হীরের টুকরো – গজেন্দ্র কুমার মিত্র

হীরের টুকরো – গজেন্দ্রকুমার মিত্র

বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। হ্যা, ক’বছর তাও মনে আছে রত্নার। তখন মাত্র এগারো বছরের। বাবার সঙ্গেই দাঁড়িয়ে ছিল। আগেকার অন্ধকার—বাবা যা গল্প করেন—এখনও মাঝে মাঝে ভুল হয়ে যায়, করতেন বলাই উচিত—তা হোক, সেই সাইরেন বাজানো অন্ধকার—এ তা নয়! এখন সরকারী কর্মচারীদের শৈথিল্যের জন্য কৃত অন্ধকার। বলা নেই কওয়া নেই—ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে যায়। চারদিকে ঝলমল করছে আলো, হঠাৎ পাড়াসুদ্ধ নিকষ কালো অন্ধকার।

সেদিন রবিবার। ওঁদের দোকান বদ্ধ, বাবা বিকেলে বারতিনেক চা খেয়ে অলস সন্ধ্যাটা উপতোগ করছিলেন। হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যেতে মনে হল, বাইরে রাস্তাঘাট দেখার মতো ঘটনা তো অন্যদিন দেখা যায় না—আজ দেখা যাক।

সঙ্গে সঙ্গেই রত্মা বেরিয়ে এসেছিল, বাবার লুঙ্গিটা ধরে—তখনই এই ঘটনাটা ঘটল।

আকস্মিক, অকারণ, স্বপ্নাতীত।

ভদ্রলোক ব্যবসাদার। পৈতৃক ব্যবসা, মনোহারীর দোকান। তখন ছিল সামান্য, পরে বড় ছেলে কেশব, তার তখন পঁচিশ বছর বয়স, ছোট মাধবের তেইশ—এরাই খেটেছে। প্রাণপণে খেটেছে। সামান্য থেকেই দোকানটিকে অসামান্য করে তুলেছে। অবশ্যই প্ল্যান-প্রোগ্রাম কেশবেরই, শুধু আমদানী করা মনোহারী বস্তু নয়—কিনে এনে বিক্রি করা—তাতে থামে নি কেশব—কিছু কিছু জিনিস তৈরি করেছে ছোট ছোট কারখানা করে। ক্রমশ সে কারখানা বেড়েছে। সেটা কেশবই দেখেছেন। মাধব দোকানটি।

‘ঝাঁপ বন্ধ করা’ যাকে বলে-সব বন্ধ করে দুই ভাই হিসেব-নিকেশ নিয়ে বসতেন—ফলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা, এক একদিন বারোটাও বেজে যেত।

অর্থ এলেই অনর্থ—কথাটা প্রতিদিনেই যেন জপমালার মতোই মনে করে রত্বা।

এবার একদিন কেশবই কথাটা তুলল। বলল, ‘দ্যাখো, এখন তো আমরা একারবর্তী নই, স্ত্রীরা এলে একত্রে থাকাও যায় না। দুজনেরই ছেলেমেয়ে আছে, ভবিষ্যৎ—। তুমি ভাল করেছ পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে দিয়ে ভাড়াবাড়িতে উঠেছ, এ তোমার মহত্ত্ব। তা তেমনি আমি ভল জমি কিনে, প্ল্যান পর্যন্ত করে দিয়েছি—বাড়ি উঠতে শুরু করেছে। তোমার না অসুবিধা হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখি সর্বদা।

‘তা আমি বলি কি, তুমি যেমন মনোহারী দোকানটা দেখছ- তোমার চেষ্টাতেই অনেক বাড়িয়েছ, ওটাই তোমার থাক, আমি কারখানাটা নিই। কী বল?’

মাধব এইটেই আঁচ করেছিল, তার জন্য প্রস্তুত ছিল। বলল, ‘তা কেন দাদা, সংসার আলাদা হয়েছে হোক, ব্যবসা একসঙ্গেই থাক, এরও অর্ধেক লাভ ভুমি নেবে, আমিও কারখানার অর্ধেক লাভ নেবো। এতে ঝগড়াঝাঁটির তো কারণ নেই। যেমন চলছিল তাই থাক না!’

এই সূত্রপাত

প্রথমে বুঝিয়ে বলা, তারপর একটু কটু কথা। মনের বিষ উদগার করা। এটর্নি উকিল আসা-যাওয়া শুরু হল।

এই ভাবেই চলছে, এমন সময়ে এই কান্ড।

যে বাড়িতে মাধব আছে- একতলা, নীচু। পাওয়া যায় নি বলেই এ বাড়িতে আসা। তা ছাড়া বাড়ি তৈরি চলছে, একতলা থাকার মতো হলেই সে বাড়ি চলে যাবে। এমন কোন জীবন-মরণ টানাটানির মতো হবে তা মাধব ভাবে নি।

সেদিন রবিবার আগেই বলেছি। ছুটির দিন, অলস দিন, সন্ধ্যার মুখে হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেল (এ অবস্থা তখন প্রাত্যহিক ছিল না, তবে ছিল)। মাধবের মনে হল এমন অবস্থা কখনও বাড়ি বসে দেখে নি, কারণ কাজের দিন দোকান থেকে ঘরে ফিরতে এখনও দেরি হয়—আজ একবার বাড়ির দরজায় গিয়ে দেখা যাক। সে এসে বাইরে দাঁড়াল। তখনও হ্যারিকেন জ্বালার বোধ হয় সময় হয় নি। অকস্মাৎ একটা লোক সাইকেলে যেতে যেতে একটা রিভলবার থেকে গুলি করেই তীরবেগে চলে গেল! মাধবের দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

এখনও মনে হয় রত্নার, সেই সন্ধের ঘটনাটা ভাবলে আজও যেন মনের সে অবস্থা হয়ে পড়ে। বিহ্লল? না আরও বেশিরকম কিছু? রত্না তখন বেশ ছোট, বাবার সঙ্গে রত্নাও বাইরে বেরিয়ে এসেছিল, বাবার লুঙ্গির একটা প্রান্ত ধরে।

ঘটনাটা কি হল—ভাবতেই তো খানিকটা সময় গেল। ততক্ষণে অবশ্যই অনেকে বেরিয়ে এল। তারপর পুলিস ইত্যাদি।

কেশব খুব হাহাকার করলেন। ঐ দোকান বেশ মোটা টাকায় বিক্রি করে সব টাকা ভাদ্রবৌয়ের হাতে তুলে দিলেন, কী ভাবে টাকা সব লগ্নী করা যায় তাও শিখিয়ে দিলেন। শুধু তাই নয়, বাড়িটা যতদূর সম্ভব তৈরি হয়ে যাক তা তিনি দাঁড়িয়ে থেকে তদারক করেছেন। গৃহপ্রবেশের দিনও দাঁড়িয়ে থেকেছেন, স্ত্রী-পুত্র নিয়ে।

কেউ কোন অভিযোগ করতে পারবে না। মহাদেবের মতো বড় ভাই—সকলেই ধন্য ধন্য করলে।

মাধবের একটি মেয়ে—সেটিই রত্না। ছেলেটি মাত্র ছয় বছরের। সুতরাং ব্যবসা

করার মতো কেউ সাবালক হয় নি।

রত্না বড় হয়েছে, এম. এসসি. পাস করেছে, কলেজে চাকরি করছে।

বিয়ের কথা তোলে মা, রতা শুধু বলে ‘না মা, সে সময় হয় নি এখনও।’

রত্না সেদিনের কথা ভুলতে পারে নি। সেই অভিশাপপূর্ণ সন্ধ্যারাত্রির কথা।

বাবার এই অপঘাত মৃত্যুর শোধ নেবে সে, তার আগে আর কোন কথা ভাববে না। সে কথা কাউকে বলতে পারে নি, পাছে ঘাতকটি সতর্ক হয়ে ওঠে। খবরের কাগজেও এ সমন্ধে কোন ‘রাও’ তুলতে দেয় নি।

মনে থাকার কথা নয়। বলতে গেলে পলকের কথা, এই ঘটনা। তবু মনে আছে রত্নার—পিস্তলের আলো জ্বলে ওঠার মুহূর্তটিতেই একটি আংটির ছবি চোখে পড়েছিল—মধ্যে কী একটা পাথর তা দেখা যায় নি, পাথরটির দুপাশে ছোট ছোট হীরের দুটো টুকরো চোখে পড়েছিল।

যত ছোটই হোক, তারও জেল্লা অসাধারণ।

একবার মনে হয়, এতে কি—এই সামান্য পাথরের দ্যুতিতে ওকে পথ দেখাতে পারবে?

কিন্তু আকস্মিক ভাবেই ঘটনার যোগাযোগ ঘটল। কলেজের সেমিনার উপলক্ষে দ্বারভাঙায় যেতে হল রত্নাকে। মোকামা অংশনে নেমেছে রত্না, পরের ট্রেনে দ্বারভাঙা

যাবে। অকস্মাৎ ওর চোখে পড়ল, আগে মানুষটা নয়, আগেই সেই পাথরটা। মাঝখানে বড় মুক্তো একটি, আর দুপাশে দুটো হীরের টুকরো ছোট ছোট।

চোখ জ্বলে উঠল রত্নার।

এতদিনে পেলাম। তবে কি বাবার আত্মা পথ দেখিয়ে দিল?

কিন্তু যার হাতে আংটি—সে যে ঘাতক হবার মতো নয়।

বাঙালী তো বটেই, বয়স ২৫ থেকে ২৮-এর মধ্যে, অতি সুপুরুষ এবং বড় ঘরের কোন ছেলে।

সম্ভবত কোন কাজেই এসেছেন বা এসেছিলেন।

পরিচয় তো নেই-ই, হঠাৎ কথাটা পাড়লে খারাপ দেখাবে না? অথচ—

না, সময় নেই।

একেবারেই সামনে এসে বলল, ‘কিছু মনে করবেন না, এ আংটিটি কোথা থেকে পেয়েছেন?

ভ্রুকুটি দেখা দেবে বৈকি!

সঙ্গে সঙ্গেই রত্না সে ভুলটা বুঝলে।

একেবারে হাতজোড় করল রত্না।

‘দেখুন, কথাটা এভাবে বলা উচিত নয়, তা আমি বুঝি, কিন্তু হঠাৎ আপনাকে দেখলুম, এই আংটিটা হাতে—আমার যে এর সঙ্গে একটা ভয়ঙ্কর—ভয়ঙ্কর কথাটা জোর দিয়েই বলছি স্মৃতি। তাই—

নরম হলেন ভদ্রলোক। বললেন, ‘আমি তো এত জানি না, কিছুই জানি না। একটা মোকর্দমার ব্যাপারে এসেছি, আমি সবে অ্যাটর্নিগিরি ধরেছি—এসেছিলুম ভাগলপুরে

এক উকেলের কাছে, সেই প্রসঙ্গে কথা হতে হতে উকীলবাবু বললেন, আপনার তো

টাকা আছে, একটা আংটি কিনবেন? অতি মহার্ঘ্য আংটি, জ্বলের দামে বিক্রি করতে

চাইছে একজন। এই উর্দুবাজারের মধ্যেই—এক হাজ্বার টাকা পেলেই দেবে।

‘তার মানে চোরাই?’

‘হ্যাঁ।’ এসব আংটি চোরাইতে আসে বা খুনোখুনি—। তাতে কি, আপনার শখ থাকে তো নিন, আমি জিম্মাদার।

‘তা শখ হল। নিয়ে নিলাম। ইতিহাস এইটুকু।’

রত্না বললে, আংটিতে আমার লোভ নেই, ও সর্বনেশে আংটি। আমি সেই লোকটিকে চাইছি। তার হদিশ কোথায় পাবো?’ .

‘তা আমিও জানি না। তবে যাবেন আমার সঙ্গে ভাগলপুরে? আমার যে কৌতূহল হচ্ছে খুব।’

‘তাহলে তো আমি বেঁচে যাই। চলুন চলুন।’

উর্দুবাজারে গিয়ে উকিলবাবুকে ধরতে তিনি বললেন, ‘কে দিয়েছে তা জানি, কিন্তু সে কি আর এক হাতে এসেছে! দেখি।’

ডেকে পাঠালেন। সে লোকটি—দিলমহম্মদ নাম, প্রাণভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এল, আগেই কীাঁদো-কাঁদো হয়ে বললে, ‘আমি কিছু জানি না হুজুর, ঐ দুধওয়ালা বললে, তার কে আত্মীয় হয়, সেই বললে—

‘ঠিক আছে, তাকে আনতে হবে। দুধওয়ালাকে বলো এসব কোন ঝঞ্ঝাটের ব্যাপার নয়, একটা ঠিকানা জানতে চাই।’

দুধওয়ালা এবার সঙ্গে করে নিয়ে এল আর একজনকে। সেও কাঁদো-কাঁদো। বললে, বাবু, এক বাঙ্গালই আমার কাছে এসে বললে, আমি এটা কমদামেই পেয়েছি, যে বেচেছে সে বোধ হয় কোন চোরাই মাল পেয়ে থাকবে—বলেছে, আমি কাশী চলে যাবো, ওখানে কোন কাম যদি পাই, আমাকে তো কেউ বিশেষ চেনে না—তুমি যা হয় দাও। তা আমি অনেক টানাটানি করে চারশ টাকা দিয়েছিলুম বাবুসাহেব, তারপর এই হাত ঘুরতে ঘুরতে—

অ্যাটর্নি দেবেশবাবু বললেন, ‘তুমি ঠিক জানো সে কাশীই চলে গেছে?’

‘তা কী করে জানবো। তবে অন্য কোন জায়গায় গেছে কিনা—?’ বলতে বলতে বলে উঠল, ‘একবার শুধু বলেছিল, আচ্ছা, দ্বারভাঙা যেতে হলে কোন্‌ গাড়িতে চড়তে হবে? অবশ্য যাবো না এখন—ওখানে আমার এক বহিন আছে—যা হোক সে পরে হবে।’

‘দ্বারভাঙা শহর?’

‘তা বলতে পারব না। তবে বাঙালী দ্বারভাঙা শহরেই বেশি।’

আর দেরি করল না দেবেশ আর রত্না রতানার তো দ্বারভাঙাতেই যাবার কথা। দেবেশের কৌতুহল ও সংশয় আংটি নিয়ে। উকীলবাবু জোর করে খাইয়ে রাত্রের ট্রেনেই ওদের তুলে দিলেন।

দেবেশের দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় থাকেন দ্বারভাঙায়, নন্দবাবু, তিনিও উকীল। দেবেশরা প্রথমে ওখানেই গেলেন।

‘আরে, আসুন আসুন, এ কী ভাগ্য আমার।’ বলতে বলতে সঙ্গে করে সামনের বড় বারান্দায় বসালেন নন্দবাবু। প্রবাসী বাঙালীরা অতিথিপরায়ণ হন। ওখানে চেচিঁয়েই

স্ত্রীকে বললেন, ‘ওগো শুনছ, দেবেশরা এসেছেন, আগে চা দাও, মুখ হাত ধোওয়ার জল পাঠাও—দেরি কোরো না।’

দেবেশ বললো, ‘কী বিপদ, এমন হৈচৈ করবেন জানলে আসতুম না।’

‘বটে, অ্যাটর্নি হয়েছেন বলে একেবারে আসতুম না বলে বসলেন! এত অধৈর্য কেন। এই ইনি? বিয়ে হয়েছে, না হবে।’

দেবেশ বললেন, ‘সত্যি, এই জন্যেই বলে গাঁওয়ার। দুম্‌ করে বলে বসলেন। কিছুই না। ইনি একটা জিনিসের জন্যে খুব ব্যগ্র। মোকামা জংশনে পরিচয়, ওর জন্যেই উজানে আসতে হল। আর কিছু না।’

নন্দবাবু একটু অপ্রস্তুত হলেন।

যাই হোক, চা এল, প্রচুর লুচি-তরকারী এল, মিঠাই। মুখ-হাত ধোওয়ারও অসুবিধা হল না।

তার মধ্যেই রত্বার আংটির কথাটা উঠল।

সব শুনে Tনন্দবাবু বললেন, ‘বিপদে ফেললেন, এখন দ্বারভাঙা আগের মতো এতটুকু নয়। নতুন এসেছে, বোনের কাছে। এইটুকু শুধু জানেন। খয়ের! দেখি কী করা যায়!’

দেরি হল বিস্তর! নন্দবাবু তিন-চারজনকে লাগিয়ে দিলেন। তাতেও সময় লাগল। স্নান করে উঠেও উদ্বিগ্ন হয়ে বসে রইল রত্না। এই উদ্বেগ নিয়ে সেমিনারের আলোচনাতেও যোগ দিয়ে লাভ হবে না। এই ভদ্রলোককে নিয়ে আসা, খরচাও নিচ্ছেন ণা—তার সঙ্গে এই আতিথেয়তা বড় লজ্জায় পড়ে রইল।

তবে বিকেলের মধ্যেই সে লোকটিকে পাওয়া গেল। হ্যাঁ, লোকটি বোনের বাড়িই এসেছে, সেও নাকি অনেকদিন পরে—বিয়ের পরেই বলতে গেলে।

যে লোকটি এল, মাঝারি ধরনের গড়ন। তবে বেশ একটু মাথা উচু করা লোক। অপরদের মতো কাঁপতে কাঁপতে আসা নয়।

আরও লক্ষ্য করল রত্না, রাঙালী হয়েও উচ্চারণটা যেন বহুদিনের ঐ অঞ্চলের বাসিন্দাদের মতো।

প্রশ্নটা নন্দবাবুই তুললেন!

উকীল মানুষ। দেখেই বুঝলেন, এ মাথা উচু করা লোক। সেই ভাবেই কথাবার্তা চালালেন।

‘তুমি বাপু, এই আটটার কথা কিছু জানো?’

‘জানি বৈকি বাবু, এর অনেক কাহিনী। আপনারা কেউ শচীদুলালবাবুকে চিনতেন?’

‘না, কে শচীদুলাল, শুনি নি তো।’

‘আপনাদের অবশ্য জানবার কথাও নয়। সে যাক্‌, তিনি কলকাতারই লোক, লেখাপড়া জানা। আপনারা কেউ কলকাতারই এক লোক—কেশবাবুকে চেনেন? শুনেছি খুব ভারী ব্যবসার মালিক।’

‘জানি বেকি। আমার জেঠামশাই। তিনি এর মধ্যে— রত্না উৎকন্ঠায় বিস্ময়ে কথা

শেষ করতে পারল না।

মুখে চু-চু শব্দ করে বললে, ‘সে যাক, কথাটা তো পাড়তেই হোত। যাক্‌, আগে শচীদুলালের কথাটাও বলি। ঐ ভবানীপুরেরই মানুষ, লেখাপড়া-জানা লোক, টাকাকড়িও ছিল। বিয়েও হয়েছিল ভাল মেয়ের সঙ্গে—কিন্তু একরকম লোক থাকে জানেন তো, এরা অধঃপাতেই নামতে চায়। প্রথমটা শুরু হল জুয়া খেলার। ঘোড়দৌড় তো বটেই, তা ছাড়া নানারকম শুরু হল। ফলে বাজে বজ্জাত লোকেদের পাল্লায় পড়ল। ঘরে খপসুরত বউ, অথচ একটা কালো ধুমসো মেয়েছেলের সঙ্গে দিন কাটায়! আনুষঙ্গিক তো সবই আছে, এমন লোক অধঃপাতের জন্য ব্যস্ত হবেই।

টাকা হাতে না থাকলে নানান ফিকিরে টাকার জন্যে হন্যে হয়ে বেড়ায় ওরা। ক্রমে যেমন সব রকম নেশায় চতুরং তেমনি সব রকম পাপে। আপনাদের কেশববাবু নাকি এইরকম লোকই চেয়েছিলেন। শচীকে ডেকে এনে বললেন, দ্যাখো, তুমি নাকি সব কুকর্ম করে বেড়াও। মানুষ মারতে পারো? শচী বললে, হ্যা, পারি বৈকি। ওটা অবশ্য এখনও হয় নি। তবে মোটা টাকা পেলে সেটাও শুরু করতে পারি।

‘কত চাও? কেশববাবু জিজ্ঞেস করেছিলেন।’

‘দশ হাজার চাই। আর পাঁচ বোতল বিলিতী হুইস্কি।’

‘না,’ অত হবে না। পাঁচ হাজার পাবে আর অল প্রোটেকশন।

‘এই নিয়ে নাকি অনেকক্ষণ দর-কযাকষি হয়। শেষ পর্যন্ত রফা হল—কিছু মনে করবেন না বাবু, এ এ শচীবাবুর কাছেই যা শোনা—ছ হাজার টাকা; একটা রিভলবার, আর ঐ যে কেশববাবুর হাতের আংটি চাই।’

‘কেশববাবু খুব ধস্তাধস্তি করেছিলেন, সদ্য নাকি কোন বিলাইতি সাহেবের কাছ থেকে কিনেছেন আড়াই হাজার টাকা দিয়ে—কিন্তু শচীরও এঁ বুলি ছিল, নইলে হবে

না। আগত্যা এ আংটি খুলে দিতে হল।

‘তারপর—মনে হচ্ছে আপনাদের আত্মীয়। খুন করতে এক মিনিটও লাগে নি, তা নিয়ে যতই হট্টগোল হোক, শচীকে কেউ জড়াতে পারে নি। জড়ালেন কেশববাবুই। তাই-ই শচীর সন্দেহ। শচী এটা তাবে নি কখনও। কে সব লোকজন ছিল, অন্য একটা ব্যাপারে এমন ভাবে ফাঁসিয়ে দিলেন—শচীরও তো অগুণতি ছিদ্র জীবনে—

পুলিসও একেবারে প্রস্তুত হয়ে ছিল—মামলা সাজানোরও কোন খুঁত হয় নি—জেলে চলে গেলেন ছ বছরের জন্যে! আর, আমি ও’র মুখে সব শুনে যা বুঝেছিলুম, ওকে আর বাতাস পেতে হবে না।’

দেবেশ স্থির মুখে সব শুনে বললেন, ‘এসব তুমি জেলের মধ্যেই জেনেছ তো? না?’

‘হ্যা হুজুর। মিথ্যে বলব না। ভাল কিছু করতে গিয়ে মন্দ পথে পা দিয়েছিলুম। আমি অবশ্য জেলে গিছলুম শচীবাবুর জেল হবার অনেক পরে। আমার সাজাও ছিল কম, আড়াই বছর।’

‘তা ও iআংটি তুমি পেলে কি করে?’

‘বলছি বাবু, আমি ওর মতো পাঁড় বদমাইশ ছিলাম না। কিছু দিক্‌-এর জন্যই এটা  হয়েছিল—সেই জন্যেই হোক, আর এমনিই আমি বাবু নির্বিরোধী মানুষ, তিনিই আমাকে একদিন নিভৃতে বললেন, দ্যাখো, আমার যা শরীরের অবস্থা, অনেক রকম ?

অত্যাচার চালিয়েছি তো এই শরীরটার ওপর বেশী দিন বাঁচব না, যদি বা বাঁচি, কেশববাবু হয়তো অন্য ফাঁদে জড়াবেন। পুলিস তো ওর পয়সা খেয়ে বসে আছে। তোর ওপর আমার একটা ভালবাসা হয়েছে। আমার সবচেয়ে শখের জিনিস একটা আংটি, দামী বলে নয়, বিপিতী সেটিং, এমন আর দেখি নি কখনও—কেশববাবুরও খুব শখের জিনিস, সবে আঙুলে পরেছেন, সেইটে আমি জোর করে আদায় করেছিলুম। কেশববাবু ভেবেছিলেন জেলে পোরবার সময়ে কেড়ে নেবেন—তা পারেন নি। অনেক প্যাঁচ শিখেছি বজ্জাতদের সঙ্গে—সেটা নিতে পারেন নি।… অথচ আমারও ভোগে লাগল না, ওটা অভিশাপের আংটি। তুই নিয়ে যদি কোনমতে বার হতে পারিস, এটা পরবার চেষ্টা করতে যাস নি, যত তাড়াতাড়ি পারিস বেচে দিস, যা পাস।’

‘সত্যিই শচীবাবু বেশীদিন বাঁচেন নি। আমি জেল থেকে বেরোবার মাস দুই আগেই মারা গেলেন। আমারও বাবু ভয় হয়েছিল, আমি অবিশ্যি কলকাতায় ভাঙাবার চেষ্টা করি নি, চলে এসেছিলুম ভাগলপুরে—যে সব পাড়ায় এই সব কথা নিয়ে ঘোঁট হবে না, সেই জায়গাতেই এটা দিয়েছি আর যা দিয়েছে তাই নিয়েছি। এই আমার কথা! এখন আপনারা মালিক।’

বলে লোকটি চুপ করল।

ওকে কিছু বলার ছিল না, ওকে নিয়ে কোন কাজেরও প্রয়োজন নেই।

সেই আংটি নিয়ে রত্না আর দেবেশ সেই দিনই রওনা হল। ঘটনা সব শোনার পর দেবেশ আংটা খুলে রত্বার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। রতা দেবেশ যে দামে কিনেছিলেন সেই দাম দিতে চেয়েছিল। দেবেশ নেন নি, বলেছিলেন, ‘এখন থাক, পরে দেবেন। আমি তো আপনার সঙ্গেই আছি, যবনিকা না ওঠা পর্যন্ত!’

কলকাতায় ফিরে আসার পর একদিন পরে দেবেশকে নিয়ে জেঠার বাড়ি গেল রত্না।

এটা যেন এখন স্বতঃসিদ্ধ হয়ে গেছে, দুজনকে একই সঙ্গে যেতে হবে এ ব্যাপারে।

জেঠার বাড়ি, কেউ কিছু বর্ণার নেই। সবাই অভ্যর্থনা করল, কেবল দেবেশ সম্বন্ধে একটু জিজ্ঞাসা ও প্রশ্ন রয়ে গেল!

রত্না জিজ্ঞেস করল, ‘জেঠু কোথায়?’

‘ওর কদিন শরীরটা ভাল নেই, ডাক্তার আসছে। তা যাও না। তুমি যাবে তার আর কি?’

রত্না চোখের ইঙ্গিতে দেবেশকেও সঙ্গে যেতে বলল। দেবেশ সম্বন্ধে ওদের চোখে-মুখে প্রশ্নটা শুধু ফুটে উঠল! রত্না কিছু বলল না।

কেশববাবুর ঘরে ঢুকে রত্না কোন সম্ভাষণের অবকাশ দিল না। সরাসরিই কথাটা পাড়ল আংটিটি বার করে, ‘এই যে জেঠু, কেমন আছেন! আপনার একটা শখের জিনিস ছিল, এতদিন পরতে পারেন নি—এই যে সেই আংটিটা। বাবাকে খুন করতে গিয়ে টাকার সঙ্গে এই আংটিটাও দিতে হয়েছিল শচীদুলালকে, তার মরাবার পরও আপনি খুঁজে পান নি। ভাইয়ের জীবনের জন্যে টাকার মূল্য যা দিতে হয়েছিল, তার সঙ্গে এটাও ছিল না?’

কেশববাবু কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘এ—এ সব কি, কী বলছিস! এ লোকটা কে?’

প্রত্যৎপন্নবুদ্ধিতে বলল রত্না, ‘ইনি পুলিসেরই লোক। ওঁদের কাছে সবই কাগজপত্র আছে—তা আজ তো আর এ অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যাবে না।’

কেশব একবার উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করতে গিয়ে প্রায় আছড়ে পড়ে গেলেন।

আর উঠতে পারলেন না। বোধহয় আর পারবেনও না।

আংটিটা সামনেই গড়িয়ে পড়েছিল মেঝের ওপর। রত্না পায়ের জুতো দিয়ে মাড়িয়ে গুঁড়ো করে দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *