নৃমুশুশিকারী – অদ্রীশ বর্ধন

নৃমুন্ডুশিকারী – অদ্রীশ বর্ধন

ভাবছি কোনলখান থেকে শুরু করব এই কাহিনী।

আমার বন্ধু ইন্দ্রনাথ রুদ্রের বহু কাহিনীই আমি রিখেছি, লিখেছি নিছক মনের তাগিদে, বন্ধুবরের অভ্যাশ্চর্য কীর্তিকলাপ জনসাধারণের সামনে উপস্থাপিত করার অদম্য বাসনায়।

কিন্তু কোনদিন এমন দ্বিধায়, এমন দোটানায় পড়ি নি।

অথচ কোন মামলাটাই কম চিত্তাকর্ষক ছিল না। শুন্য কলসী, মোমের হাত বা সবুজ কাঁকড়া নিয়ে ইন্দনাথ রুদ্র যতখানি মস্তিঙ্কশক্তি ব্যয় করেছে, তার শতাংশের একাংশ আমাকে ব্যয় করতে হয় নি চাঞ্চল্যকর সেই কেসগুলি গল্পকারে লিখে ফেলার সময়ে।

কিন্তু এবার আমাকে ভাবতে হচ্ছে।

ভাববার কারণও আছে।

কেননা, এ কাহিনীর আমি অন্তে মধ্যে সমান বিভীষিকা, সমান বিস্ময়, সমান বৈচিত্রা। এ কাহিনী শুনে ইন্দ্রনাথ রুদ্রের শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দাকীর্তিই নয়, মানুষের বিকৃতাচারের এক বীভৎস নিদর্শন, ভয়াবহ নমুনা।

তাই ভাবতে হচ্ছে এ কাহিনীর ছত্রে ছত্রে যে লোকহর্ষক তথ্যাদির উদ্ঘাটন, তাই দিয়েই গল্প শুরু করব, না কুন্তলার অবৈধ প্রেমের কেচ্ছা  এঁকে প্রচ্ছদ সৃষ্টি করব।

থাক। তার চাইতে বরং শুরু করা যাক ঠিক যেমনটি ঘটেছিল সেইভাবেই।

চোখ বুজলেই সিনেমার দৃশ্যের মত স্পষ্ট ছবিটা ভেসে ওঠে মনের পটে।

তুমুল বৃষ্টি নেমেছিল সে-রাতে।

রাঁচি শহরের বৃষ্টি। শহরের চারিদিকে ধু-ধু প্রাপ্তিরের ওপর দিয়ে হুহুহস্কার রবে ধেয়ে আসছিল দামাল বাতাস। আর মধ্যে মধ্যে বিদ্যুতের চাবুক হেঁকে কালো  আকাশ ফালা পালা করে দিয়ে গুরগুর করে প্রলয় উল্লাসে অট্টহাসি হাসছিল দুরন্ত প্রকৃতি।

সারারাত চলেছিল এই দাপাদাপি।

ভোরবেলা মিলিয়ে গিয়েছিল ক্ষ্যাপা মেঘ, জল আর বাতাস। আমরাও প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলাম।

আমরা মানে উন্দ্রনাথ রুদ্র, আমি আর আমার গৃহিণী কবিতা।

নিশ্চিন্ত বিশ্রামসুখ উপতোগ করার জন্যেই রাঁচিতে এসেছিলাম আমরা তিনজনে। বেরিয়েছিলাম পুজোর হট্টগোল শুরু হওয়ার আগেই মহাপঞ্চমীর রাত্রে।

ষষ্ঠির দিন আর বেরোতে পারি নি। সারাদিনটা ট্রেন জার্নির ধবল কাটাতে স্রেফ বিছানায় গড়িয়েছি আর আলসেমি করেছি।

রাত্রে নেমেছে তুসুণ বৃষ্টি

পত্রের দিন ভরবেলা বেরিয়েছি বেড়াতে।

সেদিন ছিল মহাসপ্তমী।

আর সেইদিনই দেখলাম সেই বীভৎস দৃশ্য, জানলাম সেই ভয়াবহ কাহিনী, শুনলাম সেই ভয়ঙ্কর রহস্য—যা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত শিহরিত করেছে রাঁচিবাসীদের। আশপাশের গ্রাম গ্রামান্তরের অধিবাসীদের আতঙ্কিত করেছে, নিশার নিদ্রা কেড়ে নিয়েছে সন্ধ্যা না নামতেই নিঝুম নিস্তব্ধ জনবিরল হয়ে এসেছে পথ-ঘাট মাঠ-প্রান্তর গ্রাম-শহর।

তবুও বিভীষিকার শেষ হয় নি। রহস্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।

অশিক্ষিত গ্রামবাসীরা সারারাত দরজার হুড়কো এঁটে প্রদীপ নিভিয়ে ভগবানকে ডেকেছে, পুলিশ হন্যে হয়ে ঘুত্রেছে, কাগজে কাগজে লেখালেখি হয়েছে।

কিন্তু তথাপি মেটে নি শিশুমুন্ড সঞ্চয়ের লালসা। বন্ধ হয় নি শিশু হত্যা। রাতের পর রাত, মাসের পর মাস চলেছে এই একই বীভৎস ব্যাপার।

অথচ এত কান্ডের আমরা কিছুই জানতাম না। ফুরফুরে হাওয়ায় হাল্কা মনে বেড়াতে বেরিয়েছি ভোর হতেই।

কৰিতা পরেছে লাইলাক রঙের একটা ছাপা শাড়ি। কানে পাতলা রিং। গজদন্তের মত সূভ্র নিটোল মুখে চন্দন পাউডারের মোলায়েম প্রলেপ! রূপকথার কেশবতী রাজকল্যার মত সুন্দর কুঞ্চিত চুলের গোছা যা হোক করে পেছনে টেনে খোঁপা বাঁধা।

রুপসজ্জায় ইদানীং আর নিষ্ঠা নেই কবিতার। নেই ইন্দ্রনাথের বাক্যবাণের জ্বালায় কিন্তু নিজের গিন্নী বলে বলছি না, সুন্দরী মেয়েদের প্রসাধনের প্রয়োজন হয় না। পরিচ্ছন্নতাই তাদের শ্রেষ্ঠ প্রসাধন—যেমন হয়েছে কবিতার ক্ষেত্রে।

ভোরের তাজা হাওয়ায় স্থলপদ্মাের মত সুন্দর স্বচ্ছ সেই মুখখানি দেখে প্রাক-বিবাহ উন্মাদনা যেন আবার জোয়ারের মত ঠেলে উঠল বুকের মধ্যে; তাই গদগদ কন্ঠে বলেছিলাম, বুঝলে কবি, বৌ মাত্রই ম্যাজিমিয়ান। তারা যে কোন বরকে মানুষ করে

তুলতে পারে।

সিঁদুরের টিপ-আঁকা কপালটা সামানা কুচকে অপাঙ্গে তাকিয়ে কবিতা বললে, ব্যাপারটা কি? অমি তো জানতাম বংঃসন্ধিকালেই ছেলেদের গলার স্বর পাল্টায়। তা

এই বয়েসে স্বরটা হঠাৎ ওরকম দইয়ের মত থকথকে হয়ে যাওয়ার মানে?

গলা খাঁকারি দিয়ে উচ্চেঃস্বরে ইন্দ্রনাথ বললে, অহো, অহো, ভোর না হইতেই শুরু হইয়াছে দাপত্যকলহ!

মুখ রাঙা করে কবিতা বললে, ইয়ার্কি হচ্ছে? আইবুড়োই তো রয়ে গেলে। নইলে দেখা যেত—

হে বৌদি, করজোড়ে তৎক্ষণাৎ জবাবটা ছুঁড়ে দিল ইন্দ্রনাথ, বিবাহ সত্যই করি নাই এখনো, এবং করি নাই বলিযাই এখনো আমি জীবিত।

ধারে-কাছে কাটা মুন্ডুটির কোন চিহ্ন পেলাম না। দেখবার মেজাজও ছিল না।

কেননা, কল্পনাতীত ভয়াবহ এই দৃশ্য দেখে কিরকম যেন হয়ে নিয়েছিল কবিতা। ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল সমস্ত মুখ, আতঙ্ক নিবিড় হয়ে উঠেছিল দুই চোখে।

মনে হল যেন এখুনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে কবিতা। জানি খনিজখমের কাহিনী তার প্রিয় বন্তু, কিন্তু খুনজখমকে চোখে দেখার ধাত তার নেই। অনেকেরই থাকে না।

ইন্দ্রনাথও বুঝেছিল কবিতার অবস্থা। তাই বিমুঢ় ভাবটা কাটিয়ে উঠে তৎক্ষণাৎ কবিতাকে ধরে পেছন ফিরিয়ে দিল ও। ভলল, চলো।

রামদাস আগারওয়ালা স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার।

হৃষ্টপুষ্ট মানুষটি। পরিপুষ্ট গোঁফ এবং মাথাজোড়া টাক। পরনে সদাই থাকি হাফপ্যান্ট ও হাফশার্ট। অভ্যেসের মধ্যে কথায় কথায় গোঁফে তা দেওয়া।

তার ফামরায় বসেই শুনলাম সমস্ত ঘটনাটা।

শুনতে শুনতেই কতবার যে রোমাঞ্চিত হলাম আমি, তার ইয়ত্তা নেই।

রামদাসের সঙ্গে আগে আমাদের আলাপ ছিল না। কিন্তু ইন্দ্রনাথ রুদ্রর পরিচয় পেতেই চক্ষের নিমেষে তিনি আমাদের আপন করে নিলেন। এবং বললেন সেই লোমহর্ষক কাহিনী।

মাসখানেক ধরে চলেছে এই কাণ্ড। চলছে বিরামবিহীন ভাবে। প্রায় প্রতি রাত্রেই খবর আসছে—কখনো এ-গ্রাম, কখনো সে গ্রাম, কখনো-বা রাঁচি শহর থেকেই।

প্রতি রাত্রেই নিভে যাচ্ছে এক-একজন হতভাগ্যের জীবন-প্রদীপ। সেই সঙ্গে উধাও হয়ে যাচ্ছে তার মুন্ডু।

যাদের মুন্ডু এইভাবে দেহচ্যুত হচ্ছে, লক্ষণীয় হচ্ছে যে, তারা সকলেই শিশু অথবা বালক!

বয়স্ক কেউ নেই। নারীও নেই।

সভয়ে বললাম, বাপরে, এ যে জ্যাক দি রিপারের টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরী এডিশন।

রামদাস বললেন, জ্যাক দি রিপারের আক্রোশ ছিল পতিতাদের ওপর। কিন্তু এই হত্যাকারীর আক্রোশ শিশু আর বালকদের ওপর। এরকম অদ্ভূত কান্ড মশাই জীবনে দেখি নি।

ইন্দ্রনাথ বলল, শুধু তাই নয়। জ্যাক দি রিপার হত্যা করে তাদের দেহযন্ত্র এবং পুরো দেহটা ফালা ফালা করে কেটে ছিড়ে ঘটনাস্থলেই রেখে যেত। সঙ্গে নিয়ে যেত

না। কিন্তু আপনার এই নুমুগুশিকারী প্রতিবারই বাচ্চাদের মাথাগুলো সঙ্গে নিয়ে গেছে। আশ্চার্য হল এইটাই।

আমি বললাম, পাগল নয় তো?

বাতিবগ্রস্তও হতে পারে, মানুষের মাথা জমানোর বাতিক।

রামদাস বললেন, তাহলে তো তাকে বিপজ্জনক টাইপের উন্মাদ বলতে হয়।

অবশ্যই তাই। উন্মাদ না হলে রাতের পর রাত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এরকম নরহত্যা কেউ করতে পারে? নিরীহ ছেলেগুলো—এদের ওপর কারোরই আত্রোশ থাকতে পারে না। এক-আধজনের ওপর কোন কারণে থাকলেও মাথা কেটে নিয়ে যাওয়ার কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। সেক্ষেত্রে এতগুপি খোকা—

সবসুদ্ধ কতজন? শুধোল ইন্দ্রনাথ?

এই নিয়ে তেইশ জন হল।

কী সর্বনাশ! তেইশ জন শিশু খতম হয়ে গেল, অথচ হত্যাকারী এখনো ধরা না? তীক্ষ্ম কন্ঠে বলল ইন্দ্রনাথ।

কাঁচুমাচু মুখে গৌঁফে তা নিয়ে রামদাস বললেন, কি করি বলুন? চেষ্টার তো ত্রুটি নেই। কিন্তু হালে পানি পাচ্ছি না। আর সত্যি কথা বলতে কি, কলকাতা পুলিশের মত জবরদস্ত বাহিনী আমাদের কোথায় বলুন। খুনজখম দাঙ্গাহাঙ্গামা সেখানেও হয়।

কিন্তু সেখানে সূত্র থাকে, সাক্ষী থাকে। কিন্তু এখানে তো কিছুই নেই!

কিছু নেই?

না।

যাদের বাচ্চা গেছে, তাদের বাড়িতে জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনেছেন পারিবারিক আক্রোশ থাকতে পারে কিনা?

সেসবের কোন ত্রুটি রাখি নি ইন্দ্রনাথবাবু, কিছু ওই যে বললাম, হালে পানি পাচ্ছি না। আপনাকে ভগবান এ সময়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আপনি আমাদের বাঁচান। আমার মুখরক্ষা করুন। খবর পেয়েছি, আমাকে এখান থেকে বদলির চেষ্টা চলছে। তা :যদি হয়, তাহলে ‘আমার সার্ভিস রেকর্ডের বারোটা বেজে গেল। কুতিম আকুতি ফুটে ওঠে রামদাসের কণ্ঠে!

দরজাটা খুলে গেল ঠিক সময়ে। শুধু খুলে গেল না, আছড়ে পড়ল।

দড়াম শব্দে পাল্লা দুটো আছড়ে পড়ল দুপাশের দেওয়ালে, ঝড়ের মত ঘরে প্রবেশ করল এক নারীমুর্তি। আর সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে তড়াক করে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠলাম আমি।

কারণ, এ নারীমুতিকে আমি চিনি।

দমকা বাতাসের মত ঘরে প্রবেশ করেই স্থাপুর মত দাঁড়িয়ে গিয়েছিল মেয়েটি। দাঁড়িয়ে গিয়েছিল আমাকে দেখেই। অশ্রসিক্ত চোখে অপলকে তাকিয়েছিল আমর পানে।

সে চোখে দেখলাম নিঃসীম বেদনা আর অপার শোক। স্ফীত নাসারান্ধ আর কম্পিত অধরোষ্ঠে দেখলাম না-বলা-ব্যথার থরথর প্রকাশ।

বিস্রস্ত বসন আর অলুলায়িত কুন্তলে আকুল হৃদয়ের অভিব্যক্তি।

কে বলবে এই মেয়েটিই এককালে ছিল কলকাতার আধুনিকাদের শিরোমণি। কে বলবে একদা এর চরণ স্পর্শ করতে পারলে ধন্য হয়ে যেত কত বিলাত-ফেরত ধনীপুর, কৃতার্থ হয়ে যেত হেসে দুটো কথা বললে।

কুন্তলার সেই গ্ল্যামার আর নেই। ধাঁধা লাগানো সে রূপ আর নেই। চোখের তারায়

সে বিদুৎ আর নেই। তড়িৎ নেই দেহবল্লরীতে, ইশারা নেই রেখায় রেখায়।

দু’বছর আগে জনৈক পাঞ্জাবী দ্রাইভারের সঙ্গে অকস্মাৎ উধাও হয়ে গিয়েছিল কুন্তলা। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল মায়ের সব গহনা, বাবার হাজার বিশেক টাকা।

কপূরের মত উবে গিয়েছিল কণকাতা থেকে। পুলিশ হন্যে হয়ে ফিরেছে। কিন্তু সন্ধান পায় নি সেই পাঞ্জাবী ড্রাইভারের, সন্ধান পায় নি সুরূপা কুন্তলার।

সেই কুন্তলা দাঁড়িয়ে আমার সামনে। হতশ্রী, রোরুদ্যমানা, শোকবিহ্বল।

ক্ষণকাল নিস্পলক চোখে আমার পানে তাকিয়ে রইল কুন্তলা। আর তারপরেই আচমকা ছুটে এলো সামনে। এবং কিছু বেঝবার আগেই আমার পায়ে লুটিয়ে পড়ে কেঁদে উঠল হাউ হাউ করে, মৃগঙ্কদা, এ আমার কি হল। এ সর্বনাশ আমার কেন হল।

বায়োস্কোপের ঘটনার মত নাটকীয় সেই কাহিনী কুন্তলার মুখে শুনলাম ধীরে ধীরে।

মানুষের মতিচ্ছন্ন যখন হয়, এমনি করেই হয়। বিশেষ করে মেয়েদের।

তা না হলে কুন্তলার এ হাল হবে কেন?

সমাজের স্বঘরের হীরের টুকরো পাত্ররা যাকে বিয়ে করার জন্যে পাগল, সে পালাবে কেন একজন উড়নচণ্ডে ড্রাইভারের সঙ্গে?

শুধু কি তাই? প্রেমাস্পদের ফুসলানিতে শুধু সে ঘর ত্যাগ করে নি পথের সম্বল হিসাবে ঘরে যা কিছু ছিল, সব পথে নামিয়েছে।

নিজেও পথে বসেছে।

কেননা, কুন্তলার বিত্ত ফুরোতেই ড্রাইভারের চিত ঘুরেছে। কুন্তলর রূপযৌবন? লম্পটদের কাছে তার কোন দাম আছে কি? নিত্যনতুন না হবে তো তাদের মুখে রোচে না।

অতএব, যা ছিল অবশ্যম্ভাবী, তাই হয়েছে। অর্থাৎ রাত ভোর হতেই একদিন কুন্তলা দেখেছে শয্যা শূন্য। যার জন্যে সে ঘর ছেড়েছে, ভাল বর ছেড়েছে, সেই তাকে ছেড়ে গেছে।

কুন্তলা তখনো কাঁদে নি।

কারণ, তখন সে অন্তঃসত্বা। আর, কপর্দহীন।

সেই অবস্থায় কেটেছে মাসের পর মাস। যথাসময়ে অবৈধ প্রণয়ের ফুলকে বুকে তুলে নিয়েছে কুপ্তলা। কারোর কাছে মাথা হটে না করেই ছেলেকে মানুষ করেছে। রাঁচিতেই জুটিয়েছিল ছোট্ট একটি চাকরি। কোনমতে সন্ন্যাসিনীর মত জীবন যাপন করেছে, আর তিলে তিলে অনুশোচনা আর আত্মগ্লানির আগুনে দগ্ধে প্রায়শ্চিত্ত করেছে অপরিণাম-দর্শিতার।

সে আজ চার বছর আগেকার বথা।

মুকুলকে মানুষ করার জন্যে কারোর কাছে হাত পাতে নি কুন্তলা। বাবা-মার কাছেও ফিরে যায় নি। সম্পত্তির ভাগীদার হতেও না।

নাড়ীছেঁড়া ধন সেই মুকুল আচম্বিতে উধাও হয়ে গেল গতকাল রাতে।

সন্ধে হল।  দুর্গা-পর্বতের শীর্ষে বাজল শাঁখঘন্টা। সাঙ্গ হল আরতি। ঘরে ঘরে জ্বলল প্রদীপ, রাস্তায় আলো।

কিন্তু মুকুল আর ঘরে ফিরল না।

কোনদিন তো এমন ঘটে নি। স্কুল থেকে প্রতিদিনই দুপদাপ করে ঘরে ফিরেছে মুকুল। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ‘খেতে দাও খিদে পেয়েছে’ বলে আবদার করেছে। দেরি হলে কেঁদে ভাসিয়েছে।

সেই মুকুল আর ফিরল না।

ক্রমে রাত গভীর হল। অমানিশায় উষার আলো ফুটল। কিন্তু মুকুল আর ফিরল না।

আর, তারপরেই জানা গেল সেই ভয়ঙ্কর সংবাদ। একটি চার বছরের খোকার গলাকাটা গলাকাটা কবন্ধ পাওয়া গেছে লেকের পাড়ে।

পাগলিনীর মত ছুটেছে কুন্তলা। মুন্ডু ছিল না। তাতে কি হয়েছে? মা কি ছেলেকে না চিনে থাকতে পারে? সেই হাত, সেই বুক, সেই পা। আর, বামবাহুর কনুইয়ের কাছে একটা ইঞ্চিখানেক লম্বা কালো জডুল।

মুকুল! মুকুল! আমার মুকুল!

বুকফাটা কান্নায় পায়ের ওপর আছাড়ি-পাছাড়ি খেতে লাগল আধুনিকাদের একদা মুকুটমণি কুন্তলা—পাপের ফলকেও ধরায় ধরে রাখতে পারল না যে, সেই পাপিষ্টা কুন্তলা।

পাষাণ-মুর্তির মত শক্ত দেহে বসে শক্ত দেহে সমস্ত দৃশ্যটা প্রত্যক্ষ করল ইন্রনাথ রুদ্র। কিছু বলল না। সান্তনা দেবার চেষ্টা করল না। কোন প্রশ্নও করল না।

কিন্তু শিলাময় মুখে দেখলাম কঠিন সংকল্পের রেখা।

মুকুলের শব আবিষ্কার করেছিলাম আমরা। কিন্তু সেই মুহূর্তে কবিতা অসুস্থ হয়ে পড়ায় একটা সুত্র আমাদের চোখ এড়িয়ে দিয়েছিল।

একটি নতুন সাদা চাদর পড়ে ছিল অদূরন্থ ঝোপের আড়ালে নিঃসন্দেহে হত্যাকারীর। কেননা, তাতে রক্ত মাখামাখি ছিল। চাদরটা রামদাস আগরওয়ালা এনেছিলো সঙ্গে। কুন্তলাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর বার করলেন আমাদের সামনে। বললেন, এগুলি খুল হয়েছে। কিন্তু কোথাও কখনো চাদর পড়ে থাকে নি! সুতরাং সেদিক দিয়ে এবার আমরা ভাগ্যবান।

আন্দ্রনাথ বললে, ‘ভাগ্যবানই-বা বলি কিসে? এ চাদর দেখে কি-ই-বা আর জানা যাবে বলুন। না আছে ধোবির চিহ্ন, না আছে মিলের লেবেল। আনকোরা নতুন চাদর।

‘আমি বললাম, পুরুষ কি মেয়ের, তাও বুঝবার উপায় নেই।

সেটা জেনে তোমার লাভ কি? বলল ইন্দ্রনাথ।

মেয়ের হলে একটা অনুমান করা যেত।

কি অনুমান?

জানো তো, কুসংস্কার জিনিসটা ভারতীয় নারীদের অস্থি-মজ্জায় মিশে আছে। সেকালে পাড়াগাঁয়ে বন্ধ্যা-মেয়েরা শিশুবলি দিত নিজে সন্তানধারণ করার জন্যে। কে

জানে, এখানেও সে-রকম কোন মতলব চলছে কিনা।

ওসব তোমার গল্প উপন্যাসেই সম্ভব। বলল ইন্দ্রনাথ। বলে, একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল টেবিলের ওপর মেলে-দেওয়া রক্ত-মাখা ভিজে চাদরটার দিকে।

রামদাস বললেন, আমি তো মশাই হাল ছেড়ে দিয়েছি। যদিও-বা একটা সূত্র ব্রেখে গেল হত্যাকারী, মাথা-মুশু কিছুই বুঝতে পারছি না। এ-রকম চাদর হাজার হাজার রয়েছে রাঁচি শহরে, রয়েছে ঘরে ঘরে। এখন, কাকে ছেড়ে কাকে ধরি বলুন তো?

ইন্দ্রনাথ তখনও পলকহীন চোখে তাকিয়ে চাদরটার দিকে।

রামদাস বলে চললেন, এ যে কি ফ্যাস্যদে পড়লাম! রাস্তাঘাটে চৌকিদারের সংখ্যা বাড়িয়েছি, রাতে পাহারার অনেক কড়াকড়ি হয়েছে, কিন্তু তার মধ্যেই খুন হয়ে চলেছে একটার পর একটা। আরও তাজ্জব ব্যাপার, খুন হচ্ছে কেবল খোকারা, খুকুরা নয়। এ কি রহস্য বলুন তো? খোকা-বিদ্বেষী কোন পাগলের কান্ড বলেই তো মনে হচ্ছে। পাগলা-গারদ থেকে কোন খুনে পাখল রাত্রে বেরিয়ে এসে এ কাজ করে যেতে পারে।

আমি বললাম, তাই যদি হয় তো মুন্ডুগুলো সে রাখছে কোথায়? তাহাড়া রোজ রোজ  পাগলা-গারদ থেকে বেরুনো কি এতই সহজ? না মশাই না, পাগলা-গারদে নয়, পাগল লুকিয়ে আছে আপনার আমার আর পাঁচজনের মধ্যেই।

ইন্দ্রনাথ তখনও স্থির দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে চাদরটার দিকে, দুই চোখে নিবিড় তন্ময়তা। ললাটে ভ্রুকুটি।

ইন্দ্রনাথ কি কিছুর হদিশ পেয়েছে? আমাদের চোখে না ধরা-পড়া কোন সূত্রের? তা না হলে এমন ভাবান্তর তো দেখা যায় না বন্ধুবরের আননে।

পরিবর্তনটা এতক্ষণে রামদাসের চোখেও পড়েছিল। তাই বিস্মিত কণ্ঠে শুধোলেন, ইন্দ্রনাথবাবু, আপনি কি দেখছেন অমন করে? ও চাদর আমি স্যাগনিফাইং গ্লাসের নিচেও দেখেছি। কিন্তু রক্তের মধ্যে আঙুলের ছাপ পাই নি।

বিড়বিড় করে ইন্দ্রনাথ বললে, না না, আঙুলের ছাপ নয়।

তবে কিঃ

রামদাসবাবু।

বলুন স্যার।

রাঁচিতে তৈরি চাদর না এটা?

তা তো বটেই। রাঁচির স্পেশালিটি।

ক’জন তাঁতি এ চাদর তৈরি করে খোঁজ নেবেন?

সে আর এমন কি কঠিন ব্যাপার। কিন্তু তাতে লাভ কি? বিশেষ এই চাদরটাই কোন তাঁতি বুনেছে, তা আপনি জানছেন কি করে?

সে জানার উপায় আছে।

আছে?

আছে বইকি। আপনার চোখের সামনেই রয়েছে।

আমি তো মশাই দেখছি না।

দেখছেন না?

না।

মুচকি হেসে ইন্দ্রনাথ বললে, বেশ, বেশ, ওটা তাহলে আপাতত আমার মন্ত্রগুপ্তি হয়ে থাকে, যথাসময়ে জানাবো।

যথাসময়ে খবর এল রামদাসের কাছ থেকে!

এসব ব্যাপারে ভদ্রলোক খুবই পোক্ত, মোটেই দেরি করলেন না। গৌফে ঘনছন তা দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে হাঁডাঁক দিয়ে চেলাচামুন্ডা পাঠিয়ে রাঁচিশহরে এবং ধারেকাছে যেসব তাঁতিরা চাদর বোনে, তাদের একটা তালিকা তৈরি করে ফেললেন।

এবং সে তালিকা পৌছল ইন্দ্রনাথ রুদ্রের কাছে।

আর তারপরেই হাওয়া হয়ে খেল ইন্দ্রনাথ একেবারে নিপাত্তা। ভোর থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত বেমালুম অদৃশ্য হয়ে রইল বন্ধুবর।

ইন্দ্রনাথের মতিগাতি সম্বন্ধে আমার হাড় তো ভাজা ভাজা। কাজেই খুব অবাক হলাম না। কবিতাও না। যদিও গজগজ করতে লাগল সারাটা দিন না বলে কয়ে গা

ঢাকা দেওয়ার জন্য।

কিন্তু দুজনেই বুঝলাম ডালকুত্তার নাকে গন্ধ পৌচেছে। তাই দিগ্বিদিগ জ্ঞান হারিয়েছে। ছুটেছে শিকারের পেছনে।

রামদাস আগরওয়ালা ভদ্রলোক কিন্তু বিষম ফ্যাসাদে পড়লেন। নুতন খুনের খবর ওপরওয়ালার কানে পৌছেছে। হুমকিও এসে গেছে। তিন দিনের মধ্যে যদি রহস্যের সুরাহা না হয়, খুনেকে পুলিপোলাও খাওয়ানোর ব্যবস্থা না হয়, তাহলে অন্য ব্যবস্থার কথা চিন্তা করতে হবে।

ভয়ানক এই দুঃসংবাদ নিয়েই ইন্দ্রনাথের কাছে বেল্ট কযতে কষতে দৌড়ে আসছিলেন রামদাস।

এসে শুনলেন, কাক-ডাকার সঙ্গে সঙ্গে স্রেফ হাওয়ার সঙ্গে যেন মিলিয়ে গেছে ইন্দ্রনাথ।

শুনে ধপ করে মেঝের ওপরেই বসে পড়লেন। মাথা-সোড়া ঘর্মাক্ত টাকের ওপর ঘনঘন রুমাল চালনা করতে করতে যেন ককিয়ে উঠলেনঃ তাহলে আমার কি হবে?

অতীব করুণ সেই মুর্তি দেখে মুখে আঁচল চাপা কফি আনতে দৌড়ালো কবিতা।

আর আমি একটা ম্যাকরোপোলো সিগারেট এগিয়ে দিয়ে সান্তনার ছলে বসলাম—

কি আবার হবে। ইন্দ্রনাথ এখুনি এসে যাবে।

রুমালটা পকেটস্থ করে সযত্নে গোঁফজোড়ায় ডা দিয়ে সিগারেটটা ঠোঁটস্থ করলেন

আগরওয়ালা।

তারপর কুতকুতে চোখ দুটো যথাসম্ভব বড় করে বললেন, কিন্তু কখন অসবেন? কখন আসবেন, কখন আসবেন করতে করতেই সারাদিন কেটে গেল। এল রাত।

মুহুর্মূহু  হাতাহাতির ফলে রামদাসের গোঁফজোড়ার অবস্থা তখন খুবই কাহিল। রুমাল ঘযতে ঘষতে টাকেরও ছাল চামড়া উঠে যাবার উপক্রম।

ঠিক এমনি সময়ে একগাল গা-জ্বালানো হাসি নিয়ে প্রবেশ করল ইন্দ্রনাথ।

দেখেই তো পিত্তিসুদ্ধ জ্বলে গেল আমার।

তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল কবিতা।

আর, প্রায় কেঁদে ফেলার উপক্রম রামদাসের। অনেকটা হাউ হাউ করেই বলে উঠলেন, দাদা, আমি তো আবার ডুবলুম।

ডুববেন না। বলল ইন্দ্রনাথ মাকরোপোলোর প্যাকেটে চোখ পড়তেই হাত বাড়ালে সেদিকে।

প্যাকেটটা চট করে সরিয়ে নিয়ে বললাম, যা তোমার নেশা তাই গেলো, অর্থাৎ কাঁচি ধরাও। তার আগে বলো, গেছিলে কোন চলোয়?

আততায়ীর সন্ধানে!

ব্যোমকেশের মত কথা বলো না। ওসব উপন্যাসেই মানায়। সারা দিন ছিলে কোথায় নৃদুন্ডশিকারী ভো তোমার মুন্ডুটাই কচ করে কেটে নিয়ে যেতে পারত।

পারত। কিছু এক্ষেত্রে পারে নি। পারবেও না। কেননা, কামাখ্যার মাদূলি পকেটেই আছে। বলে পকেট থেকে কামাখ্যার মাদুলি অর্থাৎ নিকষ কালো রিভলভারটা বার করে দেখালে ইন্দ্রনাথ।

কবিতা বললে, ডেঁপোমো করো না। আততায়ীর টিকি অথবা ন্যাজ কোনোটা দেখতে পেয়েছ?

মুখটা নেখতে পেয়েছি।

কি? তড়াক করে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন রামনাস। উত্তেজনায় আধিক্যে মনে হল ঝুলে‒পড়া গোঁফ দুটোও কাপছে। তোৎলাতে তোৎলাতে  তোমাতে বললেন, কী‒কী বললেন? মুখ দেখেছেন?

হ্যাঁ।

অসম্ভব।

অসম্ভব কেন?

আমি এতদিনে যার ছায়াটুকুও দেখতে পেলাম না, আপনি একদিনেই তার মুখ দেখে ফেললেন?

তা দেখছি।

অসম্ভব।

এই জনোই মৃগাঙ্ক আমাকে অদ্ভূতকর্মা, অনন্য প্রতিভাধর, জাদুকর ইত্যাদি আখ্যা দিয়েছে ওর ওই ট্র্যাস গল্পগুলোয়। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি অদ্ভূতকর্মা নই, ভেল্কিবাজ নই, মায়াবী নই, কুহকী নই। আমি আপনার মতই সাধারণ মানুষ। আপনার মতই আমি চোখ দিয়ে দেখি। যেমন এক্ষেত্রে দেখেছি।

কি দেখেছেন?

রক্তমাখা চাদরে হত্যাকারীর ঠিকানা।

ঠাট্টা করছেন?

রাম রাম! আপলার সঙ্গে?

চাদরটা আমিও দেখেছি। ম্যাগনিকাইং গ্লাস দিয়ে দেখেছি।

আর, আমি শুধু চোখে দেখেছি।

তাহলে আপনার তৃতীয় নয়ন আছে বলুন?

মোটেই নেই। আমার এই দুটি নয়ন দিয়েই দেখেছি।

অদৃশ্য কালি দিয়ে লেখা ছিল বুঝি?

নিশ্চয় না।

তাহলে?

চাদরের বুনুনির মধ্যে লেখা ছিল।

চাদরের বুনুনির মধ্যে লেখা ছিল? মনে হল, এবার বুঝি কোটর ছেড়ে রামদাসের

কুৎকুতে চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসবে।

হ্যাঁ। চাদরের বুনুনির মধ্যেই লেখা ছিল। সে লেখা আপনিও দেখেছেন।

আমি দেখেছি, অথচ আমি জানি না?

কি করে জানবেন? আপনি তো গোণেন নি।

গুণি নি? আবার একটা ধাক্কা খেলেন রামনাস। এর মধ্যে আবার গোনার প্রশ্ন আসছে কি করে?

এসে গেলে আর আমি কি করি বলুন। চাদরের টানা আর পড়েন গুণলেই হত্যাকারীর ঠিকানা পেয়ে যেতেন।

টানা আর পড়েন গুণে হত্যাকারীর ঠিকানা পেয়ে যেতাম? বলছেন কি মশায়?

মাথা-টাথা খারাপ হল নাকি?

আজ্ঞে না, হয় নি। টানা আর পড়েন কাকে বলে তা জানেন?

জানবো না? তাঁতির মাকু চলে আড়াআড়িভাবে। সূতোগুলোও পড়ে সমকোণে। একদিকেরাটাকে বলে টানা, অপর দিকেরটা পড়েন।

এই তো ফুলমার্ক পেয়ে গেলেন। অথচ এখনও ধরতে পারলেন না আমি কি বলতে

চাইছি।

পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে মুখটা হাঁ করে আর বন্ধ করতে পারলেন না রামদাস। মুখব্যাদান করা অবস্থাতেই ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার চোষ, আলোকিত হল

মুখ। আমতা-আমতা করে বললেন অবশেষে, আপনি‒‒আপনি বলতে চাইছেন, ক’টা টানা আর ক’টা পড়েন আছে গুণলেই জানা যেত কোন্‌ তাঁতি ঠিক কতগুলো টানা আর পড়েন ব্যবহার করেছে?

বাঃ, ঠিক ধরেছেন।

কিন্তু তারপর?

তারপর কি?

রক্তমাখা চাদরটার মালিক কে, তা আপনি তাঁতির কাছ থেকে জানছেন কি করে।এতক্ষণে একটা সমস্যার কথা বললেন বটে। আর এই ধাঁধার জট ছাড়াতেই সারাটা দিন হাল্লাক হয়ে ঘুরেছি।

ঘেরা সার্থক হয়েছে বলুন?

তা হয়েছে বৈকি।

ক্ষণকাল পলকহীন চোখে ইন্দ্রনাথের পানে তাকিয়ে রইলেন রামদাস। তারপর বললেন অভিভূত কণ্ঠে, ইন্দ্রনাথবাবু, আপনার কথা আমি অনেক শুনেছি। ভাবতাম আপনি গল্পের নায়ক, বাস্তবে আপনার অস্তিত্ব নেই। এখন দেখছি আছে। মারাত্মক সেই অস্তিত্ব। দয়া করে হেঁয়ালিটুকু ভেঙে আমায় সুস্থ করবেন কি?

রামদাসের কণ্ঠে এমন একটা আকুতি, অমন একটা ব্যাকুলতা প্রকাশ পেল যে, মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত লঘুতা পরিহার করে গম্ভীর হয়ে গেলেউন্দ্রনাথ। একটা কাচি ধরিয়ে নিয়ে শোনাল সেই দুঃস্যহসিক অভিযান বৃত্তান্ত।

সংক্ষেপে বলি।

ইন্দ্রনাথ সন্ধান পেয়েছিল সেই তাঁতির। টান্া আর পড়েন-এর সংখ্যা প্রথমে মিলে গিয়েছিল দুজন তাঁতির মাকুর সংখ্যার সাথে। কিন্তু তাতে কিংকর্তব্যবিমুঢ় না হয়ে উপস্থিতবুদ্ধি খাটিয়েছেিইন্দ্রনাথ। সুতো আর তুলো মিলিয়ে দেখেছে। তাতেই সুরাহা হয়েছে সমস্যার, পাওয়া গেছে প্রকৃত তাঁতিকে-য়ে বুনেছে এই চাদর। রক্তমাখা চাদরটা সঙ্গে নিয়েই বেরিয়েছিল ইন্দ্রনাথ। তাঁতিকে দেখাতেই সে চিনেছে। বলেছে, এ চাদর তৈরি হয়েছে তার হাতে। বেশিদিন আগে নয়। চাদরের গাঁটরিটা তার ছেলে নিয়ে গেছে মার্কেট রোডে—খুচরো বিক্রির দোকানে।

সেখানে ধাওয়া করেছে ইন্দ্রনাথ। জেরা করেছে দোকানদারকে, মানে তাঁতির ছেলেকে। বেশি বেগ পেতে হয় নি। চাদরটা দেখেই দোকানদার বলেছে, এ চাদর গাঁটরি থেকে একটাই বিক্রি হয়েছে দিন সাতেকিআগে। কে কিনেছে? কে আবার কিনবে, রামবাবু—রামবাবু, রাঁচির রামধাবু।

অটিরেই পাওয়া গেছে রাঁচির রামবাবুর পরিচয়। রামসিংহাসন রাম তাঁর পুরো নাম। বাপ-পিতামহের বিশাল জমিদারী ছিল। এখনও যা আছে, তা গড়িয়ে খেলে তিনপুরুষ স্বচ্ছন্দে চলে যাবে। রাঁচির উপকন্ঠেই নেতারহাট যাওয়ার পথে তাঁর বিশাল বাগান আর প্রাসাদ চেনে না হেন লোক রাঁচি শহরে নেই।

রামবাবুকে চেনে রাঁচির আবালবৃদ্ধবনিভা। অমায়িক মিশুকে মানুষ। ধমনীতে নীলরক্ত বইলেও আচারে-ব্যবহারে তিনি সাধারণ মানুষ। পান-দোক্তা-তামাকের নেশা তাঁর নেই। কিন্তু আছে একটি নেশা।

বড় প্রচণ্ড সে নেশা—তগবৎনেশা।

রামসিংহাসন রাম অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ। ঠাকুরদা কালীমন্দির প্রতিষ্টা করেছিলেন বাগানের চৌহদ্দির মধ্যেই। রামবাবু দিনরাত এই কালীমন্দিরেই ধ্যানে বিভোর হয়ে থাকেন।

সেই সময়ে মন্দিরের ত্রিসীমায় কেউ ঘেঁষতে পারে না কেউ—ভেতরে যাওয়া তো দুরের কথা।

বছরবানেক হল এক ঘোর কাপালিক আস্তানা নিয়েছে তাঁর বাগানের আঁটচালায়। কাপালিকের .চেহারা অতি ভীষণ। গলায় রুদ্রের মোটা মালা। পরনে রক্ত বসন।

মাথায় জটাজটু। হতে ত্রিশূল। আর কথায় ‘হর হর ব্যোম ব্যোম’ শব্দে গাল বাজানো তো লেগেই আছে।

কাপালিক বাগানের বাইরে কদাপি আসেন। কিন্তু গভীর রাত পর্যন্ত রামবাবুর সঙ্গে তাঁকে বাগানে ঘুরতে নেখা গেছে।

এসবই শোনা কথা।

প্রতিবেশীরা শুনেছে বাড়ির চাকর-বাকরদের কাছে। আর ইন্দ্রনাথ শুনেছে প্রতিবেশীদের কাছে।

তাঁতির ছেলের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে রামবাবুর বাড়ির দিকেই গিয়েছিল সে। বাড়ির উঁচু পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢোকার সাহস হয় নি। কারণ, পাড়ার লোকের কাছেই শুনেছে দু-দুটো বাঘের মত গ্রেহাটন্ড নাকি চরিশ ঘন্টা পালা করে পাহারা দেয় গোটা বাগান আর প্রাসাদ।

শাপশাপান্তের ভয়ে বাড়ির লোকেরাও ঘেঁষে না কাপালিকের কাছে। তাঁর আটচালার ত্রিসীমানায় তাই কুকুর আর রামবাবু ছাড়া আর কারো যাতায়াত নেই।

এই পর্যন্ত শুনেই লাফিয়ে উঠলেন রামদাস আগরওয়াল। দুই চোখ ছানাবড়ার মত বিস্ফোরিত করে শুধু বললেন, বলেন কি! রামব্যাবু যে দেবতুল্য লোক মশায়! ওরকম ঋষির মত মানুষ রাঁচি শহরে আর দুজন নেই।

ইন্দ্রনাথ বললে, তা ঠিক। চেহারায় তিনি ঋষিপ্রতিমই বটে। শুধু তার দশর্নলাভের জন্যই এতটা সময় গেল আমার। ঘটাখানেক আগে তিনি টমটম চালিয়ে বাড়ি ফিরলেন। একমুখ সাদা দাড়ি, মাধার চুলও ধবধবে সাদা। বয়স কম-সে-কম ষাট, কিন্তু চোখে-মুখে দৃঢ়তা ও বলিষ্ঠতা—জরার চিহ্নমাত্র নেই। কেমন, তাই কিনা?

ঠিক, ঠিক! বলে উত্তেজিতভাবে হাত কচলাতে লাগলেন রামদাস।

তবে কি জানেন, ইন্দ্রনাথ বললে, পৃথিবীর অধিকাংশ ক্রিমিনালের চেহারাই ক্রিমিনালের মত হয় না। যেমন, আমানের মৃগাঙ্ক!

ইয়ার্কি মেরো পরে। রুদ্ধশ্বাস কণ্ঠে বললাম আমি। তোমার সন্দেহ তাহলে এই রামবাবুই শিশু-হত্যাকারী এবং নৃমুন্যশিকারী?

সন্দেহ কি হে, বিশ্বাস—বিশ্বাস, মনেখপ্রাণে বিশ্বাস করি তাই!

কেন করো?

কেন করবো না?

তার মানে?

মানে অতি সোজা। রামবাবু ধর্মপ্রাণ ব্যাক্তি। তিনপুরুষ ধরে তাই গৃহে কালীপুজো চলে। তাঁর এ বাড়িতে একবছর ধরে এক কাপালিক ডেরা নিয়েছেন। বাবু নিজে কালীমন্দিরে উপাসনা করেন এবং কাপালিকের সঙ্গে ঘোরাফেরা করেন। আর—

আর কী?

আর হপ্তা চারেক পরেই কালীপুজো।

তাতে কি?

তাতেই তো সব। মুগাঙ্ক, তুমি কি জানো না এককালে মা কালীকে একশো আটটা নরমুন্ড উপহার দেওয়া হত সাধনায় সিদ্ধিলাভের জন্যে?

ইন্দ্রনাথ—ইন্দ্রনাথ, তুমি কি বলছ ভাই?

ভায়া মৃগাঙ্ক, ভুলে যেও না, বিশাল এই ভারতে ধর্মোন্মাদ বিকৃতাচারীর সংখ্যা এখনও নগণ্য নয়। ভুলে যেও না, আসামে এখনও সর্পদেবতার কাছে মানুষ বলি দেওয়ার জন্যে সেখানকার এক রাণীকে নিয়ে এই সেদিন কাগজে কাগজে লেখালেখি হয়েছে। ভুলে যেও না, হিমালয় অর নীলগিরির আদিম অধিবাসীরা আজও মানুষের মুন্ডু শিকার করে। অষ্টসিদ্ধিলাভের জন্যে ধর্মোন্মাদ কালীসাধক অনেক রকম মানত করে, শপথ করে, প্রত্রিয়া করে।

কে জানে, এক্ষেত্রে রামবাবু তাঁর সাধকভাই কাপালিকের প্ররোচনায় একশ আটটি অথবা একাধিক শিশুমুন্ডের মালা মায়ের গলায় পরিয়ে অষ্টসিদ্ধাইয়ের স্বপ্নে মশগুল কিনা।

কথাগুলো অত্যান্ত শান্তভাবে বললেও তীক্ষ হয়ে উঠেছিল ইন্দ্রনাথের দুই চক্ষু, শক্ত হয়ে উঠেছিল চোরালের রেখা।

রামদাস গোঁফে মোচড় দিয়ে বললেন, তাহলে আপনি কি বলেন?

সার্চ করবেন। আজ রাতেই হানা দেবেন রামবাবুর বাগানের আটচালায়। নইলে আর

একটি শিশুর জীবন-দীপ নিভে মেতে পারে আজ রাতে।

শেষবারের মত গৌফে একটা মোক্ষম মোচড় দিয়ে পা বাড়ালেন রামদাস।

বুঝলাম, আজ রাতেই যবনিকা পড়বে শিশুমুন্ড শিকারীর মারাত্মক অভিযানে।

পড়লও তাই। রামদাসের দীর্ঘ রিপোর্ট দিয়ে অযথা এ-বাহিনীকে দীর্ঘায়িত করে আর লাভ নেই। তাই ছোট্ট করেই বলা যেতে পারে সে-রাতে সফল হয়েছিল তাঁর অভিযান। ধরা পড়েছিলেন রামবাবু আর কাপালিক।

আর, কাপালিকের আটচালার একটা বন্ধ প্রকোষ্ঠ থেকে বেরিয়েছিল কর্তিত শিশুমুন্ডের একটা মস্ত স্তুপ!

রামবাবুর গৃহে কালীপূজা সেই রাত থেকেই বন্ধ হয়ে গেছিল। সেইসাথে বন্ধ হয়েছিল রাঁচিশহরে শিশুহত্যা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *