খুনের রঙ – সম্পাদনা: সমরেশ মজুমদার, অনীশ দেব
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারী ১৯৯৩
প্রচ্ছদ: অনুপ রায়
.
প্রাণ নিয়ে খেলা
যুবক বলল, ‘আমি তোমাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। তোমার জন্যে সবকিছু করতে পারি-যা বলবে।’
যুবতী ভুরুর ধনুক বাঁকিয়ে তাকাল। সামান্য হাসল ঠোঁটে। বলল, ‘খুন করতে পার?’
যুবক চমকে গেল। মুখে নেমে এল মলিন ছায়া।
যুবতী তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, ‘আমাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাস, অথচ আমার কথায় সামান্য একটা প্রাণ নিতে পার না।’
যুবকের চোয়াল শক্ত হল। চোখে প্রতিজ্ঞা। বলল, ‘হ্যাঁ, পারি। কাকে খুন করতে হবে বলো।’
যুবতী আকাশের দিকে তাকাল। বাতাসের ঘ্রাণ নিল। তারপর নরম অস্পষ্ট গলায় বলল, ‘তোমার আমার ভালোবাসার মাঝখানে যে দাঁড়িয়ে আছে তাকে খুন করতে হবে। পারবে?’
যুবক যুবতীর গলার কাছে মুখ ঘষল, বলল, ‘পারব, পারব।’
সাজানো গোছানো বসবার ঘরে উইল পড়া হচ্ছিল। যান্ত্রিক স্বরে উকিল সাহেব জানিয়ে দিচ্ছিলেন, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কে কতটুকু সম্পত্তি পেয়েছেন। আর সম্পত্তির বর্তমান মালিক বৃদ্ধ গৃহকর্তা সকলের মুখের ভাব লক্ষ করছিলেন।
একসময় প্রতিবাদের গুঞ্জন উঠল ঘরে। হতে পারে না, সম্পত্তির এ রকম বেহিসেবী ভাগ কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।
হইচই-এর মাঝখানে হঠাৎই নিভে গেল ঘরের আলো। লোড শেডিং আর তার পরমুহূর্তেই শোনা গেল যন্ত্রণাময় এক তীব্র চিৎকার। কোনও মানুষের শেষ চিৎকার। যে চিৎকারের পর কারও আর কিছু করার থাকে না।
হঠাৎই জঙ্গলের মাঝে তাকে খুঁজে পাওয়া গেল। শাল গাছের ফাঁকে চাঁদের ছিন্ন-বিছিন্ন আলোয় তার শরীরটা দেখা যাচ্ছে। নিশ্চিন্ত মনে গান গাইতে গাইতে হেঁটে চলেছে। নিশ্চয়ই ওর ভালোবাসার মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে।
এই লোকটাই গত কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে খতম করেছিল দাদাকে।
জমি-জিরেত নিয়ে কাজিয়া হয়েছিল। তখন টাঙ্গির এক কোপ বসিয়ে দিয়েছিল দাদার ঘাড়ে। সঙ্গে সঙ্গে দাদা চলে গিয়েছিল আকাশে।
এখন এসেছে শোধের পালা। দাদার রক্তের ঋণ শোধ করবে ভাই। দাদা যে প্রায়ই স্বপনে দেখা দিয়ে বলে, ‘ভাইটি, শোধ নে। নইলে আমার যে বড় কষ্ট হয়!’
তাই এই অন্ধকার রাতে ভাইয়ের হাতে টাঙ্গি। সে চুপিসারে অনুসরণ করে দাদার হত্যাকারীকে। তারপর একটা বড় গাছের আড়াল থেকে অকস্মাৎ বেরিয়ে এসে জন্তুর মতো চিৎকার করে ওঠে। প্রাণপণ শক্তিতে টাঙ্গি চালায়। হত্যাকারী দ্বিখণ্ডিত হয়ে সেই মুহূর্তে আর এক হত্যাকারীর জন্ম হয়। চাঁদের আলোয় রক্তপাত ঘটে যায়।
ভালোবাসা, লোভ, প্রতিহিংসা এরকম আর ও নানা কারণে কেউ প্রাণ নেয়, কেউ প্রাণ দেয়। জীবনের কাহিনী থেকেই উঠে আসে জীবন নিয়ে নেওয়ার কাহিনী। এই সঙ্কলনের দশটি গল্পের এই জায়গাতেই মিল-খুন এর প্রতিটি গল্পের কেন্দ্রবিন্দু।
সঙ্কলনের নাম ‘খুনের রঙ’। কিন্তু খুনের রঙ কী? খুন মানেই যেহেতু রক্ত ঝরা তাই লাল রঙের কথাই মনে আসে। সত্যি কি তাই? রক্তও তো শুকিয়ে গেলে কালো হয়ে যায়-রঙ বদলায়। তাহলে!
বাংলাদেশের সহৃদয় পাঠককে যদি এই সঙ্কলন খুশি করতে পারে তাহলে জানব আমাদের শ্রম ও আন্তরিকতা খানিকটা অন্তত দাম পেল।
সমরেশ মজুমদার
অনীশ দেব






Leave a Reply