অতল অন্ধকারে – মিহির সেন
নিজেকে নিয়ে কিছুদিন একা থাকতে চেয়েছিল মানস। নিজের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া সেরে নেবার তাগিদে। তাই পিসিমারা মাসখ্যনেকের জন্য কলকাতায় নেমে আসছেন শুনে নিজেই চিঠি লিখেছিল দিনকয়েকের জন্য দার্জিলিংয়ে যেতে চায় ও। পিসিমারা ওর চিঠি পেয়ে খুব খুশি। বাড়ি তালা দিয়ে যাওয়ার চেয়ে একজন রক্ষক থাকা তো ভালই।
কিন্তু এখানে এসে বুঝতে পারে মানস, এর চেয়ে কলকাতাতেই ভাল ছিল। সেখানে ভিড়ের মাঝে নিজেকে সঁপে দিলে বেশ কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে তুলে থাকা যায়। নিজের মনের মুখোমুখি হতে হয় না। কিন্তু এখানে অহোরাত্র এই খাপি বাড়িতে নিজেকে ভীষণ পীড়িত মনে হয়। মনের আয়নায় সবসময় আর এক মানস যেন স্থির শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে।
ভাল না লাগলেই তাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। দার্জিলিংয়ের এই এক সুবিধে, বেড়ানোর জন্য কোন সময়ই বেসময় নয়। কিছু বেরিয়েও যেন স্বস্তি পায় না। একাকিত্বের আকাঙ্খা নিয়ে এখানে এসেছিল, কিন্তু নির্জন পথে একা হয়ে গেলেই কেমন অস্বস্তি বোধ করে। ভয়-ভয় করে। আবার জনাকীর্ণ ম্যালে গিয়েও আর এক যন্ত্রণা। মনে হয়, গোটা বিশ্বে ও ছাড়া আর সবাই যেন আনন্দে উদ্বেল। এই আনন্দটুকুই তো মানুষের বাঁচার সম্বল। কিন্তু ওর জীবন থেকে যেন সব আনন্দ কেউ শুষে নিয়েছে। আনন্দহীন জীবনের কিই-বা, সার্থকতা? নিছক একটা দেহের কাঠামো নিয়ে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। অথচ এই অর্থহীন কাঠামোকে স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিতে মানুষের যে কী প্রচন্ড আদঙ্ক, দ্বিধা, তা হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছে মানস!
ঠিক এ-সময় হালকা এক ঝলক বাতাসের মত রীতার আর্ভিভাব। ম্যাল পেরিয়ে নিরিবিলি একটা রাস্তার খোঁজে যাচ্ছিল মানস, একেবারে মুখোমুখি মেয়েটির সঙ্গে।
আরে, আপনি এখানে? বিশ্বয়ের চেয়ে খুশির ছোঁয়া বেশি প্রশ্নটায়।
মানস চিনতে পারে না। মেয়েটির মিষ্টি হাসির ওপর চোখ রেখে স্মৃতি হাতড়ায়।
চিনতে পারছেন না, তাই তো? অবশ্য চেনার কথাও নয়। মাত্র একদিনের পরিচয়।
অনেকের মাঝে। তাও বছর সাত-আট আগে। আমি রীতা! রীতা রায়! মানসীর বন্ধু।
অস্ফুটে বলে মানস, কোন্ মানসী?
খিলখিল করে ওঠে রীতা। এই সেরেছে। নিজের মামাতো বোনকেও পারছেন না?
মানস স্বস্তি বোধ করে। ও, আমাদের মানসী? তাই বলুন।
ঠোট টিপে একটু হেসে বলে রীতা, কোন্ মানসী ঠিক খেয়াল করতে পারছিলেন
না তো? যাকগে, বেড়াতে, না কাজে?
বেড়াতেই বলতে পারেন। তারপর একটু ইতঃস্তত করে বলে, কিছু মনে করবেন
না। আপনার সঙ্গে ঠিক কোথায় আলাপ হয়েছিল—
কফি-হাউসে। ইউনিভার্সিটি ফাঁকি দিয়ে বন্ধুরা কফি-হাউসে আড্ডা মারছিলাম। আপনি ঢুকতেই মানসী ডাকল আপনাকে। আমাদের সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। আপনি কবি, সেই পরিচয়সহ।
অবাক হয় মানস। একটু হেসে বলে, আপনার তো অদ্ভুত স্মরণশক্তি! মাত্র একদিনের পরিচয়, তাও সাত-আট বছর আগে, মনে রাখলেন কি করে বলুন তো?
ঠোঁট টিপে হেসে বলে রীতা, সবাইকে কি মনে থাকে? দু-একজন থেকে যায়। হেতু কি, সেটা মনোবিজ্ঞানীরা বলতে পারবেন।
কি জবাব দেবে ভেবে পায় লা মানস। সামান্য বিব্রত বোধ করে। সু-অলাপী ও কোন দিনই নয়।
এই সুযোগে নিজেকে সামলে নেয় রীতা। বলে, সরি, অজ্ঞন্তে একটু চপলতা প্রকাশ করে ফেলেছি বোধহয়। জানেন, এটাই আমার স্বভাব! কারো সঙ্গে একবার আলাপ হলেই তাকে ভীষণ কাছের লোক মনে হয়। রেখে-ঢেকে বা বলতে পারি না। এই উচ্ছলতার জন্য বাড়িতে কম বকা খাই। বন্ধুরাও সাবধান করে, তোর এই স্বাভাবের জন্য একদিন এমন ধাক্কা খাবি না, তখন বুঝবি।
একটু হেসে বলে মানস, আমি কিন্তু কিছু মনে করিনি। বরং বেশ উপভোগ করছিলাম আপনার এই ছেলেমানুষি। অবশ্য একই সঙ্গে এ ব্যাপারে আমার ত্রুটির কথাটাও নতুন করে অনুভব করছিলাম।
একটু হেসে বলে রীতা, সেটা প্রথমদিনই বুঝতে পেরেছিলাম। লজ্জায় আপনি লাল
হয়ে উঠেছিলেন। কথা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আমরা মেয়েরা কিন্তু খুব উপভোগ করছিলাম আপনার অসহায় অবস্থাটা।
আলাপের এ টুকু শুরু, কিন্তু শেষ নয়। রীতাও নাকি বেড়াতেই এসেছে এখানে। এক দুর সম্পর্কের দাদার বাড়িতে উঠেছে। কিন্তু এ-কদিনেই হাঁপিয়ে উঠেছে সঙ্গীসাথী না থাকায়। হৈ-চৈ ছাড়া ও একদম থাকতে পারে না। দম বন্ধ হয়ে আসে। এই সমস্যার মুখে মানসকে ওর মনে হয় এক মুস্কিল-আসান।
মানসও একাকিত্বের আশা নিয়েই এসেছিল এখানে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই একাকিত্বই ওর কাছে এক যন্ত্রণা হয়ে উঠেছিল। ওরও তাই খারাপ লাগে না রীতার
উপস্থিতি। প্রাণবন্ত, অকপট সঙ্গী হিসেবে মেয়েটি সত্যিই আনন্দদায়ক।
রোজ বিকেলে রীতা নিজেই এসে টেনে বের করে নিয়ে যেত মানসকে। মনে কোন
জটিলতা নেই বলেই বোধহয় এটাকে কোন অশোভন আচরণ বলে মনেই হত না মেয়েটির। মানসও কোন চটুলতা খুঁজে পেত না ওর আচরণে।
কিন্তু ক’দিন পরেই রীতা একটা জিনিস লক্ষ্য করল, বিশেষ একটা রাস্তায় যেন কিছুতেই যেতে চায় না মানস। কেবল বলে, অন্য দিকে চলুন। অথচ কেন যে ঐ রাস্তাটা aএড়িয়ে চলতে চায়, তাও বলত না। আরো একটা জিনিসও নজর এড়ালো না রীতার। রীতা কোন সময় সুন্দর বুনো ফুল দেখে খুশি হয়ে সেগুলো তোলার জন্য কোন খাদের পাশে গেলে কেমন যেন আতঙ্কিত হত মানস। আতঙ্কটা চোখে-মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠত।
একদিন বেরুনোর আগে মানসের ঘরে বসে চা খাচ্ছিল দু’জনে। জানালা দিয়ে সামনের বাড়িগুলো দেখা যাচ্ছিল। একটা বাড়ির ঝুলবারান্দায় তিন-চারটে বালিশ রোদে দেওয়া ছিল।
চা খেতে খেতে একবার বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ মানস আতঙ্কে চাপা চিৎকার করে ওঠে! মুহূর্তে বাইরের দিকে তাকিয়ে রীতা দেখতে পেল, সেই ঝুলবারান্দা থেকে একটা কোলবালিশ খাড়া অবস্থায় নিচে পড়ে যাচ্ছে। ঝুলবারান্দায় দীড়িয়ে দু’তিনটি
বাচ্চা ছেলেমেয়ে ঝুকে দেখছে বালিশটাকে। কিছুটা যেন ভীত ওরা! নিশ্চয়ই ওখানে দাঁড়িয়ে হুড়োহুড়ি করতে দিয়ে ওদের ধাক্কা লেগেই বালিশটা রাস্তায় পড়ে গেছে।
মুহূর্তে মানসের দিকে ফিরে তাকায় রীতা। মানস রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছছিল। চোখে-মুখে এখনও চাপা আতঙ্কের ছাপ।
আস্তে জিজ্ঞেস করে রীতা, কি ব্যাপার বলুন তো?
মানস স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে বলে, কই, কিছু না তো? হল আপনার চা খাওয়া?
অমন উচ্ছল রীতাও এবার সামান্য গম্ভীর হয়। বলে, মেয়েদের চোখকে অত সহজে ফাঁকি দেওয়া যায় না মানসবাবু। আপনি কি দেখে ভয় পেয়েছিলেন?
চোখ নামিয়ে একটু আমতা-আমতা করে মানস বলে, আমার…হঠাৎ যেন মনে হল, কেউ…একটা বাচ্চাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিল।
শুনে যেন আশ্বপ্ত হয় রীতা। একটু হেসে বলে, তাই বলুন। আপনি পুরুষমানুষ; এত নার্ভাস! তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলে, চলুন, বেরুনো যাক।
দিন কয়েক পর দারুণ উচ্ছ্বসিত গল্পে ভুপিয়ে রীতা মানসকে ওর সেই অনিচ্ছ্যর রাস্তার মুখে নিয়ে আসে। হঠাৎই খেয়াল হতে দাঁড়িয়ে পড়ে মানস। বলে, এদিকে কিছু দেখার নেই, অন্য দিকে চলুন।
রীতা আবদারের সুরে বলে, চলুন না। এতদিন হল এসেছি, এ পথটায় কোনদিন
যাইনি। দেখার মত কিছু থাকতেও তো পারে।
মাথা নেড়ে আপত্তি জানায় মানস। আমি বলছি, কিচ্ছু নেই। অন্য দিকে চলুন। এবার কপট জেদে বলে রীতা, সব সময় আপনার জেদটাই বজায় থাকবে বুঝি? আমার একটা অনুরোধ—
বাধা দিয়ে বলে মানস, আসলে…ও রাস্তাটা ভল নয়। মাঝেমাঝে নাকি ছিনতাই-টিনতাই হয়। মাঝে শুনলাম একটা রেপ কেসও হয়ে গেছে। তাই…আপনাকে নিয়ে
একা আমি ও পথে যেতে পারব না।
রীতা ওর আপত্তি মেনে নেয় কিন্তু বেশ বোঝে মানসের অজুহাতটা সত্যি নয়। এর
কোন গোপন আতঙ্ক জড়িয়ে আছে পথটার সঙ্গে। কিন্তু কি হতে পারে সেটা?
এতদিন মানসের গাম্ভীর্য, অন্যমনস্কতা দেখে ভেবেছিল রীতা, লোকটা স্বভাবে অন্তমুর্খী। এমন ইন্ট্রোভার্ট ছেলে-মেয়ে ও আগে দেখেছে। কিন্তু এবার সন্দেহ শুরু হয় রীতার, এটা মানসিক ভারসাম্য হারানোর লক্ষণ নয় তো? ***
ক’দিন পর আর একটি ঘটনায় এ-সন্দেহ আরো বাড়ে। বিকেলে যখন মানসকে ডাকতে আসে, ওর হাতে ছিল ছোট্ট একটা টেপরেকর্ডার। সেটা দেখেই কেমন যে ভাবান্তর ঘটে মানসের। ভুরু কুঁচকে বলে, ওটা কি?
হেসে বলে রীতা, টেপরেকর্ডার।
‒ওটা এনেছেন কেন?
‒এখানকরি কিছু পাখি আর ঝনার্র শব্দ ক্যাসেটে তুলে নিয়ে যাব বলে।
আপত্তি জানায় মানস, না, না, ও-সব নিয়ে বেরুনোর কোন দরকার নেই।
সামান্য গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করে রীতা, কেন?
মানস আছে বলে, ও-জিনিসটাকে আমি একদম সহ্য করতে পারি না।… ভীষণ ডিস্টার্বিং বলে মনে হয়। …একটা চটুল রুচিইীন প্রমোদ উপকরণ।
হেসে ফেলে রীতা বলে, আশ্চার্য আপনার সত্যযুগে জন্মানো উচিত ছিল মানসবাবু। কোন মুনির তপোবনে। যেখানে শহর-সভ্যতার কোন চিহ্ন নেই।
হাসিটা ছিল রীতা সাজানো। নিজেকে আড়াল রাখার জন্য এককৌতুহলী মনে এ-ঘটনাটা নতুন একটা সন্দেহের সংযোজন। মানসের কথা মেনে নিয়ে টেপরেকর্ডারটা মানসে বাড়িতেই রেখে যায় রীতা।
কিন্তু বেড়াতে-বেড়াডে, হাসি Tগল্পের ফাঁকে যাঁকে কেবলই মনে হতে থাকে, মানসের এই বিকারগুলো অহেতুক নয়। বাতিক নয়। এর পেছনে কোন গোপন সুত্র
লুকিয়ে আছে নিশ্চয়ই। রীতা এবার কৌতুহলী হয়ে ওঠে সেই সূত্র আবিস্কারে।
দিন কয়েক পর নিজেদের বাড়িতে একদিন চায়ের নিমন্ত্রণ করে রীতা মানসকে। ওর দাদা বৌদি সেদিন শিলিগুড়ি গিয়েছিলেন কি কাজে যেন।
সন্ধ্যায় মানস এলে, ওকে নিয়ে সুন্দর সাজানো বসবার ঘরটায় এনে বসায় রীতা।
সোফার পেছনেই জানালায় টবের গাছ। দেওয়ালে যামিনী রায়ের দুটো ছবি। রুচির ছাপ সর্বত্র।
রীতা যেন আজ অন্য দিনের চেয়েও উচ্ছ্বল। খুশি মানসও। কিন্তু প্রকাশহীন।
কথায় কথায় একসময় ছেলেবেলার কথা তোলে রীতা। ছেলেবেলার সরল্য, আবেগ, বোকামির নানা গল্প। হঠাৎ একসময় থেমে আচমকা প্রশ্ন করে রীতা, আচ্ছা বলুন তো, আই লাভ যু’র বাংলা কি?
একটু হকচকিয়ে যায় মানস। সামলে নিয়ে বলে, কেন, আমি তোমাকে ভালবাসি।
কপট রাগে বলে রীতা, এ মা! আপনি আমাকে এ কথা বললেন?
বলেই খিলখিল করে হেসে ওঠে। বলে, এগুলো ছিল আমাদের ছেলেবেলার দুষ্টুমি। ভালবাসা শব্দটার ভাল করে মানেই বুঝতাম না তখন।
একটু হেসে বলে মানস, এখন বোঝেন তো? আমার কিন্তু মনে হয়, আপনার বয়সটা তারপর আর বাড়েনি।
চোখে সূক্ষ্ম ভর্সনা এনে বলে রীতা, প্রমাণ চান? এক্ষুণি?
হাত জোড় করে মানস, মাপ করুন বাবা!
আরো দু-চারটা কথার পর উঠে দাঁড়ায় রীতা। একটু বসুন, দেখি চা কদ্দুর।
একটু বাদে নিজেই চায়ের ট্রে হাতে ঘরে প্রবেশ করে রীতা। দরজার মুখে একটু খামে। মুখে চাপা কৌতুকের হাসি।
হঠাৎ টেপরেকর্ডার থেকে ভেসে আসে মানসের স্বর, কেন, আমি তোমাকে ভালবাসি। তারপর এ-প্রসঙ্গে এদের সব ক’টি কথা।
শুনে চমকে ওঠে মানস। চোখে-মুখে গভীর আতঙ্ক। এই মুহুর্তে কেমন যেন অপ্রকৃতিস্থ মনে হচ্ছে ওকে। রীতাও সামান্য ভয় পায়।
চিৎকার করে উঠে দাঁড়ায় মানস। স্টপ ইট। আই সে স্টপ ইট! কে আপনাকে এ স্বাধীনতা দিয়েছে? এক্ষুণি বন্ধ করুন বলছি।
রীতার দিকে ছুটে আসে মানস। ওর কাঁধদুটো খামচে ধরে। ঝাঁকি দেয়, বদ্ধ করুন।
রীতার হাত থেকে ট্রেটা পড়ে যায়। ঝনঝন শব্দে কাপ-ডিস ভেঙে যায়। আতঙ্কিত রীতা ছুটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। গিয়ে টেপরেকর্ডার বন্ধ করে দেয়। জানালার টবের গাছের আড়ালে মাউথপিস লুকিয়ে রেখে মানসের কন্ঠস্বর তুলে নেবার এ পরিণতির কথা কলরনাও করতে পারেনি ও।
ঘরে এসে দেখে, ঘর খালি! চলে গেছে মানস।
এতদিনে নিশ্চিন্ত হয় রীতা, এই মানসিক বিপর্যয়ের সঙ্গে অবশ্যই কোন গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে! এখন থেকে শুর প্রধান কাজই হবে সেই রহস্য খুঁজে বের করা।
পরদিন সকালেই মানসের বাড়িতে যায় রীতা। মানস চুপ করে শুয়ে ছিল।
আস্তে ঘরে ঢুকে বলে রীতা, ক্ষমা চাইতে এলাম।
দ্রুত বিছানায় উঠে বসে মানস। না, না, আপনি কেন ক্ষম্া চাইবেন? কালকের ঘটনার জন্য আমিই বরং ভীষণ লজ্জিত, অনুতপ্ত। আমাকে ক্ষমা করবেন। তারপর একটু থেমে বলে, কালই জানি চলে যাচ্ছি।
ওর চোখে চোখ রেখে আস্তে বলে রীতা, তাতেই কি বাঁচবেন?
একটু চমকায় মানস। অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলে, মানে?
কিছুটা দূরত্ব রেখে ওর খাটেই গিয়ে বসে রীতা। তারপর সহানুভূতির সুরে বলে, আমার চোখকে আপনি ফাঁকি দিতে পারবেন না মানসবাবু। আমি বেশ বুঝতে পারছি, প্রচন্ড একটা মানসিক অশান্তি, অস্থিরতা আর আতঙ্ক আপনাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে ক্যনসারের জার্মের মত ভেতর থেকে কুরে-কুরে খাচ্ছে আপনাকে।
কেমন অসহায় স্বরে বলে মানস, আপনার সন্দেহ একেবারে অমূলক নয়।
এ ব্যাপারে আমি কোন সাহায্য করতে পারি আপনাকে?
আপনি! আপনি কি করবেন? এ আমার একান্তই নিজস্ব সমস্যা!
পৃথিবীতে এমন কোন সমস্যা নেই, চেষ্টা করলে যা সমাধান করা যায় ন্য। অন্তত সাময়িকভাবে কিছুটা হালাকাও তো করতে পারেন মনকে। বিপদের দিনে কাউকে না কাউকে বিশ্বাস করতে হয় মানসবাবু। তার ওপর নির্ভর করতে হয়। আমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে, বন্ধু ভেবে বলতে পারেন, আপনার কি হয়েছে। বলবেন?
আলতোভবে ওর হাতের ওপর হাত রাখে রীতা। বন্ধুত্বের ছোঁয়া।
একটা চাপা অস্থিরতা নিয়ে উঠে দাঁড়ায় মানস। ঘরে সামান্য পায়চারি করে। তারপর ওর দিকে ফিরে বলে, আপনার অনুমান মিথ্যে নয়। কিন্তু আমাকে আর একটু ভাবার সময় দিন।
সেদিন বিকালেই মানস অকপটে সব কথা খুলে বলে রীতাকে। নির্জন একটা জায়গায় একটা টিলার আড়ালে বসে। না বলে উপায় ছিল না। ওর মানসিক যন্ত্রণা
ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছিল। বেশ বুঝতে পারছিল, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে আস্তে
আস্তেেউন্মত্ততার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ও। বেঁচে থাকাটাই এক অভিশাপ হয়ে উঠেছে।
অথচ কাউকে বলে নিজের মন হালকা করতে পারছিল না। তেমন সহানুভূতিশীল, বিশ্বস্থ কেউ ছিল না ওর জীবনে। সেই অভাব পূরণ করার জন্যই যেন রীতার এই দৈব-আবির্ভাব।
কেমন আচ্ছন্নের মত নিজের কথা বলে যাচ্ছিল মানস। কিছুটা এলোমেলোভাবে। আর সমস্ত চেতনা সজাগ রেখে ওর কথা শুনে যাচ্ছিল রীতা।
স্বামী স্ত্রীর ছোট সাংসার ছিল মানসের। সুখী সংসার। স্ত্রী দীপা ছিল কবি স্বামীর গুনমুগ্ধ। ওদের পারস্পরিক নির্ভরতা আর বিশ্বাস অনেক বন্ধুরই ঈর্ষার হেতু ছিল।
ওদের নিজেদের এই ছোট্ট জীবন-বৃত্তে আর একজনের সবস্থিতি ছিল অপরিহার্য অবিচ্ছেদ্য। মানসের অভিন্ন-হৃদয় বন্ধু সন্দীপের। ছেলেবেলা থেকে ওদের এই অবিচ্ছিন্ন বন্ধুত্বে ছেদ পড়েনি ওদের বিয়ের পরও। মনের দিক দিয়ে কিছুটা দূর্বল, সংসারে অনভিজ্ঞ আর উদাসীন মানসের এবমাত্র নির্ভরস্থল ছিল সন্দীপ। সন্দীপ ছাড়া নিজেকে ভাবতে গেলে কেমন অসহায় বোধ করত মানস। সন্দীপও সে রকমই। বন্ধুকে মুখে সব সময় বাপ-বাপান্ত করে গালাগাল করলেও মানসের সব কাল নিজে আগ বাড়িরে করে দিত। ইলেকট্রিক বিল গ্যাস, মিউনিসিপ্যালিটির ট্যাক্স
থেকে শুরু করে সংসারের ঝুট-ঝামেলা সামাল দিতো সন্দীপ। বিয়ের পর এজন্য ভীষণ সঙ্কোচ বোধ করত দীপা। আড়ালে মানসকে বকত। এর এই আলসেমির জন্য। বন্ধুকে এভাবে বেগার খটানোর জন্য!
কিন্তু কিছুনিন পরেই বুঝতে পারে, মুখে যতই গালাগাল করুক বন্ধুকে, এ কাজগুলো সন্দীপ করে স্বেচ্ছোয়। কর্তব্যবোধে। সব ঝড়-ঝাপটা থেকে মানসকে আড়াল করেই যেন ওর আনন্দ। মাঝেমাঝে শুদের দুই বন্ধুর সম্পর্কটাকে মনে হত দীপার অসহায় সন্তান আর স্নেহময়ী জননীর।
কিছুদিনের ভেতরই সন্দীপের এই নির্ভরতার অভ্যেসটা দীপার ভেতর অজান্তেই সংক্রোমিত হল যেন। সন্দীপদা ছাড়া এক পা-ও যেন চলতে পারত না দীপাও।
এ-নিয়ে অনেকেই কটাক্ষ করত। কুৎসা রটাত। দীপার বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলত, কিরে কলির দ্রৌপদী, দুই পাগুব নিয়ে কেমন ঘর করছিস? অভিজ্ঞরা বলত, এ ব্যাপারটা মানব চরিত্র বিরোধী। দুটি পুরুষ ও এক নারীর এই ত্রিভূজ চিরকাল ইতিহাসে বহ অঘটন আর বিপর্যয় ঘটিয়েছে। ওরা কি সৃষ্টিছাড়া?
কিন্তু বাইরের কারো কথায় কান দিত না ওরা। পাত্তা দিত না। নিজেদের তৈরি এক দ্বীপে পরম নিশ্চিতে বাস করত তিনজন। লোকের চোখে আঙ্গুল দিয়ে যেন প্রমাণ করতে চাইত, পারস্পরিক বিশ্বাস নির্ভেজাল হলে দুই পুরুষ আর এক নারীর আদর্শ ত্রিভূজও গড়ে তোলা যায়।
কিন্তু অদিশ্বর বোধহয় আড়ালে বসে হাসছিলেন তখন। না হলে মাস ছয়েক আগে এই দার্জিলিংয়েই তিনজন মিলে বেড়াতে এসে সবকিছু এ-ভাবে তছনছ হয়ে যাবে কেন?
একনাগাড়ে অনেকক্ষণ বলে থামে মানস। হয়তো ক্লান্ত হয়ে, অথবা পরের ঘটনাটুকু মনে মনে সাজিয়ে নিতে। রীতা অপেক্ষায় বসে থাকে। আড়চোখে একবার টিলাটার দিকে তাকায়—লা, কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
আবার শুরু করে মানস, দার্জিলিংয়ে এসে দারুণ হৈ চৈ করে দিন কাটাচ্ছিলম আমরা তিনজন। আমি একটু শীত-কাতুরে বলে বেশির ভাগ সময়েই সন্দীপের সঙ্গে
বেরুত দীপা। আমি তাতে হাঁপ ছেড়ে বাঁচতাম।
বলতে ভুলে দিয়েছিলাম, সন্দীপ নাটক লিখত। কিন্তু লেখার ব্যাপারে দারুণ খুঁতখুতে আর আলসে ছিল। মুড না এলে লিখত না। পেশাদার নাট্যকার ছিল না বলেই অবশ্য এই মেজাজটা ধরে রাখতে পারত। আমি, আর বিশেষ করে দীপা, এজন্য প্রায়ই বকতাম ওকে। লেখার জন্য চাপ দিতাম। কিন্তু আমাদের কোন পাত্তাই দিত না ও।
দাজিলিংয়ে এসে একটা নতুন নাটক লেখার ইচ্ছেটা ওর ভেতর দানা বাঁধছে মনে
হল। আমি আর দীপা এতে মনে মনে খুব খুশি হলাম।
একদিন গল্প করতে করতে নাক ডাকার প্রসঙ্গ এল। সংবাদপত্রের একটি সংবাদের সূত্রেই! লন্ডনে এক মহিলা নাকি বিবাহ বিচ্ছেদের েআবেদন জানিয়েছিলেন আদালতে ঘুমের তেতর স্বামী ভীষণ নাক ডাকেন বলে। স্বামীর নার্সিকাগর্জনে মহিলা রাত্রে ঘুম্যতে পারতেন না।
সন্দীপ হেসে দীপাকে বলল, মানস কেমন সহনশীল স্বামী দেখ, সারারাত তুমি পাশে শুয়ে নাকের দামামা বাজানো সত্বেও উচ্চবাচ্যটি করে না।
দীপা ঝেড়ে অস্বীকার করে, না মশাই, ঘুমের ভেতর আমার মোটেই নাক ডাকে না তোমরা আমাকে ক্ষেপানোর জন্য বললেই হল?
নাক কিন্তু সত্যি ডাকত দীপার। প্রথম প্রথম তাতে আমার ঘুমের সামান্য ঝ্যাঘাত যে না ঘটত, তা নয়। কিন্তু পরে অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দীপাকে নাক ডাকার কথা বদলে ও দারুন চটে যেত!
সঙ্গে একটা টেপরেকর্ডার নিজে এসেছিলাম আমরা।
শুনে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয় রীতা। একটু হেসে বলে, নিশ্চয়ই আপনার বন্ধুর মাথায়
দুষ্টুবুদ্ধি চেপেছিল, আপনার স্ত্রীর নাক ডাকা রেকর্ড করে আপনাদের কথাটা প্রমাণ
করার?
প্রশংসার দৃষ্টিতে রীতার দিকে তাকিয়ে মানস বলে, একজ্যাক্টলি তাই! প্রায়ই দুপুরে
ঘুমোত দীপা। একদিন ও সে সময় টেপরেকর্ডার ওর মাথার পাশে রেখে ওর নাক ডাকার শব্দটা তুলে নিল। বলল, এখন কিছু বলিস না। রাত্রে খাবার টেবিলে এটা চালিয়ে দিয়ে অবাক করে দেব ওকে।
সন্দীপ ওর লিজের ঘরে গিয়ে একটা বই নিয়ে শুয়ে পড়ল। অমি পোস্ট-অফিসে গেলাম অফিসে একটা জরুরি টেলিগ্রাম করার জন্য। ছুটি এক্সটেনশনের ব্যাপারে।
পোষ্ট-অফিসে হঠাৎই এক চেনা ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হওয়ায় ফিরতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে দেখলাম আমার দেরি দেখে বেরিয়ে গেছে সন্দীপ আর দীপা। কোনদিকে যাচ্ছে সেটা লিখে রেখে গেছে। আমার খুজে পেতে সুবিধে হবে বলে।
একটু পরে বেরুব ভেবে বিছানায় গা এগিয়ে দিলাম। একটু গড়িয়ে নেবার জন্য। হঠাৎ টেপরেকর্ডারের দিকে নজর পড়ল। ভাবলাম, একবার চালিয়ে দেখিতো, দীপার লাসিকাগর্জনটা কেমন এল।
টেপা চালিয়ে চালিয়ে জায়গাটা খুচ্ছে নিতে গিয়ে হঠাৎ এক জায়গায় দীপা আর সন্দীপের নিচু গলার সংলাপ শুনে একটু ব্যাক করে আবার চালিয়ে দিলাম টেপটা। আর অবাক হয়ে শুনলাম, স্পষ্ট ওদের প্রেমালাপ। স্বামীকে লুকিয়ে সন্দীপের সঙ্গে এই গোপন সম্পর্ক বজিয়ে রাখতে নাকি হাঁপিয়ে উঠেছে ও। স্বামী যতই ভালমানুয আর গবেট হোক, কোন্ সময় যে ওদের গোপন ব্যাপারটা আঁচ করে বসে, সে ভাবনায় আতঙ্কিত দীপা।
নিজের কানকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। ঘুরিয়ে আবার শুনলাম সংলাপগুলো। আবারও।
কোন ভুল নেই, ওদেরই কন্ঠশ্বর। দাউ-দাউ করে মাথায় আগুন জ্বলে উঠল আমার। আমার বিশ্বাস আর সারল্যের সুযোগ নিয়ে এতদূর এগিয়ে গেছে ওরা?
আমাকে এত মূর্খ ভাবছে? তাহলে দেখছি অভিজ্ঞ প্রাজ্ঞদের সেই কথাটাই ঠিক, দু’টি পুরুষ ও এক নারীর ত্রিভূজ বাস্তবে কিছুতেই সম্ভব নয়।
পুরুষের সেন্স অপ পজেসন যে কী ভীষন তীব্র হতে পারে, সে মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম আমি। বিশ্বাস আর ভালবাসা যত তীব্র হয় বিশ্বাসভঙ্গজনিত ঘৃণা আর প্রতিহিংসাও তত তীব্র হয়। সেই মুহূর্তে সিদ্ধান্তে এলাম আমি, এই বিশ্বাসঘাতকতার
শাস্তি ওদের পেতেই হবে। তার পরিণতি যাই হোক না কেন।
আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। মনে হচ্ছিল, একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। চারপাশের সব কিছু আবছা। যেন স্বপ্নের ভেতর হাঁটছি।
নির্জন একটা রাস্তায় গিয়ে ওদের দেখা পেলাম একটা খাদের পাশে ঝুঁকে বুনো ফুল তুলছে দীপা। ওর হাতটা শক্ত করে ধরে আছে সন্দীপ। এই দীপা, কী হচ্ছে? এবার এস। পড়ে যাবে। আমাকেও মারবে দেখছি।
খিলখিল করে হেসে বলল দীপ্য, তোমার সঙ্গে সহমরণ! সে তো সৌভাগ্য আমার!
সন্দীপ বলল, এ কথা শুনলে তোমার পতিদেবতা হাটফেল করবে কিন্তু।
ততক্ষণে পায়ে পায়ে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছি আমি। ওদের গেছনে এসে দাঁড়িয়েছি। হঠাৎ কি যে হল আমার! আচমকা এক ধাকায়—
আতঙ্কে বিস্ফোরিভ চোখে রীতা অস্ফুটে বলে, ওদের খাদে ফেলে দিলেন?
হ্যাঁ। নিষ্প্রাণ, নিথর স্বর মানসের।
একটু থেমে থেকে বলল, fকিন্তু আরো আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানেন? এর জন্য এক বিন্দু অনুতাপ হল না আমার। অপরাধবোধ জাগল না মনে। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে গুলি করে মারার পর সৈনিকদেরও বোধহয় এরকমই প্রতিক্রিয়া হয়। কে জানে।
আস্তে বলে রীতা, তারপর?
কেউ দেখতে পারনি ঘটনাটা। আমি স্বাভাবিকভাবেই বাড়ি ফিরে এলাম। তারপর রাত দশটা নাগাদ থানায় দিয়ে রিপোর্ট করলাম, আমার স্ত্রী আর বন্ধু বেড়াতে বেরিয়েছিল, তাঁদের কোন খোঁজ পাচ্ছি না।
পুলিশ পরদিন সকালে গভীর এক খাদ থেকে ওদের মৃতদেহ উদ্ধার করল। হোটেলের কর্মচারীদের কাছ থেকে পুলিশ জানতে পারল, ওরা দু’জন আমার অনুপস্থিতিতেই বেরিয়ে গিয়েছিল।. ফিরে এসে ওদের না দেখে একাই বেরিয়ে গিয়েছিলম আমি। আর খুঁজে না পেয়ে একাই আবার ফিরে এসেছিলাম। তাদের কাছ থেকেই পুলিশ আরো একটি তথ্য জানতে পারল, আমাদের তিনজনের ভেতর কী গভীর বন্ধুত্ব ছিল। ***
শেষ পর্যন্ত এটা একটা অ্যাকসিডেন্ট বলেই ধরে নিল পুলিশ।
রীতা চাপা বিতৃষ্ণার সঙ্গে বলল, আর আপনিও নিশ্চিন্ত মনে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে গেলেন?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল মানস, তা আর পারলাম কই? তাহলে তো বেঁচে যেতাম আমি।
ঠিক বুঝতে না পেরে রীতা বলল, মানে?
মানস বলল, পুলিশের ঝামেলা মিটিয়ে দার্জিলিং থেকে নেমে আসার জন্য জিনিসপত্র গোছাচ্ছিলাম। হঠাৎ সন্দীপের টেবিলের ঢাকনার নিচে কয়েক শিট কাগজ দেখে সেগুলো টেনে বের করলাম। একটা নাটকের পান্ডুলিপির কয়েকটা পৃষ্ঠা। বুঝলাম, একটা নতুন লাটক লিখতে শুরু করেছিল সন্দীপ। দু’একটা পৃষ্ঠা নাড়াচাড়ার পরই হঠাৎ এবটা পৃষ্ঠার এক জায়গায় দৃষ্টি থেমে গেল। আশ্চার্য! টেপে দীপা আর সন্দীপের যে সংলাপ শুনেছিলাম, হুবহু সেই সংলাপ। একবার মনে হল, আমি ভুল দেখছি না তো? আবারও পড়লাম। না, দীপা আর সন্দীপের সেই গভীর প্রেমালাপের সংলাপগুলোই। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠল আমার। তাহলে…তাহলে কি সম্দীপের জেদাজেদিতে ওরা দু’জন টেপরেকর্ডার চাসিয়ে নাটকের এই অংশটা অভিনয় করে দেখছিল, কেমন আসে?
আমার চোখের সামনে গোটা পৃথিবীটা অন্ধকরে হয়ে দুলে উঠেছিল। তারপর আর কিছু মনে নেই আমার। জ্ঞান ফিরলে দেখলাম, আমি আমার বিছানায় শুয়ে।
আস্তে মাথা নিচু করে মানস। চোখের সামনে মানুষটা যেন কেমন ভেঙ্গেচুরে যাচ্ছে! এখন আর বিদ্বেষ নয়, ঘৃণা নয়, গম্ভীর সহানুভূতির সঙ্গে মানসের দিকে তাকায় রীতা। নিঃশব্দে ওর হাতের ওপর হাতটা রাখে! সান্তনা দেবার ভঙ্গিকে।
হঠাৎ চোখ তুলে তাকায় মানস রীতার দিকে। আবেগে ওর হাতটা চেপে ধরে। কাঁপা গলায় বলে, আমাকে তুমি বাঁচাও রীতা। তোমার সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকেই
আমার আবার বাঁচতে ইচ্ছে করছে! ভুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে না রীতা।
আস্তে ওর মুঠি থেকে হাতটা সরিয়ে নেয় রীতা। অস্ফুটে বলে, আমাকে একটু ভাবতে দিন।
কিন্তু জানত রীতা, যতই সহানুভূতি বোধ করুক, নতুন করে কিছু ভাবার অবকাশ নেই ওর। কিছু বলারও নেই। সত্যি কথাটা বলতে হলে তো সবই স্বীকার করতে হয়। বলতে হয় ও রীতা নয়, লোপামুদ্রা। মানসীর বন্ধু নয় ও। এমনকি মৌখিক পরিচয়ও নেই মানসীর সঙ্গে! লোপামুদ্রা কলকাতার এক প্রাইভেট ডিটেকটিভ অফিসের মহিলা ডিটেকটিভ। সন্দীপের মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু নয় সন্দেহ করেই সন্দীপের পরিবার থেকে নিয়োগ করা হয়েছিল ওকে সন্দীপের মৃত্যু-রহস্য উদঘাটন
করার জন্য। আরো বলতে হয়, পেশার খাতিরে ওদের আজকের পুরো আলোচনাটাই টিলার আড়ালে বসে টেপ করে নিয়েছিল ওর বৌদি। সেই টেপটা নিয়ে কালই কলকাতায় রওনা হতে হবে রীতার, ওরফে লোপামুদ্রার।
না, এ কথাগুলো সহ্য করতে পারবে না মানস। ও কলকাতা পৌছানোর আগেই হয়তো আত্মহত্যা করে বসবে। তার চেয়ে ওর জীবন থেকে নিঃশব্দে সরে পড়াই ভাল। ডিটেকটিভ হলেও সেও তো একজন মেয়ে। ভালবাসার স্পর্শ চিনতে তো ভুল হয় না ওর। ভুল হয়নি।
***
