেন আপন মনে।
‘আমি এসেছি। আমি এসেছি।’ চেঁচিয়ে বলতে লাগল কেশব। ঠাকুরের বাঁ হাতখানি তুলে নিল নিজের হাতে। হাত বুলাতে লাগল।
ঠাকুর তখন মাতোয়ারা। বলছেন ভাবারূঢ় হয়ে: ‘যতক্ষণ উপাধি, ততক্ষণই নানা বোধ। যেমন কেশব, প্রসন্ন, অমৃত, এই সব। পূর্ণজ্ঞান হলেই এক চৈতন্য। ভাবসমুদ্র উথলালেই ডাঙায় এক বাঁশ জল। আগে নদী দিয়ে সমুদ্রে আসতে হলে এঁকেবেঁকে ঘুরে আসতে হত, এক রাজ্যের পথ। বন্যে এলে একাকার। তখন সোজা নৌকো চালিয়ে দিলেই হল।’
চোখ চাইলেন ঠাকুর। বললেন, ‘তোমার অসুখ হলেই আমার প্রাণটা বড় ব্যাকুল হয়। আগের বারে তোমার যখন অসুখ হয়, রাত্রির শেষ প্রহরে আমি কাঁদতুম। বলতুম, মা! কেশবের যদি কিছু হয়, তবে কার সঙ্গে কথা কবো। তখন কলকাতায় এলে ডাব-চিনি দিয়েছিলুম সিদ্ধেশ্বরীকে। মা’র কাছে মেনেছিলাম, যাতে অসুখ সেরে যায়।’ কিন্তু এবার, এবার কি মানেননি?
৬
ঢং করে ঘণ্টা বাজল। ঢং শব্দটা হল সাকার ভাব। তারপর ঢং-এর অংটি থেকে গেল অনেকক্ষণ। ঐ অংটি হল নিরাকার।
ঈশ্বরতত্ত্ব বোঝাচ্ছেন ঠাকুর।
‘নিরাকারে একেবারে মন স্থির হয় না। বাণ শিখতে হলে আগে কলাগাছ তাক করতে হয়, তারপর শরগাছ, তারপর সলতে। তারপর উড়ে যাচ্ছে যে পাখি।’
এক সন্নেসী জগন্নাথ দর্শন করতে গিয়েছে। গিয়ে সন্দেহ হয়েছে ঈশ্বর সাকার না নিরাকার। হাতের দণ্ড ঠেকিয়ে দেখতে গেল তাঁর গায়ে লাগে কিনা। একবার দেখল লাগল, আবার দেখল লাগল না। একবার দেখল মূর্তি, আবার দেখল অমূর্তি। ঘট আর আকাশ। ঢং আর অং। সন্নেসী বুঝল ঈশ্বর সাকার, আবার নিরাকার। কাঠ মাটি মনে কোরো না সাকার মূর্তিকে। শোলার আতা দেখলে যেমন আসল আতা মনে পড়ে, বাপের ফটোগ্রাফ দেখলে যেমন বাপকে মনে পড়ে, তেমনি। প্রতিমায় সত্যের উদ্দীপনা। রূপের মধ্যেই অরূপরতন।
ভক্তির জন্যে সাকার, মুক্তির জন্যে নিরাকার। মুক্তি দিলেই নিশ্চিন্ত, কোনো ঝঞ্ঝাট নেই, ঈশ্বরকে ফিরতে হয় না সঙ্গে-সঙ্গে। ভক্তি দেওয়াই কঠিন, ছুটি পায় না ভগবান, লেগে থাকতে হয় সব সময়। তাই, আমি মুক্তি দিতে কাতর নই রে, ভক্তি দিতে কাতর হই।
এমনি কত কথা বলে যাচ্ছেন ঠাকুর। প্রিয়তন্ময়ের মত শুনছে কেশব সেন।
অদ্বৈতজ্ঞান আঁচলে বেঁধে যা ইচ্ছে তাই করো। আনন্দময়ীকে সঙ্গে নিয়ে যেথা ইচ্ছে সেথা যাও।
‘দেখনি ময়রার দোকানে ছানা চিনি মিশিয়ে একটা ঠাশা তৈরি করে। পরে তা থেকেই তৈরি হয় গোল্লা আর বরফি, তালশাঁস আর আতা সন্দেশ। ছানা চিনির রূপান্তরে যেমন নানান রকম সন্দেশ, তেমনি ভাব ভক্তির রূপান্তরে নানান রকম বিগ্রহ–শিব দুর্গা কৃষ্ণ বিষ্ণু। পলতা থেকে কলকাতাতে যে জল আসে রাস্তায় আর বাড়িতে, তা একই জল, কিন্তু সে কলের জল কোথাও পড়ছে সিংহের মুখ দিয়ে কোথাও বা মানুষের মুখ দিয়ে। নানা রূপে ঈশ্বরই খেলা করছেন।’
যাই বলো, দল চাই নে, চাই উদারবুদ্ধি। গেড়ে ডোবাতেই দাম বাঁধে, যেমন হিঞ্চে কলমির দল। স্রোতের জলে দল বাঁধে না। গোঁড়ামিতেই দল পাকায়, উদারবুদ্ধির দল নেই।
এত কথা বলছেন, একবারও জিজ্ঞেস করছেন না, কেশব তুমি কেমন আছ? কেবল ঈশ্বরের কথা।
নরেন্দ্রকে যখন দেখি, কখনো জিজ্ঞেস করিনি, তোর বাপের নাম কি? তোর বাপের কখানা বাড়ি?
প্রতিমায় পূজা হয়, আর জীয়ন্ত মানুষে হবে না? তিনিই তো মানুষ হয়ে লীলা করছেন। ‘জীবে জীবে চেয়ে দেখ সবই যে তাঁর অবতার। তুই নতুন লীলা কি দেখাবি তাঁর নিত্য লীলা চমৎকার।’
তাঁকে সর্বভূতে দেখতে লাগলুম। বেলপাতা তুলতে গেলুম সে দিন। পাতা ছিঁড়তে গিয়ে খানিকটা আঁস উঠে এল। দেখলাম গাছ চৈতন্যময়। মনে কষ্ট হল। ফুল তুলতে গিয়ে দেখি, গাছে ফুল ফুটে আছে, যেন সম্মুখে বিরাট–পূজা হয়ে গেছে—বিরাটের মাথায় ফুলের তোড়া। আর ফুল তোলা হল না।
হাসিমুখে তাকালেন কেশবের দিকে। বললেন, ‘তোমার অসুখ হয়েছে কেন তার মানে আছে।’
উৎসুক হয়ে তাকালো কেশব।
‘শরীরের ভিতর দিয়ে অনেক ভাব চলে গিয়েছে কিনা তাই এই অবস্থা। যখন ভাব হয় তখন কিছু বোঝা যায় না, অনেক দিন পর শরীরে এসে আঘাত লাগে। দেখনি সেই গঙ্গার উপরে বড় জাহাজ? বড় জাহাজ যখন গঙ্গা দিয়ে চলে যায়, তখন প্রথম কিছু টের পাওয়া যায় না। শেষে, ওমা দেখি, পাড়ের গায়ে জল ধপাস ধপাস করছে, আর পাড়ের খানিকটা ভেঙে জলে পড়ল। কুঁড়ে ঘরে হাতি ঢুকলেও এমনিই হয়। কুঁড়ে ঘরে হাতি ঢুকলে ঘর তোলপাড় করে ভেঙেচুরে দেয়। তেমনি ভাবহস্তী তোমার দেহঘরে প্রবেশ করেছে। তোলপাড় করে ভেঙে দেবে না তো কি!’
কেশব চক্ষু নত করল।
‘হয় কি জানো? আগুন লাগলে কতগুলো জিনিস পুড়িয়ে-টুড়িয়ে ফেলে, আর একটা হৈহৈ কাণ্ড লাগিয়ে দেয়। জ্ঞানাগ্নি প্রথম কাম ক্রোধ এই সব রিপু নাশ করে, পরে অহং বুদ্ধির উৎখাত হয়। তারপর তোলপাড়!’ ঠাকুর থামলেন একটু। বললেন, ‘তুমি মনে করছ, সব ফুরিয়ে গেল। কিন্তু যতক্ষণ রোগের কিছু বাকি থাকে ততক্ষণ তিনি ছাড়বেন না। হাসপাতালে যদি একবার নাম লেখাও, আর চলে আসবার যো নেই। যতক্ষণ রোগের একটু কসুর থাকে ছেড়ে দেবে না ডাক্তার সাহেব। তুমি নাম লেখালে কেন?’
কেশব হাসতে লাগল। হাসপাতালের উপমাটি বড় ভালো লেগেছে।
কত রূগী হাসপাতালে ঢোকে এসে জাঁক করে। কিন্তু যখন দেখে ইনচার্জ’ ডাক্তার কিছুতে ছাড়ে না তখন একদিন ফাঁক বুঝে চম্পট দেয়। কেউ বা আবার চাদর বালিশ নিয়ে সরে পড়ে। কোথায় রোগ সারাবে তা নয় চুরি করে। ধর্মপথে এসে আবার জাহান্নমে যায়।
‘তখন আমার দারুণ অসুখ । মাথায় যেন দুলাখ পিঁপড়ে কামড়াচ্ছে। কিন্তু ঈশ্বরীয় কথার বিরাম নেই। নাটাগড়ের রাম কবরেজ দেখতে এল। সে এসে দেখে আমি বসে বিচার করছি। তখন সে বললে, এ কি পাগল! দুখানা হাড় নিয়ে বিচার করছে!’
যে খানদানি চাষা, সে চাষ করাই চায়, হাজা-শুকো মানে না। আর কিছু জানে না সে চাষ ছাড়া। তেমনি জীবনের দৈন্য-দূর্ভিক্ষেও হরিনাম ছাড়ে না। মা যদি সন্তানকে মারে, সন্তান মা-মা বলেই কাঁদে। গলা ধরে যদি ফেলেও দেয় তবু ও তার মা-মা ডাক। সে তো আর যাকে-তাকে মা বলছে না, তার মাকেই মা বলছে। তাই ছন্দে একটি মন্ত্র বাঁধলেন ঠাকুর। দুঃখ জানে, শরীর জানে, মন তুমি আনন্দে থাকো।’
দুঃখ তো শরীরের ব্যাপার, আর মন, তুমি তো আনন্দের মৌচাক। দুঃখের হলেই এই মধুকণা সঞ্চিত হচ্ছে। সারা জীবনই তো দুঃখ—রোগ শোক জ্বালা যন্ত্রণা। যারা বলে আগে দুঃখ দারিদ্র্য যাক, পরে ঈশ্বরভজন করা যাবে, তারা সেই সমুদ্র-স্নানার্থী তীর্থবাসীর মত। ভাবছে, সমুদ্রের ঢেউ আগে থামুক, পরে স্নান করে নেব। হায়, সমুদ্রের ঢেউ কোনোদিন থামবে না, স্নানও হবে না সেই তীর্থঙ্করের। ঢেউয়ের মধ্যেই স্নান করে নিতে হবে। দুঃখের মধ্যেই নিতে হবে সেই আনন্দস্পর্শ। এ তো দুঃখের ঢেউ নয় এ হচ্ছে সুখস্বপ্নরসরাশির ঢেউ।
মেঘাচ্ছন্ন দিন দুর্দিন নয়, যেদিন হরিকথামৃতপান হয় না সেদিনই দুর্দিন। ‘তোমার শেকড়সুদ্ধ তুলে দিচ্ছে।’ কেশবের দিকে আবার তাকালেন ঠাকুর। ‘শিশির পাবে বলে মালী বসরাই গোলাপের গাছ শেকড়সুদ্ধ তুলে দেয়। শিশির পেলে গাছ ভালো করে গজাবে। তাই এই হুলুস্থুল।
কেশবের মা দাঁড়ালেন এসে দরজার পাশে।
‘মা আপনাকে প্রণাম করছেন।’
আনন্দে হাসলেন ঠাকুর।
‘মা বলছেন কেশবের অসুখটি যাতে সারে’ কে একজন বললে মায়ের হয়ে। ঠাকুর বললেন, ‘সুবচনী আনন্দময়ীকে ডাকো। তিনিই দুঃখ দূর করবেন।’ পরে লক্ষ্য করলেন কেশবকে: ‘বাড়ির ভিতরে অত থেকো না। যেখানে যত বেশি ঈশ্বরীয় কথা সেখানেই তত বেশি আরাম। দেখি, তোমার হাত দেখি।’ কেশবের একখানি হাত তুলে নিয়ে ওজন করতে লাগলেন ঠাকুর। বললেন, ‘না তোমার হাত হালকা আছে। যারা খল তাদের হাত ভারী হয়।’
সবাই হেসে উঠল।
কেশবের মা বললেন, ‘কেশবকে আশীর্বাদ করুন।’
‘আমার কী সাধ্য! তিনি আশীর্বাদ করবেন। তোমার কর্ম তুমি করো মা, লোকে বলে করি আমি।’
‘ঈশ্বর দুবার হাসেন। একবার হাসেন যখন, ভাই জমি বখরা করে, আর দড়ি মেপে বলে, এ দিকটা আমার, ও দিকটা তোমার। ঈশ্বর এই ভেবে হাসেন, আমার জগৎ, তার খানিকটা মাটি নিয়ে আমার-আমার করছে। আরো একবার হাসেন। ছেলের সঙ্কটাপন্ন অসুখ। মা কাঁদছে। বৈদ্য এসে বলে, ভয় কি মা, আমি ভালো করব। বৈদ্য জানে না, ঈশ্বর যদি মারেন, কার সাধ্য রক্ষা করে।’
কেশবের একটা কাশি উঠল। সে কাশি আর থামে না। কঠিন কষ্টকর কাশি। বুকের মধ্যে ব্যথার ধাক্কা লাগছে সকলের।
বেগটা একটু থামল। থামতেই ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করল ঠাকুরকে। দেয়াল ধরে-ধরে চলে গেল আপন ঘরে। তার শেষ শয্যায়।
কেশবের বড় ছেলেটিকে ঠাকুরের পাশে এনে বসাল অমৃত। বললে, ‘এইটি কেশবের বড় ছেলে। আপনি আশীর্বাদ করুন। ও কি, মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করুন।’
‘আমার আশীর্বাদ করতে নেই।’ বলে ছেলেটির সর্বাঙ্গে হাত বুলুতে লাগলেন ঠাকুর।
অমৃত বললে, ‘আচ্ছা, তবে গায়ে হাত বুলোন।’
সে হাত মানেই তো অপরিমেয় করুণার পারাবার।
‘অসুখ ভালো হোক, ও সব কথা আমি বলতে পারি না। ও ক্ষমতা আমি মা’র কাছে চাইও না। মাকে শুধু বলি, মা, আমাকে শুদ্ধা ভক্তি দাও।’
কেশবকে লক্ষ্য করে বলছেন, ‘ইনি কি কম লোক গা! যারা টাকা চায় তারাও মানে, আবার সাধুতেও মানে। দয়ানন্দকে দেখেছিলুম। তখন বাগানে ছিল। কেশবের যাবার কথা—কেশব সেন, কেশব সেন, করে ঘর-বার করছে, কখন কেশব আসেন।’
মিষ্টিমুখ করলেন ঠাকুর। এইবার উঠবেন গাড়িতে। ব্রাহ্ম ভক্তেরা সঙ্গে এসে তুলে দিচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় দেখলেন, নিচে আলো নেই। বললেন ঠাকুর, ‘এ সব জায়গায় ভালো করে আলো দিতে হয়। আলো না দিলে দারিদ্র্য হয়। দেখো এ রকমটি যেন হয় না আর কোনোদিন।’
এলোপ্যাথিতে কিছু হচ্ছে না। ডাকা হল মহেন্দ্রলাল সরকারকে। কিছুতেই কিছু হবার নয়।
তবু তারই মধ্যে বাড়ির এক পাশে দেবালয় তৈরি করাল। প্রতিষ্ঠার দিনে, উত্থান-শক্তি নেই, তবু জোর করে নেমে এল নিচে। একটা চেয়ারে বসিয়ে চার-পাঁচজনে ধরে নামাল অতিকষ্টে, বেদী এখনো শেষ হয়নি, না হোক, যা হয়েছে এই বেদীতে বসেই আমি উপাসনা করব।
এসেছি মা, তোমার ঘরে। ওরা আসতে বারণ করেছিল, কোনোমতে শরীরটা এনে ফেলেছি। এই দেবালয় তোমার ঘর, লক্ষীর ঘর। আমার বড় সাধ ছিল কয়েকখানা ইট কুড়িয়ে এনে তোমাকে একখানা ঘর করে দি। তুমি মা নিজেই স্বহস্তে ইট কুড়িয়ে এনে এই প্রশস্ত দেবালয় করিয়ে দিলে। এখন বড় সাধ, ঘরের ঐ রোয়াকে তোমার ভক্তবৃন্দ সঙ্গে নাচি। এই ঘরই আমার বৃন্দাবন, আমার কাশী মক্কা, আমার জেরুশালেম। মা আমার দয়া, মা আমার পুণ্যশান্তি, আমার শ্রীসৌন্দর্য, আমার সম্পদস্বাস্থ্য। বিষম রোগযন্ত্রণার মধ্যে মা আমার আনন্দসুধা।
রোগের তাড়নায় দিন-রাত আর্তনাদ করছে কেশব। সে নিদারুণ বেদনার নিবারণ নেই। শরীরের রক্ত দিলে যদি উপশম হত, শত-শত লোক দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। মা, আমার মুখ যেন তোমার নিন্দা না করে। তুমি আমাকে ভেঙে-ভেঙে তোমার কোলের মধ্যে টেনে নিচ্ছ মা।
“বাবা, আমার শাপেই তোমার এত যন্ত্রণা-‘ সারদাসুন্দরী বললেন কাঁদতে-কাঁদতে।
মায়ের বুকে মাথা রাখল কেশব। বললে, ‘এমন কথা তুমি মুখেও এনো না। তোমার মত মা কে পায়? তুমি আমার বড় ভালো মা, তোমার গর্ভে জন্মেই তো আমি এত ভালো হতে পেরেছি—’
কেশবের তিরোভাবের কথা জানানো হল ঠাকুরকে।
ঠাকুরের মনে হল, একটা অঙ্গ যেন পড়ে গেল। এমন কম্প এল যে লেপ চাপা দিয়ে পড়ে রইলেন। তারপর তিনদিন বেহুঁস।
সিঁদুরেপটির মণি মল্লিকের ছেলেটি মারা গেছে। উপযুক্ত ছেলে—এ শোক রাখবার জায়গা নেই। ছেলেকে শ্মশানে পুড়িয়ে রেখে ঠাকুরের কাছে সটান এসে উপস্থিত। ঘরভরা লোক। সব জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল তার দিকে। ঠাকুরেরও চোখ পড়ল, জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি গো, আজ অমন শুকনো দেখছি কেন? ‘
ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল মণি মল্লিক। বললে, ‘আমার ছেলেটি আজ মারা গেল। আসছি সব শেষ করে।’
সহসা সমস্ত ঘর বজ্রাহতের মত স্তম্ভিত হয়ে রইল। ক্রমে ক্রমে নানা জনে নানা রকম সান্ত্বনার কথা আওড়াতে লাগলো। সব মামুলি, বাজে কথা।
কিন্তু ঠাকুর তো কিছু বলছেন না। এই দারুণদহন শোকে তাঁর কি একটু মৌখিক সহানভূতিও পাওয়া যাবে না? ঠাকুর এত হৃদয়হীন।
বুড়ো মণি মল্লিক আকুল হয়ে বিলাপ করতে লাগল। ঠাকুর দুটো মিষ্টি কথাও বলবেন না এ কঠোরতা যেন পুত্রশোকের চেয়েও দুঃসহ।
কেঁদে-কেঁদে শোকের কলসী খালি করল মণি মল্লিক। তখন সহসা তাল ঠুকে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত তেজের সঙ্গে গান ধরলেন ঠাকুরঃ
জীব সাজো সমরে।
ঐ দ্যাখ রণবেশে কাল প্রবেশে তোর ঘরে।
আরোহণ করি মহা পুণ্যরথে
ভজন সাধন দুটো অশ্ব জুড়ে,—
তাতে দিয়ে জ্ঞানধনুকে টান
ভক্তিব্রহ্মবাণ সংযোগ করো রে।।
মণিমোহন স্তব্ধশোক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কে পুত্র? কার পুত্র? কার জন্যে এই শোক?
সমাধিভঙ্গের পর ঠাকুর বললেন, ‘পুত্রশোকের মত কি আর জ্বালা আছে? তবে কি জানো? যারা ঈশ্বরকে ধরে থাকে তারা এই বিষম শোকেও একেবারে তলিয়ে যায় না। একটা নাড়াচাড়া খেয়েই ফের সামলে নেয়। চুনোপুঁটির মত আধারগুলোই একেবারে অস্থির হয়ে ওঠে, তলিয়ে যায়। দেখনি? গঙ্গায় স্টিমারগুলো গেলে জেলেডিঙ্গিগুলো কি করে, মনে হয় যেন একেবারে গেল, আর সামলাতে পারলে না। কোনোখানা বা উলটেই গেল। আর বড়-বড় হাজারমুণে কিস্তিগুলো দু-চার-বার টালমাটাল হয়েই যেমন তেমনি স্থির হলো। দু-চারবার নাড়াচাড়া কিন্তু খেতেই হবে।’
ঠাকুরের স্বরে বিষাদ গাম্ভীর্য। মানুষ সুখের আশায় সংসার করে। বিয়ে করল ছেলে হল, সেই ছেলে আবার বড় হল, তার বিয়ে দিলে—দিন কতক বেশ চলল। তারপর এটার অসুখ, ওটার বিসুখ, এটা মলো ওটা বয়ে গেল, ভাবনায় চিন্তায় একেবারে ব্যতিব্যস্ত। যত রস মরে তত একেবারে দশ ডাক ছাড়তে থাকে। দেখনি? ভিয়েনের উনুনে কাঁচা সুঁদরির চেলাগুলো প্রথমটা বেশ জ্বলে। তারপর কাঠখানা যত পুড়ে আসে, কাঠের সব রসটা পেছনের দিক দিয়ে ঠেলে বেরিয়ে গ্যাঁজলার মত হয়ে ফুটতে থাকে আর চাঁ-চাঁ ফুসফাস নানা রকম আওয়াজ হতে থাকে—সেই রকম।’
‘এই জন্যেই তো আপনার কাছে ছুটে এলাম। বুঝলাম, এ জ্বালা শান্ত করবার আর লোক নেই।’
ধাত্রী ভুবনমোহিনী মাঝে-মাঝে ঠাকুরকে দর্শন করতে আসে।
সকলের জিনিস খেতে পারেন না ঠাকুর। বিশেষত ডাক্তার, কবরেজ বা ধাত্রীর। অনেক যন্ত্রণা দেখেও তারা টাকা নেয় তার জন্যে।
‘ভুবন এসেছিল। পঁচিশটা বোম্বাই আম আর সন্দেশ রসগোল্লা এনেছিল।’ বলছেন অধর সেনকে। ‘আমায় বললে, আপনি একটা আম খাবেন? আমি বললাম, আমার পেট ভার। আর, সত্যিই দেখ না, একটু কচুরি সন্দেশ খেয়েই পেট কি রকম হয়ে গেছে।’ অন্য কথায় গেলেন তখুনি। ‘কেশব সেনের মা বোন এরা এসেছিল। তাই আবার খানিকটা নাচলুম। কি করি। ভারি শোক পেয়েছে।’
সেদিন আবার বললেন মাস্টারমশাইকে। ‘কেশব সেনের মা এসেছিল। তাদের বাড়ির ছোকরারা হরিনাম করলে। কেশবের মা তাদের প্রদক্ষিণ করে হাততালি দিতে লাগলো। দেখলাম শোকে কাতর হয়নি। এখানে এসে একাদশী করলে। মালাটি নিয়ে জপ করে। বেশ ভক্তি।’
‘মাঝি-বউ অনেক দিন আসে না। তার খবর কেউ জানো তোমরা?” মা যখন জয়রামবাটিতে, জিজ্ঞেস করলেন একদিন।
কোয়ালপাড়ার মজুরনী। চিনতে পেরেছে সবাই। কিন্তু খবর রাখে না কেউ। সংসারে এত খবর থাকতে কোন এক মজুরনীর খবর!
বলতে-বলতেই মজুরনী এসে হাজির। কোয়ালপাড়ার হাটে মস্ত বাজার করে কে এক ভক্ত তার মাথায় মোট চাপিয়ে দিয়েছে। তাই বয়ে নিয়ে এসেছে ধুঁকতে-ধুঁকতে। এ কেমন চেহারা! রাতারাতি যেন বুড়ো হয়ে গিয়েছে মজুরনী। ধূলোমাখা রুক্ষ চুল, গভীর গর্তের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে চোখ, কেমন সর্বশূন্য চাউনি। হাঁটু দুটো ঠকঠক করে কাঁপছে, যেন হাতের লাঠি কেউ কেড়ে নিয়েছে জোর করে।
‘এ তোমার কী হয়েছে মাঝি-বউ?
“মা গো, আমার জোয়ান রোজগারী ছেলেটি মারা গেছে।’
‘বলো কি মাঝি-বউ?’ এক মুহূর্তও স্তব্ধ থাকলেন না শ্রীমা, ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠলেন। আকুল, অন্ধ আর্তনাদ। উপরে আকাশ, সামনে দিগন্ত পর্যন্ত রেখা টানা সে আর্তনাদের। কখনো লুটিয়ে পড়ছেন মাটিতে, কখনো বা কাঁদছেন বারান্দার খুঁটিতে মাথা রেখে। জগতের সমস্ত মৃতপুত্রা জননীর শোক নিজের মধ্যে টেনে নিয়ে ধরে দিচ্ছেন নিরর্গল অশ্রুজলে।
মাঝি বউ তো অবাক। যেন তার ছেলে মরেনি, মা’র ছেলে মরেছে! কোথায় মা তাকে সান্ত্বনা দেবেন, উলটে এখন তাকেই মাকে সান্ত্বনা দিতে হয়।
যেমন বুদ্ধদেব সান্ত্বনা দিয়েছিলেন উব্বিরীকে।
কোশলের রানি উব্বিরী। অচিরাবতীর তীরে কাঁদছে অঝোরে।
‘এখানে বসে কে কাঁদছে?” জিজ্ঞেস করলেন বুদ্ধদেব। বললেন, ‘এ যে শ্মশান ‘এই শ্মশানেই আমার মেয়েটিকে ছাই করে দিয়েছি।’
‘কোন মেয়ে?”
জলভরা চোখে তাকালো একবার উব্বিরী। কোন মেয়ে! একটি বই আমার আর মেয়ে কোথায়!
‘চুরাশি হাজার মেয়ে এই চিতার ভস্মে ঘুমিয়ে রয়েছে! তুমি চিরন্তনী জননী, তুমি কার জন্যে, তোমার কোন মেয়েটির জন্যে কাঁদছ? কত তো কাঁদলে জন্ম-জন্ম ধরে, কেউ ফিরে এল, চিনতে পারলে কাউকে? যদি চুরাশি হাজার মেয়ে চিতাশয্যা ছেড়ে জেগে ওঠে চোখের সামনে, চিনতে পারবে মেয়ে বলে?”
স্তব্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল উব্বিরী।
‘পথিক যেমন চলতে-চলতে তরুতলে আশ্রয় নেয় তেমনি তারা তোমার অঙ্কছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিলো। ক্ষণমুগ্ধা, ভেবেছিলে ওদের উপর তোমার বুঝি শাশ্বত অধিকার। কিন্তু চেয়ে দেখ, সবই অচিরস্থায়ী, শ্মশান-নদীর নামটিও অচিরাবতী। সংসারে শুধু এক বস্তু সার জেনো। সে হচ্ছে যাত্রা, অনন্তযাত্রা। তুমিও চলেছ অনন্ত পথে, তোমার মেয়েরাও তেমনি। শুধু এগিয়ে যাওয়া, নিবতে-নিবতে শেষ জ্বলে ওঠা।’
চোখের জল মুছল উব্বিরী। কিন্তু শ্রীমা’র কান্নার বিরাম নেই
উব্বিরী কেঁদেছিল নিজের কন্যার শোকে। শ্রীমা কাঁদছেন পুত্রহারা মজুরনী মাঝি-বউ হয়ে।
শ্রীমাই চিরন্তনী মা।
শোকের বেগ কমে এলে নবাসনের বউকে নারকেল তেল আনতে বললেন। তেল এনে ঢেলে দিলেন মাঝি-বউয়ের মাথায়। হাত চাপড়ে চাপড়ে মাখিয়ে দিলেন ভালো করে। আঁচলে বেধে দিলেন মুড়ি-গুড়। যাবার সময় বললেন, ‘আবার আসিস মাঝি-বউ।’
মাঝি-বউ মন্দ-হাসির ঝিলিক দিল। তার আর শোক নেই।
ঠাকুর শোক তাড়িয়ে দেন। আর মা শোক শুষে নেন।
আরেক ভাবে বলি। ঠাকুর দুঃখকে ঠেলে দেন। মা নেন টেনে। কিন্তু ও আমার কে?
রামলালের বিয়ে, সারদা চলেছে কামারপুকুর। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন যতদূর চোখ যায়। ভাবলেন ও আমার কে!
খেতে বসেছেন ঠাকুর। বলরাম কাছে ব’সে। আরো হয়তো কেউ-কেউ।
‘আচ্ছা আবার বিয়ে কেন হল বলো দেখি ? স্ত্রী আবার কিসের জন্যে হল? পরনের কাপড়ের ঠিক নেই, তার আবার স্ত্রী কেন?’
বলরাম হাসল একটু মুখে টিপে।
‘ও, বুঝেছি।’ থালা থেকে এক গ্রাস ভাত তুললেন ঠাকুব। বলরামের দিকে ইশারা করলেন। ‘এই, এর জন্যে হয়েছে। নইলে কে আর অমন রেঁধে দিত বলো! কে আর অমন করে খাওয়াটা দেখত! ওরা সব আজ চলে গেল—’
কে চলে গেল !
‘রামলালের খুড়ী গো! রামলালের বিয়ে হবে—তাই সব গেল কামারপুকুর। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখলুম। কিছুই মনে হল না। সত্যি বলছি, যেন কে তো কে গেল! কিন্তু তারপর ভাবনা হল কে এখন রেঁধে দেয়।’ আবার বললেন আপন মনে: ‘সব রকম খাওয়া তো আর পেটে সয় না, আর সব সময় খাওয়ার হুঁশও থাকে না। ও বোঝে কি রকমটি ঠিক সয়। এটা ওটা করে দেয়। তাই মনে হল, কে করে দেবে!” অপূর্ব মমতা। সর্বঢালা নির্ভরতা।
শিখিয়ে দিয়েছিলেন সারদাকে: ‘গাড়িতে বা নৌকোয় যাবার সময় আগে গিয়ে উঠবে, আর নামবার সময় কোনো জিনিসটা নিতে ভুল হয়েছে কিনা দেখে নে সকলের শেষে নামবে।’
ভাবে আছি বলে বাস্তব ভুলব কেন?
বলরাম বোসের বাড়ি যাচ্ছেন, সঙ্গে রামলাল আর যোগীন। সকালবেলা। যাচ্ছেন ঘোড়ার গাড়িতে। গাড়ি দক্ষিণেশ্বরের ফটক পর্যন্ত এসেছে, জিজ্ঞেস করলেন যোগীনকে, ‘কি রে, নাইবার কাপড়-গামছা এনেছিস তো?”
‘গামছা এনেছি। কাপড়খানা আনতে ভুল হয়েছে।’ কথাটা উড়িয়ে দিতে চাইল যোগীন। ‘তা, বলরামবাবুরা আপনার জন্যে একখানা নতুন কাপড় দেখে-শুনে দেবে খন।’
‘সে কি কথা? সবাই বলবে কোত্থেকে একটা হাবাতে এসেছে। কে জানে, তাদের কষ্ট হবে, হয়তো আতান্তরে পড়বে-যা, গাড়ি থামিয়ে নেমে নিয়ে আয় গে।’
যেমন কথা তেমন কাজ। যোগীন ছুটল ফের কাপড় আনতে।
ভালো লোক লক্ষ্মীমন্ত লোক বাড়িতে এলে সব বিষয়ে কেমন সুসার হয়ে যায়, “কাউকে কিছুতে বেগ পেতে হয় না।’ বললেন ঠাকুর, ‘আর হাবাতে হতচ্ছাড়া গুলো এলে সব বিষয়ে বেগ পেতে হয়। যেদিন ঘরে কিছু নেই সেদিনই এসে হাজির হয় হতচ্ছাড়ারা।’
ঠাকুরের সঙ্গে হাজরাও মাঝে-মাঝে আসে কলকাতায়। কিন্তু সেবার সেও ফেলে গিয়েছিল গামছা। দক্ষিণেশ্বরে ফিরে হুঁশ হল।
‘কই আমি তো নিজের গামছা বা বটুয়া একবারও ভুলে ফেলে আসি না! ভগবানের নামে কাপড় থাকে না পরনে, কিন্তু ভাবমুখ ছেড়ে বাস্তবমুখে এসে কড়াক্রান্তির ভুলচুক নেই। আর তোর একটু জপ করেই এত ভুল!
ভক্ত হয়েছিস বলে ভুলো হবি কেন? বোকা হবি কেন? কে কাকে ভক্তি করে!
‘ভক্ত আপনাকেই আপনি ডাকে।’ বললে প্রতাপ হাজরা।
‘এ তো খুব উঁচু কথা। আপনার ভিতর আপনাকে দেখতে পেলে তো সবই হয়ে গেল। ঐটি দেখতে পাবার জন্যেই সাধনা। আর ঐ সাধনার জন্যেই শরীর।’ সার্থক উপমা দিলেন ঠাকুর: ‘যতক্ষণ না স্বর্ণপ্রতিমা ঢালাই হয় ততক্ষণ ছাঁচের দরকার। হয়ে গেলে ফেলে দাও মাটির ছাঁচ। ঈশ্বরদর্শন হলে কি হবে আর শরীর দিয়ে? তিনি শুধু অন্তরে নন, অন্তরে-বাহিরে। নয়নের সম্মুখে শুধু নন, নয়নের মাঝখানে।
লক্ষ্মী এসেছে এবার। রামেশ্বরের মেয়ে, রামলালের আপন বোন। এগারো বছর বয়েসে বিয়ে হয়েছে। বিয়ে হয়েছে ধনকৃষ্ণ ঘটকের সঙ্গে। সেবার রামেশ্বরের অস্থি নিয়ে দক্ষিণেশ্বরে এসেছে রামলাল, ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছে লক্ষ্মী?
‘তার বিয়ে হয়েছে।’ বললে রামলাল।
‘বিয়ে হয়েছে? সে বিধবা হবে।’ মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল ঠাকুরের।
হৃদয় কাছে বসে ছিল, ফোঁস করে উঠল। ‘তাকে আপনি এত ভালোবাসেন, তার বিয়ে হয়েছে শুনে কোথায় তাকে আশীর্বাদ করবেন, তা নয়, কি একটা ছাইভস্ম কথা বলে ফেললেন।’
‘কি বললাম বল তো!’ ঠাকুর তাকালেন শূন্যচোখে।
‘কি মাথামণ্ডু বললেন! শুনে আর কাজ নেই।’
‘কি করবো! মা বলালেন যে!’ ঠাকুর বললেন গম্ভীর কণ্ঠে: ‘লক্ষী মা-শীতলার অংশ। ভারি রোখা দেবী, আর যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে সে সামান্য জীব। সে পুড়ে যাবে। সামান্য জীবের ভোগে আসতে পারে না লক্ষী।
ধনকৃষ্ণ নিরুদ্দেশ হয়েছে। কোথায় কি কাজের সন্ধানে যাচ্ছে বলে বেরুল আর ফিরল না। বারো বছর কেটে গেল। কুশপুত্তলিকা দাহন করে শ্রাদ্ধশান্তি করে খোলসা হল লক্ষ্মী।
শ্বশুরবাড়ির কিছু সম্পত্তি তার ভাগে পড়েছে। তাই শুনে ঠাকুর বললেন, ‘কোনো সম্পত্তি জোটাসনি, আঁটকুড়ের আবার সম্পত্তি কি!’
সরিকদের নামে লিখে দিল অংশ।
‘ধর্মকর্ম যা সব ঘরে বসে করবি। বাইরে তীর্থে-তীর্থে একলাটি ঘুরে বেড়াবিনে। কার পাল্লায় পড়বি কে জানে। আর ঐ খুড়ির সঙ্গে থাকবি। বাইরে বড় ভয়।’ বললেন সারদাকে, ‘লজ্জাই নারীর ভূষণ। বল্ না লক্ষ্মী সেই পদটি—অবলার অবলায় বৃদ্ধি, অবলার অবলায় সিদ্ধি। ‘
নহবৎখানায় প্রতিষ্ঠা হল সারদার। লজ্জারূপেন সংস্থিতা।
দরমার-বেড়ায় আঙুল-প্রমাণ ছেঁদা হয়েছে একটা। তারই উপর চোখ রেখে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখবার চেষ্টা করে সারদা। পাশ থেকে কখনো বা লক্ষী। মন্দিরের প্রাঙ্গণে এত সব নাম-নৃত্যে এত সব ভাব-ভক্তি, একটু দেখবে না ওরা? সেই ছেঁদা ক্রমে ক্রমে একটু বড় হয়েছে বুঝি। ঠাকুর পরিহাস করে বললেন রামলালকে, ‘ওরে রামনেলো, তোর খুড়ির পরদা যে ফাঁক হয়ে গেল।’
নবতকে বলেন খাঁচা। সারদা আর লক্ষ্মীকে, শুকসারী। নিজের ঘরে ফলমূল মিষ্টি নামলে রামলালকে বলেন, ‘ওরে খাঁচায় শুকসারী আছে, ফলমূল ছোলাটোলা কিছু দিয়ে আয়।’
ঠাকুর শুয়ে আছেন খাটের উপর। চোখ বুজে শুয়ে আছেন। সন্ধে হয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ। খাবার রাখতে সারদা ঘরে ঢুকেছে আলগোছে। বেরিয়ে যাচ্ছে ঠাকুর বলে উঠলেন, ‘দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যাস।’ ভেবেছেন লক্ষ্মী এসেছে বুঝি।
‘দিচ্ছি।’
কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠলেন ঠাকুর। বললেন, ‘আহা, তুমি! আমি ভেবেছিলুম লক্ষ্মী। কিছু মনে কোরোনি।’
দিয়ে যাস? তুই? না, না, তুমি, তুমি। দিয়ে যেও। বন্ধ করে দিয়ে যেও দরজা।
সারা রাত ঠাকুরের আর ঘুম হল না। সকালবেলা নবতে এসে হাজির। বললেন অপরাধীর মত, ‘দেখ গো, সারারাত আমার ঘুম হয়নি ভেবে ভেবে। কেন অমন রুক্ষু কথা বলে ফেললাম!
বাপ নেই, মা পাগল, নাম রাধু। শ্রীমা’র ভাইঝি। কি অসুখ করেছে, তাই তার মা শ্রীমাকে গালাগাল দিচ্ছে। ‘তুমিই ওষুধ খাইয়ে-খাইয়ে আমার মেয়েকে মেরে ফেললে।’ ক্রমেই গলা চড়তে লাগল।। সঙ্গে-সঙ্গে গালাগাল।
শ্রীমা’র অসহ্য মনে হল। বলে উঠলেন পাগলীকে লক্ষ্য করে, ‘তোকে আজই মেরে ফেলব। আমি যদি তোকে মারি, দুনিয়ায় এমন কেউ নেই তোকে রক্ষা করতে পারে। আর এতে আমার পাপও নেই পূণ্যও নেই।’ পরে বলছেন আপন মনে: ‘আমি এমন স্বামীর কাছে পড়েছিলুম কখনো আমাকে তুই পর্যন্ত বলেননি। সরুচাকলি আর সুজির পায়েস তৈরি করে একদিন সন্ধের পর গেছি ঠাকুরের ঘরে। রেখে চলে আসছি, লক্ষ্মী মনে করে বলছেন, দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে যাস। বললুম, হ্যাঁ, রাখলাম ভেজিয়ে। গলার স্বর টের পেয়ে সঙ্কুচিত হয়ে গেলেন, বললেন, আহা তুমি! আমি ভেবেছিলাম লক্ষ্মী। কিছু মনে কোরো না। পরদিন নবতের সামনে গিয়ে কত অনুনয়। দেখ গো, সারা রাত ঘুম হয়নি ভেবে ভেবে। আর রাধার মা কিনা আমাকে দিন-রাত গাল দিচ্ছে। কি পাপে যে আমার এমন হচ্ছে জানি না। হয়তো শিবের মাথায় কাঁটাশুদ্ধ বেলপাতা দিয়েছি। সেই কণ্টকে আমার এই কণ্টক।’
কিন্তু তোর মাথায় যে আমি ফুল দিয়েছি তাতে কি কোনো কণ্টক আছে? কাঁটা না থাকবে তো কাঁদাস কেন এমন করে?
‘কেন এত উতলা হন নরেনের জন্যে?’ টিপ্পনি কাটে রামলাল।
‘ওরে তোর ফেরেনডো যেমন রসিকলাল, নরেনের ফেরেনডো যেমন হাজরা, আমার ফেরেনডো তেমনি নরেন। বলে গেল বুধবার আসবে, ফিরে বুধবার এল তো সে এখনো এল না। তুই একবার গিয়ে খবর নিয়ে আয়, কেমন আছে।’
শেয়ারের গাড়ি না নিয়ে হেঁটেই চলে গেল কলকাতা। পাকড়ালো নরেনকে। বললে, ‘কি গো, ঠাকুরকে বলে এলে বুধবারে যাবে, কত বুধবার চলে গেল, তবুও তোমার দেখা নেই।’
যাব বলে তো ঠিক করি, কিন্তু সংসারের ঝামেলায় হয়ে ওঠে না, দাদা-
“আজই চলো।’
টেরি কেটে ওরই মধ্যে ফিটফাট হয়ে বাবু সাজল নরেন। দক্ষিণেশ্বরে এসে ভূমিষ্ঠ হয়ে ঠাকুরকে প্রণাম করলে।
তার কপালের ধূলো হাত দিয়ে মুছে দিলেন ঠাকুর। মাথার টেরি উসকো-খুসকো করে দিলেন। বললেন, ‘তোর আবার এ সব কেন?’ পরে তাকালেন মুখের দিকে। ‘আজ এখানে থাকবি তো?
না বলতে যেন কান্না পায়। বললে, ‘থাকব।’
‘ওরে রামলাল, নরেন আজ থাকবে।’ উল্লাসে অধীর হলেন ঠাকুর। ‘তোর খুড়িকে খবর দে। ভালো করে খাওয়ার বন্দোবস্ত কর। হিন্দুস্থানী রুটি আর ছোলার ডাল।’
শুধু এখানেই খাওয়ান না, নিজের হাতে খাবার বয়ে নিয়ে যান কলকাতায়। একেবারে তার টঙে।
তিন বন্ধুতে মিলে পড়ছে। নরেন, দাশরথি আর হরিদাস। বাইরে হঠাৎ ডাক শোনা গেল: নরেন, ও নরেন!
নরেন ব্যস্ত হয়ে নামতে লাগল। কিন্তু ব্যস্ততর যিনি তিনি উঠে পড়েছেন। বন্ধুরা দেখল, সিঁড়ির মাঝপথে দুজনের সাক্ষাৎকার।
‘এত দিন যাসনি কেন? যাসনি কেন এত দিন?’ অনুযোগ করছেন ঠাকুর, আর গামছায় বাঁধা সন্দেশ বের করে খাইয়ে দিচ্ছেন নিজ হাতে।
—চল কত দিন গান শুনিনি তোর।’
টঙে উঠে তানপুরা নিয়ে বসল নরেন। কান মলে-মলে সুর বাঁধল। তার পর গাইল গলা ছেড়ে:
জাগো মা কুলকুণ্ডলিনী,
তুমি ব্রহ্মানন্দস্বরূপিনী,
তুমি নিত্যানন্দস্বরূপিনী
প্রসুপ্ত ভুজগাকারা আধার-পদ্মবাসিনী।
ঠাকুর সমাধিস্থ হয়ে গেলেন। নরেনের বন্ধুরা ভাবল হঠাৎ কোনো অসুখ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন বুঝি। জল নিয়ে এল ছুটে। ছিটে দিতে যাবে, বাধা দিল নরেন! বললে, ‘দরকার নেই। ওঁর ভাব হয়েছে। আবার গান শুনতে-শুনতেই প্রকৃতিস্থ হবেন।’
যেমন বলা তেমনি। চলল গানের নির্ঝরস্রোত। ঠাকুর চলে এলেন সহজাবস্থায়। বললেন, ‘যাবি, আমার সঙ্গে যাবি দক্ষিণেশ্বর? কত দিন যাসনি। চল না আজ। বেশিক্ষণ না হয় নাই থাকলি। আবার না হয় ফিরে আসবি এখুনি। যাবি?”
যাব। ঠাকুরের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল নরেন। পড়ে রইল বই। পড়ে রইল তানপুরা।
৭
শিব গুহ-র বাড়ির ছেলে অন্নদা গুহ। অন্নদার কাছে নরেন আজকাল খুব বেশি আনাগোনা করছে। হাজরা নালিশ করল ঠাকুরকে।
‘নরেন অন্নদা এক আফিসওয়ালার বাসায় যায়।’ বললেন ঠাকুর। ‘সেখানে তারা ব্রাহ্মসমাজ করে।’
‘বামুনরা বলে, অন্নদা গুহ লোকটার বড় অহঙ্কার।’
‘বামুনদের কথা শুনো না।’ ঠাকুর পরিহাস করলেন। তাদের তো জানো, না দিলেই খারাপ লোক, দিলেই ভালো। অন্নদাকে আমি জানি, ভালো লোক।’
শুনলাম বেশ কঠোর করছে আজকাল।’ হাজরা বললে। ‘সামান্য কিছু খেয়ে থাকে। ভাত খায় চারদিন অন্তর।’
‘বলো কি!’ যেন একটু আশ্চর্য হলেন ঠাকুর।
শেষে বললেন আত্মস্থের মতো: ‘কে জানে কোন ভেকসে নারায়ণ মিল যায়।’
‘অন্নদার বাড়িতে নরেন আগমনী গাইলে।
‘সত্যি?’ ঠাকুর যেন খুশি হলেন। নিরাকার থেকে সাকারে আসছে নরেন? জ্ঞানের প্রাখর্য থেকে ভক্তির স্নিগ্ধতায়?
বলতে-বলতেই নরেন এসে হাজির।
“তুই আগমনী গেয়েছিস? কি রকম গাইলি? গা না একটিবার—’
নরেনকে নিয়ে বাইরে এলেন ঠাকুর। গোল বারান্দা পেরিয়ে গঙ্গার পোস্তার উপরে এলেন। ‘গা না’
নরেন গান ধরল:
কেমন করে পরের ঘরে ছিলি উমা বলমা তাই।
কত লোকে কত বলে শুনে প্রাণে মরে যাই।।
চিতাভস্ম মেখে অঙ্গে, জামাই বেড়ায় মহারঙ্গে।
তুই না কি মা তারি সঙ্গে সোনার অঙ্গে মাখিস ছাই।।
কেমনে মা ধৈর্য ধরে, জামাই নাকি ভিক্ষা করে।
এবার নিতে এলে পরে বলব উমা ঘরে নাই।।
সেই অন্নদা গুহ একদিন এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। ‘তুমি তো নরেনের বন্ধু?” উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর। ‘জানো তো ওর বাবা মারা গেছে—’
মাথা হেঁট করে রইল অন্নদা।
‘ওদের বড় কষ্ট। দিন চলে না। এখন বন্ধুবান্ধবরা যদি কিছু সাহায্য করে তো বেশ হয়।
অন্নদা চলে গেলে ঠাকুরকে বকতে লাগল নরেন। সে কি কড়া-কড়া কথা!
‘কেন, কেন আপনি ওর কাছে ও সব কথা বলতে গেলেন?’
‘তাতে কি হয়েছে?’
‘কি হয়েছে মানে? আমার দুঃখ-দৈন্যের কথা যার-তার কাছে বলে-বলে বেড়াবেন? আমার কি একটা মান নেই? আমি কি ভিখিরি?”
বকুনি খেয়ে কেঁদে ফেললেন ঠাকুর। বললেন, ‘ওরে তুই ভিখিরি হবি কেন? আমি ভিখিরি হব। আমি দ্বারে-দ্বারে ভিক্ষে করব তোর জন্যে।’
কিন্তু দুঃখে-কষ্টে দেহই যদি না থাকে তবে সবই বৃথা।
‘বাঁচবার ইচ্ছে কেন? কেন দেহের যত্ন করি? ঈশ্বর নিয়ে সম্ভোগ করব, তাঁর নাম-গুণ গাইবো, তাঁর জ্ঞানী-ভক্ত দেখে-দেখে বেড়াবো।’ ত্রৈলোক্য সান্যালকে বলছেন ঠাকুর: ‘তাই মাকে বলেছিলাম, মা, একটু শক্তি দে যাতে হাঁটতে পারি, এখানে-ওখানে যেতে পারি, সঙ্গ করতে পারি জ্ঞানী-ভক্তদের। তা হাঁটবার শক্তি দিলে না কিন্তু—’ তাই কোথায় কোন দোরে গিয়ে তোর জন্যে ভিক্ষে করব?
ঠাকুরের বড় অভিমান হয়েছে মা’র উপর। নরেনের এখনো একটা হিল্লে হল না!
দিন-দিন ম্লান হচ্ছে সেই চারুকান্তি! তাই বলছেন ত্রৈলোক্যকে: ‘এই দেখ না, নরেন্দ্র—বাপ মারা গেছে, বাড়িতে বড় কষ্ট, কোনো উপায় হচ্ছে না। শুধু দুঃখ ভোগ করছে।’ একটু হয়তো থামলেন। বললেন, ‘তা কি করা! ঈশ্বর কখনো সুখে রাখেন, কখনো দুঃখে রাখেন—’
‘আজ্ঞে, তাঁর দয়া হবে নরেনের উপর।’ যেন আশ্বাস দিল ত্রৈলোক্য।
‘আর কখন হবে!’ অভিমানে কন্ঠস্বর ভারী হয়ে এল ঠাকুরের: ‘তবে কাশীতে অন্নপূর্ণার বাড়ি কেউ অভুক্ত থাকে না! কিন্তু যাই বলো, কারু-কারু সন্ধ্যে পর্যন্ত বসে থাকতে হয়।’ নরেন্দ্র কাছেই ছিল, তার দিকে সস্নেহ চোখে তাকালেন ঠাকুর।
‘আমি নাস্তিক মত পড়ছি।’ নরেন নিস্পৃহের মত বললে।
‘দুটোই আছে—অস্তি আর নাস্তি।’ বললেন ঠাকুর: দুটোই যখন আছে, অস্তিটাই নাও না কেন?’
কী মনে হয় চারদিকে তাকিয়ে? একটা কিছু আছে? না, সমস্তই এলোমেলো, ভাঙাচোরা? ট্রেনে যেতে-যেতে দেখি মাঠের ধারে পোড়ো বাড়ি, ইটের পাঁজা ভেঙে পড়েছে, ফাটলে ফাটলে বট-পাকুড়ের জড়িপটি। সহজেই বুঝে নিতে পারি, পরিত্যক্ত, জনশূন্য। আবার হঠাৎ কখনো আগ-রাতের দিকে চকিতে একটা আলো-জ্বালা বাড়ি চোখে পড়ে। কাউকে দেখা যায় না বটে, তেরছা আলোয় চোখে পড়ে কোনো আসবাবের টুকরো কিংবা কোনো দেয়ালের পট-পঞ্জী। কিংবা দিনের বেলায় আরেকটা বাড়িতে চোখে পড়ল, এরিয়েলের তার, কিংবা জামাকাপড় শুকোতে দিয়েছে রেলিঙে। সহজেই বুঝে নিতে পারি, লোক আছে। শ্রী আছে, শৃঙ্খলা আছে, স্থিতি-গতি আছে। তেমনি পৃথিবীর চারদিকে তাকিয়ে কি মনে হয় এ একটা দেয়ালে-গাছ-গজানো পোড়ো বাড়ি, না, আলো-জ্বলা গানের-পরশ-লাগা আনন্দ-নিকেতন?
হয় নীতি, নয় শক্তি, নয় শৃঙ্খলা–একটা তো কিছু আছে। অন্তত একটা ধারাবাহিকতা। অন্তত একটা পুনরাবৃত্তি। থাকাটাই যদি সত্যি হয় তবে তাই, তাই ভগবান।
‘কিন্তু ভগবান তো ভক্তকে দেখবেন।’
সুরেশ মিত্তির বললে নরেনের পক্ষ হয়ে।
‘নইলে তাঁকে ন্যায়পরায়ণ বলি কি করে?” ‘সেই তো মায়া! ঈশ্বরের কাজ বুঝি এমন আমাদের সাধ্য কি। ভীষ্মদেব শরশয্যায় শুয়ে। পাণ্ডবেরা দেখতে এসেছেন। সঙ্গে কৃষ্ণ। এসে খানিকক্ষণ পর দেখেন, ভীষ্মদেব কাঁদছেন। কি আশ্চর্য! পাণ্ডবেরা প্রশ্ন করলেন কৃষ্ণকে—পিতামহ অষ্টবসুর এক বসু, এঁর মতন জ্ঞানী দেখা যায় না। ইনিও মৃত্যুর মায়াতে কাঁদছেন? তারই জন্যে কি? জিজ্ঞেস করো ভীষ্মকে। জিজ্ঞেস করাতে ভীষ্মদেব বললেন, কৃষ্ণ, ঈশ্বরের কাজ কিছুই বুঝতে পারলাম না। যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ নারায়ণ ফিরছেন সেই পাণ্ডবদের বিপদের শেষ নেই। যখনই এই কথা ভাবি তখনই কাঁদি। এই ভেবে কাঁদি ঈশ্বরের কার্য বোঝবার যো নেই।’
‘একটু গা না—’ বললেন ফের নরেনকে।
‘ঘরে যাই—অনেক কাজ আছে।’ ঘুরে দাঁড়াল নরেন।
ঠাকুর অভিমানের সুর মিশিয়ে বললেন, ‘তা বাছা, আমাদের কথা শুনবে কেন? যার আছে কানে সোনা তার কথা আনা-আনা। যার আছে পোঁদে ট্যানা, তার কথা কেউ শোনে না।’
সকলে হেসে উঠল ।
‘তুমি বাবু গুহদের বাগানে যেতে পারো। প্রায় শুনি, আজ কোথায়, না গুহদের বাগানে। এ কথা বলতুম না-তা তুই কেঁড়েলি করলি কেন?’
নরেন চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। শেষে বললে, ‘যন্ত্র নেই। শুধু গান—’
‘আমাদের বাছা যেমন অবস্থা। এইতে পারো তো গাও। তাতে বলরামের বন্দোবস্ত!”
‘কত দিনে হবে সে প্রেম সঞ্চার’ গান ধরল নরেন। ভাবাবেশে তার চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগল। দেখে ঠাকুরের মহানন্দ!
নরেন কি তবে ধ্যানের পথে? সমাধির পথে? যিনি নাদরহিত, ব্যঞ্জনবহিত, স্বররহিত, উচ্চারণরহিত, রেখারহিত—নরেন কি সেই ব্রহ্মের সন্ধানে?
যেমন তিলের মধ্যে তেল, দুধের মধ্যে ঘি, ফুলের মধ্যে গন্ধ, ফলের মধ্যে রস, কাঠের মধ্যে আগুন তেমনি শরীরের মধ্যে আত্মা। সর্বব্যাপী, সর্বস্বরূপ। স্নেহসরূপ, স্বাদস্বরূপ, সৌরভস্বরূপ। বাতাস যেমন আকাশময় ঘুরে বেড়াচ্ছে তেমনি ঈশ্বরও হৃদয়ে ব্যাপ্ত হয়ে আছেন। হৃদয়ই আকাশ। বাতাস আর ঈশ্বর দুইই নিশ্বাসবস্তু। এই হৃদয়াকাশেই ধরতে হবে সেই সমীরণকে। নরেন কি সেই হৃদয়াকাশের অভিযাত্রী?
‘লাল জ্যোতি দেখলুম।’ ঠাকুর বলছেন তাঁর আশ্চর্য দর্শনের কথা: ‘তার মধ্যে বসে নরেন্দ্র-সমাধিস্থ। একটা চোখ চাইলে। বুঝলাম ওই একরূপে সিমলেতে কায়েতের ছেলে হয়ে আছে। তখন বললাম, মা ওকে মায়ায় বদ্ধ কর। তা না হলে সমাধিস্থ হয়ে দেহত্যাগ করবে।’
৮
দেহত্যাগের আর দেরি নেই। প্রায়োপবেশনেই সমাধি-শয়ন নেব এবার।
ঠাকুর তবে কি করতে আছেন? তাঁর ভালোবাসায় তবে আর লাভ কি? তিনি থাকতে যদি মা-ভাই-বোনকে আধপেটা খেয়ে থাকতে হয় তবে তাঁরই বা থাকবার কী অর্থ!
এটর্নির আফিসে কিছু খাটাখাটনি করল ক’দিন। অনুবাদ করল কখানা বইয়ের।
জল গরম করবার মতও রোজগার নয়।
শত ঠেলা মেরেও সরানো যাচ্ছে না অভাবের হাতিকে। এবার ঠাকুর এসে হাত মেলান। তাঁর মা’র তো অনেক প্রতাপ। মা’র কাছে তাঁর তো অনেক খাতির। এবার তাঁর মাকে বলে-কয়ে একটা ব্যবস্থা করিয়ে দিন।
ছুটল দক্ষিণেশ্বর। একেবারে ঠাকুরের পদপ্রান্তে।
‘আপনার মাকে একবারটি বলুন।
অবাক হয়ে মুখের দিকে তাকালেন ঠাকুর। বললেন, ‘কি বলব?
‘মা-ভাই-বোনের কষ্ট আর দেখতে পারি না।’ নরেন বললে প্রায় পরাভূতের মত: ‘ওদের কষ্টের যাতে লাঘব হয়, একটা স্থায়ী চাকরি-বাকরি হয় আমার, আপনার মা’র কাছে সুপারিশ করুন একটু–
ঠাকুর তাকালেন স্নিগ্ধ চোখে। বললেন, ‘আমার মা, তোর কে? ‘
পুত্তলিকা। প্রস্তরপ্রতিমা।
নরেন মাথা হেঁট করে রইল। বললে, ‘আমার কে না কে, তাতে কী আসে যায়? আপনার তো সব। আপনার কথা তো আর ফেলতে পারবে না। একটু বলুন না আমার হয়ে। যাতে টাকাকড়ির একটু মুখ দেখি। মা-ভাই-বোনের ম্লান মুখে একটু হাসি ফোটাই!’
‘ওরে ও সব বিষয় কথা বলতে পারি না–
‘ও সব বাজে কথা ছাড়ুন।’ নরেন মরীয়া হয়ে উঠল: ‘আপনাকে বলতেই হবে। নইলে ছাড়ব না কিছুতেই।’
ঠাকুরের চক্ষু দুটি ছলছল করে উঠল। বললেন, ‘ওরে, জানিস না, কতবার বলেছি তোর হয়ে। বলেছি, মা, নরেনের দুঃখ-কষ্ট দূর কর। নরেনকে টাকা দে—’
‘বলেছেন? বেশ, আজ একবার বলুন।
‘তুই গিয়ে বল। কাছে বসে একবার মা বলে ডাক।’
‘আমার ডাক আসে না।’
‘তারই জন্যে তো হয় না কিছু সুরাহা।’ ঠাকুর তাকালেন তার মুখের দিকে।
‘তারই জন্যে তো তোর এত কষ্ট। তুই মাকে মানিস না বলে মা আমার কথাও শোনেন না। শোন,’ ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করলেন: ‘আজ মঙ্গলবার। রাত্তিরে কালীঘরে গিয়ে মাকে প্রণাম কর। তার পর যা চাইবি মা’র কাছে, মা দিয়ে দেবেন। লুট করেও মা’র ভাণ্ডার শেষ করতে পারবিনে।
‘সত্যি?’
‘তুই দ্যাখই না চেয়ে।’
তবে আর ভয় নেই। আকুল হয়ে রাত্রির প্রতীক্ষা করতে লাগল নরেন। প্রার্থনা করা মাত্রই রাত্রির অবসান হয়ে যাবে। সম্পদে-সৌন্দর্যে ভরে উঠবে ঘর-দুয়ার। ক্লেশভার কাঁধে নিয়ে পালিয়ে যাবে দারিদ্র্য। উচ্ছল দক্ষিণ বাতাসের মত আসবে এবার সচ্ছলতা।
কত সহজ সমাধান। শুধু প্রণাম আর প্রার্থনা। শুধু স্বীকৃতি আর সমর্পণ!
উৎকণ্ঠার কণ্টকের উপর দিয়ে হেঁটে-হেঁটে এল সেই মঙ্গলরাত্রি। ক্রমে এক প্রহর কেটে গেল। ঠাকুর এসে বললেন, ‘যা এবার শ্রীমন্দিরে। প্রাণ ঢেলে প্রণাম কর। তার পর চা প্রাণ ভ’রে।’
যেন নেশা করেছে নরেন, পা টলতে লাগল। কী না জানি সে দেখবে! কী না জানি শুনবে মা’র মুখের থেকে! প্রস্তরময়ী প্রাণময়ী হয়ে উঠবে। জড়পুত্তলী হয়ে উঠবে সুভাষিণী।
মন্দিরে আর কেউ নেই। শুধু নরেন আর ভবতারিণী।
কী দেখল নরেন চোখ চেয়ে? দেখল অখিল জগতের জননী প্রেম ও প্রসন্নতার নিত্যনির্ঝরিণী হয়ে বিরাজ করছেন। সৌম্যা সুন্দরী আর্তিহারিণী। সহস্র-নয়নোজ্জলা হয়ে সংসারে সমারূঢ় হয়ে আছেন। কোথাও শোক নেই দুঃখ নেই অভাব-অভিযোগ নেই।
ত্রিলোকমোহিনী মূর্তির কাছে দাঁড়িয়ে নরেন আর কী প্রার্থনা করবে? প্রণাম করে ভক্তিবিহ্বল হৃদয়ে বলে উঠল, ‘মা, জ্ঞান দাও, ভক্তি দাও, বিবেক দাও, বৈরাগ্য দাও!’ তন্ময়ের মত ফিরে এল ঠাকুরের কাছে। ঠাকুর চঞ্চল হয়ে উঠলেন। ‘কি রে, গিয়েছিলি মা’র কাছে? চেয়েছিলি টাকাকড়ি?” নরেন বিমূঢ়ের মত তাকিয়ে রইল। ‘কি রে, বলেছিলি আমার সংসারের দুঃখ কষ্ট দূর করে দাও?’
‘কি আশ্চর্য, সব ভুল হয়ে গেল। এখন কী হবে?’ অসহায়ের মত মুখ করলে। ‘যা, যা, ফের যা।’ ঠাকুর তাকে ঠেলে দিলেন মন্দিরের দিকে। ‘গিয়ে ফের প্রার্থনা কর। মনের কথা মাকে না বলবি তো কাকে বলবি? কেন ভুল হবে? মাকে গিয়ে বল, মা আমাকে চাকরি দে, আরাম দে, স্বাচ্ছন্দ্য দে—’
নরেন আবার এসে দাঁড়াল ভবতারিণীর সমুখে।
সেই কনকোত্তমকান্তিকান্তা দয়ার্দ্রচিত্তা অখিলেশ্বরী। সর্বব্যাপিনী মহতী স্থিতি-শক্তি। শক্তিমতী সত্তা। বিদ্যারূপে উদ্ভাসিনী।
কী আর ভিক্ষা করব মা’র কাছে? মহীরূপে মৃত্তিকারূপে জগৎসংসারকে মায়ের মতনই বুকে করে আছেন। আমিও তো মা’র কোলে অমল শিশু।
‘মা, জ্ঞান দাও, ভক্তি দাও, বিবেক দাও, বৈরাগ্য দাও –
আবার ফিরে এল ঠাকুরের কাছে।
‘কি রে, এবার চেয়েছিলি ঠিক-ঠিক?” ‘পারলাম না। এল না মুখ দিয়ে।’
‘সে কি কথা? তুই কি আনাড়ি না আকাট?”
‘মাকে দেখামাত্রই কি রকম একটা আবেশ আসে।’ নরেন বলতে লাগল মুগ্ধের মত। ‘যা চাইবো বলে ভেবেছিলুম তা আর মনে করতে পারলুম না।’
দূর ছোঁড়া। নিজেকে প্রথমে একটু সামলে নিবি।’ ঠাকুর যেন তাকে শিখিয়ে দিলেন: ‘গোড়াতেই তলিয়ে যাবিনে। সামলে নিয়ে চারদিক বুঝে-সমঝে মাথা ঠাণ্ডা করে চাইবি। যা, আরেকবার গিয়ে চেষ্টা কর। এমন সোনার সুযোগ আর আসবে না।’ নরেনকে আবার তিনি ঠেলে দিলেন। নরেন আবার এসে পৌঁছল মন্দিরে।
পরমা মায়া মোক্ষরূপে বসে আছেন সামনে। সুদূরবর্তী আকাশ থেকে সন্নিহিত মৃত্তিকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ তাঁর আসন। দেহবুদ্ধিরূপে তিনি, আবার মনোরূপে তিনি। সুখদুঃখভোক্তা প্রাণরূপে তিনি, আবার বিশুদ্ধ চৈতন্যরূপে তিনি। তিনি সর্বস্বরূপা সর্বেশ্বরী। হীনবুদ্ধির মত তাঁর কাছে কী লাউ-কুমড়ো চাইব! যিনি বরদায়িনী মূর্তিতে অবাধদর্শনা হয়ে আছেন তাঁর কাছে আবার কী ভিক্ষে করব? যিনি সর্ববাধাপ্রশমনী তাঁর সত্তায় বিশ্বাস হোক এবার। তা হলে আর অভাব নেই কাতরতা নেই অন্ধকার নেই।
‘আর কিছু চাই না মা, আমাকে জ্ঞান দাও, ভক্তি দাও, বিবেক দাও, বৈরাগ্য দাও।”
বারে বারে প্রণাম করতে লাগল নরেন।
প্রকৃষ্টরূপে অবনত হওয়ার নামই প্রণাম। অহংজ্ঞানকে প্রকৃষ্টরূপে নিপাতিত করার নামই প্রণিপাত। তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া।
মানুষের দরজায়, বিষয়ের দরজায় মাথা ঠুকব না আর। সহস্রশীর্ষে প্রকৃতিরূপিণী জননীকে প্রণাম করব।
‘কি রে, চাইলি এবার?’ ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।
‘চাইতে লজ্জা করল!’
‘লজ্জা করল!’ আনন্দে হাসতে লাগলেন ঠাকুর। নরেন বসল তাঁর পদচ্ছায়ে। তখন ঠাকুর তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে-দিতে বললেন, ‘মা বলে দিয়েছেন তোদের মোটা ভাত-কাপড়ের অভাব হবে না কোনোদিন।’
ও-সবে আর যেন আগ্রহ নেই নরেনের। বললে, ‘আমাকে মা’র গান শিখিয়ে দিন।’ ‘কোনটা শিখবি?’
‘মা ত্বং হি তারা—সেই গানটা—’
ঠাকুর শিখিয়ে দিলেন।
‘মা ত্বং হি তারা
ত্রিগুণধরা পরাৎপরা।
তোরে জানি মা ও দীনদয়াময়ী
তুমি দুর্গমেতে দুঃখহরা।
তুমি জলে, তুমি স্থলে,
তুমিই আদ্য মূলে গো মা,
আছ সর্বঘটে অঙ্গপুটে
সাকার আকার নিরাকারা।
তুমি সন্ধ্যা, তুমি গায়ত্রী,
তুমিই জগদ্ধাত্রী গো মা
তুমি অকূলের ত্রাণকর্ত্রী
সদাশিবের মনোহরা।।
সারা রাত গাইলে ঐ গান। ঘুমুতে গেল না। নিশীথরাত্রির সঙ্গীতময়ী মহতী সত্তায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল।
পরদিন দুপুরবেলা পর্যন্ত ঘুমুচ্ছে নরেন। তার পাশে বসে আছেন ঠাকুর। যেন পাহারা দিচ্ছেন।
বৈকুণ্ঠ সান্যাল এসেছে।
‘ওরে এই ছেলেটিকে চিনিস? এ বড় ভালো ছেলে, নাম নরেন্দ্র।’
‘এখনো ঘুমচ্ছে যে?’
‘কাল সমস্ত রাত মা’র গান গেয়েছে—মা ত্বং হি তারা। গাইতে গাইতে রাত কাবার। কাল কী হয়েছিল জানিস নে বুঝি?”
কৌতূহলী হয়ে তাকাল বৈকুণ্ঠ।
‘মাকে আগে মানত না, কাল মেনেছে। কষ্টে পড়েছিল তাই মা’র কাছে গিয়ে টাকা-কড়ি চাইতে বলে দিয়েছিলাম। তা গিয়েছিল চাইতে, কিন্তু পারল না! লজ্জা করল! বলতে-বলতে আনন্দে উছলে পড়ছেন ঠাকুর: ‘বললে, ফুল-ফল চেয়ে কী হবে, মা তোকেই চাই। তাই গান শিখে নিয়ে গাইলে সমস্ত রাত–তুমি অকলের ত্রাণকর্ত্রী, সদাশিবের মনোহরা। কালী মেনেছে নরেন, মা মেনেছে, বেশ হয়েছে—তাই না?’
বৈকুণ্ঠ সায় দিল: ‘বেশ হয়েছে।’
হাসতে লাগলেন ঠাকুর: ‘নরেন কালী মেনেছে, মা মেনেছে—কী বলো, বেশ হয়েছে। কেমন? তাই না?’
যা দেবী সর্বভূতেষু ছায়ারূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।।
৯
‘আত্মজীবনী লেখা মানে কতগুলো মিছে কথার জাল বোনা।’ বলছেন গিরিশচন্দ্র। শুধু লোকের কাছে দেখাবার চেষ্টা আমি খুব বাহাদুর-আমার খাওয়া, শোওয়া, ঘুম, স্বপ্ন, চিন্তা সব অসাধারণ। দোষগুলি ঢাকা দিয়ে আমি মস্ত একজন ভগবানের স্পেশ্যাল-মার্কার তৈরি, এই তো বলতে হবে। দম্ভের এর চেয়ে আর কিছু প্রকাশ হতে পারে না। শুধু পালিশ করে নিজেকে দেখানো, আমি কত মহৎ, কত উদার, কত প্রতিভাশালী। আত্মজীবনী মানে নিজের ওকালতি করা।’
‘কেউ-কেউ তো আত্মজীবনীতে নিজের দুষ্প্রবৃত্তির কথাও বলে থাকেন।’ বললেন একজন।
‘তাও নিজের মহত্ত্ব প্রকাশ করবার জন্যে।’
আমার অহঙ্কার ভেঙে ফেল, ধুলো করে দাও। একটি ফুৎকারে উড়িয়ে দাও মৃতপত্রের জঞ্জাল, আবার একটি ফুৎকারে বাজিয়ে তোলো স্তম্ভিত সমুদ্রের শঙ্খ। নিজের পুচ্ছের আলোতে জোনাকির মত আত্মসংসার আলোকিত দেখছি, সে সীমার বাইরে আর সবই অস্বীকৃত—এবার দেখাও তোমার স্পর্শপ্রগাঢ় অন্ধকার। যেখানে বিচ্ছিত্তি নেই, বিবিক্ততা নেই, শুধু অনন্ত অন্তর্ব্যাপ্তি। তুমি যদি পুত্রের থেকে প্রিয়, বিত্তের থেকে প্রিয়, অন্যতর সমস্ত কিছুর থেকে প্রিয়, তবে সুখসাধনদ্রব্যে কেন সমাসক্ত রেখেছ? ভেঙে দাও এই মধুপাত্র। ভোগ তো একরকম মনোবিকার। ভেঙে দাও এই মত্ততার স্বপ্ন। কাটিয়ে দাও এই রোগরাত্রি। অহং থেকে আত্মাতে নিয়ে চলো।
‘আহা, বসেছেন দেখ না!’ বললেন ঠাকুর, ‘যেন গোঁফে চাড়া দিয়ে সাইনবোর্ড মেরে বসেছেন!’
কিন্তু গোঁফের তেজ কতদিন! কতদিনই বা সাইনবোর্ডের চাকচিক্য।
একজন এলে আরেকজন যায়। আরেকজন এলে সে-একজন থাকে না। তাদের চির-কালের ঝগড়া। কিছুতেই তারা থাকতে পারে না একসঙ্গে। একজনের প্রকাশে আরেকজনের পলায়ন। তারা হচ্ছে ‘আমি’ আর ‘তিনি’। অহং আর আত্মা। হয় আমি থাকি নয় তুমি থাকো। আর, তুমি যদি আসো আমি কোথায়!
‘পাছে অহঙ্কার হয় ব’লে গৌরীচরণ “আমি” বলত না–বলত “ইনি”। আমিও তার দেখাদেখি “ইনি” বলতাম। আমি খেয়েছি না বলে বলতাম ইনি খেয়েছেন। সেজবাবু তাই দেখে একদিন বললে, সে কি কথা, তুমি কেন ওসব বলবে? ওসব ওরা বলুক, ওদের অহঙ্কার আছে। তোমার তো আর অহঙ্কার নেই।’
না, আমারও বুঝি অহঙ্কার হত মাঝে-মাঝে!
পূর্বকথা, বেলতলায় তন্ত্রের সাধনাব কথা বলতে গিয়ে বললেন ঠাকুর, ‘যেদিনই অহঙ্কার করতুম তার পরদিনই অসুখ হত।’
দক্ষিণেশ্বরে কালীবাড়ির সেই মেথরানির কথা মনে নেই? তার যে কি অহঙ্কার! গায়ে দু-একখানা গয়না ছিল। যে পথ দিয়ে আসে গয়নার ঝলস দিয়ে বলে, এই, সরে যা! তার মানে, এই দেখে যা! মেথরানিরই এই, তা অন্য লোকের কথা আর কি বলবো!
একমাত্র নিরহঙ্কার যুধিষ্ঠির। পাঁচ ভাই চলেছে মহাপ্রস্থানে। সর্ব প্রথম পড়ল সহদেব। ভীম জিজ্ঞেস করল, সহদেবের পতনের কারণ কি? যুধিষ্ঠির বললেন, সহদেব মনে করত তার মত প্রাজ্ঞ আর কেউ নেই—সেই অহঙ্কারে। তার পরে পড়ল নকুল। নকুল পড়ল কেন? নকুল ভাবত তার মত রূপবান আর কেউ নেই—সেই অহঙ্কারে। তার পরে অর্জুন। অর্জুন ভাবত, আমিই সর্বাগ্রগণ্য ধনুর্থর সেই অভিমানে। তার পরে ভীম। আমি কেন পড়লুম? তুমি অতিরিক্ত ভোজন করতে, অন্যের শক্তি উপেক্ষা করে নিজের শক্তির শ্লাঘা করতে, সেই দর্পে। সশরীরে স্বর্গে এলেন শুধু যুধিষ্ঠির।
তোমার দম্ভ নয়, তোমার দয়া!
নদীতীরে বসে তপস্বী সন্ধ্যা করছিলেন, এক নিরাশ্রয় বৃশ্চিক ভাসতে ভাসতে সেখানে এসে উপস্থিত। স্থলে আশ্রয় দেবার জন্যে জল থেকে তাকে তুললেন তপস্বী। তুলতে-না-তুলতেই বৃশ্চিক তাঁকে দংশন করল। বিষজ্বালায় অস্থির হয়ে জলে তক্ষুনি তাকে ছুঁড়ে ফেললেন। জলে পড়ে বিপন্ন বৃশ্চিক আবার হাবুডুবু খেতে লাগল। দেখে আবার দয়া হল তাপসের। আবার তাকে তুললেন হাতে করে। আবার দংশন। আবার নিক্ষেপ। পরে ভাবলেন, বৃশ্চিক তার নিজের ধর্ম বারে বারে পালন করছে বারে বারে দংশন করে, কিন্তু আমি কেন ধর্মভ্রষ্ট হচ্ছি? আমার সর্বজীবে দয়া। আমি কেন তাকে জলে ছুঁড়ে ফেলছি? আমার চেয়ে বৃশ্চিক বেশি স্বধর্মাশ্রিত। এই ভেবে আবার তাকে তুললেন জল থেকে। দংশন করলেও এবার আর ফেললেন না। স্থলেই স্থান করে দিলেন।
বার-বার ঘষলেও চন্দন চারু গন্ধ। বার-বার ছিন্ন করলেও ইক্ষু কাণ্ড মধুস্বাদু। বার-বার দগ্ধ করলেও কাঞ্চন কান্তবর্ণ। তেমনি যারা সজ্জন তারা প্রকৃতিবিকৃতি-শূন্য।
তোমার ক্ষোভ নয়, তোমার ক্ষমা।
তুমি অতৃণ মাঠ। সেখানে আগুন পড়লেও বা কি। আগুন মাটির স্পর্শে আপনিই শান্ত হয়ে যায়। তপ্ত লৌহকে ছেদন করবার জন্যে তোমার হাতে শীতল লৌহ। ধূলির ধরণীতে তুমিই ধরাধর।
তুমি পিঁপড়েটির পর্যন্ত নিন্দা করো না। বরং তার পায়ের নুপূরগুঞ্জনটি শোনো।
‘নগণ্য পিঁপড়ের পর্যন্ত নিন্দে কোরো না।’
এ সংসারে সুখ দুর্লভ, সুখই আবার সুলভ। তাই কেউ যদি আমার নিন্দা করে প্রীতিলাভ করে, সমক্ষেই হোক বা অসাক্ষাতেই হোক, করুক, আনন্দ পাক। নিন্দা কবার অধিকার দিয়েই তাকে আমি অভিনন্দিত করছি।
ভববল্লী কি? তৃষ্ণা। দারিদ্র্য কি? অসন্তোষ। দান কি? অনাকাঙ্ক্ষা। ভোগ্য কি? সহজ সুখ। ত্যাজ্য কি? অহঙ্কার।
নিজের অন্তরঙ্গদের দেখবার জন্যে ব্যাকুল তখন ঠাকুর। রাতে ঘুম নেই। কালী-মন্দিরে বসে-বসে কাঁদেন। বলেন, ‘মা, ওর বড় ভক্তি, ওকে টেনে নাও। মা গো, ওকে এখানে এনে দাও; যদি সে না আসতে পারে তা হলে আমাকে সেখানে নিয়ে যাও। আমি দেখে আসি।’
থেকে-থেকে তাই ছুটে আসেন বলরাম বসুর বাড়িতে। সেখানেই প্রেমের হাট বসিয়েছেন। বলেন, ‘জগন্নাথের সেবা আছে বলরামের। খুব শুদ্ধ অন্ন। এসেই বলরামকে বলেন, ‘যাও, নরেন্দ্রকে, ভবনাথকে, রাখালকে নিমন্ত্রণ করে এস। এদের খাওয়ালে নারায়ণকে খাওয়ানো হয়। এরা সামান্য নয়, এরা ঈশ্বরাংশে জন্মেছে। এদের খাওয়ালে তোমার ভালো বই মন্দ হবে না।’
বলরাম আবার একটু হাত-টান।
ঠাকুরকে একদিন গাড়ি করে দিয়েছে দক্ষিণেশ্বর যাবে। ভাড়া ঠিক করেছে বারো আনা। সে কি কথা! বারো আনায় দক্ষিণেশ্বর?
‘তা ও অমন হয়।’ ঘাড় নেড়ে দিয়ে চলে গেল বলরাম। শেষকালে কেলেঙ্কার রাস্তার মাঝেই গাড়ি পড়ল ভেঙে। ঘোড়া আর যেতে চায় না। চাবুক চালালো গাড়োয়ান। তখন সেই ভাঙা গাড়ি নিয়েই দে-দৌড়। পড়ি কি মরি ঠিক নেই। যখনই দেখবে বন্দোবস্তটা একটু শিথিল বা কৃপণ, তখনই ঠাকুরের ভাষায় ‘বলরামের বন্দোবস্ত’। গাড়ি না করে ঠাকুর যদি নৌকোয় আসেন তবেই যেন বলরাম বেশি খুশি। কড়া-গণ্ডা উশুল করে নেওয়ার পক্ষপাতী। তাই বললেন একদিন ঠাকুর, ‘যখন খ্যাঁট দিয়েছে তখন নিশ্চয়ই আজ বিকেলে নাচিয়ে নেবে।
কীর্তনের সময় ঠাকুর যখন নাচেন তখন বলরাম খোল বাজায়। সে আবার আরেক যন্ত্রণা। বলরামের তালবোধ নেই। তার ভাবখানা হচ্ছে এই, আপনারা গাও নাচো আনন্দ করো, আর আমি যেমন-তেমন খোলে চাঁটি মারি।
হাজরা ঠাট্টা করে বলে, ‘তোমার খালি বড়লোকের ছেলের দিকে টান।’
‘তাই যদি হবে তবে হরীশ, নেটো, নরেন্দ্র—এদের ভালোবাসি কেন? ভাত নুন দে খাবার পয়সা জোটে না নরেন্দ্রর।’
বলরাম জিজ্ঞেস করল, ‘সংসারে পূর্ণজ্ঞান হয় কি করে?”
“শুধু সেবা করে। মায়ের সেবা করে। জগতের মা-ই সংসারের মা হয়ে এসেছেন।’ বললেন ঠাকুর। ‘যতক্ষণ নিজের শরীরের খবর আছে ততক্ষণ মা’র খবর নিতে হবে। তাই হাজরারে বলি, নিজের কাশি হলে মিছরি মরিচ করতে হয়। যতক্ষণ এ সব করতে হয় মা’র খবরও নিতে হয়। তবে যখন নিজের শরীরের খবর নিতে পাচ্ছি না, তখন অন্য কথা। তখন ঈশ্বরই সব ভার লন।’
ঠাকুর ও ভক্তদের খাওয়াবার নিমন্ত্রণ করে ডেকে এনেছে বলরাম। বারান্দায় বসে গিয়েছে সার বেঁধে। দাসের মতন দাঁড়িয়ে আছে বলরাম, প্রভুর মত নয়। তাকে দেখলে কে বলবে সে এ বাড়ির কর্তা।
একদিন ভাবদৃষ্টিতে বলরামকে দেখলেন ঠাকুর। বটতলা থেকে বকুলতলা পর্যন্ত দেখলেন চৈতন্যদেবের সঙ্কীর্তনের দল চলেছে। তার পুরোভাগে বলরাম। কিরূপ ভক্ত এখানে আসবে আগে থেকে তা দেখিয়ে দেয় মহামায়া। বলরাম না এলে চলবে কেন? নইলে মুড়ি-মিছরি সব দেবে কে?
প্রথম যেদিন দেখলেন দক্ষিণেশ্বরে, বললেন, ‘ওগো মা বলেছেন তুমি যে আপনার জন। তুমি যে মা’র একজন রসদদার। তোমার ঘরে এখানকার অনেক জমা আছে—কিছু কিনে পাঠিয়ে দিও।’
তাই দেয় বলরাম। চাল-ডাল চিনি-মিছরি আটা-সুজি সাগু-বার্লি। বলেন ঠাকুর, ‘ওর অন্ন আমি খুব খেতে পারি। মুখে দিলেই যেন আপনা হতে নেমে যায়।’
দক্ষিণেশ্বরের কালীবাড়ির নাম রেখেছেন ‘মা কালীর কেল্লা’—প্রথম কেল্লা। দ্বিতীয় কেল্লা হচ্ছে বলরামের বাড়ি। ৫৭ রামকান্ত বসু স্ট্রিট।
সেই বাড়িতেই ঠাকুরের সঙ্গে গিরিশ ঘোষের দ্বিতীয় দেখা।
প্রথম দেখা এটর্নি দীননাথ বোসের বাড়িতে। বোসপাড়া লেনে। ‘ইণ্ডিয়ান মিরর’ পড়ে প্রথম জানতে পায় পরমহংসদেবের কথা। এ আবার কেমন পরমহংস! ব্রাহ্মরা বেশ ভোল বদলাচ্ছে যা হোক। হরি ধরেছে, মা ধরেছে, এবার মনের মত এক পরমহংসও খাড়া করেছে দেখছি। ভেলকি ধরেছে মন্দ নয়। এমনি করে লোক বাগাবার মতলব। যাই একবার দেখে আসি গে।
বেজায় ভিড় হয়েছে। ঠাকুরকে ঘিরে বহু ভক্তের সমাগম। ঐ বুঝি কেশব সেন। ঘন-ঘন সমাধিস্থ হচ্ছেন ঠাকুর আবার সমাধিভঙ্গের পর উপদেশ দিচ্ছেন। যারা শুনছে তারা যেন কর্ণ দিয়ে সুধা পান করছে।
সন্ধে হয়েছে। সেজ জ্বেলে রেখে গেল ঠাকুরের সামনে। ঠাকুরের তখনো অর্ধবাহ্য-দশা। বললেন, ‘সন্ধে হয়েছে?’
ঢং! গিরিশের মন তেতে উঠল। দিব্যি সেজ জ্বলছে সামনে, আর, বলছে কিনা, সন্ধে হয়েছে? সন্ধে না হলে আলো কেন?
সন্ধে হয়েছে? আবার জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।
হ্যাঁ, হয়েছে। কে একজন বলে উঠল।
কেউ একজন না বলে দিলে যেন সন্ধে হয়েছে কিনা বোঝা যাবে না! চোখের সমুখে আলো জ্বেলে দিলেও না! বুজরুকি আর কাকে বলে! বিরক্তিতে সমস্ত মন বিষিয়ে উঠল গিরিশের। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল।
বাড়ি ফিরলে জিজ্ঞেস করলে পিসেমশাই, সদরালা গোপীনাথ বোস, ‘কেমন দেখলে হে?
একবাক্যে নস্যাৎ করল গিরিশ। ‘বুজরুকি।’
