পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ (প্রথম খন্ড) – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্॥ পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্, ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে৷৷”
— শ্রীমদ্ভগবদগীতা
“যে রাম যে কৃষ্ণ, ইদানীং সেই রামকৃষ্ণর রূপে ভক্তের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে।”
— শ্রীরামকৃষ্ণ
“নরলীলায় অবতারকে ঠিক মানুষের মত আচরণ করতে হয়—তাই চিনতে পারা কঠিন। মানুষ হয়েছেন তো ঠিক মানুষ। সেই ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রোগ, শোক, কখনো বা ভয়—ঠিক মানুষের মত। পঞ্চভূতের ফাঁদে ব্রহ্ম পড়ে কাঁদে।”
— শ্রীরামকৃষ্ণ
॥ ওঁ ভগবতে শ্রীরামকৃষ্ণায় নমঃ।।
.
ভূমিকা
ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণরূপে মর্তধামে লীলা করতে এসেছিলেন। সে লীলা-কাহিনী অনেক ভক্ত ও সাধক লিপিবদ্ধ করেছেন। আমি অযোগ্য আমি অকিঞ্চন আমি কামকাঞ্চনকীট। ভগবানের সেই নরলীলা বর্ণনা করতে পারি আমার সে ক্ষমতা নেই, পবিত্রতাও নেই। তবে দস্যু রত্নাকরেরও রাম নাম নেবার অধিকার ছিল—মরা-মরা বলতে-বলতে সেও একদিন পৌঁচেছিল রাম-নামে। আর, ভগবান কৃপা করলে মূকও বাচাল হয়, পঙ্গুও যায় গিরিলঙ্ঘনে। তাই ভগবানের কৃপাবলম্বন করেই আমি অগ্রসর হয়েছি। আমার তত্ত্ব নেই শাস্ত্র নেই, তন্ত্র-মন্ত্র কিছু নেই, আছে কিঞ্চিৎ সাহিত্য। এই সাহিত্যের উপচারেই অর্চনা করতে চেয়েছি ভগবানকে।
গীতায় ভগবান বলেছেন:
পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি।
তদহং ভক্ত্যুপহুতমশ্নামি প্ৰযতাত্মনঃ৷৷
ভক্তিভরে ভগবানকে যাই দেওয়া যায় তাই তিনি গ্রহণ করেন। বিদুরের স্ত্রী কলা না দিয়ে কলার খোসা দিয়েছিলেন ভগবানকে। আমি নিবেদন করলাম আমার সাহিত্য, আমার কথাশিল্প। এর মধ্যে এক বিন্দুও ভক্তি আছে কিনা, যিনি সকল মনের স্বাদ গ্রহণ করে বেড়ান তিনিই জানেন।
আমি গঙ্গাজলেই গঙ্গাপূজো করতে চেয়েছি। কিন্তু সেই গঙ্গাজলের সঙ্গে অনেক ঘোলা জল মিশে গিয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণের কথার সঙ্গে আমার নিজের অনেক কথা চলে এসেছে, ফুলের মাঝে কাঁটার মত, কিংবা বলি, কীটের মত। তাতে ফুলের সৌরভ কখনো ম্লান হবার নয়। ঘোলা জল মিশলেও গঙ্গাজলের শুচিতা কখনো নষ্ট হয় না। আমরা ভাষা দেখি ভগবান ভাব দেখেন। এক লোকের ভাসুরের নাম হরি, শ্বশুরের নাম কৃষ্ণ। শ্বশুর-ভাসুরের নাম মুখে উচ্চারণ করতে পারে না বলে সেই স্ত্রীলোক জপ করছে—’ফরে ফৄষ্ট ফরে ফৄষ্ট ফৄষ্ট ফৄষ্ট ফরে ফরে।’ শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, ও ঠিক বলছে, ওর ডাক শুনেছেন ভগবান। আসলে, মনই মন্ত্র। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, ‘মন তোর মন্তর।’ ভগবান ভাষার ত্রুটি ধরেন না, নিজে অনির্বচনীয় বলে বচনের অন্তরালে মনের মৌনেরই খবর নেন। সে মৌন সমস্ত প্রকাশের পরপারে।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, নরলীলায় অবতারকে ঠিক মানুষের মত আচরণ করতে হয়, তাই চিনতে পারা কঠিন। মানুষ হয়েছেন তো ঠিক মানুষ।’ আমার লেখার এটিতে হয়তো কখনো তাঁর নরত্বের মধ্যে তাঁর দেবত্ব ঢাকা পড়েছে। কিন্তু নারায়ণ-রূপী নরও যা নররূপী নারায়ণও তাই। যিনি জীবোদ্ধার করতে এসেছিলেন তাঁর পরমপাবনী ক্ষমা কাউকে বঞ্চনা করে না কখনো।
দিয়াশলাই জেলে সূর্যকে দেখানো যায় না, কিন্তু গৃহকোণে পূজোর প্রদীপটি হয়তো জালানো যায়। আমার এ বই শুধু সেই দীপ জ্বালানো পূজা, দীপ-জ্বালানো আরতি।
অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত
৬ই ফাল্গুন ১৩৫৮






Leave a Reply