পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
।। দ্বিতীয় খণ্ড ।।
“তুমি সংসারে থেকে ঈশ্বরের প্রতি মন রেখেছ, এ কি কম কথা?
যে সংসারত্যাগী সে তো ঈশ্বরকে ডাকবেই। তাতে আর বাহাদুরি কি!
সংসারে থেকে যে ডাকে সেই ধন্য। পাথর সরিয়ে তবে দেখে।”
“যস্য বীর্যেশ কৃতিনো বয়ং চ ভুবনানি চ।
রামকৃষ্ণং সদা বন্দে শর্বং স্বতন্ত্রমিশ্বরম্।।
যাঁর শক্তিতে আমরা ও সমুদয়জগৎ কৃতার্থ
সেই শিবস্বরূপ স্বাধীন ঈশ্বর শ্রীরামকৃষ্ণকে
আমি সদা বন্দনা করি।” স্বামী বিবেকানন্দ–
“শ্রীরামকৃষ্ণ ভারতবর্ষের সমগ্র অতীত ধর্ম-চিন্তার সাকার বিগ্রহস্বরূপ।”
যে তাঁকে নমস্কার করবে সে সেই মুহূর্তে সোনা হয়ে যাবে।” –স্বামী বিবেকানন্দ
।ওঁ ভগবতে শ্রীরামকৃষ্ণায় নমঃ।
.
ভূমিকা
প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় যা লিখেছি দ্বিতীয় খণ্ডেরও সেই কথা। দিয়াশলাই জ্বেলে সূর্যকে দেখানো যায় না, কিন্তু গৃহকোণে পুজোর প্রদীপটি হয়তো জ্বালানো যায়। আমার এ বই শুধু সেই দীপ জ্বালানো পূজা, দীপ জ্বালানো আরতি।
এ বইয়ে যত তথ্য সংগৃহীত হয়েছে সবই কোনো না কোনো পূর্ব লিখিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থ থেকে আহুত। কোনো তথ্যই আমার কপোলকল্পনা নয়।
বাক্য ঈশ্বরের বিভূতি, কিন্তু ঈশ্বর আবার সমস্ত বাক্যের অতীত। অথচ বচন ছাড়া সে অনির্বচনীয়ের আভাস আনি কি করে? শব্দ ছাড়া কি করে বোঝাই আমার কান্না? কিন্তু সব সময়ে ভয়, বাক্য বুঝি আভরণ না হয়ে আবর্জনা হয়ে উঠল! আর, আভরণ হলেই বা কি, আভরণ দিয়েই কি রূপ বোঝানো যায়? বর্ণ দিয়ে কি বোঝানো যায় অবর্ণনীয়কে? তবু ভয়, এই বুঝি মহিমান্বিতকে খর্ব করে ফেললাম!
কিন্তু ভগবানকে ছোট করি এমন আমাদের সাধ্য কি। তিনি নিজের থেকেই ছোট হয়েছেন ভক্তের জন্যে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, ভক্তের কাছে ঈশ্বর ছোট হয়ে যান, যেমন ঠিক অরুণোদয়ের সূর্য। তিনি ছোট না হলে তাঁকে ধরি কি করে? মধ্যাহ্নের সূর্যের তেজে চোখ যে ঝলসে যাবে। ধরা দেবার জন্যে তিনি স্বেচ্ছায় ছোট হয়েছেন। সুলভ হয়েছেন আমরা দুর্বল বলে। সুকোমল হয়েছেন যেহেতু আমরা ভঙ্গুর। রিক্ত হয়েছেন যেহেতু আমরা নিঃসম্বল। বললেন শ্রীরামকৃষ্ণ, ভক্তের জন্যে ভগবানের নরম ভাব হয়ে যায়, তিনি ঐশ্বর্য ত্যাগ করে আসেন।’
তিনি তো খাজনা আদায় করতে আসেননি, তিনি প্রেম ভিক্ষা করতে এসেছেন। বালগোপাল হয়ে এসেছেন ননী ভিক্ষা করতে। তাই দুয়ারের বাইরে ফেলে এসেছেন তাঁর প্রতাপের রাজমুকুট, তাঁর ঐশ্বর্যের সাজসজ্জা। প্রবঞ্চিতের বন্ধু বলে নিষ্কিঞ্চন হয়ে এসেছেন। রাজ্যেশ্বর হয়ে ফিরছেন কাঙালের মত। ‘ওরে, তারে কেউ চিনলি না রে,’ বললেন শ্রীরামকৃষ্ণ, ‘সে পাগলের বেশে দীন হীন কাঙালের বেশে ফিরছে জীবের ঘরে-ঘরে।’যে কাঙাল তার কী আর আছে কেড়ে নেব?
ভক্তি তাঁর কেমন প্রিয়? বললেন শ্রীরামকৃষ্ণ, খোল দিয়ে জাব যেমন গরুর প্রিয়। শুধু দেখতে হবে জাবে খোল মেশানো হল কিনা। বাক্যের মধ্যে আন্তরিকতা আছে কিনা। ডাকের মধ্যে আছে কিনা অন্তরঙ্গতার সূর। নিমন্ত্রণের মধ্যে আছে কিনা আতিথেয়তার আস্বাদ।
কাঁদতে-কাঁদতে যেমন শোক হয়, তেমনি নাম করতে-করতে প্রেম জাগুক। পঙ্কশয্যা থেকে জাগুক এবার নিষ্কলঙ্ক শতদল। জীবনের নির্বাসনে আসুক এবার মুক্তির সুসংবাদ। সমস্ত অন্ধকারে জ্বলুক এই প্রার্থনার দীপশিখা।
৬ই ফাল্গুন ১৩৫৯
অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত






Leave a Reply